এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  অন্যান্য

  • পায়ের তলায় সর্ষেঃ জুলে, লাদাখ!

    সিকি
    অন্যান্য | ২৩ জুন ২০১২ | ১২২০৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • pipi | 139.74.191.52 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০২:১২558442
  • ঠিক ঠিক ঠিক। রাজমা অতি ধিক।
  • aka | 178.26.215.13 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০২:২০558443
  • সত্যি বলতে কি নিন্দা করায় সিকিকে আমি একটু গাল দিলেও সূর্যাস্ত না দেখতে পারার জন্য একটা কিটক্যাট দিলাম। গাড়িতে গাড়িতে ঘুরে লোকে কি করে এত থকে যাচ্ছিল সেটাই বুঝলাম না।
  • hu | 22.34.246.72 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০২:৩৩558444
  • সিকির জন্য আমারও খুব দুঃখ হচ্ছে। যাই হোক, পরের বার দেখো। লেখাটা তুখোড় হচ্ছে।
  • pipi | 139.74.191.52 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০২:৪৮558445
  • না আকা, গাড়িতে ঘুরেও মানুষ থকে যায়। আমি ঐজন্য হাঁটা বরং বেশি পছন্দ করি একটানা গাড়িতে বসে থাকার চেয়ে। আমার মোশন সিকনেস আছে, কেদার-বদ্রী ঘুরতে গিয়ে গাড়ি যত পাকদণ্ডী ধরে উপরে উঠছে তত আমি মাথা ব্যথা আর গা গুলুনির চোটে এলিয়ে পড়ছিলাম। সাথে অন্য পরিবার ছিল বলে গাড়ি থামাতে বলতে পারি নি (আর কতবারই বা থামাতে বলব) কিন্তু অসহ্য কষ্ট হয়েছিল। এ যাদের হয় না তারা বুঝবে না। চৌহানের মেয়ের জন্য আমার তাই একটু হলেও সিমপ্যাথি আছে কারণ হাই অল্টিট্যুড সিকনেস - মোশন সিকনেস সব মিলিয়ে যে কি কষ্টের এ যে নিজে না ভুগেছে সে ছাড়া কেউ বুঝবে না।
    অবশ্য চারিদিকের ঐ অপার্থিব সৌন্দর্য্যের প্রতি কি করে কেউ সম্পূর্ণ immuneথাকতে পারে এটা একটা বিস্ময়কর ব্যাপার বটে। আমি তো মাথা তুলতে পারলেই গাড়ি থেকে মুখ বাড়িয়ে বাইরের দৃশ্য চোখ দিয়ে যতটা পারা যায় চাটছিলাম। তএ ঐ আর কি, শরীর সাথ না দিলে মনও সাথে থাকে না।
  • aranya | 154.160.226.53 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৩:০৬558446
  • ভোর চারটেয় উঠে কুয়াশাঢাকা একটা গিরিপথ টাইপের রাস্তা দিয়ে ড্রাইভ করে লামার ভ্যালিতে (ইয়েলোস্টোন) গ্রিজলী দেখতে গিয়েছিলাম। দেখেওছিলাম দু চোখ ভোরে - ভোরের নরম আলোয় এলিয়ে রয়েছে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ উপত্যকা, ঘাসের বুকে ঢেউ তুলে ছুটছে মা গ্রিজলী, পেছনে তিনটে গাবলু গুবলু বাচ্চা।
    ফেরার পর আপিসে কলীগ কল্পেশ শাহ গপ্পো শুনে বলল - আরে ইয়ার ও ভালুক তো ব্রন্ক্স জু-তেই দেখা যায়।
  • একক | 24.99.8.103 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৩:১০558448
  • মীয়নীজ + গোবর উড বে বেটার :|
  • একক | 24.99.8.103 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৩:১০558447
  • এইসব লোকের মুখে মার্জারিন ও গোবর এক্সংয়ে মিশিয়ে লেপে দিতে হয়. মার্জারিন চাটতে গেলেই গোবর খেয়ে ফেলবে !
  • প্পন | 122.133.206.25 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৩:১৪558449
  • অলটিট্যুড সিকনেস প্রথম এক-দু'দিনের অ্যাক্লাইমেটাইজেশনের পরে ঠিক হয়ে যায়।

    মোশন সিকনেস যার থাকে তার গাড়িতে লং ডিস্ট্যান্স গিয়ে অন্যের কিলজয় হওয়াই উচিত নয়।

    সিকির ভাষ্য সত্যি হলে চৌহান ফ্যামিলির ওপর বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই। তবে ঐ আর কী, ভার্ডিক্ট দেবার আগে বাদী-বিবাদী উভয়পক্ষের সওয়াল শোনা উচিত। ঃ)
  • rimi | 85.76.118.96 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৩:১৭558450
  • না, পৃথিবীসুদ্ধু সবাইকেই যে প্রকৃতিপ্রেমিক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। গোবর আর মার্জারিন লেপার প্রস্তাবে আমার কোনো সায় নেই। কেউ যদি প্রকৃতি উপভোগ না করে ভিডিও গেম খেলে কিম্বা টিভি দেখে, আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই, বন্ধুত্ব করতেও বাধা নেই। শুধু তার সঙ্গে আমি বেড়াতে কখনো যাবো না।
  • Sibu | 118.23.96.4 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৩:২০558452
  • অরন্যের গল্পে ইন্দুরাসের গপ্পো মনে পড়ে গেল। ইন্দুরাস আর ইন্দুরানী গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ট্রেক করতে যাবে। বন্ধুর মন্তব্য, আরে মাটির মধ্যে বিশাল গাড্ডা, ও আর দেখার কি আছে?
  • aranya | 154.160.226.53 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৩:২৪558453
  • ঈশেন-ও লিখেছিল না - নায়াগ্রা ফলস জাস্ট একটা বড়্সড় উল্টানো কমোড ঃ-)
  • aranya | 154.160.226.53 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৩:২৬558454
  • রিমি-র সাথে তো সহজে একমত হই না, এই সুযোগে একটা ক দিয়ে দি ঃ-)
  • একক | 24.99.8.103 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৩:২৭558455
  • বন্ধুত্ব কেন করবনা . কী মুশকিল. বন্ধুত্বের বেসিকালি কোনো ক্রাইটেরিয়া হয়না, জমে গেলেই দোস্তি.

    কিন্তু যারা ওসব এনজয় করেনা অথচ সঙ্গে জুতে গিয়ে পেট ব্যথা মাথা ব্যথা করে ঘ্যানঘ্যানায় বা অদ্ভুত সব মন্তব্য করে বা একটু বাড়ির মতো খাবার না পেলে চিললে মাত্ করে তাদের সঙ্গে সম্পক্ক ওই উইক এন্ড পার্টি তেই সীমাবদ্ধ . এই আর কী.
  • Sibu | 118.23.96.4 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৩:২৮558456
  • ওটা মনে হয় পোমো ঈশান মাইমার সাথে ঝগড়া করে লিখেছিল।
  • aranya | 154.160.226.53 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৩:৩৫558457
  • ঈশান আরো একবার মনে বহুত ঘা দিয়েছিল - বাঘ, কুমীর ও পরিবেশ' নামে টই খুলে সুন্দরবনের সব বাঘ, কুমীর মেরে ফেলার পক্ষে সওয়াল করেছিল, যাতে গ্রামের লোকজন বেঘোরে মারা না পড়ে।
    এটা অবিশ্যি ডিফিকাল্ট ইস্যু, প্রতি বছর অনেক জেলে, কাঠুরে, মধু সংগ্রাহক-রা সত্যিই মারা যায় বাঘ, কুমীরের আক্রমণে।
  • Sibu | 118.23.96.4 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৩:৪১558458
  • এই চান্সে রিমিকে একটু আবাজ দেই। জশুয়া ট্রী ন্যাশনাল পার্কে বিকেলের দিকে একটা ওয়াটারিং হোলের পাশে ক্যামেরা হাতে বসে আছি। হঠাৎ দেখি একটা বিগ হর্ন, সাঁঝের ঝোকে জল খেতে এসেছে। রিমির কাঁধে ট্যাপ করে দেখতে বললাম। ও উত্তেজিত হয়ে এমন হাঁউমাউ করে উঠল, হরিন হাওয়া। আমি এখনো উইলডারনেসে বিগহর্নের ছবি তুলব বলে অপেক্ষা করে আছি।
  • rimi | 85.76.118.96 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৬:৪৪558459
  • ঃ-) এই সুযোগে আমিও সিবুদাকে আওয়াজ দি। এখনো পর্যন্ত আমার বেড়াতে যাবার বেস্ট সঙ্গী হল আই এস আই এর কিছু বন্ধু (মাইনাস আকা) আর বৌদি ঃ-) বৌদির সঙ্গে একখানা দারুণ অ্যাডভেঞ্চার হল, জঙ্গলের মধ্যে তাঁবুর ভিতরে বসে ভালুকের লেজের গুঁতো খেলাম, বৌদি বলেছে শিবুদা থাকলে ভালুক কোনোমতেই তাঁবুর ধারে কাছে আসত না।

    (বিগ হর্ন কেন পালিয়েছিল সে বিষয়ে বৌদির মতামত একটু অন্যরকম বোঝাই যাচ্ছে)
  • Sibu | 118.23.96.4 | ০৭ জুলাই ২০১২ ০৭:১৮558460
  • আকা অবিশ্যি রিপোর্ট করেছে পাশের তাঁবুর থেকে সেদিন দুটো বড় কুকুর রাত্রে ছাড়া ছিল। খুব সাহস যাদের তাদের কুকুর আর ভালুকে গুবলেট হয়ে যেতেই পারে। এই আর কি।
  • ডিডি | 120.234.159.216 | ০৭ জুলাই ২০১২ ১৪:০৬558461
  • কুকুর না ছাই। দুটো স্লাইটলি মোটা মতন কাঠবিড়ালি (উডক্যাট) একটু হাঁটাহাটি করছিলো।

    চাঁদের আলোয় একেক সময় অমন দেখায়। নইলে কে কবে শুনেছে গ্রীজলি বেয়ার কুরুর্কু কুক কুক করে আওয়াজ করে ? ভালুকের ল্যাজ কি অমোন মোটা? তাদের গায়ে কি ডোরাকাটা দাগ থাকে ?
    তবে ?
  • প্পন | 122.133.206.25 | ০৭ জুলাই ২০১২ ১৪:২৯558463
  • আর কস্মিনকালেও কেউ শুনেছে লেজের গুঁতো কেউ খায়? লেজের সুড়সুড়ি, লেজের বাড়ি, এমনকি শক্তমতো লেজ হলে লেজের খোঁচা - এই অব্দি ঠিক আছে।

    তাই বলে লেজের গুঁতো? নাই বা হলো বিজলী গ্রেয়ার।
  • bhatta | 132.169.218.156 | ০৭ জুলাই ২০১২ ১৪:৫৮558464
  • আরে এতো জিনুদা দেখি।travelogue টা এক্ঘর হচ্ছে দাদা।লাদাখ লাজবাব
  • kumu | 132.160.159.184 | ০৭ জুলাই ২০১২ ১৫:২০558465
  • গুঁতো টা বাদ্দিয়ে রিমির ৬-৪৪ এর বাকী কথাগুলোতে খুব সাপোর্ট দিলাম।
  • সিকি | 132.177.2.130 | ০৭ জুলাই ২০১২ ২০:১৫558466
  • আরে এই ভট্টা-টা কে? আমায় চিনল কেং কয়ে?
  • de | 130.62.165.93 | ০৭ জুলাই ২০১২ ২০:৪৪558467
  • উঃ! সিকির যেমন লেখা তেমনি ছবি -- আমি জাস্ট ২০১৩ র জন্য অপেক্ষা করে আছি -- আচ্ছা সব্বাই ২০১৪ র প্ল্যান বানাচ্ছে কেন? ১৩ বলে বাদ?

