Sourav Mitra RSS feed

Sourav Mitraএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • নাদির
    "ইনসাইড আস দেয়ার ইজ সামথিং দ্যাট হ্যাজ নো নেম,দ্যাট সামথিং ইজ হোয়াট উই আর।"― হোসে সারামাগো, ব্লাইন্ডনেস***হেলেন-...
  • জিয়াগঞ্জের ঘটনাঃ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতা
    আসামে এনার্সি কেসে লাথ খেয়েছে। একমাত্র দালাল ছাড়া গরিষ্ঠ বাঙালী এনার্সি চাই না। এসব বুঝে, জিয়াগঞ্জ নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছিল। যাই হোক করে ঘটনাটি থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেই হবে। মেরুকরনের রাজনীতিই এদের ভোট কৌশল। ঐক্যবদ্ধ বাঙালী জাতিকে হিন্দু মুসলমানে ভাগ করা ...
  • অরফ্যানগঞ্জ
    পায়ের নিচে মাটি তোলপাড় হচ্ছিল প্রফুল্লর— ভূমিকম্পর মত। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেন কেউ আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে— সেই প্রচণ্ড কাঁপুনিতে ফাটল ধরছে পথঘাট, দোকানবাজার, বহুতলে। পাতাল থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছিল। ঝোড়ো বাতাস বইছিল রেলব্রিজের দিক থেকে। প্রফুল্ল দোকান থেকে ...
  • থিম পুজো
    অনেকদিন পরে পুরনো পাড়ায় গেছিলাম। মাঝে মাঝে যাই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়। বন্ধুদের মা-বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ভাল লাগে। বেশ রিজুভিনেটিং। এবার অনেকদিন পরে গেলাম। এবার গিয়ে শুনলাম তপেস নাকি ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একটু পরে তপেসও এল ...
  • কাঁসাইয়ের সুতি খেলা
    সেকালে কাঁসাই নদীতে 'সুতি' নামের একটা খেলা প্রচলিত ছিল। মাছ ধরার অভিনব এক পদ্ধতি, বহু কাল ধরে যা চলে আসছে। আমাদের পাড়ার একাধিক লোক সুতি খেলাতে অংশ নিত। এই মৎস্যশিকার সার্বজনীন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়। মনে আছে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ...
  • শুভ বিজয়া
    আমার যে ঠাকুর-দেবতায় খুব একটা বিশ্বাস আছে, এমন নয়। শাশ্বত অবিনশ্বর আত্মাতেও নয়। এদিকে, আমার এই জীবন, এই বেঁচে থাকা, সবকিছু নিছকই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া, এমনটা সবসময় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না - জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পরিণ...
  • আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই...
    দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। দেশের সবচেয়ে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে বুয়েট। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছু বরাহ নন্দন! কাওকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কি খুব সহজ কাজ? কতটুকু জোরে মারতে হয়? একজন মানুষ পারে ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭
    চন্দ্রপুলিধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন ...
  • গুমনামিজোচ্চরফেরেব্বাজ
    #গুমনামিজোচ্চরফেরেব্...
  • হাসিমারার হাটে
    অনেকদিন আগে একবার দিন সাতেকের জন্যে ভূটান বেড়াতে যাব ঠিক করেছিলাম। কলেজ থেকে বেরিয়ে তদ্দিনে বছরখানেক চাকরি করা হয়ে গেছে। পুজোর সপ্তমীর দিন আমি, অভিজিৎ আর শুভায়ু দার্জিলিং মেল ধরলাম। শিলিগুড়ি অব্দি ট্রেন, সেখান থেকে বাসে ফুন্টসলিং। ফুন্টসলিঙে এক রাত্তির ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক (গল্প)

Sourav Mitra

কয়েক হপ্তা আগেও রাত নামলে যে সড়ক অন্ধকারে মুখ লুকিয়েছে, সেখানে হঠাৎ বিশ-পঁচিশ পা অন্তর অন্তর তিন মানুষ উঁচু উঁচু খাম্বা আর আলোর বহর দেখে আরও একবার নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে হারু। একখানা ভাঙার চেষ্টায় হাতের শেষ ঢিলটি ফসকে গেলে অনেকটা যেন প্রতিবর্ত ক্রিয়ার মতো অস্ফুটে গালাগাল বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে, ‘ধুর শালা, এত উঁচুতে কেউ লাইট লাগায়!’
- গুলতি আনলে হয় না হারুদা?
- তোর যেমন বুদ্ধি! খোলার কাচখানা কি মোটকা দেখছিস? তার ওপরে আবার লোহার জালি, - গুলতির নুড়িতে আঁচড়ও ধরবে না।
- মেলা ফ্যাচাং হল দেখি! করবাটা কী?
- তিরধনুক লাগবে। কালুয়া, তোর দাদার কাছ থেকে ধনুক আর ক-খান মজবুত তির নিয়া আন দেখি। খাঁটি ইস্পাত যেন হয়। কাঁচা লোহা গছালে ওই তির তোদের দুই ভাইয়ের পোন্দে দিমু।
- ব্যবসার কী হবে?
- রাস্তার উপর ফ্যাটফ্যাটা আলো জ্বালায় রাখলে ব্যবসা হবে কচু। কোন্‍ হারামির মাথায় যে এই বুদ্ধি আইছিল!

চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক। পশ্চিমবঙ্গের মাথা থেকে পা আড়াআড়ি দু-ভাগ করে যাওয়া সড়কের এই অংশটা বাংলা-বিহার সীমান্ত। নামে জাতীয় সড়ক, তবে মোটে বারো-চোদ্দো হাত চওড়া। রাস্তার দুপাশে দুই রাজ্য, অঘটন কিছু ঘটলে দুই রাজ্যের পুলিশই একে-অপরের কাঁধে দায়িত্ব ঠেলতে চায়। - ব্যবসার পক্ষে আদর্শ পরিবেশ।
‘ব্যবসা’, - মানে ছিনতাই। ডাকাতি বললেও অত্যুক্তি হয় না। হারুই দলপতি। কাজের শুরুতে পুরো দলকে লুকিয়ে থাকতে হয় রাস্তার গা ঘেঁষে। আসা-যাওয়াকারী গাড়িগুলির ওপর নজর রাখে। দূর থেকেই বেছে নেয় ‘খদ্দের’। -ছোটোখাটো কোনও চার চাকার গাড়ি। ছোটো গাড়িতে দু-চারজনের বেশি সওয়ারি থাকে না, ঝামেলা কম। হারুদের দলের কয়েকজনের হাতে থাকে একটি কাঁঠালগাছের গুঁড়ি, ওজনে হালকা কিন্তু দারুণ শক্ত। কাজের পদ্ধতি বলতে - সেই গুঁড়ি রাস্তার মাঝবরাবর ফেলে কোনও ‘খদ্দের’ গাড়ির জন্য অপেক্ষা করা, আর গাড়ি ব্রেক কষলেই ব্যবসার শুরু।
ফরিদপুর থেকে এখানে খুঁটি গেড়েছিল হারুর বাপ। হারুর জন্মের আগে থেকেই সে রমানাথ চৌধুরীর জমিতে ভাগচাষি। তার বাপের মতো মানুষেরা সাধারণত ‘মরে’ না, ‘পচে মরে’। অথচ বাপটা মাত্র চারদিনের জ্বরে টুপ করে মরে গেল! সে জুটল চাষে। সয়ে এসেছিল, কিন্তু-!
তখন আশ্বিন মাস, গর্ভিণীসংক্রান্তির দিন ধানগাছের সাধভক্ষণ উৎসবের প্রস্তুতি চলছে সমস্ত চাষিবাড়িতে। উত্তরবাংলায় যার নাম ‘লখী ডাক’। ফরিদপুরের ভাষায় ওর বাপ বলত ‘গার্শীপরব’। ওর মা মৈমনসিংয়ের মেয়ে, তার মুখে যা আবার ‘গুমা দেওয়া’। খুনোখুনি, কাটাকাটি সবে থেমেছে, নতুন সরকার এসেছে বছরখানেক হল। সে বছর উৎসবের ঠিক আগের দিন ডাক পড়ে চৌধুরীবাড়িতে। চৌধুরীর চোখমুখ থমথমে, কীসব বর্গা-টর্গা হবে নাকি, - ‘ভূমি সংরক্ষণ’ না কী যেন এক আইন। চৌধুরী বলে, - সব জমি নাকি কেড়ে নেবে সরকার, ইচ্ছামতো লোক বসাবে! চাষির কপালে লবডঙ্কা। এর-ওর নামে নকল লেখাপড়া করেও কূল হচ্ছে না। চৌধুরীদের জমি-জিরেত সব যায় যায়।
জমিদারের বিপদ মানে চাষির বিপদ তার দশ গুণ। চৌধুরীদের এক ভাই আবার রাজনীতি করে। সে খবর পেয়েছে, - খুব শিগ্‌গির সরকারি বাবুরা মাপজোক, হিসেবনিকেশ করতে আসবেন। ভরসার কথা শোনায় রমানাথের ছোটোভাই ঊমানাথ। - দুঁদে উকিল। শহর থেকে আইনের ফাঁকফোকরের খোঁজ এনেছে। - এই নতুন আইনে সব চাষজমির বর্গা হলেও মাছের ভেড়ি আর লিচুবাগান তার নাগালের বাইরে। এই ফাঁক দিয়ে নাকি অনেক নাদুসনুদুস জমিদারি গলে যাচ্ছে! রাতারাতি লিচুবাগান তো আর তৈরি করা যায় না, তাই আল ভেঙে, জল ঢুকিয়ে ধানের জমিকে মাছের ভেড়ি সাজানো ছাড়া আর-কোনো উপায় নেই। কিন্তু, চাষ না পড়লে চাষি খাবে কী? চৌধুরীদের দয়ার শরীর। কথা দিলেন, ঝামেলা চুকলে সময়মতো বাড়ি-বাড়ি পৌঁছে যাবে খোরাকি। চাপা গুঞ্জন কিছু উঠলেও গাঁয়ে-গঞ্জে তখনও কর্তার ইচ্ছেই কর্ম। প্রথমবার কোনও উৎসব অনুষ্ঠান ছাড়াই হ্যাজাক জ্বলে, জেনারেটর লাগিয়ে জ্বলে হ্যালোজেনের লাইটও। খেতের রং তখনও সবুজ। নরম ধানের ভেতরে সবে তখন দুধের দেখা মিলেছে। বুকে পাথর রেখে কয়েকশো ভাগচাষি কাস্তে চালাতে শুরু করে। দেখতে দেখতেই শূন্য হয় খেত।... গর্ভিণীসংক্রান্তির রাতেই গর্ভপাত, - চোখের জলে চাষিবউদের বুক ভেসে যায়।
টানা দু-দিন পাম্প চালিয়ে জল থইথই জমিতে ছাড়া হল শ-খানেক জিওলমাছ আর হাজারখানেক তেলাপিয়া, তেলাপিয়ার চারা। কিন্তু যত সহজ ভাবা হয়েছিল, সরকারি হিসেবনিকেশ অত সহজে মিটল না। অগভীর জলে দু-চারটে মাছের আঁশ দেখে ঠান্ডা হলেন না বাবুরা। বড়ো দাঁও হাঁকলেন। দরে না পোষানোয় তেনারা ‘রিপোর্ট’ দিলেন, চৌধুরী গেল আদালতে।

জমিই হোক কি মানুষ, রাতারাতি বেশ বদলালেই কি তার জাত বদলায়? লাঙল-ধরা হাতে জাল ছুঁড়ে জুত হয় না, অগভীর জলে মাছের বাড়ও নেই। বাজারে বসলে আবার জেলেপাড়ার লোকেরা ঝামেলা পাকায়। এদিকে চেয়েচিন্তে আর চলে ক-দিন? ওদিকে ভাসা-ভাসা খবর, - চৌধুরীরা নাকি আদালতে টাকা খাইয়ে জমি বেচার দালাল ছেড়েছে! - বড়োই ফাঁপড়ে পড়ে হারুর দলবল। পেটের দায়ে কেউ শহরে ছোটে, কেউ হয় দিনমজুর।
হারু আর ভাদু, - স্বামী-স্ত্রীতে কাজ নেয় ইটভাঁটায়। হাজিরা দিয়েই রোজ খানতিনেক তালপাতা জুটিয়ে ছাওনি বানায় ভাঁটার পাশে, - তার মধ্যে ছেঁড়া ত্রিপল আর কাঁথার বিছানায় শুয়ে বংশী হাত-পা নাড়ে। আর তার বাপ মাটি কোপায়, মা মাথায় ঝুড়ি নিয়ে ঠেলাগাড়িতে সেই মাটি তোলে। বংশীর খুনখুন শব্দে বা নোংরা করে ফেলা কাঁথার গন্ধে কুকুর এসে জুটলেই কোদাল হাতে রে রে ‍করে তেড়ে যায় হারু। ভাদু তার দুধের সন্তানকে বুকে তুলে পিঠে কয়েকটা আদরের থাবা দেয়।
ভাঁটা-মালিক খিস্তি হাঁকে। বংশীর মা-বাপ ছেলেকে ছেড়ে আবার খাদানে নামে। ওরা জানে ভাঁটা-মালিক ভাত ছেটালে কাকের অভাব হবে না। প্রয়োজনের তুলনায় তখন মজুরের জোগান এমনিতেই বেশি। মজুরি যতই যৎসামান্য হোক, মুখ বুজে কাজ করতে হবে।
কঞ্চির বেড়ার গায়ে মাটি লেপা দেওয়ালের ঘর, খড়ের চালের ফাঁকে কোজাগরী চাঁদ ওঠে আকাশে। ওদের দুজনের দিনের শেষে আধপেটা খেয়ে শুয়ে থাকা। স্বপ্ন দেখা, - খুব তাড়াতাড়িই আইনের জট খুলবে হয়তো, হয়তো জমি বেচার খবরটা ভুয়ো, হয়তো পরের মরশুমেই আবার পড়বে লাঙল, হয়তো-।
রাতের বেলায় অঘোরে ঘুমায় বংশী। ওর মা, স্বামীসোহাগিনী ভাদু চোখ বুজে শুয়ে থাকে। কানের লতি, চুল, নরম বুকে আদর করে তার মরদ, - বল দেখি, ‘পঁই দিলু পঁই হাত, কোন পাখির পোন্দে দাঁত’?
ভাদু খিলখিলিয়ে হাসে, ‘মুই কী জানি!’
- ছেমরি, এটাও জানিস না! বোলতা রে, বোলতা।...

হারুর মা রাতকানা মানুষ। সেই সাতসকালে ওরা দুজন কাজে বেরোনোর সময় একথালা ভাত পায় বুড়ি। তারপর চুপচাপ বসে থাকে। পেটের খিদে আর পেচ্ছাপ-বাহ্যি ছাড়া তার শরীরে কোনও বোধ নেই। বেলা পড়লে খিদের জ্বালায় ইনিয়েবিনিয়ে কাঁদে, ‘ও বউ, দুটো ভাত দে না রে, ও বউ...’
হারু আর ভাদুর যখন ঘরে ফেরার ফুরসত হয়, তখন আকাশের আলো নিভন্ত। ততক্ষণে এক-একদিন বুড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। - খটখটে শুকনো জিভ। জলটুকু জোটে, রাতে খাবার জোটে না রোজ। ভাঁটার কাজে সত্যিই ঘর চলে না। কোন পথে যে বাড়তি দুটি টাকার আমদানি হয়? – হারুদের কোদালের প্রতিটি কোপের সাথে সে প্রশ্নও মাটির বুকে আছড়ে পড়তে থাকে।
শ্যামলাল খোঁজ আনে, - তেঁতুলের কাঠে নাকি দারুণ পয়সা। আধুনিক প্লাস্টিক বা ফাইবারের দিন তখনও আসে নি। বজবজ আর ট্যাংরার কারখানাগুলিতে মেয়েদের ফ্যান্সি জুতোর হিল বানাতে তেঁতুলকাঠ ছাড়া গতি নেই। - এই তেঁতুলকাঠ তাদের রোজগারের নতুন পন্থা।
জাতীয় সড়কের ওপারে জঙ্গল। এই জঙ্গল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের আওতায়। ঝুঁকি আছে। তবে একটা গাছ বেচে যা থাকে, - ভাঁটার চার রোজের সমান। হারু, শ্যামলাল, নরেন, রফিক, হায়দার, - সবাই রোজ রাতে জঙ্গলে যেতে শুরু করে। রাত তিনটে, সাড়ে তিনটে অবধি কুড়ুল-করাত হাতে চলে গাছ কাটা। ভোরের আলো ফোটার আগেই ম্যাটাডোর নিয়ে হাজির হয় পাইকার নন্দ বিশ্বাসের লোক। - নগদ টাকার কারবার।
গাছ কাটার খবর পৌঁছে যায় জঙ্গলের রেঞ্জারসাহেবের অফিসে। কিছুদিন পর থেকেই আলো নিভিয়ে টহলদারি গাড়ি ঘুরতে শুরু করে জঙ্গলে। রাস্তার গাড়ির জন্য টহলদারির আওয়াজও টের পাওয়া যায় না সবসময়। প্রায়ই খালি হাতে ফিরতে হয়। তেমনই এক রাতে ওরা বসেছিল জাতীয় সড়কের ধারে। পরপর কয়েকদিন কাজ হয়নি। হঠাৎ খেপে ওঠে হায়দার, ‘খেতে জমিদার, জঙ্গলে রেঞ্জার, - যেখানে বাবু, সেখানেই পেটে গামছা! চুলায় যাক শালা, আজ থেকে রাস্তাতেই রোজগার করব, দেখি কোন শালা আটকায়!‍’
দূরে একটি গাড়ির আলো দেখা যায়। হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে হায়দার। পেটের আগুনে তার চোখও তখন জ্বলছে, হাতে উদ্ধত কুড়ুল! প্রচণ্ড শব্দ করে গাড়িটি থামতেই কুড়ুলের ঘায়ে গাড়ির সামনের কাচখানা ভেঙে দেয়। সওয়ারি লোকগুলি প্রাণের ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। ওদের মনে কোনও ভয়ডর নেই তখন। মুছে গিয়েছে যাবতীয় সংস্কার আর সংশয়ের অস্তিত্ব।
- মালকড়ি যা আছে সব বার করেন।...
নতুন ধান্দার হাল-হকিকত কানে যেতেই ভাদু বেঁকে বসে। প্রয়োজনে সে পাঁচটাকা রোজের ইটভাঁটায় কাজে লাগতেও রাজি। কিন্তু, চুরি-ডাকাতির ভাত তার মুখে রুচবে না। কিছুতেই বুঝতে চায় না – হারুদের অন্য কোনও পথ তখন নেই। প্রথমে অনুনয়, তারপর ঝগড়াঝাঁটি, শেষে একদিন রাগের মাথায় গায়ে হাত তুলে ফ্যালে।
আঘাতটা গালের থেকেও মনে বেশি লেগেছিল। ছেলে কোলে ভাদু চলে যায় তার নিরাবরণ প্রকৃতির দেশে। অনেক সাধ্যসাধনাতেও ফিরে আসেনি।
‘ভালোই হয়েছে।’ – ও নিজেকে বোঝায়। ভাদু বোধহয় আবার ঝুমুরের দলে ভিড়েছে। হয়তো অনেক নামডাক হয়েছে তার, – দিল্লি, বোম্বাই, গৌহাটি, জয়পুর, - কত দেশে হয়তো গান শোনাতে যায়! এক অখ্যাত ডাকাতের বউ হওয়ার সাথে এর তুলনাই হয় না। তবু মাঝে মাঝেই তার কথা মনে পড়ে। ছেলেটার মুখখানা মনে ভেসে উঠলে বুক টাটায়। - দুজনে কতই না আদর করে তার নাম রেখেছিল ‘বংশীধারী’।

মাত্র ষোলো বছর বয়সে ভাদু বউ হয়ে ওর ঘরে আসে। পান্ডুয়ার বাইশ হাজারির মেলায় তাকে প্রথমবার দ্যাখে হারু। মালদার গাজোল এলাকার পান্ডুয়া গ্রামে। - জেলাসদর থেকে প্রায় নয়-দশ মাইল দূরে রায়গঞ্জের পথে জাতীয় সড়কের একপাশে এই গ্রাম। পান্ডুয়ার প্রাচীন ইতিহাস হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ - নানা ধর্ম ও সংস্কৃতিতে লালিতপালিত। মধ্যযুগে যে সুফি-পিরেরা এই মাটিতে ইসলামধর্মের বীজ ছড়িয়েছিল, জালালুদ্দিন তবরেজি তাদের একজন। সুদূর পারস্যের তাবরেজ থেকে এসে আস্তানা নিয়েছিল এই পান্ডুয়াতে। তার নামে এ জায়গার নাম হয় হজরত-পান্ডুয়া। জালালুদ্দিন তার যাবতীয় সম্পত্তি মানুষের সেবায় দান করে যায়। খুব সম্ভব, সে কালে সেই সম্পত্তির দাম ছিল বাইশ হাজার টাকা। সেই থেকে নাম ‘বাইশ হাজারির মেলা’। আবার অনেকে বলে, ইসলামি রজব মাসের বাইশ তারিখে নাকি তবরেজি সাহেবের মৃত্যু হয়। প্রতিবছর সেই দিন হাজার হাজার ভক্ত এসে উপস্থিত হয় তার নামে দরগায় সিন্নি চড়াতে। - সেই থেকে মেলার অমন নামকরণ।
মেলার বয়স নেহাত কম না। - সে প্রায় সাত-আটশো বছরের কথা! আগে বাইশ দিন ধরে হত নাকি, কমতে কমতে তখন মাত্র পাঁচ দিনের। গাঁয়ের মেলা, - গেঁয়ো লোকেরই ভিড় বেশি। মালদা, দিনাজপুর, পূর্ণিয়া, কাটিহারের ব্যাপারীদের হরেক পসরা। নাগরদোলা, চরকিদোলা, ফেমাস ইন্ডিয়ান সার্কাসের লাল-সাদা তাঁবু। অনামী জাদুকরের ‘অলৌকিক ইন্দ্রজাল’, - পলক ফেলতে নীল রুমাল হলুদ হয়ে যায়! এসেছে শিলিগুড়ি, ময়নাগুড়ি, আলিপুরদুয়ার আর রায়গঞ্জের নাচুনির দল। - দু-টাকার টিকিটে পাঁচখানা নাচ।
তবে সেইবার নতুন একখানা ব্যাপার হয়েছিল বটে, - সরকারি তাঁবুতে এসেছিল ছোটোনাগপুরের গায়েনের দল। ইয়ারবন্ধুদের সাথে গিয়েছিল হারু। ভাদুর সে কী গান, – ‘ঝিরি ঝিরি নদীয়া... পাতাল শীতল পানিয়া... মিটি মিটি শ্যামের ভরত গাগরিয়া...’
গা শিরশিরিয়ে ওঠে। পরদিন সকাল সকাল আবার যাওয়া মেলায়, - এবার একা। তখন পুকুরে স্নান করতে নেমেছে ভাদু। হারুকে দেখে হঠাৎ আঁজলা ভরে জল ছিটিয়ে দেয়,- ‘উপরে ডুংরিয়া, নীচে পুখুরিয়া... ডর লাগে ম’কে ভরতে গাগরিয়া...’ – ছোটোনাগপুরের পাহাড়কন্যার গড়্যাইনা গান। ডুংরি মানে পাহাড়। জঙ্গলে জঙ্গলে ফল, মূল, মধু সংগ্রহ করে ভাদুর বাপ-ভাইরা, খেজুরপাতার চাটাই বোনে। মেয়েরা দল বেঁধে গান গায়, - ঝুমুর, টুসু, ভাদু, আবাইদা, গড়্যাইনা। গানের নামেই তো হারুর বউয়ের নাম।
একে মেলা-মচ্ছবে গান গেয়ে বেড়ায়, তার ওপর কুচকুচে কালো রং, - বলাই বাহুল্য, হারুর মায়ের পছন্দ হয়নি ভাদুকে। ভাতের সাথে খেসারির ডাল, ছ্যাঁচড়া, বেগুনভাজা, শুয়োরের মাংস আর মন্ডা ছাড়া বরযাত্রীদের কিছু খাওয়াতে পারেনি ভাদুর দাদারা।
গোটা চারেক চুড়ি, একটি ফিনফিনে হার, ঝুটা পাথরের আংটি, - সব রূপোর। বধূবরণের সময়ও গজগজানি থামে না বুড়ির, ‘রূপের কী বাহার গো, – একে বিড়াল কালো, তায় গাঙ সাঁতরে এল! কথায় বলে যোবনকালে মাদি শুয়োরও সুন্দর লাগে, কিন্তু তা বলে এই? - এক্কেবারে ভরামবলি? আর তেমন কিপ্টা তার দুই দাদা, - এককুচি সোনা অবধি শুঁকায়নি গো! রাক্ষসীটা নিশ্চয়ই বাণ মেরেছে। নেহাত সেই অলক্ষুণে মেলায় ছেলে সিঁদুর ঘষে দিয়েছিল, না হলে কি আর-!’

দেখতে দেখতে কেটে গেল বেশ কিছু বছর। পুলিশের উৎপাত খুব বেড়েছে সেসময়। আগে দু-আনা চার আনা ভাগেই তারা ঠান্ডা হত, সেদিন এখন আর নেই। ক্লাব, পঞ্চায়েত, পার্টি অফিসও পাওনাগন্ডা বুঝে নিতে ছাড়ে না। তার ওপরে খুব সমস্যা হয়েছে নতুন এস.পি.-কে নিয়ে। কড়া ধাতের লোক, এলাকায় কোনও গোলমাল বরদাস্ত করেন না। নেহাত নীচুমহলে এখনও হুকুমখাতিরের চল আছে তাই রক্ষে, নইলে দলের সবাইকে জেলের ঘানি টানতে হত!
শিলিগুড়ি থেকে একটা পিস্তল কিনেছে হারু, দারুণ কাজ দেয়। - দেখে বা আওয়াজ শুনে কে বলবে নকল?... একদিন লাঙল ছেড়ে জাল ধরেছিল। তারপর জাল ছেড়ে কোদাল, কোদাল ছেড়ে কুড়ুলও। - পরিস্থিতি বাধ্য করেছিল। কুড়ুল ছেড়ে নকল পিস্তল ধরা যেন সেই সর্বগ্রাসী পরিস্থিতির মুখে পালটা জবাব।
চল্লিশের শেষ কোঠায় দাঁড়ানো হারুর শরীরে এত ঝক্কি পোষায় না। এখন সামান্য হলেও নিজের কাঠা-কয়েক জমিজমা কিছু হয়েছে, ফুলচাষ আর নার্সারি বসালে হয়তো ভালোভাবেই সংসার চলে যেত। কিন্তু, দলের লোকেরা ছাড়লে তো, - হারু নাকি খুব পয়া! ব্যবসার রমরমার সময়েও ও না গেলে ‘খদ্দের’ জুটত না, জুটলেও দেখা যেত হয় সে খদ্দেরের ট্যাঁকের মাপ পাঁচসিকে, নয়তো গয়নাগুলি সব ঝুটা সোনার! একদিন তো বি.এস.এফ.-এর গাড়িকেই থামাতে গিয়েছিল কালুয়া, - শেষে গুলি খেয়ে মরে আর কি! মোটামুটি সেদিন থেকে দলের অঘোষিত নিয়ম হয়ে যায়, - হারু না থাকলে ব্যবসা বন্ধ।
হারুর মায়ের যেদিন শ্বাস ওঠে, আটচাকার পাঞ্জাব ট্রাকের নীচে পড়েছিল হায়দার। রাস্তা থেকে বেলচা দিয়ে চেঁছে তুলতে হয়েছিল তার শরীর।
হায়দারের হঠাৎ মৃত্যুতে অকূল দরিয়ায় পড়ে তার বিবি রাহেলা। রাহেলার ছেলে তখন নিতান্তই শিশু। চারপাশে যারা – তাদের নিজেদেরই রোজ দু-বেলা পাত পড়ে কি না সন্দেহ। তবু চেয়েচিন্তে কয়েকদিন চলল। কিন্তু ওই দিনকয়েকই।
নরেন, রফিক, শ্যামলালরা সেদিন হারুর কথা শুনে তাজ্জব।-
- তওবা তওবা! বলো কী, রাহেলা-রে তুমি নিকা করবা, - সেইটা ক্যামনে হয়?
- তা ছাড়া তো উপায় দেখি না রে রফিক। হায়দার আমাদের লোক, চোখের সামনে তার পরিবার-
- সবাই মিলে দিয়ে-থুয়ে যদি-?
- সে আর কয়দিন? দিনের পর দিন মরা সোয়ামির ইয়ারবন্ধুর টাকায় তার সংসার চললে গাঁয়ে বদনাম কেমন রটবে – সেইটা ভেবেছিস? মান, ইজ্জত বাঁচবে? আর চিরকাল তারে পাহারাই বা দিবে কে?
রফিক মাথা নাড়ে, ‘তবু হারুদা, সব বুঝলেও মন সায় দেয় না। সমাজ বলে তো কিছু আছে-?’
- তুই-আমি মিলেই আমাদের সমাজ। বাদবাকি যারা, তারা কি আমাদের খাওয়াবে-পরাবে? শরীলের ডাকে তো আর নিকেয় মাতছি না! তুই শালা নামেই মোসলমান। ধম্মে চার নিকে জায়েজ কেন – সে খবর রাখিস? পয়গম্বরের কালে চারদিকে কেমন যুদ্ধ বেঁধেছিল মনে করে দেখ। হাজারে হাজারে মানুষ মরত। চারখানা নিকে জায়েজ না হলে যারা মরত তাদের বউ, মেয়ে, বোনেরা সব যেত কোথায় বল দেখি? কেউ তাদের ইজ্জত-আব্রু, খাওয়া-পরা দেখত কী করে?
- সে যুগ আর এ যুগ এক হল?
- এখুন আমরা যা করছি, তা যুদ্ধের থেকে কম কিছু না রে ভাই।
রফিকের মনের কিন্তু তখনও যায়নি, ‘তুমি যে হিন্দু-!’
- দরকারে মুসলমান হব।... জাতের বিচারে যাস না। এইটা ভুলিস না রে ভাই, মানুষের জাত মাত্র দুই, বড়োলোক আর গরিব, - আশরাফ আর আতরাফ। হায়দারের বউয়ের ভার যদি তুই নিতে চাস, তা’লে তুই তারে নিকে কর। আটকাইবে কোন শালায়?
রফিক জানে তা সম্ভব নয়। - এক বিবিকেই খাওয়াতে-পরাতে তার কালঘাম ছুটছে! কিন্তু, ভেবে দিশা পায় না, – হারুর কাজখানা সওয়াব হবে নাকি গুনাহ্, পুণ্য হবে নাকি পাপ। ভাবনা হয়, হায়দারের বউ জাত খুইয়ে মুরতাদ হবে না তো? কিন্তু, আযাব বা দুর্যোগের দিনে সে বিচার কি মানা হয়? কে জানে, হয়তো সবকিছুই আল্লাহের এলহাম! – এইসব বিচার আলেমরা করুক, ও নিজে তার বন্ধুর নিয়তে কোনও খাদ পায়নি।
কিন্তু, সেদিন সওয়াব হয়ে থাকুক বা গুনাহ্, কড়া বাস্তব হল, রাহেলার সাথে হারুর বিয়ের প্রায় দশ বছর পরেও ওদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। - গড়ে ওঠার কথাও হয়তো ছিল না। আসলে, ভাদুর মতো রাহেলাও হারুদের এই পেশাটিকে কোনোদিন মানতে পারেনি। উপায় ছিল না, তাই কোনোমতে পড়ে থেকেছে শুধু। তার ও হায়দারের বড়ো ছেলে ইউনানি চিকিৎসা পড়তে কেরালায় যাওয়ার কথা ঠিক হওয়ার পর থেকে সে যেন ঝাড়া হাত-পা। ছোটো ছেলেটি ইশকুলের গণ্ডি ডিঙোয়নি এখনও।
পাকা দেওয়াল আর অ্যাসবেস্টস ছাওয়া দুটি ঘর, কালো সিমেন্টের মেঝে। বছর দশেক আগে মাটির মেঝে ফুঁড়ে সাপ ঢুকেছিল ঘরে, এখন ঘুলঘুলি বেয়ে ঢুকেছে টিভির তার। রাহেলা টিভিতেই মগ্ন। সারাদিন সিরিয়াল আর সিনেমা, - বাংলা থেকে হিন্দি, হিন্দি থেকে বাংলা। রান্নাঘরের দেওয়াল মাটির, টালির ছাদ। বাইরের দেওয়াল বেয়ে লাউগাছ উঠেছে ছাদে। ‘ব্যবসা’ সেরে বাড়ি ফিরে নিজের ভাত নিজেকেই বাড়তে হয়। ঠান্ডা কড়কড়ে ভাত প্রায়ই বিস্বাদ লাগে মুখে। রাহেলা এমনই, - তার কৃতজ্ঞতা আছে, আন্তরিকতা নেই। এমনকী তার ছেলে যে কেরালায় লেখাপড়া শিখতে গিয়েছে, – সে খবরটুকুও সে নিজের মুখে বলেনি কোনোদিন। মানি-অর্ডারের রসিদ দেখে হারু জেনেছিল। তাও সেটুকুই, এর বেশি জানার অধিকার বা এক্তিয়ার – কোনোটিই ওর নেই। অলঙ্ঘনীয় এক দেওয়াল মাঝে থেকেই গেছে।
হারুর মনের এক কোণে থেকে গেছে ভাদু। আর বংশী, ওর সন্তান? বিয়ের অত বছর পর বংশীর জন্ম, বাপ হয়ে হারুর খুশির শেষ ছিল না। কিন্তু, আজকে ছেলের জন্য টান কিছুটা পাতলা। - উপলব্ধি করে নিজেকে মনে মনে গালি দেয় হারু। নিজের ছেলে বলে কথা, নিজের রক্ত-!
আসলে, পুরুষের বাৎসল্যের রং নারীর চেয়ে ভিন্ন। নারী গর্ভধারণেই ‘মা’ হতে শুরু করে। দশমাস কাটতে কাটতে পুরোপুরি মা হয়ে যায়। শুনতে যতই খারাপ লাগুক, পুরুষ ‘বাপ’ হয় বাপ হওয়ার কিছুদিন পরে। সন্তান যতদিন শুধুই তার মাকে জড়িয়ে থাকে, বাপের বাৎসল্য তখনও তেমন দানা বাঁধে না। সন্তান তার বাপকে চিনে হাসা ধরলে বাপের মনেও রস ধীরে ধীরে গাঢ় হয়। - তার আগে যা থাকে সেটা রক্তের টান বা মায়া হতে পারে, ঠিক বাৎসল্য নয়।
দূরের চাষজমি থেকে ‘হুদুম দেও’ পরবের গান ভেসে আসছে। - এ এক পুরুষবর্জিত উৎসব, লাঙল পড়ার আগে মাটিকে কামিনী করে তোলার পরব। মাঝরাতে উন্মুক্ত চাষের খেতে চাষিবাড়ির মেয়েরা সম্পূর্ণ আবরণহীন হয়ে নাচগান করে। মাটি আর মানুষ আলাদা থাকে না তখন। সাধেই কি মাটির সাথে চাষির এমন আত্মিক সম্পর্ক! মাটি যে তার ঘরের মেয়ে, যার কামনা-বাসনা আছে, যে হাসে, কাঁদে। বীজ ধারণ করে সন্তানবতী হয়।
উঠে আসা দীর্ঘশ্বাসকে বুকের মধ্যেই পোষ মানায় হারু। ধানজমির সোঁদা মাটি নয়, এই চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়কের পিচ-পাথর আজ ঘোর বাস্তব।
নিখুঁত নিশানায় স্ট্রিটল্যাম্পের ভবলীলা সাঙ্গ, - দুটির বেশি তির খরচা হয়নি। রাস্তার এই মোড় এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। গাড়ির আলো দেখা যেতেই শ্যামলাল আর কালুয়া নিয়মমতো রাস্তার মাঝবরাবর ফেলে দেয় কাঁঠালগাছের গুঁড়ি। কিন্তু, ড্রাইভারের চোখে পড়ে না। আচমকা ঝটকায় শূন্যে পালটি খেয়ে কিছুদূর ছিটকে যায় গাড়িটি, সজোর ধাক্কা লাগে রাস্তার পাশের নিমগাছে। ওরা ভ্যাবাচাকা খেয়ে গিয়েছিল। এতগুলি বছরে এমন দুর্ঘটনা হয়নি কখনও। উলটে যাওয়া গাড়ির চাকাগুলি তখনও ঘুরছে, একছুটে ওরা সেদিকে পৌঁছোয়।
যেভাবে তুবড়েছে, - সওয়ারি কারও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব কম। রক্তমাখা আঁচলের কিছুটা চোখে পড়ে শুধু। ড্রাইভারের পেটে স্টিয়ারিংয়ের রড! - শেষ নিঃশ্বাস শুধু পড়তে বাকি।
‘সব্বোনাশ করেছে!’ চেঁচিয়ে ওঠে শ্যামলাল, ‘জলদি পালা-।’
‘পালাব কেন?’ – পালটা ধমক লাগায় হারু।
- আরে, এখানে দাঁড়ায় থেকি মার্ডার কেস খাইতে চাও নাকি! ব্যাগ-ট্যাগগুলান ‘ইস্‌পটে’ না থাকলে ডাকাতির তদন্ত হইতে পারে। ওইসব আর লইয়া কাম নাই, চুপচাপ কাইটা পড়ি, - লোকে ভাবব এক্সিডেন্ট।
- মানুষগুলারে হাসপাতালে পৌঁছাতে লাগবে না? -আহাম্মক!
- অহন আপনে বাঁচলে বাপের নাম। আরে, মরা মানুষরে হাসপাতালে লইয়া করবা কী?
- কে বলেছে মরা? – তুই ডাক্তার না গণকঠাকুর!
দলের মধ্যে তর্ক বেঁধে যায়। কাঁঠালগাছের গুঁড়ি সমেত ওরা পালিয়ে এলে সত্যিই কেউ ওদের টিকিরও নাগাল পেত না। কিন্তু... কপালের দোষে ডাকাত হলেও শরীরে এখনও চাষার রক্ত কি না, শেষমেষ মানুষগুলিকে বেঘোরে মরার জন্য রেখে আসতে পারে না।
সে রাতে বাড়ি ঢোকার মুখে টিভির শব্দ আসে না। হারু প্রমাদ গোনে। ঘরে ঢুকতেই রাহেলার মুখোমুখি-
- ষোলো আনা পূর্ণ হইল তো এইবার! ভাবছিলেন কী আপনেরা? – খুন কইরা হাসপাতালে লাশ ফালাইয়া আইবেন, আর কাকপক্ষীতেও টের পাইব না!
হারু চমকে যায়- তুমি কোইথেকে জানলা?
- পুলিশ আইছিল খবর লইতে। ঘরদোর সব তছনছ কইরা গ্যাছে। সালাম দিতে যাইতে কইছে থানায়।
- কিন্তু বিশ্বাস করো, আমরা কাওরে মারি নাই!
- আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কাম নাই। ডাকাইতের বিবির কথা কুন আহাম্মকে মানবে?... দ্যাখেন, আপনেরা খুন করছেন কি করেন নাই – তা জানতি চাই না। কিন্তু, পোলাডার কাঁচা বয়স, এই খুনাখুনির ছোঁয়া কিছুতেই তার গায়ে লাগাইতে দিমু না। এইবার বলেন, - আমি তারে লইয়া ঘর ছাড়ুম, নাকি আপনে পালাইবেন?
রফিক আর শ্যামলাল ধরা পড়ে। মারের চোটে শ্যামলালের একটা চোখ নাকি কানা করে দিয়েছে ওরা! গত তিনমাস ধরে ক্রমাগত ছুটে চলেছে নরেন আর হারু। কুড়িয়েবাড়িয়ে টাকাপয়সা যা এনেছিল, – এখন শেষের মুখে। খুব শিগ্‌গির কিছু একটা উপায় না করতে পারলে খুব মুশকিল। ওরা এখন উড়িষ্যায়, - নরেন তার বড়ো সম্বন্ধীর শ্বশুরবাড়িতে কয়েকদিন হল উঠেছে। বাড়ির লোকের মতিগতি সুবিধের নয়, আজ রাতেই পালাতে হবে। কিন্তু, আর কতদিন পালাবে? কতবার পালাবে এক পরিচয় থেকে অন্য পরিচয়ে! আর কতবার ওপড়াবে শিকড়!
সাবধানের মার নেই। - নরেনের কুটুমবাড়িতে বলে এসেছে পুরী যাওয়ার কথা, জলেশ্বর থেকে ট্রেন বদলে ওরা নীলাচল এক্সপ্রসে চড়ে বসে। - একবার দিল্লি পৌঁছে গেলে আর কেউ খুঁজে পাবে না। অত বড়ো শহর, - মানুষ নিজেকেই খুঁজে পায় না সেখানে!
কামরার ঠাসাঠাসি ভিড় একটু পাতলা হয়েছে। পা-টুকু সোজা করার উপায় ছিল না এতক্ষণ। সেই সাতসকালে দুটি মুড়ি খেয়ে বেরোনো, দুপুরে একবার চা-শিঙারা ছাড়া পেটে কিছু পড়েনি। ট্রেন বোকারো ছেড়েছে কিছুক্ষণ আগে। এখন রাত প্রায় বারোটা। খিদের চোটে নাড়িভুঁড়ি গুলিয়ে ওঠার জোগাড়! পরের স্টেশনে ট্রেন ঢুকতেই নরেন উঠে দাঁড়ায়, ‘দশটা টাকা দাও দেখি, দেখি খাবারদাবার কিছু জুটে কি না।’
হারু একটু-আধটু হিন্দি পড়তে জানত, জানালা দিয়ে স্টেশনের নাম দেখে, - চন্দ্রপুরা জংশন। এত রাতে প্রায় কিছুই খোলা নেই, দু-একটা চায়ের দোকান ছাড়া। - তারই একটায় হাতরুটি সেঁকা চলছে, ট্রেন থেকে নেমে নরেন সেদিকে এগিয়ে যায়। প্রথমে খেয়াল হয়নি, - স্টেশনেই বসে ছিল দুজন ষন্ডামতো লোক। নরেনকে নামতে দেখেই তাদের একজন বুকপকেট থেকে কী একটা কাগজ বের করে দেখে নেয়। চোখের ইশারা করে অন্যজনকে। দুজন দুদিক থেকে বেড়ালের মতো এগিয়ে যায় চায়ের দোকানের দিকে। পেছন থেকে আচমকা চেপে ধরে নরেনের কলার!
ব্যাপারটা বুঝতে হারুর একটুও দেরি হয় না। উলটোদিকের দরজা দিয়ে নেমে পড়ে দুটি প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে। ট্রেনের গা ঘেঁষে প্রথমে ধীর পায়ে মিলিয়ে যায় অন্ধকারে, আবার ছুট লাগায়।
একদিকে ঝুমুরিয়া, রসিক গায়ক আর নাচনির দল, অন্যদিকে ঢুলি, ঢাকি, নাগরাই আর সানাইয়ের বাজনদাররা। গায়ক আর নাচনিরা হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে। বাজনদাররা ধুমুল বাজিয়ে বাজিয়ে আর হাতছানি দিয়ে লোক ডাকতে ব্যস্ত। - ‘আজ ইখানেই লাচ হবেক বটে!’
হারুর দেশের মতো নরম মাটির দেশ এ নয়। - কচ্ছপের খোলের মতো, গন্ডারের খড়্গের মতো, নারকেলের খোলের মতো পাহাড় আর পাহাড়। কোথাও একটু সমতল, কোথাও গুহা, কোথাও বড়ো বড়ো পাথরের বুকে দুধের মতো জলের ভাণ্ডার। সেই জল পাথরের খাঁজ বেয়ে নদী হয়ে নেমে এসেছে মাটির বুকে। তেমনই এক নদী, - চাটুহাঁসা। এখন গ্রীষ্মকাল, - হাঁটু অবধিও ডোবে না! কিন্তু শাল, সেগুন, আবলুস, মহুয়া, পিয়ালের এ দেশ চিরসবুজ। জঙ্গলে হরিণ, খরগোশ, বনমুরগির দল।
তবে দেখে বোঝা যায়, একটু একটু করে শহরের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। নতুন বাড়িঘর উঠেছে অনেক। কেলাব-ঘর, নতুন নতুন দোকানপাট। পথঘাটও অচেনা ঠেকে। সূর্য পশ্চিমে হেলেছে, ধুমুলের বোলে একটু একটু করে ভিড় জমাতে শুরু করেছে ওরা, - ভূমিজ, খারিয়া, কুর্ম্মা...।
রেললাইনের পাথরের ওপর দৌড়োতে গিয়ে চোট লেগেছে পায়ে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এক পথচলতি বুড়োর দিকে এগিয়ে যায় হারু।

- কালাচাঁদ মাহাতোর ঘর কুনদিকে গো?
...যার বিটি গানবাজনায় খুব নাম করেছিল এককালে!...


279 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: দ

Re: চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক (গল্প)

ভালই লাগল।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন