কুশান গুপ্ত RSS feed

নাম পরিবর্তন করি, এফিডেফিট বিনা।আসল নামে হাজার হাজার ডক্টর হাজরা আছেন, কে প্রথম জানা নেই, কে দ্বিতীয়, কে অদ্বিতীয়, এ ব্যাপারে ধারণা অস্বচ্ছ। অধমের ব্লগ অত্যন্ত ইনকনসিস্টেন্ট,কিছু বা খাপছাড়া, খানিকটা বারোভাজা ধরণের। কিন্তু গম্ভীর নিবন্ধের পর ক্লান্তি আসে, তখন কবিতা, তারপর ঘুম, ক্লান্তি ও নস্টালজিয়া। কোনো গন্তব্য নেই, তবু হাঁটতে হয় যেমন। একসময় অবকাশ ছিল অখন্ড, নিষিদ্ধ তামাশা লয়ে রংদার সমকাল চোখ মারিত। আজকাল আর মনেও হয় না, এ জীবন লইয়া কি করিব? আপনাদের হয়?

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বদল
    ছাত্র হয়ে অ্যামেরিকায় পড়তে যারা আসে - আমি মূলতঃ ছেলেদের কথাই বলছি - তাদের জীবনের মোটামুটি একটা নিশ্চিত গতিপথ আছে। মানে ছিল। আজ থেকে কুড়ি-বাইশ বছর বা তার আগে। যেমন ধরুন, পড়তে এল তো - এসে প্রথম প্রথম একেবারে দিশেহারা অবস্থা হত। হবে না-ই বা কেন? এতদিন অব্দি ...
  • নাদির
    "ইনসাইড আস দেয়ার ইজ সামথিং দ্যাট হ্যাজ নো নেম,দ্যাট সামথিং ইজ হোয়াট উই আর।"― হোসে সারামাগো, ব্লাইন্ডনেস***হেলেন-...
  • জিয়াগঞ্জের ঘটনাঃ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতা
    আসামে এনার্সি কেসে লাথ খেয়েছে। একমাত্র দালাল ছাড়া গরিষ্ঠ বাঙালী এনার্সি চাই না। এসব বুঝে, জিয়াগঞ্জ নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছিল। যাই হোক করে ঘটনাটি থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেই হবে। মেরুকরনের রাজনীতিই এদের ভোট কৌশল। ঐক্যবদ্ধ বাঙালী জাতিকে হিন্দু মুসলমানে ভাগ করা ...
  • অরফ্যানগঞ্জ
    পায়ের নিচে মাটি তোলপাড় হচ্ছিল প্রফুল্লর— ভূমিকম্পর মত। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেন কেউ আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে— সেই প্রচণ্ড কাঁপুনিতে ফাটল ধরছে পথঘাট, দোকানবাজার, বহুতলে। পাতাল থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছিল। ঝোড়ো বাতাস বইছিল রেলব্রিজের দিক থেকে। প্রফুল্ল দোকান থেকে ...
  • থিম পুজো
    অনেকদিন পরে পুরনো পাড়ায় গেছিলাম। মাঝে মাঝে যাই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়। বন্ধুদের মা-বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ভাল লাগে। বেশ রিজুভিনেটিং। এবার অনেকদিন পরে গেলাম। এবার গিয়ে শুনলাম তপেস নাকি ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একটু পরে তপেসও এল ...
  • কাঁসাইয়ের সুতি খেলা
    সেকালে কাঁসাই নদীতে 'সুতি' নামের একটা খেলা প্রচলিত ছিল। মাছ ধরার অভিনব এক পদ্ধতি, বহু কাল ধরে যা চলে আসছে। আমাদের পাড়ার একাধিক লোক সুতি খেলাতে অংশ নিত। এই মৎস্যশিকার সার্বজনীন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়। মনে আছে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ...
  • শুভ বিজয়া
    আমার যে ঠাকুর-দেবতায় খুব একটা বিশ্বাস আছে, এমন নয়। শাশ্বত অবিনশ্বর আত্মাতেও নয়। এদিকে, আমার এই জীবন, এই বেঁচে থাকা, সবকিছু নিছকই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া, এমনটা সবসময় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না - জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পরিণ...
  • আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই...
    দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। দেশের সবচেয়ে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে বুয়েট। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছু বরাহ নন্দন! কাওকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কি খুব সহজ কাজ? কতটুকু জোরে মারতে হয়? একজন মানুষ পারে ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭
    চন্দ্রপুলিধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন ...
  • গুমনামিজোচ্চরফেরেব্বাজ
    #গুমনামিজোচ্চরফেরেব্...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

কুচু-মনা উপাখ্যান

কুশান গুপ্ত

১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।

এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল কিশোরের স্টাইলে গাহিবার অব্যবহিত পরেই সে মহম্মদ রফির স্টাইলে পরবর্তী গান গাহিত। এছাড়া মিঠুনের কোন সিনেমা রিলিজ করিল, 'তেরি মেহেরবানিয়া'র স্টোরি কীরূপে অভিনব, দলবদলে ইস্টবেঙ্গল কীরূপ কৌশলে মোহনবাগানের হাতে হ্যারিকেন ধরাইল, এইসব বিষয়েও তার তথ্যসম্ভার এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা প্রখর ছিল। সর্বোপরি তার ছিল অলীক গল্প বলিবার অনায়াস দক্ষতা। একই সঙ্গে স্বপনকুমার, হেমেন রায়, ব্রুস লী ও জেমস হ্যাডলি চেজ পাঞ্চ করিয়া সে এক অপূর্ব স্বাদের ট্রপিকানা তৈয়ার করিত। এসকল কারণে দ্রুত কুচুর অনুগামীর সংখ্যা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।

কিন্তু, অন্য জ্বালা ছিল। কুচুর মধ্যে, অপরকে, বিশেষ করিয়া গোবেচারা গোছের সহপাঠীদের পীড়িত করিবার এক সহজাত স্বভাব ও দক্ষতা ছিল। রকমারি নিপীড়ন কৌশল সে অনায়াস-আয়ত্ত করিয়াছিল। কোনো এক সহপাঠী হয়তো চুপ করিয়া বেঞ্চে বসিয়া আছে। অকস্মাৎ একজন তার দু'চোখ পেছন হইতে চাপিয়া ধরিল। তৎক্ষণাৎ কুচু ও তার সাঙ্গোপাঙ্গো মিলিয়া তার মাথায় ফটাফট চাঁটি মারিতে লাগিল। ইহার ন্যূনতম স্থায়িত্বকাল দুমিনিট। এই অরন্তুদ ক্রীড়ার নাম 'চ্যারিটি শো'। অপরাপর নানান কৌতূকময় ক্রীড়া ছিল, যাহাতে নিরীহ ছাত্ররা নিপীড়িত হইত। অন্যের কষ্টে করুণা উদ্রেক হইবার পরিবর্তে দর্শকদিগের আনন্দিত হইবার কিছু এলিমেন্ট তো থাকেই। কিন্তু ইহাতে যারা অত্যাচারিত হয় তারা ভিতরে ভিতরে বিরূপ হইয়া উঠে। কুচুর দৌরাত্ম্য ক্রমে বাড়িতেছিল। অপরের টিফিন বাক্স অকস্মাৎ চিল পাখির ন্যায় ছোঁ মারিয়া কাড়িয়া নিমেষে টিফিন গলাধঃকরণ, সাদা স্কুল ইউনিফর্মে কালি দিয়া দাগাইয়া দেওয়া, ক্লাস চলাকালীন পিছন হইতে নিদারুণ চিমটি সহ নানান ইনোভেটিভ পদ্ধতির টর্চার-কৌশল প্রয়োগে কুচু ও তার নেতৃত্বাধীন দলবল রীতিমত ওস্তাদ হইয়া উঠিয়াছিল। ক্রমে ইহা ক্লাসে একপ্রকার আতঙ্ক বিস্তার করে।

এদিকে সেই গোকুলেই ধীরে ধীরে মনা বলিয়া এক সহপাঠী বাড়িতেছিল। মনার ভালো নাম মনোতোষ ভূঁঞা। তার শরীরচর্চায় বিশেষ আসক্তি ছিল। শক্তি সংঘে গিয়া সে পঞ্চম শ্ৰেণী হইতেই নিয়মিত প্যারালাল বার, ডন বৈঠক অভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে ডাম্বেল বারবেল ভাঁজিতে শুরু করিয়া দেয়। তাহার এক প্রেরনাপুস্তক ছিল। যাহা নীলমণি দাশ(আয়রনম্যান) বিরচিত। এই পুস্তক সে সর্বত্র সঙ্গে রাখিত। ইহার সমূহ তত্ত্ব, উপযুক্ত ডায়েট এবং শক্তি সঙ্ঘের নিয়মিত একবগ্গা অনুশীলন তাকে অচিরেই পেশীবহুল এক গাম্বাটে রূপান্তরিত করে। গাম্বাট বলার কারণ, মনার সেন্স অব হিউমার নামক বস্তু মাত্রায় যথেষ্ট কম ছিল। উপরন্ত সে কারুর সাতে পাঁচে থাকিত না। তথাপি, সে কিছুটা সেন্টিমেন্টাল ছিল। নবা বা নবীন কলামুড়ি নামক এক শীর্ণকায় বালককে সে নিজের বন্ধু মনে করিত এবং তাকে বিশেষ নজরে রাখিত। ইহার কারণ নবার অতীব কৃশতা ও শারীরিক দুর্বলতা। তাকে সে বলিত, ব্যায়াম করা প্রয়োজন, এই দ্যাখ, বলিয়া সে শ্বাস টানিয়া নিজের বাইসেপস ফুলাইত, তারপর বলিত, 'ধর দেখি।' নবা পরম বিস্ময়ে তার পেশীসকল টিপিয়া টুপিয়া পরখ করিত। নবার এইরূপ বিস্ময়ে মনা যারপরনাই গর্বিত হইত। তবে মনা সুকান্তের কবিতা বেশ ভাল আবৃত্তি করিত এবং নিজ মায়ের প্রতি ঈশ্বরচন্দ্রসুলভ ভক্তির কারণে সেও মিঠুনের বিশেষ ফ্যান ছিল। সে আবিষ্কার করিয়াছিল, মিঠুনের কোন সিনেমাতেই পিতার কোনো ভূমিকাই নাই, সকল ভূমিকা তথা তাৎপর্য মমতাময়ী মায়ের। ইহার পরেই বেসুরো গলায়, 'ইয়াদ আ রাহা হ্যায়, তেরা প্যার' ধরিত। ইহাতে করুণ অপেক্ষা হাস্যরস উদ্রেক হইত বেশী। তথাপি, নবা কোনোদিন তাকে উপেক্ষা তো করেই নাই, বরং তাকে যথোচিত গুরুত্ব দিত। এই কারণে মনা নবার প্রতি বিশেষ প্রসন্ন ছিল ।

একদিন টিফিন পিরিয়ডে নবা স্কুলসংলগ্ন মাঠে দাঁড়াইয়া ছিল। অকস্মাৎ কুচুর এক ঘনিষ্ঠ স্যাঙ্গাত, প্রীতম, আসিয়া নবাকে বলিল, 'এই প্যাঁকাটি, তোর হাতটা দেখি', একথা বলিয়াই সে নবার হাত লইয়া মুড়িয়া ধরিল। নবা বেচারি বেদনায় চিৎকার করিতে লাগিল। অদূরেই মনা দাঁড়াইয়া ছিল। সে আগাইয়া আসিল। প্রীতম নবার হাত ছাড়িয়া এক্ষণে দাঁত কেলাইয়া হাসিতেছিল। মনা  প্রীতমের সন্নিকটে আসিয়া স্বীয় হাত বাড়াইল, বলিল-' একটু আমাকেও অমনি কর না।' প্রীতম ঘোর ফ্যাসাদে পড়িল। সে মনাকে এড়াইতে সচেষ্ট হইল, কেননা মনার শারীরিক ক্ষমতা সম্পর্কে সে কিছুটা হইলেও ওয়াকিবহাল ছিল। তাকে চুপ দেখিয়া, মনা হাত বাড়াইয়া তার হাত করমর্দনের ভঙ্গিতে ধরিল এবং নির্বিকার ভঙ্গিতে চাপ দিতে লাগিল। ক্রমে সে চাপের মাত্রা বাড়াইতে লাগিল। প্রীতম ব্যথায় কঁকাইতে লাগিল এবং 'ছেড়ে দে মনা, প্লিজ', এইরূপে অনুনয় করিতে লাগিল। নবা দেখিল, মনার মুখমন্ডলে এক অভূতপূর্ব ক্রূরতা, তার দাঁত দিয়া সে নীচের ঠোঁট কীরূপে আলগা কামড়াইয়া ধরিয়াছে এবং  মাঝেমধ্যে হাতের চাপ বাড়াইয়া বলিতেছে, ' কেমন লাগছে, গুরু?'

শেষাবধি যখন সে প্রীতমের হাত ছাড়িল, প্রীতম সম্মুখে ঝুঁকিয়া, এক হাত দিয়া অপর হাত ধরিয়া, কার্যত কাঁদিতেছিল। তার সারা মুখ লাল হইয়া গিয়াছিল এবং সে সেদিন বাকি ক্লাস চলাকালীন বাহ্যত চুপ ছিল।

ইহার পরের দিন মনা, রস-কস-সিঙ্গাড়া ক্রীড়ায়, কুচু-লবির দুইজনকে আহ্বান করিল। বাকি দুইজনও ছিল, যারা কুচু-পক্ষের অন্তর্গত নয়। ইহার পরে মনা যে কটি দান জিতিল, কুচুর দুই স্যাঙ্গাতকে মুহুর্মুহু চড়ে ঘায়েল করিতে লাগিল। কিছুতেই মনা আউট হয় না। চড়ের পর চড় চড়াইতে থাকে মনা। এক একটি চপেটাঘাত সজোর-সশব্দ এবং তিনজনের হাত লাল হইয়া ফুলিয়া গেল। সকলে দেখিল সেই তিনজনের মুখমন্ডল লালবর্ণ ধারণ করিয়াছে, তারা দরদর ঘামিতেছে এবং একজন কান্নার উপক্রম করিতেছে। নবা দেখিল, চপেটাঘাতোদ্যত মনার মুখমন্ডলে সেই ক্রূর অভিব্যক্তি।

কুচুর নিকট তার তিন বিশ্বস্ত অনুগামীর হ্যাটা হইবার সংবাদ চলিয়া যায়। সে সব শুনিয়া বলিল, 'মনাকে দেখে নেব।' তৎক্ষণাৎ কুচুর এহেন বার্তা জনৈক সহপাঠী মনাকে আসিয়া দেয়। ইহার পরের দিন মনা এক সহপাঠীর হাত দিয়া এক চিরকুট কুচুর নিকট প্রেরণ করে। সেই চিরকুটের বয়ান এইরূপ: ' মুখে আস্ফালন না করিয়া সত্যিই যদি বাপের ব্যাটা হও তবে আমার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করো। সময় ও স্থল তুমি নির্বাচন করো। তার পরেই স্থির হইবে, কে কাকে দেখিবে। মা কসম।'

উল্লেখ্য এই যে, 'মা কসম' শব্দবন্ধ লাল কালিতে লেখা ছিল। ইহা পড়া মাত্রই কুচুও অবিলম্বে লিখিতে বসিল। অনুরূপ একই কায়দায় অন্য এক চিরকুট কুচুর অনুচর আসিয়া মনাকে প্রেরণ করিল। উক্ত চিরকুটের শেষে সবুজ কালিতে: 'চরণো কি সৌগন্ধ' লিখিত ছিল।

দিনক্ষণ ঠিক হইয়া গেল। আসছে শনিবার ক্লাস ছুটির পরে বারান্দায় কুচু ও মনার দ্বৈরথ শুরু হইবে। এই লইয়া নানাবিধ আলোচনা ও স্ট্র্যাটেজি চলিতে লাগিল। উভয়পক্ষের পরামর্শদাতাগণ যথাক্রমে কুচু ও মনাকে স্বীয় স্বীয় জ্ঞানভান্ডার হইতে নানারূপ ফান্ডা দিতে লাগিল। মনাকে একজন বলিল, কুচুর যত জোর তার পায়ে। হাত দুর্বল। কিন্তু পা হইতে সাবধান। কুচুর জনৈক পরামর্শদাতা বলিল, প্রথমেই মুখে পাঞ্চ কষাও। মনা ঘায়েল হইয়া যাইবে। প্রচারও চলিতে লাগিল লাগাতার। মনার স্পর্ধা দ্যাখো, কুচুকে কেউ চ্যালেঞ্জ মারে? ফল ভুগিতে হইবে। অপরপক্ষ বলিল, এতদিনে কুচু সমূহ শিক্ষা পাইবে। বড্ড বাড় বাড়িয়াছিল।


                              ২

নির্ধারিত দিনে ক্লাসের বাইরে বারান্দায় গোটা ক্লাস ১টা ৪০ মিনিটে দাঁড়াইয়া রহিল। যুযুধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আজ লড়িবে। আজ শ্রেষ্ঠত্বের পরীক্ষা।

প্রায় একই সঙ্গে কুচু ও মনা ক্লাসের বাহিরে বারান্দায় আসিল। দুজনেই শার্ট খুলিয়া দিয়াছে। কুচু আসিয়া প্রথমে ভক্তিভরে চোখ বন্ধ করিয়া এক হাত কপালে দিয়া নমো ঠুকিতে লাগিল। তৎক্ষণাৎ মনা ওপরের দিকে দুই করতল পাতিয়া দোয়া মাঙ্গিতে লাগিল।

অতঃপর মনা পুশ আপ মারিতে লাগিল। কুচু মার্শাল আর্টের অনুকরণে মুখ দিয়া 'ইয়া ইয়া' শব্দকরত তার পা শূন্যে ছুঁড়িতে লাগিল।

তারপর দুজনে পরস্পরের সঙ্গে দূরত্ব রাখিয়া পরস্পরের সম্মুখীন হইল। দর্শকদের সিটি ও হাততালি পড়িতে লাগিল।

শুরুতেই মনা দক্ষিণ হস্তের একটি মাঝারি পাঞ্চ কুচুর উদ্দেশ্যে ঝাড়িল। কুচু সরিয়া যাইতে তার বাহুতে লাগিল। 'সলিড দিয়েছে কিন্তু', মনাপক্ষের কেউ বলিল। কিন্তু পরক্ষনেই কুচু এগাইয়া একটি সুউচ্চ লাথি হাঁকাইল। লাথিও নিশানায় লাগিল না। মনার হাতে লাগিল। কুচুপক্ষ ঈষৎ উল্লসিত হইল: 'লাগলে আর রক্ষে ছিল না।'

দুই প্রতিপক্ষ মোটেও চুপ ছিল না। কুচু মনার দিকে একটি ঘুষি শূন্যে ঝাড়িয়া বলিল, ' আজ তোর লাইফের শেষদিন মনা।' তৎক্ষণাৎ মনা, 'যা যা ফুটানি মারিস না', বলিয়া কুচুকে তাচ্ছিল্য করিল।
দুজনে অবিরাম পরস্পরের উদ্দেশ্যে লাথি ঘুঁষি ঝাড়িতেছিল, কিন্তু অধিকাংশই লক্ষ্যভ্রষ্ট হইতেছিল।

কিছুক্ষণ  ঘুষি ও লাথির এমত নিষ্ফল আয়োজন চলিতে লাগিল। অকস্মাৎ, ' নে এবার সামলা' , বলিয়া মনা কুচুর দিকে ধাবিত হইল। কুচু, ' চলে আয় দেখছি তোকে', বলিয়া মনাকে জড়াইয়া ধরিল। কিছুক্ষণ দুজনে তুমুল বাহুযুদ্ধ হইল।  অতঃপর দুজনেই জড়াইয়া মড়াইয়া ভূপতিত হইল ও ঝাপটা ঝাপটি করিতে লাগিল। প্রভূত সিটি, প্যাঁক ও হাততালি পড়িতে লাগিল। কুচুপন্থীরা বলিল, ' মনা আজ শেষ।' মনার দলবল বলিল, ' কুচু জমানার আজই অবসান।'

কিন্তু দুজনের হাত পা যদিও বা চলিতেছিল, লড়াইয়ের ধরন দেখিয়া মনে হইবার উপায় ছিল না যে কোনো মীমাংসা হইবে।

অকস্মাৎ কুচু বলিল, ' মনা, ঘাড় ছাড়, নাহলে কিন্তু তোকে শেষ করে দেব'। তৎক্ষণাৎ মনা বলিল, 'তুই আমার কোমর ছাড় আগে।'

দুজনে পরস্পরকে, শর্তাধীন, ছাড়িয়া মেঝের ওপরে উঠিল। কিন্তু কারুর আর লড়াই করিবার যেন স্পৃহা নাই। মিনিট পনেরো লড়িয়াই উভয়ে ক্লান্ত হইয়া গিয়াছিল। বাহুযুদ্ধ স্থগিত হইয়াছিল। তথাপি, বাকযুদ্ধ অব্যাহত ছিল। 'আজকে ছেড়ে দিলাম', কুচু বলিবামাত্র মনা উত্তর করিল, 'ধরলি কখন, যে ছাড়বি?'

-'আরে যা যা।'

-' ফোট ফোট।'

-'পরে দেখছি তোকে।'

-'পারলে এখনই দ্যাখ না।'

-' ফোট তুই।'

ইহার পরে যাহা হইল তা বলিবার নয়। কুচু ও মনাপক্ষ যে যার নেতাকে অভিনন্দন জানাইতে ব্যস্ত হইয়া পড়িল এবং উভয় পক্ষই দাবি করিল যে  তারাই আজকের যুদ্ধে জয়ী। প্রবল কলহ, শ্রাব্য ও অশ্রাব্য কটূক্তি, চিৎকার, প্যাঁক, সিটি ও হুক্কারব শুরু হইল। মধ্যে মধ্যে থ্রি চিয়ার্স ও হিপ হিপ হুররে রব উঠিতে লাগিল। এছাড়া, ' কি দিলো, আটানা কিলো', 'পাগলা খির খাবি, ঝাঁঝে মরে যাবি' ইত্যাকার শ্লোগান লাগিয়া ছিল।

একসময় উভয় পক্ষের দলবল যে যার জামা খুলিয়া শূন্যে উড়াইতে উড়াইতে, 'জিত্তেচ্ছি, জিত্তেচ্ছি' বলিয়া চিল চিৎকার জুড়িয়া দিল। বস্তুত, কে যে কী জিতিয়াছে, বুঝিবার উপায় নাই। যদিও লড়াই অমীমাংসিত রহিল, তথাপি, যে যার নেতাকে কাঁধে তুলিয়া আপন আপন ভিকট্রি-উৎসবের কুচকাওয়াজ করিতে লাগিল।

ইহার পরে ষষ্ঠ (ক) কুচু ও মনা নামক দ্বিশক্তির এক বাইপোলার শ্রেণীকক্ষে রূপান্তরিত হয়। বাড়িতে থাকে সন্দেহ ও পারস্পরিক অবিশ্বাস। অনুষ্ঠিত হইতে থাকে গুপ্ত মিটিং ও পরস্পরকে জব্দ করিবার নানান ফিকিরফন্দী। পূর্বের ন্যায় একচ্ছত্র কুচু নিয়ন্ত্রিত ইউনিপোলার শ্রেণীকক্ষ হইতে ইহা চরিত্রে আলাদা। নিজ পক্ষের শক্তি বাড়াইবার নানান কৌশল উভয়পক্ষ আমদানি করিতে লাগিল। অন্যপক্ষে সুচতুর গুপ্তচর নিয়োগ, আড়ি পেতে শত্রুপক্ষের কৌশল জানিয়া আসা, এসবের অন্তর্গত ছিল। কিছু কিছু নিরপেক্ষ তথা দোদুল্যমান গোছের ভালো ছেলের দর এক্ষণে বাড়িয়া গেল। উভয় পক্ষ অযাচিত ভাবে টিফিন বাড়াইয়া দেয়, নানারূপে সহায়তা করে, যাতে তার দলে উক্ত ছেলে যোগ দেয়। ফলে সাধারণ ছাত্রদের কাছে, পূর্বাপেক্ষা, বলাই বাহুল্য, সুসময় আসিয়াছিল।

এবং, শক্তির ভারসাম্য অনুযায়ী এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান তথা গণতন্ত্রও বজায় ছিল। কোনো পক্ষই কাউকে সহসা আক্রমণ করিতে চায় না। উভয় পক্ষের বাহিরে কিছু কিছু ব্যতিক্রমী ইন্ডিভিজুয়ালিস্ট ছিল। যেমন, শ্যামা, ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন। শ্যামা যে কোন পক্ষে, বুঝিবার জো নাই। কিন্তু ক্লাসের হইয়া টিম করিতে গেলে কুচু ও মনা উভয় পক্ষ হইতে পাঁচ জন করে খেলোয়াড় রাখিতেই হইবে। দল নির্বাচনের ন্যায় ক্রিটিক্যাল মুহূর্তে উভয় পক্ষই মজুত থাকে। বজায় থাকে গলাবাজি ও দলবাজি।

এমনিতে কুচু ও মনা দুই ভিন্ন মতবাদ ও বিশ্বাসের কিশোর। কুচু ইস্টবেঙ্গল কিন্তু মনা মোহনবাগান। কুচু কংগ্রেস, মনা সিপিএম। কুচু হেমন্তপন্থী, মনা মান্নাপন্থী। তথাপি, দুটি বিষয়ে উভয়ের আশ্চর্য মিল। প্রথমত, দুজনেই পড়াশুনায় অষ্টরম্ভা এবং শিক্ষকদের অনুকম্পার পাত্র। দুজনেই মার্কা মারা শিক্ষকদের নিকট নিয়মিত প্রভূত কিলচড়, বেত্রাঘাত  খাইত। আরেকটি বিষয়ে দুজনের মিল বা দুর্বলতা, যদিও ভিন্ন কারণবশত। তা হইল মিঠুন চক্রবর্তী। কুচু মিঠুনের ডান্স ভালবাসিত এবং সেই অনুকরণে নাচিত। মনার মিঠুন আসক্তির কারণ আগেই বলিয়াছি। তুমুল মাতৃপ্রেম।

কুচু-মনার  দ্বিপাক্ষিক লড়াই অতঃপর নতুন এক সমীকরণের জন্ম দিল। অকস্মাৎ হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় মনা-লবি হইতে রাজেন বেরা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করিল। সঙ্গে সঙ্গে ঢক্কানিনাদ সহকারে মনাপক্ষ ইহা প্রচার করিল। রাজেনের দর বাড়িয়া গেল। এমন প্রতিভাত হইল যে স্বয়ং মনা এবং তার অনুগামীরা প্রত্যেকেই দ্বিতীয় হইয়াছে। কিন্তু সপ্তাহ গড়াইতে না গড়াইতে কুচুদলীয় তাপস পালোধী জেলা আবৃত্তিতে প্রথম স্থান দখল করিল। কুচুপক্ষ এইরূপে সওয়াল করিতে লাগিল, যে, ইহা কেবল একটি শ্রেণীর ষান্মাসিক‌ পরীক্ষা নয়, সারা জেলার ব্যাপার। এইরূপে কারিকুলাম-অন্তর্গত ও এক্সট্রা-কারিকুলার প্রতিটি ক্ষেত্রে কে কাকে টেক্কা মারিল, তার চুলচেরা হিসাব নিকাশ ও প্রচার চলিতে লাগিল। বস্তুত, এ যেন এক প্রতিযোগিতামূলক দ্বিপাক্ষিক কোল্ড ওয়ার।

কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে গোল বাধিত। যখন মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের প্রাক্কাল আসিত। সকল কুচুপন্থী ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক নয়। আবার, সকল মোহনবাগানি মনা-লবির অন্তর্গত নয়। এক্ষেত্রে মনা ও কুচু লবি এক আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে পড়িত। ক্ষেত্র বিশেষে মনুষ্যের কোন সত্ত্বা কখন জাগ্রত হইবে বলা মুশকিল। এই সময়ে মনা ও কুচু লবির অস্তিত্ব ভুলিয়া, সকল মোহনবাগানী একদিকে এবং সকল ইস্টবেঙ্গল-সমর্থক অপরদিকে অবস্থান করিত। ইহাতে সর্বাধিক গোঁসা হইত স্বীয় স্বীয় দলভুক্ত কট্টর নেতৃবৃন্দের।

ইহার মধ্যে একদিন কুচুপক্ষীয় এক বিক্ষুব্ধ ছাত্র, রঙ্গন খামকাট, আসিয়া বলিল যে সে মনাপক্ষে যোগ দিতে চায়। মনাপক্ষ যারপরনাই উল্লসিত হইল। প্রচার হইতে লাগিল যে কুচুপক্ষ স্বৈরাচারী এবং গণতন্ত্রের প্রকৃত আশ্রয়স্থল মনা। কিন্ত কিছুদিন পরেই এক মামুলি বচসার সূত্রে মজনু ঢালি নামক এক ছাত্র মনাপক্ষ ত্যাজিয়া কুচুর দলে যোগ দিল। চলিতে লাগিল পাল্টা প্রচার।

এই করিয়া সপ্তম শ্রেণীর মাঝামাঝি আসিয়া গেল। সপ্তম (ক) বনাম সপ্তম(খ) ফুটবল লীগ ম্যাচ চলিবার সময় এক সঙ্কট দেখা যায়। মাঠের বাহিরে কুচু ও মনা লবি পৃথক জায়গায় বসিয়া বিচ্ছিন্ন ভাবে দলকে সমর্থন দিতে থাকে। হাড্ডাহাড্ডি সেই ম্যাচে সপ্তম(ক) হারিয়া যায়। শ্যামা আসিয়া বলিল, ' এত লড়লাম। শুধুমাত্র মাঠের বাইরের সমর্থনের অভাবে হেরে গেলাম।'

-' এই লবিজম ক্লাসের ক্ষতি করছে', কেউ একজন তৎক্ষণাৎ বলিল।

ইহার পরে তৃতীয় এক পক্ষ গজাইল। ক্রমশ প্রচার হইতে লাগিল যে দ্বিপাক্ষিক লবিজম ক্লাসের আবহাওয়া দূষিত করিতেছে। খামোকা অবিশ্বাস, অকারণ সন্দেহের চাষবাস এবং সকল বিষয়ে এরূপ প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ক্লাসের স্পিরিট ভাঙিয়া দিতেছে। বিশেষত বেশ কিছু সঙ্কটকালীন পরিস্থিতিতে সমন্বয় জরুরী। যেমন পরীক্ষার হল। সেই মুহূর্তেও গোঁসা রাখিলে উত্তর মিলাইব কী করে? তাছাড়া বহির্শত্রুর আক্রমণ, খতরনাক টিচারদের ঠেকাইতেও বন্ধুসুলভ বোঝাপড়া রাখিতেই হয়, নইলে সঙ্কট।

ইহার পরেই টোটন পাঙ্গাস নেতৃত্বাধীন তৃতীয় পক্ষ কুচু ও মনার উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি দেয়। ইহাতে বলা হয় নেতৃবৃন্দ সকল বৈরিতা ত্যাগ করিয়া বৃহত্তর স্বার্থে এক হইয়া যাক। পাশাপাশি চলিতে লাগিল লাগাতার প্রচার। ধীরে ধীরে মনা ও কুচু পক্ষ ভাঙিতে লাগিল। ক্রমশই শক্তি অর্জন করিতে লাগিল তৃতীয় পক্ষ। বিপন্ন হইতে লাগিল কুচু ও মনার দল। ক্রমে মনা ও কুচু উভয়েরই অস্তিত্বের সঙ্কট আসিয়া উপস্থিত হইল।

ইতিমধ্যে 'কসম প্যায়দা করনে ওয়ালি কি' সগৌরবে চলিতেছিল। এই আখ্যানে উল্লিখিত ম্রিয়মান নবা এই ছবির নাম দেখিয়া ভাবিয়াছিল যে মিঠুন বুঝি পেয়াদার রোলে অভিনয় করিয়া কোনো কসম খাইয়াছেন। ইহা শুনিয়া জনৈক মিঠুন-বিশেষজ্ঞ হাসিয়া খুন হইয়া যায়। নবাকে বোঝানো হয় এই শব্দবন্ধের প্ৰকৃত অর্থ ' মায়ের নামে শপথ'।

এই সময়েই টোটন এক মোক্ষম চাল চালিল। সে কুচু ও মনাকে এক চিঠি দিল। কুচু ও মনা দুজনেই ডাইহার্ড মিঠুন ফ্যান। দুইজনে একত্রিত হইয়া এই সাম্প্রতিক শোরগোল ফেলে দেওয়া সিনেমাটি দেখিয়া আসুক। তার পরেই তারা সিদ্ধান্ত লইতে পারে।

সকলকে অবাক করিয়া কুচু ও মনা এই প্রস্তাব গ্রহণ করিল। উভয় পক্ষের তিনজন করিয়া, কুচু ও মনা, ছয়টি টিকিট সংগ্রহ করিয়া চলিল 'কপ্যাকবাকি' দেখিতে।

প্রথমে মুখ হাঁড়ি করিয়া কুচু ও মনা সিনেমা দেখিতে বসে। কিন্তু, রুদ্ধশ্বাস এই সিনেমায় খতরনাক ভিলেনকে যে পদ্ধতিতে মিঠুন শায়েস্তা করিল তা অবাক হইবার মতন। এই ছবিতে মাতৃরূপেন সংস্থিতা তথা সংস্মিতা ছিলেন স্বনামধন্যা স্মিতা পাতিল। তাঁর কৃতিত্ব কিছু কম নয়। মনা এমত মাতৃসত্ত্বামথিত আবেগদ্রব ছবি পূর্বে দেখে নাই। সে আবেগে নয়নজলে ভাসিয়া গেল। মিঠুন নাচিতে নাচিতে ভিলেনকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়িতে থাকে: 'রুলায়া হ্যায়, রুলায়েঙ্গে, সাতায়া হ্যায়, সাতায়েঙ্গে'। অর্থ: 'কাঁদিয়েছিস, কাঁদাবই, সাজা দিয়েছিস, সাজা দেবই' ইত্যাদি। কালো চশমাধারী মিঠুন যখন, 'আজ দেখেঙ্গে হম কিসমে কিতনা হ্যায় দম' বলিয়া অমরিশ পুরীকে আহ্বান জানায়, সেই দৃশ্য দেখিয়া কুচু বিহ্বল হইয়া যায়।

কুচু ও মনা পাশাপাশিই বসিয়াছিল। এক আবেগঘন মুহূর্তে যখন মিঠুন মায়ের নামে শপথ রাখিতেছে তখন দেখা যায় কুচু ও মনা পরস্পরের হাত দৃঢ় করিয়া ধরিয়া থাকে। তৈরি হয় এক অলৌকিক বন্ডিং, যার আসল কৃতিত্ব সুদূর মুম্বইয়ের এক বাঙালিতনয়ের। এক সময়ে দেখা যায় কুচু ও মনা উভয়েই ক্রন্দনরত।

ইহার পরের দিন ক্লাসে হাসিতে হাসিতে একসঙ্গে গলা জড়াইয়া প্রবেশ করিল কুচু ও মনা। উভয়েই কোথা হইতে হেয়ার স্টাইল মিঠুনের ন্যায় করিয়া আসিয়াছে। উভয়েরই জুলফিদ্বয় অন্তর্হিত হইয়াছিল।

ইহার পরে শুরু হইল মানভঞ্জনের পালা। কোলাকুলির বিজয়া সম্মিলনী তথা মহরম লাগিল। কুচু শিবির ও মনা শিবির  ভাঙিয়া একত্রিত হইল। অতঃপর এক শান্তি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলে ছোট্ট শ্লোগান উঠিতেছিল। একদল বলিল, কুচু। অন্যদল জবাবে, মনা। এইরূপ কুচু ও মনা এই দুই শব্দদ্বয় মিলিয়া আকাশে বাতাসে এক অপরূপ দ্যোতনা তৈরি করে। যা ক্লাস হইতে অন্য ক্লাসে, স্কুল হইতে স্কুলে, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াইয়া গঞ্জের অলিতে গলিতে ধ্বনিত হইতে লাগিল। আপন ধ্বনিমাধুর্যে ইহা ক্রমে জনমানসে স্থাপিত হয়।  জনচেতনায় চিরস্থায়ী রূপে নিষিক্ত হয় এই মানবিক ও মধুর 'কুচুমনা', যা সৌহার্দ্য, প্রীতি, মাতৃত্ব, ভ্রাতৃত্ব, ভগিনীত্বের প্রতীকরূপে অতঃপর নির্বিচারে ব্যবহৃত হইতে থাকে।

অসম্ভব প্রেম পাইলে কিংবা স্নেহের অতিরেক ঘটিলে আজও বাঙালির মুখ হইতে বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে নিঃসৃত হয়: কুচুমনা।



338 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: দোবরু পান্না

Re: কুচু-মনা উপাখ্যান

দুর্দান্ত। নিজের ছাত্রজীবনের কথা মনে পড়ে গেল
Avatar: মিঠুন

Re: কুচু-মনা উপাখ্যান

কসম পয়দা করনেওয়ালে কি- মায়ের না, বাবার নামে শপথ, সিনেমাতে যে বাবা নায়েকের জন্মের আগেই খুন হয়ে যায় এবং তার মায়ের নামে চরিত্রহীনতার দোষ লাগে।
Avatar: অমিত

Re: কুচু-মনা উপাখ্যান

ওফফ। এসব গল্পে ডিসক্লেইমার দিতে হয় সব চরিত্র কাল্পনিক 🤣🤣🤣
Avatar: Tim

Re: কুচু-মনা উপাখ্যান

ঃ-)))

এটা হেব্বি হয়েছে! জেপিবিএসে এরকম গ্যাং ওয়ার ছিলো, মনে পড়লো।
Avatar: অনিরুদ্ধ সরকার

Re: কুচু-মনা উপাখ্যান

ভাই অনেক অনেকদিন পরে আবার মনে পড়ে গেল যে কুচু আর মনা তো আমারই ক্লাসমেট ছিল ।
সাধারণ একটি প্লট, অসামান্য হয়ে উঠেছে তোমার গল্প বলার অসাধারণ দক্ষতার জন্য!
আর একটি প্রশংসা না করে পারছিনা, তোমার চরিত্রদের নামকরণ ...............
অভিনন্দন বন্ধু।
Avatar: রিভু

Re: কুচু-মনা উপাখ্যান

আহা জেনারেল ন্যাপলা মনে পড়ে গেলো।
Avatar: কুশান

Re: কুচু-মনা উপাখ্যান

পড়ার এবং মন্তব্য করার জন্য সবাইকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। ভাল থাকুন বন্ধুরা।
Avatar: রনুদা

Re: কুচু-মনা উপাখ্যান

লেখাটি সন্বন্ধে অসাধারণ বলিলেও কম বলা হয়। কি করিয়া একটি নিদ্রিত এ্যালবাম কে জাগাইতে হয় তাহা কুশান গুপ্ত বিলক্ষণ জানেন আর তাই অনন্য দক্ষতায় তাঁর কলমে সেই জাগরণ প্রক্রিয়ায় সামিল করেন পাঠককুল কে। সালাম ভাইসাব!


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন