বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2] [3] [4] [5] [6] [7] [8] [9] [10] [11] [12] [13]     এই পাতায় আছে271--300


           বিষয় : ১৯৭১ :: মুক্তিযুদ্ধের কথা
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :বিপ্লব রহমান
          IP Address : 212.164.212.14 (*)          Date:09 Dec 2012 -- 07:16 PM




Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 03:34 PM

উচ্চ আদালতে বাংলায় রায়
রেজাউল করিম

দেশের আইন-আদালত আজও চলছে ঔপনিবেশিক আমলের ধারায়। বিচারকাজ ও আইন প্রণয়ন হচ্ছে ইংরেজিতে। আদালতে মামলার রায়ও লেখা হতো ইংরেজিতে। আর বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষ সেই রায় বুঝতে না পেরে দ্বারস্থ হতো আইনজীবীর। টাকার বিনিময়ে আইনজীবী তা বাংলায় তরজমা করে সংশ্লিষ্ট বিচারপ্রার্থীকে বুঝিয়ে দিতেন। উচ্চ আদালতে ইংরেজিতে রায় লেখার প্রথা সর্বপ্রথম ভাঙেন বিচারপতি আমীরুল ইসলাম চৌধুরী। এরপর আরো দুজন বিচারপতি দু-চারটি রায় দিয়েছেন বাংলা ভাষায়। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক আগের বিচারপতিদের প্রয়াসকে পূর্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল, স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীনতাযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ, স্থানীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের ব্যানারে অংশ নেওয়া এবং প্রতি বছরের ডিসেম্বর মাসে নিম্ন আদালতে অবকাশকালীন প্রতি আদালতে একজন করে বিচারকের বিচার কাজ পরিচালনা সংক্রান্ত রায়সহ প্রায় ২০০টি রায় বাংলায় দেন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। গত সোমবার কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলন নিয়ে নানা কথা বলেন এই আইন বিশেষজ্ঞ। এখন তিনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান।

বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে সর্বপ্রথম মরহুম বিচারপতি আমীরুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ভাষায় রায় লেখা শুরু করেন। ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় রায় প্রদান করে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময় বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, বিচারপতি হামিদুল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বাংলা ভাষায় রায় দিয়েছেন।’

খায়রুল হক বলেন, ‘আমি বিচারপতি হওয়ার পর বাংলা ভাষায় রায় দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করি। কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে, আদালতে যে ভাষায় সাধারণত রায় দেওয়া হয়, তা বেশির ভাগ জনগণ বোঝে না। জনগণের স্বার্থে ও প্রয়োজনে এই সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই জনগণের বড় অংশ এই রায় বুঝতে না পারলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। কিন্তু প্রথমদিকে বাংলায় রায় লেখার সাহস পাচ্ছিলাম না। ২০০৭ সালের জানুয়ারির শেষ বা ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে একটি জাতীয় দৈনিকে আদালতে বাংলা ভাষার ওপর মরহুম বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের লেখা তিনটি নিবন্ধ আমি মনোযোগসহ পড়ি। ওই তিনটি নিবন্ধই আমার চিন্তাধারা বাস্তবায়নে সাহস জোগায়। ২০০৭ সাল থেকে আমি প্রধান বিচারপতি হিসেবে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় ২০০টি রায় বাংলায় প্রদান করি।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা ব্যাপকভাবে প্রচলিত না থাকার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, বেঞ্চ কর্মকর্তারা বিচারকদের ডিরেকশন বাংলায় সহজে লিখতে পারেন না; দ্বিতীয়ত, বাংলা ভাষায় আইনের তেমন প্রতিশব্দ সহজলভ্য নয়; তৃতীয়ত, ইংরেজি ভাষায় রায় লেখা দীর্ঘ দিনের প্রচলন এবং চতুর্থত, আইনের সব ভাষ্যই ইংরেজিতে।

আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আজ হোক-কাল হোক সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের সব আদালতের বিচারকরা বাংলা ভাষায় রায় লিখবেন। তবে বাংলায় রায় প্রদান করতে হলে তা প্রকাশের আগে বার বার সংশোধন করা কঠিন ব্যাপার। এ জন্য হাইকোর্টের বেঞ্চ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য লজিস্টিকস সরবরাহ করা দরকার।

প্রসঙ্গত, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন বেশ কিছু রায় বাংলা ভাষায় প্রদান করেছেন। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি একটি রায়ও ইংরেজিতে লেখেননি বলে জানা গেছে।

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/12/51322#s
thash.MhItgra5.dpuf





Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 03:36 PM

শুরু হচ্ছে দেশের সব ক্ষুদ্রজাতির ভাষার সমীক্ষা
বিপ্লব রহমান

দেশের সব ক্ষুদ্রজাতির ভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশে প্রথমবারের মতো সমীক্ষা করতে যাচ্ছে সরকার। এ জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এরই মধ্যে গ্রহণ করেছে বছরব্যাপী এক কর্মসূচি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল ভাষা ও নৃবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ এবং চৌকস একটি কর্মীবাহিনী আগামী মার্চ থেকে শুরু করবে মাঠপর্যায়ের সমীক্ষার কাজ। ক্ষুদ্রজাতির প্রতিনিধিরাও যুক্ত থাকছেন এ উদ্যোগে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘বাংলাদেশে নৃভাষার বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’ নামক পরীক্ষামূলক এই কর্মসূচি চলবে ক্ষুদ্রজাতি অধ্যুষিত দেশের ২০টি অঞ্চলে। এরপর চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গা, ম্রো, লুসাই, বম, রাখাইন, গারো, হাজং, সাঁওতাল, ওঁরাও, মুণ্ডা, খাসিয়া, মণিপুরিসহ প্রায় ৭০টি ক্ষুদ্রজাতির প্রায় ২৫ লাখ মানুষের নিজস্ব ভাষা, উচ্চারণ, বর্ণমালা, ভাষার বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে চলবে গবেষণা। পরে মাঠ পর্যায়ের সব তথ্য ও শ্রুতি সংরক্ষণ করা হবে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের নিজস্ব তথ্য ব্যাংকে। ভাষাগত সংখ্যালঘুর এসব তথ্য-উপাত্ত নিয়ে বাংলা ও ইংরেজিতে প্রকাশ করা হবে বিশদ গ্রন্থ। এসব গ্রন্থ সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে ওয়েবসাইটেও।

সরকারি অর্থায়নে পুরো সমীক্ষায় ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় চার কোটি টাকা। পরে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে চলবে নিবিড় গবেষণা। বিস্তারিত কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী সময়ে বড় মাপে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ ভাষাভিত্তিক সমীক্ষা হবে।

ভারত উপমহাদেশে ১৯ শতকের শুরুতে প্রথম ভাষাগত সমীক্ষা করেন জর্জ আব্রাহাম গিয়ারসন। এটি একটি ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র হিসেবে বহু গবেষণায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু তথ্য স্বল্পতার কারণে প্রাচীন এই সমীক্ষার রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। এটি যথাযথ মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষাও নয়। বাংলাদেশের ভাষাগত সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর সব ভাষাও এতে স্থান পায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বহু ভাষা ও সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্যপূর্ণ বাংলাদেশে ক্ষুদ্রজাতির সব ভাষা, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, রীতিনীতি, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে এখন নতুন করে নেওয়া ভাষাবিষয়ক সমীক্ষাটি এ ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখবে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. জীনাত ইমতিয়াজ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভাষা কেবল প্রকাশমাধ্যম নয়, তা একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্বরূপের নির্দেশনাও। তাই বৃহত্তর ভাষার প্রভাবে দেশের ভাষাগত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বহু ভাষা আজ বিপন্ন। ক্ষুদ্রজাতির কয়েকটি ভাষা এরই মধ্যে বিলুপ্তপ্রায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘কিন্তু সংখ্যালঘুদের এসব ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আমাদের এক অমূল্য সম্পদ। তাই এসব সংরক্ষণ ও বিকাশে ক্ষুদ্রজাতির ভাষাবিষয়ক সমীক্ষাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া পড়াশোনা, গবেষণা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায় সমীক্ষাটি ব্যবহৃত হবে তথ্যসূত্র হিসেবে।’

‘বাংলাদেশে নৃ-ভাষার বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’ কর্মসূচির পরিচালক ড. অরুণা বিশ্বাস বলেন, ‘দেশের ক্ষুদ্রজাতির ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে একেকটি গ্রন্থে একেক রকম তথ্য দেওয়া আছে। অনেক তথ্য আবার নির্ভরযোগ্যও নয়। এমনই বাস্তবতায় ইনস্টিটিউটের ভাষাবিষয়ক সমীক্ষাটি হবে ভাষা ও নৃবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সংশ্লিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বৈজ্ঞানিক পন্থায়। এর তথ্য-উপাত্ত যেন যথাযথ হয়, সেদিকে দেওয়া হবে বিশেষ গুরুত্ব। এসব কারণে আমরা মনে করছি, সব মহলে এই সমীক্ষা গ্রন্থের বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা থাকবে।’

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/13/51736#s
thash.XvVUQGfq.dpuf



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 03:38 PM

আলো ছড়াচ্ছে ভাষা শিক্ষার নিকেতন
বিপ্লব রহমান

ভাষার ওপর নিবিড় শিক্ষা ও উচ্চতর গবেষণায় জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে ‘আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষানিকেতন বিগত চার দশকে পরিণত হয়েছে বিদেশি ভাষা শিক্ষার বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানে। নিয়মিত গবেষণাপত্র প্রকাশ, আলোচনা সভা ও স্মারক বক্তৃতার আয়োজন, সুবিশাল পাঠাগার, ছাত্রবৃত্তি প্রদানের মতো অর্জনও কম নয় প্রতিষ্ঠানটির।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলা ছাড়াও রয়েছে ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, জাপানি, চীনা, আরবি, কোরিয়ান, ইতালিয়ান, ফারসি, রুশ, স্প্যানিশ ও টার্কিশ ভাষা শিক্ষার বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। এখানে একেকটি কর্মসূচিতে সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার ব্যক্তিরা দূতাবাস, জাতিসংঘ মিশন, বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পেশায় রাখছেন মেধার স্বাক্ষর। তবে ইনস্টিটিউটের বাংলা ভাষা শিক্ষার কর্মসূচিটি কেবলই বিদেশিদের জন্য। অন্যসব কর্মসূচি অবশ্য সবার জন্যই উন্মুক্ত। ইনস্টিটিউটটি পরিচালিত হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। ১৩টি ভাষার যেকোনোটির ওপর প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার্থীদের সেখান থেকে দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ। ভাষার ওপর উচ্চতর গবেষণার (এমফিল, পিএইচডি) সুযোগও রয়েছে এখানে। এ জন্য যে সনদটি দেওয়া হয় সেটিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। বিশ্বমানের এসব সনদ বহু বছর ধরে সমাদৃত হচ্ছে সর্বত্র। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার সনদটি ব্রিটিশ কাউন্সিল সমমানের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে প্রথম খোলা হয়েছিল চীনা ও ফরাসি ভাষা শিক্ষার কর্মসূচি। সেটি ১৯৪৮ সালের কথা। ওই বিভাগে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের বছরেই যুক্ত হয় জার্মান ভাষার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। ১৯৬৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে খোলা হয় বিদেশি ভাষা শিক্ষা বিভাগ। তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এসব কর্মসূচি স্থানান্তরিত হয় নতুন বিভাগটিতে। একে একে সেখানে যোগ হয় রুশ, তুর্কি, জাপানি, স্প্যানিশসহ মোট ছয়টি বিদেশি ভাষা শিক্ষার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠা পায় ‘আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট’। তখন সব ভাষা শিক্ষার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি স্থানান্তর করা হয় সেখানে। পরে শিক্ষার্থীদের আগ্রহে একে একে সেখানে যোগ হয় আরো সাতটি ভাষা শিক্ষার কর্মসূচি। বলা ভালো, একেকটি ভাষা শিক্ষার প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মেয়াদ এক বছর (১২০ ঘণ্টা)। এরপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ইনস্টিটিউটটি প্রতিবছর প্রকাশ করছে একটি উচ্চমানের গবেষণা জার্নাল।

ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সুলতান আহমেদ কালের কণ্ঠকে জানান, আধুনিক ভাষা শিক্ষার ওপর সুযোগ তৈরি ইনস্টিটিউটের প্রধান লক্ষ্য। এর মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ সক্ষম হয়ে উঠতে পারেন বিদেশের কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনে। এ ছাড়া ভাষার ওপর নিবিড় গবেষণা ও উচ্চতর ডিগ্রি দিয়ে বিজ্ঞজন তৈরিও প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি লক্ষ্য। তিনি বলেন, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট এরই মধ্যে পরিচিতি পেয়েছে বিদেশি ভাষা শিক্ষার একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এর নেপথ্যে রয়েছে ছাত্র-শিক্ষকদের চার দশকের নিরলস শ্রম।

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/14/51988#s
thash.zQMFjkIK.dpuf



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 03:40 PM

ক্ষুদ্রজাতির ভাষায় বিশ্বকোষ
বিপ্লব রহমান

বাঙালি ছাড়াও এ দেশে বংশপরম্পরায় বসবাস করছে প্রায় ৭০টি ক্ষুদ্রজাতির প্রায় ২৫ লাখ মানুষ। তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও ঐতিহ্য। নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে তারাও সমান অংশীদার। একুশের গৌরবের পথচলায় বাংলা ভাষা ছাড়াও ক্ষুদ্রজাতির নিজস্ব ভাষাতেই হচ্ছে লেখাপড়া, সাহিত্য নির্মাণ, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা। আর এখন ইন্টারনেটভিত্তিক মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া [wikipedia.org], সংক্ষেপে উইকিতে যোগ হয়েছে ক্ষুদ্রজাতির ভাষা। সমগ্র উইকিপিডিয়ার মোট ২৮৫টি ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষার পাশাপাশি স্থান করে নিয়েছে এ দেশের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, সাঁওতালি ও চাকমা ভাষা। তবে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে সাঁওতালি ও চাকমা ভাষার উইকিপিডিয়া নির্মাণ উদ্যোগ।

নির্মাতাদের সূত্রে জানা গেছে, উইকিপিডিয়া হলো জনমানুষের হাতে তৈরি সাধারণের জন্য লেখা বিশ্বকোষ। বাংলাদেশের ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা ছাড়া কেবল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষায় রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ উইকি। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি উইকি নির্মাণ শুরু হয় ২০০৬ সালে। পরের তিন বছর পর্যন্ত এর অগ্রগতি ছিল অনেকটাই সাবলীল। কাজটি একাই অনেকটা এগিয়ে নেন নিউ ইয়র্কপ্রবাসী উত্তম সিংহ। তবে স্বেচ্ছাশ্রমে সমষ্টিগত অবদানকারীর অভাবে ২০০৯ সাল থেকে ধীর হয়ে পড়ে এর কার্যক্রম।

এরপর সাঁওতালি ও চাকমা ভাষায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় উইকি। ২০০৮ সালে সাঁওতালি উইকি শুরু হলেও একইভাবে উদ্যোগের অভাবে এটি তেমন এগোতে পারছে না। এর নিবন্ধ সংখ্যা মাত্র ১০-১২। অন্যদিকে রাঙামাটির তরুণ কম্পিউটার প্রকৌশলী জ্যোতি চাকমা ও বেসরকারি কর্মকর্তা সুজ মরিজ চাকমা টানা এক বছর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০১২ সালে চাকমা লিপির ইউনিকোড ফন্ট ‘রিবেং ইউনি’ উদ্ভাবন করেন। তাঁদের নির্মিত [uni.hilledu.com] ওয়েবসাইটটি থেকে চাকমা ইউনিকোড ফন্ট ও অভ্র কি-বোর্ড লে-আউট সফটওয়্যার বিনা মূল্যে ডাউনলোড করা যায়। সেখানে দেওয়া আছে ‘রিবেং ইউনি’ ফন্ট ব্যবহারের নির্দেশাবলিও। গত বছরজুড়ে চাকমাভাষী অল্প কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীর উদ্যোগে এগিয়ে চলে চাকমা ভাষায় উইকি নির্মাণকাজ। ১৫-১৬টি নিবন্ধ তৈরির পর এটির কাজও খানিকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। এটিও হাজার হাজার নিবন্ধ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ উইকি হওয়ার অপেক্ষায়।

বাংলা উইকির অন্যতম উদ্যোক্তা ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা অ্যাট বার্মিংহামের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রাগিব হাসান। কালের কণ্ঠকে তিনি জানান, উইকিপিডিয়ায় অনেক ক্ষুদ্র ভাষায় বিশ্বকোষ আছে। এমনকি এমন অনেক ইউরোপীয় ভাষা আছে, যার ভাষাভাষীর সংখ্যা সাঁওতালি বা চাকমা ভাষার চেয়েও অনেক কম। তাই উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন এ রকম ক্ষুদ্রতর ভাষার বিশ্বকোষ বিকাশের ওপর বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে।

উইকিপিডিয়ান রাগিব হাসান বলেন, ‘আমার স্বপ্ন, বাংলাদেশের প্রতিটি ভাষায় তথ্যের ভাণ্ডার গড়ে উঠবে। আর ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের এনে দেবে আরেক সমৃদ্ধ একুশ। সাঁওতালি ও চাকমা ভাষার উইকিপিডিয়ার বাস্তবায়ন হয়ে উঠুক এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ।’
সাঁওতালি ও চাকমা ভাষায় উইকি নির্মাণে পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছেন উইকিমিডিয়ার বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের কোষাধ্যক্ষ ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য আলী হায়দার খান। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ক্ষুদ্রজাতির ভাষাগুলোয় উইকিপিডিয়া তৈরিতে মূল বাধা হলো শিক্ষার ক্ষেত্রে এসব ভাষার চর্চা তেমন হয় না। এসব ভাষায় প্রকাশিত বইপুস্তকও খুব কম। এ ছাড়া ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেটের ব্যবহারও সীমিত। ফলে উইকিপিডিয়ায় অবদান রাখতে পারেন এমন স্বেচ্ছাসেবী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

আলী হায়দার খান আরো বলেন, ‘সারা বিশ্বে ছোট ছোট ভাষা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। বিলুপ্ত হতে যাওয়া এসব ভাষাকে সংরক্ষণের জন্য বর্তমানে উইকিপিডিয়াকে বিবেচনা করা হচ্ছে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে। উইকিপিডিয়ার মাধ্যমে আমরাও বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর চর্চা সচল রাখতে পারি।’

চাকমা ভাষার উইকি নির্মাতা জ্যোতি চাকমা কালের কণ্ঠকে জানান, গত বছর চাকমা উইকিপিডিয়ার কাজ শুরু করেও কর্মশালা করতে না পারায় এ কাজ তেমন এগোতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এ ছাড়া স্বেচ্ছাশ্রমে চাকমা ভাষার উইকি নির্মাণে চাই এক দল নিবেদিতপ্রাণ কর্মী।

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/15/52285#s
thash.Y41pEKfN.dpuf



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 03:42 PM

বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ বাউল গান
আজিজুল পারভেজ

বাংলার বাউল গান এখন বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এ স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেসকো। বিশ্বের ৪৩টি বাক ও বিমূর্ত ঐতিহ্য চিহ্নিত করতে গিয়ে ইউনেসকো বাংলাদেশের বাউল গানকে অসাধারণ সৃষ্টি বলে আখ্যা দিয়ে একে বিশ্ব সভ্যতার সম্পদ বলে ঘোষণা দিয়েছে। বাউল গানকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এর তালিকাভুক্ত করে ইউনেসকো সদর দপ্তর থেকে ২০০৫ সালের ২৭ নভেম্বর এ ঘোষণা দেওয়া হয়। বিশ্ব সংস্থার এই স্বীকৃতির ফলে বাউল গান নিয়ে দেশ-বিদেশে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।
বাউল গান বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকায়ত সংগীতের একটি অনন্য ধারা। এটি বাউল সম্প্রদায়ের নিজস্ব সাধনগীত। আবহমান বাংলার প্রকৃতি, মাটি আর মানুষের জীবন জিজ্ঞাসা একাত্ম হয়ে ফুটে ওঠে বাউল গানে। আরো ফুটে ওঠে সাম্য ও মানবতার বাণী। এ ধারাটি পুষ্ট হয়েছে পঞ্চদশ শতাব্দীর তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের ভাব, রাধাকৃষ্ণবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্ব ও সুফি দর্শনের প্রভাবে। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, বাংলাদেশে বাউল মতের উদ্ভব সতের শতকে। এ মতের প্রবর্তক হলেন আউল চাঁদ ও মাধব বিবি।

গবেষকদের মতে, নিজ দেহের মধ্যে ঈশ্বরকে পাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা থেকে বাউল ধারার সৃষ্টি। বাউল সাধকদের সাধনার মাধ্যম হচ্ছে গান। সাধকের কাছে সাধন-ভজনের গূঢ়তত্ত্ব প্রকাশ পায় গানের মাধ্যমেই। প্রত্যেক মানুষের অন্তরে যে পরম সুন্দর ঈশ্বরের উপস্থিতি, সেই অদেখাকে দেখা আর অধরাকে ধরাই বাউল সাধন-ভজনের উদ্দেশ্য। বাউলের ভূখণ্ড তাঁর দেহ, পথপ্রদর্শক তাঁর গুরু, জীবনসঙ্গী নারী, সাধনপথ বলতে সুর, আর মন্ত্র বলতে একতারা। ভিক্ষা করেই তাঁর জীবনযাপন। ভিক্ষা না পেলেও তাঁর দুঃখ নেই। তাঁর যত দুঃখ মনের মানুষকে না পাওয়ার। বাউলের সাধনপথ যত দীর্ঘায়িত হয়, ব্যাকুলতা তত বাড়ে; দুঃখ যত গভীর হয়, গান হয় তত মানবিক।

মানবকল্যাণ কামনায় সবচেয়ে বেশি সুর ধ্বনিত হয়েছে মরমি সাধক লালনের গানে। লালনের সাম্যবাদী চিন্তাই আজকের উদার মানবতাবাদ। লালন বলেন, ‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে/যেদিন হিন্দু মুসলমান/বৌদ্ধ খ্রিস্টান/জাতি গোত্র নাহি রবে।’ বস্তুত উনিশ শতকে লালনের গান তাঁর সর্বজনীন আবেদনের কারণে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। লালনের কারণেই হিন্দু, মুসলমান সম্প্রদায়ের দেহতত্ত্ববাদীরা সব বিভেদ ভুলে যুত সাধনায় মিলিত হন। শিষ্য-ভক্তদের মাধ্যমে লালনের গান প্রচার ও প্রসার লাভ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লালনের কথা প্রচার করেন বহির্বিশ্বে।
লালনের পর পাণ্ডু শাহ, দুদ্ধ শাহ, ভোলা শাহ, পাগলা কানাই, রাধারমণ, কাঙাল হরিনাথ, হাছন রাজা, অতুল প্রসাদ, বিজয় সরকার, দ্বিজদাস, জালাল খাঁ, উকিল মুন্সী, রশিদ উদ্দিন, শাহ আব্দুল করিম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ কবি ও বাউলের মাধ্যমে এ দেশের ঐতিহ্যবাহী লোকায়ত সংগীতের ধারাটি আরো পুষ্ট হয়।

শহরে, গ্রামে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে বাউলসংগীত। সব ধরনের শ্রোতাই মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করে বাউল গান। এ গানের অসম্ভব জনপ্রিয়তার পেছনে আছে এর সর্বজনীনতা, গভীর মানবিকতা বোধ। ইউনেসকো যে স্বীকৃতি বাউল গানকে দিয়েছে, তার অধিকাংশ কৃতিত্বই লালন সাঁইয়ের। মানুষ লালনের গান শুনেই বাউল গান নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে বেশি।

ইউনেসকোর স্বীকৃতির সুফল কী জানতে চাইলে তরুণ গবেষক সাইমন জাকারিয়া জানান, এই স্বীকৃতির ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলার বাউল গানের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। এর ফলে বাউল গানের সংরক্ষণ ও প্রসারেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা নিয়ে এ ব্যাপারে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তিনি আরো জানান, ওই ঘোষণার পর ইউনেসকো বাউল গানের বাণী ও সুর সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের জন্য আর্থিক অনুদান প্রদান করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিল্পকলা একাডেমি একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। ২০০৮ সালের দিকে ওই প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়া অঞ্চলে ফিল্ড ওয়ার্কের মাধ্যমে বাউল গানের বাণী ও সুর সংগ্রহের কাজ চলে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৫০০ বাউল গান নিয়ে ‘বাউলসংগীত’ নামে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়, যার মধ্যে ১০০টি গানের ইংরেজি অনুবাদ এবং দেড় শ গানের স্বরলিপি যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাউলদের কণ্ঠে অবিকৃত সুরে গাওয়া পঞ্চাশটি বউল গান সিডিতে ধারণ করে ওই গ্রন্থের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

সাইমন জাকারিয়ার মতে, বাংলার অমূল্য সম্পদ বাউল গান সংরক্ষণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বাউলশিল্পী অধ্যুষিত অঞ্চল সিলেট, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, নাটোর প্রভৃতি অঞ্চলে ফিল্ড ওয়ার্ক শুরু করা উচিত। না হলে কালের গর্ভে অনেক গান এবং গানের সুর হারিয়ে যাবে।
বাউল গানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ইউনেসকোর সনদপত্রটি সংরক্ষিত হচ্ছে বাংলা একাডেমি জাতীয় লেখক ও সাহিত্য জাদুঘরে।

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/16/52681#s
thash.SY0xvyoz.dpuf



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 03:44 PM

মুনীর অপটিমা থেকে অভ্র
বিপ্লব রহমান

শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ১৯৬৫ সালে উদ্ভাবন করেন ‘মুনীর অপটিমা’ টাইপরাইটার। ছাপাখানার বাইরে সেই প্রথম প্রযুক্তির সূত্রে বাংলা পেল নতুন গতি। স্বাধীনতার পর ইলেকট্রনিক টাইপরাইটারেও যুক্ত হয় বাংলা। পরে আটের দশকে ‘বিজয়’ সফটওয়্যার ব্যবহার করে সম্ভব হয় কম্পিউটারেই বাংলা লেখা। আর ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ মুক্ত সফটওয়্যার ‘অভ্র’ উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক নবযাত্রা।
আন্তর্জাতিক বর্ণ সংকেতায়ন বা ইউনিকোডে বাংলা বর্ণলিপি যুক্ত হওয়ায় ‘অভ্র’ ফন্টে সম্ভব হয় ইন্টারনেটে বাংলায় লেখালেখিসহ বাংলায় ওয়েবসাইট নির্মাণ। একই সঙ্গে অফলাইনে বাংলার প্রসার বাড়ে এই সফটওয়্যারে। কম্পিউটারে বাংলা লেখার সুযোগ সৃষ্টি মুদ্রনশিল্পেও এনেছে অভাবনীয় পরিবর্তন।

‘অভ্র’ উদ্ভাবন করেন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান খান। মেহেদী, রিফাতুন্নবি, তানভিন ইসলাম সিয়াম, রাইয়ান কামাল, শাবাব মুস্তফা, নিপুণ হক- এই কয়েক বন্ধু সেই থেকে ‘অভ্র’র উৎকর্ষ বৃদ্ধিতে কাজ করছেন। ‘ভাষা হোক উন্মুক্ত’- এই স্লোগানে ‘অভ্র’র সম্মুখযাত্রা শুরু। এর সমস্ত সংস্করণ ওয়েবসাইট [omicronlab.com] থেকে বিনা মূল্যে ডাউনলোড করে ব্যবহার করা যায়। ব্যবহারকারীর সুযোগ রয়েছে অভ্র, প্রভাত বা ফনেটিক কি-বোর্ড বাছাই করার। এমনকি যিনি কম্পিউটারে বাংলা লিখতে অভ্যস্ত নন, তিনিও অন্তত কিছু বাক্য ‘অভ্র’তে লিখতে পারবেন ডিজিটাল কি-বোর্ড থেকে মাউস দিয়ে। কয়েক বছর আগে ‘অভ্র’তে ফনেটিক ভার্সন যুক্ত হওয়ায় বাংলা টাইপিং হয়েছে আরো সহজ। রোমান হরফে বাংলা কথাটি টাইপ করলে ফনেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটি পরিণত হবে বাংলায়। ‘অভ্র’ ফনেটিক অনলাইন ও অফলাইনে সমান সক্রিয়। এ ছাড়া ‘অভ্র’র কোডাররা উদ্ভাবন করেছেন বহনযোগ্য সফটওয়্যার ভার্সন। মুক্ত জ্ঞানকোষ বাংলা উইকিপিডিয়া, সংবাদপত্র, নিউজ পোর্টালসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটের সার্চ ইঞ্জিনে এরই মধ্যে যুক্ত হয়েছে এই ফনেটিক অপশন।

ইউনিকোডে বাংলা যুক্ত হওয়ায় ইন্টারনেটে দ্রুত প্রসার হচ্ছে বাংলার। ‘অভ্র’ ও উইন্ডোজ সেভেন এই কাজকে করেছে আরো সহজ। আর কম্পিউটারের উইন্ডোজ সেভেনে বাংলা দেখার জন্য আলাদাভাবে প্রয়োজন নেই বাংলা কনফিগারেশনের। এ ছাড়া ব্রাউজিং সফটওয়্যার ফায়ারফক্সেও এখন যুক্ত হয়েছে ‘অভ্র’। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিভিন্ন ধরনের কম্পিউটার থেকে তো বটেই, এমনকি মোবাইল ফোনেও সম্ভব হয়েছে বাংলায় লেখাপড়ার কাজ।

অভ্র সফটওয়্যারে ইউনিকোড ব্যবহার করে সহজেই ই-মেইল, ডিজিটাল সংবাদপত্র, নিউজ পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, বাংলা ব্লগসহ সব সাইটেই বাংলায় চলছে লেখাপড়ার কাজ। ওপার বাংলাসহ সারা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে মহান একুশের গৌরবগাথা। এ কারণে ‘অভ্র’কে অনেকেই বলছেন ইন্টারনেটে বাংলা ব্যবহারের মাইলফলক। উবুন্টু লিনাক্স, উইন্ডোজের সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলা ব্যবহারের। বেশ কিছুদিন হলো শুরু হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওয়েবসাইট গুগল ও ফেসবুকের বাংলা সংস্করণ। সার্চ ইঞ্জিনের পাশাপাশি গুগলের সব কটি ওয়েবসাইট পরিষেবায় বিশ্বের ৬৫টি ভাষার মধ্যে স্থান পেয়েছে বাংলা ভাষা। ফনেটিকে গুগলেও এখন বাংলায় লেখা সম্ভব হচ্ছে। গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে করা যাচ্ছে বিদেশি ভাষার বঙ্গানুবাদ। তবে এখনো তা অনেকটাই যান্ত্রিক।

‘অভ্র’র পরে ‘বিজয় বায়ান্ন’, ‘বিজয় একুশে’ এবং ‘বিজয় একাত্তর’ নিয়ে এসেছে বাংলা ইউনিকোড ফন্ট। এসব ফন্টের কি-বোর্ড পুরোপুরি ‘বিজয়’ টাইপিং সফটওয়্যারনির্ভর। ফলে যাঁরা কম্পিউটারে লেখালেখিতে বিজয় কি-বোর্ডে অভ্যস্ত তাঁরা এটি সহজেই ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া ‘আকাশ নর্মাল’, ‘অপর্ণা লোহিত’, ‘বাংলা’ ‘গোধূলি’ ‘মহুয়া’, ‘মুক্তি’, ‘সোলায়মানলিপি’সহ ডজনখানেক ইউনিকোড ফন্ট উদ্ভাবিত হয়েছে বাংলায়।

‘অভ্র’র অন্যতম উদ্ভাবক ডা. মেহেদী হাসান খান কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, তাঁদের কোডাররা ‘অভ্র’র নতুন নতুন ভার্সন নিয়ে কাজ করছেন। তাঁরা চেষ্টা করছেন বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যারে ‘অভ্র’কে আরো বেশি ব্যবহারবান্ধব করে তুলতে।

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/17/53091#s
thash.nYlKXg06.dpuf



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 03:46 PM

আশা জাগানিয়া বিবর্তনমূলক অভিধান
আজিজুল পারভেজ

বাংলা ভাষাচর্চার ইতিহাসে এক অভিনব সংযোজন বিবর্তনমূলক অভিধান। কোন শব্দ বাংলায় প্রথম কবে, কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে, কিভাবে কালক্রমে পাল্টেছে, কোন শব্দের কী মানে- এসবের উত্তর পাওয়া যাবে বাংলা একাডেমির নতুন এই অভিধান থেকে।

গবেষক গোলাম মুরশিদের সম্পাদনায় ১২ জনের একটি দলের প্রায় তিন বছরের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমে প্রকাশিত হয়েছে এই অভিধান। প্রথম বাংলা অভিধান রচনার প্রায় ২০০ বছর পর প্রকাশিত হলো এই বিবর্তনমূলক অভিধান। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় অভিধানও এটি। গত ১ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ‘বাংলা ভাষার বিবর্তনমূলক অভিধান’ তুলে দেওয়ার মাধ্যমে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়। তিন খণ্ডে প্রকাশিত অভিধানের পৃষ্ঠাসংখ্যা তিন হাজারের বেশি।
নতুন এই অভিধান প্রণয়ন প্রসঙ্গে সম্পাদক গোলাম মুরশিদ বলেছেন, ‘জ্ঞানেন্দ্রমোহন ও হরিচরণ যে ভাষার অভিধান রচনা করেছিলেন, সেই ভাষারীতি আর এখনকার বাংলা ঠিক এক নয়। বাংলাদেশেও নয়, পশ্চিমবঙ্গেও নয়। হরিচরণ তাঁর শব্দকোষে সংস্কৃত ভাষার প্রতি যে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, বাংলা ভাষার চর্চায় তার প্রাসঙ্গিকতা এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে দুই বাংলায়। বস্তুত নতুন অভিধান তৈরি করা এ জন্য খুব দরকার হয়ে পড়েছিল। কেবল নতুন নয়, নতুন ধরনের অভিধান রচনারই প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল।’

নতুন শব্দ, বিশেষ করে যৌগিক শব্দকেও এই অভিধান স্বীকৃতি দিয়েছে; তা ব্যাকরণে অশুদ্ধ হলেও। সম্পাদকের ভাষায়, ‘এই অভিধান তৈরি করতে গিয়ে দেখেছি রবীন্দ্রনাথ নতুন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন ২৫ হাজারের বেশি। আরো দুজন কবি নতুন দুটো শব্দভাণ্ডারের দরজা খুলে দিয়েছিলেন, নিজেদের কবিতায় তার ব্যাপক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। কাজী নজরুল ইসলাম আরবি-ফারসির আর জসীমউদ্দীন অযত্নের ধুলোয় চাপা পড়া পল্লীর অন্তহীন উপকরণ তুলে এনেছেন। সেসব শব্দেরও বিবর্তনমূলক অন্তর্ভুক্তি এই অভিধানে রাখা হয়েছে।’

পূর্ব প্রকাশিত অভিধান থেকে ‘কাট অ্যান্ড পেস্ট’ এবং কিছু নতুন সংযোজন নয়, সম্পূর্ণ নতুনভাবেই প্রণীত হয়েছে এই অভিধান। ব্যবহৃত হয়েছে কলকাতার মেয়রস কোর্টের কাগজপত্র, ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির সঙ্গে যুক্ত তাঁতিদের চিঠিপত্রের মতো সম্পূর্ণ নতুন উপাদানও। নতুন করে দেখা হয়েছে কলকাতাকেন্দ্রিক প্রামাণ্য ভাষার ওপরে বাস্তুহারাদের প্রভাবও। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দুই বাংলার ভাষাচর্চায় যে প্রভাব ফেলেছে, তারও একটা ধারণা মিলবে এ অভিধান থেকে। সম্পাদক ভূমিকায় লিখেছেন, ‘বাংলা ভাষায় এখনো যেসব অভিধান সংকলিত হয়েছে, তাদের মধ্যে আমরা সজ্ঞানে সবার আগে আমাদের অভিধানটি যাতে বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ, হিন্দু-মুসলমান সবাই ব্যবহার করতে পারে সেদিকে সংকল্পিত প্রয়াস রেখেছিলাম।’

শব্দের বিবর্তন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় এই অভিধান থেকে। ‘অনুবাদ’ শব্দটির কথাই ধরা যেতে পারে। এই শব্দটি বললে এখন আমরা বুঝি তরজমা। কিন্তু উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত এই অর্থে শব্দটি ব্যবহারই হতো না। তার আগে অনুবাদের অর্থ ছিল বাধা, প্রতিকূলতা। সেই অর্থটা আজও বহন করে ‘বাদানুবাদ’ শব্দটি। কিন্তু ভাষান্তর বা তরজমা অর্থে শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন অক্ষয়কুমার দত্ত, সম্ভবত ১৮৪২ সালে।

বাংলা ভাষার বিবর্তনমূলক অভিধানে ভুক্ত শব্দের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। নিয়মিতভাবে নতুন নতুন শব্দ এই অভিধানে যুক্ত করার তাগিদ দিয়েছেন সম্পাদক। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, একাডেমির নতুন আইনে অভিধানের জন্য আলাদা বিভাগ খোলার সুযোগ রয়েছে। এটা হলে নিয়মিতভাবে অভিধানগুলোতে সংযোজন-বিয়োজনের কাজ চলবে।

বাংলা একাডেমি নানা বিষয়ে এর আগে ২৮টি অভিধান প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে অনেক অভিধান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে বাংলা ভাষার বিবর্তনমূলক অভিধানটি এরই মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। পশ্চিমবঙ্গের পত্রিকায় ভূয়সী প্রশংসা করে একাধিক পর্যালোচনা প্রকাশিত হয়েছে। আনন্দবাজার পত্রিকায় বলা হয়েছে, ‘বাংলা একাডেমির উদ্যোগে যে অভিধানটি প্রকাশিত হতে চলেছে, সেটা রীতিমতো আশা জাগায়।’ বিখ্যাত দেশ ম্যাগাজিনেও এ বিষয়ে আলোচনা এসেছে।

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/18/53427#s
thash.QgKFE1r8.dpuf



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 03:47 PM

অনলাইনে বাংলা ভাষায় আইন
রেজাউল করিম

বাংলা ভাষায় প্রণীত আইনগুলো এখন অনলাইনে। ‘লজ অব বাংলাদেশ’ নামের সাইটে মিলছে আইনগুলো। আর http://bdlaws. minlaw.gov.bd ঠিকানায় ক্লিক করলেই পাওয়া যায় এই সাইট। দেশে প্রচলিত যেকোনো আইন পাওয়া যাবে এখানে।
ওয়েবসাইটটি পরিচালনা করছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও পার্লামেন্ট বিভাগ। এটি প্রতিষ্ঠা করা হয় ২০১০ সালে। শুরুর সময় থেকেই যেকোনো নতুন আইন প্রণয়নের সঙ্গে সঙ্গে তা এই সাইটে যোগ করা হয়। তাৎপর্যের বিষয় হলো, ২০১০ সালের আগে বাংলায় প্রণীত আইনগুলোও রয়েছে এই সাইটে।

বাংলাদেশে বেশির ভাগ আইন ব্রিটিশদের অনুসরণ করে প্রণয়ন হয়েছে ইংরেজিতে। আর ইংরেজি থেকে বাংলা ভাষায় আইন অনুবাদের কাজ শুরু হয় ১৯৮৭ সালে। এ পর্যন্ত শখানেক পুরনো আইন বাংলায় অনুবাদ হয়েছে।

ইতিহাসের প্রথম লিখিত আইন হিসেবে ধরা হয় হাম্বুরাবি কোডকে। আর আমাদের দেশে লিখিত আইন প্রণীত হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের শাসন ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে ১৭৭৩ সালে রেগুলেশন অ্যাক্ট নামে একটি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এই ভূমিতে শুরু করে লিখিত আইন প্রচলনের বিধান। এরপর থেকে দেওয়ানি কার্যবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি ও দণ্ডবিধিসহ প্রায় দেড় শ লিখিত আইন প্রণয়ন হয়। ওই আইনগুলোর বেশির ভাগ আমাদের দেশে বলবৎ রয়েছে। কিছু সংস্কারও হয়েছে। এই আইনগুলো এই সাইটে ক্লিক করলেই ভেসে ওঠে চোখের সামনে।

‘লজ অব বাংলাদেশ’ ওয়েবসাইটে আইনগুলোকে সহজে পাওয়ার জন্য আইন প্রণয়নের বছর, আইনের নাম ও নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে খুঁজে বের করা সহজ। সাইটে প্রবেশ করতে কোনো ফির প্রয়োজন হয় না। কোনো অনলাইন অ্যাকাউন্ট খোলারও দরকার নেই। আইনগুলোকে পিডিএফ ভার্সনে এবং মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে করা হয়েছে। যাতে করে প্রয়োজনের মুহূর্তে যে কেউ সহজে ডাউনলোড বা কপি করতে পারে।
বাংলাদেশ কোডের ৩৮টি ভলিউম রয়েছে এই সাইটে। বাংলাদেশ কোড রেগুলেশন ও পুরোপুরি সংশোধনী আইন ছাড়া এ দেশে বিদ্যমান সব আইন, অধ্যাদেশ এবং রাষ্ট্রপতির আদেশ এই ৩৮টি ভলিউমে প্রকাশ করা হয়েছে। ১৮৩৬ সাল থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত আইনগুলো ১১টি ভলিউমে এবং ১৯৩৯ থেকে এ পর্যন্ত আইনগুলো বাকি ভলিউমগুলোতে প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলায় প্রণীত আইনগুলো ২৭ থেকে ৩৮ ভলিউমে সংযুক্ত করা হয়েছে।

সরকারিভাবে এই উদ্যোগের পাশাপাশি আরো বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট বাংলা আইন প্রচারের জন্য পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো বেশির ভাগই ব্যক্তি-উদ্যোগে করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- অবলম্বন ডটকম, অবসর ডটকম, আইন ও সালিস কেন্দ্র এবং ব্লাস্টের ওয়েবসাইট। আরো কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা বাংলা ভাষায় আইনগুলো অনলাইনে প্রচারে কাজ করে যাচ্ছে।

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/19/53761#s
thash.b6mfmxfu.dpuf



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 03:49 PM

মোবাইল ফোনে মাতৃভাষা
বিপ্লব রহমান

ইন্টারনেট, কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন ক্রমেই আরো সহজলভ্য হচ্ছে। আসছে নতুনত্ব, কমছে দাম, বাড়ছে কর্মপরিধি। দ্রুতই এসব ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। বিশেষত মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে বলা যায় বিপ্লব ঘটে গেছে। আর প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন মোবাইল ফোনেই চলছে রাষ্ট্রভাষা বাংলায় লেখালেখির কাজ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মোবাইল ফোনে বাংলায় খুদে বার্তা বা এসএমএস কার্যক্রমের। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘সাপোর্ট টু ডিজিটাল বাংলাদেশ (এটুআই) প্রোগ্রাম’ গণভবনে আয়োজন করে ওই অনুষ্ঠানের। বাংলায় এসএমএস কার্যক্রম চালুকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের নির্দেশে ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই সব কম্পানির বেসিক মোবাইল ফোনের হ্যান্ডসেটে পূর্ণাঙ্গ বাংলা কি-প্যাড সংযোজন বাধ্যতামূলক করা হয়।

অবশ্য নিজস্ব উদ্যোগে কয়েকটি মোবাইল ফোন কম্পানি বছর তিনেক আগেই সুযোগ সৃষ্টি করেছিল তাদের হ্যান্ডসেটের সব ফিচার বাংলায় করার। সেসব ফোন থেকে এসএমএসের পাশাপাশি ইন্টারনেটেও সম্ভব ছিল বাংলায় লেখা। আর বাধ্যতামূলক করার পর গত দুই বছরে এই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে সব কম্পানির বেসিক মোবাইল ফোনের হ্যান্ডসেটে। কয়েকটি কম্পানি হ্যান্ডসেট কিনলে বাংলায় টাইপ করার জন্য গ্রাহকদের সরবরাহ করছে মুদ্রিত নির্দেশিকা। আবার অনেকে ইংরেজির পাশাপাশি কি-প্যাডে বাংলা বর্ণমালা যুক্ত করায় কাজটি আরো সহজ হয়েছে।

আইওএস, অ্যান্ড্রয়েড ও উইন্ডোজের মতো অপারেটিং সিস্টেমের স্মার্ট ফোনগুলোতে অবশ্য শুরুতে বাংলা ফন্ট থাকে না। সে সমস্যা সমাধানেও এগিয়ে এসেছে কয়েকটি বেসরকারি উদ্যোক্তা। মায়াবিসহ আরো বেশকিছু ফন্ট এখন বিনা মূল্যে ডাউনলোড করা যায় গুগল প্লে স্টোর থেকে। মোবাইল হ্যান্ডসেটে এসব ফন্ট যুক্ত করার পর অনলাইন ও অফলাইনে (যেমন এসএমএস) লেখা সম্ভব বাংলাতেই। ফনেটিক কি-প্যাড যুক্ত হওয়ায় এসব ফন্ট থেকে বাংলা টাইপিং বেশ সহজ। রোমান হরফে কোনো শব্দ বাংলায় লিখলে ফনেটিকে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রূপান্তরিত হয় বাংলায়। তাই যাঁরা মোটেই বাংলা টাইপিং জানেন না, তাঁরাও এই ফন্টটি দিয়ে সহজেই মোবাইলে তো বটেই, এমনকি লেখালেখি করতে পারছেন কম্পিউটার প্যাডেও। মোবাইলে বাংলা লেখালেখি জনপ্রিয় করতে স্বপ্রণোদিত হয়ে বাংলা ভাষাপ্রেমীরা বাংলা ও ইংরেজিতে লিখছেন অসংখ্য ব্লগ পোস্টও। সব মিলিয়ে মোবাইলে বাংলা ফন্ট যুক্ত হওয়ায় আরো সহজ হয়েছে ইন্টারনেটে বাংলায় লেখাপড়া বা এসএমএসে মনের কথা ও তথ্যের আদান-প্রদান। সেই সূত্রে অগ্রযাত্রায় নতুন মাত্রা পেয়েছে বাংলা ভাষা।

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/20/54166#s
thash.u2DSVUKJ.dpuf



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 03:50 PM

আলো ছড়িয়ে চলেছে বাংলা একাডেমি
নিজস্ব প্রতিবেদক

বাঙালি জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক অভিধায় অভিষিক্ত বাংলা একাডেমি। বাংলাদেশের ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির গবেষণায় নিয়োজিত এক অনন্য জাতীয় প্রতিষ্ঠান। ভাষা আন্দোলনের চেতনায় ঋদ্ধ এই প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনে কাজ করে চলেছে নিরন্তরভাবে।

মহান ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফসল বাংলা একাডেমি। বায়ান্নর রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলনের পর পূর্ব পাকিস্তানে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে তা ছিল একুশের প্রতীক হিসেবে একুশ দফা। এই একুশ দফার অন্যতম একটি ছিল বাংলা ভাষা-সাহিত্যের লালন ও বিকাশের জন্য বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার কথা। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হওয়ার পর ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠা পায় বাংলা একাডেমি।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন বর্ধমান হাউসে স্থাপিত হয় বাংলা একাডেমি। বর্ধমান হাউস ও এর প্রাঙ্গণ আজ পরিণত হয়েছে বাঙালির ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির তীর্থকেন্দ্রে। বর্ধমান হাউসে স্থাপিত হয়েছে ‘ভাষা আন্দোলন জাদুঘর’ ও ‘জাতীয় লেখক ও সাহিত্য জাদুঘর’।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলা একাডেমি বিপুলসংখ্যক গবেষণালব্ধ গ্রন্থ ও সংকলন প্রকাশ করে বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের অভিধান প্রকাশের মাধ্যমে বিগত অর্ধশতক ধরে গ্রন্থ প্রকাশনার ভুবনে এটি অনন্য ভূমিকা রেখে আসছে। আর তাতে ঋদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার জ্ঞানের জগৎ। প্রতিষ্ঠানটি গত শতকের পঞ্চাশের দশকে যে কয়েকটি বড় মাপের কাজ হাতে নিয়েছিল তার প্রথমটি ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তানি ভাষার আদর্শ অভিধান’। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সম্পাদনায় ‘আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’ ছিল এর প্রথম অংশ এবং ড. মুহম্মদ এনামুল হকের সম্পাদনায় ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ দ্বিতীয় অংশ। পূর্ব বাংলায় অভিধানচর্চার ধারায় এ দুটি গ্রন্থ আজও মাইলফলক হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে অভিধানগুলোই সবচেয়ে জনপ্রিয়। এর মধ্যে ইংরেজি-বাংলা ও বাংলা-ইংরেজি অভিধান পেয়েছে অসাধারণ জনপ্রিয়তা। কাজী নজরুল ইসলামসহ কীর্তিমান বাঙালি লেখকদের রচনাসমগ্র প্রকাশও একাডেমির আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ।

বাংলা একাডেমির অনন্য কীর্তি হচ্ছে প্রমিত বাংলা বানানরীতি প্রণয়ন। বাংলা বানানের ক্ষেত্রে নৈরাজ্য দূর করতে ১৯৯২ সালে এটি প্রণয়ন করা হয়।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রদানও একটি বড় কাজ। এটি বাংলা ভাষার মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৬০ সাল থেকে এটি প্রদান করা হচ্ছে। রবীন্দ্রচর্চার স্বীকৃতি দিতে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে রবীন্দ্র পুরস্কার। রয়েছে আরো কয়েকটি পুরস্কার। সাহিত্য ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কীর্তিমানদের ফেলোশিপ প্রদান করে সম্মান জানানো হয় এ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে।

বাংলা একাডেমিতে আছে একটি সমৃদ্ধ ও দুর্লভ সংগ্রহশালা। প্রচীন বাংলার অমূল্য পুঁথিসাহিত্য সংরক্ষিত হচ্ছে এখানে। আরো আছে মূল্যবান গ্রন্থ ও সংবাদপত্র। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ জার্নাল ও সাময়িকী- বাংলা একাডেমি পত্রিকা, উত্তরাধিকার, ধানশালিকের দেশ প্রভৃতি।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বাংলা একাডেমি আয়োজন করে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। সময়পরিক্রমায় এটি দেশের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। তা ছাড়া সাহিত্যচর্চার বিকাশে নিয়মিতভাবে সাহিত্য সম্মেলন আয়োজনও প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য একটি উদ্যোগ। এর যাত্রা হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। বাংলা একাডেমি সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি যুগান্তকারী কাজ সম্পাদন করেছে। এগুলো হচ্ছে ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’, ‘বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক অভিধান’, জেলাভিত্তিক ‘বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা’, ‘রবীন্দ্রজীবনী’, ‘বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস’ গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশ।

বাংলা একাডেমি এত দিন পরিচালিত হতো ১৯৭৮ সালের তৎকালীন সামরিক শাসকের জারি করা একটি ইংরেজি অধ্যাদেশের মাধ্যমে। ৩৫ বছর পর গত বছর সরকার বাংলা ভাষায় বাংলা একাডেমি আইন পাস করেছে। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান জানিয়েছেন, নতুন আইন প্রণয়নের ফলে বাংলা একাডেমিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/21/54433#s
thash.DrpUhi6J.dpuf



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 03:52 PM

বাংলার ভাণ্ডারে চার লাখ শব্দরতন!
আজিজুল পারভেজ

বাংলা ভাষার ভাণ্ডারে শব্দসংখ্যা কত! শতবর্ষ আগের অভিধানে যেখানে সোয়া লাখের মতো শব্দ সংকলিত হয়েছিল, সাম্প্রতিককালের অভিধানে এ সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়ায়নি। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলা শব্দের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে যাবে। আবার অনেকে মনে করেন, সংখ্যাটি চার লাখের কম হবে না। তবে বাংলার সব শব্দ সংকলনের ব্যাপকভিত্তিক কোনো উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি।

জাতীয় জ্ঞানকোষ ‘বাংলাপিডিয়া’র প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের মতে, কোনো ভাষার শব্দসংখ্যা কত, কোনো এক মুহূর্তে তা বলা কঠিন। কারণ প্রতিনিয়ত শব্দ মরে যাচ্ছে, আবার নতুন নতুন শব্দও তৈরি হচ্ছে। তবে অভিধানে শব্দ সংকলিত হলে সেই সময়ের সংখ্যা হিসেবে তা উল্লেখ করা যায়।

বাংলা ভাষার শব্দ সংকলন ও অভিধান প্রণয়নের ইতিহাস অনুসন্ধান করে জানা যায়, বাংলা শব্দ সংকলিত করে বাংলায় লেখা প্রথম বাংলা থেকে বাংলা অভিধান প্রণয়ন করেন রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ। সেটি প্রকাশিত হয় প্রায় ২০০ বছর আগে, ১৮১৭ সালে। তার ঠিক ১০০ বছর পর ১৯১৭ সালে প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় অভিধান জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাংলা ভাষার অভিধান’। তাতে প্রায় ৭৫ হাজার বাংলা শব্দ সংকলিত হয়। তারপর ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংস্করণে শব্দসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ ১৫ হাজার। এ বাংলায় বাংলা শব্দ সংকলনের কাজ শুরু হয় পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে। ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠা লাভের পর বাংলা একাডেমি প্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করে, তা ছিল অভিধান প্রণয়ন। উদ্যোগ নেওয়া হয় ব্যবহারিক বাংলা অভিধান প্রণয়নের। কিভাবে এটি প্রণয়ন করা হবে সে ব্যাপারে সুপারিশ ও নীতিমালা তৈরির জন্য তৎকালীন দেশসেরা পণ্ডিতদের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে বাংলা একাডেমি। এ কমিটিতে ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুনীর চৌধুরী, অজিত কুমার গুহ ও আহমদ শরীফের মতো পণ্ডিতরা। সমসাময়িক অন্যান্য বিশেষজ্ঞও নানাভাবে যুক্ত হন এ প্রক্রিয়ায়। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ১৯৭৪ সালে ড. মুহম্মদ এনামুল হকের সম্পাদনায় স্বরবর্ণ অংশ, ১৯৮৪ সালে অধ্যাপক শিবপ্রসন্ন লাহিড়ীর সম্পাদনায় ব্যঞ্জনবর্ণ অংশ এবং ১৯৯২ সালে অখণ্ড পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ নামে প্রকাশিত হয়। ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় পরিমার্জিত সংস্করণ। এতে ভুক্তি ও উপভুক্তি মিলে মোট ৭৩ হাজার ২৭৯টি শব্দের অভিধা পাওয়া যায়। এ অভিধানের আরেকটি সংস্করণ আগামী জুনে প্রকাশিত হওয়ার কথা। এ নতুন সংস্করণে নতুন দুই হাজার শব্দ সংযুক্ত হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ অভিধানের হিসাব মতে বাংলা শব্দের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে সাকল্যে ৭৫ হাজার। তবে সর্বশেষ যে অভিধান প্রকাশিত হয়েছে চলতি ফেব্রুয়ারিতে, এটিই হবে এযাবৎকালের বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় অভিধান। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত এ অভিধান হচ্ছে ‘বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’। বাংলা ভাষায় এর আগে প্রকাশিত বড় অভিধান জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাংলা ভাষার অভিধান’ প্রকাশের প্রায় ১০০ বছর পর প্রকাশিত হলো এ অভিধান। তাতে কত শব্দ স্থান পেয়েছে সে পরিসংখ্যান উল্লেখ নেই। তবে সম্পাদক ড. গোলাম মুরশিদ জানিয়েছেন, এতে প্রায় দেড় লাখ শব্দ যুক্ত হয়েছে। এ হিসাবে গত ১০০ বছরে বাংলার শব্দ সংকলনে যুক্ত হয়েছে ৩৫ হাজার শব্দ।

তবে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বাংলা একাডেমির অভিধানে সংকলিত শব্দসংখ্যা দিয়ে বাংলা শব্দভাণ্ডারের শব্দসংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে না। কারণ বাংলা একাডেমি যে অভিধানগুলো করেছে, তা সাহিত্যভিত্তিক। বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে যুক্ত হয়েছে সেসব শব্দ, যা বাংলা সাহিত্যে ঢুকেছে। এর বাইরে তো অগণিত শব্দ রয়ে গেছে। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের মতে, আমাদের ভূখণ্ডের সব যুগের, সব শ্রেণীর, সব ধর্মের, সব সংস্কৃতির শব্দকে সংকলিত করলে বাংলা শব্দের সংখ্যা দুই লাখের কম হবে না। কিন্তু এ রকম শব্দ সংকলনের কোনো উদ্যোগ এখনো গ্রহণ করা হয়নি। এশিয়াটিক সোসাইটি ২০০৯ সালের দিকে এ রকম একটি উদ্যোগ নিলেও তা নানা কারণে সফল হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৌমিত্র শেখরের মতে, বাংলা শব্দভাণ্ডারে শব্দসংখ্যা চার লাখের কম হবে না। এ ব্যাপারে ব্যাপকভিত্তিক কোনো গবেষণা না হওয়ার কারণে প্রকৃত সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, রাষ্ট্রকে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে।

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/21/54432#s
thash.vHKrcwXZ.dpuf



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 03:56 PM

মুক্তিযুদ্ধ স্মারক
আলফোঁসির একাত্তরের পাসপোর্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক

একাত্তরে যোদ্ধারা গোল আলুর তৈরি সিল দিয়ে বিদেশি সাংবাদিক আলফোঁসিকে যে ভিসা দিয়েছিলেন সেটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দুর্লভ সংগ্রহরাজির অংশ হলো। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি বিশ্ববাসীকে জানাতে যে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক এ দেশে সাংবাদিকতা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ফ্রান্সের ফিলিপ মার্ক এদুয়ার্দ আলফোঁসি। গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে যুদ্ধকালীন পাসপোর্টটি জাদুঘরের সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর হাতে তুলে দেন আলফোঁসি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ফ্রান্স-বাংলাদেশ ইকোনমিক চেম্বারের সভাপতি কাজী এনায়েত উল্লাহ। পাসপোর্টটি বুঝিয়ে দিয়ে আলফোঁসি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ তখনই বুঝতে পেরেছিল, নিজ দেশের সব কাজ নিজ হাতে করার সময় এসেছে। আমাদের পাসপোর্টে এভাবে সিল দেওয়া সেটাই প্রমাণ করে।’

আলফোঁসিকে দেওয়া ঐতিহাসিক এ পাসপোর্টে আছে গোল সিল। এর চারধারে বৃত্তাকারে লেখা ‘দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কমান্ড, চুয়াডাঙ্গা’। মাঝখানে বাংলাদেশের মানচিত্রের জমিনে লেখা ‘বাংলাদেশ’। পাশে আঞ্চলিক কমান্ডার ড. আসহাবুল হকের স্বাক্ষর।

নিচে বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সেসের আরেকটি সিল রয়েছে। ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল এই ‘অন অ্যারাইভাল ভিসা’ ইস্যু করা হয়েছে, যার ১৪ দিন পর শপথ নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার।

বাঙালির স্বাধীনতাযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করতে আসা আলফোঁসির মতে, তাঁর পাসপোর্টে ওই স্বাক্ষরদাতা চুয়াডাঙ্গার গণপ্রজাতন্ত্রী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান প্রশাসক ছিলেন। আলফোঁসি মনে করেন, যুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলাদেশে আলুর তৈরি সিলের প্রথম পাসপোর্ট।

মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পর গত মাসের শেষদিকে বাংলাদেশে আসেন বাংলাদেশের বন্ধু এই বিদেশি সাংবাদিক। পাসপোর্টটি হস্তান্তর করে আলফোঁসি বলেন, ‘পাসপোর্টটা আমি দিতে পেরেছি এ বিষয়টি আমার জন্য বড় আনন্দের ব্যাপার। ৯ মাস যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আর ওই সময়ে এখানে সাংবাদিকতা করেছিলাম- এটাও একই সঙ্গে আনন্দের।’

অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমরা চুয়াডাঙ্গা আসার পরপর একটি গ্রামে পাকিস্তানিরা বোমা হামলা চালায়। তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহে আসা অনেকে কলকাতায় এলেও যুদ্ধের ময়দানে যেতে কেউই সাহসী হচ্ছিলেন না। ওই অবস্থায় আমরা প্রথম বাংলাদেশে ঢুকি। আমাদের পাঠানো সংবাদ প্রতিবেদনগুলো পশ্চিমা জগতে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। মানুষ সত্য জানতে পেরেছিল।’

আলফোঁসি বলেন, ‘স্বাধীনতা ঘোষণার প্রথম দিকেই বাংলাদেশ আমাকে এখানে কাজ করার অনুমতি দিয়েছিল- আমি মনে করি; এটা একটা ঐতিহাসিক দলিল। আর এভাবেই আমার পাসপোর্ট আপনাদের ইতিহাসে সাক্ষী হয়ে থাকবে।’ একাত্তরের অন্য সাংবাদিকদেরও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন আলফোঁসি।

একাত্তরে আলফোঁসির সংগ্রহ করা ভিডিও ফুটেজ ও তাঁর সাক্ষাৎকারসহ একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন তথ্যচিত্র নির্মাতা প্রকাশ রায়। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ফ্রান্স-বাংলাদেশ ইকোনমিক চেম্বারের যৌথ সহযোগিতায় তৈরি করা হয় ‘বাংলাদেশ : একটি পতাকার জন্ম’।

প্রকাশ রায়কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলফোঁসির বন্ধুসুলভ মনোভাব প্রকাশ পায়। তাঁর ভাষায়, ‘পাকিস্তানিদের আকাক্সক্ষা ছিল শক্তি দিয়ে জয়ী হওয়া। ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই যখন পাকিস্তানি কামানের গোলা বাংলাদেশিদের নিষ্পেষিত করছিল, যখন যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশির ভাগ পশ্চিমা দেশ পাকিস্তানকে সমর্থন করছিল; সেই অবস্থায় স্বাধীনতার দাবিতে দৃঢ় এই বাঙালি যোদ্ধারা আমার পাসপোর্টে বাংলাদেশের প্রথম অফিশিয়াল সিল দেয়।’

১৯৭০ সালে ফ্রান্সের একমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল ‘প্রিমিয়েরে ইনফোরম্যাসন’-এ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন আলফোঁসি। পিয়েরে দেসগ্রপস ও পিয়েরে দুমায়েত নামের দুই খ্যাতিমান সাংবাদিক ওই টিভি চ্যানেলটি পরিচালনা করছিলেন তখন। আফগানিস্তান, সেনেগাল, লেবানন ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে আগ্রাসন ও সংকট ছাড়াও ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধও আলফোঁসি প্রত্যক্ষ করেছিলেন; অসামান্য সাহসিকতায় তুলে ধরেছিলেন নির্মমতার ভয়াবহ ইতিহাস। এ ছাড়া সাংবাদিকতার সূত্রে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে।

আলফোঁসি ১৯৬১ সালে ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি সর্বনে বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনে স্নাতক শেষ করেন। পরে তিনি ফরাসি রেডিও আরটিএল-এ সাংবাদিকতা শুরু করেন। শুধু সাংবাদিকতাই নয়, নানা বিষয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ, ম্যাগাজিন প্রকাশ, লেখিলেখি করেছেন তিনি। বিচিত্র অভিজ্ঞতায় বিদগ্ধ আলফোঁসি ২০১৩ সাল থেকে ফ্রান্স ছাড়াও বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন।

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2014/03/02/57600#st
hash.QpXivxzO.dpuf



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 04:19 PM

বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিল
মর্নিং নিউজের নেতৃত্বে উর্দু চাপানোর চেষ্টা
মিজানুর রহমান খান | আপডেট: ০১:৫৭, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ


মার্কিন জাতীয় মহাফেজখানা থেকে প্রথম আলো সংগ্রহ করেছে বায়ান্নর মার্কিন দলিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্ত করা এসব গোপন দলিলের ভিত্তিতে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ একাদশ কিস্তি

একুশে ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণের ঘটনার পর পশ্চিম পাকিস্তানিদের একটি গোষ্ঠী বাঙালির জীবনে উর্দু চাপাতে ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজ-এর ওপর ভর করেছিল। পত্রিকাটি প্রকাশ্যে কেবল উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তৎপরতা বজায় রেখেছিল।

১৯৫২ সালের ২৯ মার্চ ঢাকা থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো বার্তায় মার্কিন কনসাল জন ডব্লিউ বাউলিং ওই তথ্য উল্লেখ করেন। বাউলিং মন্তব্য করেন যে ‘উর্দু বাঙালির স্বতঃপ্রণোদিত দাবি’—এই স্লোগান নিয়ে পত্রিকাটি রীতিমতো উর্দু প্রচলনের পক্ষে নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
মার্কিন কনসাল মর্নিং নিউজ-এর ওই ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যকার একটি হইচইকারী অথচ একটি অকার্যকর গোষ্ঠী মর্নিং নিউজের নেতৃত্বে উর্দু প্রচলনের সপক্ষে “স্বতঃস্ফূর্ত দাবি” তুলতে শুরু করেছে। এদের পেছনে আছে বিভিন্ন ধরনের সন্দেহজনক সংগঠন। স্পষ্টতই তাদের এই আন্দোলন সাধারণ জনগণের মধ্যে কোনো সাড়া সৃষ্টি করেনি। কিংবা প্রাদেশিক সরকারও তাদের সমর্থন দিচ্ছে না। অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকারের কতিপয় কর্মকর্তা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রতীয়মান হয়।’

জন বাউলিং আরও উল্লেখ করেন যে পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার সাবেক সম্পাদক আবদুস সালামকে মর্নিং নিউজ প্ল্যান্টে অগ্নিসংযোগের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। অবজারভার পত্রিকার আরও অনেক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটা বোধগম্য যে এই গ্রেপ্তার এবং অভিযোগ আনা হয়েছে খাজা নুরুদ্দিনের নির্দেশে। তিনি মর্নিং নিউজ পত্রিকার মালিক। কর্মকর্তারা ঘরোয়াভাবে উল্লেখ করেন যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দোষের বিষয়ে সামান্য সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু আদালতে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই।

আমেরিকান কনসাল বাউলিং তাঁর ওই বার্তায় আরও বলেন, প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলিতে বাজেট প্রণয়ন এবং ফেব্রুয়ারির দাঙ্গাকে (ভাষা আন্দোলন) কেন্দ্র করে যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল তা প্রশমিত হয়েছে। মার্চের শেষ সপ্তাহে প্রদেশের পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ২৪ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত কড়া পুলিশি প্রহরায় প্রাদেশিক লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির অধিবেশন বসে। ২৮ মার্চ রাতে অধিবেশনের মুলতবি ঘটে। এ অধিবেশন সফলভাবে পরিচালনা করতে পেরে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর মর্যাদা উল্লেখযোগ্যভাবে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। অ্যাসেম্বলির ফ্লোরে একাধিকবার ফেব্রুয়ারির দাঙ্গার বিষয় ওঠে। মুখ্যমন্ত্রী সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর যথার্থতা প্রমাণ করতে তাঁর আগের ব্যবহূত যুক্তিগুলোই পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি অ্যাসেম্বলির ফ্লোরে কলকাতা থেকে প্রকাশিত কমিউনিস্ট সংবাদপত্রের উদ্ধৃতি দেন এবং বলেন, কমিউনিস্ট পার্টি ভাষা আন্দোলনের সাফল্য তাদেরই বলে দাবি করেছে।

ওই প্রতিবেদনমতে, অ্যাসেম্বলিতে তখন ভিন্নমতাবলম্বী মুসলিম গ্রুপের সদস্যের সংখ্যা ছিল সাকল্যে ১৩। কিন্তু গ্রেপ্তার ও অনুপস্থিতিজনিত কারণে তাঁদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৫-এ। তাঁরা নিজেদের ‘আওয়ামী ব্লক’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। ফেব্রুয়ারির দাঙ্গাকালীন উত্তেজনার মুহূর্তে বেশির ভাগ এমএলএ, যাঁরা মুসলিম লীগ থেকে কিংবা অ্যাসেম্বলি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন, আবার নিজ নিজ জায়গায় ফিরে এসেছেন। স্বাভাবিকভাবে ভোট দিয়েছেন।

একটি ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খাজা নুরুদ্দিন ১৯৪২ সালে ভারতে প্রথম মুসলিম সান্ধ্য ইংরেজি দৈনিক স্টার অব ইন্ডিয়া প্রকাশ করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকায় বের করেন মর্নিং নিউজ। ১৯৫৩ সালে পত্রিকাটি করাচি থেকেও একসঙ্গে বের হয়। ১৯৩৬-১৯৪৫ সালে তিনি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘হিলাল-ই-খিদমত’ খেতাবে ভূষিত করে।

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/144604/%E0%A6%AE%E0%A6%B
0%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%82_%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%89%E0%A
6%9C%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A7%83%E0%A6%A4%E
0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A7%87_%E0%A6%89%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8
1_%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8B%E0%A6%B0_%E0%
A6%9A%E0%A7%87%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BE



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 04:23 PM

বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিল

ব্লাডের বর্ণনায় ১৯৬২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি
মিজানুর রহমান খান | আপডেট: ০২:২৭, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ


মার্কিন জাতীয় মহাফেজখানা থেকে প্রথম আলো সংগ্রহ করেছে বায়ান্নর মার্কিন দলিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্ত করা এসব গোপন দলিলের ভিত্তিতে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ দ্বাদশ কিস্তি

একাত্তরের গণহত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন মার্কিন কূটনীতিক অর্চার কেন্ট ব্লাড। নিক্সন-কিসিঞ্জারের নীতির বিরোধিতাকারী সেই বহুল আলোচিত ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’-এর রূপকার ব্লাড অন্তত একটি একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। সারা দেশে শহীদ দিবস পালনের ব্যাপকতা বৃদ্ধির জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভূমিকার প্রশংসা করেছিলেন।

১৯৬২ সালের ২৮ ফেব্রুয়রি ঢাকা থেকে ওয়াশিংটনে প্রেরিত তাঁর একটি বার্তায় ১৯৬২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির বিবরণ পাওয়া গেছে। তখন তিনি ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল। ব্লাড লিখেছেন, খুব সকালে ছাত্ররা আজিমপুর সমাধিতে জড়ো হতে শুরু করেন। অনেকেই কালো ব্যাজ ধারণ করেন। তাঁদের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড। যাতে লেখা শহীদ স্মৃতি দীর্ঘজীবী হোক। বাংলা ভাষার ব্যাপকভিত্তিক প্রচলন এবং বাংলা ভাষার স্বীকৃতির সপক্ষেও অনেক প্রচারপত্র ছিল। ছাত্ররা মানবসারি তৈরি করে সুশৃঙ্খলভাবে মেডিকেল কলেজ চত্বরে স্মৃতিসৌধে (নির্মাণকাজ তখন থেমে ছিল) সমবেত হয়।

স্মৃতিসৌধটি কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল। ছাত্ররা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সেখানে তাঁরা একটি সংক্ষিপ্ত সভাও করেন। এতে একুশে ফেব্রুয়ারি জাতীয় ছুটি ঘোষণা, শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন, ১৯৫৮ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী স্মৃতিসৌধের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার প্রস্তাব পাস হয়।

গতকাল ভাষা গবেষক আহমেদ রফিক জানিয়েছেন, জনপ্রিয় গভর্নর আজম খানের উদ্যোগেই একটি শহীদ স্মৃতি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বর্তমান শহীদ মিনার ওই কমিটির সুপারিশেরই ফল।

অর্চার ব্লাড লিখেছেন, ছাত্রদের ওই সভায় সরকারি কমিটিতে ১৫ জন ছাত্রসহ পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট আতাউর রহমান খানকে অন্তর্ভুক্ত করারও প্রস্তাব পাস হয়। ১৯৫২ সালে যেসব ছাত্র নিহত হয়েছিলেন, তাঁদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করাও ওই কমিটির দায়িত্ব ছিল। আহমেদ রফিক অবশ্য নিশ্চিত করেছেন যে পাকিস্তান আমলে শহীদ পরিবারের কেউ সাহায্য পাননি। ওই সভা প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী ছিল এবং ছাত্ররা শান্তিপূর্ণভাবে সভাস্থল ত্যাগ করেন।

ব্লাড আরও উল্লেখ করেন, শহীদ দিবস পালন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকাগুলোতে পুলিশ বাহিনীকে লাঠি ও অস্ত্র নিয়ে সতর্ক প্রহরায় দেখা যায়। বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের মোবাইল রেডিও ইউনিটকে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে।
বাংলা একাডেমিতে দুপুরে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ড. কাজী মোতাহার হোসেন বাংলা লিখতে রোমান হস্তলিপি চালুর বিরোধিতা করেন। ময়মনসিংহের করটিয়া কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ স্মৃতিসৌধ স্থাপনের সিদ্ধান্তের জন্য পূর্ব পাকিস্তান সরকারকে ধন্যবাদ জানান। ব্লাডের কথায়, বামপন্থী অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ভাষা আন্দোলনে যোগদানের জন্য যাঁকে জেলে পাঠানো হয়েছিল, ধনী পরিবারের ইংরেজি প্রীতির নিন্দা জানান। অধ্যাপক চৌধুরী হীনম্মন্যতা থেকে এই প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন।

ব্লাড তাঁর ওই বার্তাটির কোনো অংশকে গোপনীয় হিসেবে চিহ্নিত করেননি। তিনি তাঁর বার্তা শেষে মন্তব্য করেন, সরকার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এবারের ভাষা দিবসের কর্মসূচি পালনে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি।

গত সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানের সরকার ছাত্রদের দীর্ঘকালের দাবি মেনে শহীদ স্মৃতিসৌধ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান নুরুল হুদা মার্কিন কনসালকে (ব্লাড) বলেছেন, ‘তিনি এটা দেখে খুবই সন্তুষ্ট যে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ছাত্র রাজনীতি থেকে দূরে থাকে, তারাও শহীদ দিবসের মিছিলে যোগ দিয়েছে।’ এরপর ব্লাডের মন্তব্য: ‘রমজানের বন্ধের মধ্যেও সারা দেশে ব্যাপকভিত্তিতে শহীদ দিবস পালনের ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সক্রিয়তার সাক্ষ্য বহন করে। শহীদ দিবসটি শান্তিপূর্ণভাবে কেটে গেল, তার কারণ হয়তো ছাত্ররা জানত কর্তৃপক্ষ ঝামেলা পাকাবে। তাছাড়া ১ মার্চে সংবিধান ঘোষণা এবং ১২ মার্চে স্কুল খোলার আগ পর্যন্ত তারা ধৈর্য ধারণকেই উত্তম মনে করেছে।’
http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/145333/%E0%A6%AC%E0%A7%8
D%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A1%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A
7%8D%E0%A6%A3%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A7%9F_%E0%A7%A7%E0%A7%AF%E0%A7%AC%E
0%A7%A8_%E0%A6%8F%E0%A6%B0_%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A6%B6%E0%A7%
87_%E0%A6%AB%E0%A7%87%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A7%9F%E0%
A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF




Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 04:27 PM

বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিল-১৩

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের চোখে জিন্নাহর ভাষা ভাবনা
মিজানুর রহমান খান | আপডেট: ০২:৩১, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঠিক কী ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঢাকায় ‘উর্দু কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা দিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে পাকিস্তানে নিযুক্ত প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রদূত পল এইচ অলিংয়ের একটি মূল্যায়ন জানা গেছে।
১৯৪৮ সালের মার্চে ১০ দিনের এক সফরে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন জিন্নাহ। তখন ঢাকায় মার্কিন কনস্যুলেট ছিল না। জিন্নাহর সফর মূল্যায়ন করে করাচি থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত অলিং ১৯৪৮ সালের ৩১ মার্চ চিঠি লিখেছিলেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ ক্যাটলেট মার্শালকে।

তিন পৃষ্ঠার ওই চিঠিটি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অবস্থিত মার্কিন মহাফেজখানায় রক্ষিত আছে।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত লিখেছেন, ‘জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করেছিলেন। এ সময় তিনি পুনরায় উর্দুর মতো একই মর্যাদায় বাংলাকে বিকল্প সরকারি ভাষা চালু করার ধারণা বাতিল করেন। মি. জিন্নাহর অবশ্য পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা মেনে নিতে আপত্তি নেই। কিন্তু উর্দুর সঙ্গে তাকে একই মর্যাদায় ফেলার চেষ্টায় জিন্নাহ বিরোধিতা করছেন। কারণ, তিনি মনে করেন, উর্দুকে বাংলার সমান্তরাল করার উদ্যোগের সঙ্গে পাকিস্তানের শত্রুদের কৌশলগত দিক রয়েছে।’

রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, করাচির সংবাদপত্রমতে তাঁর পুরো সফরের মধ্যে সমাবর্তনের অনুষ্ঠানে একটা বিঘ্ন ঘটাই ছিল একমাত্র অপ্রীতিকর ঘটনা। উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা—জিন্নাহর এই ঘোষণার প্রেক্ষাপটে ছাত্রদের একটি ক্ষুদ্রগোষ্ঠী মিলনায়তনের এক প্রান্ত থেকে নানা ধ্বনি উচ্চারণ করেছিল।

জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তান সফর সম্পর্কে ওই মার্কিন চিঠিতে আরও বলা হয়, ২৫ মার্চ চট্টগ্রামে বিমান থেকে নামার পর জিন্নাহ ঢাকার মতোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংবর্ধিত হন। ঢাকার মতো এক বৃহৎ জনসভায় তিনি বক্তৃতা করেন। এখানে তিনি বলেন, পাকিস্তানকে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ইসলামি সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, কোনো ইজমের ভিত্তিতে নয়। ভ্রাতৃত্ব, সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ—এর সবটাই হলো ইসলাম ধর্ম, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মৌলিক বিষয়। ২৮ মার্চ গভর্নর জেনারেল ঢাকায় ফিরে এসেছিলেন এবং এদিনই পূর্ব বাংলায় তিনি তাঁর চূড়ান্ত বক্তব্য দেন। জিন্নাহ প্রাদেশিকতাবাদকে আক্রমণ করেন। তাঁর কথায় প্রাদেশিকতাবাদকে দৃশ্যপটে এনেছে ভারতীয় ইউনিয়নের নাগরিকবৃন্দ। ভারতীয় নাগরিকেরা আকস্মিকভাবে পূর্ব বাংলার নিপীড়িত জনতার পাশে দাঁড়াতে উৎসাহ দেখাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে।

পল এইচ অংলি তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেন, গভর্নর জেনারেলের ঢাকায় অবস্থানকালে তাঁর রেসকোর্সে দেওয়া ভাষণটি উল্লেখযোগ্য। এতে এক লাখ অথবা তার বেশি মানুষ একত্র হয়েছিল। খুব সম্ভবত সাম্প্রতিক কালে গঠিত অল পাকিস্তান পিপলস পার্টির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছিলেন, ‘মাশরুম দলগুলো মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি মুসলিম লীগের পতাকাতলে সবাইকে সমবেত হতে আহ্বান জানান।

গভর্নর জেনারেল প্রাদেশিকতাবাদের বিষ সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এবং সব অনুগত নাগরিককে বাঙালি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি কিংবা পাঠানের পরিচয় ভুলে যেতে আহ্বান জানান এবং বলেন, পাকিস্তানের শত্রুরা সুপরিকল্পিতভাবে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে প্রাদেশিকতাবাদের চেতনা উসকে দিচ্ছেন। তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন রেখেছিলেন, পাকিস্তানের অভ্যুদয়ে তারা সন্তুষ্ট হয়েছে, নাকি পূর্ব বাংলার ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একীভূত হওয়াকে তারা অগ্রাধিকার দিত। তখন সমবেত জনতা জিন্নাহকে অভিনন্দন জানান, আর প্রতিধ্বনি তোলেন, না না না। এ সময় তিনি পাকিস্তানের জন্য একটি সরকারি ভাষা নির্দিষ্ট করার সমস্যা উল্লেখ করে বলেন, অবশ্যই উর্দুই এককভাবে সরকারি ভাষা হওয়া উচিত। কিন্তু পূর্ব বাংলার মানুষ তাদের প্রদেশের ভাষা কী হবে, সেটা নির্ধারণে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে।

গভর্নর জেনারেল নির্দিষ্টভাবে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল দ্বারা ব্যবহার কিংবা অপব্যবহারের শিকার হওয়ার বিষয় ছাত্রদেরকে সতর্ক করে দেন। এবং ছাত্রদেরকে অধ্যয়নে মনোনিবেশ করার পরামর্শ দেন।

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/146032/%E0%A6%AE%E0%A6%B
E%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%A8_%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A
6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A6%E0%A7%82%E0%A6%A4%E0
%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%9A%E0%A7%8B%E0%A6%96%E0%A7%87_%E0%A6%9C%E0%A6%B
F%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%B0_%E0%A6%AD%E0%A
6%BE%E0%A6%B7%E0%A6%BE_%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%BE



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 04:48 PM

বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিল—১৪

আইয়ুবের স্বপ্নে ছিল ‘পাকিস্তানি ভাষা’
মিজানুর রহমান খান | আপডেট: ০২:২৪, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৫৬ সালের সংবিধানে উর্দু ও বাংলাকে জাতীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর এক যুগ পরে এসেও আইয়ুব খান পাকিস্তানি ভাষা চালু করার পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছিলেন।

১৯৬৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে মার্কিন কনসাল লেজলি স্কয়ার্স ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিলেন, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিশেষ সংগীত ও নৃত্যসন্ধ্যার আয়োজন করেছিল নজরুল একাডেমী। অনুষ্ঠান শেষে আইয়ুব একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ দেন। এতে তিনি পাকিস্তানের আঞ্চলিক উপাদানের মধ্যে অনৈক্যের পরিবর্তে ঐক্যের সন্ধান পান এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে ‘আমাদের সম্ভবত একটি “পাকিস্তানি ভাষা” থাকবে। আর সেটা হবে দেশের সব ভাষার সংশ্লেষণ।’

স্কয়ার্স মন্তব্য করেছিলেন, এটা অনুমেয় যে ভাষাসংক্রান্ত আইয়ুবের ওই ঘোষণাটি অপরিকল্পিত। তাঁর ওই মন্তব্যকে কেবলই সাংঘাতিক রাজনৈতিক ভুল হিসেবে বিবেচনা করা চলে। অন্তত ঢাকার মানুষ তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাঙালিদের জন্য বিব্রতকর মনে করবে। ‘পাকিস্তানি ভাষা’ সম্পর্কে তিনি যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, তাঁর মূলে রয়েছে মুসলিম সাংস্কৃতিক এককেন্দ্রিকতার ধারণা। আর পাকিস্তানে ‘বাংলা চালুর প্রতিবন্ধকতা’ নিয়ে তাঁর উচাটন মনের প্রতিফলন ঘটেছে।

১৯৬৮ সালের ২ অক্টোবর স্কয়ার্স ওয়াশিংটনে আরেকটি গোপনীয় বার্তা পাঠান। এতে তিনি লিখেছেন, পাকিস্তান অবজারভার ১ অক্টোবর দেওয়া আইয়ুবের বেতার বক্তৃতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি মাহমুদ হোসাইনের মন্তব্য প্রথম পৃষ্ঠায় পাশাপাশি ছেপেছে। আইয়ুব তাঁর মাসিক বেতার ভাষণে বলেছেন, ‘সংস্কৃতিকে বিভক্ত করা যায় না’। মাহমুদ হোসাইন বক্তব্য দিয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিনারে। অবজারভার তাঁর বক্তব্যের শিরোনাম দিয়েছে, ‘একটিমাত্র সংস্কৃতির জন্য এক ইউনিটের পাকিস্তান অনেক বড়।’

ওই মার্কিন কূটনীতিকের ভাষায়, ওই দুটি প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর মধ্যে বৈপরীত্য রয়েছে। ড. হোসাইন মনে করেন, ‘পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান’ একটি স্বতন্ত্র পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এর ফলে ‘পাকিস্তানি সংস্কৃতির মধ্যেও একটি বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে বাধ্য।’ তিনি আরও যুক্তি দেন যে ‘একটি আদর্শ একটি সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে না, যদি না সেই আদর্শ একটি ভূখণ্ডের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়।’

রাওয়ালপিন্ডি ডেটলাইনে আইয়ুবের ভাষণ ছাপা হয়। আইয়ুব বলেন, ‘আমাদের ভিত্তি হলো ইসলাম। তাই পাকিস্তানি জাতির সংস্কৃতিকে সম্প্রদায়গতভাবে বিভক্ত করা চলে না।’ ওই খবরে আইয়ুবকে উদ্ধৃত করে আরও বলা হয়, ‘আমরা পাকিস্তানের জন্য একটি সর্বজনীন ভাষার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হব।’

আইয়ুবের ওই মন্তব্যে মার্কিন কনসাল গত সেপ্টেম্বরে ঢাকায় দেওয়া তাঁর উল্লিখিত ‘পাকিস্তানি ভাষা’বিষয়ক ঘোষণার মধ্যে মিল খুঁজে পান। স্কয়ার্স বলেন, এটা লক্ষণীয় যে এর আগে নজরুল একাডেমীর অনুষ্ঠানে তিনি ‘ভাষাগত ঐক্য’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। এখন এক মাসের ব্যবধানে সেখান থেকে সরে এসে বলছেন, ‘সাংস্কৃতিক ঐক্য’। অক্টোবর ভাষণে আইয়ুব উর্দু, বাংলা, সিন্ধি, পাঞ্জাবি ও অন্যান্য পাকিস্তানি ভাষার মধ্যে উৎপত্তি ও কাঠামোগত সামঞ্জস্য চিহ্নিত করেন। তিনি যুক্তি দেন, ‘আঞ্চলিক ভাষাসমূহ একটি পরিবারভুক্ত। এই ভাষাগুলো জীবনের এক এবং অভিন্ন দর্শনের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট।’

স্কয়ার্স মন্তব্য করেন, আইয়ুবের বেতার ভাষণের আগে ড. হোসেইন রাজশাহীর সেমিনারে তাঁর বক্তব্য রেখেছিলেন। ড. হোসেইন ১৯৬০-৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি (১৯৬৭-৬৯) জাকির হোসাইনের ভাই।

মার্কিন কনসাল লিখেছেন, সম্প্রতি তিনি করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতি এবং ভাষার একনিষ্ঠ সমর্থক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে তাঁকে জবরদস্তি সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/146944/%E0%A6%86%E0%A6%8
7%E0%A7%9F%E0%A7%81%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A
6%AC%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A7%87_%E0%A6%9B%E0%A6%BF%E0%A6%B2_%
E2%80%98%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A
4%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF_%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E2%8
0%99



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 04:58 PM

বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিল ১৫

ভাষার প্রশ্ন স্থগিতে ৮০ দৈনিকের সম্পাদক রাজি
মিজানুর রহমান খান | আপডেট: ০১:৪৪, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ


একুশে ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের পরের পরিস্থিতিতে ভীত নূরুল আমীন সরকার মার্চে ঢাকার আইনসভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পাস করেছিল। কিন্তু দুই মাস পর করাচিতে গণপরিষদে একই প্রস্তাব আনা হলে সেটি তিনি প্রতিহত করেন। গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্ন অনির্দিষ্টকাল স্থগিত রাখার প্রস্তাব ৪১-১২ ভোটে পাস হয়েছিল।

ওই দিনই প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দীন সমগ্র পাকিস্তান থেকে দৈনিক সংবাদপত্রের ৮০ সম্পাদককে করাচিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ভাষার প্রশ্নকে দলীয় রাজনীতি থেকে পৃথক করে দেখতে তিনি তাঁদের সহযোগিতা চান এবং সম্পাদকেরা সরকারকে সহযোগিতা দিতে সম্মত হয়েছিলেন।
১৯৫২ সালের ১৫ মে করাচির মার্কিন দূতাবাসের কাউন্সিলর ওয়ারউইক পার্কিনস ওয়াশিংটনকে পাঠানো এক বার্তায় (এয়ার পাউচ) এ তথ্য জানিয়েছিলেন।

গণপরিষদে কী পরিবেশে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন স্থগিত রাখার প্রস্তাব পাস হয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন ওয়ারউইক পার্কিনস। তিনি লিখেছেন, মুসলিম লীগের সংসদীয় দল সামান্য মতভেদ এবং বিস্ময়করভাবে অল্প তিক্ততায় গণপরিষদে একটি সংশোধিত প্রস্তাব পাস করাতে সক্ষম হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘বাংলা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কি হবে না, সে বিষয়টি স্থগিত থাকবে।’

পার্কিনসের মতে, এ পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সফল হয়েছে। পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন পিছিয়ে দিতে সমর্থন পেয়েছেন। করাচিতে সম্পাদকদের আমন্ত্রণ জানানোর ওই ঘটনা ছিল নজিরবিহীন। জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকেরা প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ রক্ষায় সহযোগিতা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দীন উর্দুর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে গত জানুয়ারিতে পূর্ববঙ্গে একটি ভ্রান্তিকর ঘোষণা দিয়েছিলেন। এতে মারাত্মক জাতীয় সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল।

একুশের ঘটনা ওই মার্কিন কূটনীতিকের বিবরণ মতে, কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে ঢাকায় তখন দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার এটা সাময়িকভাবে পাশে সরিয়ে রাখতে পেরেছে। যখন পাকিস্তান সংবিধান লেখা হবে, তখন ভাষার বিষয়টি আবার তোলা হবে। তবে সেটা গত দুই মাসের তুলনায় অনেক কম বিস্ফোরক পরিস্থিতিতে আলোচনার সুযোগ ঘটবে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের নূর আহমেদ গণপরিষদে প্রস্তাব করেন যে, উর্দু ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হবে। এর পরপরই খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী আব্দুস সাত্তার পীরজাদা এর বিকল্প প্রস্তাব আনেন। এতে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। যথাসময়ে এটি যখন বিবেচনার জন্য আসবে, তখন এ প্রশ্নের ফয়সালা করা হবে।’

নূর আহমেদের প্রস্তাবটি হিন্দু কংগ্রেস পার্টি সমর্থন করে। এই হিন্দু সদস্যদের অধিকাংশই পূর্ব পাকিস্তানের। তবে এটি আরও সমর্থন করেছে কমিউনিস্টপন্থী আজাদ পাকিস্তান পার্টি। এই সদস্যদের সবাই পশ্চিম পাকিস্তানি। কংগ্রেস পার্টি যুক্তি দেয় যে, পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন একান্তভাবে দেশজ আন্দোলন। এটা দেশের বাইরে থেকে এসেছে বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা সঠিক নয়। কংগ্রেসের একজন সদস্য স্পষ্ট করেন যে, হিন্দুরা ভাষা বিক্ষোভে আদৌ কোনো ভূমিকা রাখেনি এবং ভবিষ্যতেও তারা তা করবে না।

পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন যুক্তি দেন, ‘তারা আমাদের মধ্যে চিড় ধরাতে চাইছে। ওই কংগ্রেস পার্টি ধারণা তৈরি করছে যে, তাঁরাই যেন বাংলা ভাষা প্রচারের প্রবক্তা। প্রকৃতপক্ষে দুই ধরনের বাঙালি আছে। বাঙালি মুসলিম ও বাঙালি হিন্দু।’

ওই মার্কিন প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ভাষা বিষয়ে নূরুল আমীন তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যাখ্যা দেন। তিনি ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত হন যে, পূর্ব বাংলা অ্যাসেম্বলিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তিনিই প্রস্তাব এনেছিলেন। পাস করার জন্য তিনিই তা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠিয়েছেন। এদিন নূরুল আমীন দাবি করেন যে, পূর্ব বাংলার অ্যাসেম্বলিতে আনা তাঁর একটি সংশোধনী প্রস্তাব পাস হয়নি। এতে বলা হয়েছিল যে, ‘পাকিস্তানের গণপরিষদের পরবর্তী অধিবেশনে চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে যে, বাংলা হবে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা।’ এখন আমি আশাবাদী যে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন এখন স্থগিত রাখলে সেটা ভালো ফল দেবে।

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/147613/%E0%A6%AD%E0%A6%B
E%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%B0_%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B6%E0%A
7%8D%E0%A6%A8_%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A6%97%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E
0%A7%87_%E0%A7%AE%E0%A7%A6_%E0%A6%A6%E0%A7%88%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%
95%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%
A6%A6%E0%A6%95_%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%BF



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 05:11 PM

বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিল—১৭

রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে নজরুলকে ব্যবহার
মিজানুর রহমান খান | আপডেট: ০২:০২, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ


বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ ঠেকাতে পাকিস্তানি সরকার ও মুসলিম লিগের রটনাবিদেরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলিম কবি বিবেচনায় নজরুল ইসলামকে ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় রবীন্দ্রজয়ন্তী উদ্যাপনের সূচনাকে তারা সুনজরে দেখেনি। এই মানসিকতা থেকেই ঢাকায় নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

১৯৬৭ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকার তৎকালীন মার্কিন কনসাল ডরিস ভার্জিনিয়া মেটকাফ ওয়াশিংটনে পাঠানো এক বার্তায় ওই মন্তব্য করেছিলেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে বাঙালিদের বিরুদ্ধে মুসলিম লিগের ওই মিশন ছিল উচ্চাভিলাষী। কারণ, শিক্ষিত বাঙালিরা রবীন্দ্রনাথকে শেক্সপিয়ার-ওয়ার্ডসওয়ার্থ-ইয়েটস-গ্যেটের দলভুক্ত মনে করেন। অন্য দিকে নজরুলকে তাঁরা মনে করেন জর্জ এম কোহেন এবং আরভিং বার্লিনদের (এই দুজনই মার্কিন লেখক ও গীতিকার) দলভুক্ত। যদিও নজরুল মুসলমান হয়েও পাকিস্তান সমর্থন করেননি। তিনি তাঁর হিন্দু স্ত্রীকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বাস করেন।

মার্কিন কনসালের বর্ণনায়, ১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৭ পাকিস্তান সরকার ঢাকায় ব্যাপক উদ্দীপনায় নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে। এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে পাকিস্তানি সংস্কৃতির উন্নয়ন সাধন করা। ২৪ সেপ্টেম্বরে মুসলিম লিগের নেতা খান এ সবুরকে একাডেমির প্রধান পৃষ্ঠপোষক করা হয়। অথচ তিনি কোনো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নন এবং সাহিত্যে তাঁর অনুরাগও নেই।

মেটকাফ তাঁর ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলেন যে খান এ সবুর বাঙালির আকাঙ্ক্ষা ও বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালান। ১৬ আগস্ট খুলনায় তিনি বলেছেন, দীর্ঘ ২০ বছর পরে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে একদল বুদ্ধিজীবী নিয়োগ করতে সক্ষম হয়েছে, যারা কতিপয় কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি বিদেশি সংস্কৃতির বিজয় দেখতে চাইছে। এই মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবী পাকিস্তান সৃষ্টির আদর্শগত যৌক্তিকতাকে নাকচ করার চেষ্টা করছেন।

মার্কিন কনসাল উল্লেখ করেন যে ‘১৯৪৮ সালের ৯ মে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে যে জনমত গঠন শুরু হয়, তাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার। তিনি রবীন্দ্রনাথের জন্মজয়ন্তী উদ্যাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিকাশের সূচনা ঘটে। এই অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করে মুসলিম লিগের অবাঙালি নেতারা মৌখিকভাবে আক্রমণ করেছিলেন। আর এই ঘটনা নিয়ে মুসলিম লিগ নেতাদের মধ্যে প্রথম চিড় ধরেছিল। ১৯৪৮ সালের ৯ মের পর থেকে ঢাকা এবং পূর্ব পাকিস্তানের নানা জায়গায় রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালিত হয়ে আসছে।’

ডরিস মেটকাফের ভাষায়, ‘১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যখন বামপন্থীদের নেতৃত্বে ছাত্ররা ঢাকায় দাঙ্গা সৃষ্টি করেছিল, তখন সরকারকে তারা একটি প্রতিশ্রুতি প্রদানে বাধ্য করে যে বাংলা হবে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। সেই থেকে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো বাংলা ভাষাকে জাতীয়করণ করা এবং পূর্ব পাকিস্তানিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে গণ্য হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে মার্কিন কনসাল আরও মন্তব্য করেন যে ‘১৯৫৫ সালে তরুণ রাজনীতিক নুরুল হুদা বুলবুল ললিত কলা একাডেমি (বাফা) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। হুদাকে এ কাজে যাঁরা আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন হাবিবুল্লাহ বাহার তাঁদের অন্যতম। ১৯৪৮ সালে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালন বাংলা ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করেছিল।’

১৯৬৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে আরেকটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন কনাসল স্কয়ার্স। পূর্ব পাকিস্তান সফররত ২৪ সেপ্টেম্বর আইয়ুব খান হোটেল ইন্টারকনে নজরুল একাডেমি আয়োজিত সংগীত ও নৃত্যসন্ধ্যা উপভোগ করেন। তিনি ৫০ হাজার রুপি অনুদান দেন।
মার্কিন কনসাল মন্তব্য করেছিলেন যে ‘এক বছর আগে আইয়ুব সরকার বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে প্রতিহত করতে নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যদিও নজরুল হিন্দু বিয়ে করেছেন। তিনি বাঙালি কমিউনিস্ট পার্টির পূর্বসূরি সংগঠনকে সহায়তা দিয়েছেন। দেশভাগের বিরোধিতা করেছেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পরে ভারতে থেকে গেছেন। এখন কিছুটা অসুস্থ অবস্থায় কলকাতার কাছে বসবাস করছেন। কবি নজরুল আসলে স্থানীয় মুসলিম লিগের কাছে বিড়ম্বনার উৎস। কারণ, তিনি সর্বদাই মুসলিম লিগের বিরোধিতা করেছেন।

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/149161/%E0%A6%B0%E0%A6%A
C%E0%A7%80%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A8%E0%A6
%BE%E0%A6%A5%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0
%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A7%87_%E0%A6%A8%E0%A6%9C%E0%A6%B0%E0%A7%81
%E0%A6%B2%E0%A6%95%E0%A7%87_%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%AC%E0%A6
%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B0



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 05:13 PM

বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিল—১৮

‘বাংলা দেশ’ নামেরও বিরোধিতা করেছিল জামায়াত
মিজানুর রহমান খান | আপডেট: ০৬:৫৮, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ


জামায়াত-ই-ইসলামী ১৯৭১ সালে কেবল বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের বিরোধিতাই করেনি, ১৯৬৯ সালে বাঙালি রাজনীতিকেরা যখন ‘বাংলা দেশ’ নামকরণের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন, তখন জামায়াত এর বিরোধিতা করেছিল।

১৯৬৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার তৎকালীন মার্কিন কনস্যুলেট ওয়াশিংটনকে একটি এয়ারগ্রাম বার্তায় জমায়াতের এই ‘বাংলা দেশ’ নামকরণ বিরোধিতার তথ্য জানিয়েছিল। মার্কিন কনস্যুলেটের ভাষ্যমতে, শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান প্রমুখ বাঙালি রাজনীতিক সমস্বরে ‘বাংলা দেশ’ নামকরণের দাবি তুলেছেন। আর জামায়াত বাঙালি রাজনীতিকদের প্রতি ইঙ্গিত করে উর্দুর পরিবর্তে বাংলা ভাষা প্রচলনে তাঁদের ভূমিকার সমালোচনা করেছে।

উল্লেখ্য, অধ্যাপক গোলাম আযম বাংলা ভাষার আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছিলেন বলে দাবি করেন। কিন্তু জামায়াত সংগঠনগতভাবে বাংলাকে নাকচ করে কেবল উর্দুর পক্ষেই যে জোরালো ভূমিকা রেখেছিল, মার্কিন কনস্যুলেটের এই এয়ারগ্রামটি তার সাক্ষ্য বহন করে।

আইয়ুব খানকে সরিয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খান সবে ক্ষমতায় এসেছেন। ২৮ নভেম্বরে দেওয়া তাঁর একটি ভাষণকে কেন্দ্র করে ‘বাংলা দেশ’ নামকরণের দাবি উনসত্তরের ডিসেম্বরে নতুন মাত্রা পেয়েছিল। ৭ ডিসেম্বরে পাকিস্তান অবজারভার-এ আতাউর রহমান খানের ‘বাংলা দেশের’ পক্ষে একটি বিবৃতি ছাপা হয়। এর বিরোধিতা করে ১৯৬৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায়ই জামায়াতের ওই ‘বাংলা দেশ’ ও বাংলা ভাষাবিরোধী বিবৃতিটি ছাপা হয়।

মার্কিন কনস্যুলেট জানিয়েছিল, সাবেক এমপিএ এবং বর্তমানে করাচি জামায়াত-ই-ইসলামীর যুগ্ম সম্পাদক মাহমুদ আজম ফারুকী অভিযোগ করেছেন যে, ‘বাংলা দেশ’ নামকরণের দাবি পাকিস্তানের অখণ্ডতা এবং সংহতির প্রতি হুমকি এবং এর মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদের অদেশপ্রেমিক সুর নিহিত। জামায়াতের নেতা ফারুকী আরও যুক্তি দেন যে, ‘অতীতে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ “ভাষার প্রশ্ন” তুলেছিলেন। তাঁরা উর্দুর বিরোধিতা করেছিলেন। অথচ জাতীয় ভাষা হিসেবে উর্দু “সর্বসম্মতিক্রমে” গৃহীত হয়েছিল। ওই নেতাদের ভূমিকার কারণে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বিভেদ আরও বিস্তৃত হয়েছে।’

লক্ষণীয় যে, জামায়াতের নেতা যে ‘বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ’ বলতে পূর্ব পাকিস্তানিদেরই বুঝিয়েছিলেন, সে কথা নির্দিষ্টভাবে মার্কিন কনস্যুলেট ওয়াশিংটনকে অবহিত করেছিল।

মার্কিন কনসাল উল্লেখ করে যে, ১৯৬৯ সালের ২৮ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের একটি ভাষণের পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ ‘বাংলা দেশ’ করার বিষয়টি ঢাকার সংবাদপত্রে সাম্প্রতিককালে বিরাট গুরুত্ব পেয়েছে। যাঁরা পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ ‘বাংলা দেশ’ করতে চাইছেন, তাঁদের যুক্তির প্রধান ভিত্তি হলো, যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট ভেঙে গেছে এবং প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে সিন্ধ, বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের সাবেক প্রাদেশিক নাম পুনর্জীবিত হচ্ছে। তাই পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশের মধ্যে সবচেয়ে পূর্বে অবস্থিত প্রদেশের নাম আর ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখা সংগত হবে না।

মার্কিন কনস্যুলেট ওই বার্তায় জানায়, ইয়াহিয়ার বক্তৃতার পরদিনই এস রহমতউল্লাহ পূর্ব পাকিস্তানকে ‘পূর্ব বাংলা’ নামকরণের আহ্বান জানান। তবে এর আগে অন্যদের মধ্যে নানা উপলক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান ‘বাংলা দেশ’ নামকরণের পক্ষে মত দিয়েছেন।

১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর শেখ মুজিবুর রহমান এক সেমিনারে বলেছেন, পাকিস্তানের পূর্বাংশ এখন থেকে ‘বাংলা দেশ’ হিসেবে পরিচিত হওয়া উচিত। মুজিব উল্লসিত জনতার উদ্দেশে বলেছেন, ‘বাংলা’ শব্দের সঙ্গে এই মাটির দুই মহান সন্তান শের-ই-বাংলা ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ন্যাপের আধ্যাত্মিক গুরু মওলানা ভাসানী ৭ ডিসেম্বর প্রকাশ্য জনসভায় পূর্ব পাকিস্তানের পুনঃ নামকরণ সমর্থন করে বলেছেন, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘বাংলা দেশ’ নামকরণই হবে সঠিক এবং যথার্থ। তিনিও যুক্তি দেন যে, যেহেতু এক ইউনিট ভেঙে গেছে, তাই ‘বাংলা দেশ’ নামটি পুনরুজ্জীবিত হওয়া উচিত।

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/150193/%E2%80%98%E0%A6%A
C%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE_%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E2%8
0%99_%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A6%93_%E0%A6%AC%
E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A7%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE_%E0%A6%
95%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%9B%E0%A6%BF%E0%A6%B2_%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%
A6%AE%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%A4



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 05:20 PM

বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিল—১৯

১৯৫৮ থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের তোষামোদি
মিজানুর রহমান খান | আপডেট: ০২:২৪, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৫৮ সালের অক্টোবর থেকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বাঙালি জাতীয়তাবাদের তোষামোদি এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্কুল-কলেজে সরকারিভাবে শহীদ দিবস পালনকে উৎসাহিত করার নীতি গ্রহণ করেছিল।

উল্লেখ্য, ইস্কান্দার মির্জাকে উৎখাত করে জেনারেল আইয়ুব খান আটান্নর অক্টোবরে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। ঢাকার তৎকালীন মার্কিন কনসাল গিনি ক্যাপ্রিও আইয়ুব শাসনামলের গোড়া থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ব পাকিস্তান নীতি তীক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ১৯৬০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে পাঠানো এক প্রতিবেদনে ক্যাপ্রিও ওই মন্তব্য করেন।

সামরিক শাসন জারির দুই বছর পরের একুশে পালনে কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ করেছিলেন ক্যাপ্রিও। তিনি মন্তব্য করেন, এবারে পূর্ব পাকিস্তানের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাত্র অল্প কয়েক দিনের প্রস্তুতিতে একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এতে বাধা দেয়নি। আবার একেবারে মুক্তভাবেও সভা-সমাবেশ করতে দেয়নি। তদুপরি সরকারের অপেক্ষাকৃত নমনীয়তা দেখে অনেকেই বিস্মিত। সরকার মনে করে যে এখানকার রাজনৈতিক অবস্থা এখন যথেষ্ট স্থিতিশীল। তাই স্পর্শকাতর বাঙালিদের, ক্যাপ্রিওর ভাষায় ‘জাতীয়তাবাদী এবং সংকীর্ণ পক্ষপাতমূলক’ একুশে উদ্যাপনে বাধা দেওয়া ঠিক হবে না।

ওই প্রতিবেদনে ক্যাপ্রিও লিখেছেন, ‘বাঙালির সংবেদনশীলতার প্রতি কেন্দ্রের সচেতনতা রয়েছে। প্রদেশের স্কুলগুলোতে শহীদ দিবস পালনকে উৎসাহিত করা কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। কারণ, ১৯৫৮-এর অক্টোবরে সামরিক শাসন জারি থেকে কেন্দ্রীয় সরকার বাঙালি জাতীয়তাবাদের তোষামোদি শুরু করেছে। বাঙালিদের আস্থাভাজন হওয়ার জন্য তিনি ধারণা দিয়েছিলেন যে দুই প্রদেশ সমান এবং বাংলা সর্বদা উর্দুর সঙ্গে এক সমান্তরালে চলবে।’

ওই বার্তায় ক্যাপ্রিও আরও লিখেছেন, এটা লক্ষণীয় যে শহীদ দিবস (১৯৬০) পালন করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ এমন কিছুই করেনি, যাতে পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে। দিনটিতে প্রদেশের কোথাও কোনো কুচকাওয়াজ হয়নি। কিংবা কোথাও হাইডপার্ক ধরনের বক্তৃতাও হয়নি। সমগ্র প্রদেশজুড়ে একুশের কর্মসূচি ছিল নিষ্প্রাণ ও ঘরোয়া। এটাও কৌতূহলোদ্দীপক যে ঢাকার মাত্র দুটি দৈনিক সংবাদ ও ইত্তেফাক শহীদ দিবসে সম্পাদকীয় ছেপেছে।

১৯৫৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর তিন দিনের সফরে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন আইয়ুব খান। এই সফর উপলক্ষে ঢাকার মার্কিন কনসাল অন্তত দুটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। ৩০ ডিসেম্বর ১৯৫৮ পাঠানো বার্তায় মার্কিন কনসাল মন্তব্য করেছিলেন, বাঙালিদের আস্থা অর্জন করতে আইয়ুব যথেষ্ট সতর্ক ও সচেষ্ট ছিলেন। তারা এমনকি শঙ্কিত ছিল যে সরকারবিরোধী আন্দোলন যদি তীব্রতর হয়, তাহলে দ্রুতই তাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের সঙ্গে এক করে দেখা হবে। এটা করতে তারাই অতি উৎসাহী হয়ে উঠবে, যারা এখন আইয়ুব সরকারে নেই।

কনসাল ক্যাপ্রিও বলেন, ‘বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে আয়োজিত অনেক জাঁকালো অনুষ্ঠানে আইয়ুব খানের প্রাণবন্ত উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তাঁর সফরসঙ্গী জেনারেল আযম খান (১৯৬০ সালের এপিলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হন) এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।’ এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বাঙালিদের দেশপ্রেম এবং তাঁদের মানবীয় গুণাবলির মহত্ত্বে তিনি গভীরভাবে মুগ্ধ।’

আইয়ুব তাঁর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বাংলা একাডেমিকে ১০ হাজার টাকা অনুদান দেন। তাঁর ঢাকা সফরের অনেক আগে থেকেই সরকারি কর্মকর্তারা প্রচার চালাতে শুরু করেন যে সরকার বাংলা একাডেমিকে একটি সক্রিয় ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। আধুনিক চিন্তা ও বিজ্ঞানকে সমাজে ছড়িয়ে দিতে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে হবে।

১৯৫৯ সালের ৭ জানুয়ারি পৃথক এক বার্তায় ক্যাপ্রিও জানিয়েছিলেন, ‘২৮ ডিসেম্বর আইয়ুব চট্টগ্রামে নিয়াজ স্টেডিয়ামে ভাষণ দিয়েছিলেন। জেনারেল সম্ভবত জাতীয়তাবাদী চেতনায় উর্দুতে ভাষণ দেন। তিনি বাংলা জানেন না। তদুপরি জনতা পিনপতন নীরবতার মধ্য দিয়ে তাঁর বক্তব্য শুনেছে, তাঁর প্রতি তারা বৈরী মনোভাব দেখায়নি।’

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/150877/%E0%A7%A7%E0%A7%A
F%E0%A7%AB%E0%A7%AE_%E0%A6%A5%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%87_%E0%A6%AC%E0%
A6%BE%E0%A6%99%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BF_%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A4%
E0%A7%80%E0%A7%9F%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%8
7%E0%A6%B0_%E0%A6%A4%E0%A7%8B%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%8B%E0%A
6%A6%E0%A6%BF



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 05:32 PM

বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিল—২০

উর্দুর পক্ষে মন্তব্য ভাসানী বিব্রত!
মিজানুর রহমান খান | আপডেট: ০৩:০২, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ


বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিল-১৩ভাষা আন্দোলনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। কিন্তু ১৯৫৩ সালের ৪ জুন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল গ্রে ব্রিম লিখেছেন, উর্দু দৈনিক পাসবান পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর মুখ খোলেন এবং তাতে তিনি তাঁর অবস্থান তুলে ধরেন। ওই সাক্ষাৎকারে ভাসানী সুপারিশ করেন যে সমগ্র পাকিস্তানের জন্য উর্দুই হবে একমাত্র ভাষা। কারণ কেবল উর্দু ভাষাই পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে সেতুবন্ধ হতে পারে।

লক্ষণীয় যে গ্রে ব্রিম ভাসানীকে উদ্ধৃত করে উর্দু হবে পাকিস্তানের ‘লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। লিংগুয়া ফ্রাঙ্কার অর্থ হলো বহু ভাষাভাষী অঞ্চলে যে ভাষা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হয়।

উল্লেখ্য যে ২১ ফেব্রুয়ারির পর পরই গঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের প্রধান ছিলেন মওলানা ভাসানী। ভাসানী গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ গতকাল পাসবান পত্রিকার ওই সাক্ষাৎকারের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কারণ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা প্রশ্নে ভাসানীর ভূমিকা অনন্যসাধারণ। তাঁর মতে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাসানী পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছিলেন। সুতরাং পাসবান পত্রিকার ওই সাক্ষাৎকারকে সন্দেহের চোখেই দেখতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন যে তেজগাঁওয়ে পাকিস্তান সরকারের দেওয়া তিন বিঘা জমি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পত্রিকাটি ছাপা হতো। ভারত থেকে আগত মোহাজেরদের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত পাসবান ও মর্নিং নিউজ সব সময় সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানীর বিরুদ্ধাচরণ করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ভাসানী কখনো মার্কিনদের সুনজরে দেখেননি বলেও মন্তব্য করেন।
তবে ১৯৫৩ সালে উর্দু নিয়ে মওলানা ভাসানীর কথিত ওই বক্তব্য যে খুবই অস্বাভাবিক ও বিস্ময়কর ছিল, তার প্রমাণ রয়েছে মার্কিন কনসালের প্রতিবেদনেও।

মার্কিন কনসাল গ্রে ব্রিম লিখেছেন, এটা অনুমান করা যায় যে মওলানা ভাসানী ভেবেছিলেন, উর্দু সম্পর্কে তাঁর এই তোষামোদপূর্ণ বক্তব্য হয়তো (সরকারের) অনুগ্রহ লাভ করতে পারে। আর উর্দুভাষী মহলের বাইরে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির কথাও অগোচরে থেকে যাবে। কিন্তু বাংলা দৈনিক সংবাদ এটা দ্রুত লুফে নিয়েছে। পত্রিকাটি ভাসানীর ওই সাক্ষাৎকারে দেওয়া মন্তব্য প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশ করেছে। ভাসানীর পক্ষ থেকে ওই বক্তব্যের বিরোধিতা করে একটি বিবৃতি প্রচার করা হয়েছে। সংবাদপত্রে দেওয়া ওই বিবৃতিতে ভাসানী উল্লেখ করেন যে, ‘এ বিষয়ে তাঁর অবস্থান খুবই স্পষ্ট। দেড় বছর ধরে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান বজায় রেখে চলেছেন।’ মার্কিন কনসাল মনে করেন যে ভাসানীর ওই বিবৃতিতে তাঁর আড়ষ্টভাব চাপা থাকেনি।

মার্কিন কনসাল তাঁর ওই প্রতিবেদনে এই প্রসঙ্গটির ইতি টেনে মন্তব্য করেন যে ‘মওলানা ভাসানীর এই “প্রত্যাখ্যান” আপাতগ্রাহ্য হলেও এটা মোটামুটি ধরে নেওয়া চলে যে উর্দুর সপক্ষে একটি উর্দু দৈনিকে দেওয়া তাঁর ওই সাক্ষাৎকারটি তাঁকে তাড়া করবে।’

উল্লেখ্য, মওলানা ভাসানী একুশে ফেব্রুয়ারির পর পরই গ্রেপ্তার হন। এবং প্রায় ১১ মাস জেল খেটে ১৯৫৩ সালের ২১ এপ্রিল তিনি ছাড়া পান। সৈয়দ আবুল মকসুদ উল্লেখ করেন যে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায় এবং পূর্ব বাংলার জনমতের চাপে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিনা বিচারে আটকে রাখার প্রতিবাদে ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তিনি ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশন করেছিলেন।

http://www.prothom-alo.com/sports/article/151612/%E0%A6%89%E0%A6%B0%E0
%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%B0_%E0%A6%AA%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7
%E0%A7%87_%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6
%AF_%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%80_%E0%A6%AC%E
0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 06:11 PM

বায়ান্নর গোপন মার্কিন দলিল

মুজিবকে দণ্ড দিতে চেয়েছিল পাকিস্তান
মিজানুর রহমান খান | আপডেট: ০২:৩৯, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ


পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেলরা সবাই বাংলা ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের অসামান্য ভূমিকা চিত্রিত করেছেন। এর মধ্যে মার্কিন পলিটিক্যাল অফিসার কিলগোর ওয়াশিংটনকে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত মুজিবকে দোষী সাব্যস্ত করতে পাকিস্তান সরকার বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকাকে বিবেচনায় নিতে পারে। পাকিস্তানি শাসকেরা জানেন মুজিব পিন্ডিকে অবজ্ঞা করেন। পাকিস্তানের অখণ্ডতায় তিনি নিষ্ঠাবান নন।

১৯৬৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু মার্কিন পলিটিক্যাল অফিসার এন্ড্রু আই কিলগোরের কাছে বলেছিলেন যে তাঁকে (মুজিবকে) হত্যার জন্য দুজন আততায়ীকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ঢাকা থেকে ১৯৬৮ সালের ২৬ জুন কিলগোর কেন মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় দণ্ড দেওয়া হতে পারে তার কারণ বিশ্লেষণ করে ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিলেন।

কিলগোর লিখেছিলেন, মুজিব একজন আন্দোলনপ্রবণ জাতীয়তাবাদী। তাঁর রয়েছে আইনবহির্ভূত রাজনৈতিক কার্যক্রমের দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৩৯-৪১ সালে তিনি যদিও একজন ছাত্র ছিলেন কিন্তু ওই সময়ে কলকাতার ‘ব্ল্যাক হোলে’ নিহতদের স্মরণে গঠিত স্মৃতিসৌধ অপসারণের জন্য যে আন্দোলন হয় মুজিব ছিলেন তার অন্যতম নেতা।

উল্লেখ্য, ১৭৫৬ সালে ফোর্ট উইলিয়ামের ‘ব্ল্যাক হোল’ কারাগারে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্যরা শতাধিক ব্রিটিশ সৈন্যকে বন্দী করেছিল। পরে তাদের লাশ পাওয়া যায়। এদের স্মরণে ওই স্মৃতিসৌধ হয়েছিল।

কিলগোর লিখেছেন, ‘কলকাতায় মুজিব ছিলেন ‘রশীদ আলী’ উপদলের নেতা। এই উপদলটি সাবেক ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সদস্যদের নিয়ে গঠিত। যাঁরা দেশভাগ এবং পাকিস্তান সৃষ্টি চেয়েছিলেন।’ উল্লেখ্য, কর্নেল রশীদ আলীর গ্রুপটি ব্রিটিশদের তাড়াতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছিল।

কিলগোরের বর্ণনায়, ‘বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা নিয়ে ঢাকার প্রথম আন্দোলন হয়েছিল। সেটা ছিল ১৯৪৮ সালের মার্চ। আর মুজিব ছিলেন ওই আন্দোলনের নেতা। ১৯৪৯-৫৪ সালে মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ যে সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে মুজিব ছিলেন এর অন্যতম সংগঠক। পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের প্রতি মুজিবের গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আবেগতাড়িত অঙ্গীকার রয়েছে। সে কারণে তিনি অব্যাহতভাবে পাকিস্তান সরকারের নিপীড়ন সয়েছেন। সুতরাং মনমানসিকতা এবং আদর্শগতভাবে পূর্ব পাকিস্তান সরকার উৎখাতে তাঁর সামর্থ্য রয়েছে।’

কিলগোর মন্তব্য করেন, ‘তাই এটা সন্দেহ করার কারণ রয়েছে যে মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছিলেন কিংবা সমর্থন দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগকেই তিনি স্বায়ত্তশাসন আদায়ের উপযোগী মনে করেছেন। প্রতীয়মান হয় যে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ মুজিবকে দণ্ড দেবে।’

১৯৫৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার মার্কিন কনসাল গিনি ক্যাপ্রিও লিখেছেন, প্রাদেশিক সাবেক পাঁচ মন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হলো। তাঁরা জামিনে ছাড়াও পেলেন। কিন্তু আটকে রাখা হলো মুজিবকে। ২০ অক্টোবর ১৯৫৮ থেকে মুজিব বন্দী। অনেকেই ভাবেন যে সরকার যেকোনো বাঙালি রাজনীতিকের চেয়ে মুজিবকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। বিনা বিচারে তাই তাঁকে জেলে রাখা হয়। মার্কিন কনস্যুলেট মনে করেন যে একজন বাঙালি জাতীয়তাবাদী হিসেবে মুজিবের শক্তিশালী আবেদন রয়েছে। এটা সোহরাওয়ার্দী ও আতাউর রহমান খানের সঙ্গে তুলনীয়। কিন্তু সাংগঠনিক সামর্থ্য এবং দলীয় কর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয়তার দিক থেকে মুজিবই সেরা। তাই পাকিস্তান সরকারের চোখে সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি শেখ মুজিবুুর রহমান।

১৯৬৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মার্কিন কনসাল মিসেস ডরিস মেটকাফ লিখেছেন, সোহরাওয়ার্দীর স্বর্ণযুগে ১৯৫৫ সালের অক্টোবরে আওয়ামী মুসলিম লীগ মুসলিম শব্দটি ফেলে দিয়ে আওয়ামী লীগ নাম ধারণ করে। ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক নীতি গ্রহণ করে। এই আওয়ামী লীগই উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে সরকারি ভাষা করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। মুজিবই ছিলেন সে আন্দোলনের প্রধান নেতা।

১৯৬৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মার্কিন কনসাল লিখেছিলেন, ‘মুজিব একজন সত্যিকারের “মাটির সন্তান” হিসেবে বেড়ে উঠেছিলেন। দেশভাগের পরে মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘটগুলোর নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করেন। এসব কারণে ঢাকার আইন স্কুল থেকে মুজিবকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।’

১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মার্কিন কনসাল স্কয়ার্স ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান কনস্যুলেটের একজন কর্মকর্তাকে বলেছেন, তিনি পিন্ডি যাচ্ছেন। তবে যাওয়ার আগে ২২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে তিনি বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে নিহত ছাত্রদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনার এবং সাম্প্রতিক কালে নিহত ছাত্রদের সমাধিস্থল আজিমপুরে যাবেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি রাওয়ালপিন্ডি যাচ্ছেন। ওই কূটনীতিক তখন মুজিবকে জিজ্ঞেস করেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কি তাহলে শেষ হয়ে যাচ্ছে? দৃপ্ত মুজিব পুনঃ পুনঃ বলেন, শেষ শেষ।

সংশোধনী: ভাসানীর নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় ৩১ জানুয়ারি ১৯৫২। গতকাল ভুলক্রমে তা ২১ ফেব্রুয়ারির পরে গঠিত হয় বলে ছাপা হয়েছে।

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/152425/%E0%A6%AE%E0%A7%8
1%E0%A6%9C%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%95%E0%A7%87_%E0%A6%A6%E0%A6%A3%E0%A
7%8D%E0%A6%A1_%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%87_%E0%A6%9A%E0%A7%87%
E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%9B%E0%A6%BF%E0%A6%B2_%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%
95%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%A8



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:02 Mar 2014 -- 07:04 PM

Enter Bangladesh
Potato seal used to issue permit in 1971

Staff Correspondent
"Entry Bangladesh, 3/4/71" is handwritten on a page in a French passport that has been submitted to the Liberation War Museum to be preserved as a relic of the then East Pakistan's glorious struggle for freedom.

Eight months before the nation won its war for independence, French journalist Philippe Alfonsi got the entry permit from freedom fighters in Chuadanga district. He presented the document to the museum in Dhaka yesterday.

French journalist Philippe Alfonsi, showing his passport containing a Bangladesh visa, Photo: Palash Khan
French journalist Philippe Alfonsi, showing his passport containing a Bangladesh visa, Photo: Palash Khan
The seal of approval only reflects their farsightedness and that they believed in winning the war against the Pakistanis and establishing an independent country to be called Bangladesh, said Alfonsi, 75, at a press conference at the museum in the capital's Segunbagicha.

"This visa proves how organised the freedom fighters were while fighting the war. Even then they were aware of their duties and responsibilities as people of an emerging nation."

Senior war correspondent Alfonsi along with cameraperson Philippe Dumiz and sound recordist Jean Henaff had come to cover the conflict in erstwhile East Pakistan on an assignment from the French TV channel, "Première Information".

The journalists followed the line of refugees, who were entering India in millions, in the opposite direction towards Chuadanga.

After they had witnessed bombing and machine-gun attacks from Pakistani airplanes, they took shelter inside a bunker where the French people met the freedom fighters, Alfonsi said.

The seal consists of two circles, one inside another, with a hand-drawn map of Bangladesh at the centre. "Dakhsin Paschimanchal (southwest)" and "Chuaganda" are written between the two circles.

The words were probably inscribed on a piece of potato, which was used as the seal, Alfonsi said.
The footage that Alfonsi and his colleagues collected during their three week-stay in the southwest region later opened the eyes of the people of France as well as that of the entire Europe to the reality of the war and helped create a public opinion in favour of East Pakistan's struggle for independence, said Kazi Enayet Ullah, president of France-Bangladesh Economic Chamber.

Theatre activist Prokash Roy came across some 200 minutes of footage on the 1971 Liberation War in France's television archive Ina, while working for a thesis paper for his coursework in 2010.

Enayet provided Prokash with all logistics to collect the footage taken by Alfonsi and another French journalist Alain Cances. While looking for the two journalists, they came to know that Cances had already passed away a few years ago.

Prokash later used the footage in making a documentary named "Bangladesh: the Birth of a Flag".
Receiving Alfonsi's passport, Ziauddin Tariq Ali, trustee of the museum, reminisced about how the people of France, including former president François Mitterrand, had supported Bangladesh though their government had sided with Pakistan.

Because of space limitation, the museum can only display 10 percent of its 13,000 relics, he said, adding it would be shifted to a new location in Agargaon next year and then all the museum's treasures can be exhibited.

Published: 12:01 am Sunday, March 02, 2014
http://www.thedailystar.net/backpage/enter-bangladesh-13629


Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:03 Mar 2014 -- 03:13 PM

ফিলিপ আলফঁনসির বাংলাদেশ অভিযান
ইকবাল হোসাইন চৌধুরী | আপডেট: ০০:৫০, মার্চ ০১, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ


মূল রচনা: একাত্তর এখনো জীবন্ত তাঁর ভিডিও প্রতিবেদনে। পড়ুন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ফ্রান্সের এক বর্ষীয়ান টিভি সাংবাদিকের অনন্য অভিজ্ঞতার কথা

ফিরে দেখা ১৯৭১, বাংলাদেশের একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত গ্রামে তরুণ ফরাসি সাংবাদিক ফিলিপ আলফঁনসি‘আপনার পাসপোর্টে মুক্তিযোদ্ধাদের সিল দেওয়ার ঘটনাটা কি আরেকবার বলবেন?

‘শুনেছি, একটা আলু কেটে বানানো হয়েছিল সেই সিলটা।’

মুক্তিযোদ্ধাদের সিলসহ সেই পাসপোর্টফিলিপ আলফঁনসিকে নাগালে পেতেই প্রথম প্রশ্ন। ফ্রান্সের নামজাদা এই সাংবাদিক ও প্রযোজক ইংরেজি জানেন না। অথবা যেটুকু জানেন, সেটা ব্যবহার করতে চান না। তিনি উত্তর দিলেন চোস্ত ফরাসিতে। আমাদের ভাষার সমস্যা সমাধান করতে দোভাষীর দায়িত্বটা নিলেন তথ্যচিত্র নির্মাতা প্রকাশ রায়।

‘হ্যাঁ, সেটা ছিল এপ্রিল মাস। আমি তখন কলকাতায়। শরণার্থীদের পথ ধরে আমি যাচ্ছিলাম। প্রথম যে জায়গাটায় রিপোর্ট করতে গিয়েছিলাম, সেটা ছিল চুয়াডাঙ্গার একটি জায়গা। ওই জায়গায় কিছু সময় আগে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। এক দল মুক্তিযোদ্ধা আমাকে বললেন, বাংলাদেশে ঢুকতে হলে পাসপোর্টে স্বাধীন বাংলাদেশের ভিসা লাগবে। তাঁরা আমার পাসপোর্টে সত্যি সত্যি একটা সিল দিয়ে দিলেন। যতদূর মনে পড়ে, একটা আলু কেটে সেই সিলটা বানানো হয়েছিল।’

পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণের মুখে পালাচ্ছে মানুষআলফঁনসির সেই পাসপোর্টের গল্পে আমরা আবার ফিরে আসব। তার আগে চলুন ফিরে যাই আলফঁনসির ক্যারিয়ারের শুরুতে। ১৯৭১ সালে তরুণ সাংবাদিক আলফঁনসি কাজ করছিলেন ফ্রান্সের একমাত্র টিভি চ্যানেলে। টিভি চ্যানেলটির পুরোভাগে ছিলেন ফ্রান্সের টিভি সাংবাদিকতার ইতিহাসে খ্যাতিমান দুই নাম—পিয়ের দেসগ্রপস ও পিঁয়ের দুমত। পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশ) পাঠানোর জন্য আলফঁনসিকে বেছে নেওয়ার কারণ ছিল তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার বছর দেড়েক আগে একবার এই ভূখণ্ডে এসেছিলেন আলফঁনসি।

‘আমাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মানে যেটাকে পাকিস্তানিরা স্রেফ “বিদ্রোহ” বলে প্রচার করছিল, সেটা আসলেই জনযুদ্ধ কি না। পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ আসলেই পাকিস্তানিদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে কি না সেটা দেখা।’

আলফঁনসি কী দেখেছিলেন? উত্তর মিলবে তাঁর সেই সময়ে ধারণকৃত ভিডিওচিত্রগুলো থেকে, যেখানে শুরুতেই আমরা দেখি, বিকট শব্দে একের পর এক উড়ে যাচ্ছে বোমারু বিমান। মানুষ ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। একাত্তর সেখানে পুরোপুরি হাজির।
মুক্তিযুদ্ধের এসব দুর্লভ ভিডিওচিত্র হয়তো আমাদের অদেখাই থেকে যেত। কিন্তু...

মুক্তিযোদ্ধাদের একটি প্রশিক্ষণ শিবিরএকটি পতাকার জন্ম
বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গলের ছেলে প্রকাশ রায়। তিনি নাটক করেন, থিয়েটার করেন। কাজ করেছেন তারেক মাসুদ পরিচালিত অন্তর্যাত্রা ছবিতেও।
২০০৪ সালে প্রকাশ চলে যান প্যারিস। সেখানে গিয়ে নাম লেখান নাটকের দলে। চলচ্চিত্রবিষয়ক কোর্সের অংশ হিসেবে তিনি তৈরি করেন তাঁর প্রথম তথ্যচিত্র অনিশ্চিত যাত্রা। সেই ছবির কাজ করতে গিয়েই প্রকাশ সন্ধান পান এক অমূল্য ‘স্বর্ণখনি’র। ১৯৭১ সালে ফরাসি সাংবাদিকদের ধারণ করা প্রায় দুই ঘণ্টার ভিডিওচিত্র! প্রথম দেখাতেই প্রকাশ বুঝেছিলেন, এই ভিডিওচিত্র বাংলাদেশে অদেখা। সেটা পুরোপুরি নিশ্চিত হলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হককে ওগুলোর অংশবিশেষ দেখানোর পর।

রণাঙ্গনে মুক্তিসেনাপ্রকাশ ঠিক করলেন, যে করেই হোক এই ভিডিওচিত্র তাঁকে পেতেই হবে। কিন্তু সেগুলো রক্ষিত আছে ফ্রান্সের জাতীয় মহাফেজখানায়। নিজে দেখার জন্য ভিডিওগুলোর অংশবিশেষ পাওয়া যায় বটে, কিন্তু অনুমতি ছাড়া সেগুলো চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা অসম্ভব। আর এগুলো চলচ্চিত্রে ব্যবহারের জন্য চাই বিপুল অঙ্কের ফি। সেই অঙ্কটা প্রকাশের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
‘একবার ভেবেছিলাম, আমার যা হয় হোক, ভিডিওগুলো আমি আমার ছবিতে ব্যবহার করবই। ওগুলো বাংলাদেশের মানুষকে দেখানোর জন্য আমাকে যদি জেলে যেতে হয়, তা-ও যাব।’ প্রকাশ বলছিলেন।

শেষ পর্যন্ত প্রকাশ রায় কী করতেন কে জানে। তবে তাঁকে জেলে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে হয়নি, কারণ কাজী এনায়েত উল্লাহ্। ফ্রান্স-বাংলাদেশ ইকোনমিক চেম্বারের সভাপতি তিনি। কাজী এনায়েত উল্লাহ্ এগিয়ে এলেন বাংলাদেশের অদেখা সেই দুর্লভ ভিডিওচিত্র উদ্ধারকাজে। শামিল হলেন এক নির্মাতার স্বপ্নপূরণের লড়াইয়ে। সেই ভিডিওচিত্রগুলো ব্যবহারের অনুমতি মিলল। কিন্তু কে হবেন বাংলাদেশ: একটি পতাকার জন্ম নামের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তথ্যচিত্রটির ‘নায়ক’। অবশ্যই ফ্রান্সের সেসব সাংবাদিকদের একজন, যাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে এসেছিলেন আমাদের এই ভূখণ্ডে।

প্রকাশ খুঁজলেন তাঁদের। অ্যালেন কঁসেসের নাম পাওয়া গেল। কিন্তু ভদ্রলোক জীবিত নেই। শেষ পর্যন্ত খোঁজ মিলল ফিলিপ আলফঁনসির।
অতঃপর আলফঁনসি আর বাংলাদেশ: একটি পতাকার জন্ম নামের চলচ্চিত্রকে বাংলাদেশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পালা।

ঢাকায় ফিলিপ আলফঁনসির সঙ্গে প্যারিসপ্রবাসী নির্মাতা প্রকাশ রায়, ছবি: কবীর শাহরীয়ারজাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে হাজির বহু সুধীজন। খানিক পরেই শুরু হবে বাংলাদেশ: একটি পতাকার জন্ম তথ্যচিত্রের উদ্বোধনী প্রদর্শনী। অতিথিরা মঞ্চে আসীন। মফিদুল হক পরিচয় করিয়ে দিলেন একজন ভিনদেশিকে। বয়স তাঁকে কাবু করতে পারেনি মোটেও। হলিউড অভিনেতা মাইকেল ডগলাসের স্টাইলে পেছনে আঁচড়ানো চুল। আপাদমস্তক ফ্যাশন-সচেতন একজন মানুষ। হ্যাঁ, তিনিই ফিলিপ আলফঁনসি। ছবি শুরুর আগ মুহূর্তে মাইক্রোফোনের সামনে এলেন এই ফরাসি। মিলনায়তনভর্তি মন্ত্রমুগ্ধ দর্শক শুনলেন এক ভিনদেশির বাংলাদেশ অভিযানের কাহিনি। খানিক পরেই পর্দা উঠল ছবির। সাদা-কালো ভিডিওচিত্রে খুব সহজে খুঁজে পাওয়া গেল তরুণ আলফঁনসিকে।
‘সামরিক শক্তির দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে ছিল পাকিস্তানি বাহিনী। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ছিল খুব দৃঢ। স্বভাবে তাঁরা ছিলেন শান্ত। যথেষ্ট শৃঙ্খলাও ছিল তাঁদের মধ্যে। তাঁদের দেখেছি সাধারণ মানুষজনকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ার কাজ করছিলেন। সাধারণ মানুষজনও পুরোপুরি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল তাঁদের।’

সেই দফায় ১৫ কি ২০ দিন আলফঁনসি ছিলেন বাংলাদেশে। ‘আমি যখন প্রতিবেদন সংগ্রহের পর কলকাতায় ফিরে যাই, তখন দেখি, অনেক সাংবাদিক সেখানে অপেক্ষমাণ। তাঁরা আমাকে রীতিমতো ছেঁকে ধরেছিলেন।’ বলছিলেন আলফঁনসি। তাঁর সেসব সাহসী প্রতিবেদন টেলিভিশনে প্রচারিত হওয়ার পর বিপুল সাড়া পড়ে যায় ফ্রান্সে।

সেই আর এই বাংলাদেশ
‘যতদূর মনে পড়ে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আমাদের দেশের মানুষের খুব পরিষ্কার ধারণা ছিল না। আমার প্রতিবেদনগুলো প্রচারের পর পাকিস্তানিদের বর্বরতা সবাই জানতে পারে। বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে তখন বড় ধরনের জনমত তৈরি হয়।’ মন্তব্য আলফঁনসির।
এবারে আলাপ পর্বের স্থান প্যানপ্যাসিফিক হোটেল সোনারগাঁও। সময় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেল চারটা।

আলফঁনসিকে আরেকটা প্রশ্ন, এত বছর পর বাংলাদেশকে আবার দেখলেন খুব কাছ থেকে। একাত্তর আর এখনকার বাংলাদেশের মধ্যে কোনো তফাত কি চোখে পড়ে?

আলফঁনসির ধূসর চোখ জোড়া নিশ্চল হয়ে রইল খানিক। কী যেন ভাবলেন, তারপর মুখ খুললেন সম্ভবত ভেবেচিন্তে।
‘আসলে এই অল্প দেখায় খুব বড় কিছু বলা অসম্ভব। তবে সেদিন গ্রামের দিকে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। মনে হলো, গ্রামগুলো ঠিক আগের মতোই আছে। কিন্তু ঢাকায় বড় বড় অনেক বিল্ডিং উঠে গেছে...’

বলতে বলতে আবার কী যেন ভাবেন আলফঁনসি।

হোটেল সোনারগাঁও থেকে আলাপ শেষে চলে আসব। বাংলাদেশের এই দুর্দিনের বন্ধুকে বলি, ‘একদিন আমাদের প্রথম আলো অফিসে আসুন। সবাই মিলে আমরা আপনার কথা শুনব। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক প্রকাশনাও আছে আমাদের। আসবেন?’
শুনেই হেসে উঠলেন আলফঁনসি। ‘আমি তো কাল চলে যাচ্ছি। তবে যেতে পারলে ভালো লাগতই।’

সে কারণেই বলতে হলো, এবারের মতো বিদায় হে ভিনদেশি বন্ধু।

আর হ্যাঁ, ওই যে মুক্তিযোদ্ধাদের সিল দেওয়া পাসপোর্ট, সেটা এখনো আছে আলফঁনসির সংগ্রহে। সেই পাসপোর্ট বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের কাছে তুলে দেওয়ার ইচ্ছে এই ফরাসি সাংবাদিকের। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, তারা এই পাসপোর্ট দেখবে। হয়তো ভাববে, সত্যসন্ধানী এক ফরাসি সাংবাদিক কী দুঃসাহসী একটা কাজই না করে গেছেন বাংলাদেশের জন্য!

http://www.prothom-alo.com/we_are/article/158032/%E0%A6%AB%E0%A6%BF%E0
%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%AA_%E0%A6%86%E0%A6%B2%E0%A6%AB%E0%A6%81%E0%A6%A8
%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%B0_%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6
%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6_%E0%A6%85%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0
%A6%BE%E0%A6%A8



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:03 Mar 2014 -- 04:47 PM

প্রতিরোধের মার্চ

বিলোনিয়ার প্রথম যুদ্ধ
মেজর জেনারেল ইমাম-উজ জামান, বীর বিক্রম | আপডেট: ০২:০০, মার্চ ০১, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ


স্বাধীনতাযুদ্ধের অনেক ইতিহাস এখনো অজানা। একাত্তরে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের নিজেদের কলমে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের দুঃসাহসী অভিযানগুলো। এসব লেখা নিয়ে প্রথমা প্রকাশন থেকে দ্রুতই প্রকাশিত হবে মুক্তির লড়াই: মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধাদের কলমে একাত্তরের গৌরবময় যুদ্ধগাথা শিরোনামে একটি গ্রন্থ। প্রকাশিতব্য এ গ্রন্থ থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু যুদ্ধের স্মৃতির চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো। আজ প্রকাশিত হলো বিলোনিয়া যুদ্ধের কথা:

মেজর জেনারেল ইমাম-উজ জামান, বীর বিক্রমবিলোনিয়া ফেনী জেলার (১৯৭১ সালে নোয়াখালী জেলার মহকুমা) দুটি থানা পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া নিয়ে গঠিত। বিলোনিয়াকে শত্রুমুক্ত করার জন্য একটি মিশ্র বাহিনী দিয়ে বিলোনিয়ার দক্ষিণাংশ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তর ১ নম্বর সেক্টরের নিয়মিত ও স্বল্পপ্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ব দিক থেকে এবং ২ নম্বর সেক্টরের নিয়মিত ও স্বল্পপ্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের পশ্চিম দিক থেকে বিলোনিয়ার দক্ষিণ মুখে প্রবেশ করার আদেশ দেওয়া হয়। এই দুটি সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা আগে থেকেই তাঁদের অবস্থানের আশপাশের এলাকাগুলোতে অপারেশন চালিয়ে আসছিলেন। পরিকল্পনা মোতাবেক ১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা একাত্তরের ১ জুন নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর তিনটি কোম্পানির সমন্বয়ে মেজর জিয়াউর রহমানের (বীর উত্তম, পরে লে. জেনারেল ও রাষ্ট্রপতি) নেতৃত্বে বিলোনিয়ার পূর্ব সীমান্তে চাঁদগাজীর সামান্য দক্ষিণ দিক দিয়ে বিলোনিয়াতে প্রবেশ করেন এবং আগের আন্তর্জাতিক সীমানা থেকে মুহুরী নদী পর্যন্ত প্রসারিতভাবে দক্ষিণ দিকে মুখ করে প্রতিরক্ষা অবস্থান গ্রহণ করেন। মুহুরী নদীর সংলগ্নে অবস্থান নেওয়া কোম্পানিটির নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন অলি আহমদ (বীর বিক্রম, পরে কর্নেল), মাঝের কোম্পানিটির নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান (বীর বিক্রম, পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল এবং জিয়া হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত) এবং সীমান্তসংলগ্ন কোম্পানিটির নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান (পরে মেজর)।

মেজর জিয়া চাঁদগাজীর নিকটবর্তী স্থানে সেক্টর সদর দপ্তর স্থাপন করেন। একই সময়ে ২ নম্বর সেক্টরের মক্তিযোদ্ধারাও চারটি কোম্পানিতে বিভক্ত হয়ে পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে নোয়াপুর-জাম্মুরা হয়ে বিলোনিয়াতে প্রবেশ করেন এবং পশ্চিমের আন্তর্জাতিক সীমানা হতে মুহুরী নদী পর্যন্ত দক্ষিণমুখী হয়ে তিন কোম্পানিকে সম্মুখে এবং এক কোম্পানিকে পেছনে রেখে প্রতিরক্ষা অবস্থান গ্রহণ করেন। আমার নেতৃত্বে ছিল মুহুরী নদীর সংলগ্ন সাধারণ এলাকা পূর্ব রশিকপুরে অবস্থানরত কোম্পানিটি। মাঝের কোম্পানিটির নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম (বীর বিক্রম, পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল), পশ্চিম দিকে আন্তর্জাতিক সীমান্তসংলগ্ন সাধারণ এলাকা জাম্মুরাতে অবস্থান নেওয়া কোম্পানিটির নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন গাফফার হালদার (বীর উত্তম, পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল) এবং পেছনের কোম্পানিটির নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম চৌধুরী (পরে মেজর)। মর্টার প্লাটুন পেছনের কোম্পানির নিকটবর্তী স্থানে রাখা হয়। ২ নম্বর সেক্টরের সার্বিক নেতৃত্বে ছিলেন মেজর এ জে এম আমিনুল হক (বীর উত্তম, পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)।

১৯৭১ সালের ৩ জুনের মধ্যে ১ ও ২ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধারা বিলোনিয়া অবস্থানের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। পরদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিলোনিয়ার সর্বশেষ ঘটনাবলি সম্পর্কে অবহিত হয় এবং বন্দুয়া-দৌলতপুর রেললাইন ও ছাগলনাইয়া থেকে উত্তর দিকে চলে যাওয়া রাস্তা বরাবর দুটি অক্ষে অগ্রসর হয়ে এক আকস্মিক আক্রমণ করার পরিকল্পনা করে। পাকিস্তানি বাহিনী অগ্রসর হওয়ার সময় ভেবেছিল যে তাদের সামনে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কিছু অপ্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা থাকতে পারে। যার জন্য তারা মানসিকভাবে খুব বেশি সতর্ক ছিল না। এই অসতর্কতার কারণেই তারা মুক্তিবাহিনীর ভারী মেশিনগান এবং প্রতিরক্ষায় অবস্থিত অন্যান্য অস্ত্রের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে যায়। মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান থেকে আসা অবিরত গোলাগুলির কবলে পড়ে ৬০ ও ৭০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হন। এতে শত্রুরা সহজেই বুঝতে পারে যে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানটি দুর্বল নয়, বরং দুই ব্যাটালিয়ন নিয়মিত ও স্বল্পপ্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা-সংবলিত একটি সুরক্ষিত প্রতিরক্ষা অবস্থান। শত্রুর অগ্রাভিযান অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় তারা পিছু হটে যায়। ১৯৭১ সালের ৭ জুন ভোরে উল্লিখিত দুটো অক্ষেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী অগ্রাভিযান পুনরায় শুরু করে। কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর তারা আবারও মুক্তিবাহিনীর গুলিবর্ষণের মুখে পড়ে এবং বাংলার দামাল সন্তানেরা পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ সফলতার সঙ্গে প্রতিহত করেন। এই অগ্রাভিযানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৫০ থেকে ৬০ জন সেনা নিহত হন। ৯ জুন পাকিস্তান সেনাবাহিনীও তাদের রণকৌশলে কিছুটা পরিবর্তন এনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষার সমগ্র সম্মুখভাগজুড়ে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করে। পাকিস্তানি এক ব্যাটালিয়নেরও বেশি সেনার এই প্রচেষ্টা সারা দিন ধরে চলে এবং ফেনী ও ছাগলনাইয়ার মধ্যবর্তী কোনো স্থানে অবস্থিত গোলন্দাজ বাহিনীর এক রেজিমেন্ট তাদের সাহায্যে নিয়োজিত ছিল। শত্রুর এ প্রচেষ্টাও মুক্তিবাহিনী ব্যর্থ করে দেয়। ইতিমধ্যে প্রতিরক্ষায় অবস্থানরত মুক্তিবাহিনী অনুভব করে যে প্রতিরক্ষা অবস্থানটি আরও শক্তিশালী করার জন্য এর সম্মুখভাগে কিছু মাইন বসানো প্রয়োজন। কাজেই একটি মাইন বেষ্টনী তৈরি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এম-১৬ মাইন সংগ্রহ করা হয় এবং প্রতিরক্ষা অবস্থানের সমগ্র সম্মুখভাগজুড়ে তিন-চার দিন সময় নিয়ে মাইন স্থাপন করা হয়। ১১ জুন পাকিস্তান সেনাবাহিনী পুনরায় মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায় এবং মুক্তিবাহিনী এককভাবে শত্রুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে তাদের আক্রমণ প্রতিহত করে দেয়। এভাবে পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানের ওপর ১১ বার নিষ্ফল আক্রমণ চালায়। তারা দিন-রাত মুক্তিবাহিনীর অবস্থানগুলোর ওপর অবিরাম গোলাবর্ষণ অব্যাহত রাখে। পরিশেষে শত্রুরা বুঝতে পারে যে এভাবে আক্রমণ করে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান ধ্বংস করা সম্ভব নয়।

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/158368/%E0%A6%AC%E0%A6%B
F%E0%A6%B2%E0%A7%8B%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0_%E0%A
6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A5%E0%A6%AE_%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A6%E
0%A7%8D%E0%A6%A7



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:03 Mar 2014 -- 04:51 PM

প্রতিরোধের মার্চ

শত্রুদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টিই ছিল লক্ষ্য
সিদ্দিকুল হক | আপডেট: ০২:৪২, মার্চ ০২, ২০১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাত্তরে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের নিজেদের কলমে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের নানা দুঃসাহসী অভিযানের বর্ণনা। এসব লেখা নিয়ে প্রথমা প্রকাশন থেকে শিগগিরই প্রকাশিত হবে মুক্তির লড়াই: মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধাদের কলমে একাত্তরের গৌরবময় যুদ্ধগাথা শিরোনামে একটি বই। প্রকাশিতব্য এ বই থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু যুদ্ধের স্মৃতির চুম্বক অংশ তুলে ধরা হচ্ছে। আজ ছাপা হলো ফুলবাড়ী গেরিলা অপারেশনের কথা।

ভারতের পানিঘাটা প্রশিক্ষণ শিবিরে প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হলো ফুলবাড়ীর একটা গ্রামে। এই গ্রামটিকে আমরা হাইড আউট বা গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে টহলরত পাকিস্তানি সেনাদের ওপর আক্রমণ করব। গ্রামটা ছিল পুরোপুরি পরিত্যক্ত। একদিন রাতে আমরা সেখানে পৌঁছালাম, পুরো দুই দিন গ্রামের আশপাশের এলাকাটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা হলো। দুই দিন পর ঠিক হলো ফুলবাড়ী গ্রামে আমরা অপারেশনে চালাব।

তখন জুন মাস। বর্ষা মৌসুম শুরু হয়েছে। ভোররাতে আমরা অন্য পাড়ায় নতুন ক্যাম্পে পৌঁছালাম, এ জায়গাটা আরও নিস্তব্ধ। কিন্তু জায়গাটির নাম জানতে পারিনি। মাত্র ১৫-১৬ বছর বয়সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম, তাই সব স্থানের নাম জানা সম্ভব হয়নি। পরে শুনেছিলাম এই পাড়াটিতে ১০-১২টি বাড়ি ছিল। বেশির ভাগ বাড়ির চালা নেই। অধিকাংশ ঘরের দেয়াল পড়ে গেছে। কিছু ঘর অক্ষত আছে।
আমাদের ক্যাম্প থেকে অপারেশনের স্থানটি ৮-১০ কিলোমিটারের মধ্যে। অপারেশনের জায়গাটি রেকি করার জন্য লোক পাঠানো হলো। রেকি দল ফিরে এল বেলা ওঠার পর। আমরা নাশতা সেরে নিয়ে আক্রমণের একটা পরিকল্পনা তৈরি করলাম। এবার শুরু হলো প্রস্তুতি। জায়গাটার একটা সম্ভাব্য নকশা আঁকা হলো, আর সেই মোতাবেক আক্রমণের ছক তৈরি হলো। সিদ্ধান্ত হলো যে আক্রমণ করে শত্রুসেনাকে বিপর্যস্ত করে দ্রুত সরে পড়তে হবে। রাতে আমরা অপারেশনে যাব। সন্ধ্যার পর পর খাওয়া-দাওয়া সেরে বিশ্রাম নিলাম, ফাঁকে ফাঁকে যে যার অস্ত্র আর গোলাবারুদ পরীক্ষার কাজটাও সেরে নিলাম। আমার ছিল একটা ভারতীয় এসএলআর, পুরো দলে দুটো মাত্র এই আধা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ছিল। গভীর রাতে রওনা হলাম, ভোর হওয়ার কিছু পরে অভিযান করার স্থানটিতে পৌঁছালাম।

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী নিজ নিজ অবস্থানে প্রস্তুত হলাম। এখন শুধু শত্রুর অপেক্ষা। আমাদের টার্গেট হচ্ছে একটা টহল দল। কারণ বড়সড় আক্রমণ করার মতো জনবল বা অস্ত্রবল কোনোটাই আমাদের ছিল না। তাই চোরাগোপ্তা হামলায় শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করে তাদের ওপর একটা মানসিক চাপ সৃষ্টি করাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। আমরা একটা পুকুরপাড়ের শেষ দিকে পজিশন নিই। একটা কাঁচা রাস্তা পশ্চিম দিক থেকে সোজা পূর্ব দিকে চলে গেছে। কিছুদূর আসার পর একটা সরু রাস্তা উত্তর দিকে চলে গেছে। উত্তরের রাস্তাটা পেরিয়ে ২০০-৩০০ গজ পরে রাস্তার দক্ষিণ পাশে অর্থাৎ আমার বাঁদিকে একটা পুকুর। আর কাঁচা রাস্তা থেকে পুকুরে যাওয়ার জন্য ছিল একটা ছোট রাস্তা। আর এই রাস্তার নিচেই আমাদের অবস্থান। পুকুরপাড়ের নিচ থেকেই শুরু হয়েছে জঙ্গল। আর আমাদের জন্য নিরাপদে সরে পড়ার আদর্শ ব্যবস্থা।

অপেক্ষার পালা শেষ হলো। দুপুরের কাছাকাছি সময়ে শত্রুদের দেখা মিলল। তারা ১০ জন, সঙ্গে দুজন সাইকেল আরোহী। সাইকেল আরোহী দুজন দলের আগে আগে সাইকেলে চড়ে আসছে। এই দুজনই গ্রামের সাধারণ লোক অথবা রাজাকার। কারণ তাদের কাছে কোনো অস্ত্র আছে বলে মনে হলো না। টার্গেট আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আমরা প্রস্তুত হয়ে আছি, শুধু নির্দেশের অপেক্ষা। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ ঘটল। চারপাশে ধোঁয়া আর ধুলোয় অন্ধকার। প্রথমে একটা তারপর আরও একটা। লক্ষ্য করলাম আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকা দলের একজন সাইকেল আরোহী নেই। দ্বিতীয় আরোহীর অবস্থানটা বোঝা যাচ্ছে না। রাস্তার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু পড়ে আছে, এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে না। এবার শুরু হলো গোলাগুলি। আমরাও তাদের জবাব দিতে শুরু করলাম। চলল সমানে সমান। এবার আমাদের মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্য আর যোদ্ধা যোদ্ধা ভাব দেখা গেল। অনেককে দেখলাম গোলাগুলির সময় মাঝেমধ্যে জায়গা বদল করছে, এ অবস্থা চলল প্রায় ঘণ্টা দুয়েক। তারপর কমান্ডারের নির্দেশে আমরা নিজ নিজ অবস্থান ত্যাগ করে ধীরে ধীরে পুকুরপাড়কে আড়াল করে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। আমাদের কাভার দেওয়ার জন্য যারা পেছনে ছিল তারাও একসময় আমাদের সঙ্গে যোগ দিল। গোলাগুলি এখন একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। আমরা দ্রুত সেই জায়গাটা ত্যাগ করলাম। একপর্যায়ে একটা গ্রামের ভেতর গিয়ে আমরা কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি করলাম। অভিযানের ফলাফল জানার জন্য দুজনকে পাঠানো হলো। তবে একসঙ্গে নয়, আগে-পিছে করে। আমরা অ্যাম্বুশ অবস্থান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার সরে এসেছি। ঘণ্টা দেড়েক পর আমাদের সহযোদ্ধা দুজন ফিরে এল। তাদের কাছ থেকে জানা গেল, রাস্তার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু জিনিস ছাড়া আর কোনো কিছুর আলামত সড়কের ওপর ছিল না। আমরাও আমাদের ক্যাম্পে ফিরে এলাম। সবাই ক্লান্ত, বেলা শেষ।

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/159034/%E0%A6%B6%E0%A6%A
4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%93%E0%A
6%AA%E0%A6%B0_%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%95_%
E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%AA_%E0%A6%B8%E0%A7%83%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%
9F%E0%A6%BF%E0%A6%87_%E0%A6%9B%E0%A6%BF%E0%A6%B2_%E0%A6%B2%E0%A6%95%E0
%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%AF



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:03 Mar 2014 -- 05:18 PM

Singing National Anthem
Independence Day world record likely
Tribune Report

At least 300,000 people would converge on the National Parade Ground on the day to sing the national anthem in a bid to set a new Guinness World Record

Cultural Affairs Minister Asaduzzaman Noor unveils the logo of the “Lakhho Kanthe Shonar Bangla” at a press conference in Bangladesh Shilpakala Academy yesterday
Photo- Nashirul Islam/Dhaka Tribune
Bangladesh is eyeing creation of a world record on singing the national anthem on March 26, the Independence Day.

At least 300,000 people would converge on the National Parade Ground on the day to sing the national anthem in a bid to set a new Guinness World Record, Cultural Affairs Minister Asaduzzaman Noor said at a press conference yesterday.

He was speaking after unveiling the logo of the programme. Information Minister Hasanul Haque Inu was present at the press briefing.

Both ministers expressed hope that everyone at educational institutions, upazila and district headquarters would join the chorus simultaneously.

The attempt is a bid to focus increasing patriotism among citizens.


See more at: http://www.dhakatribune.com/arts-amp-culture/2014/mar/03/independence-
day-world-record-likely#sthash.ysXutwa5.dpuf



Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:03 Mar 2014 -- 05:23 PM

আরিফ রহমান
ভাষাসৈনিক গোলাম আযম: একটি গোয়েবলসীয় প্রচারণার ব্যবচ্ছেদ
মার্চ ১, ২০১৪

একুশে ফেব্রুয়ারি। আমাদের আবেগের দিন, আমাদের গর্বের দিন। এদিন আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সালাম, রফিক, বরকতসহ সকল শহীদের আত্মত্যাগ। কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি আবদুল মতিন, গাজীউল হক, কাজী গোলাম মাহবুব, কামাল লোহানী প্রমুখ ভাষাসৈনিকদের অবদান। হৃদয়ের অর্ঘ্য দিয়ে বরণ করি, পুষ্পমণ্ডিত করে তুলি আমাদের প্রাণপ্রিয় শহীদ মিনার। কিন্তু এমন দিন এলেই যদি শোনেন এক কুখ্যাত রাজাকার, যার একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য তাকে নব্বই বছরের সাজা দিয়েছেন মাননীয় আদালত, তিনি ‘ভাষাসৈনিক’ সাজতে চাচ্ছেন, কেমন লাগবে শুনতে?

সেটাই কিন্তু করা হচ্ছে। এ প্রচারণা শুরু হয়েছিল সম্ভবত নব্বইয়ের দশকে। হঠাৎ করেই দেখা গেল, কিছু নামগোত্রহীন পত্রিকায় আসতে শুরু করল ‘ভাষাসৈনিক’ হিসেবে গোলাম আযমের নাম। ঢাকার দেওয়াল দেওয়ালেও জামায়াত-শিবিরের কিছু শ্লোগান দেখা যেতে শুরু করল– ‘ভাষাসৈনিক গোলাম আযম’। প্রথমদিকে কেউ তেমন গা করেনি। কিন্তু পরে যত দিন গেছে ততই গোয়েবলসীয় কায়দায় জাঁকিয়ে বসেছে এই প্রচারণা। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক–

“… ভাষা আন্দোলন নিয়ে আজ যারা বড় বড় কথা বলছেন, তাঁদের মনে রাখা উচিত ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন আবুল কাশেম ও অধ্যাপক গোলাম আযম। প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলীর সামনে সাহস করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে স্মারকলিপি পেশ করেছিলেন গোলাম আযম। অথচ ইতিহাস থেকে পরবর্তীতে তার নামটি মুছে ফেলা হয়েছে। দেশের বুদ্ধিজীবীরা তো অন্তত বলতে পারেন, “লোকটা খারাপ, তবে এ ভালো কাজটা ভালো করেছে (ভাষা আন্দোলন)। গোলাম আযমকে গালি দিয়ে হলেও তো তারা কথাটি বলতে পারেন। অথচ আজ ইতিহাস বিকৃত করে নতুন নতুন ভাষাসৈনিক সৃষ্টি করা হচ্ছে…।”

[জনকণ্ঠ, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১১]

কথাগুলো বলছিলেন জামায়াতের আমীর মকবুল আহমাদ, জামায়াত আয়োজিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক আলোচনা ও দোয়া মাহফিলে। জামায়াতের আমীরের এই বক্তব্য ছাড়াও প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে সারা শহর ছেয়ে যায় নিচের পোস্টারের মতো ভয়ঙ্কর সব পোস্টারে–

এছাড়াও দৈনিক ‘সংগ্রাম’ পত্রিকার বিভিন্ন লেখায় অহরহ গোলাম আযমকে ভাষাসৈনিক হিসেবে দাবি করা হয়। তারই একটি উদাহরণ–

গোলাম আযমের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও তাকে ভাষাসৈনিক দাবি করা হয়েছে বলিষ্ঠ কণ্ঠে–

এছাড়া জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের ওয়েবেও পাওয়া গেল একই উচ্চারণ–

১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর আমীর এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড গোলাম আযমকে নিয়ে বরাবরই বিভিন্ন প্রোপাগাণ্ডা শোনা যায় তার সমর্থক গোষ্ঠীর মুখে। এর মধ্যে সবচেয়ে রসালো প্রচারণাটি হচ্ছে গোলাম আযমকে ভাষাসৈনিক প্রমাণ করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। ফেব্রুয়ারি এলেই এই ইস্যু নিয়ে শুরু হয় রকমারি বাণিজ্য। আমাদের এই লেখার উদ্দেশ্য থাকবে সমস্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা যে, দাবিটির সত্যতা কতটুকু। সঙ্গে থাকবে এই বিষয় নিয়ে সমস্ত বিভ্রান্তি দূর করার বস্তুনিষ্ঠ প্রয়াস।

প্রথমে উপরে দেওয়া ছবিগুলোর দিকে তাকানো যাক। উপরের ছবিগুলো থেকে একটা কথা তো পরিষ্কার যে জামায়াত-শিবির এবং তাদের ঘরানার মিডিয়াগুলো প্রকাশ্যে প্রচার করে আসছে যে, গোলাম আযম ভাষাসৈনিক। এখন দেখা যাক ভাষা আন্দোলনে তিনি আসলে কী কী অবদান রেখেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।

প্রথমেই আমরা দেখি গোলাম আযমের নিজের জবানী। তার আত্মজীবনী ‘জীবনে যা দেখলাম’ বইটি ঘেঁটে পাওয়া গেল ভাষা আন্দোলনে তার অবদান নিয়ে বিশাল এক ফিরিস্তি। তিন খণ্ডের বইটির প্রথম খণ্ডের একাধিক অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে।

বিস্তারিত পড়ে জানা গেল, ১৯৪৮ সালের ২৭ নভেম্বর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এক সমাবেশে ভাষণ দেন। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা একটি মানপত্র পাঠ করে। ওই মানপত্রে বাংলা ভাষা নিয়েও কিছু দাবি জানানো হয়। মানপত্রটি পাঠ করেন ইউনিয়নের তৎকালীন সেক্রেটারি গোলাম আযম, যদিও এটি পাঠ করার কথা ছিল ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট অরবিন্দ বোসের। কিন্তু ভাষার দাবি-সম্বলিত মানপত্র একজন হিন্দু ছাত্রকে দিয়ে পাঠ করালে প্রধানমন্ত্রীর মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে এবং মুসলিম লীগ সরকার এ নিয়ে নানা প্রকার বিরূপ প্রচার শুরু করবে– এ আশংকা থেকেই একজন মুসলমান ছাত্র হিসেবে সেক্রেটারি গোলাম আযমকে সেটা পাঠ করতে দেওয়া হয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে অগ্রগণ্য ভাষাসৈনিক কামাল লোহানী বলেন–

‘‘গোলাম আযম ভাষাসৈনিক ছিলেন না। কখনওই ছিলেন না। স্বাধীনতাবিরোধীরা তাকে ওটা বানাতে চেয়েছে। এই অপপ্রচারের একটি লাগসই জবাব ভাষামতিন ভাই দিয়েছেন এভাবে। গোলাম আযমের পিঠে চড়ে আমার তখন ভাষার দাবির পোস্টার দেয়ালে লাগিয়েছি। আসল ঘটনা হল, গোলাম আযম তখন ডাকসুর জিএস ছিলেন। অরবিন্দ নামে একজন ভিপি। ঢাকায় আসবেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। ডাকসু থেকে বাংলা ভাষার দাবিতে তাকে একটা স্মারকলিপি দেওয়া হবে। কৌশলগত কারণে অরবিন্দকে বাদ দিয়ে গোলাম আযমকে দিয়ে স্মারকলিপিটি লিয়াকত আলী খানকে দেওয়া হয়েছিল। এটুকুই তার ইতিহাস। তারপর আর গোলাম আযম ভাষার লড়াইয়ের ইতিহাসে নেই।’’

অথচ গোলাম আযম তার বইয়ে লিখেছেন–

[পাঠক লাল কালিতে আন্ডারলাইন করা জায়গাগুলোর কথা খেয়াল রাখবেন, আমরা পরবর্তীতে এ নিয়ে আলোচনা করব।]

এরপর বইটিতে গোলাম আযমের মেমোরেন্ডাম পড়ে শোনানোর রগরগে বিবরণ–

এবার আপনাদের কাছে তুলে ধরছি সেই ঐতিহাসিক (!) মানপত্রের মূল কপিটির ভাষা-সংক্রান্ত অংশ–

…… We are happy to note that out Central Government, under your wise guidance, has given Bengali an honoured place. This is a step in the right direction which shall go a long way to further strengthen our cultural ties, with our brethren in West Pakistan. Interchange of thoughts and ideas and mutual understanding are essential if we have to develop a homogeneous and healthy national outlook. We have accepted Urdu as our Lingua Franca but we also feel very strongly that, Bengali by virtue of its being the official language of the premier province and also the language of the 62% of the population of the state should be given its rightful place as one of the state languages together with Urdu….

পাঠক, লক্ষ্য করবেন এখানে কোনো বলিষ্ঠ দাবি রাখা হয়নি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য। কোনো রকমে দায়সারাভাবে বাংলার কথা এসেছে। উর্দুকে আন্তর্জাতিক ভাষার মাধ্যম হিসেবে (Lingua Franca) মেনে নেওয়ার কথা এসেছে। আবার একথাও বলা হয়েছে ‘প্রধানমন্ত্রী’ নাকি বাংলাকে সম্মানজনক অবস্থান দিয়েছেন। অথচ বাংলাকে ওই মানপত্রে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিই জানানো হয়নি! কেবল করা হয়েছিল প্রাদেশিক সরকারি কাজকর্মের ভাষা করার। আর তাই প্রধানমন্ত্রী নিজের বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে কিছুই বলেননি (তার স্ত্রীর অনুরোধ সত্ত্বেও)।

গোলাম আযমের ভাষায়–

পাঠক লক্ষ্য করবেন, গোলাম আযম এমনই বক্তব্য দিয়েছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী তার সব দাবিদাওয়া সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করলেন। তার বক্তব্য শুনে খুশিতে টেবিল চাপড়ে দিলেন, আর ভাষার ব্যাপারে কিছুই বললেন না!

এবার আসুন একটু বিশ্লেষণী দৃষ্টি নিয়ে দেখি কয়েকটি পয়েন্ট। গোলাম আযম তার একই আত্মজীবনীতে অনেকবার বাংলা ভাষা নিয়ে আক্রমণাত্মক, বিদ্রুপাত্মক এবং প্রচণ্ড বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করেছেন। নিচে তা থেকে অল্প কয়েকটি উল্লেখ করা হল–

বাংলা ভাষায় আপনি, তুই, তুমি এসবের জন্য আলাদা আলাদা শব্দ থাকার ব্যাপারটা গোলাম আযমের পছন্দ হয়নি; তিনি এটাকে চিহ্নিত করেছেন ‘বিরাট সমস্যা’ হিসেবে–

মজার ব্যাপার হচ্ছে, নিজেকে ভাষাসৈনিক দাবি করলেও আপন নাতি-নাতনিদের কিন্তু তিনি বাংলা শিক্ষা দেননি। অবশ্য এ নিয়ে কিছুটা ‘মেকি’ আপসোসও আছে তার–

বিভিন্ন খ্যাতিমান বাংলাভাষী সাহিত্যিকের প্রতি তিনি ছড়িয়েছেন চরম বিদ্বেষ; বঙ্কিমচন্দ্রকে নিজের বইয়ে ‘ইসলামবিদ্বেষী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও তার অনেক জ্বালা। রবীন্দ্রনাথ নাকি ‘মুসলিম স্বার্থের বিরুদ্ধে’ ছিলেন, ছিলেন স্রেফ ‘পৌত্তলিক হিন্দু’ ইত্যাদি। তাই ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসীদের কাছে রবীন্দ্রনাথ গ্রহণযোগ্য হলেও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীদের কাছে তিনি হবেন সর্বদাই পরিত্যাজ্য–

বাংলা এবং বাঙালি জাতি নিয়ে বিদ্বেষ তার পরবর্তীকালের অনেক উক্তিতেই পাওয়া যাবে। যেমন, ১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসে তিনি বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা শ্লোগান ইসলাম ও পাকিস্তানবিরোধী’। তিনি সে সময় আরও বলেছিলেন, ‘‘বাঙালিরা কখনও জাতি ছিল না।’’

[দৈনিক পাকিস্তান, ১৩ এপ্রিল, ১৯৭০]

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বাংলা ভাষা আর বাঙালি জাতির প্রতি যার এত প্রেমের নমুনা, তিনি কেনই-বা প্রধানমন্ত্রীর সামনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দাবি করলেন?

আমাদের বুঝতে হবে সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ। তিনি নিজেই বলেছেন, তিনি সে সময়ের অনির্বাচিত জিএস ছিলেন এবং মানপত্র পড়ার বিষয়টি ছিল একটা আকস্মিক ঘটনা মাত্র। এমনকি তিনি সেই মানপত্র নিজে লিখেননি, লিখেছিলেন তৎকালীন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি আবদুর রহমান চৌধুরী। তারপর একটি কমিটি স্মারকলিপিটি চূড়ান্ত করে। সেদিন স্মারকলিপি পাঠ করা ছাড়া তার কাছে আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না। যদি তিনি তা থেকে বিরত থাকতেন কিংবা অনাগ্রহী হতেন, তাহলে সাধারণ ছাত্রদের হাত থেকে তাকে কেউ রক্ষা করতে পারত না। কারণ ছাত্ররা তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর ওপর মারাত্মক বিরক্ত ছিল।

প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, সেই বছরের মার্চেই কায়েদে আজম কার্জনে যখন বলে ওঠেন– “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”– তখনই সেখানকার ছাত্ররা “না, না” বলে প্রতিবাদ করে ওঠে। ধীরে ধীরে এটা হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণের দাবি। কাজেই ছাত্রদের জনপ্রিয় দাবি অস্বীকার করা কিংবা এড়িয়ে যাবার মতো সাহস বা সুযোগ কোনোটাই গোলাম আযমের সেদিন ছিল না।

আর তাই ছাত্র প্রতিনিধি হয়ে গোলাম আযম যতটা সম্ভব বাধ্য হয়েই ‘যথেষ্ট নম্র ভাষায়’ এই দাবি প্রকাশ করেছিলেন, যদিও উর্দুকেই মনেপ্রাণে রাষ্ট্রভাষা মনে করতেন গোলাম আযম। তিনি ভাষাসৈনিক মোটেই নন। সে সময়কার ঘটনা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আবদুল গাফফার চৌধুরী তার একটি সাম্প্রতিক কলামে বলেছেন–

‘‘১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার আগে পর্যন্ত ১৫ মার্চ ছিল ভাষা আন্দোলন দিবস। এই আন্দোলনে কাজী গোলাম মাহবুব, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ সকলকেই গ্রেফতার বরণ করতে হয়েছে। আবদুল মতিনকে হুলিয়া মাথায় করে আন্ডারগ্রাউন্ডেও পালিয়ে থাকতে হয়েছে। মূখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের ভাষার দাবির স্মারকলিপি নিয়ে গিয়েছিলেন সলিমুল্লাহ হলের ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন ভিপি আবদুর রহমান চৌধুরী (পরে বিচারপতি হয়েছিলেন)। তাকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের এই প্রথম পর্যায়েও গোলাম আযমকে কোথাও দেখা যায়নি। তাকে গ্রেফতার হতে হয়নি। ভাষা আন্দোলনকারীদের সচিবালয় ঘেরাও বা রাজপথের মিছিলেও গোলাম আযমকে দেখা যায়নি। ১৫ মার্চের ভাষা দিবস উদযাপনের কোনো বছরের সভায় তাকে দেখা যায়নি। ভাষা সংগ্রাম কমিটিতেও (কেন্দ্রীয় অথবা ছাত্র কমিটি) তার নাম দেখা যায় না। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আরোপিত ১৪৪ ধারা ভাঙার জন্য ভাষা আন্দোলন সংযুক্ত প্রবীণ ও নবীন নেতাদের কোনো গোপন ও প্রকাশ্য সভাতেই তাকে অংশ নিতে দেখা যায়নি। তাহলে তিনি ভাষাসৈনিক হলেন কীভাবে? কেবল ১৯৪৮ সালে লিয়াকত আলীর ঢাকা সফরের সময় এক্সিডেন্টালি একটি মানপত্র পাঠ দ্বারা ভাষাসংগ্রামী, ভাষাসৈনিক হয়ে গেলেন? ইতিহাস বিকৃতি এবং মিথ্যা দাবি করারও একটা সীমা থাকা দরকার।’’

উপরের আলোচনা থেকে তাহলে আমরা এখন কিছু সিদ্ধান্তে আসার মতো জায়গায় পৌঁছুতে পারছি–

১. প্রধানমন্ত্রীর সামনে পাঠ করা মানপত্রটি গোলাম আযম নিজের হাতে লিখেননি।

২. তার ভাষায়, এই মানপত্র পাঠ করা ছিল একটা আকস্মিক ব্যাপার এবং স্বাভাবিক অবস্থায় এই মানপত্র তার নিজের পড়ার কথা নয়, এটা তিনি একটা বিশেষ ‘সিচুয়েশনে’ পড়েছিলেন মাত্র।

৩. মানপত্রটি পাঠ করার কথা ছিল ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট অরবিন্দ বোসের।

৪. তার আগেই (মার্চেই) জিন্নাহের সামনে ছাত্ররা ভাষার দাবিতে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানায়।

৫. গোলাম আযম ভাষার প্রশ্নে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি; ফলে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।

৬. বাংলাকে ওই মানপত্রে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়নি; দাবি করা হয়েছিল প্রাদেশিক সরকারি কাজকর্মের ভাষা করার।

সবশেষে আমরা দেখব ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়গুলোতে গোলাম আযমের ভূমিকা।

১৯৭০ সালের ২০ জুন একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকার পঞ্চম পৃষ্ঠায়। “বাংলা ভাষার আন্দোলন করা ভুল হইয়াছে” শিরোনামের সেই লেখায় গোলাম আযমের বক্তব্য প্রকাশিত হয়। দেখুন তার বক্তব্য–

সেই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়–

“বাংলা ভাষা আন্দোলন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ থেকে মোটেই সঠিক কাজ হয়নি।”

[দৈনিক আজাদ, ২০ জুন, ১৯৭০]

এখানেই শেষ নয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর প্রথম দিকেই আমাদের শহীদ মিনারটি গুঁড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন আমাদের ‘ভাষাসৈনিক’ গোলাম আযম। তার বরাত দিয়ে মুখপাত্র দৈনিক ‘সংগ্রাম’ খবর প্রকাশ করে ১৬ জুলাই। “ইতিহাস কথা বলে” শীর্ষক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল–

‘‘আইয়ুব খানের গভর্নর আজম খান ছাত্রদের খুশি করার জন্য যে শহীদ মিনার তৈরি করলেন তাকে পূজামণ্ডপ বলা যেতে পারে কিন্তু মিনার কিছুতেই নয়। যাহোক, সেনাবাহিনী সেই কুখ্যাত মিনারটি ধ্বংস করে সেখানে মসজিদ গড়ে শহীদদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন জেনে দেশবাসী খুশি হয়েছে।’’

[দৈনিক সংগ্রাম, ১৬ জুলাই, ১৯৭১]

কাজেই গোলাম আযম কোনোক্রমেই ভাষাসৈনিক নন। তিনি একজন যুদ্ধাপরাধী। এভাবে তাকে পরিচিত করানোরে ব্যাপারটি আসলে তাকে মহিমান্বিত করার জামায়াতি অপকৌশল মাত্র।

http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/15515


Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:03 Mar 2014 -- 05:38 PM

অভিজিৎ রায় ও আরিফ রহমান
কাদের মোল্লার আসল নকল: একটি নির্মোহ অনুসন্ধান
ডিসেম্বর ২৩, ২০১৩

যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়েছে। এটা আমাদের জন্য একটা বিরাট অর্জন, বলাই বাহুল্য। এবারের বিজয় দিবস এবং সেই সঙ্গে নতুন বছরের আগমনটাই যেন ভিন্নমাত্রায় পৌঁছে গেছে এই অর্জনের ফলে। যুদ্ধাপরাধী রাজাকার-আলবদরদের বিচারের যে আকাঙ্ক্ষা একটা সময় আমাদের রক্তে শিহরণ তুলত, একটা অপ্রাপ্তির বেদনা গ্রাস করে ফেলত বছর খানেক আগেও, সেটা থেকে যেন আমরা মুক্তি পেয়েছি।
অন্তত একজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছি নানা ধরনের বিতর্ক, প্রতিবন্ধকতা, বিশ্বমোড়লদের তরফ থেকে দেওয়া আন্তর্জাতিক চাপ সবকিছু অগ্রাহ্য করে। এটা যে কত বড় অর্জন তা বোধহয় আমরা কেউ বুঝতে পারছি না। এই দিনটা দেখার স্বপ্ন আমরা বুকের মধ্যে লালন করেছিলাম বহুদিন ধরে।

কিন্তু আমরা কী দেখলাম? কাদের মোল্লার ফাঁসির পর বাংলাদেশের আপামর জনগণ যখন আনন্দোচ্ছ্বাস করছে, ঠিক তখনই এক মুখচেনা মহল সারা দেশে শুরু করেছিল সহিংসতা আর নৈরাজ্যের বিস্তার। জ্বালাও-পোড়াও, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর আক্রমণ, বিচারকদের বাসায় বোমাবাজি সবই শুরু হল পুরোদমে। পাশাপাশি আরেকটা কাজও জামাতিদের তরফ থেকে করার প্রচেষ্টা চালানো হল– যেটা তারা সবসময়ই করে থাকে– বিভ্রান্তি ছড়ানো।

সত্য যখন উন্মোচিত আর দিনের আলোর মতো উদ্ভাসিত, বিভ্রান্তি আর মিথ্যে প্রচারণা– এটাই বোধহয় একমাত্র অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায় তখন। সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর চাঁদে সাঈদীর মুখচ্ছবি দেখা নিয়ে কী প্রচারণাটাই না চালানো হয়েছিল। অথচ পুরোটাই ছিল ফটোশপে এডিট করা খুব কাঁচা হাতের কাজ। যারা নিজেদের ধর্মের একনিষ্ঠ সেবক মনে করেন, তাদের সাচ্চা সৈনিকেরা এভাবে ফটোশপে ছবি এডিট করে যাচ্ছেতাই প্রচারণা চালায়-– ভাবতেও হয়তো অনেকের অবাক লাগবে।

কিন্তু যারা এই গোত্রটির কাজকর্মের নাড়ি-নক্ষত্রের হদিস জানেন, তারা অবাক হন না। শাহবাগ আন্দোলন শুরুর সময় একে কলঙ্কিত করতে নানা ধরনের রগরগে ছবি জোড়াতালি দিয়ে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছিল-– ‘প্রজন্ম চত্বর’ নাকি আসলে ‘প্রজনন চত্বর’। ওখানে নাকি রাত্রিবেলা গাঁজা খাওয়া হয়, ফ্রি সেক্স হয়, তরুণীরা সেখানে গেলেই ধর্ষিত হতে হয়, আরও কত কী।

কী না করেছিল তারা! মুম্বাই মেডিকেলের স্ক্যান্ডালের ছবির সঙ্গে ইমরান এইচ সরকারের চেহারা জোড়া দেওয়া, শাহবাগের জমায়েতে নাইট ক্লাবের নগ্নবক্ষা নারীর ছবি কাট অ্যান্ড পেস্ট করে লাগিয়ে দিয়ে ফেসবুকে ছড়ানো, নামাজরত এক পাকিস্তানি পুলিশকে শিবিরের কর্মী হিসেবে চালিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে প্রতীকী রশি নিয়ে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবি সম্বলিত ছবির শিরোনাম বদলে ‘ফাঁসির অভিনয় করতে গিয়ে শাহবাগে যুবক প্রাণ হারাল’ টাইপ মিথ্যে নিউজ তৈরি করা-– কোনো কিছুই বাদ যায়নি।

মুক্তমনা ব্লগে আমাদের সতীর্থ দিগন্ত বাহার ‘কথিত ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামীর মিথ্যাচার সমগ্র’ শিরোনামের পোস্টে খুলে দিয়েছিলেন তাদের মিথ্যের মুখোশ; লিঙ্কটি পাঠকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া গেল:

http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=33825

কাদের মোল্লার ফাঁসির পরেও নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানো হবে তা আগেই বোঝা গিয়েছিল। ফাঁসির আগে থেকেই কাদেরের তথাকথিত ‘অ্যালিবাই’ উপজীব্য করে ছড়ানো হয়েছিল মিথ্যে। কাদের ট্রাইব্যুনালকে বলেছিল:

“আজ এই কোরআন শরীফ হাতে নিয়ে আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, ১৯৭১ সালে মিরপুরে কসাই কাদের কর্তৃক যেইসব হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল তার একটি অপরাধের সঙ্গেও আমার দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। কাদের মোল্লা বলেন, আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি আমি ১৯৭৩ সালের আগে কোনোদিন মিরপুরেই যাইনি।”

এই অ্যালিবাইকেই সত্য ধরে নিয়ে অনেকে জল ঘোলা করছেন। কিন্তু এটাই কি স্বাভাবিক নয় যে কাদের মোল্লার মতো এত বড় একটা পাষণ্ড এবং ঠাণ্ডা মাথার খুনি এ ধরনের অ্যালিবাই হাজির করেই নিজেকে আত্মরক্ষা করতে চাইবে? তার তো এটাই বলার কথা যে ঘটনার সময় সে ঘটনাস্থলে ছিল না।

এ নিয়ে সম্প্রতি ব্লগার নিঝুম মজুমদার কিছু গবেষণা করেছেন। মুক্তমনায় প্রকাশিত তার দি কিউরিয়াস কেইস অব কাদের মোল্লা এবং সাক্ষী মোমেনা শিরোনামের লেখাটি থেকে জানা যায়, এই কাদের মোল্লার একসময়ের সবচাইতে বড় ইয়ার দোস্ত ‘আক্তার গুণ্ডা’ ছিল কাদের মোল্লার মতোই এক ভয়াবহ খুনি। কাদের মোল্লা এই আক্তার গুণ্ডার সঙ্গে মিলেই মূলত ১৯৭১ সালে মিরপুরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল।

১৯৭২ সালের দালাল আইনে এই আক্তার গুণ্ডার বিচার হয় এবং বিচারে তার ফাঁসিও হয়। মজার ব্যাপার হল, এই আক্তার গুণ্ডাও আজ থেকে ৪০ বছর আগে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে সেই একই ধরনের অ্যালিবাই হাজির করেছিল যে, সে ঘটনাস্থলে ছিল না, ছিল পাকিস্তানে। গণহত্যার সে কিছুই জানে না [‘আক্তার গুণ্ডা ভার্সেস বাংলাদেশ রায়’ দ্র:]।

কিন্তু কেউ এ ধরনের ‘ভেজা বিড়াল’ সাজতে চাইলেই যে সেটা ঠিক তা তো নয়। বহু চাক্ষুষ সাক্ষীই আক্তার গুণ্ডার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিল এবং সে দোষী প্রমাণিত হয়েছিল।

কাদের মোল্লাও বিয়াল্লিশ বছর পরে তার প্রিয় গুণ্ডা বন্ধুর মতোই অ্যালিবাই হাজির করতে গিয়ে বলেছে, সে কস্মিনকালেও মিরপুরে যায়নি, গণহত্যা তো কোন ছাড়! এমন একটা ভাব যে, কাদের মোল্লা ভাজা মাছটিও উল্টে খেতে জানে না। সহজ সরল এক ভালো মানুষকে যেন ‘কসাই কাদের’ ভেবে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

একই কাজ তারা অন্য আসামির বেলায়ও করেছে। এই ‘সাকাচৌ’ সেই সাকা চৌধুরী নয়, সে ছিল পাকিস্তানে। এই দেলু রাজাকার সেই ‘দেইল্যা’ নয়। একই ধারাবাহিকতায় এখন বলছে, এই কাদের মোল্লা সেই কসাই কাদের নয়। কিন্তু তাদের এই কথা ঠিক কতটুকু যৌক্তিক– এই প্রবন্ধে আমরা সেটা পুংখানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দেখব।

একাত্তরে কাদের মোল্লার মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার ব্যাপারটা বহুভাবেই আসলে প্রমাণ করা যায়। শুরু করা যাক ইন্টারনেটে পাওয়া একটি বহুল প্রচারিত ছবি দিয়ে, যেখানে নিয়াজীর পেছনে আশরাফুজ্জামান এবং কাদের মোল্লাকে দেখা যাচ্ছে। আশরাফুজ্জামান বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে মূল ভূমিকা পালন করেছিল, বর্তমানে ব্রিটেনে পলাতক আলবদর নেতা মুঈনুদ্দীনের সঙ্গে মিলে। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান খ্যাত ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে তারা। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মুঈনুদ্দীনের সঙ্গে আশরাফুজ্জামান খানেরও ফাঁসির আদেশ হয়েছে সম্প্রতি। সেখানেই বীরদর্পে কাদের মোল্লা দণ্ডায়মান। মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধ কোষ’ বইয়ে ছবিটির হদিস পাওয়া যায়। ইউটিউবেও এর একটি ভিডিও আছে।

সেই বিয়াল্লিশ বছর আগের ছবিটির কথা যদি আমরা বাদও দিই, আজকের দিনের প্রসঙ্গ গোণায় ধরলেও, কাদের মোল্লার পরিচয় গোপন থাকে না। তার ফাঁসির পর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান বলেছেন–
“১৯৭১ সালের ঘটনার বিয়াল্লিশ বছর পর কাদের মোল্লার ফাঁসি একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের প্রতি বিশ্বস্ততা ও সংহতির জন্য কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তার মৃত্যুতে সকল পাকিস্তানি মর্মাহত এবং শোকাহত।’’

তিনি আরও বলেন, “এ ঘটনার মাধ্যমে পুরনো ক্ষত আবারও জাগিয়ে তোলা হয়েছে।”

জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের প্রধান মুনাওয়ার হাসান কাদের মোল্লাকে তাদের ‘বাংলাদেশি সহচর’ এবং ‘পাকিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা’ আখ্যায়িত করে তার ফাঁসিকে ‘শোচনীয়’ বলে মন্তব্য করেন। শুধু তাই নয়, কাদেরের ফাঁসি দেওয়ায় বাংলাদেশ আক্রমণের জন্য নিজেদের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল জামায়াত-ই-ইসলামী। ‘কসাই কাদের’ আর ‘কাদের মোল্লা’ এক ব্যক্তি না হলে পাকিস্তানি জামাতের এত শখ হল কেন এই বিবৃতি দেবার?

বারবারই বাংলাদেশের জামাত দাবি করে এসেছে কসাই কাদের আর কাদের মোল্লা এক ব্যক্তি নয়, তারা হাজির করে কাদেরের জবানবন্দি, যেখানে কাদেরের অ্যালিবাই ছিল:

“১৯৭১ সালের ১২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের আমিরাবাদ চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ই তিনি গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করেন। গ্রামে অবস্থানকালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও হাইস্কুলের প্রায় ৩০ জন ছাত্রের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ থেকে ১ মে পর্যন্ত (পাকিস্তান সেনাবাহিনী ফরিদপুরে পৌঁছার দিন পর্যন্ত) অন্যদের সঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ চালিয়ে যান। সেনাবাহিনীর জুনিয়র কমিশনড অফিসার (জেসিও) মফিজুর রহমান ডামি রাইফেল দিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেন।” (ইত্তেফাক)

কাদের এবং তার দলবলের দাবি অনুযায়ী সে একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধা ছিল; অথচ পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিন্তু স্পষ্ট করেই বলেছেন–

‘‘কাদের মোল্লা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অখণ্ড পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন এবং তা তিনি নিজের মুখেই বলেছিলেন।’’

নিজের মুখে কাকে এ কথা বলেছেন কাদের? তিনি বিরাট মুক্তিযোদ্ধা হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে তো নিজেকে ‘অখণ্ড পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন’ সেটা বলার কথা নয়। যেভাবে নিউজগুলো পত্রিকায় এসেছে তাতে মনে হয় নিসার সাহেবের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল এবং তিনি কাদেরের পরিচয় সম্বন্ধে যথেষ্টই ওয়াকিবহাল। না হলে নিসার সাহেব বলবেন কেন যে, পাকিস্তানের প্রতি বিশ্বস্ততা ও সংহতির জন্য কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই?

এগুলো থেকে কী প্রমাণিত হয়? কসাই কাদের আর কাদের মোল্লা দুই ব্যক্তি? সেই হিন্দি সিনেমার মতো আসল কাদেরকে জীবিত রেখে তার ‘জরুয়া’ ভাইকে ঝোলানো হয়েছে? মোটেও তা নয়। বরং সম্প্রতি একটি পত্রিকায় ড. জিনিয়া জাহিদ যে কথাগুলো তার ‘কাদের মোল্লা মরিয়া প্রমাণ করিল’ শিরোনামের লেখায় উল্লেখ করেছেন সেটাই সত্য হিসেবে প্রকট হয়ে উঠেছে–

‘‘সেই যে রবীন্দ্রনাথের কাদম্বিনী গল্পে পড়েছিলাম, ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল যে, সে মরে নাই’, ঠিক তেমনি কাদের মোল্লার ফাঁসিতে মৃত্যুর পর তাদের সমগোত্রীয় পাকি-জামায়াতের স্বীকারোক্তিতে এটাই প্রমাণ হল যে, এই কাদের মোল্লাই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা এবং এই কাদের মোল্লাই আমৃত্যু পাকি-সমর্থক ছিলেন। এই কাদের মোল্লা একাত্তরেও যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন।’’

মিথ্যাচারী এবং মিথ্যার বেসাতি করা জামাত-শিবির কেবল কাদের মোল্লাকে কসাই কাদের থেকে পৃথক করার মিশন নিয়েই মাঠে নামেনি, তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পর্যন্ত প্রমাণ করতে চেয়েছে। সে নাকি একাত্তরের যুদ্ধে গ্রামে বসে কলেজ ও হাইস্কুলের প্রায় ৩০ জন ছাত্রের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ থেকে ১ মে পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ চালিয়ে গেছে। মিথ্যাচারের একটা সীমা থাকে! অথচ এই কাদের মোল্লাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে করেছিল চরম বিদ্রূপাত্মক উক্তি, যেটা ২০০৭ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছিল:

“কেউ সুন্দরী নারীর লোভে, কেউ হিন্দুর সম্পদ লুণ্ঠন, কেউ ভারতীয় স্বার্থরক্ষায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। কেউই আন্তরিকতা কিংবা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি।” (কাদের মোল্লা, সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ৩১ অক্টোবর, ২০০৭)

এর বাইরেও বহুবারই কাদের মোল্লার বাংলাদেশ বিরোধিতা এবং বাংলাদেশের প্রতি অবজ্ঞার ব্যাপারটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। যেমন এ বছরের নভেম্বর মাসে বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকমে প্রকাশিত এই নিউজটি দ্রষ্টব্য:

এই লোক ‘কসাই কাদের’না হয়ে মুক্তিযোদ্ধা হবে, সেটা কি কোনো পাগলেও বিশ্বাস করবে?

এবার কিছু চাক্ষুষ সাক্ষীর বয়ান শোনা যাক।

এক: ফজর আলী

“মিরপুর ১১ নম্বর বি ব্লকের বাসিন্দা ফজর আলী গণতদন্ত কমিশনকে দেওয়া সাক্ষ্যে তার ছোট ভাই মিরপুর বাংলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে নৃশংসভাবে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন কাদের মোল্লাকে। ২৯ মার্চ নবাবপুর থেকে পল্লবকে তুলে নিয়ে আসে কাদের মোল্লার সাঙ্গপাঙ্গরা। এরপর তার নির্দেশে ১২ নম্বর থেকে ১ নম্বর সেকশনের শাহ আলী মাজার পর্যন্ত হাতে দড়ি বেঁধে হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ছাত্রলীগ কর্মী পল্লবকে। এরপর আবার ১ নম্বর থেকে ১২ নম্বর সেকশনের ঈদগাহ মাঠে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে টানা দু’দিন একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয় পল্লবকে। ঘাতকরা এরপর তার দু’হাতের সবকটি আঙুল কেটে ফেলে।

৫ এপ্রিল একটি মজার খেলা খেলে কাদের মোল্লা। সঙ্গীদের নির্দেশ দেওয়া হয় গাছে ঝোলানো পল্লবকে গুলি করতে, যার গুলি লাগবে তাকে পুরষ্কার দেওয়া হবে। পরে কাদের মোল্লার সঙ্গী আক্তার পল্লবের বুকে পাঁচটি গুলি করে পরপর। পল্লবের লাশ আরও দু’দিন ওই গাছে ঝুলিয়ে রাখে কাদের মোল্লা, যাতে মানুষ বোঝে ভারতের দালালদের জন্য কী পরিণাম অপেক্ষা করছে। ১২ নম্বর সেকশনে কালাপানি ঝিলের পাশে আরও ৭ জন হতভাগার সঙ্গে মাটিচাপা দেওয়া হয় পল্লবকে।

অক্টোবরে মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে একজন মহিলা কবি মেহরুন্নেসাকে প্রকাশ্যে নিজের হাতে নির্মমভাবে হত্যা করে কাদের মো্ল্লা। প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন সিরাজ এই নৃশংসতায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। মূলত বিহারিদের নিয়ে একটি খুনে দল তৈরি করেছিল কাদের মোল্লা। আর বুলেট বাঁচাতে জবাই করা ছিল তার কাছে বেশি প্রিয়।”

দুই: ফিরোজ আলী

“ফিরোজ আলী তখন মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি, একাত্তর সালে সপরিবারে মিরপুরে থাকতেন। ২৫ মার্চের পর তার ভাই পল্লবকে শুধু ‘জয় বাংলা’র অনুসারী হওয়ার অপরাধে কাদের মোল্লার নির্দেশে অবাঙলি গুণ্ডারা অকথ্য নির্যাতন করে নির্মমভাবে হত্যা করে। তখন সমগ্র মিরপুরে হত্যা আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে কাদের মোল্লা ও তার অনুসারী অবাঙালিরা। জবাই করে বাঙালি হত্যা ছিল তাদের প্রতিদিনের রুটিনমাফিক কাজ। একেকটি জবাই’র আগে ঘোষণা দিত যারা বাংলাদেশ তথা ‘জয় বাংলা’র অনুসারী, তারা বিধর্মী-নাস্তিক-ভারতের দালাল, এদের হত্যা করা সওয়াবের কাজ!

এমন জবাই’র নেশা বেড়ে যাওয়ায় কাদের মোল্লার নাম তখন এ তল্লাটে আতঙ্কের সমার্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্থানীয়রা আবদুল কাদের মোল্লাকে ‘কসাই কাদের’নামকরণ করে। গরু জবাই-এর মতো মানুষ জবাই-এ দক্ষতার নামডাকে (!) কসাই কাদের ‘মিরপুরের কসা‌ই’ নামেও পরিচিতি লাভ করে ব্যাপক।

কসাই কাদের মোল্লার প্রতিহিংসার শিকার শহীদ পল্লবের ডাক নাম ছিল ‘টুনটুনি’। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বেশ কিছু চলচ্চিত্রে পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করে সুখ্যাতি অর্জন করে প্রতিপক্ষের চক্ষুশূল হন পল্লব। এ কথা জানান ফিরোজ আলীর স্ত্রী।

পল্লব ছাড়াও কবি মেহেরুন্নেছা নামের এলাকায় খুবই শান্ত-নিরীহ প্রকৃতির বাঙালি গৃহবধূ কসাই কাদের মোল্লার প্রতিহিংসার বলি হন। মিরপুর ৬ নং সেকশন, ডি ব্লক মুকুল ফৌজের মাঠের কাছাকাছি একটি বাড়িতে থাকতেন কবি মেহেরুন্নেছা। তিনি ছিলেন কবি কাজী রোজীর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী।

কসাই কাদের মোল্লার নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে লেখালেখির অপরাধে মেহেরুন্নেছাসহ তার পুরো পরিবারকে বটি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছিল! এরপর টুকরো করা মাংসখণ্ডগুলো নিয়ে ফুটবলও খেলা হয়েছিল ৬ নং মুকুল ফৌজের মাঠে! কসাই কাদেরের নির্দেশে ৩০/৩৫ জনের একটি অবাঙালি ঘাতকের দল, মাথায় লাল ফিতা বেঁধে, ধারালো তলোয়ারে সজ্জিত হয়ে অংশ নেয় কবি মেহেরুন্নেছা ও তার পরিবারের হত্যাযজ্ঞে!”

তিন: কাদের মোল্লার বন্ধু মোজাম্মেল এইচ খান

ড. মোজাম্মেল এইচ খান ছিলেন রাজেন্দ্র কলেজে কাদের মোল্লার সহপাঠী। তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন কাদের মোল্লার কাজকর্ম, একাত্তরে এবং তার পরবর্তী সময়। তিনি ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৩ দৈনিক জনকণ্ঠে একটি চমৎকার লেখা লিখেছিলেন, ‘‘কাদের মোল্লাকে নিয়ে ‘আমার দেশ’ পত্রিকার আষাঢ়ে কাহিনী’’ শিরোনামে:

“কাদের মোল্লা হলেন আমাদের রাজেন্দ্র কলেজের ১৯৬৪-১৯৬৬ এইচএসসি ব্যাচের সবচেয়ে পরিচিত মুখ এবং তিনি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমধিক পরিচিত ব্যক্তি, তা সে যে কারণেই হোক না কেন। এমনকি তিনি আমাদের সে সময়ের আরেক সহপাঠী বেগম জিয়ার বিগত শাসনামলের মন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদকেও পরিচিতির দিক দিয়ে ছাড়িয়ে গেছেন; যদিও মুজাহিদও একইভাবে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলার অপেক্ষায় রয়েছেন, যদি না সুপ্রীম কোর্ট তার দণ্ডকে উল্টে দেয়।’’

ড. মোজাম্মেল খান তাঁর প্রবন্ধে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, এমনকি কাদেরের পরিবারের দেওয়া বিবরণেও তিনি ১৯৭২ সালে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে ‘তার ডিপার্টমেন্টে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন’ এ ধরনের কোনো দাবি নেই; বরং তিনি যে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন সে কথাই বলা হয়েছে। এমনকি তিনি যে কোনো ডিগ্রি পেয়েছেন সেটার কোনো উল্লেখ নেই।

তেমনিভাবে ‘যুদ্ধের পুরো সময় তিনি গ্রামেই অবস্থান করেন’ সে কথা বলা হয়েছে, কিন্তু তিনি যে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন সেটার কোনো উল্লেখ নেই। ‘শেখ মুজিবুর রহমান তাকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরিও দিয়েছিলেন’ সেটাও কাদেরের পরিবার উল্লেখ করেনি; অথচ ‘আমার দেশ’ এবং ‘বাঁশের কেল্লা’রা চাঁদে সাঈদীর মুখচ্ছবি দর্শনের মতো করে ঠিকই ‘সত্যের সন্ধান’ পেয়ে গেছে!

জামাতিদের পক্ষ থেকে আরও ছড়ানো হয়েছে যে, কাদের মোল্লা নাকি ‘ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট’ হওয়া ‘গোল্ড মেডেলিস্ট’ ছাত্র ছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা মোটেই সে রকমের নয়। মোল্লার ‘ভালো ছাত্রত্বের’ গুমোর ফাঁস করে দিয়েছেন মোজাম্মেল খান তাঁর কলামে:

‘‘এইচএসসির ফলাফলে কাদের গড়পড়তা ছাত্রের থেকে নিচে ছিল যার ফলে সরাসরি সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়ার যোগ্যতা অর্জন করেনি। সে রাজেন্দ্র কলেজেই বিএসসি পড়ে (১৯৬৬-১৯৬৮) এবং ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাস কোর্সে এমএসসিতে ভর্তি হয় যেটা তার পরিবারের দেওয়া সময়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে যাচ্ছে; যদিও তার পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী সে এসএসসি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। অথচ কাদের আমাদের সঙ্গে এইচএসসি পাস করেছে ১৯৬৬ সালে।

তাহলে এর মাঝে দুই বছরের বেশি সময় সে কী করেছে? তার পরিবার বলেছে সে স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসে এবং ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সেখানে অধ্যয়ন করে। এ বক্তব্যের প্রথম অংশটুকু সত্য নয় এবং যে কোনো পাঠকই বুঝতে পারবেন দুই বছরের এমএসসি ডিগ্রির জন্য ৮ বছর (১৯৬৯-১৯৭১, ১৯৭২-১৯৭৭) বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করার হিসেব মেলানো যায় না।’’

বর্তমানে কানাডাপ্রবাসী অধ্যাপক মোজাম্মেল খান সেই একই প্রবন্ধে বর্ণনা করেছেন যখন তিনি ১৯৭৯ সালে দেশে বেড়াতে গিয়েছিলেন, কীভাবে কাদের মোল্লার সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়ে গিয়েছিল এবং কীভাবে সে উল্লসিত হয়ে মোজাম্মেল সাহেবকে বলেছিল ‘জয় বাংলা’কে সরিয়ে ‘জিন্দাবাদ’ রাজত্ব করে চলেছে:

“১৯৭৩ সালের প্রথমার্ধ্বে আমি যখন উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে আসি তখন জানতাম না কাদের কোথায় আছে। ১৯৭৯ সালে আমি দেশে বেড়াতে গেলে একদিন যখন ঢাকার মগবাজারের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি তখন পেছন থেকে একজন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তুই কি মোজাম্মেল? আমি কাদের।’ আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘কাদের, তুই বেঁচে আছিস?’ কাদেরের উত্তর ছিল, ‘হ্যাঁ, আমি ভালোভাবে বেঁচে আছি এবং এখন আমি দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদক। তোর জয় বাংলা এখন এদেশ থেকে নির্বাসিত; ফিরে এসেছে আমাদের জিন্দাবাদ এবং এটা এখন প্রচণ্ডভাবে জাগ্রত।’ যেহেতু কাদের সত্য কথাই বলেছিল, সেহেতু আমি ওর কথার কোনো জবাব দিতে পারিনি।

কয়েক সপ্তাহ পরে আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাই তখন সংবাদপত্রে পড়লাম প্রেসক্লাবে একটি বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিল কাদের মোল্লা; একেই বলে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস!”

মোজাম্মেল এইচ খান ইংরেজিতেও এ নিয়ে একটি লেখা লিখেছেন Quader Mollah: fact versus fiction শিরোনামে যেটা মুক্তমনা সাইটের ইংরেজি ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে।

ড. মোজাম্মেল এইচ খান কাদের মোল্লার ফাঁসির পর স্ট্যাটাসও দিয়েছিলেন, ‘‘বিদায় এককালের সহপাঠী কাদের মোল্লা। তোমার এ পরিণতিতে আমি শোক করতে পারছি না’’ বলে:

পাঠক নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন আমরা এ লেখায় এখন পর্যন্ত মোমেনা বেগমের কথা আনিনি। এই নারী কাদের মোল্লার দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিলেন। তাঁর পরিবারের সব সদস্যকে চোখের সামনে মরতে দেখেছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকমে প্রকাশিত তাঁর ভাষ্য থেকে জানা যায়, বেলা ডোবার আগে কাদের মোল্লার নেতৃত্বে মোমেনাদের বাড়িতে হামলা হয়। “আব্বা দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া আসে এবং বলতে থাকে ‘কাদের মোল্লা, মেরে ফেলবে’। আক্তার গুণ্ডা, বিহারিরা তারা ও পাক বাহিনীরা দৌড়াইয়া আসছিল। আব্বা ঘরে এসে দরজার খিল লাগায়ে দেয়।”

হযরত দরজা এঁটে সন্তানদের খাটের নিচে লুকাতে বলেন। মোমেনার সঙ্গে তার বোন আমেনা বেগমও খাটের নিচে ঢোকে। তখন দরজায় শোনেন কাদের মোল্লাসহ বিহারিদের কণ্ঠস্বর, ‘এই হারামি বাচ্চা, দরজা খোল, বোম মার দেঙ্গা।’ শুরুতে দরজা না খোলায় বাড়ির দরজার সামনে একটি বোমা ফাটানো হয়। এক পর্যায়ে হযরতের স্ত্রী একটি দা হাতে নিয়ে দরজা খোলেন। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে তাকে গুলি করা হয়।

“আব্বা তখন আম্মাকে ধরতে যায়। কাদের মোল্লা পেছন থেকে শার্টের কলার টেনে ধরে বলে, ‘এই শুয়ারের বাচ্চা, এখন আর আওয়ামী লীগ করবি না? বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যাবি না? মিছিল করবি না? জয় বাংলা বলবি না?’ আব্বা হাতজোড় করে বলে, ‘কাদের ভাই, আমাকে ছেড়ে দাও’। আক্তার গুন্ডাকে বলল, ‘আক্তার ভাই, আমাকে ছেড়ে দাও’।” তবু না ছেড়ে হযরত আলীকে টেনে-হিঁচড়ে ঘরের বাইরে নিয়ে যায় বিহারিরা।

সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এরপর কাঁদতে কাঁদতে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দেন মোমেনা। “দাও দিয়ে আমার মাকে তারা জবাই করে। চাপাতি দিয়ে খোদেজাকে (বোন) জবাই করে। তাসলিমাকেও (বোন) জবাই করে। আমার একটি ভাই ছিল বাবু, বয়স ছিল দুই বছর, তাকে আছড়িয়ে মারে। বাবু মা মা করে চিৎকার করছিল,” বলতে গিয়ে অঝোরে কাঁদেন মোমেনা।

বাবুর চিৎকার শুনে খাটের তলায় লুকানো আমেনা চিৎকার দিলে তার অবস্থান জেনে যায় হামলাকারীরা। মোমেনা বলেন, “আমেনাকে তারা টেনে বের করে, সব কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে ফেলে। এরপর তাকে নির্যাতন করতে থাকে। আমেনা অনেক চিৎকার করছিল, একসময় চিৎকার থেমে যায়।”

কাঁদতে কাঁদতে প্রায় অজ্ঞান মোমেনা এরপর শোনান নিজের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা।

মোমেনার সাক্ষ্য নিয়ে কম জল ঘোলা করেনি জামাতিরা। বলা হচ্ছে মোমেনা নাকি তিনবার সাক্ষ্য দিয়েছেন। একেক জায়গায় নাকি তার একেক রকম বক্তব্য। তিনি নাকি মিরপুরের জল্লাদখানার জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে যে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তাতে কাদের মোল্লার নাম ছিল না। তিনি নাকি বোরকা ও নেকাবে মুখ আবৃত করে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়েছিলেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।

এগুলো আসলে একেবারেই বানোয়াট প্রোপাগাণ্ডা। ব্লগার নিঝুম মজুমদার মুক্তমনায় প্রকাশিত দি কিউরিয়াস কেইস অব কাদের মোল্লা এবং সাক্ষী মোমেনা প্রবন্ধে প্রতিটি কুযুক্তিই খণ্ডন করেছেন। পাঠকেরা প্রবন্ধটি পড়ে দেখতে পারেন।

আসলে মোমেনা মূলত তার জীবনে একবারই সাক্ষ্য দিয়েছেন তাঁর পিতা-মাতা আর ভাই-বোন হত্যা মামলায়। আর সারাজীবন যদি অন্য কোনো বক্তব্য দিয়ে থাকেন তবে সেটি আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়নি, হবার কথাও নয়।

মোমেনার যে জবানবন্দির কথা বলে জল ঘোলা করার চেষ্টা করা হয়– যেটি তিনি মিরপুরের জল্লাদখানার জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন বলে ‘বাঁশের কেল্লা’রা ক্রমাগতভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে, সেটি কিন্তু মাননীয় আদালতের চোখে সম্পূর্ণভাবে অসাড় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। যে অভিযোগ আদালতে ধোপে টেকেনি, সেটা যদি ‘কন্সপিরেসি থিওরি’ হিসেবে কেউ ছড়িয়ে বেড়ায় তখন তার ঘাড়েই দায় বর্তায় সেটা প্রমাণ করার, আমাদের ওপর নয়।

নিঝুম মজুমদারের অনুসন্ধানী পোস্ট থেকে জানা যায়, ‘‘কাদেরের আইনজীবী একটা কাগজ নিয়ে এসেছে ছবি ফরম্যাটে [ফটোস্ট্যাট] যাতে কোনো কর্তৃপক্ষের সাক্ষর নেই, সাক্ষ্যদাতার সাক্ষর নেই, এটি কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে সেটির ব্যাখ্যা নেই কিংবা বলতে পারেনি, এই বিচারের আইনের ধারা ৯, সাব সেকশন ৫-এর নিয়ম ফলো করা হয়নি, এটা কোনো সাক্ষ্য নয়।’’ [ট্রাইব্যুনাল-২ এর মামলার রায়, পৃষ্ঠা ১১৯, প্যারা ৩৯১-৩৯২ দ্র:]

আর কোনো জাদুঘরের সাক্ষাতকারে যদি মোমেনা কাদের মোল্লার নাম উল্লেখ না করে থাকেন কিংবা আদালতে যদি বোরকা পরে সাক্ষ্য দিতে এসে থাকেন তাতেই-বা কী সমস্যা ছিল? যে মানুষটি তাঁর পরিবারের প্রত্যেককে চোখের সামনে নৃশংসভাবে খুন হতে দেখেছেন, যে ব্যক্তি গত বিয়াল্লিশটি বছর শোক-দুঃখ-হাহাকার নিয়ে বড় হয়েছেন, কাতর হয়েছেন অমানুষিক যন্ত্রণায়, তিনি কি নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রয়োজনমাফিক ব্যবস্থা নেবেন না? মোমেনা বেগম নিজ মুখেই তো বলেছেন যে, আদালতে সাক্ষ্যের আগে তিনি ভয় এবং নিরাপত্তার কারণে অনেক সময়ই নাম গোপন করে গেছেন:

“অনেক মানুষ আমার কাছে এসেছিল ও আমার ছবি নিয়েছিল; কিন্তু ভয়ের কারণে আমি কাউকে কাদের মোল্লা এবং আক্তার গুণ্ডার নাম বলি নাই।”

তাঁর ভয়ের ব্যাপারটা তো অমূলক নয়। জামাত-শিবিরের সন্ত্রাস সম্বন্ধে কেউ তো অজ্ঞ নয়। সাঈদীর মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী গোলাম মোস্তফা নিহত হননি? তারা বোধহয় একই পরিণতি মোমেনা বেগমের জন্যও চেয়েছিল। সেটা বাস্তবায়িত না হওয়াতেই কি এত ক্ষোভ আর মিথ্যাচার?

আর এই মামলায় তো কেবল মোমেনা বেগম নয়, অনেক সাক্ষীই ‘ক্যামেরা ট্রায়ালে’ সাক্ষ্য দিয়েছেন। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে এই জাতীয় ট্রায়ালের ক্ষেত্রে যে নিয়মগুলো প্রচলিত রয়েছে, সে ধরনের নিয়ম মেনেই সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অথচ হঠাৎ করেই মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য কেন্দ্র করে গোয়েবলসীয় প্রচারণায় মেতে উঠেছেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মহল।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, অনেকেরই হয়তো জানা নেই– সাক্ষী নিয়ে বরং ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছিলেন কাদের মোল্লার পক্ষের আইনজীবীরাই। মোল্লার এক ভিকটিম পল্লবের ভাইয়ের স্ত্রী মোসাম্মৎ সায়েরাকে তারা হাত করতে চেষ্টা করেন, তাকে দিয়ে মিথ্যে সাক্ষ্য দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু মিথ্যে কথা বলতে গিয়ে লেজেগোবরে করে ফেলেছেন তিনি। (ট্রাইব্যুনালের রায়ের প্যারা ১৮২-১৮৯ দ্রঃ)। মজা হচ্ছে এগুলো নিয়ে গোয়েবলস বাবাজি আর তার সাগরেদরা সব নিশ্চুপ।

পাঠকদের অবগতির জন্য জানাই, কেবল মোমেনা বেগম নয়, অনেকের সাক্ষ্য থেকেই জানা গেছে এই কাদের মোল্লাই– আক্তার গুণ্ডা, নেহাল, হাক্কা গুণ্ডা যারা মীরপুরে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল একাত্তরে– তাদের সহচর ছিল। এদের অনেকেই সরাসরি কাদেরকে নিজ চোখে শনাক্ত করেছিল। সেই চাক্ষুষ সাক্ষীর মধ্য থেকেই দু’জনের বয়ান উপরে এই লেখাতেই উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া আছেন প্রধান সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল হক মামা, যিনি আদালতে দাঁড়িয়ে কাদের মোল্লাকে শনাক্ত করেছিলেন। কাদের মোল্লার আসল-নকল নিয়ে প্রধান সাক্ষী শহিদুল হক মামা ‘একাত্তর’ টিভিতে ১৩.১২.২০১৩, ইউটিউব ভিডিও:


http://www.youtube.com/watch?v=sGsTPnuHMPA

তারপরও বেশিরভাগ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, জামাত-সমর্থক গোষ্ঠীর ধারণা কাদের নির্দোষ ভালো মানুষ। কিছু “বিকৃত তথ্য”এবং তার সঙ্গে একগাদা নির্জলা ‘মিথ্যাচার’ জড়িয়ে সারাদিন এরা করে যাচ্ছে ধর্মব্যবসা। গোয়েবলসীয় কায়দায় তারা বলেই চলেছে কাদের মোল্লা আর কসাই কাদের নাকি এক নয়। যারা এখনও বলে, কসাই কাদের আর মোল্লা কাদের এক নয়, তাদের কাছে আমাদের একটাই প্রশ্ন–

‘কসাই কাদের’টা তাইলে গেল কোথায়? রাতারাতি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল নাকি?

আমরা মনে করি, কাদের আর কসাই একই লোক সেটা আদালতেই প্রমাণিত হয়ে গেছে আর শাস্তিও দেওয়া হয়েছে, আমাদের নতুন করে আর কিছু প্রমাণের নেই। ‘বার্ডেন অব প্রুফ’টা তাদের কাঁধেই যারা মনে করেন দুই কাদের ভিন্ন ব্যক্তি। আমরা মনে করি, তারা সেটা প্রমাণ করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে মোমেনার মতো চাক্ষুষ সাক্ষীরাই যথেষ্ট যাদের পরিবার কাদের মোল্লার হাতে নিগৃহীত হয়েছিলেন। তাকে চিনতেন তার বন্ধু এবং সহপাঠীরাও, যেমন ড. মোজাম্মেল এইচ খানের মতো ব্যক্তিরা।

বিপরীত পক্ষ বরাবরই সেগুলো অস্বীকার করে ‘বাঁশের কেল্লা’ আর গোলাম মওলা রনির মতো লোকজনের কথাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। আসুন দেখি কতটা নির্ভরযোগ্য এই গোলাম মাওলা রনি, যে সরকারদলীয় সাংসদ অতীতে সাংবাদিক পেটানোসহ বহু কারণেই বিতর্কিত হয়ে সংবাদের শিরোনাম হয়েছিলেন।

কাদের মোল্লার ফাঁসির আগ মুহূর্তে তিনি একটি চিরকুট প্রকাশ করেন ফেসবুকে এবং দাবি করলেন রনির সঙ্গে মোল্লা সাহেবের কারাগারে সাক্ষাত হয়েছিল এবং সেই সুবাদে মোল্লা রনিকে একটা চিঠি দেন, সেখানে ইনিয়ে বিনিয়ে কাদের মোল্লার ‘একটু উস্তাভাজি খাওয়ার’ বাসনা ছিল আর মোল্লা নাকি রনিকে এও অনুরোধ করে বলেছিলেন, ‘আমার ফাঁসির পর একবার হলেও বল বা লিখ যে, কাদের মোল্লা আর কসাই কাদের এক ব্যক্তি নয়’। এই সেই চিঠি:

এই চিঠি পুঁজি করেই সহানুভূতির বাণিজ্য শুরু করেছিলেন গোলাম মওলা রনি ফেসবুকে। গোলাম শুরু করেছিলেন কাদেরের গোলামী।

কিন্তু আমরা যখন এ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলাম তখন বেরিয়ে এল অন্য তথ্য, বিশেষ করে যখন কাদের মোল্লার স্ত্রীকে লেখা একটি চিঠি অনলাইনে প্রকাশিত হয়ে যায়:

ব্যাপারটা কি লক্ষ্য করেছেন পাঠক???

পাঠকদের সুবিধার জন্য দুটো ছবি একসঙ্গে দেওয়া গেল। একটু ভালো করে খেয়াল করলেই বোঝা যাবে যে ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’:

গোলাম মওলা রনি সাহেবের যে ফেসবুক স্ট্যাটাসটা নিয়ে এত চেঁচামেচি, এখন তো থলের বেড়াল বেরিয়ে এসেছে; সেই চিরকুটের সিগনেচার আর কাদের মোল্লার পরিবারের কাছে লেখা চিঠির সিগনেচার ভিন্ন!

লেখাটি শেষ করার আগে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারও পাঠকদের মনে করিয়ে দিতে চাই। এই ট্রাইব্যুনাল যদি স্বচ্ছ না হয়, যদি কাদের সত্যই মনে করে যে তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে, তাহলে ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ের পর কসাই কাদের কেন দুই আঙুল দিয়ে জয়সূচক ‘ভিক্টরি চিহ্ন’ দেখিয়েছিল? যে ট্রাইব্যুনাল স্বচ্ছ নয়, নিরপেক্ষ নয়, আন্তর্জাতিক নয়– সেই ট্রাইব্যুনালে প্রথম রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়ার পরেও কেন কাদের নিজেকে জয়ী মনে করল?

যদি সে সত্যিই কসাই কাদের না হয়, কস্মিনকালেও যদি মিরপুরে না গিয়ে থাকে, একটি মানুষও হত্যা না করে থাকে, তবে কতবড় পাগল হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাবার পরেও হাত তুলে নিজেকে জয়ী ঘোষণা করে? হিসেবটা কি মেলে?

আশা করি আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াসটি বিভ্রান্তি দূর করে হিসেবগুলো মেলাতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে।

http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/14020


Name:   Biplob Rahman           

IP Address : 212.164.212.61 (*)          Date:28 Mar 2014 -- 09:53 AM

বিভুরঞ্জন সরকার
স্বাধীনতার মাসে আক্ষেপ ও আত্মজিজ্ঞাসা
মার্চ ৬, ২০১৪

ডিসেম্বর মাস আমাদের বিজয়ের মাস। ফেব্রুয়ারি মাস ভাষার মাস। মার্চ হচ্ছে স্বাধীনতার মাস। স্বাধীনতার মাসের শুরুতেই আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হওয়ার কোনো গরজ কি আমরা বোধ করছি?

উনিশ শ একাত্তর সালের পঁচিশে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আকস্মিকভাবে নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর হামলা চালালে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানের সামরিক একনায়ক ইয়াহিয়া খান টালবাহানা শুরু করলে একাত্তরের মার্চের প্রথম দিনই বাংলাদেশের বিক্ষুব্ধ মানুষের কণ্ঠে শ্লোগান উচ্চারিত হয়েছিল ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। বাঙালি সত্যি অস্ত্র হাতে তুলে নেবে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন করবে– সেটা কিন্তু তখনও অনেকের কাছে ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু কল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তব রূপ পেয়েছে।

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ থেকে ষোলই ডিসেম্বর। নয় মাসের অসম যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছি আমরা। ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্ত, কোটি মানুষের দুঃসহ দুঃখবরণ, লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রম হারানোসহ অনেক উচ্চমূল্য দিয়েই কেনা হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। শিল্পীর কণ্ঠে যখন ধ্বনিত হয়, ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারও দানে পাওয়া নয়’, তখন তাতে সামান্য অতিরঞ্জন আছে বলেও মনে হয় না।

অনেক দামে কেনা এই স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পর আমরা যদি আমাদের দেশের দিকে, দেশের মানুষের দিকে তাকাই, তাহলে এ কথা কি আমরা উল্লাস ও উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি যে, হ্যাঁ, এই স্বাধীনতাই আমরা চেয়েছিলাম? দেশে সংঘাত-সংঘর্ষের যে রাজনীতি চলছে, তা দেখে কি আমাদের মনে হয় যে, এমন রাজনীতিই আমাদের কাম্য ছিল? রাজনীতিবিদদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আস্থা-বিশ্বাস ইত্যাদি থাকবে না, এটা আমরা কেউ আশা করিনি। দল থাকলে দলাদলি থাকবে তাই বলে সেটা কোনোভাবেই হানাহানিতে পরিণত হবে না। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না– তেমনটাই ছিল প্রত্যাশিত।

দেশের অসংখ্য মানুষ নিরক্ষর থাকবে, গৃহহীন থাকবে, বেকার থাকবে, অনাহারী থাকবে, চিকিৎসার সুযোগ বঞ্চিত থাকবে– এমন অবস্থার জন্য নিশ্চয়ই কেউ অস্ত্র হাতে তুলে নেয়নি, বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়নি? পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বৈষম্য ও জুলুমের শাসন কায়েম করে মানুষকে অধিকারহীন, মর্যাদাহীন করে দাবিয়ে রেখে মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক সুবিধাভোগী অনুগতদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল বলেই তো আমরা পাকিস্তানি জিঞ্জির ভাঙার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছিলাম।

স্বাধীনতার চার দশকের বেশি সময় অতিক্রম করে আমরা কি এটা সত্যি দাবি করতে পারি যে, আমরা আমাদের স্বপ্ন পূরণের কাছাকাছি আসতে সক্ষম হয়েছি? আমরা কি অপশাসনের জিঞ্জির ভাঙতে পেরেছি. নাকি নতুন খাঁচায় আবদ্ধ হয়েছি? অল্প সংখ্যক মানুষ কর্তৃক বেশি সংখ্যক মানুষকে দাবিয়ে রাখার উৎকট ব্যবস্থা আমাদের ওপর চেপে বসায় এখন আমরা অস্বস্তিতে ছটফট করছি আর বলছি রক্ত দিয়ে আমরা এমন স্বাধীনতা চাইনি।

আমরা গর্ব করে বলে থাকি যে, অনেক লড়াই-সংগ্রাম করে আমরা দেশে গণতন্ত্র কায়েম করেছি। সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রপ্রিয়; অবৈধভাবে বা চোরা পথে বন্দুকের জোরে যারা ক্ষমতা দখল করে, এ দেশের মানুষ তাদের মেনে নেয় না, নির্বিবাদে তাদের শাসন চালাতে দেয় না। তারপরও সত্য এটাই যে, স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে দুইবার আমাদের ওপর অগণতান্ত্রিক সামরিক শাসন চেপে বসেছিল। নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে, বছরের পর বছর আন্দোলন করে ভোট দিয়ে সরকার বদলের একটি ধারা আমরা চালু করেছি।

প্রশ্ন হল, এটাই কি প্রকৃত গণতন্ত্র? দেশের মানুষ কি সত্যিকার অর্থে তার মর্যাদা ও অধিকার ফিরে পেয়েছে? দেশে কি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে কি আমরা বেরিয়ে আসতে পেরেছি? আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে কি আমরা সন্তুষ্ট থাকতে পারছি?
বেশি মানুষের ভোট পেয়ে যারা ক্ষমতায় যাচ্ছে তারা কিন্তু কল্যাণ করছে অল্পসংখ্যক মানুষের

বেশি মানুষের ভোট পেয়ে যারা ক্ষমতায় যাচ্ছে তারা কিন্তু কল্যাণ করছে অল্পসংখ্যক মানুষের

বেশি মানুষ যাদের ভোট দেয়, তারা দেশ শাসনের অধিকার পায়– এই ব্যবস্থা আমাদের দেশে চালু হয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এই রীতিরও ব্যত্যয় ঘটেছে চরমভাবে। বেশি মানুষের ভোট পেয়ে যারা ক্ষমতায় যাচ্ছে তারা কিন্তু বেশি মানুষের কল্যাণ করছে না, কল্যাণ করছে অল্প সংখ্যক মানুষের। অল্প সংখ্যক মানুষ সুখে থাকবে, বেশি সংখ্যক মানুষ অসুখি থাকবে– এটা তো স্বাধীনতার মূল্যবোধ তথা ন্যায়ের কথা নয়, ইনসাফের কথা নয়। ভোট দেওয়ার অধিকার সবার আছে ঠিকই, কিন্তু সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার সীমাবদ্ধ থাকছে অল্প সংখ্যক মানুষের মধ্যে।

ফলে একদিকে কিছু সংখ্যক মানুষের ধন-সম্পদ বাড়ছে, অঢেল বিত্তের অধিকারী হয়ে তারা বিলাসী জীবন যাপন করছে; অন্যদিকে বেশি সংখ্যক মানুষের জীবনে নেমে এসেছে সীমাহীন কষ্ট-দুর্ভোগ। দিন যত যাচ্ছে, ততই ধনবৈষম্য বাড়ছে, বাড়ছে দারিদ্র্য। কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে, কমছে না হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা।

আমরা দাবি করে থাকি যে, আমাদের দেশের মানুষ রাজনীতিসচেতন। তারা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল করে না। সত্যি কি তাই? ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা কি সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছি? একবার এ দলকে আরেকবার ও দলকে ভোট দেওয়ার নাম কি সঠিক গণরায়? কাকে ভোট দিই, কেন দিই, যাকে ভোট দিই তিনি আমাদের ভোটের মর্যাদা রক্ষা করেন কি-না, এগুলো কি সত্যি আমরা বিচার-বিবেচনা করি?

ভোটদানে আমাদের বিচক্ষণতার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলা যেতে পারে যে, আমাদের ভোটে যারা ক্ষমতায় যায়, ক্ষমতায় গিয়ে তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে পরবর্তী নির্বাচনে আমরা তাদের ভোট দিই না। শুধু এটুকুতেই কি ভোটারদের সচেতনতার পরিচয় বহন করে? এ রকম বৃত্তবন্দি হয়ে থাকার নাম কি সচেতনতা? আমাদের এই বৃত্তের মধ্যে চলার কি শেষ হবে না? আমরা কি বৃত্ত ভাঙার কোনো চেষ্টা করব না? যারা ওয়াদা ভঙ্গ করছে বার বার, তাদের খারিজ করে দেওয়ার কথা আমরা ভাবব না?

সন্দেহ নেই যে, একানব্বইয়ের গণআন্দোলনে স্বৈরশাসক এরশাদ পতনের পর থেকে নির্বাচনের মাধ্যমেই আমাদের দেশে ক্ষমতার পালাবদল ঘটছে। একবার বিএনপি, একবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হচ্ছে। এবার তার ব্যতিক্রম হল এমন বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় যাতে স্বস্তি নেই, আনন্দ নেই। বিএনপির নেতৃত্বে জোট অথবা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট– এই হল আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির উত্তরণ ও বিকাশ। ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা বদল হওয়া ছাড়া দেশে আর কোথাও গণতন্ত্রের চর্চা নেই।

রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্রচর্চার কোনো লক্ষণ নেই। দলের প্রধান নেত্রী বা নেতার ইচ্ছার বাইরে দল চলে না, সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কোনো কোনো সময় কোনো কোনো দলের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে কেউ কেউ কথা বলার সুযোগ পেয়ে থাকেন তবে আলাপ-আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয় দলীয় প্রধানের ওপর। আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা ওই পর্যন্ত!

আমরা জানি যে, একটি দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকে রাজনীতিবিদদের হাতে। তারাই দেশ চালান। কখনও সরকারে থেকে, কখনও বিরোধী দলে থেকে। আমাদের দেশে রাজনীতিবিদদের অক্ষমতা-ব্যর্থতা কি কারও নজর এড়ায়? রাজনীতিতে তাদের কমিটমেন্ট কী? তারা কতটুকু সৎ, বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী? তারা কি নিজেদের জন্য রাজনীতি করেন, নাকি মানুষের জন্য? যাদের পেশিশক্তির জোর বেশি, যারা রাতারাতি টাকাওয়ালায় পরিণত হয়েছেন– রাজনীতিতে আজকাল তাদেরই দাপট বেশি।

রাজনীতিতে ভালো মানুষের প্রান্তিক অবস্থান নিয়ে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করি না, তা নয়, তবে ভালো মানুষরা রাজনীতিতে জায়গা পাক– তার জন্য আমাদের কোনো উদ্যোগ-প্রচেষ্টা নেই। আগে ব্যবসায়ীরা নিজেদের ব্যবসার প্রসার ও সুরক্ষার জন্য রাজনীতিবিদদের চাঁদা দিতেন, অর্থাৎ রাজনীতিবিদদের চলতে হত ব্যবসায়ীদের চাঁদার টাকায়। এখন ব্যবসায়ীরা আর টাকা দিয়ে রাজনীতিবিদ না পুষে নিজেরা সরাসরি রাজনীতিতে নামছেন। পেশাদার রাজনীতিকের সংখ্যা কমছে, বাড়ছে ব্যবসায়ী রাজনীতিকের সংখ্যা।

কিছু সংখ্যক রাজনীতিবিদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের ফলে রাজনীতি সম্পর্কেই মানুষের মধ্যে বিরূপ ধারণা তৈরি হচ্ছে। অথচ মানুষের মধ্যে আস্থার মনোভাব তৈরির জন্য কোনো উদ্যোগ রাজনীতিবিদদের নেই। ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতা কারও মধ্যে নেই, খারাপ হওয়ার প্রতিযোগিতা আছে প্রবলভাবে। দেশের মানুষের কাছে শ্রদ্ধা-সম্মান পাওয়ার জন্য রাজনীতিবিদদের কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকতেই রাজনীতিবিদরা আজকাল বেশি পছন্দ করেন। তারা বিতর্কে থাকতে চান, প্রচারে থাকতে চান, কারণ প্রচারেই যে প্রসার!

রাজনীতিবিদদের পরস্পরের প্রতি চরম সন্দেহ ও অবিশ্বাস দেশের রাজনীতিকে ক্রমাগত অসুস্থতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কেবল প্রতিপক্ষের প্রতি বিদ্বেষ বা বিরূপতা নয়, একদলে থেকেও সদ্ভাব-সদাচার রক্ষা করতে পারেন না অনেকেই। ফলে দলের মধ্যে দলাদলি-কোন্দল, রেষারেষি এখন চরমে। ঐক্য নয় বিভেদ, মিত্রতা নয় তিক্ততা– এটাই যেন রাজনীতির মূলমন্ত্র।

অস্থিতিশীলতা তৈরি করাই যেন এখনকার রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। একদল ক্ষমতায় থাকার জন্য মরিয়া, অন্য দল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য উদগ্রীব। ক্ষমতায় থাকার জন্য এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নীতিহীনতার প্রতিযোগিতা বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ক্ষমতায় থাকার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবেলায় রাষ্ট্রযন্ত্রের যাবতীয় শক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার যেমন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, তেমনি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আন্দোলনের নামে হরতাল-জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে জান-মালের ক্ষতি সাধন করাও নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

ক্ষমতার রাজনীতির যাঁতায় পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়ার জন্য ভোটের বিকল্প কিছু নেই, জানা সত্ত্বেও ভোটারদের স্বার্থ না দেখার দুঃসাহস রাজনীতিবিদরা কোথা থেকে পান? পাঁচ বছর পর মানুষের কাছে ভোটপ্রার্থী হতে হবে, তাদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে– এটা জেনেও কেন ভোটে জেতা বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদে যান না? সংসদ সদস্য হিসেবে তারা বেতন-ভাতা নেন, সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, অথচ সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন না। এমন উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি?

চলতি রাজনীতির ধারায় দুটি দল একে অপরের প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় এটা প্রায় নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, ‘এ’ না হলে ‘বি’– অবশ্যই ভোটে জিতবে। মানুষের সামনে আর কোনো ভালো বিকল্প না থাকায় এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার রাজনীতি প্রবল হয়ে উঠছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দুঃখকষ্ট লাঘব করা কিংবা সুশাসন নিশ্চিত করা এখন আর বড় কথা নয়। সন্ত্রাস, দুর্নীতি, শক্তি প্রদর্শনই এখন রাজনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।

আমাদের দেশের প্রকৃত উন্নয়ন-অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য মূলধারার প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি সমঝোতা প্রয়োজন বলে অনেকেই মনে করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, দুই বিপরীত ধারার দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা কি আদৌ সম্ভব? কেউ হয়তো বলবেন, এই দুই দলের মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য এখন এতই কমে এসেছে যে, স্থায়ী না হলেও ইস্যুভিত্তিক সমঝোতা এই দুই দলের মধ্যে না হওয়ার কোনো যুক্তি নেই। অথচ যুক্তিহীনতাই যে এখন রাজনীতিকে বেশি প্রভাবিত করছে, তার কী হবে!
দুই বিপরীত ধারার দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা কি আদৌ সম্ভব

দুই বিপরীত ধারার দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা কি আদৌ সম্ভব

একদল বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, অন্যদল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বলে এতদিন যে পার্থক্যরেখা টানা হতো, এখন আর তা টানা খুব সহজ নয়। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীরা যদি বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামি ভাবধারার মিশেলে বিশ্বাসী হয়, তাহলে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরাও এখন ইসলামি ভাবধারা থেকে খুব দূরে অবস্থান করতে চাইছে না। দুই দলের পার্থক্যটা তাহলে কোথায়? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমানের অবস্থান, সম্মান ও মর্যাদাই কি এখন দুই দলের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু?

যদি তা-ই হয় তাহলে প্রয়াত দুই নেতাকে এক কাতারে না নামিয়ে, দুই জনের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানকে স্বীকার করে বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক হিসেবে এবং মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার অবদানের কথা বিনা বিতর্কে মেনে নিলেই তো এই দুই দলের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য হলেও রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তাত্ত্বিক বিচার-বিশ্লেষণে এই সমঝোতা অসম্ভব বলে মনে না হলেও বাস্তবতা যে ভিন্ন সেটাও তো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাহলে হবেটা কী? আমরা করব কী?

আমরা মুখে বলি আমরা দেশের ভেতর রাজনৈতিক অস্থিরতা চাই না, সংঘাতের রাজনীতি চাই না। বাস্তবে এই অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদেরই আমরা উৎসাহ দিই, মদদ দেই জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতে। যারা এই অপরাজনীতিকে আঁকড়ে আছে তাদের আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করার সৎসাহস না দেখিয়ে পালাক্রমে তাদের কাছেই নিজেদের সমর্পণ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। আমাদের এই সমর্পণবাদী মানসিকতা দূর না হলে রাজনীতি থেকে অস্থিরতা দূর হবে না, রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে না।

চার দশকের বেশি সময় হল আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি না হয়ে আর কত বছর আমরা কাটিয়ে দেব? আমরা কি বছরের পর বছর শুধু আক্ষেপ করে সময় কাটাব, নাকি ভালোর দিকে পরিবর্তন নিশ্চিত করার জন্য সাহসী ভূমিকা গ্রহণ করব– সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদেরই।

http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/15580

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2] [3] [4] [5] [6] [7] [8] [9] [10] [11] [12] [13]     এই পাতায় আছে271--300