    আর রিমি কে পুরোপুরি ক'। সমমনস্ক লোক না হলে ঘুরতে যাওয়াই উচিত নয়। আমরা কোনকালে কারো সাথে ঘুরতে যাই না -- মানে আমি গেলেও আমার বাকি ফ্যামিলি যায় না ঃ)) বেশীর ভাগ সময়েই দেখি লোকে রিল্যাক্স করার নামে বসে থাকে আর পান-ভোজনেই সময় কাটায়। বেড়াতে গিয়ে ওসব করার আমি কোন মানে বুঝি না!

    তবে সিকি,

    ওদের গাড়িটা ছেড়ে দিয়ে তুমি তো বসে যেতে পারতে প্যাগংয়ের ধারে। পরে অন্য কোন গাড়িতে লিফট নিয়ে যেতে না হয়। সূর্যাস্ত না দেখতে পাওয়ার গপ্পো শুনে আমার খুব খারাপ লাগলো!
  • সিকি | 132.177.2.130 | ০৭ জুলাই ২০১২ ২১:৫১558468
  • দে, পয়সার বড় অভাব। স্পনসরার পেলে এ বছরেই বেরিয়ে পড়তে পারি। যে ধাক্কা গেছে, সামলে উঠতে গেলে দু বছর তো লাগবেই। তারপরে ভালো বাইক কেনার আছে।

    এমনিতে আমরা দু বছর বাদ বাদ বেড়াতে যাই। ২০০৮-এ গেছিলাম রাজস্থান। ২০১০-এ আন্দামান। ২০১২তে হল লাদাখ। হিসেবমত এর পরে কেরালা যাবার কথা। তবে লাদাখটা প্রায় কিছুই "হল" না এবারে আমার মতে, তাই এটা ২০১৪য় আরেকবার রাখছি। পরে না হয় ডিসেম্বরে কেরালাটা হয়ে যাবে।

    গাড়ি ছেড়ে দেওয়া কোনোমতে সম্ভব নয় ওই এলাকায়। কোনো ফোন কাজ করে না, প্রত্যেকে যে যার নিজের গাড়ি ভরে এসেছে। সেখানে অচেনা অজানা আড়াইজন মানুষকে কেউ লিফট দেবে কিনা, সেটা বোঝা-ও তো মুশকিল। দ্বিতীয়ত, ফেরার ছিল তাং শে ফিল্ড হাসপাতালের গেস্ট হাউসে। সেটা যাওয়া আসার রাস্তায় মোটেই পড়ে না, জানতামও না কোনদিক দিয়ে কীভাবে গেলে সেখানে পৌঁছনো যায়, সুতরাং, নিজেদের গাড়ি আর ড্রাইভারই ভরসা।

    এই সব ঝামেলার জন্যেই তো নিজের গাড়ি নিয়ে যেতে হয়। ডিপেন্ডেন্সি বড় বাজে জিনিস।
  • প্পন | 122.133.206.25 | ০৮ জুলাই ২০১২ ০০:৪২558469
  • ডিসেম্বরে কেরালা ট্রিপ বড় কস্টলি। ফরেনাররা এসে এসে এমন হাল করে দিয়েছে। ঃ(
  • সিকি | 132.177.2.130 | ০৮ জুলাই ২০১২ ০১:০৮558470
  • ১৯ জুন ২০১২

    ঘুম থেকে উঠলাম একেবারে ফ্রেশ হয়ে। আগের দিনের আমার মাথাযন্ত্রণা, সিকিনীর হাতে ঝিনঝিন, ব্রেথলেসনেস, কোনো কিছুই নেই আর। কিন্তু চৌহানকন্যা যে এলিয়ে ছিল শুরু থেকে, সেই এলিয়েই আছে। এমনিতে ভাইয়ের সঙ্গে খুনসুটি, মা-বাবা-আন্টি-আঙ্কলের সঙ্গে গল্পগুজব সবই ঠিকঠাক তালে চলছে, কিন্তু "কেমন আছ" জিজ্ঞেস করলেই মুখে আষাঢ়ের মেঘ ঘনিয়ে আসে। তার নাকি গেস্টহাউসে থেকেও কাল সারারাত ঘুম হয় নি, পেটে যন্ত্রণা করেছে, মাথা যন্ত্রণা করেছে। সক্কাল সক্কাল তাই আবার তাং শে ফিল্ড হাসপাতালের কর্নেল ডাক্তার এসে আবার তাকে দেখে গেলেন, এবং যথারীতি বলে গেলেন, কিছুই হয় নি, শি ইজ পারফেক্টলি অলরাইট। ব্লাডপ্রেসার হার্টবীট পেটের অবস্থা সব নর্মাল, অসুখ শুধুই তার মনে।

    আর চৌহানগিন্নির তো কান-কটকট আর কান-মে-দর্দ কখনওই থামে না, সেটিও অ্যাজ ইট ইজ ছিল।

    সুন্দর সাজানো গোছানো ছিমছাম গেস্টহাউসের আশেপাশে খানিক ঘুরে বেড়ালাম, আর্মি অ্যাকোমোডেশনগুলো লোকবসতি থেকে যত দূরেই হোক, এত সুন্দর সিস্টেমেটিক সাজানো গোছানো হয়, যে সকালে উঠে আর মনেই রইল না যে দিল্লি থেকে বেরিয়েছিলাম প্যাংগং লেকের ধারে টেন্টে রাত কাটাবো, এই আশা নিয়ে। মনেও রইল না যে, আমরা এখন আর সোমোরিরি যাচ্ছি না, "আরাম" করতে যাচ্ছি উজিয়ে বহুদূর, কেরি-তে।

    কেরি কোথায়? কেরিতে কেন? ম্যাপ দেখুন। লে-র নিচে কারু দেখতে পাচ্ছেন নিশ্চয়ই? কারুর নিচে উপসী। এখান থেকে রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গেছে। একটা রাস্তা তাংলাং লা হয়ে চলে যাচ্ছে সারচুর দিকে। এটাই মানালি হয়ে লে আসার রাস্তা। আর উপসী থেকে মাঝ বরাবর আরেকটা রাস্তা চলে যাচ্ছে চুমথাং-এর দিকে, এই রাস্তাতেই ঠিক মাঝামাঝি কেরে (Kere) বলে একটা জায়গা দেখা যাচ্ছে? এটাই কেরি। লাদাখি উচ্চারণে ক-গুলো খ হয়ে যায়, তাই এদের কাছে কারু হল "খারু", আর কেরি হল "খেরি"। যাই হোক, আমরা কেরিই বলব।

    কেরি থেকে নিচে আর মাত্র শ খানেক কিলোমিটার নামলেই সোমোরিরির দেখা পাওয়া যেত। কিন্তু ... যাক, এক কথা বার বার রিপিট করে আর কী হবে? যা হয় নি, তা হয় নি।

    কেরিতে একটা ফিল্ড হাসপাতাল আছে আর্মির। প্রতিটা ফিল্ড হাসপাতালের একটা করে নম্বর থাকে, এর নম্বর হচ্ছে ৪০১৪। ফোর জিরো ওয়ান ফোর ফিল্ড হসপিটাল। নতুন ঠিক নয়, অনেকদিনই তৈরি হয়েছে, কিন্তু তেমন নজরে ছিল না এতকাল। অন্যত্র, অন্য কোনো ফিল্ড হসপিটালে জনৈক কর্নেল ডি এন করণ সুপারসীডেড হয়ে গেছিলেন অন্য সহকর্মীদের দ্বারা। মানে, একই র‍্যাঙ্কের অন্য কর্নেলের প্রমোশন হয়ে গেছিল, এঁর হয় নি। তাই মিলিটারির নিয়ম অনুযায়ী ইনি এসসি, মানে স্ট্যাচুটরি কমপ্লেইন্ট দাখিল করেছিলেন, ডিফেন্স মিনিস্ট্রিতে। এর পর ব্র্যাকেটের মধ্যে যেগুলো লেখা উচিত নয়, সেগুলো হল, চৌহানকে তিনি এবং তাঁকে চৌহান পরস্পরের পিঠ চুলকে দেন, এবং ফাইল চালাচালি করতে থাকেন। ফলে, অচিরেই কম্যান্ডিং অফিসারের মর্যাদায় উন্নীত হয়ে তিনি কেরি ফিল্ড হাসপাতালের দায়িত্বে চলে আসেন। এই কৃতজ্ঞতার বোঝা সামলাতে না পেরে, চৌহান লে বেড়াতে আসছে যেই শুনেছেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাদের পুরো টিমকে একদিনের জন্য তাঁর গরীবখানায়, মানে, ফোর জিরো ওয়ান ফোর ফিল্ড হসপিটালে একদিনের আতিথ্য গ্রহণ করার জন্য ঝুলোঝুলি শুরু করেছেন। মোটা দাগে, ডিফেন্স মেডিকেলের সেকশন অফিসার এবং ইউডিসিকে তিনি নিমন্ত্রণ করে এনে দেখিয়ে দিতে চান তিনি দায়িত্ব পেয়ে থেকে এই সো-কলড নেগলেক্টেড হাসপাতালের কী অপরিসীম উন্নতি সাধন করেছেন।

    মেডিকেলের সঙ্গে যুক্ত ফৌজি দু রকমের হয়। এক, যাঁরা ফৌজে জয়েন করার আশা নিয়ে ডাক্তারি বা নার্সিং পড়তে আসেন, ভর্তি হন এএফএমসি পুণেতে (Armed Forces' Medical College), ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই মিলিটারি আদবকায়দা নিয়মকানুনের সঙ্গে ডাক্তারি শিখে জয়েন করেন আর্মি, এয়ারফোর্স বা নেভিতে। আর দুই, যাঁরা অন্যান্য মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করার পরে আর্মি জয়েন করেন। ডিফেন্সের কেতা অনুযায়ী নাম্বার ওয়ান ক্যাটেগরি সবসময়েই নাম্বার টু-কে নিচু নজরে দ্যাখে। কারণ দ্বিতীয় দলের লোকেরা সরাসরি ফৌজি নয়, ব্যাকডোর দিয়ে ঢোকা ফৌজি।

    করণ মেডিক্যাল পড়েছেন দিল্লির এমএএমসি থেকে, মানে, মৌলানা আজাদ মেডিকেল কলেজ। পরে কয়েক বছর এমনি হাসপাতালে কাজ করার পরে ফৌজে জয়েন করেছেন। ফলে প্রমোশনের সময়ে ডিরেক্ট ফৌজিরা তাঁকে সুপারসীড করে যাবে, এতে আর আশ্চর্যের কী আছে? কেরি ফিল্ড হসপিটালের সর্বেসর্বা, কম্যান্ডিং অফিসার, এত বড় ডেজিগনেশন তাঁর মেলার কথাই নয়, সেই পোস্টিং যেভাবেই হোক একে তুতিয়ে ওকে পাতিয়ে তাকে পটিয়ে চৌহান করিয়ে দিয়েছে, ফলে চৌহানের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ থাকবে না করণের, এতে আর আশ্চর্যের কী আছে?

    তাই, ফোর জিরো ওয়ান ফোর ফিল্ড হসপিটালে আতিথ্য গ্রহণ করার জন্য, আমরা এখন তাং শে থেকে চাং লা পাস পেরিয়ে চলেছি, কেরিতে। সোমোরিরি পাস দিয়ে। মনে প্রচুর ক্ষোভ, কিন্তু আজ, পুরো ঘুরে আসার পর আপনাদের বলতে বাধা নেই, প্রথাগত ডেস্টিনেশনের বাইরে ওই একদিনের ঘোরাটা না হলে হয় তো, অনেক কিছু মিস করতাম।

    এইবার খুব তাড়াতাড়ি চাং লা পাস পেরিয়ে কারুতে এসে পৌঁছে গেলাম। কারু থেকে আর লে-র রাস্তা না নিয়ে আমরা এগোলাম উপসীর দিকে। কারু থেকেই এক নীলচে সবুজ রঙের নদী আমাদের সাথে সাথে চলতে লাগল। দোরজিকে জিজ্ঞেস করামাত্রই জানাল, এটা ইন্ডাস। মানে, সিন্ধু নদ।

    কারুর পরেই উপসী, এখান থেকে মানালির রাস্তা বেরিয়ে যাচ্ছে, আমরা অন্য রাস্তাটা ধরলাম। প্রতি মুহূর্তে পাথরের টেক্সচার, ডিজাইন বদলে যাচ্ছে, কোথাও মনে হচ্ছে যেন দৈত্যাকার বিশাল বিশাল পাথর ট্যারা ভাবে একের ওপর এরেকটা স্ট্যাক করে রাখা আছে, কোথাও মনে হচ্ছে ছোট বড় মেজ অসংখ্য নুড়িপাথর জাস্ট কাদা দিয়ে লেপে একসঙ্গে আতকে রাখা আছে, টোকা মারলেই ঝুরঝুরিয়ে ল্যান্ডস্লাইড শুরু হবে। আর পুরো রাস্তা ধরে আমাদের সঙ্গে নাচতে নাচতে চলেছে সিন্ধু নদ। মাঝে মাঝে সবুজ রঙের ছোট ছোট ব্রিজ, কখনো আমাদের নিয়ে যাচ্ছে নদীর এপার, কখনো নদীর ওপারে। এ রকমই একটা ব্রিজ পেরিয়ে এক মিনিটের জন্য আমাদের গাড়ি থামল। সামনে পাথরের ওপর লেখা, থ্রি ইডিয়টস শুটিং পয়েন্ট।

    আমীর খানের এই সিনেমাটা পুরো বিখ্যাত করে দিয়েছে লে-কে। শেষের একটু আগে সেই সীনটা মনে আছে, যখন প্রিয়া মানালিতে আছে, আজই তার বিয়ে, জানার পরে চতুরের হাত মুখ বেঁধে তাকে ডিকিতে ফেলে ফারহান আর রাজু একটা ব্রিজের সামনে থেকে ইউ টার্ন নিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে মানালির দিকে চলল? এই সেই ব্রিজ।

    আরও এগোতে এগোতে, কেরি পৌঁছতে যখন আর মাত্র দশ কিলোমিটার বাকি, হঠাৎ রাস্তায় আটকে দিল দুটি লেবার। সামনে ব্রিজ বানানোর কাজ চলছে, তাই পাথর খসানো হচ্ছে ওপরের পাহাড় থেকে। এক ঘণ্টা লাগবে রাস্তা ক্লিয়ার হতে।

    কী আর করা! আমাদের গাড়িই প্রথম। পাহাড়ের রাস্তায় এখানে এসব খুব কমন ব্যাপার। ট্রাফিক এত কম যে ঘন্টা দুঘন্টায় একবার করে রাস্তা খোলা হয় কাজ চলাকালীন। ততক্ষণে খুব বেশি হলে হয় তো চার পাঁচটা গাড়ি আটকে পড়ে। কেউই মাইন্ড করে না ঘন্টা দু ঘন্টা আটকে থাকতে। এটা এখানে পার্ট অফ লাইফ।

    নেমে একটু এদিক ওদিক শাটার টিপে বেড়ালাম। এসে পড়েছে গোটা তিনেক আর্মির ট্রাক। সেখান থেকে ছ সাতজন ফৌজির দল এসে আলাপ করে গেল, কারুর বাড়ি ফরিদাবাদ, কারুর বাড়ি মথুরা, কেউ এসেছে সাসারাম থেকে। কোথায় যাচ্ছি, কোথা থেকে এসেছি, কতদিন ধরে বেড়াচ্ছি, সব গল্প জেনে মথুরাবাসী খুব অবাক, আপনারা এইখানে এই পাথরের রাজত্বে এসে কী আনন্দ পান? আমাদের মথুরা তো এর চেয়ে অনেক সুন্দর, কৃষ্ণ ভগওয়ানজির অত বড় মন্দির আছে, এখানে তো কোনও মন্দির নেই, খালি খতরা হি খতরা! ঠাণ্ডায় মেরে রেখে দেয় আমাদের। আমি তো আর তিন চার বছর কাজ করে ফৌজির চাগ্রি ... ছাঃচাঃ ... ছেড়ে দেব, গাঁয়ে ফিরে কাপড়ের দোকান দেব। আমার ভাইয়ের কাপড়ের দোকান আছে করোল বাগে।

    বেচারা সিধাসাধা গাঁয়ের ছেলে, বেশিদূর পড়াশোনা হয় নি, পেটের দায়ে ঢুকেছে ফৌজে, লে লাদাখের সৌন্দর্য বোঝার মত মানসিকতা ওদের নেই। হ্যাহ্যা করলাম খানিক তাদের সাথে, তারা খুব খুশি হয়ে মোবাইলের ক্যামেরায় আমাকে কাঁধে কোমরে জড়িয়ে ধরে নিজেদের ছবি তুলে নিল। ইতিমধ্যে তিনটে বেজে গেল, রাস্তা খুলে গেল।

    ঠিক কুড়ি মিনিটের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম কেরির ফিল্ড হসপিটালে। করণবাবু তখন ছিলেন না, তবে সমস্ত নির্দেশ দেওয়া ছিল, ঘরে গিয়ে সুটকেস ইত্যাদি রেখে ফ্রেশ হতে হতেই তিনি এসে পড়লেন। শ্যামবর্ণ ছোটখাটো চেহারার একজন লোক, এই হাসপাতালের কম্যান্ডিং অফিসার। সঙ্গে দুজন নওজওয়ান, সদাহাস্যময়, একজনের নাম সচীন মাগু, অন্যজন সঞ্জয় বিনায়ক, উর্দিতে লেখা নাম দেখলাম। এরাও ডাক্তার, পুনের আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজের পাস আউট, আপাতত এই হাসপাতালের ফেসিলিটেশন অফিসার। হাবভাবে যেমনি শার্প তেমনি চৌকস আর তেমনি বিনয়ী, বরং করণবাবুকেই এদের তুলনায় খানিক অনুজ্জ্বল লাগছিল।

    চৌহানকন্যা যথারীতি গেস্টহাউসে পৌঁছেই বিছানায় দেহ রেখেছেন, তার আর উঠবার শক্তি নেই, হাঁটবার শক্তি নেই। করণ আঙ্কল তাদের অনেক পুরনো পরিচিত, আঙ্কল নাকি অনেকবার তাদের বাড়িতে এসে "চা খেয়ে গেছেন", এ গল্প বারতিনেক শুনেছি গাড়িতে, সেই আঙ্কলের সঙ্গে দেখা করারও তার আর ক্ষমতা নেই। অগত্যা তাকে গেস্টহাউসে রেখে আমরাই এলাম ডাইনিং হলে, কিঞ্চিৎ খেয়ে পিত্তরক্ষা করার তাগিদে। অনেকদিন বাদে চৌহানকে দেখতে পেয়ে করণ খুব খুশি, খুব উত্তেজিত, গল্প হচ্ছে, সিগারেটের পরে সিগারেট ধরিয়ে যাচ্ছেন করণ (লক্ষ্য করে দেখলাম, উনি চেন স্মোকার, একজন ডাক্তারের পক্ষে এটা বেশ আশ্চর্যের), আমি সবিনয়ে হার্ড ড্রিঙ্কস প্রত্যাখ্যান করার পরে আমাকে জুসে জুসে ভরিয়ে দিল দুজন ফৌজি, আর আমার বাঁপাশে সর্বক্ষণ মুখে মাপা হাসি ঝুলিয়ে একভাবে অ্যাটেনশন হয়ে বসে রইলেন সঞ্জয় আর সচীন। দুপা দুপাশে, একবারের জন্যও পা ক্রশ হল না, শিরদাঁড়া খাড়া রেখে, দু হাত দুই হাঁটুর ওপর রেখে বসা অবস্থায় অ্যাটেনশন, একভাবে, যতক্ষণ আমি জুস খেলাম, মেয়ে আর সিকিনী জুস খেল, গল্পগুজব চালালাম সবাই মিলে।

    করণ আসার পর থেকেই সচীন আর সঞ্জয়ের সাথে আরও এক জন সাথে সেঁটে গেছিলেন। তিনি এই হাসপাতালের ফোটোগ্রাফার। অ্যাজ ইফ আমরা কোনও সেলিব্রিটি, এইভাবে আমাদের প্রতিটি মুভমেন্ট, প্রতিটা মিনিট শাটার মেরে মেরে ক্যাপচার করে যাচ্ছিলেন তিনি। মনে হল যেন আমাদের ভিজিটের ওপর কোনো ডকুমেন্টারি বানাবেন উনি। এমনিতেই লোকজনের ছবি তোলায় আমি খুব একটা স্বচ্ছন্দ নই, তার ওপর এই লেভেলের খাতির, কথায় কথায় জানলাম, বাইরের জগতের লোকের মুখ এখানে দেখাই যায় না, কখনো কখনো কোনও মিলিটারি অফিসার আসেন, সে সময়ে মিলিটারি ডেকোরাম মেনটেন করে তাঁকে স্বাগত জানাতে হয়, এর বাইরে লোক বলতে সামনে একটা ছোট্ট গ্রাম আর একটা গুম্ফা। এই হাসপাতালে আমরাই প্রথম সিভিলিয়ান অতিথি, তাই আর্মির তরফ থেকে উনি আমাদের সিভিলিয়ান প্রোটোকল অনুযায়ী হসপিটালিটি দিতে চান। পুরো একঘর কেস যাকে বলে। একদিনের জন্য আমরা আর্মির খাস অতিথি।

    প্রায় এক ঘন্টা বাদে করণ বললেন, চলুন, আপনাদের আশপাশ দেখিয়ে আনি। সামনেই সিন্ধু, তার সামনে একটা টিলায় আমরা একটা শিবজির মন্দির বানিয়েছি, সেখান থেকে পুরো ভ্যালিটা দেখা যায়।

    সবাই মিলে চললাম। পেছনে ক্যামেরাম্যানও চললেন ফটো তুলতে তুলতে। টিলায় ওঠা হল, সেখানে পুরোহিত হাতে পুজোর থালা নিয়ে নারকোল নিয়ে একেবারে রেডিই ছিলেন, পৌঁছতেই ইশারা হল সবাইকার জুতো খুলে ফেলার, চৌহান ফ্যামিলির ভক্তি সবচেয়ে বেশি অ্যাজ ইউজুয়াল, তারা লাইন দিয়ে দাঁড়াল, পেছনে সিকিনী আর সাঁঝ, এক এক করে ঘুপচি মন্দিরের ভেতর ঢুকে ঘণ্টা বাজিয়ে থালা ঘুরিয়ে মন্ত্র পড়ে শিবজীর পুজো দেওয়া হল। আমি তো নাস্তিক, তাই পুজোর লাইন লাগার সাথে সাথেই আমি ক্যামেরা বার করে মন্দিরের পেছনে শেল্টার নিলাম। সব মিলিটারি ভক্তের দল, এখানে খাপ কতটা খুলব, খোলা উচিত কিনা বুঝতে না পেরে সোজা ক্যামেরা বের করে পেছন দিক থেকে সিন্ধু নদ, পাহাড়, দূরের মনাস্ট্রি ইত্যাদির ছবি তুলতে লাগলাম।

    তা দেখলাম, আমাকে কেউ জোরাজুরিও করল না, মনে হল ভক্তির আতিশয্যে কেউ আলাদা করে আমাকে খেয়ালও করে নি। খানিক বাদে শিবজির নামে জয়ধ্বনি নিয়ে ঘণ্টা বাজিয়ে আরতি শেষ হল। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

    টিলা থেকে নেমে পাশের একটা ডর্মিটরিতে নিয়ে গেলেন করণ। এটা ফৌজিদের শেল্টার। ডিজেল জেনারেটর দিয়ে চালানো হয় সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেম। শীতকালের জন্য। লম্বা ডর্মিটরি রুমের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত দামী স্টীল দিয়ে দামী গদি লাগানো বাঙ্কার বেড। অনুমতি চাইতেই সহাস্যে ফটো নেবার অনুমতি মিলল। ওদিকে মিলিটারি ফটোগ্রাফার অক্লান্তভাবে আমাদের ছবি তুলেই যাচ্ছেন, এখানে থাকেন বলেই হয় তো এখানকার সৌন্দর্যের ছবি নেবার মত বলে মনে করছেন না উনি, কেবলই দূর থেকে কাছ থেকে আমাদের ছবি তুলেই যাচ্ছেন, তুলেই যাচ্ছেন।

    ফৌজিদের শেল্টার দেখার পরে পরের ঘরের দিকে এগোলেন করণ। এটা আমাদের মন্দির। রোজ সন্ধ্যেবেলা এখানটা আমরা নাম-টাম করি।

    খাইসে, ওপরেরটা তা হলে মন্দির ছিল না? আবার কাটাতে হবে দেখছি! মন্দিরে তো আমি ঢুকব না।

    পাশেই বেঞ্চি, সবাই জুতো খুলে এক এক করে ঢুকছে, আমি গ্যাঁট হয়ে বসে রইলাম জুতো না খুলেই। করণ এইবার আমায় দেখে এগিয়ে এলেন, ইয়ং ম্যান, তুমি আসবে না?

    আমি মিষ্টি হেসে বললাম, নাঃ, আমি মন্দির, প্রার্থনা, পুজাপাঠ এসবে একেবারে ইন্টারেস্টেড নই। প্লিজ এক্সকিউজ মি।

    করণ একেবারে বিস্ফারিত নয়ন, চশমা খসে পড়ে প্রায় নাক থেকে, ইউ ডোন্ট বিলিভ ইন গড?

    আমি আবারও মিষ্টি হেসে ঘাড় নাড়লাম, না। ভগবানের সঙ্গে আমার বনিবনা হয় না। আমি কোনো ছবি বা মূর্তির সামনে মাথা নোয়াই না।

    চৌহানের মুখে তখন একরাশ বিরক্তি, আড়চোখে দেখলাম। সিকিনী তো আমায় হাড়ে হাড়ে চেনে, সে অন্যদিকে তাকিয়ে তখন আকাশ বাতাস দেখতে দেখতে সুট করে ঢুকে পড়ল মন্দিরে। করণ কী বলবেন বুঝতে না পেরে বললেন, ইন্টারেস্টিং! আমি এরকম কথা কাউকে বলতে শুনি নি, তা তুমি এখন কী করবে? আমরা তো খানিকক্ষণ নাম করব।

    আমি বললাম, করুন না, আমি বরং একটু এদিক ওদিক ঘুরে ছবি তুলি, সন্ধ্যেও হয়ে আসছে, বেশিক্ষণ আলো থাকবে না।

    সবাই ঢুকে গেল মন্দিরে, উঁকি মেরে দেখলাম রামচন্দ্র, হনুমান ইত্যাদিদের ফটো আর মূর্তি লাগানো রয়েছে ভেতরে আর ফরাস পাতা রয়েছে, সবাই সেখানে গিয়ে বসছে আর একজন সবার কপালে টিকা ইত্যাদি পরাচ্ছে। আমি সরে গেলাম। এমন সৌন্দর্য, আর তো বেশিদিন দেখা যাবে না, একবার ভালো করে ঘুরে দেখি।

    খানিক এদিক ওদিক ঘুরলাম, এইবার এসকর্ট আর ফোটোগ্রাফার ছাড়াই। তারপর আবার ফিরে এসে বসলাম মন্দিরের বাইরের বেঞ্চে, ভেতর থেকে তখন টিপিকাল উত্তর ভারতীয় স্টাইলে হরেক রকম গলায় বেসুরে ওম জয় জগদীশো হরেএএএ স্বামী জয় জগদীশো হরেএএএ আওয়াজ আসছে। খানিক বাদে শুনলাম কেউ একজন ঘোষণা করলেন, এইবার হনুমান চালিশা পাঠ হবে।

    গাঁ* মেরেছে। সিকিনী ওইখানে বসে আছে কী করে? হনুমানের পুজো দেখলেই আমার কেন জানি না একসাথে প্রচণ্ড হাসি আর খিস্তি পায়। এমনিতে পুরো উত্তর ভারত জুড়ে "হনুমানজি"র খুব রমরমা, খুব পুজো পান উনি, কিন্তু ওই রাজমার মত আমার হনুমানেও বোধ হয় মেন্টাল ব্লকেজ আছে, ছোটবেলা থেকে গালাগালি হিসেবে যে নামকরণ শুনে এসেছি, এখানে এসে এতদিন ধরে তাকে ভগবান হিসেবে দেখেও আমার মনে এতটুকুও ভক্তি জাগে না।

    কী আর করা যাবে। এক সময়ে হনুমান চালিশাও শেষ হল। হনুমানের ভক্তের দল সব একে একে বেরিয়ে এলেন মন্দির থেকে। এরপর আমাদের নিয়ে করণ দেখাতে আনলেন তাঁর অফিস। বেশ সাজানো গোজানো, অত্যন্ত বৈভব দৃশ্যমান চারদিকে। তুলকালাম রকমের দামী সোফাসেট, শুনলাম দিল্লির পাঁচকুঁইয়া রোড থেকে সমস্ত ফার্নিচার কিনে বাই রোড নিয়ে আসা হয়েছে। এই হাসপাতালকে জম্মু কাশ্মীরের সেরা ফিল্ড হাসপাতাল বানাবার ব্রত নিয়েছেন করণ, তার জন্য যেভাবে হোক যেখান থেকে হোক উনি টাকা স্যাংশন করান।

    বুঝতেই পারছেন, এ আমার আপনার ট্যাক্সের টাকা। ডিফেন্স খাতে বরাদ্দ, যে বরাদ্দ প্রতি বছর বাজেটের সময়ে বেড়ে বেড়ে যায়। পুরো হাসপাতালে একটা স্টেথোস্কোপ দেখলাম না, কোনও ডিসপেনসারি দেখলাম না, চিকিৎসার কোথাও কোনো বন্দোবস্ত দেখলাম না, কেবল উনি ঘুরিয়ে দেখালেন কেমন সুন্দর গেস্টহাউস বানিয়েছেন, অফিসঘর বানিয়েছেন, বাঙ্কার বেড কিনে এনেছেন, সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেম বানিয়েছেন, মানে মোদ্দা কথায় একটা রিসর্ট বানানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন তিনি।

    অফিসঘরে প্রজেক্টর মেশিনে ল্যাপটপ লাগিয়ে করণ দেখাতে লাগলেন কিছুদিন আগে সস্ত্রীক ডিরেক্টর জেনারেল সাহেব এসেছিলেন, তো সেই ডিজি সাবেবের স্ত্রী-কে আপ্যায়ন করতে তাঁর এই 4014 ফিল্ড হসপিটাল কী কী ব্যবস্থা করেছিল, কীভাবে তাঁকে লে ঘুরিয়েছে, কীভাবে লোকাল লাদাখি ডান্স প্রোগ্রাম দেখিয়েছে, কীভাবে আলচি মনাস্ট্রিতে তাঁকে দিয়ে পুজো দেওয়া করিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে ফুটনোটে খেদ, আপনাদের জন্য তো কিছুই করতে পারলাম না, তিনচারদিন যদি থেকে যেতেন, আপনাদের এমন ট্রিটমেন্ট দিতাম, সারাজীবন ভুলতে পারতেন না। আপনারা তো কালই সকালে চলে যাবেন, ঠিক আছে, কাল আপনাদের জন্য স্পেশাল ব্রেকফাস্ট, সিন্ধু নদীর ধারে টেন্ট খাটিয়ে।

    নটা নাগাদ আমরা আবার ডাইনিং হলে এলাম। দুপুরে লাঞ্চ কিছু হয় নি, অল্প স্ন্যাকস খেয়ে ছিলাম, রাতে আমাদের অনারে স্পেশাল ডিনার। প্রথমে তো অনেকক্ষণ ধরে শক্ত এবং নরম পানীয় সরবরাহ করা হল যার যার পছন্দ অনুযায়ী। ডাইনিং হলের সুবিশাল বিয়াল্লিশ ইঞ্চি এলইডি টিভিতে মেয়ের জন্য পোগো চ্যানেল চালিয়ে দেওয়া হল। তারপর পনীর পকোড়া চিকেন পকোড়া ফ্রেঞ্চ ফ্রাই কতবার যে সার্কুলেট হল, হতে হতে রাত প্রায় এগারোটা বাজে বাজে, তখন ঘটল এক কাণ্ড।

    আপনারা ওয়াঘা বর্ডারে গেছেন তো অনেকে? সন্ধ্যে বেলায় যে ফ্ল্যাগ মার্চ হয় ভারত আর পাকিস্তানি সোলজারদের, দেখেছেন? কী রকম মাথা পর্যন্ত পা তুলে প্যারেড করতে করতে গেট বন্ধ হয় দুদিকের?

    কিচেনের দিক থেকে এক মুশকো গোঁফওলা ফৌজি, পুরো ওই রকম ড্রেসে ... মাথায় কেবল পাগড়ির বদলে টুপি ছিল, সেই রকম মাথা অবধি পা তুলে প্যারেড করতে করতে খটাশ করে আমার পাশে বসা সচীন মাগু-র সামনে এসে তাকে একটা অতিকায় স্যালুট ঠুকলেন, আর হল কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, জয়হিন্দ, শ্রীমাআআআন। খানা প্রস্তুত হ্যায়, শ্রীমাআআআন। সচীন বোধ হয় উত্তরে বললেন, জয়হিন্দ, লাগা দো। অমনি সেই জওয়ান, অ্যাবাউট টার্ন করে, জয়হিন্দ, শ্রীমাআআআন, বলে আবার খট খট করে একভাবে প্যারেড করে কিচেনে ঢুকে গেলেন।

    আমরা চমকিত হয়ে তাঁকে ফলো করে গেলাম পাশের ঘরে। সেখানে তখন খাবার সাজানো আছে টেবিলে। প্যারেড করা জওয়ান স্ট্যাক থেকে প্লেট টিস্যু চামচ ফর্ক তুলে তুলে দিচ্ছেন সবার হাতে।

    রান্না অত্যন্ত উমদা হয়েছিল, সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না, সবচেয়ে বড় কথা, বাটার চিকেন ছিল। আমি তাই দিয়ে বেশ কিছু রুটি উড়িয়ে দিলাম।

    ক্লান্তও ছিলাম, খাওয়া শেষ হওয়া মাত্র আর তাকিয়ে থাকা মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। তাই তাড়াতাড়ি বিদায় নিয়ে নিজেদের রুমের দিকে হাঁটা লাগালাম।

    কথা হল, সামনের মনাস্ট্রিতে আমাদের স্পেশাল ভিজিট করানো হবে কাল সকাল আটটায়, তাই পৌনে আটটায় বেরোতে হবে, সেখান থেকে ফিরে এসে সিন্ধু নদের ধারে টেন্টে ব্রেকফাস্ট করে আমরা ফাইনালি বিদায় নেব।

    তলতে টলতে বিছানায় গিয়েই গভীর ঘুমে। অ্যাসবেস্টসের ছাদে স্কাইলাইট লাগানো আছে, সক্কাল সক্কাল ঘুম ভেঙে যাবেই যাবে ...

    ছবি তুলে দিলাম। ৫০৫ থেকে আজকের ছবি।
  • sch | 125.242.205.240 | ০৮ জুলাই ২০১২ ১৭:৫৩558471
  • বেশ লাগলো। একটা জিনিস মাথায় এলো - এই যে কেরীর ফিল্ড হাস্পাতালে কাজের জিনিসের চেয়ে অকাজের জিনিসের সংখ্যা বেশী - এ নিয়ে কিন্তু একটা RTI করাই যায়। RTI এর মাধ্বযমে জানতে চাওয়াই যায় যে বছরে কত টাকার medical equipment আর মেডিসিন আসে আর নন মেডিক্যাল জিনিস কত। আর কতজন চিকিৎসিত হয়।
    taxpayer হিসেবে এতূকু আমরা জানতে চাইতেই পারি -
  • গান্ধী | 213.110.243.22 | ০৮ জুলাই ২০১২ ২১:৫০558472
  • sch দাঃ)

    @সিকিদা

    এভাবে খাওয়ার গল্প বলা কি উচিত?
  • pi | 82.83.87.188 | ০৮ জুলাই ২০১২ ২২:২০558475
  • সিকি, ছবি যোগ করে লিং টা একটু দিয়ে দিও। পুরানো পোস্ট উজিয়ে খুঁজে বের করা আর হয়ে উঠছে না। ঃ(
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন