• বুলবুলভাজা  আলোচনা  সমাজ  গুরুচন্ডা৯ এগারো

  • সমাজতন্ত্র নিয়ে কিছু ভাবনা

    কল্লোল দাশগুপ্ত
    আলোচনা | সমাজ | ২১ জানুয়ারি ২০০৮ | ১০১৫ বার পঠিত
  • সমাজতন্ত্র সংকটে। আজ আর এই নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। একদিন ছিলো। কিন্ত অন্য একটা বিতর্ক আছে - আবার নেইও বটে। সংকটের শুরু কোথায়? বির্পযস্ত সমাজতন্ত্রের তলায় চাপা থাকা এই বিতর্ক খুঁড়ে আনা যাক। পুরোনো কাসুন্দি নেহাৎ খারাপ কিছু নয়।

    প্রশ্ন তুললেন রোজা লাক্সেমবার্গ, সর্বহারার একনায়কতন্ত্র নিয়ে, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বরূপ নিয়ে।

    কিন্ত, তখন সময় ছিলো আগুন জ্বালার। তাই রোজার প্রশ্ন হারিয়ে গেলো। অসাফল্যের মতো অসফল রোজার প্রশ্নাবলী উড়ে গেলো, পুড়ে গেলো, লেনিনিয় সাফল্যের ঝড়ে আর আগুনে।

    রোজার অবহেলিত প্রশ্নাবলীর আড়াল থেকে উঠে এলেন ক্রুশ্চেভ, তার শন্তিপূর্ণ সহাবস্থানের তত্ত্ব নিয়ে। কেউ কেউ বললেন বুর্জোয়া রাস্তায় হাঁটছে লেনিনের পার্টি - লড়াই জারী আছে। সংকট রুশ এবং তার তাঁবেদারদের। সমাজতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক।

    হাঙ্গেরি ক্ষতবিক্ষত হল রুশ ট্যাঙ্কের ধাতব বেল্টের তলায়। গোটা পূর্ব ইউরোপ জুড়ে রুশ ছায়া গাঢ়তর। কেউ কেউ বললেন - লেনিনের রাশিয়া, স্তালিনের রাশিয়া - সামাজিক সাম্রাজ্যবাদে পরিণত। কিন্তু লড়াই জারি আছে। সমাজতন্ত্রের পতাকা উড়ছে - চীন, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েৎনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, আলবানিয়া, কিউবা ................। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।

    পৃথিবী জুড়ে লড়াই তখন ঢেউ-এর মতো আছড়ে পড়ছে - এশিয়া, আফ্ৰিকা, লাতিন আমেরিকা। নক্সালবাড়ির কৃষক বিদ্রোহ থেকে সরর্বন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যারিকেডে। নিউইয়র্ক আর ওয়াশিংটনের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধবিরোধী মিছিল থেকে রোডেশিয়ার গেরিলা হানায়। চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা খেমার রুজ আর ভিয়েৎকং বাহিনী থেকে চিলির নির্বাচনে সালভাদোর আয়েন্দে। আর চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পৃথিবী কাঁপানো বজ্রনির্ঘোষ - সদর দপ্তরে কামান দাগো।

    তবু স্ফুলিঙ্গসমূহ দাবানলে পরিণত হল না। শুরু হলো পিছু হাটার দিন। রোজার অবহেলিত প্রশ্নাবলীর আড়াল থেকে এবার উঠে এলেন তেং শিয়াও পিং তার ইঁদুর ধরা বেড়ালের তত্ত্ব নিয়ে, অনেকে বললেন - বুর্জোয়া রাস্তায় হাঁটছে মাও-এর পার্টি - তবু লড়াই .........

    ভিয়েৎনাম, আমার নাম তোমার নাম, সেই ভিয়েৎনামের হাতে আক্রান্ত কম্বোডিয়া। আনন্দবাজারে পাতা জোড়া বিজ্ঞাপনে গণপ্রজাতন্ত্রী উত্তর কোরিয়ার কিম ইল সুং উত্তরাধিকারী হিসাবে ঘোষনা করলেন তার ছেলেকে। চীন এবং ভিয়েৎনাম রাইফেল উঁচিয়ে ধরলো একে অন্যের বিরুদ্ধে। প্রায় সকলেই বলে উঠলেন - হচ্ছেটা কি !!!

    হঠাৎ উঠলো ঝড় অমাবস্যার রাতে, উত্তাল সমুদ্দর। গ্লাসনস্ত, পেরেস্ত্রোইকা.......... । সোভিয়েৎ রাশিয়া, রুমানিয়া, য়ুগোশ্লোভিয়া, হাঙ্গেরি, চেকোশ্লোভাকিয়া, পূর্ব জার্মানি, পোল্যান্ড, বার্লিন দেওয়াল এবং শেষ পর্যন্ত আলবানিয়া ............. সবই আচমকা অতীত।

    যে কোনো কারণেই হোক কিউবাকে কেউ নতির মধ্যে রাখলেন না। যদিও আজও কিউবাই ......

    সংকটে সমাজতন্ত্র। সংকটের বহি:প্রকাশ বড় বিচিত্র। পশ্চিমের পূব - পূর্ব ইউরোপ আর রাশিয়ায় এর বহি:প্রকাশ বেশ ঘটনাবহুল। বহুকাল ধরে, ষাঠের দশকের গোড়া থেকেই, আলবানিয়া, রুমানিয়া আর য়ুগোশ্লোভিয়া ছাড়া, গোটা পূর্ব ইউরোপই ওয়ারশ চুক্তির বকলমে রাশিয়ার ছায়ায় ঢাকা। সেই ছায়াচ্ছন্ন পূর্ব ইউরোপ আর রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের নামে চলেছে পার্টি এবং সরকারী আমলা পুঁজির শাসন - রাষ্ট্রায়ত্ত পুঁজি যার বিমূর্ত রূপ। আলবানিয়া, রুমানিয়া আর য়ুগোশ্লোভিয়ায় যা চলছিলো - তা এরই রকমফের মাত্র। সবখানেই সাধারণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব সংকটে। সংখ্যালঘু জাতির ওপর সংখ্যাগুরু জাতির ভাষা, সংস্কৃতি এমনকি জাতি পরিচয়ও আধিপত্য কায়েম করছে। যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত পুঁজির এই শাসনকে বুর্জোয়া দুনিয়া সমাজতন্ত্র বলেই চিহ্নিত করতো। তাই যখন রাশিয়া সহ পূর্ব ইউরোপের মানুষ কমিউনিষ্ট পার্টির শাসনকে অস্বীকার করলো - তখন নানান জাতি স্বত্ত্বায় ভাগ হয়ে গেলো প্রতিটি "সমাজতান্ত্রিক'' দেশ। গড়ে উঠলো নতুন সব জাতিরাষ্ট্র - যারা জন্মলগ্ন থেকেই একে অপরের ঘোষিত শত্রু। যুদ্ধ, অনাহার আর মাৎসন্যায়ে ভেসে গেলো পশ্চিমের পূর্ব। বুর্জোয়া দুনিয়া পরম বিশ্বাসে বললো - সমাজতন্ত্র মৃত।

    সমাজতন্ত্রের সংকট তার চেহারা পাল্টে নিলো এশিয়ায়। চীন, উত্তর কোরিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েৎনাম, লাওসে ক্ষমতায় রয়ে গেলো কমিউনিষ্ট পার্টি। দেশভাগ বা ওই জাতীয় কিছু ঘটলো না। যা ঘটলো চীন-ভিয়েৎনাম, ভিয়েৎনাম-কম্বোডিয়া স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধ। কিন্তু প্রায় অঘটনের মতো করে ঘটে গেলো - রাষ্ট্রায়ত্ত পুঁজির পাশাপাশি ব্যক্তিপুঁজির, বিশেষত: বিদেশী ব্যক্তি এবং লগ্নী পুঁজির অনুপ্রবেশ। এখানেও সাধারনের ওপর দমন নেমে এসেছে অতীতে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও। তবে সাধারনের সমস্যা এখানে যতটা না অর্থনৈতিক তার চেয়ে অনেক বেশী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক। বুর্জোয়া দুনিয়া পরম বিশ্বাসে বললো - বাজারেই মুক্তি।

    বুর্জোয়া দুনিয়া যাই বলুক - সমাজতন্ত্র সংকটে তার জন্মলগ্ন থেকেই।

    এঙ্গলস তাঁর "ওরিজিন অফ দ্য ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রপারটি এন্ড দ্য স্টেট'' -এ বলেছেন -
    "রাষ্ট্র কখনোই সমাজের বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো শক্তি নয়। হেগেলের মতে রাষ্ট্র 'নৈতিক বোধের বাস্তব রূপ' বা 'যুক্তির প্রতিমূর্তি ও বাস্তব রূপ'। কিন্তু রাষ্ট্র এ সব কিছুই নয়। বরং সমাজবিকাশের এক বিশেষ স্তরে রাষ্ট্রের উদ্ভব। রাষ্ট্রের উদ্ভব মানেই, সমাধানের অতীত এক দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে সমাজ। মীমাংসার সম্ভাবনাহীন এক দ্বন্দ্বদীর্ণ সমাজ, যে দ্বন্দ্ব নিরাকরনে সে অক্ষম। পরস্পর বিরোধী অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রতিভূ বিভিন্ন শ্রেণী এই দ্বন্দ্বে লিপ্ত। এই দ্বন্দ্বরত শ্রেণীসমূহ যাতে নিজেদের মধ্যে নিস্ফল সংগ্রামে নিজেদের এবং গোটা সমাজটাকেই ধ্বংস করে না ফেলে, তার জন্য এমন একটা শক্তির প্রয়োজন ঘটে যাকে আপাতভাবে সমাজের ঊর্দ্ধে মনে হয়। এই সব শ্রেণীদ্বন্দ্বকে প্রশমিত করে একটা 'শৃঙ্খলা'র গন্ডীর মধ্যে আটকে রাখাই যার কাজ। এই শক্তি সমাজ থেকে উঠে এলেও নিজেকে তা সমাজের ঊর্দ্ধে স্থাপন করে এবং ক্রমশ: নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়। এই শক্তিই রাষ্ট্র।''

    এঙ্গলসের এই মতের নানান ব্যাখ্যা রয়েছে। এঙ্গলসের বক্তব্য অনুযায়ী অন্তত: দুই ধরনের শ্রেণীদ্বন্দ্ব আছে - "নিস্ফল'' এবং তাহলে অন্যটা নিশ্চই "ফলবতী''। মজাটা হলো, এই "নিস্ফল'' শ্রেণীদ্বন্দ্ব, দ্বন্দ্বলিপ্ত শ্রেণীসমূহকে এমনকি গোটা সমাজকেও ধ্বংস করে দিতে পারে। আর তাই হয়তো তাকে "প্রশমিত'' করে রাখাই রাষ্ট্রের কাজ।

    লেনিন অবশ্য এই ধরনের ব্যাখ্যাকে পেতি বুর্জোয়া বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর "রাষ্ট্র ও বিপ্লব"-এ লেনিন বলেছেন - "মার্কসের মতে রাষ্ট্র হল শ্রেণীগত শাসনের যন্ত্র। এক শ্রেণীর দ্বারা অন্য শ্রেণীকে পীড়ন করার যন্ত্র। যে 'শৃঙ্খলা' শ্রেণী সংগ্রামকে প্রশমিত করে এই পীড়নকে বিধিবদ্ধ করে, সেই কায়েমী 'শৃঙ্খলা' প্রবর্তন করাই রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য।''

    লেনিন তাঁর ব্যাখ্যায় একটা নতুন উপাদান যোগ করেছেন - পীড়ন। কিন্তু পেতি বুর্জোয়া বা সর্বহারা উভয় ব্যাখ্যাতেই কিছু সত্যতা আছে। শ্রেণীদ্বন্দ্ব প্রশমিত করাই যদি রাষ্ট্রের কাজ হয়, তবে সেটা আপোষ-মীমাংসা বা পীড়ন যে কোনো উপায়েই হতে পারে। তবে সে বিতর্কে না গিয়ে ধরে নিচ্ছি লেনিনের ব্যাখ্যাই বেশী গ্রহনযোগ্য। কারন শ্রেণীদ্বন্দ্ব প্রশমিত করার কাজে রাষ্ট্রের পক্ষে পীড়নের পথ গ্রহন করার সম্ভাবনাই বেশী।

    লেনিন তাঁর "রাষ্ট্র ও বিপ্লব'' - এ অন্য এক জায়গায় খুব স্পষ্টভাবেই বলেছেন - "রাষ্ট্র হল বিশেষ দমনকারী শক্তি। শ্রমিক শ্রেণীকে দাবিয়ে রাখার জন্য বুর্জোয়া শ্রেণীর বিশেষ দমন যন্ত্র। সেই দমন যন্ত্রকে উৎপাটিত করে তার জায়গায় বুর্জোয়া শ্রেণীকে দমন করার জন্য শ্রমিক শ্রেণীর নিজস্ব বিশেষ দমন যন্ত্র (শ্রমিক শ্রেণীর একাধিপত্য) প্রতিষ্ঠা করতে হবে।''

    অর্থাৎ, একটা ব্যাপার খুব পরিষ্কার, বুর্জোয়া বা সমাজতান্ত্রিক, যে ধরনের রাষ্ট্রই হোক না কেনো, তার কাজ একই থাকে - যে শ্রেণী বা শ্রেণীসমূহ রাষ্ট্রক্ষমতায় নেই, তাকে দমন করা ।

    "কমিউনিষ্ট ম্যানিফেষ্টো''-তে মার্কস-এঙ্গলস বলেছেন - "শ্রমিক শ্রেণী তার রাজনৈতিক আধিপত্য প্রয়োগ করে, বুর্জোয়া শ্রেণীর কবল থেকে যাবতীয় পুঁজি ক্রমে ক্রমে ছিনিয়ে নেবে। রাষ্ট্র অর্থাৎ শাসকশ্রেণী রূপে সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণীর হাতে উৎপাদনের সমস্ত উপকরণ কেন্দ্রীভূত করবে, এবং যথাসম্ভব দ্রুত উৎপাদিকা শক্তির পরিমান বাড়িয়ে তুলবে।''

    অর্থাৎ আরও একটা ব্যাপার খুব পরিষ্কার, পুঁজির মালিকানা বদল হলেও তার চরিত্রের কোনো পরিবর্তন ঘটছে না। সে আগের মতো শাসকশ্রেণীর মালিকানাধীনই থাকবে - শুধু শাসকশ্রেণী পাল্টে যাবে। তফাৎ ঘটছে অন্যত্র - ব্যক্তি মালিকানার জায়গা নিচ্ছে শাসকশ্রেণীর ক্ষমতার বিমূর্ত রূপ - রাষ্ট্রই।

    কারুর মতে শ্রমিকশ্রেণী বুর্জোয়াদের থেকে পুঁজি ছিনিয়ে নেবার পর সেটা আর পুঁজি থাকে না। বিষয়টা একটু খতিয়ে দেখা যাক।

    পুঁজি যখন বুর্জোয়াদের হাতে থাকে তখন তার কাজ কি? শ্রমের সাহায্যে পণ্য উৎপাদন। সেই পণ্য বাজারে বিক্রি করে মুনাফা অর্জন। সেই মুনাফার একটি অংশ দিয়ে পুঁজির বৃদ্ধি। সেই বর্ধিত পুঁজি বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে উৎপাদন, উৎপাদিকা শক্তি এবং পুঁজির ক্রমাগত বৃদ্ধি। এই প্রক্রিয়ায় যেমন শ্রমিকশ্রেণী সংখ্যায় বাড়তে থাকে, তাদের দুর্দশাও বাড়তে থাকে সমান ভাবে। তবু পুঁজির দ্রুত বৃদ্ধিই শ্রমিকশ্রেণীর দিক থেকে সবচেয়ে বেশী কাম্য (১)। ফলে যখন মার্কস বলেন যে বুর্জোয়াদের হাত থেকে পুঁজি ছিনিয়ে নেবার পর সমস্ত উৎপাদনের উপকরণকে রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত করে, যথাসম্ভব দ্রুত উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে (২), তখন প্রশ্ন ওঠে পুঁজি যখন বুর্জোয়াদের হাতে থাকে তখনও তো সে এই একই কাজ করে। সেই কাজের (উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ) একটাই পদ্ধতি, পুঁজি-শ্রম-পণ্য-মুনাফা, বর্ধিত পুঁজি - বর্ধিত শ্রম - বর্ধিত পণ্য - বর্ধিত মুনাফা। পুঁজির বিকাশ ছাড়া উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটবে কি ভাবে?

    মার্কস "পুঁজি" শব্দটি খুব ভেবেচিন্তে ব্যবহার করেছেন। বলেছেন যে পুঁজি হলো সঞ্চিত শ্রম - জীবন্ত শ্রম যার সেবা করে। উল্টোটা হলে সেই সম্পদ আর যাই হোক, পুঁজি নয় (৩)। ফলে কোথাও যদি মার্কস "পুঁজি" শব্দটি ব্যবহার করেছেন, তা নেহাৎ অন্যমনস্ক শব্দ ব্যবহার নয়। তাই মার্কস যখন সমাজতন্ত্রে অবশ্য করণীয় দশটি কার্যক্রমের মধ্যে বলেন যে, সমস্ত ব্যাঙ্কের সম্পদ (ক্রেডিট) একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে একচেটিয়া রাষ্ট্রীয় পুঁজি হিসাবে কেন্দ্রীভূত করতে হবে (৪), তখন কোনো সন্দেহই থাকে না যে সমাজতন্ত্রেও "পুঁজি" পুঁজি হিসাবেই থাকে - ব্যক্তিগত থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত হয় মাত্র।

    সেই রাষ্ট্রীয় পুঁজি মুনাফাও অর্জন করে। অর্থাৎ সে সমাজতন্ত্রেও উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরী করে। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের কথা ধার করে বলা যায় "কম মজুরির গোপন চুরি" সমাজতন্ত্রেও থেকেই যায়। তার থেকেই আসে পরমানু বোমা, মহাকাশ অভিযানের খরচ। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য তাই দিয়ে শ্রমিক আবাসনও তৈরী হয় (৫)। বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে মুনাফা ১৯২৪-২৫ এ ৫২১,০০০,০০০ রুবল থেকে বেড়ে ১৯২৬-২৭ এ দাঁড়ায় ৬৮০,০০০,০০০ রুবলে (৬)। সমাজতন্ত্রেও সঞ্চিত শ্রম, জীবন্ত শ্রমের সেবা করে না। বরং জীবন্ত শ্রম সঞ্চিত শ্রমের সেবা করেই যেতে থাকে ।

    মার্কস "গোথা কর্মসূচীর সমালোচনা"-য় শ্রমের ফসল বন্টনের সমস্যা নিয়ে লিখেছেন :

    From this must now be deducted:
    First, cover for replacement of the means of production used up. Second, additional portion for expansion of production. Third, reserve or insurance funds to provide against accidents, dislocations caused by natural calamities, etc.

    These deductions from the "undiminished" proceeds of labor are an economic necessity, and their magnitude is to be determined according to available means and forces, and partly by computation of probabilities, but they are in no way calculable by equity.

    There remains the other part of the total product, intended to serve as means of consumption. Before this is divided among the individuals, there has to be deducted again, from it:
    First, the general costs of administration not belonging to production. This part will, from the outset, be very considerably restricted in comparison with present-day society, and it diminishes in proportion as the new society develops.
    Second, that which is intended for the common satisfaction of needs, such as schools, health services, etc. From the outset, this part grows considerably in comparison with present-day society, and it grows in proportion as the new society develops.
    Third, funds for those unable to work, etc., in short, for what is included under so-called official poor relief today.
    ( Karl Marx, Critique of the Gotha Programme 1875 )

    আরোপের ঝোঁক থেকেই বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। প্রথম : উৎপাদনের উপকরণের ক্ষয়ক্ষতি পূরণ, দ্বিতীয় : উৎপাদন বাড়ানো, তৃতীয় : দুর্ঘটনা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের থেকে প্রথম ও দ্বিতীয়-কে রক্ষা করা। এসবের পরেও যা থাকলো তার থেকেও প্রথম : অনুৎপাদক কাজে ব্যয়িত প্রশাসনিক খরচ আলাদা করে রেখে তারপর যা থাকলো, তা সামাজিক পরিকাঠামো, কর্মক্ষম নন এমন মানুষের জন্য ব্যয়িত হবে।

    এই যে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বিষয়ের জন্য যে পরিমাণ শ্রমের ফসল সরিয়ে রাখতে হবে তা আসবে কোথা থেকে?

    Accordingly, the individual producer receives back from society -- after the deductions have been made -- exactly what he gives to it. What he has given to it is his individual quantum of labor. For example, the social working day consists of the sum of the individual hours of work; the individual labor time of the individual producer is the part of the social working day contributed by him, his share in it. He receives a certificate from society that he has furnished such-and-such an amount of labor (after deducting his labor for the common funds); and with this certificate, he draws from the social stock of means of consumption as much as the same amount of labor cost. The same amount of labor which he has given to society in one form, he receives back in another.
    ( Karl Marx, Critique of the Gotha Programme 1875 )

    শ্রমের যে অংশটি সাধারণ তহবিলের জন্য শ্রমিক দিয়েছে - তার থেকে। সাধারণ তহবিলের অর্থ (রাষ্ট্রের ক্রমবিন্যাস অনুযায়ী) : ১) উৎপাদনের উপকরণের ক্ষয়ক্ষতি পূরণের খরচ ২) উৎপাদন বাড়ানোর খরচ ৩) দুর্ঘটনা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের থেকে উৎপাদনের উপকরণেরকে রক্ষা করার খরচ ৪) অনুৎপাদক কাজে ব্যয়িত প্রশাসনিক খরচ ৫) সামাজিক পরিকাঠামো ও সুরক্ষার খরচ।

    অর্থাৎ, শ্রমিক তার শ্রমের পূর্ণ মূল্য পেলো না।

    এবার নীচের উদ্ধৃতিটি লক্ষ্য করুন :

    Transfer to Reserve: No dividend can be declared by a company for any financial year except after transfer to reserve of the company of such percentage of its profits for that year, not exceeding 10 per cent as may be prescribed. On exercise of their power under this sub-section the Central Government have promulgated the Companies (Transfer of Profits to Reserves) Rules, 1975 prescribing the percentages of profits to be transferred to reserve before declaring dividend. The following percentages of profit will have to be transferred before a dividend is declared: -

    (a) If the proposed dividend exceeds = not less than 2.5% of the current 10% but does not exceed 12.5% of = profits the paid-up capital
    (b) If the proposed dividend exceeds = not less than 5% of the current 12.5% but does not exceed 15% of = profits the paid-up capital
    (c) If the proposed dividend exceeds = not less than 7.5% of the current 15% but does not exceed 20% of = profits The paid-up capital
    (d) If the proposed dividend exceeds = not less than 10% of the current 20% of the paid-up capital = profits.

    এটি কেম্পানিস অ্যাক্টের ১৯ নং এপেনডিক্স। নোটিফিকেশন নং জি.এস.আর ৪২৬(ই), তাং জুলাই ২৪, ১৯৭৫। গেজেট অফ ইন্ডিয়া, এক্সট্রাঅর্ডিনারী, পার্ট টু, সেকশন ৩(১), তাং ২৬ জুলাই ১৯৭৫।

    তার মানে : মুনাফা ঘরে তোলার আগে একটি পুঁজিবাদী কোম্পানিকেও মুনাফার একটা অংশ সাধারণ তহবিলে সরিয়ে রাখতে হয়। যাকে একাউন্টিং পরিভাষায় 'জেনারেল রির্জাভ' বলে। এছাড়াও বাধ্যতামূলকভাবে উৎপাদনের যে উপকরণগুলি ব্যয়িত হয়েছে, তা পূরণের খরচ যাকে একাউন্টিং পরিভাষায় 'ডেপ্রিশিয়েশন' বলে তাও মুনাফা থেকে সরিয়ে রাখতে হয়।

    হ্যাঁ, এরা সামাজিক পরিকাঠামো বা কর্মক্ষম নন এমন মানুষের জন্য কিছু করে না, কারণ সে সব করার জন্য তাদের সেবক - সরকার রয়েছে। সরকারী কোম্পানিগুলির মুনাফার একটা অংশ ওতে ব্যয়িত হয়।

    এর থেকে আশা করি এমন কোনো সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসবে না যে, আমি বলছি, পুঁজিবাদই একমাত্র পথ। বা, এই কোম্পানিগুলো মার্কসবাদী। কিংবা, মার্কস পুঁজিবাদী ছিলেন। আমি এটাই দেখাতে চাইলাম যে মার্কস 'গোথা কর্মসূচীর সমালোচনা'-য় যা বলেছেন তাতে একথা প্রমাণ হয় না যে সমাজতান্ত্রিক সমাজে 'পুঁজি' থাকবে না। আমার প্রতিপাদ্য এটাই যে, সমাজতান্ত্রিক সমাজে যে উৎপাদন ব্যবস্থার কথা বলা হলো বা যে উৎপাদন ব্যবস্থা সমাজতান্ত্রিক সমাজে চালু হল, তা আদতে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থারই অন্য এক রূপ।

    তাহলে সমাজতন্ত্রেও রাষ্ট্র থেকে গেলো পীড়নের যন্ত্র হিসাবে। উপরি পাওনা হিসাবে সে এখন পূঁজির মালিকও বটে। কিন্তু রাষ্ট্র আসলে একটা বিমূর্ত বস্তু - যার মূর্ত রূপ হলো তার পরিচালন সংগঠন - সরকার। সরকার চালায় শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসাবে কমিউনিষ্ট পার্টি - আর কমিউনিষ্ট পার্টির প্রতিনিধি হিসাবে মন্ত্রীমন্ডলী এবং ছোটো বড়ো অজস্র আমলা, পুলিশ, বিচারক, নিয়মিত সৈন্যবাহিনী আর আইনসভার নির্বাচিত সদস্যসমূহের এক বিশাল প্রতিষ্ঠান।

    যেহেতু রাষ্ট্র তার ধর্ম অনুযায়ী নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়, ফলে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের মতো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রও তার সমস্ত প্রতিষ্ঠান সমেত সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে আরও একটা অদ্ভুত অবস্থা তৈরী হয় - পুঁজিও তার মালিকের সাথে সাথে সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সম্পদের সামাজিকরণ জন্ম দিয়েছিলো ধনতন্ত্রের, সমাজতন্ত্র তাকে সমাজবিচ্ছিন্ন করে দেয়।

    সামন্ততান্ত্রিক সমাজে অলস সম্পদ সামাজিক উৎপাদনের কাজে লাগিয়ে বুর্জোয়ারা পুঁজির জন্য দেয়। সেই কারনেই, পুঁজি শুধুই সম্পদের সমাহার নয়, তা একটা সামাজিক শক্তিও বটে, এ কথা মার্কস বার বার বলেছেন (৭)।

    পুঁজির এই অস্বাভাবিক অবস্থান, তার সাথে রাষ্ট্রের একটা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। পুঁজির স্বাভাবিক ঝোঁক তাকে সামাজিক অবস্থানে নিয়ে যেতে চায়, তার মালিক রাষ্ট্রের পক্ষে তা হতে দেওয়া সম্ভব নয়। পুঁজি তার পথ কেটে নিতে থাকে দুর্নীতি আর ভ্রষ্টাচারের হাত ধরে ব্যক্তি আমলা, ব্যক্তি মন্ত্রী, ব্যক্তি নেতার তোষখানায়। এই অলস পুঁজি ও তার অবৈধ মালিকেরা রাষ্ট্রের ভিতরেই রাষ্ট্রের শত্রু হয়ে ওঠে এবং আঘাত হানার সুযোগ খোঁজে নিরবিচ্ছিন্নভাবে।

    অন্যদিকে দমনের যন্ত্র হিসাবেও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে পড়ে। এটা পরিষ্কার যে, ক্ষমতায় না থাকা শ্রেণী বা শ্রেণীসমূহকে দমন করে রাষ্ট্র - এটা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সত্য হলেও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তা অর্ধসত্য হয়ে দাঁড়ায়। মুশকিলটা হয় নানান দিক থেকে। সমাজতন্ত্রতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকায়, বিরোধী কন্ঠস্বর প্রকাশ্যে থাকে না। ফলে শত্রু চিহ্নিতকরণ বেশ কঠিন। তার ওপর শ্রেণী হিসাবে বুর্জোয়ারা যেমন তার স্বাভাবিক শত্রু, তেমনই, শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রাষ্ট্রের বিলোপ হওয়ার ফলে, সেও তার শত্রুও বটে।

    যখন রাষ্ট্র বিলোপের প্রশ্ন আসে অর্থাৎ সমাজতন্ত্র থেকে সাম্যসমাজের উত্তরণের প্রশ্ন আসে তখন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিলুপ্তির প্রশ্নই আসে। শ্রমিকশ্রেণীর এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি তার জন্মলগ্ন থেকেই থাকে। শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণীচরিত্রই হলো শোষণ বিরোধী, আর রাষ্ট্র মানেই শোষণের যন্ত্র । ফলে রাষ্ট্রের উচ্ছেদই শ্রমিকশ্রেণীর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। তাই সে যে কোন রাষ্ট্রেরই বিরোধী। রাষ্ট্র পীড়নের যন্ত্র। তার অস্তিত্বের যারা বিরোধী তাদের ওপরে সে দমন নমিয়ে আনবে সেটাই স্বাভাবিক। ফলে নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, শ্রমিকশ্রেণী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসক শ্রেণী নয়।

    এটা শুধু একদলীয় সমাজতন্ত্রের সমস্যা নয়। শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণীচরিত্রই তাকে রাষ্ট্র বা পুঁজির মালিক হতে বাধা দেয়। শ্রমিকশ্রেণীর কেউ বা কারা যদি সেই অবস্থানে চলে যায়, তবে নিশ্চিত ভাবেই সে বা তারা শ্রমিকশ্রেণী থেকে চ্যুত হয়। আমলাতান্ত্রিকতা, শ্রেণীর নামে দলের একনায়কতন্ত্র, দল ও সরকারের একাকার হয়ে যাওয়া, দুর্নীতির হাত ধরে দল ও সরকারী পদাধিকারীদের প্রচুর সম্পদের মালিক হয়ে ওঠা - এ সবই ঘটে চলে শ্রমিকশ্রেণীর নামেই।

    দুই শ্রেণীর উদ্দেশ্য আলাদা হওয়া সত্ত্বেও, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে দুই শ্রেণীই সমান বিপদের। ফলে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দমন যন্ত্রের লক্ষ্য উভয় শ্রেণীই। এটা একেবারেই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিশেষ সমস্যা। বুর্জোয়া রাষ্ট্র, সামন্ত রাষ্ট্র বা দাস রাষ্ট্রকে কখনোই তার শাসকশ্রেণীকে দমন করতে হয় নি। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রই প্রথম রাষ্ট্র যে তার শাসক শ্রেণী বলে চিহ্নিত শ্রেণীর ওপরেও পীড়ন নামিয়ে আনে। আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে - রাষ্ট্রের ভিতরে থেকে যারা অবৈধভাবে পুঁজি সঞ্চয় করে চলে, যেহেতু তারাই দমন যন্ত্রের পরিচালক, ফলে তারা রাষ্ট্রবিরোধী হয়েও পীড়নের শিকার হয় না।

    যদিও একটা মত আছে যে, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র আসলে ঠিক রাষ্ট নয়। লেনিন তাঁর 'রাষ্ট্র ও বিপ্লব'-এ বলেছেন - "ধনতন্ত্র থেকে কমিউনিষ্ট সমাজে উত্তরণের পর্বেও দমনের প্রয়োজন। কিন্তু এই দমন হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত দ্বারা সংখ্যালঘিষ্ঠ শোষকের দমন। দমনের বিশেষ যন্ত্র রাষ্ট্রের তখনো প্রয়োজন। কিন্তু এই রাষ্ট্র হলো এক পরিবর্তনশীল সময়ের রাষ্ট্র। প্রচলিত অর্থে একে রাষ্ট্র বলা চলে না।''

    এখানে তিনটে ব্যাপার একদম পরিষ্কার নয় -

    প্রথমত: সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কিভাবে শ্রমিকশ্রেণীকে 'সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত' আর বুর্জোয়াদের 'সংখ্যালঘিষ্ঠ শোষক' বলা হচ্ছে! তবে কি লেনিন বলতে চাইছেন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও বুর্জোয়ারা শোষক হিসাবেই থাকে!! কিন্তু তাহলে 'শোষিত'-রা কিভাবে 'শোষক'-দের ওপর দমন নামিয়ে আনে সেটা পরিষ্কার নয়। আর 'শোষিত'-রা যদি 'শোষক'-দের ওপর দমন নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়, তবে দমনকারীরা আর 'শোষিত' থাকে না শাসক হয়ে যায়। উল্টোদিকে দমিতরাও আর 'শোষক' থাকে না - শাসিত হয়ে যায়।
    তবু ধরে নিচ্ছি, লেনিন 'শোষক' ও 'শোষিত' পুরোনো সমাজের প্রেক্ষিতেই ব্যবহার করেছেন।

    দ্বিতীয়ত: শোষক-শোষিতের বিতর্কে না গিয়ে লেনিনের মতই যদি মেনে নেই, তাহলেও যে রাষ্ট্র সংখ্যালঘুর ওপর পীড়ন চালায় তাকে কেনো প্রচলিত অর্থে রাষ্ট্র বলা যাবে না সেটা বোঝা গেলো না। শুধু অর্থনৈতিক সংখ্যালঘুই তো সংখ্যালঘুত্বের একমাত্র মাপকাঠি নয় - ধর্ম, জাতি, ভাষাগোষ্ঠী এসবেরও তো সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু হয় - সে বেলা !!!

    তৃতীয়ত : এতসব বিতর্কে না গিয়েও বলা যায় - রাষ্ট্রের প্রধান এবং একমাত্র কাজ যখন দমন করা, তখন সেই কাজ যে রাষ্ট্র করে চলে তাকে প্রচলিত অর্থে রাষ্ট্র না বলার কোনো যুক্তিই থাকতে পারে না।

    আর তাছাড়া, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কমিউনিষ্ট সমাজ কায়েম করার জন্য আত্মহুতি দিতে ভয়ানক ব্যাগ্র এমন কথা কেউ কখনো বলে নি।

    দেখা যাক লেনিন কি ভাবে প্রচলিত রাষ্ট্র থেকে এর ফারাক করছেন।

    - "মজুরশ্রেণী রাষ্ট্রযন্ত্রের ধনগুরুত্ব কি দিয়ে পূরণ করবে, সে সম্পর্কে অতীব শিক্ষণীয় তথ্য প্যারী কমিউনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া গেছে।" - রাষ্ট্র ও বিপ্লব, ৩য় অধ্যায়, ১৮৭১ এর প্যারী কমিউনের অভিজ্ঞতা, মার্কসের ব্যাখ্যা।

    সেই অভিজ্ঞতা মার্কসের ভাষায় - "রাষ্ট্রীয় ফৌজ তুলে দিয়ে তার জায়গায় সশস্ত্র জনসাধারনকে নিয়োগ করা......................... এটাই ছিলো কমিউনের প্রথম ফরমান।" - ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ।

    আর রাশিয়ায় কি হলো?

    The old army was a class instrument in the hands of the bourgeoisie for the oppression of the workers. The seizure of power by the workers and propertyless persons renders necessary the formation of a new army. The tasks of this new army will be the defence of the Soviet authority, the creation of a basis for the transformation of the standing army into a force deriving its strength from a nation in arms, and, furthermore, the creation of a basis for the support of the coming Socialist Revolution in Europe.

    The Council of People's Commissars has decided to organize the new army as a 'Red Army of Workers and Peasants' on the following basis:
    (I)
    1. The Red Army of Workers and Peasants will be formed from the class-conscious and best elements of the working classes.
    2. All citizens of the Russian Republic who have completed their eighteenth year are eligible for service. Service in the Red Army is open to anyone ready to give his life and strength for the defence of the achievements of the October Revolution, the Soviet Power and Socialism. Enlistment in the Red Army is conditional upon guarantees being given by a military or civil committee functioning within the territory of the Soviet Power or by Party or Trade Union committees or, in extreme cases, by two persons belonging to one of the above organizations. Should an entire unit desire to join the Red Army, its acceptance is conditional upon a collective guarantee and the affirmative vote of all its members.

    (II)
    1. The families of members of the Red Army of Workers and Peasants will be maintained by the State and receive, in addition, a monthly supplement of 50 roubles.
    2. Members of soldiers families who are incapable of work and have hitherto been supported by the aforesaid soldiers will receive further support in accordance with the local cost of living, as determined by the local Soviets.

    (III)
    The Council of People’s Commissars is the supreme head of the Red Army of Workers and Peasants. The immediate command and administration of the Army is vested in the Commissariat for Military Affairs and in the Special All-Russian College therein contained.

    প্যারী কমিউনের অভিজ্ঞতা থেকে, যাতে প্রচলিত রাষ্ট্রের মতো এই রাষ্ট্রও "সমাজের প্রভু" না হয়ে বসে, মার্কস আরও বললেন -

    "প্রথমত, প্রশাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ, শিক্ষা বিভাগ প্রভৃতি সমস্ত পদেই কমিউন সংশ্লিষ্ট সকলের সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত লোক নিয়োগ করে; নির্বাচনের এই অধিকারও ছিলো যে, তারা যে কোনো সময়ে তাদের প্রতিনিধিদের ফিরিয়ে আনতে পারবে। দ্বিতীয়ত, অন্যান্য মজুরেরা যে পরিমান মজুরি পেত, ঊর্দ্ধতন নিম্নতম সমস্ত কর্মচারীকেই মাত্র সেই পরিমান মজুরি দেওয়া হত।" - ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ।

    আর রাশিয়ায় কি হল?

    সরকারী পদে নিয়োগ :

    (1) On the relief of Comrade A. I. RYKOV1 from duties as People's Commissar of Communications of the USSR DECREE OF THE PRESIDIUM OF THE CENTRAL EXECUTIVE COMMITTEE OF THE USSR

    The Presidium of the Central Executive Committee of the USSR decrees: Comrade Aleksei Ivanovich Rykov is relieved from duties as People's Commissar of Communications of the USSR.
    Chairman of the Central Executive Committee of the USSR G. PETROVSKIJ.
    Secretary of the Central Executive Committee of the USSR I. AKULOV.

    Moscow, The Kremlin. 26 September 1936.
    ------------------------------------------------------------------------------------------------------
    (2) On the appointment of Comrade G. G. YAGODA2 as People's Commissar of Communications of the USSR DECREE OF THE PRESIDIUM OF THE CENTRAL EXECUTIVE COMMITTEE OF THE USSR
    The Presidium of the Central Executive Committee of the USSR decrees:
    Comrade Genrikh Grigorievich Yagoda is appointed People's Commissar of Communications of the USSR, and relieved from the duties of People's Commissar of Internal Affairs of the USSR.
    Chairman of the Central Executive Committee of the USSR G. PETROVSKIJ.
    Secretary of the Central Executive Committee of the USSR I. AKULOV.

    Moscow, the Kremlin. 26 September 1936.
    -----------------------------------------------------------------------------------------------------
    (3) On the appointment of Comrade N. I. YEZHOV as People's Commissar of Internal Affairs of the USSR DECREE OF THE PRESIDIUM OF THE CENTRAL EXECUTIVE COMMITTEE OF THE USSR
    The Presidium of the Central Executive Committee of the USSR decrees:
    Comrade Nikolai Ivanovich Yezhov is appointed People's Commissar of Internal Affairs of the USSR.
    Chairman of the Central Executive Committee of the USSR G. PETROVSKIJ.
    Secretary of the Central Executive Committee of the USSR I. AKULOV.

    Moscow, the Kremlin. 26 September 1936.

    (from "Pravda", 27 September 1936, p.1)

    মজুরির প্রশ্নে :

    Re Comrade Shlyapnikov's inquiry concerning rates of pay for high ranking officials, the C.P.C.
    1) confirms that the decree establishing 500-ruble monthly salaries for members of the Council of People's Commissars is to be interpreted as an approximate norm for top salaries and contains no prohibition to pay specialists more.
    This motion of Lenin's was adopted at a meeting of the C.P.C. on January 2 (15), 1918, during the discussion of an inquiry by A. G. Shlyapnikov, People's Commissar for Labour, concerning the rates of pay for high officials of the factory managements.
    (Rates of Pay for High-Ranking Officials, January 2 1918, Lenin Collect Works, Vol 42)

    তাহলে বিষয়টি কি দাঁড়ালো?

    অন্য আর পাঁচটা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের মতোই রাষ্ট্রীয় ফৌজ গড়া হলো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও।
    অন্য আর পাঁচটা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের মতোই প্রশাসন, বিচার, শিক্ষা প্রভৃতি সমস্ত পদেই সরকারী আমলারা নিয়োজিত হলেন সরকারী আদেশ বলে - সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও।
    অন্য আর পাঁচটা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের মতোই না হলেও, মজুরির ফারাক থেকেই গেলো - সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও।

    অতীব শিক্ষণীয় প্যারী কমিউনের তথ্য কাজে এলো না।

  • অর্থাৎ, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রও প্রচলিত অর্থে রাষ্ট্রই, যার কিছু বিশেষ সমস্যা আছে।

    রাষ্ট্রীয় মালিকানায় পুঁজির আবর্তনের পরিবর্তন ঘটে। পুঁজির সামাজিক ভূমিকা লুপ্ত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় যাবার মধ্য দিয়ে তার চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে কি?

    অর্থাৎ, সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা বলে কিছু হয় কি?

    যৌথ খামার বা শ্রমিক পরিচালিত শিল্পে পূঁজির ভূমিকা কি?

    সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার ফলে রাষ্ট্রীয় পুঁজির প্রকৃত মালিক হয়ে দাঁড়ায় - বড় বড় পদাসীন আমলা, মন্ত্রী, সেনাপ্রধান, পুলিশকর্তা, বিচারপতি এবং অবশ্যই কমিউনিষ্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ।

    কারখানা ব্যবস্থা বজায় থাকে শিল্পে ও কৃষিতেও। পরিচালক হিসাবে শ্রমিকদের প্রতিনিধি হয়ে যারা থাকেন, তারা হয় পার্টির নেতা বা শাসনযন্ত্রের আমলা বা একসাথে দুইই।

    রাষ্ট্রীয় পুঁজিও উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরী করে। সেই উদ্বৃত্ত মূল্যেই রাষ্ট্রের অনুৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলির খরচ চলে - জেলখানা চালানো থেকে চাঁদে যাওয়া।

    রাষ্ট্রীয় মালিকানাও পুঁজির চরিত্রহননে সক্ষম হয় না। বরং পুঁজি তার স্বাভাবিক অবস্থানে, অর্থাৎ সামাজিক অবস্থানে ফিরে যাবার ঝোঁক বজায় রাখে এবং এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি করে দুর্নীতিগ্রস্ত নীতিনির্ধারক আর সিদ্ধান্তগ্রহনকারী ব্যক্তি, যাদের কোষাগারে জমা হতে থাকে অবৈধ পুঁজি। ফলে সমাজতন্ত্রের নামে যেটা চলে সেটা আদতে ধনতন্ত্রেরই অন্য এক রূপ রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ।

    ১৯২১-এ লেনিন বলছেন যে রাষ্টীয় পুঁজিবাদই রাশিয়াকে নিশ্চিতভাবে সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে দেবে (৮)।

    একই কথা লেনিন ১৯১৮-তে (৯), ১৯১৭-তেও (১০) বলছেন। লক্ষ্য করার বিষয়, রাষ্টীয় পুঁজিবাদ সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে দেবে, অর্থাৎ রাষ্টীয় পুঁজিবাদ কখনোই সমাজতন্ত্র নয়, সে বিষয়ে লেনিন খুব স্পষ্ট। কিন্ত তিনি এটাও খুব জোরের সঙ্গে বলছেন সমাজতন্ত্র আসবে রাষ্ট্রীয় পুঁজির হাত ধরে। কাজেই ১৯১৭-য় বা ১৯২১-এ যা হল, সেটা সমাজতন্ত্র নয়, রাষ্টীয় পুঁজিবাদ।

    সমাজতন্ত্র বলতে, মার্কস বা লেনিন যা বলেছেন, আমি তার সাথে একমত নই। কারণ সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা বলতে ওনারা যা বলেছেন, যা অনুশীলন করেছেন, তা পুঁজিবাদেরই রকমফের মাত্র। সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদে উত্তরণের পথে কোনো অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়। এটা আজকের বাস্তব। মার্কস বা লেনিন তা মনে করতেন না। লেনিনের কাছে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদই ছিল সমাজতন্ত্রের "গ্যারান্টি"।

    ভাবতে হবে, এমনটা কেন হলো? শুধু তো রাশিয়ায় নয়, চীন-ভিয়েৎনাম-কম্বোডিয়া-লাওস-গোটা পূর্ব ইউরোপ কেন এইভাবেভেঙ্গে পড়লো? কেন সমাজতান্ত্রিক সমাজগুলো ধ্বংস হয়ে গেলো?

    এমন ভাবার কোন কারন নেই যে পুঁজি কখনো কোন সংকটে পড়ে নি। আর সেই সংকটকালে লেনিন বা স্তালিন যে জাতীয় ভুল করেছিলেন তেমন ভুল কি হিটলার/মুসোলিনী/তোজো বা আইসেনহাওয়ার/চার্চিল/দ্য গল বা আর কেউ করেন নি? কেন পুঁজি বার বার একটার পর একটা সংকট কাটিয়ে ক্রমশ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে? আর সমাজতন্ত্র সংকটে পড়লেই, হয় ট্রটস্কি নয় স্তালিন নয় মাও নয় টিটো কেউ না কেউ দায়ী হয়ে যান। আর সমাজতন্ত্রিক সমাজগুলো ফিরে যায় পুঁজিবাদের গায় !!!!

    এর থেকে আশা করি এমন কোনো সিদ্ধান্তে কেউ উপনীত হবেন না যে আমি বলছি পুঁজিবাদ সমাজতন্ত্রের চেয়ে ভালো। আমি বলছি, পুঁজিবাদ সমাজতন্ত্রের চেয়ে সংকটের মোকাবিলায় অনেক বেশী দক্ষ। কিন্তু আজকের পুঁজিবাদ মানবতার শত্রু। সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদের চেয়ে অনেক অনেক অনেক বেশী কাম্য।

    সমাজতন্ত্রকে দাঁড়াতে হবে তার নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থার উপর, যে উৎপাদন ব্যবস্থা পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার চেয়ে ততটাই আলাদা, যতটা পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা আলাদা সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার চেয়ে।

    মার্কস তাঁর "ওয়েজ লেবার এন্ড ক্যাপিটাল''-এ বলেছেন :

    "পুঁজি তার বিকাশের জন্য নির্ভর করে শ্রমশক্তির ওপর - জন্ম নেয় শ্রমিকশ্রেণী। আবার শ্রমিকশ্রেণীও তার বিকাশের জন্য নির্ভর করে পুঁজির ওপর। অর্থাৎ পুঁজির বিকাশ মানেই শ্রমিক শ্রেণীর বিকাশ।''

    এই সিদ্ধান্ত আজ আর প্রযোজ্য নয়। মার্কস যে ভবিষ্যত সমাজের কথা ভেবেছিলেন, যেখানে রাষ্ট্র অবলুপ্ত হয়ে যাবে, যেখানে শ্রমের জায়গা নেবে যন্ত্র। মানুষের অবসর বেড়ে যাবে। মানুষ তখন তার সৃষ্টিশীল মননের চর্চায় আরও বেশী সময় ও শ্রম দেবে, যাতে সে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বুর্জোয়া সামাজেই যখন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ঐ ধরনের যন্ত্রায়ন ঘটে, তখন ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায় ভয়াবহ। পুঁজির বিকাশ আর কোনোভাবেই শ্রমিক শ্রেণীর বিকাশ ঘটায় না - বরং উল্টোটাই করে। এতে চিন্তাবিদ ও বিপ্লবী হিসাবে মার্কস এতটুকু খাটো হন না।

    মার্কস একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন, আর সেই স্বপ্নপূরণের একটা বাস্তবসম্মত তাত্ত্বিক ভিত্তিও দিয়ে গেছেন তাঁর সময় থেকে বেশ কিছু এগিয়েই। কিন্তু তিনি তো ভবিষ্যতবক্তা বা জ্যোতিষী নন। স্বপ্নভঙ্গর দায়িত্ব নি:সন্দেহে তাঁর নয় - আমাদের সকলের, আমরা যারা তাঁর স্বপ্নকে আজকের সময়ে রূপায়নের কথা ভাবি।

    উৎপাদন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত যন্ত্রায়নের ফলে শ্রমশক্তির ব্যবহার ক্রমশ: কমতে থাকে। শ্রমশক্তির এই সংকোচনের আওতায় শুধু কায়িক শ্রমই নয়, মানসিক শ্রমও পড়ে যায়। ফলে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বাড়তে তাকে ভীষণ ভাবে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যেটুকু শ্রমের দরকার পড়ে, পুঁজি তা অনায়সে জোগাড় করে নেয় এবং তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি মজুরি দিয়ে তাদের তাঁবেদারে পরিণত করে। পরিসেবা শিল্পে আজ কাজের সময় অলিখিত ভাবে প্রায় দশ থেকে বারো ঘন্টায় এসে দঁড়িয়েছে। বলা হচ্ছে ব্যাঙ্ক (ধীরে ধীরে সব শিল্পই) খোলা রাখতে হবে রাতদিন - সাতদিন। এই প্রেক্ষিতে, ব্যক্তিপিছু কাজের ঘন্টা কমানোর কথা এবং তার সাথে নতুন কর্মী নিয়োগের কথা কোনো শ্রমিক সংগঠন তুলছেন কি?

    একটু বিশদে যাওয়া যাক।

    শিল্পে যন্ত্রায়ণের ফলে যে কাজ করতে আগে আট ঘন্টা লাগতো তা আজ চার ঘন্টায় বা তারও কমে হয়। শ্রমিক সংগঠনগুলি একসময় শিল্পে যন্ত্রায়নের প্রচন্ড বিরোধী ছিলো। পরে যখন তারা মেনে নিতে বাধ্য হলো, তখন এই 'মেনে নেওয়ার' দরকশাকশিতে কিছু মজুরি বাড়িয়ে নিলো। কোনো কোনো শ্রমিক সংগঠন (ছোট ছোট শ্রমিক সংগঠন যারা বড় দলগুলির বাইরে) তারাও একসময় হতদ্যম হয়ে চুপ করে গেলো। অথচ কেউ একবারের জন্যও কাজের সময় কমানোর দাবী তুললো না। বললো না যে চার ঘন্টায় যখন আট ঘন্টার বা তার-ও বেশী কাজ পাওয়া যাচ্ছে, তখন মজুরি না বাড়িয়ে বরং কাজের সময় ব্যক্তি পিছু চার ঘন্টা হোক, আর চার ঘন্টার জন্য নতুন কর্মী নিয়োগ করা হোক।

    যদিও ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। ফ্রান্সে, বেলজিয়ামে, উৎপাদন প্রক্রিয়ার যন্ত্রায়নের সাথে সাথে কাজের ঘন্টা কমানোর এবং কর্মী সংখ্যা বাড়ানোর আন্দোলন বেশ জোরদার। তবু ব্যাতিক্রম শেষ পর্যন্ত নিয়মকেই প্রতিষ্ঠা করে। তাই, শিল্পে সার্বিক যন্ত্রায়নের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিক আন্দোলনের মূল্যায়ন, ভীষণ জরুরী।

    ভীষণ জরুরী পুঁজি ও শ্রমের আন্ত:সম্পর্কের নবমূল্যায়ন। পুঁজি যে বিপুল সংখ্যক মানুষকে কর্মচ্যুত করেছে এবং যে শ্রমশক্তিকে স্রেফ কর্মহীন করে রেখে ক্রমাগত তাদের প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে, সেই কর্মচ্যূত/কর্মহীন শ্রমসম্ভাবনার সাথে পুঁজির সম্পর্ক নির্ধারণ আর একটি জরুরী কাজ। এই সব প্রান্তিক হয়ে যাওয়া মানুষের সাথে পুঁজির সম্পর্ক আর উৎপাদনের ক্ষেত্রে নেই। বরং এদের সাথে পুঁজির সম্পর্ক সম্পূর্ণ অন্য এক ময়দানে - বাজারে।

    পুঁজির ইতিহাসে এই প্রথম সে তার মুনাফা বাড়ানোর, ফলত: পুঁজি বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় বাজারকে সংকুচিত করছে। অতীতে পুঁজির বিকাশের সাথে সাথে শ্রমিকশ্রেণীরও বিকাশ ঘটতো। যতো বেশী বেশী মানুষ মজুর দাসে পরিণত হত - তত বাজার বাড়তো। এই বাজার বাড়ানোর তাগিদেই পূঁজির সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকা, যা আজ এক শীর্ষে এসে পৌঁছেছে বিশ্বায়নের মধ্য দিয়ে।
    সারা দুনিয়াজুড়ে অবাধ এবং এক নিয়মের বাজার চাইছে পুঁজি। অথচ উৎপাদন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত যন্ত্রায়ন ক্রমাগত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে - বাজার সংকুচিত হচ্ছে।

    এই সংকটের মোকাবিলায় পুঁজি নানান কায়দা গ্রহন করছে। ভোগ্যপণ্যের বাজার ছেয়ে যাচ্ছে 'ব্যবহার করো - ফেলে দাও' জাতীয় পণ্যে। কৃত্রিম চাহিদা তৈরী হচ্ছে বিজ্ঞাপন আর ক্রেডিট কার্ডের দৌলতে। পুঁজি এবার হাত বাড়াচ্ছে প্রান্তিক মানুষের দিকেও। মাইক্রোক্রেডিটের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে অতি ক্ষুদ্র পুঁজিপতি। এতে বাজার কিছু বাড়ছে সন্দেহ নেই, কিন্তু এর ফলে গরীব মানুষের মনে পুঁজি/পুঁজিপতি এই শব্দগুলো যে ঘৃণার আবরণ তৈরি করত তা ভেঙে যাচ্ছে। মাইক্রোক্রেডিট প্রান্তিক মানুষকে নিরানব্বই-এর ধাক্কায় ফেলে দিয়ে - পুঁজির সাথে তাদের মানসিক দূরত্ব কমিয়ে আনছে। পুঁজির বিরুদ্ধে লড়াই-এর দার্শনিক অবস্থানকে দুর্বল করার চেষ্টা চালাচ্ছে পুঁজি। বাজার সংকোচন ছাড়াও বিশ্বায়ন পর্বে পুঁজির এই নতুন সংকট নানান চেহারায় উঠে আসছে।

    সমস্ত পণ্যের অবাধ বাজারের সাথে সাথে শ্রমেরও অবাধ বাজার তৈরি হচ্ছে। অথচ জাতিরাষ্ট্রের ঘেরাটোপ আজও অক্ষুন্ন। এর ফলে শস্তা শ্রমের খোঁজে, নিজের দেশের মহার্ঘ শ্রমশক্তিকে পায়ে ঠেলে পুঁজি যখন উৎপাদন প্রক্রিয়ার পুরোটাই বা অংশবিশেষ অন্য দেশে নিয়ে যাচ্ছে - তখন নিজের দেশে পুঁজি রাজনৈতিক চাপে পড়ে যাচ্ছে।

    সংকটমোচনের উপায় শুধু যুদ্ধ নয়, পুঁজি আজ সাধারন মানুষের মধ্যে মান্যতা গড়ে তোলার চেষ্টায় রত। একদিন 'বড়লোক', 'বড়লোকি', 'পুঁজিপতি' শব্দসমূহ গালাগালির নামান্তর ছিলো, সে মাত্র পঁচিশ-তিরিশ বছর আগেকার কথা। আর আজ, অন্তত এই বাংলায়, 'বাম', 'বামফ্রন্ট', 'কমিউনিষ্ট', 'মার্কসবাদী' এই শব্দগুলো তার জায়গা নিয়েছে।

    এ বড় সুখের সময় নয়।

    দুনিয়াজোড়া এক নিয়মের বাজার ধাক্কা খাচ্ছে পৃথিবীর অসম্ভব বৈচিত্রময় বহুত্বের বাস্তবের কাছে।

    প্রকৃতি - গোটা পৃথিবীর সব কিছু যার মধ্যে বিলীন হয়ে রয়েছে - মানবজাতিও যার ব্যতিক্রম নয়, কোনোভাবেই একসারতের ধারণায় খাপ খায় না - বহুসারতই তার ধর্ম ।

    আজ বাজারের বিরুদ্ধে লড়াই এক আশ্চর্য জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বায়ন/বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আজ নৈরাজ্যবাদী, সাম্যবাদী, পরিবেশবাদী, মানবতাবাদী নানান রাজনৈতিক সংগঠন, গণসংগঠন, এনজিও সকলেই একসাথে লড়ছেন। অথচ কোনো কেন্দ্রীয় সংগঠন নেই। সকলেই নিজের নিজের কায়দায় প্রতিবাদ প্রতিরোধে শামিল হচ্ছেন একসাথে, এবং সকলে মিলেই সফলও হচ্ছেন। ইন্টারনেট হয়ে দাঁড়িয়েছে এই প্রতিবাদীদের যোগাযোগের, মতবিনিময়ের, আন্দোলনকে তীব্র করে তোলার হাতিয়ার। এক নতুন প্রতিবাদী সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে এই আন্দোলন, যা আগের তুলনায় অনেক বেশী পরমতসহিষ্ণু, অন্য প্রতিবাদী মতের প্রতি অনেক বেশী শ্রদ্ধাশীল। আগে একই লক্ষ্যের বিরুদ্ধে অনেক মতের সমান্তরাল লড়াই চলতো। মতপার্থক্য হলেই সংগঠন ভাঙতো। লড়াই প্রায়শ: নিজেদের মধ্যেও চলতো। আজ একই লক্ষ্যের বিরুদ্ধে অনেক মতের মানুষ/সংগঠন লড়ছে একই সাথে।

    কিন্তু ঝামেলা হলো, যাঁরা সবচেয়ে বেশী নিপীড়িত, পুঁজি যাঁদের জীবন, জীবিকা, জীবনের অনুকূল পরিবেশ কেড়ে নিয়ে প্রান্তিকায়িত করেছে, তারা এই আন্দোলনের শরিক নয়। কোনো ইন্টারনেটই তাঁদের কাছে পৌঁছয় না। তাদের পক্ষে প্রাগ বা জেনেভায় বিক্ষোভ দেখানো অসম্ভব। অথচ নিশ্চিতভাবেই তাঁরা এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড়ো শক্তি। ভাবতে হবে, তাঁদের কিভাবে এই বিশ্বায়নবিরোধী আন্দোলনে শামিল করা যায়। আমার ধারণা এঁরাই আন্দোলনে নতুন দিশা দিতে পারেন। এঁদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকাটাই পুঁজি এবং বাজারের বিরুদ্ধে লড়াই করে, রাষ্ট্র এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই করে। আজ যাঁরা প্রাগ বা জেনেভায় বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন তাঁদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই কখনোই এই মাত্রার নয়। বিশ্বায়ন বিরোধী লড়াই-এ এদের অবস্থান বরং অনেক বেশী বৌদ্ধিক। ফলে এই প্রান্তিক মানুষেরা যথাযোগ্য মর্যাদায় যখন ওই আন্দোলনে সামিল হবেন, তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতা আন্দোলনকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবে - এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

    আমার আপনার মতো তুলনায় সুখে থাকা মানুষদের, যাদের পুঁজিবাদ/বিশ্বায়ন বিরোধীতা অনেকটাই বৌদ্ধিক, তাদের পক্ষে এটা সম্ভব নয়। আমরা বড়জোর সেই নতুন ব্যবস্থাকে সূত্রায়িত করতে পারি মাত্র, জন্ম দিতে পারি না। এটুকু আন্দাজ করতে পারি সেই ব্যবস্থা, উৎপাদনের ক্ষেত্রে পুঁজি ও বন্টনের ক্ষেত্রে বাজারকে বাদ দিয়ে অন্যতর কোন ব্যবস্থার সন্ধান দেবে। তা না হলে পৃথিবী বাঁচবে না। আধুনিক শিল্প, যা পুঁজির হাত ধরে গড়ে উঠেছে, কিভাবে তার দূষণের বিষে সমগ্র পৃথিবীর জীবজগতের ওপর ধ্বংসের কুটিল ছায়া নামিয়ে এনেছে তা আর কোন বির্তকের বিষয় নয়। ইচ্ছা করলেই এই দূষণের কারণ নির্মূল করা সম্ভব নয়। বড়জোর কিছু কমতে পারে। তাতে বিশেষ কোন সুরাহা হবে না। নতুন উৎপাদন ব্যবস্থায় হয়তো এর সমাধান থাকবে।

    আবারও বলছি, এঁরাই পুঁজি এবং বাজারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করবেন, যেদিন আমাদের মতো তুলনায় সুখে থাকা মানুষদের হাত থেকে লড়াইয়ের নেতৃত্ব প্রকৃতপক্ষে ওঁদের হাতে চলে যাবে। তা না হলে বার বার বিশ্ব-সাম্যবাদী আন্দোলনের মতো, নেতৃত্ব প্রকৃতপক্ষে "ভদ্রলোক"-দের হাতে থাকার ফল যা হয়েছে, তাই হবে। বার বার 'ভুল' হবে, আর তাই নিয়ে অনন্ত বার শতধা হবে আন্দোলন।

    এঁরাই পারবেন আমাদের শেখাতে কিভাবে পুঁজিকে বাতিল করে নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা উঠে আসবে। কিভাবে বাজারকে অস্বীকার করে, তুচ্ছ করে নতুন বন্টন ব্যবস্থা উঠে আসবে।

    এই সব সংকট এবং পূঁজির বিরুদ্ধে মানুষ ও প্রকৃতির লড়াই হয়ত কোনো নতুন উৎপাদন ব্যবস্থার সন্ধান দেবে - যা পুঁজিকে তার চরিত্র থেকে মুক্ত করে অন্য কোনো রূপ দেবে। যখন উৎপাদন ব্যবস্থার সামাজিকরণ একটা চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছবে। লাভ/ক্ষতির হিসাব যখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে।

    সেখান থেকেই শুরু হবে নতুন কোনো সমাজের পথ চলা, যা মানুষকে এবং ব্যাপক অর্থে প্রকৃতিকেও পূর্ণতায় পৌঁছে দেবে।


    কোথায় পেলাম :

    (১) We thus see that if capital grows rapidly, competition among the workers grows with even greater rapidity – i.e., the means of employment and subsistence for the working class decrease in proportion even more rapidly; but, this notwithstanding, the rapid growth of capital is the most favorable condition for wage-labor. Wage Labour & Capital Effect of Capitalist Competition on the Capitalist Class the Middle Class and the Working Class-Karl Marx

    কার্ল মার্কসের লেখা ১৮৪৭, ব্রাসেলস, জার্মান শ্রমিক সংঘে বক্তৃতামালা হিসাবে পঠিত। প্রথম প্রকাশ জার্মান ভাষায় ১৮৪৯।

    (২) The proletariate with use its political supremacy to wrest, by degree, all capital from the bourgeoisie, to centralise all instruments of production in the hands of the State, i.e., of the proletariat organised as the ruling class; and to increase the total productive forces as rapidly as possible – Communist Manifesto Proletarians & Communists - Karl Marx & F

    কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডেরিক এঙ্গলেস এর লেখা, ১৮৪৭। প্রথম প্রকাশ ১৮৪৮। কমিউনিস্ট লিগ নামে এক গোপন সংগঠন ১৮৪৭ নভেম্বরে তাদের লন্ডন বৈঠকে কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডেরিক এঙ্গলেস কে দলের তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং কর্মসূচী তৈরির দায়িত্ব দেয়। তারই ফলশ্রুতি হিসাবে লেখা হয় আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে গুরত্বপূর্ন লেখা "কমিউনিস্ট ইস্তেহার"।

    (৩) Capital does not consist in the fact that accumulated labor serves living labor as a means for new production. It consists in the fact that living labor serves accumulated labor as the means of preserving and multiplying its exchange value. - Wage Labour & Capital Nature & Growth Of Capital

    ১ নং টিকা দেখুন

    (৪) Centralisation of credit in the banks of the state, by means of a national bank with State capital and an exclusive monopoly. 5th point of the 10 point agenda of Socialism (where the 1st point was the famous Abolitaion of Property) - Communist Manifesto Proletarians & Communists

    'কমিউনিস্ট ইস্তেহার'-এর মহান ঘোষনা, দশ দফা কর্মসূচী। যার প্রথম কর্মসূচীই হল সম্পত্তির অবসান। উপরের উদ্ধৃতি সেই ঘোষনারই পঞ্চম দফা।

    (৫) On the business aspect of life in a Russian textile factory I will not linger, for industry is the subject of another volume in this series. Like all the larger concerns in Russia, this mill has been nationalized. On the productive side it is subject to a big organization known as the Textile Trust; on the commercial side a separately organized "syndicate" disposes of its manufactures. In spite of the use of such words as trust and syndicate, no private capital is involved, and the Russians intend only to convey that the industries grouped as "trusts" enjoy autonomy in the conduct of their affairs, though their profits go to the State. They are under an obligation, however, to return at least ten percent of their annual surplus to the workers in the form of a welfare fund. Last year the Textile Trust did, in fact, assign as much as twenty-two percent of its profits for the benefit of its employees, and this considerable sum was spent mainly upon housing. – How The Soviet Work - Chapter 2: Democracy in the Factory - Vanguard Press, November 1927 by H N Brailsford

    এইচ এন ব্রেইলসফোর্ড বামপন্থী ইংরেজ সাংবাদিক। ১৯২০ থেকে ১৯৫২৭-এর মধ্যে বহুবার সোভিয়েৎ রাশিয়ায় গিয়েছেন। ১৯২৭-এর নভেম্বরে একটি কাপড় কল দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা "হাও দ্য সোভিয়েৎ ওয়ার্কস"-এর দ্বিতীয় অধ্যায়।

    (৬) Finances of large State industries:

    1924-25
    Rubles

    1925-26
    Rubles

    1926-27
    Rubles

    Profits
    521,000,000
    676,000,000
    680,000,000

    Losses
    63,000,000
    66,000,000
    80,000,000

    Net Profit
    458,000,000
    610,000,000
    600,000,000

    Depreciation Fund
    277,000,000
    360,000,000
    398,000,000

    Taxes paid to govt
    169,000,000
    259,000,000
    379,000,000

    Financing by govt
    125,000,000
    325,000,000
    536,000,000

    Net receipts from or payments to the govt
    - 44,000,000
    + 66,000,000
    + 157,000,000

    Credits
    564,000,000
    431,000,000
    454,000,000

    Total Net Income
    1,255,000,000
    1,467,000,000
    1,609,000,000

    Of this:

    Capital expenditures
    385,000,000
    810,000,000
    1,090,000,000

    Operating Funds
    870,000,000
    657,000,000
    519,000,000

    Total
    1,255,000,000
    1,467,000,000
    1,609,000,000

    ( The Soviet Union : Facts, Descriptions, Statistics 1917 to 1928 Industry Published in 1929 by Soviet Union Information Bureau 4 Table. )

    ১৯২৯-এ সোভিয়েৎ ইউনিয়ান ইনফরমেশন ব্যুরো প্রকাশিত, সোভিয়েৎ ইউনিয়ান সর্ম্পকিত তথ্যাবলীর শিল্প অধ্যায়ের চতুর্থ সারণী।

    (৭) Thereby, that as an independent social power, i.e. as the power of a part of society it preserves itself and multiplies by exchange with direct, living labour power. - Wage Labour & Capital Nature & Growth Of Capital - Karl Marx

    ১ নং টিকা দেখুন

    (৮) Tax In Kind 1921 Vol 32 Lenin Collected Works - 'ট্যাক্স ইন কাইন্ড' এই পুস্তিকাটি লেখা হয় ১৯২১-এ দশম পার্টি কংগ্রেসের ঠিক পরেই। এই লেখায় "নতুন অর্থনৈতিক নীতি"-র প্রয়োজনীয়তা ব্যখ্যা করেন লেনিন। এই লেখায় বহু জায়গায় রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ নিয়ে লেনিন তাঁর মত ব্যক্ত করেছেন।

    (৯) State capitalism would be a step forward as compared with the present state of affairs in our Soviet Republic. If in approximately six months’ time state capitalism became established in our Republic, this would be a great success and a sure guarantee that within a year socialism will have gained a permanently firm hold and will have become invincible in this country. - The Present-Day Economy Of Russia- Referred in another writing Tax In Kind 1921 Vol 32

    "ট্যাক্স ইন কাইন্ড" এই পুস্তিকাটিতেই এই লেখাটির উল্লখ আছে। ১৯১৮ সালে "দ্য প্রেজেন্ট ডে ইকনমি অফ রাশিয়া' লেনিন-এর এই লেখাটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়।

    (১০) Try to substitute for the Junker-capitalist state, for the landowner-capitalist state, a revolutionary-democratic state, i.e., a state which in a revolutionary way abolishes all privileges and does not fear to introduce the fullest democracy in a revolutionary way. You will find that, given a really revolutionary-democratic state, state-monopoly capitalism inevitably and unavoidably implies a step . . . towards socialism. . . .
    For socialism is merely the next step forward from state-capitalist monopoly. . . .
    State-monopoly capitalism is a complete material preparation for socialism, the threshold of socialism, a rung on the ladder of history between which and the rung called socialism there are no intermediate rungs (pp. 27 and 28). - The Impending Catastrophe and How To Combat It, written in September 1917. Lenin Collected Works Vol 22

    এই লেখাটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয় ১৯১৭ সালে অক্টোবরের শেষদিকে। আসন্ন দুর্ভিক্ষের মোকাবিলায় সরকার, দল এবং মানুষ কি করতে পারে সেই প্রসঙ্গে লেনিন-এর এই লেখা।

  • বিভাগ : আলোচনা | ২১ জানুয়ারি ২০০৮ | ১০১৫ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • π | ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৯:১৮96884
  • কল্লোলদা, এই পঠিত ভ্যালু জানু ২০২০ থেকে। তার আগেরটা দেখায় না।

  • b | 14.139.196.11 | ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১১:৩৯96887
  • লেখাটার মধ্যে অনেক ইম্রিজি চিহ্ন ঢুকে আছে। একটু এডিট করা যায় না?
  • Kallol Dasgupta | ২০ নভেম্বর ২০২০ ২১:২৬100509
  • আগে তো ঠিকই ছিলো। গুরুর ফর্ম্যাট পাল্টানোর পর বহু পুরোনো লেখায় এমনটা হয়ে গেছে। এখন তো পালটানো গুরুর হাতে।

  • lcm | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১২:০৭497451
  • এটা এবারে মোটামুটি পড়তে পারা উচিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন