Simool Sen RSS feed

Simool Senএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • তিরাশির শীত
    ১৯৮৩ র শীতে লয়েডের ওয়েস্টইন্ডিজ ভারতে সফর করতে এলো। সেই সময়কার আমাদের মফস্বলের সেই শীতঋতু, তাজা খেজুর রস ও রকমারি টোপা কুলে আয়োজিত, রঙিন কমলালেবু-সুরভিত, কিছু অন্যরকম ছিলো। এত শীত, এত শীত সেই অধুনাবিস্মৃত কালে, কুয়াশাআচ্ছন্ন পুকুরের লেগে থাকা হিমে মাছ ...
  • ‘দাদাগিরি’-র ভূত এবং ভূতের দাদাগিরি
    রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে, শ্যাওড়া গাছের মাথায়, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে, ছাপাখানায় এবং সুখী গৃহকোণে প্রায়শই ভূত দেখা যায়, সে নিয়ে কোনও পাষণ্ড কোনওদিনই সন্দেহ প্রকাশ করেনি । কিন্তু তাই বলে দুরদর্শনে, প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানেও ? আজ্ঞে হ্যাঁ, দাদা ভরসা ...
  • আর কিছু নয়
    প্রতিদিন পণ করি, তোমার দুয়ারে আর পণ্য হয়ে থাকা নয় ।তারপর দক্ষিণা মলয়ের প্রভাবে, পণ ভঙ্গ করে, ঠিক ঠিকখুলে দেই নিজের জানা-লা। তুমি ভাব, মূল্য পড়ে গেছে।আমি ভাবি, মূল্য বেড়ে গেছে।কখন যে কার মূল্য বাড়ে আর কার কমে , এই কথা ক'জনাই বা জানে?এই না-জানাদের দলে আমিই ...
  • একা আমলকী
    বাইরে কে একটা চিৎকার করছে। বাইরে মানে এই ছোট্টো নোংরা কফির দোকানটা, যার বৈশিষ্ট্যহীন টেবিলগুলোর ওপর ছড়িয়ে রয়েছে খাবারের গুঁড়ো আর দেয়ালে ঝোলানো ফ্যাকাশে ছবিটা কোনো জলপ্রপাত নাকি মেয়ের মুখ বোঝা যাচ্ছে না — এই দোকানটার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কেউ চিৎকার করছে। ...
  • গল্পঃ রেড বুকের লোকেরা
    রবিবার। সকাল দশটার মত বাজে।শহরের মিরপুর ডিওএইচেসে চাঞ্চল্যকর খুন। স্ত্রীকে হত্যা করে স্বামী পলাতক।টিভি স্ক্রিণে এই খবর ভাসছে। একজন কমবয়েসী রিপোর্টার চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলছে। কথা আর কিছুই নয়, চিরাচরিত খুনের ভাষ্য। বলার ভঙ্গিতে সাসপেন্স রাখার চেষ্টা ...
  • মহাভারতের কথা অমৃতসমান ২
    মহাভারতের কথা অমৃতসমান ২চিত্রগুপ্ত: হে দ্রুপদকন্যা, যজ্ঞাগ্নিসম্ভূতা পাঞ্চালী, বলো তোমার কি অভিযোগ। আজ এ সভায় দুর্যোধন, দু:শাসন, কর্ণ সবার বিচার হবে। দ্রৌপদী: ওদের বিরূদ্ধে আমার কোনও অভিযোগ নেই রাজন। ওরা ওদের ইচ্ছা কখনো অপ্রকাশ রাখেন নি। আমার অভিযোগ ...
  • মহাভারতের কথা অমৃতসমান
    কুন্তী: প্রণাম কুরুজ্যেষ্ঠ্য গঙ্গাপুত্র। ভীষ্ম: আহ্ কুন্তী, সুখী হও। কিন্তু এত রাত্রে? কোনও বিশেষ প্রয়োজন? কুন্তী: কাল প্রভাতেই খান্ডবপ্রস্থের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। তার আগে মনে একটি প্রশ্ন বড়ই বিব্রত করছিল। তাই ভাবলাম, একবার আপনার দর্শন করে যাই। ভীষ্ম: সে ...
  • অযোধ্যা রায়ঃ গণতন্ত্রের প্রত্যাশা এবং আদালত
    বাবরি রায় কী হতে চলেছে প্রায় সবাই জানতেন। তার প্রতিক্রিয়াও মোটামুটি প্রেডিক্টেবল। তবুও সকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া, মানে মূলতঃ ফেবু আর হোয়াটস অ্যাপে চার ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখলাম। বলাই বাহুল্য সবগুলিই রাজনৈতিক পরিচয়জ্ঞাপক। বিজেপি সমর্থক এবং দক্ষিণপন্থীরা ...
  • ফয়সালা বৃক্ষের কাহিনি
    অতিদূর পল্লীপ্রান্তে এক ফয়সালা বৃক্ষশাখায় পিন্টু মাষ্টার ও বলহরি বসবাস করিত । তরুবর শাখাবহুল হইলেও নাতিদীর্ঘ , এই লইয়া , সার্কাস পালানো বানর পিন্টু মাষ্টারের আক্ষেপের অন্ত ছিলনা । এদিকে বলহরি বয়সে অনুজ তায় শিবস্থ প্রকৃতির । শীতের প্রহর হইতে প্রহর ...
  • গেরিলা নেতা এমএন লারমা
    [মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে লেখকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তার প্রায় এক দশকের গেরিলা জীবন। কারণ এম এন লারমাই প্রথম সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পাহাড়িদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখান। আর তাঁর ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

দেহ যাঁর গেহ/ পুনশ্চ রামপ্রসাদ

Simool Sen



রামপ্রসাদ সেনের কাছে আরও এক বার ফিরে আসা গেল। কার্তিকে যখন পুরোনো বাংলা বছর শেষ হতে চলেছে স্মরণোৎসব আর আকাশপ্রদীপে, সর্বস্বশৃঙ্খলে বাঁধা ইতিহাসের ভেতর থেকে একটি-দুটি ভূত হানা দেয়। ভূত মানে অতীতস্মৃতি যেমন, বিশ্বচরাচরে উপ্ত জীবনদায়ী মৌলও তো, ততটাই। কার্তিকের শেষে মাঠে থরে থরে ধান, দুর্গাসপ্তমীর কলাবউ স্নান থেকে সবুজের যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা খানিক পরেই স্মৃতির খাতায় চলে যাবে।

রামপ্রসাদকে, আবারও, ঠিক এই মোকামেই মনে পড়ে যায়। তাঁর নিদানটি সহজ: মন কৃষিকাজ জানে না। মানবজমিন যদি-বা চষা হত যথাবিহিত, ভারা ভারা সোনা ফলত হয়তো-বা। অথচ বছরের শেষে অন্তিম হিসেব কষতে গিয়ে দেখা গেল, চাষ হয় নি, অতএব সে-শিকেও ছেঁড়েনি। আবাদি জমি ফলত রয়ে গেছে নিষ্ফল।

বদ্যি বংশের ছেলে রামপ্রসাদ, দু' তিন পুরুষে চাষবাস করেছেন কি সন্দেহ, অথচ তাঁর বয়ানে বার বার এক সাধক কৃষক ছায়া ফেলে। সে' কিসসা অনেকেরই জানা– কলকাতায় দুর্গাচরণ মিত্রের সেরেস্তায় মুহুরির কাজে বিপুল ফাঁকি দিচ্ছেন রামপ্রসাদ, সহকর্মীদের মধ্যে ইতিউতি ফিসফাস, চাকরি থেকে বরখাস্ত করার তোড়জোড় শুরু। নাটকীয় সেই কিংবদন্তি-মোতাবেক, রামপ্রসাদকে চাকরি থেকে সরানো হবে-হবে, এমন মোক্ষম মুহূর্তে মনিবের চোখে পড়ল দলিলপত্রের ফাঁকফোকরে ফুটে-ওঠা শ্যামাসংগীত: 'আমায় দে মা তবিলদারি'। সে' সব পদের ভাবরস আর চমৎকৃতি দেখে রামপ্রসাদের শাস্তি মকুব, মাসে-মাসে নির্দিষ্ট খোরাকিভাতার বিনিময়ে তাঁকে বাপের ভিটে কুমারহট্টে পাঠিয়ে দিলেন ধর্মভীরু মনিব দুর্গাচরণ।

রামপ্রসাদ জাতে বদ্যি। কিন্তু ধাতে, মনে হয়, তিনি এক নির্বিকল্প কায়স্থ। কায়স্থ শব্দটির ব্যুৎপত্তি ও ব্যঞ্জনা লুকিয়ে আছে কায়ায়, আধারে। মাসখানেক আগে রামপ্রসাদকে ফের মনে পড়ল করণিক শব্দটির উৎস খুঁজতে গিয়ে। করণ মানেও কায়স্থের মতই উৎসগত ভাবে সেই দেহ, কায়া, শরীর, সেই নাছোড় আধারের অবয়ব– যে দ্যোতনার প্রতি ইঙ্গিতে এক দিন লিখেছিলেন তিনি: 'দেহের মধ্যে সুজন যে জন, তার ঘরেতেই ঘর করেছি।' সেই ঘরের ভেতরেই তাঁর আবাস, সেই আধারের ভেতর তার হয়ে-ওঠার সাধনা– যেখানে আশ্চর্য সাধনায় ব্রতী হয়ে এক দিন বলতে পেরেছিলেন: 'কালীনাম কল্পতরু, হৃদয়ে রোপণ করেছি'। নিরন্তর কর্ষণের উপমায় মনোভূমিতে গতর খাটাচ্ছেন শহুরে সেরেস্তায় দলিলপত্রের কারবারি, আদত লক্ষণার্থেই পেশাদার, কর্মী মানুষ কেরানি রামপ্রসাদ।

জাতের সঙ্গে দেহের সম্পর্ক নিবিড়, আর আপ্তপুরুষের দেহটিই তো সেই সূত্রে বৃত্তি আর কর্মের প্রশস্ত প্রান্তর। ব্রহ্মার হাড় থেকে কায়স্থ জাত, আর যমের দরবারি হিসেবলিখিয়ে চিত্রগুপ্ত কায়স্থের সেই প্রাচীন আধার। সেই দেহভাণ্ডেই তার আবাস। শুধু কর্ম নয়– কায়স্থের আদিপুরুষ চিত্রগুপ্ত ধর্মরাজও বটেন, তিনি পাপপুণ্যের খতিয়ান বাতলান। ধর্ম মানে এসেন্স, সার, গুণ, বা স্বভাব, ধর্ম মানে প্রকৃতি। একই সঙ্গে, ধর্ম মানে কৃত্য বা করণও। প্রকৃতি ব্যক্ত হয়ে ওঠে কার্তিকশেষে। সাংখ্য বিধানে, এই প্রকৃতির বিপ্রতীপে ঠায় দাঁড়িয়ে পুরুষকার– নিরন্তর চর্যা, কর্ষণ আর শারীরিক শ্রমের ব্যঞ্জনা বয়ে। স্বভাব বা নেচারের ভাঁড়ার সীমিত, রামপ্রসাদি বয়ানে তাকে অনূদিত করতে হবে সাধনা ও চর্যায়।

করণ মানে সুতরাং আধার, করণ মানে পদ্ধতি। রামপ্রসাদ কী উপায় বাতলাচ্ছেন তবে? চর্য়ার কোনও এক নতুনতর উপায়ের দিকে যাত্রা করছেন তা হলে তিনি? কোনও কায়া, বা কোনও আধার-শরীরের দিকে– যে ধ্রুবপদে মন কৃষিকাজ জানে না বলে তাঁর একান্ত অনুযোগ?

এর উত্তর ঠিক জানা নেই। তবে, মোগল আমলের শেষাশেষি সেই সময়টা বাংলার জাতীয় জীবনে রবরবার। জমি উদ্বৃত্ত, সম্পদের বিচিত্র সব ফিকির, এত কালের অনাবিষ্কৃত চালানের নতুন সব সড়ক খুলে গেছে, হাজির হয়েছে প্রাতীচ্য বণিকের জাদুলাঠি। রামপ্রসাদ, এমতাবস্থায়, ঘোরাফেরা করছেন ব্যক্ত প্রকৃতি আর অর্জনক্ষম পুরুষের দুই বিপরীতমুখো জানলা-বরাবর: 'এক ব্রহ্ম দ্বিধা জেনে মন আমার হয়েছে পাজি।' এক দিকে সেই প্রকৃতিদত্ত, স্বয়ংব্যক্ত গুণ, স্বভাব বা নেচার, অন্য দিকে কালচার, কৃষ্টি– চর্যা, প্র্যাক্সিস, শ্রম আর হয়ে-ওঠার খতিয়ান। 'মানববৃত্তির নিয়ত উৎকর্ষণই ধর্ম', একশো বছর ধর্ম্মতত্ত্বে পরে বলবেন না বঙ্কিম? রামপ্রসাদ সেই উপায় বা রাস্তাকে খুঁজে পাবেন তার আধারে, শরীরে, আর তার অনুষঙ্গে লেপটে-থাকা সাধনা ও চর্যার নিগূঢ় প্রকরণে, যার পরতে পরতে জেগে উঠবে কুলতুরা, কর্ষণ– পরবর্তী সময়ের নিহিতার্থে যা কালচার। এই রামপ্রসাদই তো বলতে পারেন, 'ভবহাটে দেহ বেচেছি'– যে দেহ তাঁর মেধাজীবী হিসেবরক্ষক করণিকযাপনের বহু, বহু দূরের দ্বীপ।

রামপ্রসাদের কালী ছিলেন তমোগুণের অধিকারিণী কর্মমার্গের সেই দেবী, যার নেতৃত্ব মেনে নেওয়া মানে আধারকে বা কায়াকে করে তোলা অচ্ছেদ্য সাধনার, চর্যার, কৃষ্টির, বা পরবর্তীর বঙ্কিমি অনুশীলনের অংশ। জাতে বদ্যি আর কাজে মুহুরি তিনি যতই হোন, তাঁর ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকে এক আবহমান সাধক চাষির প্রতিরূপ, যে প্রতীকে বেঁচে ছিল বৌদ্ধ তন্ত্র থেকে বাউল দর্শনের শাশ্বত দেশজ সারাৎসার। অথচ ডিক্লাসড হওয়া কাকে বলে, রামপ্রসাদ সেন জানতেন না। দিগন্তে এক নতুন শ্রেণির সম্ভাবনা তখন উদীয়মান, জন্ম আর কাজের পুরোনো ফিরিস্তি শিথিল হয়ে এসেছে যৎকিঞ্চিৎ। ইউরোপ তত দিনে প্রায় অশ্বমেধঘোড়া ছুটিয়ে বাংলায় উপনীত। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর তাঁর জীবৎকালে ঘটে নি, কিন্তু কৃষিব্যবস্থার এত কালের প্রতাপ যেন-বা যায়-যায়। এই পরিস্থিতিতে, রামপ্রসাদ হ্যালুসিনেট করেন আর এক আদিশক্তি অন্নপূর্ণাকে, কারণ রাজা হতে তিনি নাচার, বরঞ্চ ভাতডাল যেন-বা নিয়মিত জোটে, শস্যদায়িনী-সমীপে এ-ই তাঁর নিতান্ত প্রার্থনা। অন্নপূর্ণা আর্ত ভক্তকে কাশীতে দৈব আদেশ পাঠান গান রচনার জন্য, আবার রামপ্রসাদের খেতে এসে বেড়াও দিয়ে যান সেই খিলখিলে হাসির গৃহী তরুণী। শাকম্ভরী অন্নপূর্ণা যেন-বা দেহে স্থিত রামপ্রসাদের সেই কৃষকজীবনের আদিম নক্ষত্র। আর, আজকের এই রামপ্রসাদি অমাবস্যার পূর্বমুহূর্তে, গত কালই কার্তিকের মাঝামাঝি চলে গেল না চোদ্দো শাকের তিথি? এই হেমন্তিকা ঘরে ঘরে বার বার ডাক পাঠিয়ে যায় ভূতের কাছে, প্রাণের জৈব উৎসের কাছে, কৃত্রিম আলোর উল্টো দিকে সেই নগ্ন নিরাবরণ অন্ধকারের কাছে।



102 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন