এবড়োখেবড়ো RSS feed

এবড়োখেবড়ো-র খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • একা আমলকী
    বাইরে কে একটা চিৎকার করছে। বাইরে মানে এই ছোট্টো নোংরা কফির দোকানটা, যার বৈশিষ্ট্যহীন টেবিলগুলোর ওপর ছড়িয়ে রয়েছে খাবারের গুঁড়ো আর দেয়ালে ঝোলানো ফ্যাকাশে ছবিটা কোনো জলপ্রপাত নাকি মেয়ের মুখ বোঝা যাচ্ছে না — এই দোকানটার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কেউ চিৎকার করছে। ...
  • গল্পঃ রেড বুকের লোকেরা
    রবিবার। সকাল দশটার মত বাজে।শহরের মিরপুর ডিওএইচেসে চাঞ্চল্যকর খুন। স্ত্রীকে হত্যা করে স্বামী পলাতক।টিভি স্ক্রিণে এই খবর ভাসছে। একজন কমবয়েসী রিপোর্টার চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলছে। কথা আর কিছুই নয়, চিরাচরিত খুনের ভাষ্য। বলার ভঙ্গিতে সাসপেন্স রাখার চেষ্টা ...
  • মহাভারতের কথা অমৃতসমান ২
    মহাভারতের কথা অমৃতসমান ২চিত্রগুপ্ত: হে দ্রুপদকন্যা, যজ্ঞাগ্নিসম্ভূতা পাঞ্চালী, বলো তোমার কি অভিযোগ। আজ এ সভায় দুর্যোধন, দু:শাসন, কর্ণ সবার বিচার হবে। দ্রৌপদী: ওদের বিরূদ্ধে আমার কোনও অভিযোগ নেই রাজন। ওরা ওদের ইচ্ছা কখনো অপ্রকাশ রাখেন নি। আমার অভিযোগ ...
  • মহাভারতের কথা অমৃতসমান
    কুন্তী: প্রণাম কুরুজ্যেষ্ঠ্য গঙ্গাপুত্র। ভীষ্ম: আহ্ কুন্তী, সুখী হও। কিন্তু এত রাত্রে? কোনও বিশেষ প্রয়োজন? কুন্তী: কাল প্রভাতেই খান্ডবপ্রস্থের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। তার আগে মনে একটি প্রশ্ন বড়ই বিব্রত করছিল। তাই ভাবলাম, একবার আপনার দর্শন করে যাই। ভীষ্ম: সে ...
  • অযোধ্যা রায়ঃ গণতন্ত্রের প্রত্যাশা এবং আদালত
    বাবরি রায় কী হতে চলেছে প্রায় সবাই জানতেন। তার প্রতিক্রিয়াও মোটামুটি প্রেডিক্টেবল। তবুও সকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া, মানে মূলতঃ ফেবু আর হোয়াটস অ্যাপে চার ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখলাম। বলাই বাহুল্য সবগুলিই রাজনৈতিক পরিচয়জ্ঞাপক। বিজেপি সমর্থক এবং দক্ষিণপন্থীরা ...
  • ফয়সালা বৃক্ষের কাহিনি
    অতিদূর পল্লীপ্রান্তে এক ফয়সালা বৃক্ষশাখায় পিন্টু মাষ্টার ও বলহরি বসবাস করিত । তরুবর শাখাবহুল হইলেও নাতিদীর্ঘ , এই লইয়া , সার্কাস পালানো বানর পিন্টু মাষ্টারের আক্ষেপের অন্ত ছিলনা । এদিকে বলহরি বয়সে অনুজ তায় শিবস্থ প্রকৃতির । শীতের প্রহর হইতে প্রহর ...
  • গেরিলা নেতা এমএন লারমা
    [মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে লেখকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তার প্রায় এক দশকের গেরিলা জীবন। কারণ এম এন লারমাই প্রথম সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পাহাড়িদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখান। আর তাঁর ...
  • হ্যামলিনের বাঁশিওলা
    হ্যামলিনের বাঁশিওলার গল্পটা জানিস তো? একটা শহরে খুব ইঁদুরের উপদ্রব হয়েছিল। ইঁদুরের জ্বালায় শহরের লোকের ত্রাহি ত্রাহি রব। কিছুতেই ইঁদুর তাড়ান যাচ্ছেনা। এমন সময়ে হ্যামলিন শহর থেকে একজন বাঁশিওলা বাঁশি নিয়ে এল। শহরের মেয়রকে বলল যে উপযুক্ত পারিশ্রমিক পেলে সে ...
  • প্রেমের জীবন চক্র অথবা প্রেমিক-প্রেমিকার
    "তোমার মিলনে বুঝি গো জীবন, বিরহে মরণ"।প্রেমের চরম স্টেজটা পার করতে গিয়ে এই রকম একটা অনুভূতি আসে। একজন আরেকজনকে ছাড়া বাঁচে না। এই স্টেজটা যদি কোনভাবে খারাপের দিকে যায় তখন মানুষের নানা পাগলামি লক্ষ্য করা যায়। কখনো কখনো পাগলামিটা তার গন্ডি ছাড়িয়ে ছাগলামিতে ...
  • সত্যিটা
    প্রায়-শূন্য করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল তমালী। করিডোরের প্রান্তে হেডমিস্ট্রেসের ঘর। সেখানে মিটিং আছে। ক’দিন ধরে স্কুলে তোলপাড় চলছে। গুরুতর অভিযোগ। আজ সেই নিয়ে মিটিং। হেডমিস্ট্রেস ছাড়াও ম্যানেজিং কমিটির দু-একজন এসেছেন দেখেছে। আর আসার কথা অবন্তীর বাবা-মা’র। ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

এবড়োখেবড়ো

[কথামুখ — প্রথমেই স্বীকার করে নেওয়া ভালো, আমার ইতিহাসের প্রথাগত পাঠ মাধ্যমিক অবধি। তবুও অ্যাকাডেমিক পরিসরের বাইরে নিছকই কৌতূহল থেকে গান্ধী বিষয়ক লেখাপত্তর পড়তে গিয়ে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই অবিসংবাদী নেতাটি সম্পর্কে যে ধারণা লাভ করেছি আমি, তা আর পাঁচজনের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাওয়ার ইচ্ছে থেকেই এই দুরূহ কাজে হাত দেওয়া।

মূল লেখা শুরু করার আগে কিছু প্রাথমিক কথা বলে নিতে চাই। প্রথমত, পড়ার ছন্দ ও গতি অব্যাহত রাখতে লেখার ফাঁকে ফাঁকে কেবলমাত্র গান্ধীর নিজের লেখাপত্র ছাড়া অন্য রেফারেন্স উল্লেখ করার ব্যাপারটি সচেতনভাবেই পরিহার করেছি; যদিও প্রতিটি পর্বের শেষে আগ্রহী পাঠক যাতে ইচ্ছে করলে সেই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে পারেন সেই উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ লেখাপত্রের উল্লেখ থাকবে। লেখার একদম শেষে থাকবে বিস্তারিত গ্রন্থতালিকাও। দ্বিতীয়ত, উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে শুধু বাংলা বা শুধু ইংরেজিতে মূল উদ্ধৃতিটা না দিয়ে, মূলত একঘেয়েমি কাটানোর জন্যই বাংলা ও ইংরেজি – উভয় ভাষাতেই তা রেখেছি। তৃতীয়ত, এ লেখা অদীক্ষিত পাঠকের জন্যও। তাই কোনও কোনও ক্ষেত্রে ইতিহাসের ঘটনাবলির বিস্তারিত উল্লেখের ফলে ইতিহাস-সচেতন পাঠকরা বিরক্ত বোধ করবেন না, সেই আশা রাখি।

দেবাশিস্‌ ভট্টাচার্য, ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির সাধারণ সম্পাদক, আমাকে গান্ধীবিষয়ক বেশ কিছু বই ও জার্নাল পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এই কারণে তাঁর কাছে আমি অশেষ কৃতজ্ঞ। বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই ঈপ্সিতা পালকেও। তিনি একপ্রকার জোর করেই আমাকে এখানে লেখার সুযোগ না করে দিলে দশ পর্বে বিন্যস্ত এই দীর্ঘ লেখাটি কোনও দিনই হয়তো আলোর মুখ দেখত না।]



অহিংসা-সত্যাগ্রহ-অসহযোগ; মৌনব্রত-আত্মশুদ্ধি-ব্রহ্মচর্য; খাটো ধুতি-আশ্রম-চরকা; নিরামিষ-অনশন-রামধুন; হরিজন-বাণী বিতরণ-বিজ্ঞান বিরোধিতা, বানিয়া-ব্যারিস্টার-বৈরাগীর এক চমৎকার বিরল প্যাকেজ গান্ধী এখন সম্পূর্ণই ব্রাত্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে। তাঁর চরকা, তাঁর খাদি, তাঁর মাদক বর্জনের সংকল্প, তাঁর স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর যাবতীয় অস্ত্র বিসর্জনের প্রতিশ্রুতি, তাঁর সেনাবাহিনী গঠনের অপ্রয়োজনীয়তার আদর্শ — সব কবেই তামাদি হয়ে গেছে। তবুও রাষ্ট্রনেতারা সে কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন না। বরং গান্ধী টুপি পরে এক দল ভড়ংবাজির আশ্রয় নেন, অন্য দল সারা বছর নাথুরামের ভজনা করে একটা দিন বহু কষ্টে তাঁর জন্য বরাদ্দ রাখেন। আর তাঁর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির সুকৌশলী নির্মাণে আদাজল খেয়ে নেমে পড়ে রাষ্ট্র এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে পর পর তিনটে গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগে তিনি তাই অবলীলায় ‘হে রাম’ বলতে পারেন; তার জন্মদিন-মৃত্যুদিনে সরকার বের করে ডাকটিকিট-মুদ্রা; তাঁর জীবন নিয়ে তৈরি ছবি অনায়াসে ছিনিয়ে আনে একগাদা অস্কার। এই বছর তাঁর জন্মের সার্ধশতবর্ষ পূর্তিতে আবারও গান্ধীবন্দনার ঢল নামবে। সেই স্রোতের বিরুদ্ধেই আমার এই অবগাহনের চেষ্টা।

প্রথম পর্ব : গান্ধী ও দক্ষিণ আফ্রিকা — মিথ-মিথ্যার মিশেল

মাঝারি মানের ছাত্র গান্ধী জীবিকার তাড়নায় ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টারি পড়তে যান। পড়া শেষে ভারতে ফিরে এসে বোম্বাইতে আইনজীবী হিসাবে পসার জমাতে না পেরে আংশিক সময়ের ইংরেজি শিক্ষক হিসাবে স্কুলে পড়ানোর জন্য আবেদন করেন। কিন্তু স্নাতকোত্তর ডিগ্রি না থাকায় সেই চাকরি তাঁর হয়নি। শেষে ভগ্নমনোরথ গান্ধী তাঁর ভাই উকিল লক্ষীদাসের সহায়তায় রাজকোটে টুকটাক আইনি পরামর্শ দিয়ে গ্রাসাচ্ছদনের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হন। এই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার ধনী মুসলিম ব্যবসায়ী দাদা আবদুল্লা ট্রান্সভালের অন্য এক ভারতীয় ব্যবসায়ী তায়েব শেঠ-এর কাছ থেকে ৪০ হাজার পাউন্ড আদায় করার জন্য আদালতে মামলা ঠোকেন। আবদুল্লা এমন একজন আইনজীবী খুঁজছিলেন যিনি তাঁর এবং তাঁর অ্যাটর্নি বেকার-এর সঙ্গে দোভাষির কাজে দক্ষ হবেন। ১৮৯৩ সালের প্রথম দিকে আবদুল্লার পোরবন্দরস্থিত মেমন ফার্ম শাখা এ ব্যাপারে গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি রাজি হয়ে যান। গান্ধী তখন ২৪।

স্ত্রী কস্তুরবা এবং দুই পুত্র মণিলাল ও হরিলালকে ভারতে রেখে গান্ধী যখন ১৮৯৩ সালের মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা পৌঁছন, তখন সেখানে ছিল মোটামুটি চার ধরণের জাতি — কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান, শ্বেতাঙ্গ ইউরোপিয়ান – ব্রিটিশ ও ডাচ (বুয়র), ভারতীয় এবং চিনারা। ডাচরা দখল করেছিল অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট এবং ট্রান্সভাল। অন্যদিকে ব্রিটিশরা কেপ কলোনি এবং নাটালের উপনিবেশগুলো অধিকার করেছিল। তখন নাটালে বসবাসকারী ছিলেন প্রায় ৪৫ হাজার ইউরোপীয়, পাঁচ লাখ স্থানীয় আফ্রিকান এবং প্রায় ৩৫ হাজার ভারতীয়। ভারতীয়রা ছিলেন প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত — ‘প্যাসেঞ্জার’ (যাঁরা নিজ খরচে সে দেশে এসেছেন), ‘গিরমিটিয়া’ (‘Agreement’-এর অপভ্রংশ) হিসাবে পরিচিত চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক এবং চুক্তি ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও যাঁরা দেশে ফিরে যাননি। চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকরা মূলত কয়লাখনি এবং কৃষিখামারগুলিতে কাজ করতেন। এঁদের ভোটাধিকার ছিল না, উপরন্তু তাঁদের ওপর চলত শ্বেতাঙ্গ ‘প্রভু’দের অবর্ণনীয় অত্যাচার ও অমানুষিক শোষণ।

তখনও পর্যন্ত গান্ধী ছিলেন ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অত্যধিক অনুরক্ত এবং তাঁদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে ধনী ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ব্যবসা-স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে অসীম আস্থাশীল। তাই গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা পর্বে চুক্তিবদ্ধ ক্রীতদাসতুল্য ভারতীয় শ্রমিকদের দুর্দশা দূর করার বা তাঁদের দৈহিক উৎপীড়ন বন্ধ করার জন্য গান্ধী কোনও চেষ্টাই করেননি। বরং নাটালের প্রবাসী ভারতীয় ব্যবসায়ীরা যাতে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ বণিকদের সমানাধিকার লাভ করতে পারেন, সে ব্যাপারে সতত সচেষ্ট ছিলেন। মূলত এই কারণেই ১৮৯৪ সালের ২২ অগস্ট তিনি গড়ে তোলেন নাটাল ভারতীয় কংগ্রেস বা NIC। নবগঠিত এই সংগঠনের সভাপতি হন ধনী ব্যবসায়ী আবদুল্লা হাজি আদম, সাম্মানিক সম্পাদক হন গান্ধী। প্রধানত চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের এই সংগঠন থেকে দূরে রাখতে কংগ্রেসের চাঁদা ধার্য হয় বার্ষিক তিন পাউন্ড। এই কংগ্রেসের মূল উদ্দেশ্য ছিল “To promote concord and harmony among the Indians and Europeans residing in the colony [of South Africa]”। সংগঠনের সম্পাদক হিসাবে দরখাস্ত লেখা, সরকারি আধিকারিকদের কাছে প্রতিনিধি দল পাঠানো, বিভিন্ন সংবাদপত্র ও বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের কাছে নিজেদের দাবি আদায়ের সমর্থনে চিঠি লেখা এবং বিভিন্ন সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তমূহ সরকারের নজরে আনা ইত্যাদির মধ্যেই গান্ধীর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল।

১৮৯৫ সালের মে মাসে নাটাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি ভারতীয় চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের বিষয়ে Indian Immigration Law Amendment Bill আনে। এই বিলে দু’টি সংশোধনী আনা হয়। প্রথমত, চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের চুক্তির মেয়াদ পূর্বতন পাঁচ বছরের পরিবর্তে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য করা হয়। দ্বিতীয়ত, কেবলমাত্র চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেই তাঁদের ভারতে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হয়। তাঁরা যদি ভারতে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে অসম্মতি প্রকাশ করে নাটালেই থেকে যেতে চান, সে ক্ষেত্রে তাঁদেরকে পুনরায় চুক্তিবদ্ধ হওয়া, অথবা তাঁদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সহ পরিবারের প্রত্যেকের জন্য বার্ষিক তিন পাউন্ড কর দেওয়ার কথা বলা হয়। গান্ধী বিলটি পুনর্বিবেচনার জন্য যথাক্রমে নাটাল অ্যাসেমব্লির প্রেসিডেন্ট, নাটাল কাউন্সিল এবং উপনিবেশের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি চেম্বারলিনের কাছে আবেদন জানান। একদম শেষ পর্যায়ে তিনি লর্ড এলগিনের কাছেও এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করে ১৮৯৫ সালের ১১ অগস্ট এক স্মারকলিপি পাঠান। যদিও গান্ধীর আবেদনে কর্ণপাত না করে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের শোষণের এক স্থায়ী হাতিয়ার হিসাবে বিলটি পাশ হয়।

এই সময় অবধি গান্ধী কেবলমাত্র যে একটি বিষয়ে সফল হন, সেটি হল ডারবান পোস্ট অফিসের প্রবেশপথ সংক্রান্ত আবেদন। পোস্ট অফিসে প্রবেশপথ ছিল দুটি – একটি শ্বেতাঙ্গদের জন্য ও অন্যটি অ-শ্বেতাঙ্গদের জন্য। কিন্তু গান্ধী প্রথম থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গদের তুলনায় সেখানে বসবাসকারী ভারতীয়দের উচ্চ স্তরের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেন। ফলত এই বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে গান্ধী কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লিখে ভারতীয়দের জন্য তৃতীয় একটি প্রবেশপথের বন্দোবস্ত করতে সফল হন — “In the Durban Post and Telegraph Offices, there were separate entrances for natives and Asiatics and Europeans. We felt the indignity too much and many respectable Indians were insulted and called all sorts of names by the clerks at the counter. We petitioned the authorities to do away with the invidious distinction and they have now provided three separate entrances for natives, Asiatics, and Europeans” (The Collected Works of Mahatma Gandhi, Electronic Book, 98 Volumes, New Delhi, Publications Division, Government of India, 1999; Vol. 1, pp. 367-368; এর পর থেকে কেবলমাত্র CWMG ১/৩৬৭-৩৬৮ লেখা হবে)।

ইতিমধ্যে ডাচ উপনিবেশ ট্রান্সভালে সোনা এবং হিরের সন্ধান মিলতেই ব্রিটিশরা ডাচদের উপনিবেশগুলো কব্জা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এই কারণে স্থানীয় শ্বেত-অধিবাসী বুয়রদের সঙ্গে ১৮৯৯ এর ১২ অক্টোবর থেকে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয়, ইতিহাসে তাই ‘বুয়র যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত। এই যুদ্ধে গান্ধীর অংশগ্রহণ করার কোনও কারণই ছিল না, কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিশ্বস্ত প্রজা হিসেবে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত ভারতীয়দের এই যুদ্ধে ইংরেজদের হয়ে অংশগ্রহণ করার কথা বলেন। যুদ্ধে যোগদান করতে চেয়ে তিনি লেখেন, “I need hardly say that, as soon as war was declared, irrespective of their opinions as to the justness or otherwise of the war, the Indians to a man made up their minds to give their humble support to the British Government during the crisis…” (CWMG, ২/৩৫৩)। সাম্রাজ্যবাদী এই যুদ্ধে যোগ দিতে চেয়ে গান্ধী অন্যত্র যে সাফাই দেন তা এই রকম — “Suffice it to say that my loyalty to the British rule drove me to participation with the British in that war. I felt that, if I demanded rights as a British citizen, it was also my duty, as such, to participate in the defence of the British Empire. I held then that India could achieve her complete emancipation only within and through the British Empire. So I collected to gather as many comrades as possible, and with very great difficulty got their services accepted as an ambulance corps” (‘The Boer War’, Chapter 64, An Autobiography or The Story of My Experiments with Truth)।

এই যুদ্ধে তিনি ‘uniformed non-commissioned officer’ হিসাবে প্রায় এগারোশো ভারতীয় স্ট্রেচারবাহকদের শীর্ষ নেতার পদে নির্বাচিত হন। যুদ্ধ শেষে তিনি মেডেল পান, যদিও বাকিদের ক্ষেত্রে তাঁর একটি চিঠির স্বীকৃতি ছাড়া আর কিছুই জোটেনি। যুদ্ধে নিরীহ স্ট্রেচারবাহকের কাজ আপাতদৃষ্টিতে নিছকই সেবামূলক কাজ মনে হলেও গান্ধী এই যুদ্ধে পুরোদস্তুর অংশ নিতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি নিজেই এ ব্যাপারে লেখেন, “At the time of the Boer War, it will be remembered, the Indians volunteered to do any work that might be entrusted to them, and it was with the greatest difficulty that they could get their services accepted even for ambulance work. General Buller has certified as to what kind of work the Natal Indian Volunteer Ambulance Corps did. If the Government only realised what reserve force is being wasted, they would make use of it and give Indians the opportunity of a thorough training for actual warfare. There is, too, on the Statute-book, a law for the purpose, which has been allowed to fall into desuetude from sheer prejudice. We believe a very fine volunteer corps could be formed from Colonial-born Indians that would be second to none in Natal in smartness and efficiency, not only in peace but in actual service also” (CWMG ৫/১১)।

পরবর্তী কিস্তি পুজোর হুল্লোড় মিটে যাওয়ার পরে ...
[যাঁরা গান্ধী রচনাবলি পড়তে চান কিংবা এই লেখার রেফারেন্সের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চান তাঁদের জন্য রইল এই গুরুত্বপূর্ণ লিংকটা।
https://www.gandhiashramsevagram.org/gandhi-literature/collected-works
-of-mahatma-gandhi-volume-1-to-98.php]

বুয়র যুদ্ধ শেষে ১৯০১ সালের অক্টোবর মাসে গান্ধী ভারতে ফিরে যান। কিন্তু দেশে তাঁর আইনের পেশা না জমায় পরের বছর ডিসেম্বরে পুনরায় তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে আসেন। ১৯০৩ সাল থেকে তিনি ট্রান্সভালের জোহানেসবার্গে থাকতে শুরু করেন এবং ওই বছরেই গড়ে তোলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা BIA। নাটালে অবস্থানকালে গান্ধী যেমন নিজেকে ব্রিটিশদের বিশ্বস্ত প্রজা ভাবতেন এবং তাদের যে কোনও মূল্যে তুষ্ট করে প্রবাসী ধনী ভারতীয়দের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট ছিলেন, জোহানেসবার্গ বসবাসকালীনও তাঁর আন্দোলনের অভিমুখ ও পদ্ধতির কোনও ব্যত্যয় ঘটেনি। ১৯০৪ এ তিনি স্থাপন করেন ফিনিক্স আশ্রম, যেখান থেকে মূলত তাঁর রাজনৈতিক বিবৃতি ছাপার জন্য প্রকাশিত হয় ‘Indian Opinion’ নামক সংবাদপত্র, যার পাতায় পাতায় তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের অবিচারের কাহিনি। জোহানেসবার্গের আখের বিস্তীর্ণ খামারবাড়িগুলির কেন্দ্রস্থলে ছিল তাঁর ফিনিক্স আশ্রমের অবস্থান। স্বাভাবিকভাবেই তিনি এখানে কর্মরত অসংখ্য চুক্তিবদ্ধ ভারতীয় শ্রমিকদের ওপর দীর্ঘ দিনের শোষণ ও অত্যাচার সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল ছিলেন। কিন্তু তাঁদের অবস্থা সম্পর্কে অনুসন্ধান চালানো বা তাঁদের জীবনযাত্রাকে তুলনামূলক সহনশীল করে তোলার ব্যাপারে তিনি যে বরাবর নিশ্চেষ্ট থেকেছেন তাই নয়, ওই সংবাদপত্রের ১৭ ডিসেম্বর, ১৯০৪ সংখ্যায় তিনি নির্দ্বিধায় লিখেছেন: The general condition of the indentured labourer in the Colony is satisfactory; and it can only enhance its reputation if causes even of suspicion are removed (CWMG ৪/১৩৯)।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকার ইংরেজ সরকারের অস্বাভাবিক কর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে নাটালের স্থানীয় জুলু উপজাতির বিদ্রোহীরা একজন ম্যাজিস্ট্রেট সহ দু’জন শ্বেতাঙ্গ পুলিশকে হত্যা করলে ‘বাম্বাত্তা বিদ্রোহ’ সূচিত হয়। এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করতে উদগ্রীব গান্ধী লেখেন, “What is our duty during these calamitous times in the Colony? It is not for us to say whether the revolt of the Kaffirs is justified or not. We are in Natal by virtue of British power. Our very existence depends upon it. It is therefore our duty to render whatever help we can. There was a discussion in the Press as to what part the Indian community would play in the event of an actual war. We have already declared in the English columns of this journal [Indian Opinion] that the Indian community is ready to play its part; and we believe what we did during the Boer war should also be done now. That is, if the Government so desires, we should raise an ambulance corps. We should also agree to become permanent volunteers, if the Government is prepared to give us the requisite training” (CWMG ৫/১৭৯)। কিন্তু নিছকই যে জুলুদের সেবা করার জন্য তিনি অ্যাম্বুলেন্স বাহিনী গঠন করতে চেয়েছিলেন তা আদৌ সত্যি নয়, কারণ দু’টো অনুচ্ছেদ আগেই আমরা দেখেছি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পক্ষে তিনি তিন তিনটে যুক্তি দিচ্ছেন — ক) ভারতীয়রা উপনিবেশ রক্ষা করতে সক্ষম; খ) সৈন্যদের অতিরিক্ত বাহিনী অর্থাৎ ভারতীয়দের কাজে লাগানোই অধিক যুক্তিযুক্ত এবং গ) এ বিষয়ে একটি পুরনো আইনও বিদ্যমান। অর্থাৎ গান্ধীর চোখে দক্ষিণ আফ্রিকা-জাত ভারতীয়রা সেনাবাহিনিতে নথিভুক্ত হওয়ার প্রথম হকদার!

শুধু অংশগ্রহণ করেই ক্ষান্ত থাকেননি গান্ধী, এই যুদ্ধে অর্থ সাহায্যের প্রস্তাব করে তিনি বলেন, “It is necessary that Indians help in the way they did when a fund was started at the time of Boer War. It will be good to collect some money and send it to the Government or to some Fund that might have been started” (CWMG ৫/২৫১)। এহ বাহ্য, শুধু সরকারকে অর্থসাহায্য করার প্রস্তাবই নয়, সৈন্যদের অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয়ের জন্য তহবিল গঠনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি এ-ও বলেন: “The soldiers’ life is a hard one. The salary and allowances that the Government pay them are not always enough. Those, therefore, who do not go to the front should, in order to express their sympathy, raise a fund for the purpose of sending the soldiers fruits, tobacco, warm clothing and other things that they might need. It is our duty to subscribe to such a fund” (CWMG ৫/২৫৯)। মাদকবিরোধী হিসেবে পরিচিত গান্ধী কি না সৈন্যদের তামাক খাওয়ার অভ্যাসের কথা বিবেচনা করে তহবিল গঠন করতে চাইছেন! এই যুদ্ধেও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে স্ট্রেচারবাহকের ভূমিকা পালন করে বিদ্রোহ দমন করতে সাহায্য করায় গান্ধী সার্জেন্ট মেজর পদ ও সরকারি সম্মান লাভ করেন। যদিও যুদ্ধে হত সাড়ে ৩ হাজার জুলু, বিভিন্ন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে জুলু নারী ও শিশুদের অনাহারে মৃত্যু, ৩০ হাজার জুলুর গৃহহীন হয়ে পড়া এবং ব্রিটিশদের ‘পোড়া মাটি’-র ঘৃণ্য নীতি সম্পর্কে তিনি ছিলেন আশ্চর্য রকমের উদাসীন।

বাম্বাত্তা বিদ্রোহীদের ওপর ইংরেজ শাসকদের ভয়াবহ অত্যচারকে দোর্দণ্ডপ্রতাপ সাম্রাজ্যবাদী চার্চিল অবধি ‘disgusting butchery’ বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, অথচ শান্তির উপাসক গান্ধী ১৯০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে আবারও জুলুদের বিদ্রোহ দমনে ইংরেজদের সাহায্য করতে চেয়ে লিখেছিলেন: “There is again a rebellion of Kaffirs in Zululand. In view of this, hundreds of white troops have been dispatched. The Indian community must come forward at such a time without, however, thinking of securing any rights thereby. They must consider only the duty of the community. It is a common observation that when we attend to our duty, rights follow as a matter of course. It will be only proper for the Indian community to make the offer that was made last year. ... We assume that there are many Indians now who will welcome such work enthusiastically. Those who went to the front last year can do so again. Most of them are seasoned people and familiar with the nature of the work. We very much hope that this work will be taken in hand without any delay” (CWMG ৭/৩৯৭)। স্থানীয় আফ্রিকানদের স্বার্থের প্রতি উদাসীন থেকে বারংবার সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে সাহায্য করার বিনিময়ে নিজেদের স্বার্থকে অক্ষুণ্ণ রাখার গান্ধীর এই ঘৃণ্য প্রয়াসকে চিহ্নিত করে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি জন ডিউব ১৯১২ সালে সঠিক ভাবেই লিখেছিলেন, “ … people like Indians have come into our land and lorded it over us, as though we who belong to the country were mere non-entities…”।

যদিও গান্ধী আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, জুলু যুদ্ধের পরেই নাকি তাঁর মনোজগতে পরিবর্তন আসে এবং পাঁচটি ব্যাপারে দৃঢ়সংকল্প হন — ব্রহ্মচর্য, অহিংসা, বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই, ‘vow of poverty’ এবং সত্যাগ্রহ; আমরা দেখতে পাব যে এগুলির প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর জীবনে অসংখ্যবার ব্যতিক্রম ঘটেছে। ‘সত্যাগ্রহ’ সম্পর্কিত আলোচনার আমরা দেখে নিই গান্ধী স্বয়ং সত্যাগ্রহ বিষয়ে কী বলেছেন। সত্যাগ্রহ সম্পর্কে গান্ধীর ধারণা এইরকম: “This doctrine of satyagraha is not new; it is merely an extension of the rule of domestic life to the political. Family disputes and differences are generally settled according to the law of love. The injured member has so much regard for the others that he suffers injury for the sake of his principles without retaliating and without being angry with those who differ from him. And as repression of anger and self-suffering are difficult processes, he does not dignify trifles into principles, but, in all non-essentials, readily agrees with the rest of the family, and thus contrives to gain the maximum of peace for himself without disturbing that of the others. Thus his action, whether he resists or resigns, is always calculated to promote the common welfare of the family. It is this law of love which, silently but surely, governs the family for the most part throughout the civilized world” (CWMG ২০/৪০) অর্থাৎ তাঁর মতে সত্যাগ্রহের গোটা বিষয়টাই পারিবারিক সমস্যা, রাজনৈতিক সমস্যা নয়!

যাই হোক, গান্ধী ১৯০৭-০৮ ও ১৯০৮-১১ সালে মূলত এলিট ভারতীয়দের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করার বিরুদ্ধে এবং ১৯১৩-১৪-য় প্রধানত অ-খ্রিস্টান ভারতীয় বিবাহকে স্বীকৃতি না দেওয়ার বিরুদ্ধে তিনটি নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ অভিযানে নেতৃত্ব দেন। জুলু যুদ্ধের অব্যবহিত পর ১৯০৬ এর ২২ অগস্ট ট্রান্সভাল সরকারি গেজেটে ‘এশিয়াটিক ল অ্যামেন্ডমেন্ট অর্ডিন্যান্স’-এর কথা প্রকাশিত হয়। নতুন এই অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ট্রান্সভালে বসবাসকারী আট বছরের ঊর্ধ্বে সমস্ত ভারতীয়কে নতুন করে নাম পঞ্জীভুক্ত করে ছাড়পত্র বা ‘পাস’ নেওয়ার কথা বলা হয় এবং এই ছাড়পত্র এক জায়গা থেকে অন্যত্র যাওয়া, আইন-আদালত ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হয়।

গান্ধী তাঁর বন্ধু প্রিটোরিয়ার অ্যাটর্নি রেইনহোল্ড গ্রেগরস্কি-র কাছে এই ব্যাপারে জানতে চাইলে গ্রেগরস্কি জানান, “The act is far more severe than the Dutch Law. There is not a single provision that is favourable to the Indians. The act makes the position of the Indian worse than that of the Kaffir. Not every Kaffir is required to carry a pass on him; but now every Indian will have to do so. Educated Kaffirs are exempt from such restrictive laws. But the Indian, whatever his education and standing, will have to carry a pass. The pass, it seems to us, will be like the one carried by prisoners, etc. Whatever loop-holes there existed in the Law [3] of 1885 have been closed in this Act. While Kaffirs can own land, Indians cannot. It does not seem probable that the Liberal Government will approve such a law.” (CWMG ৫/৩৩৯)। বন্ধুর এহেন ব্যাখ্যা শুনে গান্ধীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে! যে গান্ধী ১৮৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে নাটালের লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্যদের ‘খোলা চিঠি’-তে খোলাখুলি জানিয়েছিলেন ‘…both the English and the Indians spring from a common stock, called the Indo-Aryan’; যিনি নির্দ্বিধায় তাদের প্রভুত্বকে মেনে নিয়ে লিখেছিলেন: ‘Providence has put the English and the Indians together, and has placed in the hands of the former the destinies of the latter’; যিনি বলেছিলেন – ‘… the Indians were, and are in no way inferior to their Anglo-Saxon brethren…’ সেই প্রভু তথা ভাই ভারতীয়দের তাদের সমগোত্রীয় না ভেবে শুধু অন্যায়ই করছে না, ‘নিকৃষ্ট’ আফ্রিকানদের থেকেও নিম্নস্তরে নামিয়ে দিচ্ছে!! এই আইনকে ‘কালা কানুন’ হিসেবে অভিহিত করে এর যথোচিত জবাবের উপায় খুঁজতে শুরু করেন তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকা আদতে যে আফ্রিকানদের দেশ, ইংরেজ তথা ইউরোপীয়রা যে সেখানে জবরদখলকারি ঔপনিবেশিক মাত্র – সে কথা ‘সত্যাগ্রহী’ গান্ধীর কখনও মনে হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছনোর মাত্র দেড় বছর পরে ডিসেম্বর ১৮৯৪তে যিনি লেখেন : “A general belief seems to prevail in the Colony that the Indians are little better, if at all, than savages or the Natives of Africa”; ১৮৯৬ সালে পুনরায় যিনি জানান: “Ours is one continual struggle against a degradation sought to be inflicted upon us by the Europeans, who desire to degrade us to the level of the raw Kaffir whose occupation is hunting, and whose sole ambition is to collect a certain number of cattle to buy a wife with and, then, pass his life in indolence and nakedness”; ১৮৯৯ এ যিনি ওই মতেই অবিচল থেকে বলেন “… it would place them [British Indian], who are undoubtedly infinitely superior to the Kaffirs, in close proximity to the latter”; তিনি কীভাবে ভারতীয়দের সঙ্গে ‘কাফ্রি’দের এই পার্থক্য মেনে নিতে পারেন! তাই ‘Better die rather than submit to such a law’ আহ্বান জানিয়ে এই পঞ্জীকরণে আপত্তি জানান তিনি। যুদ্ধের পোশাক খুলে রেখে ফের আইনজীবীর পোশাক গায়ে চাপান, সেপ্টেম্বরে শুরু করেন তাঁর প্রথম সত্যাগ্রহ।

৮ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের তরফে তিনি উপনিবেশ স্টেট সেক্রেটারিকে জানান, “British Indians alarmed at haste with which Asiatic Ordinance is being rushed through Legislative Council. Ordinance reduces Indians to status lower than Kaffirs and much lower than that occupied under Dutch regime. British Indian Association request Imperial sanction be stayed pending deputation proceeding directly. Association requests reassuring reply” (CWMG ৫/৩৩০)। পাশাপাশি, ভারতের ভাইসরয়কেও এই ব্যাপারে তারবার্তায় জানান, “British Indians alarmed at Asiatic Ordinance passing through Legislative Council. Transvaal Ordinance degrading, insulting, reduces Indians to a worse status than that of Pariahs. British Indian Association request the Viceroy’s active intervention. His Excellency being directly responsible for their welfare” (তদেব)।

১১ সেপ্টেম্বর গান্ধীর নেতৃত্বে প্রায় তিন হাজার ভারতীয় এম্পায়ার থিয়েটারের প্রতিবাদ সভায় হাজির হন। সেখানে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী তাঁরা ঈশ্বরের নামে শপথ নিয়ে পাস না তোলার জন্য এবং আইন অমান্য করে জেলে যাওয়ার জন্য সম্মত হন। অক্টোবর মাসে গান্ধী এবার একজন মুসলিম সহযোগী মহম্মদ আলিকে নিয়ে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে (‘vow of poverty’ ভুলে গিয়ে প্রথম শ্রেণির টিকিটে!), লর্ড এলগিনের সঙ্গে দেখা করে কথা আদায় করার চেষ্টা করেন। এলগিন অবশ্য স্পষ্টই জানান যে ট্রান্সভাল সরকার এই বিল পাশ করলে তিনি এ ব্যাপারে মাথা গলাবেন না। ১৯০৭ সালের পয়লা জানুয়ারি ট্রান্সভাল স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে জিতে জেনারেল স্মাটস এই সরকারের উপনিবেশ সচিব হন। পার্লামেন্টে ২২ মার্চ কেবলমাত্র এশীয় মহিলাদের ছাড় দিয়ে বাকিদের ক্ষেত্রে এই অর্ডিন্যান্স পাশ হয়। মে মাসে এলগিনের সম্মতি মিলবার পরে প্রথমে ১ জুলাই থেকে ও পরে বাড়িয়ে ৩০ নভেম্বর থেকে তা চালু করার কথা বলা হয়। ট্রান্সভাল সরকার ভারতীয়দের পঞ্জীকরণের উদ্দেশ্যে প্রিটোরিয়া, পিটার্সবার্গ, জোহানেসবার্গ এবং অন্যান্য ভারতীয় অধ্যুষিত অঞ্চলে অফিস খুললে গান্ধীর পরামর্শ অনুযায়ী ভারতীয় সত্যাগ্রহীরা অফিসের সামনে পিকেটিং শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত নাম পঞ্জীভুক্ত করেন প্রায় ১৩ হাজার ভারতীয়র মধ্যে মাত্র ৫১১ জন। কর্তৃপক্ষ এবার বিরোধী নেতাদের গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেন।

১৯০৮ এর ১০ জানুয়ারি ট্রান্সভালে গান্ধীকে গ্রেফতার করা হয় এবং দু মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি জেলে যাওয়া সত্ত্বেও আন্দোলন বন্ধ হল না দেখে জেনারেল স্মাটস এক চাল চালেন। তিনি ট্রান্সভাল লিডার-এর সম্পাদক অ্যালবার্ট কার্টরাইটকে গান্ধীকে রাজি করানোর ব্যাপারে পাঠান। ২৮ জানুয়ারি গান্ধী প্রিটোরিয়াতে স্মাটস-এর সঙ্গে দেখা করেন এবং দু’জনেই আপস করতে সম্মত হন। যদিও আন্দোলন প্রত্যাহারের শর্ত হিসাবে গান্ধী অযথা প্রচার করেন যে স্মাটস ‘… verbally promised to repeal the Act, if the British Indians fulfilled their part of the compromise, that is to say, underwent voluntary registration’ (CWMG ৯/২৩০), আদতে তাঁদের মধ্যে এই আইন প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনও প্রতিশ্রুতির কথাই হয়নি। অবশেষে জেনারেল স্মাটসের ‘মৌখিক প্রতিশ্রুতি’-র ভিত্তিতে ১৯০৮-এর জানুয়ারিতে প্রথম সত্যাগ্রহ তুলে নেওয়া হয়।

এই পর্বের তৃতীয় তথা শেষ কিস্তি পরবর্তী সপ্তাহে ...

[গান্ধী রচনাবলির প্রয়োজনীয় খণ্ডটির লিংকে ক্লিক করুন। ডাউনলোড হলে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠাসংখ্যা টাইপ করুন। তাহলেই উদ্ধৃতিটি দেখতে পাবেন। ইচ্ছা করলে আগের কিংবা পরের অংশও পড়তে পারেন।

https://www.gandhiashramsevagram.org/gandhi-literature/collected-works
-of-mahatma-gandhi-volume-1-to-98.php]


প্রথম পর্ব : তৃতীয় তথা শেষ কিস্তি

‘প্রতিশ্রুতি’ স্বাভাবিক ভাবেই রক্ষিত না হওয়ায় গান্ধী শুরু করেন সত্যাগ্রহের দ্বিতীয় পর্যায়, কালা কানুন বাতিলের দাবিতে এবার শুরু হয় জেল ভরো আন্দোলন। কিন্তু সেখানেও স্থানীয় আফ্রিকানদের সম্পর্কে তাঁর ঘৃণিত মনোভাব প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়। সত্যাগ্রহ চলাকালীন যখন তাঁকে এবং তাঁর অনুগামীদের আফ্রিকানদের সঙ্গে জেলের একই সেলে রাখা হচ্ছে তখনও তিনি তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন: “Many of the Native prisoners are only one degree removed from the animal and often created rows and fought among themselves in their cells” (CWMG ৮/১৮৩) বা “We were then marched off to a prison intended for Kaffirs. … We could understand not being classed with the whites, but to be placed on the same level with the Natives seemed too much to put up with. … At the same time, it is indubitably right that Indians should have separate cells. … Kaffirs are as a rule uncivilized - the convicts even more so. They are troublesome, very dirty and live almost like animals” (CWMG ৮/১৯৮-৯৯)। ১৯১১ সালে যখন তাঁর সত্যাগ্রহ চলছে তখন এক বৈঠকে জেনারেল স্মাটস তাঁকে বলেছিলেন, “… this country is the Kaffirs’. We whites are a handful. We do not want Asia to come in” (CWMG ১১/৩৬০)। কিন্তু হায়! সাম্রাজ্যবাদী স্মাটস যে কথা অনুভব করেছিলেন, একুশটা বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় কাটিয়েও তা অনুভব করতে পারেননি গান্ধী।

দক্ষিণ আফ্রিকার আন্দোলন পরিচালনা পর্বেই গান্ধী মনোযোগ দেন তাঁর কার্যাবলীর সুষ্ঠু প্রচারে। ১৮৬৯ থেকে ১৯০৯ পর্যন্ত তাঁর জীবনের নানা কর্মকাণ্ড বিস্তারিত ভাবে লেখার জন্য গান্ধী ১৯০৯ সালে রেভারেন্ড যোসেফ ডোককে দিয়ে লেখান তাঁর প্রথম জীবনী। অক্টোবর মাসে সেই জীবনী প্রকাশিত হতেই তার ৭০০ কপি দেশ-বিদেশে বিলির জন্য উদ্যোগী হন তিনি নিজে। এই বইয়ের তথ্যকে আকর হিসাবে বিবেচনা করে পরের বছর হেনরি পোলক লেখেন গান্ধীর দ্বিতীয় জীবনী। আর ১৯০৯ সালে লন্ডন থেকে খালি হাতে ফিরে আসার সময় জাহাজে বসে মাত্র দশ দিনে গান্ধী গুজরাটি ভাষায় লেখেন ‘হিন্দ স্বরাজ’ নামক গ্রন্থটি, পরের বছর নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করে তা প্রকাশ করেন ‘Hind Swaraj or Indian Home Rule’ নামে। সংস্কাররাচ্ছন্ন বৈষ্ণব পরিবারের প্রাত্যহিক বিচারহীন হিন্দু আচার – গুজরাটের জৈন ঐতিহ্য – বাইবেলের খ্রিস্টিয় পাপবোধ – রাসকিন (Unto This Last)-এর সরল ও সমবেত জীবনের আদর্শ – থরো (On the Duty of Civil Disobedience)-র অসহযোগ এবং টলস্টয় (The Kingdom of God Is within You)-এর খ্রিস্টিয় অহিংসা ও দারিদ্র্যব্রত চিন্তার জগাখিচুড়ি করে গান্ধী নিজে তাঁর রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে ভবিষ্যতের ভারতকে চিত্রিত করেন এই গ্রন্থে।

এর অনেক বছর বাদে ১৯২৩ সালে গান্ধী যখন পুণের ইয়েরবেদা জেলে বন্দী, তখন তিনি লেখেন ‘Satyagraha in South Africa’। পাশাপাশি, ১৯২৫ সালের নভেম্বর মাস থেকে গুজরাটি ‘নবজীবন’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতে থাকে ‘An Autobiography or The Story of My Experiments with Truth’। ১৯২৭ এবং ১৯২৯ সালে দু’খণ্ডে প্রকাশিত সেই আত্মজীবনী পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়। যদিও প্রত্যেকটি বইতেই তাঁর যুদ্ধে অংশগ্রহণের অংশটায় সুনিপুণভাবে প্রলেপ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে তিনি যৌনজীবনকে ‘physically harmful and morally sinful’ রূপে বিবেচনা করে ব্রহ্মচর্য পালন শুরু করেছেন (যদিও পরবর্তীকালে তাঁর ব্রহ্মচর্যের পরীক্ষার জন্য অজস্র নগ্ন নারীর বক্ষলগ্না হয়ে রাত কাটাবেন তিনি); একশো একরের ফিনিক্স আশ্রম থেকে চলে আসছেন এগারো শো একর বিশিষ্ট টলস্টয় ফার্মে এবং ওই ফার্মে থাকাকালীন ভবিষ্যতে তাঁর ভাবমূর্তি মসিলিপ্ত হতে পারে ভেবে ১৯১০ নাগাদ বেশ কিছু কাগজপত্র নষ্ট করে দিচ্ছেন।

মোটামুটি ভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯০৭ থেকে ১৯১১ অবধি দীর্ঘ সময়কালে গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলন ভারতীয়দের সমানাধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে আদৌ ফলপ্রসু হয়নি। সেই ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে হতাশ গান্ধী ১৯০৯ সালের ২৩ জুন নিজেই লিখেছিলেন — “… Indians have been begging for something to be brought to them from England [as a gift]. This shows our utter helplessness. The whites of the Colonies are the strong and favoured sons [of the Empire]. We are the weak and neglected ones. How can the neglected sons get a hearing from the mother against the favoured ones?” (CWMG, ৯/৩৯১-৩৯২)। প্রখ্যাত গ্রন্থকার যোসেফ লেলিভেল্ড গান্ধীর সত্যাগ্রহ পর্বের চমৎকার মূল্যায়ন করে লিখেছেন, “Nearly five years after the start of Satyagraha, he had nothing to show for the resistance his leadership had inspired. Indians had courted arrest and gone to jail more than two thousand times, serving sentences of up to six months at hard labour, some, like Thambi Naidoo and Gandhi’s son Harilal, doing so repeatedly. Hundreds of other resisters had been deported back to India. The world had fleetingly taken notice — India especially — but the new white government had outmaneuvered Gandhi. Disillusion was building up, especially in Natal”।

গান্ধীর আন্দোলনে আবার জোয়ার আসে যখন ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ মার্চ কেপ কলোনির সুপ্রিম কোর্ট অ-খ্রিস্টান ভারতীয় বিবাহকে স্বীকৃতি না দেওয়ার কথা জানায়। গান্ধী যেন এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন, কিন্তু তিনি ক্রমশ বুঝতে পারছিলেন যে প্রকৃত গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে গেলে বিশাল সংখ্যক ভারতীয়ের সমর্থন প্রয়োজন। ওই একই সময়ে নাটাল কর্তৃপক্ষ প্রাক্তন চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের বার্ষিক তিন পাউন্ড কর না দিলে ফৌজদারি মামলার হুমকি দেয়। গান্ধী এই দুটি বিষয়েরই বিরোধিতা করে শুরু করেন দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর তৃতীয় তথা শেষ সত্যাগ্রহ। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর যাবতীয় আন্দোলনের অভিমুখ নির্দিষ্ট রেখেছিলেন কেবলমাত্র অভিজাত ‘প্যাসেঞ্জার’ ভারতীয়দের জন্য। দক্ষিণ আফ্রিকার চুক্তিবদ্ধ ভারতীয় শ্রমিকদের জন্য তিনি আদৌ চিন্তিত ছিলেন না। শুধুমাত্র নিজ স্বার্থে এই বিশাল শ্রমিকবৃন্দকে আন্দোলনে শামিল করার হীন চক্রান্তকে সমালোচনা করে ১৯১৩ সালের ১৭ অক্টোবর ‘Natal Mercury’ পত্রিকায় Natal Indian Patriotic Union (NIPU)-এর তরফে লেখা হয়: “When the NIPU espoused for the abolition of the tax, Mr Gandhi did not manifest his outrage by supporting our agitation in a substantial manner. Mr Gandhi had no inclination whatsoever to help these poor people. … Mr Gandhi’s dictum that India would ‘have no right to exist side by side with a free and self-respecting community if they have no decency and moral strength to suffer’ would have been a welcome pronouncement at the time when the agitation on this subject was in full swing, but now it falls flat on us, because we cannot believe that the same man who was like a ‘stoic’, though not intriguing at the time, could be sincere in what he says now”।
যাই হোক, এই সমালোচনাকে অগ্রাহ্য করে তাঁর অনুগামী প্রায় পাঁচ হাজার বিক্ষোভকারীকে নাটালের সীমান্ত অতিক্রম করে ট্রান্সভালে প্রবেশ ও গ্রেফতার বরণ করার জন্য নির্দেশ দেন গান্ধী। তাঁর নেতৃত্বে ৬ নভেম্বর, ১৯১৩ সালে ২০৩৭ জন পুরুষ, ১২৭ জন নারী ও ৫৭ জন শিশুর একটি দল সীমানা অতিক্রম করে ট্রান্সভালে পৌঁছলে ৯ তারিখে গান্ধীকে গ্রেফতার করা হয় এবং নয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় (যদিও সরকার তাঁকে ব্লুমফনটেনের বিশেষ আবাসে আয়াসেই রেখেছিল)। গান্ধীর অনুপস্থিতিতে তাঁর দুই সহকারী পোলক ও কলেনবাকের নেতৃত্বে সত্যাগ্রহীরা আরও অগ্রসর হলে পোলক ও কলেনবাককেও গ্রেফতার করা হয়।

এইবার দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার সত্যাগ্রহীদের ওপর গুলি চালিয়ে তাঁদের আন্দোলন দমন করতে শুরু করে। বেশ কিছু সত্যাগ্রহী মারা যান, আহত মিছিলকারীদের জেলে ভরা হয়। ওই বছরেই দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ শ্রমিকরা প্রথমে জুলাই মাসে সোনার খনিতে এবং ছ’মাস পরে রেলে ধর্মঘট ডাকেন। পাশাপাশি, ভারতীয়দের শান্তিপূর্ণ পদযাত্রার ওপর এহেন বর্বরোচিত আক্রমণের খবর গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা জুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তেই নিউ ক্যাসলের কয়লাখনিতে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকরা মিছিলকারীদের সমর্থনে ধর্মঘট করেন। শ্রমিক ধর্মঘটিদের সঙ্গে যোগ দেন প্রায় পনেরো হাজার চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক। যুগপৎ শ্বেতাঙ্গ ও ভারতীয় শ্রমিকদের ধর্মঘটে দিশাহারা, বিপর্যস্ত সরকারের বিরুদ্ধে চাপ দিয়ে দাবি আদায় করার বিষয়ে গান্ধীর কাছে এক সুবর্ণ সুযোগ আসে। কিন্তু গান্ধী বলেন, “Indians do not fight for equal political rights. They recognize that, in view of existing prejudice, fresh immigration from India should be strictly limited, provision being made for the entrance of a sufficient number annually for reasonable wear and tear” (CWMG ১৩/৩৬৬)।

অবশেষে ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ এবং ব্রিটিশ সরকারের চাপের মুখে পড়ে জেনারেল স্মাটস সত্যাগ্রহীদের দাবিদাওয়া বিবেচনার জন্য ১৯১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তিন সদস্যের তদন্ত কমিশন (সলোমন কমিশন) গঠন করেন। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী গান্ধী, পোলক ও কলেনবাককে ১৮ ডিসেম্বর জেল থেকে নিঃশর্তে মুক্তি দেওয়া হয়। স্মাটস এইবার আপস প্রস্তাব নিয়ে কথা বলার জন্য গান্ধীকে ডেকে পাঠান। স্মাটস তাঁকে কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী দাবিসমূহ মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে গান্ধী আবারও স্মাটসের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। শুধু তাই নয়, যে সত্যাগ্রহীরা গান্ধীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিলেন, চরম অত্যাচারিত হলেন; সেই সত্যাগ্রহীদের ওপর পুলিশের অত্যাচারের ব্যাপারে কিছুই বলবেন না বা এই নিয়ে আদালতে কোনও মামলাও করবেন না বলে তিনি স্মাটসকে প্রতিশ্রুতি দেন। জেনারেল স্মাটসের কাছে এহেন ন্যক্কারজনক মুচলেকা দেওয়ার অব্যবহিত পরেই সরকার কমিশনের প্রস্তাবগুলি Indian Relief Bill এ অন্তর্ভুক্ত করে ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে বিলটিকে আইনে পরিণত করে। ভারতীয়দের বিবাহ বৈধ বলে স্বীকৃত হয় (যদিও মুসলমানদের বহু বিবাহ অস্বীকৃত থাকে) ও তিন পাউন্ড করের অবলুপ্তি ঘটে। এই আইনকে ‘magna carta for Indians’ বলে অভিহিত করে গান্ধী তাঁর প্রায় আট বছর ব্যাপী সত্যাগ্রহ তুলে নেন।

রাজনৈতিক গুরু গোখলের পরামর্শে ১৯১৪ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকাকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে ভারতবর্ষে পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার জন্য গান্ধী যখন ইংল্যান্ড অভিমুখে রওনা হচ্ছেন, তখনও দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী ভারতীয়দের যে যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল – তার তালিকাও নেহাত কম নয়। প্রথমত, দক্ষিণ আফ্রিকার এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে যেতে গেলে যে পারমিট ব্যবস্থা চালু ছিল তার অবলুপ্তি ঘটেনি, অর্থাৎ যে ‘কালা কানুন’-এর বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন শুরু করেছিলেন তা তখনও পূর্ণ মাত্রায় বহাল ছিল। দ্বিতীয়ত, ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ ফ্রি স্টেটে ভারতীয়দের জমি কেনা ও ব্যবসা স্থাপনের অনুমতি ছিল না এবং অন্য দুটি প্রদেশেও সে ব্যাপারে আইনকানুনের মারপ্যাঁচ যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান ছিল। সর্বোপরি, এই আইনে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের কোনও সুরাহাই হয়নি। সঠিক ভাবে বলতে গেলে তিন পাউন্ড কর বিলোপকেই গান্ধীর দক্ষিণ আফ্রিকা পর্বের একমাত্র সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, যদিও মূলত কর আদায় করার প্রশাসনিক অসুবিধার কারণেই সরকার এই কর প্রত্যাহার করে নেয়।

কেবলমাত্র বুয়র ও বাম্বাত্তা যুদ্ধে গান্ধীর ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে অহিংসার পূজারী, বর্ণবিদ্বেষবিরোধী আন্দোলনের হোতা, দরিদ্র অসহায় কৃষক-শ্রমিকদের ত্রাতা হিসেবে প্রচারিত গান্ধীর সযত্নলালিত মুখোশ এক ঝটকায় খুলে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে African Chronicle ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ এপ্রিল লেখে: “Mr. Gandhi’s ephemeral fame and popularity in India and elsewhere rest on no glorious achievement for his countrymen, but on a series of failures, which has resulted in causing endless misery, loss of wealth, and deprivation of existing rights”। তবে অশ্বিন দেশাই এবং গুলাম ভাহেদ একটি মাত্র বাক্যে গান্ধীর দক্ষিণ আফ্রিকা পর্বের যে মূল্যায়ন করেছেন তার তুলনা মেলা ভার। তাঁরা লিখেছেন, “He [Gandhi] was a lawyer and lawbreaker, journalist and propagandist, a loyal subject of Empire and agitator, a fighter against discrimination and a racist, a man of principle and a dealmaker, and a passive resister yet a sergeant major”।


সহায়ক লেখাপত্র :
১. Ashwin Desai, Goolam Vahed – The South African Gandhi: Stretcher-Bearer of Empire
২. G B Singh – Gandhi: Behind the Mask of Divinity
৩. George Paxton – Gandhi’s Wars
৪. Joseph Lelyveld – Great Soul: Mahatma Gandhi and His Struggle with India
৫. Nishikant Kolge – Was Gandhi a Racist? His Writings in South Africa
৬. Philip Sprat – Gandhism: An Analysis, Vol. I


লিংক - https://www.gandhiashramsevagram.org/gandhi-literature/collected-works
-of-mahatma-gandhi-volume-1-to-98.php


দ্বিতীয় পর্ব : গান্ধী ও ভারতের কৃষক-শ্রমিক — ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত

১৯১৪ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকাকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে ভারত অভিমুখে যাত্রা করলেও গান্ধী বোম্বাইতে পৌঁছন পরের বছর ৯ জানুয়ারি। সরাসরি ভারতে না এসে তিনি লন্ডনে উপস্থিত হন এবং ভারত সচিবের কাছে চিঠি লিখে সাম্রাজ্যের সেবায় বিনা শর্তে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার বাসনা জ্ঞাপন করেন। যিনি নিজেই আত্মজীবনীতে লেখেন: “I make no distinction, from the point of view of ahimsa, between combatants and non-combatants. He who volunteers to serve a band of dacoits, by working as their carrier, or their watchman while they are about their business, or their nurse when they are wounded, is as much guilty of dacoity as the dacoits themselves. In the same way those who confine themselves to attending to the wounded in battle cannot be absolved from their guilt of war” (‘A Spiritual Dilemma’, Chapter 116, An Autobiography or The Story of My Experiments with Truth) সেই একই ব্যক্তি কীভাবে পুনরায় যুদ্ধে যেতে উন্মুখ হন তা বোঝা দুষ্কর! যাই হোক, শেষ অবধি প্লুরিসিতে আক্রান্ত গান্ধী সেই পরিকল্পনা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়ে ভারতে ফিরে আসেন। গুরু গোখলের পরামর্শে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, অবিচার-অত্যাচার সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করার জন্য তিনি এবার ভারতের গ্রাম পরিভ্রমণ শুরু করেন। অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধে যোগদান করার পুরস্কার হিসাবে ততদিনে তাঁর ‘কাইজার-ই-হিন্দ’ পদক পাওয়া সারা।

১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গোখলের মৃত্যুর পর তিলকই হয়ে ওঠেন কংগ্রসের অন্যতম প্রধান নেতা এবং পরের বছরে কংগ্রেসের লখনউ অধিবেশনে চরমপন্থীরা পুনরায় মূল স্রোতে ফিরে এলে তিলক ও তাঁর অনুগামীরাই কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সিদ্ধান্তসমূহের ক্ষেত্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। এই অধিবেশনে বিহারের জনৈক ধনী কৃষক তথা ছোট মহাজন রাজকুমার শুক্ল চম্পারণের কৃষিজীবীদের ওপর নীলকরদের চরম অত্যাচারের প্রসঙ্গটি অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাবসমূহের অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানালে গান্ধী তীব্র আপত্তি জানান। পরিহাস এই, রাজকুমার শুক্লর অনুরোধে সেই একই গান্ধী জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকাকে পোক্ত করার উদ্দেশ্যে ১৯১৭ সালে বিহারের চম্পারণ হাজির হন। পরে আমরা দেখতে পাব, তিলক ‘Indian Unrest’-এর লেখক ভ্যালেন্টিন চিরলের বিরুদ্ধে মামলা লড়তে ইংল্যান্ড গেলে ১৯১৯ সালের শেষদিকে গান্ধীই হয়ে উঠবেন কংগ্রেসের সর্বেসর্বা এবং পরের বছর অগস্টে তিলকের মৃত্যু ও ডিসেম্বরে জিন্নার কংগ্রেস ত্যাগের পরে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্ন করার লোকের সন্ধান পাওয়াও ক্রমশ দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে।

যাই হোক, আমরা ফিরে আসি চম্পারণ প্রসঙ্গে। ১৮৬০ থেকেই চম্পারণে ‘তিনকাঠিয়া প্রথা’-র বিরুদ্ধে বিক্ষিপ্ত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। নীলকররা জমিদারদের থেকে ঠিকাদারি ইজারা নিয়ে চাষিদের জমির একটা অংশে (বিঘা পিছু তিন কাঠা) অলাভজনক দামে নীল বুনতে বাধ্য করে। শেষে জার্মানির কৃত্রিম রঙের সঙ্গে মোকাবিলা না করতে পেরে ১৯০০ সাল নাগাদ নীল চাষ কমে যায়। তখন নীলকররা নীল চাষের দায় থেকে চাষিদের রেহাই দেওয়ার পরিবর্তে থোক ক্ষতিপূরণের বোঝা চাষিদের ঘাড়েই চাপানোর চেষ্টা করলে ১৯০৫-০৮ এর মধ্যে মোতিহারি-বেতিয়া অঞ্চলে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। চাষিদের তুলনামূলক সম্পন্ন একটা অংশ এবং বিহার কংগ্রেসের কিছু নেতা পরের দশক পর্যন্ত এই আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। রাজকুমার শুক্লের অনুরোধে ১৯১৭ সালের ১৫ এপ্রিল গান্ধী চম্পারণ পৌঁছন।

সেখানে পৌঁছেই তিনি সংগ্রামী নীলচাষিরা তাঁর নেতৃত্ব মেনে নিলে তিনি নীলকরদের কাছ থেকে তাঁদের দাবি আদায় করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। চাষিদের তরফ থেকে আশ্বাস পেয়ে তিনি নীলকর ও বিহারের উচ্চপদস্থ সরকারি আমলাদের বোঝান যে, নীলচাষিদের সামান্য কিছু দাবি পূরণ করে এই সংগ্রাম মিটিয়ে ফেলা দরকার। অন্যথায় সারা বিহার জুড়ে কৃষক আন্দোলনের ঝড় উঠতে পারে এবং তার ফলে বিহারে জমিদারি প্রথা ও ইংরেজ শাসন বিপন্ন হতে পারে। নীলকরেরা গান্ধীর পরামর্শ অগ্রাহ্য করে। অবশেষে বিহারের ছোটলাটের সঙ্গে উপর্যুপরি চার-চারটি বৈঠকের পর জুলাই মাসে সরকারি আমলা ও কতিপয় নীলকর ছাড়া কৃষকদের একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে গান্ধীকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। তদন্তের ভিত্তিতে নীলকররা ক্ষতিপূরণের অর্থ নীলচাষিদের ফেরত দিতে নীতিগত ভাবে সম্মত হন। তাঁরা ভেবেছিলেন, গান্ধী হয়তো পুরো অর্থই দাবি করবেন। কিন্তু তিনি পঞ্চাশ শতাংশ ক্ষতিপূরণ দাবি করলে তাঁরা ২৫ শতাংশ দিতে রাজি হন। তাঁদেরকে অবাক করে দিয়ে গান্ধী ওই ২৫ শতাংশ অর্থ ফেরত নিতেই রাজি হয়ে যান এবং তিনকাঠিয়া ব্যবস্থা উঠে যায়। তাঁর পরামর্শে নীলচাষিরা সংগ্রাম বন্ধ করে কাজে যোগ দেন। কৃষক সম্প্রদায়কে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম থেকে দূরে রাখতে সামান্য চালকলা দিয়ে তাঁদের তুষ্ট রাখার এই শিক্ষাই গান্ধীকে পরবর্তীকালের ‘সত্যাগ্রহ’ সংগ্রামের অন্যতম প্রধান কর্মপন্থারূপে গ্রহণ করার অনুপ্রেরণা যোগায়।

কিন্তু রাতারাতি কৃষকদের মসিহারূপে পরিগণিত গান্ধী আদৌ কি এঁদের প্রকৃত বন্ধু ছিলেন? সহজ উত্তর, না। ১৯২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির যে বারদোলি প্রস্তাবে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার অনুমোদিত হয়েছিল, তার সাতটি ধারার মধ্যে অন্তত তিনটি ধারার উল্লেখ এখানে করলে কংগ্রেস তথা গান্ধীর কৃষক-বিরোধী চরিত্রটি আরও একবার উন্মোচিত হয়ে পড়ে। প্রস্তাবের দ্বিতীয় ধারায় সরকারকে বকেয়া কর পরিশোধ করার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়: “In view of the violent outbreaks every time mass civil disobedience is inaugurated, indicating that the country is not non-violent enough, the Working Committee of the Congress resolves that mass civil disobedience … be suspended, and instructs the local Congress Committees to advise the cultivators to pay land revenue and other taxes due to the Government, and to suspend every other activity of an offensive character”। জমিদারদের আশ্বাস দিয়ে যথাক্রমে ষষ্ঠ ও সপ্তম ধারায় বলা হয় “The Working Committee advises Congress workers and organisations to inform the ryots (peasants) that withholding of rent payment to the Zemindars (landlords) is contrary to the Congress resolutions and injurious to the best interests of the country” এবং “The Working Committee assures the Zemindars that the Congress movement is in no way intended to attack their legal rights, and that even where the ryots have grievances, the Committee desires that redress be sought by mutual consultation and arbitration”।

১৯৩১-৩২ সাল নাগাদ পদুকোটা, জম্মু-কাশ্মীর, পুলরা থেকে কৃষক সংগ্রাম যখন সারা ভারতে ছড়াচ্ছে সেই সময় গান্ধী গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করতে ইংল্যান্ড যান। ইংল্যান্ড থেকে এই বিদ্রোহের বিরোধিতা ও সামন্তপ্রভুদের সমর্থন করে তিনি ঘোষণা করেন, “Even up to now the Congress has endeavoured to serve the Princes of India by refraining from any interference in their domestic and internal affairs” (CWMG ৫৩/৩৬১)। আবার ২৫ জুলাই, ১৯৩৪ জমিদারদের আশ্বাস দিয়ে বলেন — “ন্যায্য কারণ ছাড়া সম্পত্তির মালিক শ্রেণীদের তাদের সম্পত্তির থেকে আমি বঞ্চিত করতে চাই না। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে তোমাদের হৃদয় পরিবর্তন করা যাতে তোমরা তোমাদের সমস্ত সম্পত্তি তোমাদের প্রজাদের অছি হিসাবে রাখতে পার এবং মুখ্যত তাদের কল্যাণে তা ব্যবহার কর। ... আমি কাজ করছি মালিক ও শ্রমিক এবং জমিদার ও প্রজার মধ্যে সহযোগিতা ও সংযোগের জন্য। ... আমার স্বপ্নের রামরাজ্য রাজা ও নিঃস্ব উভয়ের অধিকার সুনিশ্চিত করতে চায়। ... স্বাধীনতার শান্তিতে থাকার চেয়ে বড় কোনও উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রজাদের নেই এবং তারা তোমাদের সম্পত্তি নিয়ে কখনও ঈর্ষা করবে না যদি তোমরা তা তাদের জন্য ব্যবহার কর (CWMG ৬৪/২৩০-৩২)।” মনে রাখতে হবে, সে সময় ভারতে ছিল পাঁচশোরও বেশি দেশীয় রাজ্য এবং এই অতিকায় সামন্তপ্রভুদের শোষণ-উৎপীড়নের নাগপাশে আবদ্ধ ছিলেন প্রায় দশ কোটি কৃষক।

সর্বোপরি কৃষকদের শিক্ষার ব্যাপারে তিনি যে মত প্রকাশ করেন তা প্রায় বাঁধিয়ে রাখার মতো! গান্ধী ‘হিন্দ স্বরাজ’-এ, লেখেন: “A peasant earns his bread honestly. He has ordinary knowledge of the world. He knows fairly well how he should behave towards his parents, his wife, his children and his fellow villagers. He understands and observes the rules of morality. But he cannot write his own name. What do you propose to do by giving him a knowledge of letters? Will you add an inch to his happiness? Do you wish to make him discontented with his cottage or his lot? And even if you want to do that, he will not need such an education. Carried away by the flood of western thought we came to the conclusion, without weighing pros and cons, that we should give this kind of education to the people”। হয়তো এই কারণেই যে রাজেন্দ্রপ্রসাদ চম্পারণের ইংরেজ জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে গান্ধীর সত্যাগ্রহে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন, ঘটনার ২০ বছর পরে তাঁরই প্রত্যক্ষ মদতে তাঁর সন্তানেরা চম্পারণের একরের পর একর উর্বর জমি আত্মসাৎ করেছিল!

চম্পারণে কৃষকদের বিশ্বাস আদায় করার পর তিনিই যে ভারতীয় শিল্পপতিদের অকৃত্রিম বন্ধু ও যোগ্যতম প্রতিনিধি, তা বোঝাতে গান্ধী ১৯১৮ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ জুড়ে চলা আমেদাবাদের কাপড়কলগুলির শ্রমিক ধর্মঘটকে বেছে নেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয় শিল্পপতিরা তাদের যুদ্ধকালীন সুযোগসুবিধা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পেছনে এসে দাঁড়ায়। আমেদাবাদের বস্ত্রশিল্প চূড়ামণি আম্বালাল সারাভাই-এর কাছ থেকে সাবরমতী আশ্রম মোটা আর্থিক অনুদান পায়, তাঁর বোন অনসূয়া বেন গান্ধীর শিষ্যায় পরিণত হন। শুধু তাই নয়, ১৯২১ সালে গান্ধী যখন ‘তিলক স্বরাজ তহবিল’-এর জন্য ১ কোটি টাকা চাঁদা তোলার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে দেন, তখন তার মধ্যে কেবলমাত্র বোম্বাইয়ের অবদান ছিল কম করেও সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা। জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে শিল্পপতিদের এই গাঁটছড়া দেখতে পেয়ে সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘Gandhism and the Labour-Peasant Problem’ প্রবন্ধে যথার্থই লিখেছিলেন: “Whenever there is unrest among the workers the mill owners of Ahmedabad are in the habit of requisitioning Mahatma Gandhi to use his influence to settle the disputes. With the consent and support of Gandhiji, some of his followers had taken upon themselves the task of organising the workers into unions. The poor workers, unconscious of their class interests, have readily fallen prey to this clever move”।

যে পরিস্থতিতে গান্ধী আমেদাবাদের ধর্মঘটে হস্তক্ষেপ করেন, সেটি ছিল একান্তভাবেই গুজরাটের মিলমালিক ও তাঁদের শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ। আমেদাবাদের মিলমালিকরা স্বল্প সময়ের জন্য দেওয়া ৭০% প্লেগ বোনাসের বদলে যুদ্ধের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের ২০% মজুরিবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়। শ্রমিকরা ৫০% বেতনবৃদ্ধির দাবিতে অটল থাকেন। মালিকরা সেই দাবি না মেনে লকআউট ঘোষণা করে। অসন্তুষ্ট শ্রমিকরা হিংসাত্মক কার্যকলাপ শুরু করলে গান্ধী এইবার আসরে অবতীর্ণ হন। প্রথমে তিনি শ্রমিকদের ৩৫% বেতনবৃদ্ধি যথেষ্ট বলে মধ্যস্ততা করেন এবং তাতেও কাজ না হওয়ায় শ্রমিকদের কারখানায় জঙ্গী পিকেটিংকে নিষিদ্ধ করার কৌশল হিসাবে তিনি ১৫ মার্চ অনশনে বসেন। টানা ২৫ দিন শ্রমিকদের ধর্মঘটের পরে অবশেষে গান্ধীর অনশনের ফলে শ্রমিকদের মজুরি ৩৫% বাড়ে। গান্ধীর এই অনশনকে ‘শ্রমিকদের ভাঙা মনকে চাঙ্গা করার সার্থক প্রচেষ্টা’ বলে বর্ণনা করা হলেও জুডিথ ব্রাউন জেলাশাসকের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন যে, শ্রমিকরা মিলমালিকদের সঙ্গে দহরম-মহরমের জন্য গান্ধীকে প্রচণ্ড অপমান করেছিলেন।

রাসকিন শোষক ও শোষিতের মধ্যে দ্বন্দ্বের বদলে সহযোগিতার কথা বলেছেন, আর গান্ধী সেই দাওয়াইটিকে ‘ধন্বন্তরির দান’ বলে গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই মানসিকতার প্রতিফলন আমরা যেমন কৃষক ও জমিদারদের পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে দেখতে পাই, হুবহু তাই দেখতে পাই শ্রমিক ও মালিকদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত তার ছবি তিনি তুলে ধরেন ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকার ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯২০ সংখ্যায় — “If on the other hand they take their stand on pure justice and suffer in their person to secure it, not only will they always succeed but they will reform their masters, develop industries and both master and men will be as members of one and the same family”। ওই একই পত্রিকায় তিনি লেখেন: “...যখন কারখানার শ্রমিকরা কারখানার মালিকের সঙ্গে নিজেকে এবং নিজের স্বার্থকে এক করে দেখতে শিখবে, নিজেকে উন্নত করতে শিখবে, তখন তারা আর তাদের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশের কলকারখানা সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠবে।”

শ্রমিক শ্রেণি যাতে ধর্মঘট করে বা বৃহত্তর আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হয়ে মালিকদের বেকায়দায় না ফেলতে পারে, সে বিষয়ে তিনি ছিলেন সর্বদা সতর্ক ও সচেতন। এই কারণেই ১৯২১ সালে রেলওয়ে এবং বাষ্পীয় জাহাজ শ্রমিকদের ধর্মঘট প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, “In India we want no political strikes. ...We must gain control over all the unruly and disturbing elements, or isolate them. ...We seek not to destroy capital or capitalists, but to regulate the relations between capital and labour. We want to harness capital to our side. It would be folly to encourage sympathetic strikes” (CWMG ২৩/২৮৫)। না, এখানেই তিনি থেমে থাকতে চাননি! বরং শোষকদেরই শোষিতদের অছি বা ট্রাস্টি হিসেবে দেখতে চেয়ে তিনি বলেন — “My attitude would be to convert the better-off classes into trustees of what they already possessed. That is to say, they would keep the money, but they would have to work for the benefit of the people who procured them their wealth. And for doing this they would receive a ‘commission’” (CWMG ৫৪/১০২-০৩)।

দক্ষিণ আফ্রিকায় যেমন চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের বিষয়ে উদাসীন ছিলেন গান্ধী, তেমনই ভারতীয় কৃষক-শ্রমিকদের শ্রেণিস্বার্থ সম্পর্কেও তিনি ছিলেন নীরব দর্শকের ভূমিকায়। শুধু তাই নয়, ভারতের জনসাধারণের এই বিপুল অংশকে তাঁর আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সর্বদাই সতর্ক থেকেছেন এবং প্রায় এড়িয়ে গেছেন। যখনই তাঁরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, প্রায় প্রতিটি সময়েই হিংসার অনুপ্রবেশের অছিলায় তিনি সেই আন্দোলনকে হয় আটকে দিয়েছেন কিংবা স্থগিত করেছেন অসীম দক্ষতায়।

সহায়ক লেখাপত্র :
১. সুমিত সরকার – আধুনিক ভারত : ১৮৮৫-১৯৪৭
২. সৈয়দ শাহেদুল্লাহ – লেনিনবাদীর চোখে গান্ধীবাদ
৩. Philip Sprat – Gandhism: An Analysis, Vol. II
৪. Rammanohar Lohia – Guilty Men of India’s Partition
৫. R Palme Dutt – India To-Day
৬. Vinay Lal – The Gandhi Everyone Loves to Hate

তৃতীয় পর্ব আগামী সপ্তাহে ...

লিংক - https://www.gandhiashramsevagram.org/gandhi-literature/collected-works
-of-mahatma-gandhi-volume-1-to-98.php


তৃতীয় পর্ব : গান্ধী ও অসহযোগ — সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পের উন্মেষ

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সরকার বুঝতে পারে, ভারতবাসীর লোকবল ও অর্থবল ছাড়া যুদ্ধজয় অসম্ভব। সরকার-বিরোধী আন্দোলন প্রশমন এবং যুদ্ধে ভারতীয়দের সাহায্য লাভের উদ্দেশ্যে ১৯১৭ সালে ভারত-সচিব মন্টেগু যুদ্ধশেষে ভারতকে স্বায়ত্বশাসনের অধিকার দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। বড়লাট চেমসফোর্ড ও মন্টেগুর যৌথ রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৯১৯-এ পাশ হয় ভারত শাসন আইন যা ‘মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার’ নামে পরিচিত। এই শাসন সংস্কারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতা ও আয় সুনির্দিষ্টভাবে বন্টন করা হয়। কেন্দ্রের হাতে থাকে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, রেলপথ, ডাকব্যবস্থা, শুল্ক ও মুদ্রা। আর প্রাদেশিক সরকারগুলির হাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, পুলিশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, রাজস্ব, যোগাযোগ প্রভৃতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। যদিও এই আইন দেশবাসীর আশা পূর্ণ করতে পারেনি কারণ এই আইনের সাহায্যে ভারতীয় শাসনব্যবস্থার কোনও মৌলিক পরিবর্তনই সাধিত হয়নি।

একই সময়ে ভারতে সমস্ত রকমের রাজনৈতিক আন্দোলন ও বৈপ্লবিক কার্যকলাপ দমনের জন্য ১৯১৯-এর ১৮ মার্চ কুখ্যাত রাওলাট আইন জারি করা হয়। এই স্বৈরাচারী আইনটির বিরুদ্ধে গান্ধী ৩০ মার্চ দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেন। যদিও পরে তারিখ পাল্টিয়ে ৬ এপ্রিল ধার্য করা হয়। প্রসঙ্গত, এই সত্যাগ্রহকে সফল করে তোলার জন্য তিনি জনসমর্থনের অপেক্ষা করেননি, এমনকি জাতীয় কংগ্রেসের মুখাপেক্ষীও থাকেননি। সাবরমতী আশ্রমের বল্লভভাই প্যাটেল, সরোজিনী নাইডু, ইন্দুলাল যাজ্ঞিক সহ মাত্র জনা বিশেক একান্ত অনুগামীদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি এই ধর্মঘট ডাকেন। সঠিক সময়ে খবর না পাওয়ায় ৩০ মার্চই দিল্লি, মুলতান, লাহোর ও অমৃতসরে ধর্মঘট পালিত হয়।

১০ এপ্রিল পাঞ্জাবের দুই জনপ্রিয় নেতা সত্যপাল ও সৈফুদ্দিন কিচলুকে গ্রেফতার করলে পাঞ্জাবে ঝড়ের সূত্রপাত হয়। অহিংস জনতা ব্রিটিশ ডেপুটি কমিশনারের কাছে ওই দুই নেতাকে মুক্ত করার আবেদন জানাতে তাঁর বাসস্থানের দিকে গেলে সেনা গুলি চালায়। তাতে আহত ও নিহত মানুষদের দেখে উত্তেজিত জনতা পোস্ট অফিস, ব্যাংক ও রেলস্টেশনে আগুন লাগায় এবং চারজন নিরীহ ইংরেজকে হত্যা করে। ওই দিনই দুপুরে দিল্লির কাছে পালওয়াল স্টেশনে গান্ধীর গ্রেফতারের সংবাদ ছড়িয়ে পড়া মাত্র লাহোরে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। গান্ধী ও পাঞ্জাবের নেতৃদ্বয়ের গ্রেফতারের প্রতিবাদে অমৃতসর শহরে শান্তিপূর্ণ মিছিল বের হলে পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়, অন্ততপক্ষে ২০ জন নিহত ও ১৫০ জন আহত হন। সামরিক শাসনকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার ১২ এপ্রিল সামরিক শাসন জারি না করেই অমৃতসর শহরের অসামরিক কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নেন। শুরু হয় সভাসমিতির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং যথেচ্ছভাবে গ্রেফতার। ১৩ এপ্রিল ঘটে জালিয়ানওয়ালা বাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, যেখানে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যাই ছিল ৩৭৯ জন।

এই নারকীয় ঘটনা ঘটে যাওয়ার অনেক পরে খবর পান রবীন্দ্রনাথ। আইন ভঙ্গ করে গান্ধী ও তিনি পাঞ্জাবে একসঙ্গে প্রবেশ করে প্রতিবাদ জানাবেন এমন প্রস্তাব জানিয়ে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজকে পাঠান গান্ধীর কাছে। গান্ধী বলে দেন, “I do not want to embarrass the Government now”। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর নাইট উপাধি বর্জন করছেন, অননুকরণীয় ভাষায় লিখছেন — ‘... কোনো চিহ্নের দ্বারা পাঞ্জাবের এই ঘটনা চিরস্মরণীয় করা আমাদের পক্ষে গৌরবের নয়’, তখন গান্ধী জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ডকে আড়াল করতে গিয়ে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে মনোযোগী হতে বলে লিখছেন: “The best way of checking hatred, therefore, is to teach the nation to isolate the memory of the dead, which is a sacred trust, from the ‘frightfulness’ which should be forgiven if it cannot be forgotten” (CWMG, ২০/২০৬)। এবং রাওলাট আইনের প্রতিবাদে তাঁর সত্যাগ্রহ কর্মসূচীতে হিংসার প্রবেশ দেখে একে ‘Himalayan blunder’ বলে অভিহিত করে ১৮ এপ্রিল তিনি আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন।

জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডের পাক্কা চারমাস পরে ২৪ অগস্ট কংগ্রেস তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গোটা পাঞ্জাবে নিহত হয়েছিলেন মাত্র ৪ জন ইংরেজ আর ভারতীয় মারা গিয়েছিলে অন্ততপক্ষে ১২০০ জন। অথচ ভারতীয়দের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডকে ধিক্কার না জানিয়ে গান্ধী বলেন, “But the slow torture, degradation and emasculation that followed was much worse, more calculated, malicious and soul killing, and the actors who performed the deeds deserve greater condemnation than General Dyer for the Jallianwala Bagh massacre” (CWMG, ২১/৪৭)। বলা বাহুল্য, রাওলাট আইন কিন্তু বাতিল হয়নি।

এদিকে ভারতীয় রাজনীতিতে এক পরিবর্তন ঘটে। মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের অধিকাংশ তীর্থস্থানগুলি ছিল তুরস্ক সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। তুরস্কের সুলতানকে সমস্ত মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের খলিফা হিসাবে স্বীকার করে নিয়ে যাতে একটি সর্ব-ঐস্লামিক (প্যান-ইসলামিক) আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেই উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার উৎসাহ যোগাতে থাকে। কিন্তু ১৯২০ সাল নাগাদ কামাল আতার্তুক তুরস্কের সুলতানকে সিংহাসনচ্যুত করলে ব্রিটিশ সরকার কামালকে সমর্থন করে। ভারতীয় মুসলমানরা সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হন। ওই বছরেরই মার্চ মাসে প্যারিসে মহম্মদ আলি কূটনীতিকদের কাছে এই আন্দোলনের যে তিনটি কেন্দ্রীয় দাবি হাজির করেন সেগুলি হল: ক) মুসলমানদের পবিত্র স্থানগুলির নিয়ন্ত্রণ যেন অবশ্যই তুরস্কের সুলতান অর্থাৎ খলিফার হাতে থাকে; খ) খলিফা যাতে ইসলামি ধর্মবিশ্বাসকে রক্ষা করতে পারেন তার জন্যে তাঁকে যেন পর্যাপ্ত জায়গা দেওয়া হয় এবং গ) জাজিজার-উল-আরব অর্থাৎ আরব-সিরিয়া-ইরাক-প্যালেস্তাইন যেন অবশ্যই মুসলিম সার্বভৌমত্বের অধীনে থাকে।

আন্দোলনকে সফল করতে ১৯১৯-এর ২২-২৩ নভেম্বর দিল্লিতে সারা ভারত খিলাফত সম্মেলনে আলি ভ্রাতৃদ্বয়ের তরফ থেকেই সর্বপ্রথম ইংরেজদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অসহযোগের ডাক তোলা হয়। ১৯২০ সালের ১-৩ জুন অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির এলাহাবাদ সভায় গান্ধী তাঁদের সমর্থন করেন। ‘পাঞ্জাব অন্যায়’, ‘খিলাফত অন্যায়’ ও ‘স্বরাজ’ — এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি সংযুক্ত আন্দোলনের পরিকল্পনা নেওয়ার জন্য গান্ধী কংগ্রেসের ওপর চাপ দিতে শুরু করেন। ২৬ মে, ১৯২০-তে ইয়ং ইন্ডিয়ায় তিনি লেখেন, “… by helping the Mohammedans of India at a critical moment in their history, I want to buy their friendship” আর সেপ্টেম্বরে কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে তিনি প্রথম ঘোষণা করেন ‘Swaraj in one year’।

পরের বছর গান্ধী যখন লিখছেন: “…swaraj was a certainty inside of twelve months. If the atmosphere of non-violence is truly established, I make bold to say that we shall achieve the substance even during the remaining days of this year, though we might have to wait for the form yet a while” (CWMG, ২৫/২৫৪); তার ঢের আগে ১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নাগপুর কংগ্রেসের সম্মেলনে জিন্না রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের এই অশুভ আঁতাতের ব্যাপারে তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৯১৬ সালের লখনউ কংগ্রেসে জিন্না তিলকের সঙ্গে যৌথ ভাবে লখনউ চুক্তি সম্পাদনে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। চুক্তির প্রস্তাব লেখেন জিন্না এবং এই লখনউ চুক্তিই হিন্দু প্রাধান্যযুক্ত কংগ্রেসের সঙ্গে মুসলিম লিগের আলাদা নির্বাচকমণ্ডলীর ক্ষেত্রে সহমত প্রকাশ করে। নাগপুর কংগ্রেসের সভায় জিন্না গান্ধীকে অভিযুক্ত করে লেখেন, “Your methods have already caused split and division in almost every institution that you have approached hitherto, and in the public life of the country not only amongst Hindus and Muslims but between Hindus and Hindus, and Muslims and Muslims, and even between fathers and sons”। অবশেষে খিলাফতের বিরোধিতা করে জিন্না কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং তাঁর জীবদ্দশায় আর কখনও সেই দলে ফিরে আসেননি।

আসলে, গান্ধী যেভাবে অসহযোগ আন্দোলনে দেশের মুসলমানদের নেওয়ার জন্য জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে খিলাফত আন্দোলনকে যুক্ত করেছিলেন, তার যৌক্তিকতা ও সার্থকতা সম্বন্ধে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন। কারণ, খিলাফত ছিল আন্তর্জাতিক মুসলিম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যার সঙ্গে ভারতের জাতীয় জীবনের কোনও স্বার্থই জড়িত ছিল না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অগস্টে তিলকের মৃত্যুর পর গান্ধীই হয়ে ওঠেন কংগ্রেসের সর্বেসর্বা। তাই এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, অসহযোগ আন্দোলন সম্পূর্ণত গান্ধী পরিকল্পিত-ঘোষিত-নিয়ন্ত্রিত এবং আকস্মিকভাবে একক সিদ্ধান্তে প্রত্যাহৃত এক আন্দোলনের অন্য নাম এবং এই আন্দোলন থেকেই ভারতীয় রাজনীতিতে ‘গান্ধী যুগ’-এর শুরু। খিলাফত প্রতিষ্ঠা, পাঞ্জাবের অত্যাচারের প্রতিকার এবং এক বছরের মধ্যে স্বরাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গান্ধী যে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন তার কর্মসূচী হিসাবে গ্রহণ করা হয় — সরকারি খেতাব ও উপাধি, সরকারি স্কুল-কলেজ, পুলিশ-সেনাবাহিনী-আদালত ও সরকারি চাকরি এবং বিলিতি পণ্য বিশেষত বস্ত্র বয়কট।

উচ্চ ও মধ্য শ্রেণির ভারতীয়দের কাছে বয়কটের আহ্বান তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। মার্চ ১৯২১ অবধি ওকালতি ছেড়েছিলেন মাত্র ১৮০ জন আইনজীবী আর মোট ৫১৮৬টি খেতাবের মধ্যে মাত্র ২৪টি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। শিক্ষাক্ষেত্রে কিছু জাতীয় বিদ্যালয় ও কলেজ খোলা হয়েছিল বটে, কিন্তু এক বছরের মধ্যে স্বরাজ না আসায় তার অনেকগুলোই পাকাপাকিভাবে উঠে যায়। তবে আন্দোলনের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন যে শ্রমিক ও কৃষকরা, গান্ধী তাঁদের ধর্তব্যেই আনেননি! গোটা ১৯২১ সাল জুড়ে শ্রমিকরা মোট ৩৯৬টি ধর্মঘট করেছিলেন, যুক্ত ছিলেন ৬ লাখ শ্রমিক এবং শ্রমদিবস নষ্টের পরিমাণ ছিল ৭০ লাখ দিন। কিছু কিছু ধর্মঘটে আঞ্চলিক কংগ্রেস নেতারা, বিশেষত বাংলা ও মাদ্রাজে, সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে গান্ধীর অবস্থান ছিল দ্ব্যর্থহীন। ১৯২১-এর ১৬ ফেব্রুয়ারি ইয়ং ইন্ডিয়া-র ‘স্ট্রাইক’ নামক প্রবন্ধে তিনি জানান, ‘ধর্মঘট অহিংস অসহযোগের পরিকল্পনার আওতায় পড়ে না’। একই পত্রিকায় ‘দ্য লেসন অফ আসাম’ লেখাটিতে তিনি এ-ও বলেন: “In India we want no political strikes. … We must gain control over all the unruly and disturbing elements … We seek not to destroy capital or capitalists, but to regulate the relations between capital and labour. We want to harness capital to our side. It would be folly to encourage sympathetic strikes” (CWMG, ২৩/২৮৫)।

আন্দোলন যখন তুঙ্গে, সেই সময়ে ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে ঘটে মুসলমান কৃষকদের মোপলা বিদ্রোহ। ১৯১৬ থেকেই মালাবার উপকূলের দু’টি তালুকে (এরনাদ ও ওয়ালুতভানাদ) যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, ১৯২০-র এপ্রিলে মানজেরি সম্মেলনের পর খিলাফত আন্দোলনের নেতারা সেই বিক্ষোভকে নিজেদের হাতে তুলে নেন। ১৯২১ সালের ২০ অগস্ট অস্ত্রের তল্লাশি করার জন্য তিরুরঙ্গাভি মসজিদে পুলিশ অভিযান চালালে তার প্রতিবাদে পুলিশ চৌকি, সরকারি দফতর এবং অত্যাচারী হিন্দু ভূস্বামীদের বাড়িতে ব্যাপক হামলা হয়। বিদ্রোহ শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মোপলারা তালুক দুটো সম্পূর্ণ দখল করে সেখানে নিজেদের স্বাধীন রাজ্য গঠন করেন। এর পরে সরকার ট্যাংক, মেশিনগান ও বিমান থেকে অবিরাম গোলাগুলি এবং বোমাবর্ষণ করলে প্রায় আড়াই হাজার মোপলা মারা যান। এই বিদ্রোহকে সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠী ‘হিন্দুবিরোধী বিদ্রোহ’ হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করলেও ঐতিহাসিক সুমিত সরকার মোপলা বিদ্রোহকে নিছকই হিন্দু হত্যা অভিযান হিসাবে মেনে নেননি। বরং তাঁর মতে, এটি ছিল ‘এক বিশাল সশস্ত্র সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বিদ্রোহ’ যাকে নির্মমভাবে দমন করার ফলে ২৩৩৭ জন বিদ্রোহী নিহত, ১৬৫২ জন আহত এবং কম করেও ৪৫ হাজার জন বন্দী হন। এত জন বিদ্রোহীর মৃত্যুতেও অবিচলিত গান্ধী বলেন, “We must not betray any mental or secret approval of the Moplahs. We must see clearly, that it would be dishonourable for us to show any approval of the violence. … We have undertaken to do no violence even under the most provoking circumstances. … The misguided Moplahs have therefore rendered a distinct disservice to the sacred cause of Islam and swaraj” (CWMG, ২৪/১৮৯)।

অসহযোগ আন্দোলনের একেবারে শেষ পর্যায়ে ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই গান্ধী ছাড়া কংগ্রেস ও খিলাফতের প্রায় সমস্ত নেতাকে কারারুদ্ধ করা হয়। এই মাসের শেষ দিকে আমেদাবাদে হাকিম আজমল খাঁ-র সভাপতিত্বে (নির্বাচিত সভাপতি চিত্তরঞ্জন দাস জেলে বন্দী থাকার কারণে) শুরু হয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন। উৎসাহী জনসাধারণ আশা করেছিলেন যে, এই অধিবেশন থেকেই আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপ হিসাবে কর বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হবে। কিন্তু দেশব্যাপী বিক্ষুব্ধ কৃষকরা কর বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে খাজনা বন্ধের আন্দোলন চালু করলে তার রাশ টানা অসম্ভব হবে বুঝতে পেরে অধিবেশনের মূল প্রস্তাবে কর বন্ধ প্রসঙ্গে গান্ধী সম্পূর্ণ নীরব থাকেন। অধিবেশনের আগে রায়বেরিলিতে জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের গণবিদ্রোহকে শান্ত করতে রায়তদের নির্দেশ দিয়ে তিনি ১৮ মে, ১৯২১ লিখেছিলেন, “Whilst we will not hesitate to advise the kisans when the moment comes to suspend payment of taxes to the Government, it is not contemplated that at any stage of non-co-operation we would seek to deprive the zemindars of their rent. The kisan movement must be confined to the improvement to the status of the kisans and the betterment of the relations between the zemindars and them. The kisans must be advised scrupulously to abide by the terms of their agreement with the zemindars, whether such agreement is written or inferred from custom” (CWMG, ২৩/১৫৮)। এই অধিবেশনেও তাঁর নির্দেশে জমিদারগোষ্ঠীকে অভয় দিয়ে ঘোষণা করা হয়, “তাদের [জমিদারদের] বৈধ অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করবার কোনও ইচ্ছাই কংগ্রেস আন্দোলনের নেই। কৃষকগণ কর্তৃক জমিদারদের খাজনা বন্ধ করা কংগ্রেস প্রস্তাবের বিরোধী এবং মৌলিক স্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকর।”

আসলে অসহযোগ আন্দোলন যে পর্বতের মূষিকপ্রসব হতে চলেছে তা গান্ধী বুঝতে পেরেছিলেন। ১৯২২ সালের জানুয়ারি মাসেই তিনি তা কবুল করে বলেন, “… I do consider the idea of the Conference for devising a scheme of full swaraj premature. India has not yet incontestably proved her strength” (CWMG, ২৫/৪৭০)। তিনি যে কোনও উপায়ে আন্দোলন প্রত্যাহার করার একটা ছুতো খুঁজছিলেন। চৌরিচৌরার ঘটনা তাঁকে সেই প্রার্থিত ‘এসকেপ রুট’ এনে দেয়। যুক্তপ্রদেশের গোরখপুর জেলার চৌরিচৌরা গ্রামে মদ বিক্রি ও খাদ্যশস্যের চড়া দামের বিরোধিতা করে একদল স্বেচ্ছাসেবক ধর্না শুরু করেছিলেন। স্বেচ্ছাসেবকদের নেতা ভগবান আহিরকে পুলিশ গ্রেফতার করলে ক্ষুব্ধ জনতা থানা ঘেরাও করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি চালালে ক্ষিপ্ত জনতা থানায় অগ্নিসংযোগ করে। মারা যান দারোগাসহ ২২ জন পুলিশ। রাওলাট সত্যাগ্রহের মতো এবারও আন্দোলনে হিংসার অনুপ্রবেশের অজুহাতে গান্ধী ১২ ফেব্রুয়ারি বারদোলিতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির ডাকা জরুরি বৈঠকে আন্দোলন বন্ধের ঘোষণা করেন। যদিও ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় চৌরিচৌরার ঘটনাকে তিনি ঈশ্বর-পরিকল্পিত বলেছিলেন, কারণ এই ঘটনা তাঁকে ‘anarchy and chaos throughout the country’-র হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। প্রসঙ্গত, দায়রা আদালত প্রথমে ২২৫ জন অভিযুক্ত স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে অন্তত ১৭২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় (শেষ অবধি ১৯ জনকে ফাঁসি এবং বাকিদের দ্বীপান্তরের শাস্তি হয়) যদিও ১৭২ জনের জীবননাশের এই বর্বর প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে গান্ধী বা অন্য জাতীয়তাবাদী নেতারা কোনও প্রতিবাদই করেননি।

চৌরিচৌরার ঘটনার প্রেক্ষিতে গান্ধীর এহেন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদস্বরূপ মতিলাল নেহরু, লালা লাজপত রায়, চিত্তরঞ্জন দাস প্রমুখ নেতৃবৃন্দ জেল থেকে সুদীর্ঘ ও ক্রোধান্বিত চিঠি লিখলে গান্ধীর শীতল উত্তর ছিল জেলে বন্দি ব্যক্তিগণ ‘রাজনীতিতে মৃত’ এবং কর্মপন্থা সম্পর্কে কোনও কিছু বলার দাবি করতে পারেন না। চৌরিচৌরার ঘটনাকে ছুতো করে গান্ধী যেভাবে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনে রাশ টানেন, তার তীব্র বিরোধিতা করে নেহরু তাঁর আত্মজীবনীতে লেখেন: “We were angry when we learned of this stoppage of our struggle at a time when we seemed to be consolidating our position and advancing on all fronts. But our disappointment and anger in prison could do little good to anyone; civil resistance stopped, and non-cooperation wilted away”। সুভাষও ‘The Indian Struggle 1920-1942’ গ্রন্থে একই সমালোচনার সুরে লেখেন — “To sound the order of retreat just when public enthusiasm was reaching the boiling point was nothing short of a national calamity. The principal lieutenants of the Mahatma, Deshbandhu Das, Pandit Motilal Nehru and Lala Lajpat Rai, who were all in prison, shared the popular resentment. I was with the Deshbandu at the time, and I could see that he was beside himself with anger and sorrow”। খিলাফত আন্দোলনের নেতা ও কর্মীরাও প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন।

যে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী হিন্দু-মুসলমানের অভূতপূর্ব ঐক্য সম্মিলিত হয়েছিল, সেই একই আন্দোলনের আচমকা প্রত্যাহারে দেশ জুড়ে শুরু হয় অসংখ্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সাইমন কমিশনের রিপোর্ট থেকে জানা যায় ১৯২২ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ১১২টি দাঙ্গায় প্রায় ৪৫০ জন মারা যান, আহত হন প্রায় ৫ হাজার মানুষ। গান্ধীর একতরফা সিদ্ধান্তের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি যে সাম্প্রদায়িকতা, তা উপলব্ধি করে নেহরু লিখেছিলেন: “It is possible that this sudden bottling-up of a great movement led to a tragic development in the country. The suppressed violence had to find a way out, and in the following years this perhaps aggravated the communal trouble”। রবীন্দ্রনাথও ব্যথিত চিত্তে লেখেন, “ঈশ্বরদ্রোহী পাশবিকতাকে ধর্মের নামাবলী পরালে যে কী বীভৎস হয়ে ওঠে তা চোখ খুলে একটু দেখলেই বেশ বোঝা যায়।” যে আন্দোলনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কেঁপে উঠেছিল, তার এহেন নৈরাশ্যজনক সমাপ্তি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাকে ২৫টা বছর পিছিয়ে দেয়।


সহায়ক লেখাপত্র :
১. নরহরি কবিরাজ (সম্পাদিত) – অসমাপ্ত বিপ্লব, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা : ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস
২. সুপ্রকাশ রায় – ভারতের জাতীয়তাবাদী বৈপ্লবিক সংগ্রাম (১৮৯৩-১৯৪৭)
৩. সুমিত সরকার – আধুনিক ভারত : ১৮৮৫-১৯৪৭
৪. Leonard A. Gordon – Brothers Against the Raj
৫. Philip Sprat – Gandhism: An Analysis, Vol. II
৬. Stanley Wolpert – Jinnah of Pakistan

চতুর্থ পর্ব আগামী সপ্তাহে ...

লিঙ্ক - https://www.gandhiashramsevagram.org/gandhi-literature/collected-works
-of-mahatma-gandhi-volume-1-to-98.php


চতুর্থ পর্ব : গান্ধী ও অহিংসা — ছিন্ন করো ছদ্মবেশ

এর আগের পর্বে আমরা দেখেছি, যখনই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত গণসংগ্রাম চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে তখনই গান্ধী সেই আন্দোলনের রাশ নিজের হাতে তুলে নিতে চেয়ে অহিংসার ধুয়ো তুলেছেন। কিন্তু সারা জীবন তাঁর কার্যক্রম কিংবা অসংখ্য বাণী আমরা যদি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাব তথাকথিত ‘অহিংসা’ নিয়ে গান্ধী বা তাঁর অনুগামীদের উচ্চগ্রামের ঢক্কানিনাদ কতটা অসার, কতটা মোহ আবরণ। শুধু তাই নয়; যে গান্ধী হিংসায় নিহত শ্বেতাঙ্গদের নিয়ে সতত সোচ্চার, সেই একই ব্যক্তি অগণিত ভারতীয়ের মৃত্যুতে নিয়ত নিস্পৃহ।

যুদ্ধ এবং যুদ্ধজনিত হিংসা সম্পর্কে তাঁর মনোভাব স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করে যে গান্ধী লেখেন: “I draw no distinction between those who wield the weapons of destruction and those who do Red Cross work. Both participate in war and advance its cause. Both are guilty of the crime of war” (ইয়ং ইন্ডিয়া, ১৩-৯-১৯২৮); সেই তিনিই ‘Satyagraha in South Africa’ গ্রন্থে এ বিষয়ে তাঁর প্রকৃত মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করে ফেলেন এ কথা লিখে — “Our existence in South Africa is only in our capacity as British subjects. In every memorial we have presented, we have asserted our rights as such. We have been proud of our British citizenship, or have given our rulers and the world to believe that we are so proud. Our rulers profess to safeguard our rights because we are British subjects, and what little rights we still retain, we retain because we are British subjects”। ওই একই গ্রন্থে তিনি ব্রিটিশদের পক্ষ নিয়ে ভারতীয়দের যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়ে খোলাখুলি সমর্থন জানিয়ে আরও লেখেন, “And if we desire to win our freedom and achieve our welfare as members of the British Empire, here is a golden opportunity for us to do so by helping the British in the war by all means at our disposal”। মনে রাখতে হবে, ১৯২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল এই গ্রন্থ এবং সেই বইটিতে উদ্ধৃত বাক্যবন্ধটি সংশোধনের কোনও প্রচেষ্টাই তিনি করেননি।

প্রথম মহাযুদ্ধের শেষ দিকে যুদ্ধে ভারতীয় সেনাদের অংশগ্রহণের জন্য ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড চেমসফোর্ড ১৯১৮ সালের ২৭ এপ্রিল দিল্লিতে যে যুদ্ধ সম্মেলন আহ্বান করেন, সেখানে তিনি গান্ধীকে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানান। তিলক ও আলি ভ্রাতৃদ্বয়কে সম্মেলনে না ডাকার কারণে গান্ধী এ ব্যাপারে প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। শেষে চেমসফোর্ডের সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের পরে সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে তিনি ওই সম্মেলনে উপস্থিত হন এবং ইংরেজদের যুদ্ধ প্রচেষ্টা সমর্থন করে সমস্ত শক্তি দিয়ে ইংরেজদের সাহায্য করার জন্য ভারতের জনসাধারণকে আহ্বান করেন। সম্মেলনের পরে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ভাইসরয়কে তিনি জানান: “I recognize that, in the hour of its danger, we must give, — as we have decided to give — ungrudging and unequivocal support to the Empire, of which we aspire, in the near future, to be partners in the same sense as the Dominions overseas. But it is the simple truth that our response is due to the expectation that our goal will be reached all the more speedily… I would make India offer all her able-bodied sons as a sacrifice to the Empire at its critical moment; and I know that India by this very act would become the most favoured partner in the Empire and racial distinctions would become a thing of the past” (CWMG, ১৭/৭-৮)।

২৯ এপ্রিল লর্ড চেমসফোর্ডকে লেখা ওই একই চিঠিতে তিনি আরও জানান — “In Champaran, by resisting an age-long tyranny, I have shown the ultimate sovereignty of British justice. In Kaira, a population that was cursing the Government now feels that it, and not the Government, is the power when it is prepared to suffer for the truth it represents. It is, therefore, losing its bitterness and is saying to itself that the Government must be a Government for the people, for it tolerates orderly and respectful disobedience where injustice is felt. Thus, Champaran and Kaira affairs are my direct, definite, and special contribution to the war”।

এই প্রসঙ্গে গান্ধীর তৃতীয় সত্যাগ্রহটি সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে আলোচনা করে নেওয়া জরুরি। খারাপ ফসলের দরুন খাজনা মকুবের জন্য চাপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে কাপরভঞ্জ তালুকের মোহনলাল পান্ড্যর মতো আঞ্চলিক নেতাদের তরফ থেকে ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে গান্ধীকে গুজরাটের খেড়া জেলাতে আহ্বান জানানো হয়। বিস্তর টালবাহানার পরে গান্ধী পরের বছর ২২ মার্চ বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন। কিন্তু তার আগেই খেড়ার চাষিদের খাজনা জমা দিতে বাধ্য করা হয় এবং সেই বছর ভালো রবি শস্যের ফলন খাজনা মকুবের বিষয়টিকে কমজোরিও করে দেয়। পরিণামে ভারতের প্রথম প্রকৃত কৃষক সত্যাগ্রহ খেড়ার ৫৫৯টি গ্রামের মধ্যে মাত্র ৭০টিতে ছাপ ফেলতে সক্ষম হয় ও নামমাত্র ছাড় পেয়েই জুন মাসে এই সত্যাগ্রহ তুলে নিতে হয়।

এই সত্যাগ্রহে চেমসফোর্ডের সঙ্গে গান্ধী খেড়ার বিষয়ে দর কষাকষি শুরু করেন। খেড়াতে সরকার সম্মানজনক সন্ধিতে রাজি হলে তিনি যুদ্ধের জন্য ‘recruiting agent-in-chief’ হিসেবে ব্রিটিশ সেনাদলে ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে প্রচারকাজ চালাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। সরকার এই প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পরে গান্ধী পূর্ণ উদ্যমে খেড়ার গ্রামগুলি থেকে সৈন্য সংগ্রহে নেমে পড়েন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন প্রায় ১১ লক্ষ ভারতীয় সেনা, তার পরেও গান্ধী সেনা সরবরাহের দায়িত্ব কেন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তার উত্তর মেলা ভার।

দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয়দের যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য যে হাস্যকর যুক্তিজাল বিস্তার করেছিলেন গান্ধী, হুবহু একই যুক্তি দেখিয়ে ২২ জুন নাদিয়াদের এক জনসভায় তিনি বলেন, “As long as we have to look to Englishmen for our defence, as long as we are not free from the fear of the military, so long we cannot be regarded as equal partners with Englishmen. It behoves us, therefore, to learn the use of arms and to acquire the ability to defend ourselves. … There can be no friendship between the brave and the effeminate. We are regarded as a cowardly people. If we want to become free from that reproach, we should learn the use of arms” (CWMG, ১৭/৮৩)। ওই একই সভায় খেড়ার কৃষিজীবীদের ব্রিটিশদের সমর্থন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি যুক্তি দেন — “Partnership in the Empire is our definite goal. We should suffer to the utmost of our ability and even lay down our lives to defend the Empire. If the Empire perishes, with it perish our cherished aspirations. Hence the easiest and the straightest way to win swaraj is to participate in the defence of the Empire” (CWMG, ১৭/৮৪)। ৯ জুলাই নাদিয়াদ থেকেই জিন্নাকে ভারতীয় মুসলমানদেরও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে তিনি লেখেন: “What a proud thing it would be if we recruited and, at the same time, insisted on amendments in the Reform Scheme!” (CWMG, ১৭/১২৫)।

এই ‘মর্যাদাসূচক’ গোলামির জন্য গান্ধী অজস্র ভারতবাসীকে সাম্রাজ্যবাদী কামানের খোরাক বানাতেও দ্বিধা করেননি। ‘অহিংসার পূজারী’ গান্ধী সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজকে সাহায্য করার তীব্র বাসনায় রীতিমতো হিসেব কষে দেখান যে, খেড়া জেলায় গ্রামপিছু ২০ জন তরতাজা যুবক যুদ্ধে গেলে ১২ হাজার সৈন্য যোগাড় করা কোনও সমস্যার ব্যাপারই নয়! তাঁদের প্রাণবিসর্জনকে স্বাভাবিক বিষয় ধরে নিয়ে এমনকি খেড়ার মৃত্যুহার উল্লেখ করতেও ভোলেন না তিনি!! অসংখ্য দরিদ্র ভারতীয়র প্রাণের বিনিময়ে ‘স্বরাজ’-এর স্বপ্ন দেখানো গান্ধী তাঁদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “To sacrifice sons in the war ought to be a cause not of pain but of pleasure to brave men. Sacrifice of sons at this hour will be a sacrifice for swaraj. … There are 600 villages in Kheda district. Every village has on an average a population of over 1,000. If every village gave at least twenty men, Kheda district would be able to raise an army of 12,000 men. The population of the whole district is seven lakhs and this number will then work out at 1.7 per cent, a rate which is lower than the death rate. If we are not prepared to make even this sacrifice for the Empire, for the sake of swaraj, no wonder that we should be regarded unworthy of it. If every village gives at least twenty men, on their return from the war they will be the living bulwarks of their village. If they fall on the battle-field, they will immortalize themselves, their village and their country, and twenty fresh men will follow their example and offer themselves for national defence” (CWMG, ১৭/৮৬-৮৭)। অথচ ভারতীয়দের এই ‘সহযোগিতা’ ও অকাতরে প্রাণ বিসর্জনের মূল্য হিসেবে ব্রিটিশ সরকার উপহার দিয়েছিল কুখ্যাত ‘রাওলাট বিল’!

সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের হিংসানীতির প্রবল সমর্থক গান্ধী কেবল ভারতীয়দের ক্ষেত্রে তাঁর ‘অহিংসা’-র মুখোশটি পরে নিয়েছেন এবং যতীন দাসের অনশনে মৃত্যুবরণ; ভগৎ সিং-সুখদেব-রাজগুরুর ফাঁসি; বিনয়-বাদল-দীনেশের আত্মবলিদান; চন্দ্রশেখর আজাদের আত্মহত্যা কিংবা আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনানীদের আত্মত্যাগ তাঁর বিন্দুমাত্র মনোযোগ বা সহানুভূতি আকর্ষণ করতে পারেনি। এই সব ব্যাপারে হয় তিনি আজীবন নীরব থেকেছেন নয়তো ‘বিপথগামী’ বলে অভিহিত করেছেন।

১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল ট্রেড ডিসপিউট বিলের বিরোধিতা করে ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত অ্যাসেম্বলি হলে বোমা ছোঁড়েন, শুর হয় দ্বিতীয় লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা। ১১ জুন যতীন দাসকে এই মামলার সঙ্গে যুক্ত করে গ্রেফতার করে লাহোর জেলে পাঠানো হয়। লাহোর জেলে বন্দিদের অব্যবস্থার প্রতিবাদে ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত অনশন শুরু করেন। এই অনশনের সমর্থনে ১৩ জুলাই যতীন দাসসহ বাকি বন্দিরা অনশনে যোগ দেন। ২৬ জুলাই যতীন দাসের নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। ইতিমধ্যে অনেক বন্দি অনশন ভঙ্গ করলেও তাঁদের দাবি না মেটা পর্যন্ত যতীন অনশন চালানোর বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকেন। ১৩ সেপ্টেম্বর একটানা ৬৩ দিনের অনশনের পরে তিনি বরণ করেন শহিদের মৃত্যু। অথচ অনশন যাঁর সংগ্রামের অন্যতম বিখ্যাত হাতিয়ার, সেই গান্ধী যতীন দাসের এই আত্মবলিদানকে নিরাসক্তভাবে বর্ণনা করেন ‘diabolical suicide’ বা স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা বলে।

১৯৩০ সালের ২৩ এপ্রিল বাদশা খান ও বেশ কয়েকজন নেতা গ্রেফতার হওয়ার ফলে পেশোয়ারে এক বিশাল অভ্যুত্থান ঘটে। কিস্‌সাকহানি বাজারে তিন ঘন্টা ধরে সাঁজোয়া গাড়ি থেকে প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ করা হয়। সরকারি সূত্র অনুসারে এতে নিহত হন ৩০ জন এবং বেসরকারি হিসাবে তা ২৫০ ছাড়ায়। হিন্দু সৈন্যদের নিয়ে তৈরি গাড়োয়াল রাইফেলস-এর একটি বাহিনী পেশোয়ারের বিদ্রোহী শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-জনসাধারণের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করে। গান্ধী গাড়োয়ালি সৈন্যদের ‘অবাধ্যতা ও শৃঙ্খলাভঙ্গের ভয়ংকর অপরাধ’-এ অভিযুক্ত করে তাঁদের তীব্র ভর্ৎসনা করেন। অথচ, বিদ্রোহ দমন করতে শাসক যখন বিদ্রোহীদের হত্যা করে তখন তার প্রতিবাদে গান্ধী একটা কথাও বলেননি। ৪ মে, অর্থাৎ ঘটনার ১০ দিন পরে ব্রিটিশরা পেশোয়ারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হয়। গাড়োয়ালি সৈন্যদের শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধে পনেরো বছরের সশ্রম কারাদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের শাস্তি হয়। কিন্তু গান্ধী-আরউইন চুক্তিতে রাজবন্দিদের মুক্তির উল্লেখ থাকলেও গাড়োয়ালি সেনাদের মুক্তির ব্যাপারটা বাদ রাখা হয়। চুক্তিতে স্পষ্ট বলা হয়, ‘Soldiers and police convicted of offences involving disobedience of orders... will not come within scope of this amnesty’।

ফরাসি সাংবাদিক চার্লস পেত্রাশ ১৯৩১-এর ২৯ অক্টোবর এ ব্যাপারে গান্ধীকে প্রশ্ন করেন: “Why did you not see that the Garhwali soldiers, who had refused to fire on an unarmed crowd, were included in the truce? How do you reconcile that with your doctrine of non-violence, since these men were punished for having refused to be party to an act of violence?” উত্তরে নির্বিকারচিত্তে গান্ধী যে সাফাই দেন তা এইরকম — “The Garhwali prisoners (as they are called) deliberately disobeyed their orders. I agree that it was a non-violent action on their part, but it was also a gross breach of discipline by those who had taken an oath to carry out the commands of their officers. … I cannot ask officials and soldiers to disobey; for when I am in power I shall in all likelihood make use of those same officials and those same soldiers. If I taught them to disobey I should be afraid that they might do the same when I am in power” (CWMG, ৫৩/৪৪৭)। অর্থাৎ ক্ষমতা লাভের পরে গান্ধী স্বয়ং অহিংসার বাণী বিতরণের বদলে সামরিক বাহিনীর ওপরেই শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হবেন!

১৯৩১ সালে ভগৎ সিং-এর ফাঁসির ছ’দিন পরে ২৯ মার্চ করাচিতে কংগ্রেসের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরুর আত্মত্যাগ এবং সাহসিকতার প্রশ্নে গান্ধীর সংশোধনীর পরে নিছকই দায়সারাভাবে যে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় তা হল — ‘যদিও কংগ্রেসের নীতি সমস্ত প্রকারের হিংসাত্মক কার্যকলাপ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখা এবং এ-সব সমর্থন না করা, তবুও সে দেশপ্রেমীদের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ প্রশংসচিত্তে স্মরণ করে’।

১৯৩৫-এর শেষ দিকে মুসোলিনি বাহিনী সাত মাস নিরবচ্ছিন্ন বোমাবর্ষণের পরে আবিসিনিয়া দখল করে। অহিংসার পথ অবলম্বন করলে আবিসিনিয়ার বাসিন্দারা উপকৃত হতেন তা জানিয়ে গান্ধী বলেন, “But if the Abyssinians had retired from the field and allowed themselves to be slaughtered, their seeming inactivity would have been much more effective though not for the moment visible” (হরিজন, ২০-৩-১৯৩৭)। এই বিষয়ে একই কথার পুনরাবৃত্তি করে ১৯৩৮ সালে তিনি লেখেন: “… if the Abyssinians had adopted the attitude of non-violence of the strong, i.e., the non-violence which breaks to pieces but never bends, Mussolini would have had no interest in Abyssinia. Thus if they had simply said: ‘You are welcome to reduce us to dust or ashes but you will not find one Abyssinian ready to co-operate with you’, what would Mussolini have done? He did not want a desert” (CWMG, ৭৩/১৫৬)।

বিভিন্ন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে জার্মানি যখন লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ ইহুদিকে হত্যা করছে সেই ১৯৩৮ সালে গান্ধী ইহুদিদের উপদেশ দিচ্ছেন: “I am convinced that, if someone with courage and vision can arise among them to lead them in non-violent action, the winter of their despair can in the twinkling of an eye be turned into the summer of hope” (হরিজন, ২৬-১১-১৯৩৮)। এই বীভৎস গণহত্যার প্রতিবাদ হিসাবে তিনি ইহুদিদের এমনকি গণ-আত্মহত্যার পরামর্শ দিতেও পিছপা হচ্ছেন না। একইভাবে জার্মানি চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমণ করলে তিনি লিখছেন, চেকরা যদি “… had known the use of non-violence as a weapon for the defence of national honour, they would have faced the whole might of Germany with that of Italy thrown in ... to save their honour they would have died to a man without shedding the blood of the robber” (হরিজন, ৮-১০-১৯৩৮)।

১৯৪০-এর জুলাই মাসে জার্মানি ও ইংরেজদের যুদ্ধ চলাকালীন গান্ধী প্রকাশ করেন ‘To Every Britton’ নামক এক বার্তা। সেখানে ইংরেজ জাতির উদ্দেশে তিনি বলেন — “I want you to fight Nazism without arms, or, if I am to retain the military terminology, with non-violent arms. I would like you to lay down the arms you have as being useless for saving you or humanity. You will invite Herr Hitler and Signor Mussolini to take what they want of the countries you call your possessions. Let them take possession of your beautiful island, with your many beautiful buildings. You will give all these but neither your souls, nor your minds. If these gentlemen choose to occupy your homes, you will vacate them. If they do not give you free passage out, you will allow yourself man, woman and child, to be slaughtered, but you will refuse to owe allegiance to them (হরিজন, ৬-৭-১৯৪০)। অথচ একই গান্ধী ১৫ মে, ১৯৪০ হিটলারের প্রশংসা করে লিখতে পারেন: “I do not consider Hitler to be as bad as he is depicted. He is showing an ability that is amazing and he seems to be gaining his victories without much bloodshed” (CWMG, ৭৮/২১৯) কিংবা ওই বছরেই ২৪ ডিসেম্বর হিটলারকে লেখা চিঠিতে তিনি জানাতে পারেন, “We have no doubt about your bravery or devotion to your fatherland, nor do we believe that you are the monster described by your opponents” (CWMG, ৭৯/৪৫৬)! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নারকীয় হত্যালীলার সময়ে ‘অহিংসার পূজারী’ গান্ধী কিছুদিনের জন্যে হলেও এই বিশ্বাসে অটল ছিলেন যে, যুদ্ধে অক্ষশক্তির জয় নিশ্চিত। হয়তো এই কারণেই তিনি ভারতবর্ষের ‘সম্ভাব্য শাসক’ অক্ষশক্তির প্রতিনিধিদের প্রিয় পাত্র হতে চেয়েছিলেন। সেই অশান্ত সময়ে দাঁড়িয়ে একমাত্র নেহরু ছাড়া ভারতের অন্য কোনও নেতা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও ফ্যাসিবাদী শক্তির এক ও অভিন্ন রূপ চিনতে পারেননি। সুভাষ তো নয়-ই, গান্ধীও নয়।

আন্তর্জাতিক আঙিনা থেকে আমরা যদি চোখ ফেরাই জাতীয় প্রেক্ষাপটের দিকে, তাহলেও একই চিত্র আমরা দেখতে পাব। ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো ভারতীয় সৈন্যদের জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জুড়ে দেওয়ার কথা বললে কংগ্রেস নেতারা এই একতরফা ঘোষণায় ক্ষুব্ধ হন। যুদ্ধ সম্পর্কে ১৯২৭ থেকে কংগ্রেস বারবার যে-সব প্রস্তাব নেয় তার মূল কথা ছিল সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে ভারত কখনও অংশ নেবে না এবং জনগণের সম্মতি ছাড়া ভারতকে কোনও যুদ্ধে লিপ্ত করা চলবে না। অথচ ওয়ার্কিং কমিটিতে গান্ধী শর্তনিরপেক্ষ অহিংস সমর্থনের কথা বলেন। সিমলায় বড়লাটের সঙ্গে দেখা করার পর ব্রিটিশ যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ‘ন্যায়’-এর পক্ষে যুদ্ধ করছে এবং এই কারণেই ভারতবাসীর তাকে সমর্থনের প্রয়োজন তা জানিয়ে গান্ধী বলেন, “I am not therefore just now thinking of India’s deliverance. It will come, but what will it be worth if England and France fall, or if they come out victorious over Germany ruined and humbled?” (CWMG, ৭৬/৩১২)। কিন্তু ওয়ার্কিং কমিটির অধিকাংশ সদস্যই তা মেনে না নিয়ে শর্তসাপেক্ষে সামরিক সাহায্যের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ন্যূনতম কিছু শর্ত মেনে নিলে যুদ্ধপ্রচেষ্টায় কংগ্রেসের তরফে ফ্যাসিস্ট জার্মানির বিরুদ্ধে পূর্ণ সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হয়। শর্তগুলি ছিল — ক) যুদ্ধের পরে স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক কাঠামো স্থির করার জন্য এক সংবিধান-রচনা পরিষদের প্রতিশ্রুতি এবং খ) সেই মুহূর্তে কেন্দ্রে প্রকৃত দায়িত্বশীল সরকার জাতীয় একটা কিছু গড়ে তোলা। যদিও বড়লাট সে সমস্ত প্রস্তাব নাকচ করে দেন। ১৭ অক্টোবর লিনলিথগোর বিবৃতিতে যুদ্ধের পরে ১৯৩৫-এর আইন রদবদলের জন্য ‘শুধু কয়েকটি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় বসা হবে’ জাতীয় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি যুদ্ধঘোষণার দিনই বলবৎ করা হয় ভারত রক্ষা অর্ডিন্যান্স।

২৩ অক্টোবর ওয়ার্কিং কমিটিতে ভাইসরয়ের বিবৃতিকে বাতিল করে দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যুদ্ধ সমর্থন করা হবে না এবং প্রতিবাদে কংগ্রেসি মন্ত্রিসভাগুলোকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু সরকার তার দমননীতি থেকে সরে না এসে একের পর এক অর্ডিন্যান্স জারি করে বাক্‌স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে শুরু করে। সারা দেশ জুড়ে জাতীয়তাবাদী কর্মী বিশেষত বামপন্থী কর্মীদের হয়রান করা শুরু হয়। এমনকি কংগ্রেস যদি গণসংগ্রাম শুরু করার দিকে কোনও পদক্ষেপ নেয় তাহলে কংগ্রেসকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্যও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয় সরকার। ওই বছরের ২৩ নভেম্বর ও ২২ ডিসেম্বর ওয়ার্কিং কমিটির গৃহীত দুটি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারকে যতদূর সম্ভব বিব্রত করা থেকে রেহাই দিয়ে কংগ্রেসি কার্যক্রম গঠনমূলক কার্যসূচী রূপায়ণে সীমাবদ্ধ থাকে।

পরের বছর জার্মানি পশ্চিম ইউরোপ দখল করার পরে কংগ্রেস নেতৃত্ব আরও একবার ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণার সাপেক্ষে ইংরেজদের সমর্থনের কথা জানান। কিন্তু যে গান্ধী এক বছর আগেও যুদ্ধে ইংরেজদের শর্তনিরপেক্ষ সমর্থনের কথা বলেছিলেন, সেই তিনিই এই সময়ে কংগ্রেসের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে গিয়ে বলেন: “It is wrong to help the British war-effort with men or money. The only worthy effort is to resist all war with non-violent resistance” এবং ১৯৪০ সালের অক্টোবর মাস থেকে অহিংস গণ সত্যাগ্রহের বদলে শুরু করেন ‘ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ’। ১৭ অক্টোবর বিনোবা ভাবে প্রথম শুরু করেন এই সত্যাগ্রহ, দ্বিতীয় জন নেহরু। গান্ধী-উদ্ভাবিত এই সত্যাগ্রহের নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক জেলার সত্যাগ্রহীদের নামের তালিকা আগে গান্ধীর কাছে পেশ করতে হত। তালিকা থেকে তিনি তাঁর পছন্দমতো সত্যাগ্রহীদের বাছাই করতেন এবং কেবলমাত্র সেই নির্বাচিত ব্যক্তিরাই সত্যাগ্রহ করার অধিকার পেতেন। এই সত্যাগ্রহীরা কখন কোথায় সত্যাগ্রহ করবেন তা পুলিশকে আগে জানানো হত।

এই ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ শুরু হওয়ার কিছুদিন পরে ওই বছরেরই ২ ডিসেম্বর ওয়ার্ধা থেকে ভারত সরকারের হোম মেম্বার রেজিনাল্ড ম্যাক্সওয়েলকে গান্ধী তাঁর লক্ষ্য ব্যাখ্যা করে লেখেন, “অবিচলভাবে আমার ব্রত পালন করতে গিয়ে সরকারের ন্যূনতম অস্বস্তি (least embarrassment) সৃষ্টি করাই আমার ইচ্ছা। যদি এটি সফল হয়, ব্রিটিশের সঙ্গে সঙ্গে ভারত-ও উপকৃত হবে এবং শেষ পর্যন্ত সারা পৃথিবী। এটি যদি ব্যর্থও হয়, সরকারের ওপরে আঘাত আসবে না। ... কর্তব্যের নির্দেশে আমি আপাতদৃষ্টিতে বিরোধী পন্থা অবলম্বন করেছি। আমি এতে স্বচ্ছন্দ বোধ করছি যে, আপাতদৃষ্টিতে বিরোধী শিবিরে থেকেও ব্রিটিশ সরকারের ঘোষিত লক্ষ্যের অনুকূলেই আমি কাজ করছি, এই বিশ্বাস থেকে যে তাদের পদ্ধতি নাৎসিবাদ (Hitlerism)-কে পরাজিত করতে না পারলেও একমাত্র আমার পদ্ধতিই পারবে, যদি আদৌ পারে” (CWMG, ৭৯/৪১০)। ফলত গান্ধীর নেতৃত্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন কংগ্রেসের রাজনৈতিক সংগ্রাম এক চূড়ান্ত প্রহসনে পরিণত হয়।

অহিংসা বিষয়ে গান্ধীর বিপরীতধর্মী মনোভাবের শেষ প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৪৬ সালের ১৮-২৩ ফেব্রুয়ারি বোম্বাইয়ের নৌ-বিদ্রোহের সময়। রাজনৈতিকভাবে অনগ্রসর ‘সামরিক জাতি’ (মার্শাল রেস) থেকে নিয়োগ করাই ছিল পুরনো সামরিক প্রথা। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের সময়ে রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির যে বিস্তার হয় তাতে দেশের সব জায়গার লোকই আসার ফলে সেই প্রথা আলাদা হয়ে যায়। ১৮ ফেব্রুয়ারি নৌ-সঙ্কেত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ‘তলোয়ার’-এর রেটিংরা খারাপ খাবার ও বর্ণবৈষম্যগত অপমানের বিরুদ্ধে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। রেটিংদের দাবি ছিল মূলত দু’টি — ক) ভালো খাবার ও শ্বেতাঙ্গ নাবিকদের সঙ্গে ভারতীয় নাবিকদের বেতনসাম্য এবং খ) আজাদ হিন্দ ফৌজ তথা অন্যান্য রাজবন্দিদের মুক্তি ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার। ‘তলোয়ার’ জাহাজের ১১০০ রেটিংদের নিয়ে যে বিদ্রোহ শুরু হয় তা ক্রমে বোম্বাই বন্দরের ২২টি জাহাজে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিদ্রোহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ হাজার। পাশাপাশি হিন্দু ও মুসলমান ছাত্র-শ্রমিকরা পুলিশ তথা সেনাবাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে তাঁদের সমর্থন করেন।

ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্‌-মুহূর্তে এই বিদ্রোহ কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ নেতৃবৃন্দের অস্বস্তি বাড়িয়ে তোলে।প্যাটেল, আজাদ এবং গান্ধী এই সহিংস বিদ্রোহের নিন্দা করেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় যে গান্ধী ব্রিটিশ শাসনের অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করতে পনেরো দিনের অরাজকতা মেনে নিতেও প্রস্তুত বলে লুই ফিশারকে জানিয়েছিলেন; হিংসাত্মক পন্থা অবলম্বন করে কৃষকরা জমিদারদের কাছ থেকে জমি কেড়ে নিতে পারে - এমন সম্ভাবনাও যিনি উড়িয়ে দেননি; সেই গান্ধীর চোখেই নৌ-বিদ্রোহ সহসা মন্দ হয়ে ওঠে! অবিকল পেশোয়ার বিদ্রোহের সময় গাড়োয়ালি সেনাদের অসহযোগিতার মতো একই কারণ দেখিয়ে তিনি লেখেন “... the lesson would be a bad inheritance. Discipline will be at least as necessary under swaraj, as it is now…”। ‘ভারতের পক্ষে একটি অশুভ ও অশোভন দৃষ্টান্ত’ স্থাপনের জন্য নৌ-বিদ্রোহের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন গান্ধী ২২ ফেব্রুয়ারি রেটিংদের নিন্দা করেন এবং চাকরি নিয়ে কোনও অভিযোগ থাকলে তাঁদের শান্তিপূর্ণভাবে পদত্যাগ করার উপদেশ দেন।

‘মিউটিনি ইন দ্য নেভি’ প্রবন্ধে তিনি লেখেন, “... insulting and injuring the Europeans, is not non-violence of the Congress type …” (হরিজন, ৩-৩-১৯৪৬)। ওই একই প্রবন্ধে তিনি আরও বলেন: “A combination between Hindus and Muslims and others for the purpose of violent action is unholy…”। অবশেষে ২৩ ফেব্রুয়ারি প্যাটেল রেটিংদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আত্মসমর্পন করান। তাঁদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও রকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে জাতীয় দলগুলি তা আটকাবে। যদিও ৪৭৬ জন বরখাস্ত নৌসেনার একজনকেও পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারত কিংবা পাকিস্তান – কোনও দেশের সেনাবাহিনীতেই পুনর্বহাল করা হয়নি।

হিংসার প্রতি গান্ধীর ঘৃণা এবং অহিংসার বুলি যে আদতে একটি ঘৃণ্য কৌশল এবং জনসাধারণকে প্রতারণার একটি অপচেষ্টা মাত্র, তা তিনি প্রথমে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং পরে ভারতে প্রমাণ করেছিলেন। সংগ্রামী জনসাধারণকে দমন করবার জন্য শাসকগোষ্ঠীকে অবাধ সুযোগদানের উদ্দেশ্যে গান্ধীর উপদেশ: “প্রতিপক্ষের আঘাত যতই তীব্র হোক না কেন, তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে জনসাধারণের কিছুতেই বলপ্রয়োগ করা উচিত নয়। শাসকগোষ্ঠীর হৃদয় জয় করেই তাদের মুক্তি অর্জন করতে হবে।” সুতরাং গান্ধীর নীতিতে অহিংসা কেবল ভারতবাসীর অবশ্য পালনীয় আর সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠীকে দেওয়া হয়েছে গুলিগোলা চালিয়ে ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-নারী হত্যার অবাধ স্বাধীনতা!!

সহায়ক লেখাপত্র :
১. বিপান চন্দ্র ও অন্যান্য – ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম : ১৮৫৭-১৯৪৭
২. নরহরি কবিরাজ (সম্পাদিত) – অসমাপ্ত বিপ্লব, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা : ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস
৩. সুমিত সরকার – আধুনিক ভারত : ১৮৮৫-১৯৪৭
৪. D. G. Tendulkar – Mahatma: Life of Mohandas Karamchand Gandhi, Vol. VII
৫. Louis Fischer – Mahatma Gandhi: His Life & Times

পঞ্চম পর্ব পরের সপ্তাহে ...


1936 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3] [4] [5]   এই পাতায় আছে 61 -- 80
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

বাকি পর্ব কবে?
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

Comment from এবড়োখেবড়ো on 22 October 2019 22:01:02 IST 237812.68.454512.126 (*) #

খুব স্পষ্ট ভাষায় বলি, এই জিনিসটা শোভন লাগল না। পৃথিবীতে অনেক নাম আছে, তার যে কোনও একটা নামে লেখা যায়। কিন্তু যখন একজন এই নামে লিখছেন তখন অন্যের বেছে বেছে এই নাম নেওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। মন্তব্য করা তো নয়ই। আমি লগ ইন করে মন্তব্য করি না। কিন্তু এটা দেখে লিখতেই হল।

বাকি পর্ব সময়মতো আসবে। আগে থেকে ঘড়ি-ঘন্টা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি আদৌ উৎসাহী থাকেন এই লেখা পড়তে, তবে সাইটে চোখ রাখবেন মাঝে মাঝে।
Avatar: ঋভু

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

^^ একই নিক ব্যাপারটা একটা টেকনিক্যাল গ্লিচ হতে পারে। আগে প্রায়ই হতো লেখার কমেন্টে।
Avatar: r2h

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

ও হ্যাঁ, এইটা খুব সম্ভবত বাগ; মন্তব্যকারী ইচ্ছে করে এক নিকে লেখেননি।

এটার কি যেন একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন আছে, ব্লগে মন্তব্য করার সময় লগিন করা থাকলে বা না থাকলে ফোন বা ল্যাপটপ থেকে, এরকম। টইয়ের পোস্টে হয় না এটা।
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

যদি নিছকই টেকনিক্যাল গ্লিচ হয় তো কোনও সমস্যা নেই। আমি অবশ্য এ ব্যাপারে কিছুই জানকারি রাখি না। যাই হোক, দ্বিতীয় পর্ব দিলাম আজ।
Avatar: এস চক্রবর্তী

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

একটা প্রশ্ন ছিল মিল শ্রমিকদের ৩৫% দাবি দাওয়া কেন্দ্রিক আন্দোলনে যেভাবে মোহন দাসঅনশনে বসে গেলেন , তাতে একটা জিনিস স্পষ্ট যে মিল শ্রমিকদের উপর তার কোন নিয়ন্ত্রন ছিল সেটা কিভাবে? মানে আত্মিক যোগাযোগ না ইউনিয়ন ইত্যাদি নাকি একে বারেই কংগ্রেস পার্টি কেন্দ্রিক কোনও নিয়ন্ত্রন , মিল শ্রমিকদের উপর কাজ করত ? না গুজরাটি সংযোগ ভিত্তিক লোকাল নেতা ? সময় করে উত্তর দিলেই হবে।
Avatar: +-×÷

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

যে রাজেন্দ্রপ্রসাদ চম্পারণের ইংরেজ জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে গান্ধীর সত্যাগ্রহে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন, ঘটনার ২০ বছর পরে তাঁরই প্রত্যক্ষ মদতে তাঁর সন্তানেরা চম্পারণের একরের পর একর উর্বর জমি আত্মসাৎ করেছিল!
—–– রেফারন্স?
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

@এস চক্রবর্তী

মিলশ্রমিকদের ওপরে তাঁর যে খুব একটা নিয়ন্ত্রণ ছিল তা কিন্তু নয়। তাঁরা গান্ধীকে মধ্যস্থতা করার জন্য ডাকেনওনি। প্রশ্ন উঠবে, তাহলে তাঁকে মধ্যস্থতা করার জন্য ডেকেছিলেন কে বা কারা? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আরও একবার গান্ধীর শ্রেণিচরিত্র স্পষ্ট হবে। খেয়াল করে দেখুন শ্রমিকরা তাঁদের আবি আদায়ের জন্য ২৫ দিন ধর্মঘট করছেন। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না, অথচ যেই গান্ধী অনশনে বসলেন সব সমস্যা মিটে গেল। তাঁর অনশনের চারদিনের মাথায়। কেন? কারণ এ বিষয়ে তাঁকে ডেকেছিলেন আম্বালাল সারাভাই, যিনি ছিলেন Ahmedabad Mill Owners’ Association-এর সভাপতি। তাঁর চাঁদার পরিমাণ আগেই লিখেছি। এছাড়াও সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর সত্যাগ্রহের অর্থভাণ্ডারে সে বাজারে ২৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন টাটা। সেখান থেকে ভারতে ফিরে আসার পরে তাঁকে বিপুল অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন বিড়লা। আর দীর্ঘদিন কংগ্রেসের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব সামলিয়েছেন যমনালাল বাজাজ। গান্ধী এমনি এমনি ‘the rich cannot accumulate wealth without the co-operation of the poor in society’ বাণী বিতরণ করেননি!

শুধু কি তাই? ১৯২০ নাগাদ তিনি একটি শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে তোলেন যার নাম ছিল 'মজুর মহাজন সংঘ' বা Workers and Mill-Owners Association। নাম শুনেই বুঝতে পারছেন সেই ইউনিয়নের কাজ! মানে শোষক-শোষিত ভাই-ভাই!! এই ইউনিয়নে আজীবনের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন আম্বালালের ভগ্নী অনুসূয়া বেন আর গান্ধী ছিলেন ইউনিয়নের অ্যাডভাইসরি কমিটির অন্যতম প্রধান সদস্য। হ্যাঁ, আজীবনের জন্য! ইউনিয়নের সদস্যদের জন্য ধর্মঘট পুরো নিষিদ্ধ ছিল এবং ইউনিয়নটি কোনও দিন এআইটিইউসি বা গিরণি কামগর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

@+-×÷

শুধু এই একটি বাক্য লেখার জন্য রেফারেন্স হিসেবে আমি রামমোহন লোহিয়ার Guilty Men of India’s Partition-এর উল্লেখ করেছি। লোহিয়া ওই গ্রন্থে লিখেছেন, “Mr. Rajendra Prasad fought with Gandhiji against the British landlords and indigo planters of Champaran and for the right of farmers to the fruits of their toil in what became the first engagement of civil disobedience on Indian soil. Twenty years later, he allowed his sons to acquire acres and acres of this lush soil of Champaran, not through a normal purchase but as the result of political patronage”।

Avatar: রঞ্জন

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

@ এবড়ো খেবড়ো,
শেষ পর্বের অপেক্ষায় আছি । আপনার পদ্ধতিতে কোন সংশয় নেই । কোন ঐতিহাসিক চরিত্রের মূল্যায়ন কেবল তাঁর নিজের লেখা আত্মজীবনী নির্ভর হওয়া বাঞ্ছনীয় নয় ।
সেই দাড়িদাদু কবে বলে গেছেন--' -- কে ছবি আঁকিয়া যায় জানি না । যেই আঁকুক, সে ছবিই আঁকে।'
ফলে শুধু আপন মনের মাধুরী বা ইচ্ছাকৃত তথ্যের বিকৃতি নয় , বয়সের সঙ্গে সঙ্গে লেখকের দেখার চোখ, অনুপাত জ্ঞানও বদলে যায় । নিজেকেই দেখি-- ছোটবেলায় যে পাহাড় , যে পুকুর বা যে বাড়ি বিশাল মনে হয়েছিল এখন মেলাতে গিয়ে দেখি সেগুলো আসলে তত বড় ছিল না ।
তাই ক্রস চেক, সমসাময়িক অন্য সোর্সের সঙ্গে মেলানো এবং সারকামস্টেনশিয়াল এভিডেন্সের সঙ্গে মেলানো খুব দরকার । আর ভক্তের চোখে না দেখলে কোন সাদা ছবি একটু ধূসর হতেই পারে , তাতে ভয় পাবার কিছু নেই । তবে আজকের মূল্যবোধ এবং সেই সময়ের প্রেক্ষিত মনে রাখা খুব দরকার। নইলে মূল্যায়ন ( অ্যাবসলূট নিরপেক্ষ হওয়া মানুষের ক্ষমতার বাঈরে) বাম বা ডান দিকে হেলে পড়বে। হয় ভক্তের নয় নিন্দুকের ন্যারেটিভ হয়ে যাবে ।
২ আমি গান্ধীশতবার্ষিকী বছরে (১৯৬৯) যে গেলাস আদ্দেক খালি দেখেছি আজ পঞ্চাশ বছর পরে সেটা আদ্দেক ভরা দেখছি। গেলাসে জল আগের মতই আছে , শুধু দেখার চোখ পালটে গেছে।
তিরিশের দশক এবং চল্লিশের দশক নিয়ে আপনার বক্তব্য শোনার অপেক্ষায় আছি । মতের ভীষণ অমিল হবে এবং তেড়ে তক্কো হবে সেই আশায় ।ঃ))
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

@রঞ্জন

এখনও অবধি যে পদ্ধতিতে সংশয় প্রকাশ করেননি, তার জন্য ধন্যবাদ। আমি সমসাময়িক প্রেক্ষিতেই দেখতে চাইছি গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনকে। তাঁর সমসাময়িক মানুষজন কিংবা তাঁর চেয়ে বয়সে ছোট অথচ একই সময়ে ভারতীয় রাজনীতিতে প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক, তাঁদের চোখ দিয়েও বিশ্লেষণ করতে চাইছি তাঁর কর্মকাণ্ডকে। আবারও বলি, সাদা ফ্যাটফেটে গান্ধী বা কালো কুচকুচে গান্ধী মূল্যায়নে কোনও পরিশ্রম নেই যতটা আছে ধূসর রক্তমাংসের গান্ধী বিশ্লেষণে। আমি পরিশ্রম করার চেষ্টা করছি মাত্র। বাকিটা পাঠক বলবেন। মূল্যায়ন যাতে কিছুতেই মার্কসীয় একবগ্গা একটেরে না হয় তার জন্য সচেতন প্রয়াস জারি আছে কারণ সেটা ত্রুটিমুক্ত হবে না কিছুতেই। আর ডান দিকে হেলে পড়ার কোনও প্রশ্নই নেই।

আসলে লেখাটা দশটা (বা সম্ভবত এগারোটা) পর্বে শেষ হবে। সবে দুটো পর্ব প্রকাশিত হয়েছে। সত্যি কথা বলতে লেখার সময়েও ভাবতে পারিনি যে লেখাটা এত বড় হবে। ফলে পাঠকদের সুবিধার কথা ভেবেই পর্বে পর্বে দেওয়ার চেষ্টা করছি।

তেড়ে তক্কো হোক, কাটাছেঁড়া হোক এই লেখা নিয়ে। আমার এতটুকু আপত্তি নেই। বিপরীত দৃষ্টিকোণ বা তথ্য সর্বদা স্বাগত, তাতে নিজেই বরং সমৃদ্ধ হব। তিরিশ এবং চল্লিশ মানে তো আমার কাছে গান্ধী ছাড়াও আম্বেদকর, রবীন্দ্রনাথ, নেহরু, সুভাষ এবং অতি অবশ্যই জিন্না। তো তাঁদের নিয়ে লিখেছি আলাদা আলাদা পর্বে। কিন্তু তাঁদের নিয়ে আপনার নিজের বক্তব্য না জানা পর্যন্ত কীভাবে বুঝব যে আমি এবং আপনি একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছি না সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে? সেটা নিয়ে দু-চার কথা যদি বলেন অন্তত তাহলে বুঝতে পারি।
Avatar: রঞ্জন

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

সঙ্গে আছি ।ঃ))
Avatar: রিভু

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

পড়ছি। একটা কোট কমপ্লিট থাকা উচিত ছিল, আউট অফ কন্টেক্স্ট লেগেছে।

“ the fury that has been spent upon General Dyer is, I am sure, largely misdi- rected. No doubt the shooting was ‘frightful’, the loss of innocent life deplorable. But the slow torture, degradation and emasculation that followed was much worse, more calculated, malicious and soul killing, and the actors who perform the deeds deserve greater condemnation than General Dyer for the Jallianwala Bagh massacre. The latter only destroyed a few bodies but the others tried to kill the soul of a নেশন”

Avatar: সিএস

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

এই লেখাটায় আমার যা আপত্তি, সেগুলি এরকম, যেঃ

১। লেখাটি কোটেশনের ওপর নির্ভরশীল, ফলে সামনে পেছনে কী আছে সেগুলি বোঝা যাচ্ছে না। যেমন, জালিয়ানওয়ালাবাগ নিয়ে কোটটি, লেখক যেভাবে তুলেছিলেন সেটি পড়ে আমার মনে হয়েছিল, গান্ধী দেশের লোকের দুঃখে দুঃখী নয়, পরন্তু ৪ জন ইংরেজ মারা গেছিল বলে, সেই ঘটনার প্রতি কাতর। কিন্তু রিভু যে কোটটি দিয়েছেন সেটি পড়ে মনে হয়, না সেরকম নয়, দেশের লোকের সম্বন্ধেই মন্তব্য করছেন এবং সমালোচনা করছেন ইংরেজ সরকারের যারা মানুষকে শারীরিক ভাবেই শুধু ধ্বংস করছে না, তাদের আত্মাও নষ্ট করছে। এই যুক্তিটি কিন্তু গান্ধীর চিন্তাভাবনা বা কাজের পদ্ধতির সাথে মিলে যায়।

২। লেখাটি শুধুই সমালোচনা। লেখকের সেরকম উদ্দেশ্য থাকতেই পারে কিন্তু ইতিহাসের দিক দিয়ে বা সোশিওলজির দিক দিয়েই, এইরকম একপেশে যুক্তি একটু অপ্রসাঙ্গিক, অন্তত আমার কাছে। ইতিহাসের প্রায় সব 'মহান' ব্যক্তিই কন্ট্রাডিকশনে ভরা, সে বিবেকানন্দ বা গান্ধী কিন্তু আমার আগ্রহ হল, এটা বোঝা যে তাও তাঁরা কীভাবে একটা বিশেষ সময় জুড়ে বড় সংখ্যক মানুষকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। এটাকে শুধুই জালিয়াতি আর ভড়ং বলে যুক্তি দিলে, সে লেখা অন্তত আমার কাছে অপ্রয়োজনীয়। গান্ধীর ক্ষেত্রেই, সমালোচনা কম হয়নি, কমিউনিস্টরা করেছে শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গী না থাকার কারণে, অনশনকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার অভিযোগ ছিল, ব্রহ্মচর্য পালনের উপায় নিয়ে নির্মলকুমার বসুর আপত্তি ছিল, কিন্তু এসব সত্ত্বেও একটা সময় জুড়ে খুব সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন, হিতেশরঞ্জন সান্যালের লেখায় মনে হয় এরকম সব উদাহরণ আছে যে মাতঙ্গিনী হাজরার চেয়েও সাধারণ মহিলা গান্ধীর প্রভাবে 'সত্যাগ্রহী' হয়ে উঠেছিলেন। এই প্রভাবিত করার ব্যাপারটি না জানতে পারলে, নিন্দেমূলক লেখাগুলি আমার অপছন্দের, তার বদলে আশীষ নন্দীর লেখালেখি পড়ে ফেলা উচিত। বর্তমানের মানুষের চোখ থেকে মোহ আবরণ খুলে ফেলব, সবার নির্মোক খসিয়ে ফেলে উলঙ্গ করে ফেলব, লোকে জানতে পারবে বড় মানুষদের আসল চরিত্র, যে কোন লেখক যদি সেরকম উদ্দেশ্য নিয়ে লিখতে নামেন, আমি মনে করি, সেরকম চেষ্টা না রাখাই ভাল। ইতিহাস আর বাস্তবতা অতি জটিল, সে সব কিছু এইরকম প্রকল্পের উদ্দেশ্য সাধন করবে সেটা মনে করিনা, উপরন্তু এও মনে করিনা যে সেই প্রকল্পটি সঠিক, কারণ যেটা আগে বললাম, কন্ট্রাডিক্শন থাকলেও, জননেতারা, ধর্মীয় নেতারা, সমাজ হিতৈষীরা অনেক দূর অবধি জনসাধারণকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। আর এই প্রভাবিত করার ব্যাপারটি ধরতে পারলে কীভাবে বিশেষ সামাজিক পরিশ্থিতিতে একজন ব্যক্তি ইতিহাসের প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠে, কীভাবে মানুষের যৌথ চাহিদা একজনের মধ্যে দিয়ে কিছুটা হলেও আর্টিকুলেটেড হয়, সেই জটিল সম্পর্কের ব্যাপারটি খোলসা হয়।
Avatar: শোভন চক্রবর্তী

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

“We could understand not being classed with the whites, but to be placed on the same level with the Natives seemed too much to put up with. … At the same time, it is indubitably right that Indians should have separate cells”.
মানে সেই তৃতীয় রা স্তা পোষ্টাপিসে যেমনটি করেছিলেন । মানে মধ্যপন্থা ওনার প্রিয়ছিল চিরকাল । ‘

“.........physically harmful and morally sinful’ রূপে বিবেচনা করে ব্রহ্মচর্য পালন শুরু করেছেন (যদিও পরবর্তীকালে তাঁর ব্রহ্মচর্যের পরীক্ষার জন্য অজস্র নগ্ন নারীর বক্ষলগ্না হয়ে রাত কাটাবেন তিনি)”
সিদ্ধান্ত যদি হয়েই থাকে তাহলে আবার কিসের পরীক্ষা ? নাকি পরীক্ষার আড়ালে আচার চুরি করে খাবার লাইসেন্স ?

“গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলন ভারতীয়দের সমানাধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে আদৌ ফলপ্রসু হয়নি। সেই ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে হতাশ গান্ধী ১৯০৯ সালের ২৩ জুন নিজেই লিখেছিলেন”
এরজন্য কি গ্রেসমার্ক দেওয়া যায় না ?

“ সরকার কমিশনের প্রস্তাবগুলি Indian Relief Bill এ অন্তর্ভুক্ত করে ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে বিলটিকে আইনে পরিণত করে”
এটা তো একটা সাফল্য , তাই না ?

সব শেষে একটা কথাই বলি “অশ্বিন দেশাই এবং গুলাম ভাহেদ একটি মাত্র বাক্যে গান্ধীর দক্ষিণ আফ্রিকা পর্বের যে মূল্যায়ন করেছেন তার তুলনা মেলা ভার “ এটা আমার কাছে একটা সম্পদ ।
শুধু এটা পড়লেই ৩৪% নম্বর পাওয়া যাবে ।

রোজ পড়ি আজ কমেন্ট করলাম কারণ আজকেড় পর্ব সত্যি আমার মনের মত ।
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

@রিভু

//পড়ছি। একটা কোট কমপ্লিট থাকা উচিত ছিল, আউট অফ কন্টেক্স্ট লেগেছে।//

বেশ। মেনে নিলাম। কিন্তু আমি তো খণ্ড, পৃষ্ঠাসংখ্যা সবই উল্লেখ করার চেষ্টা করছি এবং প্রতিটি পর্বের শুরুতে পাঠকের সুবিধার্থে রচনাবলির লিঙ্কও দিচ্ছি। পাঠক ইচ্ছে করলেই যাতে উদ্ধৃতাংশের আগের ও পরের অংশটি পড়তে পারেন। আমি আমার প্রয়োজনমাফিক অংশটাই দিচ্ছি কারণ ঠিক আপনার পরেই সিএস অভিযোগ করেছেন যে এ লেখা ‘কোটেশনের ওপর নির্ভরশীল’। অথচ কোটেশন দিতেই হচ্ছে, নতুবা গান্ধীর কথা ও কাজের ফারাকটা তুলে ধরতে অসুবিধে হচ্ছে। তাছাড়া একটি মাত্র বাক্য লেখার রেফারেন্সও অনেকে চাইছেন। কাজেই এ ব্যাপারে আমি নাচার।

কিন্তু আপনার কোটটা ‘আউট অফ কন্টেক্স্ট’ লাগছে কেন? মানে আপনি যতটুকু তুলে ধরেছেন আমি তার থেকে কম তুলে কী মহা অন্যায় করলাম? লেখার সুরে বা বক্তব্যে আমি মূল কোনও পার্থক্য খুঁজে পাইনি। প্রথমত, এই দীর্ঘ অংশে উনি নমো নমো করে নৃশংস হত্যাকাণ্ডটির জন্য ঠিক দু’টো শব্দ ব্যবহার করেছেন --- ‘frightful’ ও ‘deplorable’ এবং ভারতীয়দের কাজকম্মো কত খারাপ তার ব্যাখ্যা দিতে আদাজল খেয়ে নেমেছেন। জাতির ‘আত্মা’ খায় না মাথায় দেয়? কে বলছেন? না যিনি নিজে ঠিক এক বছর আগে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে ভারতীয়দের কামানের খোরাক বানাতে খেড়ায় সৈন্য সংগ্রহে নেমেছেন নির্লজ্জের মতো। তখন ওঁর ‘আত্মা’ কোথায় বন্ধক দেওয়া ছিল? কার কাছে? শুধু তাই নয়, ভারতীয়দের পুঞ্জীভূত ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ কেবলমাত্র ডায়ারের বিরুদ্ধে নয়, সমগ্র ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে। অথচ তিনি সুকৌশলে এই অংশটিতে তাঁর অভিমুখ ঘুরিয়ে দিয়েছেন ডায়ারের দিকে। সমগ্রকে আড়াল করে এই যে মাত্র একজন ব্যক্তির ঘাড়ে বন্দুক চাপানোর চেষ্টা — এটাই তো ‘largely misdirected’।

দ্বিতীয়ত, জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডে মৃত ব্যক্তিদের বলিদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে উনি সৌধ বানাতে উদগ্রীব অথচ পাঞ্জাবে ব্রিটিশ প্রশাসনের যে ম্যাসিভ অ্যাট্রোসিটির ফলে আরও আটশোরও বেশি মানুষ মারা গেলেন তাঁদের স্মরণে কোনও সৌধ বানাতে উদ্যোগী হননি তো। এমনকি এই ঘটনার মাত্র ৩ বছর পরে চৌরিচৌরাতে মৃত ভারতীয়দের জন্য কোনও সৌধ বানাতে বলেননি তো। এই একপেশে আচরণ কেন?

@সিএস

//লেখাটি কোটেশনের ওপর নির্ভরশীল, ফলে সামনে পেছনে কী আছে সেগুলি বোঝা যাচ্ছে না। যেমন, জালিয়ানওয়ালাবাগ নিয়ে কোটটি, লেখক যেভাবে তুলেছিলেন সেটি পড়ে আমার মনে হয়েছিল, গান্ধী দেশের লোকের দুঃখে দুঃখী নয়, পরন্তু ৪ জন ইংরেজ মারা গেছিল বলে, সেই ঘটনার প্রতি কাতর। কিন্তু রিভু যে কোটটি দিয়েছেন সেটি পড়ে মনে হয়, না সেরকম নয়, দেশের লোকের সম্বন্ধেই মন্তব্য করছেন এবং সমালোচনা করছেন ইংরেজ সরকারের যারা মানুষকে শারীরিক ভাবেই শুধু ধ্বংস করছে না, তাদের আত্মাও নষ্ট করছে। এই যুক্তিটি কিন্তু গান্ধীর চিন্তাভাবনা বা কাজের পদ্ধতির সাথে মিলে যায়।//

আপনার এই প্রশ্নের উত্তর আমি আগেই দিয়েছি এবং আরও বলি আপনি উদ্ধৃতিটির সম্পূর্ণ ভুল অর্থ করেছেন। ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে উনি এই অংশে একটি কটু কথাও বলেননি।


//ইতিহাসের প্রায় সব ‘মহান’ ব্যক্তিই কন্ট্রাডিকশনে ভরা, সে বিবেকানন্দ বা গান্ধী কিন্তু আমার আগ্রহ হল, এটা বোঝা যে তাও তাঁরা কীভাবে একটা বিশেষ সময় জুড়ে বড় সংখ্যক মানুষকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। ... এই প্রভাবিত করার ব্যাপারটি না জানতে পারলে, নিন্দেমূলক লেখাগুলি আমার অপছন্দের, তার বদলে আশীষ নন্দীর লেখালেখি পড়ে ফেলা উচিত। ... ইতিহাস আর বাস্তবতা অতি জটিল, সে সব কিছু এইরকম প্রকল্পের উদ্দেশ্য সাধন করবে সেটা মনে করিনা, উপরন্তু এও মনে করিনা যে সেই প্রকল্পটি সঠিক, কারণ যেটা আগে বললাম, কন্ট্রাডিক্শন থাকলেও, জননেতারা, ধর্মীয় নেতারা, সমাজ হিতৈষীরা অনেক দূর অবধি জনসাধারণকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। আর এই প্রভাবিত করার ব্যাপারটি ধরতে পারলে কীভাবে বিশেষ সামাজিক পরিশ্থিতিতে একজন ব্যক্তি ইতিহাসের প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠে, কীভাবে মানুষের যৌথ চাহিদা একজনের মধ্যে দিয়ে কিছুটা হলেও আর্টিকুলেটেড হয়, সেই জটিল সম্পর্কের ব্যাপারটি খোলসা হয়।//

মাফ করবেন, আপনার দীর্ঘ মন্তব্যটি সামান্য সংক্ষেপিত আকারে রাখলাম যদিও আপনার মূল বক্তব্যটি তাতে বিঘ্নিত হচ্ছে না বলেই আমার বিশ্বাস। যাই হোক, আপনার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি। হ্যাঁ, এ কথা নিঃসন্দেহে ঠিক গান্ধী ক্রাউডপুলার ছিলেন, মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার সহজাত দক্ষতা তাঁর ছিল। এবং তাঁর কিছু গুণ না থাকলে এতদিন ধরে মানুষকে তিনি মেসমারাইজড করে রাখতে পারতেন না। ওয়েল, একমত আপনার সঙ্গে এই জায়গাটুকুতে।

কিন্তু এই যে জনসাধারণের মধ্যে তাঁর অসম্ভব জনপ্রিয়তা - তার কতটা সেই সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা-সঞ্জাত আর কতটা তাঁর ‘সাধু’-সুলভ ইমেজের প্রোজেকশন? রামধুন-চরকা-আত্মশুদ্ধি-পাপবোধ-অনশনসহ এই দারিদ্রক্লিষ্ট নিরক্ষর কুসংস্কারাচ্ছন্ন জনসাধারণের কাছে তাঁর যে প্রায় ভগবানসুলভ ভাবমূর্তি, মাত্র একজন অসীম বলশালী মানুষ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে জয়ী হবেনই এই যে অন্ধবিশ্বাস — তার সুন্দর চিত্র অঙ্কিত আছে সতীনাথ ভাদুড়ীর ঢোঁড়াইতে। শাহিদ আমিনও ‘গান্ধী যখন মহাত্মা’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কেমন করে ইংরেজরাজ চলে গিয়ে গান্ধীরাজ আসবে বলে মানুষের বিশ্বাস ক্রমে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হচ্ছে। অথচ এই জনসাধারণকে কি আদৌ তিনি তাঁর আন্দোলনে শামিল করেছেন? না। কৃষক শ্রেণি? বাদ। শ্রমিক শ্রেণি? বাদ। তাহলে কারা তাঁর আন্দোলনের সাথী? তাঁর একান্ত বিশ্বস্ত অনুগামীরা — প্যাটেল, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, কৃপালনি, রাজাগোপালাচারির মতো বশংবদ ক্ষমতালোভী আপসকামী নেতৃবৃন্দ।

শুধু তাই নয়। কোনও আন্দোলন শুরু করার সময়েও যেমন তিনি তাঁর কোনও সহকর্মীর সঙ্গে পরামর্শ করার তোয়াক্কা করেননি, সেই আন্দোলন আচমকা বন্ধ করার সময়েও তাই। এই চরম একনায়ক নেতাটি তাঁর সমস্ত প্রতিস্পর্ধী নেতা, সমস্ত প্রতিস্পর্ধী কর্মসূচীকে হয় একপেশে করে দিয়েছেন না হয় বাতিল করে দিয়েছেন চরম ধূর্ততার সঙ্গে। বিপিন পাল, অ্যানি বেসান্ত, তিলক, জিন্না, চিত্তরঞ্জন — তাঁর সমসাময়িক সমস্ত নেতাকে তো তিনি দমিয়ে দিয়েছেনই, পাশাপাশি নেহরু-সুভাষের মতো তরুণদের তিনি ব্যবহার করেছেন ইচ্ছেমতো। ওয়ার্কিং কমিটির সমবেত সিদ্ধান্ত তিনি একার হাতে পাল্টিয়ে দিয়েছেন গণতন্ত্রের তোয়াক্কাটুকু না করে, সে তিনি কংগ্রেসের সদস্য থাকুন বা না থাকুন। গোলটেবিল বৈঠকে তিনি সদম্ভে ঘোষণা করেছেন ভারতবর্ষের সমস্ত জাতি ও সম্প্রদায়কে রিপ্রেজেন্ট করছেন তিনি একা। এই ঔদ্ধত্য, এই অহং আর কোনও ভারতীয় নেতা প্রকাশ করেছেন?

যে আন্দোলনে তিনি হাত দিয়েছেন সেই আন্দোলনেই তিনি ব্যর্থ। তাহলে তাঁর প্রায় ৪৫ বছরের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবদান ঠিক কোথায়? বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই? না। সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা? না। দলিত সম্প্রদায়ের উন্নতি? না। অবিভক্ত ভারতবর্ষ? না। তাহলে হ্যাঁ কোনটা?

হ্যাঁ আসলে একটা জায়গাতেই! তাই দেশীয় রাজন্যবর্গ তাঁর আন্দোলনের আওতার বাইরে। সামন্তপ্রভুরা তাঁর আন্দোলনের আওতার বাইরে। মিলমালিকরা তাঁর আন্দোলনের আওতার বাইরে। তাঁর আন্দোলন হচ্ছে ব্রিটিশ শাসনকে যথাসম্ভব অক্ষুণ্ণ রেখে কলাটা-মুলোটা পাওয়ার স্বায়ত্তশাসন লাভ। তাঁর চালিকাশক্তি হচ্ছেন ঘনশ্যামদাস বিড়লা অ্যান্ড কোং আর তিনি হচ্ছেন তাঁদের রাজনৈতিক ভাষ্যনির্মাতা। তিনি নিজে লুই ফিশারের কাছে শিল্পপতিরাই যে কংগ্রেসের প্রধান অর্থদাতা এবং তাদের প্রতি যে কংগ্রেসের ‘silent debt’ আছে তা স্বীকার করেছেন। কাজেই অ্যাটলান্টিক চার্টার নিয়ে চার্চিল বেকায়দায় না পড়লে আমাদের স্বাধীনতা কবে আসত কেউ জানে না।

মৃত্যুর প্রায় ৭৫ বছর পরেও এহেন মানুষটিকে হাই পেডেস্টালে চড়িয়ে পুজো করতে যাব কোন দুঃখে? বিশেষত জিন্না, রবীন্দ্রনাথ, আম্বেদকর, নেহরু, সুভাষ এমনকি ব্রিটিশরাও যাঁকে ছেড়ে কথা বলেননি? তিনি তাঁর সাধুত্ব দেখাতে চাইলে হিমালয়ে তপস্যায় বসতে পারতেন, গিরিকন্দরে আশ্রয় নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তো আদ্যন্ত রাজনৈতিক নেতা। এতগুলো মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, এত রক্তপাত, এত শরণার্থী — এর দায় তিনি নেবেন না?

শেষে শুধু দু’টো কথা বলি। আশিস নন্দী আমি যেমন পড়েছি, তেমন রামচন্দ্র গুহও পড়েছি। কিন্তু গোটা লেখায় তাঁদের বইয়ের উল্লেখ করা তো দূরের কথা, একটি বাক্য নেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করিনি। সম্প্রতি অরুন্ধতী রায় আম্বেদকরের বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে প্রায় আলাদা একটি প্রবন্ধে গান্ধী সম্পর্কে লিখেছেন, “Obama loves him and so does the Occupy Movement. Anarchists love him and so does the Establishment. Narendra Modi loves him and so does Rahul Gandhi. The poor love him and so do the rich. He is the Saint of the Status Quo.” এই স্থিতাবস্থার সওয়াল করা সন্তটি সম্পর্কে অরুন্ধতী রায়ের পড়াশোনার এক শতাংশও আমার নেই, তবে আমি ঠিক নিঃসন্দিহান নই যে আপনার তাঁর চেয়েও বেশি আছে কি না।

আশিস নন্দীর মেড ইজি পড়ে যদি আপনার সব পাওনা মিটে যায় তবে এ লেখা না পড়ার এবং তেড়ে সমালোচনা করার অধিকার আপনার একশোবার আছে। তবে তার আগে গান্ধীর সদর্থক দিকগুলো এক এক করে আপনার তুলে ধরা দরকার। তারও আগে দরকার রবীন্দ্রনাথের সেই প্রবন্ধটি পড়া যেখানে তিনি লিখেছেন — মহত্বকে পদে পদে নিন্দার কাঁটা মাড়াইয়া চলিতে হয়। ইহাতে যে হার মানে বীরের সদ্‌গতি সে লাভ করে না। পৃথিবীতে নিন্দা দোষীকে সংশোধন করিবার জন্য আছে তাহা নহে, মহত্বকে গৌরব দেওয়া তাহার একটা মস্ত কাজ।

@শোভন চক্রবর্তী

গুরুতে আপনাকে স্বাগত এবং মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ। আপনি আসলে প্রথম পর্ব মানে গান্ধী ও দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে কিছু প্রশ্ন রেখেছেন, যদিও মজার ছলে আপনি নিজেই তার কিছু উত্তরও দিয়েছেন। এখানে আপনার করা একটি প্রশ্নের উত্তর দিই যেখানে আপনি জানতে চেয়েছেন, “সরকার কমিশনের প্রস্তাবগুলি Indian Relief Bill এ অন্তর্ভুক্ত করে ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে বিলটিকে আইনে পরিণত করে” — এটা গান্ধীর একটা সাফল্য কি না।

আমার উত্তর, আদৌ না। কারণ যে শর্তাবলীর ভিত্তিতে স্মাটস এবং গান্ধীর মধ্যে আপস হয়েছিল তার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল এই আইন চালু হওয়ার পরে যে সব ভারতীয় দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে পাকাপাকিভাবে ভারতে ফিরে যেতে চাইবেন, সরকার তাঁদের নিজ খরচে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। এর ফলে এমনিতেই দক্ষিণ আফ্রিকায় চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে এবং সরকার ১৯১৭ নাগাদ ভারত থেকে চুক্তির ভিত্তিতে শ্রমিক আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।

প্রসঙ্গত জানাই, গান্ধীকে নিয়ে আরও দু’টো পর্ব ইতিমধ্যে এখানে দিয়েছি। উৎসাহী হলে সেই পর্বগুলোও পড়ে নিয়ে মন্তব্য করতে পারেন।

Avatar: সিএস

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

দু'চারটে কথা।

যেমন জালিয়ানওয়ালাবাগ সম্পর্কিত ঘটনাটি। ১৯১৫-এ মনে হয় দেশে এলেন, ১৯১৭-এ চম্পারণ সত্যাগ্রহে যুক্ত হলেন, ১৯২১-এ কংগ্রেসের নেতা হলেন। মাঝে ১৯১৯-এ জালিয়ানওয়ালাবাগ। ১৯১৫-তে দেশে ফেরার আগে মনে হয় না, গান্ধীর গরীব মানুষের সাথে দেখাসাক্ষাৎ হয়েছিল, বিলেত বা দক্ষিণ আফ্রিকায় উনি মোটামুটি সাহেব। ফলে ১৯১৫ থেকে ১৯২১-এর মধ্যে ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে ইংরেজ বিরোধীতার কাঠামোটা তৈরী করছেন, যার ভিত্তি মনে হয় এটাই যে ইংরেজদের সাথে গায়ের জোরে পাল্লা দেওয়া যাবে না, কারণ তাদের অস্ত্রের বহর আর ক্ষমতার সাথে ঐ 'নিরক্ষর' দেশবাসী কোন ভাবেই যুঝতে পারবে না। ফলে প্রয়োজন হয়ে পড়ছে একটা অন্য উপায়, অন্য পদ্ধতি, আমার ধারণা বাস্তব পরিস্থিতি একটা কারণ যে 'অহিংস' আন্দোলন আর সত্যাগ্রহ, এই দুটিকে পলিটিক্যাল টুল হিসেবে গড়ে তোলার। আবারও বলি, এই যে নিজের মতটা তৈরী করে তোলা, তার দর্শন আর পদ্ধতি সেটা সেই সময়েই অতি সমালোচিত, গালের বদলে গাল এগিয়ে দাও ইত্যাদি বা ডানপন্থীদের কাছে বা অন্য কিছু মানুষের কাছেও, এই পদ্ধতিটি effeminate, কিন্তু গান্ধীর কাছে এটাই একমাত্র উপায় যার মাধ্যমে বড় সংখ্যক মানুষকে স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত করা যায়।

ফলে, জেনারেল ডায়ার সংক্রান্ত যে উক্তিটি, সেটি মনে হয়না ভুল পড়ছি, কারণ আমি পড়তে চাইছি গান্ধীর চিন্তাভাব্নার দিক দিয়ে। 'ক্ষমা' করে দেওয়া গান্ধীর দর্শনের একটি প্রধান দিক, সে অতি বড় শত্রু হলেও, ইংরেজদের প্রতাপকেও ক্ষমা করে দেওয়া যায়, যেমন ডায়ারের ক্ষেত্রে, কারণ সেটি না হলে দেশের লোকের 'আত্মশক্তি' জাগ্রত হবে না, ভেতর থেকে জোর আসবে না, যা দিয়ে সরকারের অস্ত্রের জোরের মোকাবিলা করা যাবে। কংগ্রেস থেকে জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনা নিয়ে যে কমিটি হয়েছিল সেই কমিটিও, গান্ধীর কথামত ডায়ারের শাস্তির দাবী করেনি, প্রায় বিশ বছর পরেও এই ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন এবং বলেছিলেন মনে হয়, যে ডায়ারের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগতভাবে কোন রাগ নেই, পারলে তার সাথে দেখাও করেন এবং তার হৃদয়ের কাছেও পৌছতে চান !! এই উক্তিটিতেও গান্ধী একটি দ্বৈততা তৈরী করছেন, একদিকে শারীরিকভাবে মৃত দেশবাসী আর অন্যদিকে soul killing, আত্মার ধ্বংস, প্রথমটিকে অতখানি মুল্য দিচ্ছেন না, প্রধান উদ্দেশ্য, আবারও ঐ 'আত্মশক্তি'-র জাগরন বা তার গঠন যেটা ন হলে উনি অন্তত মনে করছেন যে, যে আন্দোলন বা পদ্ধতি তিনি চান সেটা হয়ে উঠবে না। এই পজিশনটি কিন্তু সেইসময়েও সমালোচিত হয়েছে, কিছু মানুষ এটাকে সমর্থন করেছে আবার যাদের পরিবারের মানুষেরা মারা যায়, তার মেনে নিতে পারেনি, জেনারেল ডায়ার একজন খুনী হয়েও পার পেয়ে যাওয়াতে। আরো কিছু কথা হল, যে ক্ষমা করে দেওয়া মানেই যে ভুলে যাওয়া সেরকম নয়, সেটা হলে সেটির থেকে বড় পাপ আর কিছু নেই, এরকম কথাও বলেছিলেন জেনারেল ডায়ারের কাজের প্রেক্ষিতে। এই ভুলে না যাওয়াটি হল, ঐ প্রবল ভায়োলেন্স আর নৃশংসতাকে ভুলে না যাওয়া, ভুলে যাননি বলেই 'ডায়ারিজম' শব্দটিও মনে হয় গান্ধীই প্রথম ব্যবহার করেন যার দ্বারা যে কোন বিরুদ্ধ মতকে অস্ত্রের জোরে দাবিয়ে রাখা যায়, সেটিকে নির্দেশ করে। কয়েক বছর পরে, হিন্দুধর্মের অনাচার সম্পর্কে বলতে গিয়েও ডায়ারিজম কথাটি ব্যবহার করেছিলেন, অপিচ, কয়েক বছর পরেও গোহত্যার প্রতিশোধ হিসেবে মানুষ খুন করার বিরুদ্ধে বলতে গিয়েও জেনারেল ডায়ারের উদাহরণই টেনে আনেন; ডায়ার যেমন ভেবেছিলেন যে অমৃতসরে ইংরেজ অধিবাসীরাই বিপদের সামনে, অতএব গুলি চালিয়েছিলেন, যদিও মেনে নেওয়া যায় ডায়ারের যুক্তিটি কিন্তু নৃশংস মৃত্যু মেনে নেওয়া যায়না, তেমনি কেউ যদি মনে করে গোহত্যা পাপ, সেই যূক্তিটি মেনে নিলেও, যেহেতু সে শাস্ত্র-ধর্ম ইত্যাদিকে ভিত্তি করে সেই মতের পক্ষে, কিন্তু সেরকম হলেও তার ফল হিসেবে মানুষ হ্ত্যাকে মেনে নেওয়া যায়না, সেটি ঘটলে সেটিকেই বলা যায় ডায়ারিজম, যেখানে ভায়োলেন্স দিয়ে বিরুদ্ধ মতটিকে চাপা দেওয়া হচ্ছে। ফলে, গান্ধীর ক্ষেত্রে বারবারই ঘুরেফিরে আসছে একটি দার্শনিক অবস্থান, যেটি অনেক ক্ষেত্রেই পলিটিক্সের সাথে আড়াআড়ি সম্পর্কে যাচ্ছে, ক্রমাগত সমঝোতাও করতে হচ্ছে, পিছিয়েও যাচ্ছেন, আন্দোলন বন্ধ করে দিচ্ছেন, সমালোচিতও হচ্ছেন প্রচুর, কিন্তু আবারও নতুন করে শুরুও করছেন।

আরও কটি কথা থাকে, ঢোড়াই সংক্রান্ত। ছোট করে এটাই বলার, আপনি যেখানে 'অন্ধবিশ্বাস' দেখছেন, আমি সেরকম কদাপিই দেখছি না। এগিয়ে গিয়ে বলতে পারি যে সেটি উপন্যাসটির ভুল পড়া, ঐ উপন্যাসটি এবং তারাশংকরের গণদেবতা উপন্যাসের যতীন মাস্টারও প্রমান করে যে ঐ সময়ে গান্ধীর প্রভাবে অতি সাধারণ মানুষও কীভাবে অসাধারন আর সাহসী হয়ে উঠেছিল এবং তাদের ছোট গন্ডী ভেঙে তার বেরিয়ে যেতে পেরেছিল। আগের পোস্টে যা লিখেছিলাম যে জননেতারা কীভাবে অনেক সংখ্যক মানুষকে ছুঁতে পারেন, তার উদাহরন ছড়িয়ে আছে এই দুটি উপন্যাসে। ভারতের রাজনীতিতে গান্ধীর প্রবেশ না ঘটলে, অন্তত এই দুটি উপন্যাস লেখা হয়ে উঠত না বলে মনে করি।

আর কয়েকটি জিনিস বুঝিনি।

যেমন আশীষ নন্দী কেন মেড ইজি সেটা বুঝিনি।

বুঝিনি এও যে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, রক্তপাত, শরনার্থী ইত্যাদির সাথে কীভাবে গান্ধী যুক্ত হয়ে যাচ্ছেন। এই মতটিও যদিও নতুন কিছু না কিন্তু একটি একস্ট্রীম পজিশন যেখানে ভারতের বিবিধ ক্ষয়ের কারন হিসেবে গান্ধীকেই দায়ী করা হয়। না, আপনি সেরকম নিস্চয় বলছেন না, কিন্তু এই মতের প্রায় উল্টোদিকেই আছে, কোর্টে দাঁড়িয়ে গডসের মতটিও, যে সে জেনেশুনেই পিতৃহত্যা করেছে কারণ গান্ধীহত্যা না ঘটলে ভারতবর্ষের অবনতি ঘটতে থাকবেই।

বুঝেছি এটা যে অরুন্ধতী রায়ের মতটি একজন বামপন্থী র‌্যাডিক্যালের দিক থেকে গান্ধীর ক্রিটিসিজম। সে থাকতেই পারে কিন্তু এটা মনে হয় অরুন্ধতী জানেন যে গান্ধী আর যায় হোক বামপন্থী অর্থে বা সমাজবিপ্ল্ববী রাজানীতির দিক দিয়ে র‌্যাডিক্যাল নন। কেন নন, সেখানে গান্ধীর কী পজিশন, সেসব নিয়েও নিস্চয় লেখাপত্তর আছে।

তাহলে যেটা দাঁড়ায়, আমার কাছে অন্তত, গান্ধী অত্যন্ত প্রবলেম্যাটিক। তার দর্শন, পদ্ধতি, সমর্থকদের কাছ থেকে, দেশবাসীদের কাছ থেকে তাঁর দাবী, এই সব মিলিয়ে।

তাহলে কী পড়ে থাকে ? পড়ে থাকে সেটুকুই যা পড়ে আছে আজকের সময়ে কাশ্মীরের মানুষের সামনে। মিলিটারি আর সরকারের প্রবল অস্ত্রবলের সামনে তারা পুরোই অসহায়, অন্যদিকে আছে বন্দুকের রাজনীতি, যার সফল ঘটবেই না সময়্সাপেক্ষ এবং অত্যন্ত রক্তক্ষরনকারী। তাহলে তারা কী করতে পারে, বড়জোর তারা গান্ধীর পথ নিতে পারে, অহিংস আন্দোলন আর অসহযোগ। কিন্তু তার জন্যও তো নেতা দরকার, সে হবে কিনা কেউই জানেনা।




Avatar: সিএস

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

শেষ প্যারাঃ

* যা সফল হবে না, সময়সাপেক্ষ এবং অত্যন্ত রক্তক্ষরণকারী।


Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

@সিএস

আপনার দ্রুত ও অত্যন্ত শীলিত মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

আগে আশিস নন্দীর কনফিউশনটা ক্লিয়ার করে নিই। আপনি লিখেছিলেন "নিন্দেমূলক লেখাগুলি আমার অপছন্দের, তার বদলে আশীষ নন্দীর লেখালেখি পড়ে ফেলা উচিত।" আমি জানি না, কেন মাত্র তিনটে পর্ব পড়ার পরে এই লেখাটি আপনার নিন্দেমূলক মনে হচ্ছে বা আশিস নন্দীর লেখা পড়ার কথা বলছেন। আমার ধারণা, যুগপৎ আশিস নন্দী এবং রামচন্দ্র গুহ - দু'জনেই গান্ধী মূল্যায়নে চরম অবস্থান নিয়েছেন এবং এই কারণেই এই দুজনকে আমি সযত্নে পরিহার করেছি।

১৮৯৩ থেকে ১৯২৩ অবধি এই ৪০ বছরের গান্ধীর জীবনের কোনও রাজনৈতিক ঘটনাকে আমি বিকৃত বা একপেশেভাবে দেখিয়েছি, তা যদি নির্দিষ্টভাবে আপনি না দেখান তাহলে উক্ত বাক্যটির অর্থ আমি উদ্ধার করতে পারছি না। আশা করব, পরে আপনি তা দেখাবেন। আমি আপনাকে আশ্বাস দিতে পারি তাতে আমার বিশ্লেষণে যদি সামান্যতম ভুলও থাকে, আমি তা সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করে নেওয়ার চেষ্টা করব। আবারও বলি, নিছক নিন্দা করার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রায় ৪০ হাজার শব্দ লেখার পরিশ্রম আমি করতে বসিনি। তার সঙ্গে যোগ করুন প্রায় প্রত্যেকটি পাঠকের উত্তর দেওয়ার পরিশ্রমটুকুও।

আপনাকে আবারও আশ্বাস দিতে পারি, এই লেখা কেবলমাত্র বামপন্থী র‌্যাডিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে লিখিত হচ্ছে না। রবীন্দ্রনাথ, আম্বেদকর, নেহরু, সুভাষ, আজাদ, জিন্না - এঁরা কেউই তা নন। কিন্তু তাঁদের গান্ধী সমালোচনাও আসবে যথাযথ সময়ে।

"মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, রক্তপাত, শরনার্থী ইত্যাদির সাথে কীভাবে গান্ধী যুক্ত হয়ে যাচ্ছেন।"

আমি গান্ধীকে একমাত্র দায়ী করিনি, করতে চাইও না, কিন্তু তিনি এসবের দায় এড়াতে পারেন না তাই বলেছি।

অহিংসার যে দর্শন আপনি হাজির করেছেন এখানে, তা আপাতদৃষ্টিতে ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ১৯২৫ অবধি যুক্তিযুক্ত বলে আমি মনে করি। কিন্তু যিনি চৌরিচৌরায় হিংসার অনুপ্রবেশের অজুহাতে হঠাৎ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, তিনি কিন্তু আইন অমান্য আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম, শোলাপুর কিংবা পেশোয়ারে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম সত্ত্বেও তা প্রত্যাহার করেননি। এমনকি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ে অন্তত পনেরো দিনের জন্য হিংসার বহিঃপ্রকাশকে তিনি বাধা দেবেন না বলেও ফিশারকে জানিয়েছিলেন। তাহলে তাঁর অহিংসার দর্শন আদৌ টিকছে কি?

যেহেতু উনি হিংসার কারণে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, তাই ঠিক এর পরের অর্থাৎ চতুর্থ পর্বে গান্ধী ও অহিংসা নিয়ে লেখা হয়েছে। আপনাকে অনুরোধ করব তা পড়ার জন্য। তাতে যদি আপনার মনোভাবের বিন্দুমাত্র বদল ঘটাতে সক্ষম হই তবেই আমার এ লেখা সার্থক।
Avatar: রিভু

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

অরিজিনাল লেখা:
"""
But the slow torture, degradation and emasculation that followed was much worse, more calculated, malicious and soul killing, and the actors who performed the deeds deserve greater condemnation than General Dyer for the Jallianwala Bagh massacre
"""

আমার কমেন্ট:
"""
পড়ছি। একটা কোট কমপ্লিট থাকা উচিত ছিল, আউট অফ কন্টেক্স্ট লেগেছে।

“ the fury that has been spent upon General Dyer is, I am sure, largely misdi- rected. No doubt the shooting was ‘frightful’, the loss of innocent life deplorable. But the slow torture, degradation and emasculation that followed was much worse, more calculated, malicious and soul killing, and the actors who perform the deeds deserve greater condemnation than General Dyer for the Jallianwala Bagh massacre. The latter only destroyed a few bodies but the others tried to kill the soul of a নেশন”
"""

এলেবেলের রিপ্লাই:
"""
//পড়ছি। একটা কোট কমপ্লিট থাকা উচিত ছিল, আউট অফ কন্টেক্স্ট লেগেছে।//

বেশ। মেনে নিলাম। কিন্তু আমি তো খণ্ড, পৃষ্ঠাসংখ্যা সবই উল্লেখ করার চেষ্টা করছি এবং প্রতিটি পর্বের শুরুতে পাঠকের সুবিধার্থে রচনাবলির লিঙ্কও দিচ্ছি। পাঠক ইচ্ছে করলেই যাতে উদ্ধৃতাংশের আগের ও পরের অংশটি পড়তে পারেন। আমি আমার প্রয়োজনমাফিক অংশটাই দিচ্ছি কারণ ঠিক আপনার পরেই সিএস অভিযোগ করেছেন যে এ লেখা ‘কোটেশনের ওপর নির্ভরশীল’। অথচ কোটেশন দিতেই হচ্ছে, নতুবা গান্ধীর কথা ও কাজের ফারাকটা তুলে ধরতে অসুবিধে হচ্ছে। তাছাড়া একটি মাত্র বাক্য লেখার রেফারেন্সও অনেকে চাইছেন। কাজেই এ ব্যাপারে আমি নাচার।

কিন্তু আপনার কোটটা ‘আউট অফ কন্টেক্স্ট’ লাগছে কেন? মানে আপনি যতটুকু তুলে ধরেছেন আমি তার থেকে কম তুলে কী মহা অন্যায় করলাম? লেখার সুরে বা বক্তব্যে আমি মূল কোনও পার্থক্য খুঁজে পাইনি। প্রথমত, এই দীর্ঘ অংশে উনি নমো নমো করে নৃশংস হত্যাকাণ্ডটির জন্য ঠিক দু’টো শব্দ ব্যবহার করেছেন --- ‘frightful’ ও ‘deplorable’ এবং ভারতীয়দের কাজকম্মো কত খারাপ তার ব্যাখ্যা দিতে আদাজল খেয়ে নেমেছেন। জাতির ‘আত্মা’ খায় না মাথায় দেয়? কে বলছেন? না যিনি নিজে ঠিক এক বছর আগে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে ভারতীয়দের কামানের খোরাক বানাতে খেড়ায় সৈন্য সংগ্রহে নেমেছেন নির্লজ্জের মতো। তখন ওঁর ‘আত্মা’ কোথায় বন্ধক দেওয়া ছিল? কার কাছে? শুধু তাই নয়, ভারতীয়দের পুঞ্জীভূত ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ কেবলমাত্র ডায়ারের বিরুদ্ধে নয়, সমগ্র ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে। অথচ তিনি সুকৌশলে এই অংশটিতে তাঁর অভিমুখ ঘুরিয়ে দিয়েছেন ডায়ারের দিকে। সমগ্রকে আড়াল করে এই যে মাত্র একজন ব্যক্তির ঘাড়ে বন্দুক চাপানোর চেষ্টা — এটাই তো ‘largely misdirected’।
"""

এই কোটটা পড়ে মনে হচ্ছে "ভারতীয়দের কাজকম্মো কত খারাপ তার ব্যাখ্যা দিতে আদাজল খেয়ে নেমেছেন"? অবিশ্বাস্য ইনফারেন্স তো। পুরো লেখা:

"""
General Dyer
The Army Council has found General Dyer guilty of error of judgment and advised that he should not receive any office under the Crown. Mr. Montagu has been unsparing in his criticism of General Dyer's conduct. And yet somehow or other I cannot help feeling that General Dyer is by no means the worst offender. His brutality is unmistakable. His abject and unsoldier-like cowardice is apparent in every line of his amazing defence before the Army Council. He has called an unarmed crowd of men and children--mostly holiday-makers--'a rebel army.' He believes himself to be the saviour of the Punjab in that he was able to shoot down like rabbits men who were penned in an inclosure. Such a man is unworthy of being considered a soldier. There was no bravery in his action. He ran no risk. He shot without the slightest opposition and without warning. This is not an 'error of judgement.' It is paralysis of it in the face of fancied danger. It is proof of criminal incapacity and heartlessness. But the fury that has been spent upon General Dyer is, I am sure, largely misdirected. No doubt the shooting was 'frightful,' the loss of innocent life deplorable. But the slow torture, degradation and emasculation that followed was much worse, more calculated, malicious and soul-killing, and the actors who performed the deeds deserve greater condemnation that General Dyer for the Jallianwalla Bagh massacre. The latter merely destroyed a few bodies but the others tried to kill the soul of a nation. Who ever talks of Col. Frank Johnson who was by far the worst offender? He terrorised guiltless Lahore, and by his merciless orders set the tone to the whole of the Martial Law officers. But what I am concerned with is not even Col. Johnson. The first business of the people of the Punjab and of India is to rid the service of Col O'Brien, Mr. Bosworth Smith, Rai Shri Ram and Mr. Malik Khan. They are still retained in the service. Their guilt is as much proved as that of General Dyer. We shall have failed in our duty if the condemnation pronounced upon General Dyer produces a sense of satisfaction and the obvious duty of purging the administration in the Punjab is neglected. That task will not be performed by platform rhetoric or resolutions merely. Stern action is required on out part if we are to make any headway with ourselves and make any impression upon the officials that they are not to consider themselves as masters of the people but as their trusties and servants who cannot hold office if they misbehave themselves and prove unworthy of the trust reposed in them ": ফ্রিডম'স ব্যাটল, গান্ধী, পৃষ্ঠা ৯৩-৯৫।

এবার একটু নিজেই বিচার করে দেখুন।


Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

@রিভু,

আপনি কীভাবে ধরে নিলেন যে মূল লেখাটিতে এবং পরে সেই সম্পর্কিত মন্তব্যের ইনফারেন্স কেবলমাত্র এই কোট থেকে টানা হয়েছে?

আমার নির্দিষ্ট কতগুলো প্রশ্নের উত্তর দিন আগে।

১) এই নিন্দা কবেকার? আপনি জানেন ইয়ং ইন্ডিয়ায় এটি প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালের ১৪ জুলাই। ঘটনাটি ঘটে আগের বছরে এপ্রিলে। প্রতিক্রিয়া জানাতে তাঁর সময় লাগছে মাত্র ১ বছর ৩ মাস!

২) এতদিন পরেও তিনি কি ব্রিটিশ প্রশাসনকে দায়ী করছেন? না, প্রশ্নই নেই। পাঞ্জাবের ছোটলাটকে আড়ালে রাখা আছে, সরকারকে তো বটেই। বদলে ঘাড়ে বন্দুক চাপানো হয়েছে ডায়ার ও Col O'Brien, Mr. Bosworth Smith, Rai Shri Ram and Mr. Malik Khan-এর ওপরে। কেন? পাঞ্জাবে যখন কেপিএস গিল তাণ্ডব চালাচ্ছিলেন, তা কার নির্দেশে চালাচ্ছিলেন? নিজে নিজে? তো গান্ধী রেজিনাল্ড ডায়ারকে ক্লিনচিট দিতে এত আগ্রহী কেন?

৩) কংগ্রেসের নিজস্ব রিপোর্ট কবে? তার কত দিন পরে গান্ধীর এই প্রতিক্রিয়া? এত দেরির কারণ কি?

এইবারে একই প্রসঙ্গে একই সময়ে রবীন্দ্রনাথকে দেখুন।

১) নাইটহুড খেতাব বর্জন করতে চেয়ে চিঠি দিচ্ছেন ঘটনা ঘটার দেড় মাসের মাথায় এবং খবর পাওয়ার দিন পনেরোর মধ্যে। চিঠিতে নির্দিষ্টভাবে সরকারকে (ডায়ারকে নয়) অভিযুক্ত করে লিখছেন, "The enormity of the MEASURES TAKEN BY THE GOVERNMENT IN THE PUNJAB for quelling some local disturbances has, with a rude shock, revealed to our minds the helplessness of our position as British subjects in India." একজন কবি, অন্যজন রাজনৈতিক নেতা। অথচ ঘটনার বিশ্লেষণে সেই কবি গুনে গুনে দশ গোল দিচ্ছেন নেতাকে।

২) যেখানে গান্ধী ১৫ মাস পরে বাতেলা মেরে লিখছেন, "Stern action is required on out part if we are to make any headway with ourselves and make any impression upon the officials that they are not to consider themselves as masters of the people but as their trusties and servants who cannot hold office if they misbehave themselves and prove unworthy of the trust reposed in them " সেখানে উনি এতদিন দিব্যি ঘোড়ার ঘাস কেটে বসে থাকার পরে 'stern action' নেওয়ার কথা ভাবছেন এবং ঠিক কী যে অ্যাকশন নিতে চান তা স্বয়ং খোদাও জানেন না!

৩) অমল হোম-এর ‘পুরুষোত্তম রবীন্দ্রনাথ’ বইতে দেখতে পাচ্ছি, অমৃতসরের কংগ্রেস অধিবেশনে (১৯১৯) রবীন্দ্রনাথকে উপাধি বর্জনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে লেখা একটি খসড়া প্রস্তাব ‘সাবজেক্টস কমিটি’তে পেশ করার অনুরোধ পাশ কাটিয়ে যান জিতেন বন্দ্যোপাধ্যায়, লালা মনোহরলাল, বিপিনচন্দ্র পাল, চিত্তরঞ্জন প্রমুখ কংগ্রেসি নেতারা। শেষ পর্যন্ত সৈয়দ হাসান ইমাম অমৃতসর অধিবেশনের সভাপতি মতিলাল নেহরুর কাছে প্রস্তাবটি পেশ করেন। কিন্তু তিনি প্রস্তাবটিকে সযত্নে চেপে দেন। আর গাঁধীজি অন্যত্র বলেন, নাইট খেতাব ত্যাগের জন্য বড়লাটকে দেওয়া রবীন্দ্রনাথের চিঠি নিতান্তই 'premature'।

এই ঘটনার সমর্থন মেলে যখন দেখি যে ‘ভারতে জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা এবং রবীন্দ্রনাথ’ বইয়ে লেখক নেপাল মজুমদার লিখেছেন, ‘‘ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয়, রবীন্দ্রনাথের নাইট উপাধি বর্জন ও প্রতিবাদপত্র কংগ্রেসী মহলে এতটুকু স্বীকৃতি কিংবা সমাদর পাইল না। এই মহান কার্যের জন্য তাঁহাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়া অমৃতসর কংগ্রেসে কোন প্রস্তাব গৃহীত হইল না।’’

এতই যখন অ্যাকশন নেওয়ার ইচ্ছে তো এমন কাণ্ড কোন আক্কেলে? নাইটহুড ত্যাগ করার পরেও রবীন্দ্রনাথকে 'স্যার' সম্বোধন করে চিঠি লেখা কোন আক্কেলে? কাইজার-ই-হিন্দ পদক কুক্ষিগত করে রাখা কোন আক্কেলে?

এত কিছুর পরেও যদি একটি মাত্র উদ্ধৃতি থেকে ইনফারেন্স টানতে হয়, তবে চোখে ঠুলি লাগিয়ে নেওয়াই ভালো। এবড়োখেবড়ো (হ্যাঁ, এলেবেলে নয়) সেই ঠুলি অনেক আগেই খুলে ফেলেছে।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3] [4] [5]   এই পাতায় আছে 61 -- 80


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন