এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  অন্যান্য

  • পায়ের তলায় সর্ষেঃ জুলে, লাদাখ!

    সিকি
    অন্যান্য | ২৩ জুন ২০১২ | ১২২১৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Nina | 22.149.39.84 | ২৫ জুন ২০১২ ২২:৫২558485
  • একি ই ই ই সিকি তুই গাইলি না
    দিওয়ানা হুয়া বাদল
    এইসি তো মেরি তকদির ন থি
    কি তুমস কো ই মহবুব মিলে

    কিম্বা
    য়ে চাঁদ সা রৌশন চেহরা??
  • সিকি | 132.177.205.17 | ২৫ জুন ২০১২ ২২:৫৮558496
  • ইয়ে দেখ কে দিল ঝু-মা ...
    লি প্যার মে আঙ্গরাই

    ওই ঝুমাআ টানটা যে আমি এ জীবনে দিতে পারব না নীনাদি। তা হলে আর গেয়ে কী লাভ?

    লাইনগুলো শোনার পরে মনে হয় এর পর মরে গেলেও ক্ষতি নেই।
  • Nina | 22.149.39.84 | ২৬ জুন ২০১২ ০১:৪৮558507
  • যা;চ্চলে --এইটুকু লিখলি আজ ---
  • kumu | 132.160.159.184 | ২৬ জুন ২০১২ ১৩:০৯558518
  • সাঁঝের ছবিগুলো বড় ভাল হয়েছে।
  • শ্রাবণী | 127.239.15.27 | ২৬ জুন ২০১২ ১৫:০৪558529
  • দুপুরে ভেজ খেল শমীক, আবার চমৎকার বলছে.....এটা শমীকই তো?
  • প্পন | 214.138.240.254 | ২৬ জুন ২০১২ ১৬:৫০558540
  • হ্যাঁ, তাও আবার পনীরের তরকারি!
  • ঐশিক | 213.200.33.67 | ২৬ জুন ২০১২ ১৮:১৮558551
  • যা তা, আর কই?
  • Nina | 22.149.39.84 | ২৬ জুন ২০১২ ১৮:৫৬558562
  • ভারি মিষ্টি মেয়ে আমাদের সাঁঝ---এখনও চোখ বুজলে মনে পড়ে কেমন আমার কোল ঘেঁষে বসে ছিল আমার চাদর জড়িয়ে---
    হে হে ওর ছবি দেখব বলেই সিকির কাছে লিংক চেয়েছিলুম ঃ)
    কই সিকি লেখ--বসে আছি তো---
    ( সিকি ওখানে রাজমা-চাওল খেলি না ;-)))) )
  • সিকি | 132.177.155.55 | ২৬ জুন ২০১২ ২০:২১558573
  • ১০ জুন ২০১২, রবিবার

    ঘুম ভেঙে উঠে রেডি হতে হতেই হঠাৎ করে গেছোদাদার ফোন। সোনমার্গের জায়গায় পরের দিনের জন্য আমাদের শ্রীনগর ট্র্যানজিট ক্যাম্পে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে শুনে গেছোদাদা খুব উৎসাহিত। একসময়ে গেছোদাদাও ওখানে থাকত। বলল, শুক্লাজিকে পাবে ওখানে, গিয়ে আমার নাম বোলো, উনি চিনতে পারবেন।

    বেরোতে বেরোতে বেজে গেল নটা। সুন্দর মসৃণ রাস্তা দিয়ে আমরা চললাম শ্রীনগরের পশ্চিমদিকে, গুলমার্গে। একটু পরেই সামনে দেখা দিল ঝকঝকে বরফের পাহাড়। ড্রাইভার বিলাল বলল, ওই পাহাড়ের ওপর দিয়েই নাকি গন্ডোলা যাবে।

    মাঝে যেতে যেতে দেখি রাস্তার ধারে বাক্স বাক্স চেরি আর স্ট্রবেরি বিক্রি হচ্ছে। এক জায়গায় গাড়ি থামানো হল, খানিক চেরি আর স্ট্রবেরি টেস্ট করে দেখা গেল জিনিসগুলো শুধু স্বাদে উৎকৃষ্ট, তা-ই নয়, দামেও অত্যন্ত শস্তা। মাত্র একশো টাকায় এক বাক্স চেরি আর দেড়শো টাকায় এক বাক্স স্ট্রবেরি কিনে নিয়ে গাড়িতে ওঠা হল আবার।

    গুলমার্গ পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সাড়ে এগারোটা-পৌনে বারোটা। অনেক আগে থেকেই দেখা যাচ্ছিল ভিড়, আসল স্পটে পৌঁছে দেখলাম ভিড় পুরো ভেঙে পড়েছে। ঘোড়ার গায়ের আর গুয়ের গন্ধ, শাড়ির ওপর বোঁটকা গন্ধওলা ভাড়া-করা ওভারকোট চড়িয়ে, কানে মাফলার বেঁধে কিংবা হনুমান টুপি পরে একগুচ্ছ বাঙালি মাসিমা-মেসোমশাইয়ের দল এদিক থেকে ওদিক হাঁকপাক করছে। অবাঙালিও ছিল প্রচুর। গাড়ি থেকে নামামাত্রই, যা হয়, সাবজী ঘোড়া লে লো, বাবুজী ঘোড়া চাহিয়ে গাইড চাহিয়ে, ওদিকে সারসার দোকানপাটে ঘোড়ার বাহ্যি আর চা-বিস্কুট সফট ড্রিঙ্কসের পাশাপাশি সহাবস্থান।

    বেশি স্মার্ট বনতে গিয়ে আমরা হাল্কা করে বোকামী করে ফেললাম। এটা জানা ছিল যে ঘোড়া বা গাইড, কোনওটাই নেবার দরকার নেই, কিন্তু নেমে যে কোনদিকে যেতে হয়, সেটা জানা ছিল না। এক নাছোড়বান্দা ঘোড়াওয়ালা আমাদের (পরে বোঝা গেছিল, ইচ্ছে করেই) ডানদিকের রাস্তা দেখিয়ে দিল, যেটা আসলে গন্ডোলা রাইডের দিকে যাবার রাস্তাই নয়। আমরা কাদা ভেঙে মাঠ ভেঙে রীতিমতো তিন চার কিলোমিটার ট্রেকিং করতে করতে (সঙ্গে গ্রুপের তাবৎ মহিলাকূলের সোচ্চার এবং নিরুচ্চার গালাগাল খেতে খেতে) যখন গন্ডোলার কাউন্টারের সামনে থামলাম, তখন বাজে একটা। কাউন্টারের সামনে দেড় কিলোমিটার লম্বা লাইন দেখেও আমি ঘাবড়াই নি, কারণ ফার্স্ট ফেজের টিকিট তো আমার কাটাই আছে অনলাইনে। প্রিন্ট আউট নিয়ে এগিয়ে গেলাম।

    কিন্তু অচিরেই ভুল ভাঙল। লাইন দুটি। সে তুমি টিকিট আগে থেকে কেটেই রাখো আর না-ই রাখো। যদি টিকিট কাটা না থাকে, তা হলে টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়াও, তার আবার দুটো পার্ট, একটায় ক্যাশ, আরেকটায় ক্রেডিট কার্ড, আর যদি অনলাইনে আগে থেকে টিকিট কাটা থাকে, তা হলে সেটা দেখিয়ে বোর্ডিং পাস নেবার জন্য আরেকটা লাইন। আর টিকিট বা বোর্ডিং পাস নেওয়া হলে পরে গন্ডোলায় ওঠার জন্য আরও একটা লাইন, যে লাইনের শেষটা দেখা যাচ্ছিল, মুখটা আর দেখা যাচ্ছিল না। ... মনে হচ্ছিল সারা ভারতের লোক বোধ হয় সেদিন গন্ডোলায় চড়ার জন্য চলে এসেছে। বিভিন্ন ভাষায় গালিগালাজ, লাইন ভাঙা, এখানে ওখানে বসে পড়া, মানে সে এক ক্যাওসের চূড়ান্ত।

    শুধু লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সওয়া দুটো বাজল, তখনও বোর্ডিং পাস হাতে পাই নি, খুব তাড়াতাড়ি যে পাব, সে আশাও নেই। সকলের সম্মতি নিয়ে তাই স্থির করা হল গন্ডোলা কাটিয়ে দেওয়া হোক, ছোটদের খিদে পেয়েছে, টাকা ফেরত নিয়ে খেয়েদেয়ে মানে মানে শ্রীনগর ফেরা হোক। শেষ গন্ডোলা নাকি চলবে তিনটের সময়, কোনো আশা নেই যে তার মধ্যে আমরা গন্ডোলা উঠতে পারব। খেয়ে এসে লাইনে দাঁড়াবারও প্রশ্ন নেই, কারণ নিয়ারেস্ট খাবার জায়গা সেখান থেকে দেড়-দু কিলোমিটার দূরে।

    পাশেই একটা জানলার ওপরে লেখা ছিল রিফান্ড কাউন্টার। লাইন ছেড়ে সেদিকে গেলাম। জানলা বন্ধ, পাশের দরজাও বন্ধ। পেছনে অনেকগুলো লোক বলছিল, ভাই এখানে রিফান্ড হবে না, চলে যাও, তো তাদের ইগনোর করেই দরজা ঠকঠকাতে লাগলাম।

    কাচের ওপাশ থেকে এক কাশ্মিরী মুখ বেরিয়ে এল, অপরিসীম বিরক্তি নিয়ে, কেয়া হুয়া?

    বললাম, রিফান্ড চাই। ফেরত যাবো।

    কাশ্মিরী ছেলেটি এক বিকৃত মুখভঙ্গি করে বলল, নিকাল লে। রিফান্ড নেহি হোগা।

    এইবার গেল আমার মটকা গরম হয়ে, নেহি হোগা মানে? ওপরে লেখা আছে যে, রিফান্ড কাউন্টার? রিফান্ড হবে না তো বোর্ড টাঙিয়ে রেখেছিস কেন?

    ছেলেটি কোনো আর্গুমেন্টেই গেল না, কেয়া করেগা কর লে তু, এক পয়সা ভি রিফান্ড নেহি হোগা য়ঁহাপর, বলেই ঠকাস করে কাচ বন্ধ করে ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেল।
  • Nina | 22.149.39.84 | ২৬ জুন ২০১২ ২১:০৪558585
  • এব্বাবা! তাপ্পর??
    এই প্লিজ এখানেই থেমে যাসনা আজ--আর একটু বল
  • সিকি | 132.177.155.55 | ২৬ জুন ২০১২ ২১:২০558596
  • দাঁড়াও, লেখা আর ছবি আপলোডানো একসাথে চলছে। আসিতেছে।
  • a | 75.204.229.11 | ২৬ জুন ২০১২ ২১:৩৭558607
  • সিকি, রোজ দুবেলা আসছি পড়তে। তা গ্যাঁড়া যায়নি এবার কাশ্মির?
  • সিকি | 132.177.187.171 | ২৬ জুন ২০১২ ২২:২২558618
  • গ্যাঁড়া পাঁড় দিল্লিওয়ালা। ও দিল্লি ছেড়ে নড়েই না। একবার ছেন্নাই গিয়েই হাল খারাপ হয়ে গেছিল।
  • সিকি | 132.177.187.171 | ২৬ জুন ২০১২ ২২:৪৪558626
  • না, আজকের মত ক্ষ্যামা দিতে হল। চারচারবার চেষ্টা করেও ছবি আপলোডাতে পারলাম না। পিকাসায় কীসের প্রবলেম হচ্ছে কে জানে! ছবি না তুললে লেখা পোস্ট করেও লাভ নেই।

    খেয়ে উঠে আরেকবার দেখব। না হলে আবার কাল সন্ধ্যেয়। পুরো সন্ধ্যেটা নষ্ট হল।

    এই দেরির জন্য সিকি দায়ী নয়, দায়ী বিপ পাল আর তার সার্ভার।
  • সিকি | 132.177.187.171 | ২৬ জুন ২০১২ ২২:৪৪558625
  • না, আজকের মত ক্ষ্যামা দিতে হল। চারচারবার চেষ্টা করেও ছবি আপলোডাতে পারলাম না। পিকাসায় কীসের প্রবলেম হচ্ছে কে জানে! ছবি না তুললে লেখা পোস্ট করেও লাভ নেই।

    খেয়ে উঠে আরেকবার দেখব। না হলে আবার কাল সন্ধ্যেয়। পুরো সন্ধ্যেটা নষ্ট হল।

    এই দেরির জন্য সিকি দায়ী নয়, দায়ী বিপ পাল আর তার সার্ভার।
  • সিকি | 132.177.187.171 | ২৬ জুন ২০১২ ২৩:৪৩558627
  • খুব ইচ্ছে করছিল এক থাপ্পড়ে কাচটা ভেঙে দিয়ে আসি, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে কে যে কী রিয়্যাক্ট করবে, আর আশেপাশে পুলিশ ইত্যাদি দেখে বিদেশ বিভুঁইয়ে আর সে সাহস করলাম না। অপমানটাকে জাস্ট গিলে নিয়ে ফেরত চলে আসতে হল। সাতজন লোকের তিনশো টাকা করে পুরো দুহাজার একশো টাকা এক কথায় চোট হয়ে গেল।

    ঝকঝকে নীল আকাশ, ধবধবে সাদা বরফমাখা পাহাড়চূড়োর হাতছানি, দিগন্তবিস্তৃত সবুজ মাঠ, সাদা হলুদ বেগনি ফুলের সমারোহ, সব এক লহমায় বিবর্ণ হয়ে গেল আমাদের কাছে। এইভাবে অপমান করল? গুরগাঁওতে এই ধরণের ব্যবহার স্বাভাবিক, তাই বলে কাশ্মীরে? গুলমার্গে? এত ট্যুরিস্টের ভিড় বলেই কি ছেলেটা আমাকে এইভাবে কেয়া করেগা কর লে তু ... বলে অপমান করার সাহস নিল?

    সবাই মিলে নিজেদের মধ্যেই গুষ্ঠির তুষ্টি করতে করতে ফিরছিলাম খাবারের জায়গার দিকে, এইবার পাকা রাস্তা ধরে। ফিরতে গিয়ে বুঝতে পারলাম সেই ঘোড়াওয়ালাও আমাদের মুর্গি করেছিল, আসলে গাড়ি রাখার জায়গা থেকে গন্ডোলার কাউন্টার খুব একটা দূরে ছিল না। আমাদের গজগজানি শুনে পথ চলতে চলতেই আমার পাশে এগিয়ে এল আরেক কাশ্মীরি যুবক। কথায় কথায় জানলাম, শ্রীনগরে তার বাড়ি। সে-ই বলল, এরকমই হয় গুলমার্গে। আপনারা তো তাও বাইরে থেকে এসেছেন, আমি তো কাশ্মীরি, আমি তো এদের কাছে লোকাল লোকের মতই, আমাদের সাথেও এরা এই রকমই ব্যবহার করে। দিল্লি থেকে এসেছেন, বরফ দেখতে, পাহাড় দেখতে, তো সোনমার্গ যান, পহেলগাঁও যান, কাশ্মীরের আরও অন্য অনেক জায়গা আছে, সেখানে যান। কিন্তু গুলমার্গে আর কোনোদিন আসবেন না। এরা বাকি কাশ্মীরিদেরও হাতে মাথা কাটে। এই গন্ডোলা-চালানো লোকগুলো সত্যিই গন্ডগোলের।

    বোধ হয় আমাদের মন-খারাপকে সহানুভূতি জানাতেই সাদা পাহাড়ের পেছন থেকে নীল আকাশকে ছেয়ে ধরল একদঙ্গল কালো মেঘ। দেখতে দেখতে হাওয়া পালটে গেল, আমরা যতক্ষণে পার্কিং-এর কাছে একটা হোটেলে খাবার জায়গা খুঁজে বসলাম, ততক্ষণে ভিজে হাওয়া বইতে শুরু করেছে, কালো মেঘের দল আকাশের খুব নিচ দিয়ে, প্রায় আমাদের হাতের ধরাছোঁয়ার মধ্যেই কুণ্ডলী পাকাতে শুরু করেছে।

    খাবার খুব ভালো কোয়ালিটির ছিল না, প্রায় প্রত্যেকের হজমের সমস্যা শুরু হয়ে গেছিল ফেরার পথে, এক আমার ছাড়া (আমার তো তাগড়া লিভার, লোহা চিবিয়েও হজম করে ফেলি), তবে খাবার শেষ হওয়া মাত্র শুরু হল বৃষ্টি ... না, ঠিক বৃষ্টি নয়, অর্ধেক তুষারপাত, অর্ধেক বৃষ্টি। নরম তুলোর মত স্নো-ফ্লেকস পড়তে শুরু করল, হাতে নেওয়া মাত্র গলে যাচ্ছে।

    বিদেশ বিভুঁই যে একেবারে দেখি নি, তা নয়, তবে চোখের সামনে তুষারপাত দেখি নি কোনোদিন, গুলমার্গ আমাদের মন ভালো করে দিল জীবনের প্রথম স্নো-ফল দেখিয়ে। অদ্ভুত ব্যাপার, বরফ পড়ছে, সামনের সাদা রঙের বিশাল পাহাড়চূড়াটা ধীরে ধীরে আরও, আরও সাদা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ঠাণ্ডা তো তেমন নেই! এই ডিসেম্বরের গোড়ায় দিল্লিতে যেমন টেম্পারেচার থাকে, ঠিক তেমনই ঠাণ্ডা। উপাদেয়, আরামদায়ক।

    বৃষ্টি শুরু হল, কেটেও গেল খুব তাড়াতাড়ি। মেঘ সরে গেল অন্যদিকে। নীল আকাশের বুকে আবারও ঝলমলিয়ে উঠল সাদা পাহাড়চূড়ো। তাকে গুডবাই জানিয়ে আমরা উঠে বসলাম গাড়িতে।

    বিকেল বিকেল পৌঁছে গেলাম শ্রীনগরের ট্রানজিট ক্যাম্পে। শহর থেকে অনেক দূরে, বাদামী বাগ বলে একটা জায়গায়, একটা গাছে ছাওয়া অ্যাভেন্যুয়ের দুপাশে শ্রীনগরের মিলিটারী ছাউনি এলাকা, সেইখানেই পরিচয়পত্র চেক করার পরে একটা গেট দিয়ে যখন ঢোকার অনুমতি পেলাম, ভেতরটা দেখে মন ভালো হয়ে গেল।

    শ্রীনগরের কিচ্ছুটি দেখা হয় নি। শালিমার গার্ডেন, মুঘল গার্ডেন, নিশান্ত গার্ডেন, টিউলিপ গার্ডেন ... বাগানের শহর শ্রীনগরে একটা বাগানও না দেখে গুলমার্গে সারাদিন নষ্ট করে এসেছি, কিন্তু এইখানে লোকচক্ষুর আড়ালে আর্মির ট্র্যানজিট ক্যাম্পে এক বিশাল বাগান তৈরি করে রাখা রয়েছে। কয়েকশো রকমের ফুল, যার মধ্যে বেশির ভাগই গোলাপ ফুল, নরম ঘাসের গালিচা-পাতা লন, এক কোণে খরগোশের খোঁয়াড়, আর সামনে চিনার গাছের পাতা দিয়ে মোড়া ডাইনিং হল্‌, সে এক অপূর্ব দৃশ্য।

    সামান্য এইটুকুনি জার্নিতেই সিকিনী তখন ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছে ঘরে, আমি চিন্তায় পড়েছি, গুলমার্গ থেকে শ্রীনগর, এ তো কিছুই দূরত্ব নয়, আসল জার্নি তো শুরু হবে আগামী কাল থেকে, এখনই ক্লান্ত হয়ে পড়লে এরা লে পর্যন্ত পৌঁছবে কী করে? কী আর করা, একা একা ক্যামেরা নিয়ে আর সাঁঝকে সঙ্গে নিয়ে নেমে এলাম বাগানে, মন ভরে প্রায় প্রতিটা ফুলের ফটো তুলতে লাগলাম, আসলে হাত মকশো করা আর কি। আমার তেমন ভালো ক্যামেরাও নেই, আমি ছবি তুলতেও পারি না বুনানের মত, তার মধ্যেই যেটুকু যা ছবি তুলেছি ফুল-টুলের, তুলে দিলাম, আজকের কোটায়, দেখে নিন ... ৫২ নং অনওয়ার্ডস, ১০ তারিখের ছবি।

    সারা জীবন আর্মির লোকেদের তাঁবেদারি করতে করতে চৌহানের ব্যবহারটা টিপিকাল মিলিটারি ভৃত্যসুলভ হয়ে গেছে। সবাইকেই স্যর বা ম্যাডাম করে ডাকে (আমার বউকে ম্যাডাম ডাকতেই পারে, অফিসে সে চৌহানের বস), কারুর প্রশ্নের উত্তর দেবার সময়ে "ইয়েস" বা "ও-কে"-টাকে সম্পূর্ণ উহ্য রেখে মিলিটারি স্টাইলে উত্তর দেয়, "স্যর"। ধরুন, বললাম, চৌহানজি, কাল সকাল সাতটায় স্টার্ট করতে হবে কিন্তু, মিলিটারি কনভয় বেরোবার আগেই আমাদের হাইওয়ে ধরে নিতে হবে, চৌহান উত্তরে বলবে, "স্যর"। ... "কাল তা হলে রাস্তাতেই কোথাও দাঁড়িয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিই?" -- "স্যর।"

    তো সেই চৌহানই ভয় দেখিয়ে রেখেছিল, আর্মি মেসে নাকি সাঙ্ঘাতিকভাবে ড্রেসকোড মেইনটেন করা হয়। পুরো ফর্ম্যাল শার্ট প্যান্ট শু পরে না গেলে নাকি ডাইনিং হলে ঢুকতে দেয় না। এই সব কেতা মাইরি বেড়াতে বেরিয়ে মাথায় রাখতে আদৌ ইচ্ছে করে না, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে মিলিটারির সমস্ত এসট্যাবলিশমেন্ট এমন সব জায়গাতেই হয়, যেগুলো মূল শহর থেকে অনেক, অনেক দূরে। ধারে কাছে খাবার দ্বিতীয় কোনও অপশন থাকে না। নিজের গাড়িও নেই যে টুক করে নিয়ে বেরিয়ে গিয়ে খেয়ে আসব। অতএব, স্রেফ "আর্মির মেস"-এ খাবার জন্যেই আমাকে একপ্রস্থ ফর্ম্যাল শার্ট, প্যান্ট আর জুতো ক্যারি করতে হয়েছিল নিজের জিনস টিশার্ট আর স্নিকার্সের সঙ্গে।

    সেইমত ধরাচূড়ো পরে রাত নটার সময়ে ডাইনিং হলে পৌঁছলাম। ও হরিবোল, গিয়ে দেখি বেশ কিছু লোক দিব্যি জিনস স্নিকার পরে হাম হাম করে চিকেন ভাত খাচ্ছে। মনে মনে চৌহানের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু গাল পেড়ে পেট ভরে ভাত-মাংস খেয়ে নিলাম।

    পরদিন সকাল থেকে আসল যাত্রা শুরু। গন্তব্য দ্রাস। কারগিলেও নাকি জায়গা পাওয়া যায় নি, তাই দ্রাসে মিলিটারি ফিল্ড হসপিটালের গেস্টহাউসে আমাদের থাকার জায়গা করা হয়েছে।
  • ঐশিক | 132.179.35.62 | ২৭ জুন ২০১২ ০০:৪০558628
  • কোথায় গেলে ওস্তাদ-- কোথায় গেলে:(
  • hu | 22.34.246.72 | ২৭ জুন ২০১২ ০২:১৬558629
  • দুর্দান্ত হচ্ছে।
  • pipi | 139.74.191.152 | ২৭ জুন ২০১২ ২০:১৭558630
  • অ সিকি! কই গেলে?
  • Nina | 22.149.39.84 | ২৭ জুন ২০১২ ২০:২৬558632
  • সিকি হে ----বসে আছি
  • সিকি | 132.177.187.171 | ২৭ জুন ২০১২ ২১:২১558633
  • দাঁড়ান। চলছে।
  • সিকি | 132.177.187.171 | ২৭ জুন ২০১২ ২২:৪৯558634
  • ১১ জুন ২০১২

    সক্কাল সক্কাল শুরু হল আমাদের যাত্রা। বিলালএর সঙ্গে ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছিল শ্রীনগর থেকেই, ও আমাদের চারদিনে লে পৌঁছে দেবে। দিয়ে ফিরে আসবে, কারণ লে শহরে শ্রীনগরের ট্যাক্সির চলার অনুমতি নেই। জম্মু কাশ্মীরে প্রতিটা এলাকায় আলাদা ট্যাক্সি ইউনিয়ন আছে, স্থানীয় ইকনমিকে সাহায্য করার জন্য, তাই শ্রীনগরের ট্যাক্সি কেবল শ্রীনগরেই বিজনেস করতে পারে, কারগিলের ট্যাক্সি কারগিলে, জানস্কারের ট্যাক্সি জানস্কারে, এবং লে-র ট্যাক্সি লে-তে কেবল বিজনেস করে।

    যাই হোক, দুধারে চিনার গাছের সারি, নানা রকমের পাহাড়, পাশে-পাশে লুকিয়ে চলা নদী ইত্যাদি ঝড়ের বেগে পেরোতে পেরোতে হঠাৎই দেখলাম সামনের বরফের পাহাড়টা প্রায় আমাদের সামনে চলে এসেছে, একটু এগোলেই ধরে ফেলা যায়, এমন দূরত্বে। বেলা দশটা নাগাদ আমরা এসে পৌঁছলাম সোনমার্গে। সামনে ঝকঝক করছে সাদা টুপি পরা পাহাড়। মন্দাকিনী গ্লেসিয়ার।

    এইখানেই আমাদের থাকার কথা ছিল, নাকি আর্মির লোকজন এখানে আমাদের জন্য অ্যাকোমোডেশন দিতে পারে নি, তাই আমাদের দুদিন শ্রীনগরে থাকতে হয়েছিল। আমি অবশ্য ওপর ওপর দেখে বিশেষ কিছু হোটেল আছে বলে বুঝলাম না, জাস্ট হাতে গোনা তিনচারটে ছাড়া।

    এখান থেকে ঘোড়ায় করে যেতে হয় মন্দাকিনীর উৎসে। মন্দাকিনী গ্লেসিয়ার। মন্দাকিনী বললেই মনে পড়ে না সেই সিনেমাটার কথা? সি-থ্রু সাদা শাড়ি পরে রাম-তেরি-গঙ্গা-ময়লির সেই উত্তেজক স্নান এবং গান? ঠিক ধরেছেন, ঠিক এইখানেই সেই গানের শুটিং হয়েছিল বলে রাজকাপুরবাবু মহিলার নাম রেখেছিলেন মন্দাকিনী।

    ঘোড়াওয়ালা দর হাঁকল পার ঘোড়া বারোশো টাকা। খুব অল্প আয়াসেই সেটা পার ঘোড়া আটশো টাকায় নেমে গেল। সিকিনী তখনো সুস্থ বোধ করছে না। আর চৌহানের মেয়ে তো বেসিক্যালি গাছনেকি টাইপের। তার নাকি গাড়িতে চাপলেই শরীর খারাপ লাগে। বাইশ বছরের একটা হাট্টাকাট্টা চেহারার মেয়ে কেমন পাঁচনগেলা মুখ করে বসে থাকে আর ঘুমোতে থাকে। চৌহানের ছেলের বয়েসও ওইরকম, তারও ওই এক রোগ। একটা আইপড কানে লাগিয়ে পাঞ্জাবী ভাংরা শোনে, আর ঘুমোয়। চারপাশের সৌন্দর্য দৃশ্য কিছুই ওদের আকৃষ্ট করে না।

    চৌহানপুত্র তো ঘোড়ায় চড়তে রাজি, কিন্তু চৌহানকন্যা গাড়িতে বসে ঘুমনোই প্রেফার করল। তার নাকি শরীর খারাপ লাগছে। সিকিনীও শরীর ভালো লাগছে না, এই দোহাই দিয়ে গাড়িতে বসে থাকাই প্রেফার করল, কিন্তু ঘোড়াওয়ালা যেই ঘোড়া আনতে গেল, অমনি সিকিনী এক লহমায় সুস্থ হয়ে গেল। অগত্যা আরেকটা ঘোড়া আনার জন্য বলতে হল।

    স্টার্টিং পয়েন্ট থেকে ন কিলোমিটার দূরত্বে মন্দাকিনীর গ্লেসিয়ার। যাওয়া আসা মিলিয়ে মোট আঠেরো কিলোমিটার ঘোড়ার পিঠে। অনেকে হেঁটেও যায়, বাকিরা ঘোড়ায় যায়। সবুজ মাঠের মধ্যে দিয়ে খানিক দুলকি চালে চলার পরে শুরু হল আসল পাহাড়ী রাস্তা। মানে, রাস্তা বলে কিছু নেই, পাথরের খাঁজখোঁজ দিয়ে খুর চালিয়ে চলার পথ খুঁজে বের করে নেওয়া। ঘোড়া কখনো ওপরে উঠছে, কখনও নিচে নামছে, সেই বুঝে শরীরটাকে সামনে অথবা পেছনে ঝোঁকাতে হচ্ছে। কখনো ঘোড়ারা নিজেদের মধ্যে কম্পিটিশনও চালাচ্ছে। পাশের ঘোড়া এগিয়ে গেলে এই ঘোড়া ফরররর করে আওয়াজ করে ওর পেটে গুঁতিয়ে দিচ্ছে। আর সেই ঘোড়ার পিঠে যদি কোনো মহিলা বসে থাকেন, তা হলে সুন্দর সুরেলা আঁআঁআঁআঁইআঁইআঁই শব্দে আকাশবাতাস মুখরিত হয়ে আসছে।

    বেশ অনেকক্ষণ এইভাবে চলার পরে ধীরে ধীরে সামনে এল মন্দাকিনী গ্লেসিয়ার। ম্যাগোঃ, ক্ষী নোংরা ক্ষী নোংরা। চারদিকে কাদায় মাখামাখি হয়ে আছে বরফের বিশাল চাদর। অজস্র ঝুপড়িদোকানে বিক্রি হচ্ছে চা-কফি-ম্যাগি-কোল্ড ড্রিংস। এক কাপ চা পঁচিশ টাকা। আর কাঠের পাটায় দড়ি বেঁধে "স্লেজওলা"রা ওপর থেকে স্লেজে করে গড়িয়ে নামার আনন্দ দেবার জন্য সমানে পেছনে লেগে ঘ্যানঘ্যানঘ্যানঘ্যান করে যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে। সে কী বিরক্তিকর আবহাওয়া। ওই নোংরা বরফে স্লেজ করার আমাদের বিন্দুমাত্রও ইচ্ছে ছিল না, না আমার, না মেয়ের, না সিকিনীর, তাতে কি দমে তারা? বেলা একটার সময়ে একের পর এক স্লেজওয়ালা আসছে আর ঘেনিয়ে যাচ্ছে, বউনি কা টেইম হ্যায়। চঢ় লো।

    কোনোরকমে আধঘণ্টা কাটিয়ে ফেরত এলাম ওই ঝুপড়ি দোকানসমূহের সামনে। ঘোড়াওয়ালার ওখানেই থাকার কথা। কিন্তু কোথায় ঘোড়া? কোথায়ই বা ঘোড়াওয়ালা? ঘোড়া তো সবই এক রকমের দেখতে লাগে। ঘোড়াওয়ালার মুখ চিনে তো রাখি নি, কেবল নামটা মনে ছিল, ওয়াসিম। ওয়াসিম ওয়াসিম করে অনেক হাঁক পাড়লাম। দু চারজন ওয়াসিম জুটেও গেল, কিন্তু তাদের কেউই আমাদের ঘোড়াওয়ালা নয়।

    এই সময়ে শুরু হল বৃষ্টি আর কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া। যদিও গায়ে জ্যাকেট ইত্যাদি চড়ানো ছিল, তবু ঠান্ডায় কাঁপুনি কমানো গেল না।

    ঝাড়া আধঘণ্টা ওইভাবে কাঁপার পরে ঘোড়াওয়ালার দেখা মিলল। বৃষ্টি তখনো থামে নি। কিন্তু সে কথা শুনলে তো ঘোড়াওয়ালার বিজনেস চলবে না। "বারিশ য়ঁহা পে অ্যায়সে হি হোতি হ্যায়, আভি রুক জায়েগি" বলে ঝটপট আমাদের ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে দিল। খানিক বাদে শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি। তখন সামনে অসংখ্য ঘোড়া, পেছনেও তাই, পাথুরে রাস্তা বিষ্টি পড়ে পিছল হয়ে গেছে, পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি মাঝে মাঝে ঘোড়ার খুরও পিছলে যাচ্ছে পাথরে, কাদায় পড়ে। সেই অবস্থায় ভিজতে ভিজতে ফিরে চললাম গাড়ির দিকে। ন কিলোমিটার রাস্তা। বৃষ্টি বাড়ছে, কমছে, আবার বাড়ছে, আমি মেয়ের ওপর প্রায় ঝুঁকে পড়ে কোনোমতে ওকে বাঁচাচ্ছি বৃষ্টি থেকে (ওকে আমার ঘোড়াতেই নিয়েছিলাম), অবশেষে গন্তব্যে আসার খানিক আগে বৃষ্টি থেমে গেল।

    আমাদের পায়ে তখন আর সাড় নেই, হাতের আঙুল ঠাণ্ডায় প্রায় বেঁকে যায়-যায় অবস্থা। তাই দিয়েই কোনোমতে নেমে পার্স বের করে টাকাপয়সা মেটালাম।

    হিমশীতল বৃষ্টিতে ভিজে তখন আমাদের সকলের অবস্থা বেশ খারাপ, গায়ের জ্যাকেট সোয়েটার সমস্ত ভিজে, তা সত্ত্বেও গুটিগুটি গাড়ির মধ্যে গিয়ে ঢুকলাম। জামাকাপড় চেঞ্জ করার কোনওই উপায় নেই, বিলাল, মানে আমাদের ড্রাইভার গাড়ির ব্লোয়ার চালিয়ে দিল। একটু আরাম হল। ওদিকে গাড়ির মধ্যে বসে সেই এক রকমের পাঁচনগেলা মুখ করে চৌহানকন্যা জবুথবু মেরে বসে আছে সামনের সীটে। তার নাকি প্রচণ্ড পেটে ব্যথা হচ্ছে।

    একটু এগিয়েই একটা রেস্টুরেন্টে ঢোকা হল, তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে, গাড়ি থেকে বেরনো মাত্র হি-হি করে কাঁপুনি শুরু হল। তড়িঘড়ি সুপ আর চাওমিনের অর্ডার দেওয়া হল। যতক্ষণ না খাবার এল আর চামচে করে মুখে তুলতে পারলাম, ততক্ষণ রেস্টুরেন্টের ভেতরে চেয়ারে বসে ভিজে জ্যাকেট সোয়েটারশুদ্ধু হি-হি-হি-হি করে কেঁপে গেলাম।

    ইন দি মীন টাইম, খালি পেট আর ঠাণ্ডা লাগার যুগপৎ এফেক্টে কেমন করে জানি না সিকিনীর মেজাজ গেল বিগড়ে। "আর ভাল্লাগছে না, এইভাবে বেড়ানো যায় নাকি, এখান থেকেই ফেরত যেতে ইচ্ছে করছে, মেয়েকে আগে ডাক্তার দেখাতে হবে, ডাক্তার না দেখিয়ে আমি এক পা-ও নড়ব না" ইত্যাদি খিচিমিচি জুড়ে দিল। এদিকে মেয়ে তখন এক এক চামচ করে সুইট কর্ন স্যুপ খেয়ে কাঁপুনি কমাচ্ছে। অনেক কষ্টে সিকিনীকে শান্ত করা গেল। ডাক্তার না দেখিয়েই, শুধু গরম গরম খাবার খেয়ে কাঁপুনি থামিয়ে আমরা আবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম। চৌহানকন্যার মুখ তখনও সেই এক রকমের পাঁচনগেলা। কোঁ-কোঁ করে যাচ্ছে, আর ফ্রন্ট সীটে বসে ঝিমিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বাবার কাছ থেকে নিয়ে কী কী সব ট্যাবলেট নিয়ে মুঠো মুঠো খাচ্ছে।

    দুপুর তখন তিনটে বাজে, এমন সময়ে শ্রীনগর-সোনমার্গের সমতল রাস্তা ছেড়ে পাকদন্ডী রাস্তা শুরু হল, এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই রাস্তার অবস্থা মসৃণ থেকে ভাঙাচোরায় রূপান্তরিত হল। পাহাড়ী রাস্তার এ পাশে পাথর বা গাছপালা কমে গিয়ে ইতিউতি দেখা যেতে লাগল বরফের প্যাচ। আমরা কি এত ওপরে চলে এসেছি? জানলা নামিয়ে দেখলাম এমন কিছু সাঙ্ঘাতিক ঠাণ্ডা নয়, মোটামুটিই ঠাণ্ডা, তবে আকাশ ঘোলাটে, খানিক বাদেই শুরু হল বৃষ্টি। ভুল বললাম, অত উঁচুতে বৃষ্টি হয় না, তুষারপাত শুরু হল, এবং সাথে সাথেই শুরু হল দুদিকে বরফের উঁচু দেওয়াল।

    মনে আছে, জব উই মেট সিনেমার সেই বিখ্যাত গান? ইয়ে ইশক হায়, জন্নত দিখায়ে, বৈঠে বিঠায়ে? ঠিক এই জায়গাতে শুটিং হয়েছিল। উচ্চতা মাত্র ১১৬৪৯ ফুট, নাচানাচিতে খুব একটা কষ্ট হয় না, আর এখানকার বরফ মোটেই সোনমার্গের মত নোংরা নয়। দুপাশে একেবারে ধবধবে সাদা বরফের দেওয়াল। প্রচুর বাইকওয়ালা দেখলাম, সেখানে দাঁড়িয়ে ফটো তুলছে। আমাদের তো দাঁড়াবার প্রশ্নই ওঠে না, চৌহানপরিবার প্রচণ্ড বিধ্বস্ত, বিরক্ত, এবং সেই পাঁচনগেলা মুখ সকলের। মাঝে চৌহানপুত্র একবার বলেও ফেলল, ফ্রিজ খুললেই তো বরফ পাওয়া যায়, তবে লোকে বরফ দেখতে এতদূর আসে কেন!

    মালটার বাপ যদি আমার বউয়ের কলিগ না হত তা হলে ওখানেই দুটো থাবড়া লাগিয়ে চারটে খিস্তি মেরে দিতাম। এই ধরণের পাবলিকের জন্য কোনো ভদ্র সিভিলাইজড ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজ করা যায় না। শুধু ওই কটা লোকের জন্য গাড়ির ভেতরটা একেবারে তেঁতোস্য তেঁতো হয়ে রয়েছে, আর বাইরের দৃশ্য তত চমকে চমকে দিচ্ছে। মুগ্ধ করে দিচ্ছে। চৌহান, তার ছেলে, মেয়ে, বউ, সকলেই, কেউ হাঁ করে, কেউ মুখ গুঁজে, কেউ কাত হয়ে ঘোঁতঘোঁতিয়ে ঘুমিয়ে চলেছে। শালারা এসেছিল কেন?

    সন্ধ্যে প্রায় সাতটা নাগাদ দ্রাসে পৌঁছলাম। ছোট্ট গ্রাম, খানিক খুঁজে বেড়াবার পরেই থাকার জায়গা খুঁজে পেলাম। চারদিকে বরফে ঢাকা পাহাড়ের প্যানোরামিক ভিউ, তখন সূর্য অস্ত যাব-যাব করছে। তার মাঝে গাছে ঘেরা একটা এলাকার মধ্যে সুন্দর সাজানো গোছানো কিছু কটেজ। আর্মি অ্যাকোমোডেশন। পাওয়ার লাইন বলতে, জেনারেটর চলে। রাত এগারোটায় সব বন্ধ করে দেওয়া হয়। গীজার চলে না, তবে বললে গরম জল দিয়ে যাবে বালতি করে। ঘরে টিভি চলে, টাটা স্কাই আছে। ইলেকট্রিক ব্ল্যাঙ্কেট আছে, আর রুম হীটার আছে।

    শীতে কেঁপে কেঁপে তখন আমাদের অবস্থা কাহিল। সুটকেশ খুলে দেখি তুষারপাতে সুটকেস ভিজে গেছে, ওপরের লেয়ারের জামাকাপড় ভিজে গেছে।

    সারা সন্ধ্যে জুতো, মোজা, পায়জামা, সোয়েটার, জ্যাকেট হীটারের সামনে ধরে ধরে শুকোলাম। রাতে খাবার সময়ে বেরোতেই হবে, মেস ছাড়া খাবার নিয়ম নেই। বেরোতে গিয়ে টের পেলাম ঠাণ্ডা কী জিনিস। হাড়ের ভেতর অবধি কাঁপিয়ে দিচ্ছে। কোনোরকমে খাবার শেষ করে ফিরে এলাম কটেজে। এখানে নন ভেজ পাবার জাস্ট কোনও গল্পই নেই। রুটি সবজি ডাল ভাত, আর লাস্ট পাতে গরম গরম গুলাবজামুন।

    রাতে শোবার জন্য স্লিপিং ব্যাগ। জেনারেটর তো এগারোটায় বন্ধ হয়ে যাবে, হীটার আর চলবে না। কী ভালো কী ভালো স্লিপিং ব্যাগ ছিল, একবার সেঁধিয়ে গেলাম, পরদিন একদম সকাল সাড়ে ছটায় ঘুম ভাঙল। এতটুকু ঠাণ্ডা লাগল না। ঘুম থেকে উঠে একদম ফ্রেশ।

    আজ লে পৌঁছনোর কথা। তারও আগে, আজ দ্রাসের ফিল্ড হসপিটালে আমাদের অনারে ব্রেকফাস্ট। সৌজন্যে কর্নেল রণধাওয়া।

    ( আবার কাল)
  • cb | 228.186.9.244 | ২৭ জুন ২০১২ ২৩:০৬558636
  • সত্যের পথ হতে বিচ্যুত নেহি হো রহা হ্যায়,
  • Nina | 22.149.39.84 | ২৭ জুন ২০১২ ২৩:০৭558637
  • বাপরে সিকি--
    তোর কাশ্মীর ঘোরা তোএকেবারে কনসান্ট্রেশন ক্যাম্প কে মাফিক হয়ে যাচ্ছে---

    "সঙ্গ " তাই বুঝে শুনে নেয়া উচিৎ--

    সাথ মে চৌহান তো কাশ্মীর হো পরেশান !!তোর ভ্রমণকাহিনীর নাম ঃ-)))
  • সিকি | 132.177.187.171 | ২৭ জুন ২০১২ ২৩:১২558638
  • একদম।
  • সিকি | 132.177.187.171 | ২৭ জুন ২০১২ ২৩:১৫558639
  • প্রসঙ্গত, সেদিনের তুলকালাম বৃষ্টিতে ভেজার পরে একবারের জন্যেও ডাক্তার না দেখানো সত্ত্বেও আমাদের কারুর সর্দি, জ্বর, ফ্যাঁচফ্যাঁচ, ফোঁচফোঁচ, গলাব্যথা কিস্যু হয় নি। ওসব কেবল পলিউটেড সমতলভূমিতে হয়। স্বর্গের কাছাকাছি ঠাণ্ডা লাগে না।
  • সোমনাথ২ | 217.239.86.106 | ২৮ জুন ২০১২ ০০:১৮558640
  • ফাটাফাটি হচ্ছে !
  • শঙ্খ | 169.53.110.141 | ২৮ জুন ২০১২ ০০:২২558641
  • খুব সম্ভবত তার কারণ ওখানে ঐ রকম ঠান্ডায় জার্ম থাকে না।

    আন্টার্কটিক জার্নাল বলে একটা কোরিয়ান মুভিতে ডায়ালাগ ছিলো, আর যেভাবে হোক, আণ্টার্কটিকাতে নাকি সর্দি জ্বরে কেউ ভুগবে না, ঐ একই কারণে।

    লেখাটা জবরদস্ত হচ্ছে। চৌহানের ভিলেনি দেখার জন্যে মুখিয়ে বসে আছি।
  • প্পন | 122.133.206.25 | ২৮ জুন ২০১২ ০১:১৭558643
  • শীতের মানালিতে এক এক্ষপেরিয়েন্স হয়েছিল। পুরো ভিজে চুপচুপে আমরা, ক্যামেরার লেন্সে বরফের গুঁড়ো, কোনমতে গাড়ির হিটার চালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলাম। কিন্তু একটুও সর্দি জ্বর হয়নি।

    মানালিতে প্রথম দিনেই ওই এক্ষপেরিয়েন্স, তারপর দুদিন হোটলের ঘরের জানলা দিয়ে দেখা কীভাবে পুরো শহর, বিয়াস নদীর ওপর বিচ, পাইনের বন, পার্ক করা গাড়ি, হোটেলের ঘরের ছাদ আস্তে আস্তে সরোভস্কির ক্রিস্টালে পরিণত হতে থাকে। স্বর্গ কাকে বলে টের পেয়েছিলাম ওই দু'দিন। একটুও সাইট সিইং হয়নি, নেহরুকুন্ড ছাড়া, কিন্তু তাতে একটুও দুঃখ নেই। এবং ইয়েস, চয়েস দিলে আবার আমি শীতেই মানালি যাব, গরমে নয়।

    চৌহানের ভিলেনগিরির মুখোমুখি হব বলে আমিও রুদ্ধশ্বাসে বসে আছি।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন