• হরিদাস পাল  বাকিসব  মোচ্ছব

  • অন্য সীতা, অন্য দুর্গা, অন্য রামায়ণ

    Sudipto Pal লেখকের গ্রাহক হোন
    বাকিসব | মোচ্ছব | ২৭ অক্টোবর ২০২০ | ৩৫৯ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • বিজয়াদশমীর দিনে উত্তর ভারতে রামের হাতে রাবণের পরাজয়ের উদযাপন, কিন্তু পূর্বভারতে দুর্গার হাতে মহিষাসুরের। এই দুই কাহিনীর মধ্যে, এই এখনকার দিনে যেরকম বলা হয়- ক্রসোভার- এরকম কোনো ক্রসোভার আছে কি? আছে কিন্তু। তার নাম অদ্ভুত রামায়ণ। রচয়িতার নাম বাল্মিকী বলেই সবাই জানে। এই রামায়ণে সীতাই সুপারহিরো। রাবণ এখানে সহস্রমস্তকযুক্ত আরও ভয়ঙ্কর রাবণ। তার সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে রাম অজ্ঞান হয়ে পড়লেন, রণক্ষেত্রে এলেন সীতা। সীতা কালীর রূপ নিয়ে এই রাবণের বধ করলেন।


    এই কাহিনী অনেকটাই দেবীমাহাত্ম্য যেটাকে শ্রী শ্রী চণ্ডীও বলা হয় থাকে- তার মত। প্রতি বছর মহালয়ায় যে চণ্ডীপাঠ হয়, সেটি রচিত হয়েছিল দেবীমাহাত্ম্য নাম দিয়ে। চণ্ডী বা মহিষমর্দিনীকে নিয়ে এটি প্রাচীনতম বড়মাপের সাহিত্য। এটি মার্কণ্ডেয়পুরাণের অন্তর্ভুক্ত। মার্কণ্ডেয়পুরাণের রচনাকাল তৃতীয় শতক হলেও, দেবীমাহাত্ম্য মোটামুটি ষষ্ঠ শতকে রচিত বলে মনে করা হয়। শারদ গুরুচণ্ডা৯তে এই লেখকের মহিষমর্দিনী বিষয়ক অন্য লেখাটিতে আরও বিশদ পাবেন ( https://www.guruchandali.com/comment.php?topic=19297)।


    অদ্ভুত রামায়ণে আমরা দেখি সহস্রমস্তক রাবণের যতবার মাথা কাটা হচ্ছে ততবার এক বিন্দু রক্ত মাটিতে পড়লেও মাথা জুড়ে যাচ্ছে- শিবের বরের প্রভাবে। শেষ অবধি সীতা সমস্ত ভূপতিত রক্ত নিজে পান করে মাথাগুলিকে ধড়ে যোগ হওয়া থেকে ব্যাহত করলেন। এই কাহিনী অনেকটাই চণ্ডী সাহিত্যের মত। সামগ্রিক কথনভঙ্গীও চণ্ডী সাহিত্যের মত।


    অদ্ভুত রামায়ণে সীতার জন্মবৃত্তান্ত দেখা যায়। সীতা এখানে মন্দোদরীর কন্যা। ঋষি গৃৎসমদ কন্যালাভের আশায় একটি কলসে প্রতিদিন অল্প অল্প করে মন্ত্রঃপূত দুগ্ধ সঞ্চয় করতেন। রাবণ গৃৎসমদসহ দণ্ডকারণ্যের ঋষিদের বধ করে তাদের রক্ত ঐ কলসটিতে করেই লংকায় নিয়ে আসেন, আর মন্দোদরীকে ওটি রাখতে বলেন, এবং সতর্ক করে দেন যে ঐ রক্ত বিষাক্ত। রাবণের দিনের পর দিন বহুনারীসম্ভোগে বিরক্ত হয়ে মন্দোদরী আত্মহননের পথ বেছে নেন। সেইজন্য তিনি ঐ কলসের রক্ত পান করেন। কিন্তু বিষক্রিয়ার মৃত্যু হবার পরিবর্তে উল্টে গর্ভবতী হয়ে পড়েন। এদিকে রাবণের সাথে তাঁর দীর্ঘদিন কোনও সংসর্গ হয়নি, অতএব তিনি জানতেন এই সন্তান রাবণের নয়। কলঙ্কের ভয়ে তিনি কুরুক্ষেত্রে পালিয়ে আসেন এবং গর্ভপাত করেন। ভ্রূণটিকে তিনি মাটি চাপা দিয়ে দেন, যাকে জনক পরে খুঁজে পান আর নাম দেন সীতা। সেই অর্থে সীতা মন্দোদরীর কন্যা, যদিও রাবণের ঔরসজাত নয়। তবে এখানে তাঁকে রাবণদুহিতাই বলা হচ্ছে, কারণ ব্রহ্মা রাবণকে বর দিয়েছিলেন, রাবণের মৃত্যু একমাত্র তখনই হবে যখন রাবণ নিজ দুহিতাকে কামনা করবেন। অন্যভাবে দেখলে গৃৎসমদকে সীতার ঔরসপিতা বলা যেতে পারে, কারণ তাঁর সঞ্চিত দুধের কলস থেকে সীতার জন্ম।


    মূল রামায়ণের সঙ্গে একটা বড় পার্থক্য হল এই কাহিনী অনেকটাই নারীকেন্দ্রিক। মন্দোদরীকে তাঁর প্রাপ্য ন্যায়বিচার বা পোয়েটিক জাস্টিস- যাই বলুন না কেন- সেটি দেবার জন্যই সীতার জন্ম এখানে। কোনও একটা প্রফেসিকে সার্থক করার জন্য পুরাণকাহিনীতে রাম বা কৃষ্ণের মত নায়কদের জন্ম হত। এখানে কিন্তু এই ভূমিকা সীতার। লক্ষণীয় যে এখানে গৃৎসমদ কন্যালাভের আশায় দুগ্ধ সঞ্চয় করতেন, যেখানে সেই যুগে পুত্রেষ্টি যজ্ঞের প্রচলন আমরা বেশী দেখতে পাই। কাহিনীর শেষে দেবগণ এবং রামকে সীতার স্তব করতে দেখা যায়।


    তামিল কাহিনী শতকণ্ঠরাবণেও সীতার যোদ্ধ্রীরূপ দেখা যায়, তবে এই কাহিনীর ব্যাপারে আমার তেমন ধারণা নেই।


    অদ্ভুত রামায়ণ কোন সময়ে লেখা? বাল্মিকীর নাম দিয়েই এটি প্রচলিত, তবে এটি অনেক পরবর্তী যুগের। আমি এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাইনি। পাঠকরা কেউ জানলে অবশ্যই জানাবেন। বাল্মিকী রামায়ণ দ্বিতীয় সাধারণ পূর্ব শতক থেকে দ্বিতীয় শতকের মধ্যে রচিত। অদ্ভুত রামায়ণ আমার আন্দাজ দেবীমাহাত্ম্যর পরবর্তীকালে লেখা। অর্থাৎ সপ্তম থেকে পঞ্চদশ শতক যেটি শাক্ত ও তান্ত্রিক সাহিত্যের পীক পিরিয়ড- ঐ সময়ে লেখা বলে আমার মনে হয়। দেবীমাহাত্ম্য ও অন্যান্য শাক্ত সাহিত্যের মত এখানেও সাংখ্যদর্শনের পুরুষ-প্রকৃতি, কার্যকারণ আর বেদান্তের অদ্বৈত বা দ্বৈতের ধারণা, সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্মের ধারণা এখানে ব্যক্ত করা হয়েছে। রয়েছে মানস-সরোবরের উল্লেখও। এগুলোও মোটামুটি ঐ সময়কালেরই আভাস দেয়। ঐতিহাসিক সুবীরা জয়স্বালের মতে এটি কাশ্মীরে রচিত।


    মনে রাখতে হবে প্রতিটি রামায়ণেই অনেক নিজস্ব কাহিনী এবং আখ্যান থাকে। ওড়িয়া রামায়ণে শবরীর এঁটো কুলের গল্প দেখি যা অন্য রামায়ণে নেই। কৃত্তিবাসী রামায়ণে ভাগীরথের মা আর মাসির সমকামিতা দেখতে পাই যা বাল্মিকী রামায়ণে নেই। জৈন রামায়ণগুলি পুরো অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা।   কাহিনীর বিভিন্নতা নানা কারণে আসে- স্থানভেদ, কালভেদ, দার্শনিক মতের ভেদ। কয়েকশো রামায়ণে কয়েক সহস্র কাহিনী- আর তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ছোট ছোট বিস্ময়।


    ছবিতে অদ্ভুত রামায়ণের অংশবিশেষ দিচ্ছি। ছবিগুলি তথ্যসূত্রের প্রথম বইটি থেকে সংগৃহীত। 


    তথ্যসূত্র:


    http://dspace.wbpublibnet.gov.in:8080/jspui/handle/10689/34040 (adbhuta ramayana texts)


    https://www.shakuntalagawde.com/2018/05/18/adbhuta-ramayana-a-feminine-narrative/

    Jaiswal, S. (1993). Historical Evolution of the Ram Legend. Social Scientist, 21(3/4), 89-97. doi:10.2307/3517633

    জীবনীকোষ- শ্রী শশিভূষণ বিদ্যালংকার (https://bn.wikisource.org/wiki/%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%BE:%E0%A6%9C%E0%A7%80%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%B7-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%80%E0%A6%AF%E0%A6%BC_%E0%A6%AA%E0%A7%8C%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%A3%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%80%E0%A6%AF%E0%A6%BC_%E0%A6%96%E0%A6%A3%E0%A7%8D%E0%A6%A1.pdf/%E0%A7%AE%E0%A7%AF%E0%A7%A7)











  • বিভাগ : বাকিসব | ২৭ অক্টোবর ২০২০ | ৩৫৯ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
আরও পড়ুন
আঁধি - Jahar Kanungo
আরও পড়ুন
ভগীরথ - Vikram Pakrashi
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন