• বুলবুলভাজা  অন্যান্য  নেট-ঠেক-কড়চা

  • ওয়ার্ডরোবে সময়ের দাগ

    রঞ্জন সেন
    অন্যান্য | নেট-ঠেক-কড়চা | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৬১৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • বিকিনির জায়গায় এসেছে ট্রিকিনি। দুটি বস্ত্রখণ্ডের সাঁতার পোশাকের সঙ্গে একপিস ডিজাইনার মুখোশ যুক্ত হয়ে নাম হয়েছে ট্রিকিনি। সাজপোশাক আর ফ্যাশনের পৃথিবীতে ডিজিটাল দাপটে আমরা বেশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম। করোনাকালে তা এক নতুন চেহারা নিয়েছে। নতুন ফ্যাশনের হালহদিশ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গোটা র‍্যাম্প ঢুকে পড়েছে অনলাইনে। ফিজিক্যাল স্পেসের সঙ্গে ডিজিটাল টেকনোলজি মিশে ফ্যাশনের দুনিয়ায় এসে গেছে এক নতুন পরিভাষা, যার নাম ফিজিটাল। অতিমারি, মহামারি, মন্বন্তর, আর্থিক দুরবস্থা মানুষের পোশাক-আশাকের ওপর যে ছাপ ফেলে সেকথা আমাদের ইতিহাস বলছে। করোনার দিনে মৃত্যু ও সংক্রমণের বিভীষিকার মধ্যেও তার লক্ষণগুলি বেশ ফুটে উঠছে।



    সত্যিই বড়ো বিচিত্র জীব মানুষ! সবকিছুকেই সে নিজের রঙে, নিজের ঢঙে সাজিয়ে নিতে চায়। মনখারাপের দিনেও সুরুচি ও শিল্পকলা তার সঙ্গ ছাড়ে না। মানুষের সাজপোশাক বলুন বা ফ্যাশন, সবকিছুর মধ্যেই তা জেগে ওঠে। বিহারের মধুবনী শিল্পীরা এখন বাঁচার তাগিদেই তৈরি করছেন মাস্ক। আর সেই মাস্কের গায়ে তারা এঁকে দিচ্ছেন মধুবনী চিত্রকলার মোটিফ। একই ঘটনা ঘটছে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার নয়াগ্রামে। সেখানকার পটুয়ারা করোনা মাস্কের গায়ে ফুটিয়ে তুলছেন পটচিত্রের ছোটো ছোটো ছবি। শুধু আমাদের দেশে নয়, এ ঘটনা ঘটছে পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও। পেরু ও চিনের লোকশিল্পীরাও মাস্কের গায়ে আঁকছেন তাদের ঐতিহ্যবাহী চিত্রকলা। কাপড়ের টুকরোয় মুখ ঢাকা পড়লেও শিল্প ঢাকা পড়বে না, মানুষের এই প্রবণতাই জীবনের সঙ্গে শিল্পকে জুড়ে দেয়। এই প্রবণতার হাত ধরে ভবিষ্যতে গ্লাভস কিংবা পিপিই স্যুট এর গায়ে ফ্যাশনের ছোঁয়া লাগলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।





    ওয়ার্ডরোবে লেগে থাকে সময়ের দাগ। এ ঘটনা যে বারবার ঘটে চলে ফ্যাশনের ইতিহাস তার সাক্ষী। ১৯৩০-এর দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন বা আর্থিক মন্দার সময়ে দামি ওভারকোটকে সরিয়ে চালু হয়ে গিয়েছিল সস্তার ট্রেঞ্চ কোট। ফ্রক আর স্কার্ট-এর কাটছাঁটেও পড়েছিল ব্যয়সঙ্কোচের ছাপ। শোনা যায়, মাথায় পরচুলা পরা চালু হয়েছিল যৌনরোগ, বিশেষ করে সিফিলিসের সংক্রমণে চুল পড়ে যাওয়া মানুষের টাক ঢাকতে। টাক ঢাকতে এল উইগ। ফ্রান্সের সম্রাট ত্রয়োদশ লুই-এর আমলে মাথায় রিবন শোভিত উইগ পরা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৬১৯ সালে বুবনিক প্লেগ থেকে বাঁচতে চালু হয়ে গেল ধনেশ পাখির মতো লম্বা ঠোঁটওয়ালা মাস্ক। নিশ্বাস নেওয়ার সময় সংক্রমণ ঠেকাতে ঠোঁটের ফাঁপা জায়গাটায় ঠাসা থাকতো নানারকম শিকড়বাকড়। মুখোশের চোখের জায়গাটায় বসানো থাকতো চশমার কাঁচ। আর সঙ্গে ছিল চামড়ার লম্বা কোট আর হ্যাট। প্লেগকে তো মানুষ নিশ্চয় ভয় করত। পুরোনোদিনের বইতে প্লেগ আটকানোর পোশাক পরা মানুষের সেই ছবি দেখলে গোয়েন্দাকাহিনিতে পড়া খুনির ছবি দেখার মতো ভয় করে। রোগ ঠেকাতে মাস্ক মোটেই নতুন কিছু নয়। গোয়েন্দাগল্পে জাঁকিয়ে বসার বহু আগে রোগ ঠেকাতে মাস্ক ব্যবহার করতেন সাধারণ মানুষ। ১৯১৮-র জাপানি ফ্লু-র সময়ে জাপানে মাস্ক ব্যবহার বেশ চালু ছিল। পরবর্তী সময়ে তা হয়ে দাঁড়াল এক লাভজনক ব্যাবসা। পশ্চিমের ‘লং ড্রেসেস উইথ হাই ওয়েস্ট’, সেও তো টিবিতে বিধ্বস্ত শরীরের ভগ্নদশা ঢাকার প্রয়াস।



    শুধু অতীতে নয়, এই ঘটনা ঘটছে এইসময়েও। কোভিড সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে আমাদের পোশাক শিল্প ও ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এর প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। ভারতে এই শিল্পের ৮০ শতাংশ বাজারই খুচরো। সেই বাজারের একটা বড়ো অংশ এখন অতিমারির ধাক্কায় বন্ধ। কিছু কিছু দোকানপাট খুলতে শুরু করলেও ব্যাবসার অবস্থা স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। বহু ব্যবসায়ী তাদের দোকানের ঝাঁপ চিরতরে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন। যেসব দোকান খোলা, তাতে যে খুব ভিড় হচ্ছে এমন নয়। শুরুতেই ফ্যাশনের ফিজিটাল হয়ে ওঠার যে কথা বলেছি তা একটা মরিয়া প্রচেষ্টা। মানুষ ঘরবন্দি, আয় কমেছে, বেড়েছে আর্থিক অনিশ্চয়তা। তার থেকে বড়ো কথা বাইরে বেরোলে আছে সংক্রমণের বিপদ। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ধাক্কায় সব অনুষ্ঠানই হচ্ছে নম নম করে। ফ্যাশন বলুন বা সাজপোশাক, দেখানোর জায়গাও কম। তবুও মানুষের ভাবনা থেমে নেই। এই কোয়ারেন্টিন কালে আসছে সময় আর পরিস্থিতির উপযোগী পোশাকের নতুন ডিজাইন।



    কারণ মানুষ চরিত্রগতভাবে বৈচিত্র্যবিলাসী, বাঁধা গণ্ডি থেকে বেরোতে চায় সে। বাধ্যতামূলকভাবে ঘরে থাকতে হচ্ছে বলে সে এখন ঘরের পোশাকে আনতে চাইছে বৈচিত্র। বস্ত্রশিল্প বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই সময়ে আমাদের দেশে লাউঞ্জওয়্যার মানে ঘরে পরার পোশাকের বিক্রি বেড়েছে ৭০ শতাংশ। বিক্রি বেড়েছে অ্যাক্টিভওয়্যারের। জগিং, ট্রেকিং, খেলাধুলার পোশাকের ব্যাপারে চলছে নতুন ভাবনাচিন্তা। ঘরের পোশাক হয়ে উঠছে আরও ছিমছাম, আরও কেতাদুরস্ত। কখনও বা একঘেয়েমি মুক্ত হওয়ার বাসনায় আরও রঙিন। এও তো এক নতুন স্বাভাবিকতা।

  • বিভাগ : অন্যান্য | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৬১৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সুনীশ দেব | 182.66.21.200 | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৮:৫১97163
  • আমাদের যাপনরীতিতে দুঃসময় কিছু বাধ্যতামূলক পরিবর্তনের ভগীরথ । কিভাবে অনিচ্ছুক জীবন তা সহনীয় করে রঞ্জনলিপিতে সে ইতিহাস বর্ণময় তার পুঙ্খানুপুঙ্খতায় । লেখাটি মনোরম এবং সময়ের দলিল । শুভেচ্ছা অনিঃশেষ ।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন