এবড়োখেবড়ো RSS feed

এবড়োখেবড়ো-র খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • নাদির
    "ইনসাইড আস দেয়ার ইজ সামথিং দ্যাট হ্যাজ নো নেম,দ্যাট সামথিং ইজ হোয়াট উই আর।"― হোসে সারামাগো, ব্লাইন্ডনেস***হেলেন-...
  • জিয়াগঞ্জের ঘটনাঃ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতা
    আসামে এনার্সি কেসে লাথ খেয়েছে। একমাত্র দালাল ছাড়া গরিষ্ঠ বাঙালী এনার্সি চাই না। এসব বুঝে, জিয়াগঞ্জ নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছিল। যাই হোক করে ঘটনাটি থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেই হবে। মেরুকরনের রাজনীতিই এদের ভোট কৌশল। ঐক্যবদ্ধ বাঙালী জাতিকে হিন্দু মুসলমানে ভাগ করা ...
  • অরফ্যানগঞ্জ
    পায়ের নিচে মাটি তোলপাড় হচ্ছিল প্রফুল্লর— ভূমিকম্পর মত। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেন কেউ আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে— সেই প্রচণ্ড কাঁপুনিতে ফাটল ধরছে পথঘাট, দোকানবাজার, বহুতলে। পাতাল থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছিল। ঝোড়ো বাতাস বইছিল রেলব্রিজের দিক থেকে। প্রফুল্ল দোকান থেকে ...
  • থিম পুজো
    অনেকদিন পরে পুরনো পাড়ায় গেছিলাম। মাঝে মাঝে যাই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়। বন্ধুদের মা-বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ভাল লাগে। বেশ রিজুভিনেটিং। এবার অনেকদিন পরে গেলাম। এবার গিয়ে শুনলাম তপেস নাকি ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একটু পরে তপেসও এল ...
  • কাঁসাইয়ের সুতি খেলা
    সেকালে কাঁসাই নদীতে 'সুতি' নামের একটা খেলা প্রচলিত ছিল। মাছ ধরার অভিনব এক পদ্ধতি, বহু কাল ধরে যা চলে আসছে। আমাদের পাড়ার একাধিক লোক সুতি খেলাতে অংশ নিত। এই মৎস্যশিকার সার্বজনীন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়। মনে আছে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ...
  • শুভ বিজয়া
    আমার যে ঠাকুর-দেবতায় খুব একটা বিশ্বাস আছে, এমন নয়। শাশ্বত অবিনশ্বর আত্মাতেও নয়। এদিকে, আমার এই জীবন, এই বেঁচে থাকা, সবকিছু নিছকই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া, এমনটা সবসময় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না - জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পরিণ...
  • আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই...
    দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। দেশের সবচেয়ে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে বুয়েট। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছু বরাহ নন্দন! কাওকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কি খুব সহজ কাজ? কতটুকু জোরে মারতে হয়? একজন মানুষ পারে ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭
    চন্দ্রপুলিধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন ...
  • গুমনামিজোচ্চরফেরেব্বাজ
    #গুমনামিজোচ্চরফেরেব্...
  • হাসিমারার হাটে
    অনেকদিন আগে একবার দিন সাতেকের জন্যে ভূটান বেড়াতে যাব ঠিক করেছিলাম। কলেজ থেকে বেরিয়ে তদ্দিনে বছরখানেক চাকরি করা হয়ে গেছে। পুজোর সপ্তমীর দিন আমি, অভিজিৎ আর শুভায়ু দার্জিলিং মেল ধরলাম। শিলিগুড়ি অব্দি ট্রেন, সেখান থেকে বাসে ফুন্টসলিং। ফুন্টসলিঙে এক রাত্তির ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

এবড়োখেবড়ো

[কথামুখ — প্রথমেই স্বীকার করে নেওয়া ভালো, আমার ইতিহাসের প্রথাগত পাঠ মাধ্যমিক অবধি। তবুও অ্যাকাডেমিক পরিসরের বাইরে নিছকই কৌতূহল থেকে গান্ধী বিষয়ক লেখাপত্তর পড়তে গিয়ে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই অবিসংবাদী নেতাটি সম্পর্কে যে ধারণা লাভ করেছি আমি, তা আর পাঁচজনের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাওয়ার ইচ্ছে থেকেই এই দুরূহ কাজে হাত দেওয়া।

মূল লেখা শুরু করার আগে কিছু প্রাথমিক কথা বলে নিতে চাই। প্রথমত, পড়ার ছন্দ ও গতি অব্যাহত রাখতে লেখার ফাঁকে ফাঁকে কেবলমাত্র গান্ধীর নিজের লেখাপত্র ছাড়া অন্য রেফারেন্স উল্লেখ করার ব্যাপারটি সচেতনভাবেই পরিহার করেছি; যদিও প্রতিটি পর্বের শেষে আগ্রহী পাঠক যাতে ইচ্ছে করলে সেই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে পারেন সেই উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ লেখাপত্রের উল্লেখ থাকবে। লেখার একদম শেষে থাকবে বিস্তারিত গ্রন্থতালিকাও। দ্বিতীয়ত, উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে শুধু বাংলা বা শুধু ইংরেজিতে মূল উদ্ধৃতিটা না দিয়ে, মূলত একঘেয়েমি কাটানোর জন্যই বাংলা ও ইংরেজি – উভয় ভাষাতেই তা রেখেছি। তৃতীয়ত, এ লেখা অদীক্ষিত পাঠকের জন্যও। তাই কোনও কোনও ক্ষেত্রে ইতিহাসের ঘটনাবলির বিস্তারিত উল্লেখের ফলে ইতিহাস-সচেতন পাঠকরা বিরক্ত বোধ করবেন না, সেই আশা রাখি।

দেবাশিস্‌ ভট্টাচার্য, ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির সাধারণ সম্পাদক, আমাকে গান্ধীবিষয়ক বেশ কিছু বই ও জার্নাল পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এই কারণে তাঁর কাছে আমি অশেষ কৃতজ্ঞ। বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই ঈপ্সিতা পালকেও। তিনি একপ্রকার জোর করেই আমাকে এখানে লেখার সুযোগ না করে দিলে দশ পর্বে বিন্যস্ত এই দীর্ঘ লেখাটি কোনও দিনই হয়তো আলোর মুখ দেখত না।]



অহিংসা-সত্যাগ্রহ-অসহযোগ; মৌনব্রত-আত্মশুদ্ধি-ব্রহ্মচর্য; খাটো ধুতি-আশ্রম-চরকা; নিরামিষ-অনশন-রামধুন; হরিজন-বাণী বিতরণ-বিজ্ঞান বিরোধিতা, বানিয়া-ব্যারিস্টার-বৈরাগীর এক চমৎকার বিরল প্যাকেজ গান্ধী এখন সম্পূর্ণই ব্রাত্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে। তাঁর চরকা, তাঁর খাদি, তাঁর মাদক বর্জনের সংকল্প, তাঁর স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর যাবতীয় অস্ত্র বিসর্জনের প্রতিশ্রুতি, তাঁর সেনাবাহিনী গঠনের অপ্রয়োজনীয়তার আদর্শ — সব কবেই তামাদি হয়ে গেছে। তবুও রাষ্ট্রনেতারা সে কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন না। বরং গান্ধী টুপি পরে এক দল ভড়ংবাজির আশ্রয় নেন, অন্য দল সারা বছর নাথুরামের ভজনা করে একটা দিন বহু কষ্টে তাঁর জন্য বরাদ্দ রাখেন। আর তাঁর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির সুকৌশলী নির্মাণে আদাজল খেয়ে নেমে পড়ে রাষ্ট্র এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে পর পর তিনটে গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগে তিনি তাই অবলীলায় ‘হে রাম’ বলতে পারেন; তার জন্মদিন-মৃত্যুদিনে সরকার বের করে ডাকটিকিট-মুদ্রা; তাঁর জীবন নিয়ে তৈরি ছবি অনায়াসে ছিনিয়ে আনে একগাদা অস্কার। এই বছর তাঁর জন্মের সার্ধশতবর্ষ পূর্তিতে আবারও গান্ধীবন্দনার ঢল নামবে। সেই স্রোতের বিরুদ্ধেই আমার এই অবগাহনের চেষ্টা।

প্রথম পর্ব : গান্ধী ও দক্ষিণ আফ্রিকা — মিথ-মিথ্যার মিশেল

মাঝারি মানের ছাত্র গান্ধী জীবিকার তাড়নায় ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টারি পড়তে যান। পড়া শেষে ভারতে ফিরে এসে বোম্বাইতে আইনজীবী হিসাবে পসার জমাতে না পেরে আংশিক সময়ের ইংরেজি শিক্ষক হিসাবে স্কুলে পড়ানোর জন্য আবেদন করেন। কিন্তু স্নাতকোত্তর ডিগ্রি না থাকায় সেই চাকরি তাঁর হয়নি। শেষে ভগ্নমনোরথ গান্ধী তাঁর ভাই উকিল লক্ষীদাসের সহায়তায় রাজকোটে টুকটাক আইনি পরামর্শ দিয়ে গ্রাসাচ্ছদনের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হন। এই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার ধনী মুসলিম ব্যবসায়ী দাদা আবদুল্লা ট্রান্সভালের অন্য এক ভারতীয় ব্যবসায়ী তায়েব শেঠ-এর কাছ থেকে ৪০ হাজার পাউন্ড আদায় করার জন্য আদালতে মামলা ঠোকেন। আবদুল্লা এমন একজন আইনজীবী খুঁজছিলেন যিনি তাঁর এবং তাঁর অ্যাটর্নি বেকার-এর সঙ্গে দোভাষির কাজে দক্ষ হবেন। ১৮৯৩ সালের প্রথম দিকে আবদুল্লার পোরবন্দরস্থিত মেমন ফার্ম শাখা এ ব্যাপারে গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি রাজি হয়ে যান। গান্ধী তখন ২৪।

স্ত্রী কস্তুরবা এবং দুই পুত্র মণিলাল ও হরিলালকে ভারতে রেখে গান্ধী যখন ১৮৯৩ সালের মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা পৌঁছন, তখন সেখানে ছিল মোটামুটি চার ধরণের জাতি — কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান, শ্বেতাঙ্গ ইউরোপিয়ান – ব্রিটিশ ও ডাচ (বুয়র), ভারতীয় এবং চিনারা। ডাচরা দখল করেছিল অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট এবং ট্রান্সভাল। অন্যদিকে ব্রিটিশরা কেপ কলোনি এবং নাটালের উপনিবেশগুলো অধিকার করেছিল। তখন নাটালে বসবাসকারী ছিলেন প্রায় ৪৫ হাজার ইউরোপীয়, পাঁচ লাখ স্থানীয় আফ্রিকান এবং প্রায় ৩৫ হাজার ভারতীয়। ভারতীয়রা ছিলেন প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত — ‘প্যাসেঞ্জার’ (যাঁরা নিজ খরচে সে দেশে এসেছেন), ‘গিরমিটিয়া’ (‘Agreement’-এর অপভ্রংশ) হিসাবে পরিচিত চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক এবং চুক্তি ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও যাঁরা দেশে ফিরে যাননি। চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকরা মূলত কয়লাখনি এবং কৃষিখামারগুলিতে কাজ করতেন। এঁদের ভোটাধিকার ছিল না, উপরন্তু তাঁদের ওপর চলত শ্বেতাঙ্গ ‘প্রভু’দের অবর্ণনীয় অত্যাচার ও অমানুষিক শোষণ।

তখনও পর্যন্ত গান্ধী ছিলেন ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অত্যধিক অনুরক্ত এবং তাঁদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে ধনী ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ব্যবসা-স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে অসীম আস্থাশীল। তাই গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা পর্বে চুক্তিবদ্ধ ক্রীতদাসতুল্য ভারতীয় শ্রমিকদের দুর্দশা দূর করার বা তাঁদের দৈহিক উৎপীড়ন বন্ধ করার জন্য গান্ধী কোনও চেষ্টাই করেননি। বরং নাটালের প্রবাসী ভারতীয় ব্যবসায়ীরা যাতে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ বণিকদের সমানাধিকার লাভ করতে পারেন, সে ব্যাপারে সতত সচেষ্ট ছিলেন। মূলত এই কারণেই ১৮৯৪ সালের ২২ অগস্ট তিনি গড়ে তোলেন নাটাল ভারতীয় কংগ্রেস বা NIC। নবগঠিত এই সংগঠনের সভাপতি হন ধনী ব্যবসায়ী আবদুল্লা হাজি আদম, সাম্মানিক সম্পাদক হন গান্ধী। প্রধানত চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের এই সংগঠন থেকে দূরে রাখতে কংগ্রেসের চাঁদা ধার্য হয় বার্ষিক তিন পাউন্ড। এই কংগ্রেসের মূল উদ্দেশ্য ছিল “To promote concord and harmony among the Indians and Europeans residing in the colony [of South Africa]”। সংগঠনের সম্পাদক হিসাবে দরখাস্ত লেখা, সরকারি আধিকারিকদের কাছে প্রতিনিধি দল পাঠানো, বিভিন্ন সংবাদপত্র ও বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের কাছে নিজেদের দাবি আদায়ের সমর্থনে চিঠি লেখা এবং বিভিন্ন সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তমূহ সরকারের নজরে আনা ইত্যাদির মধ্যেই গান্ধীর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল।

১৮৯৫ সালের মে মাসে নাটাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি ভারতীয় চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের বিষয়ে Indian Immigration Law Amendment Bill আনে। এই বিলে দু’টি সংশোধনী আনা হয়। প্রথমত, চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের চুক্তির মেয়াদ পূর্বতন পাঁচ বছরের পরিবর্তে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য করা হয়। দ্বিতীয়ত, কেবলমাত্র চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেই তাঁদের ভারতে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হয়। তাঁরা যদি ভারতে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে অসম্মতি প্রকাশ করে নাটালেই থেকে যেতে চান, সে ক্ষেত্রে তাঁদেরকে পুনরায় চুক্তিবদ্ধ হওয়া, অথবা তাঁদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সহ পরিবারের প্রত্যেকের জন্য বার্ষিক তিন পাউন্ড কর দেওয়ার কথা বলা হয়। গান্ধী বিলটি পুনর্বিবেচনার জন্য যথাক্রমে নাটাল অ্যাসেমব্লির প্রেসিডেন্ট, নাটাল কাউন্সিল এবং উপনিবেশের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি চেম্বারলিনের কাছে আবেদন জানান। একদম শেষ পর্যায়ে তিনি লর্ড এলগিনের কাছেও এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করে ১৮৯৫ সালের ১১ অগস্ট এক স্মারকলিপি পাঠান। যদিও গান্ধীর আবেদনে কর্ণপাত না করে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের শোষণের এক স্থায়ী হাতিয়ার হিসাবে বিলটি পাশ হয়।

এই সময় অবধি গান্ধী কেবলমাত্র যে একটি বিষয়ে সফল হন, সেটি হল ডারবান পোস্ট অফিসের প্রবেশপথ সংক্রান্ত আবেদন। পোস্ট অফিসে প্রবেশপথ ছিল দুটি – একটি শ্বেতাঙ্গদের জন্য ও অন্যটি অ-শ্বেতাঙ্গদের জন্য। কিন্তু গান্ধী প্রথম থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গদের তুলনায় সেখানে বসবাসকারী ভারতীয়দের উচ্চ স্তরের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেন। ফলত এই বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে গান্ধী কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লিখে ভারতীয়দের জন্য তৃতীয় একটি প্রবেশপথের বন্দোবস্ত করতে সফল হন — “In the Durban Post and Telegraph Offices, there were separate entrances for natives and Asiatics and Europeans. We felt the indignity too much and many respectable Indians were insulted and called all sorts of names by the clerks at the counter. We petitioned the authorities to do away with the invidious distinction and they have now provided three separate entrances for natives, Asiatics, and Europeans” (The Collected Works of Mahatma Gandhi, Electronic Book, 98 Volumes, New Delhi, Publications Division, Government of India, 1999; Vol. 1, pp. 367-368; এর পর থেকে কেবলমাত্র CWMG ১/৩৬৭-৩৬৮ লেখা হবে)।

ইতিমধ্যে ডাচ উপনিবেশ ট্রান্সভালে সোনা এবং হিরের সন্ধান মিলতেই ব্রিটিশরা ডাচদের উপনিবেশগুলো কব্জা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এই কারণে স্থানীয় শ্বেত-অধিবাসী বুয়রদের সঙ্গে ১৮৯৯ এর ১২ অক্টোবর থেকে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয়, ইতিহাসে তাই ‘বুয়র যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত। এই যুদ্ধে গান্ধীর অংশগ্রহণ করার কোনও কারণই ছিল না, কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিশ্বস্ত প্রজা হিসেবে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত ভারতীয়দের এই যুদ্ধে ইংরেজদের হয়ে অংশগ্রহণ করার কথা বলেন। যুদ্ধে যোগদান করতে চেয়ে তিনি লেখেন, “I need hardly say that, as soon as war was declared, irrespective of their opinions as to the justness or otherwise of the war, the Indians to a man made up their minds to give their humble support to the British Government during the crisis…” (CWMG, ২/৩৫৩)। সাম্রাজ্যবাদী এই যুদ্ধে যোগ দিতে চেয়ে গান্ধী অন্যত্র যে সাফাই দেন তা এই রকম — “Suffice it to say that my loyalty to the British rule drove me to participation with the British in that war. I felt that, if I demanded rights as a British citizen, it was also my duty, as such, to participate in the defence of the British Empire. I held then that India could achieve her complete emancipation only within and through the British Empire. So I collected to gather as many comrades as possible, and with very great difficulty got their services accepted as an ambulance corps” (‘The Boer War’, Chapter 64, An Autobiography or The Story of My Experiments with Truth)।

এই যুদ্ধে তিনি ‘uniformed non-commissioned officer’ হিসাবে প্রায় এগারোশো ভারতীয় স্ট্রেচারবাহকদের শীর্ষ নেতার পদে নির্বাচিত হন। যুদ্ধ শেষে তিনি মেডেল পান, যদিও বাকিদের ক্ষেত্রে তাঁর একটি চিঠির স্বীকৃতি ছাড়া আর কিছুই জোটেনি। যুদ্ধে নিরীহ স্ট্রেচারবাহকের কাজ আপাতদৃষ্টিতে নিছকই সেবামূলক কাজ মনে হলেও গান্ধী এই যুদ্ধে পুরোদস্তুর অংশ নিতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি নিজেই এ ব্যাপারে লেখেন, “At the time of the Boer War, it will be remembered, the Indians volunteered to do any work that might be entrusted to them, and it was with the greatest difficulty that they could get their services accepted even for ambulance work. General Buller has certified as to what kind of work the Natal Indian Volunteer Ambulance Corps did. If the Government only realised what reserve force is being wasted, they would make use of it and give Indians the opportunity of a thorough training for actual warfare. There is, too, on the Statute-book, a law for the purpose, which has been allowed to fall into desuetude from sheer prejudice. We believe a very fine volunteer corps could be formed from Colonial-born Indians that would be second to none in Natal in smartness and efficiency, not only in peace but in actual service also” (CWMG ৫/১১)।

পরবর্তী কিস্তি পুজোর হুল্লোড় মিটে যাওয়ার পরে ...
[যাঁরা গান্ধী রচনাবলি পড়তে চান কিংবা এই লেখার রেফারেন্সের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চান তাঁদের জন্য রইল এই গুরুত্বপূর্ণ লিংকটা।
https://www.gandhiashramsevagram.org/gandhi-literature/collected-works
-of-mahatma-gandhi-volume-1-to-98.php]

বুয়র যুদ্ধ শেষে ১৯০১ সালের অক্টোবর মাসে গান্ধী ভারতে ফিরে যান। কিন্তু দেশে তাঁর আইনের পেশা না জমায় পরের বছর ডিসেম্বরে পুনরায় তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে আসেন। ১৯০৩ সাল থেকে তিনি ট্রান্সভালের জোহানেসবার্গে থাকতে শুরু করেন এবং ওই বছরেই গড়ে তোলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা BIA। নাটালে অবস্থানকালে গান্ধী যেমন নিজেকে ব্রিটিশদের বিশ্বস্ত প্রজা ভাবতেন এবং তাদের যে কোনও মূল্যে তুষ্ট করে প্রবাসী ধনী ভারতীয়দের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট ছিলেন, জোহানেসবার্গ বসবাসকালীনও তাঁর আন্দোলনের অভিমুখ ও পদ্ধতির কোনও ব্যত্যয় ঘটেনি। ১৯০৪ এ তিনি স্থাপন করেন ফিনিক্স আশ্রম, যেখান থেকে মূলত তাঁর রাজনৈতিক বিবৃতি ছাপার জন্য প্রকাশিত হয় ‘Indian Opinion’ নামক সংবাদপত্র, যার পাতায় পাতায় তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের অবিচারের কাহিনি। জোহানেসবার্গের আখের বিস্তীর্ণ খামারবাড়িগুলির কেন্দ্রস্থলে ছিল তাঁর ফিনিক্স আশ্রমের অবস্থান। স্বাভাবিকভাবেই তিনি এখানে কর্মরত অসংখ্য চুক্তিবদ্ধ ভারতীয় শ্রমিকদের ওপর দীর্ঘ দিনের শোষণ ও অত্যাচার সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল ছিলেন। কিন্তু তাঁদের অবস্থা সম্পর্কে অনুসন্ধান চালানো বা তাঁদের জীবনযাত্রাকে তুলনামূলক সহনশীল করে তোলার ব্যাপারে তিনি যে বরাবর নিশ্চেষ্ট থেকেছেন তাই নয়, ওই সংবাদপত্রের ১৭ ডিসেম্বর, ১৯০৪ সংখ্যায় তিনি নির্দ্বিধায় লিখেছেন: The general condition of the indentured labourer in the Colony is satisfactory; and it can only enhance its reputation if causes even of suspicion are removed (CWMG ৪/১৩৯)।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকার ইংরেজ সরকারের অস্বাভাবিক কর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে নাটালের স্থানীয় জুলু উপজাতির বিদ্রোহীরা একজন ম্যাজিস্ট্রেট সহ দু’জন শ্বেতাঙ্গ পুলিশকে হত্যা করলে ‘বাম্বাত্তা বিদ্রোহ’ সূচিত হয়। এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করতে উদগ্রীব গান্ধী লেখেন, “What is our duty during these calamitous times in the Colony? It is not for us to say whether the revolt of the Kaffirs is justified or not. We are in Natal by virtue of British power. Our very existence depends upon it. It is therefore our duty to render whatever help we can. There was a discussion in the Press as to what part the Indian community would play in the event of an actual war. We have already declared in the English columns of this journal [Indian Opinion] that the Indian community is ready to play its part; and we believe what we did during the Boer war should also be done now. That is, if the Government so desires, we should raise an ambulance corps. We should also agree to become permanent volunteers, if the Government is prepared to give us the requisite training” (CWMG ৫/১৭৯)। কিন্তু নিছকই যে জুলুদের সেবা করার জন্য তিনি অ্যাম্বুলেন্স বাহিনী গঠন করতে চেয়েছিলেন তা আদৌ সত্যি নয়, কারণ দু’টো অনুচ্ছেদ আগেই আমরা দেখেছি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পক্ষে তিনি তিন তিনটে যুক্তি দিচ্ছেন — ক) ভারতীয়রা উপনিবেশ রক্ষা করতে সক্ষম; খ) সৈন্যদের অতিরিক্ত বাহিনী অর্থাৎ ভারতীয়দের কাজে লাগানোই অধিক যুক্তিযুক্ত এবং গ) এ বিষয়ে একটি পুরনো আইনও বিদ্যমান। অর্থাৎ গান্ধীর চোখে দক্ষিণ আফ্রিকা-জাত ভারতীয়রা সেনাবাহিনিতে নথিভুক্ত হওয়ার প্রথম হকদার!

শুধু অংশগ্রহণ করেই ক্ষান্ত থাকেননি গান্ধী, এই যুদ্ধে অর্থ সাহায্যের প্রস্তাব করে তিনি বলেন, “It is necessary that Indians help in the way they did when a fund was started at the time of Boer War. It will be good to collect some money and send it to the Government or to some Fund that might have been started” (CWMG ৫/২৫১)। এহ বাহ্য, শুধু সরকারকে অর্থসাহায্য করার প্রস্তাবই নয়, সৈন্যদের অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয়ের জন্য তহবিল গঠনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি এ-ও বলেন: “The soldiers’ life is a hard one. The salary and allowances that the Government pay them are not always enough. Those, therefore, who do not go to the front should, in order to express their sympathy, raise a fund for the purpose of sending the soldiers fruits, tobacco, warm clothing and other things that they might need. It is our duty to subscribe to such a fund” (CWMG ৫/২৫৯)। মাদকবিরোধী হিসেবে পরিচিত গান্ধী কি না সৈন্যদের তামাক খাওয়ার অভ্যাসের কথা বিবেচনা করে তহবিল গঠন করতে চাইছেন! এই যুদ্ধেও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে স্ট্রেচারবাহকের ভূমিকা পালন করে বিদ্রোহ দমন করতে সাহায্য করায় গান্ধী সার্জেন্ট মেজর পদ ও সরকারি সম্মান লাভ করেন। যদিও যুদ্ধে হত সাড়ে ৩ হাজার জুলু, বিভিন্ন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে জুলু নারী ও শিশুদের অনাহারে মৃত্যু, ৩০ হাজার জুলুর গৃহহীন হয়ে পড়া এবং ব্রিটিশদের ‘পোড়া মাটি’-র ঘৃণ্য নীতি সম্পর্কে তিনি ছিলেন আশ্চর্য রকমের উদাসীন।

বাম্বাত্তা বিদ্রোহীদের ওপর ইংরেজ শাসকদের ভয়াবহ অত্যচারকে দোর্দণ্ডপ্রতাপ সাম্রাজ্যবাদী চার্চিল অবধি ‘disgusting butchery’ বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, অথচ শান্তির উপাসক গান্ধী ১৯০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে আবারও জুলুদের বিদ্রোহ দমনে ইংরেজদের সাহায্য করতে চেয়ে লিখেছিলেন: “There is again a rebellion of Kaffirs in Zululand. In view of this, hundreds of white troops have been dispatched. The Indian community must come forward at such a time without, however, thinking of securing any rights thereby. They must consider only the duty of the community. It is a common observation that when we attend to our duty, rights follow as a matter of course. It will be only proper for the Indian community to make the offer that was made last year. ... We assume that there are many Indians now who will welcome such work enthusiastically. Those who went to the front last year can do so again. Most of them are seasoned people and familiar with the nature of the work. We very much hope that this work will be taken in hand without any delay” (CWMG ৭/৩৯৭)। স্থানীয় আফ্রিকানদের স্বার্থের প্রতি উদাসীন থেকে বারংবার সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে সাহায্য করার বিনিময়ে নিজেদের স্বার্থকে অক্ষুণ্ণ রাখার গান্ধীর এই ঘৃণ্য প্রয়াসকে চিহ্নিত করে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি জন ডিউব ১৯১২ সালে সঠিক ভাবেই লিখেছিলেন, “ … people like Indians have come into our land and lorded it over us, as though we who belong to the country were mere non-entities…”।

যদিও গান্ধী আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, জুলু যুদ্ধের পরেই নাকি তাঁর মনোজগতে পরিবর্তন আসে এবং পাঁচটি ব্যাপারে দৃঢ়সংকল্প হন — ব্রহ্মচর্য, অহিংসা, বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই, ‘vow of poverty’ এবং সত্যাগ্রহ; আমরা দেখতে পাব যে এগুলির প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর জীবনে অসংখ্যবার ব্যতিক্রম ঘটেছে। ‘সত্যাগ্রহ’ সম্পর্কিত আলোচনার আমরা দেখে নিই গান্ধী স্বয়ং সত্যাগ্রহ বিষয়ে কী বলেছেন। সত্যাগ্রহ সম্পর্কে গান্ধীর ধারণা এইরকম: “This doctrine of satyagraha is not new; it is merely an extension of the rule of domestic life to the political. Family disputes and differences are generally settled according to the law of love. The injured member has so much regard for the others that he suffers injury for the sake of his principles without retaliating and without being angry with those who differ from him. And as repression of anger and self-suffering are difficult processes, he does not dignify trifles into principles, but, in all non-essentials, readily agrees with the rest of the family, and thus contrives to gain the maximum of peace for himself without disturbing that of the others. Thus his action, whether he resists or resigns, is always calculated to promote the common welfare of the family. It is this law of love which, silently but surely, governs the family for the most part throughout the civilized world” (CWMG ২০/৪০) অর্থাৎ তাঁর মতে সত্যাগ্রহের গোটা বিষয়টাই পারিবারিক সমস্যা, রাজনৈতিক সমস্যা নয়!

যাই হোক, গান্ধী ১৯০৭-০৮ ও ১৯০৮-১১ সালে মূলত এলিট ভারতীয়দের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করার বিরুদ্ধে এবং ১৯১৩-১৪-য় প্রধানত অ-খ্রিস্টান ভারতীয় বিবাহকে স্বীকৃতি না দেওয়ার বিরুদ্ধে তিনটি নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ অভিযানে নেতৃত্ব দেন। জুলু যুদ্ধের অব্যবহিত পর ১৯০৬ এর ২২ অগস্ট ট্রান্সভাল সরকারি গেজেটে ‘এশিয়াটিক ল অ্যামেন্ডমেন্ট অর্ডিন্যান্স’-এর কথা প্রকাশিত হয়। নতুন এই অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ট্রান্সভালে বসবাসকারী আট বছরের ঊর্ধ্বে সমস্ত ভারতীয়কে নতুন করে নাম পঞ্জীভুক্ত করে ছাড়পত্র বা ‘পাস’ নেওয়ার কথা বলা হয় এবং এই ছাড়পত্র এক জায়গা থেকে অন্যত্র যাওয়া, আইন-আদালত ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হয়।

গান্ধী তাঁর বন্ধু প্রিটোরিয়ার অ্যাটর্নি রেইনহোল্ড গ্রেগরস্কি-র কাছে এই ব্যাপারে জানতে চাইলে গ্রেগরস্কি জানান, “The act is far more severe than the Dutch Law. There is not a single provision that is favourable to the Indians. The act makes the position of the Indian worse than that of the Kaffir. Not every Kaffir is required to carry a pass on him; but now every Indian will have to do so. Educated Kaffirs are exempt from such restrictive laws. But the Indian, whatever his education and standing, will have to carry a pass. The pass, it seems to us, will be like the one carried by prisoners, etc. Whatever loop-holes there existed in the Law [3] of 1885 have been closed in this Act. While Kaffirs can own land, Indians cannot. It does not seem probable that the Liberal Government will approve such a law.” (CWMG ৫/৩৩৯)। বন্ধুর এহেন ব্যাখ্যা শুনে গান্ধীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে! যে গান্ধী ১৮৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে নাটালের লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্যদের ‘খোলা চিঠি’-তে খোলাখুলি জানিয়েছিলেন ‘…both the English and the Indians spring from a common stock, called the Indo-Aryan’; যিনি নির্দ্বিধায় তাদের প্রভুত্বকে মেনে নিয়ে লিখেছিলেন: ‘Providence has put the English and the Indians together, and has placed in the hands of the former the destinies of the latter’; যিনি বলেছিলেন – ‘… the Indians were, and are in no way inferior to their Anglo-Saxon brethren…’ সেই প্রভু তথা ভাই ভারতীয়দের তাদের সমগোত্রীয় না ভেবে শুধু অন্যায়ই করছে না, ‘নিকৃষ্ট’ আফ্রিকানদের থেকেও নিম্নস্তরে নামিয়ে দিচ্ছে!! এই আইনকে ‘কালা কানুন’ হিসেবে অভিহিত করে এর যথোচিত জবাবের উপায় খুঁজতে শুরু করেন তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকা আদতে যে আফ্রিকানদের দেশ, ইংরেজ তথা ইউরোপীয়রা যে সেখানে জবরদখলকারি ঔপনিবেশিক মাত্র – সে কথা ‘সত্যাগ্রহী’ গান্ধীর কখনও মনে হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছনোর মাত্র দেড় বছর পরে ডিসেম্বর ১৮৯৪তে যিনি লেখেন : “A general belief seems to prevail in the Colony that the Indians are little better, if at all, than savages or the Natives of Africa”; ১৮৯৬ সালে পুনরায় যিনি জানান: “Ours is one continual struggle against a degradation sought to be inflicted upon us by the Europeans, who desire to degrade us to the level of the raw Kaffir whose occupation is hunting, and whose sole ambition is to collect a certain number of cattle to buy a wife with and, then, pass his life in indolence and nakedness”; ১৮৯৯ এ যিনি ওই মতেই অবিচল থেকে বলেন “… it would place them [British Indian], who are undoubtedly infinitely superior to the Kaffirs, in close proximity to the latter”; তিনি কীভাবে ভারতীয়দের সঙ্গে ‘কাফ্রি’দের এই পার্থক্য মেনে নিতে পারেন! তাই ‘Better die rather than submit to such a law’ আহ্বান জানিয়ে এই পঞ্জীকরণে আপত্তি জানান তিনি। যুদ্ধের পোশাক খুলে রেখে ফের আইনজীবীর পোশাক গায়ে চাপান, সেপ্টেম্বরে শুরু করেন তাঁর প্রথম সত্যাগ্রহ।

৮ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের তরফে তিনি উপনিবেশ স্টেট সেক্রেটারিকে জানান, “British Indians alarmed at haste with which Asiatic Ordinance is being rushed through Legislative Council. Ordinance reduces Indians to status lower than Kaffirs and much lower than that occupied under Dutch regime. British Indian Association request Imperial sanction be stayed pending deputation proceeding directly. Association requests reassuring reply” (CWMG ৫/৩৩০)। পাশাপাশি, ভারতের ভাইসরয়কেও এই ব্যাপারে তারবার্তায় জানান, “British Indians alarmed at Asiatic Ordinance passing through Legislative Council. Transvaal Ordinance degrading, insulting, reduces Indians to a worse status than that of Pariahs. British Indian Association request the Viceroy’s active intervention. His Excellency being directly responsible for their welfare” (তদেব)।

১১ সেপ্টেম্বর গান্ধীর নেতৃত্বে প্রায় তিন হাজার ভারতীয় এম্পায়ার থিয়েটারের প্রতিবাদ সভায় হাজির হন। সেখানে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী তাঁরা ঈশ্বরের নামে শপথ নিয়ে পাস না তোলার জন্য এবং আইন অমান্য করে জেলে যাওয়ার জন্য সম্মত হন। অক্টোবর মাসে গান্ধী এবার একজন মুসলিম সহযোগী মহম্মদ আলিকে নিয়ে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে (‘vow of poverty’ ভুলে গিয়ে প্রথম শ্রেণির টিকিটে!), লর্ড এলগিনের সঙ্গে দেখা করে কথা আদায় করার চেষ্টা করেন। এলগিন অবশ্য স্পষ্টই জানান যে ট্রান্সভাল সরকার এই বিল পাশ করলে তিনি এ ব্যাপারে মাথা গলাবেন না। ১৯০৭ সালের পয়লা জানুয়ারি ট্রান্সভাল স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে জিতে জেনারেল স্মাটস এই সরকারের উপনিবেশ সচিব হন। পার্লামেন্টে ২২ মার্চ কেবলমাত্র এশীয় মহিলাদের ছাড় দিয়ে বাকিদের ক্ষেত্রে এই অর্ডিন্যান্স পাশ হয়। মে মাসে এলগিনের সম্মতি মিলবার পরে প্রথমে ১ জুলাই থেকে ও পরে বাড়িয়ে ৩০ নভেম্বর থেকে তা চালু করার কথা বলা হয়। ট্রান্সভাল সরকার ভারতীয়দের পঞ্জীকরণের উদ্দেশ্যে প্রিটোরিয়া, পিটার্সবার্গ, জোহানেসবার্গ এবং অন্যান্য ভারতীয় অধ্যুষিত অঞ্চলে অফিস খুললে গান্ধীর পরামর্শ অনুযায়ী ভারতীয় সত্যাগ্রহীরা অফিসের সামনে পিকেটিং শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত নাম পঞ্জীভুক্ত করেন প্রায় ১৩ হাজার ভারতীয়র মধ্যে মাত্র ৫১১ জন। কর্তৃপক্ষ এবার বিরোধী নেতাদের গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেন।

১৯০৮ এর ১০ জানুয়ারি ট্রান্সভালে গান্ধীকে গ্রেফতার করা হয় এবং দু মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি জেলে যাওয়া সত্ত্বেও আন্দোলন বন্ধ হল না দেখে জেনারেল স্মাটস এক চাল চালেন। তিনি ট্রান্সভাল লিডার-এর সম্পাদক অ্যালবার্ট কার্টরাইটকে গান্ধীকে রাজি করানোর ব্যাপারে পাঠান। ২৮ জানুয়ারি গান্ধী প্রিটোরিয়াতে স্মাটস-এর সঙ্গে দেখা করেন এবং দু’জনেই আপস করতে সম্মত হন। যদিও আন্দোলন প্রত্যাহারের শর্ত হিসাবে গান্ধী অযথা প্রচার করেন যে স্মাটস ‘… verbally promised to repeal the Act, if the British Indians fulfilled their part of the compromise, that is to say, underwent voluntary registration’ (CWMG ৯/২৩০), আদতে তাঁদের মধ্যে এই আইন প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনও প্রতিশ্রুতির কথাই হয়নি। অবশেষে জেনারেল স্মাটসের ‘মৌখিক প্রতিশ্রুতি’-র ভিত্তিতে ১৯০৮-এর জানুয়ারিতে প্রথম সত্যাগ্রহ তুলে নেওয়া হয়।

এই পর্বের তৃতীয় তথা শেষ কিস্তি পরবর্তী সপ্তাহে ...

[গান্ধী রচনাবলির প্রয়োজনীয় খণ্ডটির লিংকে ক্লিক করুন। ডাউনলোড হলে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠাসংখ্যা টাইপ করুন। তাহলেই উদ্ধৃতিটি দেখতে পাবেন। ইচ্ছা করলে আগের কিংবা পরের অংশও পড়তে পারেন।

https://www.gandhiashramsevagram.org/gandhi-literature/collected-works
-of-mahatma-gandhi-volume-1-to-98.php]


প্রথম পর্ব : তৃতীয় তথা শেষ কিস্তি

‘প্রতিশ্রুতি’ স্বাভাবিক ভাবেই রক্ষিত না হওয়ায় গান্ধী শুরু করেন সত্যাগ্রহের দ্বিতীয় পর্যায়, কালা কানুন বাতিলের দাবিতে এবার শুরু হয় জেল ভরো আন্দোলন। কিন্তু সেখানেও স্থানীয় আফ্রিকানদের সম্পর্কে তাঁর ঘৃণিত মনোভাব প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়। সত্যাগ্রহ চলাকালীন যখন তাঁকে এবং তাঁর অনুগামীদের আফ্রিকানদের সঙ্গে জেলের একই সেলে রাখা হচ্ছে তখনও তিনি তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন: “Many of the Native prisoners are only one degree removed from the animal and often created rows and fought among themselves in their cells” (CWMG ৮/১৮৩) বা “We were then marched off to a prison intended for Kaffirs. … We could understand not being classed with the whites, but to be placed on the same level with the Natives seemed too much to put up with. … At the same time, it is indubitably right that Indians should have separate cells. … Kaffirs are as a rule uncivilized - the convicts even more so. They are troublesome, very dirty and live almost like animals” (CWMG ৮/১৯৮-৯৯)। ১৯১১ সালে যখন তাঁর সত্যাগ্রহ চলছে তখন এক বৈঠকে জেনারেল স্মাটস তাঁকে বলেছিলেন, “… this country is the Kaffirs’. We whites are a handful. We do not want Asia to come in” (CWMG ১১/৩৬০)। কিন্তু হায়! সাম্রাজ্যবাদী স্মাটস যে কথা অনুভব করেছিলেন, একুশটা বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় কাটিয়েও তা অনুভব করতে পারেননি গান্ধী।

দক্ষিণ আফ্রিকার আন্দোলন পরিচালনা পর্বেই গান্ধী মনোযোগ দেন তাঁর কার্যাবলীর সুষ্ঠু প্রচারে। ১৮৬৯ থেকে ১৯০৯ পর্যন্ত তাঁর জীবনের নানা কর্মকাণ্ড বিস্তারিত ভাবে লেখার জন্য গান্ধী ১৯০৯ সালে রেভারেন্ড যোসেফ ডোককে দিয়ে লেখান তাঁর প্রথম জীবনী। অক্টোবর মাসে সেই জীবনী প্রকাশিত হতেই তার ৭০০ কপি দেশ-বিদেশে বিলির জন্য উদ্যোগী হন তিনি নিজে। এই বইয়ের তথ্যকে আকর হিসাবে বিবেচনা করে পরের বছর হেনরি পোলক লেখেন গান্ধীর দ্বিতীয় জীবনী। আর ১৯০৯ সালে লন্ডন থেকে খালি হাতে ফিরে আসার সময় জাহাজে বসে মাত্র দশ দিনে গান্ধী গুজরাটি ভাষায় লেখেন ‘হিন্দ স্বরাজ’ নামক গ্রন্থটি, পরের বছর নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করে তা প্রকাশ করেন ‘Hind Swaraj or Indian Home Rule’ নামে। সংস্কাররাচ্ছন্ন বৈষ্ণব পরিবারের প্রাত্যহিক বিচারহীন হিন্দু আচার – গুজরাটের জৈন ঐতিহ্য – বাইবেলের খ্রিস্টিয় পাপবোধ – রাসকিন (Unto This Last)-এর সরল ও সমবেত জীবনের আদর্শ – থরো (On the Duty of Civil Disobedience)-র অসহযোগ এবং টলস্টয় (The Kingdom of God Is within You)-এর খ্রিস্টিয় অহিংসা ও দারিদ্র্যব্রত চিন্তার জগাখিচুড়ি করে গান্ধী নিজে তাঁর রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে ভবিষ্যতের ভারতকে চিত্রিত করেন এই গ্রন্থে।

এর অনেক বছর বাদে ১৯২৩ সালে গান্ধী যখন পুণের ইয়েরবেদা জেলে বন্দী, তখন তিনি লেখেন ‘Satyagraha in South Africa’। পাশাপাশি, ১৯২৫ সালের নভেম্বর মাস থেকে গুজরাটি ‘নবজীবন’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতে থাকে ‘An Autobiography or The Story of My Experiments with Truth’। ১৯২৭ এবং ১৯২৯ সালে দু’খণ্ডে প্রকাশিত সেই আত্মজীবনী পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়। যদিও প্রত্যেকটি বইতেই তাঁর যুদ্ধে অংশগ্রহণের অংশটায় সুনিপুণভাবে প্রলেপ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে তিনি যৌনজীবনকে ‘physically harmful and morally sinful’ রূপে বিবেচনা করে ব্রহ্মচর্য পালন শুরু করেছেন (যদিও পরবর্তীকালে তাঁর ব্রহ্মচর্যের পরীক্ষার জন্য অজস্র নগ্ন নারীর বক্ষলগ্না হয়ে রাত কাটাবেন তিনি); একশো একরের ফিনিক্স আশ্রম থেকে চলে আসছেন এগারো শো একর বিশিষ্ট টলস্টয় ফার্মে এবং ওই ফার্মে থাকাকালীন ভবিষ্যতে তাঁর ভাবমূর্তি মসিলিপ্ত হতে পারে ভেবে ১৯১০ নাগাদ বেশ কিছু কাগজপত্র নষ্ট করে দিচ্ছেন।

মোটামুটি ভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯০৭ থেকে ১৯১১ অবধি দীর্ঘ সময়কালে গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলন ভারতীয়দের সমানাধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে আদৌ ফলপ্রসু হয়নি। সেই ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে হতাশ গান্ধী ১৯০৯ সালের ২৩ জুন নিজেই লিখেছিলেন — “… Indians have been begging for something to be brought to them from England [as a gift]. This shows our utter helplessness. The whites of the Colonies are the strong and favoured sons [of the Empire]. We are the weak and neglected ones. How can the neglected sons get a hearing from the mother against the favoured ones?” (CWMG, ৯/৩৯১-৩৯২)। প্রখ্যাত গ্রন্থকার যোসেফ লেলিভেল্ড গান্ধীর সত্যাগ্রহ পর্বের চমৎকার মূল্যায়ন করে লিখেছেন, “Nearly five years after the start of Satyagraha, he had nothing to show for the resistance his leadership had inspired. Indians had courted arrest and gone to jail more than two thousand times, serving sentences of up to six months at hard labour, some, like Thambi Naidoo and Gandhi’s son Harilal, doing so repeatedly. Hundreds of other resisters had been deported back to India. The world had fleetingly taken notice — India especially — but the new white government had outmaneuvered Gandhi. Disillusion was building up, especially in Natal”।

গান্ধীর আন্দোলনে আবার জোয়ার আসে যখন ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ মার্চ কেপ কলোনির সুপ্রিম কোর্ট অ-খ্রিস্টান ভারতীয় বিবাহকে স্বীকৃতি না দেওয়ার কথা জানায়। গান্ধী যেন এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন, কিন্তু তিনি ক্রমশ বুঝতে পারছিলেন যে প্রকৃত গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে গেলে বিশাল সংখ্যক ভারতীয়ের সমর্থন প্রয়োজন। ওই একই সময়ে নাটাল কর্তৃপক্ষ প্রাক্তন চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের বার্ষিক তিন পাউন্ড কর না দিলে ফৌজদারি মামলার হুমকি দেয়। গান্ধী এই দুটি বিষয়েরই বিরোধিতা করে শুরু করেন দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর তৃতীয় তথা শেষ সত্যাগ্রহ। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর যাবতীয় আন্দোলনের অভিমুখ নির্দিষ্ট রেখেছিলেন কেবলমাত্র অভিজাত ‘প্যাসেঞ্জার’ ভারতীয়দের জন্য। দক্ষিণ আফ্রিকার চুক্তিবদ্ধ ভারতীয় শ্রমিকদের জন্য তিনি আদৌ চিন্তিত ছিলেন না। শুধুমাত্র নিজ স্বার্থে এই বিশাল শ্রমিকবৃন্দকে আন্দোলনে শামিল করার হীন চক্রান্তকে সমালোচনা করে ১৯১৩ সালের ১৭ অক্টোবর ‘Natal Mercury’ পত্রিকায় Natal Indian Patriotic Union (NIPU)-এর তরফে লেখা হয়: “When the NIPU espoused for the abolition of the tax, Mr Gandhi did not manifest his outrage by supporting our agitation in a substantial manner. Mr Gandhi had no inclination whatsoever to help these poor people. … Mr Gandhi’s dictum that India would ‘have no right to exist side by side with a free and self-respecting community if they have no decency and moral strength to suffer’ would have been a welcome pronouncement at the time when the agitation on this subject was in full swing, but now it falls flat on us, because we cannot believe that the same man who was like a ‘stoic’, though not intriguing at the time, could be sincere in what he says now”।
যাই হোক, এই সমালোচনাকে অগ্রাহ্য করে তাঁর অনুগামী প্রায় পাঁচ হাজার বিক্ষোভকারীকে নাটালের সীমান্ত অতিক্রম করে ট্রান্সভালে প্রবেশ ও গ্রেফতার বরণ করার জন্য নির্দেশ দেন গান্ধী। তাঁর নেতৃত্বে ৬ নভেম্বর, ১৯১৩ সালে ২০৩৭ জন পুরুষ, ১২৭ জন নারী ও ৫৭ জন শিশুর একটি দল সীমানা অতিক্রম করে ট্রান্সভালে পৌঁছলে ৯ তারিখে গান্ধীকে গ্রেফতার করা হয় এবং নয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় (যদিও সরকার তাঁকে ব্লুমফনটেনের বিশেষ আবাসে আয়াসেই রেখেছিল)। গান্ধীর অনুপস্থিতিতে তাঁর দুই সহকারী পোলক ও কলেনবাকের নেতৃত্বে সত্যাগ্রহীরা আরও অগ্রসর হলে পোলক ও কলেনবাককেও গ্রেফতার করা হয়।

এইবার দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার সত্যাগ্রহীদের ওপর গুলি চালিয়ে তাঁদের আন্দোলন দমন করতে শুরু করে। বেশ কিছু সত্যাগ্রহী মারা যান, আহত মিছিলকারীদের জেলে ভরা হয়। ওই বছরেই দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ শ্রমিকরা প্রথমে জুলাই মাসে সোনার খনিতে এবং ছ’মাস পরে রেলে ধর্মঘট ডাকেন। পাশাপাশি, ভারতীয়দের শান্তিপূর্ণ পদযাত্রার ওপর এহেন বর্বরোচিত আক্রমণের খবর গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা জুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তেই নিউ ক্যাসলের কয়লাখনিতে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকরা মিছিলকারীদের সমর্থনে ধর্মঘট করেন। শ্রমিক ধর্মঘটিদের সঙ্গে যোগ দেন প্রায় পনেরো হাজার চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক। যুগপৎ শ্বেতাঙ্গ ও ভারতীয় শ্রমিকদের ধর্মঘটে দিশাহারা, বিপর্যস্ত সরকারের বিরুদ্ধে চাপ দিয়ে দাবি আদায় করার বিষয়ে গান্ধীর কাছে এক সুবর্ণ সুযোগ আসে। কিন্তু গান্ধী বলেন, “Indians do not fight for equal political rights. They recognize that, in view of existing prejudice, fresh immigration from India should be strictly limited, provision being made for the entrance of a sufficient number annually for reasonable wear and tear” (CWMG ১৩/৩৬৬)।

অবশেষে ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ এবং ব্রিটিশ সরকারের চাপের মুখে পড়ে জেনারেল স্মাটস সত্যাগ্রহীদের দাবিদাওয়া বিবেচনার জন্য ১৯১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তিন সদস্যের তদন্ত কমিশন (সলোমন কমিশন) গঠন করেন। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী গান্ধী, পোলক ও কলেনবাককে ১৮ ডিসেম্বর জেল থেকে নিঃশর্তে মুক্তি দেওয়া হয়। স্মাটস এইবার আপস প্রস্তাব নিয়ে কথা বলার জন্য গান্ধীকে ডেকে পাঠান। স্মাটস তাঁকে কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী দাবিসমূহ মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে গান্ধী আবারও স্মাটসের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। শুধু তাই নয়, যে সত্যাগ্রহীরা গান্ধীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিলেন, চরম অত্যাচারিত হলেন; সেই সত্যাগ্রহীদের ওপর পুলিশের অত্যাচারের ব্যাপারে কিছুই বলবেন না বা এই নিয়ে আদালতে কোনও মামলাও করবেন না বলে তিনি স্মাটসকে প্রতিশ্রুতি দেন। জেনারেল স্মাটসের কাছে এহেন ন্যক্কারজনক মুচলেকা দেওয়ার অব্যবহিত পরেই সরকার কমিশনের প্রস্তাবগুলি Indian Relief Bill এ অন্তর্ভুক্ত করে ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে বিলটিকে আইনে পরিণত করে। ভারতীয়দের বিবাহ বৈধ বলে স্বীকৃত হয় (যদিও মুসলমানদের বহু বিবাহ অস্বীকৃত থাকে) ও তিন পাউন্ড করের অবলুপ্তি ঘটে। এই আইনকে ‘magna carta for Indians’ বলে অভিহিত করে গান্ধী তাঁর প্রায় আট বছর ব্যাপী সত্যাগ্রহ তুলে নেন।

রাজনৈতিক গুরু গোখলের পরামর্শে ১৯১৪ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকাকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে ভারতবর্ষে পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার জন্য গান্ধী যখন ইংল্যান্ড অভিমুখে রওনা হচ্ছেন, তখনও দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী ভারতীয়দের যে যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল – তার তালিকাও নেহাত কম নয়। প্রথমত, দক্ষিণ আফ্রিকার এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে যেতে গেলে যে পারমিট ব্যবস্থা চালু ছিল তার অবলুপ্তি ঘটেনি, অর্থাৎ যে ‘কালা কানুন’-এর বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন শুরু করেছিলেন তা তখনও পূর্ণ মাত্রায় বহাল ছিল। দ্বিতীয়ত, ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ ফ্রি স্টেটে ভারতীয়দের জমি কেনা ও ব্যবসা স্থাপনের অনুমতি ছিল না এবং অন্য দুটি প্রদেশেও সে ব্যাপারে আইনকানুনের মারপ্যাঁচ যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান ছিল। সর্বোপরি, এই আইনে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের কোনও সুরাহাই হয়নি। সঠিক ভাবে বলতে গেলে তিন পাউন্ড কর বিলোপকেই গান্ধীর দক্ষিণ আফ্রিকা পর্বের একমাত্র সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, যদিও মূলত কর আদায় করার প্রশাসনিক অসুবিধার কারণেই সরকার এই কর প্রত্যাহার করে নেয়।

কেবলমাত্র বুয়র ও বাম্বাত্তা যুদ্ধে গান্ধীর ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে অহিংসার পূজারী, বর্ণবিদ্বেষবিরোধী আন্দোলনের হোতা, দরিদ্র অসহায় কৃষক-শ্রমিকদের ত্রাতা হিসেবে প্রচারিত গান্ধীর সযত্নলালিত মুখোশ এক ঝটকায় খুলে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে African Chronicle ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ এপ্রিল লেখে: “Mr. Gandhi’s ephemeral fame and popularity in India and elsewhere rest on no glorious achievement for his countrymen, but on a series of failures, which has resulted in causing endless misery, loss of wealth, and deprivation of existing rights”। তবে অশ্বিন দেশাই এবং গুলাম ভাহেদ একটি মাত্র বাক্যে গান্ধীর দক্ষিণ আফ্রিকা পর্বের যে মূল্যায়ন করেছেন তার তুলনা মেলা ভার। তাঁরা লিখেছেন, “He [Gandhi] was a lawyer and lawbreaker, journalist and propagandist, a loyal subject of Empire and agitator, a fighter against discrimination and a racist, a man of principle and a dealmaker, and a passive resister yet a sergeant major”।


সহায়ক লেখাপত্র :
১. Ashwin Desai, Goolam Vahed – The South African Gandhi: Stretcher-Bearer of Empire
২. G B Singh – Gandhi: Behind the Mask of Divinity
৩. George Paxton – Gandhi’s Wars
৪. Joseph Lelyveld – Great Soul: Mahatma Gandhi and His Struggle with India
৫. Nishikant Kolge – Was Gandhi a Racist? His Writings in South Africa
৬. Philip Sprat – Gandhism: An Analysis, Vol. I



1242 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3]   এই পাতায় আছে 26 -- 45
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

@+-×÷,

১) //“This doctrine of satyagraha... is merely an extension of the rule of domestic life to the political." --- "অর্থাৎ তাঁর মতে সত্যাগ্রহের গোটা বিষয়টাই পারিবারিক সমস্যা, রাজনৈতিক সমস্যা নয়!"

--- এমত কনক্লুশন যাকে বলে আমিউজিং।//

বেশ, তাই না হয় হল কিন্তু অ্যামিউজিং কেন সেটা তো বলবেন! খেয়াল করে দেখুন বিস্তর টালবাহানা ও ধোঁয়াশা জিইয়ে রাখার পর গান্ধী সত্যাগ্রহ নিয়ে বলছেন --- “This doctrine of satyagraha is not new; it is merely an extension of the rule of domestic life to the political. Family disputes and differences are generally settled according to the law of love. The injured member has so much regard for the others that he suffers injury for the sake of his principles without retaliating and without being angry with those who differ from him. And as repression of anger and self-suffering are difficult processes, he does not dignify trifles into principles, but, in all non-essentials, readily agrees with the rest of the family, and thus contrives to gain the maximum of peace for himself without disturbing that of the others. Thus his action, whether he resists or resigns, is always calculated to promote the common welfare of the family. It is this law of love which, silently but surely, governs the family for the most part throughout the civilized world” তিনি তো এই ধারণা ধার নিয়েছেন রাসকিনের Unto This Last থেকে, যেখানে শোষক ও শোষিত একই পরিবারভুক্ত! পিতা ও সন্তানের সম্পর্ক! তাই কোনও সংঘর্ষের দরকার নেই, কোনও শ্রেণি সংগ্রামের উচ্চারণের বালাই নেই, পুরোটাই আপস এবং ক্রমাগত আপসের সাহায্যে মিটিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ অক্ষম প্রচেষ্টা। আর সত্যের প্রতি গান্ধীর যে কত আগ্রহ তা আমরা পরবর্তী পর্বগুলোতে দেখতেও পাব।

২) //এটা কি এভাবেও লেখা যায়, যে, মাদকবিরোধী হিসেবে পরিচিত গান্ধী কিনা মৃত্যুর চৌকাঠে দাঁড়ানো যুদ্ধরত সেনাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির জন্য তহবিল গঠনকালে এমনকি তাদের তামাকের প্রয়োজনটুকুর কথাও মনে রাখছেন!//

না, লেখাই যায় না! তিনি তো যুদ্ধের বিরোধী! তিনি তো অহিংসার জ্যান্ত নিদর্শন! যুদ্ধ এবং যুদ্ধজনিত হিংসা সম্পর্কে তাঁর মনোভাব স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করে যে গান্ধী লেখেন: “I draw no distinction between those who wield the weapons of destruction and those who do Red Cross work. Both participate in war and advance its cause. Both are guilty of the crime of war” (ইয়ং ইন্ডিয়া ১৩.০৯.১৯২৮), সেই একই গান্ধী যুদ্ধে সহযোগিতার কথা ভাববেন কীভাবে?


৩) //"অক্টোবর মাসে গান্ধী এবার একজন মুসলিম সহযোগী মহম্মদ আলিকে নিয়ে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে (‘vow of poverty’ ভুলে গিয়ে প্রথম শ্রেণির টিকিটে!)"
--- এটা কী জাহাজের টিকিট না ট্রেনেরও? টিকিটের খরচ কে দিয়েছিল? যাত্রার কতদিন আগে টিকিট কাটা হয়? সেই সময় সেকেন্ড, থার্ড বা জেনারেল ক্লাসের টিকিট কি অ্যাভেলেবল ছিল? গান্ধীর সহযাত্রীর প্রেফারেন্স কী ছিল? অন্যান্য ক্লাসের টিকিটে সমুদ্রযাত্রায় অসুস্থ হয়ে পড়ার ট্রেন্ড কেমন ছিল? গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মিটিং এর পূর্বে সেই অসুস্থতার রিস্ক নেওয়া কতখানি সমীচীন ছিল? এসব না জেনে ঠিকমতো কিছু কনক্লুড করা যাচ্ছে না যে। এই যাত্রা সম্বন্ধে ডিটেল কোথায় পড়তে পাওয়া যাবে?//

এটা জাহাজের টিকিট। খরচ দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী ধনী ভারতীয় ব্যবসায়ীরা যাঁদের ব্যবসা-স্বার্থ দেখার কাজে গান্ধী তাঁর জীবনের মূল্যবান ২১ টা বছর ব্যয় করেছিলেন। এমনকি ১৯০৯ সালে দ্বিতীয়বারের জন্য যখন তিনি ইংল্যান্ডে যান তখনও তিনি প্রথম শ্রেণির টিকিটেই গিয়েছিলেন। হ্যাঁ, সেই সময়ে অবশ্যই সেকেন্ড, থার্ড বা জেনারেল ক্লাসের টিকিট অ্যাভেলেবল ছিল। গান্ধী জীবনে কোনও দিন অন্য কারও প্রেফারেন্সের ধার ধারেননি। তাঁর মতো একনায়ক গোটা পৃথিবীতে বিরল। কাজেই তাঁর সহযাত্রীর প্রেফারেন্সের প্রশ্নই নেই। 'গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মিটিং'-এ যোগ দেওয়ার জন্য তিনি গোলটেবিল বৈঠকেও গিয়েছিলেন যদিও প্রথম শ্রেণিতে যাননি। কাজেই ...

গান্ধীর দক্ষিণ আফ্রিকা পর্ব নিয়ে বইপত্রের সংখ্যা খুবই সীমিত। কাজেই এই যাত্রার ডিটেল আমি অন্তত আপনাকে দিতে অক্ষম। কোনও পাঠক যদি দিতে পারেন।
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

@এস চক্রবর্তী, //দুটো জিনিস জানবার ইচ্ছা রইল , দেশে মানে ভারতে গান্ধী কি ধরনের ট্রেনের কোচে সাধারণত যাতায়াত করতেন , মানে প্রথম শ্রেণী কি একেবারেই ব্যাতিক্রম আর সৈন্যদের তামাক কি একটা স্লিপ অফ ওয়ার্ড ধরে ছাড় দেওয়া যায় না?মানে আমরা অনেক সময় অনেক কথা লিখি বা অন্যরা ড্রাফট করে দেয় । সেরকম হতে পারে কি না ? আমার জানার জন্য জিজ্ঞাসা ।//

নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন, আমি আমার সাধ্যমতো আপনাকে জানানোর চেষ্টা করব।

আপনার প্রথম প্রশ্ন --- "দেশে মানে ভারতে গান্ধী কি ধরনের ট্রেনের কোচে সাধারণত যাতায়াত করতেন , মানে প্রথম শ্রেণী কি একেবারেই ব্যাতিক্রম"

আমার উত্তর --- গান্ধী ভারতবর্ষে ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণিতে যাতায়াত করতেন, ফলে তাঁর জন্য কংগ্রেস পার্টি ও ইংরেজ সরকারের উদ্যোগে তৃতীয় শ্রেণি লেখা ট্রেনের পুরো একটা কামরা আলাদা করে রাখা হয়েছিল। সেই কামরার বাহ্যিক চেহারা বাদ দিয়ে ভেতরে ব্যবস্থা প্রথম শ্রেণীর কামরাকে ছাড়িয়ে যেত এবং গান্ধীর গন্তব্যস্থলের ট্রেনে তা জুড়ে দেওয়া হত। সরোজিনী নাইডু বলেছিলেন, “To keep Mahatma Gandhi poor, we have to destroy treasures. His poverty is very costly.”

আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন --- "সৈন্যদের তামাক কি একটা স্লিপ অফ ওয়ার্ড ধরে ছাড় দেওয়া যায় না?মানে আমরা অনেক সময় অনেক কথা লিখি বা অন্যরা ড্রাফট করে দেয় । সেরকম হতে পারে কি না ?"

প্রশ্নই নেই! ইন্ডিয়ান ওপিনিয়নের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তিকে সাহায্য করার জন্য গান্ধীর তীব্র আকুতির কথা। একটা ক্ষেত্রে স্লিপ অফ ওয়ার্ড ধরে নেওয়াই যায়, কিন্তু তিনি তো এটা বারবার করেছেন। তখন কি আর ছাই জানতেন সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর একাধিক কুকর্মের সাক্ষী ইন্ডিয়ান ওপিনিয়নের রিপোর্ট ভারত সরকার ৯৮ খণ্ডে ছাপিয়ে দেবে!!!
Avatar: +-×÷

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

""যদিও গান্ধী আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, জুলু যুদ্ধের পরেই নাকি তাঁর মনোজগতে পরিবর্তন আসে এবং পাঁচটি ব্যাপারে দৃঢ়সংকল্প হন — ব্রহ্মচর্য, অহিংসা, বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই, ‘vow of poverty’ এবং সত্যাগ্রহ""

সেখানে জুলু যুদ্ধ বা তার আগের যুদ্ধে গান্ধী যুদ্ধবিরোধী বা অহিংস নীতিতে অধিষ্ঠান করেননি কেন এটা অযৌক্তিক আর্গুমেন্ট নয়?

satyagraha... is merely an extension of the rule of domestic life to the political." এখানে তো বলাই হল পারিবারিক ক্ষেত্র থেকে পদ্ধতিটাকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক্সটেন্ড করা হচ্ছে। বিশ্বমানবতার দিক থেকে দেখলে সমগ্র পৃথিবী তথা মানবজাতিকেই একটি পরিবার হিসেবে ভাবা হচ্ছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পদ্ধতিটিকে ব্যবহার করার জাস্টিফিকেশন হিসেবেই তো এই লজিক দেওয়া হচ্ছে। ""তাঁর মতে সত্যাগ্রহের গোটা বিষয়টাই পারিবারিক সমস্যা, রাজনৈতিক সমস্যা নয়!"" এইটা এখান থেকে কীভাবে কনক্লুড করা যায়?

যাত্রার কতদিন আগে টিকিট কাটা হয়? সেই সময় সেকেন্ড, থার্ড বা জেনারেল ক্লাসের টিকিট কি অ্যাভেলেবল ছিল? একথা বলার অর্থ টিকিট কাটতে গিয়ে যদি দেখা যায় ফার্স্ট ক্লাস ছাড়া অন্য সব ক্লাসের টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে তবে কি নির্দিষ্ট দিনের বেশ কিছুদিন পরে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে? ব্যবসায়ীরা ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কিনে হাতে ধরিয়ে দিলে কি বলতে হবে, এ টিকিট ছিঁড়ে ফেলে নতুন একটা থার্ড ক্লাস টিকিট কিনে না দিলে আমি যাচ্ছি না? জাস্ট দাবিটা বুঝতে চাইছি। গান্ধী কতটা ভন্ড ছিলেন, vow of poverty বলে আসলে ফার্স্ট ক্লাসের আরামই চাইতেন কিনা সেব্যপারে কোনো স্পেকুলেটিভ কনক্লুসন এখনো করে উঠিনি।

তবে সালটাল একটু গুলিয়ে যাচ্ছে। জুলু যুদ্ধের পরে দৃঢ়সংকল্প হন মানে কবে? ১৯০৫ আর ১৯০৭ এ জুলু যুদ্ধ হয় তাইতো? ১৯০৭ এর পরে দৃঢ়সংকল্প হলে (তাই দাঁড়াচ্ছে, নইলে ১৯০৭ এ যুদ্ধে অংশ নিতে চাইতেন না) ১৯০৬ এ কেন ফার্স্টক্লাসে গেলেন এটাও লজিকে আসে না।

যাইহোক লিখুন, পড়ছি।

Avatar: ন্যাড়া

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

ভাল লেখা। পড়ছি। যদিও একটা প্রেমিস ধরে তাতে তথ্য ফিট করানোর চেষ্টা দেখতে পাচ্ছি। যেমন তামাক আর রাজনৈতিক-পারিবারিক যে দুটো জায়গা +-x÷ যে ধরেছেন, ওনার লেখার আগেই আমারও মনে হয়েছিল ইংরিজি উদ্ধৃতি থেকে এবড়োখেবড়োবাবু যে ইন্টারপ্রিটেশন করেছেন সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

উদ্দেশ্যটাও আমার কাছে স্পষ্ট। সাবেক বামপন্থী পজিশন থেকে গান্ধীর কাজকে দেখা। তাও পড়তে চাই।
Avatar: +-×÷

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

তাছাড়া, গান্ধী ""অযথা"" প্রচার করেন যে স্মাটস ‘… verbally promised to repeal the Act, আদতে তাঁদের মধ্যে এই আইন প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনও প্রতিশ্রুতির কথাই হয়নি। এটা তো সাম্প্রতিক গবেষনা হিসেবেও অশ্বিন দেশাইও লেখেননি দেখা যাচ্ছে। তিনি বরং লিখেছেন, ফর্মাল চুক্তিপত্রে আইন প্রত্যাহারের কথা ছিল না কিন্তু Gandhi insisted that Smuts ‘… verbally promised to repeal the Act, যা কিনা গান্ধীর ভার্সানকেই সমর্থন করছে। তাঁদের মধ্যে এই আইন প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনও প্রতিশ্রুতির কথাই হয়নি।-- এটা তো এখনো এবড়োখেবড়োর ধারণা বা মতামতের বাইরের কিছু বলে প্রতিষ্ঠা পেল না, তাইনা?
Avatar: খ

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

লেখকের বিবেচনা র জন্য অনুরোধ এই যে কে কি মন্তব্য করছে তাতে এত উত্তর প্রতি ক্রিয়া র কি হল? কেউ তো পড়ে ধন‍্য করছে না, যা বক্তব্য পুরো প্রবন্ধ টা শেষ করে ন‍্যান একটু গোদা করে। প‍রে উত্তর প্রত‍্যুত্তর করা র অনেক সময় পাবেন তো। আগে নিজের বক্তব্য নিজের মত প্রকাশ করে নিতে পারেন নইলে কিছু দিন পরে সম্পূর্ণ উৎসাহ হারাবেন।
Avatar: ঋভু

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

সাউথ আফ্রিকা পর্বটার রেফারেন্সের জন্যে উৎসাহী জনতা অশ্বিন দেশাই এর বইটাই পড়ে দেখতে পারেন । সুলিখিত ছোট বই : https://b-ok.cc/book/2860087/095ecf

Avatar: b

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

ন্যাড়াস্যার, আপনি আপাততঃ পান্নালাল দাশগুপ্তের গান্ধী গবেষণা বইটা দিয়ে শুরু করুন। রবি-মোহন-কার্ল সবাইকে এক্ধারসে পেয়ে যাবেন।
Avatar: abcd

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

পান্নালাল দাশগুপ্ত, আমার হ্যাজিওগ্রাফিক লেগেছে। তুলনায় ভাল লেগেছে হীরেন মুখার্জি নাম্বুদিরিপাদ আর ডাঙ্গে।
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

@খ, আপনার সৎ পরামর্শ শিরোধার্য করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে একটা কিস্তি শেষ হওয়া এবং পরবর্তী কিস্তি শুরু হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ের কোনও একটি নির্দিষ্ট দিনে পাঠকবৃন্দের উত্তর সাধ্যমতো চেষ্টা করব। নাহলে অকারণে অনেকটা সময় নষ্ট হবে এবং দৈনন্দিন এই সওয়াল-জবাব চালিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়।

@ন্যাড়া, আপনাকে আশ্বস্ত করে জানাই গান্ধী মূল্যায়নে মার্কসীয়-রবীন্দ্রনাথীয়-আম্বেদকরীয় এমনকি পাঁড় গান্ধীবাদীদের লেখা ও দৃষ্টিভঙ্গীকে সাদরে গ্রহণ করা হয়েছে। কাজেই এখনই কোনও সিদ্ধান্তে আসবেন না দয়া করে। আর মাদকবিরোধী হিসাবে পরিচিত গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহচর ঘনশ্যামদাস বিড়লার ব্যবসা সম্পর্কে আপনি অনবহিত - এটা বিশ্বাস করতে বলবেন না!

@ঋভু, অশ্বিন দেশাই-এর হার্ডকপিটি ৩৪৩ পাতার। আপনি কি সেটিকেই সুলিখিত 'ছোট' বই বলতে চাইছেন? আগে এটার জানান দিলে আমার ৫৯৫ টাকা বেঁচে যেত! আফশোস!!
Avatar: অর্জুন

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস


পড়লাম।

'“This doctrine of satyagraha... is merely an extension of the rule of domestic life to the political." --- "অর্থাৎ তাঁর মতে সত্যাগ্রহের গোটা বিষয়টাই পারিবারিক সমস্যা, রাজনৈতিক সমস্যা নয়!"

এখানে 'সত্যাগ্রহের গোটা বিষয়টাই'কে ' পারিবারিক সমস্যা' বোধহয় বলতে চাননি মোহনদাস গান্ধী।

এখানে 'satyagraha... is merely an extension of the rule of domestic life' বলতে ব্যক্তিগত জীবনচর্যাও হতে পারে। অর্থাৎ 'সত্যাগ্রহ' পালন করতে হলে তার প্রথম সূচনা হবে নিজের জীবনযাত্রা থেকে।

সত্যাগ্রহ নিয়ে গান্ধী নিজেও কি দ্বিধায় ছিলেন না!

আত্মজীবনীতে লিখছেন Events were so shaping themselves in Johannesburg as to make this self- purification on my part a preliminary as it were to 'Satyagraha'. I can now see that all the principle events of my life, culminating in the vow of 'brahamacharya', were secretly preparing me for it. The principle caled 'Satyagraha' came into being before that name was invented. Indeed when it was born, I myself could not say what it was.

প্রথমে গুজরাতি ভাষাতেও passive resistance শব্দ ব্যবহার করা হয় কিন্তু একটি ইউরোপীয় সমাবেশে passive resistance শব্দটার সংকীর্ণতা তাকে নূতন করে একটা উপযুক্ত ভারতীয় শব্দ সন্ধানে উদ্যত করে।

But I could not for the life of me find out a new name, and therefore offered a nominal prize through 'Indian Opinion" to the reader who made the best suggestion on the subject. As a result Maganlal Gandhi coined the word Sadagraha (Sat:truth, Agatha:firmness) and won the prize.

সদাগ্রহ শব্দটি পুরস্কার পেলেও গান্ধী অবশেষে সেটি একটু অদল বদল করে 'সত্যাগ্রহ' করে দেন।








Avatar: 8-{O

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

principle events গান্ধী লিখেছেন?
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

@8-{O, :-)))))))))) আজকে হাসির ইমোজিটা নিয্যস ঠিক দিইচি।
Avatar: জ

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

বাম্বাত্তা বিদ্রোহ সূচিত হয়। বিদ্রোহে যোগদান করতে উন্মুখ গান্ধী

এইভাবে লেখাটা কি ঠিক হল? গান্ধীজি বিদ্রোহে যোগদান করতে উন্মুখ ছিলেন না। তিনি বিদ্রোহ দমনে যোগদান করতে উন্মুখ ছিলেন
Avatar: অর্জুন

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস



আমার কাছে গান্ধীজীর ইংরেজিতে লেখা আত্মজীবনী An Autobiography OR The story of my experiments with truth র যে কপিটা আছে সেটা ২০০০ সালে আমার ছাত্রাবস্থায় পুনের আগা খান প্যালেস থেকে কেনা। প্রকাশক Navajivan publishing house, মূল্য ২০ টাকা, ১৯৯৯ সালের সংস্করণ ।

সেখানকার XXVI chapter এ The Birth of Satyagraha তে ছাপা আছে

The principle called 'Satyagraha' came into being before that name was invented.

I gave the exact quote.



Avatar: 8-{O

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

principle events?
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

আজ আমার উত্তর দেওয়ার পালা।

@+-×÷, আপনি অনেকগুলো প্রশ্ন তুলেছেন, আমি এক এক করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।

১) //""যদিও গান্ধী আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, জুলু যুদ্ধের পরেই নাকি তাঁর মনোজগতে পরিবর্তন আসে এবং পাঁচটি ব্যাপারে দৃঢ়সংকল্প হন — ব্রহ্মচর্য, অহিংসা, বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই, ‘vow of poverty’ এবং সত্যাগ্রহ""

সেখানে জুলু যুদ্ধ বা তার আগের যুদ্ধে গান্ধী যুদ্ধবিরোধী বা অহিংস নীতিতে অধিষ্ঠান করেননি কেন এটা অযৌক্তিক আর্গুমেন্ট নয়?//

দেখুন গোটাটাই তো গান্ধীর বয়ান এবং সে বয়ান যে মিথ্যে সে তো আমি দেখিয়েইছি ১৯০৭ সালেও তাঁর যুদ্ধে যোগদানের ইচ্ছের কথা জানিয়ে। শুধু জুলু যুদ্ধই নয়, তার পরেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকে ১৯১৪ সালে তিনি যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে যোগ দিতে চেয়েছেন। এমনকি যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তিনি রীতিমতো রিক্রুটিং সার্জেন্টও হয়েছেন। গান্ধী ‘অহিংসার প্রতিমূর্তি - এই বহুপ্রচলিত মিথটিকে ভাঙতে একটি আস্ত পর্ব লেখা হয়েছে যা পড়লে আপনার কাছে পরিষ্কার হবে তাঁর এই দাবি কতটা অসার।

২) //satyagraha... is merely an extension of the rule of domestic life to the political." এখানে তো বলাই হল পারিবারিক ক্ষেত্র থেকে পদ্ধতিটাকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক্সটেন্ড করা হচ্ছে। বিশ্বমানবতার দিক থেকে দেখলে সমগ্র পৃথিবী তথা মানবজাতিকেই একটি পরিবার হিসেবে ভাবা হচ্ছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পদ্ধতিটিকে ব্যবহার করার জাস্টিফিকেশন হিসেবেই তো এই লজিক দেওয়া হচ্ছে। ""তাঁর মতে সত্যাগ্রহের গোটা বিষয়টাই পারিবারিক সমস্যা, রাজনৈতিক সমস্যা নয়!"" এইটা এখান থেকে কীভাবে কনক্লুড করা যায়?//

আমি আপনাদের সুবিধার্থে গান্ধীর প্রায় প্রতিটা উক্তিরই রেফারেন্স দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আপনারা কি সেগুলো ক্রসচেক করছেন? যদি করেন তো দেখতে পাবেন গান্ধী তাঁর বহুবিখ্যাত সত্যাগ্রহের সংজ্ঞা দিচ্ছেন ১৯২০ সালে অর্থাৎ তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হওয়ার প্রায় ২৫ বছর পরে। এর মধ্যে তাঁর একাধিক সত্যাগ্রহে নেতৃত্বদানের পর্ব সারা। এই যে সংজ্ঞা এটা উনি দিয়েছিলেন কংগ্রেসের পাঞ্জাব সাব-কমিটির রিপোর্টে। তার আগে জালিয়ানওয়ালা বাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে। সেখানে অত্যাচারী ব্রিটিশ এবং অত্যাচারিত ভারতীয়দের একই পরিবারভুক্ত করা কতটা যুক্তিযুক্ত? আমার কনক্লুশন বাদই দিন, প্রখ্যাত ঐতিহাসিক বি আর নন্দও তো লিখেছেন, “Gandhi deliberately discouraged the involvement of the peasantry and the industrial workers in his campaigns; he also excluded the princely state from the purview of his movement”। তাহলে ওই পরিবারের সদস্য কারা? এবং কী আশ্চর্য তিনি তাঁর দেশবাসীদের এক পরিবারভুক্ত মনে করেন না! আম্বেদকরের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। তা পরবর্তী পর্বে আসবে।

৩) //যাত্রার কতদিন আগে টিকিট কাটা হয়? সেই সময় সেকেন্ড, থার্ড বা জেনারেল ক্লাসের টিকিট কি অ্যাভেলেবল ছিল? একথা বলার অর্থ টিকিট কাটতে গিয়ে যদি দেখা যায় ফার্স্ট ক্লাস ছাড়া অন্য সব ক্লাসের টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে তবে কি নির্দিষ্ট দিনের বেশ কিছুদিন পরে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে? ব্যবসায়ীরা ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কিনে হাতে ধরিয়ে দিলে কি বলতে হবে, এ টিকিট ছিঁড়ে ফেলে নতুন একটা থার্ড ক্লাস টিকিট কিনে না দিলে আমি যাচ্ছি না? জাস্ট দাবিটা বুঝতে চাইছি। গান্ধী কতটা ভন্ড ছিলেন, vow of poverty বলে আসলে ফার্স্ট ক্লাসের আরামই চাইতেন কিনা সেব্যপারে কোনো স্পেকুলেটিভ কনক্লুসন এখনো করে উঠিনি।//

গান্ধী তাঁর ‘vow of poverty’ বা দারিদ্রব্রতর ধারণা পেয়েছিলেন টলস্টয়ের কাছ থেকে। হ্যাঁ, এ ব্যাপারে তিনি যে ভণ্ড ছিলেন তা তো সরোজিনী নাইডুর উক্তিতেই মালুম হয়। মালুম হয় দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর অ্যাসোশিয়েশনের বার্ষিক চাঁদার হার দেখেও।

৪) //তবে সালটাল একটু গুলিয়ে যাচ্ছে। জুলু যুদ্ধের পরে দৃঢ়সংকল্প হন মানে কবে? ১৯০৫ আর ১৯০৭ এ জুলু যুদ্ধ হয় তাইতো? ১৯০৭ এর পরে দৃঢ়সংকল্প হলে (তাই দাঁড়াচ্ছে, নইলে ১৯০৭ এ যুদ্ধে অংশ নিতে চাইতেন না) ১৯০৬ এ কেন ফার্স্টক্লাসে গেলেন এটাও লজিকে আসে না।//

গান্ধী তাঁর আত্মজীবনীতে দৃঢ়সংকল্প হওয়ার কথা লিখেছেন ১৯০৬ থেকে এবং ওই সময় থেকেই তিনি ব্রহ্মচর্যও পালন করতে শুরু করেন। যদিও তিনি নিজে ‘যুদ্ধ’ শব্দটা ব্যবহার না করে বারংবার ‘বিদ্রোহ’ বা Rebellion বলেছেন। ১৯০৭ সালে যুদ্ধ হয়নি, যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল মাত্র। লজিকে আনতে পারছেন তাঁর কথা এবং আচরণের পার্থক্যকে!

৫) //তাছাড়া, গান্ধী ""অযথা"" প্রচার করেন যে স্মাটস ‘… verbally promised to repeal the Act, আদতে তাঁদের মধ্যে এই আইন প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনও প্রতিশ্রুতির কথাই হয়নি। এটা তো সাম্প্রতিক গবেষনা হিসেবেও অশ্বিন দেশাইও লেখেননি দেখা যাচ্ছে। তিনি বরং লিখেছেন, ফর্মাল চুক্তিপত্রে আইন প্রত্যাহারের কথা ছিল না কিন্তু Gandhi insisted that Smuts ‘… verbally promised to repeal the Act, যা কিনা গান্ধীর ভার্সানকেই সমর্থন করছে। তাঁদের মধ্যে এই আইন প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনও প্রতিশ্রুতির কথাই হয়নি।-- এটা তো এখনো এবড়োখেবড়োর ধারণা বা মতামতের বাইরের কিছু বলে প্রতিষ্ঠা পেল না, তাইনা?//

না, ওটা এবড়োখেবরোর ধারণা নয়। ওটা গান্ধীর নিজস্ব ইন্টারপ্রিটেশন! অ্যাক্ট রিপিল করা হবে এমন কিছু চুক্তিতে বলাই হয়নি, তবুও গান্ধী আন্দোলন প্রত্যাহার করার অজুহাত হিসাবে যুক্তি খাড়া করেন। আপনি অশ্বিন দেশাই-এর উদ্ধৃতিটা আর একবার পড়ুন এবং নজরটানে নজর দিন।

@অর্জুন
//এখানে 'সত্যাগ্রহের গোটা বিষয়টাই'কে ' পারিবারিক সমস্যা' বোধহয় বলতে চাননি মোহনদাস গান্ধী।
এখানে 'satyagraha... is merely an extension of the rule of domestic life' বলতে ব্যক্তিগত জীবনচর্যাও হতে পারে। অর্থাৎ 'সত্যাগ্রহ' পালন করতে হলে তার প্রথম সূচনা হবে নিজের জীবনযাত্রা থেকে।//

বেশ তো, আপনার ব্যাখ্যাই মেনে নিলাম। কিন্তু আপনি আমাকে বলুন এই ব্যক্তিগত জীবনচর্যায় ব্রহ্মচর্য অবশ্য পালনীয় শর্ত কেন?

@জ
//গান্ধীজি বিদ্রোহে যোগদান করতে উন্মুখ ছিলেন না। তিনি বিদ্রোহ দমনে যোগদান করতে উন্মুখ ছিলেন//

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ লেখাটা খুঁটিয়ে পড়ে এই ভুলটা দেখিয়ে দেওয়ার জন্য। এখানে তো আর সংশোধনের সুযোগ নেই, আমি আমার পাণ্ডুলিপিতে ভুলটা শুধরে নিলাম।

Avatar: রঞ্জন

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

আজকের এই টালমাটাল সময়ে জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রবাদ , দেশভক্তি এবং রাজনীতিতে ধর্মের তড়কার ইমপ্যাক্ট -- এগুলো আমাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।
তাই গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ- বিবেকানন্দ-- নেতাজি--নেহরুজি সবার সেই সময়ের প্রেক্ষিতে পুনর্মূল্যায়ন এবং আজকে তার প্রাসংগিকতা নিয়ে কথাবার্তা খুব জরুরি।
কোন ঘটনার ইন্টারপ্রিটেশনে মতভেদ থাকতেই পারে । বিতর্ক চলুক। মন দিয়ে পড়ছি।
আশা করব এরপর রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা এবং জাতীয়তাবাদ বিষয়ক মতামত নিয়ে কিছু 'নির্মোহ' হবে।
Avatar: রঞ্জন

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

একটা কথা । গান্ধীজি 'মহাত্মা' অভিধা পেলেও মানুষ ছিলেন, দেবতা নয় । তাই সবার মত তাঁর আচরণেও স্ববিরোধ ছিল। সেসবই প্রমাণিত তথ্য । কিন্তু গান্ধীজির বাস্তব ঘটনার অভিঘাতে পরিবর্তনও হয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাংগ প্রভুর ভক্ত গান্ধীজি ভারতে ফিরেও ' বৃটিশ সাম্রাজ্যের একনিষ্ঠ সেবক' ছিলেন।
কিন্তু তিনিই দেড়দশক পরে বৃটিশ সাম্রাজ্যকে ডেভিলস এম্পায়ার বলতে দ্বিধা করেন নি । রাউলাট অ্যাক্টের সময় থেকেই পরিবর্তনের শুরু মনে হয় ।
আশায় আছি যে এবড়োখেবড়ো'র লেখায় এই বাঁকবদলের কিছু হদিশ পাব।
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস

রঞ্জনবাবু,

লেখাটা পড়ার জন্য ও মন্তব্য করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। মাঝে মাঝে কোথায় উধাও হয়ে যান?

যাই হোক, আপনি লিখেছেন 'তিনিই দেড়দশক পরে বৃটিশ সাম্রাজ্যকে ডেভিলস এম্পায়ার বলতে দ্বিধা করেন নি । রাউলাট অ্যাক্টের সময় থেকেই পরিবর্তনের শুরু মনে হয় ।' হায়! তাই যদি হত। আপাতত এর বেশি কিছু লিখছি না।

আপনাকে একটু ভেবে দেখতে বলি অন্যভাবে। এক, গান্ধী লিখছেন, "I am trying to introduce religion into politics". দুই, ১৯২০ সালের ১৮ই মে শ্রীনিবাস শাস্ত্রীকে লিখিত এক পত্রে হোমরুল লিগের নেতৃবৃন্দ কর্তৃক তাঁদের সংগঠনে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণের উল্লেখ করে গান্ধী লেখেন “ I have told them … I could only join an organization to affect its policy and not be affected by it”.

আপনি কি কালের যাত্রার ধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন? 'দেশভক্তি এবং রাজনীতিতে ধর্মের তড়কার ইমপ্যাক্ট'-এর পূর্বসূরীকে দেখতে পাচ্ছেন?

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3]   এই পাতায় আছে 26 -- 45


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন