ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  বিবিধ  শনিবারবেলা

  • লেখার টেবিল - তৃতীয় পর্ব

    সাম্যব্রত জোয়ারদার
    ধারাবাহিক | বিবিধ | ১৯ জুন ২০২১ | ১৯৭২ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • পর্ব - ১ | পর্ব - ২ | পর্ব - ৩

    পুরোনো দিনের কাঠের টেবিলগুলো যেমন হয়। অনেকটা উঁচু। নিচে পা-রাখার জায়গা। যাকে ইংরেজিতে বলে— ফুট রেস্ট। এটা অবশ্য অনেক পরে জেনেছিলাম। টেবিলের দু’দিকের কোনায় দু’টো ড্রয়ার। তার মধ্যে লুকিয়ে রাখা এক জাদুকরের জগৎ। আগলে রাখা ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা। টেবিলটা ছিল বাবার। পরে বড় হয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে সেটি দখল করলাম। নব্বইয়ের একেবারে শুরুর দিকে বাসাবদলের পর টেবিলটি আমার জিম্মায় এল। তাতে জমে উঠল লিটল্ ম্যাগাজিন। ফুটপাথ থেকে খুঁজে বের করা সব আশ্চর্য উজ্জ্বল উদ্ধার। তখনও লেখালেখি নিয়ে সেভাবে কিছু ভাবিনি। কলেজ স্ট্রিটে যাওয়া হচ্ছে নিয়মিত। প্রেসিডেন্সি কলেজের পোর্টিকোও ধোঁয়া উদযাপন চলছে। কফিহৌসের সুড়ঙ্গ দিয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে উপরে উঠছি। আবার রাতের অন্ধকারে সাঁতার কাটতে কাটতে মিলিয়ে যাচ্ছি শিয়ালদা স্টেশন, ওয়েলিংটন, নিমতলা, শ্যামবাজার কিংবা যাদবপুর এইট-বি মোড়ের দিকে। টেবিলের ড্রয়ারে জমা হচ্ছে— না লেখা চিঠি। জমা হচ্ছে বাসের টিকিটের পিছনে লেখা কথোপকথন। চকোলেটের মোড়ক। পাথরের টুকরো। বেশি রাতে ট্রেনের শান্টিং। সেতুর মাথায় ঝুঁকে পড়া বহুতল মেঘ। একটা গোটা জুন মাস সূর্যাস্ত-হলুদ রঙের ওষুধের স্ট্রিপ সমেত ঢুকে পড়ছে শিরা-উপশিরায়, স্নায়ুতে। আর টেবিলের নিচে জড়ো হচ্ছে, জমায়েত হচ্ছে, রক্তবর্ণ কাপড়, লাল-সালু।

    বাবার ছিল সরকারি অডিটের চাকরি। কাজের সূত্রে বাংলার প্রায় সমস্ত জেলা-সদরেই যেতে হত। সিউড়ি। মালদা। বালুরঘাট। জলপাইগুড়ি। একবার গরমের ছুটিতে আমাদের ডেকে নিলেন উত্তরবঙ্গ। রাতের দার্জিলিং মেল ধরে সকালে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। মেঘলা দিন। ওভারব্রিজের উপর থেকে অনেকটা দূর দেখা যাচ্ছে। ট্রেন লাইন বেঁকে গেছে। নিচে প্ল্যাটফর্মে একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন দাঁড়িয়ে। হুইসল বাজিয়ে ছেড়ে দিয়ে আরও উত্তরের দিকে চলতে শুরু করল। শিলিগুড়ি শহরটা তখন জলরঙে আঁকা কবিতার মতো। সেই ছোট ছোট বাড়ি। টিনের চাল। সামনে একটু বাগান। সুপুরির সারি। হিলকার্ট রোড। সেবক রোড। ভেনাস মোড়ে সাইকেল রিকশ’র কনসার্ট, সম্মেলন। দার্জিলিং মোড়, মাটিগাড়া, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে জিপ ছুটল নকশালবাড়ি। এক পাশে ন্যারোগেজ লাইন। আর ডানদিকে চা-বাগান আর চা-বাগান পেরিয়ে দার্জিলিং পাহাড়।

    ছোটবেলা থেকেই কিছু কিছু শব্দ মাথায় গেঁথে গিয়েছিল। এ’দেশ আমাদের হলেও আসলে আমাদের নয়। আমরা রিফিউজি। উদ্বাস্তু। দেশভাগের কারণে একদিন রাতারাতি ভিটেমাটি সব ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে। এই স্বাধীনতা টেবিলের তলায় হয়েছে। নেতাজী থাকলে দেশের এই হাল হত না। কলোনির ছেলেমেয়েরা অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা শিখেছে। কংগ্রেসি গুন্ডারা ভোট দিতে দেয়নি। আর নকশাল আমলে পুলিশ খুব অত্যাচার করেছে। কত ভাল ভাল ছেলেকে গুলি করে মেরেছে।

    কাক উড়ে গেলে কখনও তাল পড়ে। হয়ত বা কাকতালীয়। তবু লিখি— আমার জন্মের ঠিক আগের দিন ৭ ফেব্রুয়ারি দ্রোণাচার্য ঘোষকে জেলের মধ্যে গুলি করা হয়। খুন হন তিনি।দ্রোণাচার্য ছিলেন কবি। বিপ্লবী। হুগলির মগরার মানুষ। অত্যাচারী জোতদার খুনের দায়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন। রাষ্ট্রের হেফাজতে চরম শারীরিক অত্যাচার চলে। দ্রোণাচার্যকে ইমামবাড়া হাসপাতালে ভরতি করা হয়। সেখান থেকেও পালিয়ে যান তিনি। আত্মগোপন করেছিলেন। কিন্তু ফের পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যান। দিনলিপিতে দ্রোণাচার্য লিখেছিলেন— কবিতা এবং রাজনীতি দুই-ই আমার কাছে সমান প্রিয়, তবে কবিতা কিছু পরিমাণে বেশি। অবশ্য দুটোই পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, কেউ কাউকে বাদ দিয়ে নয়, তবু শেষ অবধি আমি কবিই।... এটা স্পষ্ট বুঝেছি এই সমাজকে পাল্টাতে হবে। এই শোষণের সাম্রাজ্যকে পাল্টাতে রাজনীতি হচ্ছে পথ। আর কবিতাও এই পাল্টানোর জন্য আমার অন্যতম হাতিয়ার। আর তাছাড়া রাজনীতিকে বাদ দিয়ে ‘মানুষের কবিতা’ লেখা যায় না। মানুষের কবিতা লিখতে চেয়েছিলেন দ্রোণাচার্যের মত অনেকেই। যেমন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র তিমিরবরণ সিংহ। শঙ্খ ঘোষ ছিলেন তিমিরের মাস্টারমশাই। ‘আদিমলতা গুল্মময়’ ও ‘বাবরের প্রার্থনা’র কবিতায় এই সব দিনের আভাস আছে। 'কবিতার মুহূর্ত'। সেখানেও শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন— আটষট্টিতে তিমিরের মুখের রেখায় অনেক বদল হয়ে গেছে। শুধু তিমির নয়, অনেক যুবকেরই তখন পাল্টে গেছে আদল, অনেকেরই তখন মনে হচ্ছে নকশালবাড়ির পথ দেশের মুক্তির পথ, সে-পথে মেতে উঠেছে অনেকের মতো তিমিরও। তারপর একদিন গ্রামে চলে গেছে সে... যাদবপুরের বসতি এলাকার শ্রমিকদের মধ্যে নকশালবাড়ি রাজনীতির আগুন মশালের মতো করে বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিমির। তারপর একদিন মালদার গ্রামে চলে যান ভূমিহীন গরিব কৃষকদের কাছে।

    ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত ‘ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্য়াল উইকলি’ হাতে এসেছিল। তাতে কল্যাণ চৌধুরীর একটি প্রবন্ধ ছিল ‘ল অ্যান্ড অর্ডার কিলিংস’। নথিতে দেখা যাচ্ছে বহরমপুর সেন্ট্রাল জেলে তিমিরবরণকে খুন করা হয় ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১। তিমিরের সঙ্গেই নাম রয়েছে বিপ্লব ভট্টাচার্য, মৃদুল সরকার, আশিস ভট্টাচার্য, গোরা দাশগুপ্ত, নজরুল ইসলাম, কানাইলাল বঙ্গ, প্রভাত ব্যানার্জি — এঁদের। বিশে ফেব্রুয়ারিতেও একজন বিপ্লবী খুন হন। তাঁর নাম নথিভুক্ত নেই। আননোন।

    ময়দান ভারী হয়ে নামে কুয়াশায়
    দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্চ
    তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া?
    নিচু হয়ে বসে হাতে তুলে নিই
    তোমার ছিন্ন শির তিমির


    তিমির বিষয়ে দু’টুকরো।। শঙ্খ ঘোষ

    লেখার টেবিলের নিচে তাই ভারী হয়ে জমতে শুরু করে লাল সালু। ফ্লাইওভারের উপর হুটারের লিম্ফোসাইট ধ্বনি। আর তার নিচে গণ কনভেনশনের পোস্টার। আর তার নিচে ফুটপাথ শিশুদের ছন্দজ্ঞান। আর তার নিচে উন্মাদের হস্তমৈথুন...একটা গোটা জুন মাস সূর্যাস্ত-হলুদ রঙের ওষুধের স্ট্রিপ সমেত ঢুকে পড়ে শিরা-উপশিরায়, স্নায়ুতে...

    সেই চাঁদমণি চা-বাগান, মাটিগাড়ার দিগন্ত পার করে আমাদের জিপ এসে পৌঁছল নকশালবাড়ি হাসপাতালের সামনে।


    ক্রমশ...

    পর্ব - ১ | পর্ব - ২ | পর্ব - ৩
  • ধারাবাহিক | ১৯ জুন ২০২১ | ১৯৭২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan Roy | ১৯ জুন ২০২১ ১৭:১৮495089
  • পড়ছি।

  • Prosanta Dutta | ১৯ জুন ২০২১ ২২:২৮495099
  • ভালো লাগছে 

  • ঋতব্রত জোয়ারদার | 49.206.54.89 | ২০ জুন ২০২১ ১২:৩৩495115
  • খুব ভালো লাগছে । এই উদ্যোগ সফলতা পাক।

  • | ২০ জুন ২০২১ ১২:৩৮495117
  • বেশ লাগল

  • Mayukh Datta | ২০ জুন ২০২১ ১৩:২৩495119
  • পড়ছি, চলুক...

  • ভাস্বতী লাহিড়ী | 2409:4060:200e:2cdd::2951:b8a5 | ২০ জুন ২০২১ ১৩:৪২495121
  •  ভালো লাগছে 

  • মৈত্রী | 2409:4060:2e19:a71f:2f75:3b77:6f55:7cc5 | ২০ জুন ২০২১ ১৫:১৯495125
  • বেশ ভালো লাগলো।

  • Santosh Banerjee | ২০ জুন ২০২১ ১৯:১২495134
  • ভালো লাগছে ! অতীত কে নাড়ী ভুঁড়ি সুদ্ধ টেনে বার করুন দাদা !!

  • কৃশানু ভট্টাচার্য | 2401:4900:110f:e1c2:0:6d:eaa2:a901 | ২১ জুন ২০২১ ২৩:৫১495187
  • ঐ টেবিলে ওয়াহিদা রহমান এর ছবি কি এখনো আছে?

  • ঝানকু সেনগুপ্ত | 43.252.248.116 | ২৩ জুন ২০২১ ১৯:০৫495232
  • খুব , খুব  ভাল লাগছে,   সেই ঐতিহাসিক সময়ের উপস্থাপনা, অন্য স্টাইল,  অন্য লিখন শৈলী !!

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন