• টইপত্তর  নাটক

  •  তিনজন তালুকদারঃ একটি অলস সময়ের নাটক

    রঞ্জন
    নাটক | ০২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ২১৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • তিনজন তালুকদার
    প্রথম দৃশ্য
    (খালি মঞ্চে সেন্টার স্টেজে একটি বেঞ্চ পাতা।বাঁদিক থেকে ১ম অভিনেতা কাঁধে একটি ঝোলা, তুড়ি বাজিয়ে গান গাইতে গাইতে ঢুকে এক উইংস থেকে বিপরীত উইংস পর্যন্ত ফুটলাইটের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। তারপর ফিরে এসে সেন্টার স্টেজে বেঞ্চের উপর পত্রিকাটি পটকে দিয়ে দর্শকদের মুখোমুখি হয়।)

    ১ম: 'তালুকদারের ভালুক গেল শালুক খেতে পুকুরে,
    এমন সময় করল তাড়া মিশকালো এক কুকুরে।
    কুকুরটা যেই করল ধাওয়া,
    আর হল না শালুক খাওয়া,
    ছুটল ভালুক বাড়ির পানে সেদিন বেলা দুকুরে।'

    আচ্ছা, এই শীতের দুপুর পার্কে এসে একটু নিরিবিলিতে রোদ পোহাব, তারও জো নেই। এই অ্যাত্তোগুলো লোক এখানে তামাশা দেখতে হাজির হয়েছে।

    বলি, ও মশাইরা! আপনাদের কি আর খেয়েদেয়ে কোন কাজ নেই, দুপুরবেলা বাড়িতে চারাপোনার ঝোল দিয়ে দুটি খেয়ে নিয়ে কোথায় লেপমুড়ি দিয়ে ভাতঘুম দেবেন, তা নয়, পার্কে এসে ভিড় করেছেন।ঠিক আছে, ঠিক আছে, দুপুরে নাই ঘুমুলেন সর্দি হবে, মাথা ধরবে, তাই তো? তো টিভি খুলে সিরিয়াল দেখতে কে মানা করেছে! ও, আপনার ওসব পছন্দ নয়? কেন? ঘরে ঘরে আজকাল অমন শাস–বহু সিরিয়াল চলছে? বেশ তো, পুরনো বাংলা সিনেমা দেখুন না! উত্তম–সুচিত্রা? সাড়ে চুয়াত্তর, হারানো সুর, বিপাশা, সপ্তপদী, গূহদাহ।আর বিকেলে খেলা? ডার্বি? দূর মশাই! আপনাদের দেখছি কিছুতেই উৎসাহ নেই। সব অকালে বুড়িযে গেছেন।

    ও, গি্ন্নি এইসময় টিভি কব্জা করে বসে থাকেন? আচ্ছা, উনি নেই? বাপের বাড়ি গেছেন? কদ্দিনের জন্যে? কি বললেন? দশবছর হল? মানে? না না, ভেরি সরি। কী হয়েছিল বললেন? ক্যানসার? ভেরি সরি। কিন্তু টিভি? ও বৌমার কব্জায়?

    মশায় আপনি সিনিয়র সিটিজেন, আপনার জন্যে কোন কনসিডারেশন নেই?সিনিয়র সিটিজেনদের সবাই কনসিডার করে। সরকার পাবলিক সবাই। রেলে কনসেশন, বাসে স্পেশাল সিট, মেট্রো রেলেও।না, না। এ আপনার বৌমার ভারি অন্যায়!আপনি বুঝিয়ে বলুন। আর অবুঝ হলে ছেলেকে বলুন। আপনাকে একটা আলাদা টিভি করে দিক।

    ছেলে কী বলল? বেশি টিভি দেখা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল নয়? ডাক্তারে বলেছে? যত্তসব!

    না, না। খামোকা আপনার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিচ্ছি না। ভেরি সরি। কিন্তু আপনি নিজের জায়গা এত সহজে ছেড়ে দেবেন না। ছাড়তে ছাড়তে শেষে নিজের ঘর ছেড়ে বারান্দায় ঠাঁই হবে। বুঝলেন? আর শেষ কোথায় হবে কেউ জানে না।

    হয়ত বাড়ি ছেড়ে সরে পরতে হবে।

    কোথায়? কোথায় আবার? হয় বৃদ্ধাশ্রমে, নয় রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে।

    না না। আপনাকে অপমান করছি না। খালি বলছি -এত সহজে হার মেনে নেবেন না। কী করতে পারেন? অনেক কিছু।

    যেমন ধরুন, বৌমা যখন ওনার পছন্দের সিরিয়ালটি দেখতে বসবেন তখন আপনিও গিয়ে ওখানে চেয়ার টেনে বসে পড়বেন।

    বলবেন যে আপনিও ওই সিরিয়ালটি দেখতে এসেছেন। খুব প্রশংসা করবেন ওই সিরিয়ালের অল্পবয়সী নায়িকার। বলবেন-- এমন বৌমা যেন সবার ঘরে হয়। আর নিন্দেমন্দ করবেন সিরিয়ালের কুচক্কুরে শ্বাশুড়ি, খান্ডার ননদ এবং নিপাট ভালোমানুষ ন্যাকা শ্বশুরের।

    কী বলছেন? পারবেন না? লজ্জা করে? দূর মশাই, এই জন্যেই বাঙালীর কিছু হবে না। ঠাকুর বলে গেছেন-- লজ্জা, মান, ভয়; তিন থাকতে নয়।

    বিবেকানন্দ বুঝেছিলেন। তাই মার্গারেট নোবল নামের মেমসাহেবকে কোলকাতায় নিয়ে আসতে লজ্জা পান নি। ওসব ন্যাকামি ওনার ছিল না। বরানগর মঠের জন্যে ভিক্ষে করতে, থুড়ি মাধুকরীর জন্যে পথে বেরোতে মান-সম্মান গেল ভাবেন নি। আর ভয়? সে তো কবেই--। নইলে জাহাজে চড়ে বিদেশে গিয়ে বাঘা বাঘা সাহেবসুবোদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইংরিজিতে লেক্চার দেন?

    কী বললেন? ভাট বকছি! না মশাই, বৌমাকে আমার একনম্বর দাওয়াই দিয়ে দেখুন।সাতদিনের মধ্যে হাতে গরম রেজাল্ট! না পেলে আবার আমাকে কনসাল্ট করবেন, বিনে পয়সায়। প্রতি রোববার, দুপুরবেলা , এই পার্কে।

    ও হো হো! জানতে চান আমি এখানে কি করছি? আমার ওষুধ আমার বাড়িতেই কেন ফল দেয় নি? সে মশাই গুঢ় তত্ত্ব। এ'রকম চেঁচিয়ে বলা যাবে না। শুধু আপনাকে বলতে পারি। উঠে আসুন। হ্যাঁ, এদিক দিয়ে। দেখুন স্টেজের বাঁ পাশে ছোট্ট সিঁড়ি আছে। আর হ্যাঁ, লাইটের তার-টার গুলো একটু দেখে, নইলে গোটা স্টেজ অন্ধকার।

    হ্যাঁ, আসুন। এসে এই বেঞ্চে আমার পাশটিতে চুপটি করে বসুন। তারপর বলছি। আরে মশাই, অনেক জায়গা আছে।যদি হয় সুজন, তো তেঁতুল পাতায় ন'জন। আর এত বড় বেঞ্চ, খালিই পড়ে আছে।

    [দর্শকদের থেকে একজন মঞ্চে উঠে আসে]

    ২য়ঃ দেখুন মশাই, অনেক হয়েছে। তখন থেকে আপনার আগড়ম বাগড়ম শুনে যাচ্চি, এবার ঝেড়ে কাশুন দিকি! সবাই কে তো ঘরে থাকার ফর্মূলা ৪৪ দিচ্চেন, নিজে কী কচ্চেন? কথায় বলে না--আপনি আচরি ধম্মো!

    তা আপনাকে কে হুড়ো দিচ্চে? গিন্নি না বৌমা? গিন্নি?

    [১ম ইশারায় উপরের দিকে দেখায়]

    ও, আপনারো সেই দশা! তা আপনিও তো সিনিয়র সিটিজেন। সেই সিটিজেন'স চার্টার নিজের বাড়িতে অচল। এই সব বক্তিমে ছেলে-ছেলে বউকে শোনান না! সে ব্যাপারে লবডংকা!

    (দ্বিতীয়জন বেঞ্চিতে প্রথমজনের পাশে বসে পড়ে)

    কিচুই বুঝলাম না! আপনার মাথার ব্যামো নেই তো? অনেকক্ষণ পেটে কিচু পড়েনি বুঝি? বেচারা! চিনেবাদাম চলবে? আমার কাছে একটু বেঁচে আছে।

    ১মঃ আরে না মশাই। যা ভাবছেন তা একেবারেই নয়। বৌমা আমার খুব যত্ন করে। আমার খুঁটিনাটি খেয়াল রাখে। সকালে বেড-টি, বিস্কিট। রোজ নতুন নতুন জলখাবার। দশটায় মৌসুমী ফলটল। হরলিক্স। চানের সময় গরম জল।দুপুরে বাঁশকাঠি চালের ভাত। মাছের ঝোল। রোব্বারে মাংস। দুদিন অন্তর বিছানার চাদর বালিশের ওয়াড় পাল্টে দেওয়া। বিকেল সাড়ে চারটেয় ঘড়ি ধরে চা। সন্ধ্যেয় টিভিতে সিনেমা। আমার ঘরে আলাদা পোর্টেবল সেট। রাত্তিরে ঘড়ি ধরে শুতে পাঠায়, মশারি টাঙিয়ে দেয়।

    ২য়ঃ ডাক্তারের চেক আপ?

    ১মঃ প্রতি মাসে নিয়ম করে। ঘরে এসে প্রেসার চেক। ছ'মাসে সুগার কোলোস্টেরল টেস্ট, ইসিজি।

    ২য়ঃ ওব্বাবা! আপনি তো ভগোবানের বরপুত্তুর! আর বইপত্তর?

    ১মঃ হ্যাঁ, দুটো কাগজ।একটা ইংরিজি আর একটা বাংলা। দেশ পত্রিকা। পাড়ার লাইব্রেরির কার্ড। বৌমা নিজে গিয়ে বই বদলে আনে।

    ২য়ঃ উঃ! কালীদা গো কালীদা! আর পারি না। সবই বুঝলাম। এসব হল গতজন্মের পুণ্যি! এবার আপনার সিরিয়ালের টুইস্ট?

    ১মঃ টুইস্ট?

    ২য়ঃ হ্যাঁ মশাই। হর কহানী কে অন্ত মেঁ এক টুইস্ট হোতা হ্যায়। নইলে ঘরে এত যত্ন আত্তি ! তবু আপনি দুকুরবেলা এখানে বসে!

    ১মঃ বলছি, বলছি। গলাটা শুকিয়ে গেছে।আগে একটু ভিজিয়ে নিই।

    [সঙ্গের ঝোলার থেকে একটি জলের বোতল ও আনন্দবাজার পত্রিকা বের করে পত্রিকাটি ২য়ের হাতে ধরিয়ে দেয়, তারপর বোতল থেকে এক ঢোঁক খেয়ে তৃপ্তির শব্দ করে]

    ২য়ঃ (কিঞ্চিৎ বিরক্ত) কই মশাই, শুরু করুন।

    ১মঃ বলছি, বলছি। আপনাকে ছাড়া কাকে বলব? একজন কাউকে তো বলতেই হবে।

    ২য়ঃ ধেত্তেরি, যত ভ্যান্তারা। বুইতে পেরেচি, নজ্জা করচে! ছেলে পোঁচে না, ছেলেবৌ ভাত দেয় না! সেই হরিদাসের গুপ্তকতাটা আবার কানে কানে বলতে হবে! এদিকে দুনিয়ার পাবলিককে ফিরিতে জ্ঞানদান কচ্চে, যেন ক্লাবকে সরকারি ডোনেশন!

    আমি চল্লেম, তোমার দৌড় বোঝা গ্যাচে।

    বলি ' এতই তোর বুদ্ধি হলে,

    আজ কেন তোর ক্যাঁতা বগলে?' চল্লেম!

    [ ২য় পত্রিকাটি বেঞ্চের ওপর ছুঁড়ে ফেলতেই ১মজন হাঁ-হাঁ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওটা তুলে নেয়। ২য় একটু অপ্রস্তুত]

    কী আচে ওতে? কোন সাত রাজার ধন মাণিক?

    ১মঃ আরে ওটাই তো আসল! ওর জন্যেই তো এখানে আসা! ওটাকে অমন হতচ্ছেদ্দা করলে ধম্মে সইবে?

    ২য়ঃ আমি আবার কাকে হতচ্চেদ্দা করলাম?

    ১মঃ আরে এই পত্রিকাটা; এই রোববারের আনন্দবাজার! এর জন্যেই গোটা সপ্তাহ হা-পিত্যেশ করে বসে থাকি। এর জন্যেই চুপিচুপি দুপুরের রোদে পার্কে এসে বসি।

    ২য়ঃ মানে? নিজের ঘরে বসে আনন্দবাজার পড়তে পারেন না? আর এদিকে বড়ফট্টাই হচ্চে যে ছেলে-ছেলেবৌ আমায় চোকে হারায়? এমন ধ্যাষ্টামো--

    ১মঃ দূর মহায়! এই দেখুন 'পাত্রপাত্রী' কলমগুলো। এগুলো কখনো মন দিয়ে পড়েছেন?

    ২য়ঃ খামোকা কেন পড়তে যাবো? ছেলের পরে একটি মেয়ে ছিল। তা তিনি অফিসের মাদ্রাজি বসের সাথে রেজিস্ট্রি করে মুম্বাইয়ে ঘর বেঁধেছেন। বুড়ো বয়সে নাকের ডগায় চশমা ঝুলিয়ে রোববার রোববার ওই সব কলম দেখব আর লালকালিতে দাগাব, সে চান্সই দিলে না। আপনারও কি মেয়ের বিয়ে দেওয়া বাকি?

    ১মঃ আরে আমারও একই অবস্থা। এক ছেলে আর বৌমা। সে ইন্টারনেটে সার্চ করে ওদের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। আমি এগুলো দেখি নির্মল আনন্দের খোরাক বলে। শুনবেন নাকি দু-একটা স্যাম্পল?

    (খুলে পড়তে থাকে)

    এই যে, এটা দেখুন।

    'সুন্দরী ফর্সা শিক্ষিতা পাত্রীর জন্য কেঃ সঃ চাঃ/ রাঃসঃ চাঃ / বেঃ সঃ চাঃ পাত্র চাই।

    বা বেঃ সঃ নেশাহীন সুপাত্র কাম্য।

    ২য়ঃ এইসব কেঃ সঃ চাঃ/ রাঃসঃ চাঃ / বেঃ সঃ চাঃ কোডের মানে?

    ১মঃ তা ও জানেন না? কেন্দ্রীয় সরকারী চাকুরে/ রাজ্য সরকারি চাকুরে/ বেসরকারী চাকুরে।

    আরো দেখুন। কি পরিমাণে ডিভোর্সী কেস?

    এটা—ডিভোর্সী --- সন্তান নেই; এটা--শুধুই রেজিস্ট্রি, আইনে অসিদ্ধ, সোশ্যাল হয় নি।

    আর এটা-- সোশ্যাল ম্যারেজ হইয়াছিল। কিন্তু অষ্টমঙ্গলার পর হইতেই কন্যা পিতৃগৃহে; পতিসংসর্গ হয় নাই।

    ২য়ঃ উঃ থামুন তো! মাথা ধরিয়ে দিলেন। এইসব ফালতু জিনিস পড়তে আনন্দবাজার বগলে নিয়ে পার্কে আসেন? কেন? নিজের ঘরে বসে বৌমার দেওয়া চা অথবা ফলের রসে চুমুক দিতে দিতে--

    ১মঃ আরে সেটাই তো রহস্য। আস্তে আস্তে ভাঁজ খুলছি।তার আগে আরও কিছু স্যাম্পল দেখুন না!

    -- এই যে, উজ্বলশ্যামবর্ণা, ম্যাট্রিক পাস, গৃহকর্মনিপুণা, সম্ভ্রান্ত পূঃবঃ সম্ভ্রান্তবংশীয় সৌকালীন গোত্র, কায়স্থ। সুউপায়ী, সৎপাত্র কাম্য। পঃ বঃ চলিবে না। কী বুঝলেন? অমন হাঁ-মুখ দেখেই বুঝেছি, বোঝেন নি। শুনুন, বলছে বাঙাল কায়স্থ পড়াশোনায় লবডংকা, কালো মেয়ে। কুলীন কায়স্থ। তবে ছেলে ঘটি হলে চলবে না।

    -- -- আর এটা, সুন্দরী ফর্সা শিক্ষিত (অনধিক ২৫/২৬) পাত্রী চাই। পাত্র বিদেশে নামজাদা মালটিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত। শীঘ্র বিবাহ; কোন দাবিদাওয়া নাই। কেবল প্রকৃত সুন্দরীর অভিভাবকগণ ফোটো সহ আবেদন করুন।

    ২য়ঃ শালা, যেন চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়েছে।

    ১মঃ এটাকে কী বলবেন? পাত্র (৪০) কোলকাতার প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী স্বর্ণবণিক পরিবারের একমাত্র পুত্র। কলিকাতায় নিজস্ব বাড়ি আছে। মাসিক আয় (৪০০০০/-)। জাতিবন্ধন নাই। তবে চাকুরিরতা অথবা পূঃবঃ কাম্য নহে।

    ২য়ঃ ঢের হয়েছে। ক্ষ্যামা দিন; আর পারছি না।

    ১মঃ ব্যস্‌ ব্যস্‌; এই শেষ মণিমুক্তোঃ গরীব পরিবারের মেধাবী পুত্র। সম্পন্ন পরিবারের কানা/খোঁড়া বা যে কোন খুঁতসম্পন্ন কন্যাকে বিবাহ করিতে রাজি। ঘরজামাই প্রস্তাবেও আপত্তি নাই। অভিভাবকগণের অনুমতি আছে।

    ২য়ঃ ঘেন্না ধরে গেল।

    ১মঃ আমারও । দেখছেন? সমাজ কোন পথে চলেছে? সোজা অধঃপতন।

    ২য়ঃ খুব দেখছি, পতন তো অধঃই হয়; উর্দ্ধপতন বলে কিছু হয় কি?

    ১মঃ অ্যাই, কোন অশ্লীল কথা নয়; এটা ভদ্রলোকের পাড়া।

    ২য়ঃ অশ্লীল কথা কেউ বলেনি, আপনার নোংরা মন, তাই সাধারণ কথার বিকৃত মানে করছেন?

    ১মঃ কী বললেন? আমার নোংরা মন?

    ২য়ঃ নয়তো কি? নইলে কেউ এই বয়সে পার্কে বসে ঐসব অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স ঘাঁটে? বিকৃতরুচি!

    ১মঃ শুনুন মশাই; আমরা হলাম ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার সাজনপুর পরগণার তালুকদার ফ্যামিলি। সেই ইংরেজ আমল থেকে।আমাদের বংশে কেউ সরকার বাহাদুরের খাজনা বাকি রাখে নি। অনাবৃষ্টির বছরেও, ফসলের দাম পড়ে গেলেও। দশটা গাঁয়ে আমাদের সুনাম ছিল। চরিত্র নিয়ে কোন কথা উঠে নি। আর আপনি—

    ২য়ঃ সে কী! আপনিও তালুকদার? আমরাও তাই। তবে যশোরের নড়াইল এলাকার। খুঁজলে হয়ত লতায়-পাতায় একটা আত্মীয়তা বেরিয়ে পড়তেও পারে।

    ১মঃ না, পারে না। যশোর জেলায় কোন তালুকদার হতে পারে না। আপনারা নকল।

    ২য়ঃ কী আবোলতাবোল বকছেন? আমাদের পদবী তালুকদার পরাশর গোত্র। আপনি না-না করলেই হল? যত্ত কাঠবাঙালের গোঁ!

    ১মঃ আপনি ভুল বুঝছেন। আমাদের পদবী তালুকদার নয়। আমরা আসলে সাজনপুর পরগণার গোটা তালুকের মালিক। ডায়রেক্ট ইংরেজ সরকারকে খাজনা দেওয়া হত; তাই উপাধি তালুকদার। এ নিয়ে আজও আমাদের পরিবারের সবাই গর্বিত।

    ২য়ঃ এতে গর্বিত হওয়ার কী আছে?

    ১মঃ আরে, মাঝখানে কোন মিডলম্যান বা মধ্যসত্ত্বভোগী নেই। সোজা সরকার বাহাদুরকে খাজনা দেওয়া। কত্ত বড় সম্মান! আপনি এসব বুঝবেন না।

    ২য়ঃ কেন বুঝব না? আমাদের এক পূর্বপুরুষ ছিলেন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের আস্তাবলের সহিস। উনি একদিন ঘোড়ার একটা বাতিল জিন থেকে একটুখানি চামড়া আর রবারের টুকরো কেটে নিয়ে গুলতি বানিয়ে নাতিকে দিয়েছিলেন। তো ধরা পড়ে যান। তখন ম্যজিস্ট্রেট বাহাদুর তাঁকে কাছারিতে ডেকে এনে সবার সামনে হান্টার দিয়ে চাবকে ছিলেন। সেই ঘা শুকোতে অনেক দিন লেগেছিল। আজও আমরা প্রপিতামহের পিঠে সেই চাবুকের দাগ নিয়ে গর্ব অনুভব করি।

    ১মঃ এসব কী ভাট বকছেন? সাহেব কষে চাবকেছে তো গর্বিত হওয়ার কী আছে?

    ২য়ঃ সায়েব সবার সামনে জামা খুলিয়ে নিয়ে নিজের হাতে চাবকেছে। ডায়রেক্ট! মাঝখানে কোন মিডলম্যান ছিল না। অত্যন্ত গর্বের ব্যাপার। আপনি বুঝবেন না।

    ১মঃ ঠাট্টা করছেন? সে করুন গে। কিন্তু আপনাদের তালুক কেন, নিজের বলতে বোধহয় এক ছটাক জমিও ছিল না। আমাদের গোটা একটা পরগণা।

    ২য়ঃ হয়তো ছিল, হয়তো ছিল না। কিন্তু আপনাদের সেই তালুকও তো 'ছিল', এখন 'নেই'। এখন আপনি হরিদাস পাল ছেলেবৌমার চিড়িয়াখানা থেকে পালিয়ে এখানে পার্কে পত্রিকা পড়ছেন। কাজেই আমিই আসল তালুকদার, ওটাই আমার পদবি; আপনি নকল।

    ১মঃ ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনিই ঠিক। আমিই ভুল। আসুন আমরা মিটমাট করে নেই।

    (হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু ২য় দু'পা পিছিয়ে যায়)

    কী হল?

    ২য়ঃ না মানে আমি কোলাকুলি করি না।

    ১মঃ সে কী, বিজয়দশমী বা ঈদের দিনেও না?

    ২য়ঃ না; আমার ওইসব জাদুই ঝাপ্পি দেওয়া নিয়ে একটু রিজার্ভেশন আছে।

    ১মঃ আচ্ছ? কারণটা বলতে আপত্তি আছে?

    ২য়ঃ না, মানে ছোটবেলায় রামকৃষ্ণ মিশনে কংসবধ পালা দেখেছিলাম। সেখানে নিজের পিতাকে কেন বন্দী করেছে সেটা খোলসা করতে গিয়ে কংস বলছে যে আসলে ওর বাপ কোন দৈত্য। সে ব্যাটা ভরবিকেলে কোন উদ্যানে গিয়ে কংসের মাকে একা পেয়ে আলিঙ্গন করল, আর তার ফলে কংসের জন্ম হল। তখন থেকেই আমার মনে কোলাকুলি নিয়ে কেমন ভয় ধরে গেছে।

    ১মঃ ধ্যাত্তেরি! আপনি বা্চ্চা নাকি? ওসব তো রূপক বা মিথ। সাহিত্যে বোঝাতে গেলে--।

    ২য়ঃ আমিও সাহিত্যে এম এ। তবে ইংরেজিতে। বুঝি সবই। তবে বলা তো যায় না। যদি কিছু হয়ে যায়। এটা ভারতবর্ষ।

    ১মঃ আপনিও আজব লোক মশাই। অবশ্যি তালুকদারেরা ও'রম একটু হয়েই থাকে। তো শেকহ্যান্ড করতে তো কোন আপত্তি নেই?

    ২য়ঃ তা নেই। কিন্তু আগে আপনি বলুন ঘরে বসে কেন পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপন পড়তে পারেন না? কেন ঝোলায় পুরে পার্কে এসে পড়তে হয়?

    ১মঃ (মাথা চুলকে) উপায় নেই। নিজের ঘরে সারাক্ষণ হয় বৌমা নয় ছেলে আমাকে চোখে চোখে রাখে।

    বাবা, এবার একটু বেদানা, এই দু'কুচি আপেল, এবার মুরগির আংসের স্টু! আচ্ছা বাবা , আগের বইটা মানে নারায়ণ সান্যাল আপনার পড়া হয়ে গেছে? আজকে বদলে দিছি। জরাসন্ধ পড়বেন?

    উঃ হাঁপিয়ে উঠেছি। যেন চিড়িয়াখানায় বাঘকে খাঁচায় ঢুকিয়ে যত্ন আত্তি করা হচ্ছে। আমাদের বাড়িতে কোন বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজন আসে না। কার সঙ্গে মনের কথা বলব।

    ২য়ঃ তা আপেল বেদানা মুর্গীর ঠ্যাং চিবুতে চিবুতেই না হয় রোববারের আনন্দবাজার পড়তেন; প্রবলেম কোথায়?

    ১মঃ ওই পাত্রপাত্রীর পাতাটা খুলতে দেখলেই ওদের মাথা খারাপ হয়ে যায়।তক্ষুণি শুরু হবে ঘ্যানঘ্যান।

    (নকল করে)-বাবা, আমরা কি আপনার যত্ন আত্তি করি না? তবে কেন ঐসব ছাইপাঁশ পড়েন?

    - বল বাবা, তোমায় ঠিক করে খেতে পরতে দিই না?

    ২য়ঃ মানে?

    ১মঃ মানে ওরা ভাবে আমি বুড়ো বয়সে আবার বিয়ে করতে চাই; নিদেন পক্ষে সঙ্গী খুঁজছি। ভয় পায়, যদি উইল বদলে ফেলি, যদি বাড়ি আর ব্যাংক ব্যালান্স কোনো উড়ে এসে জুড়ে বসা শাকচুন্নি হাতিয়ে ফেলে?

    কত বুঝিয়েছি যে আমি এই বয়সে আবার ছাঁদনাতলায় যাওয়ার চক্করে নেই; কিন্তু ভবি ভোলে না।তাই লুকিয়ে পার্কে এসে পড়ে নেওয়া ছাড়া কোন রাস্তা নেই।

    ২য়ঃ উই আর ইন দ্য সেম বোট ব্রাদার!

    এবার হাত মেলাতে পারি। আমাদের তালুকদার ক্লাবে আপাততঃ দুজন সদস্য--আমি নামে তালুকদার, আপনি কামে তালুকদার।

    ১মঃ তাহলে আমি তালুকদার নম্বর এক; আপনি দুই। না না, রেগে যাবেন না। আপনাকে দুনম্বরি বলছি না।(ঘড়ি দেখে)

    এই রে, চারটে বেজে গেছে। আমায় বাড়ি ফিরতে হবে। নইলে বৌমা চিন্তা করবে। ও আবার ঘড়ি ধরে সাড়ে চারটেয় চা দেয় কি না! আর আপনিও বাড়ি যান। গিয়ে আমার দাওয়াই নম্বর এক প্রয়োগ করুন। আর সাতদিন পরে রোববার দুপুরে এসে আমাকে প্রগ্রেস রিপোর্ট করুন।

    ২য়ঃ (দর্শকদের) আপনারাও আসুন, নতুন ফর্মূলা শিখতে, আগামী রোববার দুপুর দুটোয় ঠিক এই খানে।


    দ্বিতীয় দৃশ্য
    ===========
    [পার্কের বেঞ্চিতে বসে ১ম ও ২য় খোসগল্পে মেতে আছে]

    ১মঃ বাঃ, আপনি তো হেভি অ্যাক্টিং করতে পারেন মশাই! তা আপনার ডায়লগ শুনে বৌমা কী বললে?

    ২য়ঃ ও প্রথমে চোখ গোল গোল করে খানিকক্ষণ আমাকে দেখল। তারপর একটা মোড়া টেনে কাছে এসে বলল-- না বাবা, এই সিরিয়ালে শ্বশুর তেমন একটা ন্যালাক্যাবলা নয়, এক সপ্তাহ নিয়মিত দেখলে বুঝতে পারবেন। ও'রকম শ্বশুর আছে রাত ন'টার সিরিয়ালে--নামটা হল "চরকা কাটে চাঁদের বুড়ি" । সেটায় শাশুড়ি খুব ভাল। বৌটা নানান প্যাঁচ কষে, দিনভর গুজগুজ ফুসফুস করে দেওরের মাথা খায়, কু'মন্তর দেয়। আর শাশুড়ির ক্ষুরধার বুদ্ধি , ঠান্ডা মাথা; বৌটার সব প্যাঁচ মাঞ্জা দিয়ে ঢিল ছেড়ে খেলার মত করে খেলিয়ে কুচ কুচ করে কেটে দেয়। দেখবেন নাকি বাবা?

    আমি মাথা হেলিয়ে সায় দেওয়ায় নাচ- বোলিয়ে স্টেপে রান্নাঘরে গিয়ে দু'কাপ গ্রিনলেভেল লিপটন চা নিয়ে এল।

    ১মঃ মার দিয়া কেল্লা!

    ২য়ঃ এবার?

    ১মঃ এবার দুনম্বর ফর্মূলা। আপনাকে একসপ্তাহ পরে বলতে হবে--বৌমা, তুমি যখন ব্যস্ত থাক, মানে টুকুনকে স্কুলে ছাড়তে গেলে, আনতে গেলে, কি পার্লারে গেলে--তখন যদি আমি বাংলা বা ইংরেজি খবরের চ্যানেলগুলো বা ফুটবল ক্রিকেট টেনিস একটু দেখি, তো আপত্তি আছে? তবে তুমি আসলেই আমি রিমোট ফেরত দিয়ে দেব। আর যখন রিয়েলিটি শো হবে, যেমন মাধা-গাধা-নিসা বা ধিতাং ধিতাং বোলে-- তখন তো অন্য কিছু দেখার প্রশ্নই ওঠে না, কী বল?

    ২য়ঃ তাতে আমার কোন মোক্ষলাভ হবে?

    ১মঃ হবে, হবে। আগামী দুটো রোববার ছেড়ে তিননম্বর রোববারে এই পার্কে এসে আমাকে রিপোর্ট করবেন। আরে আমার ওপর ভরসা রাখুন। বিশ্বাসে মিলয়ে কৃষ্ণ।

    ২য়ঃ ইয়েস, এইভাবে চললে লাইফ একদম হলিউড জলিগুড হয়ে যাবে। থ্রি চিয়ার্স ফর তালুকদার ক্লাব- (একসঙ্গে) হিপ -হিপ-হুররে!

    (দুজনে হাসিমুখে উঠে দাঁড়ায়। হাত ধরাধরি করে নাচতে থাকে।)

    "আমরা দু'টি ভাই, শিবের গাজন গাই,

    একটি-দুটি পয়সা পেলে বাড়ি চলে যাই।

    আমরা দু'টি ভাই---"।

    (হঠাৎ বেঞ্চির পেছন থেকে কেউ চেঁচিয়ে ওঠে-- " ফাউল! ফাউল! দুই নয় তিন; থ্রি মাস্কেটিয়ার্স"!  সেই শুনে দুই তালুকদার চমকে উঠে প্রায় ভিরমি খায় আর কি! তারপর দুজনে বেঞ্চির পেছনে উঁকি মেরে দেখতে থাকে এই চিৎকারের উৎস কোথায়! এমন সময় বেঞ্চির পেছন থেকে উঠে দাঁড়ায় আরেক জন। তালুকদার নম্বর তিন। সে উঠে হাই তোলে, আড়মোড়া ভাঙে, তারপর হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দেয়। দুজনের কেউই হাত মেলায় না, এক পা পিছিয়ে আসে।)

    ১মঃ অমন বিচ্ছিরি ফাউল-ফাউল চিৎকার কি আপনার?

    ৩য়ঃ আজ্ঞে হ্যাঁ।

    ২য়ঃ নিকুচি করেছে ‘আজ্ঞে-আপনির’। কেমন ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন জানেন? যদি হার্ট অ্যাটাক হত?

    ১মঃ আগে বলুন, চেঁচালেন কেন?

    ৩য়ঃ সরি সরি! আসলে আপনারা ভুল বললেন না, তাই।

    ১মঃ কী ভুল?

    ৩য়ঃ ওই যে বললেন--দুই তালুকদার, সেটা তো ভুল।

    ২য়ঃ কীসের ভুল?

    ৩য়ঃ আরে দুই নয়, তিন হবে, তিন তালুকদার।

    ২য়ঃ অ! তা সেই তিননম্বর শ্রীমান কখন আবির্ভূত হবেন?

    ৩য়ঃ এই যে, আপনাদের সামনে জলজ্যান্ত দাঁড়িয়ে আছি; তালুকদার নম্বর থ্রি। আমাকে তালুকদার ক্লাবে নেবেন না?

    ১মঃ ইয়ার্কি হচ্ছে? আপনিও তালুকদার! কোথাকার?

    ৩য়ঃ আজ্ঞে, আমি কবি তালুকদার। কোথাকার জানিনা।জন্ম থেকে কোলকাতার।

    ২য়ঃ এটা কোন নাম হল?

    ৩য়ঃ কেন নয়? বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত গায়কের নাম যদি কবি মজুমদার হয়, সেই যে " যৌবন-সরসী নীরে" গাওয়া--তো আমি তো কবিতা লিখি-- আমাকে কবি তালুকদার বলে মেনে নিতে আপত্তি কেন?

    ১মঃ আপনি কবিতা লেখেন?

    ৩য়ঃ এই একটু আধটু; শুনবেন নাকি?

    ২য়ঃ সে শুনবো'খন। তার আগে বলুন তো, আপনি কোত্থেকে উদয় হলেন?

    ১মঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ; আর আড়ি পেতে আমাদের কথা শুনছিলেন কেন?

    ৩য়ঃ না ঠিক আড়ি পাতি নি। অনেক আগেই বেঞ্চির উপর ওই কৃষ্ণচুড়া গাছের ছায়া দেখে ওর পেছনে, মানে মাটিতে হেলান দিয়ে বসেছিলাম। তারপর কখন যে চোখ লেগে গেছল আর আমি গড়িয়ে প্রায় ওর নীচে ঢুকে পড়েছিলাম টেরই পাইনি।

    ১মঃ এই যে, কেন মিথ্যে কথা বলছেন বলুন তো? আমাদের কথা কান পেতে না শুনলে কী করে ঠিক সময় দুয়ের জায়গায় তিন তালুকদার বলে অমন চেঁচিয়ে উঠলেন? ঊঃ, পিলে চমকে গেছল মাইরি!

    ৩য়ঃ সরি, সরি! আসলে কাল সারারাত ঘুম আসে নি। তাই এখানে গাছের ছায়ায় ঝিরঝিরে বাতাসে চোখ বুজে গেছল। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। কানে এল আপনাদের কথাবার্তা। তখন মনে হল আরে আমিও তো তালুকদার, নকল নয়,পৈতৃক পদবি। তো আপনাদের সঙ্গে দোস্তি করলে কেমন হয়? একেবারে থ্রি মাস্কেটিয়ার্স!

    ২য়ঃ এঃ, একেবারে থ্রি মাস্কেটিয়ার্স! ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার। তবু স্বপ্ন দেখা চাই।

    ৩য়ঃ ঠিক তাই; স্বপ্ন তো দেখতেই হবে। স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

    ২য়ঃ ওরে বাবা, স্বপ্নগুলোকে! একটা স্বপ্নকে নিয়েই কত ঝামেলা। আর এতগুলো স্বপ্ন? কী লোক মাইরি আপনি।

    ৩য়ঃ কেন আপনার আমার সবার স্বপ্ন। আলাদা আলাদা স্বপ্ন। আপনি কোন স্বপ্ন দেখেন না? নিশ্চয়ই দেখেন।

    ১মঃ এত জোর দিয়ে বলছেন কী করে? আমাদের আপনি কতটুকু চেনেন?

    ৩য়ঃ আপনারা বেঁচে আছেন যে! তার মানে আপনাদের স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয় নি। সবচেয়ে দুর্ভাগা সে যার কোন স্বপ্ন নেই। সে আসলে বেঁচে নেই। মুশকিলটা এই -- সে নিজেও জানে না যে কবে মরে গেছে।

    ২য়ঃ ও! সে নিজে জানে না বেঁচে আছে কী মরে? অথচ আপনি জানেন! আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পড়া গেছে।

    ৩য়ঃ ঠিক তাই; ও জানে না, কিন্তু আমি জানি ও কবে মারা গেছে।

    ২য়ঃ বেশ, বলে ফেলুন ও কবে মারা গেছে। ঢ্যামনামি!

    ১মঃ কী হল মশাই, বলুন। কবে?

    ৩য়ঃ যেদিন থেকে ও স্বপ্ন দেখা ছেড়েছে।

    ২য়ঃ এটা কোন উত্তর হল?

    ৩য়ঃ কেন নয়?

    ২য়ঃ আমি জিগ্যেস করলাম-- কবে ভাল হব ডাক্তারবাবু? উনি জবাব দিলেন-- যে দিন অসুখ সেরে যাবে। ক্লাসে স্যারকে জিগ্যেস করলাম-- কাগজ সহজে পুড়ে যায় কেন? উত্তর পেলাম-- কাগজ হল দাহ্য পদার্থ।

    বোঝ ঠ্যালা। আরে দাহ্য পদার্থ মানেই তো যেটা সহজে পোড়ে! তেমনি আপনার কথা। স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিলে মানুষ মরে যায়।

    বেশ! অমুক কবে মরেছে? যেদিন ও স্বপ্ন দেখা ছেড়েছে। এগুলো কোন উত্তর নয়।শুধু প্রশ্নটাকেই ঘুরিয়ে বলা। লজিকের ভাষায়--; নাঃ থাকগে।

    ৩য়ঃ কী হল, বলুন--লজিকের ভাষায়? (উত্তেজিত হয়ে আঙুল তুলে) হ্যাঁ, থামবেন না, থামতে নেই। বলুন--লজিকের ভাষায় এদের বলে--?

    ২য়ঃ (নীচু গলায়)সার্কুলার রিজনিং। ফ্যালাসি। প্রশ্নটাকেই ঘুরিয়ে উত্তর বলে চালিয়ে দেওয়া- প্রমাণ নয়, প্রমাণের ভড়ং।

    ৩য়ঃ আপনি লজিক পড়েছেন?

    ২য়ঃ (নীচু গলায়) পড়াতাম। গাঁয়ের স্কুলে। আমার পাশের গাঁয়ে।

    ৩য়ঃ এটাই আপনার স্বপ্ন ছিল?

    ২য়ঃ (নীচু গলায়) হ্যাঁ, মানে না। আমি ফিলজফি পড়ে ভাবলাম সবার লজিক শেখা উচিত। সবার। চাষী, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবি, আমলা, মন্ত্রী, দলগুলো--সবার।

    ১মঃ তাতে কী কচুপোড়া হত?

    ২য়ঃ বিশ্বাস করতাম --সবাই যদি লজিক্যালি ভাবতে শেখে তাহলে নিজেদের ভুল বা কুযুক্তিগুলো বুঝতে পারবে। খামোকা এঁড়ে তক্কো, গাজোয়ারি বন্ধ হবে। লোকে ভাল থাকতে শিখবে।

    ১মঃ কেমন করে?

    ২য়ঃ সবাই লজিক দিয়ে দেখলে তো একই সিদ্ধান্তে পৌঁছবে, তাই না?

    ৩য়ঃ তারপর?

    ২য়ঃ দিনে দিনে লজিকের ছাত্র কমতে লাগল। এটা পড়ে ছেলেপুলেদের কী লাভ হবে, কী রকম রোজগারপাতি হবে সেটা অভিভাবকদের বোঝাতে পারি নি।

    ১মঃ শেষে কী হল?

    ২য়ঃ কী আর হবে, একদিন স্কুল কমিটি আমাকে একমাসের আগাম মাইনে দিয়ে নোটিস ধরিয়ে দিল। ওদের দোষ নেই। কাছাকাছি দশটা গাঁয়ে কোন স্কুলে লজিক পড়ানো হয় না।

    ৩য়ঃ তাতে আপনার স্বপ্ন দেখা থেমে গেল?

    ১মঃ না, থামে নি তো! নইলে কি উনি সার্কুলার লজিক আর ফ্যালাসি বলে রেফারির মত হুইসল্‌ বাজাতে পারতেন?

    ২য়ঃ এখন একটাই স্বপ্ন, ছেলে-বৌমার থেকে একটু ভাল ব্যবহার , নিদেন পক্ষে সংসারে একটু স্পেস, অর্থাৎ বলতে চাই-- আমাকে আমার মত থাকতে দাও!

    ৩য়ঃ সে নিয়ে পরে কথা হবে 'খন। আগে বলুন--!

    ১মঃ (৩য়ের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) না, এসব ভ্যান্তারা অনেক হয়েছে। আগে আপনি মশাই আপনার কবিতা শোনান। শুনে ঠিক করব আপনাকে তালুকদার ক্লাবের মেম্বারশিপ দেয়া হবে কী না?

    ৩য়ঃ নইলে?

    ২য়ঃ নইলে রইলে, পার্কে ঘুমনো ফোতো কবি হয়ে।

    ৩য়ঃ আচ্ছা বেশ, কি'রকম কবিতা শুনতে চান, যদি বলেন।

    ১মঃ এ আবার কী? কবিতা মানে কবিতা, ভালো কবিতা।এটা কি বাজারে মাছ কিনতে আসা? ছোট না বড়, টাটকা না পচা?

    ৩য়ঃ কবিতা নানা রকমের হতে পারে। অ্যাবস্ট্রাকট ছবির মত, ল্যান্ডস্কেপের বা ক্ল্যাসিক্যাল গানের মত।

    ২য়ঃ আচ্ছা, তাহলে ফোক সংয়ের মত বা সিনেমার পোস্টারের মত?

    ১মঃ বা দাদের মলমের বিজ্ঞাপনের মত,

    ২য়ঃ বিনা ছুরিকাঁচি অপারেশনের হ্যান্ডবিলের মত?

    ৩য়ঃ হ্যাঁ; সবই হতে পারে। তবে এই শতকের কবিতা অনেকটাই ব্যক্তিগত সংলাপ।

    ১মঃ অথবা প্রলাপ।

    ২য়ঃ আচ্ছা কথা কাটাকাটি থাক। আপনি ভাই স্যাম্পল পেশ করুন।

    ৩য়ঃ প্রথমে ধরুন--ল্যান্ডস্কেপের মত কবিতা।

    " শরৎকাল
    ব্যাঙের লাফ
    টুপ্‌ করে শব্দ।"

    ১মঃ তারপর?

    ৩য়ঃ তার আর পর নেই। এটি জাপানী হাইকু, ওইটুকুই হয়।

    ১মঃ হাইকু কেন, বলুন জাপানি হারাকিরি। কবিতার আত্মহত্যা।

    ৩য়ঃ আপনি কবিতাটি শুনে চোখ বুজে ধ্যান করুন, দেখতে পাবেন শরতের দুপুর। নির্জন। নিস্তরঙ্গ পুকুরের স্থির জলে একটি ব্যাঙ লাফ দিল। এমনই শান্ত পরিবেশ যে ঈথারে আওয়াজ উঠল-- টুপ্‌!

    ২য়ঃ এটাকে কোন গন্ডমূর্খ কবিতা বলবে?

    ৩য়ঃ রবীন্দ্রনাথ; নিজেই অনুবাদ করেছেন।

    ১মঃ মানছি না, মানবো না। রবি ঠাকুর বললেও না।

    ৩য়ঃ কে মানতে বলছে? বললাম তো কবিতা ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয়। একজন মানলেও অন্যে না মানতেই পারে।

    এটা দেখুনঃ

    " সূর্য ব্যাটা বুর্জোয়া যে দুর্যোধনের ভাই,
    গর্জনে তার তূর্য বাজে, তর্জনে ভয় পাই"।

    ১ম ও ২য়ঃ হ্যাঁ , হ্যাঁ, এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। কেমন ছন্দ-মিল ও অলংকার। আর বুর্জোয়ার মুন্ডপাত করায় বেশ বিপ্লবী বিপ্লবী মনে হচ্ছে।

    ৩য়ঃ কিন্তু এটা কবিতা হয় নি, শুধু বাইরের খোলসটা আছে।

    ১মঃ কোন শালা বলে?

    ৩য়ঃ কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্কোত্তি মশায় লিখেছেন।

    (১ম ও ২য় বেশ ঘাবড়ে গেছে।)

    ২য়ঃ আচ্ছা, কবিতা চর্চা থাক। আগে বলুন কাল গোটা রাত্তির ঘুমোন নি কেন?

    ৩য়ঃ আজ্ঞে কবিতা লিখছিলুম।

    ১মঃ গুল! একটা কবিতা লিখতে সারারাত জাগতে হয়? সে তো লক্ষ্মী আসবেন বলে কোজাগরী পূর্ণিমায়। সরস্বতীর জন্যেও এত?

    ৩য়ঃ নইলে উনি ধরা দেন না যে।

    ১মঃ দূর মশাই; কোন খাঁটি তালুকদার এমন বোকামি করে না।

    ২য়ঃ ঠিক আছে; ওই কবিতাটাই শুনিয়ে দিন।

    ১মঃ এই শেষ- হ্যাঁ। এটা শুনেই ঠিক করব আপনাকে নেব কি না! বেশ খেলিয়ে সুর করে পড়ুন দিকি।

    ৩য়ঃ (গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করে)

    আমার যা কিছু প্রতিরোধ ভেঙে দিয়ে
    কবিতা ছুঁয়েছে স্বপ্নের বাতিঘর।
    খড়কুটো নিয়ে বুকেতে বেঁধেছে বাসা,
    কবিতা--আমার আড়াইটে অক্ষর।
    আড়াই আখরে যে প্রেম দিল না ধরা,
    কবিতা যে তার গোপন দীর্ঘশ্বাস।
    মাঝরাত্তিরে জানলায় দিয়ে টোকা,
    করল আমার চরম সর্বনাশ।

    হঠাৎ কখন অকালবৈশাখীর
    তান্ডবে ঘরে ঢোকে দুরন্ত হাওয়া,
    এক ফুৎকারে নিভিয়ে ঘরের বাতি
    শুরু হয়ে যায় কবিতার আসা যাওয়া।"

    ১মঃ ব্যস্‌ ব্যস-; আর পড়ার দরকার নেই। বেশ পছন্দ হল। আপনাকে মেম্বার করে নিলাম। তালুকদার নম্বর তিন!

    ২য়ঃ আপনি কবিতাটা বুঝতে পেরেছেন?

    ৩য়ঃ কবিতা তো বুঝবার জন্যে নয়, বাজবার জন্যে।

    ২য়ঃ আঃ, পন্ডিতি করা ছাড়ুন তো!(১ম কে) কী বুঝলেন, আমাকে বুঝিয়ে দিন।

    ১মঃ (লজ্জা লজ্জা মুখ করে) তেমন কঠিন তো লাগল না। কবিতা হচ্ছে ওনার স্বপ্ন বা স্বপ্নসুন্দরী।

    ৩য়ঃ বাঃ! তারপর?

    ১মঃ কিন্তু গোটা কবিতাটা কিরম অসইব্য মত। কবিতা বলে মেয়েটি, যাকে নিয়ে আপনি স্বপ্ন দেখেন- সে রাত্তিরে এসে আপনার জানলায় টোকা দিয়ে দরজা খোলা্চ্ছে। তারপর দমকা হাওয়ার মত ঘরে ঢুকে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দিচ্ছে! আর বলতে পারব না।এমন লজ্জা পাওয়ার মত কবিতা লেখেন কেন?

    ২য়ঃ (৩য়কে) ঠিক আছে?

    ৩য়ঃ বললাম তো, কবিতায় ঠিক ভুল বলে কিছু হয় না। এটাও একটা ইন্টারপ্রিটেশন হতে পারে। আসলে কবিতা তো পাঠের পরে পাঠকের মনে তৈরি হয়।

    ১মঃ ওরে বাবা! আপনি তো দেখছি মহা গুরুঘন্টাল! আচ্ছা, আপনার কোনটা পছন্দ?

    ৩য়ঃ মানে?

    ১মঃ মানে এই গাঁজা, ভাঙ, চরস, এলএসডি।

    ৩য়ঃ হঠাৎ এরকম প্রশ্ন?

    ১মঃ রাগ কইরেন না। মিনিমাম নেসাসারি কৌতূহল, স্যার।

    সবাই জানে উঁচুদরের কবিতা লিখতে গেলে ব্যোমভোলে বলে একটু ওইসব সেবন না করলে হয় না। মানে নেশার সিঁড়ি বেয়ে তুরীয় মার্গে পৌঁছুলে তবেই দিনের বেলা গোলাপী হাতি দেখা যায়।

    ৩য়ঃ আচ্ছা, তাহলে কবিতা লেখা আর গোলাপী হাতি দেখা একই জিনিস?

    ২য়ঃ মেটাফর স্যার , মেটাফর। আসলে কবিরা মাটির থেকে দেড় ইঞ্চি উঁচুতে উঠে নিজের একান্ত ভুবন তৈরি করেন তো! তাই বলছিলাম কী--!

    ৩য়ঃ দেখুন, আমার ব্যাগে একটু ভোদকা আছে, ইম্পোর্টেড। চলবে?

    ২য়ঃ না মশাই। আমি ওসব ছুঁই নে। বুড়ো বয়সে অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে বৌমার কাছে এখনও যতটুকু ইজ্জত আছে তা খোয়াব নাকি?

    ৩য়ঃ কিছু হবে না। এ আপনার দেশি চোলাই বা ধেনো নয়। কোনো উগ্র গন্ধ নেই। মৌরি চিবিয়ে বাড়ি যাবেন। কিস্যু হবে না।

    ২য়ঃ বলছেন?

    ৩য়ঃ আরে মশাই গ্র্যান্টি দিচ্ছি।

    ২য়ঃ না থাক।

    ১মঃ আমি রাজি। সোজা গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ব, ব্যস।

    ৩য়ঃ (ঝোলা থেকে একটি জলের বোতল বের করে, আর চানাচুরের প্যাকেট)। নিন, দুগ্গা বলে শুরু করুন। বোতলের ঢাকনা দিয়ে আলগা করে খাবেন, ব্যস।

    (১ম শুরু করে)।

    ব্যস্‌,আপনিই বা বাদ যাবেন কেন? একযাত্রায় পৃথক ফল? কাম অন্‌! বী এ স্পোর্ট্‌!

    ২য়ঃ কী জানেন! অনেক আগের কথা। ছেলেটা কলেজে পড়ছে। মেয়েটা ইস্কুলে। স্কুল কমিটি আমাকে সদ্য সদ্য একমাসের আগাম মাইনে আর প্রেমপত্র ধরিয়েছে। আমি বাড়ি না ফিরে ফুটবল মাঠের পাশে বসেছিলাম। হিন্দি টিচার, গেম টিচার আর কারিগরি শিক্ষার টিচারের সঙ্গে। সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে। ছেলেরা সব ঘরে ফিরে গেছে। ওরা বলল মন খারাপ কর না। দুঃখকে ভুলে সামনে দেখ। ঠাকুর ঠিক পথ বাতলাবেন। হিন্দি টিচার বলল- হাঁ ইয়ার, ইস গম কো মার ডালো। বুঝতেই পারছেন, ওদের কথায় ভেসে গেলাম। অভ্যেস নেই। নেশা হয়ে গেল। ওরা ধরে ধরে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিল।

    ৩য়ঃ তারপর?

    ২য়ঃ তারপর যা হল সে আর বলার মত নয়।

    ১মঃ তালুকদারদের কাছে কিছু লুকোতে নেই। বলে ফেলুন।

    ২য়ঃ আমার গিন্নির সে কী রণচন্ডী মূর্তি! শুধু তাই নয়, ছেলেমেয়ে দুটোকে উসকে দিল। ওরা চেঁচাতে লাগল-- বাবা, তুমি মুত্‌ খেয়েছ, মুত খেয়েছ। আমাদের ফ্যামিলির নাক কেটেছ। এত কষ্ট পেয়েছিলাম--আর ছুঁই নি।

    ১মঃ তাতে লাভটা কী হয়েছে? এবার বিদ্রোহ করুন। ছেলে ছেলে-বৌ কিছু বললে বলবেন--বেশ করেছি। নিজের জমা পয়সায় খেয়েছি। আমাকে আমার মত থাকতে দাও। বাড়াবাড়ি করলে দুই তালুকদার এসে তোমাদের ক্লাস নেবে।

    ৩য়ঃ হিয়ার! হিয়ার! থ্রি চিয়ার্স ফর ক্লাব তালুকদার। থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের মটো মনে আছে তো?

    ২য়ঃ হ্যাঁ, ওয়ান ফর অল।

    ১ম ও ৩য় (একসঙ্গে): অল ফর ওয়ান।

    ২য়ঃ (হাসে) দেখবেন, নেশা টেশা হবে না তো?

    ৩য়ঃ কিস্যু হবে না। হলে আমরা আপনাকে সেই ধরে ধরে বাড়ি পৌঁছে দেব।

    (সবাই হাসে। খাওয়া শুরু হয়)

    ১মঃ বেশ ফুরফুরে লাগছে। একটা গান গাই?

    ২য়ঃ এই না না; পাবলিক প্লেসে বসে আছেন। আপনার বোধহয় নেশা হচ্ছে।

    ১মঃ তাহলে একটা কবিতা শোনাই? বাংলা হাইকু? ল্যান্ডস্কেপ?

    “গাছের ডালে বসে একজোড়া পাখি।

    একটা এদিকে উড়ে গেল

    আর একটা ওদিকে।“

    দেখলেন তো? আমার নেশা হয় নি।

    ৩য়ঃ হয় নি তো। সত্যিই হয় নি।

    ১মঃ ঠিক বলেছেন। এবার তাহলে একটা গানই গাই।

    ৩য়ঃ শুধু গান? যা যা প্রাণে চায় সব করুন।

    ১মঃ (ব্রতচারীর গান গাইতে থাকে)

    আমরা বাঙালী সবাই বাংলা মা'র সন্তান,

    বাংলা ভূমির জল-হাওয়ায় তৈরি মোদের প্রাণ।

    মোদের স্নেহ মোদের ভাষা মোদের নাচার গান,

    বাংলাভূমির মাটি-হাওয়া-জলেতে নির্মাণ।

    (এই কটি লাইনই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাইতে থাকে, ৩য় যোগ দেয়। তারপর দুজনে উঠে ব্রতচারীর নাচ নাচতে নাচতে এগিয়ে যায়, আবার একইভাবে পিছিয়ে আসে। এরপর ওরা ২য়কে দুহাত ধরে টেনে তোলে। অবশেষে তিনজনে হাত ধরাধরি করে একই লাইন গাইতে গাইতে নাচতে থাকে।)


    তৃতীয় দৃশ্য
    ======================
    [স্টেজে শুধু ৩য় দাঁড়িয়ে; ফ্রন্ট স্টেজে গিয়ে দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে]

    ৩য়ঃ সেদিন যা হল না, বললে পেত্যয় যাবেন না।প্রথম দিনেই তালুকদারদের তালুকদারি খতম। হয়েছে কী ওরা দুজন তো সাদাজলটল খেয়ে নেচে গেয়ে এ ওর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। এমন সময় এক ব্যাটা পুলিস এ্সে--

    (১ম ও ২য় উত্তেজিত ভাবে স্টেজে ঢোকে)

    ১মঃ অ্যাই, আর একটাও কথা বলবেন না। ঠগ, জোচ্চোর!

    ২য়ঃ কাওয়ার্ড! বলে কি না তালুকদারি খতম! তোর ক্ষ্যামতা আছে খতম করবার। তুই কি ইংরেজ বাহাদুর?

    ৩য়ঃ মাথাটাথা কি একেবারেই গেছে? আমি ঠগ? আমি কাওয়ার্ড?

    তাহলে থানা থেকে কে আপনাদের ছাড়িয়ে আনল? কে জামিন করাল?

    ১মঃ হ্যাঁ, সেটা মানছি। কিন্তু তার আগে?

    ৩য়ঃ তার আগে আবার কী?

    ২য়ঃ আরে পুলিশ ধরতে এলে আপনি কিছু না বলে আমাদের ফেলে পালিয়ে যান নি?

    ৩য়ঃ ঠিক ও'রকম না।

    ১মঃ ঠিক কী রকম?

    ৩য়ঃ জলটল খেয়ে আপনাদের ঘুম পেল আর আমার পেল সুসু। তা আমি পার্কের ওদিকে চলে গেলাম, কিন্তু আপনাদের কড়ে আঙুল দেখিয়ে বলে গেলাম কোথায় যাচ্ছি।

    ১মঃ কিন্তু আমি তো দেখি নি।

    ৩য়ঃ দেখবেন কী করে? আপনি তখন টল্লি হয়ে ওনার কোলে মাথা রেখে শোয়ার তাল করছেন।

    ১মঃ মিথ্যে কথা। কোলে নয়, কাঁধে।

    ৩য়ঃ ওসব আদালতে জজের সামনে বলবেন'খন।

    ২য়ঃ কেন? আদালতে যেতে হবে কেন?

    ১মঃ আপনি যে আমাদের ছাড়িয়ে আনলেন? তো আবার কোর্ট কাচারি কিসের?

    ৩য়ঃ ধেত্তেরি! আমি তো খালি বন্ড দিয়ে ছাড়িয়ে এনেছি।কিন্তু পুলিশ যে এফ আই আর করেছে।কোর্টে কেস উঠবেই। তখন আপনাদের আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শপথ নিয়ে সত্যি কথাটা বলতে হবে। তখন কোথায় মাথা রেখেছিলেন, কোলে না কাঁধে, সেসব বলবেন'খন।

    ২য়ঃ কাঁধেই রেখেছিল, কোলে টলে নয়। আর আমরা তো কোন বেআইনি কাজ করিনি। তবে?

    ৩য়ঃ পুলিশের রিপোর্টে অন্যরকম লিখেছে(পকেট থেকে একটি কাগজ বের করে পড়তে থাকে) হুম্‌--- পাবলিক প্লেসে দুই বয়স্ক লোক মাল খেয়ে টল্লি হয়ে জড়াজড়ি করছিল। বুঝলেন শুধু পাবলিক প্লেসে মদ্যপানই নয়, ধারা ৩৭৭ ও লাগিয়েছে।

    ২য়ঃ সেটা আবার কী?

    ৩য়ঃ এটা হল সমলিঙ্গের প্রেম, মানে ছেলে-ছেলে বা মেয়ে-মেয়েতে প্রেম বা বিয়ে আটকানোর ধারা।

    ১মঃ কী যা তা! কিন্তু ওসব নাকি এখন বে -আইনী নয়? সেই যে সুপ্রীম কোর্টে কেস চলছিল? অনেক মোমবাতি মিছিল হয়েছিল?

    ৩য়ঃ ওই পর্য্যন্তই। সে কেস এখনও চলছে, ফয়সালা হয় নি। ততদিন--।

    ২য়ঃ ছাড়ুন তো! আমরা তো ওসব কিছু করি নি। তাহলে কেস খাব কেন?

    ৩য়ঃ খাবেন। কারণ দিনকাল পাল্টে গেছে। এখন বড্ড কড়াকড়ি।

    ১মঃ কড়াকড়ি হওয়া ভাল তো। নইলে রামা শ্যামা এসে হুজ্জুতি করে, চোখ রাঙায়। আইনকে কাঁচকলা দেখায়।

    ৩য়ঃ ব্যাপারটা এত সোজা না।

    (দর্শকদের দিকে ফিরে) গিন্নিকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যান, কী গরমের দিনে পার্কে গিয়ে বসতে-- পকেটে ম্যারেজ সার্টিফিকেটটি রাখতে ভুলবেন না।

    ১মঃ নইলে?

    ৩য়ঃ দেখবেন? (গলার সুর পাল্টে আঙুল উঁচিয়ে এগিয়ে যায়)

    অ্যাই! এখানে কী হচ্ছে? এসব কী হচ্ছে? পাবলিক প্লেসে বেলেল্লাপনা? লজ্জা করে না? বাড়ির লোকজনকে লুকিয়ে এখানে এসে--

    ১মঃ কী ফালতু কথা বলছেন? আমরা স্বামী-স্ত্রী।

    ৩য়ঃ স্বামী-স্ত্রী! আমাকে বোকা বানাবি? (২য়কে) কী খুকি? সত্যি?

    (২য় মাথায় আঁচল টানার ভঙ্গি করে মাথা হেলিয়ে 'হ্যাঁ' বলে।) আচ্ছা? তোমার বাবাকে ডেকে আনি?

    ১মঃ এবার কিন্তু আপনি খামোকা হ্যারাস করছেন।আপনার কোন রাইট নেই এসব করবার।

    ৩য়ঃ আচ্ছা, আমাকে আইন শেখাবি? চল থানায়। সরকারী কর্মচারির কাজে বাধা দেওয়া?মজা দেখবি!

    ২য়ঃ আপনি ভুল বুঝছেন। আমাদের বিয়ে হয়েছে দশবছর, ম্যারেজ সার্টিফিকেট আছে।

    ৩য়ঃ কোথায়? দেখা দিকি?

    ২য়ঃ সে তো ঘরে লকারে রাখা আছে। কেউ পকেটে নিয়ে ঘোরে নাকি?

    ৩য়ঃ ও ! ঘরের লকারে রাখা আ্ছে? এইসব পট্টি দিয়ে কেটে পড়বে? এখন থানার লক আপে চল। সেখান থেকে ফোন করে ঘরের লোকজনকে বল লকার থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে আসতে।

    ১মঃ সে কী করে হবে? লকারের চাবি তো আমার হ্যান্ডব্যাগে।

    ৩য়ঃ হুঁ, তাহলে বাড়ির লোকজনকে বল পাড়ার কাউন্সিলরকে সঙ্গে নিয়ে এসে তোমাদের আইডেন্টিফাই করে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে।

    ১মঃ (হু-হু করে কেঁদে ওঠে)ঃ বাড়িতে আমার দুটো ছোট ছোট বাচ্চা আছে। পাড়ায় এ নিয়ে জানাজানি হলে মুখ দেখাতে পারব না। প্লীজ, আপনি অন্য কোন রাস্তা বের করুন। থানায় যাব না, প্লীজ কিছু করুন।

    ৩য়ঃ (এবার স্বাভাবিক স্বরে দর্শকদের) দেখলেন তো!

    ১মঃ আচ্ছা, সঙ্গে সার্টিফিকেট রাখলেও যদি পুলিশ দেখতে না চায়?

    ২য়ঃ শুধু পুলিশ? এখন রাম-শ্যাম-যদু-মধু এসে বলবে--!

    ১মঃ কী বলবে? (স্বর পালটে)এই যে দেখুন না, আমার --।

    ২য়ঃ (গলার স্বর পালটে) এঃ সার্টিফিকেট দেখাচ্ছে! ওসব ফল্স সার্টিফিকেট অনেক দেখেছি। আগে প্রমাণ কর যে সার্টিফিকেট জাল নয়।

    ৩য়ঃ (১মকে)ঃ কী করে বুঝব যে কাগজটায় যে নাম লেখা আছে সেটা আসলে কার? তুমি যে তুমি, অন্য কেউ নও--তার প্রমাণ?

    ১ম ও ২য়ঃ (দর্শককে)ঃ দেখলেন তো।আগে তো এমন হত না? এখন কেন?

    ৩য়ঃ আসল কথা হল সময়! সময় বদলে গেছে।

    পুরুষ বলী নহী হোত হ্যায়, সময় হোত বলবান।
    ভিল্লন লুটী গোপিকা, ওহি অরজুন, ওহি বাণ।।

    ১মঃ সবই বুঝলাম। কিন্তু আমাদের পুলিশ টেনে হিঁচড়ে থানায় নিয়ে গেল আর আপনি কেটে পড়লেন কেন সেটা বুঝিনি।

    ৩য়ঃ বললাম তো, গেছলাম পার্কের কোণায় একটা গাছের গোড়ায় জল দিতে, তলপেট হালকা করতে। ফেরার সময় দেখি দুটো পুলিস দুই তালুকদারকে বগলদাবা করেছে।

    ২য়ঃ আর অমনি আপনি তিন নম্বর সটকে পড়লেন? আপনি মশাই তালুকদার নন, জমাদার।

    ৩য়ঃ মিথ্যে কথা! আদৌ সটকে পড়ি নি। আমি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ছবি তুলছিলাম।

    ১মঃ আ-হা-হা! ছবি তুলছিলাম! দেখেন নি যারা সাহায্য করতে না এসে ছবি তোলে তাদের মিডিয়া কেমন গালাগাল দেয়?

    ৩য়ঃ গুলি মারুন মিডিয়াকে! আমি ওখানে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে আমাকেও কালোগাড়িতে তুলে কোতোয়ালিতে নিয়ে যেত? তাতে কোন পুণ্যিটা হত শুনি?

    আর আপনাদের কোন ইজ্জত লুটে নিচ্ছিল যে আমি তক্ষুণি হেল্প হেল্প করে চেঁচাব, তাও ভর দুপুরে নির্জন পার্কে?

    (দর্শকদের) এদের কথা ছাড়ুন। আপনারা আমার বুদ্ধি নিন। যদি দেখেন দুশমন দলে বা শক্তিতে ভারি তাহলে আগে মোবাইলে ছবি তুলে তারপর ১০০ নম্বর ডায়াল করুন।

    ২য়ঃ তাতে কোন মোক্ষলাভ হবে?

    ৩য়ঃ হবে। এই ছবিগুলো দিয়ে অপরাধীকে আইডেন্টিফাই করা যাবে। কোর্ট সংজ্ঞান নেবে। পুলিশ চাইলেও পয়সা নিয়ে কেস চেপে দিতে পারবে না।

    ২য়ঃ পাবলিককে তো ফিরিতে জ্ঞান বিলোচ্চেন, আপনি নিজে ফোটো খিঁচে তারপর কী করলেন সেটা বলুন।

    ৩য়ঃ (মুচকি হেসে)ঃ বলতে দিচ্ছেন কই! আমি একজন বড় পার্টিকে ফোন করে বললাম-- আমার বন্ধুদের মিথ্যে মিথ্যে ধরে নিয়ে গে্ছে। মাল খেয়ে নোংরামি করার চার্জ লাগিয়েছে। আপনি ফোন করে আটকান। ওদের আমার পার্সোনাল বন্ডে ছেড়ে দিতে বলুন।

    ১মঃ ব্যস্‌? এতেই ম্যাজিক হল?

    ৩য়ঃ না না। সে বলল--চার্জ যদি জেনুইন হয়? আমি বললাম মেডিক্যাল টেস্ট্ট হোক। অ্যালকোমিটার এনে ওদের শ্বাস পরীক্ষা হোক।

    ২য়ঃ কী সর্বনাশ!

    ১মঃ কতবড় রিস্ক নিয়েছিলেন জানেন?

    ৩য়ঃ জানি।

    ১মঃ যদি টেস্ট পজিটিভ হত?

    ৩য়ঃ হয়েছে কি?

    ২য়ঃ না হয় নি। হয়ত মেশিন খারাপ।অথবা আপনি ঘুষ দিয়েছেন।

    ৩য়ঃ না; মেশিন ঠিকই আছে। আমি জানতাম পরীক্ষায় কিছু পাওয়া যাবে না।

    ১মঃ এঃ সবজান্তা! কী করে জানতেন?

    ৩য়ঃ আসলে আমার বোতলে মদ ছিল না।

    (কয়েক সেকন্ড নীরবতা। সবাই এই খবরে যেন স্ট্যাচু!)

    ২য়ঃ তো আমরা যে খেলাম! কী খেলাম?

    ৩য়ঃ আপনারা খেয়েছেন একটি এনার্জি ড্রিংক; নন-অ্যালকোহলিক। আমি মদ খাই না।

    ১মঃ তার মানে আপনি আমাদের ঠকিয়েছেন। দিল্লি কা ঠগ! জোচ্চোর!

    ৩য়ঃ হ্যাঁ, ঠকিয়েছি। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না। আমি যে তালুকদার।

    ২য়ঃ যাকগে, ভালই হয়েছে। বৌমার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে কোন চাপ হবে না।কিন্তু আপনি তালুকদার ন'ন। আপনি কে ঠিক করে বলুন দেখি।

    ১মঃ বোঝ নি? উনি একটি হারামির হাতবাক্স। ওনার চক্করে সেদিন থানায় যেতে হয়েছিল।

    ৩য়ঃ (সামনে দর্শকদের দিকে দু'পা এগিয়ে স্বগতোক্তির মত করে)

    ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতাম--কবি হব। ম্যাগাজিনে কবিতা পাঠাতাম, ছাপা হত না। নিজে প্রেস খুললাম। তাতে হ্যান্ডবিল, পরীক্ষার কোশ্চেন, বিয়ের কার্ড--সবই ছাপা হয়। ভালই চলে। কিন্তু আয়ের আদ্দেক পয়সা দিয়ে আমি কবিতার বই ছাপি। আমার ও এইরকম আরও অনেকের। পেপারব্যাক, একশ' কপি।বইমেলায় কুড়ি কপি বিক্রি হয়। চল্লিশ কপি বন্ধুবান্ধব চেনা লোকজনের মধ্যে বিলিয়ে দিই। বিয়ে-পৈতে-অন্নপ্রাশনে উপহার দিই। এইসব পাগলামি গিন্নির সহ্য হয় নি। ওর আলাদা স্বপ্ন। তাই ছেলের সংসারে মুম্বাই গিয়ে রয়েছে। পূজোতেও আসে না। আমি আছি বন্ধুদের নিয়ে, মানে যারা নতুন কবি হতে চায়। নিজের পৈতৃক বাড়ি। হেসে খেলে চলে যায়। আপনাদের কথা শুনে বন্ধুত্ব পাতাতে ইচ্ছে হল। তাই তালুকদার হলাম।

    কিন্তু বুঝতে পারছি-- সেটা আমার কপালে নেই। তালুকদারেরা বন্ধুদের ঠকায় না, ধোঁকা দেয় না। তাই চললাম। ভালো থাকুন, কিন্তু স্বপ্ন দেখা বন্ধ করবেন না, প্লীজ!

    (উইংসের দিকে হেঁটে যায়)

    ১মঃ দাঁড়ান। আপনাকে তালুকদার ক্লাবের মেম্বার করেছিলাম না? আপনি আজীবন সদস্য থাকবেন, বলে দিলাম, ব্যস্‌!

    ৩য়ঃ কিন্তু আমি যে--

    ১মঃ সে কথা বললে আমিও তো--।

    ২য়ঃ মানে?

    ১মঃ না, আমার কোন ছেলে বা কেয়ারিং ছেলে-বৌ নেই। আসলে আমার বিয়েই হয় নি। দাদা অকালে চলে গেলেন। বৌদি আর দুটো বাচ্চার ভার আমি নিজের কাঁধে তুলে নিলাম। ওদের লেখাপড়া চাকরি, বিয়ে সব সামলাতে সামলাতে বয়স হয়ে গেছল। ধাক্কা খেলাম যখন বুঝলাম যে ওরা চাইছে কিছু টাকা নিয়ে আমি যদি বাড়িটা ছেড়ে চলে যাই। তাই করলাম, ওরা সুখী হোক। জানি, দাদা ওপর থেকে আশীর্বাদ করবেন।

    এখন একটি বৃদ্ধাবাসে থাকি। মন্দ না। কিন্তু মাঝে মাঝে একঘেয়ে লাগে। সব বয়স্ক আর বুড়োর দল। সব পুরুষ। দিন গোণে কবে ওপরের ডাক আসবে।তাই এখানে চলে আসি।খবরের কাগজে পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপন পড়ি। আসলে মনে মনে স্বপ্ন দেখি--আমার ছেলে, ছেলে বৌ, নাতি -নাতনি।

    স্বপ্ন দেখা তো বন্ধ করা উচিত নয়। কী বলেন?

    ৩য়ঃ নিশ্চয়ই। নইলে ইউ আর ডেড।

    (২য়কে) তাহলে বাকি রইলেন আপনি-- থ্রি মাস্কেটিয়ার্স এর মধ্যে সবচেয়ে খাঁটি, আসল তালুকদার। যার লজিক পড়ানোর স্বপ্ন পুড়ে ছাই।যে নিজে এখন ছেলে-ছেলেবৌয়ের হুজ্জতে হাড়-ভাজাভাজা হচ্ছে।

    ২য় (একটু ক্ষণ ভেবে নিয়ে মাথা তোলে দর্শকদের দিকে মুখ করে বলে)ঃ ইয়ে, লজিক্যালি দেখলে আপনার স্টেটমেন্টেও একটা ফ্যালাসি আছে।

    মেরী কহানী মেঁ ভী থোড়া টুইস্ট হ্যায়।

    (সবাই চুপ, প্রতীক্ষারত)

    আসলে বাস্তব ছবিটা ঠিক উল্টো। ছেলে-ছেলেবৌ কিছু করে নি। আমিই উল্টে ওদের দাবড়ে রেখেছি।আসলে লজিক পড়ানোর চাকরি চলে যাওয়ার পর ঘরে বাইরে অবহেলার শিকার হলাম। শেষে লজিক্ ছেড়ে অংকের ট্যুইশন শুরু করলাম। ধীরে ধীরে সাফল্য এল, পয়সা হল।বাড়ি বানালাম।কিন্তু বড় বেশি হিসেবি হয়ে পড়লাম। পয়সার মহত্ব অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে বুঝেছি। কিন্তু ওটাও একটা ফ্যালাসি, রজ্জুতে সর্পভ্রম। টের পেলাম-- যখন স্ত্রীর স্বাস্থ্য গেল, ঠিকমত চিকিত্সা হল না।

    ছেলে আর্থিক ভাবে সফল নয়। তাই ওকে লুজার ভাবি। আরে আমাকেও তো গোড়াতে সবাই তাই ভাবত।

    বাড়ি আমার, সংসার চালাতে আমার কন্ট্রিবিউশন কম নয়। তাই টিভি আমার ঘরে থাকে। আমি ঘরে না থাকলে কেউ ছুঁতে পারবে না। তবে ইদানীং নাতনিটাকে অ্যালাউ করেছি। আর ওকে এখন থেকেই বাড়িতে আলাদা করে লজিক পড়াচ্ছি।

    ৩য়ঃ এইসব করে আপনি আনন্দে আছেন? তাহলে লজিক্যালি ঠিক করছেন।

    ২য়ঃ না নেই। খালি মনে হয় কোথাও একটা ফ্যালাসি আছে। সেটা ঠিক ধরতে পারছি না।

    ১মঃ আসলে নিজের দোষ কেউ দেখতে পায় না। সেটা দেখতে হলে একটা আয়না চাই।

    ২য়ঃ ঠিক বলেছেন। ভারতীয় ন্যায়ে একটা যুক্তি আছে;-- কেউ নিজের কাঁধে চড়তে পারে না, যতবড় পালোয়ানই হোক। সবাইকে অন্যের কাঁধেই চড়তে হয়। তা আপনারা মানে দুই তালুকদারেরা আমার মুখের সামনে আয়না ধরুন না, প্লীজ।

    ৩য়ঃ আসুন, আমরা সবাই একে অপরের আয়না হয়ে যাই।

    ১মঃ ইয়েস্‌, থ্রি মাস্কেটিয়ার্স্‌। ওয়ান ফর অল, অল ফর ওয়ান।

    ৩য়ঃ একটা কথা। (১মকে) -- আপনি বৃদ্ধাশ্রম ছেড়ে দিয়ে আমার বাড়িতে চলে আসুন। জায়গার অভাব নেই। আর আমার স্বপ্ব দেখা অনামা কবির দল? তারাই আমার পরিবার। সেখানে আপনারও জায়গা হবে। আর অনেকেই অল্পবয়সী। স্বাদ পাবেন সংযুক্ত পরিবারের।

    ১মঃ (২য়কে) আপনিও চলে আসুন। ছেলে ছেলেবৌকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। ওদের এখন হাত পা ছড়িয়ে নিজের হিসেবে বাঁচতে দিন। মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসবেন, তাতে শান্তি পাবেন।

    আমি কালকেই হিসেব চুকিয়ে ব্যাংকের ডেবিট কার্ড আর পাসবই নিয়ে কবির ঘরে চলে আসছি। আপনি আসলে ষোলকলা পূর্ণ হবে। বাড়িটার সামনে বোর্ড লাগিয়ে দেব-" তালুকদার ক্লাব"। কী? আসছেন তো?

    ২য়ঃ দেখুন। এটা লজিক্যালি পারফেক্ট হল না। ফ্যালাসি আছে। ভেবে দেখলাম আগে নিজের মন পরিষ্কার করতে হবে। নিজের জন্যে স্পেস চাইবার আগে অন্যদের জন্যে স্পেস ছাড়তে হবে। তাই আমি বাড়ি গিয়ে প্রথমে টিভিটা আমার ঘর থেকে বের করে বসবার ঘরের দেয়ালে ফিট করাবো; যে যখন ওখানে বসবে সে তার মত চ্যানেল ঘোরাবে, আমাকে জিগ্যেস করার দরকার নেই।

    আর বাড়িটা ছেলে ও ছেলেবৌয়ের নামে রেজিস্ট্রি করে দেব। রেজিস্ট্রির কাগজ আগামী মাসে ওদের বিবাহবার্ষিকীর দিন উপহার দেব। সেদিন বিরিয়ানি হবে--খাসির মাংসের। আর আপনারা দুই তালুকদার আমাদের বাড়িতে খেতে আসবেন।

    ১মঃ সেরেছে! পরে যদি আপনাকে ওরা বের করে দেয়? বদলা নেয়?

    ২য়ঃ দিলে দেবে; তখন আপনারা আছেন। তালুকদার ক্লাব আছে।

    ১মঃ অনেক রিস্ক নিচ্ছেন কিন্তু। দিনকাল খারাপ।

    ২য়ঃ নিচ্ছি।প্রথম জীবনে একবার নিয়েছিলাম--এখন আবার নেব।নইলে জীবনটা বড্ড আলুনি আলুনি হয়ে যাচ্ছে।চেষ্টা করতে ক্ষতি কী? দিনকাল খারাপ হলেও সূর্য তো এখনও পূবদিকেই ওঠে।

    ৩য়ঃ হ্যাঁ; আমাদের দাড়িদাদুও তাই বলে গেছেন।

    ১মঃ কী?

    ৩য়ঃ “মন্দ যদি তিন-চল্লিশ ভালোর সংখ্যা সাতান্ন”! ভালোর সংখ্যাই হরেদরে বেশি। তাই পৃথিবীটা ঘুরছে। চাঁদ তারারা হারিয়ে যাচ্ছে না।

    (তিনজনে একসঙ্গে দর্শকদের)ঃআপনারা এবার আসুন। রাত বাড়ছে। কিন্তু রবি ঠাকুরের দেওয়া এই মন্ত্রটা রোজ শোয়ার আগে জপ করবেনঃ

    "মন্দ যদি তিন-চল্লিশ ভালোর সংখ্যা সাতান্ন!"

    আমাদের সঙ্গে তিনবার বলুন!----

    (এবার তিনজন 'তালুকদারের ভালুক গেল শালুক খেতে পুকুরে' গাইতে গাইতে দর্শকদের মধ্যে দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে যায়।)

    === সমাপ্ত=====
আরও পড়ুন
লোনার - Saswati Basu
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বাপ্পা দাস | 2401:4900:104e:7697:0:45:96aa:b601 | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৪:২৮732658
  • বেশ মজার।শ্রুতি "natok"হতেই পারে। 

  • রঞ্জন | 122.162.127.139 | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৯:৫৩732659
  • @বাপ্পা,

      যা বলেছেন।

    আসলে এটা ছত্তিসগড়ের রায়পুরে আমাদের "আড্ডা" বলে সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাসিক পারফরম্যান্সের জন্যে ওদের ফরমাশে লেখা। তিন বুড়ো জুটিয়ে রিহার্সাল শুরু হল । (দলে দু'জন পরিচালক আছেন যারা কয়েক দশক  ধরে নিয়মিত বাঙলা ও হিন্দি নাটক করাচ্ছেন)। এমন সময় কোভিড । সব বন্ধ। চেষ্টা চলছে জুম ইত্যাদির মাধ্যমে কিছু করা যায় কিনা।

     বলতে চাই গুরুচন্ডালির এক মহাগুরু কল্লোল দাশগুপ্তের ২০১১ সালে আমন্ত্রিত গানের প্রোগ্রাম (হাউস্ফুল) দিয়েই আমাদের 'আড্ডা'র পথ  চলা শুরু হয়েছিল। এরপর এক নীপা বিকাশ গণচৌধুরিও তাঁর স্ত্রী দু'বার ওখানে শ্রুতি নাটক করিয়ে এসেছেন। দেখা যাক কোভিড-মা কবে প্রসন্ন হন।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে প্রতিক্রিয়া দিন