• টইপত্তর  বইপত্তর

  • মলয়ের লেখাপত্তর

    pi
    বইপত্তর | ২৪ মার্চ ২০১২ | ৪৪২০২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মলয় রায়চৌধুরী | 27.58.255.50 | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৯:১৭734845
  • জাঁ জেনে সম্পর্কে জাঁ পল সার্ত্রে : মলয় রায়চৌধুরী

               ফেলিক্স গুত্তারি তাঁর ‘জেনে রিগেইনড’ বইতে সার্ত্রের ‘সেইন্ট জেনে: অ্যাক্টর অ্যাণ্ড মার্টিয়ার’ ( ১৯৬৩ ), ৬৫০ পৃষ্ঠার বইটাকে বলেছেন ‘সার্ত্রের তৈরি জেনের বিরাট ও অতীব ব্যয়বহুল সমাধিস্তম্ভ’ । টাইম ম্যাগাজিন অবশ্য বলেছিল ‘এ পর্যন্ত লেখা বিস্ময়কর সমালোচনামূলক গবেষণার অন্যতম।’ বইটা সম্পর্কে জেনে বলেছেন যে তিনি সন্ত নন, অভিনেতা নন, শহিদও নন ; তিনি একজন শ্রমজীবি লেখক । সার্ত্রে বলেছেন, ‘জেনে হলেন ঈশ্বর’। লুই ফার্দিনাঁ সেলিন বলেছেন, ‘ফরাসি দেশে কেবল দুজন লেখক আছেন, জেনে এবং আমি।’

              জেনেকে  নিয়ে এডমাণ্ড হোয়াইটও পরে ৮০০ পৃষ্ঠার একটি বই লিখেছেন। সার্ত্রে যেন এইরকম চরিত্র খুঁজছিলেন যার ওপরে নিজের দর্শন চাপিয়ে তিনি নিজেকেই ব্যাখ্যা করতে পারেন। তিনি জেনেকে অস্তিত্ববাদী দার্শনিকের মোড়কে পুরেও তাঁকে বের করে এনেছেন মিথ্যাবাদী, পায়ুবিক্রেতা ও ক্রেতা, নাট্যকার, অভিনেতা, চোর, সাহিত্যিক ইত্যাদি থেকে তাঁর ব্যক্তিগত অস্তিত্ববাদী নায়ককে । বইটা এতো দীর্ঘ যে মাঝে-মাঝে বিরক্তিকর লাগলেও, থেমে থেমে চিন্তার অবসর নিতে হয় ফরাসি ‘ভদ্র, সুনীতিসম্পন্ন, বিবেচক’ সমাজ থেকে বহুকাল অন্ধকারে ছাঁটাই করা  জেনে নামের এই মানুষটার অন্তরজগতের সাংঘাতিক, ভয়ানক, আতঙ্কজনক প্রবণতার তলায় চাপা পড়া লোকটাকে জানবার জন্য । সার্ত্রের চোখে জেনে একজন মৌলিক অস্তিত্ববাদী নায়ক হিসাবে প্রতিভাত হন, তার কারণ জেনে শয়তানি বা পাপ বা ইভিল করার মাধ্যমেই আবিষ্কার করতে সফল হন যে প্রকৃতপক্ষে খ্রিস্টধর্মের শয়তানি ও পাপ এবং রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ ও ইভিল কাকে বলে । সার্ত্রের মতে, জেনে জন্মেছিলেন একটি অর্থহীন, পরিপন্হী জগতে, যা ভয়, আত্মদোষ, কলুষ, কল্মষ ও ইভিলে ঠাশা এবং এই প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড়া পেতে হলে এই কাজগুলোর ভেতরেই দোল খেয়ে তার বিরোধিতা করতে হবে ।

             জাঁ জেনের জীবনের চরম বিকৃতিগুলোকে জেনের তৈরি করা কিংবদন্তি থেকে আলাদা করে আসল মানুষটাকে বের করে আনার জন্য এডমাণ্ড হোয়াইট জেনের বন্ধুবান্ধব, প্রেমিকের দল, প্রকাশক এবং পরিচিতজনদের থেকে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, এবং চিঠিপত্র, সাক্ষাৎকার, জার্নাল, পুলিশের নথিপত্র, মনোবিদদের প্রতিবেদন যাচাই করে ৮০০ পাতার বই লিখেচিলেন যা সার্ত্রের থেকে একেবারে ভিন্ন অথচ গোয়েন্দা বইয়ের মতন আকর্ষক । তিনি জেনের  প্রাণচঞ্চল প্রেরণার পরস্পরবিরোধিতাকে জীবনের ঘটনা থেকেই বের করে আনতে চেয়েছেন : সত্যতা ও ভণ্ডামি, বিশ্বস্ততা ও ছিনালি, কতৃত্ব ও নতিস্বীকার, সন্মান ও বেইমানি।

              ফরাসি ভাষায় সার্ত্রের ( ১৯৫২ ) বইটিতে ‘কমেদিয়েন’ শব্দটি ব্যবহৃত যা ইংরেজিতে করা হয়েছে ‘অ্যাক্টর’, মূলত ‘দি থিফস জার্নাল’-এর ওপর ভিত্তি করেই জেনেকে বিশ্লেষণ করেছেন সার্ত্রে । জেনের বইটি, সার্ত্রে বলেছেন, প্রমাণ করে যে, প্রতিভা মানুষের প্রকৃতিদত্ত গুণ নয়, তা একটা পথ যা একজন লোক মরিয়া অবস্হায় আবিষ্কার করে । সার্ত্রে তাঁর ‘দি ডেভিল অ্যাণ্ড দি গুড লর্ড ( ১৯৫১ ) নাটকে গেৎজ চরিত্রটি জেনের মানসিকতা ও নৈতিকতার বোধ থেকে আহরণ করে লিখেছিলেন । আলোচক ডেভিড হ্যালপেরিন সার্ত্রের বইটি সম্পর্কে বলেছেন যে এটি একটি একক প্রতিস্বের সূক্ষ্ম, অসাধারণ এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান আর সেই সঙ্গে সমকামীদের লৈঙ্গিক অবস্হানের সামাজিক-দার্শনিক বিশ্লেষণ ।    

           বইটা চারটে পর্বে বিভাজিত । প্রথম হলো ‘মেটামরফোসিস’ ; দ্বিতীয় ‘ফার্স্ট কনভারশান : ইভিল’ ; তৃতীয় ‘সেকেণ্ড মেটামরফোসিস : এসথেটে’ এবং চতুর্থ ‘থার্ড মেটামরফোসিস : দি রাইটার’। প্রথম পর্বে, অনাথ ও জারজ জেনের বিভিন্ন পালক পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা ও সীমাবদ্ধ জীবনধারা চিত্রিত করা হয়েছে যার সঙ্গে জেনে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছেন না । সামাজিক ও সরকারি সংস্হাগুলোর সঙ্গে জেনের পরিচয় হয় এবং সংস্হাগুলো বালকটিকে সামাজিক সরঞ্জামে পালটে ফ্যালে । ফরাসি সরকার তার তত্বাবধায়ক জানার পর বালকটি হয়ে ওঠে পালক পরিবারদের অবাধ্য এবং সংশোধনের অযোগ্য, যার দরুন সরকার তাকে ছাপ্পা দেয় ‘অভ্যাসগত অপরাধীর’ । জেনের কৈশোর ও তারুণ্যে প্রশাসন তাকে অবিরাম পিষে ফেলতে থাকে আর তরুণটি হয়ে ওঠে ভয়প্রদর্শনকারী । সে আর একা থাকে না, তার মেটামরফোসিস হয়, সমাজের নানা অপরাধী তার বন্ধু হয়ে ওঠে এবং বুঝতে পারে যে এই অপরাধীরা তাদের অপরাধের মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পিত । জেনে অস্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন যে আইনত, প্রশাসনিকস্তরে এবং রাষ্ট্রের রসায়ানাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তিনি নির্বাচিত প্রাণী। সার্ত্রে বলেছেন যে জেনের প্রথম চুরিগুলো জেনের অন্তরজীবনের আবহ গড়ে তুলেছিল এবং তা হলো আতঙ্কের আহ্লাদ ।

            বইটির দ্বিতীয় পর্বে, সার্ত্রের দার্শনিকতার মাল হয়ে ওঠেন জেনে । সার্ত্রে ব্যাখ্যা করেন ইভিল বা শয়তানি বা পাপের দার্শনিক ও তাত্বিক জটিলতা । বইয়ের এই পর্বটা বেশ দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর । জীবনী থেকে দর্শন টেনে আনেন সার্ত্রে, বিশ্লেষণ করেন নৈতিকতা, অপরাধ, যৌনকামনা এবং অন্ধকার জগতের নানা এলাকায় জেনের মতন মানুষদের একের পর এক অবিরাম দুর্ভাগ্য ও অশান্তি । জেনে নিজে এই ইভিল সম্পর্কে কী ভাবেন, তাঁর উদ্দেশ্যই বা কি তার দার্শনিক উত্তর খুঁজতে চেয়েছেন সার্ত্রে ।

            তৃতীয় পর্বে ফরাসি পাঠকদের কাছে বিস্ময়কর কিংবদন্তি হিসাবে দেখা দেন জেনে। তাঁর পাঠকেরা অবাক হয়ে গাঁটকাটা, পায়ুবিক্রেতা, চোর, স্কুল-পলাতক, গৃহ-পলাতক  থেকে তাঁর লেখক সত্তার সঙ্গে পরিচিত হতে থাকেন । সমাজের স্বীকৃতি পাবার পরও জেনে ভবঘুরে, পায়ুবেশ্যা, সমকামী, চুরি ইত্যাদির সঙ্গে জড়িয়েছিলেন । তিনি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন এবং আমেরিকার ‘ব্ল্যাক প্যান্হার’ ও প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে বক্তৃতা দেন ; ছবি তুলে তাইলেও মাঝখানের আঙুল তুলে ধরতেন । অবশ্য গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজকেও দেখা গেছে ফোটোগ্রাফারদের সামনে মধ্যমা তুলে ধরতে । যখন সমালোচকদের কাছে তিনি একজন প্রতিভাবান লেখক ও ভাবুক হিসাবে স্বীকৃতি পেলেন তখন জাঁ ককতো, সার্ত্রে প্রমুখ ফরাসি সাহিত্যিকদের উদ্যোগে যাবজ্জীবনের কারাদণ্ড থেকে মুক্তি পান ।

              সার্ত্রে জেনেকে সন্ত বলেছেন তার কারণ জেনে নিজের পক্ষে যে নৈতিকতাবোধ গড়ে নিয়েছেন তা আদি-নিষ্কলুষতা ও সত্য তাড়িত এবং জেনে এই অবস্হান থেকে খ্রিস্টধর্মীর ‘নষ্ট নিষ্ঠা’ স্বীকার করছেন না । মানসিক স্হিরতা পাবার অভিপ্রায়ে তাঁর নৈতিকতাবোধ একটি দ্বিমেরু সাধনী । নিজের কাছে তিনি সৎ, কেননা নৈতিকতার সাদা-কালোকে তিনি যে কোনো ধরণের জঞ্জাল ও প্রতিপন্হী সামাজিক এঁটোকাঁটা থেকে তৈরি করে ফেলতে পারেন ; তাঁর কাছে তাই বাইবেল-পড়ুয়া গির্জা-বালক আর দক্ষ পেশাদার চোরের তফাত নেই । জেনে শয়তানি বা পাপ বা ইভিলের সততা থেকে ঝুঁকে পড়েন কালো নান্দনিকতায় ; এই মেটামরফোসিস তিনি নিজেও তখন হৃদয়ঙ্গম করেননি । তাঁর তখনও মনে হতো যে শয়তানির সূর্যালোকে থেকেও তিনি নতুন এক সূর্যালোক খুঁজে পেয়েছেন, যার নাম সৌন্দর্য । এই পর্বে সার্ত্রে শিল্প ও নান্দনিক নির্ণায়ক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জেনের আত্মআবিষ্কারকে গুরুত্ব দিয়েছেন ।

              চতুর্থ পর্বে, সার্ত্রে যখন জেনের তৃতীয় মেটামরফোসিসের কথা বলছেন তখন জেনে একজন প্রতিভাবান লেখক । সার্ত্রে কিন্তু বলছেন যে জেনের উপন্যাসগুলো মেকি এবং তার গদ্যও মেকি। কিন্তু মেকি হোক বা নাহোক, তাদের উৎস হলো জ্ঞাপন করার সদিচ্ছা । জেনে কায়দা করে তাঁর পাঠকদের ব্যবহার করেছেন, তিনি তাদের ব্যবহার করেছেন নিজের বিষয়ে নিজের সঙ্গে কথোপকথনের উদ্দেশে । সার্ত্রে বলেছেন যে এই বিশেষত্ব পাঠকদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে । কোনো আলোচকই অবশ্য জেনেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাননি ; পাঠকরা বরং অবাক হয়ে প্রশংসা করেছে জেনের এই মেটামরফোসিসকে ।

             ১৯৬৪ সালে ‘প্লেবয়’ পত্রিকায় ম্যাডেলিন গোবিলকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সার্ত্রে সম্পর্কে জেনে বলেছিলেন, “জগতে যখন সবাই শ্রদ্ধেয় বেশ্যা হতে চাইছে, তখন এরকম একজনের দেখা পেতে ভালো লাগে যে জানে যে সে একটু-আধটু ছেনাল কিন্তু শ্রদ্ধেয় হতে চায় না । সার্ত্রের বইটা সম্পর্কে ওই একই সাক্ষাৎকারে জেনে বলেছেন, যদিও তিনি পাণ্ডুলিপি পড়েছিলেন কিন্তু প্রকাশিত হবার পর বইটা তাঁকে নিদারুণ বিরক্তিতে আক্রান্ত করেছিল, কেননা অন্য একজন লোক তাঁকে উলঙ্গ করে দিয়েছিল ; যখন তিনি নিজেকে নগ্ন করেন তখন তিনি প্রয়াস করেন যাতে তাঁর ক্ষতি না হয় আর তা করার জন্য শব্দ, মনোভাব, বাদবিচার, ম্যাজিক ইত্যাদির মাধ্যমে ছদ্মবেশ ধরেন । পড়ে তাঁর তক্ষুনি মনে হয়েছিল বইটা পুড়িয়ে ফেলবেন ; বইটার চাপে কিছুদিনের জন্য তাঁর লেখালিখি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ; এক ধরণের শূন্যতা ও মানসিক অপকর্ষ সৃষ্টি করেছিল । তিনি যান্ত্রিকের মতন বহু উপন্যাস লিখে ফেলতে পারতেন, পর্নোগ্রাফিক বই লিখতে পারতেন, কিন্তু সার্ত্রের বই অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ওই শূন্যতাবোধ কাটাবার জন্য তিনি নাটক লেখা আরম্ভ করেন। ”

             পক্ষান্তরে বইতে সার্ত্রে জিগ্যেস করেছেন, “আমি কি জেনের প্রতি যথেষ্ট ন্যায্য থাকতে পেরেছি ?” সার্ত্রের দরুণ কিন্তু জেনের প্রচার বেড়ে যায় এবং তিনি ধনী হয়ে ওঠেন, প্রতিসংস্কৃতির প্রতিনিধি । যে সমাজ একসময়ে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল তাকে বিদ্রূপ করার সুযোগ কখনও ছাড়েননি । সার্ত্রে বলেছেন, জেনে আমাদের দিকে আয়না মেলে ধরেন ; আমাদের উচিত তাতে নিজেদের আসল চেহারা দেখা । 

              জেনের বইগুলো আর সার্ত্রের বইটির আয়নায় নিজেদের দেখে পাঠকের নিজস্ব প্রতিভাস ও পরিজ্ঞান ঘটার কথা । সুসান সোনটাগ তাঁর ‘এগেইনস্ট ইনটারপ্রিটেশান অ্যাণ্ড আদার এসেজ’ গ্রণ্হে সার্ত্রের বইটিকে বলেছেন, “ক্যানসার, হাস্যকর বাগাড়ম্বরে ঠাশা, এর আলোকিত ধারণার মালপত্রকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় চটচটে গাম্ভীর্য আর বীভৎস পুনরাবৃত্তির স্বরভঙ্গী।” প্রকাশক গালিমার সার্ত্রেকে বলেছিল জেনের সাহিত্য সংগ্রহের একটা ভূমিকা লিখে দিতে আর সেটাই শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ালো ৬০০ পাতার দানব । সার্ত্রের বইটা জীবনী নয়, সাহিত্য সমালোচনাও নয় । বইটা তাঁর অস্তিত্ববাদ বোঝাবার ময়দান । সোনটাগ বলেছেন, বই লিখতে বসে সার্ত্রে তাঁর বিষয় পেয়ে গেলেন, নিজে তো ডুবলেনই, জেনেকেও ডোবালেন । সোনটাগ বলেছেন যে পাঠক যদি সার্ত্রের দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হন, তাহলে বইটার পাঠ সহায়ক হবে, অন্তত ভাসা-ভাসাভাবে। সার্ত্রেকে সঙ্গে নিয়ে পাঠক জেনে সম্পর্কে তাঁর কৌতূহল মেটাতে পারবেন । তবে সার্ত্রে এতো বেশি জেনে সম্পর্কে কথা বলেছেন যে শেষ পর্যন্ত জেনে আর জেনে থাকেন না ।

            এডমাণ্ড হোয়াইট ১৯৯৩ সালে নথিপত্র দেখে গবেষণার পর জেনের যে জীবনী লিখেছিলেন তাতে বলেছেন যে শৈশব-তারুণ্যের যে ঘটনাগুলো জেনে লিখেছেন তার বেশির ভাগই কাল্পনিক ও অসত্য এবং তা জেনের ব্যক্তিগত কিংবদন্তি বানাবার দক্ষতা ; সার্ত্রে এগুলোকে যাচাই না করে জেনের বানানো গল্পের ওপর নির্ভর করে বইটা খাড়া করেছিলেন । সার্ত্রে ব্যক্তিগতভাবে জেনেকে জানতেন, এবং বইতে লিখেওছেন যে জেনে ইতিহাসকে তোয়াক্কা করে না আর কিংবদন্তি দিয়ে ফাঁকগুলো ভরে দেবে । আসলে ওই কিংবদন্তি সার্ত্রের জন্য জরুরি ছিল তাঁর বইয়ের বিষয়কে কেন্দ্র করে যাতে নিজস্ব নৈতিক আর দার্শনিক তত্বকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন ।

             তাঁর গদ্যের মারপ্যাঁচ দিয়ে জেনে নিজেকে ল্যাঠামাছের মতন পিচ্ছিল করে তুলেছিলেন ; গড়ে তুলেছিলেন ছায়াময় একজন “আমি”, যার ঝলক তিনি পাঠকদের দিতে থাকেন । সার্ত্রে এই ঝলকটাকে বইয়ের পাতায় গিঁথে দিয়ে অস্তিত্ববাদী প্রপঞ্চবিজ্ঞানকে ছড়িয়ে দেবার সুযোগ ছাড়েননি । মূলাগত স্বাধীনতাবোধ এবং নির্নিমিত্ততা হলো তাঁর তর্কের বনেদ ; ফলে আত্ম-প্রতিস্ব গড়ার জন্য জেনের বানানো কাহিনি তাঁর কাজে লেগেছে । সার্ত্রে অবশ্য বলেছেন যে জেনের গদ্য মেকি বলে জেনে একজন স্বজ্ঞাত লেখকের সম্পূর্ণ বিপরীত, তাঁর নানন্দনিকতায় সৌন্দর্যকে দখল করা প্রচেষ্টা রয়েছে কিন্তু তাঁর আকাঙ্কা নেই সৌন্দর্যের প্রতি ; মেকি গদ্যের ফলে জেনে অন্ধকার জগতের মানুষের মতন শিল্পী হিসাবেও ফন্দিবাজ, ধড়িবাজ ; লেখায় বাগ্মীতা দেখাবার চেষ্টা বেশি এবং সন্ত্রাসের যথেষ্ট অভাব রয়েছে ।

           ‘প্লেবয়’ পত্রিকার ১৯৬৪ সালের সাক্ষাৎকারে ম্যাডেলিন গোবিল জেনেকে জিগ্যেস করেছিলেন, “আপনি চোর, বিশ্বাসঘাতক আর সমকামী হলেন কেন ?” উত্তরে জেনে বলেছিলেন, “আমি নিজে নির্ণয় নিইনি, আমি কোনও নির্ণয় নিইনি । কিন্তু কিছু তথ্যকে স্বীকার করতে হবে। আমি চুরি করতে আরম্ভ করললুম কেননা আমি ক্ষুধার্ত ছিলুম । সমকামিতার ক্ষেত্রে আমার কোনো ধারণা নেই। সমকামিতা আমার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, আমার চোখের রঙের মতন, আমার পায়ের সংখ্যার মতন। আকর্ষণটা সম্পর্কে অবগতির পর আমি নিজের সমকামিতাকে বেছে নিলাম, সার্ত্রের মতামত যা স্পষ্ট করেছে ।”

             জেনের সমকামিতা সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সার্ত্রে যা বলেছেন তা অনেকটা পরস্পরবিরোধী। সমকামিতার রহস্য, সার্ত্রে বলেছেন, জেনে তাকে অপরাধের গুরুত্ব দিয়েছেন, তা প্রকৃতিবিরোধী কেবল নয়, তা কাল্পনিকও । সমকামী মানুষ একজন অলস স্বপ্নদর্শী নয়, সে একজন প্রতারক, সে একজন ভণ্ড । জেনে বেছে নিয়েছেন নারীর ভূমিকা, আর তা করেছেন কেননা তিনি একজ রাজকুমার সাজতে চান, নকল রাজকুমার । 

            সার্ত্রে সমকামবিরোধী ছিলেন না । সমকামবিরোধী হতে হলে ব্যাপারটাকে কল্পনার চেয়েও বেশি কিছু মনে করতে হবে । তাছাড়া, স্বাধীনতাবোধের যে দ্বান্দ্বিকতা সার্ত্রের দর্শন স্বীকার করে তার ভিত্তি হলো হেগেলের মালিক-গোলামের দ্বান্দ্বিকতা । সার্ত্রের আত্ম-প্রতিস্বের দর্শন ‘অপর’ সম্পর্কিত দর্শন থেকে আলাদা ও জটিল । ফেলিক্স গুত্তারি বলেছেন যে সার্ত্রের এই বক্তব্য রক্ষণশীল ; সার্ত্রের সমকামের জগতে পুরুষ নারী হিসাবে নিজেকে জাহির করে । সার্ত্রের মতে নারীরা পরস্পরের প্রতিবিম্ব, তারা পরস্পরকে স্বীকার করে না । নারীবাদী লেখিকা জুডিথ বাটলার এই প্রসঙ্গে বলেছেন যে জেনের গদ্য, যা প্রধানত আত্মজীবনী ও ফিকশানের মিশ্রণ, তা হলে বহুরুপীর ছদ্মবেশী ভাষা, পুরুষের লিঙ্গবাদী লালিকা এবং নিটোল প্রতিস্ব গড়ে তোলার বদলে উল্টোবাঁক নিয়ে অস্হিতিশীল করার প্রয়াস । তাঁর ‘কুইয়ার রাইটিঙ : হোমোইরটিসিজম ইন জেনেজ ফিকশান’ বইতে আরও স্পষ্ট করে বলেছেন এলিজাবেথ স্টিফেন্স । তিনি বলেছেন, জেনের উপন্যাসগুলোতে গদ্যের ব্যবহার করা হয়েছে সংহতিনাশ ও পরাভূত করার কার্যপদ্ধতি হিসাবে, যে পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রথাগত ন্যারেটিভ আদলকে জেনে পালটে দিয়েছেন তাঁর উদ্ভট চরিত্রদের বিকৃত প্রভাব বর্ণনা করার খাতিরে । জেনের গদ্যে জেনে লোকটাকে সর্বত্র দেখা যায় কিন্তু লেখক জেনে মনে হয় মৃত, মাঝেমধ্যে ভুত হয়ে শব্দের ভেতরে উঁকি মারে । এই কারণেই জেনের বইগুলো পরস্পরবিরোধী ভাবনার পাঠকদের টাকে ; কারোর কাছে তিনি বৈপ্লবিক আবার কারোর কাছে প্রতিক্রিয়াশীল, সমকামিপ্রিয় এবং সমকামিভীত, পতিত এবং ফুলবাবু।

             সার্ত্রের স্তরের একজন লেখক-দার্শনিক যে পরিশ্রম করেছেন তাঁর সময়ের একজন অবহেলিত লেখকের জন্য তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় । বড়ো খ্যাতিমান লেখকরা সাধারণত তরুণ ও কম খ্যাতির লেখকদের নিয়ে লেখেন না । আর এই বই তো একজন অপরাধীর বই ও ভাবনাচিন্তা নিয়ে । সার্ত্রে বলেছেন, জেনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন, কেননা জেনে চান তাঁকে ভালোবাসা হোক ; জেনের অসাধারণ বইগুলো নিজেরাই নিজেদের খণ্ডন করে । পুরুষালী সৌন্দর্যের তরুণদের সঙ্গে ভালোবাসাবাসি নিয়ে জেনের রয়েছে ফেটিশ এবং একধরণের ত্রাস ; তিনি বুঝে উঠতে পারেন না তাদের নিয়ে কি করা দরকার । জেনের বইগুলো পড়ার পর কিংবা পাশাপাশি তাঁর বই আর সার্ত্রের বই পড়লে পাঠক এই দুজনকেই গভীরভাবে জানতে পারবেন।

              জাঁ জেনে নিঃসন্দেহে একটি চিত্তাকর্ষক জীবন কাটিয়েছিলেন, ককতো, জিয়াকোমেত্তি, গিন্সবার্গ, ইয়াসের আরাফাত, সার্ত্রের মতন বন্ধুবান্ধব, ব্ল্যাক প্যান্হার আর প্যালেস্টিনিয়দের প্রতি সমর্থন, ভীষণভাবে দেশাত্মবোধশূন্য, প্রচণ্ড প্রতিষ্ঠানবিরোধী, বারো বছর বয়সে স্কুল ছাড়া সত্বেও এবং সংশোধনাগার ও কারাগারে যৌবন কাটিয়েও, অবিশ্বাস্যরূপে শিক্ষিত। ১৯৪৩ সালে লেখা জেনের প্রথম বই ‘আওয়ার লেডি অব দি ফআওয়ার্স’কে অসাধারণ ফিকশান বলেছেন বিভিন্ন আলোচক ; কারাগার কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রথম পাণ্ডুলিপি ছিঁড়ে ফেলা সত্বেও জেনে আবার স্মৃতি থেকে লিখতে পেরেছিলেন একই বই, কারাগারে বসে, তার কারণ ‘আওয়ার লেডি অব দি ফ্লাওয়ার্স’ প্রধানত জেনের অতীত আর তখনকার বর্তমানের অতিকথামূলক সৃষ্টি । স্মৃতির সঙ্গে তথ্য, কল্পনা, অযৌক্তিক স্বপ্ন, ভাবনাচিন্তা, অনুমান, দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টি, স্নেহপূর্ণ অনুভূতি, সহমর্মিতা মিশিয়ে তিনি তাঁর বিচ্ছিন্নতাকে যাতে সহনযোগ্য করে তুলতে পারেন তাই জেনে নিজের গড়া জগতে জগতে প্রবেশ করেছেন বইটার মাধ্যমে এবং এই জগতটিতে অন্য কেউই হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন । এখান থেকেই তাঁর জগতের বিস্তারের আরম্ভ ।

              ১৯৭০ সাল থেকে জেনে দু’বছর জর্ডনে প্যালেস্টিনীয়দের উদ্বাস্তু ক্যাম্পে কাটিয়েছিলেন, এবং তখনকার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন ‘প্রিজনার অব লাভ’ । তিনি নিজেই একজন পরিত্যক্ত ব্রাত্য মানুষ, স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষিত হয়েছিলেন বাস্তুচ্যূত জনগণের প্রতি, এমনই এক আকর্ষণ যা তাঁর কাছে জটিল আর কালসহ হয়ে দেখা দিয়েছিল । ১৯৮৬ সালে যখন তিনি বইটি লিখছেন তখন তাঁর পরিচিতজনদের অনেকে মারা গেছেন, জেনে নিজেও মৃত্যুর কাছাকাছি, কিন্তু এই বইতে অন্ধকারজগতের লোকটি নেই ; যিনি আছেন তিনি ইহুদি-বিরোধী একজন লেখক, কেবল প্যালেস্টিনীয় উথ্থানকে সমর্থন করছেন না, তিনি বিপ্লবকে সমর্থন করছেন, সরল গদ্যে, খোলাখুলি রাজনৈতিক মতামত ব্যক্ত করছেন, বিশ্লেষণ করছেন দৃশ্যাবলীর রাজনীতি এবং আত্মপরিচয়ের সন্মোহিনী ও অননুগত বৈশিষ্ট্য । তাঁর এই শেষ বইটি, বর্তমান উপদ্রুত পৃথিবীর সবচেয়ে রক্তাক্ত দ্রোহ, নিপীড়ন ও সন্ত্রাসবেষ্টিত বধ্যভূমির উদ্দেশে একটি কাব্যিক ও দার্শনিক যাত্রা । 

  • মলয় রায়চৌধুরী | 27.58.255.50 | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৯:২৩734846
  • ট্রাউজার-পরা মেঘ    : ভ্লাদিমির মায়াকভস্কি   

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী                    

    প্রস্তাবনা

    তুমি ভাবলে,

    স্যাঁতসেতে এক মগজের কল্পনায়,

    এক তেলচিটে খাটে হাত-পা-ছড়ানো পেট-মোটা চাকরের মতন,--

    আমার হৃদয়ের রক্তাক্ত ছেঁড়া টুকরো নিয়ে, আমি আবার  ঠাট্টা করব ।           

    যতক্ষণ না আমি উপেক্ষিত নই, আমি হবো নিষ্ঠুর আর পীড়াদায়ক ।

    আমার চিত্তে আর দাদুসুলভ স্নেহশীলতা নেই,

    আমার আত্মায় আর ধূসর চুল নেই !

    আমার কন্ঠস্বর দিয়ে জগতকে ঝাঁকিয়ে আর কাষ্ঠহাসি হেসে,

    আমি তোমাদের পাশ দিয়ে চলে যাই, -- সৌম্যকান্তি,

    বাইশ বছর বয়সী ।

    সুশীল ভদ্রমহোদয়গণ !

    তোমরা বেহালায় তোমাদের ভালোবাসা বাজাও ।

    অমার্জিতরা তা ঢোলোকে তারস্বরে বাজায় ।

    কিন্তু তোমরা কি নিজেদের অন্তরজগতকে বাইরে আনতে পারো, আমার মতন

    আর কেবল দুটো ঠোঁট হয়ে যেতে পারো পুরোপুরি ?

    এসো আর শেখো--

    তোমরা, দেবদূত-বাহিনীর ফুলবাবু আমলার দল !

    মিহি কাপড়ের বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে এসো

    আর তোমরা, যারা তোমাদের ঠোঁট পেতে দিতে পারো

    সেই রাঁধুনীর মতন যে নিজের রান্নার বইয়ের পাতা ওলটায় ।

    যদি তোমরা চাও--                                   

    আমি কাঁচা মাংসের ওপরে চারুশিল্পের শত্রুর মতন লালসিত হবো

    কিংবা সূর্যোদয় যে উদ্রেক ঘটায় তার রঙে পালটে দেবো,

    যদি তোমরা চাও---

    আমি হতে পারি অনিন্দনীয় সুশীল,

    মানুষ নয় -- কিন্তু ট্রাউজার-পরা এক মেঘ। 

    আমি সুন্দর অঙ্কুরোদ্গমে বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করি !       

    তা সত্ত্বেও আমি তোমাদের প্রশংসা করব, ---

    পুরুষের দল, হাসপাতালের বিছানার চাদরের মতন কোঁচকানো,

    আর নারীরা, অতিব্যবহৃত প্রবাদের মতন নির্যাতিত ।   


     

    প্রথম পর্ব

    তোমরা কি ভাবছ আমি ম্যালেরিয়ায় ভুল বকছি ?

    তা ঘটেছিল ।

    ওডেসায়, তা ঘটেছিল ।

    “আমি চারটের সময় আসব,” কথা দিয়েছিল মারিয়া ।

    আটটা…

    নয়টা…

    দশটা…

    তারপর তাড়াতাড়ি,

    সন্ধ্যা,

    বিরাগ দেখানো,

    আর ডিসেম্বরসুলভ,

    জানালাগুলো ছেড়ে

    আর ঘন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল ।

    আমার পেছন থেকে, আমি শুনতে পাই হ্রেষা আর হাসি

    ঝাড়বাতিগুলোর ।

    তোমরা আমায় চিনতে পারতে না যদি আগে থেকে পরিচিত হতে :

    পেশীতন্তুর স্তুপ

    গোঙানি,

    স্নায়বিক অস্হিরতা ।

    এরকম একজন বোকাটে কি চাইতে পারে ?

    কিন্তু একজন বোকাটে অনেক কিছু চায় ।

    কেননা নিজের জন্য তা অর্থহীন

    তা তোমরা তামায় গড়া হও

    কিংবা হৃদয় হোক শীতল ধাতুর ।

    রাতের বেলায়, তোমাদের দাবিকে জড়িয়ে নিতে চাইবে

    মেয়েলি কোনোকিছু দিয়ে,

    কোমল ।

    আর এইভাবে,

    বিশাল,

    আমি কাঠামোর ভেতরে প্রতিষ্ঠিত হই.

    আর আমার কপাল দিয়ে, গলিয়ে ফেলি জানালার কাচ ।

    এই ভালোবাসা কি অসাধারণ হবে নাকি গতানুগতিক ?

    তা কি বজায় থাকবে নাকি উপেক্ষিত হবে ?

    বিরাট কেউ এরকম দেহে আঁটবে না :

    একটু ভালোবাসা জরুরি, -- একটা শিশু, হয়তো,

    যখন মোটরগাড়ি হর্ন বাজায় আর আওয়াজ করে তখন এ ভয় পায়,

    কিন্তু ঘোড়ায়-টানা ট্র্যামের ঘণ্টি পছন্দ করে ।

    আমি মুখোমুখি হলুম

    তরঙ্গায়িত বৃষ্টির সঙ্গে,

    তবু আরেকবার,

    আচ্ছা অপেক্ষা করো

    শহুরে ফেনার বজ্রপাতের গর্জনে ভিজে গেলুম ।

    ছুরি নিয়ে পাগলের মতন বাইরে বেরিয়ে,

    রাত ওকে ধরে ফেললো

    আর ছুরি মেরে দিলো,

    কেউ দেখেনি ।

    ঠিক মধ্যরাতে

    গিলোটিন থেকে খসা মুণ্ডুর মতন পড়ে গেলো।

    জানালার কাচে রুপোর বৃষ্টিফোঁটা

    জমিয়ে তুলছিল মুখবিকৃতি

    আর চেঁচাচ্ছিল ।

    যেন নত্রে দামের পশুমুখো নর্দমাগুলো

    চেল্লানো আরম্ভ করে দিলো ।

    ধিক্কার তোমাদের !

    যা ঘটেছে তাতে কি তোমরা এখনও সন্তুষ্ট নও ?

    কান্না এবার চারিধার থেকে আমার গলা কাটবে।

    আমি শুনতে পেলুম:

    আস্তে,

    বিছানার বাইরে রোগীর মতন,

    একটা স্নায়ু লাফালো

    নীচে ।

    প্রথমে,

    পুরুষটা সরে যায়নি, প্রায় ।

    তারপর, সন্দিগ্ধ

    আর সুস্পষ্ট,

    ও লাফাতে আরম্ভ করলো।

    আর এখন, ও আর আরও দুই জন,

    এদিক-ওদিক লাফাতে লাগলো, তিড়িঙ নাচ ।

    একতলায়, পলেস্তারা তাড়াতাড়ি খসে পড়ছিল ।

    স্নায়ুরা,

    বড়োগুলো

    ছোটোগুলো,--

    নানান ! --

    পাগলের মতন টগবগাতে আরম্ভ করলো

    যতক্ষণ না, শেষে,

    ওদের পা ওদের টানতে অক্ষম হলো ।

    ঘর থেকে রাত টপটপ করে বেরিয়ে এলো আর ডুবে গেলো।

    চটচটে মাটিতে আটকে গিয়ে, চোখ তা থেকে পিছলে বের করতে পারলো না।

    হঠাৎ দরোজাগুলো দুমদাম করতে লাগলো

    যেন হোটেলের দাঁতগুলো কিড়মিড় করতে শুরু করেছে ।

    তুমি প্রবেশ করলে,

    আচমকা যেন “এই নাও !”

    সোয়েড চামড়ার মোচড়ানো দস্তানা পরে, তুমি অপেক্ষা করলে,

    আর বললে,

    “তুমি জানো,--

    আমার শিগগির বিয়ে হবে।”

    তাহলে যাও বিয়ে করো ।

    ঠিকই আছে,

    আমি সামলে নিতে পারবো ।

    দেখতেই পাচ্ছো -- আমি শান্ত, নিঃসন্দেহে !

    কোনো শবের

    নাড়ির স্পন্দনের মতন ।

    মনে আছে ?

    তুমি বলতে :

    “জ্যাক লণ্ডন,

    টাকাকড়ি, 

    ভালোবাসা আর আকুলতা,”--

    আমি কেবল একটা ব্যাপারই দেখেছি : 

    তুমি ছিলে মোনালিসা,

    যাকে চুরি করা জরুরি ছিল !

    আর কেউ তোমায় চুরি করে নিলো ।

    ভালোবাসায় আবার, আমি জুয়া খেলা আরম্ভ করব,

    আমার ভ্রুর তোরণ আগুনে উদ্ভাসিত ।

    আর কেনই বা নয় ?

    অনেক সময়ে গৃহহীন ভবঘুরেরা

    পোড়া বাড়িতেও আশ্রয় খোঁজে !

    তুমি আমাকে ঠাট্টা করছো ?

    “উন্মাদনার কেবল গুটিকয় চুনী আছে তোমার

    ভিখারির কয়েক পয়সার তুলনায়, একে ভুল প্রমাণ করা যাবে না !”

    কিন্তু মনে রেখো

    এইভাবেই পম্পেইয়ের শেষ হয়েছিল

    যখন কেউ ভিসুভিয়াসের সঙ্গে ইয়ার্কি করেছিল !

    ওহে !

    ভদ্রমহোদয়গণ !

    তোমরা অশুচি 

    নিয়ে চিন্তা করো,

    অপরাধ

    আর যুদ্ধ ।

    কিন্তু তোমরা কি দেখেছো

    ভয়ঙ্কর সন্ত্রস্ত

    আমার মুখ

    যখন

    তা

    নিখুঁত শান্তিময়তায় থাকে ?

    আর আমি অনুভব করি

    “আমি”

    আমাকে ধরে রাখার জন্য খুবই ক্ষুদ্র ।

    আমার অন্তরে কেউ কন্ঠরুদ্ধ হচ্ছে ।

    হ্যালো !

    কে কথা বলছে ?

    মা ?

    মা !

    তোমার ছেলের হয়েছে এক অত্যাশ্চর্য অসুখ !

    মা !

    ওর হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে !

    তার বোন, লিডিয়া আর ওলগাকে বোলো

    যে আর কোথাও কোনো লুকোবার জায়গা নেই ।

    প্রতিটি শব্দ,

    মজার হোক বা অভদ্র,

    যা ও নিজের জ্বলন্ত মুখ থেকে ওগরায়,

    উলঙ্গ বেশ্যার মতন ঝাঁপিয়ে পড়ে

    জ্বলন্ত বেশ্যালয় থেকে ।

    লোকেরা গন্ধ শোঁকে--

    কোনো কিছু পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে ।

    ওরা দমকলকে ডাকে ।

    ঝলমলে হেলমেট পরে 

    তারা অবহেলাভরে ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে ।

    ওহে, দমকলের লোকদের বলো :

    বুটজুতো পরে ঢোকার অনুমতি নেই !

    গনগনে হৃদয় নিয়ে একজনকে বিচক্ষণ হতে হবে ।

    আমিই তা করব !

    আমি আমার জলভরা চোখ ঢেলে দেবো চৌবাচ্চায় ।

    আমাকে কেবল আমার পাঁজরকে ঠেলতে দাও আর আমি আরম্ভ করে দেবো।

    আমি লাফিয়ে পড়বো ! তোমরা আমাকে বাধা দিতে পারবে না !

    তারা বিদ্ধস্ত ।

    তোমরা হৃদয় থেকে লাফিয়ে পড়তে পারবে না !

    ঠোঁটের ফাটল থেকে,

    এক অঙ্গার-আস্তৃত চুমু উৎসারিত হয়,

    জ্বলন্ত মুখাবয়ব থেকে পালিয়ে যায় ।

    মা !

    আমি গান গাইতে পারি না ।

    হৃদয়ের প্রার্থনাঘরে, আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল গায়কদের গায়ে !

    শব্দাবলী আর সংখ্যাসমূহের প্রতিমাদের

    খুলির ভেতর থেকে,

    জ্বলন্ত বাড়ি থেকে শিশুদের মতন, পালাতে থাকে ।

    এইভাবে ভয়,

    আকাশে পৌঁছে, ডাক দেয়

    আর তুলে ধরে

    লুসিতানিয়ার আগুনে-বাহু আর উদ্বেগ ।

    শত-চোখ আগুন শান্তির দিকে তাকালো

    ফ্ল্যাটবাড়ির দিকে, যেখানে লোকেরা ঘামছিল ।

    এক শেষতম চিৎকারে,

    তুমি কি গোঙাবে, অন্তত,

    শতাব্দীগুলোকে প্রতিবেদন দেবার জন্য যে আমি অগ্নিদগ্ধ ?


     

    দ্বিতীয় পর্ব

    আমার মহিমাকীর্তন করো !

    প্রসিদ্ধরা কেউ আমার সমকক্ষ নয় !

    যাকিছু এপর্যন্ত করা হয়েছে তার ওপরে 

    আমি ছাপ মেরে দিই “নস্যাৎ।”

    আপাতত, আমার পড়ার ইচ্ছে নেই।

    উপন্যাস ?

    তাতে কি !

    বইপত্র এইভাবে তৈরি হয়,

    আমি ভাবতুম :--

    একজন কবির আগমন হয়,

    আর নিজের ঠোঁট অনায়াসে খোলে।

    অনুপ্রাণিত, মূর্খটা বেমালুম গাইতে আরম্ভ করে--

    ওহ ক্ষান্তি দাও !

    দেখা গেলো :

    উৎসাহে গাইবার আগে,

    নিজেদের কড়া-পড়া পায়ে ওরা কিছুক্ষণ তাল ঠোকে,

    যখন কিনা কল্পনার ঘিলুহীন মাছেরা

    হৃদয়ের পাঁকে কাদা ছেটায় আর মাখামাখি করে ।

    আর যখন, ছন্দে হিসহিসোচ্ছে, ওরা গরম জলে সেদ্ধ করে

    যাবতীয় ভালোবাসা আর পাপিয়া-পাখিদের ক্বাথের মতন ঝোলে,

    জিভহীন পথ কেবল কিলবিল করে আর কুণ্ডলী পাকায়---

    তাতে আর্তনাদ করার বা এমনকি বলার মতো কিছুই থাকে না ।

    আমরা নিজের গর্ববশে, সারাদিন সৎমেজাজে কাজ করি

    আর ব্যাবেলের শহর-মিনারগুলোর আবার পুনরানয়ন হয় ।

    কিন্তু ঈশ্বর

    গুঁড়িয়ে 

    এই শহরগুলোকে ফাঁকা মাঠে পালটে ফ্যালেন,

    শব্দকে মন্হন করে ।

    নৈঃশব্দে, রাস্তাকে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় দুর্দশায়।

    গ্রাসনলিকার পথে এক চিৎকার ঋজু দাঁড়িয়ে পড়ে।

    যখন মোটাসোটা ট্যাক্সি আর মোটরগাড়ি অন্তরায়ে স্হির,

    গলার ভেতরে আটকে থাকে ।

    যেন ক্ষয়রোগের কারণে,

    নিষ্পিষ্ট বুক শ্বাস নেবার জন্য খাবি খাচ্ছিল ।

    শহর, বিষাদে আক্রান্ত, তাড়াতাড়ি রাস্তা বন্ধ করে দিলো ।

    আর তখন--

    তা সত্ত্বেও !--

    রাস্তাটা চৌমাথার মোড়ে নিজের ধকল উগরে দিলো কেশে

    আর গলা থেকে বারান্দাকে ঠেলে বের করে দিলো, শেষ পর্যন্ত,

    মনে হলো যেন,

    শ্রেষ্ঠশ্রেনির দেবদূতের গায়কদলের ধুয়ায় যোগ দিয়ে,

    সাম্প্রতিককালে লুন্ঠিত, ঈশ্বর তার তাপ আমাদের দেখাবে !

    কিন্তু রাস্তাটা উবু হয়ে বসে কর্কশকন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো :

    “খেতে যেতে দাও !”

    শিল্পপতি ক্রুপ আর তার আণ্ডাবাচ্চারা ঘিরে ধরে

    শহরে চোখরাঙানো ভ্রু আঁকার জন্য,

    যখন কিনা সঙ্কীর্ণ প্রবেশপথে

    শব্দাবলীর লাশ এদিক-ওদিক ছড়ানো পড়ে থাকে,--

    দুটো বেঁচে থাকে আর মাথাচাড়া দ্যায়,--

    “শুয়োর”

    আর অন্যটা,--

    আমার মনে হয় “খাবার সুপ” ।

    আর কবির দল, ফোঁপানি আর নালিশে ভিজে সপসপে,

    রাস্তা থেকে দৌড় লাগায়, বিরক্ত আর খিটখিটে :

    “ওই দুটো শব্দ দিয়ে এখন আর ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়

    এক সুন্দরী রমণী

    কিংবা ভালোবাসা

    কিংবা শিশির-ঢাকা ফুল।”

    আর কবিদের পর,

    অন্যান্য হাজার লোকের হুড়োহুড়ি আরম্ভ হলো :

    ছাত্রছাত্রীর দল,

    বেশ্যার দল,

    বিক্রেতার দল ।

    ভদ্রমহোদয়গণ,

    থামুন !

    আপনারা তো অভাবগ্রস্ত নন ;

    তাহলে ভদ্রমহোদয়গণ কেন আপনারা ওগুলো চাইছেন !

    প্রতিটি পদক্ষেপে দালান অতিক্রম করে,

    আমরা স্বাস্হ্যবান আর অত্যুৎসাহী !

    ওদের কথা শুনবেন না, বরং ওদের পিটুনি দিন !

    ওদের,

    যারা মাঙনার বাড়তি হিসাবে সেঁটে রয়েছে

    প্রতিটি রাজন্য-বিছানায় !

    আমাদের কি নম্রভাবে ওদের জিগ্যেস করতে হবে :

    “সাহায্য করো, দয়া করে !”

    স্তবগানের জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করতে হবে

    আর বাগ্মীতার জন্য ?

    আমরা জ্বলন্ত স্তবগানের সৃষ্টিকারী

    কলমিল আর রসায়ানাগারের গুনগুনানির পাশাপাশি ।

    আমি কেন ফাউস্তের কথা ভাবতে যাবো ?

    আতশবাজির লুন্ঠনে পরীদের প্রদর্শন করে

    ও মেফিসটোফিলিসের সঙ্গে নক্ষত্রপূঞ্জের নকশাকাটা পাটাতনে পিছলে চলেছে !

    আমি জানি --

    আমার বুটজুতোয় একটা পেরেক

    গ্যেটের কল্পনার চেয়ে বেশি ভয়াবহ !

    আমি 

    সবচেয়ে সোনালী-হাঁমুখের

    প্রতিটি শব্দের সঙ্গে আমি দিচ্ছি

    দেহের এক নামদিবস,

    আর আত্মাকে এক পূনর্জন্ম,

    আমি তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি :

    জীবজগতের কণাও

    আমি এই পৃথিবীতে যা কিছু করব তার চেয়ে অনেক বেশি !

    শোনো !

    বর্তমান যুগের জরাথুষ্ট্র,

    ঘামে ভিজে,

    তোমাদের চারিপাশে দৌড়োচ্ছে আর এখানে ধর্মপ্রচার করছে ।

    আমরা, 

    বিছানার কোঁচকানো চাদরের মতন মুখ নিয়ে,

    ঝাড়লন্ঠনের মতন ঝোলা ঠোঁটে,

    আমরা,

    কুষ্ঠরোগীর জন্য নির্দিষ্ট শহরে বন্দী,

    যেখানে, জঞ্জাল আর সোনা থেকে, কুষ্ঠরোগীদের ঘা দেখা দিয়েছিল,

    আমরা ভেনিসের নীলাভ সমুদ্রের চেয়ে পবিত্র,

    রোদ্দুরের মলম-রশ্মিতে ধোয়া ।

    আমি সেই তথ্যে থুতু ফেলি

    যে হোমার আর ওভিদ সৃষ্টি করেননি

    গুটিবসন্তে ঢাকা ঝুল,

    আমাদের মতন সব মানুষদের,

    কিন্তু সেই সঙ্গে, আমি জানি যে

    সূর্য ফ্যাকাশে হয়ে যাবে

    যদি তা আমাদের আত্মার সোনালি খেতের দিকে তাকায়।

    প্রার্থনার তুলনায় পেশী আমাদের কাছে নির্বিকল্প !

    আমরা আর ভরতুকির জন্য প্রার্থনা করব না !

    আমরা--

    আমরা প্রত্যেকে--

    নিজেদের মুঠোয় ধরে রাখি

    জগতকে চালনা করার লাগাম !

    এ-থেকেই সভাস্হলগুলোয় গোলগোথার সূত্রপাত

    পেট্রোগ্রাড, মসকো, কিয়েভ, ওডেসায়,

    আর তোমাদের একজনও সেখানে ছিলে না যারা

    এইভাবে হাঁক পাড়ছিল না :

    “ওকে ক্রুসবিদ্ধ করো !

    ওকে উচিত শিক্ষা দাও !”

    কিন্তু আমার কাছে,--

    জনগণ,

    এমনকি তোমরা যারা জঘন্য ব্যবহার করেছ,--

    আমার কাছে, তোমরা প্রিয় আর আমি গভীরভাবে তোমাদের কদর করি।

    দেখোনি কি

    যে হাত তাকে পেটাচ্ছে সেই হাতকেই কুকুরটা চাটছে ?

    আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে

    আজকালকার দলবল ।

    তারা তৈরি করেছে

    আমাকে নিয়ে 

    একটা নোংরা পরিহাস ।

    কিন্তু আমি সময়ের পাহাড়কে ডিঙিয়ে দেখতে পাই,

    ওনাকে, যাঁকে কেউ দেখতে পায় না ।

    যেখানে মানুষের দৃষ্টিশক্তি পৌঁছোয় না,

    বিপ্লবের কাঁটার মুকুট পরে,

    ক্ষুধার্ত মানুষদের নেতৃত্ব দিয়ে,

    ১৯১৬ সাল ফিরে আসছে ।

    তোমাদের মধ্যে, ওনার অগ্রদূত,

    যেখানেই দুঃখকষ্ট থাকবে, আমি থাকবো কাছাকাছি ।

    আমি সেখানে নিজেকে ক্রুশবিদ্ধ করেছি,

    প্রতিটি অশ্রুফোঁটার ওপরে ।

    ক্ষমা করার মতন এখন আর কিছু নেই !

    যে আত্মারা সমবেদনার অঙ্কুরের জন্ম দেয়, আমি পুড়িয়ে দিয়েছি তার ক্ষেত ।

    তা অনেক কঠিন

    হাজার হাজার ব্যাষ্টিল আক্রমণের তুলনায় ।

    আর যখন

    তাঁর আবির্ভাব ঘোষিত হয়,

    আনন্দে আর গর্বে,

    তোমরা এগিয়ে যাবে উদ্ধারককে অভ্যর্থনা জানাতে--

    আমি টেনে নিয়ে যাবে

    বাইরে আমার আত্মাকে,

    আর পায়ে পিষবো

    যতক্ষণ না তা ছড়িয়ে পড়ছে !

    আর তোমাদের হাতে তুলে দেবো, রক্তে লাল, পতাকা হিসাবে ।


     

    তৃতীয় পর্ব

    আহ, কেমন করে আর কোথা থেকে

    ব্যাপারটা এই পরিণতিতে পৌঁছেছে যে

    উন্মাদনার নোংরা মুঠোগুলো

    আলোকময় আনন্দের বিরুদ্ধে বাতাসে তুলে ধরা হয়েছিল ?

    মেয়েটি এলো,--

    পাগলাগারদের চিন্তায়

    আর আমার মাথা ঢেকে দিলো বিষণ্ণতায় ।

    আর যেমন ড্রেডনট যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসের বেলায়

    কন্ঠরুদ্ধ অঙ্গবিক্ষেপে

    সেনারা আধখোলা দরোজার ভেতরে লাফিয়ে পড়েছিল, জাহাজডুবির আগে,

    ভবিষ্যবাদী কবি বারলিয়ুক হামাগুড়ি দিয়ে এগোল, পেরিয়ে গেল

    তাঁর চোখের চিৎকাররত ফাঁক দিয়ে ।

    তাঁর চোখের পাতাকে প্রায় রক্তাক্ত করে,

    উনি দেখা দিলেন হাঁটু গেড়ে,

    উঠে দাঁড়ালেন আর হাঁটতে লাগলেন

    আর উত্তেজিত মেজাজে,

    কোমলভাবে, অমন মোটা একজনের কাছে অপ্রত্যাশিত,

    উনি কেবল বললেন :

    “ভালো !”

    ব্যাপারটা ভালোই যখন পর্যবেক্ষণে এক হলুদ সোয়েটার

    আত্মাকে লুকিয়ে রাখে !

    ব্যাপারটা ভালোই যখন

    ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে, আতঙ্কের মুখোমুখি,

    তুমি চেঁচিয়ে বলো :

    “কোকো খাও -- ভ্যান হুটেন কোম্পানির !”

    এই মুহূর্ত,

    বাংলার আলোর মতন,

    বিস্ফোরণে ঝলসে,

    আমি কিছুর সঙ্গেই অদলবদল করব না,

    কোনো টাকাকড়ির জন্যও নয় ।

    চুরুটের ধোঁয়ায় মেঘাচ্ছন্ন,

    আর মদের গেলাসের মতন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত,

    যে কেউ কবি সেভেরিয়ানিন-এর মতো মাতাল-মুখো হতে পারে ।

    কোন সাহসে তুমি নিজেকে কবি বলো

    আর ধূসর, তিতির-পাখির মতন, নিজের আত্মাকে কিচিরমিচিরে ডুবিয়ে দাও !

    তখন

    পেতলের বাঘনখ দিয়ে

    ঠিক এই মুহূর্তে

    জগতের খুলিকে তোমায় চিরে ফেলতে হবে !

    তুমি,

    মাথায় শুধু একটিমাত্র ভাবনা নিয়ে,

    “আমি কি শৈলী অনুযায়ী নাচছি ?”

    দ্যাখো আমি কতো আনন্দিত

    তার বদলে,

    আমি,--

    সদাসর্বদা একজন ভেড়ুয়া আর জোচ্চোর ।

    তোমাদের সবার কাছ থেকে,

    যারা মামুলি মজার জন্য ভালোবাসায় ভিজেছো,

    যারা ছিটিয়েছো

    শতকগুলোতে অশ্রুজল, যখন তোমরা কাঁদছিলে,

    আমি বেরিয়ে চলে যাবো

    আর সূর্যের একচোখ চশমাকে বসাবো

    আমার বড়ো করে খোলা, একদৃষ্ট চোখে ।

    আমি রঙিন পোশাক পরব, সবচেয়ে অস্বাভাবিক

    আর পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবো

    জনগণকে খুশি দিতে আর তাতিয়ে তুলতে,

    আর আমার সামনে

    এক ধাতব দড়িতে গলাবাঁধা,

    ছোটো কুকুরবাচ্চার মতন দৌড়োবে নেপোলিয়ান ।

    একজন নারীর মতন, শিহরিত, পৃথিবী শুয়ে পড়বে,

    আত্মসমর্পণ করতে চেয়ে, মেয়েটি ধীরে-ধীরে অবনত হবে ।

    জীবন্ত হয়ে উঠবে সবকিছু

    আর চারিদিক থেকে,

    ওদের ঠোঁট তোতলা কথা বলবে :

    “য়াম-য়াম-য়াম-য়াম !”

    হঠাৎ,

    মেঘের দল

    আর বাতাসে অন্যান্য ব্যাপার

    আশ্চর্য কোনো উত্তেজনায় আলোড়িত,

    যেন শাদা-পোশাকে শ্রমিকদল, ওপরে ওইখানে,

    হরতাল ঘোষণা করেছে, সবাই তিক্ত আর আবেগে আক্রান্ত ।

    বর্বর বজ্র মেঘের ফাটল থেকে উঁকি দিলো, ক্রুদ্ধ ।

    নাকের বিশাল ফুটো থেকে ঘোড়ার ডাক দিয়ে, গর্জন করলো

    আর এক মুহূর্তের জন্যে, আকাশের মুখ তেবড়ে বেঁকে গেলো,

    লৌহ বিসমার্কের ভেঙচির মতন ।

    আর কেউ একজন,

    মেঘের গোলকধাঁধায় জড়িয়ে,

    কফিপানের রেস্তরাঁর দিকে, হাত বাড়িয়ে দিলো এখন :

    দুটিই, কোমলতর,

    আর নারীমুখ নিয়ে

    আর একই সঙ্গে, কামান দাগার মতন ।

    তুমি কি ভাবছো

    ওটা চিলেকোঠার ওপরে সূর্য

    কফিপানের রেস্তরারাঁকে আলতো আদর করতে চাইছে ?

    না, আবার এগিয়ে আসছে সংস্কারকামীদের কচুকাটা করতে

    উনি জেনেরাল গালিফেৎ !

    ভবঘুরের দল, পকেট থেকে হাত বের করে নাও--

    বোমা তুলে নাও, ছুরি কিংবা একটা পাথর

    আর কেউ যদি লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে ছুঁড়তে না পারে

    তাহলে সে চলে আসুক কেবল নিজের কপাল দিয়ে লড়তে !

    এগিয়ে যাও, ক্ষুধার্ত,

    গোলামের দল,

    আর নির্যাতিতরা,

    এই মাছি ভনভনে জঞ্জালে, পোচো না !

    এগিয়ে যাও !

    আমরা সোমবারগুলো আর মঙ্গলবারগুলোকে

    ছুটির দিনে পালটে দেবো, তাদের রাঙিয়ে দেবো রক্তে !

    পৃথিবীকে মনে করিয়া দাও তাকে আমি হীন প্রতিপন্ন করতে চেয়েছিলুম !

     রূঢ় হও !

    পৃথিবী

    রক্ষিতার মুখের মতন ফুলে উঠেছে,

    যাকে রথসচাইল্ড বেশি-বেশি ভালোবেসেছিল !

    গুলির আগুনের বরাবর পতাকাগুলো উড়ুক

    যেমন ওরা ছুটির দিনে করে, জাঁকজমকসহ !

    ওহে, রাস্তার লন্ঠনেরা, পণ্যজীবীদের আরও ওপরে তোলো,

    ওদের মড়াগুলোকে হাওয়ায় ঝুলতে দাও ।

    আমি অভিশাপ দিলুম,

    ছুরি মারলুম

    আর মুখে ঘুষি মারলুম,

    কারোর পেছনে হামাগুড়ি দিলুম,

    তাদের পাঁজর কামড়ে ধরে ।

    আকাশে, লা মারসেইলিজ-এর মতন লাল,

    সূর্যাস্ত তার কম্পিত ঠোঁটে মরণশ্বাস তুলছিল ।

    এটা মানসিক বিকার !

    যুদ্ধ থেকে কোনো কিছুই বাঁচবে না ।

    রাত এসে পড়বে,

    কামড়ে ধরবে তোমাকে

    আর বাসিই গিলে ফেলবে তোমাকে ।

    দ্যাখো--

    আকাশ আরেকবার জুডাস-এর ভূমিকায়,

    একমুঠো নক্ষত্র নিয়ে কাদের বিশ্বাসঘাতকতায় চোবানো হয়েছিল?

    এই রাত

    তাতার যুদ্ধবাজ মামাই-এর মতন, আহ্লাদে পানোৎসব করে,

    উত্তাপে দগ্ধ করে দিলো শহরকে ।

    আমাদের চোখ এই রাতকে ভেদ করতে পারবে না,

    দুই পক্ষের চর আজেফ-এর মতন কালো !

    শুঁড়ির আসরে চুপচাপ এক কোণে হেলান দিয়ে, আমি বসে থাকি,

    আমার আত্মায় আর মেঝেতে মদ চলকে পড়ে,

    আর আমি দেখি :

    কোনের দিকে, গোল চোখের প্রভা

    আর তাদের সঙ্গে, ম্যাডোনা চেবাচ্ছে হৃদয়ের কেন্দ্র  ।

    এরকম মাতাল ভিড়ে অমন আনন্দবিচ্ছুরণ প্রদান করা কেন ?

    ওদের কিই বা দেবার আছে ?

    তোমরা দেখতে পাচ্ছ -- আরেকবার,

    ওরা কেন বারাব্বাসকে পছন্দ করে

    গোলগোথার মানুষটির তুলনায় ?

    হয়তো, ভেবেচিন্তে,

    মানবিক ভানে, কেবল একবার নয়

    আমি কি তরতাজা মুখ পরে থাকবো ।

    আমি, হয়তো,

    তোমার ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে সৌম্যকান্তি

    সম্পূর্ণ মানবজাতিতে ।

    ওদের দিয়ে দাও,

    যারা আহ্লাদে ডগমগ,

    এক দ্রুত মৃত্যু,

    যাতে ওদের ছেলেপুলেরা ভালোভাবে গড়ে ওঠে ;

    ছেলেরা -- পিতা হিসাবে

    মেয়েরা -- গর্ভবতী নারী হিসাবে ।

    সেই জ্ঞানী মানুষদের মতন, নব্যপ্রসূতদের 

    অন্তর্দৃষ্টি আর ভাবনাচিন্তায় ধূসর হয়ে উঠতে দাও

    আর ওরা আসবে

    শিশুদের নামকরণের অনুষ্ঠানে

    যে কবিতাগুলো আমি লিখেছি, তাদের।

    আমি যন্ত্রপাতি আর ব্রিটেনের শিল্পের গুণগান করি ।

    কোনো মামুলি, সার্বজনিক ধর্মোপদেশে,

    হয়তো লেখা হয়ে থাকতে পারে

    যে আমিই ত্রয়োদশতম দূত ।

    আর যখন আমার কন্ঠস্বর তারস্বরে ঘোষণা করবে,

    প্রতি সন্ধ্যায়,

    ঘণ্টার পর ঘণ্টা,

    আমার আহ্বানের অপেক্ষায়

    যিশুখ্রিস্ট, নিজে, হয়তো ঘ্রাণ নেবেন

    আমার আত্মার ফরগেট-মি-নট গুল্মের ।


     

    চতুর্থ পর্ব

    মারিয়া ! মারিয়া !

    ভেতরে আসতে দাও, মারিয়া !

    আমাকে রাস্তায় ফেলে যেও না !

    তুমি অমন করতে পারো ?

    আমার গাল চুপসে গেছে,

    অথচ তুমি নিষ্ঠুরভাবে অপেক্ষা করাও ।

    তাড়াতাড়ি, সবায়ের দ্বারা পরীক্ষিত,

    বাসি আর বিবর্ণ,

    আমি চলে আসবো

    আর বিনা দাঁতে তোতলাবো

    যে আজকে আমি

    “সাতিশয় অকপট।”

    মারিয়া, 

    চেয়ে দ্যাখো--

    আমার কাঁধ দুটো আবার ঝুলে পড়ছে ।

    রাস্তায়, লোকেরা

    তাদের চার-তলা পেটের চর্বিতে আঙুল বোলায়।

    ওরা চোখ দেখায়,

    চল্লিশ বছরের অবসাদে ক্ষয়িত, আর অস্হির---

    ওরা চাপা হাসি হাসে কেননা

    আমার দাঁতে,

    আবারও,

    আমি গত রাতের আদরগুলোর শক্ত-হয়ে-যাওয়া ধৃষ্টতা কামড়ে ধরে রেখেছি ।

    বৃষ্টি ফুটপাথের ওপরে কেঁদে ফেললো,--

    ও তো জমা-জলে কারারুদ্ধ জোচ্চোর ।

    রাস্তার লাশ, পাথরবাঁধানো পাথরের পিটুনি খেয়ে, নিজের কান্নায় ভিজে গেলো।

    কিন্তু ধূসর চোখের পাতাগুলো--

    হ্যাঁ !--

    ঝুলন্ত বরফের চোখের পাতা হয়ে উঠলো জমাট

    তাদের চোখ থেকে ঝরা অশ্রুজলে--

    হ্যাঁ !--

    ড্রেনপাইপগুলোর বিষাদভারাতুর চোখ থেকে ।

    প্রতিটি পথচারীকে চাটছিল বৃষ্টির শুঁড় :

    পথের গাড়িগুলোয় ঝিকমিক করছিল খেলোয়াড়ের দল ।

    ফেটে পড়ছিল জনগণ

    গাদাগাদি ভরা,

    আর তাদের চর্বি উথলে উঠছিল ।

    ঘোলাটে এক নদীর মতন, মাটিতে স্রোত গড়ে উঠেছিল,

    তাতে মিশেছিল

    বাসি মাংসের রস ।

    মারিয়া !

    কেমন করে আমি কোমল শব্দকে স্ফীত কানে আঁটাবো ?

    একটা পাখি

    ভিক্ষার জন্য গান গায়

    ক্ষুধার্ত কন্ঠস্বরে

    বরং ভালো,

    কিন্তু আমি একজন মানুষ,

    মারিয়া,

    আমি তো প্রেসনিয়ার নোংরা তালুতে অসুস্হ রাতের কাশি ।

    মারিয়া, তুমি কি আমাকে চাও ?

    মারিয়া, আমাকে গ্রহণ করো, দয়া করো ।

    কাঁপা আঙুলে আমি গির্জার ঘণ্টার লোহার গলা টিপে ধরবো !

    মারিয়া !

    রাস্তার চারণভূমিগুলো বুনো আর দর্শনীয় হয়ে গেছে !

    ওরা আমার গলা টিপে ধরেছে আর আমি প্রায় অজ্ঞান হতে চলেছি।

    খোলো !

    আমি আহত !

    দ্যাখো -- আমার চোখ খুবলে নেয়া হয়েছে

    মেয়েদের টুপির আলপিন দিয়ে !

    তুমি দরোজা খুলে দিলে ।

    আমার খুকি !

    ওহ, ভয় পেও না !

    এই মহিলাদের দেখছো,

    আমার গলায় পাহাড়ের মতন ঝুলে রয়েছে,--

    জীবনভর, নিজের সঙ্গে টেনে নিয়ে যাই

    কয়েক কোটি, প্রচুর, বিশাল, বিশুদ্ধ ভালোবাসাদের

    আর কোটি কোটি নোংরা, বিদকুটে ভাড়াপ্রেমিকাদের ।

    ভয় পেও না

    যদি সততার 

    প্রতিজ্ঞাভঙ্গ হয়,

    হাজার সুন্দরী মুখ দেখে, আমি নিজেকে তাদের দিকে ছুঁড়ে দেবো--

    “ওরা, যারা মায়াকভস্কিকে ভালোবাসে !”

    দয়া করে বোঝো যে ওটাও হল

    রানিদের বংশ, যারা একজন উন্মাদ মানুষের হৃদয়ে সওয়ার হয়েছে ।

    মারিয়া, কাছে এসো !

    নগ্ন আর লজ্জাহীন হও,

    কিংবা আতঙ্কে শিহরিত,

    তোমার ঠোঁটের বিস্ময়কে সমর্পণ করো, কতো নরম :

    আমার হৃদয় আর আমি কখনও মে মাসের আগে পর্যন্ত থাকিনি,

    কিন্তু অতীতে,

    শত শত এপ্রিল মাস জড়ো হয়েছে ।

    মারিয়া !

    একজন কবি সারা দিন কল্পিত সুন্দরীর বন্দনায় গান গায়,

    কিন্তু আমি--

    আমি রক্তমাংসে গড়া,

    আমি একজন মানুষ --

    আমি তোমার দেহ চাই,

    খ্রিস্টধর্মীরা যেমন প্রার্থনা করে :

    “এই দিনটা আমাকে দাও

    আমাদের প্রতিদিনের রুটি।”

    মারিয়া, আমাকে দাও !

    মারিয়া !

    আমি ভয় পাই তোমার নাম ভুলে যাবো

    চাপে পড়ে কবি যেমন শব্দ ভুলে যায়

    একটি শব্দ

    সে অস্হির রাতে কল্পনা করেছিল,

    ঈশ্বরের সমান যার প্রভাব ।

    তোমার দেহকে

    আমি ভালোবেসে যাবো আর তত্বাবধান করবো

    যেমন একজন সৈনিক

    যুদ্ধে যার পা কাটা গেছে,

    একা

    আর-কেউ তাকে চায় না,

    অন্য পা-কে সে সস্নেহে যত্ন করে ।

    মারিয়া,--

    তুমি কি আমাকে নেবে না ?

    নেবে না তুমি !

    হাঃ !

    তাহলে অন্ধকারময় আর বেদনাদায়ক,

    আরেকবার,

    আমি বয়ে নিয়ে যাবো

    আমার অশ্রু-কলঙ্কিত হৃদয়

    এগোবো,

    কুকুরের মতন,

    খোঁড়াতে খোঁড়াতে,

    থাবা বইতে থাকে সে

    যার ওপর দিয়ে দ্রুতগতি রেলগাড়ি চলে গেছে।

    হৃদয় থেকে রক্ত ঝরিয়ে আমি যে রাস্তায় ঘুরে বেড়াই তাকে উৎসাহ দেবো,

    আমার জ্যাকেটে ফুলের গুচ্ছ ঝুলে থাকে,  ধূসরিত করে,

    সূর্য পৃথিবীর চারিধারে হাজার বার নাচবে,

    স্যালোম-এর মতন

    ব্যাপটিস্টের মুণ্ডু ঘিরে যে নেচে ছিল ।

    আর যখন আমার বছরগুলো, একেবারে শেষে,

    তাদের নাচ শেষ করবে আর বলিরেখা আঁকবে

    কোটি কোটি রক্ত-কলঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে

    আমার পিতার রাজত্বের পথ

    আমি চড়ে বেরিয়ে আসবো

    নোংরা ( রাতের বেলায় গলিতে ঘুমিয়ে ),

    আর কানেতে ফিসফিস করে বলব

    যখন আমি দাঁড়িয়ে

    ওনার দিকে :

    শ্রীমান ঈশ্বর, শোনো !

    এটা কি ক্লান্তিকর নয়

    তোমার মহানুভব চোখদুটো মেঘেতে ডুবিয়ে দাও

    প্রতিদিন, প্রতি সন্ধ্যায় ?

    তার বদলে, এসো,

    বৃত্তাকারে পাক খাবার উৎসব আরম্ভ করা যাক

    শুভ আর অশুভের জ্ঞানবৃক্ষ ঘিরে !

    সর্বশক্তিমান, তুমি চিরকাল আমাদের পাশে থাকবে !

    মদ থেকে, মজাগুলো আরম্ভ হবে

    আর প্রেরিত দূত পিটার, যিনি সব সময়ে ভ্রুকুটি করেন,

    দ্রুত-লয়ের নাচ নাচবেন--- কি-কা-পু ।

    আমরা সব কয়জন ইভকে ইডেন স্বর্গোদ্যানে ফিরিয়ে আনবো :

    আমাকে আদেশ করো

    আর আমি যাবো --

    বীথিকাগুলো থেকে, প্রয়োজনের সুন্দরী মেয়েদের বেছে নেবো

    আর তাদের তোমার কাছে আনবো !

    আনবো তো আমি ?

    না ?

    তুমি তোমার কোঁকড়াচুল মাথা কেন অভব্যভাবে নাড়াচ্ছো ?

    কেন তুমি তোমার ভ্রুতে গিঁট ফেলছো যেন তুমি রুক্ষ ?

    তুমি কি মনে করো

    যে এই

    যার ডানা আছে, সে কাছেই,

    ভালোবাসার মানে জানে ?

    আমিও একজন দেবদূত ; আগেও ছিলুম--

    শর্করায় তৈরি মেশশাবকের চোখ নিয়ে, আমি তোমার মুখগুলোর দিকে তাকালুম,

    কিন্তু আমি ঘোটকিদের আর উপহার দিতে চাই না, --

    সেভরে-পাড়ার সমস্ত অত্যাচারকে ফুলদানির রূপ দেয়া হয়েছে ।

    সর্বশক্তিমান, তুমি দুটো হাত তৈরি করে দিয়েছো,

    আর তা সযত্নে,

    একটা মাথা গড়ে দিয়েছো, আর তালিকায় অনেককিছু রয়েছে--

    কিন্তু কেন তুমি তা করলে

    কেননা ব্যথা করে

    যখন কেউ চুমু খায়, চুমু, চুমু ?!

    আমি ভেবেছিলুম তুমিই মহান ঈশ্বর, সর্বশক্তিমান

    কিন্তু তুমি একজন ক্ষুদে মূর্তি, -- স্যুট-পরা একজন নির্বোধ,

    ঝুঁকে, আমি ইতিমধ্যে আয়ত্বে পেয়েছি

    সেই ছুরি যা আমি লুকিয়ে রেখেছি

    আমার বুটজুতোর ফাঁকে ।

    তোমরা, ডানাসুদ্ধ জোচ্চোরের দল

    ভয়ে জড়োসড়ো হও !

    নিজেদের কাঁপতে-থাকা পালকগুলো ঝাঁকাও, রাসকেলের দল !

    তুমি, গা থেকে ধুপের গন্ধ বেরোচ্ছে, তোমাকে চিরে ফালাফালা করব,

    এখান থেকে আলাস্কা পর্যন্ত ধাওয়া করে।

    আমাকে যেতে দাও !

    তুমি আমাকে থামাতে পারবে না !

    আমি ঠিক হই বা ভুল

    তাতে কোনো তফাত হয় না,

    আমি শান্ত হবো না ।

    দ্যাখো,--

    সারা রাত নক্ষত্রদের মাথা কাটা হয়েছে

    আর আকাশ আবার কোতলে রক্তবর্ণ ।

    ওহে তুমি,

    স্বর্গ !

    মাথা থেকে টুপি খোলো,

    যখনই আমাকে কাছে দেখতে পাবে !

    স্তব্ধতা । 

    ব্রহ্মাণ্ড ঘুমোচ্ছে ।

    কালো, নক্ষত্রে- কানের তলায়

    থাবা রেখে ।


     

    মেরুদণ্ড বেণু

    প্রস্তাবনা

    তোমাদের সকলের জন্যে,

    যারা কখনও আনন্দ দিয়েছিল বা এখনও দিচ্ছে,

    আত্মার সমাধিতে প্রতিমাদের দ্বারা সুরক্ষিত,

    আমি তুলে ধরব, মদের এক পানপাত্রের মতো

    উৎসবের অনুষ্ঠানে, খুলির কানায়-কানায় ভরা কবিতা ।

    .

    আমি প্রায়ই বেশি-বেশি ভাবি :

    আমার জন্যে অনেক ভালো হতে পারতো

    একটা বুলেট দিয়ে আমার সমাপ্তিকে  বিদ্ধ করে দেয়া ।

    আজকের দিনেই, 

    হয়তো বা, 

    আমি আমার অন্তিম প্রদর্শন মঞ্চস্হ করছি।

    .

    স্মৃতি !

    আমার মগজ থেকে সভাঘরে একত্রিত হয়

    আমার প্রেমের অফুরান সংখ্যা

    চোখ থেকে চোখে হাসি ছড়িয়ে দ্যায় ।

    বিগত বিয়ের ফেস্টুনে রাতকে সাজাও।

    দেহ থেকে দেহে ঢেলে দাও আনন্দ ।

    এই রাত যেন কেউ ভুলতে না পারে । 

    এই অনুষ্ঠানে আমি বেণু বাজাব ।

    বাজাবো আমার নিজের মেরুদণ্ডে ।

    .


     

    বড়োবড়ো পা ফেলে আমি মাড়িয়ে যাচ্ছি দীর্ঘ পথ ।

    কোথায় যাবো আমি, নিজের ভেতরের নরকে লুকোবো ?

    অভিশপ্ত নারী, কোন স্বর্গীয় কার্যাধ্যক্ষ

    তার কল্পনায় তোমাকে গড়েছে ?!

    আনন্দে মাতার জন্য পথগুলো অনেক বেশি সঙ্কীর্ণ ।

    ছুটির দিনের গর্ব আর শোভাযাত্রায় জনগণ বেরিয়ে পড়েছে রবিবারের সাজে।

    আমি ভাবলুম,

    ভাবনাচিন্তা, অসুস্হ আর চাপচাপ

    জমাটবাঁধা রক্ত, আমার খুলি থেকে হামাগুড়ি দিয়েছে ।

    .

    আমি,

    যাকিছু উৎসবময় তার ইন্দ্রজালকর্মী,

    এই উৎসব বাঁটোয়ারা করার কোনো সঙ্গী নেই।

    এবার আমি যাবো আর ঝাঁপাবো,

    নেভস্কির পাথরগুলোতে ঠুকবো আমার মগজ !

    আমি ঈশ্বরনিন্দা করেছি ।

    চিৎকার করে বলেছি ঈশ্বর বলে কিছু নেই,

    কিন্তু নরকের অতল থেকে

    ঈশ্বর এক নারীকে অবচিত করলেন যার সামনে পর্বতমালা

    কাঁপবে আর শিহরিত হবে :

    তিনি তাকে সামনে নিয়ে এলেন আর হুকুম দিলেন :

    একে ভালোবাসো !

    .

    ঈশ্বর পরিতৃপ্ত । 

    আকাশের তলায় এক দুরারোহ পাআড়ে

    এক যন্ত্রণাকাতর মানুষ পশুতে পরিণত হয়ে বিদ্ধস্ত হয়েছে ।

    ঈশ্বর হাত কচলান ।

    ঈশ্বর চিন্তা করেন :

    তুমি অপেক্ষা করো, ভ্লাদিমির !

    যাতে তুমি জানতে না পারো নারীটি কে,

    তিনি ছিলেন, নিঃসন্দেহে তিনি,

    যিনি নারীটিকে একজন বাস্তব স্বামী দেবার কথা ভাবলেন     

    আর পিয়ানোর ওপরে মানুষের স্বরলিপি রাখলেন ।   

    কেউ যদি হঠাৎ পা-টিপে-টিপে শোবার ঘরের দরোজায় যেতো

    আর তোমার ওপরের ওয়াড়-পরানো লেপকে    আশীর্বাদ করতো,

    আমি জানি

    পোড়া পশমের গন্ধ বেরোতো,

    আর শয়তানের মাংস উদ্গীরণ করতো গন্ধকের ধোঁয়া।

    তার বদলে, সকাল হওয়া পর্যন্ত,

    আতঙ্কে যে ভালোবাসবার জন্য তোমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে

    আমি ছোটাছুটি করলুম

    আমার কান্নাকে কবিতার মুখাবয়ব দিলুম,

    উন্মাদনার কিনারায় এক হীরক-কর্তনকারী।

    ওহ, কেবল এক থাক তাসের জন্য !

    ওহ, মদের জন্য

    শ্বাসে বেরোনো হৃদয়কে কুলকুচি করার জন্য ।

    .

    তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই !

    তোমাকে আমি চাই না !

    যাই হোক না কেন,

    আমি জানি

    আমি তাড়াতাড়ি কর্কশ চিৎকারে ভেঙে পড়ব !

    .

    যদি সত্যি হয় যে তোমার অস্তিত্ব আছে,

    ঈশ্বর,

    আমার ঈশ্বর,

    যদি নক্ষত্রদের জাজিম তোমারই বোনা হয়,

    যদি, প্রতিদিনকার এই

    অতিরক্ত যন্ত্রণা, 

    তুমি চাপিয়ে দিয়েছ নিগ্রহ, হে প্রভু ;

    তাহলে বিচারকের শেকল পরে নাও ।

    আমার আগমনের জন্য অপেক্ষা করো।

    আমি সময়কে মান্যতা দিই 

    এবং এক দিনও দেরি করব না ।

    শোনো,

    সর্বশক্তিমান ধর্মবিচারক !

    আমি মুখে কুলুপ দিয়ে রাখব ।

    কোনো কান্না

    আমার কামড়ে-ধরা ঠোঁট থেকে বেরোবে না।

    ঘোড়ার ল্যাজের মতো ধুমকেতুর সঙ্গে আমাকে বেঁধে রাখো,

    আর ঘষটে নিয়ে চলো আমাকে,

    নক্ষত্রদের গ্রাসে ছিন্ন হয়ে ।

    কিংবা হয়তো এরকম :

    আমার আত্মা যখন দেহের আশ্রয় ছেড়ে 

    তোমার বিচারব্যবস্হার সামনে নিজেকে উপস্হিত করবে,

    তখন কটমট ভ্রু কুঁচকে,

    তুমি,

    ছায়াপথের দুই পাশে পা ঝুলিয়ে ছুঁড়ে দিও ফাঁসির দড়ি,

    একজন অপরাধীর মতন আমাকে গ্রেপ্তার করে ঝুলিয়ে দিও ।

    তোমার ইচ্ছানুযায়ী যা হয় কোরো।

    যদি চাও আমাকে কেটে চার টুকরো করো।

    আমি নিজে তোমার হাত ধুয়ে পরিষ্কার করে দেবো ।

    কিন্তু এইটুকু করো--

    তুমি কি শুনতে পাচ্ছো !---

    ওই অভিশপ্ত নারীকে সরিয়ে দাও

    যাকে তুমি আমার প্রিয়তমা করেছো !

    .

    বড়ো বড়ো পা ফেলে আমি মাড়িয়ে যাচ্ছি দীর্ঘ পথ ।

    কোথায় যাবো আমি, নিজের ভেতরের নরকে লুকোবো ?

    অভিশপ্ত নারী, কোন স্বর্গীয় কার্যাধ্যক্ষ

    তার কল্পনায় তোমাকে গড়েছে ?!

    .


     

    উভয় আলোয়,

    ধোঁয়ায় ভুলে গিয়েছে তার রঙ ছিল নীল,

    আর মেঘগুলো দেখতে ছেঁড়াখোড়া উদ্বাস্তুদের মতো,

    আমি নিয়ে আসবো আমার শেষতম ভালোবাসার ভোর,

    কোনো ক্ষয়রোগীর রক্তবমির মতন উজ্বল।

    উল্লাসময়তায় আমি ঢেকে ফেলবো গর্জন

    সমাগমকারীদের,

    বাড়ি আর আরাম সম্পর্কে বিস্মৃত।

    পুরুষের দল,

    আমার কথা শোনো !

    পরিখা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরোও :

    তোমরা এই যুদ্ধ আরেকদিন লোড়ো।

    .

    এমনকি যদি,

    মদ্যপানের গ্রিক দেবতার মতন রক্তে লুটোপুটি খাও,

    এক মত্ত লড়াই তার শীর্ষে পৌঁছে গেছে--

    তবুও ভালোবাসার শব্দেরা পুরোনো হয় না ।

    প্রিয় জার্মানরা !

    আমি জানি

    গ্যেটের গ্রেশেন নামের নারী

    তোমার ঠোঁটে উৎসারিত হয় ।

    ফরাসিরা

    বেয়োনেটের আঘাতে হাসিমুখে মারা যায় ;

    মৃদু হাসি নিয়ে বিমানচালক ভেঙে পড়ে ;

    যখন তাদের মনে পড়ে 

    তোমার চুমুখাওয়া মুখ, 

    ত্রাভিয়াতা ।

    .

    কিন্তু গোলাপি হাঁ-মুখের জন্য আমার আগ্রহ নেই

    যা বহু শতক এতাবৎ কামড়েছে ।

    আজকে আমাকে জড়িয়ে ধরতে দাও নতুন পা!

    তুমি আমি গাইবো,

    লালমাথায়

    রুজমাখা ঠোঁটে ।


     

    হয়তো, এই সময়কে কাটিয়ে উঠে

    যা বেয়োনেটের ইস্পাতের মতন যন্ত্রণাদায়ক,

    পেকে-যাওয়া দাড়িতে বহু শতক

    কেবল আমরাই থাকবো :

    তুমি

    আর আমি,

    শহর থেকে শহরে তোমার পেছন পেছন ।

    সমুদ্রের ওই পারে তোমার বিয়ে হবে,

    আর রাতের আশ্রয়ে প্রতীক্ষা করবে---

    লণ্ডনের কুয়াশায় আমি দেগে দেবো

    তোমায় পথলন্ঠনের তপ্ত ঠোঁট ।

    এক গুমোটভরা মরুভূমিতে, যেখানে সিংহেরা সতর্ক,

    তুমি তোমার কাফেলাদের মেলে ধরবে--

    তোমার ওপরে,

    হাওয়ায় ছেঁড়া বালিয়াড়ির তলায়,

    আমি পেতে দেবে সাহারার মতন আমার জ্বলন্ত গাল।

    .

    তোমার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি খেলিয়ে

    তুমি চাউনি মেলবে

    আর দেখবে এক সৌম্যকান্তি বুলফাইটার !

    আর হঠাৎ আমি,

    এক মরণাপন্ন ষাঁড়ের চোখের জন্য, 

    ধনী দর্শকদের দিকে আমার ঈর্ষা ছুঁড়ে দেবো ।

    .

    যদি কোনো সেতু পর্যন্ত তুমি তোমার সংশয়াপন্ন পা নিয়ে যাও,

    এই ভেবে

    নিচে নামা কতো ভালো--

    তাহলে সে আমিই,

    সেতুর তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সিন নদী,

    যে তোমাকে ডাকবে

    আমার ক্ষয়াটে দাঁত দেখিয়ে ।

    .

    যদি তুমি, অন্য পুরুষের সাথে মোটর গাড়িতে দ্রুত চলে যাচ্ছো, পুড়িয়ে দাও

    স্ত্রেলকা-পাড়া বা সোকোলনিকি অঞ্চল--

    তাহলে সে  আমিই, উঁচুতে উঠছি,

    চাঁদের মতন প্রত্যাশী আর আবরণমুক্ত,

    যে তোমাকে আকাঙ্খায় আকুল করে তুলবে ।

    .

    তাদের প্রয়োজন হবে

    আমার মতো এক শক্তিমান পুরুষ--

    তারা হুকুম করবে :

    যুদ্ধে গিয়ে মরো !

    শেষ যে শব্দ আমি বলব

    তা তোমার নাম,

    বোমার টুকরোয় জখম আমার রক্তজমাট ঠোঁটে ।

    .

    আমার শেষ কি সিংহাসনে বসে হবে ?

    নাকি সেইন্ট হেলেনা দ্বীপে ?

    জীবনের ঝড়ের দাপটগুলোকে জিন পরিয়ে,

    আমি প্রতিযোগীতায় নেমেছি

    জগতের রাজত্বের জন্য

    আর 

    দণ্ডাদেশ-পাওয়া কয়েদির পায়ের বেড়ি ।

    .

    আমি জার হবার জন্য নিয়তি-নির্দিষ্ট--

    আমার মুদ্রার সূর্যালোকপ্রাপ্ত সোনায়

    আমি আমার প্রজাদের হুকুম দেবো

    টাঁকশালে ছাপ দিতে

    তোমার চমৎকার মুখাবয়ব !

    কিন্তু যেখানে

    পৃথিবী হিমপ্রান্তরে বিলীন হয়,

    নদী যেখানে উত্তর-বাতাসের সঙ্গে দরাদরি করে,

    সেখানে আমি পায়ের বেড়িতে লিলির নাম আঁচড়ে লিখে যাবো,

    আর  কঠোর দণ্ডাদেশের অন্ধকারে,

    বারবার তাতে চুমু খাবো ।

    .


     

    তোমরা শোনো, যারা ভুলে গেছ আকাশের রঙ নীল,

    যারা সেই রকম রোমশ হয়েছ

    যেন জানোয়ার ।

    হয়তো এটাই

    জগতের শেষতম ভালোবাসা

    যা ক্ষয়রোগীর রক্তবমির মতন উজ্বল ।

    .


     

    আমি ভুলে যাব বছর, দিন, তারিখ ।

    কাগজের এক তাড়া দিয়ে নিজেকে তালাবন্ধ করে রাখব।

    আলোকপ্রাপ্ত শব্দাবলীর যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে,

    সৃষ্টি করব তোমায়, হে অমানবিক ইন্দ্রজাল !

    .

    এই দিন, তোমার কাছে গিয়ে,

    আমি অনুভব করেছি

    বাড়িতে কিছু-একটা অঘটন ঘটেছে ।

    তোমার রেশমে কিছু গোপন করেছ,

    আর ধূপের সুগন্ধ ফলাও হয়ে ছড়িয়েছে বাতাসে ।

    আমাকে দেখে আনন্দিত তো ?

    সেই “অনেক”

    ছিল অত্যন্ত শীতল ।

    বিভ্রান্তি ভেঙে ফেলল যুক্তির পাঁচিল ।

    তপ্ত ও জ্বরে আক্রান্ত, আমি হতাশার স্তুপে আশ্রয় নিলুম । 

    .

    শোনো,

    তুমি যা-ই করো না কেন,

    তুমি শবকে লুকোতে পারবে না ।

    সেই ভয়ানক শব্দ মাথার ওপরে লাভা ঢেলে দ্যায় ।

    তুমি যা-ই করো না কেন,

    তোমার প্রতিটি পেশীতন্তু

    শিঙা বাজায়

    যেন লাউডস্পিকার থেকে :

    মেয়েটি মৃতা, মৃতা, মৃতা !

    তা হতে পারে না, 

    আমাকে জবাব দাও ।

    মিথ্যা কথা বোলো না !

    ( এখন আমি যাবো কেমন করে ? )

    তোমার মুখাবয়বে তোমার দুই চোখ খুঁড়ে তোলে

    দুটি গভীর কবরের ব্যাদিত অতল ।

    .

    কবরগুলো আরও গভীর হয় ।

    তাদের কোনো তলদেশ নেই ।

    মনে হয়

    দিনগুলোর উঁচু মাচান থেকে আমি প্রথমে মাথা নামিয়ে লাফিয়ে পড়ব।

    অতল গহ্বরের ওপরে আমি আমার আত্মাকে টেনে বাজিকরের দড়ি করে নিয়েছি

    আর, শব্দদের ভোজবাজি দেখিয়ে, তার ওপরে টাল সামলাচ্ছি ।

    .

    আমি জানি

    ভালোবাসা তাকে ইতিমধ্যে পরাস্ত করেছে ।

    আমি অবসাদের বহু চিহ্ণ খুঁজে পাচ্ছি ।

    আমার আত্মায় পাচ্ছি আমাদের যৌবন ।

    হৃদয়কে আহ্বান জানাও দেহের উৎসবে ।

    .

    আমি জানি

    আমাদের প্রত্যেককে এক নারীর জন্য চড়া দাম দিতে হবে ।

    তুমি কি কিছু মনে করবে

    যদি, ইতিমধ্যে,

    তোমাকে তামাক-ধোঁয়ার পোশাকে মুড়ে দিই

    প্যারিসের ফ্যাশনের বদলে ?

    .

    প্রিয়তমাষু,

    প্রাচীনকালে যিশুর বার্তাবাহকদের মতন,

    আমি হাজার হাজার পথ দিয়ে হাঁটবো ।

    অনন্তকাল তোমার জন্য এক মুকুট তৈরি করেছে,

    সেই মুকুটে আমার শব্দাবলী 

    শিহরণের রামধনুর জাদু তৈরি করে ।

    .

    হাতির দল যেমন শতমণ ওজনের খেলায়

    পুরুর রাজার বিজয় সম্পূর্ণ করেছিল,

    আমি তোমার মগজে ভরে দিয়েছি প্রতিভার পদধ্বনি ।

    কিন্তু সবই বৃথা ।

    আমি তোমাকে বিচ্ছিন্ন করে আনতে পারি না ।

    .

    আনন্দ করো !

    আনন্দ করো,

    এখন

    তুমি আমাকে শেষ করে দিয়েছ !

    আমার মানসিক যন্ত্রণা এতোটাই তীক্ষ্ণ,

    আমি ছুটে চলে যাবো খালের দিকে

    আর মাথা চুবিয়ে দেবো তার অপূরণীয় গর্তে ।

    .

    তুমি তোমার ঠোঁট দিয়েছিলে ।

    তুমি ওদের সঙ্গে বেশ রুক্ষ ছিলে ।

    আমি হিম হয়ে গেলুম ছুঁয়ে ।

    অনুতপ্ত ঠোঁটে আমি বরং চুমু খেতে পারতুম

    জমাট পাথর ভেঙে তৈরি সন্ন্যাসিনীদের মঠকে ।

    .

    দরোজায়

    ধাক্কা ।

    পুরুষটি প্রবেশ করলো,

    রাস্তার হইচইয়ে আচ্ছাদিত ।

    আমি

    টুকরো হয়ে গেলুম হাহাকারে ।

    কেঁদে পুরুষটিকে বললুম :

    “ঠিক আছে,

    আমি চলে যাবো,

    ঠিক আছে !

    মেয়েটি তোমার কাছেই থাকবে ।

    মেয়েটিকে সুচারু ছেঁড়া পোশাকে সাজিয়ে তোলো,

    আর লাজুক ডানা দুটো, রেশমে মোড়া, মোটা হয়ে উঠুক।

    নজর রাখো যাতে না মেয়েটি ভেসে চলে যায় ।

    তোমার স্ত্রীর গলা ঘিরে

    পাথরের মতন, ঝুলিয়ে দাও মুক্তোর হার ।”

    .


     

    ওহ, কেমনতর

    এক রাত !

    আমি নিজেই হতাশার ফাঁস শক্ত করে বেঁধে নিয়েছি ।

    আমার ফোঁপানি আর হাসি

    আতঙ্কে শোচনীয় করে তুলেছে ঘরের মুখ ।

    তোমার দৃষ্টিপ্রতিভার বিধুর মুখাকৃতি জেগে উঠলো ;

    তোমার চোখদুটি জাজিমের ওপরে দীপ্ত

    যেন কোনো নতুন জাদুগর ভেলকি দেখিয়ে উপস্হিত করেছে

    ইহুদি স্বর্গরাজ্যের ঝলমলে রানিকে ।

    .

    নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায়

    মেয়েটির সামনে যাকে আমি সমর্পণ করে দিয়েছি

    আমি হাঁটু গেড়ে বসি ।

    রাজা অ্যালবার্ট

    তাঁর শহরগুলোকে

    সমর্পণের পর

    আমার তুলনায় ছিলেন উপহারে মোড়া জন্মদিনের খোকা ।

    .

    ফুলেরা আর ঘাসভূমি, সূর্যালোকে সোনার হয়ে গেল !

    বাসন্তী হয়ে ওঠো, সমস্ত প্রাকৃতিক শক্তির জীবন !

    আমি চাই একটিমাত্র বিষ--

    কবিতার একটানা গভীর চুমুক ।

    .


     

    আমার হৃদয়ের চোর,

    যে তার সমস্তকিছু ছিনতাই করেছে,

    যে আমার আত্মাকে পীড়ন করে চিত্তবিভ্রম ঘটিয়েছে,

    গ্রহণ করো, প্রিয়তমা, এই উপহার--

    আর কখনও, হয়তো, আমি অন্যকিছু সম্পর্কে ভাববো না ।

    .

    এই দিনটিকে উজ্বল ছুটির দিনে রাঙিয়ে দাও ।

    হে ক্রুশবিদ্ধসম ইন্দ্রজাল,

    তোমার সৃষ্টি বজায় রাখো ।

    যেমনটা দেখছো--

    শব্দাবলীর পেরেকগুচ্ছ

    আমাকে কাগজে গিঁথে দাও ।

    .

    শোনো !

    শোনো   

    যদি নক্ষত্রদের আলোকিত করা হয়

    তার মানে -- কেউ একজন আছে যার তা দরকার।

    তার মানে -- কেই একজন চায় তা হোক,

    কেউ একজন মনে করে থুতুর ওই দলাগুলো

    অসাধারণ ।

    আর অতিমাত্রায় উত্তেজিত,

    দুপুরের ধুলোর ঘুর্নিপাকে,

    ও  ঈশ্বরের ওপর ফেটে পড়ে,

    ভয়ে যে হয়তো সে ইতোমধ্যে দেরি করে ফেলেছে ।

    চোখের জলে,

    ও  ঈশ্বরের শিরাওঠা হাতে চুমু খায়

    কোথাও তো নিশ্চয়ই একটা নক্ষত্র থাকবে, তাই ।

    ও শপথ করে

    ও সহ্য করতে পারবে না

    ওই নক্ষত্রহীন অদৃষ্ট ।

    পরে,

    ও ঘুরে বেড়ায়, উদ্বেগে,

    কিন্তু বাইরে থেকে শান্ত ।


     

    আর অন্য সবাইকে, ও বলে :     

    ‘এখন,

    সবকিছু ঠিক আছে

    তুমি আর ভীত নও

    সত্যি তো ?’   

    শোনো,

    যদি নক্ষত্ররা আলোকিত হয়,

    তার মানে - কেউ একজন আছে যার তা দরকার।

    তার মানে এটা খুবই জরুরি যাতে

    প্রতিটি সন্ধ্যায় 

    অন্তত একটা নক্ষত্র ওপরে উঠে যাবে

    অট্টালিকার শীর্ষে ।


     

    লিলিচকা

    তামাকের ধোঁয়া বাতাসকে গ্রাস করেছে ।

    ঘরটা

    ক্রুচেনিখের নরকের একটা পর্ব ।

    মনে রেখো --

    ওই জানালার ওদিকে

    রয়েছে প্রবল উত্তেজনা 

    আমি প্রথমে তোমার হাতে টোকা দিয়েছিলুম ।

    আজ তুমি এখানে বসে আছো

    লৌহবর্ম হৃদয়ে ।

    আরেক দিন পরে

    তুমি আমাকে তাড়িয়ে দেবে, 

    হয়তো, গালমন্দ করে ।

    সামনের প্রায়ান্ধকার ঘরে আমার বাহু,

    কাঁপুনিতে ভেঙে গেছে আর শার্টের হাতায় ঢুকবে না ।

    আমি বাইরে বেরিয়ে যাবে

    রাস্তায় নিজের দেহ ছুঁড়ে ফেলব ।

    আমি প্রলাপ বকব,

    নিয়ন্ত্রণের বাইরে,

    বিষাদে চুরমার ।

    তা হতে দিও না

    আমার প্রিয়া,

    আমার প্রিয়তমা,

    এখন দুজনে দুদিকে যাওয়া যাক।

    তা সত্বেও

    আমার প্রেম

    অত্যন্ত ভারি

    তোমার ওপরে

    তুমি যেখানেই যাও না কেন।

    আমাকে একবার শেষ চিৎকার করতে দাও

    তিক্ততার, আঘাতে জর্জরিত হবার চিৎকার ।

    তুমি যদি একটা ষাঁড়কে খাটিয়ে নিরতিশয় ক্লান্ত করে দাও

    সে পালিয়ে যাবে,

    শীতল জলে গিয়ে নেমে যাবে ।

    তোমার ভালোবাসা ছাড়া

    আমার

    কোনো সমুদ্র নেই

    আর তোমার প্রেম এমনকি চোখের জলে চাওয়া বিশ্রামটুকুও দেবে না ।

    যখন এক ক্লান্ত হাতি শান্তি চায়

    সে তপ্ত বালির ওপরও রাজকীয় কায়দায় শুয়ে পড়ে।

    তোমার ভালোবাসা ছাড়া

    আমার

    কোনো সূর্য নেই,

    কিন্তু আমি এমনকি জানি না তুমি কোথায় আর কার সঙ্গে রয়েছো।

    এভাবে যদি তুমি কোনও কবিকে যন্ত্রণা দাও

    সে

    তার প্রেমিকাকে টাকা আর খ্যাতির জন্য বদনাম করবে,

    কিন্তু আমার কাছে

    কোনো শব্দই আনন্দময় নয়

    তোমার ভালোবাসাময় নাম ছাড়া ।

    আমি নিচের তলায় লাফিয়ে পড়ব না

    কিংবা বিষপান করব না

    বা মাথায় বন্দুক ঠেকাবো না ।

    কোনো চাকুর ধার

    আমাকে অসাড় করতে পারে না

    তোমার চাউনি ছাড়া ।

    কাল তুমি ভুলে যাবে যে 

    আমি তোমায় মুকুট পরিয়েছিলুম,

    যে আমি আমার কুসুমিত আত্মাকে ভালোবাসায় পুড়িয়েছিলুম,

    আর মামুলি দিনগুলোর ঘুরন্ত আনন্দমেলা

    আমার বইয়ের পাতাগুলোকে এলোমেলো করে দেবে…

    আমার শব্দগুলোর শুকনো পাতারা কি

    শ্বাসের জন্য হাঁপানো থেকে

    তোমাকে থামাতে পারবে ?

    অন্তত আমাকে তোমার 

    বিদায়বেলার অপসৃত পথকে 

    সোহাগে ভরে দিতে দাও ।


     

    তুমি

    তুমি এলে--

    কৃতসঙ্কল্প,

    কেননা আমি ছিলুম দীর্ঘদেহী,

    কেননা আমি গর্জন করছিলুম,

    কিন্তু খুঁটিয়ে দেখে

    তুমি দেখলে আমি নিছকই এক বালক ।

    তুমি দখল করে নিলে

    আর কেড়ে নিলে আমার হৃদয়

    আর তা নিয়ে

    খেলতে আরম্ভ করলে--

    লাফানো বল নিয়ে মেয়েরা যেমন খেলে ।

    আর এই অলৌকিক ঘটনার আগে

    প্রতিটি নারী

    হয়তো ছিল এক বিস্ময়বিহ্বল যুবতী

    কিংবা এক কুমারী তরুণী যে জানতে চায় :

    “অমন লোককে ভালোবাসবো ?

    কেন, সে তোমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে !

    মেয়েটি নিশ্চয়ই সিংহদের পোষ মানায়,

    চিড়িয়াখানার এক মহিলা !”

    কিন্তু আমি ছিলুম জয়োল্লাসিত ।

    আমি ওটা অনুভব করিনি --

    ওই জোয়াল !

    আনন্দে সবকিছু ভুলে গিয়ে,

    আমি লাফিয়ে উঠলুম

    এদিকে-সেদিকে উৎক্রান্ত, কনে পাবার আনন্দে রেডিণ্ডিয়ান,

    আমি খুবই গর্বিত বোধ করছিলুম

    আর ফুরফুরে । 


     


     
     

  • মলয় রায়চৌধুরী | 27.58.255.50 | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৯:২৬734847
  • হাংরি ও পরাবাস্তববাদের অবনিবনার অহেতুক চর্চা

    মলয় রায়চৌধুরী

    এক

    হাংরি আন্দোলনকারীদের অবনিবনা নিয়ে যতো খিল্লি হয় তা কিন্তু পরাবাস্তববাদীদের মাঝে অবনিবনা নিয়ে হয় না । অথচ পরাবাস্তববাদীদের পরস্পরের ঝগড়া কতোজনের সঙ্গে যে প্রত্যেকের হয়েছিল তার কোনও হিসেব নেই । ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে চে গ্বেভারার অবনিবনা চেপে গিয়ে পালা করে ওই দুজনের টি শার্ট পরে ঘুরে বেড়ান বাঙালি ছোকরা লেখক-কবি। অথচ হাংরি আন্দোলনের আলোচনা শুরু করলেই সবাই  তাঁদের পারস্পরিক অবনিবনা চর্চা করেন ; লেখালিখি বিশ্লেষণের কথা চিন্তা করেন না বা করতে চান না, বিশেষ করে বাঙালি আলোচকরা । নন্দিনী ধর হাংরি আন্দোলন আলোচনা করতে বসে দুম করে লিখে দিলেন যে আমার সংকলিত বই থেকে শৈলেশ্বর ঘোষকে বাদ দিয়েছি ; অথচ আমি হাংরি আন্দোলনকারীদের রচনার কোনো সংকলন প্রকাশ করিনি । নন্দিনী ধর লিখেছেন যে হাংরি আন্দোলনকারীরা নিজেদের ছোটোলোক ঘোষণা করে বিবিক্ততাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন ; উনি জানতেন না যে আমি পাটনায় ইমলিতলা নামে এক অন্ত্যজ অধ্যুষিত বস্তিতে থাকতুম, অবনী ধর ছিলেন জাহাজের খালাসি আর পরে ঠেলাগাড়িতে করে কয়লা বেচতেন, শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ এসেছিলেন উদ্বাস্তু পরিবার থেকে, দেবী রায় চায়ের ঠেকে চা বিলি করতেন । এ-থেকে টের পাওয়া যায় যে আলোচকরা কোনও বই পড়ার আগেই ভেবে নেন যে হাংরি আন্দোলনকারীদের রচনা আলোচনার সময়ে কী লিখবেন । হাংরি আন্দোলনকারীদের বিশ্ববীক্ষার তর্ক-বিতর্ক ও লেখালিখি বাদে দিয়ে আলোচকরা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দেন ।


     

    অন্য বাঙালি লেখকদের ক্ষেত্রে কিন্তু তাঁরা এমন অডিটরসূলভ বিশ্লেষণ করতে বসেন না । বিদেশি সাহিত্যিকদের মাঝে নিজেদের বিশ্ববীক্ষার সমর্থনে পারস্পরিক বিবাদ-বিতর্কের কথা যেমন শোনা যায় তেমনটা বাঙালি লেখকদের ক্ষেত্রে বড়ো একটা দেখা যায় না । আমরা পড়েছি গোর ভিডাল আর নরম্যান মেইলারের বিবাদ এমনকি হাতাহাতি, সালমান রুশডি - জন আপডাইক বিবাদ, হেনরি জেমস - এইচ জি ওয়েল্স বিবাদ, জোসেফ কনরাড - ডি এইচ লরেন্স বিবাদ, জন কিটস - লর্ড বায়রন বিবাদ, চার্লস ডিকেন্স - হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যাণ্ডারসন বিবাদ ইত্যাদি । আলোচকরা কিন্তু তাঁদের রচনাবলী বিশ্লেষণের সময়ে সৃজনশীল কাজকেই গুরুত্ব দেন, বিবাদকে নয় ।        

      

    বাঙালি সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, মনে করেন মানুষ ও প্রাণীরা এসেছে অন্য গ্রহ থেকে, অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য । ওই একই দপতরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর পাশের কেবিনেই বসতেন ,যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না, ডারউইনের তত্বে বিশ্বাস করতেন, বামপন্হী ছিলেন । অথচ পরপস্পরের লেখা আলোচনার সময়ে এই বিষয়গুলো ওনাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যেত, যেন সাহিত্য আলোচনায় লেখকের বিশ্ববীক্ষার কোনো প্রভাব থাকে না । অধিকাংশ বাঙালি সাহিত্যিক এই ধরণের ভাই-ভাই ক্লাবের সদস্য । এদিকে হাংরি আন্দোলনকারীদের রচনা আলোচনা করতে বসে তাদের ব্যক্তিগত অবনিবনায় জোর দেন ।         


     

    এই তো সেদিন ক্লিন্টন বি সিলির জীবনানন্দ বিষয়ক গ্রন্হ ‘এ পোয়েট অ্যাপার্ট, পড়ার সময়ে হাংরি আন্দোলনকারীরা খালাসিটোলায় জীবনানন্দের যে জন্মদিন পালন করেছিল, তার বর্ণনা পড়ছিলুম । উনি ‘দি স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮ তারিখে প্রকাশিত সংবাদ তুলে দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মে জীবনানন্দের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন । একই খবর প্রকাশিত হয়েছিল তখনকার সাপ্তাহিক ‘অমৃত’ পত্রিকায় । সেদিন সন্ধ্যায় জীবনানন্দ দাশের জন্মদিন পালনের জন্য  টেবিলে উঠে পড়লেন হাংরি আন্দোলনের গল্পকার অবনী ধর আর নাচের সঙ্গে গাইতে লাগলেন একটা গান, যা তিনি জাহাজে খালসির কাজ করার সময়ে গাইতেন, বিদেশি খালাসিদের সঙ্গে । উপস্হিত সবাই, এমনকি হাংরি আন্দোলনের কয়েকজন ভেবেছিলেন গানটা আবোল-তাবোল, কেননা ইংরেজিতে তো এমনতর শব্দ তাঁদের জানা ছিল না । যে সাংবাদিকরা খবর কভার করতে এসেছিলেন তাঁরাও গানটাকে ভেবেছিলেন হাংরি আন্দোলনকারীদের বজ্জাতি, প্রচার পাবার ধান্দা ।  ‘অমৃত’ পত্রিকায় ‘লস্ট জেনারেশন’ শিরোনামে ঠাট্টা করে দুই পাতা চুটকি লেখা হয়েছিল, অবনী ধরের কার্টুনের সঙ্গে ।  ‘অমৃত’ পত্রিকায় ‘লস্ট জেনারেশন’ তকমাটি যিনি ব্যবহার করেছিলেন তিনি জানতেন না যে এই শব্দবন্ধ তৈরি করেছিলেন গারট্রুড স্টিন এবং বিশ শতকের বিশের দশকে প্যারিসে আশ্রয় নেয়া আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, এফ স্কট ফিটজেরাল্ড, টি. এস. এলিয়ট, জন ডস প্যাসস, ই ই কামিংস, আর্চিবল্ড ম্যাকলিশ, হার্ট ক্রেন প্রমুখকে বলা হয়েছিল ‘লস্ট জেনারেশন’-এর সদস্য । অবনী ধর-এর নামের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত নন । যাঁরা তাঁর নাম শোনেননি এবং ওনার একমাত্র বই ‘ওয়ান শট’ পড়েননি, তাঁদের জানাই যে ছোটোগল্পের সংজ্ঞাকে মান্যতা দিলে বলতে হয় যে অবনী ধর ছিলেন হাংরি আন্দোলনের সর্বশ্রেষ্ঠ ছোটো গল্পকার । 

    গানটা এরকম, মোৎসার্টের একটা বিশেষ সুরে গাওয়া হয়:

    জিং গ্যাং গুলি গুলি গুলি গুলি ওয়াচা,

    জিং গ্যাং গু, জিং গ্যাং গু ।

    জিং গ্যাং গুলি গুলি গুলি গুলি ওয়াচা,

    জিং গ্যাং গু, জিং গ্যাং গু ।

    হায়লা, ওহ হায়লা শায়লা, হায়লা শায়লা, শায়লা উউউউউহ,

    হায়লা, ওহ হায়লা শায়লা, হায়লা শায়লা, শায়লা, উহ

    শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি ।

    উউউমপাহ, উউউমপাহ, উউউমপাহ, উউউমপাহ । 

    ১৯২০ সালে,, প্রথম বিশ্ব স্কাউট জাম্বোরির জন্য, রবার্ট ব্যাডেন-পাওয়েল, প্রথম বারন ব্যাডেন-পাওয়েল (স্কাউটিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা) সিদ্ধান্ত নেন যে একটা মজার গান পেলে ভালো হয়, যা সব দেশের স্কাউটরা গাইতে পারবে ; কারোরই কঠিন মনে হবে না । উনি মোৎসার্টের  এক নম্বর সিম্ফনির ইবি মেজরে বাঁধা সুরটি ধার করেছিলেন । গানটা স্কাউটদের মধ্যে তো বটেই সাধারণ স্কুল ছাত্রদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়েছিল । এই স্কাউটদের কেউ-কেউ জাহাজে চাকরি নিয়ে খালাসি এবং অন্যান্য কর্মীদের মধ্যে এটাকে ছড়িয়ে দিতে সফল হন । অবনী ধর বেশ কিছুকাল জাহাজে খালাসির কাজ করেছিলেন এবং তাঁরও ভালো লেগে যায় সমবেতভাবে গাওয়া গানটি । শতভিষা, কৃত্তিবাস, কবিতা, ধ্রুপদি  পত্রিকার কর্নধারদের প্রিয় সঙ্গীত-জগত  থেকে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া এই গান সেসময়ে নিতে পারেননি সাংবাদিক আর বিদ্যায়তনিক আলোচকরা, তার ওপর যেহেতু হাংরি আন্দোলনের ব্যাপার, তাই তাঁরা এটাকে অশিক্ষিত নেশাখোর-মাতালদের কারবার ভেবে হেঁ-হেঁ করে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন ।


     

    দুই

    উত্তরবঙ্গে হাংরি জেনারেশনের প্রসার সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে, হাংরি পত্রিকা ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ এর সম্পাদক অলোক গোস্বামী এই কথাগুলো লিখেছিলেন, তা থেকে অবনিবনার যৎসামান্য আইডিয়া হবে, আর এই অবনিবনার সঙ্গে পরাবাস্তববাদীদের নিজেদের অবনিবনারে যথেষ্ট মিল আছে :-

    “নব্বুই দশকে সদ্য প্রকাশিত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বগলে নিয়ে এক ঠা ঠা দুপুরে আমি হাজির হয়েছিলাম শৈলেশ্বরের বাড়ির গেটে। একা। ইচ্ছে ছিল শৈলেশ্বরের সঙ্গে মুখোমুখি বসে যাবতীয় ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলবো। যেহেতু স্মরণে ছিল শৈলেশ্বরের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি তাই আস্থা ছিল শৈলেশ্বরের প্রজ্ঞা,ব্যক্তিত্ব,যুক্তিবোধ তথা ভদ্রতাবোধের ওপর। দৃঢ় বিশ্বাস ছিল শৈলেশ্বর আমাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেবেন এবং যৌথ আলোচনাই পারবে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নতুন উদ্যমে একসাথে পথ চলা শুরু করতে। কিন্তু দুভার্গ্য বশতঃ তেমন কিছু ঘটলো না। বেল বাজাতেই গেটের ওপারে শৈলেশ্বর। আমাকে দেখেই ভ্রূ কুঁচকে ফেললেন।

    --কী চাই!

    মিনমিন করে বললাম, আপনার সঙ্গে কথা বলবো।

    --কে আপনি?

    এক এবং দুই নম্বর প্রশ্নের ভুল অবস্থান দেখে হাসি পাওয়া সত্বেও চেপে গিয়ে নাম বললাম।

    --কি কথা?

    --গেটটা না খুললে কথা বলি কিভাবে!

    --কোনো কথার প্রয়োজন নেই। চলে যান।

    --এভাবে কথা বলছেন কেন?

    --যা বলছি ঠিক বলছি। যান। নাহলে কিন্তু প্রতিবেশীদের ডাকতে বাধ্য হবো।

    এরপর স্বাভাবিক কারণেই খানিকটা ভয় পেয়েছিলাম কারণ আমার চেহারাটা যেরকম তাতে শৈলেশ্বর যদি একবার ডাকাত, ডাকাত বলে চেঁচিয়ে ওঠেন তাহলে হয়ত জান নিয়ে ফেরার সুযোগ পাবো না। তবে 'ছেলেধরা' বলে চেল্লালে ভয় পেতাম না। সমকামিতার দোষ না থাকায় নির্ঘাত রুখে দাঁড়াতাম।

    ভয় পাচ্ছি অথচ চলেও যেতে পারছি না। সিদ্ধান্তে পৌঁছতে গেলে আরও খানিকটা জানা বোঝা জরুরি।

    --ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি। তবে পত্রিকার নতুন সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে সেটা রাখুন।

    এগিয়ে আসতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন শৈলেশ্বর।

    --কোন পত্রিকা?

    --কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প।

    --নেব না। যান।

    এরপর আর দাঁড়াইনি। দাঁড়ানোর প্রয়োজনও ছিল না। ততক্ষণে বুঝে ফেলেছি ব্যক্তি শৈলেশ্বর ঘোষকে চিনতে ভুল হয়নি আমাদের। আর এই সমঝদারি এতটাই তৃপ্তি দিয়েছিল যে অপমানবোধ স্পর্শ করারই সুযোগ পায়নি।”

    পরাবাস্তববাদীদের  মতনই, শৈলেশ্বর ঘোষের হয়তো মনে হয়েছিল যে কলকাতায় তিনি হাংরি আন্দোলনের যে কেন্দ্র গড়ে তুলতে চাইছেন তাতে ফাটল ধরাবার চেষ্টা করা হচ্ছে । তাঁর আচরণ ছিল হুবহু আঁদ্রে ব্রেতঁর মতন । পরাবাস্তববাদ আন্দোলনে আঁদ্রে ব্রেতঁর সঙ্গে অনেকের সম্পর্ক ভালো ছিল না, দল বহুবার ভাগাভাগি হয়েছিল, অথচ সেসব নিয়ে বাঙালি আলোচকরা তেমন উৎসাহিত নন, যতোটা হাংরি আন্দোলনের দল-ভাগাভাগি নিয়ে। ইংরেজিতে মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্য চৌধুরী হাংরি আন্দোলন নিয়ে ‘দি হাংরিয়ালিস্টস’ নামে একটি বই লিখেছেন, পেঙ্গুইন র‌্যাণ্ডাম হাউস থেকে প্রকাশিত । সেই বইটি বাংলা পত্রপত্রিকায় আলোচিত হল না । 

    তিন

    আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৬ জুন ২০১৩ তারিখে গৌতম চক্রবর্তী হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে এই কথাগুলো লিখেছিলেন ; তাতেও রয়েছে টিটকিরি, যা তিনি পরাবাস্তববাদীদের সম্পর্কে কখনও বলেছেন কিনা জানি না । উনি লিখেছিলেন :

    “মানুষ, ঈশ্বর, গণতন্ত্র ও বিজ্ঞান পরাজিত হয়ে গেছে। কবিতা এখন একমাত্র আশ্রয়।... এখন কবিতা রচিত হয় অর্গ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে।

    ১৯৬২ সালে এই ভাষাতেই কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস থেকে খালাসিটোলা, বারদুয়ারি অবধি সর্বত্র গোপন বিপ্লবী আন্দোলনের ব্লু প্রিন্টের মতো ছড়িয়ে পড়ে একটি ম্যানিফেস্টো। ২৬৯ নেতাজি সুভাষ রোড, হাওড়া থেকে প্রকাশিত এই ম্যানিফেস্টোর ওপরে লেখা ‘হাংরি জেনারেশন’। নীচের লাইনে তিনটি নাম। ‘স্রষ্টা: মলয় রায়চৌধুরী। নেতৃত্ব: শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সম্পাদনা: দেবী রায়।’

    তখনও কলেজ স্ট্রিটের বাতাসে আসেনি বারুদের গন্ধ, দেওয়ালে লেখা হয়নি ‘সত্তরের দশক মুক্তির দশক’। কিন্তু পঞ্চাশ পেরিয়ে-যাওয়া এই ম্যানিফেস্টোর গুরুত্ব অন্যত্র। এর আগে ‘ভারতী’, ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘শতভিষা’ অনেক কবিতার কাগজ ছিল, সেগুলি ঘিরে কবিরা সংঘবদ্ধও হতেন। কিন্তু এই ভাবে সাইক্লোস্টাইল-করা ম্যানিফেস্টো আগে কখনও ছড়ায়নি বাংলা কবিতা।

    ওটি হাংরি আন্দোলনের দ্বিতীয় ম্যানিফেস্টো। প্রথম ম্যানিফেস্টোটি বেরিয়েছিল তার কয়েক মাস আগে, ১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে। ইংরেজিতে লেখা সেই ম্যানিফেস্টো জানায়, কবিতা সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায় না, বিভ্রমের বাগানে পুনরায় বৃক্ষরোপণ করে না। ‘Poetry is no more a civilizing manoeuvre, a replanting of bamboozled gardens.’ বিশ্বায়নের ঢের আগে ইংরেজি ভাষাতেই প্রথম ম্যানিফেস্টো লিখেছিলেন হাংরি কবিরা। কারণ, পটনার বাসিন্দা মলয় রায়চৌধুরী ম্যানিফেস্টোটি লিখেছিলেন। পটনায় বাংলা ছাপাখানা ছিল না, ফলে ইংরেজি।

    দুটি ম্যানিফেস্টোতেই শেষ হল না ইতিহাস। হাংরি আসলে সেই আন্দোলন, যার কোনও কেন্দ্র নেই। ফলে শহরে, মফস্সলে যে কোনও কবিই বের করতে পারেন তাঁর বুলেটিন। ১৯৬৮ সালে শৈলেশ্বর ঘোষ তাঁর ‘মুক্ত কবিতার ইসতাহার’-এ ছাপিয়ে দিলেন ‘সমস্ত ভন্ডামির চেহারা মেলে ধরা’, ‘শিল্প নামক তথাকথিত ভূষিমালে বিশ্বাস না করা’, ‘প্রতিষ্ঠানকে ঘৃণা করা’, ‘সভ্যতার নোনা পলেস্তারা মুখ থেকে তুলে ফেলা’ ইত্যাদি ২৮টি প্রতিজ্ঞা। পরে বন্ধুদের মধ্যে ঝগড়া বাধবে। মলয় ব্যাংকের চাকরি নিয়ে বাইরে চলে যাবেন। শৈলেশ্বর, সুবো আচার্য এবং প্রদীপ চৌধুরীরা বলবেন, ‘মলয় বুর্জোয়া সুখ ও সিকিয়োরিটির লোভে আন্দোলন ছেড়ে চলে গিয়েছে।’কী রকম লিখতেন হাংরিরা? বছর দুয়েক আগে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘বাইশে শ্রাবণ’ ছবিতে গৌতম ঘোষের চরিত্রটি লেখা হয়েছিল হাংরি কবিদের আদলে।

    ‘জেগে ওঠে পুরুষাঙ্গ নেশার জন্য হাড় মাস রক্ত ঘিলু শুরু করে কান্নাকাটি

    মনের বৃন্দাবনে পাড়াতুতো দিদি বোন বউদিদের সঙ্গে শুরু হয় পরকীয়া প্রেম’,

    লিখেছিলেন অকালপ্রয়াত ফালগুনী রায়। র‌্যাঁবো, উইলিয়াম বারোজ এবং হেনরি মিলারের উদাহরণ বারে বারেই টেনেছেন হাংরিরা। ঘটনা, এঁরা যত না ভাল কবিতা লিখেছেন, তার চেয়েও বেশি ঝগড়া করেছেন। এবং তার চেয়েও বেশি বার গাঁজা, এলএসডি, মেস্কালিন আর অ্যাম্ফিটোমাইন ট্রিপে গিয়েছেন।

    অতএব, সাররিয়ালিজ্ম বা অন্য শিল্প আন্দোলনের মতো বাঙালি কবিদের ম্যানিফেস্টোটি কোনও দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়নি। কিন্তু ‘হাংরি’রা আজও মিথ। এক সময় ‘মুখোশ খুলে ফেলুন’ বলে তৎকালীন মন্ত্রী, আমলা, সম্পাদকদের বাড়িতে ডাকযোগে তাঁরা মুখোশ পাঠিয়ে দিয়েছেন। আবার এক সময় ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি লেখার জন্য অশ্লীলতার মামলা হল মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে। উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাকের বিরুদ্ধে জারি হল গ্রেফতারি পরোয়ানা।

    রাষ্ট্র ও আদালত কী ভাবে কবিতাকে দেখে, সেই প্রতর্কে ঢুকতে হলে ১৯৬৫ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলাটি সম্পর্কে জানা জরুরি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় কাঠগড়ায় উঠেছেন মলয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে। পাবলিক প্রসিকিউটরের জিজ্ঞাসা, ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা পড়ে আপনার কী মনে হয়েছে?

    শক্তি: ভাল লাগেনি।

    প্রসিকিউটর: অবসিন কি? ভাল লাগেনি বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?

    শক্তি: ভাল লাগেনি মানে জাস্ট ভাল লাগেনি। কোনও কবিতা পড়তে ভাল লাগে, আবার কোনওটা ভাল লাগে না।

    শক্তি সাক্ষ্য দিয়েছিলেন মলয়ের বিরুদ্ধে। কয়েক মাস পরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মলয়ের সমর্থনে...

    প্রসিকিউটর: কবিতাটা কি অশ্লীল মনে হচ্ছে?

    সুনীল: কই, না তো। আমার তো বেশ ভাল লাগছে। বেশ ভাল লিখেছে।

    প্রসিকিউটর: আপনার শরীরে বা মনে খারাপ কিছু ঘটছে?

    সুনীল: না, তা কেন হবে? কবিতা পড়লে সে সব কিছু হয় না।

    একই মামলায় শক্তি ও সুনীল পরস্পরের বিরুদ্ধে। তার চেয়েও বড় কথা, ’৬৫ সালে এই সাক্ষ্য দেওয়ার আগের বছরই সুনীল আইওয়া থেকে মলয়কে বেশ কড়া একটি চিঠি দিয়েছিলেন, ‘লেখার বদলে আন্দোলন ও হাঙ্গামা করার দিকেই তোমার ঝোঁক বেশি। রাত্রে তোমার ঘুম হয় তো? মনে হয়, খুব একটা শর্টকাট খ্যাতি পাবার লোভ তোমার।’ ব্যক্তিগত চিঠিতে অনুজপ্রতিম মলয়কে ধমকাচ্ছেন, কিন্তু আদালতে তাঁর পাশে গিয়েই দাঁড়াচ্ছেন। সম্ভবত, বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে অনুজ কবিদের কাছে সুনীলের ‘সুনীলদা’ হয়ে ওঠা হাংরি মামলা থেকেই। প্রবাদপ্রতিম কৃত্তিবাসী বন্ধুত্বের নীচে যে কত চোরাবালি ছিল, তা বোঝা যায় উৎপলকুমার বসুকে লেখা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের একটি চিঠি থেকে, ‘প্রিয় উৎপল, একদিন আসুন।...আপনি তো আর শক্তির মতো ধান্দায় ঘোরেন না।’

    তা হলে কি হাংরি আন্দোলন বাংলা সাহিত্যে প্রভাবহীন, শুধুই কেচ্ছাদার জমজমাট এক পাদটীকা? দুটি কথা। হাংরিদের প্রভাবেই কবিতা-সংক্রান্ত লিট্ল ম্যাগগুলির ‘কৃত্তিবাস’, ‘শতভিষা’ গোছের নাম বদলে যায়। আসে ‘ক্ষুধার্ত’, ‘জেব্রা’, ‘ফুঃ’-এর মতো কাগজ। সেখানে কবিতায় বাঁকাচোরা ইটালিক্স, মোটাদাগের বোল্ড ইত্যাদি হরেক রকমের টাইপোগ্রাফি ব্যবহৃত হত। পরবর্তী কালে সুবিমল মিশ্রের মতো অনেকেই নিজেকে হাংরি বলবেন না, বলবেন ‘শুধুই ছোট কাগজের লেখক’। কিন্তু তাঁদের গল্প, উপন্যাসেও আসবে সেই টাইপোগ্রাফিক বিভিন্নতা। তৈরি হবে শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন। হাংরিরা না এলে কি নব্বইয়ের দশকেও হানা দিতেন পুরন্দর ভাট?

    আসলে, ম্যানিফেস্টোর মধ্যেই ছিল মৃত্যুঘণ্টা। ’৬২ সালে হাংরিদের প্রথম বাংলা ম্যানিফেস্টোর শেষ লাইন, ‘কবিতা সতীর মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা ও ঈশ্বরীর মতো অনুষ্মেষিণী।’ হাংরিরা নিজেদের যত না সাহিত্যবিপ্লবী মনে করেছেন, তার চেয়েও বেশি যৌনবিপ্লবী।”

    চার

    গৌতম চক্রবর্তী বহু বিদেশি নাম বাদ দিয়ে দিয়েছেন ; সম্ভবত তিনিও লেখার আগেই হাংরি আন্দোলনকারীদের ব্যঙ্গ করবেন বলে ঠিক করে ফেলেছিলেন । হাংরি আন্দোলনকারীরা জানতো যে ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্স তিনি মর্গে যেতে ভালোবাসতেন; সেখানে দিনের একটা সময় কাটাতেন।  মর্গে যাওয়া ছাড়াও চার্লস ডিকেন্সের ছিল আফিমে আসক্তি, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতন।  আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ছিল মদের প্রতি আসক্তি, কমলকুমার মজুমদারের মতন। মদের ভালোবাসা থেকে তিনি লিখেছেন- যখন আপনি মাতাল, তখন আপনি অনেক বেশি ভদ্র । এটা আপনার মুখ বন্ধ রাখতে সাহায্য করবে। আমেরিকান রোমান্টিক মুভমেন্টের প্রধান ব্যক্তি, অ্যাডগার অ্যালান পো ছিলেন মাদকাসক্ত। হেমিংওয়ের মতো তিনিও দুঃখ-কাতরতা থেকে মুক্ত থাকার জন্য মদ পান শুরু করেন।  ব্রিটিশ কবি, রোমান্টিক মুভমেন্টের অন্যতম প্রবক্তা, কুবলা খান ও দ্য রাইম অব দ্য এনসিয়েন্ট মেরিনার এর কবি স্যমুয়েল টেইলর কোলরিজে  আফিমে আসক্ত ছিলেন। সেই সময় তিনি আফিমখোর হিসেবে ব্রিটেনে পরিচিত ছিলেন এবং এটা নিয়ে তিনি গর্বও বোধ করতেন। তিনি বলেছেন, কুবলা খান লিখতে গিয়ে আফিমের ঘোর তাঁকে সাহায্য করেছিল। ট্রেজার আইল্যান্ড, দ্য স্ট্রেঞ্জ কেস অব ডা. জ্যাকেল অ্যান্ড মি. হাইড-এর স্রষ্টা  স্কটিশ সাহিত্যিক রবার্ট লুইস স্টিভেনসন ছিলেন কোকেনে আসক্ত। তার স্ত্রীর ভাষ্যমতে, তিনি কোকেন নিয়ে করে মাত্র ছয় দিনে  ঘোরগ্রস্ত অবস্থায় ৬০ হাজার শব্দ লিখেছিলেন। এর মধ্যে দ্য স্ট্রেঞ্জ কেস অব ডা. জ্যাকেল অ্যান্ড মি. হাইডও লিখেছেন।

    .


     

       


     

                                   

                                                           

           

                                       

                                                   

               

               

       

       

       

           

               

           

               

       


     

    তিন

    ১৯১৭ সালে গিয়ম অ্যাপলিনেয়ার “সুররিয়ালিজম” অভিধাটি তৈরি করেছিলেন, যার অর্থ ছিল বাস্তবের অতীত। শব্দটি প্রায় লুফে নেন আঁদ্রে ব্রেতঁ, নতুন একটি আন্দোলন আরম্ভ করার পরিকল্পনা নিয়ে, যে আন্দোলনটি হবে পূর্ববর্তী ডাডাবাদী আন্দোলন থেকে ভিন্ন । ত্রিস্তঁ জারা উদ্ভাবিত ডাডা আন্দোলন থেকে সরে আসার কারণ হল ব্রেতঁ সহ্য করতে পারতেন না ত্রিস্তঁ জারাকে, কেননা কবি-শিল্পী মহলে প্রতিশীল্পের জনক হিসাবে ত্রিস্তঁ জারা খ্যাতি পাচ্ছিলেন। আঁদ্রে ব্রেতঁ সুররিয়ালিজম তত্বটির একমাত্র ব্যাখ্যাকারী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে আরম্ভ করেন। ১৯১৯ সালে ত্রিস্তঁ জারাকে কিন্তু ব্রেতঁ চিঠি লিখে প্যারিসে আসতে বলেছিলেন । একইভাবে ‘হাংরি’ শব্দটি মলয় রায়চৌধুরী পেয়েছিলেন কবি জিওফ্রে চসার থেকে । এই ‘হাংরি’ শব্দটি নেয়ার জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, তেমন কিছুই করা হয়নি আঁদ্রে ব্রেতঁ ও ত্রিস্তঁ জারা সম্পর্কে । মলয় রায়চৌধুরী হাংরি জেনারেশন আন্দোলন ঘোষণা করেন ১৯৬৫ সালের পয়লা নভেম্বর একটি লিফলেট প্রকাশের মাধ্যমে ।

    পরাবাস্তববাদী আন্দোলনে, প্রথম থেকেই, আঁদ্রে ব্রেতঁ’র সঙ্গে অনেক পরাবাস্তববাদীর সদ্ভাব ছিল না, কিন্তু পরাবাস্তববাদ বিশ্লেষণের সময়ে আলোচকরা তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন না । আমরা যদি বাঙালি আলোচকদের কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখব যে তাঁরা হাংরি জেনারেশন বা ক্ষুধার্ত আন্দোলন বিশ্লেষণ করার সময়ে হাংরি জেনারেশনের সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে অত্যধিক চিন্তিত, হাংরি আন্দোলনকারীদের সাহিত্য অবদান নিয়ে নয় । ব্যাপারটা বিস্ময়কর নয় । তার কারণ অধিকাংশ আলোচক হাংরি জেনারেশনের সদস্যদের বইপত্র সহজে সংগ্রহ করতে পারেন না এবং দ্বিতীয়ত সাংবাদিক-আলোচকদের কুৎসাবিলাসী প্রবণতা । 

    আঁদ্রে ব্রেতঁ তাঁর বন্ধু পল এলুয়ার, বেনিয়ামিন পেরে, মান রে, জাক বারোঁ, রেনে ক্রেভালl, রোবের দেসনস, গিয়র্গে লিমবোর, রোজের ভিত্রাক, জোসেফ দেলতিল, লুই আরাগঁ ও ফিলিপে সুপোকে নিয়ে ১৯১৯ পরাবাস্তববাদ আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন । কিছু

    দুই

    যাঁরা কবি ও লেখকদের পারস্পরিক অবনিবনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তাঁরা লেখক-প্রতিস্ব নির্মাণের ব্যাপারটা ভেবে দ্যাখেননি, বিশেষ করে সমাজটির আর্থসামাজিক পৃষ্ঠপটে ও পূর্বের সাহিত্যিক পঠন-পাঠনের প্রভাবে নির্মিত প্রতিস্ব ।

    প্রথম ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র ও প্রথম ছোটোগল্পকার পূর্নচন্দ্র থেকে হাল আমলের মফসসলের কথাসাহিত্যিক, প্রান্তিক ও শহুরে গল্পকার কিংবা মেট্রপলিটান ঔপন্যাসিক, তাঁদের লেখক প্রতিস্ব অবিনির্মাণ করলে প্রথম যে উপাদানটি পাওয়া যাবে, তা তাঁদের মাতৃভাষায় এবং অন্যান্য যে ভাষায় তাঁদের দখল আছে, সে ভাষায় পূর্ব প্রজন্মগুলোর সাহত্যিকদের লেখা গল্প-উপন্যাসের পঠন-পাঠনের জমা করা স্মৃতি । ব্যক্তিপ্রতিস্ব নির্মাণে ভাষার অবদান অনস্বীকার্য, কিন্তু লেখক-প্রতিস্ব নির্মাণে ভাষাসাহিত্যের জ্ঞান তথা সাহিত্যের বিশেষ ঝোঁকের প্রতি লেখকের টান, তাঁর লেখনকর্মের আদল আদরা দিশা তাৎপর্য অন্তর্নিহিত-সম্পদ দাপট চৈতন্য অস্তিত্ব আত্ম-উন্মোচন এমনকী তাঁর সাহিত্য চক্রান্তক কলমটির গঠনকারী মূল উপাদান । তাঁদের লেখন-অভিজ্ঞতার মালিকানার বখরা কিন্তু তাঁদের পড়া পূর্বসূরী গল্পকার-ঔপন্যাসিক-দার্শনিকদের প্রাপ্য।

    আমি যে প্রতিস্ব-নির্মাণের কথা বলছি তা বাংলা সাহিত্যের এক বিশেষ বাঁকবদলের সময়কার । উল্লেখ্য যে ভারতবর্ষে পঞ্চতন্ত্র, হিতোপদেশ, বেতাল পঞ্চবিংশতি, কথাসরিৎসাগর, বৃহৎকথা, কথামঞ্জরী, দশকুমার চরিত, বাদবদত্তা ইত্যাদি গদ্যে রচিত কথাবস্তুর অতিপ্রাচীন ঐতিহ্য আছে । ইংরেজরা আসার পর, এবং ফলে, বাংলা গদ্যসাহিত্য ও গদ্যে নানা ধরণের সংরূপের উদ্ভব জলবিভাজকের কাজ করেছিল ; আমি সেদিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি । এক নতুন নন্দনক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল সাহিত্যের এলাকায়, যে এলাকায় লেখক নামের নির্মিত-প্রতিস্বের মানুষটির লেখনকর্মকে কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসেবে নৈতিকতা আর বৈধতা আরোপের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল । ফলে লেখনকর্ম বা পাঠবস্তুতে সতত কেন্দ্র দখল করে থাকলেন লেখ-সৃষ্টিকারী ব্যক্তিমালিকটি ।

    ইংরেজরা আসার পরই, আর বাংলা কথাসাহিত্যের শুরুতেই যে লেখকরা নির্মিত-প্রতিস্ব নিয়ে লেখন-পরিসরে নেমেছিলেন, তা কিন্তু নয়। লেখন পরিসরে ব্যক্তিনামের লালন, ব্যক্তি-আধিপত্যের ছাপ, ব্যক্তিপ্রসূত রচনাগত মৌলিকতা, ব্যক্তিসৃজনশীলতা ইত্যাদি প্রতর্কগুলো হিন্দু বাঙালির জীবনে প্রবেশ করতে পেরেছিল  সেই সময়কার কলকাতায় ইউরোপীয় আলোকপ্রাপ্তির মননবিশ্বটি পাকাপাকি ভাবে থিতু হয়ে বসার পর । ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা, ১৮৩৫ থেকে শিক্ষার বাহন হিসেবে ইংরেজি, তারপর ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষিত বাঙালির সমাজে ওই মননবিশ্ব প্রবেশ করতে পেরেছিল। বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ সালে, লেখক হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের মননবিশ্বটি ওই আদরায় নির্মিত হবার পর এবং ফলে, আর একই কারণে বঙ্কিমচন্দ্রের ভাই পূর্ণচন্দ্র দ্বারা রচিত হলো, ১৮৭৩ সালে, প্রথম বাংলা ছোটোগল্প ‘মধুমতী’ । তার আগে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা এবং ১৮৩১ সালে প্রকাশিত ‘নববাবুবিলাস’ আর ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা ‘আলালের ঘরের দুলাল’ পাঠবস্তুগুলোতে ওই মননবিশ্বের ছাপ ছিল না ।

    পূর্ণচন্দ্র তাঁর গল্পটিতে নামস্বাক্ষর করেননি । ‘নববাবুবিলাস’ আর ‘আলালের ঘরের দুলাল’ ছদ্মনামে লেখা । নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘বাংলা ছোটোগল্প — সংক্ষিপ্ত সমালোচনা’ বইতে জানিয়েছেন যে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সময়কালে ( ১২৮০ থেকে ১৩০৬ বঙ্গাব্দ ) বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় একশ ছাব্বিশটি ছোটোগল্প প্রকাশিত হয়েছিল যেগুলোয় লেখকরা নামস্বাক্ষর করেননি, এমনকী ছদ্মনামও নয় । রচনার সঙ্গে লেখকের নাম দেওয়ার প্রথাটি প্রবর্তন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রাহ্মধর্মের প্রভাবশালী প্রতিনিধি । সেসময়ে ব্রা্‌হ্মধর্ম হয়ে উঠেছিল ওই মননবিশ্বের ধারক ও বাহক । নামস্বাক্ষর না-করার প্রক্রিয়াটি থেকে স্পষ্ট যে কথাবস্তুর রচয়িতারা জানতেন না যে লেখকসত্তা বলে কোনো ব্যাপার হয়, এবং লেখকের নামটি সত্তাটিকে বহন করে । কোনও কথাবস্তু যে মেধাস্বত্ত, সে ধারণাটির প্রতিষ্ঠা হতে সময় লেগেছিল । তার কারণ অস্তিত্বের কেন্দ্রে ব্যক্তিমানুষকে স্হাপনের কর্মকাণ্ডটির প্রভাব, যাকে উনিশ শতকের রেনেসঁস বলা হয়, সেই চিন্তাচেতনাকে ছড়িয়ে দেবার জন্য অজস্র নির্মিত-প্রতিস্বের প্রয়োজন ছিল । ইউরোপীয় চিন্তনতন্ত্রটির বাইরে যে নন্দনক্ষেত্রটি রয়ে গেল, জলবিভাজিকার অন্য দিকে, তাকে বটতলা নামে এইজন্য দোষারোপ করা হল যে সেই এলাকায় ব্যক্তিএককগুলো অনির্মিত। জেমস লঙ বললেন বটতলার বইগুলো অশ্লীল ও অশোভন, যার দরুন বাংলার সংস্কৃতি থেকে লোপাট হয়ে গেল বইগুলো ।

    ইউরোপ থেকে আনা সাহিত্য-সংরূপগুলোর সংজ্ঞার স্বামীত্ব, তাদের ব্যাখ্যা করার অধিকার, দেশীয়করণের বৈধতা, সেসব বিধিবিধান তত্বায়নের মালিকানা, কথাবস্তুটির উদ্দেশ্যমূলক স্বীকৃতি, চিন্তনতন্ত্রটির অন্তর্গত সংশ্লেষে স্বতঃঅনুমিত ছিল যে, অনির্মিত লেখকপ্রতিস্বের পক্ষে তা অসম্ভব, নিষিদ্ধ, অপ্রবেশ্য, অনধিকার চর্চা । ব্যাপারটা স্বাভাবিক, কেননা যাঁরা সংজ্ঞাগুলো সরবরাহ করছেন, তাঁরাই তো জানবেন যে সেসব সংজ্ঞার মধ্যে কী মালমশলা আছে, আর তলে-তলে কীইবা তাদের ধান্দা । ফলে, কোনও কথাবস্তু যে সংরূপহীন হতে পারে, লেখক-এককটি চিন্তনতন্ত্রে অনির্মিত হতে পারে, রচনাকার তাঁর পাঠবস্তুকে স্হানাংকমুক্ত সমাজপ্রক্রিয়া মনে করতে পারেন, বা নিজেকে বাংলা সাহিত্যের কালরেখার বাইরে মনে করতে পারেন, এই ধরণের ধারণাকে একেবারেই প্রশ্রয় দেয়নি ওই চিন্তনতন্ত্রটি । বর্তমান কালখণ্ডে, আমরা জানি, একজন লোক লেখেন তার কারণ তিনি ‘লেখক হতে চান’ । অথচ লেখক হতে চান না এরকম লোকও তো লেখালিখি করতে পারেন । তাঁরা সাহিত্যসেবক অর্থে লেখক নন, আবার সাহিত্যচর্চাকারী বিশেষ স্হানাংক নির্ণয়-প্রয়াসী না-লেখকও নন । তাঁদের মনে লেখক হওয়া-হওয়ি বলে কোনও সাহিত্য-প্রক্রিয়া থাকে না ।

    বহুকাল যাবৎ বিভিন্ন আলোচককে মন্তব্য করতে দেখা গেছে যে, উপন্যাস আর্ট ফর্মটির বঙ্গীয়করণ করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, ছোটোগল্প আর্টফর্মটিকে সম্পূর্ণ দেশজ করে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সনেট-তের্জারিমা-ভিলানেলকে এতদ্দেশীয় করেছিলেন প্রমথ চৌধুরী ইত্যাদি ।  এই যে একটি ভিন্ন ভাষসাহিত্যের সংরূপকে আরেকটি ভাষাসাহিত্যে এনে সংস্হাপন, এর জন্য দ্বিভাষী দক্ষতা এবং সংরূপটি সম্পর্কে গভীর জ্ঞানই যথেষ্ট নয় । যিনি এই কাজটিতে লিপ্ত, তাঁর গ্রাহীক্ষমতা, বহনক্ষমতা ও প্রতিস্হাপন ক্ষমতা থাকা দরকার। অমন ক্ষমতা গড়ে ওঠে জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে । আর এই জ্ঞান আহরণ তখনই সম্ভব যখন আ্হরণকারীর লেখক-প্রতিস্বের নির্মাণ ঘটে জ্ঞানটির পরিমণ্ডলে ।

    অনির্মিত লেখক-একককে ব্র্যাণ্ডার ম্যাথিউজ প্রণীত ছোটোগল্পের সংজ্ঞার প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করা যাক । ‘দি ফিলজফি অফ দি শর্ট স্টোরি’ বইতে ম্যাথিউজ বলেছেন, “যাহা কেবলমাত্র গল্প এবং পরিসরে ক্ষুদ্র, তাহাই ছোটোগল্প নহে । ভাবের ঐক্য ছোটোগল্পের পক্ষে অপরিহার্য এবং এইখানেই উপন্যাসের সহিত ইআর পপধান প্রভেদ । ছোটোগল্পে ভাবের ঐকভ আছে, উপন্যাসে নাই ।  ক্ল্যাসিকাল ফরাসি নাটকের তিনটি ঐক্যই ফরাসি নাটকে আছে ; ইহা একটি ক্ষেত্রে, একটি দিনে, বিশেষ একটি ঘটনা দেখায় । ছোটোগল্পে একটিমাত্র চরিত্র, ঘটনা বা ভাব থাকে, অথবা একটিমাত্র পরিস্হিতির পটভূমিকায় কতকগুলো ভাবের সমাবেশ ঘটে।” এখন, অনির্মিত লেখক-প্রতিস্বের কাছে ‘ভাবের ঐক্য’, ‘ভাবের সমাবেশ’ ‘ক্লসিকাল ফরাসি নাটক’ ইত্যাদি ভাবকল্পগুলো দুর্ভেদ্য থেকে যাবে, এবং ব্যাখ্যার পরও বিমূর্ততা কাটবে না ।

       ‘অ্যান ইনট্রোডাকশান টু দি স্টাডি অফ লিটারেচার’ বইতে দেয়া ডাবলু. এইচ. হাডসন-এর তৈরি অনুশাসনের প্রেক্ষিতেও ব্যাপারটা বিচার করা যেতে পারে । হাডসন বলেছেন, “ছোটোগল্পে শিল্পকলার মূল্য নির্ধারণের জন্য ‘একক উদ্দেশ্য ও ভাবের ঐক্য’ বজায় আছে কিনা তা দেখা উচিত।” এখানেও প্রশ্ন উঠবে ‘শিল্পকলা’, তার ‘মূল্য নির্ধারণ’ এবং ‘একক উদ্দেশ্য’ ভাবকল্পগুলো নিয়ে । বস্তুত যে চিন্তনতন্ত্রের কথা একটু আগে বলেছি, তার সরবরাহ করা সংজ্ঞায় খাপ খায়নি বলে পূর্ণচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের লেখা ‘মধুমতী’ রচনাটিকে সার্থক ছোটোগল্পের তকমা দেয়া হয়নি । সার্থক ছোটোগল্পের তকমা দেয়া হল ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘দেনাপাওনা’ রচনাটিকে । ছোটোগল্পের সংজ্ঞাকে গভীরভাবে বুঝতে না পারলে ‘সার্থক’ ছোটোগল্প লেখা সম্ভব ছিল না । সার্থকতা নামের মানদন্ডটি ওই চিন্তনতন্ত্রের ফসল । বর্তমান কালখণ্ডে ওই চিন্তনতন্ত্র বাতিল হয়ে গেছে, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ ।

    ওপরের কথাগুলো এইজন্য বলতে হল যে অবনী ধর, যাঁর চোদ্দটি গদ্য নিয়ে ‘ওয়ান সট’ বইটি  প্রকাশিত হয়েছিল, তিনি ছোটোগল্প-লেখক বা গল্পকার হওয়া-হওয়ি অবস্হান থেকে সেগুলো লেখেননি, এবং তাঁর লেখক-প্রতিস্বটি ছিল অনির্মিত । ১৯৬৯ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত, এই কালখণ্ডে তিনি এও চোদ্দটি গদ্যই লিখেছিলেন। ১৯৭৫ সালের পর তিনি লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছিলেন । হাংরি আন্দোলনের সময়ে তাঁর সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছিল, অশোকনগরে, কিন্তু তখনও তিনি লেখালিখি আরম্ভ করেননি, যদিও তিনি নিজের জীবনের এই ঘটনাগুলো শোনাতে ভালোবাসতেন । তাঁর কথনভঙ্গিমা ও জীবননাট্যের ঘটনা থেকে স্পষ্ট ছিল যে কথাবস্তুর পরিসরটি সেই সময়ের সাহিত্যিক ডিসকোর্স এবং কাউন্টার-ডিসকোর্স থেকে একেবারে আলাদা, এমনকী হাংরি আন্দোলনের গল্পকার-ঔপন্যাসিক থেকেও আলাদা । ১৯৯৪ সালে কলকাতায় ফিরে জানতে পারি যে অবনী ধরের রচনাগুলো নিয়ে বই বের করার উৎসাহ কোনও হাংরি আন্দোলনকারী দেখাননি । আমি শর্মী পাণ্ডেকে অনুরোধ করি যে অবনী ধরের গদ্যগুলো নিয়ে একটা সংগ্রহ ওদের শিলালিপী প্রকাশনী থেকে বের করতে । শর্মী আর ওর স্বামী শুভঙ্কর দাশ তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে যায় আর আমাকে একটা ভূমিকা লিখে দিতে বলে । এই সময়ে অবনী ধরের সঙ্গে আমার বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ ঘটে আর ওনার জীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে ফেলি । অবনী ধর জন্মেছিলেন ১৯৩৪ সালে, তখনকার পূর্ববঙ্গের মাদারিপুর জেলার কালাকিনি থানার পাঙাশিয়া গ্রামে. তাঁর মামার বাড়িতে । মারা যান ২০০৭ সালে, অশোকনগরে । তাঁর বাবা বঙ্কিমচন্দ্র ধর ( ১৯০৫ ) ওই জেলার মাইচপাড়া গ্রামের নিবাসী ছিলেন, সাত ভাইয়ের সবচেয়ে ছোট ; বঙ্কিমচন্দ্র ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন, কিন্তু কখনও কোনও চাকরি বা ব্যবসা করেননি ; স্বাদেশী আন্দোলনে যোগ দেবার কারণে কয়েকমাসের জেল হয়েছিল তাঁর । বঙ্কিমচন্দ্র তখনকার দিনের ম্যাট্রিক পাশ ছিলেন, অর্থাৎ যে চিন্তনতন্ত্রের কথা একটু আগে বলেছি, তার মননবিশ্বে অবনী ধরের প্রতিস্বনির্মাণের সুযোগটি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল, বিশেষ করে অবনী ধর যখন তাঁর বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ।

    অবনী ধরের বয়স যখন এক বছর, তখন তাঁর বাবা বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে, তাঁর মা লাবণ্য ধর ( ১৯১৫ – ১৯৭৭ ) , আর ঠাকুমাকে নিজেদের ভাগ্যের ওপরে ছেড়ে দিয়ে, অন্য এক তরুণীর সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, এবং বাকি জীবন বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর সঙ্গিনী বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীরূপে ভিক্ষা করে চালিয়েছিলেন । যদিও বঙ্কিমচন্দ্র মারা যান ১৯৬২ সালে, তাঁর মৃত্যুর খবর অবনীরা পান ১৯৭২ সালে । ততোদিন তাঁর মা শাঁখা-সিঁদুর পরতেন । অবনী ধরের লেখক-প্রতিস্ব প্রাগুক্ত চিন্তনতন্ত্রের  পরিসরে যদি গড়ে উঠত, তাহলে তিনি এই ট্র্যাজেডির মুহূর্তটি নিয়ে একটি কথাবস্তু তৈরি করতে পারতেন, কেননা ইউরোপীয় সাহিত্যে গ্রিসের সময় থেকে ব্যক্তি-এককের ট্র্যাজেডিটি লেখকত্ব প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপাদান ছিল, যা খ্রিস্টের নৃশংস হত্যা ও আত্মবলিদানের প্রতীকি অতিকথার প্রচার-প্রসারের কারণে সাহিত্যের নন্দনক্ষেত্রটিকে দখল করে নিতে পেরেছিল । তাছাড়া বাইবেলোক্ত “আরিজিনাল সিন” বা প্রথম পাপের পতনযন্ত্রণাকে সর্বজনীন নৈতিক-দার্শনিক বনেদে পালটে ফেলার জন্যেও জরুরি ছিল ইউরোপীয় সাহিত্যের পাতায় পাতায় ব্যক্তি-ট্র্যাজেডির উপস্হিতি ।

    অবনী ধরের জীবনে বহুবার বহুরকম ট্র্যাজেডি সংঘটন দেখা গেছে, কিন্তু সেসব অভিজ্ঞতার সরাসরি মালিকানা সত্তেও তিনি সংঘটন-মুহূর্ত বা ক্লাইম্যক্স বা হুইপক্র্যাক এনডিং প্রয়োগ করে কথাবস্তুকে ঔপনিবেশিক সাহিত্য-অনুশাসন ও হেলেনিক মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্ত করেননি । প্রকৃত প্রস্তাবে কথাবস্তুগুলো গড়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক সাহিত্য-মূল্যবোধের আওতার বাইরে । প্রসঙ্গত, যে সময়ে অবনী ধর তাঁর প্রথম পর্বের গদ্যগুলো লিখেছিলেন, সেসময়ে মান্যতাপ্রাপ্ত বাংলা ছোটো গল্পকাররা ইউরোপীয় সাহিত্যের অনুশাসন মোতাবেক, বিষণ্ণতা, পারক্য, প্রেমের বিকার, মৃত্যুপ্রবণতা, নিঃসঙ্গতার বেদনা,শহুরে যৌনতা ইত্যাদির চর্চা করছিলেন ।

    বাবা বঙ্কিমচন্দ্র তাঁদের একা ফেলে নিরুদ্দেশ হবার কারণে বছর পাঁচেক অন্নকষ্টে ভোগার পর তখনকার বিহারে ( এখন ঝাড়খণ্ড ) মধুপুরনিবাসী অবনীর ‘বুড়োমা’ অর্থাৎ তাঁর ঠাকুর্দার ভাইয়ের স্ত্রী, অবনী ও তাঁর মাকে দেখাসোনার জন্য, ও নিজের বার্ধক্যে দেখভালের জন্য, সেখানে নিয়ে গেলেন । যদিও অবনীর জ্যাঠামশাবরা, প্রথম দুজন ডাক্তার, ততীয়জন উকিল, চতুর্থজন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, এবং পঞ্চম ও ষষ্ঠ যথাক্রমে দেওঘর ও মধুপুরে আশ্রম বসিয়ে তার মোহন্ত ছিলেন, অবনীর পড়াশুনার এবং স্কুলে ভর্তি হবার সুরাহা হলো না । বুড়োমার আশ্রয়ে অবনী ও তাঁর মায়ের অন্ন সমস্যার সমাধান হলেও, শিক্ষাপ্রাপ্তির সুযোগ ঘটল না । স্কুলে ভর্তির জন্য অবনীকে কলকাতার চেতলায় মামারবাড়ি যেতে হলো । প্রবাদবাক্যের মামার বাড়ির আবদারের বদলে অহরহ দুর্ব্যাবহার জোটায়, ১৯৫০ সালের পয়লা অক্টোবর, কাউকে না জানিয়ে, স্কুল থেকে পালিয়ে, অবনী চলে গেলেন মার্চেন্ট নেভিতে, খালাসির কাজ নিয়ে । তখন তাঁর ষোলো বছর বয়স ।

    এই সময়ের অভিজ্ঞতাগুলো অবনী সংগ্রহ করেন জাহাজে খালাসির কাজ করার সময়ে, বিভিন্ন দেশের বন্দর-শহরে, ইউরোপ তখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভাঙন কাটিয়ে উঠতে পারেনি । বস্তুত তাঁর খালাসিপর্বের কথাবস্তুগুলো, কথনভঙ্গীর অন্তর্গত আহ্লাদময়তার কারণে, সুখশ্রাব্য ও কৌতূহলোদ্দীপক ছিল, যে গল্পগুলো বাসুদেব দাশগুপ্তকে তিনি শোনাতেন । অনেকে মনে করেন বাসুদেব দাশগুপ্তের গল্পগুলোর উৎস হলো অবনী ধরের অভিজ্ঞতা । লেখালিখি না করেও অবনী ধর তাঁর জীবনযাপনের কারণে নিজেকে হাংরি আন্দোলনকারী মনে করতেন । হাংরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে খালাসিটোলায় ঢুঁ মারতেন । বাসুদেব দাশগুপ্ত ও শৈলেশ্বর ঘোষের প্ররোচনায় সোনাগাছির যৌনকর্মী বেবি, মীরা এবং দীপ্তির সঙ্গে নৈকট্য গড়ে ফেলেছিলেন ।

    হাংরি আন্দোলনের সময়ে, উৎসাহদানকারী সম্পাদক ও স্তাবকদলের অভাবে, এবং অবনী ধরের সাহিত্যিক উচ্চাকাঙ্খার অনুপস্হিতিতে, তাঁর বলা কাহিনিগুলো লিখিত পাঠবস্তুর আকার নিতে পারেনি । জরুরি অবস্হার শেষে সারা পশ্চিমবাংলা জুড়ে লিটল ম্যাগাজিন বিস্ফোরণ ঘটলেও, সম্পাদকরা অবনীর গদ্য সম্পর্কে আগ্রহী হননি, মূলত তাঁর কথনভঙ্গীর ও রচনাকাঠামো বিদ্যায়তনিক সংরূপ বহির্ভূত ছিল বলে । একজন খালাসির গদ্যসন্দর্ভে যে যাযাবরতার নিবাস, যার উপকরণগুলো যাত্রাপথের খুদে অনির্ণেয়তায় তাৎপর্যময়, যার বিন্যাসে ভাসমান পরিভ্রমণের অনুন্মোচিত বাচন, স্নায়ুভাষায় রচিত সেরকম স্বতঃজাত কৃৎপ্রকরণ, স্বীকৃতি পায়নি লিটল ম্যাগাজিন স্তরেও । যেহেতু অবনীর পাঠবস্তু আত্মমগ্নতাকে অতিক্রম করে যায়, এবং তাঁর বাকব্যঞ্জনা বদ্ধসমাপ্তির কাঠামোটাকেই উপহাস করে, প্রধাগত আলোচকদের দৃষ্টিও তিনি আকর্ষণ করতে পারেননি ।

    অবনীর ও তাঁর আত্মীয় পরিজনের পরিবারে নিরুদ্দিষ্ট, সাধু, সন্ন্যাসী, মোহন্ত, ভিখারি-বৈষ্ণব, বাউল ইত্যাদির পূর্বেতিহাস থাকার কারণে অবনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মা চিন্তিত ছিলেন । বয়ঃসন্ধি অতিক্রান্ত সন্ধিক্ষণে তাঁর ছেলে হয়তো কোনও বন্দরশহর থেকে বিদেশিনী বিয়ে করে বা না-করে সঙ্গে এনে একদিন হাজির হবেন, এমন দুশ্চিন্তাও লাবণ্য ধরের ছিল । ছেলের চরিত্রে অভিজ্ঞতাজনিত পার্থক্যও তিনি লক্ষ্য করে থাকবেন । তিনি অবনীকে বললেন জাহাজের চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসতে । খালাসির চাকরি ছেড়ে ১৯৫৫ সালে ফিরে এলেন অবনী ।  বুড়োমা মারা যেতে তাঁর মা মধুপুরে একা হয়ে পড়েছিলেন । অবনী দেশে ফিরে চেতলার একটা বস্তিঘরে, মামার বাড়ির কাছে, বাসা ভাড়া নিয়ে মাকে মধুপুর থেকে নিয়ে এলেন । ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৩, এই আট বছর টাকা রোজগারের জন্য নানা রকম জীবিকার অভিজ্ঞতা হলো অবনীর — ক্রেন-ড্রেজার-ডাম্পার অপারেটার, লরি-ট্যাকসি-প্রায়ভেট মোটরগাড়ি চালক, রেলওয়ে ক্যাটারিঙের বেয়ারা, কোককয়লা ফেরি, ঠোঙা ও প্যাকেট তৈরি, পোস্টার-ফেস্টুন লেখা ইত্যাদি, অসংগঠিত শ্রমিকের জন্য যে-ধরণের কাজ পাওয়া যায় সবই করলেন । ১৯৬২ সালে অবনীর মা পাত্রী নির্বাচন করে সাধনার সঙ্গে তাঁর বি্য়ে দেন ।

    অবনী তাঁর সংসার ইতিমধ্যে চেতলা থেকে নতুন গড়ে-ওঠা উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কলোনি অশোকনগরে তুলে নিয়ে যান । তখন সেখানে স্হানীয় স্বায়ত্বশাসনের পরিকাঠামো বিশেষ ছিল না । তিনি নবতর অভিজ্ঞতার সামনে পড়লেন অশোকনগরে । তিনি এও দেখলেন যে, যাঁদের মাঝে তিনি বসবাস করতে এলেন, তাঁরা পপতিদিনকার মূর্ত নাগরিক অসুবিধা ও জাগতিক দুঃখকষ্টে ও অভাব প্রতিকারের বদলে সোভিয়েত রাষ্ট্র, চিন, ভিয়েৎনাম, কিউবা, আমেরিকা, দিল্লী ইত্যাদি সুদূরবর্তী বিমূর্ত অদরকারি তর্কাতর্কিতে সময় ও ক্ষমতা অপচয় অপচয় করে আনন্দ পান । অর্থাৎ সুপ্রাইণ্ডিভিজুয়াল বা অধিব্যক্তিক ম্যাক্রোলেভেল ভাবুকদের পশ্চিমবাংলার মাটিপৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কহীন তৎপরতার প্রেক্ষিতে, তাঁর মাইক্রোলেভেল খালাসিত্ব তাঁকে কল্যাণকামীতার স্বাভাবিক সনাতন মূল্যবোধে হায়ারার্কিবর্জিত করে রেখেছিল, এবং সেই ভূমিজ প্রবৃত্তিকে অবনী ধর কাজে লাগালেন ।

    তিনি এবং আরও কয়েকজন মিলে, বিশেষ করে শিক্ষক সমর ঘোষ, অশোকনগরে ডাকঘর বসানো, পৌরসভা গঠন, অসামাজিক কাজকারবার বন্ধ ইত্যাদির উদ্যোগ নিলেন । উদ্যোগটিকে কন্ঠস্বর দেবার জন্য, এবং তাঁদের অভাব-অভিযোগ যাতে কর্তাব্যক্তিদের কানে পৌঁছোয়, ১৯৬৪ সালে পপকাশ করা আরম্ভ করলেন ‘অশোকনগর বার্তা’ নামে একটি পাক্ষিক সংবাদপত্র, যেটি ছিল ওই অঞ্চলের প্রথম পঞ্জিকৃত সংবাদপত্র । পত্রিকাটির আয়ু ছিল তিন বছর, সম্ভবত যথেষ্ট । পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, নিজের অভিজ্ঞতাকে কথাবস্তুতে রূপান্তরিত করে ছাপাবার কথা তাঁর মনে আসেনি কখনও ; পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত অন্যেরাও তাঁর মুখে ঘটনা শুনেও তাঁকে লিখতে বলেননি । সম্ভবত সমাজচিন্তনকে আত্মসাৎ করে ব্যক্তি-ক্রিয়াকরণের চিন্তা-পরিসর লালিত হবার মতো পৃথকত্ববোধ জাগার সুযোগ বা মনস্হিতি তাঁর হয়নি । ১৯৬৩ সাল থেকে চাকুরিহীন অবনীর কাছে আপনা থেকেই পরিত্যক্ত হয়েছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার দর্শন ।

    অবনী ধরের কথাবস্তুগুলোকে দুটি পর্বে চি্‌হ্ণিত করা যায় । প্রথম পর্বটি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় পর্বটি ২০০০ সালের পর । মাঝে লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন । প্রথম পর্বে তিনি ছিলেন অর্থস্রোতহীন এবং কোনও সাহিত্যিক স্বকীয়তা আনার প্রয়াস করেননি । তা আপনা থেকে হয়ে গিয়েছিল তাঁর অনির্মিত লেখক-প্রতিস্বের কারণে । অবনী ধরের ডিসকোর্স, কখনও খালাসির, কখনও বা অসংগঠিত শ্রমিক বা কর্মহীনের, ভূপ্রকৃতির উথ্থানভূমিলব্ধ, স্হানিক, অবিমিশ্র, মুক্ত, যৌগিক, বর্ণিল, অনুভূমিক, প্রতিসংস্হাপিত, কৌমনিষ্ঠ এবং অতিজ্ঞাপনমূলক । প্রথম লেখাটি, ‘আমার দুঃখী মা’ রচনার পর তিনি তা লাবণ্য ধরকেই পড়ে শুনিয়েছিলেন । স্তম্ভিত মা কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর. বলেছিলেন, ‘সত্য কথাই ল্যাখছস।’

    দ্বিতীয় পর্বের শুরু ২০০০ সালে । এই পর্বে অবনীর গদ্য-কাঠামোয় কয়েকটি কারণে সাইত্যিকতা এসে গেছে । তাঁর স্ত্রী, আরও কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে একজোট হয়ে মামলা করে ১৯৯০ সালে চাকরি পাবার পর অবনীর আর্থিক অনিশ্চয়তা কাটে । তাঁর মেয়ে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ও বি এড এবং ছেলে বি এ পাশ করেন । অর্থাৎ প্রথম পর্বের জ্ঞান পরিমণ্ডলটি, তাঁর মেয়ে ও ছেলের প্রভাবে ক্রমশ অপসারিত হয়ে বাড়ির মধ্যে একটি ভিন্ন, যা অবনীর কাছে তুলনামূলকভাবে উচ্চতর ঠেকে থাকবে, জ্ঞানপরিমণ্ডলের প্রবেশ ঘটিয়েছে । তৃতীয়ত, তাঁর প্রথম পর্বের রচনাগুলো, অন্তত কিছু সাহিত্যপাঠকের, হাতে গোনা হলেও, দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে, যাঁদের পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় তিনি উৎসাহিত হয়ে থাকবেন গদ্যগুলোকে একটি সাহিত্যিক আদল-আদরা দেবার । দ্বিতীয় পর্বের কথাবস্তুগুলোর গদ্যবিন্যাসে ধরা পড়ে যে প্রথাবাহিত গদ্যসাহিত্যের সঙ্গে, যেগুলো তাঁর ছেলে-মেয়ে নিজেরা পড়ার জন্য বাড়িতে এনে থাকবেন, তাঁর যোগাযোগ ঘটেছে । অবনী নিজে চেষ্টা করলেও, এই বয়সে পৌঁছে, তাঁর পক্ষে মুকুরবিম্ব গড়া সম্ভবপর হয়নি, এবং তাঁর অপরত্ববোধ ও সাহিত্যিক অপরত্ব মুছে যায়নি । প্রথম ও দ্বিতীয়, দুটি পর্বেই, তাঁর জীবনজিজ্ঞাসা তাড়িত হয়েছে অপরত্ববোধের অবস্হাননজনিত  বিপর্যয় দ্বারা। আর কোনো বাঙালি সাহিত্যিকের কথাবস্তুতে, অপরত্ববোধের মাত্রাগুলোকে, অবনীর মতো করে ইতোপূর্বে উপস্হাপন করতে দেখা যায়নি । তাঁর মস্তিষ্কে আতিথ্য নেয়া কথাকারটি নিজেরই স্মৃতির ঐতিহাসিক হিসেবে অবনীর সামনে উদয় হয়েছে কখনও-সখনও, যিনি অতীতকে বাঁচিয়ে তুলতে চেষ্টা করছেন না বা অতীতে বেঁচে থাকার কথা বলছেন না ; আসলে কথাকার ওই দূরবর্তী এবং নিকট অতীতের লোপাট হয়ে যাওয়া ও তাকে বাগে আনার বাচনক্রীড়ায় অংশগ্রহণকারীরূপে ‘অপর প্রতিসন্দর্ভের’ সতর্কতাগুলো জাহির করছেন ।

    দুই       

                                   

    উত্তরবঙ্গে হাংরি জেনারেশনের প্রসার সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে, হাংরি পত্রিকা ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ এর সম্পাদক অলোক গোস্বামী এই কথাগুলো লিখেছিলেন, তা থেকে অবনিবনার যৎসামান্য আইডিয়া হবে, কিন্তু এই অবনিবনার সঙ্গে পরাবাস্তববাদীদের নিজেদের অবনিবনারে যথেষ্ট মিল আছে :-

    “নব্বুই দশকে সদ্য প্রকাশিত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বগলে নিয়ে এক ঠা ঠা দুপুরে আমি হাজির হয়েছিলাম শৈলেশ্বরের বাড়ির গেটে। একা। ইচ্ছে ছিল শৈলেশ্বরের সঙ্গে মুখোমুখি বসে যাবতীয় ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলবো। যেহেতু স্মরণে ছিল শৈলেশ্বরের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি তাই আস্থা ছিল শৈলেশ্বরের প্রজ্ঞা,ব্যক্তিত্ব,যুক্তিবোধ তথা ভদ্রতাবোধের ওপর। দৃঢ় বিশ্বাস ছিল শৈলেশ্বর আমাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেবেন এবং যৌথ আলোচনাই পারবে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নতুন উদ্যমে একসাথে পথ চলা শুরু করতে। কিন্তু দুভার্গ্য বশতঃ তেমন কিছু ঘটলো না। বেল বাজাতেই গেটের ওপারে শৈলেশ্বর। আমাকে দেখেই ভ্রূ কুঁচকে ফেললেন।

    --কী চাই!

    মিনমিন করে বললাম, আপনার সঙ্গে কথা বলবো।

    --কে আপনি?

    এক এবং দুই নম্বর প্রশ্নের ভুল অবস্থান দেখে হাসি পাওয়া সত্বেও চেপে গিয়ে নাম বললাম।

    --কি কথা?

    --গেটটা না খুললে কথা বলি কিভাবে!

    --কোনো কথার প্রয়োজন নেই। চলে যান।

    --এভাবে কথা বলছেন কেন?

    --যা বলছি ঠিক বলছি। যান। নাহলে কিন্তু প্রতিবেশীদের ডাকতে বাধ্য হবো।

    এরপর স্বাভাবিক কারণেই খানিকটা ভয় পেয়েছিলাম কারণ আমার চেহারাটা যেরকম তাতে শৈলেশ্বর যদি একবার ডাকাত, ডাকাত বলে চেঁচিয়ে ওঠেন তাহলে হয়ত জান নিয়ে ফেরার সুযোগ পাবো না। তবে 'ছেলেধরা' বলে চেল্লালে ভয় পেতাম না। সমকামিতার দোষ না থাকায় নির্ঘাত রুখে দাঁড়াতাম।

    ভয় পাচ্ছি অথচ চলেও যেতে পারছি না। সিদ্ধান্তে পৌঁছতে গেলে আরও খানিকটা জানা বোঝা জরুরি।

    --ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি। তবে পত্রিকার নতুন সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে সেটা রাখুন।

    এগিয়ে আসতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন শৈলেশ্বর।

    --কোন পত্রিকা?

    --কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প।

    --নেব না। যান।

    এরপর আর দাঁড়াইনি। দাঁড়ানোর প্রয়োজনও ছিল না। ততক্ষণে বুঝে ফেলেছি ব্যক্তি শৈলেশ্বর ঘোষকে চিনতে ভুল হয়নি আমাদের। আর এই সমঝদারি এতটাই তৃপ্তি দিয়েছিল যে অপমানবোধ স্পর্শ করারই সুযোগ পায়নি।”

    শৈলেশ্বর ঘোষের হয়তো মনে হয়েছিল যে কলকাতায় তিনি হাংরি আন্দোলনের যে কেন্দ্র গড়ে তুলতে চাইছেন তাতে ফাটল ধরাবার চেষ্টা করা হচ্ছে । তাঁর আচরণ ছিল হুবহু আঁদ্রে ব্রেতঁর মতন । পরাবাস্তববাদ আন্দোলনে আঁদ্রে ব্রেতঁর সঙ্গে অনেকের সম্পর্ক ভালো ছিল না, দল বহুবার ভাগাভাগি হয়েছিল, অথচ সেসব নিয়ে বাঙালি আলোচকরা তেমন উৎসাহিত নন, যতোটা হাংরি আন্দোলনের দল-ভাগাভাগি নিয়ে ।     ইংরেজিতে মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্য চৌধুরী হাংরি আন্দোলন নিয়ে ‘দি হাংরিয়ালিস্টস’ নামে একটি বই লিখেছেন, পেঙ্গুইন র‌্যাণ্ডাম হাউস থেকে প্রকাশিত । সেই বইটি বাংলা পত্রপত্রিকায় আলোচিত হল না । 

    আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৬ জুন ২০১৩ তারিখে গৌতম চক্রবর্তী হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে এই কথাগুলো লিখেছিলেন ; তাতেও রয়েছে টিটকিরি যা তিনি পরাবাস্তববাদীদের সম্পর্কে কখনও বলেছেন কিনা জানি না । উনি লিখেছিলেন :

    “মানুষ, ঈশ্বর, গণতন্ত্র ও বিজ্ঞান পরাজিত হয়ে গেছে। কবিতা এখন একমাত্র আশ্রয়।... এখন কবিতা রচিত হয় অর্গ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে।

    ১৯৬২ সালে এই ভাষাতেই কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস থেকে খালাসিটোলা, বারদুয়ারি অবধি সর্বত্র গোপন বিপ্লবী আন্দোলনের ব্লু প্রিন্টের মতো ছড়িয়ে পড়ে একটি ম্যানিফেস্টো। ২৬৯ নেতাজি সুভাষ রোড, হাওড়া থেকে প্রকাশিত এই ম্যানিফেস্টোর ওপরে লেখা হাংরি জেনারেশন। নীচের লাইনে তিনটি নাম। স্রষ্টা: মলয় রায়চৌধুরী। নেতৃত্ব: শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সম্পাদনা: দেবী রায়।

    তখনও কলেজ স্ট্রিটের বাতাসে আসেনি বারুদের গন্ধ, দেওয়ালে লেখা হয়নি ‘সত্তরের দশক মুক্তির দশক’। কিন্তু পঞ্চাশ পেরিয়ে-যাওয়া এই ম্যানিফেস্টোর গুরুত্ব অন্যত্র। এর আগে ‘ভারতী’, ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘শতভিষা’ অনেক কবিতার কাগজ ছিল, সেগুলি ঘিরে কবিরা সংঘবদ্ধও হতেন। কিন্তু এই ভাবে সাইক্লোস্টাইল-করা ম্যানিফেস্টো আগে কখনও ছড়ায়নি বাংলা কবিতা।

    ওটি হাংরি আন্দোলনের দ্বিতীয় ম্যানিফেস্টো। প্রথম ম্যানিফেস্টোটি বেরিয়েছিল তার কয়েক মাস আগে, ১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে। ইংরেজিতে লেখা সেই ম্যানিফেস্টো জানায়, কবিতা সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায় না, বিভ্রমের বাগানে পুনরায় বৃক্ষরোপণ করে না। ‘Poetry is no more a civilizing manoeuvre, a replanting of bamboozled gardens.’ বিশ্বায়নের ঢের আগে ইংরেজি ভাষাতেই প্রথম ম্যানিফেস্টো লিখেছিলেন হাংরি কবিরা। কারণ, পটনার বাসিন্দা মলয় রায়চৌধুরী ম্যানিফেস্টোটি লিখেছিলেন। পটনায় বাংলা ছাপাখানা ছিল না, ফলে ইংরেজি।

    দুটি ম্যানিফেস্টোতেই শেষ হল না ইতিহাস। হাংরি আসলে সেই আন্দোলন, যার কোনও কেন্দ্র নেই। ফলে শহরে, মফস্সলে যে কোনও কবিই বের করতে পারেন তাঁর বুলেটিন। ১৯৬৮ সালে শৈলেশ্বর ঘোষ তাঁর ‘মুক্ত কবিতার ইসতাহার’-এ ছাপিয়ে দিলেন ‘সমস্ত ভন্ডামির চেহারা মেলে ধরা’, ‘শিল্প নামক তথাকথিত ভূষিমালে বিশ্বাস না করা’, ‘প্রতিষ্ঠানকে ঘৃণা করা’, ‘সভ্যতার নোনা পলেস্তারা মুখ থেকে তুলে ফেলা’ ইত্যাদি ২৮টি প্রতিজ্ঞা। পরে বন্ধুদের মধ্যে ঝগড়া বাধবে। মলয় ব্যাংকের চাকরি নিয়ে বাইরে চলে যাবেন। শৈলেশ্বর, সুবো আচার্য এবং প্রদীপ চৌধুরীরা বলবেন, ‘মলয় বুর্জোয়া সুখ ও সিকিয়োরিটির লোভে আন্দোলন ছেড়ে চলে গিয়েছে।’কী রকম লিখতেন হাংরিরা? বছর দুয়েক আগে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘বাইশে শ্রাবণ’ ছবিতে গৌতম ঘোষের চরিত্রটি লেখা হয়েছিল হাংরি কবিদের আদলে।

    ‘জেগে ওঠে পুরুষাঙ্গ নেশার জন্য হাড় মাস রক্ত ঘিলু শুরু করে কান্নাকাটি

    মনের বৃন্দাবনে পাড়াতুতো দিদি বোন বউদিদের সঙ্গে শুরু হয় পরকীয়া প্রেম’,

    লিখেছিলেন অকালপ্রয়াত ফালগুনী রায়। র‌্যাঁবো, উইলিয়াম বারোজ এবং হেনরি মিলারের উদাহরণ বারে বারেই টেনেছেন হাংরিরা। ঘটনা, এঁরা যত না ভাল কবিতা লিখেছেন, তার চেয়েও বেশি ঝগড়া করেছেন। এবং তার চেয়েও বেশি বার গাঁজা, এলএসডি, মেস্কালিন আর অ্যাম্ফিটোমাইন ট্রিপে গিয়েছেন।

    অতএব, সাররিয়ালিজ্ম বা অন্য শিল্প আন্দোলনের মতো বাঙালি কবিদের ম্যানিফেস্টোটি কোনও দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়নি। কিন্তু ‘হাংরি’রা আজও মিথ। এক সময় ‘মুখোশ খুলে ফেলুন’ বলে তৎকালীন মন্ত্রী, আমলা, সম্পাদকদের বাড়িতে ডাকযোগে তাঁরা মুখোশ পাঠিয়ে দিয়েছেন। আবার এক সময় ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি লেখার জন্য অশ্লীলতার মামলা হল মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে। উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাকের বিরুদ্ধে জারি হল গ্রেফতারি পরোয়ানা।

    রাষ্ট্র ও আদালত কী ভাবে কবিতাকে দেখে, সেই প্রতর্কে ঢুকতে হলে ১৯৬৫ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলাটি সম্পর্কে জানা জরুরি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় কাঠগড়ায় উঠেছেন মলয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে। পাবলিক প্রসিকিউটরের জিজ্ঞাসা, ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা পড়ে আপনার কী মনে হয়েছে?

    শক্তি: ভাল লাগেনি।

    প্রসিকিউটর: অবসিন কি? ভাল লাগেনি বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?

    শক্তি: ভাল লাগেনি মানে জাস্ট ভাল লাগেনি। কোনও কবিতা পড়তে ভাল লাগে, আবার কোনওটা ভাল লাগে না।

    শক্তি সাক্ষ্য দিয়েছিলেন মলয়ের বিরুদ্ধে। কয়েক মাস পরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মলয়ের সমর্থনে...

    প্রসিকিউটর: কবিতাটা কি অশ্লীল মনে হচ্ছে?

    সুনীল: কই, না তো। আমার তো বেশ ভাল লাগছে। বেশ ভাল লিখেছে।

    প্রসিকিউটর: আপনার শরীরে বা মনে খারাপ কিছু ঘটছে?

    সুনীল: না, তা কেন হবে? কবিতা পড়লে সে সব কিছু হয় না।

    একই মামলায় শক্তি ও সুনীল পরস্পরের বিরুদ্ধে। তার চেয়েও বড় কথা, ’৬৫ সালে এই সাক্ষ্য দেওয়ার আগের বছরই সুনীল আইওয়া থেকে মলয়কে বেশ কড়া একটি চিঠি দিয়েছিলেন, ‘লেখার বদলে আন্দোলন ও হাঙ্গামা করার দিকেই তোমার ঝোঁক বেশি। রাত্রে তোমার ঘুম হয় তো? মনে হয়, খুব একটা শর্টকাট খ্যাতি পাবার লোভ তোমার।’ ব্যক্তিগত চিঠিতে অনুজপ্রতিম মলয়কে ধমকাচ্ছেন, কিন্তু আদালতে তাঁর পাশে গিয়েই দাঁড়াচ্ছেন। সম্ভবত, বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে অনুজ কবিদের কাছে সুনীলের ‘সুনীলদা’ হয়ে ওঠা হাংরি মামলা থেকেই। প্রবাদপ্রতিম কৃত্তিবাসী বন্ধুত্বের নীচে যে কত চোরাবালি ছিল, তা বোঝা যায় উৎপলকুমার বসুকে লেখা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের একটি চিঠি থেকে, ‘প্রিয় উৎপল, একদিন আসুন।...আপনি তো আর শক্তির মতো ধান্দায় ঘোরেন না।’

    তা হলে কি হাংরি আন্দোলন বাংলা সাহিত্যে প্রভাবহীন, শুধুই কেচ্ছাদার জমজমাট এক পাদটীকা? দুটি কথা। হাংরিদের প্রভাবেই কবিতা-সংক্রান্ত লিট্ল ম্যাগগুলির ‘কৃত্তিবাস’, ‘শতভিষা’ গোছের নাম বদলে যায়। আসে ‘ক্ষুধার্ত’, ‘জেব্রা’, ‘ফুঃ’-এর মতো কাগজ। সেখানে কবিতায় বাঁকাচোরা ইটালিক্স, মোটাদাগের বোল্ড ইত্যাদি হরেক রকমের টাইপোগ্রাফি ব্যবহৃত হত। পরবর্তী কালে সুবিমল মিশ্রের মতো অনেকেই নিজেকে হাংরি বলবেন না, বলবেন ‘শুধুই ছোট কাগজের লেখক’। কিন্তু তাঁদের গল্প, উপন্যাসেও আসবে সেই টাইপোগ্রাফিক বিভিন্নতা। তৈরি হবে শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন। হাংরিরা না এলে কি নব্বইয়ের দশকেও হানা দিতেন পুরন্দর ভাট?

    আসলে, ম্যানিফেস্টোর মধ্যেই ছিল মৃত্যুঘণ্টা। ’৬২ সালে হাংরিদের প্রথম বাংলা ম্যানিফেস্টোর শেষ লাইন, ‘কবিতা সতীর মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা ও ঈশ্বরীর মতো অনুষ্মেষিণী।’ হাংরিরা নিজেদের যত না সাহিত্যবিপ্লবী মনে করেছেন, তার চেয়েও বেশি যৌনবিপ্লবী।”

    তিন

    ১৯১৭ সালে গিয়ম অ্যাপলিনেয়ার “সুররিয়ালিজম” অভিধাটি তৈরি করেছিলেন, যার অর্থ ছিল বাস্তবের অতীত। শব্দটি প্রায় লুফে নেন আঁদ্রে ব্রেতঁ, নতুন একটি আন্দোলন আরম্ভ করার পরিকল্পনা নিয়ে, যে আন্দোলনটি হবে পূর্ববর্তী ডাডাবাদী আন্দোলন থেকে ভিন্ন । ত্রিস্তঁ জারা উদ্ভাবিত ডাডা আন্দোলন থেকে সরে আসার কারণ হল ব্রেতঁ সহ্য করতে পারতেন না ত্রিস্তঁ জারাকে, কেননা কবি-শিল্পী মহলে প্রতিশীল্পের জনক হিসাবে ত্রিস্তঁ জারা খ্যাতি পাচ্ছিলেন। আঁদ্রে ব্রেতঁ সুররিয়ালিজম তত্বটির একমাত্র ব্যাখ্যাকারী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে আরম্ভ করেন। ১৯১৯ সালে ত্রিস্তঁ জারাকে কিন্তু ব্রেতঁ চিঠি লিখে প্যারিসে আসতে বলেছিলেন । একইভাবে ‘হাংরি’ শব্দটি মলয় রায়চৌধুরী পেয়েছিলেন কবি জিওফ্রে চসার থেকে । এই ‘হাংরি’ শব্দটি নেয়ার জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, তেমন কিছুই করা হয়নি আঁদ্রে ব্রেতঁ ও ত্রিস্তঁ জারা সম্পর্কে । মলয় রায়চৌধুরী হাংরি জেনারেশন আন্দোলন ঘোষণা করেন ১৯৬৫ সালের পয়লা নভেম্বর একটি লিফলেট প্রকাশের মাধ্যমে ।

    পরাবাস্তববাদী আন্দোলনে, প্রথম থেকেই, আঁদ্রে ব্রেতঁ’র সঙ্গে অনেক পরাবাস্তববাদীর সদ্ভাব ছিল না, কিন্তু পরাবাস্তববাদ বিশ্লেষণের সময়ে আলোচকরা তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন না । আমরা যদি বাঙালি আলোচকদের কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখব যে তাঁরা হাংরি জেনারেশন বা ক্ষুধার্ত আন্দোলন বিশ্লেষণ করার সময়ে হাংরি জেনারেশনের সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে অত্যধিক চিন্তিত, হাংরি আন্দোলনকারীদের সাহিত্য অবদান নিয়ে নয় । ব্যাপারটা বিস্ময়কর নয় । তার কারণ অধিকাংশ আলোচক হাংরি জেনারেশনের সদস্যদের বইপত্র সহজে সংগ্রহ করতে পারেন না এবং দ্বিতীয়ত সাংবাদিক-আলোচকদের কুৎসাবিলাসী প্রবণতা । 

    আঁদ্রে ব্রেতঁ তাঁর বন্ধু পল এলুয়ার, বেনিয়ামিন পেরে, মান রে, জাক বারোঁ, রেনে ক্রেভালl, রোবের দেসনস, গিয়র্গে লিমবোর, রোজের ভিত্রাক, জোসেফ দেলতিল, লুই আরাগঁ ও ফিলিপে সুপোকে নিয়ে ১৯১৯ পরাবাস্তববাদ আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন । কিছুকাল পরে, রাজনৈতিক ভাবাদর্শের কারণে তাঁর সঙ্গে লুই আরাগঁর ঝগড়া বেধে গিয়েছিল । মার্সেল দ্যুশঁ,  ত্রিস্তঁ জারা এবং আঁদ্রে ব্রেতঁ, উভয়ের সঙ্গেই ছিলেন, এবং দুটি দলই তাঁকে গুরুত্ব দিতেন, দ্যুশঁ’র অবাস্তব ও অচিন্ত্যনীয় ভাবনার দরুন।

    পরাবাস্তব আন্দোলনের আগে জুরিখে ডাডাবাদী আন্দোলন আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল এবং আঁদ্রে ব্রেতঁ পরাবাস্তববাদের অনুপ্রেরণা পান ডাডা আন্দোলনের পুরোধা ত্রিস্তঁ জারার কাছ থেকে, কিন্তু ব্রেতঁ চিরকাল তা অস্বীকার করে্ছেন । ডাডা ছিল শিল্পবিরোধী আভাঁ গার্দ আন্দোলন ; অবশ্য প্রতিশিল্পও তো শিল্প । ডাডাবাদের রমরমার কারণে ত্রিস্তঁ জারার সঙ্গে ব্রেতঁর সম্পর্ক দূষিত হয়ে যায় ; একজন অন্যজনের নেতৃত্ব স্বীকার করতে চাইতেন না । ডাডা (/ˈdɑːdɑː/) বা ডাডাবাদ (দাদাবাদ নামেও পরিচিত) ছিল ২০ শতকের ইউরোপীয় ভিন্নচিন্তকদের একটি সাহিত্য-শিল্প আন্দোলন, যার প্রাথমিক কেন্দ্র ছিল সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ক্যাবারে ভলতেয়ার ( ১৯১৬ নাগাদ ) এবং নিউ ইয়র্কে (প্রায় ১৯১৫ নাগাদ)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ডাডা আন্দোলন গড়ে ওঠে সেইসব শিল্পীদের নিয়ে, যাঁরা পুঁজিবাদী সমাজের যুক্তি, কারণ বা সৌন্দর্যের ধারণা মানতেন না, বরং তাঁদের কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করতেন আপাত-অর্থহীন, উদ্ভট, অযৌক্তিক এবং বুর্জোয়া-বিরোধী প্রতিবাদী বক্তব্য । আন্দোলনটির শিল্পচর্চা প্রসারিত হয়েছিল দৃশ্যমান, সাহিত্য ও শব্দ মাধ্যমে, যেমন- কোলাজ, শব্দসঙ্গীত, কাট-আপ লেখা, এবং ভাস্কর্য। ডাডাবাদী শিল্পীরা হানাহানি, যুদ্ধ এবং জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে অসন্তোষ প্রকাশ করতেন এবং গোঁড়া বামপন্থীদের সাথে তাঁদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল।

    যুদ্ধ-পূর্ববর্তী প্রগতিবাদীদের মধ্যেই ডাডার শিকড় লুকিয়ে ছিল। শিল্পের সংজ্ঞায় পড়েনা এমন সব সৃষ্টিকর্মকে চিহ্নিত করার জন্য ১৯১৩ সালে "প্রতি-শিল্প" শব্দটি চালু করেছিলেন মার্সেল দ্যুশঁ । কিউবিজম এবং কোলাজ ও বিমূর্ত শিল্পের অগ্রগতিই হয়তো ডাডা আন্দোলনকে বাস্তবতার গন্ডী থেকে বিচ্যুত হতে উদ্বুদ্ধ করে। আর শব্দ ও অর্থের প্রথানুগত সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করতে ডাডাকে প্রভাবিত করে ইতালীয় ভবিষ্যতবাদী এবং জার্মান এক্সপ্রেশনিস্টগণ । আলফ্রেড জ্যারির উবু রোই (১৮৯৬) এবং এরিক স্যাটির প্যারেড (১৯১৬-১৭) প্রভৃতি লেখাগুলোকে ডাডাবাদী রচনার আদিরূপ বলা যেতে পারে।  ডাডা আন্দোলনের মূলনীতিগুলো প্রথম সংকলিত হয় ১৯১৬ সালে হুগো বলের ডাডা ম্যানিফেস্টোতে। এই ম্যানিফেস্টোর প্রভাবে পরবর্তিকালে ব্রেতঁ সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টো লিখতে অনুপপ্রাণিত হন -- এই কথা শুনতে ব্রেতঁ’র ভালো লাগত না এবং সেকারণে তিনি বহু সঙ্গীকে এক-এক করে আন্দোলন থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন । তাছাড়া ব্রেতঁ মনে করতেন ডাডাবাদীরা নৈরাজ্যবাদী বা অ্যানার্কিস্ট, যখন কিনা তিনি একজন কমিউনিস্ট ।

    ডাডা আন্দোলনে ছিল জনসমাবেশ, মিছিল ও সাহিত্য সাময়িকীর প্রকাশনা; বিভিন্ন মাধ্যমে শিল্প, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি নিয়ে তুমুল আলোচনা হতো। আন্দোলনের প্রধান ব্যক্তিত্বরা ছিলেন হুগো বল, মার্সেল দ্যুশঁ, এমি হেনিংস, হানস আর্প, রাউল হাউসম্যান, হানা হৌক, জোহান বাডার, ত্রিস্তঁ জারা, ফ্রান্সিস পিকাবিয়া, রিচার্ড হিউলসেনব্যাক, জর্জ গ্রোস, জন হার্টফিল্ড, ম্যান রে, বিয়াট্রিস উড, কার্ট শ্যুইটার্স, হানস রিখটার এবং ম্যাক্স আর্নেস্ট। অন্যান্য  আন্দোলন, শহরতলীর গান এসবের পাশাপাশি পরাবাস্তববাদ, নব্য বাস্তবতা, পপ শিল্প এবং ফ্লক্সেস প্রভৃতি গোষ্ঠীগুলোও ডাডা আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। এই আন্দোলনের অনেকে সুররিয়ালিস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন ।

    পরাবাস্তববাদ আন্দোলনে যাঁরা ব্রেতঁর সঙ্গে একে-একে যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম হলেন ফিলিপে সুপো, লুই আরাগঁ, পল এলুয়ার, রেনে ক্রেভাল, মিশেল লেইরিস, বেনিয়ামিন পেরে, অন্তনাঁ আতো,জাক রিগো, রবের দেসনস, ম্যাক্স আর্নস্ত প্রমুখ । এঁদের অনেকে ডাডাবাদী আন্দোলন ত্যাগ করে পরাবাস্তববাদী আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯২৩ সালে যোগ দেন চিত্রকর আঁদ্রে মাসোঁ ও ইভস তাঙ্গুই । ১৯২১ সালে ভিয়েনায় গিয়ে ফ্রয়েডের সঙ্গে দেখা করেন ব্রেতঁ । ফ্রয়েডের ধারণাকে তিনি সাহিত্য ও ছবি আঁকায় নিয়ে আসতে চান । ফ্রয়েডের প্রভাবে ব্রেতঁ বললেন, সুররিয়ালিজমের মূলকথা হল অবচেতনমনের ক্রিয়াকলাপকে উদ্ভট ও আশ্চর্যকর সব রূপকল্প দ্বারা প্রকাশ করা। ডাডাবাদীরা যেখানে চেয়েছিলেন প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধকে নস্যাৎ করে মানুষকে এমন একটি নান্দনিক দৃষ্টির অধিকারী করতে যার মাধ্যমে সে ভেদ করতে পারবে ভণ্ডামি ও রীতিনীতির বেড়াজাল, পৌঁছাতে পারবে বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্যে; সেখানে পরাবাস্তববাদ আরো একধাপ এগিয়ে বলল, প্রকৃত সত্য কেবলমাত্র অবচেতনেই বিরাজ করে। পরাবাস্তববাদী শিল্পীর লক্ষ্য হল তার কৌশলের মাধ্যমে সেই সত্যকে ব্যক্তি-অস্তিত্বের গভীর থেকে তুলে আনা। 

    সুররিয়ালিজমের প্রথম ইশতেহার প্রকাশ করেন ইয়ান গল। এ ইশতেহারটি ১৯২৪ সালের ১ অক্টোবর প্রকাশিত হয়। এর কিছুদিন পরেই ১৫ অক্টোবর আঁদ্রে ব্রেতঁ সুররিয়ালিজমের দ্বিতীয় ইশতেহারটি প্রকাশ করেন। তিনি ১৯৩০ সালে এ ধারার তৃতীয় ইশতেহারটিও প্রকাশ করেন। ইয়ান গল ও আঁদ্রে ব্রেতঁ—দুজনে দু দল সুররিয়ালিস্ট শিল্পীর নেতৃত্ব দিতেন। ইয়ান গলের নেতৃত্বে ছিলেন ফ্রান্সিস পিকাবিয়া, ত্রিস্তঁ জারা, মার্সেল আর্লেন্ড, জোসেফ ডেলটিল, পিয়েরে অ্যালবার্ট বিরোট প্রমুখ। আন্দ্রে ব্রেতঁর নেতৃত্বে ছিলেন লুই আরাগঁ, পল এলুয়ায়, রোবের ডেসনোস, জ্যাক বারোঁ, জর্জ ম্যালকিন প্রমুখ। এ দুটি দলেই ডাডাইজম আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। অবশ্য ইয়ান গল ও আন্দ্রে ব্রেতঁ এই আন্দোলন নিয়ে প্রকাশ্য-রেশারেশিতে জড়িয়ে পড়েন। তখন থেকেই পরাবাস্তববাদীরা ছোটো-ছোটো গোষ্ঠীতে বিভাজিত হতে থাকেন, যদিও তাঁদের শিল্প ও সাহিত্যধারা ছিল একই । পরে আন্দোলনে যোগ দেন জোয়ান মিরো, রেমণ্ড কোয়েনু, ম্যাক্স মোরিজ, পিয়ের নাভিল, জাক আঁদ্রে বোইফার, গেয়র্গে মালকাইন প্রমুখ । জিয়োর্জিও দে চিরোকো এবং পাবলো পিকাসো অনেক সময়ে গোষ্ঠির কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন, তবে আন্দোলনের ঘোষিত সদস্য ছিলেন না।

    সুররিয়ালিজম বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য ডাডাইজম থেকে নিলেও এই মতবাদটি, যে,  ‘শিল্পের উৎস ও উপকরণ’ বিবেচনায় একটি অন্যটির চেয়ে স্বতন্ত্র্য। সুররিয়ালিজম আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন ফরাসি কবি আঁদ্রে ব্রেতঁ। তিনি শিল্প রচনায় ‘অচেতন মনের ওপর গুরুত্ব’ দেওয়ার জন্যে শিল্পীদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি মনে করতেন, ‘অচেতন মন হতে পারে কল্পনার অশেষ উৎস।’ তিনি অচেতন মনের ধারণাটি নিঃসন্দেহে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। ডাডাবাদী শিল্পীরা শিল্পের উৎস ও উপকরণ আহরণে ‘অচেতন’ মনের ধারণা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না। সুররিয়ালিস্ট শিল্পীরা এসে অচেতন মনের উৎস থেকে শিল্প রচনার প্রতি গুরুত্ব দেন এবং সফলতাও লাভ করেন।

    আঁদ্রে ব্রেতঁ মনে করতেন, ‘যা বিস্ময়কর, তা সবসময়ই সুন্দর’। অচেতন মনের গহীনেই বিস্ময়কর সুন্দরের বসবাস। তার সন্ধান করাই সাহিত্যিক-শিল্পীর যথার্থ কাজ। অচেতন মনের কারণেই সুররিয়ালিজমের কবি-শিল্পীরা গভীর আত্মঅনুসন্ধানে নামেন। মনের গহীন থেকে স্বপ্নময় দৃশ্যগুলো হাতড়ে বের করতে এবং মনের অন্তর্গত সত্য উন্মোচনে তাঁরা আগ্রহী ছিলেন। যার কারণে চেতন ও অচেতনের মধ্যে শিল্পীরা বন্ধন স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুররিয়ালিস্ট শিল্পীরা অচেতন মনের সেই সব উপলব্ধিকে দৃশ্যে রূপ দিলেন যা পূর্বে কেউ কখনো করেনি। অচেতনের ভূমিতে দাঁড়িয়ে বাস্তব উপস্থাপনের কারণে খুব দ্রুতই এ মতবাদটি বিশ্ব শিল্পকলায় ‘অভিনবত্ব’ যোগ করতে সমর্থ হয়। এমনকী, পুঁজিবাদ-বিরোধী এই আন্দোলন থেকে উপকরণ সংগ্রহ করেছেন বহু বিখ্যাত বিজ্ঞাপন কোম্পানি ।

    সুররিয়ালিজমকে ‘নির্দিষ্ট’ ছকে ফেলা কঠিন। সুররিয়ালিস্ট শিল্পীরা একই ছাতার নিচে বসবাস করে ছবি আঁকলেও এবং কবিতা লিখলেও, তাঁদের দৃষ্টি ও উপলব্ধির মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। ফলে এ মতবাদটি সম্পর্কে প্রত্যেকে ব্যাক্তিগত ভাবনা ভেবেছেন। ১৯২৯ সালে সালভাদর দালি এই আন্দোলনে যোগ দেন, যদিও তাঁর সঙ্গেও ব্রেতঁর বনিবনা হতো না । সালভাদর দালি মনে করতেন, ‘সুররিয়ালিজম একটি ধ্বংসাত্মক দর্শন এবং এটি কেবল তা-ই ধ্বংস করে যা দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ রাখে।’ অন্যদিকে জন লেলন বলেছেন, ‘সুররিয়ালিজম আমার কাছে বিশেষ প্রভাব নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। কেননা, আমি উপলব্ধি করেছিলাম আমার কল্পনা উন্মাদনা নয়। বরং সুররিয়ালিজমই আমার বাস্তবতা।’ ব্রেতোঁ বলতেন, ‘ভাবনার যথাযথ পদ্ধতি অনুধাবনের জন্যে সুররিয়ালিজম আবশ্যক।’ এ ধারায় স্বপ্ন ও বাস্তবতার মিশ্রণ হয় বলে সুররিয়ালিজমকে স্বপ্নবাস্তবতাও বলা হয়ে থাকে।

    সুররিয়ালিজমের ঢেউ খুব অল্প সময়েই শিল্পের সবগুলো শাখায় আছড়ে পড়ে। কবিতা, গান থেকে শুরু করে নাটক, সিনেমা পর্যন্ত সুররিয়ালিস্টদের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত সুররিয়ালিজম ধারায় অন্তত ছয়টি সিনেমা নির্মিত হয়। এ ধারার প্রধান শিল্পীরা হলেন জ্যাঁ আর্প, ম্যাক্স আর্নেস্ট, আঁদ্রে মেসন, সালভাদর দালি, রেনে ম্যাগরেট, পিয়েরো রয়, জোয়ান মিরো, পল ডেলভাক্স, ফ্রিদা কাহলো প্রমুখ। এ ধারার চিত্রকর্মের মধ্যে ১৯৩১ সালে আঁকা সালভাদর দালির ‘দ্য পারসিসটেন্স অব মেমোরি’ সবচেয়ে আলোচিত ছবি। এটি কেবল এ ধারার মধ্যেই আলোচিত চিত্রকর্মই নয়, এটি দালিরও অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভার নিদর্শন। ‘দ্য পারসিসটেন্স অব মেমোরি’-তে দালি ‘সময়ের’ বিচিত্র অবস্থাকে ফ্রেমবন্দি করতে চেষ্টা করেছেন। ‘মেটামরফসিস অব নার্সিসাস’, ‘নভিলিটি অব টাইম’, ‘প্রোফাইল অব টাইম’ প্রভৃতি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

    সুররিয়ালিজম ধারার প্রধানতম চিত্রকর্মের মধ্যে রেনে ম্যাগরেটের ‘দ্য সন অব ম্যান’, ‘দিস ইজ নট এ পাইপ’, জর্জিও দি চিরিকো-এর ‘দ্য রেড টাওয়ার’, ম্যাক্স আর্নেস্টের ‘দি এলিফ্যান্ট সিলিবেস’, ইভ তঁগির ‘রিপ্লাই টু রেড’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে সুররিয়ালিজম আন্দোলন থেমে যায়। শিল্পবোদ্ধারা মনে করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের মধ্য দিয়ে এ আন্দোলনটির অনানুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটে। কিন্তু অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্প আন্দোলনের মতো সুররিয়ালিজমের চর্চা বর্তমানেও হচ্ছে। বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনেও সুররিয়ালিজমের প্রভাব লক্ষ করা যায়।  ১৯২৪ সালে প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টো । মার্কসবাদের সঙ্গে আর্তুর র‌্যাঁবোর আত্মপরিবর্তনের ভাবনাকে একত্রিত করার উদ্দেশে ব্রেতঁ ১৯২৭ সালে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন । কিন্তু সাম্যবাদীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বেশিদিন টেকেনি । সেখান থেকেও তিনি ১৯৩৩ সালে বিতাড়িত হন । পরাবাস্তববাদীদের “উন্মাদ প্রেম” তত্বটি ব্রেতঁর এবং “উন্মাদ প্রেম” করার জন্য বেশ কিছু তরুণী সুররিয়ালিস্টদের প্রতি আকৃষ্ট হন । যৌনতার স্বেচ্ছাচারিতার ঢেউ ওঠে সাহিত্যিক ও শিল্পী মহলে ; পরাবাস্তববাদীদের নামের সঙ্গে একজন বা বেশি নারীর সম্পর্ক ঘটে এবং সেই নারীরা তাঁদের পুরুষ প্রেমিকদের নামেই খ্যাতি পেয়েছেন । 

    তাঁর রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং অন্যান্য কারণে প্রেভের, বারোঁ, দেসনস, লেইরিস, লিমবোর, মাসোঁ, কোয়েন্যু, মোরিস, বোইফার সম্পর্কচ্ছদ করেন ব্রেতঁর সঙ্গে এবং গেয়র্গে বাতাইয়ের নেতৃত্বে পৃথক গোষ্ঠী তৈরি করেন । এই সময়েই, ১৯২৯ নাগাদ, ব্রেতঁর গোষ্ঠীতে যোগ দেন সালভাদর দালি, লুই বুনুয়েল, আলবের্তো জিয়াকোমেত্তি, রেনে শার এবং লি মিলার । ত্রিস্তঁ জারার সঙ্গে ঝগড়া মিটমাট করে নেন ব্রেতঁ । দ্বিতীয় সুররিয়ালিস্ট ইশতাহার প্রকাশের সময়ে তাতে সই করেছিলেন আরাগঁ, আর্নস্ট, বুনুয়েল, শার, ক্রেভাল, দালি, এলুয়ার, পেরে, টাঙ্গুই, জারা, ম্যাক্সিম আলেকজান্দ্রে, জো বনসকোয়েত, কামিলে গোয়েমানস, পল নুগ, ফ্রান্সিস পোঙ্গে, মার্কো রিসটিচ, জর্জ শাদুল, আঁদ্রে তিরিয়ঁ এবং আলবেয়ার ভালেনতিন । ফেদেরিকো গারথিয়া লোরকা বন্ধু ছিলেন সালভাদর দালি এবং লুই বুনুয়েলের, আলোচনায় অংশ নিতেন, কিন্তু সুররিয়ালিস্ট গোষ্ঠিতে যোগ দেননি । ১৯২৯ সালে তাঁর মনে হয়েছিল যে দালি আর বুনুয়েলের ফিল্ম “একটি আন্দালুসিয় কুকুর” তাঁকে আক্রমণ করার জন্যে তৈরি হয়েছিল ; সেই থেকে তিনি সুররিয়ালিস্টদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন । আরাগঁ ও জর্জ শাদুল ব্রেতঁ’র গোষ্ঠী ত্যাগ করেছিলেন রাজনৈতিক মতভেদের কারণে, যদিও ব্রেতঁ বলতেন যে তিনিই ওনাদের তাড়িয়েছেন ।

    ১৯৩০ সালে কয়েকজন পরাবাস্তববাদী আঁদ্রে ব্রেতঁ’র একচেটিয়া নেতৃত্বে বিরক্ত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে একটি প্যামফ্লেট ছাপিয়েছিলেন । পরাবাস্তববাদ আন্দোলন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় । ১৯৩৫ সালে ব্রেতঁ এবং সোভিয়েত লেখক ও সাংবাদিক ইলিয়া এরেনবার্গের মাঝে ঝগড়া এমন স্তরে গিয়ে পৌঁছোয় যে প্যারিসের রাস্তায় তাঁদের দুজনের হাতাহাতি আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল । এরেনবার্গ একটি পুস্তিকা ছাপিয়ে বলেছিলেন যে পরাবাস্তববাদীরা পায়ুকামী । এর ফলে পরাবাস্তববাদীদের ইনটারন্যাশানাল কংগ্রেস ফর দি ডেফেন্স অফ কালচার সংস্হা থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল । সালভাদর দালি বলেছিলেন যে পরাবাস্তববাদীদের মধ্যে প্রকৃত সাম্যবাদী হলেন একমাত্র রেনে ক্রেভাল । চটে গিয়ে ক্রেভালকে পরাবাস্তববাদী আন্দোলন থেকে বের করে দ্যান ব্রেতঁ । অঁতনা অতো, ভিত্রাক এবং সুপোকে পরাবাস্তববাদী দল থেকে বের করে দ্যান ব্রেতঁ, মূলত সাম্যবাদের প্রতি ব্রেতঁর আত্মসমর্পণের কারণে এই তিনজন বিরক্ত বোধ করেন ।

    ১৯৩৮ সালে ব্রেতঁ মেকসিকো যাবার সুযোগ পান এবং লিও ট্রটস্কির সঙ্গে দেখা করেন । তাঁর সঙ্গে ছিলেন দিয়েগো রিভেরা ও ফ্রিদা কালহো । ট্রটস্কি এবং ব্রেতঁ একটা যুক্ত ইশতাহার প্রকাশ করেছিলেন, “শিল্পের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা” শিরোনামে । লুই আরাগঁর সঙ্গেও ব্রেতঁর সম্পর্ক ভালো ছিল না । ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ পর্যন্ত ডাডাবাদীদের সঙ্গে আন্দোলন করার পর ১৯২৪ সালে আরাগঁ যোগ দেন পরাবাস্তববাদী আন্দোলনে । অন্যান্য ফরাসী পরাবাস্তববাদীদের সঙ্গে তিনিও ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দ্যান এবং পার্টির পত্রিকায় কলাম ও রাজনৈতিক কবিতা লিখতেন । আরাগঁর সঙ্গে ব্রেতঁর বিবাদের কারণ হল ব্রেতঁ চেয়েছিলেন ট্রটস্কির সঙ্গী ভিকতর সার্জকে সন্মানিত করতে । পরবর্তীকালে, ১৯৫৬ নাগাদ, সোভিয়েত রাষ্ট্র সম্পর্কে নিরাশ হন আরাগঁ, বিশেষ করে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বিংশ কংগ্রেসের পর যখন নিকিতা ক্রুশ্চভ আক্রমণ করেন জোসেফ স্তালিনের ব্যক্তিত্ববাদকে । তা সত্ত্বেও স্তালিনপন্হী আরাগঁ ও ট্রটস্কিপন্হী ব্রেতঁর কখনও মিটমাট হয়নি । কাট-আপ কবিতার জনক ব্রায়ন জিসিনকেও গোষ্ঠী থেকে বিতাড়ন করেন ব্রেতঁ ; ব্রায়ান জিসিনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ছিলেন বিট ঔপন্যাসিক উইলিয়াম বারোজ । বিট আন্দোলনের প্রায় সকলেই সুররিয়ালিজম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন । বিটদের যৌন স্বাধীনতার ভাবনা-চিন্তায় সুররিয়ালিস্টদের অবদান আছে ।

    পরাবাস্তববাদই সম্ভবত প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন, যেখানে নারীকে দূরতম কোনো নক্ষত্রের আলোর মতো, প্রেরণা ও পরিত্রাণের মতো, কল্পনার দেবী প্রতিমার মতো পবিত্র এক অবস্থান দেওয়া হয়েছিল। নারী তাদের চোখে একই সঙ্গে পবিত্র কুমারী, দেবদূত আবার একই সঙ্গে মোহিনী জাদুকরী, ইন্দ্রিয় উদ্দীপক ও নিয়তির মতো অপ্রতিরোধ্য। ১৯২৯ সালে দ্বিতীয় সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টোয় আদ্রেঁ ব্রেতঁ নারীকে এরকম একটি অপার্থিব অসীম স্বপ্নিল চোখে দেখা ও দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। পুরুষ শিল্পীদের প্রেরণা, উদ্দীপনা ও কল্পনার সুদীর্ঘ সাম্পান হয়ে এগিয়ে আসবেন নারীরা। হয়ে উঠবেন পুরুষদের আরাধ্য ‘মিউজ’ আর একই সঙ্গে femme fatale। সুদৃশ্য উঁচু পূজার বেদি উদ্ভাসিত করে যেখানে বসে থাকবেন নারীরা। তাঁদের স্বর্গীয় প্রাসাদে আরো সৃষ্টিশীল হয়ে উঠবে পুরুষ।

    ব্রেতঁ ছিলেন সেই সময়ের কবিতার অন্যতম প্রধান পুরুষ। তাঁর সম্মোহক ব্যক্তিত্বে আচ্ছন্ন হননি তাঁর সান্নিধ্যে এসেও – এরকম কোনো দৃষ্টান্ত কোথাও নেই। উজ্জ্বল, সাবলীল, মেধাবী, স্বতঃস্ফূর্ত এবং নায়কসুলভ ব্রেতঁ একই সঙ্গে ছিলেন উদ্ধত, আক্রমণাত্মক ও অহমিকাপূর্ণ। নিজের তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে মাঝেমধ্যেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যেতেন। কিন্তু যদি তাঁর একবার মনে হতো যে কেউ তাঁর প্রভুত্বকে অগ্রাহ্য করছে, সর্বশক্তি দিয়ে তাকে আঘাত করতেন। নেতৃত্ব দেওয়ার সব গুণ প্রকৃতিগতভাবেই ছিল তাঁর মধ্যে। মহিলাদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার ছিল তরুণ প্রেমিকের মতো সম্ভ্রমপূর্ণ। তাঁর আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি, অভিজাত ভাষা – এসবের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই মেজাজ হারিয়ে সম্পূর্ণ লাগামহীন হয়ে পড়া আর দুর্বোধ্য জটিল মানসিকতার জন্য পারতপক্ষে অনেকেই ঘাঁটাতে চাইতেন না তাঁকে।

    নারী পরাবাস্তববাদীদের সংখ্যা কম ছিল না । কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে উল্লেখ্য ফ্রিদা কাহলো, আসে বার্গ, লিজে দেহামে, আইরিন হামোয়ের, জয়েস মানসোর, ওলগা ওরোজকো, আলেহান্দ্রা পিৎসারনিক, ভ্যালেনটিন পেনরোজ, জিসেল প্রাসিনস, ব্লাঙ্কা ভারেলা, ইউনিকা জুর্ন প্রমুখ । নারী চিত্রকররা সংখ্যায় ছিলেন বেশি । তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য গেরট্রুড আবেরকমবি, মারিয়ন আদনামস, আইলিন ফরেসটার আগার, রাশেল বায়েস, ফ্যানি ব্রেনান, এমি ব্রিজওয়াটার, লেনোরা ক্যারিংটন, ইথেল কলকুহুন, লেনোর ফিনি, জেন গ্রাভেরোল, ভ্যালেনটিন য়োগো, ফ্রিদা খাহলো, রিটা কার্ন-লারসেন, গ্রেটা নুটসন ( ত্রিস্তঁ জারার স্ত্রী ), জাকেলিন লামবা ( আঁদ্রে ব্রেতঁ’র স্ত্রী), মারুহা মালো, মার্গারেট মডলিন, গ্রেস পেইলথর্প, অ্যালিস রাহোন, এডিথ রিমিঙটন, পেনিলোপি রোজমন্ট, কে সেজ ( ইভস তাঙ্গুইর স্ত্রী ), ইভা স্বাঙ্কমাজেরোভা, ডরোথি ট্যানিঙ ( ম্যাক্স আর্নস্টের স্ত্রী ), রেমেদিওস ভারো ( বেনিয়ামিন পেরের স্ত্রী ) প্রমুখ । ভাস্করদের মধ্যে উল্লেখ্য এলিজা ব্রেতঁ ( আঁদ্রে ব্রেতঁ’র তৃতীয় স্ত্রী ), মেরে ওপেনহাইম ( মান রে’র মডেল ছিলেন ) এবং মিমি পারেন্ট । ফোটোগ্রাফারদের মধ্যে উল্লেখ্য ছিলেন ক্লদ কাহুন, নুশ এলুয়ার, হেনরিয়েতা গ্রিনদাত, আইডা কার, দোরা মার ( পাবলো পিকাসোর সঙ্গে নয় বছর লিভ টুগেদার করেছিলেন ), এমিলা মেদকোভা, লি মিলার, কাতি হোরনা প্রমুখ । পুরুষ পরাবাস্তববাদীদের বহু ফোটো এই নারী ফোটোগ্রাফারদের কারণেই ইতিহাসে স্হান পেয়েছে ।


     

    নারীদের নিয়ে পরাবাস্তববাদীদের এই স্বপ্নিল কাব্যময় উচ্ছ্বাস জোরালো একটা ধাক্কা খেল যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পশ্চিম ইউরোপে দ্রম্নত বদলাতে থাকা পরিস্থিতির ভস্ম ও শোণিত স্নাত শোণিত আত্মশক্তিসম্পন্ন নারীরা তাঁদের ভারী বাস্তবতা নিয়ে এসে দাঁড়ালেন সামনে। স্বপ্নে দেখা নারীর আয়না-শরীর ভেঙে পড়ল ঝুরঝুর করে আর বেরিয়ে এলো মেরুদ-সম্পন্ন রক্তমাংসের মানবী। সুররিয়ালিজম চেয়েছিল পুরুষের নিয়ন্ত্রণে নারীদের মুক্তি। কিন্তু যে গভীর অতলশায়ী মুক্তি দরজা খুলে দিলো নারীদের জন্য, সুররিয়ালিজম তার জন্য তৈরি ছিল না। মৃত অ্যালবাট্রসের মতো এই বিমূর্ত আদর্শায়িত ধারণা নারী শিল্পীদের গলায় ঝুলে থেকেছে, যাকে ঝেড়ে ফেলে নিজস্ব শিল্পসত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করা দুঃসাধ্য ছিল। সময় লেগেছে সাফল্য পেতে। কিন্তু দিনের শেষে হেসেছিলেন তাঁরাই। এমন নয় যে, পরাবাস্তবতার প্রধান মশালবাহক ব্রেতঁ চাইছিলেন যে পুরুষরাই হবেন এই আন্দোলনের ঋত্বিক আর দ্যুতিময় নারী শিল্পী এবং সাহিত্যিকদের কাজ হবে মুগ্ধ সাদা পালক ঘাসের ওপরে ফেলে যাওয়া এবং আকর্ষণীয় ‘গুজব’ হিসেবে সুখী থাকা। ১৯২৯ সালে দ্বিতীয় সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশের পরবর্তী প্রদর্শনীগুলোতে নারী শিল্পীরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু পুরুষ উদ্ভাবিত পরাবাস্তবতা থেকে তাঁদের ভাষা, স্বর ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বতন্ত্র। নিজেদের ভারী অসিত্মত্ব, শরীরী উপস্থিতি জোরালোভাবে জায়গা পেল তাঁদের ছবিতে।

    কিন্তু নারী শিল্পীদের কাছে আত্মপ্রতিকৃতি হয়ে উঠল একটি সশস্ত্র ভাষার মতো। নিজস্ব গোপন একটি সন্ত্রাসের মতো। এই আন্দোলনের মধ্যে নারীরা এমন এক পৃথিবীর ঝলক দেখলেন, যেখানে আরোপিত বিধিনিষেধ না মেনে সৃজনশীল থাকা যায়, দমচাপা প্রতিবাদের ইচ্ছেগুলোর উৎস থেকে পাথরের বাঁধ সরিয়ে দেওয়া যায়। নগ্ন ও উদ্দাম করা যায় কল্পনাকে। নোঙর নামানো জাহাজের মতো অনড় ও ঠাসবুনট একটি উপস্থিতি হয়ে ছবিতে নিজের মুখ তাঁদের কাছে হয়ে উঠল অন্যতম প্রধান আইকন। যে ছবি আত্মপ্রতিকৃতি নয়, সেখানেও বারবার আসতে থাকল শিল্পীর শরীরী প্রতিমা। ফ্রিদা কাহ্লোর (১৯০৭-৫৪) ক্যানভাস তাঁর যন্ত্রণাবিদ্ধ শান্ত মুখশ্রী ধরে রাখল। মুখের বিশেষ কিছু চিহ্ন যা তাঁকে চেনায় – যেমন পাখির ডানার মতো ভুরু, আমন্ড আকারের চোখ ছবিতেও আনলেন তিনি। রিমেদিওস ভারোর (১৯০৮-৬৩) ছবিতে পানপাতার মতো মুখ, তীক্ষন নাক, দীর্ঘ মাথাভর্তি চুলের নারীর মধ্যে নির্ভুল চেনা গেল শিল্পীকে। আবার লিওনর ফিনির (১৯১৮-৯৬) আঁকা নারীরা তাদের বেড়ালের মতো কালো চোখ আর ইন্দ্রিয়াসক্ত মুখ নিয়ে হয়ে উঠল ফিনিরই চেনা মুখচ্ছবি। ১৯৩৯ সালের ‘The Alcove : An interior with three women’ ছবিতে ভারী  পর্দা টাঙানো ঘরে দুজন অর্ধশায়িত মহিলা পরস্পরকে ছুঁয়ে আছেন। আর একজন মহিলা দাঁড়িয়ে। তিনজনেই যেন কোনো কিছুর প্রতীক্ষা করছেন চাপা উদ্বিগ্ন মুখে। যে তিনজন নারীর ছবি, তাঁরা যে লিওনর ফিনি, লিওনারা ক্যারিংটন এবং ইলিন অগার – এটা ছবিটিকে একঝলক দেখেই চেনা যায়। এমনকি যখন অন্য কোনো নারীর প্রতিকৃতি আঁকছেন তাঁরা, সেখানেও তাঁদের বিদ্রোহের অস্বীকারের জোরালো পাঞ্জার ছাপ এই শিল্পীরা সেইসব নারীর মুখে ঘন লাল নিম্নরেখা দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন


     

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হতে ১৯৩৯ সালে অধিকাংশ পরাবাস্তববাদী বিদেশে পালিয়ে যান এবং তাঁদের মধ্যে আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও বক্তব্য নিয়ে খেয়োখেয়ি বেধে যায় । অলোচকরা মনে করেন যে গোষ্ঠী হিসাবে পরাবাস্তববাদ ১৯৪৭ সালে ভেঙে যায়, প্যারিসে “লে সুররিয়ালিজমে” প্রদর্শনীর পর । যুদ্ধের শেষে, প্যারিসে ব্রেতঁ ও মার্সেল দ্যুশঁ’র ফিরে আসার পর প্রদর্শনীর কর্তারা সম্বর্ধনা দিতে চাইছিলেন কিন্তু পুরোনো পরাবাস্তববাদীরা জানতে পারলেন যে একদল যুবক পরাবাস্তববাদীর আবির্ভাব হয়েছে, যাঁরা বেশ ভিন্ন পথ ধরে এগোতে চাইছেন । যুবকদের মধ্যে উল্লেখ্য ছিলেন ফ্রাঁসিস বেকঁ, আলান দাভি, এদুয়ার্দো পোলোৎসি, রিচার্ড হ্যামিলটন প্রমুখ ।

    সুররিয়ালিজমের উদ্ভব সত্ত্বেও ডাডার প্রভাব কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি, তা প্রতিটি দশকে কবর থেকে লাফিয়ে ওঠে, যেমন আর্পের বিমূর্ততা, শুইটারের নির্মাণ, পিকাবিয়ার টারগেট ও স্ট্রাইপ এবং দ্যুশঁ’র রেডিমেড বস্তু বিশ শতকের শিল্পীদের কাজে ও আন্দোলনে ছড়িয়ে পড়ছিল । স্টুয়ার্ট ডেভিসের বিমূর্ততা থেকে অ্যান্ডি ওয়ারহলের পপ আর্ট, জাসপার জনসের টারগেট ও ফ্ল্যাগ থেকে রবার্ট রাউশেনবার্গের কোলাঝে -- সমসাময়িক সাহিত্য ও শিল্পের যেদিকেই তাকানো হোক পাওয়া যাবে ডাডার প্রভাব, সুররিয়ালিজমের উপস্হিতি । ১৯৬৬ সালে মৃত্যুর আগে, ব্রেতঁ লিখেছিলেন, “ডাডা আন্দোলনের পর আমরা মৌলিক কিছু করিনি । ডাডা ও সুররিয়ালিজম আন্দোলনকারীদের ওপর প্রচুর চাপ সৃষ্টি করেছিল এবং কয়েকজন আত্মহত্যা করেন, যেমন জাক রিগো, রেনে ক্রেভেল, আরশাইল গোর্কি, অসকার দোমিংগেজ প্রমুখ । অত্যধিক মাদক সেবনে মৃত্যু হয় গিলবার্ত লেকঁতে ও অঁতনা আতোর ।

  • মলয় রায়চৌধুরী | 27.58.255.50 | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৯:৩০734848
  • হাংরি আন্দোলন-এর অশ্লীলতা বিষয়ক ইশতাহার


     

    [ ১৯৬৫ সালে ফালিকাগজের বুলেটিনে প্রকাশিত ]

    আমি অশ্লীলতা সমর্থন করি ।

    আমি ততদিন ওব্দি অশ্লীলতা সমর্থন করব, যতদিন ওইসব দুর্বৃত্ত অভিজাতরা তাদের পৈতৃক উৎকর্ষের নকল উৎসবের দাবি করতে থাকবে ।

    আসলে অশ্লীলতা বলে কিছু নেই । 

    অশ্লীলতা একটা নকল ধারণা, বানানো, উদ্ভাবিত,

    তৈরি-করা,

    নির্মিত

    একদল অশিক্ষিত শ্রেণি-সচেতন ষড়যন্ত্রীর দ্বারা ; প্রতিষ্ঠানের অভিজাত শকুন দ্বারা, নিচুতলার থ্যাঁতলানো মানুষদের টাকাপুঁজ খেয়ে যারা গরম থাকে ; সেইসব মালকড়ি-মালিক জানোয়ারদের দ্বারা, যারা ঠাণ্ডা মাথায় এই নিচুতলার গরম হল্কার ওপরে একচোট মুরুব্বিগিরি করে ।

    তাদের শ্রেণিগত সংস্কৃতি বাঁচাতে,

    টাকাকড়ির সভ্যতাকে চালু রাখতে,

    ঘৃণাভুতের পায়ে সৌরসংসারকে আছড়ে ফেলতে ।

    সমাজের মালিকরা একটা নকল নুলো ভাষা তৈরি করে, নিচু শ্রেণির শব্দাবলীকে অস্বীকার করতে চায় যাতে বিভেদ রেখাটা পরিষ্কার থাকে ।


     

    শব্দ আসলে শব্দ আসলে শব্দ আসলে শব্দ আর আমি অভিব্যক্তির কোনোরকম শ্রেণিবিভাগ হতে দেবো না । শুধুমাত্র এই অজুহাতে যে কোনো শব্দ, অভিব্যক্তি, গালাগালি, বাক্য বা উক্তি এক বিশেষ শ্রেণি/গোষ্ঠী/জাত/এলাকা/সম্প্রদায় কর্তৃক ব্যবহৃত, আমি কাউকে তা অস্বীকার, পরিত্যাগ, অগ্রাহ্য, প্রত্যাখ্যান করতে দেবো না ।

    একটা শব্দ হলো ফাঁকা আধার যা ভরাট হবার জন্যে অপেক্ষমান ।

    সেই সমাজ, যেখানে দুটো ভিন্ন আর্থিক শ্রেণির জন্যে দুরকম শব্দাবলী, তা অসুস্হ আর বিষাক্ত।

    অশ্লীলতাকে প্রশ্রয় দেবো কেননা ভাষার মধ্যেকার শ্রেণিবিভাগ আমি নষ্ট ও ধ্বংস করে দেবো ।

    তুমি যদি একজন অ্যাকাডেমিক মূর্খ হও এবং আমার কথায় তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না, তাহলে কলকাতার একজন রক্তপায়ী বাবুকে ধানবাদে নিয়ে গিয়ে সবচেয়ে পরিষ্কার খনিশ্রমিকের মাদুরে শুইয়ে দাও। সে তাকে মনে করবে অশ্লীল, ইতর, অসহ্য, এবং সমাজবিরোধী । সেই লোকটাকেই বম্বে বা প্যারিসে নিয়ে গিয়ে কোনো কেউকেটা রাজকুমার বা আলিখান বা বড়োসায়েবের পাশে শুইয়ে দাও ; সে তার শিরদাঁড়ার পায়ুবৃন্ত পর্যন্ত আহ্লাদে ডগমগ করে উঠবে :

    ঘৃণা

    অভিজাত মগজবাক্যে তরল ভ্যামপায়ার গড়ে তোলে কেননা ইশ্বরগোবর এই সফেদ কলারদের সর্বদা ভয়, এই বুঝি মানব সভ্যতাকে লোটবার তাদের অধিকার ও সুবিধা শেষ হয়ে গেল ।

    অশ্লীলতা অভিজাতদের সংস্কার যারা নিচুতলার উন্নত সংস্কৃতির কৃষ্টি-আক্রমণকে ভয় পায় ।


     

    আসলে অশ্লীলতা হচ্ছে বুর্জোয়াদের বাড়িতে বানানো আত্মাপেষাই মেশিন ।

    ঠিক যেমন তারা বানিয়েছে যুদ্ধ

    গণহত্যা

    বাধ্যতামূলক সৈন্যভর্তি

    পুলিশের অত্যাচার কুঠরি

    এবং আণবিক বোমা

    নিজেদের লোকেদের ক্ষমতায় রাখতে

    পৃথিবীর সমস্ত স্বর্ণপায়খানাকে তাদের পেটে ভরে নিতে

    তাদের বিরোধীদের নিশ্চিহ্ণ করতে

    মধ্যবিত্তের থুতুতে একদল সফেদকলার সৈন্য ডুবিয়ে রাখতে ।

    আমি এদের চাই না

    এই পোকাদের

    আমি চাই পিটুইটারি আত্মাসুদ্দু মানুষ ।

    একজন বুর্জোয়া সবসময় একজন ফ্যাসিস্ট বা একজন

    কম্যুনিস্ট বা একজন প্রতিক্রিয়াশীল

    কিন্তু কখনও মানুষ নয় ।


     

    অভিজাতের কাছে নিচুতলার ভাষা অশ্লীল । অভিজাতের কাছে তার নিজের ভাষা মানে শিল্প।

    বুর্জোয়ারা মনে করে নিচুতলার ভাষা ব্যবহার করলে মানুষ এবং সমাজ ‘কলুষিত ও বিকৃত’ হয়, কেন না তারা ভালো করেই জানে যে, এই ধরণের বুজরুকি ছাড়া তাদের সমাজ-সংস্কৃতি বেশিদিন টিকবে না।

    এই ষড়যন্ত্র এক্কেবারে কাণ্ডজ্ঞানহীন ।

    সমগ্র সমাজের সাধারণ ভাষায় কথা বলা এবং লেখা যদি কলুষিত ও বিকৃত করা হয়,

    তাহলে আমি মানুষকে কলুষিত ও বিকৃত করে প্রকৃতিস্হ করব ।

    মানুষের তাবৎ শব্দাবলী যতক্ষণ না গ্রহণযোগ্য হয়, আমি অশ্লীলতা সমর্থন করব । আমি চাই কবিতাকে জীবনে ফিরিয়ে দেয়া হোক ।

    আমি ইচ্ছে করে তেমন লেখা লিখবো, যাকে বুর্জোয়ারা অশ্লীল মনে করে, কেন না আমি তাদের হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে বাধ্য করব তাদের ওই নকল উৎকর্ষের বিভেদ ভেঙে ফেলতে । আর এর জন্যে কলকাতার কম্যুনিস্ট বুর্জোয়া, প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া এবং ফ্যাসিস্ট বুর্জোয়া আমার বিরুদ্ধে একজোট হয়ে আমায় তাদের জেলখানায় ঢুকিয়ে দিলেও কিছু এসে যায় না ।

    মানুষ ও মানুষের মধ্যে পার্থিব দখলিসত্তের ভিত্তিতে কোনো তফাত করতে দেবো না ।

    পৈতৃক রুপোর চামচে করে সমাজের একটা অংশ কিছু শব্দকে খায় বলে, আমি তাদের উন্নত মনে করি না ।


     

    যে সমাজে পার্থিব দখলিসত্তের ভিত্তিতে মানুষে-মানুষে তফাত, সেখানে যৌনতা পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত।

    সেক্স পুঁজিরুপে ব্যবহৃত ।

    বুর্জোয়া-অত্যাচারিত সমাজ একটা বেবুশ্যেঘর,

    কিন্তু কেন যৌনতা পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত ?

    কেননা পৃথিবীতে যৌনতাই একমাত্র ব্যাপার যাতে ক্ষুদ্রতা নেই

    সংস্কৃতির

    ঐতিহ্যের

    ধর্মের, জাতির

    ঐশ্বর্যের

    দেশের, প্রথার, সংস্কারের এবং আইনের ।

    অবচেতনার টুঁটি চেপে ধরার জন্যেই যৌনতাকে পুঁজি করা হয় ।

    যৌনমাংসের তেল-তেল গন্ধ ছাড়া  এই সমাজে কোনো বিজ্ঞাপন সফল নয় এবং কোও কাজই টকটকে যোনির ফাঁদ না পেতে করিয়ে নেয়া সম্ভব নয় । প্রতিটি পদক্ষেপে অবশ্যম্ভাবী যৌনজাল কেননা এই সমাজ-ব্যবস্হা ক্রেতা-বিক্রেতার তৈরি ।

    মানুষ এবং/অথবা মানুষী এই সংস্কৃতিতে হয়ে ওঠে প্রতীক বা বস্তু, অর্থাৎ জীবন বদলে যায় ‘জিনিস’-জড়পদার্থে ।

    যৌনজীবন যদি হয়ে ওঠে সহজ সরল স্বাভাবিক, তাহলে এই সিঁড়ি-বিভাজিত সংস্কৃতি ধ্বসে পড়বে, আর ওই সুবিধা-লোটার-দল তাদের ফাঁপা অন্তর্জগতের মুখোমুখি হয়ে পড়বে ।

    তাই জন্যে যৌনতার র‌্যাশনিং

    তাইজন্যে ধীরেসুস্হে যৌনবিষের ফেনা

    তাইজন্যে পরিপূর্ণ যৌন-উপলব্ধি বারণ

    তাইজন্যে যৌনতাকে স্বাভাবিক করতে দেয়া হবে না,

    তাই জন্যে পুঁজি ছাড়া অন্য কোনো রকমভাবে যৌনতাকে প্রয়োগ করতে দেয়া হয় না : কবিতায় তো কখনই নয় : কেননা কবিতার সঙ্গে কিছুই প্রতিযোগিতা করতে পারে না ।

    শৈশব থেকেই সমাজের প্রতিটি ও তাবৎ মস্তিষ্ককে ভুল শিক্ষায় ভ্রষ্ট করা হয়, এবং এই নষ্টামিকে বলা হয় নৈতিকতা । শাসনকারী বুর্জোয়া সম্্রদায় জানে যে যতদিন এই অসুখকে নীতিজ্ঞান বলে চালানো যায়, আর যে কোনোভাবে মধ্যবিত্তের ভেতরে এটা ছড়িয়ে দেয়া যায়, তাদের কর্তৃত্ব বহাল থাকবে ।


     

    উচ্চবিত্ত টাকা-খুনিরা সাহিত্যে যৌনতার অন্য প্রয়োগ অশ্লীল ঘোষণা করবে, কেন না আইনগত ও সামাজিক উপায়ে তারা জঘন্য হিংস্রতায় নিজের শত্রুদের নিশ্চিহ্ণ করবে যাতে যৌনতাকে পুঁজি ছাড়া অন্য উপায়ে ব্যবহার করা না হয় ।

    বুর্জোয়ারা যাকে অশ্লীল বলে, আমি ইচ্ছে করে তাইই লিখবো, যাতে যৌনতাকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের ব্যাপারটা ধ্বংস ও ছারখার করে দিতে পারি ।

    যৌনতা মানবিক ;

    মেধাশক্তিই অনাক্রম্য ; যা অনাক্রম্য তা নীতিজ্ঞান ।

    আমি যৌনতাকে ‘জিনিস’ হিসেবে প্রয়োগ করতে দেবো না । সেনসর পদ্ধতি সেই ভয় থেকে জন্মায় যাকে নীৎশে বলেছেন ‘যূথের নীতিজ্ঞান’ ।

    বুর্জোয়াদের দাবি যে, কোনো বই বা কবিতা পড়ে মানুষ ও সমাজ ‘কলুষিত এবং বিকৃত’ হয়ে উঠবে কারণ তাতে যৌনতাকে স্বাভাবিকতা দেয়া হয়েছে । 


     

    আমি, মলয় রায়চৌধুরী, জন্ম ১১ কার্তিক

    আমি অশ্লীলতা সমর্থন করি,

    আমি জানি, কলকাতার বুর্জোয়া দুর্বৃত্তরা 

    আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছকে ফেলেছে,

    আমার তাতে কিছু যায় আসে না ।

    এই সভ্যতার পতন কেউ থামাতে পারবে না

    আমি ভবিষ্যৎবাণী করছি ।

    আমার যেমন ইচ্ছে আমি সেরকমভাবে লিখবো, এবং সমগ্র বাঙালি মানবসমাজের শব্দভাঁড়ারে নিজেকে চুবিয়ে দেবো।

    আমার সমস্ত শরীর যা ভাবে, আমি সেটাই ভাববো

    আর যারা জানতে চায় তাদের জানাবো

    কিংবা কাউকে

    যে এই কথাগুলো জানার জন্যে জন্মাবে ।

    আমি কবিতাকে জীবনে ফিরিয়ে দিতে চাই ।

    জীবনে যা-কিছু আছে তার সমস্তই থাকবে কবিতার অস্ত্রাগারে ।

  • মলয় রায়চৌধুরী | 27.58.255.50 | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৯:৩২734849
  • আমার নও : পোস্টমডার্ন গল্প

    মলয় রায়চৌধুরী

              আজ্ঞে, এঁরা সব পেচক সম্প্রদায়ের।  ছুটি শুরু হয়ে গেছে। আশা করি ভোর সাড়ে দশটার মধ্যে কাঁটাশয্যা থেকে গাত্রোৎপাটন করবেন। ফেলাশিও থেকে নাকি প্যাপিলোমা ভাইরাস আসে? তা হোক তা হোক  কতকিছু থেকেই তো আসে যায় কর্কট রোগ তবু সেই শিবনেত্র তবু সেই সিলিঙের ফ্যানেদের অলস গানের  মৃদু গ্রীষ্মে ধীরে ধীরে পেকে ওঠা এ ফল প্রাণের হাতের মুঠোয় ধরা বীজের তরল  তার পরে শিল্পিত উঠে যাওয়া যায়  সঙ্কোচন প্রসারণ অলক্ষ্য তাই  মুখ টিপে হেসে চলে যাই ধীরে ধীরে সোজা হওয়া পায়ের পাতায় ফেলাশিও থেকে নাকি হতে পারে কর্কট রোগ? সমুদ্র বলে ওঠে, তা হোক তা হোক হে কাগা, রে কাগা, কাআগা রে! কাঃ কাঃ কাঃ আহ আহ আহ ঘর অন্ধকার, তার স্বাদ পর্দা ধুন্দুল, আর বাইরে দেয় গুল কত রান্না কত কথা কত সংসারের দারুণ প্রমাদ শুধু তুই আজ বাইরের দূত চাস যদি ঢুকে আয়, ইতস্ততঃ খা আর গা হে কাগা এ কাগা, কাগা রে! কাঃ কাঃ কাঃ আহ আহ আহ এ শব্দ কিসের শব্দ? কালোনুনিয়া দেখতে কেমন ? খুবকালো? মাঝারিকালো? নাকি দুলকিআলো ? খেতে খেমন ? দেখলেই খিদে পায় ? নাকি যখন তখন ? ঘ্রাণ ? গন্ধ আছে কোনো? নাকি আঠালো ফুলের আঠার মতন ? শক্ত খুব? নাকি নরম ? নাকি মুখে দিলেই গ'লে যায় এমন ? ডগাটা নরম ! কালোনুনিয়া দেখতে কেমন ? রডের মতন নাকি ঝলসানো রডোড্রেনড্রন ? চোরার ঘরে চোরা , তেইলা চোরা, যায়গায় খায় যায়গায় ব্রেক, কাইত হইয়া খায় চিত হইয়া মরে, লাফাইয়া খায় দাফাইয়া মরে। ময়নার মার ঘুম নাই,হাসিনার মার খাতা নাই। ইঁদুর-চিকার মারামারি নষ্ট করে বাসাবাড়ি, ঔষধ লাগান তাড়াতাড়ি। ধরা পড়লে জামিন নাই, ইঁদুর কইবে আয়রে ভাই দেশ ছাইড়া বিদেশ যাই! একদাম ২০ টাকা ২০ টাকা ২০ টাকা ।

              জংধরা রেলপথে যেন কোন  রেলগাড়ি  অশ্বত্থের ঘেরাটোপ বটের ক্যানোপি মাকড় কলোনি ছিঁড়ে চলার মতন আগে পাশে হাতড়ায়  কোন তাড়াতাড়ি নেই কোন তাড়াতাড়ি রেলগাড়ি! খোলো মুখ, রাখো হাত, উহ কি মিঠে অসুখ ওফ কাগা বোস। আআ হাহাহা হে কাগা ও কাগা কাগা রে ম্যাগির খিচুড়ি । লিরিকাল করে বানানো। কোনো কথা হবে না। যেমন স্বাদ, তেমন গন্ধ ! কোনো চিনাকে খাওয়ালে মাও জে ডঙ ভুলে বাড়ি থেকে নড়বে না,  গোলাম হয়ে থাকবে। সাধে বলে জাতে গোরিলা ; অন্তরমহল সন্ধ্যে হয়ে আসছে। লাল আর কালচে আকাশ ।ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরে যাচ্ছে পাখিরা ।'বাসায়' । নিজস্ব বাসা ।মানব ঘাটে বসে থাকে ।সময় কাটে ।কাটেওনা ।জলের ভেতর ঘাই মারে মাছ ।দূরে ,বহূ দূরে একটা শিল্যুট । ক্রমশ আবছা থেকে স্পষ্ট হয় ।  বিকেলে ঝঞ্ঝাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আড্ডাগলির চুল্লু উৎসবে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিলেন মঞ্জুলাদি। আমরা আপ্লুত।ধন্যবাদ…..

             আমার গুরুদেবদাদুভাই বলতেন, প্রকৃত কীর্তনশিল্পী হচ্ছেন সেই মাধ্যম যিনি ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে দেন। তাঁদের উদ্দ্যেশে প্রণাম রেখো। যে চরম ভাবাবস্তায় দূর দূর বিচরণ করে আত্মা, সঙ্গীত ছাড়া সে ভাব আর কিসে? স্বর্গ নেমে আসে সুরের কাছে এখানেই।          একটা নৌকো ।মাঝির বয়স হাজার বছর তিন মাস  । ঘাটে এসে লাগে নৌকো । কোঁচকানো চামড়ার ভেতর  কোটরাগত চো়খ । ঘন সাদা চুল,সাদা দাড়ির ফাঁকে  সাদা দাঁত ।নিকষ  প্রেতের মত লাগে  । মাঝি ওকে চেনে । দুমাস হলো মানুষটা এসেছে এখানে । রোজ এভাবেই বসে থাকে । এদিকটা গ্রাম থেকে দূরে ।সচরাচর আসেনা কেউ ।ভাঙাচোরা ঘাট,আগাছা আর ভুতের উপদ্রব ।দূরে ধ্বংসস্তুপ  দানব  অট্টালিকা ।দু ধাপ নীচে বসে মাঝি । সুলেমান । একটা বিড়ি ধরায় । মানবকে একটা দেয় । চুপ চাপ ।রাত বাতাস খেলা করে দুজনের মাঝে । কি যেন বলতে চায় মাঝি । প্রিয় ঠোঁট- প্যাস্টেল। প্রিয় আকুতি- পরকীয়া। প্রিয় বৃক্ষ- বিবাহ। প্রিয় আকাশ-আরন্যক। প্রিয় ধ্বনি- হরিণী। প্রিয় রাগ- অনন্তনাগ। প্রিয় নক্ষত্র-শরৎ। প্রিয় স্পর্শ- রসাতল। প্রিয় আলাপন- শিহরণ। প্রিয় শব্দ–নৈঃশব্দ। প্রিয় আলেখ্য-চম্পক। প্রিয় মানুষ-মৃগয়া। তাবৎ শক্তিমত্তা আর পবিত্রতা সমেত মৃত এই রাষ্ট্র ঈশ্বরের ..."ভিনসারেমো", তাবৎ শক্তিমত্তা আর পবিত্রতা সমেত এই রাষ্ট্র বলে উঠলেন--খুনের জন্য দায়ী এই ছুরি তৈরির কৌশল  গোলাপ আর বৃষ্টির ঘ্রাণে মুগ্ধ ছিল সন্ধ্যার দখিনা বায়, রাত্রি  নেমেছে চোখের কাজলের গভীরে, ক্লান্তিগুলো ঢেকে রেখেছি ।

               ঢেউ- চোখ। প্রিয় পলক- দারুচিনি। শেষ বিকালবেলা ঘুমোলে যুবতীদের মেজাজ খুব  খিটমিট খিটমিট  !  কখন কোথায় কি মুখ ফসকে যায় -  নিজেরে বলেই চলে…..ব্যাস সবাই মিলে মতামত দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। লাভ হবে কি? হয়েছে এর আগে? তখনও তো মতামত দিয়েছিলেন। মতামত না দিয়ে বরঞ্চ জনমত তৈরী করুণ। পারবেন? যে লোকে বাঙালি খাবার খেতে রেস্তরাঁয় যায়, তা বাড়িতেও তো জমিয়ে রান্না করা যায়। কী সুন্দর সব মাছ মাংসের পদ, নারকেল দুধ দিয়ে শুক্তো, ছানার কোপ্তা, সোনা মুগ ডাল, বাহারি চাটনি.... সে সব ছেড়ে গুচ্ছ কাঁড়ি টাকা খসিয়ে রেস্তরাঁয় কেন বাপু! এসব তো আমাদের ঘরের সম্পদ, তাকেও বাণিজ্যিক করে তুলব? আর এসব যদি এই বেলা শিখে না নিই আমাদের ছেলেমেয়েরা তো রান্না করতেই জানবে না। হারিয়ে যাবে নারকেল নাড়ু,  মুড়িঘন্ট, ইলিশ ভাপা।  তালের বড়া  দোকান থেকে কিনে খাই, ছানার ডালনা হয়ে গিয়েছে পনির, নটে শাকের করলা ঘণ্ট খেতে গেলে শ্যামবাজারের পাইস হোটেল । বাঙালি ঘরের রান্নার গন্ধ, কড়াইয়ে খুন্তির ঠুংঠাং সেকি নাচ নয়? উৎসব মানে কি শুধু হেয়ার স্পা, প্যান্ডেল হপিং আর রেস্তরাঁয় বসে খাবারের থালা সাজিয়ে ছবি? সব শেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, "ওহ, কী লাকচে!" বলে কেউ যদি রাস্তায় চেঁচায়- ওইখানেই থাবড়িয়ে দাঁত ভেঙে দেওয়া হবে। ধন্যবাদ...          

              প্রিয় রিমঝিম-সোনাঝুরি প্রিয় সাঁতার-অপেক্ষা। প্রিয় জ্যোতিষ্ক- নীরবতা। প্রিয় চুম্বন-রেবতী। প্রিয় স্মৃতি-বাঁশরী। প্রিয় বিস্ফোরণ-কুঞ্জবন। প্রিয় রঙ-শ্রীরাধিকা। বেঁচে থাকা? সে এক ধ্রুপদী মলাট মৃত্যু? সে তো পরম প্রচ্ছদ এটিকে কি পরকীয়া বলা যায় আমি জানতে চাইছি....আমার লেখা শেষ চিঠি, আর লিখবো না, কখনো না, আর কোনোদিন কিছু জিগ্যেস করবো না। তুমি তোমার বউয়ের জন্য ৩৫০০ টাকার দামি শাড়ি কিনে এনেছো, সেই শাড়িটা আমিই পছন্দ করে কিনে দিয়েছি। অথচ আমার জন্য একমুঠো দোপাটি ফুল আনতেও তোমার হাত কেঁপেছে .... তোমায় ভাবতে হয়েছে, আসা যাওয়ার পথে কেউ দেখলো কিনা, তোমায় পেছনে ফিরে ঘুরে দেখতে হয়েছে বারবার। মাথার চুল ট্যু পায়ের নখ ইস্ত্রিমার্কা সাজগোজ করে ছিঁচকে দুঃখ সাজাবেন? মিনিমাম এক‌টি আলোমিছিল? এসব দেখে আমারই চুদে দিতে ইচ্ছে করে, বিশ্বাস করুন। মাভৈঃ বলে নগ্ন হয়ে রাজপথে নামুন এক হয়ে। দিকে দিকে। পিতা নয়, পিতৃব্য নয়, ভাই - বন্ধু নয়, স্বামী নয়, পুরুষ, তুই দেখ! দেখ! পারবেন তো মা, পারবে তো বোন? সময় আর নেই যে -- এখুনি --মাতলা'য় ছিল রাতজাগা চুপ তোমার অধরা সহিষ্ণুতায় বাধুক  ঈশ্বরীর হরবোলা খুশি,কাঞ্চনমালা তুমি অনুরাগ মুছে চর্চিত রাগে রাজবেশে গেলে অন্তঃপুরে আমার একলা বসনে বিলাপ তুমি শুনেছিলে রাত পারাবারে...

              এরপরে কিছু গোপন থাকেনি লোকালয়ে বাঁচা গরাদ জীবনে মানে খুঁজে খুঁজে অরণ্য বাঁচে আমি বাঁচি কারো ছেঁড়া অভিধানে । বুকে ভালোবাসা নিয়ে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো ঠকতে জন্মায় ;বাঁচতে না...বেঁচে থাকার একটা নেশা আছে! ধমনীর লাল রক্ত যেন সুরা, উষ্ণধারা শাখা-প্রশাখায় বইছে। ছোট ছোট আশা-আকাঙ্খা যেন পালতোলা নৌকো; ঘাট হতে ঘাটে ভেসে চলেছে। ঠিক সময়ে একজন আসবে, কিছুদিনের জন্য সবকিছু ভুলিয়ে দিতে… ঘিজতাঘিজাঙ নেশার ওপর নেশা চড়াতে, লাল-নীল-সবুজ স্বপ্নের চাঁদোয়া টাঙাতে। পেছন দিকের দরজা খুলে যাবে; নির্জন দাওয়া। তিন ধাপ সিঁড়ি, ঘাসে ঢাকা পথ, ছোট্ট জলাশয়, কাচের মতো টলটলে জল, অদ্ভুত বাতাস। 

             চুল-চোখ-নাক-কন্ঠস্বর, স্পর্শ সব একেবারে আলাদা। ভীষণ এক ভালোলাগা! আসলে এসব কিছুই নেই, কল্পনা। এ কল্পনা কেন এলো? কেমন একটা ভিজে ভিজে ভাব, 'মনটারে তুই ভাগা রে কাগা' এ হলো পাগলামি। কে সে? মাথার ওপর দিয়ে একটা পাখি উড়ে গেছে। ডানার বাতাস! কোন ডালে বসলো - এ কী বলা যায়! তবু, আর একবার যদি দেখা হয়! এসব সময়ে বেশি কিছু বলতে ইচ্ছে হয়না, এটুকুই বলতে চাই, সব্বাইকে ভালোবাসা সম্ভব নয়, কিন্তু মানুষ মানুষকে সম্মান করুক, তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিক, মানুষ আর একটা মানুষের ইমোশনের কদর করুক...বহু জায়গায় দেখেছি দুটো মানুষ আমন্ত্রিত, কিন্তু গুরুত্ব একটা মানুষকে বেশি দেওয়া হয়, আর একজনকে কম। আপনি জানেন না হয়তো সেই সময় ওই মানুষটার কতটা খারাপ লাগতে পারে।হয় নেমন্তন্ন করবেন না নইলে সম্মান করবেন।একটু চোদা খাওয়ার জন্য আমি কত কিছু করি,,,,,, ইচ্ছে করে ছোট ভাই কে দিয়ে করিয়ে নিই আমার ভোদায়,,,,,,,, ভাই যখন শুয়ে থাকে আমি গিয়ে ওরটা নাড়তে থাকি,, এইতো কাজ হয়ে গেল,  আমায় বাগানের ঘাসে, আমার ভোদাটা একটু বিদেশি...মেরেলিন মনরোইস্ট, কোমরের তলায় বালিশ... ওহহ কীইযে শান্তি...টি এস এলিয়ট বলে গেছেন।

              ঘরের লোক মেলায় গেলে, আমায় ঘরে ডেকে আমার শরীরের উপর উঠে বসতে কিন্তু একবারও তোমার পা কাঁপেনি.... তোমার বউ স্মার্ট, নাক টিকালো, লাল টিপ পরে, গায়ের রং ফর্সা, তাই তুমি সেকেন্ডে সেকেন্ডে ফোন করে খোঁজ নাও, সে শাড়ির সাথে কোন ব্লাউজটা ম্যাচিং করে পরলো, হাই হিলস পরলো, নাকি ফ্ল্যাট....কোন শেডের লিপস্টিক মাখলো ঠোঁটে, অফিসে থাকতে থাকতে তুমি তাকে ছবি পাঠাতে বলো কয়েক ঘন্টা অন্তর অন্তর, তাকে কেমন দেখতে লাগছে জানতে চাও! আহা আজ বৃষ্টি হয়েছে, রাস্তায় জল জমা, সে কিভাবে যাবে তার বাপের বাড়ি, এই চিন্তায় তুমি কম্পিউটারের সামনে বসে ভুল টাইপ করে গেছো দিনের পর দিন!....সে বিরক্ত হয়ে গেলেও তুমি রেয়াত করো নি! অথচ আমায় একটা ফোন করার সময় দরজায় ছিটকিনি লাগাতে হয়েছে তোমায়, চাদর মুড়ি দিয়ে ফিসফিস করে কথা বলতে হয়েছে। একবার বলেছিলাম একটা চিঠি লিখতে, তুমি ব্যঙ্গ করে সেকেলে বলে হেসেই উড়িয়ে দিলে....

            কবে একটা ডানডিয়া নাইটের নিমন্ত্রণ করল একজন। কী ভয়ের ব্যাপার। কলকাতা যাব রে। লোকজন আমাকে নাক উঁচু বললে তাই। ভাই রক্ষা কর আমায় । এসবে আমি নেই। সন্ত্রাসীরা কোপাচ্ছিল স্বামীকে। আর সেই খুনিদের দুই হাতে জাপটে ধরে স্বামীকে বাঁচাতে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন স্ত্রী। চিৎকার করে অন্যদের সাহায্য চাইছিলেন। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত স্বামীকে বাঁচাতে পারেননি  মিন্নি। বরগুনার মাইঠা এলাকার নিজ বাড়িতে বসে স্বামী হত্যার সেই ভয়াল স্মৃতির বর্ণনা দেন  মিন্নি। একটি ভীষণ মন খারাপের ছবি।জাহ্নবী ধরে রয়েছে মোম মায়ের হাত।শোক বড় ব্যক্তিগত। তারাই বোঝে যারা হারিয়েছে ছাতা।প্রোটেকশন দিতে পারিনি। গানপয়েন্টের মুখ। মেলে দিয়েছি গতর। সাম্প্রতিককালে এমন রঙিন রানওভার দেখেছ কি ? বুককেস থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত ব্যাকলেস ব্রা। এমন মৃদু ফ্লেভার হ্যালোজেন শুঁকেছ? দ্যাখো। চাখো। আসহোল। আয়োডিনের ঝাঁঝ নাও। তারপর ... তারপর ...মাদার-সিস্টার থেকে সেরে ওঠো হে অ-যৌনসিস্টেম...

              কথাবার্তা না, দল থেকে তাড়িয়ে দেয়া না।চোঁ-চোঁ দৌড় না, পাকড়ে ফেলা না।ছোটা একেবারেই নিষেধ।ধুমপান নিষেধ। চোদা বারণ। হাত্যারের আজ কুড়িতে পা। চারিদিকে এত চাকচিক্কের মধ্যে কোথাও গিয়ে ভুলে থাকা সত্যিগুলোকে সাধারণ এর সামনে বিবস্ত্র করার অঙ্গীকারটুকু নিয়ে আমাদের এগিয়ে চলা। হাতে হাত রেখে একসাথে আরোও বড় হব আমরা।  হ্যাঁ হাম লড়েঙ্গে সাথি, উদাস মওসাম কে খিলাফ। হাম লড়েঙ্গে তবতক, যবতক লড়নে কি জরুরত বাকি হোগি...শালা হিন্দি ছাড়া বলতে পারিস না বাঞ্চোৎ।  তুমি তোমার প্রিয় মানুষটার জন্য গা ভর্তি গয়না এনে দাও, প্রতিটা গয়না আমার পছন্দ করা! আমি তখন বাথরুমে, আমার চোখ বেয়ে নেমেছে গর্ভজল। তুমি তো জানো মেয়েদের কাছে গয়নার গুরুত্ব ততটাই যতটা বাঁধানো ফ্রেমের কাছে ছবির কিংবা মুষড়ে আসা স্মৃতির কাছে ফেলে যাওয়া পায়ের ছাপের....কিন্তু জানো তো প্রাণঘাতী বোমার আওয়াজও বড় সুমধুর লাগে তোমার বউএর গা ভর্তি গয়নার আওয়াজের চেয়ে...আমি তোমারটা কখনো ছুঁতে চাইনি, তোমার সাথে কিছু মুহূর্ত একটা পাহাড়ঘেঁষা ছোট্ট কাঠের বাড়িতে কাটাতে চেয়েছিলাম, এই ধরো একদিনের সংসার...ঘিজতাঘিজাঙ ঘিজতাঘিজাঙ সারারাত....

               ' আমার না জন্মানো মেয়ের নাম মারুঙবুরু '.....ফিরে আসাটা বা ছেড়ে আসা ,তার মাঝখানে একশীর্ণ  লাল সিগন্যালে দাঁড়িয়েছিল ,সেই রাস্তাটার নাম লাতিন কোয়ার্টার। এই শহরটা এমনিই। সঠিক আলোর খোঁজেই তো পথে নামা। অথচ বাহকের হাতে মরণ বন্ধক রেখে সাড়ে সাত মাইল আকাশই দেখলাম একনাগাড়ে। তার আগে দাঁড়িয়েছিলাম ঝর্ণার রেলিং ঘেঁষে। সবুজ থেকে আরও সবুজতর হয়ে দেখেছি বাতাসের সঙ্গে বাতাস কথা বলছে, " প্রফুল্ল,চিনতে পেরেছ ?"এই তির্যকটার প্রয়োজন ছিল। একটা পোর্সেলিনের ফুলদানি কেঁপে উঠেছিল কারণ হাওয়া বদলের সংশয় থেকে সেও মুক্ত নয়। ধরা পড়া'র পরের অধ্যায়ে কোনও অজুহাতই ধোপে টেকেনি। চাঁদ একটা আরামকেদারের মতই আধখানা হয়ে ঝুলছে। মাঝে মাঝে একটু কাত করে ঢেলে দিচ্ছিল ম্যাগমা। নক্ষত্রবেষ্টনী ছেড়ে কতটুকুই বা এগোনো যায় ! বা পৌঁছানো। মাইনাস ডিগ্রিতে একটা সম্পর্ক মরুদ্যানের গল্প বলছে। শুনতে পাচ্ছি , কিন্তু দেখতে পাচ্ছি কম।সম্পর্ক আর দূরত্বের অনুমান নির্ভুল বলি কী করে। মাইনাস পাওয়ারের চশমাটা মাঝে মাঝে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস পাওয়ার হয়ে যায়...

               কাকুদ্বয়, বিস্তারিত চাই। আমার যখন তখন বহুকিছু ক্ষিদে পায়। মুক্তির দিনে বন্ধনের প্রকট হাতছানি ... মানতে হয় নাহলে... নোটে গাছটি মুড়িয়ে গল্পের শেষ দাঁড়ি টানতে হয় ...." প্রথমাবধি ঐশীবোধের লালন ছিল শ্রী বিশ্বনাথের অন্তরে। এ প্রসঙ্গে তাঁর আধ্যাত্মিকবোধ সম্পর্কে দু একটা কথা না বললেই নয়। তথাকথিত গ্রিকদেবীর মোহময়ী পৌত্তলিকতা নয়, তাঁর আধ্যাত্মিক বোধ ছিল সমন্বয়বাদী অসাম্প্রদায়িক উদার মানবতাবোধ। তিনি পরম্পরায় বিশ্বাসী ছিলেন  এসরাজবাদক। যে কোনো বিশেষণই কম পড়ে কিছু মুগ্ধতা কে প্রকাশ করতে গেলে। ফ্যাশন ঘুরেফিরে আসে। কিশোরীবেলার আমব্রেলা কাট এবার জোরদার ফ্যাশন। ১৯২০-তে জন্মানো মা বলত এটা তার বালিকাবেলার কাট। কিনেছি এবার দুটো ছাতা, চিনের তৈরি বলে সস্তার তিন অবস্হা...কিন্তু মাওয়ের দেশ।

              বিষাদ ধারণে সে অনন্তগর্ভিণী এখন নিরাপদে পেরোয় যাবতীয় সম্ভাব্য অলীকের মৃত রন্ধ্রগুলি । এই ধরায় একা উনি অন্ধকারকে 'নিস্তেল' পেয়েছেন , এমন কি ? দীর্ঘকাল পর পরিত্যক্ত অশ্বথখচিত ছাদে দাঁড়ালে নিজেকে জাতিস্মর ভ্রম আসে বহু জনেরই । ছাদে অশ্বথ্থ দেখলেই বিলডার গোঁত্তা মারবে । যার কুণ্ডলীতে বিষযোগ থাকে , একা সেই প্রেমিকা উন্মাদিনী । কখনো কেউ ভাবে বিসর্জনের দুর্ভাগ্য লেখা হয় একমাত্র উপলক্ষেরই বিধিতে ? জলস্তর বাড়লে কী পার্থক্য গো-ক্ষুর আর সমুদ্রে ? সীমানার ক্ষত নিয়ে কত সহস্র হত্যা রোজ সসাগরা পৃথ্বীতে । ধান খেয়ে যায় মোহবাসবেরা , দ্বন্দ্ব প্রচুর , কূর্ম না নোয়া , কে ভেসেছিলো আগে ? যার গরলবর্ষা তুমি নিতে পারোনি , পরিযায়ী উড়াল তোমারই দিগন্তে সে কেন ভাসাবে ? করুণার রং উগ্র পাণ্ডুর অথবা পিত্ত প্রবণ, নিবিড় সমঝোতা থাকায় স্বাভাবিক প্রতিবর্তে কখন যে পরম শূণ্য ছুঁয়েছে ,জানা যায়নি । অনুকম্পা। করুণা। এই সব কারো কাম্য হতে পারে? যদি হয় তাহলে কিছু বলার নেই কিন্তু যদি না হয় তাহলে জানতে চাইবো কেউ কেউ নিজের বুকে ছুরি দিয়ে এই দুটো অনুভূতির পাওয়ার আশা  লেখে কেন? 

              বড় হচ্ছিনা একটুও ;এতটাই বড় হয়ে যেয়ো না যে তুমি ভুলে যাবে মাঠ।সেই তুমি পায়ের আঙুলে খেলা করতে পাথর নিয়ে,কিছুক্ষন বাদে সোজা শট।চু কিৎকিৎ, ভোকাট্টা বা খেলার শেষে চুরমুরে লাগানো আঙ্গুল চেটে নেওয়ারস্বাদ ভুলে যদি যাও জানো তুমি করবে পাপ। হ্যাঁ সেই রকমই দুস্টুমি নিয়ে যখন গুলতি ছুড়তে, বা কাঁচের গুলি নিয়ে ছোট বেলার সব ইকড়ি মিকড়ি বন্ধুগুলো হাফ পেনটুল ,ধুলো মাখা ফ্রকে গোল্লা ছুট......ছুটতে ছুটতে গো স্ট্যাচু রেডি,চোর পুলিশেরধপ্পা বা রুমাল চুরি লজেন্সের ভাগে ভাব ,আচারে আড়ি। রেনল্ডস বা রোটম্যাক পেন এখনো বড্ড দরকারী। কাবাডির জিত বিশেষত ঘাসের মাঝে, কাদা মেখে শুষে নিতে ঘ্রাণ বৃষ্টির ।এতটাই বড় হয়ে যেয়ো না যে তুমি ভুলে যাবে পরবের শেষে নিমকিনাড়ু বা খিচুড়ির প্লেটে একসাথে পাঁচজন কাড়াকাড়ি। শীতের দুপুরে কমলার কোয়ার ভাগ বা উল কাঁটায় মা কাকিমার বোনা ঘর গুলো জুড়ে গিয়ে তোমার স্কুলের সোয়েটারে স্নেহ ঝরে পড়তো পশমের আদরে। এতটাই বড় হয়ে যেয়ো না যে তুমি ভুলে যাবে তোমার ভিতর একটা শৈশব আছে। এখনো অনেক ভিড়ের মাঝে তাকে খুঁজো। ঠোঁটের কোণে তখন হাসির ঘিজতাঘিজাঙ ফিরে পাবে...

              সমর্থনের মাধুকরি যাচ্ঞা করেছো দ্বারে ও দ্বিপ্রহরে । অমানিশার মধু অপার্থিবই থেকেছে সেমত নিঃস্ব এ হিরণ্ময় ঘোরে । সমর্পণ প্রার্থিত থাকে প্রথম অর্ধের পতঙ্গসূত্র মাত্রেই , বলো কয়টি কণ্ঠ, মন্থনের ধারক হতে পারে ? অবশেষে এক আশ্চর্য ছায়াসম্ভব আলো আমায় নিষ্কৃতি দেয় , যতো ছিল অমায়াপ্রসূত ভালোবাসা সমুদয় , প্রাচীন ও প্রাণ্তিক প্লাটফর্মের মতো ক্রমে ভ্রম মনে হয় । কিছু শ্রাবণে ধারা বড় বিহ্বল রেখেছিলো জাগতিক রূপগাথা আর অনিবার্য বিপর্যয়ের কারনামায় । আদ্রর্তাহীন মাদকতা অভ্যাসে ফিরিয়েছে প্রতি ধ্যানান্তে বৃক্ষতলটি ভোলার । ঠাকুর বাড়ির ছাদে মাতঙ্গিনী গঙ্গোপাধ্যায় মানে কাদম্বরী দেবীর  আত্মহত্যার  ১৩৫ বছর পরেও সেই ছাদে এখনো প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে….আত্মহত্যাকারিণীরা অমর হয়। 

               তুমি দেখো অকালমৃত্যু , আমি জানি বিচ্ছেদের আতঙ্ক কতদূর তীব্র হলে প্রেমিকের করতলে হত্যারেখা জাগ্রত হয় । এক যোগীর কথা পড়েছিলাম,এক বৃক্ষতলে দুইবার ধ্যানে বসতেন না,পাছে মায়া পড়ে যায়। মেঘ আর বিদ্যুতের রহস্য ভেদে যে আলো দ্বিতীয় গ্রহে আসে,তার তাপ ফুটন্ত বাষ্পের সামান্য দ্বিরাগমনে বাপের বাড়ী আসা মেয়েটির সখী সান্নিধ্যের আতঙ্কের থিম লিভটুগেদার সদ্য-বিধবার থেকে আলাদা নয়।অশুভ মহাদেশকে আবিষ্কারের ব্যর্থতা যে কোনোদিন লোনাজল খায়নি তাকে বোঝানোর সমতুল্য।আসলে কী জানো আমি কোনোদিন যাইনি তোমার কাছে যে গিয়েছিল তা একটি শরীর দুটি বুক থার্টি সিক্স বি একটি যোনি আর তাকে ঘিরে কয়েকটি লোমকূপ আর একটি গর্ত আশ্চর্য ব্যাপার দ্যাখো তোমার ওই  কেঁচো আমার এই  গর্তকে গিলেও ফেলতে পারলো না….

              সম্ভ্রান্ত গণিকালয়ে মান রক্ষার্থে যে পুরুষ বাস্তুকে বাজি রাখে,ব্যাসদেবের বাইরে তার পরিণতি চাইছি- "ড্রাকারিস"। ক্ষমা এমন এক অবস্থান উন্মাদ নগ্নিকা,  দানের কাপড়ে ঠিক যে দৃষ্টি দেয়। যে হাঁস, ঝাঁক থেকে আলাদা হয়ে কসাই পুকুরে পৌঁছে যায় পরম বিশ্বাসে,তার মাংস বাজারে আলাদা করে বিক্রি হয় না।হত্যাকারী সন্তানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর মহিলা বিচারকটি নিব না ভেঙে তুলে রাখেন গর্ভপাতের স্মারক হিসাবে। কর্মসূত্রে আসা যাওয়ার পথে 'বেইমান-দেউড়ি' পড়ে। আকাশকে ব্যথা শোনানোর রাত পেরিয়ে প্রতি সকালে দেখি ক্ষয়িষ্ণু রক্তরঙের ইঁটের খাঁজে খাঁজে অজস্র মলিন বিশ্বাসঘাতকতা। পাঁজরে তীব্র দংশন ধবল কোন শ্বেতাম্বরী পেঁচা আসেনা।একাহারী শরীরের চোষক,সফল এক বাদুড় আত্মা থেকে উড়ে গিয়ে মিলিয়ে যায় বিপুল আলোর উৎসবে।সিসে রঙের হাওয়ায় কান পাতলে প্রতিধ্বনি আসে শেষ স্বাধীনতায় কোন যুদ্ধ হয়নি।পরিকল্পিত ছিলো প্রতারণা। প্রিয় বান্ধবীর নাভিতে 'ভালো' দস্তখত পড়ে  এসেফাই এর আটকানোর কথাও না কারণ ভোটগুলো তো বিজেপিতেই দিয়েছে। বাম যে রাম হয়েছে সেটা বোঝাই যায়৷ আর সবাই যদি ওই আটকানোর বিপক্ষেই থাকে তাহলে পরের দিনের ওই র‍্যালিটা কি শুধু ইউএসডিএফ আর র‍্যাডিকাল মিলে করেছে? ইউএসডিএফ বা র‍্যাডিকাল যদি আটকে থাকে তবে বেশ করেছে৷

              সিরাজদের কোন ঈশ্বর থাকেনা। ক্ষমতার খেলা চলে ব্যভিচারি আলেয়ায়।নেশাগ্রস্তের বমনে উঠে আসে সবুজ সন্দেহ,ঘৃণিত কৌশলের অপাচ্য মাধুকরিকে দাঁড় বেয়ে আনবে বর্ষা? মায়েরা জানে না কীভাবে একই গর্ভ থেকে প্রসব হয় সন্ত ও হত্যাকারী। প্রেমিকের কষ্টে টাকরায় আওয়াজ তুলি সান্ত্বনার বা আফশোসের নয়, আরামের। পাথরভরা বুক, যেমন বলেছিলেন গালিব এই নিষ্ঠুর বুক আমার সম্পদ। নয়তো এত ভালোবেসেছি জীবনে টুকরো টুকরো হয়ে কবেই ধুলো হয়ে যেতাম "দুশমনি জম কর করো,পর ইতনি গুঞ্জায়েশ রহে,কি ফির কভি হাম দোস্ত বন যায়ে তো শরমিন্দা না হো"। আবার শালা হিন্দি ফিলমের ঘিজতাঘিজাঙ । রাজা গণেশের কিছু পরে বঙ্গের দুই  প্রসিদ্ধ কবি আবির্ভূত হন। চন্ডীদাস ও   কৃত্তিবাস। আদি বাঙালি কবি এঁরাই। কিন্তু শিক্ষা বিষয়ে  সাধারণ বাঙালি সমাজ অনেক পেছনে তখন থেকেই। মিথিলা তখন সংস্কৃতচর্চ্চার বাজার। আর সে যুগের লেখাপড়া মানেই হল  সংস্কৃত ।  নদীয়াবাসী কৃত্তিবাসকেও ‘পাঠের নিমিত্ত গেলাম বড় গঙ্গাপার’ মানে বরেন্দ্রভূমিতে যেতে হয়েছিল।          রেখে যাওয়া বলতে তো সে এক আধখাওয়া নদীজল মুগ্ধতার জরুরী বৈঠক তাকে আমি বরং করে তুলি। 

            রেখে যাওয়া বলতে তো মন্দির দালানের কোলে মিহি আতাগাছ যার ছুঁয়ে শুরু হয়েছিল অজস্র রূপকথার তোতাসংবাদ। শশ্যদানা খুঁটে নিচ্ছে মৃদু চারণায় পাখিসব করে রব শেষ বাস চলে যাচ্ছে তুমি ছায়া হাত নাড়ছো হাওয়া জানালায়। বাইরেটা ফিরতে চাইছে প্রবেশের অনুনয় নিয়ে আর শিখে নেওয়া গ্লাসনস্ত নরম করে উঁকি দিচ্ছে ডানাভাঙার ইতিহাস অনুপুঙখ একটি নিটোল গল্প সন্ধ্যার ফিসফিস মেখে ক্রমশ প্রবিষ্ট। অপরাহ্ন এইসব  সময়ের কুচি অম্লান হাতভরে স্লোগান হয়ে ক্রমউচ্চারণ নৈ:শব্দের তীব্র বোধনে। কুয়াশার রং চিনে চিনে বড় হয়ে উঠছে বিজন আঙিনায় হাসি গান ব্যাথা যত কথা সংবলিত ঘিজতাঘিজাঙ। উপযুক্ত চাকরির মতোই এই পশ্চিমবঙ্গে উপযুক্ত ছেলেমেয়েদেরও অভাব দেখা দিয়েছে বোধহয়।তাই ঠাকুর পো ও বৌদিদের ডিমান্ড বেড়ে চলেছে মার্কেটে শঙ্খচূড় বনবেহাগী মল্লারী কানহা তানবাদন বাঁশুরি রিক্ত শ্বাস ঔদাসীন্য কর্ণকুহরে পঙ্গু বাদুর ঝালর অশনি অমাবস্যায় পাতালগর্ভে কুমিরাশ্রু হা করা বিচিত্র গুহায় চন্দ্রাহত মধ্যযাম ভ্রূয়ের কাকতালীয় মধ্যাহ্ন উড়োচুলে ধুম ঘন্টাকাল নিথর মৈথুনী ভাতঘুম কচি খাদ। 

               দুটি জীবন আছে।এক, জলের ওপর যেমন  সাঁতার , ভেসে ।এ হল লড়াই।বাঁচতে গেলে ভেসে থাকতেই হবে যে।দ্বিতীয়টি হল ডুবসাঁতার।এ হল সাধনা।এখানে ডুবে যাওয়ার ভয় নেই। ডুবে থাকাই আনন্দ ; সংসারে  ভেসেই থাকো। আর একটা জীবন হলো  সাধনা।  গৃহকর্তার মাইনেতে সুরে  তাল মিলিয়ে চলা! না হলে স্কটল্যান্ড থেকে ফিরে ১১ ঘন্টার বিমান যাত্রার গা ব্যথা সারতে না সারতে আবার ভ্রমণ এবং হোটেলে চোদা !সত্যি বলছি বেড়াতে সবারই ভালো লাগে,কার নয়? কিন্তু এক স্যুটকেসের জিনিস নামিয়ে গোছাতে না গোছাতে আবার তাড়া...কন্ডোম না থাকলে হ্যাঙ্গামের একশেষ ! বলতে গেলে শেষ হবেনা।আমাদের সেদিনই সকালে সাহারা মরুভূমি যাবার কথা, সেখান থেকে মরোক্কো।  কাঁইগুঁই করে  যাওয়াটা ভেস্তে দিলাম।

              কচলে সুগন্ধি লেবু মণিকোটরে আগুনক্ষিধে জাত তিক্ততার বৈরাগ্য জিহ্বায় সন্ন্যাস।নাভিতলে পাংশুটে মাধুকরী খোয়াই তলিয়ে অন্ধধীবর মণিদর্পনের চিবুকে  রক্তিম অনশ্বর চাঁদ  নিভু জ্যোৎস্না আঁচে সেঁকে সান্ধ্য-প্রেমিকের প্রসারিত চাতালের ভৌগলিক চিত্র...ইজেলের যোনিকেশে ক্লান্তি ঘামতেলে নৈপুণ্য শীৎকার ঊরুসন্ধি  খাওয়াই বিন্দুবিসর্গ কালসাপের আড়িমাড়ি ঠেস চাপাকলে মাড়াই রুয়ি বন্ধ্যাজমিনে সাওয়ান-ভাদে বীজধানে পুংগতি। আড়ষ্ট দধিমঙ্গলে ডুব পানকৌড়ির শিরচ্ছত্র এলোকেশীর ঊরুজঙ্ঘায় জাহ্নবীর হুমড়ি স্রোত কামমর্দন। চুপকথায় দুঃশাসন দ্রৌপদীকাল রজঃস্বলার ক্ষীর আঁচলের উন্মোচন স্নিগ্ধ পুরুষদুগ্ধ বক্ষটোপরে অবৈধ স্তনবৃন্তে হামাগুড়ি। যোনিওষ্ঠে মদ্যপ ঝঞ্ঝা আলতা পায়ে প্রশ্রয় একরাশ রতিক্লান্তি।মই হামানদিস্তায় সেচ গেরস্থালীর চৌকো সাপলুডো…

            গোগ্রাসে থলথলে মাটির চৌম্বকীয় সূচের অনভিপ্রেত আবেশ। জীবনের পথটা নেহাৎ ছোট নয়, এই অ-ছোট পথ পাড়ি দিতে গেলে পরিচয় হয় অনেকের সাথেই, কারো কারো সাথে গড়ে উঠে  সম্পর্ক। সম্পর্ক গড়া সহজ কিন্তু রক্ষা করা পকেটের মাশুল , অ-যোগাযোগে সম্পর্কেও ছাতকুড়া(ছত্রাক) পড়ে। তার উপ্রে আবার এখন যোগ হইছে ভার্চুয়াল সম্পর্ক, আসল সম্পর্ক যেখানে রাস্তায় গড়াগড়ি খায়,সেখানে ভার্চুয়াল সম্পর্ক আর কতক্ষণ, কতদিন? কারো কারো কাছে ভাইয়া, দাদা,দাদান,দিদি, বুবু,আপুন, বুবুন ডাকগুলো হয়তো কেবল বাচনভঙ্গির মাধুর্য বাড়ায়, কিন্তু কারো কারো কাছে এই সম্বোধনগুলো হাড় মাংস ভেদ করে হৃৎপিণ্ড ছুঁয়ে যায়। অনুবাদ কে পড়ে? পড়েই কী আদৌ! প্রায়ই হতাশায় ভেঙে পড়ি। কেন অনুবাদ করি! লাভ কী এভাবে প্র্যাকটিক্যালি ঘুম বিশ্রাম বেড়ানো রিল্যাক্স করা সব বাদ দিয়ে অনুবাদ করার! কে তাড়া দিয়েছে এমন? ফাঁক পেলেই অপমান করতে চায় কত বাজারি লেখক সম্পাদক। তবু জেদ। তবু দাঁতে দাঁত চেপে লড়া।           

            আমি একেবারেই একরোখা মানুষ, কেউ তালি বাজানোর জন্য হাত যদি কিঞ্চিৎও না বাড়ায় তবে আমি আর হাত বাড়িয়ে বেশিক্ষণ রাখতে পারি না, হাত ব্যথা করে। তথাপি আমি মানুষ ভালবাসি, মনের মত বন্ধু হলে জানকুরবান! মানুষের উপকার করতেই ভাল্লাগে। তবে কোন সম্পর্কই একতরফা হয় না। বিশদ আলোচনায় ধৈর্য নাই। ভালকথা আমি ইকটু তিতা কথা বলি তাই আমার সাথে কারো সম্পর্ক হয় না, বাট যদি কারো সাথে হয় তো মর্ছি, খুব বৃষ্টি হলে আগে রোমান্টিক হয়ে যেতাম। আম্মা মারা যাবার পর খুব বৃষ্টি হলো। কবর টা ভেঙ্গেচুরে একাকার। আমি উন্মাদের মত চিৎকার করতে থাকলাম। আমার মনে হচ্ছিলো এই যে ভাঙ্গা জায়গা দিয়ে পানি যাচ্ছে, আমার মা ডুবে যাচ্ছে! যতো ভুলে যেতে চাই, বৃষ্টি আমাকে তার চাইতেও বেশি ঝরিয়ে দেয়। সারাজীবন দিয়েই যাবে। উৎসবে বৃষ্টি হবে না, চাপ নিস না।-----হ্যাট তুই আবহাওয়াবিদ কবে থেকে হলি রে?-----আমি বলছি তো হবেনা, সব ব্যাপারেই তোর পাকামি! -----হু হু বাওয়া! শালা তুই আমার মন বুঝিস না, জলবায়ু কি করে বুঝলি বে!... ----ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন ম্যাডাম ওটা জলবায়ু নয়, আবহাওয়া হবে। জলবায়ু আর আবহাওয়ার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য আছে, ছোটবেলায় পড়াশুনায় কাঁচা ছিলি জানি, তা বলে সেটা লোক জানানোর কি দরকার...-----ওই হলো! আমি আবহাওয়াই বলেছি, বেশি পাকা! কথায় কথায় ভুল ধরবি না...------অবশ্যই ধরবো, আর তোর ভুলটাই ধরবো অন্য কারোর টা না। যাতে অন্য কেউ না ধরতে পারে তোর ভুল, তোকে কেউ অপমান না করতে পারে! তোকে সবথেকে বেশি অপমানটা আমিই করবো আবার সমস্ত আদরটাও আমিই করবো, আর কেউ না....-----এমনিতে আদর তো করতে পারিস না, আবার বড় বড় কথা, হুর....------ফোনের মধ্যে আদর আমার দ্বারা হবে না, সামনে আয়, কাছে আয়, হয়তো তোকে দেখলে জড়িয়ে নেবো গায়ে, কেঁদেও নেবো খানিক। জানিস যখন একলা থাকি, এক-এক সময়ে ইচ্ছে করেই তোকে ফোন করি না। তুই ভাবিস অন্য কারোর সাথে ব্যস্ত আছি....রাগে তো তোর মুখ ফুলে যায়, কিন্তু আমি তোকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি, তোকে একদম নিজের মতো করে পেতে চাই। মনে হয় তুই আমার সামনে বসে আছিস, অনবরত বকে যাচ্ছিস। আমি যত বলছি চুপ কর চুপ কর, তুই কোনো কথাই শুনছিস না।

              বেশি হাঁটলে আমার পায়ে ফোস্কা পড়ে।-----তো আমি কি করবো! কোলে নিয়ে হাঁটবো নাকি! ----সে তো জানি, তোর ক্ষমতা নেই!----ব্যাপারটা ক্ষমতার নয়, আমি আদরটা ঘরের ভেতরে করাই পছন্দ করি, যেখানে তোর আমার মধ্যে একটা মাছিও না ঘ্যানঘ্যান করতে পারে। শুধু তোর শ্বাসের আওয়াজ আর বুকের স্পন্দনটুকু ছাড়া আমাদের মধ্যে আর কিচ্ছু আসবে না।আমাদের গরম নিঃশ্বাস টুকু একে অপরের কাঁধে গিয়ে পড়বে, আমাদের বুকের ভেতর জমানো বরফ ধীরে ধীরে গলে যাবে, যেভাবে মোমবাতি গলে দেশলাইএর কাছে এলে....----অনেক রাত হলো, আমরা কি ঘুমাবো না আজ?---- অপেক্ষা করছি, ঘুমো...·খুব খুব খারাপ লাগে এই একবিংশ শতাব্দীতেও যখন এই ধরনের ঘটনা চোখে পড়ে। খুব খাঁটি কথা । সত্যি একটা মানুষের যোগ্যতার বিচার তার বাহ্যিক সৌন্দর্য্য কেন হবে? কেন একটি মেয়েকে সারাজীবন তার গায়ের রঙের জন্যে আত্মীয়, পাড়াপ্রতিবেশিদের থেকে কটু কথা শুনতে হবে?   আলমারির এই চাবিনিরপেক্ষ দেরাজে আলো নেই, অন্ধকারও নেই। আত্মনিরোধের রশি দেয়াল টাঙিয়ে দিচ্ছে তুমি এবং তুমির মধ্যে। দৌড়ে চলে গেল কয়েকটা ধাঁধা মশকরা, বাদামি ইয়ার্কিতে ঢেকে যাচ্ছে চোখ।

              আর খোলা ভেঙে শাঁস বের করে আনতে আনতে কেউ একটা ঘেমে উঠল। তুমি অথবা তোমার চাইতেও তীব্র ওপেক কোনও ছায়ার এই সুচ তোমার পিঠের ওপর কাঁথাস্টিচের ফোঁড় তুলেই যাচ্ছে। কফিনের ভেতর যাকে বন্ধ করে রেখেছ, সে তো শুধু গলার স্বর। এগ চিলি কয় যাহারে....নিন্দুকেরা কহিলো বটে তীরের মতো বাক্যি....বাস্তবে প্রতিটি নিন্দুক এক একখানি ঝানু তীরন্দাজ। তবে আহারের পরে মুখমণ্ডলে যে তৃপ্তির প্রভা দেখিয়াছি তাহাতে আমার মনে হইলো আমিও কি দিনে দিনে শ্রীমান পলাশ বর্মন হইয়া যাইতেছি। তবে আমার খাদ্য সেই কদ্দু আর সজিনার ডাঁটাই।বিষণ্ণ মনভার সকালের পাশে খুব আলগোছে এসে যে ভেজা পাতাটি বসেছিল আলোফোটার আগেই, তাকে বোলো এবছর একটিও শিউলি ছুঁইনি আমি। তবু তারই গন্ধ স্মৃতির ভিতর টুপটুপ হিমের শব্দে। কানে শুনিনি অথচ বুকের মধ্যে গানের সুরগুলো ঘুমোতে দেয়নি এবারেও। দ্যাখো, পায়ের অপারেশনের পর একটানা হাঁটতে পারি না কতদিন। অথচ মনে মনে যোজন পথ নদীতীর ধরে আমবাগানের পাশ দিয়ে রাধামাধবের মন্দির ছুঁয়ে ঠাকুরদালান অব্ধি দিব্যি যেতে পারি, নির্ভার। সেখানে ধূ ধূ কাশবনের দুলে ওঠার পাশে রঙ লাগছে কাদামাটির কাঠামোয়। অনন্ত ফ্রিজশটে থেমে আছে সময় ও স্থপতির মুখ সারিসারি! জানি সেই মুখগুলোর কেউই প্রায় নেই আর এখন। অথচ আছে। প্রত্যেকে। নেই হয়ে যাওয়া বিরাট বকুল গাছটার মতই অনুভবে ডালপালা শিকড়েবাকড়ে! খুব নির্জনতা ভিতর থেকে একা করে দেয় এখন। স্তব্ধও করে দেয় উৎসব আবহে। নেই অথচ আছ, আছ অথচ নেই---- এই দুই অপ্রকাশ্য ব্যথার আড়াল আলোড়িত করে প্রবল। স্পর্শাতীত দূরে চলে গেলে বিনিময়হীন অক্ষরমালার ওপর কেবল অসময়ের বৃষ্টিফোঁটা ঝরতেই থাকে।চলো, ভিজি। এখন তো তোমার অসুখ সম্পূর্ণ সেরে গেছে বাবি! তুমি ভালো আছ,বল? এসো, হাত ধরো---! দূূর্গা না, দুর্গা। পুজা না, পূজা। অঞ্জলী না, অঞ্জলি।ধর্মটা আপনার হইতে পারে, কিন্তু ভাষাটা আমারও মাতৃভাষা। এইটারে হেলাফেলা কইরেন না। আঁতে লাগে। 


     

               বিজ্ঞাপনের পাতায় কেন যে পিয়ানোর সন্ধানে এত ছানবিন, এত পুছতাছ! বরং ছেড়ে দাও একটা বেড়াল। বরং সে-ই খুবলে তুলুক দু-চারটে আঁশ। ছবির থেকে পিছলে যাচ্ছ তুমি, আর দেয়াল খুঁড়তে খুঁড়তে পিছলে যাচ্ছে শাবল। শুধু ঘুমের ভেতর একটা হাওয়া ঢুকে যাচ্ছে, আর অতিজাগরণের এই গুগলি খেলতে গিয়ে তোমার ব্যাট শূন্য থেকে টেনে নামাচ্ছে অম্লবৃষ্টি, অথচ তুমি বোধহয় জানতেও পারোনি, এতদিন তোমার গায়ের সঙ্গে সেঁটে যে দঁড়িয়েছিল, যাকে খুলতে খুলতে তুমি গুঁড়োগুঁড়ো করে ফেলেছ পিলসুজ থেকে পিচকারি অব্দি, সেও সম্ভবত তুমিই ছিলে আলমারির এই চাবিনিরপেক্ষ দেরাজে আলো নেই, অন্ধকারও নেই। আত্মনিরোধের রশি দেয়াল টাঙিয়ে দিচ্ছে তুমি এবং তুমির মধ্যে। দৌড়ে চলে গেল কয়েকটা ধাঁধা মশকরা, বাদামি ইয়ার্কিতে ঢেকে যাচ্ছে চোখ। আর খোলা ভেঙে শাঁস বের করে আনতে আনতে কেউ একটা ঘেমে উঠল। তুমি অথবা তোমার চাইতেও তীব্র ওপেক কোনও ছায়ার এই সুচ তোমার পিঠের ওপর কাঁথাস্টিচের ফোঁড় তুলেই যাচ্ছে।       

             ঝড় আসলে তোর খুব প্রেম পায়। জ্বর আসলে তোর খুব আম্মার হাত পায়। মনে হয় মাথায় কেন নাই ওই হাত। আবার জ্বর আসলে খুব জেদও ওঠে। এর মধ্যে এক বান্ধবীর কথা বলি। সে  কইলো কথায় কথায় তার বর-এর সাথে সে বাইরে ঘুরতে গেছিলো। এর মধ্যে তার মিন্সট্রেশন শুরু হইসে। সে ভয়ে রেস্টুরেন্টে খেতেও পারতেসেনা, বসতেও পারতেসেনা। তো আমি বললাম তুই তর বররে বলবি না, আজব! সে কইলো, ও এসব পছন্দ করে না। খুব বকাবকি করে। শুনে আমি থ! এটাতে পছন্দ অপছন্দের কিছু তো আমার বোঝার বাইরে। নরমাল ব্যাপার। এতে সহযোগিতা করার চাইতে বেশি পছন্দ অপছন্দ ক্যামনে! তো জিজ্ঞেস করলাম, ক্যান তর বর পাঁঠা নাকি যে ন্যাচারাল প্রবলেম বুঝবে না? তো পাঁঠা শুনে আমার পাঁঠির খুব গায়ে লাগাতে সে ফোন রেখে দিলো। 

              এইবার আমার কথায় আসি। একদিন বিকালে খুব খারাপ লাগতেসিলো। আম্মা মারা যাবার পরপরই। তো আমার খুব কাছাকাছি ক্লোজফ্রেন্ড বলতে কমল ই থাকে। আমি কমলরে ফোন দিলাম। কমল বল্লো তুই দশ মিনিট পর বের হ, আমি  বাসায় আসছি, ফ্রেশ হয়েই নামতেসি। বের হইলাম, এসে দেখি কমল ও চলে আসতেসে। আমরা চা খাইতেসি দাড়ায়া চায়ের দোকানে। এর মধ্যেই আমি বুঝলাম আমার শরীর খারাপ হইতাসে। তো আমি চা শেষ কইরা কমলরে বললাম দোস্তো, একটু বাসায় যেতে হবে। ও অবাক, বলে তুই আমাকে নামাইলি ক্যান তাইলে। দশ মিনিট হয় নাই। কাছাকাছি একটা রোম পুড়ে যাচ্ছে,তুমি নাই নাই করে উড়ে যাচ্ছে সমস্ত বুধবার।

              বললাম একটু ঝামেলা হইসে। ঘাড়ত্যাড়ায় কয়, বল আগে কী হইসে, শুনি। বললাম আমার শরীর খারাপ হইসে, কোথাও বসা যাইতেসে না। ও প্রথমে বুঝে নাই, পরে নিজে দৌড়ায় গিয়ে প্যাড কিইন্যা আইন্যা দিসে। টোকিও স্কয়ারে গিয়ে আমি নিজে ঠিকঠাক হয়ে আমরা হাঁটলাম। এরপর ও আমাকে বাসা পর্যন্ত দিয়ে গেল। সিকিম যাবার পরেও এই ঘটনা। দাদা, আপারা আলাদা, খাবার হোটেল খুঁজতেসে গ্যাংটকে। আমি উপায় না দেখে দাদাকে কল দিলাম। আপা আর দুলাভাই ওয়াশরুমে। তো শাহরুখ খানভাই সেইখানে কোত্থেকে খুঁজে এনে দিলো। আমি এক হোটেলে গিয়ে চেঞ্জ করে নিলাম। এমনিতে শাহরুখ আমাকে সিমরন ডাকে। এর মানে ঘষেটি বেগম। কারণ সে কিছু করলেই আমি সেইটা পুরা গ্রুপে বলে দেই। সারাক্ষণ আমরা মারামারি করতেই থাকি। আরেকবার, ঝিগাতলায় একই ঘটনা। আমি নিজে গিয়ে কেনার অবস্থায় ছিলাম না। ঝিগাতলায় সলমানরা থাকে, তো সলমানকে ফোন দিয়ে বললাম, সে দৌড়াতে দৌড়াতে নিয়ে আসলো। ওইখানে একটা ক্যাফেতে গিয়ে আমি বাঁচলাম। এরা বন্ধু। এরা খাঁটি বন্ধু। আমার এদের নিয়ে প্রাইড হয়। যা বেসে বোঝাতে হয়,সে ভালোর কোন বাসা নেই, যে ভালোকে বুঝতে সব বাসা ছাড়া যায়, তাকে বাসতে হয় নাকি?

              যে মানুষকে মাথায় তুইলা রাখবেন, তার প্রধান ও একমাত্র কাজ মাথায় দাঁড়ায়া কপালে লাত্থি আর চোউক্ষে গুতা দেওয়া। যে কোন সময় মুতে (ভদ্র ভাষায় সুসু ও হিসু পড়ুন) দিলেও বলার কিছুই...অ...আরেকখান কথা! আবেগ থেকে 'আ' ঝইরা যাওয়া মানুষের কেবল বেগ থাকে। আর এই সমস্ত চাপ সামলানো মানুষগুলা একটু হাসলেই কত কত জনের পিত্তি জ্বইলা যায়! পিত্ত পোড়া মানুষের হজমে সমস্যা হবেই, নতুন কিছু না..জনস্বার্থে ট্যান্টানায়ায়ায়া....

            যাঁদের স্যানিটারি ন্যাপকিন শুক্রবার বেরিয়েছে, অথচ এখনো পাননি। উদ্বিগ্ন হবেন না। শনি/রবি দুদিন  ছুটি থাকায় দেরি হচ্ছে। এই দেরি সম্পূর্ণ রূপে  অফিস সংক্রান্ত বিষয়।যে বিলের ছবি দেওয়া হয়েছে, সেখানে ট্র‍্যাকিং নাম্বার রয়েছে। অনুগ্রহ করে একটু ট্র‍্যাকিং করে অবস্থান জেনে নেবেন।  তার জগতে, তার ঈশ্বরের জগতে, আমি দুদণ্ড বসতে এলাম পার্কে অপ্রয়োজনীয় লিঙ্গমূর্তি সে অফিসে গেছে, তার জগতের চাবি রেখে গেছে বলেছে মাঝে মাঝেই মনেও করিয়ে দেবে, সে ছিল, সে আছে আস্তিকের যেমন বিশ্বাস নাস্তিকের শুকনো নিঃশ্বাস তার বাগানের ফুলে ফেলে ফেলে আমি ক'মিনিট বসতে এলাম এই যে শহর, কখনো কখনো অন্ধের মতোন একজন মানুষকে বিশ্বাস করলে, একটা সময় সূর্যের ফকফকা আলোতেও অন্ধকারাচ্ছন্ন কুয়াশা ছাড়া কিছুই দেখতে পাওয়া যায় না। কারণ, মানুষ যেমন ভালোবাসে আবার এই ভালোবাসার ছলে ঠকিয়েও দেয় কেউ ধরতে পারে কেউ পারে না ।..

              এই উপুড় শহর, তাতে লিভারে উঠলে ব্যথা সে আমায় ডাকে আস্তিকের যেমন বিশ্বাস বলে যে যেমন খুশী ওষুধ লিখলে আমি, পিয়ন পাঠিয়ে তখনি আনিয়ে নিয়ে নির্দ্বিধায় খাবে আস্তিকের যেমন বিশ্বাস আমি কত কত ঘরে অশোক সরিষামুঠি খুঁজে ফিরি শিশুটির নিরাময় তরে আমি যাই গুগলেরও কাছে বলো সেই অসুখের আরোগ্য আছে? সে তো সেই বিধুর প্রেমিক সেই সেভারাস স্নেপ হঠাৎ টেক্সট এ বলে বালকের চোখ তার মায়ের মতন হঠাৎ টেক্সট এ বলে, আশীর্বাদ করবে শিশুকে! আমরা ইউ নো হু-র ভীষণ বিরোধী লড়তে লড়তে আর দৈবী বাগানের দূরে যেতে যেতে আশীষের ফুলটুকু মাথায় ছুঁইয়ে দিয়ে ডায়েরির পাতায় রেখে দিই নাস্তিকের যেমন বিশ্বাস সারা গায়ে জেগে ওঠে মেঘের মতো সুদৃশ্য ছত্রাক। ধবধবে টেবিলক্লথে ছলকে পড়া কফিদাগ মন। খুলে রাখা, ভুলে যাওয়া কলমের কালি মেখে চাইছে দু’চোখ। শিরা বেয়ে হাতে নেমে যেদিকে যা ছুঁই− বিছানার চাদর, হিসেবের খাতা, ইরটিক বই − এ শহরে দিন কাটে, চারিদিকে ওড়ে শুধু কালোকালো ছোপ। পা বেয়ে শরীরে ঘুমোতে যায় উল্কিস্মৃতি, আমার প্রিয় শহর। রোজ রাতে একে একে লাইন করে সাজানো হয় ফুটপাথ। আঁটোসাঁটো পোষাক, মুখ বাঁধা, ভেতরের কথা যেন বেরিয়ে না আসে। সারি সারি কালো নীল সবুজের গারবেজ ব্যাগ। রাতারাতি পাচার হয়, শহরের নিকোনো উঠোন। এসবের নীচে চাপা পড়ে থাকে বহু সংসার। ছেঁড়া দস্তানা, কুড়োনো টয়েলেট পেপার, ভাঙা কাপ, খুচরো সেন্ট, আধপোড়া সিগারেট, গোলাপী খরগোশ। যে মানুষ ঘরছাড়া, আবর্জনার শেষে তার প্লাস্টিক বাড়ি। প্রতিরাতে হানাদার ফাঁকি দিয়ে পলাতক বাড়ি দেখি সকালের ট্রেনে। শহরের সূর্যমুখী ক্ষত সারাদিন বাঁচে, মরে রোজ রাতে। রাত্রি হ’লেই সব ঝকঝকে, তকতকে।

              সব জলোচ্ছ্বাস ফিরে গেলে শুধু পদচিহ্ন থেকে যাবে উঠোনে, বারান্দায়, আর ঘরের একাকী মেঝেতে। দুলে দুলে বাতাসে ভাসবে শরতের সাদা কাশফুল আর সাদা ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘেরা ঘুরে ঘুরে কবিতা পড়বে সারাটা কাশময়।নিবিড় সে সন্ধ্যেবেলায়, চৌকাঠে ঝরিয়ে টুপটাপ শিউলি শরীর তুই বলবি, যাই নি তো কোত্থাও, এই দ্যাখ, ঘ্রাণ হয়ে রয়ে গেছি তোর প্রতিটি নিঃশ্বাসের ভিতর। ছাইরঙ টিশার্টের ভেতর ঘন অন্ধকার অভিমান ধীরে ধীরে অনুরাগ জোছনা হয়ে উঠবে সারাটা আলমারি জুড়ে। এমন করেই রাত থেকে ভোর হবে, বুকের দূর্বাঘাসে শিশির ঝরবে টুপ টাপ।  বিসর্জনই দেখেছিলে হে মন, অথচ কী ভীষণ সত্যি ছিল প্রতিটি আরাধনা ক্ষণ।ভালবাসলে নাকি নদী কথা বলে! আমি ভালবাসার জন্য সপ্ত নদীর ধারে হেঁটে চলেছি অবিরত স্রোতে ভেসেও চলেছি তবু নদী কথা বলেনি ভালবাসলে নাকি পাথরে ফুল ফোটে আমি ভালবেসে অহল্যা হয়েছি ফুল ফোটার বদলে পাথর হয়ে অপেক্ষায় ভালবাসলে নাকি বৃষ্টি নামে আমি বৃষ্টি ভিজব বলে পথে শরীর ঝলসে গেছে তবু বৃষ্টি নামেনি এরপরেও তুমি বলবে প্রেমের গান লেখ! তবে আমার ধারণা, এও কোন 'জংগল গাছ'ই হবে, আমি সাধারণত: কোন তথাকথিত জংগলি গাছ বা আগাছা উপড়ানোয় ঘোরতর আপত্তি জানিয়ে থাকি, এটাও সেরকম কিছুই হবে, এবার আজ এসব অদ্ভুতদর্শন বীজ, ফল দেখে কী গাছ, কবে এল, এসব প্রশ্নবাণে খোঁচায়িত হয়ে বল আমার কোর্টে ঠেলে দিলেন!          

              মূল প্রসঙ্গে আসি। আমিও স্কার্ট পরা বা লেগিংস সামান্য তোলা ছবি এক/দু’বার  দিয়েছি। তাই বলে কেউ কেউ হয়ত মনে করেন যে নিয়মিত খুব সংক্ষিপ্ত পোশাকের ছবি না দিলে ‘নারীবাদ’ সম্ভব নয়, তেমনটা আমি ভাবি না। আমার  আরো দু’টো লক্ষী মেয়ে আছে।  সুরভি আর সুবাসিনী । ওরা পশ্চিমে থাকে। খুব মেধাবী ও পরিশ্রমী । ওরা কিন্ত ‘দ্যাখো, নারীবাদী হলে ইহা ইহা পরিতে হয়’ বলে পশ্চিমা পোশাকে ছবি দেয় না। ওরা পশ্চিমে ওদের সমুদ্রতীরের  স্বাভাবিক যেসব ছবি দেয় সেসব ছবির কোনো কোনোটির পোশাক আমাদের দৃষ্টিতে ‘সংক্ষিপ্ত’ হলেও আমাকে বিরক্ত করেনি। কারণ আমি জানি সুরভি বা সুবাসিনী কেউই নিজেকে ‘নারীবাদের আইকন’ প্রমাণে এগুলো পরছে না। পশ্চিমবঙ্গের অনেকের কাছে 'বাঙাল ভাষা'টা এখনই বেশ একটা একজোটিক ভাষা । অনেকে বেশ মজা পায় ভাষাটা শুনলে। যেন দূর দেশের ভাষা এটি, যেন অচেনা কিছু। ঘটিরা রিলেট করতে পারে না। পূর্ব বঙ্গ থেকে আসা লোকেরা রিলেট করতে পারে বটে, তবে তাদের ছেলেমেয়েরা অনেকটাই কম পারে, নাতিপুতিরা তো পারে না বল্লেই চলে।  দিন যত যাবে, তত তাঁরা গত হবেন , তত এই ভাষাটা আরো বেশি অন্য দেশের, অন্য কালচারের, অন্য ধর্মের, অন্য মানুষের ভাষা হয়ে উঠবে। কলকাতার বাঙালি মুসলমানরা বাঙাল ভাষায় কথা বলে না। মু্সলমানদের  সংগে মেলামেশা না করা বাঙালি হিন্দুর কাছে মুসলমান মানেই একজোটিক, যে ভাষায় তারা কথা বলে, সে ভাষায় একজন মুসলমান কী করে কথা বলবে? এই ভাষা তো হিন্দুদের। মুসলমান হয় উর্দু বলবে, নয়তো 'বাংলাদেশের ভাষা' বলবে। কলকাতায় আমার বাঙালি মুসলমান বন্ধুরা এমনই ভয়ঙ্কর বাঙালি এবং এমনই প্রচণ্ড ঘটি যে বাস কে বাশ বলে, শশিকে ছছি বলে। মর্ত্যের দেবীরা ভালো নাই  ;জীবন কেটে কেটে বিক্রি করে আমাকে, টুথপেস্ট আঁকা শহরে তবু দাগের মতো ফিরি করি ভালোবাসা । একদিকে রোহিত আর একদিকে স্মিথ ; গ্রেটেস্টরাই ডবলের পর ডবল করে..দ্বিপ্রাহরিক হাওয়া এসে পিঠে টোকা মারে হু হু স্বরে বলে, 'ভালো আছো?' বসন্তের দিন বুঝি শুরু হ'লো,এইবার--, বুক জুড়ে জেগে ওঠে দিনাবসানের গান, জেগে ওঠে ছোটো বড় নানা অভিযোগ, হাওয়া শোনে না সেইসব, পথচারী ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে যায় দূরে, দূরান্তরে আরেকজনের পিঠে হাত রাখে,আনুপূর্বিক স্বরে বলে, ' ওহে কেমন আছো?' 


     

  • জয়িতা ভট্টাচার্য | 27.58.255.50 | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৯:৩৪734850
  • জয়িতা ভট্টাচার্য নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

     

    জয়িতা : কবিতা না গদ্য-- গদ্যের ক্ষেত্রে প্রবন্ধ না গল্প-উপন্যাস ---তুমি নিজে কোনটা লিখতে বেশি পছন্দ করো।


     

    মলয় : আমার নিজের তেমন কোনো প্রেফারেন্স নেই । নির্ভর করে মগজের ভেতরে একটা বিশেষ সময়ে কি ঘটছে । প্রবন্ধ লিখি মূলত সম্পাদকদের অনুরোধে । এখন আর প্রবন্ধ লিখতে ভালো লাগে না, প্রাবন্ধিকের সংখ্যা কম বলে সম্পাদকরা প্রবন্ধ চান, এমনকি সম্পাদক নিজে কোনো বিষয় বেছে নিয়ে লিখতে বলেন। তা কি পারা যায় ? এখন তেমন পড়াশোনা করতে বা সমাজ নিয়ে ভাবতেও ভালো লাগে না । ফিকশান লিখি, কোনো একটা ব্যাপার স্ট্রাইক করলে লিখতে থাকি, অভিজ্ঞতায় তো মাল-মশলার অভাব নেই, নিজের জীবন থেকে কতো চরিত্র তুলে আনা যায় । কেউ চাইলে দিই । কবিতা তো অ্যাডিকশান, যখন নেশাটা পেয়ে বসে তখন না লিখে নিস্তার নেই । সেগুলোও ইমেলের বডিতে লিখে রাখি, কেউ চাইলে পাঠাই , আমার মনে না ধরলে ডিলিট করে দিই। ইন ফ্যাক্ট যে চায় তাকেই পাঠাই, কোনো বাদ বিচার করি না। অনেকে বিষয়বস্তু বলে দেন, তখন গোলমালে পড়ি, কেননা আমি তো বিষয়কেন্দ্রিক কবিতা লিখি না ; নিজের ইচ্ছেমতন লিখি, কারোর পছন্দ হোক বা নাহোক । কবিতার খাতা বলে আমার কোনো ব্যাপার নেই,  ২০০৫ সালের পর থেকে, অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির পরে ভুল ওষুধের দরুন আরথ্রাইটিস হল । , তারপর হাঁপানিতে ধরল, হার্নিয়া, প্রোস্টেট, ভেরিকোজ ভেইনস । আরথ্রাইটিসের কারণে লেখালিখির বাইরে চলে যাচ্ছিলুম, সে কষ্ট তুই বুঝতে পারবি না । মগজের ভেতরে লেখার ঘুর্ণি হয়ে পাক খাচ্ছে অথচ কিছুই লিখতে পারছি না । তারপর মেয়ের উৎসাহে কমপিউটার শিখলুম, বাংলা টাইপ করতে শিখলুম, ডান হাতের মধ্যমাটা কম আক্রান্ত, সেটাই টাইপ করতে ব্যবহার করি । ছেলে এই কমপিউটারটা দিয়ে গেছে, ছুটিতে এলে পরিষ্কার করে দিয়ে যায় । মাঝে তো তিন-চার বছর লেখালিখি করতেই পারিনি আঙুলের সমস্যার জন্য ।


     

    জয়িতা : তোমার বিভিন্ন উপন্যাস পড়লে দেখা যায় প্রতিটির ন্যারেটিভ টেকনিক ও আঙ্গিক এ ভিন্নতা । ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ থেকে ‘জলাঞ্জলি’, ‘নামগন্ধ’, ‘ঔরস’, ‘প্রাকার পরিখা’, সবগুলো একই চরিত্রদের নিয়ে এগিয়েছে, একটাই উপন্যাস বলা যায় তাদের, কিন্তু তুমি প্রতিটির ফর্ম আর টেকনিকে বদল করতে থেকেছো । কেন ? তারপর, ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ উপন্যাসে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন টেকনিক প্রয়োগ করলে, তিন রকমের বাংলা ভাষার খেলা দেখালে। ‘নখদন্ত’ উপন্যাসে বেশ কয়েকটা ছোটোগল্প আর নিজের রোজনামচার অংশ ঢুকিয়ে দিয়েছ । এই বিষয়ে কিছু বলো । এটা কি সচেতন প্রয়াস?


     

    মলয় : হ্যাঁ । পাঁচটা মিলিয়ে একটা অতোবড়ো উপন্যাস তো কেউ ছাপতো না, তাই বিভিন্ন সময়ে আলাদা-আলাদা করে লিখেছিলুম । ‘ডুবজলে’ উপন্যাসটা সহকর্মীদের নিয়ে লেখা, ক্রমে জানতে পেরেছিলুম যে কয়েকজন গোপন মার্কিস্ট-লেনিনিস্ট । পাঁচটা আলাদা উপন্যাস লিখতে পেরে একদিক থেকে ভালোই হলো, সব কয়টায় নতুনত্ব আনতে চেষ্টা করেছি । ব্যাপারটা মগজে এলে বেশ কিছুকাল ভাবি আঙ্গিক নিয়ে, উপস্হাপন নিয়ে, তারপর লেখা আরম্ভ করি । অনেক সময়ে লিখতে লিখতে আপনা থেকেই একটা আঙ্গিক গড়ে ওঠে, যেমন ‘নখদন্ত’ বা ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ । ‘নখদন্ত’ বইটার জন্য পশ্চিমবঙ্গে ট্যুর করার সময়ে চটকল আর পাটচাষ-চাষিদের নিয়ে প্রচুর তথ্য যোগাড় করেছিলুম । তেমনিই ‘নামগন্ধ’ লেখার সময়ে পশ্চিমবঙ্গের আলুচাষি আর কোল্ড স্টোরেজের তথ্য সংগ্রহ করেছিলুম । এই বইদুটোয় বেশ কিছু চরিত্র চোখে দেখা । অভিজ্ঞতার বাইরেও লিখেছি, যেমন ‘জঙ্গলরোমিও’, একদল ক্রিমিনালের বিস্টিয়ালিটি নিয়ে । টানা একটামাত্র বাক্যে ফিকশান লিখেছি ‘নরমাংসখোরদের হালনাগাদ’, এটাও জাস্ট ইম্যাজিনেটিভ, পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক বিভাজন নিয়ে । ‘হৃৎপিণ্ডের সমুদ্রযাত্রা’ রবীন্দ্রনাথের দাদুর দেহ ইংল্যাণ্ডের কবর থেকে তুলে হৃৎপিণ্ডে কেটে কলকাতায় নিয়ে আসার কাহিনি, রবীন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথের বাবারও সমালোচনা করেছি ফিকশানটায় । রবীন্দ্রনাথের দাদু যদি আরও দশ বছর বাঁচতেন তাহলে পশ্চিমবাংলার ইনডাস্ট্রি উন্নত হতো । সেসময়ে ওনাকে ফালতু বাঙালিরা আক্রমণ করেছিল চরিত্রের দোষ দিয়ে অথচ এখনকার ভারতে প্রতিটি পুঁজিপতি ওনার তুলনায় হাজারগুণ চরিত্রদোষে দুষ্ট, এমনকি তাদের মধ্যে জোচ্চোর, কালোবাজারি, চোরাইমালের কারবারি, দেশ ছেড়ে পালানো বজ্জাতরাও আছে । ডিটেকটিভ উপন্যাসটা লিখেছিলুম চ্যালেঞ্জ হিসেবে, কিন্তু সেটাতেও আমি ভারতের সমাজকে টেনে এনেছি । রাজনীতি আর সমাজকে বাদ দিয়ে উপন্যাস লিখতে পারি না, দীর্ঘ গল্প ‘জিন্নতুলবিলাদের রূপকথা’ জীবজন্তু-পাখিদের নিয়ে,  কিন্তু তাও পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক ঘটনাবলী আর চরিত্রদের নিয়ে ।  ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসটা হাংরি আন্দোলনের সময়ের জীবনযাপন নিয়ে । ‘আঁস্তাকুড়ের এলেক্ট্রা’ বাবা আর মেয়ের যৌন সম্পর্ক নিয়ে । নেক্রোফিলিয়া নিয়ে লিখেছি ‘নেক্রোপুরুষ’, সময়ের স্হিতিস্হাপকতা নিয়ে লিখেছি ‘চশমরঙ্গ’ । 


     

     

    জয়িতা : পোষ্টকলোনিয়াল বা কমনওয়েল্থ লিটেরেচারের ক্ষেত্রে সলমন রুশডিকে আদর্শ পোস্টমডার্ন নভেলিস্ট বলে কি তুমি মনে করো ?


     

    মলয় : রুশডি একজন ম্যাজিক রিয়্যালিস্ট ঔপন্যাসিক, মার্কেজ প্রভাবিত । যতোই জটিল হোক, পাঠক ঠিকই বুঝতে পারে, যেমন ‘স্যাটানিক ভার্সেস’-এর ক্ষেত্রে । আমেরিকার আলোচকরা ম্যাজিক রিয়্যালিজমকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চায় না, কেননা টেকনিকটা তাদের দেশে গড়ে ওঠেনি, তাই ম্যাজিক রিয়্যালিস্ট লেখকদেরও পোস্টমডার্ন বলে চালাবার চেষ্টা করে । পোস্টমডার্ন উপন্যাসের কিছু সূক্ষ্ম উপাদান থাকলেও রুশডির ফিকশানকে পোস্টমডার্ন তকমা দেয়া উচিত হবে না । গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজকে পোস্টমডার্ন বললে স্প্যানিশ আলোচকরা বুল ফাইটের ষাঁড় লেলিয়ে দেবে ।


     

    জয়িতা : তোমার গদ্যে প্রথাগত প্রেম আসেনা । নেই স্টিরিওটাইপ প্রটাগনিস্ট । সেটা কি সচেতন ভাবে পরিহার করেছো স্বকীয়তা আনতে? ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ উপন্যাসে মানসী বর্মণ, শেফালি, জুলি-জুডি ; ‘নামগন্ধ’ উপন্যাসে খুশিরানি মণ্ডল, ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটায়’ কেকা বউদি, ‘ঔরস’-এ ইতু, এরা একজন আরেকজনের থেকে পৃথক এবং কেউই স্টিরিওটাইপ নয় । এমনকি উপন্যাসের শেষে চমক দিয়েছ যে খুশিরানি মণ্ডলকে পূর্ববঙ্গ থেকে তুলে আনা হয়েছিল, সে প্রকৃতপক্ষে জনৈক মিনহাজুদ্দিন খানের নাতনি । আত্মপরিচয় নিয়েও খেলেছো খুশিরানি মণ্ডলের ক্ষেত্রে, সে নিজের উৎস না জেনেই লক্ষ্মীর পাঁচালী পড়ে, ব্রত রাখে, চালপড়ায় বিশ্বাস করে । মলয়রচনার আঙ্গিক সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত জানতে চাইবো ।


     

    মলয় : তার কারণ আমি প্রথাগত প্রেম করিনি আর দ্বিতীয়ত উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ব্যাপারটা ইউরোপ এনেছিল, মেট্রপলিটান সিংহাসনের প্রতীক হিসাবে । বয়সে আমার চেয়ে বড়ো নারীরা আমার জীবনে প্রথমে প্রবেশ করেছিলেন । তাই হয়তো যুবকের চেয়ে যুবতীর বয়স বেশি হয়ে যায়। নারী চরিত্রগুলোয় আবছাভাবে কুলসুম আপা আর নমিতা চক্রবর্তীর উপস্হিতি রয়ে যায় । হাংরি আন্দোলনের সময়ে যে যথেচ্ছ জীবন কাটিয়েছি, তার ছাপও নারী চরিত্রদের ওপর রয়ে গেছে । খুশিরানি মণ্ডলের মাধ্যমে দেখিয়েছি যে নিজের আইডেনটিটি ব্যাপারটা কতো গোলমেলে । এখনকার ভারতীয় সমাজের দিকে তাকিয়ে দ্যাখ, আইডেনটিটি পলিটিক্সের দরুন সমাজ ভেঙে পড়ছে, প্রতিনিয়ত লাঠালাঠি হচ্ছে, দলিতদের পেটানো হচ্ছে, মুসলমানদের ঘরছাড়া করা হচ্ছে । গোরুর মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে কতো লোকের জীবিকা নষ্ট করা হয়েছে । ইসলামে শুয়োর মাংস নিষিদ্ধ, কিন্তু দুবাইয়ের মলগুলোয় শুয়োরের মাংস বিক্রির আলাদা এলাকা আছে । আইডেনটিটি পলিটিক্স থেকে আমরা পৌঁছে গেছি জিঙ্গোইজমে । আমার বিয়ের কথা বলি ; আমি সলিলাকে বিয়ে করেছি তিন-চার দিনের আলাপের মধ্যেই, দুজনে দুজনকে হঠাৎই ভালো লেগে গিয়েছিল। এই নিয়ে একটা দীর্ঘ স্মৃতিকথা লিখছি, ‘আমার আজব বিয়ে’ নামে, অজিত বলেছে বই হিসেবে বের করবে । সলিলার মা-বাবা ছোটোবেলায় মারা গিয়েছিলেন ; তাই শাশুড়ির আদর খাবার সুযোগ হলো না আমার । 


     

    জয়িতা : ‘ডুবজলে’ উপন্যাসে টেবিলের ওপরে রাখা মানসী বর্মণের পাম্প দিয়ে বের করা দুধ অতনু চক্রবর্তী টুক করে চুমুক দিয়ে খেয়ে নিয়েছিল । এটা কেন ?


     

    মলয় : অতনুর মা সম্প্রতি মারা গিয়েছিলেন, সে কয়েকমাস মিজোরামে জুলি-জুডি নামে দুই সৎবোনের সঙ্গে যৌনজীবন কাটিয়ে পাটনায় ফিরে মানসিক গুমোটের মধ্যে আটক হয়ে গিয়েছিল। দুধটা দেখে আপনা থেকেই মায়ের অনুপস্হিতি তার মনে কাজ করে ওঠে । পরে ‘ঔরস’ আর ‘প্রাকার পরিখা’ উপন্যাস দুটোয় মানসী বর্মণ আর অতনু চক্রবর্তীর জটিল যৌন সম্পর্ক গড়ে ওঠে, ওরা তখন ঝাড়খণ্ডে মাওবাদী জমায়েতে যোগ দিয়েছে ।


     

     

    জয়িতা : বাংলা সাহিত্যে বিশ্বায়নের প্রভাব কতটা প্রতিফলিত বলে তোমার মনে হয় ? বিশ্বায়নের রেশ ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয় তোমার ?


     

    মলয় : এখনকার ব্যাপারটা বলতে পারব না । আমি আর বিশেষ পড়াশুনার সময় পাই না । বুড়ো-বুড়ি মিলে সংসার চালাতে হয় বলে সময়ের বড্ডো অভাব, বাজার করা, ঝাড়-পোঁছ, কুটনো কোটা, রান্নায় হেল্প ইত্যাদি । বিশ্বায়নের পর যে সব বাংলা উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে তার কিছুই প্রায় পড়িনি,  বিশ্বায়ন তো বলতে গেলে ব্রেক্সিট আর ট্রাম্পের গুটিয়ে ফেলার রাজনীতির দরুন উবে যেতে বসেছে, কেবল চীনই আগ্রহী ওদের মালপত্তর বিক্রির জন্য, আমাদের দেশের বাজার প্রায় কবজা করে ফেলেছে চীন । তবে ঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্য তো ইউরোপের অবদান । বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাস লেখা আরম্ভ করেছিলেন ইউরোপীয় ফর্মে । মাইকেল অমিত্রাক্ষর আরম্ভ করেছিলেন ইউরোপের ফর্মে । তিরিশের কবিরা কবিতা লেখা আরম্ভ করেছিলেন ইউরোপের ফর্মে, এমনকি জীবনানন্দের কবিতায় ইয়েটস, বিষ্ণু দের কবিতায় এলিয়টের উপস্হিতি খুঁজে পান বিদ্যায়তনিক আলোচকরা । ব্রিটিশরা আসার আগে আমাদের সাহিত্যধারা একেবারে আলাদা ছিল । প্রতীক, রূপক, চিত্রকল্প, মেটাফর ইত্যাদি ভাবকল্পগুলো তো ইউরোপের অবদান । আধুনিক সঙ্গীত সম্পর্কে আমার জ্ঞান নেই, কিন্তু অনেকে রবীন্দ্রনাথের গানে ইউরোপের প্রভাব পান, এমনকি হুবহু গানের সুরের নকল । কবির সুমন আসার পর গানে রদবদল হলো।


     

    জয়িতা :  শূন্যদশকের কবি সাহিত্যিকদের কাছেও পুনরাধুনিক ,উত্তরাধুনিক বা আধুনান্তিক সাহিত্য সম্পর্কে ধোঁয়াশা। এর কারণ কি বলে মনে হয় ? বাংলা সাহিত্য সামগ্রিকভাবে আজকের বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে কতটা সমান্তরাল ?


     

    মলয় : ধোঁয়াশা হলেও তাদের লেখায় ছাপ পাওয়া যাবে । আর সকলেরই মগজে ধোঁয়া ঢুকে আছে বলা যাবে না । অনেকে যথেষ্ট শিক্ষিত । আবার অনেকের আগ্রহ নেই, তারা নিজের মতো করে লিখতে চায় । পুনরাধুনিক, উত্তরাধুনিক, অধুনান্তিক, স্ট্রাকচারালিজম, পোস্টস্টাকচারালিম, ফেমিনিজম সম্পর্কে না জেনেও দিব্বি লেখালিখি করা যায় । কবিতা সিংহ তো ফেমিনিজমের তত্ব না পড়েও ফেমিনিস্ট কবিতা লিখে গেছেন । বাংলা কমার্শিয়াল পত্রিকায় এখন যে ধরনের মিল দেয়া কবিতা লেখা হয়, ইউরোপে আর তেমন কবিতা লেখা হয় না, ওদের কবিতায় ছবির ভাঙন অনেক বেশি আর দ্রুত । প্যারিস রিভিউ আর পোয়েট্রি পড়লে দেখা যায় যে অনেকে সহজ ভাষায় কবিতা লিখছেন, জটিলতা বর্জন করে, যখন কিনা বাংলায় বহু তরুণ কবিতাকে জটিল করে তুলছেন । আসলে কবিরা লেবেল পছন্দ করেন না । সকলেই চায় তাকে তার নামে লোকে জানুক, লেবেলের ঘেরাটোপে নয় । আমি নিজেই হাংরি লেবেলের দরুন বিরক্ত বোধ করি । বহু পাঠক তো ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ ছাড়া কিছুই জানে না।


     

    জয়িতা : একটু ব্যক্তিগত প্রশ্নে আসি । ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা’ ও ‘ছোটোলোকের যুববেলায়’ নিজের বড়ো হয়ে ওঠার কথা লিখেছো । হাংরি আন্দোলনের সময়কার ঘটনাগুলো  ‘হাংরি কিংবদন্তি’ ও ‘রাহুকেতুতে’ লিখেছ । কিন্তু পরবর্তী পর্বের মলয় রায়চৌধুরী বেশ কিছুকাল অপ্রকাশিত । এই সময়টার কথা বলো । সত্যি কি লেখোনি না লিখেছ তা অপ্রকাশে । এই ট্রান্সিশনাল সময়টার কথা বলো।


     

    মলয় : লিখেছি তো, সবই লিখেছি । ‘আখর’ পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যায় লিখেছি “ছোটোলোকের জীবন” শিরোনামে । ওটা প্রতিভাস থেকে “ছোটোলোকের সারাবেলা” নামে প্রকাশিত হবার কথা । ‘ছোটোলোকের জীবন’ তোকে পাঠিয়েছি, পড়ে দেখিস । অমিতাভ প্রহরাজ লিখেছে ‘আখর’ ওই সংখ্যাটা লোকে গান্ধী জয়ন্তীর আগের দিনে রামের বোতল কেনার মতন কিনেছিল ।


     

    জয়িতা : ব্যক্তি মলয় ও লেখক মলয়ের মধ্যে ফারাক কতটা? তুমি নিজেকে কিভাবে দ্যাখো ।


     

    মলয় : কোনো তফাত আছে বলে মনে হয় না, তবে আমি ব্যক্তি মলয়ের ইমেজ ভাঙার চেষ্টা করি, কেবল ভাষা ভেঙে হাত গুটিয়ে বসে থাকি না । আমিও যেকোনো লোকের মতন বাজার যাই, দরাদরি করি, যৌবনে মেছুনির সঙ্গে ফ্লার্ট করতুম, কয়েক মাস আগে পর্যন্ত  সন্ধ্যাবেলা সিঙ্গল মল্ট খেতুম, সিরোসিসের সিম্পটম দেখা দিয়েছে বলে আর খাই না । হাংরি আন্দোলনের সময়ে গাঁজা চরস আফিম এলএসডি বাংলা  খেতুম, এখন আর খাই না । বাড়িতে যে পোশাক পরে থাকি সেটাই অতিথিদের সামনেও পরে থাকি, মহিলারা এলেও । কথা বলার ধাঁচেও কোনো তফাত নেই, যদিও বেশ কিছু সাহিত্যিককে দেখেছি কেমন ক্যালাটাইপের গলায় কথা বলতে । তারা সব বুদ্ধদেব বসুর ছাত্র বা ছাত্রদের ছাত্র । আমি হুগলির বুলিতে ইমলিতলা মিশিয়ে চালিয়ে যাই । ব্যক্তি আর লেখক দুইই ইমলিতলার, তাই সহজেই নিজের ইমেজ ভাঙতে পারি । 


     

    জয়িতা : তোমার সমসাময়িক কোনো সাহিত্যিকের কথা বলো যাঁর সঠিক মূল্যায়ন কলকাতা কেন্দ্রিক সাহিত্য গোষ্ঠি করতে পারেনি যথাযথ ।


     

    মলয় : মূল্যায়নই হয় না, তো আবার সঠিক মূল্যায়ন । এতো বেশি সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক গোষ্ঠীবাজি হয় যে বেশির ভাগ প্রতিভাবান লেখক-কবির মূল্যায়ন হয় না, বিশেষ করে যারা গদ্য নিয়ে কাজ করছে তারা অবহেলিত থেকে যান । পুরস্কারগুলো নিয়ে টানাটানি হয় । সিপিএমের লোকেদের বাংলা অকাদেমি থেকে বিদেয় করে দেয়া হলো ওই একই সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কারণে, তাঁরাও জ্ঞানী-গুণী ছিলেন । এখন একদল নতুন মুখ এসেছেন যাঁরা তাঁদের প্রিয় সাহিত্যিক আর সংস্কৃতিকর্মীদের কাঁধে উত্তরীয় দিচ্ছেন । যারা দুটো দিককেই এড়িয়ে গেছে তাদের প্রতিষ্ঠান গুরুত্ব দেয় না । যেমন কেদার ভাদুড়ি, সজল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখকে ।


     

    জয়িতা : জীবনের ইমনকল্যাণে এসে তোমার চেতনায় কোনো পরিবর্তন এসেছে ? জীবনদর্শনের ক্ষেত্রে বলছি। 


     

    মলয়: এখন আমার একাকীত্ব ভালো লাগে, বেশি কথা বলতে ভালো লাগে না, আমার স্ত্রীও বেশি কথা বলা পছন্দ করে না । আমরা কোনো অনুষ্ঠানে যাই না । খাবার নেমন্তন্ন এড়িয়ে যাই, শরীরের কারণে । এখানে মুম্বাইতে আত্মীয় বলতে আমার এক মামাতো ভায়রাভাই, যার বয়স আমার চেয়ে ছয় বছর বেশি ।  কিন্তু এও মনে হয় যে মরার পর শ্মশানে নিয়ে যাবার লোক জোটানো বেশ কঠিন হবে । মাকে যেখানে দাহ করা হয়েছিল সেখানেই পুড়তে চাই । নয়তো বেস্ট হবে দেহ দান করে দেয়া । সেটা মরার পর বডির অবস্হা কেমন থাকে তার ওপর নির্ভর করে । আমার স্ত্রীর আপত্তি নেই । স্ত্রী আগে মারা গেলে আমারও আপত্তি নেই । ভীতিকর  হলো যে আরথ্রাইটিসের জন্য সই করতে পারি না, স্ত্রীকে সই করতে হয়, সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হয় ব্যাঙ্কে ।


     

    জয়িতা:  তোমার জীবন ও সাহিত্যচর্চার ওপর দেশে বিদেশে গবেষণা হয়।  সে সম্পর্কে কলকাতার পাঠক মহল জানতে চায় ।


     

    মলয়: বছর দশেক আগে থেকে আরম্ভ হয়েছে । প্রথম পিএইচডি করেছিলেন বিষ্ণুচন্দ্র দে আর এমফিল করেছিলেন স্বাতী ব্যানার্জি । আমেরিকা থেকে মারিনা রেজা এসে হাংরি আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করে গেছেন, এখন গুটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করছেন ড্যানিয়েলা লিমোনেলা, রূপসা  বসু নামে একটি মেয়ে এমফিল করছে, প্রবোধচন্দ্র দে এম ফিল করছেন, নয়নিমা বসু, নিকি সোবেইরি, বিবিসির জো হুইলার, ফরজানা ওয়ারসি, জুলিয়েট রেনোল্ডস, শ্রীমন্তী সেনগুপ্ত ।  এনারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানি । অনেকে যোগাযোগ না করেই, সন্দীপ দত্তর লাইব্রেরি বা অন্য কোথাও থেকে  তথ্য সংগ্রহ করে কাজ করেছেন, যেমন রিমা ভট্টাচার্য, উৎপলকুমার মণ্ডল, মধুবন্তী চন্দ, সঞ্চয়িতা ভট্টাচার্য, মহম্মদ ইমতিয়াজ, নন্দিনী ধর, তিতাস দে সরকার, এস মুদগাল, অঙ্কন কাজি, কপিল আব্রাহাম প্রমুখ   । উদয়শঙ্কর বর্মা পিএইচডি করেছেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, পুরো আন্দোলন কভার করেননি উনি, উত্তম দাশের সঙ্গে দেখা করলে নথিপত্র পেতেন । ডেবোরা বেকার আমাদের কারোর সঙ্গে বা সন্দীপ দত্তের লাইব্রেরিতে না গিয়ে তারাপদ রায়ের কাছ থেকে তথ্য যোগাড় করেছিলেন আর আবোল-তাবোল লিখেছেন । সুতরাং কে কোথায় গবেষণা করছেন বলা কঠিন। পেঙ্গুইন থেকে মৈত্রেয়ী চৌধুরীর বই ‘দি হাংরিয়ালিসটস’ বেরোবে এই বছর । আগামী বছর রাহুল দাশগুপ্ত আর বৈদ্যনাথ মিশ্রর সম্পাদনায় বেরোবে ‘লিটারেচার অফ দি হাংরিয়ালিস্টস’ । সমীরণ মোদক আমার সম্পাদিত ‘জেব্রা’ পত্রিকা সংকলিত করছেন, ‘হাংরি আন্দোলকারীদের চিঠি’ নামে একটা সংকলন বের করার তোড়জোড় করছেন। অজিত রায় তো এই বিষয়ে লিখে লিখে পাঠকের কাছে বিতর্কটা জিইয়ে রেখেছে ।


     

    জয়িতা:  সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা প্রশাখা নিয়ে নানা কাজ করেছো । কোনো বিশেষ বিষয় নিয়ে কাজ করবার ইচ্ছে আছে ?


     

    মলয়: আপাতত একটা উপন্যাস লেখার কথা ভাবছি । বাউল যুবক যুবতী জুটিকে নিয়ে, যারা তারুণ্যে একজন নকশাল আর একজন কংশাল ছিল । কিন্তু তাদের ঘিরে যে চরিত্ররা থাকবে সেই লোকগুলোকে গড়ে তুলতে পারছি না, সুরজিৎ সেনের ‘ফকিরনামা’ বইটা পড়ে আইডিয়াটা এসেছে মাথায়, কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নেই বলে এগোইনি । এতেও যুবতীর বয়স যুবকের চেয়ে বেশি। পরস্পরকে মা-বাবা বলে ডাকে । সরসিজ বসু অনুরোধ করেছেন একটা গদ্য তৈরি করতে বর্তমান ভারতের জাতীয়তা, দেশপ্রেম, দাঙ্গা, গরুর মাংস খাওয়া, নিম্নবর্গের মানুষকে কোনঠাসা করার চেষ্টা ইত্যাদি নিয়ে । ‘বসুধৈব জিঙ্গোবাদম’ নিয়ে লিখেছি । ওকে আরেকটা লেখা দিয়েছি, ‘কফিহাউস - অন্তর্ঘাতের পলিমাটি’ নামে, অন্য একটা পত্রিকায় । আশি পেরোতে চললুম, আর বিশেষ কিছু লিখতে ভাল্লাগে না । একঠায় কমপিউটারে বসে থাকতেও তো পারি না ।


     

    জয়িতা :তোমাকে প্রাচীন স্পার্টান বীরের মতো মনে হয় ।এই যে নানা ঘাত প্রতিঘাত নিন্দে মন্দ সব কিছুকে অবজ্ঞাভরে কেবল কাজ করে যাওয়া ,এই জীবনিশক্তির মূলমন্ত্র কি। অনুপ্রেরণাদাতা বা দাত্রী কে ?


     

    মলয় : হলিউড-বলিউডের ফিল্ম দেখে বলছিস বোধহয়, সিলভিস্টার স্ট্যালোনের র‌্যামবো, থর-এর নায়ক, গ্ল্যাডিয়েটরের নায়ক, নাকি ?  কোমরে দড়ি আর হাতে হাতকড়া পরে সাতজন ক্রিমিনালের সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার পর, ‘ক্ষুধার্ত গোষ্ঠী’  আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াবার পর, নিন্দে-মন্দ গায়ে লাগে না, লিখেও তো কতো লোকে গালমন্দ করে, বিশেষ করে রাজসাক্ষীদের ছেড়ে যাওয়া ‘ক্ষুধার্ত গোষ্ঠীর’ চেলারা ।   যখন লেখা আরম্ভ করেছিলুম তখন কুলসুম আপা, নমিতা চক্রবর্তী, বাড়ির চাকর শিউনন্নি, বাবার দোকানের কাজের লোক রামখেলাওন সিং ডাবর ছিল, শেষের দুজন রামচরিতমানস আর রহিম কবির দাদু থেকে কোটেশান ঝেড়ে আমাদের বকুনি দিতো , ব্যাপারগুলো ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলায়’ লিখেছি । আমার লেখালিখি নিয়ে আমার স্ত্রী আর ছেলের কোনো আগ্রহ নেই ; মেয়ের আছে, কিন্তু তার হাতে সময় একেবারে নেই, সম্প্রতি সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়েছিল । বস্তুত অনু্প্রেরণা বলে সত্যিই কি কিছু হয় ? আমার তো মনে হয় আমি নিজেই নিজের অনুপ্রেরণা, রাস্তায় হাঁটার সময়ে অনুপ্রেরণা মগজে জমতে থাকে।


     

    জয়িতা : তোমার বর্তমান যাপন সম্পর্কে তোমার অনুরাগী পাঠকসমাজকে কিছু জানাও।


     

    মলয়: আমার অনুরাগী পাঠক সত্যিই আছে ? মনে তো হয় না । আমি প্রথমে উঠি, স্ত্রী দেরিতে কেননা ওর রাতে ঘুম হয় না, রাতে উঠে-উঠে হোমিওপ্যাধি ওষুধ খায় । দাঁত ব্রাশ করে ফ্রি হ্যাণ্ড এক্সারসাইজ করি, ফিজিওথেরাপিস্টের শেখানো । এক গেলাস গরমজল খাই যাতে পেট পরিষ্কার হয় । ব্রেকফাস্ট বানাই, ওটস । তারপর ইজিচেয়ারে কিছুক্ষণ বসে টাইমস অফ ইনডিয়া পড়ি । আমার পাড়ায় বাংলা সংবাদপত্র পাওয়া যায় না, এটা গুজরাটি ফাটকাবাজদের এলাকা, একটা ফাইনানশিয়াল টাইমস কিনে দশজন মিলে শেয়ারের ওঠানামা পড়ে । আমি কখনও শেয়ার-ফেয়ার কিনিনি, তাই কোনো উৎসাহ পাই না ওনাদের সঙ্গে গ্যাঁজাতে । হকারকে বললে চারদিনের বাংলা কাগজ তাড়া করে একদিন দিয়ে যায়। নতুন যে লিটল ম্যাগাজিন আগের দিন পেয়েছি সেটা পড়ি । ফিজিওথেরাপির পর চা বানাই, গ্রিন টি । ততক্ষণে স্ত্রী উঠে ওটস ভাগাভাগি করে আর আপেল বা কিউই বা যে ফল হোক কাটে । আমি খেয়ে নিই । স্ত্রী এগারোটায় ব্রেকফাস্ট করে । তারপর বাজার যাই । মাছ-মাংস আর মাসকাবারি চাল-ডাল-তেল-মশলা কেনার থাকলে ফোন করে দিলে দিয়ে যায় । ফিরে এসে এগারোটা নাগাদ কমপিউটারে বসি আর ভাবি । ফেসবুক খুলে, জিমেল খুলে, চোখ বুলিয়ে নিই । তারপর বই আর পত্রিকা পড়ি । একটায় স্নান, খাওয়া, ঘুম । তিনটের সময়ে উঠে টিভিতে ফুটবল খেলা দেখি, ইউরোপের, ভারতের থাকলে ভারতের । সাড়ে চারটের সময়ে বিবিসি । ছয়টা থেকে আটটা কমপিউটারে লেখালিখি আর সিঙ্গল মল্ট খাওয়া, এখন যদিও আর খাই না । তারপর রুটি তরকারি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোবার চেষ্টা আর সেই ফাঁকে লেখার সম্পর্কে চিন্তাভাবনা, কেননা ঘুম আসতে দেরি হয় । অনেক সময়ে আমার ছেলের বউ রিয়াধে বসে সুইগি কিংবা ফুড পাণ্ডাকে অর্ডার দিয়ে দেয় আমাদের জন্য, বিরিয়ানি, মিষ্টি দই, নলেন গুড়ের সন্দেশ ইত্যাদির । রাতে ফোন বন্ধ করে দিই, যাতে কেউ ঘুমের দফারফা না করে ।


     

    জয়িতা :আজকাল কবিতাকে দশক হিসেবে ক্যাটিগোরাইজ করা হচ্ছে ; জেলা ও বিষয় ভিত্তিক ক্যাটিগোরাইজ করা হচ্ছে । কতটা প্রাসঙ্গিক বলে তোমার মনে হয় ?


     

    মলয়: এটা এই সময়ের ব্যাপার । সময় আপনা থেকে ঝরিয়ে দেবে যারা প্রাসঙ্গিক নয়, তাদের । প্রতিটি জেলায় কবিদের সংখ্যা তো কম নয় । হয়তো অমন সংকলন বেরোলে জানা যাবে তাদের ওপর জেলা-বিশেষের কথ্যভাষা আর ভূপ্রকৃতির প্রভাব পড়েছে কিনা । আমি নিজে তো জানি না আমি কোন জেলার । পূর্বপুরুষ লক্ষ্মীকান্ত এসেছিলেন যশোর থেকে কলকাতায়, তাঁর বংশধররা বেহালা-বড়িশায় ঘাটি গাড়েন । একজন শরিক ১৭০৩ সালে নদীর এপারে উত্তরপাড়ায় চলে আসেন, আমি তাঁর বংশধর । উত্তরপাড়ার জমিদার বাড়ি ভেঙে আবাসন হয়েছে, আমি আমার শেয়ার বেচে দিয়েছি । তারপর ছিলুম নাকতলায় । নাকতলার ফ্ল্যাট বেচে চলে এসেছি মুম্বাই ; বইপত্র আর আসবাব বিলিয়ে দিয়েছিলুম নাকতলায় । যে বাসা আমি একবার ছেড়েছি, সেখানে আর দ্বিতীয়বার ফিরে যাইনি । আমি একই ঘরে, একই বাড়িতে, একই পাড়ায়, একই শহরে, সারাজীবন কাটাইনি।


     

    জয়িতা :অনুকবিতা সাহিত্যপত্র গুলির নতুন আবিষ্কার । তোমার কি মতামত ? কবিতাকে কি সম্পাদক শব্দসীমায় বেঁধে দিতে পারে? কবি অসহায় বোধ করে অনেক সময়ই ।


     

    মলয় : এটাও কবির সংখ্যাবৃদ্ধির কারণে ঘটছে, অনেককে জায়গা দেয়া যায় অনুকবিতা পত্রিকায় । যে কবি অসহায় বোধ করে তার তো লেখাই উচিত নয় অমন সংকলনে । তবে চীনা আর জাপানি কবিতার প্রভাবে এজরা পাউন্ড ‘ইমেজিজম’ নামে অনুকবিতার আন্দোলন করেছিলেন । In a Station of the Metro নামে ওনার একটা দুই লাইনের কবিতা আছে, যাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনুকবিতার মান্যতা দেয়া হয়েছে, কবিতাটা শোন 

    The apparition of these faces in the crowd ;

    Petals on a wet, black bough.


    জয়িতা : তোমার আন্তর্জাতিক যোগসুত্র  বিশ্ব পরিচিতি সম্পর্কে বলো ।এখানকার পাঠকদের জানা দরকার। কোন বিদেশী সাহিত্যিকের সঙ্গে আলাপিত হয়ে মুগ্ধ হয়েছো ? কার বন্ধুত্ব নিবিড় হয়েছে । এখন বিদেশে তোমার রচনা নিয়ে বাংলা প্রেমী বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা কতটা সচেতন ?


     

    মলয় : হাংরি আন্দোলনের সময়ে হাওয়ার্ড ম্যাককর্ড, ডিক বাকেন, অ্যালেন গিন্সবার্গ, লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি, মার্গারেট র‌্যানডাল, ডেইজি অ্যালান, ক্যারল বার্জ, ডায়না ডি প্রিমা, কার্ল ওয়েসনার, অ্যালান ডি লোচ প্রমুখের সঙ্গে পরিচিত ছিলুম । অ্যারেস্ট করার সময়ে পুলিস ওনাদের চিঠিপত্রের ফাইল নিয়ে চলে গিয়েছিল, আর ফেরত পাইনি । এখন মাঝে-মাঝে প্রিন্ট বা মিডিয়ার সাংবাদিকরা যোগাযোগ করেন, সাক্ষাৎকার নিয়ে যান । স্কটল্যাণ্ডের একটা সংবাদপত্রের পক্ষে নিকি সোবরাইটি নামে এক তরুণী সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন । বিবিসির পক্ষ থেকে দুবার, একবার জো হুইলার আর আরেকবার ডোমিনিক বার্ন সাক্ষাৎকার নিয়ে গেছেন । ড্যানিয়েলা লিমোনেলার কথা আগেই বলেছি, যাঁকে আমার স্ত্রীও ভালোবেসে ফেলেছে, ড্যানিয়েলা বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, জার্মান, ইতালিয়ান বলতে পারে, হাত দিয়ে ভাত খায় আমাদের বাড়ি এলে । আমি আর নিজে থেকে কারোর সঙ্গে যোগাযোগ করি না । জার্মানি থেকে স্হানীয় আর্টিস্ট শিল্পা গুপ্তাকে নিয়ে এসেছিলেন মাইলিওন ; ওনারা একশো কবির প্রদর্শনী করছেন পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে, আমার কবিতাটাও অন্তর্ভুক্ত করেছেন । শিল্পা গুপ্তাই আমাকে ছবি আঁকার নানা রকম রঙ, ব্রাশ, পেনিল ইত্যাদি পাঠিয়েছেন, তাই দিয়ে ছবি আঁকছি, দেখেছিস তো? ব্লগে পাঠকের সংখ্যা থেকে মনে হয় নানা দেশ থেকে অনেকেই টোকা মেরেছে কিন্তু তাদের মধ্যে কতোজন পড়েছে বলতে পারব না । 


     

    জয়িতা : কবিতা প্রথম কবে লিখেছ? কেন? সমীরদা লিখতেন বলে?


     

    মলয় : ১৯৫৮ সালে বাবা একটা সুন্দর ডায়েরি দিয়েছিলেন, তাতে লেখা আরম্ভ করি, ইংরেজিতেও লিখতুম । দাদা আমার পরে লেখা আরম্ভ করেছিল । তবে ওই ডায়রি থেকে কবিতা নিয়ে দাদা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে দিতে, উনি কৃত্তিবাস পত্রিকায় ১৯৫৯ সালে প্রকাশ করেছিলেন । সুনীল তখন পাটনার বাড়িতে আসতেন । পরে হাংরি আন্দোলনের জন্য চটে গিয়েছিলেন । ‘যুগশঙ্খ’ পত্রিকার জন্য বাসব রায়কে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন ‘মলয় ইচ্ছে করে আমার আমেরিকাবাসের সুযোগটা নিয়েছিল।”


     

    জয়িতা: হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারে না গিয়েও সেই সময়কার কবিতার ডিক্সান কি কোনোভাবে নিকোনার পারার বা  বিট আন্দোলনের প্রভাবিত?


     

    মলয় : তখনও আমি ওনাদের কবিতা পড়িনি, নামই শুনিনি । বিদেশি কবি বলতে রোমান্টিক ব্রিটিশ কবিদের পড়েছিলুম । আমার কবিতায় ইমলিতলার মগহি আর ভোজপুরি ডিকশানের প্রভাব থাকতে পারে ; ফণীশ্বরনাথ রেণু, যিনি বাংলা জানতেন, এই কথাটা বলেছিলেন । বিটদের বইপত্র লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি পাঠিয়েছিলেন অ্যালেন আমেরিকা ফিরে যাবার পর । আর বিটদের সকলের কবিতা আর গদ্য  একই রকম নয়, সকলের রচনাতেই যৌনতা থাকে না । তাছাড়া নিকানর পাররার মতন কবিতা বিটরা লেখেনি । হাংরি আন্দোলনেও আমরা একজন আরেকজনের মতন কবিতা ও গদ্য লিখিনি । ‘ক্ষুধার্ত গোষ্ঠীর’ কবি-লেখকরা সিপিএম করা আরম্ভ করে লেখার ধারা পালটে ফেলেছিলেন । শ্রুতি আন্দোলনে কংক্রিট  পোয়েট্রির প্রভাব কিছুটা ছিল বিশেষত পরেশ মণ্ডলের কবিতায় কিন্তু তাঁরাও একই রকমের কবিতা লেখেননি । নিম সাহিত্যেরও সবাই একই রকম লিখতেন না ।


     

    জয়িতা : প্রথম পর্বের কবিতার সঙ্গে এখন যে কবিতাগুলো লিখছ তার শৈলীতে যে পরিবর্তন এসেছে সে সম্পর্কে বলো। প্রথম পর্বের কবিতায় একটা নাড়িয়ে দেওয়া ঝাঁকুনি দেওয়া ব্যাপার ছিলো । তার সিনট্যাক্স ,ডিক্সন স্ট্রাক্চার ছিলো অভূতপূর্ব। দ্বিতীয়পর্বে এসেছ মাঝে অনেকটা সময়,অভিজ্ঞতা ,সংসার ....কবিতা মাঝসমুদ্রের মতো গভীর ও সমাহিত।মিল নেই তবু চেনা যায় এ কবিতা র কবি কে। এই বিষয়ে কিছু বলো ।


     

    মলয় : সে সময়ে কবিতায় টেসটোসটেরন, অ্যাড্রেনালিন থাকত, নিজেদের পত্রিকা আর বুলেটিনে বেরোতো, উদ্দাম নেশা আর যৌনতার ঘনঘটা ছিল । এখন অভিজ্ঞতার আর পড়াশুনার দরুন কবিতায় বদল এসেছে, আপনা থেকেই । যে দেড় দশক লিখিনি, সেই সময়ে প্রচুর পড়াশুনা করেছি । সব বিষয়ে বই পড়তুম। কবি হতে হবে, এই ভেবে তো লেখালিখি করিনি, এখনও করিনা ।


     

    জয়িতা :বাংলায় উত্তরাধুনিক কবিতা কি লেখা হয় ?


     

    মলয় : হয় তো । উত্তরাধুনিক বলতে যে বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয় তা হাল আমলের বেশির ভাগ কবির রচনায় পাওয়া যাবে । অনেক তরুণ-তরুণীর কবিতায় বিস্ময়কর পংক্তি-কারিগরি দেখতে পাই ; বস্তুত ঈর্ষা হয় তাদের কবিতা পড়ে । বারীন ঘোষাল, অলোক বিশ্বাস, প্রণব পাল, ধীমান ভট্টাচার্য প্রমুখের কবিতা পড়লে টের পাবি ।

    কিন্তু পোস্টমডার্ন নামের দার্শনিক তত্বের সঙ্গে পোস্টমডার্ন সাহিত্যের সম্পর্কে নেই । পোস্টমডার্ন সাহিত্য মূলত আঙ্গিকের প্রাধান্যের ব্যাপার । ঠিক যেমন আধুনিক কবিতার সঙ্গে মডার্নিটির দর্শনের সম্পর্ক নেই । 


     

    জয়িতা :তোমার পছন্দের কবি কারা (আন্তর্জাতিক ও বাংলা সাহিত্যে)


     

    মলয় : বাংলায় বিনয়, ফালগুনী, কেদার ভাদুড়ি, জহর সেনমজুমদার, প্রদীপ চৌধুরীর চর্মরোগ, মণীভূষণ, যশোধরা, মিতুল, হেলাল হাফিজ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ প্রমুখ । সব নাম এক্ষুনি মনে পড়ছে না, আরও কিছু নাম বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলে থাকব, প্রবন্ধে লিখে থাকব  । বিদেশি পল সেলান, সিলভিয়া প্লাথ, মায়া অ্যাঞ্জেলু, জন অ্যাশবেরি, আমিরি বারাকা, ইভস বনেফয়, জ্যাক দুপাঁ প্রমুখ । আর বলছিনা, তুই প্রভাব খুঁজবি ।


     

    জয়িতা : হাংরি আন্দোলন আর তোমাকে নিয়ে বাংলা আর ইংরেজিতে গবেষণা হচ্ছে । এতে তোমার গর্ববোধ হয় ? নাকি যা চাইছিলে তা পেয়ে গেছো বলে মনে হয় ?

    মলয় : আমার কিছুই হয় না । যারা আক্রমণ করতেন তাঁদের বিরক্তি হয় বলে মনে হয় । কিছুদিন আগে প্রতিদিন পত্রিকায় অরুণেশ আর আমার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল কমল চক্রবর্তী, হাংরি আন্দোলনকারীদের প্রশ্রয় দিলেও তারা ওর বেদনার কারণ হয়েছে । সত্যি কথা বলতে কি আমার আর অরুণেশের কাব্যগ্রন্হ অত্যন্ত বাজে নিউজপ্রিন্টে ছেপেছিল, কভারও ফালতু করেছিল, তাই আমাদের মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল, যখন কিনা ওদের  নিজেদের বইগুলোর প্রোডাকশান দারুণ হয়েছিল । যাকগে, আর তো নিজের বইপত্তর রাখি না, সব বিলিয়ে দিয়েছি, এখনই মুম্বাইতে এসে এখানকার কবি-লেখকদের দিয়ে দিই ।


     

    জয়িতা : উচ্চারণ না অক্ষর কোনটা মানা উচিত ছন্দের ক্ষেত্রে।


     

    মলয় : আমি তো মাত্রা গুণে লিখি না । উচ্চরণ অনুযায়ী লিখি । 


     

    জয়িতা: তুমি বিদেশী কবিতা পড়ে আপডেটেড হতে বলো কিন্তু কবিতায় ষোলোয়ানা বাঙালি সেন্টিমেন্ট তার নিজস্ব ডিক্সনেরও কি প্রয়োজন নেই।সেই রূপান্তর কে অনুসরণ বা নকল বলা যায়কি? যেটা জীবনানন্দ বা অনেককেই শুনতে হয়েছে ।


     

    মলয় : বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য পড়লে জানা যায় যে পৃথিবীর ভাষা সামগ্রিকভাবে কোনদিকে যাচ্ছে । নকল করার দরকার হয় না ।


     

    জয়িতা: কবিতা ও গল্পে প্রান্তিক ভাষার সংলাপ ব্যবহার তোমার সময় বেশি লোক করেনি।কী ভাবনা কাজ করেছে এর পেছনে।


     

    মলয় : সেসময়ে কলকাতাকেন্দ্রিক লেখকরা লিখতেন । পরে মফসসলের লেখকরা লেখা আরম্ভ করলে প্রান্তিক ভাষার প্রবেশ ঘটে । সুবিমল বসাক ১৯৬৫ থেকেই প্রান্তিক ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন । রবীন্দ্র গুহ আর অরুণেশ ঘোষও প্রান্তিক ভাষাকে ওনাদের গল্পে এনেছেন ।


     

    জয়িতা : সাহিত্যে যৌনতা এসেছে শিল্প হয়ে কিন্তু একদম নগ্ন ও আপোষহীন। পাঠক চমকে উঠেছে। যা বিছানায় যা জৈবিক তাকে সৃজনেও ঠিক সেইভাবেই আনা প্রয়োজন এটা তোমরাই করেছ। আমি তোমার কথাই বলবো। সাহিত্যে যৌনতা উন্মুক্ত ও আলোকিত হয়েছে নানাভাবে কখনো চরিত্রের মধ্যে কখনো কবিতা বা আত্মকথায়, বিশেষ করে 'অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা' উপন্যাসে । সে ব্যাপারে কিছু বলো।


     

    মলয় : যৌনতা অনেককাল থেকেই ছিল সংস্কৃত আর বাংলা সাহিত্যে । ইভানজেলিকাল পাদরিরা স্কুল-কলেজের সিলেবাসে মাথা গলানোর পর আর তাদের শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে ওঠার পর যৌনতা নিয়ে দোনামোনা আরম্ভ হয়েছিল । তারপর ব্রাহ্মদের প্রভাব, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের । সাহিত্য যখন মধ্যবিত্তের আর উচ্চবর্ণের আওতা থেকে বেরোলো তখন যৌনতা নিজের স্বাভাবিক চরিত্র পেলো ।


     

    জয়িতা : তুমি সলিলাদির সঙ্গে পরিচয়ের পরের দিনই বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলে আর উনি তক্ষুনি রাজি হয়ে গিয়েছিলেন, সলিলাদের অভিভাবকরা ইতস্তত করছিলেন বলে তোমরা নাকি পালিয়ে যাবার টিকিট কেটে ফেলেছিলে ।  তার পর এক সপ্তাহেই বিয়ে সেরে বউকে নিয়ে পাটনায় ফিরলে । তোমার অবাক লাগেনি ওনার তখনই রাজি হয়ে যাওয়ায় ? তোমার বাবা-মা কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানাননি ?


     

    মলয় : না, সলিলা ছিল হকি খেলোয়াড়, ডিসিশন নিয়েছিল স্পোর্টসগার্লের মতনই । ওর বন্ধু সুলোচনা নাইডু ওকে হিন্দি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত আমার ফোটো আর সংবাদ পড়িয়েছিল । তাছাড়া ওর বাবা-মা ছিলেন না । মামার বাড়ির বাঁধন ছিঁড়ে চলে যেতে চাইছিল । মামারা দোনামোনা  করেছিলেন সলিলার মাইনে ওনাদের সংসারে কাজে দিতো। আমরা তো দুজনে নাগপুর ছেড়ে চুপচাপ পাটনায় চলে যাবার টিকিট কেটে ফেলেছিলুম, কিন্তু তা করলে ওর অফিস থেকে ছুটি নিতে হতো, বিয়ের প্রমাণ না দিলে পরে ট্রান্সফারের সমস্যা হতো, ও চাকরি ছাড়তে চায়নি ; তুই তো স্কুলে পড়াস, মেয়েদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়াটা কতো জরুরি তা জানিস  । সলিলার মামাতো বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছিল দুদিন পরেই । ওরা বিয়ে করে উঠল আর আমরা সেই পিঁড়িতে বসে পড়লুম । আমি আমার বিয়ে নিয়ে একটা লেখা তৈরি করছি, অজিত বই করে বের করবে । বাবা-মা তো বউ পেয়ে যাকে বলে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন । মা বলেছিলেন সিঁদুর পরিয়ে বাড়ি আনলেই হবে, আচার-টাচারের দরকার নেই । সত্যই বিয়ের আচার বলতে যা বোঝায় তা সম্ভব হয়নি , নাগপুরেও নয়। পাটনায় ফিরে তো কিছুই হয়নি ।


     

    জয়িতা: বিয়ে করে তুমি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে চলে গেলে এআরডিসি লখনউ, সেখান থেকে মুম্বাই নাবার্ডে, তারপর কলকাতার নাবার্ডে। এতো পরে কলকাতায় এসে তোমার কি মনে হলো যে হাংরি আন্দোলনের দিনগুলো আর নেই ।


     

    মলয় : লখনউ যাবার পরেই আমি ভারতের গ্রামসমাজের সঙ্গে পরিচিত হলুম । তার আগে চাষবাস, ফসল, কলকারখানা, তাঁত, ছুতোরের, কামারের, হাতের কাজের মজুরের ব্যাপারে কিছুই জানতুম না । কতোরকমের ধান, গম, জোয়ার, বাজরা, গোরু, ছাগল, শুয়োর, উট হয় জানতুম না ; তাদের ব্রিডিং সম্পর্কেও জানতুম না । সারা ভারত ঘুরেছি অ