• হরিদাস পাল  আলোচনা

  • চরকার গান, সুতোকাটুনির হাসি-কান্না

    স্বাতী রায় লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২২৪ বার পঠিত | ২ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ১৭০১ সাল। করতলব খাঁ দেওয়ান হয়ে এলেন বাংলায়। আওরংজেব তখনও স্বমহিমায় বিদ্যমান। থাকবেনও আরও কিছুদিন, ১৭০৭ সাল অবধি। সুবে বাংলা তখন মোঘলের অধীনে। সে অবশ্য সেই আকবরের আমল মানে প্রায় ১৫৭৬ থেকেই। বাংলা সে যুগের দিল্লির শাসকের কাছে স্বর্ণডিম্বপ্রসবিণী হংস। হবে নাই বা কেন? বাংলার বাৎসরিক রাজস্ব তখন মোট ১,৩১,১৫,৯০৭ টাকা।[1] বছরে কোটি টাকার উপরে দিল্লির কোষে ভরে যে সুবা, তাকে উপেক্ষা করে কার সাধ্য ! বাঙ্গালি নিজে শুধু খেয়ে-পরে থাকে তাই না, আশেপাশের সব এলাকার অন্ন-বস্ত্র জোগায়। বিশ্ব-বাণিজ্যে একটা বহু প্রতিষ্ঠিত নাম। শুধু উত্তর বা পশ্চিম ভারত থেকেই না, পারস্য, আবিসিনিয়া, আরব, চীন, তুর্কী, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া ইত্যাদি গোটা বিশ্ব থেকে সওদাগরেরা এসে ভিড় জমান এদেশে, সঙ্গে আনেন গোলমরিচ, টিন, কড়ি ইত্যাদি। চাল, গম, চিনি, আদা, হলুদ ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় থেকে সুতির কাপড়, রেশমবস্ত্র ইত্যাদি সাত-রাজার-ধন-মানিক বেছেবুছে জোগাড় করেন, তারপর জলপথে, স্থলপথে পাড়ি জমান। আগের শতক থেকেই ইউরোপীয় বণিকেরাও এসে ভিড় জমাচ্ছে, ডাচ, ফ্রেঞ্চ, ইংরেজ সবাই।

    আওরংজেবের মৃত্যুর পরে গোটা উত্তর ভারতে যে টালমাটাল অবস্থা দেখা গিয়েছিল, বাংলাকে তার হাত রক্ষা করেছিলেন করতলব খাঁ। ১৭১৩ থেকে তিনি অবশ্য হয়েছেন সুবে বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব। আমরা তাকে চিনি মুরশিদকুলি খাঁ নামে। রাজনৈতিক স্থিতি বজায় থাকায় বাংলার ব্যবসায় কোন সমস্যা হয় নি। সব মিলিয়ে বাংলা যা নেয়, দেয় তার বহুগুণ বেশি। কাশ্মীরি ব্যবসায়ীরা বাংলার আতর, মালদাই সিল্ক নিয়ে যান তিব্বতে, তিব্বতের চমরি গাইএর লেজ নিয়ে আসেন বাংলায়। বাংলার গম গিয়ে বাটাভিয়ার শিশুর মুখের গ্রাস জোগায়, বাংলার চিনির এতই চাহিদা আরব, পারস্য প্রভৃতি দেশে বিক্রি করে ব্যবসায়ীরা প্রায় ৫০% মুনাফা করেন, বাংলার জামদানী শোভা বাড়ায় আফ্রিকান সুন্দরীদের, বাংলার মসলিনের জন্য কাঙাল হন ইউরোপের ফ্যাশনিস্তারা ।

    মসলিন, জামদানী, সে মসলিনেরই কত নাম - তাঞ্জিব, মলমল, নয়নসুখ, তেরিন্ডাম, আলাবাল্লি, আদাতি , সানোই, খাসা, চৌতার, গুরাস ইত্যাদি ইত্যাদি। এছাড়াও আছে আবরোয়া – জলের উপর বিছিয়ে দিলে জলের সঙ্গে মিশে যায় সে কাপড় বা শবনম, ঘাসের উপর মেলে দিলে রাতভর শিশিরে ভিজে সকালের আলোয় মনে হয় মাকড়শার জালের উপর জমে আছে রাতের কান্না, গঙ্গালহরির জমিনে ফুটে ওঠে নদীর ঢেউ বা সরকার আলি, যে শাড়ি তৈরি হত নবাব-বাদশাদের ভেট দিতে। যেমন শাড়ি তেমনই দাম। উনবিংশ শতকের মাঝে মলমলখাস শাড়ির একখানার দাম ১০০ টাকা। মহার্ঘ্য সে সব কাপড় চলে যায় বিদেশে বা রাজারাজড়াদের ঘরে, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এছাড়াও আছে মোটা সুতোর গারা। এই সব মোটা, বহরে খাটো কাপড়ই দেশের লোকেরা বেশি পরে। বাংলার সুতোর কাপড়। সেই সব কাপড় বোনার জন্য তুলোই চাষ হয় হরেক রকম। ঢাকাই মসলিনের জন্য ফুটি কাপাস তো আছেই, এছাড়াও আছে মালদহের বরবুঙ্গা, গারো পাহাড়ের শিরাজ, বর্ধমানের নুরমা, মেদিনীপুরের কাউর, লুচি, খেরোয়া, ময়মনসিংহের বোরোলি – এসবই জাতের তুলো, মিহি সুতো তৈরি হয় এদের থেকে। মোটা কাপড়ের জন্য আছে মালদহের বিরেত্তা, বর্ধমানের মুহুরি, ভোগা তুলো। বোগগা তুলোর থেকে হয় শস্তার গারা।[2] এ ছাড়াও আমদানি হয় তুলো, সে অবশ্য তেমন সরেস দরের না। একটা তাঁতকে ঘিরে তাঁতি ছাড়াও তুলো চাষি, সুতো কাটুনি, রংরেজ, ধোপা, রিফুকর, এমব্রয়ডারি-করিয়ে ইত্যাদি বিভিন্ন দক্ষ কারিগরের বলয়। সুনিপুণ দক্ষতার সঙ্গে এসে মেলে অসম্ভব সস্তা শ্রমের বাজার। ১৭০১ সালের প্যাম্ফলেটে পাওয়া যাচ্ছে যে ইংল্যন্ডে এক শিলিং দিয়ে যে জিনিস বা যতটা শ্রম পাওয়া যায়, ভারতে সেটা দুই পেন্সে মেলে।[3] অতএব ভারতের জিনিস বিশ্বের বাজারে পড়তে জায়গা পায় না। তার উপর সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপের মেয়েদের ফ্যাশনের দুনিয়ায় বদল হয়েছে। ভারতীয় ক্যালিকো অর্থাৎ সুতির কাপড়ের পোশাক তখন ফ্যাশনের শেষ কথা। মেয়েদের নিত্যনতুন ডিজাইন চাই, এমন কিছু যা ইউরোপে আগে কখনও দেখা যায় নি। কাজেই চাহিদা তুঙ্গে।

    “বিপুল তরঙ্গ রে... ”

    সব মিলিয়ে মোট ব্যবসার পরিমাণ টাকার অঙ্কে কত ছিল? একদম গোটাগুটি টাকার হিসেব জানা নেই, তবে একটু আন্দাজ দেওয়ার চেষ্টা করা যাক। আমরা যে সময়ে গল্প শুরু করেছি, সেই সময়ে অর্থাৎ ১৭০০ সাল নাগাদ বাংলার কাপড়ের ব্যবসার পরিমাণ কি রকম? এইসময়ে বাংলা থেকে সুতির কাপড় রপ্তানী করতেন মূলত ইংরেজ, ডাচ, ফ্রেঞ্চ, ডেন প্রমুখ ইউরোপিয়ান বণিকেরা আর এশিয়ান বণিকেরা। ১৭০০ সালে ইংরেজ আর ডাচরা সেসময় পঁচিশ লাখ টাকার বেশি সুতির কাপড়ের বাণিজ্য করছে।[4] এশিয়ান বণিকদের বাণিজ্যের বছরওয়ারি হিসেব সেভাবে মেলে না, টুকরো টাকরা কথা মেলে শুধু। যেমন হেন্ড্রিক কানসিয়াস লিখেছেন ১৬৭০ সালের মালদার কথা। তখনও ইউরোপিয়ানরা সেভাবে ঘাঁটি গেড়ে বসে নি। তখন মালদার থেকে বছরে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার কাপড় পেগু, আগ্রা, সুরাট ও পারস্যে যায়। [5] ১৬৭৬ সালের রিচার্ড এডোয়ার্ড যা জানিয়েছেন তার থেকে দাঁড়ায় যে শুধুমাত্র মালদা থেকেই সুতির কাপড় বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে ১৮.৭৫ থেকে ৪৩.৭৫ লক্ষ টাকা। এর থেকে ১৭০০ সালে বাংলা থেকে এশিয়ান বণিকদের ব্যবসার পরিমাণটার একটা আন্দাজ পাওয়া যায়।

    আর এর পর থেকে মোট বস্ত্রবাণিজ্যের পরিমাণ ক্রমশঃ বাড়বে। অন্তত গোটা অষ্টাদশ শতক জুড়ে এই বস্ত্র ব্যবসার বোলবোলাও, কিছু সাময়িক ওঠাপড়া ছাড়া । ১৭৪৭ সালে শুধু ঢাকার থেকে কাপড়ের ব্যবসা হয়ে ২৮.৫ লক্ষ আর্কট টাকার। ১৭৬৫ সালের হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে যে বাংলার বস্ত্রসাম্রাজ্যের মূল্য ৩.৩০ কোটি, যার মধ্যে আছে কাঁচা রেশম, সুতী বস্ত্র আর রেশম বস্ত্র। আর এর মধ্যে ইউরোপে যায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার জিনিস, আরও ৬০ লাখ যায় ‘gulfs, coasts and islands of Indian seas’, দেশে থাকত ১/৩ অংশ, ১ কোটি ১০ লাখ টাকার কাপড়।[6] ১০০ বছরের বেশি পরে, ১৮০০ সালে বাংলা থেকে সুতির বস্ত্র রপ্তানী হয় ১.৬৭ কোটি টাকারও বেশি ( ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার মধ্যে মাত্র ৪৭ লক্ষ টাকার) [7] আর ১৮০৫ সালে সেই অঙ্কটা হল ২,৩১ কোটি টাকার। [8]

    তবে কিনা সব কিছুই উপরে উঠতে উঠতে একসময় থমকে দাঁড়ায়, তারপর নীচের দিকে নামে। বাংলার সুতিবস্ত্র বাণিজ্যও তার ব্যতিক্রম না। অলক্ষ্যে তার শেষের ঘণ্টা বেজে গেছে... তাঁতীদের উপর ইংরেজদের অসম্ভব অত্যাচার তো ছিলই, সে বিষয়ে বহু, বহু লেখাপত্র আছে। তার সঙ্গে যন্ত্রের অগ্রগতি যোগ দিল। ১৭৮০র দশক থেকেই ইংল্যন্ডের মিলের কাপড় বাংলার সঙ্গে টক্কর দেওয়ার জন্য তৈরি। তাকেই তারা মসলিন বলে। নাই বা হল চারশ টাকা দামের জাহাঙ্গিরি অবরোয়া মসলিন! সেই কলের কাপড় আমদানি হতে শুরু করল বাংলাতেও। রাজার কাপড় বলে কল্কেও পেল খানিক। যদিও দেশি কাপড় বেশি টেঁকে, তবু তার দাম বেশি। এটাও বলার যে কলের কাপড়ের দামও কমেছে হু হু করে। ফলে কিছু বছরের মধ্যেই কলের কাপড়ে ছেয়ে গেল বাজার। ১৮৯৮ সালের এক রিপোর্টে পাওয়া যাচ্ছে যে দেশি শাড়ি / ধুতির দাম দুই ত্থেকে তিন টাকা, সেখানে কলের কাপড়ের দাম দশ থেকে বার আনা। তার উপর সোনায় সোহাগা, ১৮২১ সালের থেকে বাংলায় ইংল্যন্ড থেকে মেসিনের সুতো আসতে শুরু করল। বাংলার হাতে বোনা সুতোর তুলনায় অনেকটাই শস্তা সে সুতো। ততদিনে ইউরোপের মেয়েদের কাছে বেঙ্গল ক্যালিকোর নতুনত্বের মোহাঞ্জনও ফিকে হয়ে গেছে। অতএব ডিমাণ্ড ভার্সাস সাপ্লাই কার্ভের গতিপথ পালটে গেল। অন্তত বিশ্বের বাজারে। এতটাই কম যে ১৮১৩ সালের ঢাকাতে প্রাইভেট ব্যবসা নেমে এসেছে বছরে দু লাখ টাকায় আর তারপরে ১৮১৭ সালে ঢাকার ইংরেজ আড়ংই তুলে দিল কোম্পানি। আগে পরে বন্ধ হল অন্য সব আড়ংও। দেশের বাজারে বিলিতি কলের দাপট ঠেকাতে অনেক পরে তৈরি হল বটে দিশি কটন মিল, বঙ্গলক্ষ্মী, মোহিনী, দেশের পশ্চিম উপকূলে যন্ত্রদেবতা পা রেখেছেন তারও আগে – কিন্তু সে অন্য গল্প।

    নেট ফল? ধীরে ধীরে থেমে গেল অনেক তাঁতের শব্দ। কর্মহীন হয়ে পড়ল তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষজন। যে তাঁতিরা তাঁত বুনে পাকা বাড়ি বানিয়েছিলেন, এখন তাঁরা কোনমতে দিন গুজরান করতে লাগলেন। যাঁরা তবু টিঁকে রইলেন, তাঁদের শিখতে হল সমঝোতার মন্ত্র। বিলিতি সুতোতে তাঁত বোনা শুরু হল। ১৮৪৪ সালে ঢাকাতে ৯,৩৬,০০০ টাকার কাপড় বোনা হচ্ছে, তার মধ্যে ৫ লাখ টাকার কাপড়ই বিলিতি সুতোর।[9] ঊনবিংশ শতকের শেষে দেখা যাচ্ছে, হাতে বোনা তাঁতের কাপড়ের চাহিদা তলানিতে। যা কাপড় তৈরি হয় তার বেশিটাই শুধু স্থানীয় স্তরে বিক্রি হয়। সামান্য কটি ব্যতিক্রমের মধ্যে আছে শান্তিপুর (৩.২৫ লক্ষ টাকার) আর ঢাকা (৩.৮২ লক্ষ টাকার ) – তাদের মিহি কাপড়ের চাহিদা আছে এলাকার বাইরেও। ফরাসডাঙ্গার জোড় কলকাতার বাবু সমাজে খুবই সমাদৃত। এছাড়া উলুবেড়িয়া, বিহারের সারন আর দ্বারভাঙ্গা থেকে কিছু কাপড় বিক্রির জন্য জেলার বাইরে যায়। কলের সুতো দিয়ে দেশি তাঁতে বোনা মোটা কাপড় কেনে গরীর লোকেরা, সে কাপড় বেশি শক্ত আর টেঁকসই বলে। পতনের ইতিহাস সমাপ্ত বলা যায়। ১৮৯০ সালে ঢাকায় শুধু মাত্র দিশি সুতোর থেকে ঢাকাই মসলিন বোনে এমন আর দুটি কি তিনটি পরিবার টিঁকে আছে। ১৮৯১ সালের সেন্সাস থেকে দেখা যাচ্ছে, গোটা বাংলায় তখন মাত্র ১১ লাখ মানুষ বস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। আর মধ্যে তাঁতি প্রায় ৯ লাখ আর সুতাকাটুনি মাত্র ৯০ হাজারের কাছাকাছি।[10] পঁচিশ লাখ সুতোকাটুনি মেয়ের বেশির ভাগই ততদিনে কাজ হারালেন।

    “চরকা আমার স্বামী, পুত / চরকা আমার নাতি / চরকার দৌলতে আমার দুয়ারে বাঁধা হাতি”

    এসবই গৌরচন্দ্রিকা। সময়টাকে ধরার চেষ্টা। এই বার স্পটলাইটটা ঘোরান যাক সুতাকাটুনিদের দিকে। কারা ছিল এই সুতোকাটুনি? ঘরের মেয়েরা, বৌরা। সাধারণ চাষি বাড়ির মেয়েরা কাটতেন মোটা সুতো, চরকা ঘুরিয়ে। আর উঁচু জাতের মেয়েরা, দরিদ্র বামুনের ঘরের বিধবারা কাটতেন তকলিতে মিহি সুতো। একটা সময়ে চলই ছিল বামুনবাড়ির পৈতের সুতো বাড়িতেই কেটে নেওয়ার। অনেক সহায়সম্বলহীন বিধবারা সুতো কেটে প্রাণ ধারণ করতেন। অবশ্য সুতো কাটার আগে আছে তুলো পরিষ্কার করা, বীজের থেকে ছাড়িয়ে আলাদা করা। একজন মেয়ে দিনে চরকিতে গড়ে ১০ সের তুলো পরিষ্কার করতে পারে। এরপর তুলো ধুনতে হবে। ধুনুরিদের কাজ সেটা। দিনের চার সের তুলো ধুনে ধুনুরি পায় ৬ সের মত চাল। তবে কোথাও কোথাও মেয়েরা সেই কাজটাও নিজেরাই করে নেন, তাহলে ধোনার পয়সা বাঁচে, মেয়েদের লাভটা একটু বাড়ে। তারপর সুতো কাটা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গেরস্তবাড়ির মেয়েরা ঘরের কাজ কর্ম সেরে দুপুরে চরকা কাটেন। তবে কেউ কেউ, যাদের বাচ্চা-কাচ্চা বা সংসারের ঝুট ঝামেলা নেই, তারা সারাদিনই সুতো কাটতে পারেন। তবে সংসারের কাজ করে শক্ত হয়ে যাওয়া হাতে সাধারণত মিহি সুতো হয় না। মোটা মানের গারা, গাজি ইত্যাদি কাপড় বোনা হয় সে সুতোয়। চাষি-বৌর কাটা সুতোয় বাড়ির লোকের সম্বৎসরের কাপড় হয়, শুধু বোনার খরচ দিতে হয় তাঁতিকে। বাড়ির প্রয়োজন মিটিয়ে উদবৃত্ত সুতো বিক্রি হয় তাঁতীর ঘরে।

    মিহি সুতো কাটা হয় তকলিতে। সে সুতো দিয়ে তৈরি হয় মসলিন।মিহি সুতো কাটতে চাই নরম হাত। সাধারণতঃ তিরিশ পেরোন হাতে সে সুতো হয় না। মিহি সুতো কাটার হ্যাপাও অনেক - সারাদিন ধরে টানা কাটা যায় না, চোখে লাগে, আঙ্গুলে বয় না। অল্প কেটে বন্ধ করতে হত। সব থেকে মিহি সুতো বোনা হত ঘাসের থেকে শিশিরকণা শুকিয়ে যাওয়ার আগে। হাওয়ার আর্দ্রতা সুতোর জন্য জরুরি, দিনের তাতে সুতো ভেঙ্গে যেত। দরকারে জলের পাত্রের উপর সুতো কাটা হত। আবহাওয়ার জন্য আর ঘরের কাজের চাপে সাধারণত মেয়েরা ভোর থেকে সকাল নটা দশটা অবধি আবার বিকেলে তিনটে বা চারটে থেকে সুর্যাস্তের আধঘণ্টা আগে অবধি সুতো কাটতেন।[11] দক্ষতা, ধৈর্য, বয়সের উপর সুতোর সূক্ষ্মতা আর মান নির্ভর করে। মিহি সুতোর আল্লাবাল্লি, সূক্ষ্ম মলমল ইত্যাদির সুতো যারা কাটতেন, তারা ঘরের কাজ নিজের হাতে করতেন না, লোক রেখে করাতেন যাতে হাত শক্ত না হয়ে যায়। ময়মনসিংহের রেসিডেন্ট জানাচ্ছেন, সুতো কাটা শুরুর আগে মেয়েরা বিশেষ ডায়েট খায় যাতে তাদের শরীর ঠাণ্ডা থাকে। তাদের নিয়মিত ওষুধ দেওয়া হয় যাতে চোখ ভালো থাকে। সুতো কাটার জায়গায় যেন হাওয়া না থাকে আর জোরালো আলো থাকে। সাধারণত সকালে দু ঘন্টা বিকেলে দু ঘণ্টা সুতো কাটা যায়, ডানহাতের আঙুলের ডগায় নরম চুন মাখিয়ে নেয় মাঝে মাঝে। সুতো কাটা শেষ না হলে তারা সংসারের কাজে লাগে না। [12]

    এত কান্ড করে যে সুতো কাটা হত, কেমন আয় হত মেয়েদের? সত্যিই কি দুয়ারে হাতি বাঁধতে পারতেন তাঁরা? অবশ্য মেয়েরা করত বলে এন কে সিনহা বলেছেন, সুতো কাটাটা ঠিক ‘প্রফেসেড ট্রেড’ না। তিনি অবশ্য এও বলেছেন যে As thread was spun in the intervals of domestic avocation, it was produced cheaper than any other commodity in the world which required manual skill, because the time employed in spinning would otherwise be lost. [13] সত্যিই তো, ঘরের মেয়ের আবার সময়ের দাম কি! তবে মনে রাখতে হবে, ভারতের সস্তা শ্রমের খ্যাতি কিন্তু ভারতে উপনিবেশ তৈরির আগের সময় থেকেই। এমন কোন প্রমাণ হাতে আসে নি যার থেকে বলা যায় যে সুতোর দাম প্রাক-পলাশি আমলে অনেক বেশি ছিল, পলাশি-উত্তর বাংলায় হঠাৎ করে কমে গেল।

    শাহবাদে ১৮১২-১৩ সালে ১.৬ লক্ষ মহিলা সুতো কাটেন , আর তাদের বার্ষিক আয় আঙ্কিক গড়ে এক টাকা আট আনা। [14] তুলোর বীজটাও অবশ্য ফেলা যায় না, গ্রামের দিকে তার থেকে গরু-বাছুরের খাবার হয়, শহরে তা দিয়ে বিয়ে-শাদিতে আলোর জলুশ হয়। সেই বীজ বেচে গড়ে বছরে আরও আনা দুয়েক লাভ হয়। বার্ষিক আয় দিয়ে তেমন একটা কিছু তেমন বোঝা না গেলেও, একটা মোটা হিসেব বোঝা যায়। শাহবাদে মোটা কাপড়ই মূলতঃ বোনা হয়, পাটনায় কিছু পরিমাণে মিহি মলমলও বোনা হয়, সেখানে সুতো কাটুনিদের লাভ বেশি, বছরে আঙ্কিক গড়ে তিন টাকা চার আনা। প্রসঙ্গতঃ পাটনা সে আমলের এক খুবই বড় সুতিকাপড়ের কেন্দ্র, ছোট বড় মেজ সব সাহেবদের কাপড় জোগাড়ের অন্যতম আড্ডা। সেই পাটনা এবং বিহার থেকে পাওয়া হিসেবে দেখা যাচ্ছে যে, সেখানে সুতা কাটুনির সংখ্যা তিন লাখ তেত্রিশ হাজারের আশেপাশে। এইবার একটু হিসেব কষা যাক।

    ১) বুকানন জানিয়েছেন, তুলোর বীজ ছাড়িয়ে, পরিস্কার করে, সুতো কাটতে হলে মাসে এক সেরের বেশি তুলোর সুতো সাধারণত কাটা যায় না। সেও কিনা সারাদিনই খাটলে, তবেই।

    ২) সে সময়ে পাটনা-বিহারে তুলোর দাম পাইকারি বাজারে মণ প্রতি আড়াই থেকে তিন টাকা। হাটে বাজারে আরও দাম বেশি হবে, ধরে নেওয়া যায় তিন টাকা চার আনা থেকে চার টাকা মণ হবে। খেত থেকে তুলে আনা তুলো পরিস্কার করে মাত্র তিরিশ শতাংশ পরিষ্কার তুলো পাওয়া যায় । ধোনার সময় তুলোর গড় ওজনের ১/২০ অংশ নোংরা হিসেবে বেরিয়ে যায়। [15] অর্থাৎ মাঠের থেকে নিয়ে আসা তুলোর ২৮.৫% ওজনের সুতো মেলে। অন্য যা সব হিসেব পাওয়া যায়, তার থেকে ধরে নেওয়া যেতে পারে এ সুতো নেহাতই মোটা সুতো। কারণ দিনাজপুরের হিসেবে খেতের থেকে আনা বীজওলা ১ সের তুলোর থেকে মেলে মাত্র ১০-১৫ তোলা সুতো, মিহি থেকে মোটা। আবার আল্লাবাল্লির মত সূক্ষ্ম মসলিনের জন্য, ঢাকার হিসেবে, সেটা সের প্রতি তুলোয় ২ তোলা সুতো দাঁড়ায়। মিহি বা মোটাটা যে আসলে আপেক্ষিক তা বলাই বাহুল্য।

    ৩) পাটনায় মোটা সুতোর চাহিদা ৮০ শতাংশ। সেই সুতোর দাম টাকায় ৫৬ থেকে ১৮৫ তোলা। সেই মোটা সুতো কেটে, এক সের তুলোর হিসেবে, কাটুনির মাসে পাঁচ পাই থেকে পাঁচ আনার মত লাভ থাকে। খুব ভাবতে চাইছি যে এ কিনা নেহাতই মোটা সুতো, তাই হয়ত মাসে কাটুনিরা এক সেরের বেশি তুলোর সুতো কাটতে পারতেন এবং হয়ত এই নেহাত মোটা সুতোর জন্য কাঁচা তুলো থেকে আরও কিছুটা বেশি পরিমাণে সুতো পাওয়া যেত। কিম্বা হয়ত মিহি তুলো, মোটা তুলো মিশিয়ে কাটতেন তাঁরা। সেই টাকায় ২৩ তোলা দরের সুতো বেচে তো অন্তত তাঁদের মাসে চৌদ্দ আনা লাভ হত, নাহয় সে সুতোর চাহিদা খুবই কম। তবু সন্দেহ হয় সেই সুতো কাটার দক্ষতা এবং কাটলেও বিক্রি হওয়ার ভরসা কি থাকত সবার?

    আর সারাদিন সুতো কাটলে ঘরের কাজ, বাচ্চার দেখভাল? এই টাকায় কি লোক রেখে বাড়ির কাজ করানো যায়? তাছাড়াও সে আমলে এত বিপুল সংখ্যক বাড়িতে কি আর পয়সা দিয়ে ঘরের কাজের জন্য লোক রাখা হত? তেমনটা তো জানা নেই। অবশ্য পরিবারের জন সংখ্যা বেশি ছিল তাই সুতো কাটে না এমন বাচ্চা বা বুড়ো কেউ ঘরের কাজের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলে অন্য কথা। পাইকারি বাজারে সে সময় ছয় সের চালের দাম দুই আনা চার পাই, হাটে বাজারে আরও বেশিই হবে। কাজেই বুঝতে অসুবিধা হয় না কেন সে আমলে বিধবাদের অত নিরম্বু উপবাস করতে হত। বুকানন সাহেব ঠিকই বলেছেন, এই আয়টা কিছুই না, তবে যত সামান্যই হোক পারিবারিক আয়ে সেটা যোগ হয়। সুতাকাটুনি মেয়েদের আয়ে সংসার চালানোর কথা ভাবাই বাতুলতা।

    মিহি সুতো কাটেন যারা, তাদের লাভ অবশ্যই খানিকটা বেশি হয়। পাটনার হিসেবেও দেখা গেছে সে কথা। টেলর সাহেব জানিয়েছেন যে ১৮০০ সালে সুতোর সবথেকে বেশি যে দাম দেওয়া হয়েছে তা তোলা প্রতি দাম সাড়ে তিনটাকা। বিভিন্ন দরের সুতোর কথাও তিনি বলেছেন, তোলা প্রতি সাত টাকা থেকে এক টাকা তাদের দাম। এক টাকার নিচেও সুতো মেলে - টাকায় দু তোলা থেকে ১৬ তোলা। মোটা সুতো যারা কাটে, তারা দেড় আনায় এক সের অপরিস্কৃত তুলো কিনে সেই দিয়ে চরকায় সুতো কেটে মেয়েরা চার আনায় বিক্রি করে। সপ্তাহে আড়াই আনা লাভ। [16] ঢাকায় সে সময় যে দশ বারো বছরের ছেলেদের তাঁতীর নিকিরি করে রাখা হত, তারাও মাসে খাওয়া দাওয়া ছাড়া দশ আনা পেত। তুলনাটা সহজেই অনুমেয়।

    কিছু বছর পরে ১৮০৭-১৮১১ সালে দিনাজপুরে স্থানীয় বীজ-অলা তুলো বাজারে বিক্রি হয় সের প্রতি দু আনা দরে, মানে এক মণ পাঁচ টাকা। ১ সের বীজ-ওলা তুলো থেকে মিহি সুতো হয় ১০ তোলা। বিক্রি হয় টাকায় ১২ তোলা হিসেবে। মানে তুলোর দাম বাদ দিয়ে, কাটুনির থাকে মাসে ১১ আনা ৪ পাই আর শুধু দুপুরবেলার অবসরে সুতো কাটলে, মাসে জোটে মাত্র আনা চারেক।

    দিনাজপুরের বাজারে সবচেয়ে মিহি সুতোর দাম টাকায় ৮- ১২ তোলা, এর এক ধাপ নীচের সুতো টাকায় ১৩ থেকে ১৮ তোলা। এসব মিহি তুলো, সরেস মাল, স্থানীয় তুলোর থেকে তৈরি। আমদানির তুলো বাজারে বিক্রি হয় কুড়ি টাকা আট আনা মণ হিসেবে। সে অবশ্য পরিষ্কার করা তুলো, তার থেকে বীজ ছাড়ানোর হ্যাপা নেই। সাধারণত তার থেকে মোটা সুতোই হয়। সেই মাঝারিমানের সুতোর দাম টাকায় ১৯ থেকে ২৬ তোলা। আর সবচেয়ে নিরেশ সুতোর দাম টাকায় ২৭ থেকে ৫০ তোলা। ১ সের আমদানির তুলো থেকে সব চেয়ে মোটা সুতো হয় ৭৫ তোলা, বাজারে তার দাম দেড় টাকা। আর মিহি সুতো যেটুকু হয় তা দ্বিতীয় স্তরের, ১ সের তুলোর থেকে ৫৫ তোলা মত সুতো। বিক্রির দাম ৩ টাকা। কাটুনির লাভ এক সের তুলোয় এক থেকে আড়াই টাকা।[17] তবে দিনাজপুরের বাজারেও মোটা সুতোর চাহিদা বেশি, মোট সুতোর ৬৫ শতাংশ। কাজেই ওই মাসে আড়াই টাকা ছুঁতে পারে খুব কম জনই। বেশির ভাগ মেয়েই ঐ মাসে এক টাকা বা তারও কম আয় করেন। কত বড় সংসার প্রতিপালন করা যায় সেই অর্থে? যে বিধবা মেয়েটির জীবনে সন্তান আছে, যার উপর নির্ভর করে আছে বয়স্ক আতুর জন? এই ছবি ১৮০৭-১১ সালের। বুকানন সেই সঙ্গে আরও একটা কথা জানিয়েছেন। তিনি দিনাজপুরের লোককে আর্থিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে ছটি শ্রেণীতে ভেঙ্গেছেন। প্রথম শ্রেণির বার্ষিক খরচ ১৪৯৬ টাকা ৬ আনা ৪ পাই, দরিদ্রতম শ্রেনীতে বার্ষিক খরচ বাইশটাকা দশ আনা এগার পাই। অধিকাংশ কাটুনি মেয়ের আয়ই এর ধারে কাছেও না।

    ১৭৯৩ সালের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রপ্তানির হিসেব থেকে পাওয়া যায় যে ঢাকা আর ক্ষীরপাই থেকে সবথেকে বহুমূল্য কাপড় রপ্তানি হচ্ছে। সেই দামী কাপড়ের উৎপত্তি স্থলের কি খবর? বুকাননের সময়কালের কিছু আগে, ১৭৮৯ সালের ঢাকার রেসিডেন্ট বেব জানাচ্ছেন, ১ সের বীজওলা ফুটি কাপাস তুলো থেকে ঝেড়ে ঝুড়ে

    · দুমাসে দু তোলা আল্লাবাল্লির সুতো বেরোয় অথবা
    · সাড়ে তিন তোলা সুপারফাইন ১৬০০ সুতোর মলমলের সুতো অথবা
    · পাঁচ তোলা ২০০০ সুতোর মিহি ডুরের সুতো অথবা
    · চল্লিশ থেকে বিয়াল্লিশ দিনে আট তোলা ‘১৫০০ সুতোর ডুরের’ সুতো হয়, সে সুতোর দাম টাকায় তিন তোলা হিসেবে, ২ টাকা ১০ আনা। [18] তুলোর দাম বাদ দিয়ে কাটুনির হাতে তাহলে রইল কি?

    সবথেকে মিহি সুতোর অবশ্য এক তোলার দাম তিন টাকা। সে সুতো কাটেন যে মহিলারা তাঁরা মাসে তিন টাকা আয় করেন, সুতোর দাম বাদ যাবে অবশ্য তার থেকে। কথা হল, তোলা প্রতি তিন টাকা দামের সুতোর বাজার কেমন? সে কাপড়ের সম্মানমূল্য দিতে পারেন নবাব-বাদশাহ, আমীর-ওমরাহরা। সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে সে বস্ত্র। কাজেই সে কাপড় কিন্তু তৈরিও হয় খুবই কম। খুবই কম মেয়ের কপালে ঐ পরিমাণ অর্থ জোটে। তাও হয়ত স্থানবৈগুণ্যে ঢাকার কাটুনিদের অবস্থা একটু ভাল ছিল কারণ তুলনায় সেখানে মিহি, অতি-মিহি সুতোর কাপড় তৈরি হয় অনেক বেশি। সব জায়গার কাটুনিদের সে সৌভাগ্য হত না।

    সেই সময়ের আশেপাশে শান্তিপুরের রেসিডেন্ট ছিলেন ফ্লেচার। তিনি জানিয়েছেন, এক সের তুলোর থেকে সুপারফাইন সুতো মেলে ৭ তোলা, মাঝারি সুতো দশ তোলা আর সাধারণ সুতো ১৫ তোলা। সেখানে সুতোকাটুনিদের মাসিক লাভ ১ টাকা ৪ পাই থেকে ১ টাকা ৬ আনা ৪ পাই।[19] চালের দাম তখন মণ প্রতি এক টাকারও বেশি। মাথার উপর ছাদ, বনে-বাদাড়ের শাক-কন্দ, ফল-মূল, প্রতিবেশির গাছের লাউ-কুমড়ো ছাড়া এ টাকায় একটা পরিবার বেঁচে থাকবে? পাল-পার্বনের খরচ, তীর্থ-ধর্ম, ভবিষ্যতের সঞ্চয়?

    ১৭৮৭ সালে তাঁতীরা একটা চিঠিতে জানিয়েছিলেন যে প্রতি বড় মানুষ-পিছু মাসিক এক টাকা না হলে খরচ চালানো দুষ্কর। মেয়েকাটুনিদের বেলায় কি আর সে কথা খাটে? হ্যাঁ একথা অবশ্যই সত্যি যে প্রাক-পলাশি কালেও যতই বাণিজ্য হোক, সাধারণ তাঁতি কিন্তু সেই অর্থনৈতিক ভাগের তলার দিকেই ছিল। আর পলাশি-উত্তর কালে ইংরেজদের শোষণে তারা একেবারে ত্রাহি-ত্রাহি রব তুলেছিল। কিন্তু তারা অন্তত গলা ছেড়ে কাঁদতে পেরেছিল, সুতা কাটুনিদের মত চুপ করে সইতে হয় নি তাদের।

    এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৮২৩-২৪ সালে দেশে কলের সুতো এল। হাতে বোনা সুতোর থেকে তার দাম কম। ধীরে ধীরে বাজার ছেয়ে গেল কলের সুতোয়। টিঁকে রইল শুধু খুব মিহি সুতো আর খুব মোটা সুতো, যা পরে দেশের গরীরগুর্বোরা। সেই সময়ে ১৮২৮ সালের সমাচার দর্পনে এক সুতাকাটুনির দুঃখভরা চিঠি বেরোল, তিনি দৈনিক দুই তোলা সুতো কেটে দিনে এক টাকা আয় করতেন। এই কাজ করে তিনি সাত গন্ডা টাকা দিয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, এগার গন্ডা টাকা দিয়ে শ্বশুরের শ্রাদ্ধ করেছেন, ভাত কাপড়ের কোন চিন্তা ছিল না। কিন্তু কলের সুতো এসে তার আয়ের উপায় কেড়ে নিয়েছে। তাঁর দৈনিক কাটা সুতোর পরিমাণ আর আয়ের হিসেব দেখে অবশ্য একটু অবাকই লাগে। কারণ ১৮২২-২৩ সালেও নাকি ক্ষীরপাই, রাধানগরে কোম্পানির কাটুনিদের মাসিক আয় ছিল ৩ টাকা আর মালদহে ২টাকা ৮ আনা।[20] অসামান্য দক্ষতা ছাড়া এই আয় সম্ভব না। তাই আমরা ব্যক্তির দুঃখে দুঃখিত হই, কিন্তু সামগ্রিক ভাবে বিজ্ঞানের অগ্রগতির জয়গান গাইব নাকি মেয়েদের আয়-হরণের দুঃখে কাতর হব ,না হয় সে আয় তিল পরিমাণই ,তা ঠিক বুঝে উঠি না। আয়ের উপায় চলে গেল সে কথা সত্য। কিন্তু সর্বসাধারণের জন্য যে আয় বরাদ্দ ছিল তা কি আদৌ টিঁকে থাকার জন্য যথেষ্ট? যে আয়ের সংকোচন হল, তাকে কি দেশের অন্যান্য অর্থসম্ভব ক্ষেত্রের থেকে পূরণ করা খুবই কঠিন? নাকি দুঃখটা আরও বেশি এই কারণে যে সুতো কাটার কাজটা আমাদের অন্তঃপুর ব্যবস্থার সঙ্গে চমৎকার সামঞ্জস্য রেখে করা যেত, মেয়েদের ঘরের কাজকর্মের কোন ব্যাঘাত না ঘটিয়ে – নতুন ধরণের কাজে সেই সুবিধা ততটা নাও থাকতে পারে? তুল্যমূল্য ভাবে ঐ আয়ের তুলনায় কলের সুতো কি দীর্ঘমেয়াদে বেশি লাভদায়ক নয়?

    বিভিন্ন সুত্র থেকে যেটা মনে হয়, আর্থিক দিক দিয়ে দুর্বল শ্রেণির মেয়েরাই সুতো কাটাকে পেশা করে নিয়েছিলেন। বিত্তবান বাড়ির মেয়েরা যদি বা সুতো কাটতেন, সে শুধুই নিজেদের প্রয়োজনে। সে সুতো সাধারণত বাজারে বিক্রি হতে যেত না। তার বাইরে একদল সুতো কাটবেন সংসারে আর একটু স্বচ্ছলতা আনার জন্য। আর যারা বাধ্য হয়ে সংসার প্রতিপালনের দায়ে সুতো কাটতেন, তাদের সে দায়টুকু অনেক-সময়ই পুরো মিটবে না। আর্থিক ভাবে নিম্ন শ্রেণিতে মেয়েদের কাজ করার চল তখনও ছিল, পরেও ছিল, আজও আছে। সুতো কেটে পয়সা পেলে সুতো কাটবে, না হলে ধান ভানবে, মুড়ি ভাজবে, ঘরের দাওয়ায় শাক-সব্জি বুনবে, যখন যা পাবে, যা সুবিধা তাই করবে। যার দরকার পড়ে, তাকে যেভাবেই হোক সেই দরকার মেটানর জন্য প্রাণপাত করতে হয়। তারই মধ্যে কেউ কেউ দক্ষতায় ভর দিয়ে খানিকটা উপরে উঠে যেতে পারেন, তাদের জীবনযাপন একটু সহনীয় হয়, বাকিরা যে তিমিরে সে তিমিরেই থেকে যায়।

    কেউ কেউ বলেন, ভারতে উপনিবেশ গড়ার আগে মেয়েদের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল, উপনিবেশের সময়ে মেয়েদের অর্থনৈতিক অবনমন ঘটেছে। অন্তত সুতাকাটুনিদের সার্বিক প্রেক্ষিত থেকে দেখলে তেমনটা ঠিক মনে হয় না। একেই তো বাংলার বস্ত্রবাণিজ্য যখন ক্রমশঃ বাড়ছে, তখনও প্রাক-পলাশি বা পলাশি-উত্তর কোনও পর্বেই সব রকমের আর্থিক শ্রেণীতে মেয়েদের মধ্যে আর্থিক স্বাবলম্বনের বন্দোবস্ত হয়েছে এমন প্রমাণ মেলে না। আবার উপনিবেশ দরিদ্র বাড়ির মেয়েদের খেটে খাবার অধিকারে হাত বসিয়েছে এমনও প্রমাণ মেলে না। বরং বার বার আমরা দেখি রংরেজ, ধোবি, দোকানি, মেথর, কৃষক ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের কাজে মেয়েরা স্বামীর সঙ্গে একতালে কাজ করছে, না করলে সংসার চলে না। বরং পরিবারের কোন ভাবে আর্থিক উন্নয়ন ঘটলে তখনই মেয়েদের স্বাধীন অর্থোপার্জনে কোপ পড়েছে। ইংরেজ আমলে বা তার আগেও। ফুল্লরা হাটে গেলেও, সনকার সে পাট নেই। সেই সঙ্গে এটাও বলার যে মেয়েদের শ্রমকে চোখে না দেখতে পাওয়া , তাদের আয়টাকে আয় মনে না করা, সে ব্যাপারটাকে সব সময়ই একটা অতিরিক্ত হিসেবে গণ্য করা, এমন মাত্রায় বেঁধে রাখা যাতে মেয়ের স্বাধীন গ্রাসাচ্ছাদন ব্যাহত হয়, তেমন স্বভাব বোধহয় আমাদের দেশে প্রাক-উপনিবেশ পর্ব থেকেই আছে।

    সুতো কাটার আয়ের থেকে মেয়েদের সম্পদ তৈরি হত? ঢাকার তাঁতিরা পাকা বাড়ি তৈরি করেছেন শোনা গেছে, কাটুনিদের বাবদে তেমন কিছু খবর চোখে পড়ে নি। দুয়ারের হাতির কথাটা কি সত্যি বাস্তব? অধিকাংশ মেয়ের যা আয় তার থেকে বন্ধকী বাসন ছাড়ানোর বেশি আর কিছু সম্পদ তৈরি করা সম্ভবও কি? আর বিধবা হলে, সংসারে কর্তাব্যক্তি না থাকলে নিজের পয়সা সংসারের দরকারে খরচ করছে ঠিক আছে, সধবা মেয়েরা নিজের সঞ্চয়ের পয়সা স্বামী- শ্বশুরের অনুমতি ছাড়া খরচ করতে পারত, প্রাক-উপনিবেশ কালে বা পরবর্তী সময়ে ?

    সেই কোন কালে ইসামি বলেছিলেন, কেবল সেই মেয়েই ভাল যে সারাদিন চরকা কাটে। তার একমাত্র সঙ্গী হোক তুলো, দুঃখ হোক তার শিরাজির পেয়ালা, টাকুর টংকারধ্বনিই তার কানে সঙ্গীতের ঝংকার তুলুক। মনে হয়, দুঃখযাপনের বাবদে অন্তত বাংলার সুতোকাটুনি মেয়েরা ইসামির কথাকেই সত্যি প্রমাণ করেছে।

    [1] বেঙ্গল ইন দ্য রেইন অফ আওরংজেব ১৬৫৮ – ১৭০৭, অঞ্জলি বসু, পৃঃ ৭৩
    [2] ডিটারমিনান্ট অফ টেরিটরিয়াল স্পেশালাইজেশন ইন দ্য কটন হ্যান্ডলুম ইন্ডাস্ট্রি ইন আর্লি কলোনিয়াল বেঙ্গল, অবন্তী রাউথ পৃ- ১৩
    [3] দ্য ট্রেডিং ওয়ার্ল্ড অব এশিয়া অ্যান্ড দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৬০ -১৭৬০, কিরীটি নারায়ণ চৌধুরি পৃ - ২৩৭
    [4] দ্য ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অ্যান্ড দ্য ইকোনমি অফ বেঙ্গল ১৬৩০-১৭২০, ওম প্রকাশ পৃ ৭০ থেকে ডাচ রপ্তানীর মুল্য পাওয়া, ডাচ রপ্তানীর থেকে কাপড়ের শতকরা হিসেব পাওয়া পৃ ৭২ আর ইংরেজদের রপ্তানীর হিসেব পাওয়া দ্য ট্রেডিং ওয়ার্ল্ড অব এশিয়া অ্যান্ড দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৬০ -১৭৬০, কিরীটি নারায়ণ চৌধুরি পৃ ৫০৯ পরিবর্তনের জন্য ১০ টাকা = ১ পাউন্ড আর ১ পাউন্ড = ১২ ফ্লোরিন ধরা হয়েছে।
    [5] হেন্ড্রিক ক্যান্সিস্যাসের রিপোর্ট থেকে, দ্য ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অ্যান্ড দ্য ইকোনমি অফ বেঙ্গল ১৬৩০-১৭২০, ওম প্রকাশ, পৃ- ৯৮
    [6] APPENDIX TO Fifth REPORT FROM THE SELECT COMMITTEE in APPENDI?C, No. 4. An Historical and Comparative ANALYSIS of the finANCES of Bengal ; Chronologically arranged in different periods from the Mogul Conquest to the present time;— Extracted from a Political Survey of the British Dominions and Tributary Dependencies in India. By Mr. JAMES Grant . পৃ - -২৭৫ - ২৭৬
    [7] ওরিয়েন্টাল কমার্স, মিলবার্ণ দ্বিতীয় খন্ড পৃ ২২৮-২৯
    [8] দ্য কটন উইভার্স অফ বেঙ্গল, দেবেন্দ্রবিজয় মিত্র
    [9] স্পিন্নিং ইয়ার্ণ, সুশীল চৌধুরী, দ্বাদশ অধ্যায়
    [10] মনোগ্রাফ অফ দ্য কটন ফেব্রিক্স অফ বেঙ্গল, এন এন ব্যানার্জী। পৃ- ২৫, ৬২ ( অ্যাপেন্ডিক্স ১)
    [11] দ্য কটন ম্যানুফাকচারার অফ ঢাকা, টেলর, পৃ - ১৯
    [12] ইকোনমিক হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, এন কে সিনহা ভল ১ পৃ - ১৮৩
    [13] ইকোনমিক হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, এন কে সিনহা ভল ১ পৃ - ১৮৩
    [14] অ্যান আকাউন্ট অফ দ্য ডিস্ত্রিক্ট অফ শাহবাদ ইন ১৮১২-১৩, ফ্র্যান্সিস বুকানন, পৃ- ৪০৮
    [15] মনোগ্রাফ অফ দ্য কটন ফেব্রিক্স অফ বেঙ্গল, এন এন ব্যানার্জী। পৃ- ৪০
    [16] দ্য কটন ম্যানুফাকচারার অফ ঢাকা, টেলর, পৃ - ৭৩
    [17] এ জিওগ্রাফিকাল, স্ট্যাটিস্টিক্যাল এন্ড হিস্টরিকাল অ্যাকাউন্ট অফ দিনাজপুর, ফ্রান্সিস বুকানন পৃ – ২৮৯-২৯০
    [18] ইকোনমিক হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, এন কে সিনহা ভল ১ পৃ- ১৮৪
    [19] ইকোনমিক হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, এন কে সিনহা ভল ১, পৃ - ১৮৬
    [20] দ্য ইম্প্যাক্ট অফ ব্রিটিশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভলিউহশন অন এ বেঙ্গলি ইন্ডাস্ট্রি, সিদ্ধার্থ ভদ্র, IOSR Journal Of Humanities And Social Science (IOSR-JHSS) Volume 19, Issue 4, Ver. IV (Apr. 2014), PP 11-16
  • বিভাগ : আলোচনা | ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২২৪ বার পঠিত | ২ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
ছাদ - Nirmalya Nag
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Prativa Sarker | ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ ২০:৫৫101156
  • ব্যাপক লেখা ! মুগ্ধ হয়ে গেলাম। 

  • সুজাতা গাঙ্গুলী | 106.208.197.14 | ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ ২২:০২101157
  • দারুণ লেখা। 

  • তন্বী হালদার | 2409:4060:2192:de66:365c:4209:952d:49ae | ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ ২২:৩১101158
  • তোমার লেখা পড়ি আর মনে হয় এখন না অন্য কোনো সময়ে চলে গেছি। অপূর্ব

  • প্রতাপ বোস | 2401:4900:3145:2eef:0:28:dacc:d401 | ১৮ ডিসেম্বর ২০২০ ১০:১৮101160
  • খুব ভালো লাগলো।  সুতোকাটুনিয়াদের মত পরিশ্রম করে তথ্য সংগ্রহ আর মসলিনের মত মিহি পরিবেশন।  সাথে একটা প্রকৃত সত্যের মুখোমুখি বসিয়ে দেওয়া-উপনিবেশবাদ নয়, নারী অর্থনীতির অবমূল্যায়নে আসল হাত আমাদের নিজস্ব সমাজ ব্যবস্থার শোষণ পদ্ধতিতে।

  • সম্বিৎ | ১৯ ডিসেম্বর ২০২০ ০৭:০১101173
  •  অতি চমৎকার লেখা। সর্বাঙ্গে পরিশ্রমের স্বাদ। 


    " তাই আমরা ব্যক্তির দুঃখে দুঃখিত হই, কিন্তু সামগ্রিক ভাবে বিজ্ঞানের অগ্রগতির জয়গান গাইব নাকি মেয়েদের আয়-হরণের দুঃখে কাতর হব ,না হয় সে আয় তিল পরিমাণই ,তা ঠিক বুঝে উঠি না।" - এইটা হক কথা। কন্তু শুধু কি বিজ্ঞানের অগ্রগতি? তার সঙ্গে সুতো আর কাপড়ের দাম কমায় ডিম্যান্ড-সাইড ইকনমির সুবিধে হল না কি? তার ওপর সুতোর দাম কমায়, নতুন কোন জীবিকা তৈরি হল কি?

  • Dibyendu Singha Roy | ১৯ ডিসেম্বর ২০২০ ২৩:৩০101184
  • প্রথমেই এমন একটা বিষয় নিয়ে লেখার জন্য ধন্যবাদ। তারপর এমন অসাধারণ তথ্যসমৃদ্ধ লেখার জন্য আবার ধন্যবাদ। এবার আমি ভাবছি আর অবাক হচ্ছি এটা লিখতে কি পরিমান পরিশ্রম আর নিষ্ঠা লাগছে।

  • স্বাতী রায় | ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ০১:৫১101186
  • যাঁরা পড়লেন, তাঁদের অনেক ধন্যবাদ।

    @সম্বিৎ, ডিমান্ড সাইড ইকনমির হিসেবটা একটু গোলমেলে। বিশ্ববাজারের দিক দিয়ে দেখলে, লাভের গুড় খেয়ে নিয়েছে ইংল্যন্ড আর আমেরিকা। বাংলার ব্যাপারটা একটু অন্য রকম। ১৮১০ নাগাদ বুকানন যে আর্থিক শ্রেণিবিভাগগুলোর কথা বলেছেন, তাঁদের মধ্যে শেষ দুটো শ্রেণি ছিল নেহাতই ছোট চাষি, ব্যাপারী, তাঁতি প্রমুখেরা। এঁদের মাথাপিছু কাপড়ের বাবদে বার্ষিক খরচ হল এক টাকা। কাজেই এঁদের তো দাম কমায় খুবই সুবিধা হওয়ার কথা। তবে কলের কাপড় কম টেঁকসই (আর বহরে বড়ও হত) বলে গরীবগুর্বোরা অনেক দিন দেশি সুতোর দেশি তাঁতে বোনা খেটো কাপড় পড়েছে। তারপর অবশ্য দাম আরও কমাতে ধীরে ধীরে সেই শ্রেণিটাও কলের কাপড়ে শিফট করে।

    আর ১৮৫৪ থেকে তো বোম্বেতে দেশি কলই চালু হয়ে গেল। বোম্বে গুজরাট দেশের ভিতরের ব্যবসা প্রায় একচেটিয়া করে ফেলল। বাংলা শুধু চাষজাত জিনিস এক্সপোর্টে মন দিল।  তারপর অবশ্য এখানেই কল খুলল। কিন্তু সেখানে আর মেয়েদের জায়গা হয় নি।  অথচ সেই সময় চাষের মাঠে মেয়েরা খাটছে দেদার। চা এক্সপোর্ট হয়, সেখানে কামিনরা কাজ করে দলে দলে। প্রোডাকশন কস্ট কমানোর জন্য কি? আরও ইনটারেস্টিং দেখ, খাদি দিয়ে যখন ইংরেজ তাড়ানর কথা হচ্ছে ততদিনে কিন্তু আমরা শুধু শুনছি, মায়ের দেওয়া “মোটা কাপড়” মাথায় তুলে নে রে ভাই। খাদি ফ্যাশন হচ্ছে কিন্তু মিহি শান্তিপুরী তাঁতের কাপড় বর্জন হচ্ছে কলের সুতোয় বোনা বলে। বাংলার ঘরে ঘরে যে গান্ধীবাদী মহিলারা ফের চরকা কাটতে শুরু করলেন,  তারা কেন তকলিতে ফিরে গেলেন না, মিহি সুতো কাটতে শুরু করলেন না?      

    তবে এই বস্ত্রশিল্প বাবদে মেয়েদের একটা কাজের খবর পেয়েছি। শান্তিপুরে নাকি মিলের কাপড় কিনে এনে মেয়েদের দিয়ে তার পাড় সেলাই করান হত। পাড় সেলাই করা ব্যাপারটা খুব ভাল বুঝি নি যদিও। সেটা বোধহয় খুব লোকালাইজড কাজ। সব জায়গায় ছিল না।  

  • সম্বিৎ | ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ০৩:০৭101187
  • "বহরে বড় হত" শুনে মুজতবার দেশে-বিদেশের এই অংশটা মনে পড়ল।


    "জিজ্ঞাসা করলুম, ‘সর্দারজী শিলওয়ার বানাতে ক’গজ কাপড় লাগে?

    বললেন, ‘দিল্লীতে সাড়ে তিন, জলন্ধরে সাড়ে চার, লাহোরে সাড়ে পাঁচ, লালামুসায় সাড়ে ছয়, রাওলপিণ্ডিতে সাড়ে সাত, তারপর পেশাওয়ারে এক লক্ষে সাড়ে দশ, খাস পাঠানমুল্লুক কোহাট খাইবারে পুরো থান।

    ‘বিশ গজ!’

    ‘হ্যাঁ, তাও আবার খাকী শার্টিঙ দিয়ে বানানো।’

    আমি বললুম, ‘এ রকম একবস্তা কাপড় গায়ে জড়িয়ে চলাফেরা করে কি করে? মারপিট, খুনরাহাজানির কথা বাদ দিন।‘

    সর্দারজী বললেন, আপনি বুঝি কখনো বায়স্কোপে যান না? আমি এই বুড়োবয়সেও মাঝে মাঝে যাই। না গেলে ছেলেছোকরাদের মতিগতি বোঝবার উপায় নেই আমার আবার একপাল নাতি-নাত্নী। এই সেদিন দেখলুম, দু’শশা বছরের পুরোনো গল্পে এক মেমসায়েব ফ্রকের পর ফ্রক পরেই যাচ্ছেন, পরেই যাচ্ছেনমনে নেই, দশখানা না বানোখানা। তাতে নিদেনপক্ষে চল্লিশ গজ কাপড় লাগার কথা। সেই পরে যদি মেমরা নেচেকুঁদে থাকতে পারেন, তবে মদ্দা পাঠান বিশগজী শিলওয়ার পরে মারপিট করতে পারবে না কেন?

    আমি খানিকটা ভেবে বললুম, ‘হক কথা; তবে কিনা বাজে খর্চা।

    সর্দারজী তাতেও খুশী নন। বললেন, ‘সে হল উনিশবিশের কথা। মাদ্ৰাজী ধুতি সাত হাত, জোর আট; অথচ আপনারা দশ হাত পরেন।

    আমি বললুম, দশ হাত টেকে বেশী দিন, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরা যায়।"

     

    তো বহরে বেশি হলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরা যায়, টেঁকে বেশিদিন। কাজেই পাতলা হলেও দামে কম, টেঁকে বেশিদিন - এই যদি গল্প হয় তাহলে ডিম্যান্ড-সাইডে সব মিলিয়ে উবগারই হবার কথা।

    তবে এই নাটক আবহমান কাল ধরে নানা থিয়েটারে অভিনয় হয়ে চলেছে আজও। নতুন টেকনোলজি এসে সাবেক ইন্ডাস্ট্রিকে ডিসরাপ্ট করা। এখনও শুনি বয়নশিল্পে এই ডিসরাপশন চলছে। বালুচরী শাড়ির কাজ আগে হাতে করা হত। বছর দশ-বারো আগে কম্পিউটার কন্ট্রোলড মেশিনে হচ্ছে। নির্ঘাত বহু তাঁতির ভাতে টান পড়েছে।

  • প্রলয় বসু | ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ১৫:৫০101196
  • দুর্দান্ত লেখা হয়েছে। খুব ভালো লাগলো।

  • Ranjan Roy | ২২ ডিসেম্বর ২০২০ ১৫:৩৩101291
  • খেটেখুটে দারুণ নেমেছে লেখাটি। ছুরিকলাঁ  গাাঁয়়ে থাকার সময়ে দেখলাম তকলিতে  সূূূূতো কাটার বা  ককুন  থেকে তসরের সূতো বের করার এবং মশলা মাখানোর সময় পরিিবারের মেয়েদের শ্রম। এদের জন্য কেউ বলেননি। আরো লিখবেন। 

  • Amit | 202.168.10.164 | ২২ ডিসেম্বর ২০২০ ১৬:১৬101294
  • খুব ভালো লাগলো পড়ে। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে প্রতিক্রিয়া দিন