• টইপত্তর  নাটক

  • মাটি থেকে দেড় ইঞ্চি উঁচুতে! মূল হিন্দিঃ নির্মল বর্মা

    রঞ্জন
    নাটক | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৯৮ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • অনুবাদ গল্প - মাটি থেকে দেড় ইঞ্চি উঁচুতে!

    মূল হিন্দিঃ নির্মল বর্মা

    [ হিন্দিসাহিত্যের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক নির্মল বর্মা বহুদিন জর্মনীতে ছিলেন, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। তাঁর অনেক গল্পে সেই সময়ের ছাপ। এই গল্পটির স্থান - জর্মনির কোন এক শহর। কাল - যুদ্ধ পরবর্তী দশক। এই বিশিষ্ট গল্পটি সত্তরের দশকে বেতার নাটক হয়েছে । পরে ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা, দিল্লির ডায়রেক্টর দেবেন্দ্ররাজ অঙ্কুরের প্রয়াসে এটি তাঁর ‘কহানীকে রঙ্গমঞ্চ’ পদ্ধতির অন্তর্গত হয়ে একক অভিনয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।]
    (খোলা মঞ্চে একটি টেবিল ও চেয়ার। উপরে ঝুলছে হলদে ফ্ল্যাট আলো। সাউন্ড ট্র্যাকে পার্শ্বসংগীত এবং উপযুক্ত সময়ে ড্রামের আওয়াজ এবং হিটলারি সৈন্যের বুটের শব্দ তালে তালে মিলিয়ে যাবে)

    শুনছেন, ইচ্ছে করলে আমার টেবিলে এসে বসতে পারেন। ঢের জায়গা আছে। একটা লোকের আর কতটুকু জায়গা চাই? না, না, আমার কোন অসুবিধে হবে না।

    হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি চাইলে চুপটি করে বসে থাকতে পারেন, আমিও তাই। তবে কি জানেন, কথা বলা আর চুপ করে থাকা-- দুটো যে একসঙ্গে করা যায় এটা খুব কম লোক বোঝে, কবে থেকে দেখে আসছি।

    না, না। আপনার কথা বলছি না। আপনার বয়েসটা কম। এই বয়সে চুপ করে থাকার মানে চুপ করে থাকা, আর কথা বলার মানে কথা বলা। দুটো একসঙ্গে হয় না। আপনি ছোট গ্লাসে বীয়র খাচ্ছেন? তার মানে আপনি শখে খাচ্ছেন, এখনও নেশার দাস হন নি।

    আপনাকে দেখেই বুঝেছি আপনি বাইরের লোক। এই রাত্তিরে এখানে যারা নিয়মিত আসে তাদের আমি ভাল করে চিনি। ওদের সঙ্গে কথা বলা মুশকিল।

    ওরা আগে থেকে বেশ ক'পাত্তর চড়িয়ে তারপর আসে। এখানে ঢোকে রাত্তিরের শেষ বীয়রটা মারবে বলে-- অন্য পাবগুলো বন্ধ হয়ে গেছে আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, তাই। ওরা খুব তাড়াতাড়ি গড়িয়ে পড়ে। টেবিলে, ফুটপাথে, ট্রামের কামরায়।

    কতবার আমিই ওদের তুলে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছি। পরের দিন আর চিনতে পারে না!

    ভুল বুঝবেন না। আপনাকে বলছি না। আপনাকে তো আজ প্রথম দেখলাম। একা একটা আলাদা টেবলে চুপচাপ বসে আছেন। দেখে আমার একটু খারাপ লাগল, তাই।

    না, না। ভয় পাবেন না। গায়ে পড়ে বিরক্ত করব না। বীয়রের মগ হাতে এক টেবিলে বসেও আমরা একলা থাকতে পারি।

    আমার এই বয়সে একা হয়ে যাওয়াটা বেশ মুশকিল। কারণ মানুষ বুড়ো হতে হতে একটু ভীতু হয়ে যায়। একটু একটু করে গ্রেসফুলি বুড়ো হওয়া বেশ চাপ। এ সবাই পারে না। এটা নিজে থেকে হয় না। বুড়ো হওয়া একটা আর্ট, অনেক কষ্ট করে আয়ত্ত করতে হয়।

    কী বললেন? আমার বয়স? হুঁ হুঁ, আন্দাজ করুন দেখি!

    আরে না মশায়! এটা আমাকে খুশি করতে বললেন তো! তবে খুশি হয়েছি, তাই এটাকে সেলিব্রেট করতে আর একটা বীয়র নিই? আপত্তি নেই আশা করি?

    আর আপনি? আপনি নেবেন না? না, এ নিয়ে কোন জেদাজেদি চলে না।

    প্রত্যেক মানুষের নিজের জীবন ও নিজের পছন্দের মদ বেছে নেওয়ার অধিকার থাকা চাই। আর এ দুটো এক জীবনে শুধু একবার বেছে নেওয়া যায়।

    তারপর শুধু তার পুনরাবৃত্তি হয়, ব্যস্‌। এক-একবার বাঁচা আর একবার করে চুমুক দেওয়া।

    আচ্ছা, আপনি দ্বিতীয় জন্ম মানেন? মানে পরজন্মে বিশ্বাস করেন? দোহাই, ওই বাঁধাগতের জবাব শুনতে চাইনে যে আমি কোন ধর্ম-টর্ম মানি না।

    আমি ক্যাথলিক। কিন্তু আমার অন্য ধর্মের এই কথাগুলো শুনতে ভাল লাগে যে মৃত্যুতেই আমাদের সব শেষ হয়ে যায় না। তাহলে আমরা প্রথমে একটা জীবন, তারপর দ্বিতীয়, ফের তৃতীয়-- এভাবে বাঁচতে থাকি।

    রাতের বেলায় এইসব চিন্তা বেশি করে আসে। বুঝতেই পারছেন, এই বয়সে ঘুম-টুম সহজে আসে না। ঘুমিয়ে পড়তে হলে চাই এক ছটাক খামখেয়ালিপনা আর আধ ছটাক ক্লান্তি। যদি আপনার কপালে এ'দুটো জিনিসের নিতান্ত আকাল তো এর ভর্তুকি হিসেবে দেড় ছটাক বীয়র খেয়ে দেখতে পারেন। তাই আমি রোজ মাঝরাতে এখানে চলে আসি, হ্যাঁ, গত পনের বছর ধরে, নিয়মিত।

    একটু আধটু যে ঘুমুই না তা নয়; তবে রাত তিনটে নাগাদ রোজ ঘুম ভেঙে যায়। তারপর আর ঘরে একা থাকতে পারি নে।

    রাত তিনটে! বড় ভয়ানক সময়। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি দুটোর সময় মনে হয় এখনও বেশ রাত, আর চারটে বাজলে তো ভোর হয়ে যায়। কিন্তু রাত তিনটে? মানে মাঝদরিয়ায়। আমার সব সময় মনে হয় যে মরণ যদি কখনও আসে তো তার জন্যে এটাই উপযুক্ত সময়।

    না মশাই, আমি ঠিক একা থাকি নে। জানেন তো, পেনশনভোগী বুড়োদের বেয়াড়া সব সখ থাকে! আমার হল বেড়াল, বহুবছর ধরে আমার ঘরে রয়ে গেছে। দেখুন, এদিকে আমি বীয়রে চুমুক দিয়ে বড় বড় বাতেলা মারছি আর ওদিকে ও চৌকাঠে বসে আমার প্রতীক্ষায়।

    আপনার কথা বলতে পারব না, কিন্তু আমার ভাবতে বেশ লাগে যে আমার জন্যে কেউ পথ চেয়ে বসে আছে। এমন কোন মানুষ আছে যার জন্যে কেউ অপেক্ষায় নেই বা যে কারও জন্যে প্রতীক্ষায় ব্যাকুল হয় না? যে মুহুর্তে আপনি অন্যের জন্যে অপেক্ষা করা ছেড়ে দিলেন, সেই মুহুর্ত থেকে, আসলে, আপনি আর বেঁচে নেই!

    বেড়াল হল মেয়েদের মতন। ওরা ধৈর্য্য ধরে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে পারে। শুধু তাই নয়, মেয়েদের মতই ওরা কাউকে নিজেদের দিকে টেনে আনার চুম্বকীয় ক্ষমতা রাখে। ওদের কোথাও একলা দেখলে ভয় আর আকর্ষণ --দুটোই হয়। একেবারে হাত-পা ছেড়ে যায় !

    তবে ভয় তো কুকুর বা অন্য কোন জানোয়ার দেখলেও হয়। কিন্তু সেগুলো খুব সাধারণ নীচু স্তরের ব্যাপার। আপনি পাশ কাটিয়ে এক দিকে বেরিয়ে যান তো কুকুর আর এক দিকে। ও ভয় পায় যদি আপনি বেইমানী করেন! আপনি ভয় পান যে ও আপনার নজর এড়িয়ে হটাৎ ঝাঁপিয়ে না পড়ে!

    কিন্তু বেড়াল বা সাপ দেখার ভয়ের সঙ্গে যেমন কোন রহস্য, রোমাঞ্চ বা নতুন কোন কিছুর সম্ভাবনা মিশে থাকে, এ জাতীয় ভয়ে তেমন কিছু না।

    কথাটা হল-- এটা আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি --যে বেড়ালকে শেষ অব্দি ঠিক মত চিনে ওঠা মুশকিল, প্রায় মেয়েদের মতই; সে আপনি ওদের সঙ্গে বহুবছর একসাথে থাকলেও। এ জন্যে নয় যে ওরা জেনে বুঝে কিছু গোপন রাখে, বরং আপনারই ওদের গভীর গোপনের রহস্য ভেদ করার মতন সাহস থাকে না। এটা খেয়াল করেছেন যে আমাদের সেই জিনিসটাই বেশি কাছে টানে যার মধ্যে খানিকটা আতংক আর ভয় লুকিয়ে রয়েছে।

    যদি কিছু মনে না করেন, আমি আর একটা বীয়র নেব। একটু পরে সব বার বন্ধ হয়ে যাবে আর গোটা শহরে সেই সকাল অব্দি এক ফোঁটাও পাওয়া যাবে না।

    ভয় পাবেন না, আমি আমার লিমিট জানি। মাটি থেকে প্রায় দেড় ইঞ্চি উঁচুতে ওঠা পর্য্যন্ত, ব্যস্‌। নইলে উঁচুতে উঠতেই থাকব আর এই ওড়া গিয়ে শেষ হবে কোন খানায় বা নালিতে মুখ থুবড়ে,-- সেটা বোধহয় খুব ভালো হবে না। কিন্তু কিছু লোকজন ভয়ের চোটে জমিতে একেবারে শক্ত করে খুঁটি গেড়ে ফেলে। এদের খাওয়া না খাওয়া সমান।

    আজ্ঞে হ্যাঁ, সঠিক সীমা হল দেড় ইঞ্চি ওঠা। তবে ততটুকু হুঁস থাকা দরকার যাতে নিজের চেতনাটুকু দেশলাইয়ের কাঠির মত আস্তে আস্তে নিভে যাওয়াটা টের পাওয়া যায়, আসলে কাঠিটা জ্বলতে জ্বলতে হাতে ছ্যাঁকা লাগা অব্দি ধরে রাখতে হয়, তারপর ফেলে দিতে হয়, আগেও না, পরেও না।

    কতক্ষণ ধরে রাখতে হয় আর কখন ছাড়তে হয়--এটা বুঝতে পারার মধ্যেই মদ খাওয়ার সব রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। সমস্যা হল দেড় ইঞ্চি হাওয়ায় না ওড়া অব্দি ওটা বুঝতে পারা যায় না, তবে তখন আর কিছু করার থাকে না। আপনার বোধহয় এটা শুনে হাসি পাচ্ছে যে বোধি প্রাপ্তি তখনই সম্ভব যখন আমরা বোধবুদ্ধি খুইয়ে বসি।

    আমার কথাটা হেসে উড়িয়ে দিলে আমি কিছু মনে করব না। আমি নিজেও কখনও কখনও ভাবি যে কোন কোন বিষয়ে চোখ বুঁজে থাকাই নিরাপদ জীবনের গ্যারন্টি। এভাবেই বাঁচার চেষ্টা করি। আপনি একটু একটু করে এভাবে বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, ঠিক যেভাবে বউয়ের সাথে ঘরগেরস্তিতে।

    হ্যাঁ, একটা ঘরে, বছরের পর বছর।

    তবে কখনও কখনও শংকা হয়, উনিও আপনার সঙ্গে একই খেলা খেলছেন না তো! আর সন্দেহ থেকে রেহাই পেতে আপনিও দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রেমিকা খুঁজে বেড়ান। এই হল হতাশ হওয়ার শুরু। কারণ, দ্বিতীয় নারীর গোপন ঝাঁপিটি আলাদা, তেমনি তৃতীয়জনেরও।

    ব্যাপারটা খানিকটা দাবা খেলার মত। ধরুন আপনি একটা চাল দিলেন, এবার বিপক্ষের সামনে অনন্ত সম্ভাবনার দরজা খোলা। আপনি এক গেম হেরে পরেরটা জেতার আশায় বুক বাঁধলেন। ভুলে গেলেন যে পরের বাজিটারও প্রথমটার মতই অসীম সম্ভাবনা। বেশ রহস্যময়, কী বলেন?

    দেখুন, তাই বলছিলাম কি আপনি জীবনে মেয়েদের সঙ্গে যত ইচ্ছে সম্পর্ক গড়ে তুলুন, আসলে আপনার সম্পর্ক শুধু একজন নারীর সঙ্গেই হয়।

    কী বললেন? না, না; আগেই বলে দিয়েছি যে বাড়িতে একাই থাকি, আর কেউ নেই, অবশ্যি যদি বেড়ালটার কথা না ধরেন। হ্যাঁ, বিয়ে করেছিলাম, তবে আমার স্ত্রী সম্ভবতঃ বেঁচে নেই; অবশ্য এটাও আমার অনুমান বলতে পারেন।

    মশায়, আপনি যে চিন্তায় পড়ে গেলেন! আরে অনুমান বলছি এইজন্যে যে আমি ওকে মারা যেতে দেখিনি, তাই। এখন আপনি যদি কাউকে নিজের চোখে মরতে না দেখেন, নিজের হাতে চিতায় আগুন না দিয়ে থাকেন, তবে আপনি শুধু আন্দাজ করতে পারেন যে উনি মারা গেছেন।

    আপনার হয়তো হাসি পাচ্ছে, কিন্তু আমার মনে হয় যে যদি আপনি চেনা কাউকে মারা যেতে না দেখে থাকেন তাহলে কোথায় যেন মনের এককোণে একটু আবছা আশা জেগে থাকে যে ও বেঁচে আছে। আপনি দরজা খুলবেন আর ও রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে তাড়াতাড়ি এসে আপনার সামনে দাঁড়াবে।

    হ্যাঁ, এটাই তো ভুল। এমনটা সচরাচর ঘটে না।

    এখন তার জায়গায় বেড়ালটা আসে, দরজার পেছনে ঘাপটি মেরে চৌকাঠে মাথা ঠেকিয়ে চোখের মণির রঙ বদলাতে থাকে।

    লোকে বলে সময়ে নাকি সব ঘা শুকিয়ে যায়! আপনিও তাই ভাবেন? আমার তো মনে হয় সময়ে সবটা শুকোয় না, বরং পাপড়ি জমে খানিকটা চাপা পড়ে যায়, -- ঘরের কোনায় অন্ধকারে, গালচের নীচে, যাতে বাইরে থেকে কেউ টের না পায়। কিন্তু ওর থাবা সবসময় বাইরে বেরিয়ে থাকে, আচমকা কোন মুহুর্তে আপনাকে জাপটে ধরতে পারে।

    আমি বোধহয় খেই হারিয়ে ফেলেছি।-- বিয়র খাওয়ার এই এক মজা। আপনি রাস্তা ভুলে কানা গলিতে পথ হারিয়ে ফেলেন আর ঘুরে ফিরে সেই আমড়াতলার মোড়ে--- রাউন্ড এন্ড রাউন্ড!

    আপনি বাচ্চাদের খেলাটা তো দেখেছেন, ওই যেটায় সবাই গোল হয়ে বসে আর একটা বাচ্চা রুমাল নিয়ে গোল গোল ঘুরতে থাকে। আচ্ছা, আপনাদের দেশেও এই খেলাটা আছে? বাঃ-- দেখলেন, আমরা যতই আলাদা আলাদা হই না কেন, বাচ্চাদের খেলাটেলা সব দেশে একইরকম।

    সেইসব দিনগুলো!

    তখন আমাদের সবার অবস্থাই এই রকম ছিল। সবাই ভয়পাওয়া বাচ্চাদের মত বারবার পেছন ফিরে দেখত কেউ ফলো করছে না তো! কেউ জানে না কার গলায় আচমকা পেছন থেকে ফাঁস এঁটে বসবে!

    তো সেই সময় এই দেশে নাজীরা ক্ষমতায় এসেছিল। আপনি তো তখন একেবারে বাচ্চা, আমার বয়সও এমন কিছু ছিল না। তবে যুদ্ধ চলছিল তো, তাই সকাল থেকে সন্ধে পর্য্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি, একেবারে জোয়ান বলদের মত লেগে থাকতাম।

    একটা বয়স আসে যখন মানুষ একটা গড়পড়তা সুখের খাঁচাতেই আটকে থাকতে শিখে নেয়। তার বাইরে গলা বাড়িয়ে দেখার সময়ই হয় না-- মানে নিজে যতক্ষণ ওই গন্ডীর মধ্যে ---- এটা খুব দেখে থাকবেন যে যাকে আমরা সুখ বলি তা একটা কোন মুহুর্তের ব্যাপার। ব্যাপারটা বেশ শক্তপোক্ত, কিন্তু ওইটুকু সময়ের জন্যেই।

    যেই সেই বিশেষ মুহুর্তটি চলে যায়, অমনি সেই সুখ কেমন যেন নরমসরম হালকা পলকা ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে যায়, খানিকটা হ্যাং -ওভারের মতন। কিন্তু যাকে দুঃখ বা ব্যথা অথবা যন্ত্রণা বলি তার কোন সময় অসময় নেই। মানে-- বলতে চাইছি --- দুর্ঘটনার সময় তক্ষুণি তক্ষুণি ব্যথাটা টের পাওয়া যায় না। আসলে বড় দুর্ঘটনার সময় আমরা খানিকটা বেহুঁশ খানিকটা অসাড় হয়ে যাই, ওর থেকে যে যন্ত্রণা শুরু হবে তাকে ব্যথার কোন চেনা ফ্রেমে ঠিকমত ফিট করতে প্রস্তুত থাকি না। দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়া এক কথা আর সারাজীবন ধরে তার যন্ত্রণা ভোগ করা বা তার জন্যে প্রস্তুত থাকা আরেক।

    এ অসম্ভব---- এরকম হয় না। মানে-- বলতে চাইছি বার বার অন্যের পরিস্থিতিতে নিজেকে কল্পনা করে সে কেমন কষ্ট পেয়েছে তার খানিকটা আন্দাজ করা যায় না ।

    ওটা হয় একটু কম হবে, নয় একটু বেশি। কিন্তু বাস্তবে আরেকজন যা যন্ত্রণা পেয়েছে তার তুলনায় কিছুই নয়।

    না , না; ভুল বুঝবেন না। আমি আমার স্ত্রীকে যন্ত্রণা পেতে দেখিনি। আমি যখন বাড়ি ফিরেছিলাম তার আগেই ওরা ওকে নিয়ে গিয়েছিল। সাত বছরের বিবাহিত জীবনে এই প্রথম আমি খালি বাড়িতে ঢুকলাম। না, বেড়াল-টেড়াল তখন ছিল না। ওকে বেশ কয়েক বছর পরে পুষ্যি নিয়েছিলাম।

    পাড়াপড়শীর দল নিশ্চয়ই আশপাশের বাড়িঘরের খড়খড়ির ফাঁক থেকে আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখছিল। তাই তো স্বাভাবিক। আমিও তো জানলার ফাঁক দিয়ে দেখতাম যাদের আত্মীয়্স্বজনকে গেস্টাপো পুলিশ একটু আগে বন্ধ গাড়িতে ভরে চালান করেছে। কিন্তু স্বপ্নেও ভাবিনি যে একদিন বাড়ি ফিরে দেখবো গিন্নির ঘরটা খালি!

    দেখুন, একটা কথা বলি-- যখন আমরা কোন মৃত্যু, যাতনা বা দুর্ঘটনার কথা শুনি বা সকালের কাগজে পড়ি, তখন কি একবারও ভাবি যে এটা আমার সঙ্গেও হতে পারে বা হতে পারত? না, বরং ভাবি যে এসব অন্যদের সঙ্গেই হয়।

    কি আশ্চর্য!

    আহা! ভাল লাগল যে আপনি আরও একটা বিয়র নেবেন। একটা খালি গেলাস সামনে রেখে তো সারা রাত এখানে কাটানো যায় না।

    কী বললেন? জানতাম, এই প্রশ্নটি আপনি করবেন।

    না মশায়, গোড়ায় কিছুই বুঝতে পারিনি। বলেছিলাম না বড় দুর্ঘটনার সময় লোকে হতভম্ব হয়ে যায়? নিজের ব্যথা যাতনা কিছুই পুরোপুরি টের পায় না।

    আমার স্ত্রীর জিনিসপত্র সব এলোমেলো,-- কাপড়চোপড়, বইপত্তর, পুরনো কিছু খবরের কাগজ। আলমারি আর টেবিলের ড্রয়ার হাট করে খোলা আর ভেতরের জিনিসগুলো ঘরের চারদিকে মেজেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে; ক্রিসমাস গিফ্ট, সেলাই মেশিন, পুরনো ফোটো- অ্যালবাম; জানেনই তো বিয়ের পরে কতশত জিনিস নিজের থেকেই জমতে থাকে। মনে হচ্ছিল ওরা প্রত্যেকটি ছোটখাট জিনিসকেও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে উল্টে পাল্টে দেখেছে; ঘরের কোনায় কোনায় খুঁচিয়েছে। এমন কোন জিনিসই ছিল না যা ওদের হাত নাগাল পায়নি ।

    সে রাতে আমি শোয়ার ঘরে একলা জেগেছিলাম। গিন্নির বিছানাটা খালি; ওর বালিশের নীচে রুমাল, দেশলাই আর সিগারেটের প্যাকেট -- রোজকার মতই।

    ও ঘুমোতে যাবার আগে সিগারেট খেত। প্রথম দিকে ওর এই নেশাটা আমার খারাপ লাগত, পরে ধীরে ধীরে অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। খাটের পাশে তেপায়ার উপর ওর বইটা রাখা---- ও সেইসব দিনে যা পড়ছিল। গত রাতে ঘুমোনোর সময় যে পাতাটা পড়ছিল , সেখানে ওর ক্লিপ গুঁজে মার্ক করে রাখা। ক্লিপে ছিল ওর চুলের গন্ধ। জানেনই তো, কেমন করে কিছু সামান্য ঘটনা বহুবছর পরেও আমাদের স্মৃতি জুড়ে থাকে। হয়তো এটাই ঠিক।

    বিয়ের আগে আমরা খালি বড় বড় নানান সেন্টিমেন্টাল ঘটনা নিয়ে মাথা ঘামাই, কিন্তু বিয়ে হয়ে গেলে সারাক্ষণ কাছাকাছি থাকতে থাকতে কখন যেন সেসব হাতের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। তবে অনেক ছোটখাট জিনিস, অনেক দিনযাপনের গ্লানি, যা বাইরে থেকে কেউ গা' করে না-- সেগুলোই রয়ে যায়। প্রাত্যহিকতার এইসব খুঁটিনাটি, যা আমরা সংকোচে নিজেদের মধ্যেও এড়িয়ে যাই, কক্ষনো বলি নে, পরে সেগুলো ছাড়া জীবন কেমন যেন আলুনি আলুনি লাগে।

    সে' রাতে আমি আর আমাতে ছিলাম না। গোটা রাত একলা ঘরে স্ত্রীর সমস্ত ছড়ানো ছিটোনো জিনিসপত্তরের মধ্যে চুপচাপ বসে ছিলাম। মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। হ্যাঁ, ও নিজের কামরায় নেই সেটা যেন এক মামুলি ঘটনা মাত্র।

    আমি ওকে বুঝতে পারতাম। কিন্তু ওরা আমাকে নয়, কেন ওকেই ধরে নিয়ে গেল -- এটা আমার বুদ্ধির অগম্য।

    আমার বউকেই কেন নিয়ে গেল? সারারাত বারবার নিজেকে ওই একই প্রশ্ন করেছি।

    আপনারা হয়ত শুনলে অবাক হবেন যে সাতবছরের বিবাহিত জীবনে সেই প্রথম আমার স্ত্রীর ওপর একটু সন্দেহ হল। ও কি আমার থেকে কিছু লুকোচ্ছে? এমন কিছু যার সঙ্গে আমার কোন সোজাসাপটা সম্পর্ক নেই?

    পরে জানতে পেরেছি যে গেস্টাপোর গোয়েন্দারা বহুদিন থেকেই ওকে ধরার জন্যে তক্কে তক্কে ছিল। ওর কাছে এমন কিছু বেআইনী লিফলেট আর কাগজ পাওয়া গেছল যা লোকজনের মধ্যে গোপনে বিলি করা হত, জর্মন কর্তৃপক্ষের চোখে ওটা খুব গুরুতর অপরাধ।

    পুলিস এসব কাগজপত্র আমার বৌয়ের ঘর থেকেই জব্দ করেছিল। আর আপনারা শুনলে অবাক হবেন যে আমি এর বিন্দুবিসর্গ জানতাম না।ওই রাতের একদিন আগে পর্যন্ত আমরা একই ঘরে একই বিছানায় শুতাম, প্রেম করতাম---অথচ সেই ঘরটাতেই কিছু রহস্যময় জিনিসপত্তর ছিল যেগুলো আমার নয়! আপনার শুনতে ইন্টারেস্টিং লাগছে না যে ওই ওরা,আমার বৌকে আমার চেয়ে ভাল চিনেছিল?

    ব্যস্‌, একটু দাঁড়ান, আগে আমার গেলাস খালি করি; তারপর আপনার কথায় আসছি। একটু পরে ওরা বার বন্ধ করে দেবে, তারপর আর---- না না, তাড়াহুড়ো করবেন না। মদ খেতে হয় ধীরে ধীরে, চুক চুক করে, তবে না--! আমাদের ভাষায় একটা কথা আছে-- মাল খাও যত ইচ্ছে, একশ' বছর পরে কে থাকছে?

    শতবর্ষ? একটু বাড়বাড়ি হয়ে গেল না? আপনার কী মনে হয়? আমাদের মধ্যে কে এতদিন টিকে থাকবে!

    একটা লোক-- বাঁচে, খায়দায়, মাল টানে তারপর একদিন--- ফট্‌! না মশায় , মরে যাওয়াটা অত ভয়ানক নয়।রোজ লাখে লাখে লোক মরছে, কিন্তু আপনি ট্যাঁ ফোঁ করছেন না। ভয়ের ব্যাপারটা হল যে মরে যায়, সে তার গোপনরহস্য সঙ্গে নিয়ে যায়। তখন আপনি ওর করবেন কী? কাঁচকলা! এক হিসেবে ও আমাদের নাগাল থেকে বেরিয়ে যায়।

    সে রাতে আমি নিজের বাড়িতে খালি এঘর ওঘর করছিলাম। আপনারা শুনলে হয়ত হাসবেন যে পুলিশের পরে আমিও ওর জিনিসপত্তর দ্বিতীয়বার খানাতল্লাশি করে দেখছিলাম। এক একটা জিনিস আলাদা করে উল্টে পাল্টে খুঁটিয়ে দেখছিলাম।

    আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না যে ও আমার জন্যে এমন কোন সংকেত ,এমন কোন চিহ্ন ছেড়ে যায় নি যার সাহায্যে আমি সেই জিনিসটা খুঁজে পাব, যা শুধু আমার।

    ওর বিয়ের পোষাক, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে রাখা বিয়ের আগের আমার চিঠিপত্তর, পাখির পালক, নুড়িপাথর --যেগুলো ও শখ করে জমিয়েছিল?

    দেখুন তো, বিয়ের পর সাত-সাতটা বছর কেটে গেছে, আর আমি সেই রাত্তিরে বৌয়ের জিনিসপত্তর এমন হান্ডুল-পান্ডুল করে হাতড়াচ্ছিলাম যেন আমি ওর স্বামী না, কোন খোচর! আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে আর ওর থেকে কিছু জানতে পারব না। ও যে ওদের খপ্পর থেকে বেঁচে ফিরবে না সে আমি ধরেই নিয়েছিলাম। ওরা যাদের তুলে নিয়ে যেত তাদের কাউকেই ফিরে আসতে দেখিনি ।

    কিন্তু সেদিন আমার ভয় ছিল অন্য রকম। মৃত্যু যে ওর ঘাড়ের কাছে-- সে নিয়ে বেশি ভাবিনি। আমার আশংকা হচ্ছিল যে বৌয়ের ব্যাপারে পুরো সত্যিটা আর কোনদিনই জানা যাবে না,। মৃত্যু ওর গোপন রহস্যের ঘরে তালা লাগিয়ে দেবে আর ও এমন কোন সংকেত ছেড়ে যায় নি যার সাহায্যে ওই তালাটা খুলতে পারব।

    ওরা এল পরের দিন, রাতের বেলায়। এসে আমার ঘরের দরজা খট খট করল।আমি প্রস্তুত হয়ে ওদের প্রতীক্ষা করছিলাম।জানতাম, ওরা আসবে। যদি বৌ ওদের কাছে সব উগরে দিত তাহলে বোধহয় ওদের আর আমাকে দরকার হত না। কিন্তু আমি জানতাম যে ওর মুখ থেকে একটা টুঁ শব্দও বের হবে না, আমি ওর গোপন রহস্যটা জানতাম না বটে, কিন্তু ওর স্বভাব? সে তো ভাল করেই জানতাম। ও মুখ বন্ধ রাখতে জানে, ভয়ংকর যন্ত্রণাতেও।

    না মশায়, নিজের চোখে ওকে টর্চার করতে দেখিনি, কিন্তু একটু একটু আন্দাজ করতে পারি।

    ওরা আমাকে প্রথম একটা সোজাসাপটা প্রশ্ন করল--- আমি কি শ্রীমতী অমুকের স্বামী?

    তো এর উত্তরে আমি সেরেফ 'হ্যাঁ' ছাড়া কী বলব বলুন? এর পর যা যা জিজ্ঞেস করল তার সবকটাই প্রায় আমার মাথার ওপর দিয়ে গেল। কিস্যু বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু ওরা সহজে ছাড়ার পাত্র নয়।

    আমার কথাগুলো ওরা হেসে উড়িয়ে দিল।

    যখন বললাম যে আমি আমার বৌয়ের এইসব কাজকম্মের ব্যাপারে কিছুই জানি না, ওরা ভাবল আমি পিঠের চামড়া বাঁচাতে এড়িয়ে যাচ্ছি। ওরা আমাকে একটা আলাদা সেলে নিয়ে গেল। সেখানে পুরো একসপ্তাহ ধরে নানান ঢংয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে গেল। কিন্তু প্রশ্নগুলো সব একই ধরণের।

    যেমন- আমি আমার বৌয়ের ব্যাপারে কী কী জানি? ও কোথায় যেত? কাদের সঙ্গে দেখা করত? ওইসব লিফলেট ওর কাছে কী করে এল? কে দিল?

    আমার থেকে এসবের যা হোক কিছু একটা জবাব পাওয়ার জন্যে ওরা যা যা করত তা আমি কিছুতেই আপনাকে বলতে পারব না। সব খুঁটিনাটি খুলে বললেও আপনারা আসল ব্যাপারটার কোন আন্দাজ পাবেন না। ওরা আমাকে মারতে থাকত, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া পর্য্যন্ত।

    ওদের অসীম ধৈর্য; অপেক্ষায় থাকত কখন আমার জ্ঞান ফিরে আসবে। ব্যস্‌, আবার শুরু! ঘুরে ফিরে সেই পুরনো প্রশ্নমালা আর অনন্ত যাতনা।

    ওদের বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে এতবছর একসঙ্গে ঘর করেও আমি বৌয়ের গোপন কাজকর্মের ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। ওরা ভাবত যে আমি ওদের বোকা বানাচ্ছি, ন্যাকা সেজে চোখে ধূলো দিচ্ছি!

    না মশায়, ওরা আমাকে বেদম পিটত ঠিকই, কিন্তু সেটা কষ্ট নয়। আসল কষ্ট হল আমার কাছে ওদের প্রশ্নের কোন জবাব যে নেই! বলার জন্যে ছিল শুধু ঘরোয়া কিছু ছোটখাটো ঘটনা, যেমনটা সব বরবউয়ের মধ্যেই হয়ে থাকে, মানে অতি সাধারণ সব, ব্যস্‌ তাই।

    আমি কল্পনাও করতে পারি নি যে ও রোজকার বাঁধাগতের ঘরকন্নার পাশাপাশি আর একটা জীবনযাপন করছে, হ্যাঁ, আমার থেকে আলাদা-- আমাকে ছেড়ে --- আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে জীবনের সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই!

    মজাটা দেখুন, ওরা ওকে না ধরলে আমি সারাজীবন এটাই ধরে নিতাম যে আমার বউ মানে যাকে আমি ভাল করে চিনি?

    জানেন তো, সময়টা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিম পর্ব আর গেস্টাপোরা কখনই শিকারকে সহজে হাত ফসকে যেতে দিত না। আমার বউ শেষ মুহুর্তেও মুখ খোলেনি।

    কিন্তু ওরা আমাকে কাঁচা খেলুড়ে ভেবে ছিল।ওরা বোধহয় আমাকে মারতে চায় নি, কিন্তু যমদুয়ারে পৌঁছনোর আগে অব্দি মানুষকে যত যন্ত্রণা দেওয়া যায় তা দিতে কোন কসুর করে নি। আমাকে রেহাই দিত শুধু আমি জ্ঞান হারালে অথবা নিজেরা ক্লান্ত হয়ে পড়লে।

    আমি কিছুই বলি নি, কিছু কবুল করি নি--- তার মানে এই নয় যে আমি খুব সাহসী, আসলে আমার কাছে বলার মত কিছুই ছিল না।

    জানেন প্রথম রাতে যখন বাড়ি ফিরে বউকে ঘরে পেলাম না তখন খুব দুঃখ হয়েছিল। মনে হয়েছিল, আগে থেকে এসব না জানিয়ে ও আমাকে ঠকিয়েছে। বার বার মনে হচ্ছিল আমার বউ আমাকে বিশ্বাসের যোগ্য ভাবে নি। কিন্তু এর পরে গেস্টাপোর হাতে ভয়ংকর যাতনার অসহ্য কষ্টের মুহুর্তগুলোতে আমি আস্তে আস্তে ওর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে পড়লাম-- ভাগ্যিস আমাকে ও কিছুই বলেনি! এক হিসেবে ও আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। যদি আমার কাছে বৌয়ের গুপ্ত-কাজকর্মের ব্যাপারে কিছু খবর থাকত, তাহলে কি মুখ বুজে থাকার অমন নির্ভীক সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম? আজও ভেবে পাইনি।

    ভাবুন তো, আমার যন্ত্রণার ডিগ্রি বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আর মুখ খুলে সব বলে দিলে বেঁচে যাওয়ার রাস্তা খোলা রয়েছে!

    লোকে বাধ্য হয়ে অনেক অসহনীয় যন্ত্রণাও সহ্য করে নেয়, সে উপায় নেই বলে। কিন্তু যদি জানা থাকে যে বাঁচার রাস্তা খোলা, আপনি যে কোন মুহুর্তেই এর থেকে রেহাই পেতে পারেন, খালি আপনার বউ, আপনার বাবা বা আপনার ভাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে হবে, তখন টর্চারের একটা লিমিট ছাড়িয়ে গেলে আপনি যে ওই রাস্তায় হাঁটবেন না তার কোন গ্যারান্টি আছে? পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতার চেয়ে বড় যন্ত্রণা আর কিছু নেই।

    কখনও কখনও মনে হয় যে বউ বোধহয় এই রাস্তা ঠিক করার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতেই আমাকে ওর গোপন কথা কিছুই বলে নি।

    দেখুন, বলা হয় যে ভালোবাসা হবে আয়নার মত স্বচ্ছ, তাতে কোন কিছু গোপন করার, কোন আমরা-ওরা ভাবার জায়গা নেই। আমার মনে হয় এর চেয়ে বড় ভ্রম আর কিছু হতে পারে না। ভালবাসলে নিজেকে পুরোপুরি খুলে দিতে হয় এমন নয়, বরং কিছু কিছু ঢেকে রাখতেও হয়, যাতে ভালোবাসার মানুষটির গায়ে আমার একান্ত ব্যক্তিগত কোন 'ফাঁড়া'র প্রভাব না পড়ে!

    হ্যাঁ, সব মেয়েরাই এই সত্যটি জানে, আর যেহেতু ওদের ভালবাসার শক্তি পুরুষের চেয়ে ঢের বেশি, তাই দরকার মত গোপন করার হিম্মতও রাখে।

    আপনি তা মনে করেন না? হয়ত আমারই ভুল। কিন্তু কী বলব, রাত্তিরে ঘুম না এলে এই ভেবে শান্তি পাই যে ---- থাক, কাটিয়ে দিন; আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না।

    আপনাকে যখন আমার টেবিলে বসতে বলেছিলাম তখন এই আশায় ডাকিনি যে আপনাকে কিছু বোঝাতে পারব।

    কী বললেন? না, তারপরে ওকে আর কখনও দেখতে পাই নি।

    একদিন দুপুরে বাড়ি ফেরার সময় ওই পোস্টারটায় চোখ আটকে গেল। সেসব দিনে এমনি পোস্টার তিন-চার দিনে একবার সব দেয়ালে সেঁটে দেওয়া হত। আর প্রত্যেক পোস্টারে এমন তিরিশ চল্লিশজনের নাম থাকত যারা গতরাতে ফায়ারিং স্কোয়াডের গুলিতে মারা গেছে। এরমধ্যে যখন আমার বৌয়ের নাম দেখতে পেলাম তখন কেমন যেন লাগছিল--- ওই যে ছোট্ট ক'টা অক্ষর--- ওর পেছনে আমার বউয়ের চেহারা ঘাপটি মেরে আছে!

    গোড়াতেই বলেছিলাম কি না যে যতক্ষণ কাউকে নিজের চোখে মরতে না দেখি ততক্ষণ ঠিক যেন বিশ্বাস হতে চায় না যে ও আর নেই।কেমন যেন একটা ঝাপসা মত আশা বেঁচে থাকে যে --- আপনি দরজাটা খুলবেন আর--- দেখুন তো, আবার সেই একই প্যাচাল শুরু করেছি।

    বীয়র খাওয়ার মজাটাই এই-- আপনি না একটা প্রসঙ্গেই ঘুরপাক খেয়ে আটকে থাকবেন। রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড! আরে, আপনি উঠবেন? একটু দাঁড়ান, আমি পোষা বেড়ালটার জন্যে ক'টা সালামির টুকরো প্যাক করিয়ে নিই। বেচারা এত রাত অব্দি না খেয়ে আমার জন্যে বসে থাকে।

    না, না! আপনাকে সঙ্গে আসতে হবে না। আমার ঘর এই কাছেই।আর আমি আমার মাল টানার লিমিট ঠিক জানি। বলেছিলাম না? -- জমি থেকে মাত্র দেড় ইঞ্চি উঁচুতে!

    =======================================================

    অনুবাদঃ রঞ্জন রায়
আরও পড়ুন
লোনার - Saswati Basu
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • b | 14.139.196.11 | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২৩:২৪732675
  • "পুলিস এসব কাগজপত্র আমার বৌয়ের ঘর থেকেই জব্দ করেছিল।"
    বাংলায় বোধ হয় জব্দের বদলে বাজেয়াপ্ত কথাটা ভালো হবে।
  • রঞ্জন | 182.69.64.235 | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২৩:৪১732676
  • অনেক ধন্যবাদ বি ।

    ঠিকই বলেছেন। জব্দ নয় , বাজেয়াপ্ত হবে। মূল ওয়ার্ড ফাইলে শুধরে নিলাম।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই প্রতিক্রিয়া দিন