দেশকাল ভাবনা RSS feed

দেশকাল ভাবনা-র খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বদল
    ছাত্র হয়ে অ্যামেরিকায় পড়তে যারা আসে - আমি মূলতঃ ছেলেদের কথাই বলছি - তাদের জীবনের মোটামুটি একটা নিশ্চিত গতিপথ আছে। মানে ছিল। আজ থেকে কুড়ি-বাইশ বছর বা তার আগে। যেমন ধরুন, পড়তে এল তো - এসে প্রথম প্রথম একেবারে দিশেহারা অবস্থা হত। হবে না-ই বা কেন? এতদিন অব্দি ...
  • নাদির
    "ইনসাইড আস দেয়ার ইজ সামথিং দ্যাট হ্যাজ নো নেম,দ্যাট সামথিং ইজ হোয়াট উই আর।"― হোসে সারামাগো, ব্লাইন্ডনেস***হেলেন-...
  • জিয়াগঞ্জের ঘটনাঃ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতা
    আসামে এনার্সি কেসে লাথ খেয়েছে। একমাত্র দালাল ছাড়া গরিষ্ঠ বাঙালী এনার্সি চাই না। এসব বুঝে, জিয়াগঞ্জ নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছিল। যাই হোক করে ঘটনাটি থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেই হবে। মেরুকরনের রাজনীতিই এদের ভোট কৌশল। ঐক্যবদ্ধ বাঙালী জাতিকে হিন্দু মুসলমানে ভাগ করা ...
  • অরফ্যানগঞ্জ
    পায়ের নিচে মাটি তোলপাড় হচ্ছিল প্রফুল্লর— ভূমিকম্পর মত। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেন কেউ আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে— সেই প্রচণ্ড কাঁপুনিতে ফাটল ধরছে পথঘাট, দোকানবাজার, বহুতলে। পাতাল থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছিল। ঝোড়ো বাতাস বইছিল রেলব্রিজের দিক থেকে। প্রফুল্ল দোকান থেকে ...
  • থিম পুজো
    অনেকদিন পরে পুরনো পাড়ায় গেছিলাম। মাঝে মাঝে যাই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়। বন্ধুদের মা-বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ভাল লাগে। বেশ রিজুভিনেটিং। এবার অনেকদিন পরে গেলাম। এবার গিয়ে শুনলাম তপেস নাকি ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একটু পরে তপেসও এল ...
  • কাঁসাইয়ের সুতি খেলা
    সেকালে কাঁসাই নদীতে 'সুতি' নামের একটা খেলা প্রচলিত ছিল। মাছ ধরার অভিনব এক পদ্ধতি, বহু কাল ধরে যা চলে আসছে। আমাদের পাড়ার একাধিক লোক সুতি খেলাতে অংশ নিত। এই মৎস্যশিকার সার্বজনীন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়। মনে আছে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ...
  • শুভ বিজয়া
    আমার যে ঠাকুর-দেবতায় খুব একটা বিশ্বাস আছে, এমন নয়। শাশ্বত অবিনশ্বর আত্মাতেও নয়। এদিকে, আমার এই জীবন, এই বেঁচে থাকা, সবকিছু নিছকই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া, এমনটা সবসময় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না - জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পরিণ...
  • আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই...
    দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। দেশের সবচেয়ে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে বুয়েট। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছু বরাহ নন্দন! কাওকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কি খুব সহজ কাজ? কতটুকু জোরে মারতে হয়? একজন মানুষ পারে ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭
    চন্দ্রপুলিধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন ...
  • গুমনামিজোচ্চরফেরেব্বাজ
    #গুমনামিজোচ্চরফেরেব্...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ

দেশকাল ভাবনা

ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন।

দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে দক্ষিণপন্থার দাপট বাম ও আঞ্চলিক শক্তির প্রভাবের কারণে কিছু পরিমাণে প্রশমিত ছিল। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি’র একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ চরম দক্ষিণপন্থার জন্ম দেয়। ২০১৯-র নির্বাচনে আরো বেশি গরিষ্ঠতা লাভকে মোদী দক্ষিণপন্থার পক্ষে একপ্রকার ছাড়পত্র হিসেব ধরে নিয়ে চরম দক্ষিণপন্থার গতিকে আরও তীব্র করেছে। এই চরম দক্ষিণপন্থার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, নেহরুর সময়কালে ও তার পরবর্তী সময়ে যেসব সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি মানুষের অধিকার রক্ষার অবলম্বন ছিল সেইসব প্রতিষ্ঠানের বহিরঙ্গের কোন পরিবর্তন না ঘটিয়ে এইসব প্রতিষ্ঠানে আরএসএস মতাদর্শীদের শীর্ষপদে বসিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সেগুলিকে দখল করে নেওয়া। ২০১৪-২০১৯-র পর্বে মোদী সরকার প্রতিষ্ঠানের ধ্বংসসাধনের কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছে। দেশের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি পদে সংঘের ভাবশিষ্যদের বসানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এমনকি বিচারবিভাগের স্বাধীন অবস্থানকে অবরুদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ছাত্রদের স্বাধীন চিন্তার বিকাশকে রুদ্ধ করে দিতে মোদী সরকার একাধিক দমনপীড়ন ব্যবস্থাই শুধু নেয়নি, এইসব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির সর্বোচ্চ পদে আরএসএস শিক্ষাবিদদের বসিয়ে ছাত্র-যুবদের মুক্ত চিন্তার পথকে স্থায়ীভাবে অবরুদ্ধ করার পথ সুগম করেছে। শ্রমিককের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার হরণ হয়েছে— কৃষকবিরোধী নীতি কৃষকদের আত্মহননের পথে নিয়ে গিয়েছে।

২০১৯-এর নির্বাচনে দেশের সব বড় কর্পোটেরগুলি একজোট হয়ে মোদী জমানাকে ফিরিয়ে আনতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করে মোদী-শাহ জুটি কর্পোরেটের ঋণ শোধে দেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার পূরণে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন। বাজেট অধিবেশনের সময়সীমা বাড়িয়ে ষাটটি আইন পাশ করিয়ে গর্বিত মোদী নিজেকে কাজের মানুষ হিসেবে দম্ভ প্রকাশ করলেও দেশের মানুষ লক্ষ্য করেছেন যে এইসব আইন প্রণয়নে সংসদীয় রীতিনীতিকে মান্যতা দেওয়া হয়নি। তড়িঘড়ি করে পাশ করিয়ে নেওয়া আইনের বেশ কয়েকটি দেশকে বিপর্যয়ের পথে নিয়ে যাবে। দীর্ঘদিনের সংগ্রামে অর্জিত অধিকার মানুষ হারাবে। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত হবে। আমরা এই নিবন্ধে সেই রকম কয়েকটি আইনের উল্লেখ করব।
|| ২ ||

প্রথমেই আমরা উল্লেখ করব ‘কনস্টিটিউশন (অ্যাপ্লিকেশন টু জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর) অর্ডার ২০১৯ ও দি জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর স্টেট রি-অর্গানাইজেশন বিল ২০১৯’— এই দুটি আইনের। এই দুটি আইনকে স্বাধীন দেশের ইতিহাসে জঘন্যতম কালাকানুন বললেও কম বলা হবে। দুটি আইন বলে জম্মু ও কাশ্মীরবাসীর কাশ্মীরিয়াত (কাশ্মীরের অভিনব সংস্কৃতি ও প্রথা), ইনসানিয়াৎ (মানবিকতা) এবং জামুরিয়াৎ (গণতন্ত্র)-এর উপর তীব্র আঘাত হানা হয়েছে— রাজ্যবাসীকে দেওয়া সংবিধান প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। রাজ্যটির ভারতভুক্তির ইতিহাস এখানে আলোচ্য নয়— শুধুমাত্র উল্লেখ করা দরকার যে রাজ্যটির ভারতভুক্তির ভিত্তি ছিল সংবিধানের ৩৭০ নং ধারায় প্রদত্ত বিশেষ স্বায়ত্বশাসন ও ৩৫এ ধারার বিশেষ অধিকার। এই অধিকারকে বার বার আঘাত হানা হলেও অবশিষ্ট যেসব অধিকার জম্মু ও কাশ্মীরে ছিল, সেগুলিরও অবলুপ্তি ঘটিয়ে রাজ্যটিকে এক ঘোর অন্ধকার ও সংঘাতের পথে ঠেলে দেওয়া হ'ল— কাশ্মীরবাসীর সাথে দেশের দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতা ও অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করা হ'ল।

দ্বিতীয় আইনটির মাধ্যমে রাজ্যটি দ্বিখন্ডিতই শুধু করা হয়নি, সংবিধানের প্রথম তপশীলে পনেরতম রাজ্য হিসাবে স্বীকৃত ছিল তার অবনমন ঘটিয়ে রাজ্যটি জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ নামে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। দুটি ক্ষেত্রেই রাজ্য বিধানসভা, রাজ্য সরকার ও রাজ্যের গণপরিষদের সম্মতির যে আবশ্যিক সাংবিধানিক শর্ত আছে তাকে পাশ কাটাতে অন্যায়ভাবে সংবিধানের ৩৬৭ ধারায় নতুন ব্যাখ্যা সংযোজন করে রাজ্যের রাজ্যপালের সম্মতিকেই রাজ্য বিধানসভা বা রাজ্য সরকারের সম্মতি বলে বিবেচনা করে এত বড় সিদ্ধান্ত সংসদে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হল। রাজ্যটিকে সেনা দিয়ে মুড়ে, সব রকমের যোগাযোগ ছিন্ন করে, রাজ্যবাসী তথা দেশবাসীকে অন্ধকারে রেখে, রাজ্যের নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট মানুষদের গারদে ভরে এমন এক দেশবিরোধী পদক্ষেপ দেশের ইতিহাসে ইতিপূর্বে ঘটেনি। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর এমন আঘাত দেশের মানুষ দেখেনি। অথচ এই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বৈশিষ্ট্যই কাশ্মীর সহ ভারত ইউনিয়নের রাজ্যগুলিকে অখণ্ড ভারতে ধরে রেখেছে- এটি সংবিধানের অন্যতম একটি মৌল বৈশিষ্ট্য। এই পদক্ষেপগুলিতে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন হল, যার ফলশ্রুতিতে যে কোন অঙ্গরাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে কেন্দ্র মনোনীত রাজ্যপালের সম্মতিতে রাজ্যকে ভেঙে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার পথ তৈরি হল। ফলত ভারত রাষ্ট্রের কাঠামোই শুধু বিপন্ন হয়ে পড়ল তাই নয়, এর ফলে বহুত্ববাদী ভারতের ধারণার বিনাশের পথ তৈরি হল। সংবিধানের ৩৭১ এবং ৩৭১এ থেকে ৩৭১আই ধারার যে বিশেষ অধিকার মহারাষ্ট্র, গুজরাট, নাগাল্যান্ড আসাম, মণিপুর, অন্ধ্রপ্রদেশ, সিকিম, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশ ও গারো বিশেষ মর্যাদা পায় যেসব রাজ্যের মানুষের মধ্যেও শঙ্কা তৈরি হল। মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, হিমাচলপ্রদেশ, কাশ্মীরের মতো ভারতের অন্য অংশের মানুষ জমি কিনতে পারে না। স্পষ্টতই সংবিধান বিধ্বংসী এই পদক্ষেপের আইনি । বিচারের ভার সুপ্রিম কোর্ট নেবে বলে মানুষের প্রত্যাশা। কিন্তু এমন জরুরি বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের গড়িমসি দেখে মানুষ হতাশ— তবুও আশা যে সংবিধান রক্ষায় সুপ্রিম কোর্ট কার্যকরী পদক্ষেপ নেবে।

|| ৩ ||

‘দি আনলফুল অ্যাকটিভিটিজ (প্রিভেনশন), অ্যামেন্ডমেন্ড বিল ২০১৯’ গত অধিবেশনে সংসদে পাশ করিয়ে নেওয়া হল। এর সাথে পাশ হল, ‘ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০১৯’। দুটি পদক্ষেপই ভয়ঙ্কর এবং মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

প্রথম বিলটিতে যে কোন সন্দেহভাজন ভারতীয়কে সন্ত্রাসবাদী বলে ঘোষণা করার সংস্থান করা হয়েছে। বর্তমান আইনে কোন সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী বলে ঘোষণা করা যায়। স্বাভাবিকভাবে সংগঠনে যুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু মোদী-শাহ তাতে খুশি নন তাঁরা চান তাদের বিরোধী যেকোন ব্যক্তিকেই ‘আরবান নকশাল’, ‘সন্ত্রাসবাদী’ বা ‘দেশদ্রোহী' হিসেবে দেগে দিয়ে সমাজে একঘরে করে দেওয়া এবং চাকুরি সহ নাগরিক সব সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা। উদ্দেশ্যটি গোপন না রেখেই খোলাখুলিভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোকসভায় বলেছেন, যারা সন্ত্রাসবাদী পুস্তকে সন্ত্রাসবাদী তত্ত্ব প্রচার করবে বা যারা আরবান মাওবাদীদের হয়ে কাজ করবে তাদের কোনরকম রেওয়াত করা হবে না। বস্তুত সন্ত্রাসবাদী পুস্তক (terrorist literature) বলতে ‘সন্ত্রাসবাদী তত্ত্বের’ প্রচারকেই বর্তমান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মতপ্রকাশকেই বোঝানো হয়েছে। কোনরকম বিচারবিভাগীয় পদ্ধতি ব্যতিরেকেই বর্তমান সংশোধনীতে কোন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদী বলে আইনের চতুর্থ তফশীলিতে নাম নথিভুক্ত হবে এবং তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যাবে। মোদী-শাহেরা যে কোনরূপ বামপন্থী মত, ট্রেড ইউনিয়নে আন্দোলনে যুক্ত নেতৃবৃন্দ, এমনকি কোন বাম প্রচারপুস্তিকা প্রচার করাও দেশবিরোধী কাজ। কিছুদিন আগে ভগৎ সিং-এর আত্মজীবনী রাখার কারণে দেশদ্রোহের অভিযোগে ইউএপিএ ধারায় এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সমাজকর্মীসুধা ভরদ্বাজদের বিরুদ্ধেও এই আইন প্রয়োগ করা হয়েছে।

ইউএপিএ-র দানবীয় সংশোধনীগুলি সংবিধানের ১৪ (সমানাধিকার) ১৯ (বা স্বাধীনতা) ও ২১ ধারার (জীবনের অধিকার) পরিপন্থী। কোন বিচার ছাড়াই কোন ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদী বলে দেগে দেওয়া এবং সাম্রাজ্যবাদী তালিকাভুক্ত করে শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা করা কোন গণতান্ত্রিক দেশে অকল্পনীয়। মোদী-শাহ জুটি দেশে একটা ভীতির পরিবেশ তৈরি করে মানুষের কণ্ঠরোধ করতে মরিয়া হয়েই এমনধারা দানবীয় সংশোধন করেছেন। দেশ জালিয়ানবাগের শতবর্ষে সাম্রাজ্যবাদীদের তৈরি ‘রাওলাট আইনের’ চেয়েও ভয়ঙ্কর আইন প্রণয়ন করল। গান্ধিজী এই আইনের বিরুদ্ধে দেশজুড়েআইন অমান্যের ডাক দিয়েছিলেন। সদ্য “গান্ধিভক্ত (যদিও তাঁরই পূর্বসূরীরা গান্ধিকে হত্যা করেছে এবং সদ্য জয়ী এক বিজেপি সাংসদ গান্ধি হত্যাকারীকে শহিদের মর্যাদা দিয়েছেন) মোদী-শাহ গান্ধিজীর দেড়শত জন্মবার্ষিকী জাঁক করে উদ্যাপনের আগে এমনধারা দমনপীড়নমূলক আইনের ধারা বিরোধী গান্ধিজীর কথা স্মরণ করার প্রয়োজন বোধ করেননি। স্বৈরচারীরা শুধু মুখেই গান্ধিজীর কথা বলেন।

এনআইএ (NIA) বিলটি পাশ করে ইউএপিএ সংশোধনীকে আরো কঠোর করা হয়েছে। এক, এনআইএ-র ডাইরেক্টর জেনারেল তদন্তে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তের সম্পত্তি বা অন্যকিছু বাজেয়াপ্ত করার অনুমোদন দেওয়ার অধিকারী হয়েছে। দুই, এই অনুমোদনে রাজ্য পুলিশ প্রধানের সম্মতির কোন বাধ্যবাধকতা থাকছে না। তিন, আগের আইনে ডেপুটি সুপারইনটেনডেন্ট পদমর্যাদার আধিকারিকেরা তদন্তের অধিকারী ছিলেন, বর্তমান সংশোধনীতে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার আধিকারিকেরাও তদন্ত করতে পারবে। এই সংশোধনীটি কার্যত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর আঘাত। সংবিধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয়। রাজ্যের কোন অপরাধের তদন্তে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে রাজ্যকে অন্ধকারে রেখে দেশের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে চায় স্বৈরাচারী কেন্দ্রীয় সরকার।

|| ৪ ||

মোদী দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করেছেন কর্পোরেট স্বার্থে মানুষের কণ্ঠরোধের ব্যবস্থা পাকা করতে। এই উদ্দেশ্যেই পাশ করানো হয়েছে আরটিআই (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০১৯। রাজনৈতিক দল ও সমাজকর্মীদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট ২০০৫, ঐ বছরের ১৩ অক্টোবর থেকে লাগু হয়েছে। সরকার ও সরকার পোষিত সব প্রতিষ্ঠানে রক্ষিত তথ্য ও নথি পাওয়ার অধিকার এই আইনে স্বীকৃত। ভারতীয় সংবিধানে নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার অন্তর্নিহিত ভাবে নিশ্চিত থাকলেও সুস্পষ্ট আইনের অভাবে সরকার সেসব তথ্য নাগরিকদের দিতে বরাবরই অনীহা দেখিয়েছে। ২০০৫ সালে তথ্যের অধিকার আইন লাণ্ড হওয়ার পর নাগরিকরা সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য পাওয়াকে তাদের অধিকার হিসেবে দাবি করার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী অস্ত্র হাতে পায়। তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি বা তথ্য দিতে অস্বীকৃত কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আপিল করার নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনে আছে। প্রথম ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ হলেন জনকর্তৃপক্ষ নিযুক্ত উর্ধ্বতন আধিকারিক। দ্বিতীয় আপিল কর্তৃপক্ষ হলেন রাজ্যের ক্ষেত্রে রাজ্য তথ্য কমিশনার ও শীর্ষ কর্তৃপক্ষ হলেন কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনার। মোদী সরকার আইনকে সংশোধন করে স্বাধীন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনারদের সরকারের তাঁবেদারে পরিণত করলেন। মূল আইনে উভয় তথ্য কমিশনারেরা ভারতের নির্বাচন কমিশনের মত সাংবিধানিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। আইন সংশোধন করে দুই কমিশনারদের স্থায়ী পাঁচ বছরের কার্যকাল এখন থেকে হবে সরকারের ইচ্ছাধীন। আগে তাদের বেতনক্রম ছিল নির্দিষ্ট; বর্তমানে তাও নির্ধারিত হবে সরকারের আর হাজার দপ্তরের আধিকারিকদের মত। তথ্য কমিশনারদের সরকারের নজরবন্দীর মধ্যে এনে নাগরিকদের তথ্যপাওয়ার অধিকারকেই কার্যত কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা পাকা করা হল। মোদী সরকার প্রতিষ্ঠানগুলি বহাল রেখেই তা ভেতর থেকে ধ্বংস করার যে কার্যক্রম চালু রেখেছে, তথ্যের অধিকারকে খর্ব করাও সেই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা।
|| ৫ ||

দেশে হিংসা, ঘৃণা ও সংখ্যালঘুদের বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পিত কার্যক্রমেরই অংশ হল ‘দি মুসলিম উওমেন (প্রোটেকশন অফ রাইটস অন ম্যারেজ) বিল ২০১৯’-এর সংসদের অনুমোদন। এই আইনে তাৎক্ষণিক তিন তালাক বা তালাক-ই-বিদ্দত-কে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কোন মুসলিম পুরুষ এই প্রকারের তালাকে মুসলিম মহিলাকে বিবাহ-বিচ্ছেদ দিতে চাইলে তা শুধু অবৈধ হবে না, তা হবে জামিন অযোগ্য অপরাধ এবং অপরাধীর তিন বছরের জেল হবে। বিবাহ বিচ্ছিন্না মহিলা ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী হবে।

সাধারণভাবে আইনিটি মুসলিম মহিলাদের রক্ষাকবচ হবে বলে প্রবল প্রচারলাভ করেছে। বস্তুত বাংলাদেশ, পাকিস্তান সহ বহু মুসলিম রাষ্ট্রে এই প্রকারের তালাক নিষিদ্ধ। কিন্তু ২০১৭ সালের আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট এই প্রথাকে সমতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী হিসাবে গণ্য করে। এই তালাক প্রথাকে সংবিধানবিরোধী বলে আদেশ দেওয়ার পর নতুন করে আইন প্রণয়নের খুব বেশি দরকার ছিল না। আর আইন প্রণীত হলেও অন্যান্য সব ধর্মের আইনে বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত বিষয়কে দেওয়ানী অপরাধ (Civil offence) বলে গণ্য করা হয়েছে। সেখানে মুসলিমদের ক্ষেত্রে এটিকে ফৌজদারি অপরাধ (Criminal offence) হিসাবে চিহ্নিত করা স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক। মুসলিমদের অপরাধপ্রবণ সম্প্রদায় হিসাবে জনমানসে এক ধারণা তৈরি করতে সংঘ পরিবার সদাই সচেষ্ট। স্পষ্টভাষায় তা বলা হলেও ইউএপিএ বা এনআইএ আইন সংশোধনের লক্ষ্যও প্রধানত মুসলিম সম্প্রদায়। তিন তালাক আইন এই ঘৃণার বাতাবরণকে আরও জোরদার করবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মানুষ যে ভীতির পরিবেশে বাস করছে, বিচ্ছিন্নতায় ভুগছে, এই আইন প্রণয়নের ফলে তাদের সাথে ভয়ভীতি ও বিচ্ছিন্নতা আরো বাড়বে— সংঘ পরিবার এটাই চায়।

স্মরণ করা যেতে পারে অসমে নাগরিক পঞ্জীতে কয়েক লক্ষ মুসলিম উদ্বাস্তুর সাথে কয়েক লক্ষ অমুসলিম উদ্বাস্তু তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। মুসলিম ও অমুসলিম উদ্বাস্তু বিভাজনকে আরো সম্প্রসারিত করার লক্ষে নাগরিক আইন সংশোধনী বিল বিগত লোকসভায় পেশ হওয়া বিলে অমুসলিম উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব প্রদানের কথা বলা হলেও মুসলিমদের বাদ দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় তাসই হল বিজেপি-সংঘ। পরিবারের বড় হাতিয়ার। সেই নাগরিক সংশোধনী বিল যে কোন সময় আবার সংসদে অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার জন্য মোদী-শাহেরা ওঁত পেতে রয়েছে। দেশটাকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজনের যে হীন রাজনীতি স্বাধীনতা প্রাপ্তির সময়কালে হয়েছিল, এখন সেই রাজনীতি প্রবলভাবে ফিরে আসছে হিন্দুত্বের এ্যাজেন্ডা পূরণ করতে বিজেপি এটা লাগাতার ভাবে করে যাবে।

|| ৬ ||

কর্পোরেট পুঁজির কোটি কোটি টাকার অর্থানুকূল্যে নির্বাচিত মোদী সরকার। পুঁজিপতিদের স্বার্থে শ্রম আইন সংশোধনের মরিয়া প্রচেষ্টা ২০১৪ সাল থেকেই করে আসছে। ২০১৫ সালে মোদী-১ সরকারের আমলে চালু ৪৪টি শ্রম আইনকে সংযুক্ত করে ৪টি কোডে পরিরত করার উদ্যোগ প্রবল শ্রমিক আন্দোলনের চাপে মোদী সরকার সফল হয়নি। কিন্তু রাজস্থানকে পরীক্ষাগার করে হায়ার এন্ড ফায়ার নীতিকে কার্যকর করেছে। কারখানা বন্ধ করতে সরকারি অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা সর্বনিম্ন শ্রমিকসংখ্যা ১০০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ করা থেকে ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট, এর নামে অধিকারহীন শ্রমিকদের দিয়ে অনির্দিষ্টকাল কাজ করিয়ে নেওয়ার মতো শ্রমিকবিরোধী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অধিক আসনে জয়ী হয়ে মোদী আর কোন রাখঢাক না রেখেই কর্পোরেট ঋণ শোধ করতে লোকসভার প্রথম অধিবেশনেই কোড অন ওয়েজেস ২০১৪ এবং কোড অন অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ এন্ড ওয়ার্কিং কন্ডিশন ২০১৯ দুটি আইন প্রণয়ন করল।

‘কোড অন ওয়েজেস ২০১৯’ আইনটি প্রণয়নের ফলে বর্তমানে চালু ৪টি শ্রম আইন ‘ন্যূনতম মজুরি আইন ১৯৪৮’, ‘মজুরি প্রদান আইন ১৯৩৬’, ‘বোনাস প্রদান আইন ১৯৫৫’, ‘সমান বেতন আইন, ১৯৭৬'- বাতিল হয়ে গেল। বলা হয়েছে আইনকে সরল ও স্বচ্ছ করার উদ্দেশ্যেই এই বিলুপ্তি। কিন্তু যখন লেখা হয় যে উদ্যোপতিদের আরও মসৃণ ব্যবসা দেশের স্বার্থে প্রয়োজন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে এই আইন শ্রমিকস্বার্থে প্রণীত হয়নি। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে শ্রমিকদের ভূমিকাকে লঘু করে সরকারের কর্তৃত্বকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবং এই মজুরি নিশ্চিত করার কোন কার্যকরী পদক্ষেপই আইনে নেই।

দুই, বিভিন্ন ধরনের কাজের ন্যূনতম বেতন নির্ধারণের মানদণ্ডের প্রধান বিষয় হল ‘ভৌগোলিক অবস্থান আর কুশলতা’। এর অর্থ হল অ-দক্ষ, আধাদক্ষ বা অতি দক্ষ বলে আর কোন স্তর থাকবে না। এতে শ্রমিকদের কাজ ও বেতন কমবে।

তিন, আইনটি রূপায়ণে নজরদারি করতে ইন্সপেক্টরদের ভূমিকা লঘু করে তাদের নামকরণ করা হয়েছে 'ইন্সপেক্টর কাম ফেসিলিটেটর’ যারা স্টার্ট আপ প্রতিষ্ঠানে কোন তদন্ত করতে পারবে না এবং ব্যবসা ‘মসৃণ’ করার স্বার্থে নিয়োগকর্তাকে জানিয়েই তবে ইন্সপেকশনে যেতে পারবে।

চার, কোডে ‘এমপ্লয়ি’ ও ‘ওয়ার্কার’-এর দুই সংজ্ঞা নির্ধারণ করা। হয়েছে এবং যেখানে মজুরি প্রদানের সংস্থান আছে (ধারা ২ (জেড)) সেখানে ওয়ার্কারদের উল্লেখ না থাকায় তাদের কার্যত কোডের আওতার বাইরে রাখা হল।

পাঁচ, বর্তমান কোডে ওভারটাইম আলাউন্স, ছুটির বেতন ইত্যাদিকে কোডের বাইরে রাখায় এই সময়কালে প্রাপ্য মজুরি অনিশ্চিত হল। অথচ ১৯৩৬-এর আইনে তার স্পষ্ট বিধান ছিল।

সর্বোপরি নূন্যতম বেতন ১৮০০০ টাকার কোন উল্লেখ নেই। গত বছর জুলাই মাসে সরকারি এক্সপার্ট কমিটি মূল্যসূচক অনুযায়ী দৈনিক মজুরি ৩৭৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিল, বর্তমানে সরকার পূর্বের দৈনিক ১৭৬ টাকার বদলে ১৭৮ টাকায় স্থির করতে চাইছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বা ইন্ডিয়ান লেবার কনফারেন্সের সর্বসম্মত প্রস্তাবকে আমল দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে নারী-পুরুষের সমান বেতন পাওয়ার অধিকার, বোনাস পাওয়া, বেতন ও বোনাস প্রদানে অনিচ্ছুক মালিকদের গ্রেফতার করার বিধান তুলে দেওয়া হল। আর মালিকদের শ্রমিকের কাজ পছন্দ না হলে বেতনকাটার, দু'দিনের নোটিশে বরখাস্তার অধিকার দেওয়া হয়েছে।

‘কোড অন অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ এন্ড ওয়ার্কিং কন্ডিশন ২০১৯' আইনে ‘ফ্যাক্টরি আইন', 'বিল্ডিং এন্ড আদার কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কিং আইন’, ‘ওয়ার্কিং জার্নালিস্ট ও নিউজপেপার আইন’, ‘ঠিকা-শ্রমিক অবলুপ্তি ও নিয়ন্ত্রণ আইন’ সহ ১৩টি শ্রম আইনকে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হল নির্মাণ শিল্পে অসংগঠিত শ্রমিক (প্রায় ১০ কোটি) বিওসিডব্লিউ আইন ১৯৯৬ বাতিল হওয়ার ফলে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য যে শ্রমিক কল্যাণ পরিষদ গঠিত হয়েছিল তার অস্তিত্ব বিপন্ন হল- এঁদের সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রমিক পরিচয় বিপন্ন হয়ে পড়ল। ঠিকা শ্রমিক আইন ১৯৭০ বাতিল হওয়ার ফলে সমস্ত রকম স্থায়ী চরিত্রের কাজে ঠিকা প্রথা আইনি সীলমোহর পেল এবং শ্রমিকদের বাঁধা মজুরে পরিবর্তিত করা হল।

এই কোডে দেশের কর্মশক্তির স্বাস্থ্য, সুরক্ষা কল্যণের লক্ষ্যে ক্যান্টিন ক্রেশ, ফার্স্ট এন্ড ওয়েলফেয়ার অফিসার ইত্যাদির কথা লেখা থাকলেও বলা হয়েছে যে যদি সম্ভব হয় তবেই মালিক তা করে। আর ১০০ শ্রমিকের প্রতিষ্ঠানেই ক্যান্টিনের সুবিধা থাকবে। ১০ জন শ্রমিকের কম কাজ করা হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানে তথাকথিত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কর্মপরিবেশের আওতায় পড়বে না। বস্তুত এই কোডে মালিকের স্বার্থে শ্রমিক-বিবেক জাগ্রত করা, নিয়োগকর্তার সম্পত্তি বাঁচানোর দায়িত্ব এবং নিয়োগকর্তারসাথে শ্রমিকদের নমনীয় সম্পর্কের যে বিষয়গুলি উল্লেখিত আছে তাতেই স্পষ্ট যে মালিকের মুনাফা বাড়ানোই এই কোডের উদ্দেশ্য। মালিক শ্রেণির সরকার শ্রমিক শ্রেণির পক্ষে আইন প্রণয়ন করবে তা প্রত্যাশা করাই যায় না।

|| ৭ ||

মোদী সরকার এক কৃষক বিরোধী সরকার। ড: স্বামীনাথন কমিটির সুপারিশ সহ ভূমিসংস্কারের কোন পদক্ষেপই সরকার নেয়নি। শুধুমাত্র কৃষকের আয় দ্বিগুর বা তিনগুণ করার ফাপা প্রতিশ্রুতি ছাড়া আছে। বার্ষিক কৃষকদের ৬০০০ টাকা করে ভর্তুকি দেওয়ার ঘোষণা। আর উল্টোদিকে কৃষক ও আদিবাসীদের জমি লুণ্ঠন করে কর্পোরেটের হাতে তুলে দিতে প্রথম দফায় ক্ষমতায় এসেই দীর্ঘ লড়াই-এর ফলশ্রুতিতে ১৮৮৪ সালের ভূমি অধিগ্রহণ আইন বাতিল করে ইউপিএ-২ সরকারের আমলে ২০১৩ সালে যে ‘দি রাইট টু ফেয়ার কম্পেনসেশন এন্ড ট্রান্সপারেন্সি ইন ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন, রিহাবিলিটেশন এন্ড রিসেটেলমেন্ট আইন’ প্রণীত হয়েছিল তা বদল করতে আইন ও অর্ডিন্যান্স জারি করে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, পুনর্দখল এবং অধিগ্রহণের সামাজিক অভিঘাতের বিষয়গুলি তুলে দিয়েছিল। প্রবল কৃষক শ্রমিক আন্দোলনে মোদী-১ সরকার শেষ পর্যন্ত পিছু হটেছিল। কিন্তু আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ আছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জেরে বিরোধীদের ছত্রভঙ্গ করে মোদী-২ সরকার আবার কৃষকদের উপর আঘাত হানবে।

তেমন আঘাত হানার বিল হল ইন্ডিয়ান ফরেস্ট অ্যাক্ট ১৯২৭ (সংশোধনী) বিল ২০১৯। এই বিলে সরকারি আধিকারিকদের বনভূমি সংরক্ষণে রক্ষকের ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। বনবাসীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগ্রহণের অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। গ্রামসভা ও পঞ্চায়েতের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে বনভূমি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। যে গুরুত্বপূর্ণ ‘ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট ২০০৬’ ইউপিএ-১ সরকারের আমলে প্রণীত হয়েছিল তার বিধিগুলিকে মোদী সরকার নস্যাৎ করার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারপক্ষ হাজির না থাকায় পদ্ধতি কারণে বনবাসীর ও আদিবাসীদের উচ্ছেদ করার যে আদেশ সুপ্রিম কোর্ট দিয়েছিলেন, প্রবল আন্দোলনে সুপ্রিম কোর্ট তা সাময়িকভাবে স্থগিত করলেও আদিবাসী ও বনবাসীদের আশঙ্কা দূর হয়নি। তাই ‘ভূমি অধিকার আন্দোলনে’ তীব্রতা বেড়েছে। এই লড়াইতে জয়-পরাজয়ের উপর অরণ্যরক্ষা ও বনবাসীদের জীবন জীবিকার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

|| ৮ ||

সপ্তদশ লোকসভার প্রথম অধিবেশনেই আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইন- ‘সেন্ট্রাল এডুকেশন ইনস্টিটিউশন (রিজার্ভেশন ইন টিচার্স ক্যাডার)’, ‘স্পেশাল ইকনমিক জোনস (অ্যামেন্ডমেন্ট) আইন’, ‘আধার এন্ড আদার লজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) আইন’, ‘মোটর ভেহিকলস (অ্যামেন্ডমেন্ট) আইন’ সহ মোট ৬০টি আইন এই অধিবেশনেই গৃহীত হয়েছে। বিরোধীদের সংশোধনী বা পার্লামেন্টের রীতি অনুযায়ী গুরুত্ব বিলগুলিকে সিলেক্ট কমিটি বা স্ট্যান্ডিং কমিটিতে পাঠানোর দাবি সরকার গ্রহণ করেনি।

সরকার চায় না বিরোধী কণ্ঠের প্রতিফলন। কণ্ঠরোধ করেই ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম করাই মোদী সরকারের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। এই লক্ষ্যে দুটি কর্মসূচি- এক, চিন্তার জগৎকে দখল করা দুই, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কালা-কানুনগুলোকে সংসদে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া। দুটি লক্ষ্যপূরণেই বিজেপি-সংঘ পরিবার আপাতত বিজয়ী। সংঘ পরিবার মোদীর মধ্যে দেখতে পেয়েছে হিটলারের মতো এক সর্বাধিনায়ক নেতা— যার নেতৃত্বে চলছে রাজনৈতিক প্রতিবিপ্লব। আর সংঘপরিবার তার সব ‘সাংস্কৃতিক’ সংগঠনগুলিকে মাঠে নামিয়ে ‘সাংস্কৃতিক প্রতিবিপ্লব’ সম্পূর্ণ করার কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। তাই চলছে প্রতিষ্ঠানের ধ্বংসসাধন ও উদারবাদী অর্থনীতির সংকটমোচনে সবরকমের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের জন্য কালাকানুন প্রণয়ন। হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঘৃণা ও বিভাজনের কুৎসিৎ রাজনীতি। জম্মু ও কশ্মীরের মতো এক অতি সংবেদনশীল বিষয়কে আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে সংবিধানকে ধ্বংস করে সবিধানে প্রদত্ত বিশেষ অধিকার কেড়ে নিয়ে রাজ্যটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভাজিত করা হল। প্রতিবাদ জানিয়েছেন বহু বিশিষ্ট মানুষ। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন জানিয়েছেন পশ্চিমী দুনিয়ার বাইরে ভারতই ছিল প্রথম দেশ, যেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। ভারতবাসী হিসেবে তিনি যে গর্ব অনুভব করতেন তা পদদলিত হওয়ায় তিনি ব্যথিত। ঐ রাজ্যে নিরাপত্তার অজুহাতে অবরুদ্ধ করে রাখাকে তিনি ঔপনিবেশিক আমলেই ফিরে যাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। বস্তুত মোদীজি দেশকে গণতন্ত্রের ও মানুষের অর্জিত অধিকারকে একেবারেই ধ্বংস করে দেশটাকে ক্রমশ ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিরত করতে চান। দেশের এমন পশ্চাদগামিতার বিরুদ্ধে মানুষ তীব্র প্রতিবাদে সামিল হয়েই এর মোকাবিলা করবে, স্বেচ্ছাচারী শাসককে ইতিহাস কখনই ক্ষমা করেনি।


410 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন