Kallol Lahiri RSS feed

Kallol Lahiriএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • তিরাশির শীত
    ১৯৮৩ র শীতে লয়েডের ওয়েস্টইন্ডিজ ভারতে সফর করতে এলো। সেই সময়কার আমাদের মফস্বলের সেই শীতঋতু, তাজা খেজুর রস ও রকমারি টোপা কুলে আয়োজিত, রঙিন কমলালেবু-সুরভিত, কিছু অন্যরকম ছিলো। এত শীত, এত শীত সেই অধুনাবিস্মৃত কালে, কুয়াশাআচ্ছন্ন পুকুরের লেগে থাকা হিমে মাছ ...
  • ‘দাদাগিরি’-র ভূত এবং ভূতের দাদাগিরি
    রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে, শ্যাওড়া গাছের মাথায়, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে, ছাপাখানায় এবং সুখী গৃহকোণে প্রায়শই ভূত দেখা যায়, সে নিয়ে কোনও পাষণ্ড কোনওদিনই সন্দেহ প্রকাশ করেনি । কিন্তু তাই বলে দুরদর্শনে, প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানেও ? আজ্ঞে হ্যাঁ, দাদা ভরসা ...
  • আর কিছু নয়
    প্রতিদিন পণ করি, তোমার দুয়ারে আর পণ্য হয়ে থাকা নয় ।তারপর দক্ষিণা মলয়ের প্রভাবে, পণ ভঙ্গ করে, ঠিক ঠিকখুলে দেই নিজের জানা-লা। তুমি ভাব, মূল্য পড়ে গেছে।আমি ভাবি, মূল্য বেড়ে গেছে।কখন যে কার মূল্য বাড়ে আর কার কমে , এই কথা ক'জনাই বা জানে?এই না-জানাদের দলে আমিই ...
  • একা আমলকী
    বাইরে কে একটা চিৎকার করছে। বাইরে মানে এই ছোট্টো নোংরা কফির দোকানটা, যার বৈশিষ্ট্যহীন টেবিলগুলোর ওপর ছড়িয়ে রয়েছে খাবারের গুঁড়ো আর দেয়ালে ঝোলানো ফ্যাকাশে ছবিটা কোনো জলপ্রপাত নাকি মেয়ের মুখ বোঝা যাচ্ছে না — এই দোকানটার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কেউ চিৎকার করছে। ...
  • গল্পঃ রেড বুকের লোকেরা
    রবিবার। সকাল দশটার মত বাজে।শহরের মিরপুর ডিওএইচেসে চাঞ্চল্যকর খুন। স্ত্রীকে হত্যা করে স্বামী পলাতক।টিভি স্ক্রিণে এই খবর ভাসছে। একজন কমবয়েসী রিপোর্টার চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলছে। কথা আর কিছুই নয়, চিরাচরিত খুনের ভাষ্য। বলার ভঙ্গিতে সাসপেন্স রাখার চেষ্টা ...
  • মহাভারতের কথা অমৃতসমান ২
    মহাভারতের কথা অমৃতসমান ২চিত্রগুপ্ত: হে দ্রুপদকন্যা, যজ্ঞাগ্নিসম্ভূতা পাঞ্চালী, বলো তোমার কি অভিযোগ। আজ এ সভায় দুর্যোধন, দু:শাসন, কর্ণ সবার বিচার হবে। দ্রৌপদী: ওদের বিরূদ্ধে আমার কোনও অভিযোগ নেই রাজন। ওরা ওদের ইচ্ছা কখনো অপ্রকাশ রাখেন নি। আমার অভিযোগ ...
  • মহাভারতের কথা অমৃতসমান
    কুন্তী: প্রণাম কুরুজ্যেষ্ঠ্য গঙ্গাপুত্র। ভীষ্ম: আহ্ কুন্তী, সুখী হও। কিন্তু এত রাত্রে? কোনও বিশেষ প্রয়োজন? কুন্তী: কাল প্রভাতেই খান্ডবপ্রস্থের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। তার আগে মনে একটি প্রশ্ন বড়ই বিব্রত করছিল। তাই ভাবলাম, একবার আপনার দর্শন করে যাই। ভীষ্ম: সে ...
  • অযোধ্যা রায়ঃ গণতন্ত্রের প্রত্যাশা এবং আদালত
    বাবরি রায় কী হতে চলেছে প্রায় সবাই জানতেন। তার প্রতিক্রিয়াও মোটামুটি প্রেডিক্টেবল। তবুও সকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া, মানে মূলতঃ ফেবু আর হোয়াটস অ্যাপে চার ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখলাম। বলাই বাহুল্য সবগুলিই রাজনৈতিক পরিচয়জ্ঞাপক। বিজেপি সমর্থক এবং দক্ষিণপন্থীরা ...
  • ফয়সালা বৃক্ষের কাহিনি
    অতিদূর পল্লীপ্রান্তে এক ফয়সালা বৃক্ষশাখায় পিন্টু মাষ্টার ও বলহরি বসবাস করিত । তরুবর শাখাবহুল হইলেও নাতিদীর্ঘ , এই লইয়া , সার্কাস পালানো বানর পিন্টু মাষ্টারের আক্ষেপের অন্ত ছিলনা । এদিকে বলহরি বয়সে অনুজ তায় শিবস্থ প্রকৃতির । শীতের প্রহর হইতে প্রহর ...
  • গেরিলা নেতা এমএন লারমা
    [মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে লেখকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তার প্রায় এক দশকের গেরিলা জীবন। কারণ এম এন লারমাই প্রথম সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পাহাড়িদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখান। আর তাঁর ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭

Kallol Lahiri

চন্দ্রপুলি

ধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন খিটখিটে হয়ে যায়। পইপই করে ধনঞ্জয় বলেছিল মেয়ে ডাকছে এতো করে ঘুরে এসো। ইন্দুবালার ছোট মেয়ে থাকে ব্যাঙ্গালোরে। এবছরেই তাদের সেখানকার পাট উঠবে। জামাই চলে যাবে ইউক্রেনে। মেয়ে তার ছেলেপুলে নিয়ে এসে উঠবে দিল্লী। শ্বশুর বাড়িতে। তারপর সেখান থেকে সোজা স্বামীর কাছে। তাই ওরা বারবার বলছিল একবার আসতে। একটু থেকে যেতে তাদের সংসারে। কিন্তু ইন্দুবালা ছেনু মিত্তির লেনের এই বাড়িটা ছেড়ে কোথাও কোনদিন যাননি। তাঁর যাওয়ার জায়গাও ছিল না। চিলেকোঠার ছাদ থেকে বাড়ির পেছনের বাগান। হোটলের রান্নাঘর। খাবার ঘর। রাস্তার ওপারে কাশির মুদির দোকান। বড়জোর সকালের রেল লাইনের পাশের বাজার। এইটুকু ভৌগোলিক আলোছায়ার মধ্যে ইন্দুবালা নিজেকে আষ্টে পৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিলেন। কেন রেখেছিলেন? বাইরে যেতে ভয় করতো কি তাঁর? মোটেই না। ফুরসত পেতেন না অন্য কোথাও যাওয়ার। প্রাপ্ত বয়েস না হওয়া পর্যন্ত ছেলে-মেয়েদেরও কোথাও যেতে দেননি তিনি। আগলে রেখে ছিলেন কঠিন কঠোর শাসনে। কারণ তিনি জানতেন এই মল্লিক বাড়ির রক্ত খারাপ। একটু আলগা দিয়েছো কি সবাই মাষ্টার রতন লাল মল্লিক তৈরী হবে। ইন্দুবালা তাই তাঁদের কবেকার খুলনার বাড়িতে বসা দাদুর টোলটাকে ওপরের ঘরে গড়ে তুলেছিলেন নিজের মতো করে। ছোট ছোট বাচ্চা গুলোকে নিয়ে এক পুব বাংলার বিধবা যখন হোটেল চালাচ্ছে তখন তাঁর বাড়ি থেকে ভেসে আসছে কচি গলায় পড়ার আওয়াজ। “ছোট্ট মেয়ে রোদ্দুরে দেয় বেগনী রঙের শাড়ি...চেয়ে চেয়ে চুপ করে রই...তেপান্তরের পার বুঝি ওই...”। বড় ছেলে হ্যারিকেনের আলোয় পড়ছে সহজ পাঠ। মেজো ছেলে শ্লেটে লিখছে অ আ ক খ। ছোট মেয়ে কাঁথায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে অকাতরে। জাগলেই দাদারা কেউ না কেউ তাকে দুধ খাইয়ে দেবে। আর ইন্দুবালা তখন দুটো গনগনে উনুনের সামনে। কোনটাতে ফুটছে সোনা মুগের ডাল। কোনটাতে বা ভাত। বোনকে বেশ খানিকটা বড় করে তুলেছিল দাদারাই। তাই বোন মায়ের থেকেও দাদাদের ন্যাওটা বেশি। সেই ছোট থেকেই। দাদারাও বোন বলতে প্রান। তিনজনের বড় হয়ে ওঠাটা একে অন্যকে অবলম্বন করে। তার মাঝে খাড়া হয়ে বট গাছের মতো আছে যেন মা। ঝুড়ির সাথে বট গাছের যেমন সম্পর্ক ঠিক তেমনি ছিল ওর ছেলে মেয়েরা। মা আছে জানলে ওরা নিশ্চিন্ত হত। আর ইন্দুবালা নিশ্চিন্ত হতেন ওদের সারাক্ষণ চোখের সামনে দেখে। খুব যে হুজ্জুতি ওরা করতো তেমনটা নয়। সেই সময়ও ওরা পেত না। ছোট থেকেই ওরা জেনে এসেছে ওদের মা বাবা একজনই। আর তিনি হলেন ইন্দুবালা। যার আবার একটা হোটেল আছে। সেই হোটেল না চললে ওদের ভাতও জুটবে না। কেমন করে যেন ফুস মন্তরের মতো কানে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন ইন্দুবালা। তাই ছোট থেকেই ওদের চাহিদা ছিল খুব কম। মাঝে মাঝে নিজেই অবাক হয়ে যেতেন ইন্দুবালা। ওরা যখন একটু একটু করে বড় হচ্ছিল ওদের দেখে ইন্দুবালার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়তো। নিজেও তো ভাইকে একদিকে দিদি আর এক দিকে মায়ের মতো বড় করে তুলছিলেন। তবুও যেটুকু স্নেহ পরশ শীতের হিমের মতো তাঁদের গায়ে লেগে থাকতো এই বাচ্চা গুলোর কপালে তা জোটেনি। সেই স্নেহ কোমলতা ইন্দুবালা নিজের শরীরের অন্তঃপুরে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কখনও কোন দুর্বলতার মুহূর্তেও তিনি প্রকাশ করেননি।

ইন্দুবালাকে কোনদিন কাঁদতে দেখেনি তাঁর ছেলে মেয়েরা। যেটা মুখ দিয়ে বলেছেন সেটাই করেছেন। যা চেয়েছেন সেটাই করতে হয়েছে ছেলেমেয়েদের। ছোট থেকে তাই বড় অনুশাসনে মানুষ হয়েছে তারা। পান থেকে চুন খসার জো ছিল না। নিয়মিত স্কুলে গিয়ে খোঁজ খবর নিতেন ইন্দুবালা। বাড়িতে রেখেছিলেন পড়ানোর জন্য মাষ্টার। ছেনু মিত্তির লেনে পুব দিকে যে স্কুলটা আছে সেটা নাকি সরকারী। ওখানে টাকা পয়সা তো লাগেই না তার ওপরে আবার দুপুর বেলা চাড্ডি খেতে দেয়। ওই স্কুলের এক অঙ্কের স্যার মাঝে মাঝেই ইন্দুবালার হোটেলে ভাত খেতে আসতেন। ইন্দুবালা তার কাছ থেকে সব নিয়ম নীতি শুনে স্কুলে চলে গিয়েছিলেন নিজেই। দুই ছেলেকে সেই স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। ছেলেদের হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন ঘরের কাজ। রান্না-বান্না। কাপড় কাচা। বাসন মাজা। ধনঞ্জয়ের সহ্য হতো না। ওই টুকু ছোট ছোট হাতে ছাই ঘাঁটবে মা? ইন্দুবালার জবাব ছিল, না হলে পদ্ম হবে কী করে? ইন্দুবালা ছেলে মেয়েদের সামনে যে কঠোর কঠিন অনুশাসন রেখেছিলেন আমাদের বাঙালী ঘরে সেটা বড় একটা দেখা যায় না। কেন এমন কঠোর হয়েছিলেন ইন্দুবালা? কেমন এমন কঠোর হয়েছিলেন ইন্দুবালা? তাঁকে তো এমন অনুশাসনের মধ্যে বড় হতে হয়নি। একটা নয় একাধিক কারণ এর পেছনে ছিল। তিনটে নদী পেরিয়ে তিনি যেদিন কলকাতায় এসে এই মল্লিক বাড়িতে ঢুকেছিলেন সেদিন থেকেই বুঝেছিলেন তার ভাগ্য কলাপোতায় যেমন টিমটিম করে জ্বলছিল এখানে এসে বুঝি তা নিভলো। কলকাতার বাবুরা বিকেলে গলায় পাওডার মেখে তাস পেটায়। রাতে বউ পেটায়। ভোর রাতে সোহাগ করে। আর গোটা দিন পাশ বালিশ বুকে জড়িয়ে ঘুমোয়। কিম্বা চিৎপুরের কোন বাড়িতে মাছের তেল চচ্চড়ি খেয়ে গা মালিশ করায়। ইন্দুবালার এই বাড়িতে নানা রকমের প্রতিবন্ধকতা ছিল। জীবনের নানা চড়াই উতরাই বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে ইন্দুবালাকে করে দিয়েছিল ক্ষত বিক্ষত। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যদি কোন দিন কোন সন্তান আসে তাঁর জীবনে এই বাড়ির কোন পুর্ব পুরুষের ছায়া তিনি তাদের ওপর পড়তে দেবেন না। বড় ছেলে যখন পেটে শাশুড়ি তখন সবে তার চলৎ শক্তি হারাতে বসেছেন। তাও তাঁর খানদানি মেজাজে তখনও বয়সের জঙ পড়েনি। নাতির মুখ যে বুড়ি দেখতে পাবে সেই আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন তিনি। কাজেই বাড়িতে পিতৃ পুরুষের মুখে জল দেওয়ার লোক এসেছে শুনে তিনি আহ্লাদিত হয়েছিলেন। কিন্তু নাতিকে তেল মাখানো ছাড়া বড় বেশী সোহাগ করার সময় পাননি। মেজো ছেলে যখন হল শাশুড়ি বিছানা নিলেন। আর ছোট মেয়েকে দেখে যাওয়ার অবকাশ তাঁর হয়নি। যে বাড়িতে মা ষষ্ঠী বিরূপ বলে দোজবরে ছেলের আবার বিয়ের দিয়ে ছিলেন সেই বাড়ির উঠোন জোড়া বাচ্চাদের কলকাকলি তাঁর শুনে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু মনে মনে এক পরম শান্তির গিঁট দিয়েছিলেন তিনি। এক গুষ্টি ঘটির মাঝে এক বাঙাল মেয়ে নিয়ে আসার দুর দর্শিতার বাহবা দিতে দিতে বুড়ি চোখ বুঁজেছিলেন। মাষ্টার রতন লাল মল্লিক পরলোকে গিয়েছিলেন তারও কিছুদিন পরে। ইন্দুবালা নিজে হাতে মুখাগ্নি থেকে শুরু করে শ্রাদ্ধ শান্তি তো করে ছিলেনই। এমনকি এখনও পর্যন্ত প্রত্যেক মহালয়ায় বাড়িতে পুরোহিত ডেকে বাপের বাড়ি আর শ্বশুর বাড়ির লোকদের জলের ব্যবস্থা করেন। নিজে দিতে পারেন না বলে পুরোহিতকে দিয়ে দেওয়ান। ছেলে মেয়েদের সেই দিকে ঘেষতে দেন না একটুও। বড় হলেও না। এই নিয়ে তাদের অনেক প্রশ্ন ছিল। সব জবাব থেমে যেত ইন্দুবালা যখন বলতেন আগে মরি তারপর নিজেরাই সব সামলিও। বড় হয়ে মল্লিক বাড়ির শেকড়ের উৎস সন্ধানে নিজেরা যখন আগ বাড়িয়ে গেছে তখন হোঁচট খেয়েছে বারে বারে। তখন বুঝতে পেরেছে তারা কেন তাদের মা বাড়ির চারপাশের জমাট অন্ধকার থেকে এইভাবে দূরে রেখেছে। কেন তাদের কাছে স্বপ্নের মতো হয়ে উঠেছে খুলনার কোন এক অখ্যাত অজ গাঁ কলাপোতা। বাবার থেকে তারা না দেখা মামার বাড়ির গ্রামটাকে যেন বেশি করে চেনে। মাষ্টার রতনলাল মল্লিক তাদের কাছে বাবা হিসেবে কাগজে কলমে পরিচয় আর ছাড়া আর কিছুই না। মাঝে মাঝে ঝোড়ো হাওয়ার মতো কোন কোন বদ দূর সম্পর্কের শ্বশুর বাড়ির আত্মীয় এসে সম্পত্তি বাগাতে চেষ্টা করেছে। ছেলে মেয়েদের উস্কিয়ে দিয়েছে। ইন্দুবালা নিজে সেইসব ফাটল মেরামতি করেছেন। এখানে এইগুলো হয়তো বিস্তারে বলা যেতে পারতো তাহলে আর পাঁচটা ঘরের কুট কচালির মতো হতো ব্যাপারটা। লাউয়ের খোসায় পোস্ত দিয়ে ভাজার স্বাদটা আর থাকতো না। গরম ভাতও হয়ে যেত জিরুনো। ছোট থেকে বাচ্চারা এই ছেনু মিত্তির লেন ছেড়ে বেরোয়নি খুব একটা। বাবা বাছা করে আদর করেনি তাদের কেউ। মামার বাড়ি থেকে আসেনি তাদের জন্য কোনদিন পুজোর জামা। কিম্বা বাবার দিকের কোন কুটুম পয়লা বৈশাখে পাঠায়নি মিষ্টির হাঁড়ি। অথচ তারা জানতো খুলনা বলে একটা জায়গা আছে। কলাপোতা বলে একটা গ্রাম। সেই গ্রামে একটা বড় উঠোন ওয়ালা বাড়ি আছে। সেই বাড়িতে একটা তুলসী মঞ্চ আছে। কপোতাক্ষ নদীর পাড়ে আছে মায়ের স্কুল। একটা নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুকে নিয়ে বাংলা ভাষার জন্য তাদের মামা, দিদা সবাই শহীদ হয়েছে। তাদের মা শহীদ পরিবারের মেয়ে।

আদর আহ্লাদে ইন্দুবালা বড় করেননি ছেলে মেয়েদের ঠিকই। তাই বলে ভালোবাসা ছিল না বললে কথকের পাপ বাড়বে। ইন্দুবালার ভালোবাসা সেই ছোট্ট থেকে ছেলে মেয়েরা বুঝে গিয়েছিল অন্যরকম ভাবে। তাদের জন্য বড় বড় বয়ামে, কাচের শিশিতে, এ্যালুমিনিয়ামের কৌটোয় ইন্দুবালা যত্ন করে কত কিছু যে খাবার করে রাখতেন। কোনটাতে নাড়ু, কোনটাতে মুড়ির মোয়া, চিড়ে ভাজা, কুচি নিমকি, গজা। আরও কত কি যে। আজ তা নিজেও মনে করতে পারেন না। বড় ছেলে যেবার কলেজের পরীক্ষা দিল সেবার নিজে গিয়ে কালীঘাটের মায়ের কাছে পুজো দিয়ে এসেছিলেন। বলে এসেছিলেন কোনদিন নিজের জন্য তিনি কিছু চাননি কিন্তু ওকে দাঁড়াবার জায়গাটুকু করে দিও মা। ছেলে ভালোভাবে পাশ করেছিল। শুধু তাই নয় ভালো একটা কলেজে পড়তেও গিয়েছিল সে। ইন্দুবালা জানতেন একটাকে দাঁড় করাতে পারলে বাকি গুলোও ঝপঝপ করে দাঁড়িয়ে পড়বে। তাই হয়েওছিল। বড় ছেলে প্রথম চাকরীর মাইনেটা মাকে দিতে এলে ইন্দুবালা খুশী হয়েছিলেন মনে মনে। কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করেননি। টাকা তো তিনি নেননি। বরং ছেলের বিয়ে দিয়ে আলাদা করে দিয়েছিলেন। বাকি দুটো কথা শোনাতে এলে ইন্দুবালা তাদের মুখের ওপর সোজা সাপটা বলে দিয়েছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে এবার নিজেদের পথ দেখতে হবে। তাঁর চারপাশে থেকে ভিড় বাড়ানো বরদাস্ত করবেন না তিনি। বড় রুক্ষ মনে হয়েছিল সেদিন কি ইন্দুবালাকে? তাতো হয়েছিলই। কিন্তু তিনি জানতেন প্রথম থেকে দূরে না সরালে আর কোনদিনই যে ওরা নিজেদের গুছিয়ে উঠতে পারবে না। নিজের সংসার হবে না। মাথা গোঁজার জায়গাও। আস্তে আস্তে বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল ইন্দুবালার। জীবনটা তো তারও অনেকদিন আগেই ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল তার। ধনঞ্জয় শাপ শাপান্ত করলো। কেমন মা তুমি? ছেলে মেয়েদের দূর করে দিলে? মরার সময় জল পাবে না দেখে নিও। ভর সন্ধ্যে বেলায় ধনঞ্জয়ের কথাটা বড় বুকে বেজেছিল। কিন্তু ইন্দুবালা জানতেন তাঁর দুই কূলে কেউই মরার আগে জল পায়নি। তিনও যে পাবেন সেই আশাও করেন না। ইন্দুবালা তাই কালো তিলের সাথে গঙ্গাজল দেন প্রতিবছর। পিতামহ থেকে শুরু করে মাতামহ শ্বশুর বাড়ির তিনকূলের কেউই বাদ পড়ে না। এমনকি মনিরুল...সেই কবেকার একাত্তরের যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া নিজের প্রথম প্রেমকে পর্যন্ত সারাদিন নির্জলা থেকে ইন্দুবালা জল দেন। মনটা ঝুপ করে খারাপ হয়ে যায়। ধনঞ্জয় সেটা বুঝতে পারে। বিরক্ত করে না তখন সে ইন্দুবালাকে। নিজে নিজে উনুন ধরায়। সবজী কাটে। আটা মাখে। ইন্দুবালা নীচে নামেন অনেক দেরী করে। মহালয়ায় ইন্দুবালার হোটেলের মেনু সাদা তিলের বড়া, নারকেল ডাল, কুচো মাছের চচ্চড়ি আর চালতার চাটনি। মেসের ছেলে মেয়েগুলো হাপুস হুপুস করে খেয়ে আঙুল চাটতে চাটতে শুতে যায়। চাঁদপানা মুখ গুলো আবার কয়েকদিন দেখতে পাবেন না ইন্দুবালা। কেউ জড়িয়ে ধরে। কেউ চুমু খায়। কেউ সেলফি তোলে। দিদাকে তারা নাকি খুব মিস করবে। ভালো থেকো তুমি। আর পুজোয় একদম ভালো ভালো রান্না করো না। তাহলে ওই ধনাদাই সব খাবে। কত কি সব কলবল করতে করতে বেরিয়ে যায়।

কিচ্ছুটি মুখে না দিয়ে ইন্দুবালা ওপরের ঘরে গিয়ে চুপটি করে বসেন। কাদের জন্য তাঁর আজ এতো ফাঁকা ফাঁকা লাগে? সব্বাইকে নিয়ে থাকলে আজ এই নিশুতি রাতে এই বাড়ি গমগম করতো। কোন ঝগড়া নেই। ঝাঁটি নেই। মনের কোন মালিন্যতা নেই। তবুও ছেলে মেয়ে গুলোকে এতো দূরে সরিয়ে রেখে কি পেলেন তিনি? একা বাঁচার সুখ? কার জন্যে একা হয়ে গেলেন তিনি? বাবার জন্যে? মনিরুলের জন্যে? মাষ্টার রতনলাল মল্লিকের জন্য? নাকি অলোকের জন্য? দম বন্ধ হয়ে আসে তাঁর। ঠিক এইরকম সময়ে ইন্দুবালার যেটা হয় তিনি আর চুপ করে বসে থাকতে পারেন না। কাজ করতে হয় তাঁকে। মনে পড়ে যায় দশটা নারকেলের কথা। কিলোটাক ক্ষোয়া ক্ষীর। ধনঞ্জয় মাঝরাতে শুনতে পায় খড়খড় আওয়াজ। ঘুম থেকে উঠে দেখে নারকেল কুরছেন ইন্দুবালা। খিঁচিয়ে ওঠে ধনঞ্জয়। নিজে তো শান্তি পাবেই না। আমাকেও শান্তি দেবে না তুমি? ইন্দুবালা মুখ না তুলেই বলেন তুই শুতে যা ধনঞ্জয়। আর যাওয়ার সময় রান্না ঘরের দোরটা দিয়ে যা। ধনঞ্জয় যেতে চায় না। কাল সকালে এইসব নিয়ে বসলে হোত না? এই এতো গুলো নারকেল এখন কুড়বে? বাটবে? তার চেয়ে যাওনা ছেলে মেয়েরা পুজোয় কত কি পাঠিয়েছে সেগুলো দেখো না। ঘুম না এলে সেলাই ফোড়াই করো। ইন্দুবালা খুব শান্তভাবে তাকান ধনঞ্জয়ের দিকে। এই সময়ে তাঁর একটুও ঝগড়া করতে ইচ্ছে করে না। আমি কী করবো না করবো সব তুই বলে দিবি নাকি ধনা? ইন্দুবালার এই চাহনি ধনঞ্জয় চেনে। মনে যা ভেবেছে তাই করবে। সে দাঁড়ায় না। দোড় এঁটে চলে যায়।

চন্ডীমন্ডপে অধিবাসের ঘট বসে গেছে। মহালয়াতে পুজোও হয়েছে কাঁসর ঘন্টা পিটিয়ে। কিন্তু কুমুদ পালের তখনও চোখ আঁকা হয়নি মা দুর্গার। তার ছানাপোনাদের। অনেকের সাথে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ইন্দুবালাও চন্ডীমন্ডপে থামের সামনে। টিমটিম করে জ্বলছে হ্যারিকেন। কুমুদ পাল তোরজোড় করছে কাজ শুরু করার। ঠিক সেই সময়ে কেউ একজন খোঁচা মারে ইন্দুবালাকে। সে বিরক্ত হয়। পেছন ফিরে দেখে অতসী। স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে। তারই দিকে তাকিয়ে। মুখে বল না অতসী ওমন খোঁচাচ্ছিস কেন? অতসী ফিসফিস করে বলে, বাড়ি চল। মেয়েদের ন্যাংটা ঠাকুর দেখতে নেই। মা বলেছে। ইন্দুবালা বলে তোর মা বলেছে যখন তুই যা না। আমি এখন চোখ আঁকা দেখবো। তারপর দুগগার শাড়ি পড়াও। অতসী মুখ ব্যাঁকায়। এইজন্যে সবাই তোকে ঢুলুনি বলে। ব্যাটাছেলেদের গায়ে পড়া। ওই দ্যাখ কে এসেছে। ডাকছে তোকে। ইন্দুবালা ফিরে তাকায়। দূরে অন্ধকারে বড় জাম গাছটার নীচে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে মনিরুল। যদিও মনিরুল তাকে ডাকছে না একটুও। অনেক দূর থেকে দাঁড়িয়ে সে দেখছে ঠাকুরের রঙ করা। ওই টানা টানা চোখ দুটোতে লাল কালির কাজল পরানো। কিন্তু ইন্দুবালার রাগটা যেন চড়াং করে মাথায় ওঠে। চন্ডীমন্ডপ থেকে সোজা নেমে এসে দাঁড়ায় মনিরুলের সামনে। এখানে কী করছিস তুই? মনিরুল আমতা আমতা করে বলে ঠাকুরের রঙ করা দেখছিলাম। ইন্দুবালা আরও রেগে যায়। তোর আবার ঠাকুরের রঙ করা দেখার কি আছে? আমি যা করবো তোকেও তাই করতে হবে মনিরুল? রাগলে তার নাকটা ফুলে ফুলে ওঠে। মনিরুলের সেটা দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু এখন একটুও তাকাতে পারছে না সে ইন্দুবালার দিকে। সবে গোঁফ ওঠা ছেলেটা মাথা নীচু করেই বলছে তোর খারাপ লাগবে জানলে আসতাম না। ইন্দুবালা আরও ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে আসবি না। চলে যাচ্ছে মনিরুল আস্তে আস্তে সাইকেল নিয়ে হেঁটে হেঁটে। ইন্দুবালাও ফিরে যাচ্ছে চন্ডীমন্ডপে। দুগগার চোখ আঁকা হচ্ছে। কুমুদ পাল তার শিল্পীর হাতের ছোঁওয়ায় দেবীর প্রান প্রতিষ্ঠা করছেন। কপোতাক্ষের মাটির ঠাকুরও যেন জ্যান্ত হয়ে উঠছে। কিন্তু এইসব আর ভালো লাগছে না ইন্দুবালার দেখতে। বাড়ি চলে যাচ্ছে ইন্দুবালা। কেন অমন করে বলতে গেল মনিরুলকে সে? কি ক্ষতি হতো সে দুগগার চোখ আঁকা দেখলে? সবাই তো দেখছিল। ওই অতসীটাই হচ্ছে যত নষ্টের গোড়া। ইন্দুবালাকে বলে কিনা ছেলে ঢলানি? যত রাগটা সে তাপসীর দিকে নিয়ে যেতে চায় তত রাগ গড়িয়ে আসে নিজের দিকে। ঠিক করলো কি ইন্দুবালা? মনিরুলকে কেন অমন করে বললো সে? আর কেনই বা মনিরুলের কথাই বারবার মনে পড়ছে? ভালোবেসে ফেললো নাকি ছেলেটাকে? অন্ধকারে পুকুর পাড় দিয়ে যাওয়ার সময় নিজেই যেন নিজের মুখ চাপা দেয় ইন্দুবালা। কি বলছে সে? এক মুসলমান ছেলের সাথে এক হিন্দু মেয়ের বিয়ে হতে পারে না। কোনদিন না। ঝোপ থেকে কোন একটা তক্ষক যেন ঠিক ঠিক বলে উঠলো। ভয় পেয়ে গেলো ইন্দুবালা আরও।

ছুট্টে বাড়ি এসে তার মনটা অবশ্য ভালো হয়ে গেল। ঠাম্মা উঠোন জুড়ে বসে নারকেল কুড়ছে। আর একদিকে দুধ জাল দিচ্ছে কাঠের উনুনে। কি করবে ঠাম্মা? ঠাম্মা হাসে। দেখিস না কি করবো। ইন্দুবালা নাছোড়। না আমাকে বলতেই হবে কি করছো তুমি। ঠাম্মা বলে ওই বারকোষটা তোলতো ইন্দু। এগিয়ে যায় ইন্দুবালা। বারকোষ তোলে। তার নীচে সাজানো ছোট ছোট ছাঁচ। কোনটা ময়ূর। কোনটা পান পাতা। কোনটা আলপনার নক্সা। ইন্দুবালার মুখটা যেন এই অন্ধকারে আরও আলো হয়ে যায়। তুমি চন্দ্রপুলি গড়বে ঠাম্মা? সরাসরি কোন উত্তর দেয় না ইন্দুবালার ঠাম্মা। মা দুগগাকে দেখেছিস তো দিদিভাই? কেমন এক চালার নীচে স্বামী সন্তানদের নিয়ে শান্তিতে আছে। ওই শান্তিটাই বড় জিনিস। ওটা না থাকলে জীবনে কিছুই থাকবে না। ইন্দুবালা নড়ে চড়ে বসে। অশান্তির কি হলো ঠাম্মা? আমি কি কিছু করেছি? ঠাম্মা নারকেল বাটতে বাটতে বলে না তুই কেন করবি দিদিভাই। মানুষ করে। মানুষ মানুষের নামে বদনাম রটায়। এতো রাতে সমত্ত মেয়ে বাইরে থাকলে বাড়ির অমঙ্গল হয়। ইন্দুবালার চোখ ফেটে জল আসে। আমি কিছু করেনি ঠাম্মা। মনিরুলকে চলে যেতে বলেছিলাম। মেয়ের সরলতা দেখে ঠাম্মা কি করবে বুঝতে পারে না। বাড়ির ভেতরে যাতে আওয়াজ না যায় তাই তক্ষুনি ইন্দুবালার হাতে ধরিয়ে দেন হাতাখানা। দুধটা আস্তে আস্তে ঘন হয়ে উঠছে দিদিভাই। যতক্ষণ না ক্ষীর হচ্ছে নাড়তে হবে। তলায় লেগে গেলেই মুশকিল। ধরা দুধের গন্ধ হলে চন্দ্রপুলি কেউ খাবে না যে।

নারকেল কোরা হয়ে গেছে ইন্দুবালার। এই বয়সে দশটা নারকেল কোরা চাড্ডিখানি কথা নয়। ঘামছেন তিনি। এবার বাটতে হবে শিলে ফেলে পুরোটা। মিহি করে। যাতে একটু এবড়ো খেবড়ো কুচি না পড়ে মুখে। জিভে দেওয়ার সাথে সাথে যাতে গলে যায় চন্দ্রপুলি। দিনের বেলা হলে ধনঞ্জয় জোর করে মিক্সিতে বাটতে বলতো। কিন্তু ইন্দুবালা জানেন প্রাচীন এক শিলায় নারকেল বাটা আর যন্ত্রে বাটার মধ্যে অনেক তফাত থাকে। পাথরের ওই স্বাদটা কি তিনটে স্টেনলেস স্টিলের ব্লেড দিতে পারে? কখনোই না। ইন্দুবালা তাঁর শ্বশুর বাড়ির সেই কবেকার ভারী শিল খানা পাতেন। বাটতে বসেন। আর ওই দিকে তখন কবেকার যুগ এফাল ওফাল করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে বড় ছেলে, মেজো ছেলে তার কোলে আবার ছোট্ট মেয়েটা। আমরাও খাবো মা। ইন্দুবালা বলেন আগে হোক। তারপর খেও। এখন ঘুমিয়ে পড় যাও। কিন্তু কেউ যেতে চায় না। তিনজনেই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে ইন্দুবালার দিকে। ইন্দুবালা বুঝতে পারে এরা এখান থেকে কেউ নড়বে না। মায়ের জেদ আর ধৈর্য্য দুটোই তারা পেয়েছে। বড় ছেলেকে উনুনে দুধটা নাড়তে দিয়ে ছোট ছেলেকে এলাচ ছাড়াতে বলেন। মেয়েটা কোলে ঢুললেও বারবার জেগে উঠছে। মেজোর দিকে তাকিয়ে দাদ-দা বলছে। ও বাবা বলতে শেখেনি। কারণ বাবাকে ওর মনেই নেই। এই বাড়িতে বাবা বলে কেউ কাউকে ডাকে না। তাই ওই শব্দটা আপাতত ওর জীবন থেকে উধাও। দুধ উথলে ওঠার হলে বড় ছেলে ফু দেয়। ইন্দুবালা বকেন। ওইভাবে মুখের হাওয়া দিতে আছে? ঠাকুর খাবে না? মেজো এলাচ ছাড়াতে ছাড়াতে বলে তাহলে আমরা কখন খাবো মা? মেয়েটা কোল থেকে মা মা বলে ওঠে। ইন্দুবালা নারকেল বেটে চলেন। রাত বাড়তে থাকে। ঘন দুধ ক্ষীর হলে তার মধ্যে ওই নারকেল বাটা চিনি দিয়ে ভালো করে নাড়তে থাকেন। যতক্ষণ না মন্ডটা শক্ত হয়। ছেলে দুটো ততক্ষণ বসে থাকে। রান্নাঘরের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ঢোলে। মেয়েটা ঘুমের মধ্যে কাদা। ছোট ছোট ছাঁচে পুর গুলো পোরেন ইন্দুবালা। বড় কাঁসার থালায় ভর্তি হতে থাকে ময়ূর, নক্সাকাটা নৌকা, পাঁপড়ি মেলা ফুল, জলের মধ্যে হাঁস, পদ্মপাতার আলপনা আরও কত কতকি। ঘুম থেকে তুলে দেখান দুই ছেলেকে। মেয়েটার তো তখন অতো বোঝার বয়েস হয়নি। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ছেলে দুটো। অবাক হয়ে। আর ইন্দুবালার ঠিক সেই মুহূর্তে কান্না পায়। ভীষণ কান্না পায়। ফাঁকা রান্না ঘরে থালা ভরা চন্দ্রপুলি নিয়ে সত্তর পেরোনো ইন্দুবালা মুখে কাপড় গুঁজে হাহাকার করেন। পাছে ধনঞ্জয় শুনতে পায়। ছেলেদের ফোন করে ডাকে। ওরা জেনে যায় ওদের মা ওদের সত্যি কত ভালোবাসে। ইন্দুবালা জানতে দিতে চান না তাঁর এই ভালোবাসা কাউকে। যাঁদেরই ভালোবাসতে গেছেন তারাই চলে গেছে পৃথিবী ছেড়ে। এটা যে অভিশাপ তাঁর জীবনে। উনি এই বয়সে সন্তান শোক পেতে চান না।

ঠাম্মা তাকিয়ে থাকে ফর্সা হয়ে আসা আকাশের দিকে। কাঠের উনুন প্রায় নিভে গেছে। উঠোন খানা ভর্তি হয়ে আছে হাতে গড়া ঠাম্মার চন্দ্রপুলিতে। মেয়ে মানুষের এতো কান্না কিসের? বুকে পাথর না বসাতে পারলে মেয়ে মানুষ হয়েছিস কি জন্য তুই? যা সাজি ভরে শিউলি ফুল তুলে নিয়ে আয়তো দিদিভাই। আর হাতে কয়েকটা চন্দ্রপুলি নিয়ে যা। যাকে ভালো লাগবে তাকে দিস। জীবনে বিলিয়ে দেওয়ার চেয়ে আনন্দ আর কিছুতে নেই রে। ইন্দুবালা শাড়ির আঁচলে বাঁধে চন্দ্রপুলি। সাজি নিয়ে সারা রাত না ঘুমোনো চোখে কন্যে চলে ফুল তুলতে। কিন্তু কোনদিকে যাচ্ছে সে? এতো ভটচাজ পাড়া নয়। বিশালক্ষ্মী তলা পেরিয়ে সে যাচ্ছে মোক্তার পাড়ায়। কেন যাচ্ছে সে? অনেক ভোরে মোক্তার পাড়ার মাঠে শিউলি গাছটার নীচে কে যেন শাদা চাদর মেলে বসে থাকে। সেই চাদরের টুকরো গুলো কুড়িয়ে সাজিতে ভরতে ভালো লাগে ইন্দুবালার। শরতের এই ভোরেও কেমন যেন হেমন্তের হাওয়া দিচ্ছে। শিরশির করছে গা। চারিদিকে ছেড়া ছেড়া মেঘের মতো কুয়াশা জমাট বেঁধে আছে। থমকে দাঁড়ায় ইন্দুবালা গাছটার সামনে এসে। কে ওখানে দাঁড়িয়ে? কে? এগিয়ে আসে মনিরুল। এতো ভোরে এখানে কী করছিস? কোন কথা না বলে চলে যাচ্ছিল মনিরুল। যদিও সে জানতো এই গাছের ফুল কুড়োতে আসবেই ইন্দুবালা। তাকে আসতেই হবে। সারা রাত সে তো ঘোরের মধ্যে এঁকেছে ইন্দুবালার চোখ। কাজল দিয়ে। টানা টানা। ইন্দুবালা ডাকে মনিরুল। দাঁড়িয়ে পড়ে ছেলেটা। এগিয়ে আসে ইন্দুবালা। মনিরুল বিড়বিড় করে বলে আমি কিন্তু জানতাম না তুমি এখানে আসবে...। আমি তো...। ইন্দুবালা হাত চাপা দেয় মনিরুলের ঠোঁটের ওপর। আমাদের ঠাকুর ঘরে নবদ্বীপ থাকা আনা অনেক পুরনো একটা কেষ্ট ঠাকুর আছে। ঠাম্মার শাশুড়ি তার শাশুড়ির ঠাকুর সেটা। তুই তার মতো চোখ কেন পেলি রে মনিরুল? সারাক্ষণ আমার চোখে ভাসে? শাড়ির খুট খুলে মনিরুলের হাতে ইন্দুবালা ধরিয়ে দেয় সারা রাত তার আর ঠাম্মার মিলে করা চন্দ্রপুলি। ঠাম্মা বলেছিল যাকে ভালো লাগবে তাকে দিস। আর একটা কথা না বলে একটাও ফুল না কুড়িয়েই খালি সাজি নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিল মেয়ে। গায়ে তখন তার ধুম জ্বর।

সকালে উঠে ধনঞ্জয় দেখে কাচের বয়ামে ভর্তি করে রাখা আছে চন্দ্রপুলি। ইন্দুবালা তখন কুচো গজা ভাজছেন। ঠিক করে রেখেছেন ওবেলায় লবঙ্গ লতিকা করবেন। ধনঞ্জয় বুঝতে পারে না এটা কি ইন্দুবালার পাগলামো না জেদ? সারা রাত রান্না করে তুমি তো মরবেই। তোমার ছেলেরা আমাকে জেলে দেবে। ইন্দুবালা এগিয়ে আসেন। আহা ধনা তুই ওইভাবে বলিস না। ছেলে মেয়ে গুলো বিজয়ার পরে এসে একটু মিষ্টি মুখ করবে না? ওই যে চাঁদা তুলতে এসেছিল নণ্টু পিন্টু। বাজারের লোকগুলো। কালেক্টার অফিসের বাবুরা। এদের একটু দেবো না হাতে তুলে? হোটেল যবে থেকে শুরু হয়েছিল সেই বছর পুজো থেকেই বিজয়ার মিষ্টি শুরু করেছিলেন ইন্দুবালা। সেই সময়ে লছমী থাকতো। হাতে হাতে করে দিত মাঝে মাঝে। তারপর ছেলে মেয়েরা। একটু বড় হলে তারা ঠাকুর দেখার নাম করে কেটে পড়তো যে যার মতো। শুধু ইন্দুবালা থেকে যেতেন। তাঁর সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী কেটে যেত রান্নাঘরে। বিজয়ার মিষ্টি তৈরীতে। তাঁর না ছিল নতুন কাপড় পরা। না ছিল প্যান্ডেলে গিয়ে অঞ্জলী দেওয়া। সেসব তিনি বিয়ের আগে কলাপোতায় কপোতাক্ষ নদীতে বিসর্জন দিয়ে এসেছিলেন।

বৃষ্টি নামে ঝমঝম করে। সেই বৃষ্টির মধ্যেই ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের সামনে এক এক করে গাড়ি এসে দাঁড়ায়। বড় ছেলে আসে। মেজো ছেলে। তাদের বউরা। নাতি-নাতনী সবাই। প্রনাম করে। মায়ের হাতে তৈরী চন্দ্রপুলি, কুচোগজা, লবঙ্গ লতিকা, নিমকি সবাই পেট পুরে খায়। ব্যাগ ভর্তি করে নিয়ে যায়। ওরা সবাই গল্প করে। ইন্দুবালা চুপ করে বসে শোনেন। কোথায় কোন ঠাকুর কত বড় হলো। কে প্রাইজ পেলো। তাঁতের সবচেয়ে দামী শাড়িটা পড়তে গিয়ে বড় বউয়ের কী হলো? নাতি নাতনিরা কিভাবে পুজো কাটালো। কোথায় কত লোক হলো। অঞ্জলী দিতে গিয়ে পুরোহিত কেমন বাজে করে মন্ত্র পড়ছিল। কোন রেস্টুরেন্টের পুজোর খাবার জঘন্য ছিল। ওরা নিজেদের মধ্যে গল্প করে। ওদের সবার মধ্যে বসে থেকেও ইন্দুবালার কিছু বলার থাকে না। এই এতো সবার মধ্যে তিনি যেন নিজে একটা দ্বীপ। সেই দ্বীপে তিনি ছাড়া আর কারও প্রবেশ যেন নিষেধ। ছেলেরাও একবারের জন্যেও জানতে চায় না তাদের মা কোথাও গিয়েছিল কিনা। অঞ্জলী দিয়েছে কিনা। তারা জানে তাদের মায়ের ধর্ম কর্ম সব ওই একটিই। ইন্দুবালা ভাতের হোটেল। ঠাকুরের আপ্ত বাক্য। জীবে প্রেম। আর খাওয়া ছাড়া প্রেম আসবে কী করে? অনেক রাতে শুতে এসে প্রতি বছরের মতো এই বছরেও ইন্দুবালা তার হিসেবের খাতা টেনে নেন। একটা সাদা পাতায় লাল কালীতে লেখেন ‘শুভ বিজয়া’। সেটা যে কাকে লেখেন, কেন লেখেন আজ পর্যন্ত কেউ জানে না। (ক্রমশ)

ঋণ-
ঠাম্মা, মনি, দিদা, রাঙা, বড়মা আর মা। এছাড়াও বাংলার সেইসব অসংখ্য মানুষদের যাঁদের হাতে এখনও প্রতিপালিত হয় আমাদের খাওয়া দাওয়া। জিভে জল পড়ার ইতিহাস।


363 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: Santanu

Re: ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭

দুধ ফুটিয়ে ক্ষীর হল, তাতে চিনি আর নারকেল বাটা মেশানো হল - তাহলে খোয়া ক্ষীর টার কি হল?
Avatar: দ

Re: ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭

খোয়া ক্ষীরটা এপারে যখন বৃদ্ধ ইন্দুবালা বানাচ্ছেন তখন লাগছে। ওপারে ঠাকুমা দুধে জ্বাল দিয়ে করতেন, যুবতী ইন্দুবালাও ছেলেদের নিয়ে দুধে জ্বাল দিয়ে ক্ষীর করতেন। এখন মনে হয় দুধের কোয়ালিটি খারাপ হয়েছে জল বেশী। ☺😁
Avatar: Arkaprovo

Re: ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭

এই লেখাটাতে আমি প্রত্যেক বার হারিয়ে যাই। আমার দিদা কে আমি নিন্নি বলতাম। নিন্নির বসে রাঘবশাহী বানানো এখনো আমার ছোটবেলার স্মৃতি হয়ে আছে। ছোট থেকে বড় হওয়ার সময়ে রক্তে চলে এসেছে ময়মনসিংহ গীতিকা , চন্দ্রকোনা সাব-ডিভিশন, পূর্ব পাকিস্তানের সময়, বাইচ খেলার গল্প, সেগুলি ফেলে আসার যন্ত্রনা আর অসাধারণ, ভুলতে না-পারার মতন অনেক গল্প-কাহিনী।
নিন্নি কে সবাই নার্গিস বলে ডাকতো এতো সুন্দরী ছিলেন বলে। এখন বুঝতে পারি তারা কি ভাবে নিজেদের বাঁধভাঙা আবেগ কে পাথর চাপা দিয়ে রাখতেন। মিস ইউ, নিন্নি। এই লেখা টাতে তুমি দেখা দিলে ।
Avatar: Munia

Re: ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭

এই পর্বগুলো পড়ার অপেক্ষায় থাকি!
Avatar: ঝর্না

Re: ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭

অসম্ভব ভালোলাগা দিল ঋণস্বীকার...এবং এ পর্বের লেখাটাও...
সমস্ত প্রিয় খাবার নিয়ে আপনার এক একটি পর্ব, যা দিন দিন বাঙালি রান্নাঘর থেকে হারিয়ে ফেলছি আমরা...
প্রচুর কৃতজ্ঞতা সে জন্য...
Avatar: Du

Re: ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭

এইটা পড়তে গিয়ে সেইসব কালো ছাঁচ আবার বেড়িয়ে আসে কবেকার বারকোশ থেকে এখনও দেখতে পাই শিরা ওঠা সোনালী স্নেহময় হাত।।মারকিউরোক্রোম দেওয়া হাজা হওয়া পাগুলো অজান্তেই খুঁজি বিজয়ার প্রথম প্রণামটা করব বলে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন