• খেরোর খাতা

  • কাদামাটির হাফলাইফ ৪

    Emanul Haque লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৪ জুলাই ২০২১ | ৩৬৬ বার পঠিত
  • কাদামাটির হাফলাইফ ৪
     
    ইমানুল হক
     
    আমাদের শৈশব থেকে শুনে আসছি এই গ্রামের যাত্রার ঐতিহ্য বেশ প্রাচীন। ১৩২০ সালে (১৯১৩ খ্রি) বন্যার পর শুরু হয় আমার জন্ম গ্রামে যাত্রা পালার আসর। ১০০% ঘটি তথা পশ্চিমবঙ্গীয়-র বাস। পরে এক জন পূর্ববঙ্গীয় এসে আশ্রয় নেন। সাদেক জামাই বা সাদেক বাঙ্গাল। গ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নুরুন ফুফুর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। নুরুন ফুফু এক আশ্চর্য মানুষ। অপূর্ব তাঁর জীবন কথা। তাঁকে কেউ কোনদিন কারো সঙ্গে ঝগড়া করতে দেখেননি। পরে তাঁর কথা সবিস্তারে বলা যাবে। আজকের হিসেব ধরলে আমাদের গ্রামের যাত্রাভিনয়ের ইতিহাস ১০৪ বছরের পুরনো। আমাদের গ্রামের বহু মানুষ কলকাতা ও তার সন্নিহিত অঞ্চলে চাকরি বা কাজ করতেন। এদের অধিকআংশই ছিলেন মুসলিম। এরাই যাত্রা প্রচলন করেন হয়তো। আমার নিজের ঠাকুর্দা স্টার থিয়েটারে ছদ্মনামে অভিনয় করেন সে কথা আগেই বলেছি। যাত্রা হতো মূলত কলেরার দেবী ওলাইচন্ডী দেবীর পূজাকে কেন্দ্র করে। জন্ম থেকেই দেখে আসছি মেলা বসে। ১৯ মাঘ বাঁধা তারিখ। ১৯ মাঘ মেলা। ২০-২১ যাত্রা। একবার টানা সাতদিনও যাত্রা হতে দেখেছি।
    যাত্রার যেসব প্রবীণ অভিনেতার কথা শুনেছি। তাঁদের নিয়ে বহু মজাদার গল্প চালু ছিল। একটা কথা বলা ভাল আমাদের এলাকার মানুষরা রসিকতা করে কথা ভালবাসেন। সবকিছুতে মজা । 
    ম-  নামে এক খ্যাতিমান অভিনেতা ছিলেন, যাঁর সম্পর্কে একটি কথা চালু ছিল, তিনি কলকাতায় থাকতেন—তিনি নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন—ধান গাছের তক্তা/পাটা হয়? এটা সত্য ধরে নেওয়ার কারণ থাকতে পারে নাও পারে কেউ মজা করে রটিয়ে দিতেও পারে। কারণ রগড়বাজ মানুষের অভাব ছিল না।
    যাত্রার মধ্যে পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক পালার বেশ কদর ছিল। তবে ১৯৮০-র পর সামাজিক পালার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ে। মানুষের অভাব কমে আসে অল্প স্বল্প। হয়তো সে কারণেও।
    যাই হোক দুটি বহুশ্রুত গল্পের কথা বলা যাক।
    ব পণ্ডিত আর ক শেখ অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। যাত্রায় দুজনে পার্ট পেয়েছে। তবে প্রতিদ্বন্দ্বীর। যুদ্ধ আছে। (আর কে না জানে যাত্রায় যুদ্ধ একটি অতীব চিত্তাকর্ষক বিষয়। আমরা ছোটরা ঘুমিয়ে পড়লে বলতাম—যুদ্ধের সময় ডেকে দিও। যুদ্ধ মানে কেরিচুঁ কেরিচুঁ বাজনা আর তলোয়ারের খেলা। আমরা তো যাত্রার পর মাসখানেক কঞ্চি নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে যেতাম। রাম লক্ষণের তীর ধনুক তো ছিল বহুদিনের অঙ্গ। তবে সে সব কঞ্চির তৈরি। কেনা নয়)।
    দুজনে খুব প্র্যাক্টিস করেছে যুদ্ধ। সময়ে অসময়ে। তা যাত্রায় দু-বন্ধুর যুদ্ধ চলছে। আগুন ঠিকরাচ্ছে তলোয়ার দিয়ে। প্রম্পটার পরিচালক ইশারা করেও থামাতে পারছেন না। একজনের হাতের তলোয়ার পড়ে যাবে। যাত্রার ভাষায় পতন এবং মৃত্যু। যুদ্ধ থামছে না। দর্শকরা তো খুব খুশি। এদিকে দু যোদ্ধার বাবারা উত্তেজিত—তার ছেলে হেরে যাবে হতেই পারে না। যেমনি যার হেরে যাওয়ার কথা তলোয়ার ফেলার উপক্রম করছে অমনি তার বাবা হুংকার দিচ্ছেন—কী তুই অমুকের ছেলের কাছে হেরে যাবি—তোকে ঘরে ঢুকতেই দেব না। উলটো পক্ষেও এক আওয়াজ । তা দুই ছেলে কী করে, বীর বিক্রমে লড়ে যাচ্ছে। যেই দারুণ লড়ে অমনি বাবার চিৎকার –  কাল থেকে তোর দু সের চালের ভাত আর আর এক বালতি দুধ বাঁধা। আর অন্যজনের বাবার বক্তব্য—তোকে কালো গরুর দুধ খাইয়েছি অমনি। দরকারে আরেকটা গরু কিনবো। কিন্তু তসুকের ছে্লের কাছে হারা চলবেনি। তাতে দু বাবা—যারা নিজেরাও খুব বন্ধু, ছেলেদের বন্ধুত্ব পাতানোয় তাদের ভূমিকা কম নয়—তাদের উত্তেজিত সংলাপে জাতপাত ধর্ম—সব এসে যেত। কিন্তু ওই পর্যন্তই । কখনো কোনদিন আমাদের গ্রামে ধর্ম নিয়ে গণ্ডগোল হয়নি।
    শেষ পর্যন্ত নাকি তলোয়ার ভেঙ্গে যুদ্ধ থামে।
    এবং তারপর দু বন্ধুর গলা জড়িয়ে প্রস্থান। কারো জয় নেই। কারো পরাজয় নেই।
    আর একটা গল্প চালু ছিল।
    কোহিনূর চাই নবাবের। কোহিনূর পাচ্ছেন না। কোহিনূরের চিন্তায় উন্মাদ।
    চরিত্রাভিনেতা বলেই চলে চলেছেন , নানা বিচিত্র ভঙ্গিতে কোহিনূর কোহিনূর।
    হাততালিও দেদার।
    আবেগে মত্ত। খেয়াল নাই। পাশেই ছিল যন্ত্রশিল্পীরা‌ । তাঁদের তবলায় পা পড়ে আওয়াজ উঠল -- গবাং। মানে তবলা ফেঁসে গেছে।
    কোহিনূর কোহিনূর গবাং-- বহুকাল চলেছে যাত্রাপ্রসঙ্গে
    গ্রামে যাত্রার জন্য পাগলামো এবং ধর্ম নিয়ে সহনশীলতা কতদূর ছিল বোঝাতে একটি ঘটনার উল্লেখ জরুরি।
    একবার গ্রামে যাত্রা কোন কারণে হয়নি।
    তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে মুসলিম ধর্মাবলম্বী এক যাত্রাপ্রিয় মানুষ একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী একজনের সঙ্গে মিলে মা ওলাইচন্ডীর মুখ ঘুরিয়ে দেয়। বক্তব্য একটাই—যাত্রা না  হওয়ায় মা কুপিত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন। 
    তো কী আর করা মায়ের মন রাখতে আবার যাত্রা শুরু হয়ে গেল।
    এবং সেই সম্প্রীতির ট্রাডিশন আজও বহমান।

     

  • আরও পড়ুন
    D 14/10 - Arka Goswami
  • ১৪ জুলাই ২০২১ | ৩৬৬ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি প্রতিক্রিয়া দিন