• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ইতিহাস

  • || দেশবিদেশের অন্ত্যেষ্টি শিল্প || (চতুর্থ পর্ব- গ্রীস)

    Sudipto Pal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ০৪ জুলাই ২০২০ | ৯৭৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • আগের তিন পর্বে আমরা প্রাচীন, নবীন ও তাম্রপ্রস্তর যুগ এবং লৌহযুগ দেখেছি। উত্তরাধিকার, পরিবার, পরলোকের ধারণা, শ্রমবিভাজন, বৈষম্য, শিল্পবোধ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ- এগুলোর সাথে সাথে কীরকম বিবর্তন হয়েছে সমাধিশিল্পের সেটা আমরা দেখেছি। আর সমাধি যে ইতিহাসের সংরক্ষণস্থল, এরা যে একেকটা সময়ের স্বাক্ষর বহন করে সেটাও আমরা বুঝেছি। এই পর্বে আমরা রোমান যুগ থেকে আরেকটু পিছনে ফিরে গ্রীক যুগে আসব। এই আলোচনা মূলতঃ প্রাচীন গ্রীসের ক্লাসিকাল ও হেলেনিস্টিক যুগ (৪৮০ থেকে ১৪৬ পূর্বাব্দ) নিয়ে।

    এথেন্সের গ্রীকরা শবদাহই বেশী করত, কিন্তু অন্য শহরে কবরের চল বেশী ছিল। সবার প্রথমে দেখব শবদাহের পর ছাই রাখার জন্য পাত্র (cinerary urn)- এগুলোও অনেক সময় সম্ভ্রান্ত গ্রীকরা সুন্দরভাবে মার্বেল বা পোড়ামাটি দিয়ে বানাত। তারপর দেখব স্মৃতির উদ্দেশ্যে তৈরী মূর্তি। এগুলোর কোনোটা কোনোটা উত্তরসুরীরা বানাতো, কোনোটা কোনোটা শুনেছি মৃত ব্যক্তি নিজেই মৃত্যুর আগে বানিয়ে রেখে যেত।

    কবর আর শবদাহের মিশ্রপদ্ধতিও ব্যবহার হত। যুদ্ধে যারা মারা যেত তাদের প্রথমে দাহ করা হত, তারপর তাদের অস্থিগুলো হয় বছরের শেষ অবধি অথবা যুদ্ধশেষের পর একটি নির্দিষ্ট দিন অবধি রেখে দেয়া হত। তারপর কফিনে অনেক অনেক যোদ্ধার অস্থি একসাথে ভরে নিয়ে গিয়ে অস্থিগুলোকে সমাধিস্থ করা হত। এবং নেতৃস্থানীয় লোকেরা একটি বিদায়ভাষণ (epitaphios logos) দিতেন। কফিন বা অস্থিভাণ্ডগুলো যেমন শিল্পের আকর হত, তেমনি এই বিদায়ভাষণগুলিও নিজগুণেই সাহিত্যের একটি শ্রেণী বলে পরিগণিত হত। অনেক বিদায়ভাষণ কিন্তু শুধু অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় পাঠের জন্য নয়, বরং স্বতন্ত্র সাহিত্য হিসাবেও লেখা হত। এই ছদ্ম বিদায়ভাষণগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল প্লেটোর menxenus বইটি- এই পুরো বইটি হল একটি ছদ্ম বিদায়ভাষণ। মোটকথা মানুষের বিদায়যাত্রাকে গ্রীকরা‍ একটি শিল্পে পরিণত করেছিল।

    দাহ করার আগে বা কবর দেয়ার আগে মৃতব্যক্তিকে তেল মাখানো হত। তেলের ঘট (lekythis) এবং ভস্মভাণ্ডগুলোতে সুন্দর সুন্দর শিল্পকর্ম, ছোট ছোট ঘটনার দৃশ্য থাকত। তেলের ঘট গুলি অনেকসময় কবরের মধ্যে রাখা হত। বাচ্চা মেয়েদের কবরে থাকত পুতুল।

    সুন্দর সুন্দর মার্বেলের কফিন (sarcophagus) পাওয়া গেছে গ্রীক সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে। এগুলির অনেকগুলি সংরক্ষিত আছে ইস্তানবুল আর্কিওলোজিকাল মিউজিয়ামে। এই জাদুঘরের গোটা একটা বাড়ী আছে এই কফিনগুলোর জন্য। এদের কারুকার্য সত্যি তাক লাগিয়ে দেবার মত। অনেক কাহিনী, অনেক ভাস্কর্য খচিত আছে এদের গায়ে।

    এছাড়াও গ্রীকরা বানাতো স্মৃতিফলক (funerary stele), যেখানে সংক্ষেপে প্রয়াত ব্যক্তির ব্যাপারে কিছু কথা থাকত। কিছু স্মৃতিফলকে মানুষটার এবং অনেক সময় তার পরিবারের ছবিও খচিত হত। মোটকথা গ্রীকরা স্বতন্ত্রভাবে ব্যক্তিবিশেষকে খুব গুরুত্ব দিত- এবং মিশর বা অন্য সমসাময়িক সংস্কৃতিগুলোতে শুধুমাত্র রাজারানীরাই এই গুরুত্ব পেত- গ্রীসে সেরকম ছিল না। এই ধরনের গুরুত্ব পাবার জন্য অন্য দেশে রাজাকে নিজেদের দেবতার রূপ অথবা দেবনিয়োজিত ব্যক্তি হিসাবে দেখাতে হত। গ্রীসে কিন্তু ব্যাপারটা অনেকটাই সেকুলার ভাবে হত। যদিও গ্রীক বীরপুরুষরাও দেবতা হবার চেষ্টা করতেন- কিন্তু সেটা মিশর-ব্যাবিলন-পারস্যের থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল। আর তাছাড়া এই গুরুত্ব রাজা ছাড়াও অন্য বীরপুরুষরা ও সম্ভ্রান্ত নারীরাও পেতেন। হয়তো এটা একটা কারণ যার জন্য পৃথিবীর প্রাচীনতম গণতন্ত্রগুলির একটির সূত্রপাত এথেন্সে। (এটা আলাদা কথা যে জনসংখ্যার মাত্র ১০% লোক ভোট দিতে পারত- মহিলারা, দাসেরা এবং বহিরাগতরা ভোট দিতে পারত না)। এথেন্সে রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রের দিকে বিবর্তন এবং আবার রাজতন্ত্রে ফিরে আসা- এই ক্রমবিকাশগুলোও প্রতিফলিত হয়েছে ওখানকার কবরগুলিতে। গণতন্ত্রের সময় বৈষম্য কম ছিল সেটা কবরের আয়তন, উপহারসামগ্রী ও আড়ম্বরের বৈচিত্র্যের মাধ্যমে বোঝা গেছে।

    যাই হোক, এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের ধারণা অনেকটাই পুষ্ট করেছিল গ্রীকদের বিজ্ঞান, দর্শন ও শিল্পচর্চাকে। সেইজন্যই আজ আড়াই হাজার বছর পরও অনেক আধুনিক ধারণা- যেমন গণতন্ত্র, সংবিধান, বিজ্ঞানমনস্কতা, সেকুলারিজম, ইন্ডিভিজুয়ালিজম- এদের মধ্যে আমরা গ্রীক দর্শনের ছাপ দেখতে পাই।

    পরবর্তী পর্বে রোম। আর খৃষ্টধর্মের আবির্ভাবে কীভাবে য়ুরোপে অন্ত্যেষ্টি শিল্পর পরিবর্তন এল সেগুলোও পরবর্তী পর্বগুলোয় আসবে।
    (চলবে)

    পরবর্তী পর্ব: https://www.guruchandali.com/comment.php?topic=17865

    ছবি:
    ১ - শবদাহের পর ছাই রাখার মর্মরনির্মিত ভাণ্ড (চতুর্থ পূর্বশতকের- এথেন্স আর্কিওলোজিকাল মিউজিয়াম):
     


    image copyright: ©Sudipto Pal

    ২ - স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত মূর্তি (তৃতীয় পূর্বশতকের মূর্তির রেপ্লিকা প্রথম শতকে বানানো- এথেন্স আর্কিওলোজিকাল মিউজিয়াম):


    image copyright: ©Sudipto Pal

    ৩ - মর্মরনির্মিত ভাস্কর্যমণ্ডিত কফিন ( ইস্তানবুল আর্কিওলোজিকাল মিউজিয়াম):


    image copyright: ©Sudipto Pal

    ৪ - তেল রাখার ঘট (নিউ য়র্কের মেট মিউজিয়াম):



    image copyright: ©Sudipto Pal

    ৫ - কফিনের ঢাকনার বেড় (নিউ য়র্কের মেট মিউজিয়াম):


    image copyright: ©Sudipto Pal

    ৬ - বাচ্চা মেয়ের কবরের পুতুল (এথেন্স আর্কিওলোজিকাল মিউজিয়াম):


    image copyright: ©Sudipto Pal

    ৮ - স্মৃতিফলক:



    https://commons.wikimedia.org/wiki/File:Relief_rural_votive_place_-_206_-_Glyptothek_Munich_-_DSC07363.jpg


    image is copyright free



    Sources:
    Descriptions kept in archaeological museums of Athens and Istanbul.
    https://en.wikipedia.org/wiki/Pericles%27_Funeral_Oration
    https://en.wikipedia.org/wiki/Ancient_Greek_funeral_and_burial_practices


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৪ জুলাই ২০২০ | ৯৭৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন