• টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। যে কোনো নতুন আলোচনা শুরু করার আগে পুরোনো লিস্টি ধরে একবার একই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে কিনা দেখে নিলে ভালো হয়। পড়ুন, আর নতুন আলোচনা শুরু করার জন্য "নতুন আলোচনা" বোতামে ক্লিক করুন। দেখবেন বাংলা লেখার মতো নিজের মতামতকে জগৎসভায় ছড়িয়ে দেওয়াও জলের মতো সোজা।
  • পায়ের তলায় সর্ষে: আঁধার মাণিক্যের দেশে

    Samik Mukherjee
    বিভাগ : অন্যান্য | ১৮ অক্টোবর ২০১০ | ৪৩২ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6
  • Samik | 122.162.75.50 | ১৮ অক্টোবর ২০১০ ১০:২৭458773
  • সবে প্রথম দিনের ছবি আপলোড করলাম। এই রকম আরও সাতদিনের ছবি আসবে একে একে। সাথে চলবে গল্প।

    http://picasaweb.google.com/mukherjee.samik/vspzNF#
  • Samik | 122.162.75.50 | ১৮ অক্টোবর ২০১০ ১১:২৪458884
  • নীলের কোলে শ্যামল সে দ্বীপ প্রবাল দিয়ে ঘেরা
    শৈলচূড়ায় নীড় বেঁধেছে সাগরবিহঙ্গেরা
    নারিকেলের শাখে শাখে ঝোড়ো বাতাস কেবল ডাকে
    ঘন বনের ফাঁকে ফাঁকে বইছে নগনদী
    সাত-রাজা-ধন মাণিক পাবো সেথায় নামি যদি।

    শুরু করতে পারতাম এখান থেকেই। যত দেখেছি, যত পাতা উল্টেছি আন্দামানের, মনের মধ্যে শুধু গুন্‌গুনিয়ে গেছে এই পাঁচটা লাইন। কিন্তু না, কাহিনির সূত্রপাত আরও অনেক আগে থেকে।

    এই ধরুন, এ-বছরের মার্চ এপ্রিল মাস!

    পুজোয় কোথায় যাওয়া যেতে পারে, তাই নিয়ে আলু-চানা শুরু হল কত্তা-গিন্নিতে। কন্যা তো দুদুভাতু। একবার বাই উঠল লে-লাদাখটা বয়েস থাকতে থাকতে সেরে আসি। কিন্তু ইন্টারনেটে পড়াশোনা করার পরে পুজোর সময়ে লে লাদাখের আইডিয়াটা ক্যানসেল করতে হল শেষমেশ। অত:পর কেরালা মধ্যপ্রদেশ গ্যাংটক ভূটান ইত্যাদি পেরিয়ে কী করে যেন জানি না, প্ল্যানটা যখন আন্দামানে এসে সেট্‌ল করল, তখন এপ্রিলের শেষ।

    গিন্নি এখন গেজেটেড আপিসার, ষষ্ঠ বেতন কমিশনের কল্যাণে তিনি প্লেনে চাপার পয়সা টয়সা পান সরকারের থেকে, এলটিসি বাবদ। মেকমাইট্রিপ, যাত্রা ইত্যাদি ঘেঁটে দেখা গেল পোর্ট ব্লেয়ারে যাবার প্লেন চলে কেবলমাত্র কলকাতা এবং চেন্নাই থেকে। দিল্লি থেকে কোনও ডিরেক্ট ফ্লাইট নেই।

    তা বেশ তো! মহালয়ার সময়ে বেরিয়ে ফেরার পথে বাড়িতে পুজোর চাট্টে দিন কাটিয়েও আসা যাবে। অনলাইনে টিকিটের হিসেব টিসেব করে দেখা গেল গুনেগেঁথে চল্লিশ হাজার মতন খরচা হবে পুরো রাউন্ড ট্রিপে। সে হোক। পয়সা তো দেবে গৌরী সেন। মানে ভারত সরকার। আন্দামান, সবাই বলে খুব কস্টলি ট্যুর, সরকার ন দেখিলে কে দেখিবে আমাদের?

    কিন্তু না, সরকার, যা ভেবেছিলাম, তার থেকেও বেশি সদাশয়। নতুন নিয়মানুসারে, যে কোনও প্লেন নয়, কেবলমাত্র এয়ার ইন্ডিয়ার প্লেনেই সরকারি কর্মচারিরা ট্র্যাভেল করতে পারবেন, কেবল সেই প্লেনের টিকিটই তাঁরা ক্লেম করতে পারবেন। এবং, গল্প এখানেও শেষ নয়, এয়ার ইন্ডিয়ার যে কোনও টিকিটও নয়, ওদের স্পেশাল এলটিসি ফেয়ার আছে একটি, সেই দাম অনুযায়ী টিকিট কাটতে হবে, তবেই সেটা রিইমবার্শ করা যাবে। সে দাম নর্মাল টিকিটের থেকে দ্বিগুণেরও বেশি।

    অত:পর, সব দেখেশুনে, এক শুভদিনে সফদরজঙ্গস্থিত এয়ার ইন্ডিয়ার হাইফাই বুকিং কউন্টারে গিয়ে এসির হাওয়া খেতে খেতে ডেলহি টু কলকাতা, কলকাতা টু পোর্ট ব্লেয়ার, এবং ব্যাক টু কলকাতা, ব্যাক টু ডেলহির টিকিট কেটে ফিরলাম। তিনজনের খরচা পড়ল এক লক্ষ ন হাজার টাকা। হে দয়াময়!
  • samran | 117.194.101.95 | ১৮ অক্টোবর ২০১০ ১৮:৫১458974
  • বাপ রে!
  • Samik | 122.162.75.50 | ১৮ অক্টোবর ২০১০ ২১:১১458985
  • অক্টোবর মাসের ছ তারিখে বেলাবেলির ফ্লাইটে চেপে চলে আসা গেল কলকাতায়। কাবলিদাকে আগে থেকেই বলে রাখা ছিল, ড্রাইভার এসে তুলে নিল আমাদের অ্যারপোর্ট থেকে। দিল্লিতে অবিশ্রান্ত বন্যার শেষে আমরা সদ্য শরৎকে আসতে দেখেছি সেখানে। যমুনার পাড় জুড়ে ঢেউ খেলছিল সাদা কাশের বন। কলকাতায় ঢুকলাম টিপিটিপি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে।

    কাব্লিদার বাড়িতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল খুবই ক্ষুদ্র আয়োজন। ইলিশ মাছের তেল আর ভাজা, চিংড়ির মালাইকারি, সামনের পাতে নিম-বেগুন ভাজা, তরকারি ডালও ছিল, কিন্তু সেই পর্যন্ত আর পৌঁছতে পারি নি।

    রাতের দিকে সুমেরু এল। খানিকক্ষণ গ্যাঁজগ্যাঁজানি হল, কিছুক্ষণের জন্য ইন্টারনেট খুলে দেখলাম শমীক আদি এসে আমার জায়গা নেবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। যাই হোক, রাতে খেয়েদেয়ে নিয়ে খানিকক্ষণ সুমেরু আর কাবলিদার সাথে বসে যুগপৎ উল্লাস এবং দূ:খ প্রকাশ করলাম গুরুর অতীত ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ ঝরঝরে ইত্যাদি নিয়ে। বেশিক্ষণ করা গেল না, মূলত দুটো কারণে, এক কাবলিদা-সুমেরু ক্রমশই তরলীভূত হয়ে গেছিল, আমার আবার তরলে অ্যালার্জি, আর দুই, পরদিন সাড়ে পাঁচটায় ফ্লাইট। মানে বেরোতে হবে অন্তত চারটেয়।

    লক্ষ্মী ছেলের মত ঘুমিয়ে পড়লাম।

    সোয়া তিনটেয় অ্যালার্ম লাগানো ছিল, উঠে রেডি হয়ে বেরোতে বেরোতে প্রায় ভোর চারটে। আজ মহালয়া। গাড়ি ছুটে চলল ভবানীপুর থেকে বিমানবন্দরের দিকে, আমি মোবাইলে হাল্কা করে মহিষাসুরমর্দিনী চালিয়ে দিলাম।

    গতকাল দুপুরে রাজারহাট নিউটাউন ... থুড়ি, জ্যোতিবসুনগর দেখে আমার তেমন ভালো লাগে নি, কিন্তু এই ভোররাতে ঘুমন্ত উপনগরীকে দেখে খুব ভালো লাগল। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে, চারদিক অন্ধকার, কেবল বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত এখানে ওখানেকিছু জলের ট্যাঙ্ক আদ্যোপান্ত সবুজ রঙে ইলুমিনেটেড হয়ে জেগে রয়েছে। বেশ মায়াবী ব্যাপার লাগছিল একটা।

    এয়ারপোর্টে যখন পৌঁছলাম, তখন কাউন্টার বন্ধ হতে আর পনেরো মিনিট বাকি। সকালের ফ্লাইট, একেবারে রাইট টাইম।

    আগে ঘুরে আসা লোকজনের ট্র্যাভেলগে পড়েছিলাম আকাশ থেকে সুন্দরবনের রিলিফ দেখতে পাওয়া যায়, খুব নাকি সুন্দর দেখতে। আর প্লেন যখন পোর্ট ব্লেয়ারে ল্যান্ড করে, তার আগে আকাশ থেকে দ্বীপপুঞ্জকে দেখতেও নাকি দারুণ লাগে। কিন্তু কোথায় কী! প্লেন ছাড়ল বৃষ্টির মধ্যে, এক আকাশ কালো মেঘকে সাথে নিয়ে, পোর্ট ব্লেয়ারে নামার কিছুক্ষণ আগে সমুদ্রের জল দেখতে পেলাম, বাকিটা সব ধূসর আর কালো মেঘে ঢাকা।

    বীর সাভারকর এয়ারপোর্ট। খুব ছোট্ট একটা এয়ারপোর্ট। দিনে কুল্লে চার পাঁচটি প্লেন আসে, চেন্নাই আর কলকাতা থেকে। দু একটা ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটও আসে।

    বাইরে হোটেলের লোক থাকবে আমাদের নিতে আসার জন্য। লাগেজ নিয়ে ধীরেসুস্থে বেরোলাম। অ্যারাইভালের লাউঞ্জে দেখি কয়েকটা ছাগল চরে বেড়াচ্ছে। একপাশে কিছু লোক হাতে নাম লেখা কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে। একটা কাগজে আমার নাম লেখা।

    ঘেরাতোপের বাইরে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। সঙ্গে করে এনেছি একটা ছাতা, আর কন্যের জন্যে একটা রেনকোট।

    কোনওরকমে গাড়িতে উঠে পড়লাম। গন্তব্য হোটেল।
  • Mmu | 92.102.50.70 | ১৯ অক্টোবর ২০১০ ০৩:১৪458996
  • SAMIK, ছবিগুলো দেখলাম। ভাল করে দেখিনি তবে ডাউন লোড করে রেখেছি । কাল দেখব।
  • Samik | 121.242.177.19 | ১৯ অক্টোবর ২০১০ ১২:৪৬459007
  • আজকের সময়ে কানেক্টিভিটি একটা বড় ব্যাপার। নেটে এন্তার খুঁজেপেতেও জানতে পারি নি ভোডাফোন আন্দামানে চলে কিনা। এখন হোটেলের রাস্তায় যেতে যেতে দুপাশের সাইনবোর্ড দেখে বুঝে নিলাম এয়ারটেল, ভোডাফোন, রিলায়েন্স আর বিএসএনএলের মোবাইল এখানে আরামসে চলে। পকেট থেকে বের করেও দেখলাম মোবাইলে ফুল সিগন্যাল।

    গাড়িতে উঠতে না উঠতেই হোটেল এসে গেল। রাস্তার ধারে হোটেল, সামনের রাস্তাটা ঢালু হয়ে একটু এগিয়েই হঠাৎ যেন হারিয়ে গেছে সমুদ্রে। সামনেই সমুদ্র, তাতে একটা ছোট্ট দ্বীপ, এদিককার রাস্তার সঙ্গে কানেক্ট করা। আর সেই দ্বীপের পেছনে নীলচে সবুজ রঙে উঁকি মারছে আরেকটা বড় দ্বীপ।

    সামনের এই ছোটো দ্বীপটাই চ্যাথাম। পরে বলব এর গল্প। হোটেলে ঢুকে দেখলাম সকাল আটটা বাজে। সকালটা বিশ্রাম, দুপুর থেকে আমাদের বেই বেই শুরু।

    এইফাঁকে একটু জ্ঞানদান করে নিই। প্রায় ৫৭২ খানা দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের মাত্র ৩৮টি দ্বীপে লোকজন থাকে। বাকি সমস্ত দ্বীপ কেবল পাহাড়, জঙ্গল এইসবে ভর্তি। এই যে ৩৮টা দ্বীপের কথা বললাম, এই জনসমষ্টির কিন্তু একটা বড় অংশ হচ্ছে বিভিন্ন ধরণের আদিবাসী, বা aborigins, তথাকথিত সভ্য মানুষের বাস আরও কম সংখ্যক দ্বীপে। আন্দামান বললেই আমাদের মনে প্রথম আসে জারোয়াদের কথা, কিন্তু কেবল জারোয়াই নয়, এখানে শোম্পেন, ওঙ্গি, সেন্টিনেল, নিকোবরী, গ্রেট আন্দামানিজ ইত্যাদি নানা রকমের ট্রাইবের বাস। এদের মধ্যে কেউ কেউ সদ্য সভ্য মানুষের সঙ্গে ইন্টার‌্যাক্ট করতে শুরু করছে, কেউ কেউ প্রায় পুরোপুরি মূলস্রোতের সঙ্গে মিলেমিশে গেছে, কেউ কেউ এখনও ভীষণ হোস্টাইল, জামাকাপড় পরা কোনও মানুষকে ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দেয় না। আজ পর্যন্ত তাদের কেউ কেউ আগুনের ব্যবহার জানে না, কাঁচা মাংস খায়।

    ট্রাইবদের মধ্যে মূলত নিগ্রয়েড আর মঙ্গোলিয়ান মুখই বেশি। আমি পরে নিজের চোখে জারোয়াদের দেখেছি, তাদের সম্পূর্ণভাবে আফ্রিকানদের মত দেখতে। রিসেন্টলি জারোয়াদের জিন অ্যানালিসিস করে আফ্রিকান জিনের সঙ্গে একেবারে সম্পূর্ণ মিল পাওয়া গেছে। অনুমান করা হয়, স্থলপথেই হোক বা জলপথে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন আন্দামান মূলভূখণ্ডের অংশ ছিল, আফ্রিকা মহাদেশও ইউরেশিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেই সময়েই কিছু আফ্রিকান উপজাতি মাইগ্রেট করে আসে এই অঞ্চলে, পরে মূল মহাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তারা আর ফেরৎ যেতে পারে নি।

    আজকের আন্দামান, আকাশ থেকে দেখলে মনে হয় ঠিক যেন একটা কুমিরের পিঠ। কেউ বা বলে মাঝসমুদ্রে ভেসে থাকা দ্বীপের নেকলেস। আসলে পুরোটাই অজস্র সুপ্ত আগ্নেয়গিরির বিভিন্ন মাথা। সমুদ্রের নিচে আছে বহু বহু প্রাচীন লাভার স্তর।

    পোর্ট ব্লেয়ার, যে হেতু মূল ভূখণ্ড থেকে অনেকটাই দূরে, দৈনন্দিন অনেক জিনিসের জন্যেই তাদের শিপ বা এয়ার সার্ভিসের ওপর নির্ভর করতে হয়। যার জন্য অনেক জিনিসেরই দাম এখানে বেশি। এই নিয়ে মাথা খারাপ করে লাভ নেই। প্রিন্টেড প্রাইসের ওপরে এখানে অনেক কিছুই বিক্রি হয়, খাবার জল যার মধ্যে অন্যতম।

    আমাদের হোটেলের নাম হোটেল তেজস। এটা পোর্ট ব্লেয়ারের এক প্রান্তে, জায়গাটার নাম হ্যাডো বা Huddo। সামনে হ্যাডো জেটি, সেখান থেকে ছোট্ট একটা ব্রিজ কানেক্ট করে চলে গেছে চ্যাথামের দিকে। চ্যাথাম একটা ছোট্ট দ্বীপ, আগেই বলেছি, এই পুরো দ্বীপটাই একটা কাঠের কারখানা, স-মিল। এটা এশিয়ার প্রাচীনতম স-মিল।

    তিনতলায় সী-ভিউ ঘর পেয়েছিলাম, সামনে বড় জানলা দিয়ে তাকালে সামনেই সারি সারি নারকোল গাছ, তার পেছনেই নীল সমুদ্র। এই সমুদ্রের রং ভারতের কোনও তীরবর্তী সমুদ্রে পাওয়া যায় না। আন্দামান বঙ্গোপসাগরের একেবারে মাঝামাঝি বলেই বোধ হয় এখানে এমন সমুদ্রের জলের রং। নীলের বিভিন্ন শেড।

    মাঝসমুদ্র বলেই বোধ হয়, এখানে কোনও ঝিনুক নেই, যে ঝিনুক দীঘা পুরীতে গেলে আমরা হামেশাই কুড়িয়ে থাকি। তারা এখানে পুরোপুরি অনুপস্থিত। কিন্তু ঝিনুকের বদলে আরও অনেক অনেক জিনিস রয়েছে এখানকার সমুদ্রে। যা দেখতে এখানে আসা।

    হাল্কা ঘুম দিয়ে, হোটেলে লাঞ্চ খেয়ে বেরনো গেল। দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি, বেলা দ্বিপ্রহর।
  • Samik | 121.242.177.19 | ১৯ অক্টোবর ২০১০ ১৬:০৭459018
  • বেরোনো তো গেল, কিন্তু আকাশের মুখ ভার। আজ প্রথম দিন, আজ বেশি ঘোরাঘুরি নয়। কাছাকাছি পোর্ট ব্লেয়ারেরই এক প্রান্তে আছে কর্বিন্স কুভ বিচ (Corbyn's Cove)। সেখানে প্রথম স্টপ।

    বিচে শুধু নারকোলগাছ আর নারকোলগাছ। একেবারে ভিড় নেই। অনেক দূরে দুটো একটা ফ্যামিলিকে দেখা যাচ্ছে সমুদ্রের জলের থেকে গা বাঁচিয়ে হুটোপাটি করছে। এত বড় সৈকত, আর এত ফাঁকা, মনে হল পুরো বিচটাই বুঝি আমাদের জন্য রিজার্ভড। প্যান্ট গুটিয়ে কন্যেকে নিয়ে এগিয়ে গেলাম। (অ্যালবামে ছবি নং ২৬ থেকে ৪৯)

    সমুদ্রের নীল রঙ তেমন দেখা যাচ্ছে না, বরং একটু কালচে। আকাশের মেঘের ছায়া। দূরে একটা নির্জন ছোট্ট দ্বীপ দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ের ওপর দুটো গাছের সিল্যুয়েট একটা দারুণ এফেক্ট এনেছে কালো আকাশের সামনে। নারকোলগাছগুলোর পাতা এত উজ্‌জ্বল সবুজ ...

    ঘন্টাখানেক কাটিয়ে সাড়ে তিনটে নাগাদ ফিরে এলাম শহরের ভেতর। পরের গন্তব্য সেলুলার জেল (ছবি নং ৫০ থেকে ৭৬)।

    অনেক জায়গায় অনেকেই হয় তো পড়েছে এর সম্বন্ধে, কিন্তু সামনে থেকে এই জিনিস দেখা অন্যরকমের। খুব বড় দেশপ্রেমিক হবার দরকার হয় না, শুধু ইতিহাসের প্রতি একটু ভালোবাসা থাকলে আপনিই জলে ভরে আসে চোখ। কী কঠিন, অমানুষিক অত্যাচার সয়ে যে তিলে তিলে মৃত্যুবরণ করেছেন কতশত নাম-জানা-না-জানা দেশপ্রেমিক, বিবরণ না পড়লে বোঝা যাবে না। সেই সময়কার ট্রাইবদের ধরে বেঁধে চাবুক মেরে এই এলাকার জঙ্গল সাফ করানো হয়েছিল, কী করে যেন বেঁচে গেছিল একটি মাত্র পিপল গাছ, জেল তৈরি হবার প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত সেই পিপল গাছ দাঁড়িয়ে আছে প্রবেশপথের মুখে। সন্ধ্যেবেলার লাইট-অ্যান্ড সাউন্ডে তো সে-ই শোনায় সেই অত্যাচারের গল্প।

    সাত উইং বিশিষ্ট এই জেল একসাথে প্রায় ৭০০ বন্দীকে রাখতে পারত। একবার যে এখানে আসত, সে আর ফিরে যেতে পারত না কোনওদিনও। দ্বীপান্তরিত হয়ে এখানে আসা, তাই ছিল জন্মের মত চলে আসা। তাই এই সমুদ্রযাত্রার আরেক নাম ছিল: "কালাপানি'। কালাপানির নাম শোনামাত্র মুখ শুকিয়ে যেত সব্বার। হয় অমানুষিক অত্যাচারে, নয় তো এমনিই জেলের মধ্যে পচে, নয় তো ফাঁসিতে ঝুলে সকলের চোখের আড়ালে চলে গিয়েছে শয়ে শয়ে প্রাণ। কাউন্টলেস। একদা সভ্যমানুষের সংস্পর্শবিহীন আন্দামানকে তাদের বাসযোগ্য করে তোলার সমস্ত কাজও করানো হয়েছিল এখানকার কয়েদিদের দিয়েই। আন্দামান তখন সম্পূর্ণভাবে পাহাড়ে জঙ্গলে পরিপূর্ণ, জঙ্গলে রয়েছে অসভ্য আদিমপ্রায় মানুষ যারা সভ্য মানুষ পেলে কাঁচা ছিঁড়ে খায়। ব্রিটিশদের হাতে ছিল বন্দুক, নির্বিচারে তরা খুন করেছে জারোয়া-ওঙ্গি-শোম্পেনদের, জঙ্গল কেটে বসতি বানিয়েছে পোর্ট ব্লেয়ারে, আর কয়েদিদের দিয়ে বানিয়ে চলেছে তাদের সমস্ত কোয়ার্টার, হাসপাতাল, অফিস, চার্চ। কলুর ঘানি টেনে সরষে থেকে বানাতে হয়েছে তেল, নারকোল থেকে বানাতে হয়েছে তেল। দৈনিক কোটার থেকে এক আউন্স কম তেল হলে দিনের শেষে খাবারের বদলে মিলত উপর্যুপরি চাবুক, অজ্ঞান হয়ে না-যাওয়া পর্যন্ত। সারাদিনে দুবার মাত্র টয়লেট করার অনুমতি মিলত, দিন শুরু হবার আগে, দিন শেষ হবার পর। মধ্যে যদি কারুর দরকার হত, অনুমতির বদলে মিলত চাবুক। মার। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর।

    সেলুলার জেলের প্রতিটা কুঠুরিতে জমে রয়েছে প্রচুর কষ্ট, প্রচুর কান্না, প্রচুর প্রচুর মৃত্যু। যে-সবের বদলে আজ ভারত স্বাধীন। জেলের চরপাশে কোনও উঁচু পাঁচিল ছিল না। কী হবে রেখে? সমুদ্রই তো সবচেয়ে বড় পাঁচিল! কেউ পালাতে পারবে না।

    কেউ পারে নি পালাতে। যারা লুকিয়ে রাতের অন্ধকারে সাঁতরে অন্য দ্বীপে উঠত, হয় ব্রিটিশদের হাতে মরত, না-হলে মরত জারোয়াদের হাতে। এই রকমই এক কুঠুরিতে দিনের পর দিন অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে করতে প্রায় পাগল হয়ে গেছিলেন বারীন ঘোষ। উল্লাসকর দত্ত সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে গেছিলেন। বিনায়ক দামোদর সাভারকর জেলের একটা কুঠুরিতে সেই অত্যাচারের মধ্যে থেকে অতিবাহিত করেচেন দীর্ঘ দশটা বছর। তাঁর ভাই পর্যন্ত, একই জেলে বন্দী থেকেও জানতে পারেন নি দাদা কোন্‌ সেলে আছে, বেঁচে আছে না পালিয়ে গেছে না ফাঁসি হয়ে গেছে।

    আমরা জার্মান নাৎসীদের নামে গালাগাল দিই, হলোকাস্টের স্মৃতি তুলে। কিন্তু তথাকথিত সুসভ্য ব্রিটিশ জাত সারা পৃথিবীর নজরের আড়ালে এখানে কয়েক দশক ধরে যে নারকীয় জিনিস চালিয়েছিল রাজনৈতিক কয়েদীদের ওপর, তার একমাত্র তুলনা বোধ হয় করা যায় আউশউইৎজ্‌, বার্জেন-বেলসেন, দ্রাখাউয়ের কনসে®¾ট্রশন ক্যাম্পের সঙ্গে।

    সাতটা উইং একটা সে¾ট্রাল পয়েন্টে যুক্ত। সেটা ওয়াচ টাওয়ার। ঐ টাওয়ার থেকে যে কোনও উইংয়ে নজর চালানো যেত। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, আন্দামান যখন বছর তিনেকের জন্য জাপানীদের দখলে আসে, তারা বম্বিং করে এর দুটো উইং সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এর পরে ১৯৪৫এ জাপানের আত্মসমর্পণের সাথে সাথে বিশ্বযুদ্ধ যখন শেষ হয়, তখন আন্দামান আবার ব্রিটিশদের দখলে আসে।

    দেশ স্বাধীন হবার পরে আন্দামান কীভাবে ভারতের ভাগে পড়ল, সে অন্য গল্প। কিন্তু হাতে পেয়েই ভারত সরকার সেলুলার জেলকে ডেমোলিশ করে দেবার নির্দেশ দেন। আরও দুটি উইং ভাঙা হয়ে গেছিল, সেই সময়ে দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ওঠে। তখনও যে সব স্বাধীনতা সংগ্রামী বেঁচে ছিলেন, যাঁরা জীবনের কোনও না কোনও সময় এই জেলে কাটিয়েছেন, তাঁদের পিটিশনে ধ্বংস করার কাজ বন্ধ করা হয়, সেই জায়গায় একটা হাসপাতাল বানানো হয়, আর বাকি তিনটি উইং, যা আমরা আজও দেখতে পাই, সেই সমেত বাকি অংশ জাতীয় স্মারক হিসেবে ডিক্লেয়ার করে দেওয়া হয়। ১৯৫৯ সালে।

    আজ সেলুলার জেল দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। সারা ভারত থেকে লোকে আসে দেখতে, প্রায় প্রত্যেকে বেরোয় চোখের জল মুছতে মুছতে। সন্ধ্যেবেলায় লাইট অ্যান্ড সাউন্ডে কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয় সেই সব দিনের ভয়ংকর স্মৃতি।
  • aka | 24.42.203.194 | ১৯ অক্টোবর ২০১০ ১৬:৩১459029
  • জারোয়াদের সাথে কথা বল নি? আমার ভাইরা দেখা করে, কথা বলে, লাল কাপড় দিয়ে এয়েছে।
  • Samik | 121.242.177.19 | ১৯ অক্টোবর ২০১০ ১৬:৫০459040
  • ঐসব কাজ স্ট্রিক্টলি বারণ। পরে বিস্তারিত বলব। ধীরে ধীরে এগোচ্ছি।
  • Samik | 121.242.177.19 | ১৯ অক্টোবর ২০১০ ১৭:৫০458774
  • জেল দেখে বেরোলাম সাড়ে চারটেয়। বেরোতেই দেখি জেলের গেটে হৈহৈ করে ডাব বিক্রি হচ্ছে। কত করে? পনরা রুপিয়া। হিন্দি উচ্চারণেই সন্দেহ হল, পরের প্রশ্নটা তাই বাংলাতেই ছুঁড়ে দিলাম, শাঁস আছে, না নেই? উত্তরও এল প্রত্যাশিতভাবে বাংলাতেই, শাঁসওলা নেবেন, না শাঁসছাড়া নেবেন?

    দিল্লিতে আছি সাত বছর হয়ে গেল। হিন্দি উচ্চারণ শুনেই যেমন বাঙালি চিনতে পেরে যাই, তেমনি ডাব খাই নি, সে-ও নয় নয় করে সাত বচ্ছর হয়ে গেল। হুকুম করতেই ইয়াব্বড় একটা ডাব ছুলে দিয়ে দিল লোকটা। কন্যে তার জীবৎকালে ডাব চোখে দ্যাখে নি, অমন করে একটা বড় জিনিস কেটে তার মধ্যে স্ট্র ঢুকিয়ে খাওয়া, এ-সব এক্সপেরিমেন্ট করতে সে রাজি নয়। একেবারেই নয়। বরং তার হাতে ক্যামেরা ধরিয়ে দাও, ডাবের্জল পানরত বাবা-মায়ের ছবি সে তুলে দিতে পারবে। (৭৭ নং ছবি)

    জেলের রাস্তা থেকে একটু নিচে নামলেই জেটি। সেখানে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে আবার ফিরে এলাম লাইট অ্যান্ড সাউন্ড দেখতে।

    লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শুরু হবার মুখেই ঝম্‌ঝমিয়ে বৃষ্টি। পুরোদস্তুর ভিজলাম ছাতা বের করতে পারার আগেই। শেষে সেই ভেজা গায়ে বসেই পুরো শো-টা দেখলাম। তারপর হোটেলে ফিরে লম্বা ঘুম। পরের দিনের অন্য প্ল্যান।
  • Bratin | 122.248.182.16 | ১৯ অক্টোবর ২০১০ ১৭:৫৭458785
  • দিব্বি হচ্ছে। দারুন এনজয় করছি
  • Samik | 122.162.75.167 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ০০:০১458796
  • কিছু কিছু ছবিতে সামান্য এফেক্ট লাগিয়েছি। এক্ষপার্টরা দেখে টেখে মতামত দিন।
  • Nina | 64.56.33.254 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ০০:৩১458807
  • শমীক, খুব ভাল লাগছে --ছবিগুলো গতকাল কিছু দেখেছি বাড়ীতে গিয়ে আবার দেখব আজ।
    স্বদেশীবাবু-বাবা মা আর শ্বশুরবাড়ীও অনেকটাই তাই--প্রচুর স্বদেশী আমলের মানুষজনকে খুব কাছ থেকে দেখেছি জেনেছি---বিভিন্ন জেলের বিভিন্ন বিভিষীকার গল্প শুনেছি। প্রিয়জনেদের গায়ে, মনে অনেক অত্যাচারের ক্ষতচিহ্ন দেখেছি।
    আন্দামানের নামেই কেমন বুক ধড়ফড় করে ওঠে--যাবার সাহস পাইনা---তোমার চোখ দিয়ে দেখছি--নিজের চোখে জল নিয়ে--কতশত মহৎ প্রানের বিনিময়ে আমাদের আজকের এই স্বাধীনতা ---উফ ঐ সেলুলার জেলের গাছটা যদি কথা বলতে পরত?! জেলের দেয়াল গুলি যদি নিজের বুকে গেঁথে রাখা কান্না, হা-হুতাশগুলো বাতাসে ভাসিয়ে দিত হঠাৎ--নাহ! সরি--লেখ তুমি এমনি সুন্দর করে --আপাতত তোমার চোখ দিয়েই দেখি---হয়ত নিজে যাবার সাহস এই জীবনে পাবনা।

  • Shuchismita | 12.34.246.72 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ০১:২৮458818
  • শমীক, ম্যাঙ্গো পাবলিক - ওসব এফেক্ট-টেফেক্ট বুঝি না। তার চেয়ে ভালো করে ক্যাপশান লাগাও দেখি!

    ১৩৫, ১৩৬ এ আকাশটা চমৎকার লাগল। ১৫৪-তে কি ঝড় উঠেছে? ব্যাপক তো! ১৬৭ খুব সুন্দর। কিন্তু গল্পটা না থাকলে কিছুই বুঝতে পারছি না। ১৭৭ অবশ্য চেনা গল্প - অবন ঠাকুরের শকুন্তলা :-)
  • Samik | 122.162.75.56 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ০৮:৪২458829
  • আপাতত ৮২ নং ছবি পর্যন্ত গল্প হয়েছে। তার পর থেকে পরের দিনগুলোর ছবি। গল্প হয় নি, তাই ক্যাপশন লাগাই নি। আজ দ্বিতীয় দিন কভার করব।

    ঝড়ের ছবি এখনো দিই নি। মাঝসমুদ্রে ঝড়ের মধ্যে পড়েছিলাম। ওটা নেহাৎই কালো মেঘ। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঘুরেছি পুরো ট্রিপটা।
  • Samik | 122.162.75.56 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ০৮:৪৫458840
  • নীনাদি, লাইট অ্যান্ড সাউন্ডে সেলুলার জেলের ঐ গাছটাই পুরো গল্পটা বলে। ভয়েসটা অবশ্য ওম পুরির।

    বসার জায়গা পাই নি, ঐ গাছটার নিচে বসেই লাইট অ্যান্ড সাউন্ড দেখে এসেছিলাম।
  • Samik | 121.242.177.19 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ১২:০৭458851
  • এইখানে একটু কমিক রিলিফ দেওয়া যেতেই পারে। আমি তখন কন্যেকে নিয়ে জেলের ওয়াচ টাওয়ারের মাথায়। ছকোণা এবং দোতলা এই টাওয়ারের ভেতর দিকের প্রতিটি দেওয়ালে শ্বেতপাথরে নাম লেখা সেইসব কয়েদীদের, যাঁরা এসেছিলেন, কিন্তু ফিরে যান নি। শয়ে শয়ে নাম। সিংহভাগ নামই বাঙালি।

    পেছন থেকে একটা আওয়াজ এল। "আরে বাবুয়া, ই তো সব্‌হি বঙ্গাল কা নাম লিক্‌খা হুয়া হ্যায়। বিহার সে কোই না আয়া হ্যায় কা?'

    পেছন ফিরে দেখি একটি ঠেঁট বিহারি ফ্যামিলি, চারটি কাচ্চাবাচ্চাসমেত সমস্ত লিস্ট খুঁজে পড়ে চলেছেন। তাঁরই আক্ষেপ। আচমকা তাঁর বড় মেয়ের উল্লাস, মা, মিল গয়া। ই দেখো, শর্মা হ্যায়, জরুর বিহারি হোগা।
    ...
  • Samik | 121.242.177.19 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ১৩:১৭458862
  • আন্দামানে এলে এক-দুটো দিন লোকে রেখে দেয় হ্যভলক আইল্যান্ডে যাবার জন্য। ওখানকার রাধানগর বিচ এশিয়ার সেরা তিনটে বিচের মধ্যে একটা। সেখানে যাবার জন্য জাহাজ তো চলেই, পবনহংসের হেলিকপ্টারও চলে। তবে খুব রিকোয়েন্টলি নয়। সপ্তাহে বোধ হয় দু-তিনদিন চলে। নেট ঘেঁটে বিশেষ কোনও ইনফর্মেশন পাই নি, তাই হোটেলে পৌঁছে যে ট্র্যাভেল এজেন্টকে আমরা কনট্যাক্ট করেছিলাম, তাকেই প্রয়োজনীয় ফর্ম ফিলআপ করে দিয়ে বলেছিলাম পবনহংসের আপিসে গিয়ে জমা করে আসতে, যাতে যাওয়াটা হেলিকপ্টারে হয়, ফেরাটা না হয় জাহাজে করা যাবে। লোকটা বেশ প্যাঁচার মত মুখ করে নিল ফর্মটা, সাথে জানাল, ওটা খুব একটা রেগুলার সার্ভিস নয়, প্রায়ই লোকের বুকিং ক্যানসেল হয়ে যায় মিলিটারির লোকজনের যাবার থাকলে। এমনিতে সেভেন সিটার। ইনফর্মেশনগুলো আমার কাছে নতুন নয়, তবে এ রকম পরিস্থিতি আসতে পারে জেনে নিয়েই আমি গিন্নির অফিস আইকার্ডের জেরক্স নিয়ে গেছিলাম। মিনিস্ট্রি অফ ডিফেন্স, সেনা ভবন, নিউ দিল্লি। সেটাও ধরিয়ে দিলাম।

    বুঝতে পারলাম, দিল্লি থেকে অনেক দূরে এসে পড়েছি। দিল্লি হলে ঐ আইকার্ড দেখিয়ে অনেক কিছু হয়ে যায়। এখানে ট্র্যাভেল এজেন্টের মুখে বিশেষ কিছু ভাবান্তর হল না। সে জিনিসগুলো নিয়ে বলল, জমা করে দেবে। মঙ্গলবার হেলিকপ্টার উড়বে, সোমবার দুপুরে লিস্ট বেরোবে কনফার্মড যাত্রীদের। তখন দেখে নিয়ে জানিয়ে দেওয়া যাবে। কপ্টারে না হলে জাহাজে টিকিট কেটে নেওয়া হবে।

    যাঁরা ভবিষ্যতে আন্দামানে বেড়াতে যাবেন, তাঁদের জানিয়ে রাখি, ওখানে ঘুরতে হলে একজন ট্র্যাভেল এজেন্টের সাহায্য নিতেই হবে, কারণ প্রত্যেকদিনের আলাদা আলাদা ট্যুরের জন্য জাহাজ ছাড়ে বিভিন্ন জেটি থেকে, সেখান থেকে আগে থেকে টিকিট কেটে না রাখলে ঝামেলা আছে। নিজে ঘুরতে বেরিয়ে পরের দিনের টিকিট কাটার জন্য এখানে ওখানে লাইন দিলে ঘোরা মাটি হবে। অতএব, ট্র্যাভেল এজেন্ট এখানে ভরসা।

    কাল শুক্রবার। আন্দামানে আমাদের দ্বিতীয় দিন। মঙ্গলবার হবে ষষ্ঠ দিন, এখনও অনেক সময় আছে। কাল যাবো ওয়ান্ডুর বিচ, রেড স্কিন আইল্যান্ড। সারাদিনের ট্যুর। রেড স্কিনে লোকবসতি নেই, খাবার এখান থেকে প্যাক করে নিয়ে যেতে হবে। পুরি সবজির অর্ডার দিয়ে ঘুমোতে গেলাম।

    --- ** --- ** ---
    মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর, দ্বিতীয় দিন

    সাড়ে আটটায় বেরনো, জেটিতে পৌঁছে লঞ্চে চাপা, লঞ্চ ছাড়বে সাড়ে নটায়। কিন্তু লাঞ্চ রেডি হয় নি। বিস্তর চেঁচামেচি করেও শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়ে যখন ড্রাইভারকে বললাম রাস্তায় দাঁড়িও, কটা বিস্কিটের প্যাকেট কিনে নেব, ড্রাইভারও সমস্ত মেনে নিয়ে গাড়ি স্টার্ট করে দিয়েছে, তখন কিচেন থেকে দৌড়তে দৌড়তে এল ছেলেটা, হাতে ফয়েলে মোড়া পুরি, আর পলিথিনের প্যাকেটে ভরা সবজি।

    তাই নিয়েই এগোলাম। জাস্ট নটা পঁচিশে ঢুকলাম ওয়ান্ডুর জেটিতে। রাস্তায় কিছু গ্রাম পেরিয়ে এলাম, রাস্তার দুধারে কেবল পুকুর আর পুকুর। ড্রাইভার সিমিন জানাল, এই এলাকাই পোর্ট ব্লেয়ারের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা, সুনামির সময়ে, এই সমস্ত পুকুর এককালে চাষের জমি ছিল, সুনামির জল আছড়ে পড়ে সব ভাসিয়ে দিয়েছিল, সেই জল আর বেরিয়ে যেতে পারে নি, নোনা জলে সমস্ত ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে, এখন এগুলো শুধুই পুকুর। এখান থেকে সমুদ্র অনেক দূর, পাম্প করে জল ফিরিয়েও দেওয়া যায় না।

    জেটিতে পৌঁছে হল এক ফ্যাকড়া। ওয়ান্ডুরে প্লাস্টিক নিয়ে যাওয়া বারণ। কী মুশকিল, আমাদের জলে নামার পোষাক, এমনকি আমাদের দুপুরের লাঞ্চের তরকারি পর্যন্ত প্লাস্টিকের প্যাকেটে! কিন্তু নিয়ম ইজ নিয়ম। রক্ষী তরকারির প্যাকেটটা কেবল ছাড় দিলেন, বাকি পলিথিনের প্যাকেট সমস্ত গাড়িতে রেখে আসতে হল। সে যাক, আমাদের কাছে কাপড়ের ব্যাগ ছিল, তাতেই ভরে নিলাম সব জিনিস। জামাতে আর হাওয়াই চটিতে একসাথে জায়গা নিল, কোনও আড়াল ছাড়াই।

    প্রথমে ছোটো বোট, যাতে একসাথে কুড়ি জন বসতে পারে, সেখান থেকে লঞ্চ। টিপিটিপি বৃষ্টি পড়েই চলেছে, পড়েই চলেছে, তার মধ্যেই আমরা চেপে বসলাম লঞ্চে। দশটা নাগাদ সব লোক তোলা হলে লঞ্চ ছাড়ল।
  • Samik | 121.242.177.19 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ১৪:১১458873
  • ওয়ান্ডুর (Wandoor) থেকে দুটো জায়গায় যাওয়া যায়। রেড স্কিন আইল্যান্ড, আর জলি বয় (Jolly Buoy) আইল্যান্ড। বছরের ছমাস রেড স্কিন খোলা থাকে, ছমাস জলি বয়। আমরা যাচ্ছি রেড স্কিনে।

    হঠাৎ একটা হইহই উঠল আমাদের সাইডে। সবই জলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আমিও ঝুঁকে তাকিয়ে দেখি, একটা জেলিফিশ, অলস গতিতে জলের ঠিক ওপরের লেয়ার দিয়ে লঞ্চের সাথে সাঁতার কেটে চলেছে। নিজের চোখে জেলিফিস দেখা এই প্রথম। তবে খানিকক্ষণের মধ্যেই লঞ্চ তাকে ওভারটেক করে এগিয়ে গেল।

    বিশাল চাওড়া জলপথ, বেশ হাইওয়ের মত লাগছে, কারণ দুদিকে ঘন সবুজ ম্যানগ্রোভের বন তাদের শিকড়বাকড় উঁচিয়ে রাস্তার দুই বর্ডার তৈরি করে চলেছে। ফ্লোরা এত সবুজ, আর জল এমন ঘন নীল (ছবি নং ৮৭-তে নীল জল বেশ ভালো উঠেছে), দেখলে চোখ ফিরিয়ে আনা যায় না। আর স্বচ্ছ জল। কোনও ঘোলা ব্যাপার নেই, যতদূর সূর্যের আলো যাচ্ছে, ততদূর দেখা যাচ্ছে জলের ভেতর। কোথাও কোনও ধূলো ময়লা নেই।

    চল্লিশ মিনিটের লঞ্চযাত্রার শেষে আমরা পৌঁছলাম রেড স্কিন আইল্যান্ডে। একটা ছোট্ট বিচ, অনেক শুকনো ভাঙা গাছপালা পড়ে আছে সামনে। সব মিলিয়ে একটা পিকচারেস্ক ব্যাপার।

    বিচের একটু দূরে এসে লঞ্চ থেমে গেল। এখান থেকে আমাদের আবার বোটে করে যেতে হবে। বোট বলতে, গ্লাস বটম বোট। মানে, বোটের নিচেটা, যেখানে পা রাখা হয়, সেটা কাঁচের তৈরি। কাঁচ এমন কিছু উচ্চমানের নয়, লোকের জুতোর ঘষা খেয়ে খেয়ে সে আর তেমন স্বচ্ছও নেই, তবু তার ওপরেই জল ঢেলে ঢেলে স্বচ্ছ করার প্রচেষ্টা। কেন?

    ঐ কাঁচ দিয়ে নিচে কোরাল্‌স দেখা যায়। যা দেখতে এখানে আসা। কোরালের বিপুল সম্ভার এই আইল্যান্ডের চারপাশে। যারা জলে নামতে ভয় পান, তাদের জন্য এই গ্লাস বটম বোট, যারা ভয় পান না, তারা স্নরকেলিং করতে পারেন এখানে, গাইডের সাথে।

    কত্তা-গিন্নি-কন্যের মধ্যে একমাত্র কত্তাই জলকে একেবারে ভয় পান না, তিনি ভালো সাঁতার জানেন টানেন, তাই তিনি বাকি দুজনকে অভয় দিয়ে জলে নামালেন। সমুদ্র অনেক দূর পর্যন্ত অগভীর। হেঁটে যাওয়া যায়। সেখান হাত ধরে যতটুকু ঝুপুস ঝাপুস করা যায়, করা হল।

    মূলত সমুদ্রই এখানকার ট্যুরিজমের মুখ্য আকর্ষণ হলেও ট্যুরিস্ট ফেসিলিটি প্রায় পুরো আন্দামানেই খুব প্রিমিটিভ কন্ডিশনে আছে। জলে নামার আগে, চেঞ্জিং রুম বলতে, পার্টিশন দেওয়া টিনের দুটি ঘর, ছেলেদেরটায় দরজাই নেই, মেয়েদেরটায় দরজা আছে, কিন্তু তাতে কোনও ছিটকিনি নাই। কেউ ভেতরে গেলে একজন এসকর্টকে বাইরে দরজা বন্ধ রেখে পাহারা দিতে হয়। একজন যতক্ষণ না বেরোচ্ছে, ততক্ষণ পরের জন ঢুকতে পারে না। পুরো বিচে টয়লেটের জন্য জাস্ট কোনও বন্দোবস্ত নেই। একটা ঝুপড়ি, সেখানে স্নরকেলিংয়ের মুখোশ নিয়ে লোকেরা বসে আছে।

    তো, সে যাই হোক, স্নরকেলিং পরে হবে, প্রথমে তো একটু গা ভিজিয়ে নিই। সেই স্কুলে পড়ার সময়ে সাঁতার ক্লাবে সাঁতার শিখতাম, বছরে আড়াইশো টাকা দিয়ে, পরে গঙ্গাতেও সাঁতার কেটেছি অনেক, কিন্তু হুগলি ছাড়ার পর থেকে আর সাঁতার কাটা হয় নি। আমাদের গাজিয়াবাদে সুইমিং পুলে পায়ের বুড়ো আঙুল ডোবাতে গেলেই মাসে গুনতে হয় এক হাজার টাকা করে।

    জলে নামলাম। খানিকক্ষণ নাচানাচি হল, অন্যান্য সুন্দরী মেয়েদের ভিজে পোষাক পর্যবেক্ষণ করলাম অনেকক্ষণ ধরে। প্রাণমন একেবারে ভরে গেল। তখন কানে এল, আমাদের লঞ্চের সারেংরা সমুদ্রে একটু দূরে একটা করে রাবারের টিউব আর স্নরকেলিংয়ের মুখোশ নিয়ে ডাকাডাকি করছে। তারা আরও গভীর সমুদ্রে নিয়ে যাবে, পারহেড দুশো করে টাকা।

    টাকার অ্যামানুন্টটা বড় বেশি লাগছিল, কিন্তু একজন বাঙালি মেয়ে, আমাদের লঞ্চেই আলাপ হয়েছিল, ফিরে এসে বলল, ঐ গভীর সমুদ্রের দিকটা ঘুরে এসো, তোমাদের দুশো টাকা উশুল হয়ে যাবে। অতএব, প্রথমে গিন্নিকে পাঠানো হল।

    সাঁতার জানার দরকার নেই, কেবল মুখোশটা চোখের ওপর চাপিয়ে, নিশ্বাস নেবার নলটা মুখে ঢুকিয়ে নিয়ে মাথার সামনেটা ডোবালেই হল, রাবারের টিউব বাকি শরীর ভাসিয়ে রাখবে। কুড়ি মিনিট বাদে গিন্নি ফিরে এল ঝলমলে মুখ নিয়ে, "দেখে আয় দেখে আয়, জীবনে একবারই দেখার সুজোগ মেলে এ জিনিস'।

    অতএব কথা না বাড়িয়ে কন্যাকে তার হতে ট্রান্সফার করে আমিও পরে নিলাম মুখোশ। মুখ ডোবালাম জলের নিচে, গাইডের হাত ধরে।

    জলের নিচে তাকানো মাত্র চমকে গেলাম। জাস্ট মনে হল, সীমাহীন একটা অত্যন্ত কালারফুল অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যে আমি ঢুকে পড়েছি। অজস্র রকমের সম্ভব অসম্ভব কালার। কেবল কানদুটো জলের ওপরে রাখতে হয়েছিল, নইলে গাইডের কথা শুনতে পাবো না।

    গাইড বাঙালি। আন্দামানের অধিকাংশ লোকই বাঙালি। সে আমাকে দেখাতে চলল, এইটা বেগুনি কালারের সী ক্যুকাম্বার, হাতে নিয়ে দেখুন, ঠিক ভেলভেটের মত লাগবে। এইটা বল স্টার ফিস, ঐটা হলুদ রঙের সী ক্যুকাম্বার, ঐ দেখুন এক ঝাঁক হলুদ রঙের মাছ, এইটা টাইগার ফিশ, ঐটা জোকার ফিশ, ঐ নীল মাছটা দেখুন, রাতে ওর গা দিয়ে আলো বেরোয়, এইগুলো সী অর্চিন, ঐগুলো স্পঞ্জ, লাল নীল গোলাপি বেগনি হলুদ সোনালি কমলা ... হাতে নিয়ে দেখুন, ঐ যে সাইড দিয়ে সাদা রঙের অনেকগুলো সুতোর মত বেরিয়ে গেল, এইগুলো সী ক্যুকুম্বারের আত্মরক্ষার অস্ত্র। জাস্ট ভয় দেখায়। বিষ নেই। আপনি তো সাঁতার জানেন, একেবারে নিচে ডুব দিয়ে টাচ করে আসুন, আমি দড়ি ধরে আছি।

    যাহা দেখিলাম, জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না। পাগলা, ফাটাফাটি, একঘর উইথ অ্যাটাচ বাথ, অসাধারণ, যা-তা জিনিস। এন্ডলেস অ্যাকোয়ারিয়ামের রংবেরংয়ের মাছের দলের সাথে আমি সাঁতার কাটছি। জলের নিচে যে এত রঙ থাকতে পারে! সাথে অবশ্যই রঙে্‌বরংয়ের কোরাল। প্রবাল। লাল-নীল-হলুদ-ম্যাজেন্টা ...

    স্বপ্ন মনে হচ্ছিল। আধঘণ্টা স্নরকেলিং করে ফিরে এলাম বিচে।
  • Blank | 170.153.65.102 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ১৫:৩১458885
  • এমনি জায়গায় ছবি তোলার ব্যবস্থা কিছু আছে? ক্যামেরা নিয়ে গেলে তুলতে দেয়?
  • Samik | 121.242.177.19 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ১৫:৪৪458896
  • পুরো আন্দামানে, একমাত্র ছবি তুলতে বাধা পেয়েছি সামুদ্রিকার অ্যাকোয়ারিয়াম সেকশনে। সামুদ্রিকা হল ইন্ডিয়ান নেভির মিউজিয়াম। আন্দামানের ইতিহাস ভূগোল, ফ্লোরা, ফওনা, মেরিন লাইফ ইত্যাদির ভালো কালেকশন আছে এখানে। কেবল যে ঘরটায় অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ রাখা ছিল, সেখানে ছবি তুলতে দেয় নি, বাকি সমস্ত জায়গার ছবি তোলা যায়।

    জলের নিচে ছবি তোলার ক্যামেরা নিয়ে যেতে পারলে নাথিং লাইক দ্যাট। আদারওয়াইজ ক্যামেরা ট্যামেরা ওখানে কিছু পাওয়া যাবে না। ট্যুরিজমটাকে ঠিক ওখানকার আইডেনটিটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতে আজও পারে নি আন্দামানের লোকাল লোকজন। এটাই ঐ জায়গার বিউটি। আমি প্রচুর ঘুরেও ঠিক সে রকম কোনও ক্যামেরা-ফিল্ম-রিল-ব্যাটারির দোকান দেখতে পাই নি। ট্র্যাভেল অপারেটরদের রমরমাও নেই ওখানকার বাজার এলাকায়, সমস্ত এজেন্টই হোটেলের মারফৎ কাজ করে।

    তোর বেস্ট ক্যামেরা নিয়ে যা, ট্রাইপড অবশ্যই লাগবে। স্ট্যান্ডবাই ক্যামেরাও নিয়ে যা। আমার একটি ক্যামেরা হ্যাভলকে ঢেউয়ের এক ঝাপটা খেয়ে অকেজো হয়ে গেছিল। স্ট্যান্ডবাই ক্যামেরা তখন কাজে দিয়েছিল।

    আমার সমস্ত ছবি কোডাকের পাতি ১০ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরায় তোলা, আমি ফোটোগ্রাফির ফ-ও বুঝি না। আর হ্যাঁ, হাতে অন্তত বারো চোদ্দ দিন সময় নিতে হবে পুরো আন্দামান ঘোরার জন্য। সাথে লাগবে একটা ল্যাপটপ। প্রতিদিন ক্যামেরার মেমোরি কার্ড ফুল হয়ে যাবার চান্স থাকতে পারে। ল্যাপটপে প্রতি দিনের শেষে ছবি ট্র্যান্সফার করে নিতে হবে।

    আরো জ্ঞান দেব। পরে।
  • Samik | 121.242.177.19 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ১৬:০৫458907
  • এই ফাঁকে আজকের আন্দামান নিয়ে দু-চার কথা লিখি। আমার চোখে যা দেখা।

    আন্দামানে কিছু জিনিস খুব ইউনিক। এখানকার গাড়ির নাম্বারপ্লেট ভারতের আর কোনও স্টেটে দেখতে পাওয়া যাবে না, ভারতের আর কোনও স্টেটের গাড়ির নাম্বারপ্লেটও আন্দামানে দেখতে পাওয়া যাবে না। এখানের নম্বর সবই AN দিয়ে শুরু। যদিও লেটেস্ট মডেলের সমস্ত গাড়িই এখানে আছে। টাটা ন্যানো দেখলাম প্রচুর।

    পোর্ট ব্লেয়ার হল সমুদ্র থেকে সোজা উঠে আসা পাহাড়ী দ্বীপ। এখানকার প্রায় সমস্ত দ্বীপই তাই। উঁচুনিচু ঢেউখেলানো রাস্তা। পোর্ট ব্লেয়ারের সর্বোচ্চ এলাকা হল মাউন্ট হ্যারিয়েট। আর আন্দামানের সর্বোচ্চ হল স্যাডল পিক, সেটা নিকোবরে।

    জীবনযাত্রা একটু ধীরগতির। নাগরিক জীবনের তাড়াহুড়ো কিছু নেই।

    পোর্ট ব্লেয়ারের রাস্তাঘাট অসাধারণ সুন্দর, মসৃণ, পরিষ্কার। শুধু পোর্ট ব্লেয়ারই নয়, গোটা আন্দামানে যেটুকু দেখেছি, রাস্তা বেশ ভালো, আর কোথাও নোংরা বলে কিছু নেই। আন্দামানের লোকজন প্লাস্টিককে স্বেচ্ছায় প্রায় বর্জন করে ফেলেছে, কোথাও প্লাস্টিকের টুকরো, পলিথিন ইত্যাদি পড়ে থাকতে দেখি নি।

    আন্দামানে কেউ কাউকে চিট করে না। অটোয় চেপে যে গন্তব্যের কথা বললাম, সেটা সেখান থেকে এক কিলোমিটার দূরত্বে ছিল, অটোওলা দশ টাকা নিল। দিল্লি হলে ...??

    আন্দামানে কোনও ভিখারি নেই। কেউ ভিক্ষা করে না। প্রকৃতি অঢেল সম্পদ দিয়েছে। সেসব নাও আর ব্যবসা করো। কোনওদিন শেষ হবার নয়।

    সমুদ্র, পাহাড় একসাথে হবার কারণে এখানে ভেজিটেশন বেশ মিশ্র প্রকৃতির। একইসাথে নারকোলগাছ, সুপুরি গাছ, জবা গাছ, আমগাছ, ফার্ণ গাছ, আবার ম্যানগ্রোভ জাতীয় গাছ, সব একসাথে দেখা যায়। পুরো আন্দামানটা একটা ইউনিক টাইপের রেন ফরেস্ট। সারা পৃথিবীতে এর কোনও জুড়ি নেই। এখানে এমন অনেক স্পিসিসের গাছপালা আছে, যা বাকি পৃথিবীতে পাওয়া যায় না।

    অ্যাবরিজিনদের বাদ দিলে, সভ্য মানুষের মধ্যে ৭০ শতাংশ বাঙালি। এর বাইরে আছে তামিল, তেলুগু, মালয়ালম। মজার ব্যাপার এইটাই, এতগুলো নন্‌-হিন্দি স্পিকিং লোকজনের এত বছরের পাশাপাশি বসবাসের পরেও কেউ কারুর কালচার ভোলে নি। এখানে একইসঙ্গে, পাশাপাশি চলে বাংলা মাধ্যম, তেলুগু মাধ্যম, তামিল মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। মুখ্য কথ্য ভাষা হল হিন্দি, কিন্তু বাঙালি জানা মাত্র বাংলায় কথা বলে, সেম ফর তামিল তেলুগু এটসেটরা। হিন্দি এখানে তেমন পালিশ্‌ড নয়, কারণ অধিবাসীদের কারুরই মাতৃভাষা হিন্দি নয়, জাস্ট কাজ চালাবার জন্য যেমন হিন্দি দরকার, তেমনই হিন্দি চলে এখানে। হিন্দি এখানে সত্যিকারের "সংযোগরক্ষাকারী ভাষা'। অন্য ভাষাকে দাবিয়ে রাখবার কোনও অ্যাগ্রেসিভনেস নেই। সরকারি ভাষা হিন্দি আর ইংরেজি।
  • Samik | 121.242.177.19 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ১৬:০৮458918
  • আন্দামানে কোনও সিনেমাহল নেই। একমাত্র সিনেমাহল লাইটহাউস, বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কয়েক বছর আগে। অনেক ডিভিডি রেন্টাল শপ আছে, লোকে ভাড়া নিয়ে ঘরে বসে সিনেমা দ্যাখে। আজকের এই মাল্টিপ্লেক্ষ যুগেও।

    হুঁহুঁ বাওয়া, কিল পাইরেসি বল্লেই কি আর পাইরেসি কিল করা যায়? আন্দামানের লোকজন তা হলে লেটেস্ট মুভি দেখবে কী করে?
  • Nina | 64.56.33.254 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ১৯:৩১458929
  • আহারে শমীক, অমন হ্যাটা দিওনি বিহারকে :-( হে হে মানে ইয়ে আমার যে জন্ম-কর্ম বিহার!born & brought up in Patna
    তোমার লেখা খুব ভাল লাগছে পড়তে--একটু অন্য লাইনে যাচ্ছি সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে--

    Second Lahore consiracy case ভগত সিং, শুখদেব ও রাজগুরুর ফাঁসী হল। যতীন্দ্রনাথ হাঙ্গার স্ট্রাইক করে প্রাণ দিলেন। আর বটুকেশ্বর দত্ত, বিজয় কুমার সিনহা, কমলনাথ তিওয়ারি, ডক্টর গয়া প্রসাদ, মহাবীর সিং--আরও কয়েকটা নাম মনে পড়ছেনা--তাদের হল কালাপানি--এঁরা তো বিহার থেকে। আর বটুকেশ্বর দত্ত পাটনায় আমাদের বাড়ীর পাশে থাকতেন, বাবার বন্ধু--ওঁর মুখটা আর কথাগুলো চোখে সামনে ভেসে উঠল, তোমার লেখা পড়তে পড়তে।
    আন্দামানের সুন্দর বর্ণনা পড়ে , বিশেষ করে কেউ কাউকে চিট করেনা--বড্ড ভাল লাগল--মনে হল --ঐ যে সব মহৎ প্রাণের নি:শ্বাসের গুণেই কি? কে জানে!
    আমার খুব যেতে ইচ্ছে করছে এখন--হয়তো যাব এবার--তোমাকেই জানাই থ্যাঙ্কু --যাব যাব টা তোমার লেখা থেকেই মনে এল। :-))
  • Samik | 122.162.75.89 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ২০:০৫458940
  • হাঙ্গার স্ট্রাইকে প্রাণ যতীন্দ্রনাথ নয়, যতীন দাস। :)
  • Nina | 64.56.33.254 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ২০:৩০458951
  • যতীন্দ্রনাথ দাস --পুরো নাম। মারা গেলেন ১৩ই সেপ্টেমবর --বাবাও একই সঙ্গে হাঙ্গার স্ট্রাইকে ছিলেন---সেই শুনে বাড়ীতে ঠাকুমা খাওয়া ত্যাগ করেছিলেন ও তেরোদিনের মাথায় মারা যান--সে সব অনেক গল্প।

  • Lama | 203.99.212.54 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ২০:৫০458962
  • পুরো নাম যতীন্দ্রনাথ ছিল তো
  • Samik | 122.162.75.89 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ২১:১৭458972
  • যাহ্‌, আমি তো জানতাম পুরো নাম ছিল যতীন দাসই। আমি সুভাষ বলছি থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান অনুযায়ী। :(

    তবে ইয়ে, নীনাদি, আপনাকে তো কালটিভেট করতে হচ্ছে মশাই!
  • Tim | 198.82.19.245 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ২১:২৫458975
  • শমীকের একটা এডিটেড ছবি বেশ ভালো লাগলো। সাতাশি বা তার আসেপাশের একটা ছবি। জলের রং আর গাছের রং দুটো বেশ খোলতাই হয়েছে।
    লেখাটাও বেশ।
  • Samik | 122.162.75.89 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ২১:৩৩458976
  • সাতাশিটা বেস্ট কালার উঠেছে। ওটাকেই অ্যালবাম কভার করলাম তো!
  • Nina | 64.56.33.254 | ২০ অক্টোবর ২০১০ ২১:৪৭458977
  • হা হা হা হা শমীক করে ফ্যালো-- আসছিতো দিল্লীতে ১৯শে নহেম্বর পৌছুব--২৪শে যাব কলকাতা আবার ৫ই ডিসেম্বর ভায়া দিল্লী ব্যাক টু আম্রিগা।
    যতীন্দ্রনাথ আমাদের কলকাতার বাড়ীতে ছিলেনও কদিন শুনেছি। পাটনার বাড়ীতে লম্বা বারান্দায় দুপাশে অনেক মনিষীদের ছবি টাঙানো থাকত আর যতীন্দ্রনাথের ছবিটা বাবা-মার শোবার ঘরের দেয়ালে থাকত। বাবা খুবই ক্লোজ ছিলেন ওঁর সঙ্গে, একসঙ্গে অনেক কাজ করেছেন।
  • dukhe | 122.160.114.85 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১০:১৭458978
  • শমীক আরেকটু উস্কোলেই আমি আন্দামানে সেটল করে যাব । মাইরি ।
  • r.h | 203.99.212.54 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১০:৩৫458979
  • হুঁ, আম্মো।
    আরেকটু কম বয়সে যে এসব গল্প কেন কেউ বলেনি।
  • dukhe | 122.160.114.85 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১০:৫২458980
  • ফু: । পুরুষমানুষের আবার বয়স !
  • Samik | 121.242.181.2 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১১:৩৮458981
  • যা-তা! :-))))))
  • Samik | 121.242.181.2 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১১:৪০458982
  • তৃতীয় দিনের ছবি: ১২৮ থেকে ২৫০। গল্প আজ বলব।
  • Samik | 121.242.177.19 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১৫:২০458983
  • (ধারাবিবরণী: গতকালকের পর)

    স্নরকেলিংয়ের পর আবার লঞ্চে করে ফেরৎ ওয়ান্ডুরে, এবং সেখান থেকে গাড়িতে করে হোটেল।

    এদিকে হোটেলে খাওয়া আর পোষাচ্ছিল না। কোথায় ভেবে এসেছিলাম আন্দামানে নিশ্চয়ই রাস্তার মোড়ে মোড়ে তাজা মাছভাজা বিক্রি হবে, আর আমরা তাই খেয়ে পেট ভরাবো। তা এখনও পর্যন্ত কিছু তো পেলাম না। হোটেলে মাছ বলতে কেবলই সুরমই মাছ। না চিংড়ি আছে, না কাঁকড়া আছে। ধুত্তেরি!

    আন্দামানের খুব বেশি ট্র্যাভেলগ মার্কেটে পাওয়া যায় না, তাও নেটপত্র ঘেঁটেঘুঁটে কয়েকটা ট্র্যাভেলগ বের করে পড়ে ফেলেছিলাম। এটা জানি যে পোর্ট ব্লেয়ারের মূল বাজার এলাকা হল অ্যাবের্ডিন বাজার (Aberdin Bajaar)। ওখানে কিছু রেস্টুরেন্ট তো নিশ্চয়ই থাকবে। একটা অটো নিয়ে বরং চলে যাই। ... কোনও একটা ট্র্যাভেলগে পড়েছিলাম "আইসি-স্পাইসি' রেস্টুরেন্টের কথা। অটো-ওলাকে বলতেই সে নিয়ে গেল আইসি-স্পাইসিতে, বাজারে ঠিক নয় সেটা, একটু অন্যদিকে, কিন্তু নেমে ভাড়া মেটাতে গিয়ে গ্লো-সাইন দেখে বিষম খেলাম। পিওর ভেজিটেরিয়ান!!!!!!

    মুখ দিয়ে প্রায় মাতৃভাষা বেরিয়ে পড়েছিল নিজের উদ্দেশ্যে। তা অটোওলাকেই বললাম, ভাই, বাজারের দিকেই নিয়ে চলো, নন ভেজ রেস্টুরেন্ট ওখানে নিশ্চয়ই পাবো। সে মাথা নেড়ে আমাদের বাজারের ঠিক সেন্টারে, ক্লক টাওয়ার বলে একটা মোড় আছে, অনেকটা আমাদের চুঁচড়োর ঘড়ির মোড়ের মত, সেইখানে নামিয়ে দিল। সেখন থেকে চারদিকে চার রাস্তা গেছে। একে ওকে তাকে জিজ্ঞেস করে একজন মোড়ের মাথায় দেখিয়ে দিল গগন রেস্টুরেন্ট। ভেতরে মালিক কর্মচারি, সব্বাই বাঙালি। গেলাম, চিংড়ি মাছ ভাতের অর্ডার দিলাম। সাথে মাছভাজা।

    খুব শস্তার জায়গা। কিন্তু কুচো চিংড়ির ঝোল খেয়ে কি আশ মেটে? লবস্টার, কাঁকড়া রাখেন না? কর্মচারি একগাল হেসে বলল, না দাদা, ওসবের অনেক দাম, আমরা ঠিক ওসব রাখি না, আমাদের কাছে ছোট চিংড়ি পাবেন, আর এই কুকারি মাছের ভাজা পাবেন, সমুদ্রের ফ্রেশ মাছ সব ...

    মাত্র দুশো টাকার খেলাম আড়াইজনে। কিন্তু সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল। না:, ট্র্যাভেলগগুলোর প্রিন্টাউটও আনি নি, আর কোনও রেস্টুরেন্টের নামও ছিল বোধ হয়, এখন আর কিছুতেই মনে পড়ছে না।

    হোটেলে ফিরে একপ্রস্থ চেঁচামেচি করলাম, কেন আমাদের প্লাস্টিকের প্যাকেটে খাবার দিয়েছিল, ওদের তো জানা উচিত ছিল রেড স্কিনে প্লাস্টিক নিয়ে যেতে দেয় না! লোকগুলো খুব ভালোমানুষ, অনেক করে ক্ষমা চেয়ে টেয়ে জানালো, আর এমন ভুল হবে না, আসলে সকালে লোক ছিল না, এই হয়েছে, সেই হয়েছে ...

    পরদিন আমাদের থ্রি আইল্যান্ড ট্যুর। সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে বেরোতে হবে। লাঞ্চ লঞ্চে দেবে। সারাদিনের প্রোগ্রাম।

    ইন্টারনেটের তো বালাই নেই হোটেলে, মোবাইলের জিপিআরেস চলছিল। তাই দিয়ে মেল টেল চেক করে ঘুমোতে গেলাম।
  • Samik | 121.242.177.19 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১৬:০১458984
  • -- ** -- ** --
    শনিবার, ৯ অক্টোবর, তৃতীয় দিন

    আগেরদিনের তারিখ লিখতে গিয়ে (20 Oct 2010 -- 01:17 PM)কেন মঙ্গলবার লিখেছিলাম, জানি না, ওটা ছিল শুক্রবার।

    আজকের ট্রিপ, থ্রি আইল্যান্ডস। রস, ভাইপার, আর নর্থ বে। কাল সারারাত ঝমঝমিয়ে উত্তাল বৃষ্টি হয়েছে। স্নরকেলিং করে যা যা জামাকাপড় ভিজেছে, একটাও শুকোয় নি, আজও জলে নামার কথা আছে, কন্যের সুইমিং কস্ট্যুম আর আমার নেংটিটুকু প্লাস্টিকে পুরে নিয়ে বেরোলাম। বৃষ্টি এখন হচ্ছে না, তবে আকাশের মুখ ভার।

    এজেন্ট বলল, আপনারা পৌঁছে যান, এই হল গাড়ি, জেটিতে অপেক্ষা করুন, আমি আরও একটা পার্টিকে নিয়ে ওখানে পৌঁছচ্ছি, টিকিট ওখানে দিয়ে দেব।

    পৌঁছনো গেল। জেটি বলতে, আসলে, রাজীব গান্ধি ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স। তার একপাশে জেটি। পৌঁছে দু-চাট্টে ফটো তুলতে-না-তুলতেই ঝেঁপে বৃষ্টি এল। কন্যের রেনকোট তো ছিল, আমরা দুজনে একটা ছাতায় কোনওরকমে মাথা বাঁচালাম।

    জেটিতে পাশাপাশি গায়ে গা লাগিয়ে চারটে লঞ্চ দাঁড়িয়ে। শুভক্ষণে আমাদের এজেন্ট এসে জানালো, প্রথম দুটো লঞ্চ টপকে আমাদের তৃতীয় লঞ্চে পৌঁছতে হবে। জলে ভাসমান অবস্থায় একটা লঞ্চ টপকে পরের লঞ্চে পা রাখা যে কী জিনিস, যে না করেছে, সে বুঝবে না। আমার কথা আলাদা, আমি তো অ্যাকে স্মার্ট গাই, তায় সাঁতার জানা লোক, জলে ভয়টয় নেই। কিন্তু সঙ্গে গিন্নি-কন্যের তো বিলক্ষণ ভয় আছে। সে যাই হোক, কোনওরকমে হাঁচোড়পাঁচোড় করে তাদের পাঠানো হল, তারপরে আমি গেলাম তাদের পিছুপিছু। এজেন্ট আমাদের হাতে একটা সবজেটে টিকিট ধরিয়ে দিয়ে হাওয়া হয়ে গেল। ওদিকে একটা বদখত টাইপের দেখতে লোক এসে প্রথমেই হাঁকড়ে বলল, কৌন কৌন দর্শন ট্র্যাভেলস কে হ্যায়, মেরি জিম্মেদারি সির্ফ উন লোগোঁকে লিয়ে হ্যায়, বাকি লোগোঁকে লিয়ে দিখানে কা, খানে কা, কোই ভি কাম কা জিম্মেদারি হাম নেহি লেগা।

    লে হালুয়া। দর্শন ট্র্যাভেলস্‌টা আবার কী জিনিস? সব্বাইকার টিকিট দেখাতে বলল, বলল, যাদের যাদের নীল টিকিট, তারা দর্শনের নয়। গোলাপি নীল সব রকমের টিকিটই বেরলো সবার পকেট থেকে, আমাদেরটা আবার সবজেটে নীল (না না, আপনেরা আমাকে একেবরে রংকানা বলবেন না। আমি রং খুব ভালো চিনি, ওটা সবুজ আর নীলের মাঝে একটা রং ছিল, ঠিক নীল টিকিটের মত নয়)। বদখত লোকটা সেই টিকিট দেখে বলল, ইয়ে তো গ্রিন টিকিট হ্যায়, ঠিক হ্যায়, বাকি জো লোগোঁ কে পাস বুলু টিকিট হ্যায়, ও লঞ্চ সে উতার জাইয়ে, উনকে লিয়ে দুসরা লঞ্চ হ্যায়।

    এইবারে বেশ একটা খলবলে সিচুয়েশন তৈরি হল, যারা অলরেডি দুটো লঞ্চ টপকে নীল টিকিট নিয়ে এসে বসেছিল, তারা আর লঞ্চ টপকাতে রাজি নয়, সঙ্গে বাচ্চা আছে, ব্যাগপত্র আছে, বারবার টপকানো কি মুখের কথা? শেষমেশ বদখত লোকটা হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, ঠিক হ্যায়, জানা হ্যায় তো জাইয়ে, লেকিন, খানা আপলোগোঁকো নেহি মিলেগা। আপলোগোঁ কা লঞ্চ ইসকে পিছে পিছে আ রহা হ্যায়, রস মে উতারকে চেঞ্জ কর লেনা। উধার হি খানা মিলেগা।

    লঞ্চ ছাড়ল, দেখলাম, জেটি থেকে দূরে যে আইল্যান্ডটা দেখা যাচ্ছিল, সেটাই রস আইল্যান্ড। খুব তাড়াতাড়ি এসে পৌঁছে গেলাম। অপূর্ব সুন্দর ছোট্ট দ্বীপ, পুরো পাড়টা বাঁধানো, লাল পাথর দিয়ে, দ্বীপের সমস্ত স্ট্রাকচারই লাল রঙে রাঙানো। আর সবুজ নারকোলগাছের সারি। সামনে সমুদ্রের নীলচে জল, ক্ষণে ক্ষণে সেই নীলের শেড পাল্টে যাচ্ছে।

    ব্রিটিশদের প্রথম উপনিবেশ স্থাপনের সময়ে এই রস আইল্যান্ড ছিল ব্রিটিশদের হেডকোয়ার্টার্স। অনেক পরে, ১৯৪১-এ এক ভূমিকম্পে যখন রস আইল্যান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন ব্রিটিশরা পোর্ট ব্লেয়ারকে তাদের কাজের জায়গা বানায়। তবে শুরু সেই ১৮৫৭ সালে। যখন ব্রিটিশরা হার্ডকোর রাজদ্রোহীদের দ্বীপান্তরে পাঠাচ্ছে, সেই সমস্ত শিকলবাঁধা কয়েদীদের দিয়ে এই ছোট্ট দ্বীপের বনজঙ্গল সাফ করিয়ে বানাচ্ছে নিজেদের জন্য কলোনি। লাইব্রেরি, বেকারি, পাওয়ার হাউস, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, চার্চ, কোয়ার্টার, স্কুল, সুইমিং পুল, কমিশনার্স রেসিডেন্স। অমানুষিক অত্যাচার, অমানুষিক খাটুনি। রাতের অন্ধকারে কত কয়েদি চেন পায়ে নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছে সমুদ্রে, ব্রিটিশ দেখতে পেলে গুলি করে মেরেছে, কেউ সাঁতার জানত না -- জলে ডুবে মরেছে, কেউ অন্য পাড়ের কোনও দ্বীপে উঠে গিয়ে জারোয়াদের হাতে মরেছে। কেউ খবর রাখে নি তাদের।

    ১৯৪২-এ আন্দামান যখন জাপানিদের হাতে চলে আসে, তখন জাপানিরা এই দ্বীপকে তাদের স্ট্র্যাটেজিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। জেটির মুখেই জাপানিদের বাঙ্কার এখনও রয়েছে। নেতাজি, তখন আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক, দুদিনের জন্য আন্দামান সফরে এসেছিলেন, রস আইল্যান্ডে এসে তিনি ছিলেন।

    আজ সমস্ত ইতিহাস। ব্রিটিশদের চাবুকের নাচনে বানানো প্রায় প্রতিটা বিল্ডিংকে আজ আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে বটের ঝুড়ি আর শিকড়। নারকোলগাছের বন তাদের চারদিক থেকে ঢেকে রেখেছে। রস আইল্যান্ডে কোনও জনবসতি নেই। এটা এখন ইন্ডিয়ান নেভির একটা বেস স্টেশন। দিনের বেলায় ট্যুরিস্টরা আসে, আমরা যেমন এসেছিলাম। ইতিহাসকে যারা ভালোবাসে, তারা সবাইকে লুকিয়ে দু ফোঁটা চোখের জল ফেলে। বটগাছের চাপে ধুলিসাৎ একের পর এক বিল্ডিং দেখতে দেখতে, গিন্নির মুখ থেকে আপনা-আপনিই বেরিয়ে এল একটা অমোঘ উক্তি।

    Absolute power corrupts absolutely

    ব্রিটিশ শিশুদের জন্য স্কুল তৈরি হয়েছিল। তাদের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরি হয়েছিল পার্ক, নিয়ে এসে এখানে ছেড়ে রাখা হয়েছিল কিছু হরিণ। সেই সব হরিণের বংশধরেরা আজও আছে। মানুষ দেখে তারা ভয় পায় না, দিব্যি কাছে এসে আদর খেয়ে যায়, পাতা, ডাবের খোলা দিয়ে চেটে খেয়ে নেয়।

    ফোটোগ্রাফি যাদের প্যাশন, তাদের ছবি তোলার জন্য সুন্দর জায়গা এই রস আইল্যান্ড।

    ঘন্টাখানেক বাদে আবার জেটিতে ফেরৎ, আবার লঞ্চ ডিঙিয়ে লঞ্চে চাপা। পরের স্টপেজ নর্থ বে আইল্যান্ড।
  • Samik | 121.242.177.19 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১৭:০৪458986
  • নর্থ বে যেতে খানিক সময় লাগবে, তাই লঞ্চে তখনই লাঞ্চ প্যকেট দিয়ে দিল। সকাল সাড়ে এগারোটায়। এত তাড়াতাড়ি কে খাবে? এদিকে আমি ততক্ষণে প্যাকেট খুলে ফেলেছি, হরিবোল, ভেজ বিরিয়ানি!

    ধুর, খিদে পেয়েছে, খানিক খেয়ে নিই। অর্ধেক প্যাকেট খালি করে ফেললাম। বাকিটা পরে। লঞ্চে তখন শোরগোল চলছে, সবাই প্যাকেট ফেরত দিচ্ছে, এত তাড়াতাড়ি লাঞ্চ খাওয়া হয় নাকি? পরে দেবে না-হয়;

    বদখত দর্শন ট্র্যাভেল্‌স তেমনি বদখত ভাবে জানালো, খাবার এখন গরম আছে। পরে কিন্তু লঞ্চে গরম করার ব্যবস্থা নেই। ফেরত দিতে পারেন, আমি রেখে দিচ্ছি, কিন্তু পরে ঠান্ডা খাবারই খেতে হবে। নর্থ বে-তে কিছু খাবার পাবেন না।

    তাতেও সবাই প্যাকেট ফেরত দিয়ে দিল। এদিকে আমি অর্ধেক খেয়ে ফেলেছি বলে আমার প্যাকেটটা আর দিলাম না, গিন্নিও নিজের প্যাকেটটা নিজের ব্যাগেই রেখে দিল।

    নর্থ বে ঢুকল প্রায় চল্লিশ মিনিট বাদে, দূর থেকে ঐ নারকোলের বন আর লাইটহাউসের চূড়া, যেটা দেখা যাচ্ছে, এটার একটা বিশেষত্ব আছে। এখানে কেউ বলতে পারবে, এই বিশেষত্বটা কী?

    ... এখানেও স্নরকেলিং হয়। দুশোটা করে টাকা, যারা যারা স্নরকেলিং করবে, তাদের কাছ থেকে আগেই নিয়ে নেওয়া হল। গিন্নি কন্যে জলে নামবে না, তাদের জামাকাপড় শুকোয় নি, আমি নেমে পড়লাম কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত হয়ে। যারা নামবে না, তাদের জন্য ঐ গ্লাস বটম বোট। আমাদেরও নিয়ে যাওয়া হবে, বাকিরা বোট থেকে কঁচের ভেতর দিয়ে কোরাল দেখবে, আমরা দেখব জলে মুখ ডুবিয়ে। নর্থ বে বিচে একটা দোকানে ব্যাগপত্র জমা রেখে আমরা বোটে চেপে বসলাম। বোট জলে ভাসামত্র ঝেঁপে বৃষ্টি শুরু হল। কন্যে এদিকে এতক্ষন রেনকোট পরে পরে ছবি তুলে খুব বিরক্ত হয়ে রেনকোট ছেড়ে রেখে এসেছে বিচে। ছাতা একটিই।

    অগত্যা আমাকেই ত্যাগস্বীকার করতে হল। এমনিতেই টপলেস হয়ে বসে আছি, খানিক বাদেই জলে নামব, এখন আর বৃষ্টির জল থেকে বেঁচে কী লাভ? গিন্নি-কন্যে দুজনে একটি ছাতায় দুটি মাথা কোনওরকমে বাঁচাতে লাগল, আমি ভিজতে লাগলাম অঝোরধারে।

    নৌকো পৌঁছলো গভীর সমুদ্রে। এদিকে কাঁচের ভেতর দিয়ে কিছুই দেখা যায় না, কিছু মেটে মেটে কোরাল দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তেমন রং টং নেই। আমি নামলাম। এখানে আবার এদের পয়সা রোজগারের এত লোভ, একেকবারে দুটো টিউব ভাসিয়ে দুটো লোককে স্নরকেলিং করাচ্ছে। এক দড়ির টানে চারশো টাকা রোজগার আর কি! আমার কপাল এবার বেশ মন্দ। একে তো সঙ্গে যে মালটা স্নরকেলিং করছিল, সে ভীমের ছোটো সংস্করণ, আর টিউবের ওপরে ভেসে থেকেও, বারবার মানা করা সত্‌ত্বেও সে হাত পা ছুঁড়ে সাঁতার কাটার চেষ্টা করে যাচ্ছে, ফলে জল ঘুলিয়ে যাচ্ছে, আমার গায়ে তার গোদা পায়ের লাথি পড়ছে, সে এক পুঁদিচ্চেরি কেস। নিচে মুখ ডুবিয়ে দেখি, কোথায় কালকের সেই কালারফুল রেড স্কিনের বিচ? এ তো পুউরো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট! যেদিকেই চোখ যায়, খালি গ্রে কালারের কোরাল। কিছু গ্রে কালারের বা কালারলেস মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর বেশি কিছু দেখাও গেল না ঐ ভীমের বাচ্চা এত পা ছুঁড়ছে।

    বেজায় হতাশ হয়ে বোটে উঠতে গিয়ে দু জায়গায় পা কেটে গেল। রক্ত বেরোচ্ছে, তাতে নুন-জলের ঝাপটা। ওপর থেকে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। সমুদ্রে ঢেউয়ের সাইজও আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে, নৌকো দুলছে ভালোই, ওদিকে দুই মাঝি তথা গাইডের পাত্তা নেই, তারা দড়ি ধরে চারশো টাকার খেপ খাটছে, নৌকো ভর্তি একগাদা লোক, তাদের বেশির ভাগই সাঁতার জানে না।

    জলকেলি শেষ হল দুপুর দুটোয়। উঠে জামা পরারও সময় দিতে রাজি নয় বদখত দর্শন ট্র্যাভেলস। আভি লঞ্চ ছুটেগা, জলদি জলদি আ জাও।

    সবাইকে তুলে লঞ্চ ছাড়ল আড়াইটেয়। এইবার সবাই তাদের আমানত লাঞ্চ প্যাকেট ফেরৎ চাইল। প্যাকেট খুলে সবার মাথায় হাত, ঠান্ডা বিরিয়ানি খেতে শুরু করে দিয়েছে পিঁপড়ের দল। মাঝসমুদ্রে পিঁপড়ে কোথা থেকে এল কে জানে! নিশ্চয়ই লঞ্চেই ছিল। এইবার লোকে খেপচুরিয়াস হয়ে গালিগালাজ শুরু করল, তখন আবিষ্কার করলাম ঐ বদখত দর্শন ট্র্যাভেল্‌স আসলে বাংলাভাষী। আপৎকালে সবার মুখেই মাতৃভাষা আসে কিনা!

    আমরা তো খবার ফেরৎ দিই নি, ভাগ্যিস, তাই আমাদের খাবার ঠান্ডা, কিন্তু তাতে পিঁপড়ে নেই। এদিকে বৃষ্টিতে ভিজে, স্নরকেলিং করে সকলের বিস্তর খিদে পেয়েছে, কিন্তু ঐ দের প্যাকেট বিরিয়ানিতে আড়াইজনের কী হবে! দেখতে দেখতে উড়ে গেল।

    আরেক সারেং ছিল, সে বোধ হয় দক্ষিণ ভারতীয়। সে টুটাফুটা হিন্দিতে সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। অফার দিল, সবার খাবার ফেরৎ নিয়ে ও ওপর থেকে পিঁপড়ে বেছে দেবে। অনেকে খাবার ফেরৎঅও দিল। এই ফাঁকে আমিও চিল্লামিল্লি শুরু করে দিলাম, এখন তো আর ট্রেস নেই, কে খাবার পেয়েছে, কে পায় নি। দক্ষিণ ভারতীয় এসে আমাকে খুব দূ:খ দূ:খ মুখ করে সান্ত্বনা দিতে লাগল। আপ গুস্‌সা হোগে তো আপকো ভি আচ্ছা নেহি লাগেগা, হামকো ভি আচ্ছা নেহি লাগেগা, আপনে খানা লিয়া নেহি?

    আমি বললাম, আমি খাবার আগেই খেয়ে নিয়েছি, লোকটা বিলকুল ন্যাড়া হয়ে গিয়ে বলল, নেহি নেহি আপ তো গুস্‌সা কর রহে হ্যায়, আপকো খানা ম্যায় দেতা হুঁ, উসমে চিটি নেহি হোগা। তখন হল মজা, আমি যত বলি যে আমি খেয়ে নিয়েছি, আমাদের সবার খাওয়া শেষ, ও তত বলে আমি রাগ করে খাচ্ছি না, ও আমাকে খাবার এনে দেবেই দেবে। শেষমেশ বললাম, ঠিক আছে, এনেই দাও। তখন লোকটা আরেকটা খাবারের প্যাকেট আনতে গিয়ে আরেকটা লোকের সাথে নাম অভিমানের পালায় জড়িয়ে পড়ল। আমার কথা ভুলেই গেল। আমার আর এক্সট্রা প্যাকেট পাওয়া হল না।

    পোর্ট ব্লেয়ারের অন্যপ্রান্ত দিয়ে, চ্যাথাম আইল্যান্ডের পাশ দিয়ে লঞ্চ চলল। আমাদের শেষ গন্তব্য, ভাইপার আইল্যান্ড।
  • Shibanshu | 59.93.85.194 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১৭:০৭458987
  • মনের জানালায় ক্যামেরা রেখে বাহিরকে দেখা, ভালো লাগছে।
  • dukhe | 122.160.114.85 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১৭:৩৪458988
  • তাহলে কী দাঁড়াল ? সেটল করব ? কিন্তু খাওয়াদাওয়ার এত কষ্ট । আরেকটু দেখে নিই ।
  • r.h | 203.99.212.54 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১৭:৪১458989
  • কষ্ট তো ট্যুরিষ্টদের।
    সেসব কষ্ট উদ্যম এবং পুরুষকার দিয়ে সহজেই জয় করা যায়।
  • Samik | 121.242.177.19 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১৭:৪৭458990
  • আমি ইতিহাসের ছাত্র নই, তবু ইতিহাস আমাকে খুব টানে। মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হল বলিদান, তার আরেক নীরব সাক্ষী এই ভাইপার আইল্যান্ড।

    দ্বীপান্তরিত কয়েদীদের প্রথম যখন পাঠানো হত, তারা ছিল হাতগুনতি। রস্‌ আইল্যান্ডেই রাখা হত তাদের। কনস্ট্রাকশনের কাজ করানো হত। পরে যখন কয়েদীদের সংখ্যা বাড়ল, নতুন জেল তৈরি করার দরকার পড়ল। কয়েদীদের পাঠানো হল এই ভাইপার আইল্যান্ডে। কবে কোন বিস্মৃত অতীতে এখানে ভাইপার নামে একটি জাহাজ ভেঙে ডুবে গেছিল, সেই থেকে এই দ্বীপের নাম ভাইপার আইল্যান্ড। সেইখানে কয়েদীদের দিয়ে বানানো হল নতুন জেল। পোর্ট ব্লেয়ার, বা সেলুলার জেল তখনও কল্পনাতেও আসে নি।

    সেই একই রকম সৌন্দর্য। নারকোলের সারি দিয়ে ঢেকে রাখা ভয়ংকর অত্যাচারের ইতিহাস। সেই জেল আজ আর নেই, রয়ে গেছে ফাঁসির মঞ্চটুকু। জেটি থেকে এগিয়েই একটা ছোট্ট হিলক্‌, তার মাথায় একটা গম্বুজঘর। একসাথে দু-তিনজনকে পাশাপাশি ফাঁসি দেওয়া হত। দিয়ে, মৃতদেহ সো-জা ছুঁড়ে ফেলা হত নিচের সমুদ্রে।

    সম্ভবত, এত কষ্টকর শেষকৃত্যও ব্রিটিশ শাসকের বাহুল্য মনে হয়েছিল। তাই পরে সেলুলার জেলের ফাঁসিমঞ্চ বানানো হয় এমনভাবে, যাতে দড়ি কেটে নিচে দেহ ফেলে দিলে, পরে জোয়ারের জল এসে নিজেই ভাসিয়ে নিয়ে যেত সেই পবিত্র মৃতদেহ। শাসকদের হাত লাগাতে হত না আর তাতে।

    ফিরে আসি ভাইপারে। হিলকের নিচেই একটা কোর্টঘর, সেটা এই ২০০৪-এর সুনামিতে নষ্ট হয়ে গেছে। এই কোর্টঘরে ফাঁসির আসামীকে তার শেষ মৃত্যুর পরোয়ানা পড়ে শোনানো হত। তারপরে সিঁড়ি বেয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হত ফাঁসিঘরে।

    জেলখানা আর নেই। সেলুলার জেল তৈরি করার সাথে সাথে এই জেলকে ভেঙে ফেলা হয়েছে। কিন্তু ফাঁসির মঞ্চ আজও রয়ে গেছে। সুনামির ঢেউও তাকে নষ্ট করতে পারে নি। সম্ভবত এত সৌন্দর্যের মাঝে একটুখানি মাথা নুইয়ে আমাদের নীরবতা পালনের সুযোগ করে দিতেই।

    অপরিসীম সৌন্দর্য! চারদিকে। জলে স্থলে আকাশে। দেখেছি আর ভেবেছি, এই সৌন্দর্য, ক্যামেরার সাধ্য নেই একে ধরে রাখে, এত বিশাল ল্যান্ডস্কেপ, এত রঙের খেলা, এর মাঝে কয়েক দশক ধরে তারা কী করে পেরেছিল এই রকমের নারকীয় কাজ করে যেতে? প্রকৃতি কি তাদের মনে একটুও রং লাগাতে পারে নি? কী করে মানুষ, মানুষের প্রতি এত নিষ্ঠুর হতে পারে?

    -------

    আন্দামান যদিও চলে ভারতীয় স্ট্যান্ডার্ড টাইম অনুযায়ী, কিন্তু অনেকটা পূর্বদিকে। বিকেল চারটেতেই এখানে আলো কমে আসে, সাড়ে চারটেয় সূর্য ডুবে গেল। আমরা যখন পোর্ট ব্লেয়ার ফিরলাম, তখন ঘন নীল রঙে ঢেকে গেছে চারদিক। আলো জ্বলে উঠছে এখানে ওখানে। সেই নীল রঙের মধ্যে পেছন ফিরে তাকিয়ে রস আইল্যান্ডের একটা ছবি তুললাম, জেটিতে দাঁড়িয়ে। ২৪৯ নং ছবি। এই ছবির রংটা একেবারে ন্যাচারাল রং। এই ছবিতে কোনও কারিকুরি নেই।
  • Nina | 64.56.33.254 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১৭:৫৭458991
  • বাহ! শমীক , অপূর্ব্ব।
    মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু আবার মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হতে পারে---শুনরে মানুষভাই
    সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই!!
  • Samik | 121.242.177.19 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১৭:৫৭458992
  • রাতে খাবার ঝক্কি। এই হ্যাডো এলাকায় চারপাশে কোনও রেস্টুরেন্ট নেই, আমাদের হোটেলটা ছাড়া। যেতে হবে সেই অ্যাবের্ডিন বাজার। কিন্তু আগেরদিন সেখানে গগনে খেয়ে তেমন ভালো লাগে নি। আর কি নন ভেজ জায়গা নেই?

    আজ তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম। সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে খুব শিক্ষে হয়েছে। একটা বাড়তি ছাতা কিনতেই হবে। (কিন্তু কী আশ্চর্য! কী অসাধারণ ওয়েদার, দিনের পর দিন বৃষ্টিতে ভিজে ঘুরেও আমাদের কারুর ঠান্ডা লাগে নি, সর্দি কাশি হাঁচি কিচ্ছু হয় নি)।

    হোটেলের সামনে থেকে একটা অতো ধরে প্রথমেই বললাম, দাদা, নন ভেজ, মাছ-প্রন-ক্র্যাব খাবার জন্য ভালো রেস্টুরেন্ট কী আছে এখানে, নিয়ে চলুন তো! অটোওলা বলল, তা হলে চলুন লাইটহাউস রেস্টুরেন্টে, আর তক্ষুনি আমার মনে পড়ে গেল। রাইট। লাইটহাউস রেস্টুরেন্ট। এর কথাই পড়েছিলাম ট্র্যভেলগে।

    অ্যাবের্ডিন বাজারের মাঝে ঐ ক্লক টাওয়ার, তার একদিকের মোড়ে সেই গগন রেস্টুরেন্ট, যেখানে কাল খেয়েছিলাম, অন্যদিকের রাস্তায় দু-পা এগোলেই দোতলায় লাইটহাউস রেস্টুরেন্ট।

    ঢুকে দেখি, কিছু সাদা চামড়ার ব্যক্তি সেখানে বসে খাচ্ছেন। অজান্তেই হাত চলে গেল পার্সের দিকে। কত খসবে কে জানে!

    বেশ খাতির করে বসালো। খাতির দেখে আমার আরও অস্বস্তি শুরু হল। প্রন ক্র্যাব পাওয়া যাবে? কত দাম? লোকটা আমাদের ডেকে নিয়ে গেল একপাশে। কাঁচের বাক্সে সারি সারি রাখা মাছ-চিংড়ি-লবস্টার-কাঁকড়া। যেটা পছন্দ হাত দিয়ে দেখিয়ে দাও, সেটাই রান্না হবে।

    লবস্টারের চেহারা দেখে ঠিক সাহস হল না। আমরা টাইগার প্রন নিলাম। সাথে নুডলস আর মাছের একটা থাই প্রিপারেশন।

    এর পর পঁয়তাল্লিশ মিনিট নৈ:শব্দ্য। শুধু খাবার আওয়াজ। একেবারে একঘর উইথ সাউথ ফেসিং ব্যালকনি কেস।

    বেশি না, টিপ্‌স মিলিয়ে আটশো টাকায় আড়াইজনে গলা পর্যন্ত বোঝাই করে আবার অটোয় চেপে হোটেলে ফিরলাম।

    তৃতীয় দিন শেষ।
  • Manish | 59.90.135.107 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১৭:৫৮458993
  • ছবি ন: ১০৬

    খুব ভালো
  • Blank | 170.153.65.102 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১৮:০২458994
  • ১৯৫ আর ২৫০ টা ভালো লাগছে বেশী। কোনো একটা ছবির কালার টেম্পারেচার খুব বেশী লাগলো। হোয়াইট ব্যালেন্স সেট হয় নি ঠিক মতন।
    আর আকাশ যখন ফ্যাটফ্যাটে সাদা থাকবে তখন ওটা কাটিয়ে ছবি তুলবে। অন্য ভাবে ফ্রেম টা ভেবে নেবে। সাদা আকাশ বড় বাজে লাগে
  • Blank | 170.153.65.102 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১৮:০৪458995
  • ১০৬ টা কি সিপিয়া টোনে তোলা নাকি পরে সিপিয়া করা হয়েছে?
  • Manish | 59.90.135.107 | ২১ অক্টোবর ২০১০ ১৮:১৬458997
  • ছবি ন: ২৪৮
    কীভাবে সম্ভব ?

    ছবি ন: ২৪৯

    ছবিটা অসা।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত