এবড়োখেবড়ো RSS feed

এবড়োখেবড়ো-র খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • থিম পুজো
    অনেকদিন পরে পুরনো পাড়ায় গেছিলাম। মাঝে মাঝে যাই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়। বন্ধুদের মা-বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ভাল লাগে। বেশ রিজুভিনেটিং। এবার অনেকদিন পরে গেলাম। এবার গিয়ে শুনলাম তপেস নাকি ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একটু পরে তপেসও এল ...
  • কাঁসাইয়ের সুতি খেলা
    সেকালে কাঁসাই নদীতে 'সুতি' নামের একটা খেলা প্রচলিত ছিল। মাছ ধরার অভিনব এক পদ্ধতি, বহু কাল ধরে যা চলে আসছে। আমাদের পাড়ার একাধিক লোক সুতি খেলাতে অংশ নিত। এই মৎস্যশিকার সার্বজনীন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়। মনে আছে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ...
  • শুভ বিজয়া
    আমার যে ঠাকুর-দেবতায় খুব একটা বিশ্বাস আছে, এমন নয়। শাশ্বত অবিনশ্বর আত্মাতেও নয়। এদিকে, আমার এই জীবন, এই বেঁচে থাকা, সবকিছু নিছকই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া, এমনটা সবসময় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না - জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পরিণ...
  • আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই...
    দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। দেশের সবচেয়ে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে বুয়েট। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছু বরাহ নন্দন! কাওকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কি খুব সহজ কাজ? কতটুকু জোরে মারতে হয়? একজন মানুষ পারে ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭
    চন্দ্রপুলিধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন ...
  • গুমনামিজোচ্চরফেরেব্বাজ
    #গুমনামিজোচ্চরফেরেব্...
  • হাসিমারার হাটে
    অনেকদিন আগে একবার দিন সাতেকের জন্যে ভূটান বেড়াতে যাব ঠিক করেছিলাম। কলেজ থেকে বেরিয়ে তদ্দিনে বছরখানেক চাকরি করা হয়ে গেছে। পুজোর সপ্তমীর দিন আমি, অভিজিৎ আর শুভায়ু দার্জিলিং মেল ধরলাম। শিলিগুড়ি অব্দি ট্রেন, সেখান থেকে বাসে ফুন্টসলিং। ফুন্টসলিঙে এক রাত্তির ...
  • দ্বিষো জহি
    বোধন হয়ে গেছে গতকাল। আজ ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ, সন্ধ্যাবেলায় আমন্ত্রণ ও অধিবাস। তবে আমবাঙালির মতো, আমারও এসব স্পেশিয়ালাইজড শিডিউল নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই তেমন - ছেলেবেলা থেকে আমি বুঝি দুগ্গা এসে গেছে, খুব আনন্দ হবে - এটুকুই।তা এখানে সেই আকাশ আজ। গভীর নীল - ...
  • গান্ধিজির স্বরাজ
    আমার চোখে আধুনিক ভারতের যত সমস্যা তার সবকটির মূলেই দায়ী আছে ব্রিটিশ শাসন। উদাহরণ, হাতে গরম এন আর সি নিন, প্রাক ব্রিটিশ ভারতে এরকম কোনও ইস্যুই ভাবা যেতো না। কিম্বা হিন্দু-মুসলমান, জাতিভেদ, আর্থিক বৈষম্য, জনস্ফীতি, গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অভাব, শিক্ষার অভাব ...
  • সার্ধশতবর্ষে গান্ধী : একটি পুনর্মূল্যায়নের (অপ?) প্রয়াস
    [কথামুখ — প্রথমেই স্বীকার করে নেওয়া ভালো, আমার ইতিহাসের প্রথাগত পাঠ মাধ্যমিক অবধি। তবুও অ্যাকাডেমিক পরিসরের বাইরে নিছকই কৌতূহল থেকে গান্ধী বিষয়ক লেখাপত্তর পড়তে গিয়ে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই অবিসংবাদী নেতাটি সম্পর্কে যে ধারণা লাভ করেছি আমি, তা আর ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

এবড়োখেবড়ো

[আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]


ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি পাচ্ছে ‘পথের পাঁচালী’; একই বছরে মৃণাল করছেন তাঁর প্রথম ছবি ‘রাতভোর’; আর ভারতীয় সিনেমার প্রকৃত পথপ্রদর্শক হিসাবে যাঁর সম্মানিত হওয়ার কথা সেই ঋত্বিকের ১৯৫২ সালে তৈরি ‘নাগরিক’-এ অভিনয় করছেন গীতা সোম যিনি পরের বছরে ঘরনি হবেন মৃণালের।

উনিশশো তেইশে মৃণাল সেনের জন্ম অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুরে। সেখানকার সজল-শ্যামল প্রকৃতিকে চিরবিদায় জানিয়ে ১৯৪০-এ তিনি কলকাতায় আসছেন সায়েন্স নিয়ে পড়তে। কলকাতার বৃহত্তর জগতের সঙ্গে ক্রমশ পরিচিত হচ্ছেন মৃণাল। কলেজে পড়তে পড়তেই সহসা খোঁজ পাচ্ছেন ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি (বর্তমানে ন্যাশনাল লাইব্রেরি)-র। সেখানে সকাল ন’টা থেকে সন্ধে ছ’টা অবধি কোনও বাছবিচার না করে গোগ্রাসে গিলছেন সাহিত্য-দর্শন-রাজনীতি-চলচ্চিত্র-সমাজতত্ত্ব-নৃতত্ত্ব-নন্দনতত্ত্বর ওপর লেখা যাবতীয় বইপত্তর। আর তার সঙ্গে তাঁর নিজের কথায় সিনেমা দেখছেন ‘চা খাওয়ার মতো করে’। এই সময়েই কালীঘাট দমকলের কাছে হেমবাবুর চায়ের দোকান ‘প্যারাডাইস ক্যাফে’-তে চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন ঋত্বিক-তাপস সেন-হৃষিকেশ-সলিল-বংশী চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে। চোখে তখন সিনেমা করার স্বপ্ন ক্রমেই দানা বাঁধছে।

ততদিনে বামপন্থায় আকৃষ্ট মৃণালকে নাড়িয়ে দিচ্ছে তেভাগা-তেলেঙ্গানা। একটা লজ্‌ঝড়ে ক্যামেরা জোগাড় করে চলে যাচ্ছেন কাকদ্বীপে ছবি করতে — যেখানে চিত্রনাট্য মৃণালের, সংগীত পরিচালনায় সলিল, পরিচালনায় ঋত্বিক আর হৃষিকেশ। কিন্তু সে ছবি শেষ না করতে পারার যন্ত্রণায় চিত্রনাট্য পুড়িয়ে দিচ্ছেন মৃণাল, পরবর্তীকালে যে কাজের জন্য আফশোস করতে দেখব তাঁকে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে চাকরির তীব্র মন্দার বাজারে উপার্জনের চেষ্টা তাঁকে কোনও কাজেই থিতু হতে দিচ্ছে না। তাই কখনও প্রুফ রিডার, কখনও ইংরেজির প্রাইভেট টিউটর, কখনও অনুবাদক, কখনও মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ-এর কাজ ছাড়ছেন তিনি। আর সিনেমা করার আগেই ১৯৫৩-য় প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর আজীবন ভালোলাগার মানুষটিকে নিয়ে প্রথম বই ‘চার্লি চ্যাপলিন’।

আমরা এক নিঃশ্বাসে যতই সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল উচ্চারণ করি না কেন, ভারতীয় চলচ্চিত্রের তিন মহীরূহই কিন্তু পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আলাদা ঘরানার। খোদ সত্যজিৎ তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে লিখেছেন ‘They started at about the same time as I did, Ritwik and Mrinal’। কিন্তু এ কথাও বলেছেন পাশাপাশি ‘They were making films very different from mine, very different, but very powerful, I think’। বিশিষ্ট চলচ্চিত্র সমালোচক ধীমান দাশগুপ্ত ‘গণশিল্পী ঋত্বিককুমার ঘটক বনাম ঋত্বিক : নিঃসঙ্গ স্রষ্টা’ প্রবন্ধে চমৎকারভাবে ধরেছেন এই তিন দিকপাল শিল্পীর আন্তঃসম্পর্ককে। তাঁর মতে, “সত্যজিৎ সমন্বিত, সুষম, শীলিত, কমনীয়। ঋত্বিক মন্থর, তীব্র, শিথিল, অনমনীয়। অন্যদিকে মৃণাল দ্রুত, তীক্ষ্ণ, তৎপর ও নমনীয়।” আর মৃণাল নিজে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন — “I am not a Kurosawa, I am not a Satyajit Ray, I am not a Godard, who believe in drawing sketches. I can’t do that. I can’t draw a single line. My films are a kind of thesis।”

সিনেমা পরিচালনা করতে গিয়ে ধ্রুপদী সাহিত্যকে নিজের ছবির আশ্রয় করতে চাননি তিনি। বরং সাহায্য নিয়েছেন কখনও আশীষ বর্মণ (‘পুনশ্চ’, ‘আকাশকুসুম’, ‘ইন্টারভিউ’, ‘পদাতিক’); কখনও অমলেন্দু চক্রবর্তী (‘একদিন প্রতিদিন’, ‘আকালের সন্ধানে’); কখনও বা মহাদেবী ভার্মা (‘নীল আকাশের নীচে’), কালিন্দীচরণ পানিগ্রাহী (‘মাটির মনিষ’) কিংবা মুন্সী প্রেমচন্দর (‘মৃগয়া’)। কাহিনি বৈচিত্র্যের মতোই ছবির ভাষার ক্ষেত্রেও একটি বা দু’টি ভাষায় চলচ্চিত্র বানিয়ে তিনি নিজেকে বন্দি করে রাখেননি। তাঁর আটচল্লিশ বছরের (১৯৫৫-২০০২) শিল্পজীবনে যে ২৮টি কাহিনিচিত্র নির্মাণ করেছেন মৃণাল, সেখানে তিনি বাংলা বাদেও বানিয়েছেন একটি ওড়িয়া, একটি তেলুগু এবং ছ’টি হিন্দি ছবি – যথাক্রমে ‘মাটির মনিষ’, ‘ওকা উরি কথা’, ‘ভুবন সোম’, ‘এক আধুরি কহানি’, ‘মৃগয়া’, ‘খণ্ডহর’, ‘জেনেসিস’ এবং ‘একদিন অচানক’। এ থেকে এটা স্পষ্ট যে মৃণাল আজীবন বিশ্বাস করেছেন চলচ্চিত্রের নির্দিষ্ট কোনও ভাষা হয় না, চলচ্চিত্র সাহিত্যের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া সম্পূর্ণ আলাদা একটি শিল্পমাধ্যম।

যদিও আমরা লক্ষ্য করি যে, ‘আকাশকুসুম’ থেকেই বাঁকবদল শুরু হচ্ছে পরিচালক মৃণালের, কিন্তু ভারতীয় চলচ্চিত্রের জগতে তাঁকে স্থায়ী আসন এনে দিচ্ছে ১৯৬৯ সালের ছবি ‘ভুবন সোম’। মৃণাল তাঁর ‘চলচ্চিত্র ভূত বর্তমান ভবিষ্যৎ’ গ্রন্থে লিখেছেন, “... বাংলা চলচ্চিত্র সম্পর্কে যে সংকটের কথা বলা হয় অর্থাৎ আর্থিক সংকট অর্থাৎ যে সংকট আসে জনপ্রিয়তার অভাব থেকে – সেই সংকট কাটাতে গেলে প্রথমেই যা করণীয় তা হল — ১) কম পয়সায় ছবি তোলা অর্থাৎ স্টার সিস্টেমকে বর্জন করা এবং অকারণ, অহেতুক, অসংগত জাঁকজমক বর্জন করা; ২) চলচ্চিত্রের বাজারের পরিধি বাড়ানো অর্থাৎ আঞ্চলিক গণ্ডি ডিঙিয়ে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা।” ‘ভুবন সোম’ যেন এই তত্ত্বের সার্থক বাস্তব প্রয়োগ। এই ছবি অনেক দিক দিয়েই নতুন — মৃণাল, উৎপল দত্ত এবং শেখর চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম হিন্দি ছবি; সুহাসিনী মুলের এ ছবিতেই প্রথম অভিনয়; কে কে মহাজনের প্রথম কাহিনিচিত্রে সিনেমাটোগ্রাফি; সংগীতকার বিজয় রাঘব রাও-এর প্রথম সংগীত পরিচালনা এবং অমিতাভ বচ্চনের প্রথম ভয়েস ওভার। মাত্র দেড় লাখ টাকায় বানানো, বনফুলের গল্পটার একটা আট পাতার খসড়াকে চিত্রনাট্য হিসাবে বিবেচনা করে গোটা সিনেমাটায় যে অনবদ্য ভাষ্য বুনে দেন মৃণাল, তা তাঁকে ভারতীয় সমান্তরাল সিনেমার পথিকৃতের সম্মান এনে দেয় অনায়াসে। দর্শক মুহূর্তের মধ্যে উপলব্ধি করেন যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভুবন সোম এত সোচ্চার ছিল, সেই দুর্নীতি গোটা ভারতে বজায় থাকবে বহাল তবিয়তেই।

‘ভুবন সোম’-এর ঠিক পরের বছর থেকেই সত্তরের উত্তাল কলকাতাকে সেলুলয়েডের ক্যানভাসে বন্দি করতে সত্যজিতের অপু-ত্রয়ী (পথের পাঁচালি-অপরাজিত-অপুর সংসার); ঋত্বিকের উদ্বাস্তু-ত্রয়ী (মেঘে ঢাকা তারা-কোমলগান্ধার-সুবর্ণরেখা)-র পর আমরা পেতে শুরু করি মৃণালের রাজনৈতিক-ত্রয়ী 'ইন্টারভিউ’-‘কলকাতা ৭১’-‘পদাতিক’। মৃণালের নিজের কথায়, “ ... এমনই একটা বিশ্বাস থেকে ’৬০-’৭০ দশকের সন্ধিক্ষণে নকশাল আন্দোলনকে দেখেছি, তা নিয়ে ভেবেছি, জড়িয়ে পড়েছি। এ-দেখার মধ্যে বেহিসেবিপনা ছিল, এ ভাবনার ভিতরে বেপরোয়া ভাবনা ছিল, এভাবে জড়িয়ে পড়ায় অনেকটাই আবেগ যুক্ত ছিল। কিন্তু এসবের মধ্যে আর কোনো হিসেব ছিল না, নির্লিপ্ত শীতল পর্যবেক্ষণ ছিল না, ছক কষার কোনো চেষ্টা ছিল না। নকশাল আন্দোলনকে সামনে রেখে কোনো অঙ্কটঙ্ক কষে ইন্টারভিউ, কলকাতা ৭১, কিংবা পদাতিক বানাইনি। ওই অস্থির সময়টার তাপ যখন যেভাবে মনের ওপর ছাপ ফেলেছে, সেভাবেই একের পর এক ছবিগুলো করে গেছি।” বস্তুতপক্ষে নকশালবাড়ির রাজনীতি নিয়ে এমন সংবেদনশীল আখ্যানের চারপাশ সত্যজিৎ সন্তর্পণে এড়িয়ে গেছেন, ঋত্বিকও যুক্তি-তক্কোতে যেভাবে ধরেছেন তাতে তাত্ত্বিক কচকচানি থাকলেও হৃদস্পন্দন কোথাও যেন অনুপস্থিত থেকেছে। কিন্তু মৃণাল তাঁর সমস্ত আক্রোশ-যন্ত্রণা-সহমর্মিতা-সমবেদনা উজাড় করে দিয়েছেন এই তিনটি ছবিতে।

এর পরেও যেন তিনি তৃপ্ত হতে পারেননি। তাই বাকি কথাগুলো বলার জন্য বেছে নিয়েছেন ‘কোরাস’-কে, যে ছবিতে সিনেমার ফর্ম নিয়ে অমন তীব্র দুমড়ানো-মোচড়ানো পরিচালকত্রয়ীর মধ্যে একমাত্র মৃণালই করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে ছবির মূল ভাবনাকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে :“ ‘কোরাস’ আমাদের ছবিতে শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় একটি ব্যাপক অর্থে — বিশাল মানুষের এক বিশাল ইচ্ছা — বিস্তর মানুষ, অনেক কথা, বহু লড়াই, সব যখন একীভূত হয়ে যায়, একটা সাংগীতিক মুহূর্তের সৃষ্টি হয়, অর্থাৎ একটা collective আবেগ বা ইচ্ছা — তারই নাম ‘কোরাস’।” এই চারটি ছবিই মৃণালকে নিঃসন্দেহে প্রথম ভারতীয় রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকার হিসাবে আমাদের কাছে তুলে ধরে।

মৃণাল বরাবরই আঙ্গিকসচেতন পরিচালক। ছবির বিষয়বস্তুকে আরও তীক্ষ্ণ, আরও জোরালো করতে গিয়ে বিভিন্ন ছবিতে তিনি আঙ্গিকের যে সচেতন প্রয়োগ ঘটিয়েছেন তার উল্লেখ যতই করা হোক না কেন তা অসমাপ্ত থাকতে বাধ্য। মৃণাল নিজে জানিয়েছেন, “যেভাবে এতকাল বলা হয়েছে, সেইভাবে যদি না বলে অন্যভাবে বলা যায় তাহলে বলার চেহারাটাও পাল্টে যায়। বলা তো হয়ে গেছে প্রচুর কথা এবং সে কথাগুলোই তো আমরা বারবার বলছি। তাই চলতি লিনিয়ার স্ট্রাকচারের বাইরে যেতেও মন চায় প্রায়ই।” তাই আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করি — ‘আকাশকুসুম’-এ ফ্রিজ শটের ব্যবহার; ‘ভুবন সোম’-এ মাস্ক শটের ব্যবহার করে গল্পটা মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিয়ে ভুবন সোমের ভেতরের কথাগুলো বলিয়ে নেওয়া; ‘ভুবন সোম’-এই একজন আমলার বন্দিদশা ও তার চরিত্রটির যান্ত্রিকতা দেখাতে গিয়ে ছবির শুরুতে অ্যানিমেশনের ব্যবহার, ‘মৃগয়া’-তে ডুংরিকে (অভিনয়ে মমতাশঙ্কর) ধরে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তটায় কোনও শারীরিক টানাহ্যাঁচড়া না দেখিয়ে স্রেফ তার পালকিতে ওঠা- দরজা বন্ধ হওয়া-এবং সর্দারের (অভিনয়ে অনুপকুমার) কর্কশ কণ্ঠস্বরের সাউন্ড এফেক্টের দুর্দান্ত ব্যবহার; ‘কোরাস’-এ ইমেজের ফাঁকে সাদা স্ক্রিন, ‘কলকাতা ৭১’-এ ট্রলিতে না চাপিয়ে হাতে ধরে ক্যামেরা চালানো; ‘একদিন প্রতিদিন’-এ সাংবাদিকতার ঢঙে ন্যারেশন কিংবা ‘কলকাতা ৭১’-এই ব্রেশটিয় পদ্ধতি অনুসারে আলাদা আলাদা এপিসোডে ন্যারেটিভের অখণ্ড প্যাটার্নকে ভেঙে ফেলা ইত্যাদি।

এই আঙ্গিকসচেতন মৃণাল তাঁর আঙ্গিকের সম্ভবত সার্থকতম প্রয়োগটি করেন ‘আকালের সন্ধানে’ ছবিতে, যেখানে একবারের জন্যও চিরাচরিত ফ্ল্যাশব্যাক পদ্ধতির সাহায্য না নিয়ে অসাধারণ দক্ষতায় ৪৩-এর মনুষ্যসৃষ্ট আকালকে তিনি মিলিয়ে দেন ১৯৮০-র বর্তমান মন্বন্তরের সঙ্গে। কেবলমাত্র কাহিনির বিনির্মাণের মাধ্যমে তিনি অতীত ও বর্তমান সময়কালের স্থান পরিবর্তন করে দেন এই চলচ্চিত্রে। বুঝিয়ে দেন আসলে ৪৩ আর ৮০-র মধ্যে ফারাক কিছুই নেই। তাই সিনেমার স্মিতা (অভিনয়ে স্মিতা পাতিল) কখন যেন রূপান্তরিত হয়ে যান বাস্তবের দুর্গায় (অভিনয়ে শ্রীলা মজুমদার)। তাঁর কলকাতা-ত্রয়ী যদি হয়ে থাকে নকশালবাড়ির থিসিস, তাহলে অনায়াসে এই ছবিকে চিহ্নিত করা যেতে পারে মৃণালের আকালের থিসিস হিসাবে।

আসলে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে মৃণাল কখনও বিশুদ্ধতাবাদীদের মতো আড়ষ্টতায় ভোগেননি। তিনি বিশ্বাস করেছেন যে, একটি সংবাদপত্রের কেবলমাত্র হেডলাইন থেকেও ছবি বানানো যেতে পারে। চলচ্চিত্র যে একটি বিশুদ্ধ মাধ্যম নয়, বরং সেখানে মুনশিয়ানার সঙ্গে অন্য মাধ্যমের নানা জিনিস ব্যবহার করা হলে তা যে সার্থক চলচ্চিত্রও হয়ে উঠতে পারে – সে ব্যাপারে নিঃসন্দিহান ছিলেন তিনি। তাই মৃণালের মতো আর কোনও ভারতীয় পরিচালকের ছবিতে এত বিভিন্ন, বিবিধ ও বিচিত্র বিষয়ের সংঘাত ও সহাবস্থান ঘটেনি। তাঁর সিনেমা তৈরিতে তিনি চলচ্চিত্র ছাড়াও অন্যান্য মাধ্যম থেকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেছেন চিত্রকলা, আলোকচিত্র, বিজ্ঞাপন, ফিল্ম তৈরির ছবি, বেতারানুষ্ঠান, সংবাদপত্রের বিবৃতি ও শিরোনাম, পোস্টার, হোর্ডিং, ডামি, স্ট্যাচু ইত্যাদি নানাবিধ জিনিস। আবার সিনেমারই প্রয়োজনে চলচ্চিত্রের মূল কাহিনিটিকে প্রয়োজন মতো ভেঙেচুরে নিয়ে তাঁর ছবিকে দিয়েছেন এক অব্যর্থ পটভূমি। ‘ভুবন সোম’-এর মূল কাহিনির সাহেবগঞ্জকে তিনি বদলে দেন সৌরাষ্ট্রের মায়াবী জগতে; ‘ওকা উরি কথা’-য় প্রেমচন্দের ‘কাফন’-এর উত্তরপ্রদেশের কঠিন শীতের রূঢ়তাকে তিনি প্রতিস্থাপন করেন দক্ষিণ ভারতের তেলেঙ্গানা দিয়ে; আবার প্রেমেন্দ্র মিত্র-র ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ থেকে যখন ‘খণ্ডহর’ করেন তিনি, তখন সুভাষকে মাছধরা বাঙালি থেকে পাল্টে দেন স্টিল ফটোগ্রাফারে। ছবির শেষ ভাগে তাই দেখি খণ্ডহরের যামিনী সুভাষের কাছে নেহাতই একটা মুহূর্ত মাত্র, একটা ছবি তোলার সাবজেক্ট বিশেষ, যা শেষ হয়ে গেলে যামিনী সম্পর্কে সুভাষের অপরিসীম নির্লিপ্তি চমৎকারভাবে প্রস্ফুটিত হয়।

কলকাতা ট্রিলজি পর্বে যে রাগী মৃণালকে, যে সোচ্চার মৃণালকে আমরা দেখি; ১৯৮০তে এসে সেই একই মৃণাল রাষ্ট্রের দিকে আর অভিযোগের তর্জনী তোলেন না। বরং তাঁর মধ্যমা-অনামিকা-কনিষ্ঠার অভিমুখ ঘুরিয়ে দেন নিজের দিকে, মধ্যবিত্ত মৃণালের দিকে। বারবার আমাদের চুল ধরে টেনে এনে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেন, নগ্ন করে দেন মধ্যবিত্তের অসহায়তা-দোদুল্যমানতা-স্বার্থপরতা-নির্লজ্জতা-শঠতা-নির্লিপ্ততাকে। এইবার তিনি বানান তাঁর মধ্যবিত্ত ট্রিলজি ‘একদিন প্রতিদিন’-‘চালচিত্র’-‘খারিজ’। এই সব ছবিতে মৃণাল শান্ত, পরিণত, নিরুচ্চার অথচ দর্শকের সঙ্গে সংযোগের কাজটি করে চলেন ঋষিসুলভ নিরাসক্তি নিয়ে। এই ছবিগুলোতে তিনি একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গোটা ছবির সংকটটাকে ধরেন; সকাল থেকে সন্ধে, বা সন্ধে থেকে পরদিন সকাল বা এই সকাল থেকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত। আর রেকারেন্ট মোটিফের মতো ফিরে ফিরে আসে একটা পলেস্তারা-খসা, স্যাঁতস্যাঁতে পাকা বাড়ি যা হয়তো ওই বাড়িটির বাসিন্দাদের ভেতরের চেহারাটার রূপক।

‘একদিন প্রতিদিন’ ছবিতে চিনুর বাড়িতে এসে চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়ে একটি মেয়ের আত্মহত্যার চেষ্টার খবর দেয় পুলিশ। মেয়েটির খোঁজে এন আর এস হাসপাতালের এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে হাজির হন অসংখ্য অভিভাবক — যাঁদের ওইদিনই কারও নাতনি, কারও কন্যা কিংবা কারও বোন রাতে বাড়িতে ফেরেনি। মেয়েটি হাসপাতালে মারা গেলে তাঁর মৃতদেহ শনাক্ত করতে একে একে এগিয়ে যান ওই অভিভাবকরা। মেয়েটি যে তাঁদের পরিচিত নয় তা বুঝতে পেরে স্বস্তির শ্বাস ফেলে হাসপাতাল চত্বর ছাড়তে থাকেন তাঁরা। অবশেষে শেষ ব্যক্তি হিসাবে মেয়েটির দাদা চিনতে পারেন তাঁর বোনের মৃতদেহ। কিন্তু কী আশ্চর্য, সেই নিদারুণ কষ্টের মধ্যে তিনি অনুভব করেন তাঁর আশেপাশে কোনও সমব্যথী নেই - তিনি সম্পূর্ণ একা। আবার ‘খারিজ’ ছবিতে দেখা যায় একটি শিশুকে গৃহকর্মের কাজে লাগানো গৃহস্বামী অঞ্জন (অভিনয়ে অঞ্জন দত্ত) যতই বলুন না কেন ‘ও আমাদের বাড়ির লোকের মতোই ছিল’, দর্শক কিন্তু নিশ্চিতভাবেই বুঝে ফেলেন পালান ছিল নিপাট অবহেলার পাত্র। এতটাই অবহেলা যে, তাঁরা পালানের জন্য বরাদ্দ করেছিলেন ঘুলঘুলিহীন রান্নাঘরটি যেখানে উপযুক্ত অক্সিজেন ঢুকতেই পারে না।

বরাবর বাঙালির মধ্যবিত্তের অসার স্বপ্নের বা স্বপ্নভঙ্গের কাহিনিকার ছিলেন বলেই বোধ হয় বাঙালি দর্শকের অধিকাংশের কাছে কখনওই খুব ‘কাছের মানুষ’ কিংবা ‘পছন্দের পরিচালক’ হয়ে উঠতে পারেননি মৃণাল সেন। বরং চিরকালই তাঁকে ভাবা হয়েছে সত্যজিৎ-ঋত্বিকের মধ্যবর্তী হাইফেন চিহ্ন হিসাবে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক-প্রাবন্ধিক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন :‘দুর্ভাগ্য, নাকি ভাগ্যই বলব, মৃণাল সেনের, তিনি কোনো দিন বাঙালির দেবকুলে স্থান পাননি’। এ মূল্যায়ন বর্ণে বর্ণে সত্যি। অথচ মৃণাল নিজ গুণেই মৃণাল, সত্যজিৎ-ঋত্বিকের তুমুল উপস্থিতি অগ্রাহ্য করেই মৃণাল। তাঁকে যদি চিনতে না পারি আমরা তবে সে দায় আমাদের,আমাদের চলচ্চিত্রবোধের। তাই সত্যজিৎ-ঋত্বিকের সঙ্গে কেবলমাত্র মৃণালের নামোচ্চারণ করলেই আমাদের দায় মেটে না, মৃণাল প্রকৃতপক্ষে তার চেয়ে অনেক বেশি আলোচনার জন্য দায়বদ্ধ করেন আমাদের।

এই মরা পৃথিবীতে এখনও মায়াবী আলো ছড়ানোর অপার ক্ষমতাশালী মৃণাল,আপনাকে আনত কুর্নিশ।


ঋণ :
১. প্রলয় শূর (সম্পাদিত), ‘মৃণাল সেন’, বাণীশিল্প, কলকাতা, ১৯৮৭
২. ধীমান দাশগুপ্ত, ‘সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল ও অন্যান্য’, এবং মুশায়েরা, কলকাতা, ২০০৭
৩. মৃণাল সেন, ‘চলচ্চিত্র ভূত বর্তমান ভবিষ্যৎ’, সপ্তর্ষি, কলকাতা, ২০১৩
৪. শিলাদিত্য সেন, ‘মৃণাল সেনের ফিল্মযাত্রা’, প্রতিক্ষণ, কলকাতা, ২০১৫

(লেখাটি চারু মজুমদার জন্ম-শতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত 'নবান্ন', ত্রিংশতি বর্ষ, বর্ষা সংখায় প্রকাশিত ও ঈষৎ পরিমার্জিত)


425 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 21 -- 40
Avatar: ©

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

খ লিখলেন "ওনার ন্যারেটিভ ফিচার ফিল্ম বানানোর স্কিল ছিল না .... কিন্তু ওনার অসামান্য ডকুমেন্টেশন এর স্কিল ছিল"
ন্যাড়া সেটা পড়ে লিখলেন "খনুর সঙ্গে খুব একমত হলাম আর এক ব্যাপারে যে মৃণাল সেন মূলত লিনিয়ার ন্যারেটিভ ... বানানোর ব্যাপারে স্কিলড। ভারতের এবং সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ওপর দিকের একজনই হবেন। "

এ মানে দিন রাত ইত্যাদি ... মতটাই গুলিয়ে গেল।
Avatar: ন্যাড়া

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

আমিই খনুর মতটা হবুল পড়েছিলাম, ধরিয়ে দেবার জন্যে ধন্যবাদ। আমার মতটা একই আছে, খালি খনুর সঙ্গে এ ব্যাপারে আর একমত হওয়া গেলনা।
Avatar: lcm

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

মৃণাল সেন পরীক্ষামূলক সিনেমা বানাতেন, এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম, যাকে বলে আঁভা গার্দ সিনেমা, বিশের দশকে যার শুরু।
এই যেমন ধরুন, সিনেমার অডিয়েন্স, মানে যাকে বলে ফোর্থ ওয়াল - চতুর্থ দেওয়াল, সেই দেওয়ালের ওপারে যারা আছেন, মানে দর্শকরা, তাদের সঙ্গে কমুনিকেট করা। সিনেমা প্রদর্শন ক্ষেত্রকে একটি চতুর্ভূজ আকারের ঘর হিসেবে দেখলে, তার একটি দেওয়ালে পর্দায় সিনেমা দেখানো হয়, আর দুই পাশে দুই দেওয়াল, শেষের চতুর্থ দেওয়াল হলেন দর্শক। তো সিনেমা যখন ফোর্থ ওয়ালের সঙ্গে কথা বলে, এই যেমন, 'ইন্টারভিউ' (১৯৭০) এর দৃশ্যটি দেখুন -

https://www.youtube.com/watch?v=MLD2zts6BIs
এখানে রঞ্জিত মল্লিক হঠাৎই সিনেমার দর্শকদের উদ্দেশ্যে কথা বলতে আরম্ভ করেন - (যার সারমর্ম হল) মৃণাল সেন নামের একজন পরিচালক একটি ফিল্ম বানাচ্ছেন যাতে আমি কাজ করছি, পরিচালক আমাকে বলেছেন যে এই সিনেমার জন্য বিশেষ কিছু করতে হবে না, আমি ঠিক সেই অর্থে অভিনেতা নই, আমি রোজ যা করি তাই করব, ক্যামেরাম্যান তাই রেকর্ড করবেন, যেমন আজ একটা চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাবো, এবং মৃণাল সেন বলেছেন - ঠিক আছে ওটা নিয়েই সিনেমা হবে ---- এই বিবরণ রঞ্জিত মল্লিক দর্শকদের উদ্দেশ্য করে বলছেন (ক্যামেরা দিকে তাকিয়ে ক্লোজ-আপ শট)। এই সিনেমায় শেষের দিকের একটি দৃশ্যে রঞ্জিত মল্লিক দর্শকদের কে জিগ্গেস করছেন - আমার যদি কিছু জমানো টাকা থাকত, দু-চারটে এক্সট্রা স্যুট-টাই থাকত, তাহলে কি এই চাকরিটা আমি পেতাম না, আপনারা বলুন?
এই যে টেকনিক এটি এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মমেকাররা ব্যবহার করেছেন। এই যেমন গদার-এর পেরো লে ফু থেকে -
https://www.youtube.com/watch?v=9roYGIWyHsE
এখানে লোকটি মেয়েটির সঙ্গে গাড়ি চালাতে চালাতে কথা বলছেন, ক্যামেরা(/দর্শক) পিছন থেকে তাদের কথা শুনছে, হঠাৎ লোকটি পিছন ফিরে ক্যামেরা উদ্দেশ্যে বলে - দেখো এই মেয়েটি মনে করেন এসব করলে নাকি ফান্‌(মজা) হবে। মেয়েটি ঘাবড়ে গিয়ে জিগ্গেস করে - তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ। লোকটি বলে, দর্শকদের উদ্দেশ্যে।

এছাড়া এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম মেকাররা যেসব টেকনিক ব্যবহার করতেন তার অনেক কিছুই - যেমন, জাম্প-কাট শট, বা ছবির ফ্রেম হঠাৎ ফ্রিজ করে দেওয়া - এই সব কিছু মৃণাল ব্যবহার করেছেন। একটি বইতে পড়েছিলাম, উনি কে কে মহাজন (ওনার বেশির ভাগ ছবির ক্যামেরাম্যান) কে বলছেন - যা পাচ্ছ সব শুট করে নাও, কোনো স্টক ফেলে দিও না, পরে আমি দেখব কি করা যায়। এটা খানিকটা ডকুমেন্টারি স্টাইল।

তো, কথা হল, সিনেমার ন্যারেটিভ সব ফিল্ম মেকারেরই থাকে, মানে দে ন্যারেট সামথিং। লিনিয়ার ন্যারেটিভ - মানে এডিটিং এ পর পর সিকোয়েন্সিয়ালি ঘটনাবলী সাজানো, বা, নন-লিনিয়ার মানে যেখানে একাধিক সময়ের ভিন্ন ঘটনাবলী এনে টুকরোগুলোকে এমনভাবে সাজানো হবে যাতে একটা ন্যারেটিভ তৈরি হয় - এগুলি ছিল। কিন্তু মৃণাল প্রায় অবসেস্‌ড্‌ হয়ে পড়েছিলেন ইনকনক্লুসিভ ন্যারেটিভ, মানে যেখানে কাহিনীর(/সিনেমার) শেষ বলে কিছু নেই। হয়ত এই কারণেই উনি কখানো ডিটেকটিভ স্টোরি নিয়ে সিনেমা করেন নি - মানে যেখানে সিনেমা শেষ হল কোনো রহস্য সমাধান নিয়ে নয়, বরং অনেক অপশন দর্শকের পকেটে গুঁজে দিয়ে। মৃণাল চাইতেন তার সিনেমা দেখে দর্শক একটু, সামান্যতম হলেও, একটু ভাবুক। সিনেমার মিডিয়ামকে পিওর আর্ট ফর্মের মধ্যে রেখেও সমাজ ব্যবস্থার দর্পণ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন, নিউজ মিডিয়া নয়, ডকুমেন্টারিও নয়, সিনেমার ন্যারেটিভ এর মধ্যে দিয়ে সমসাময়িক সমাজ ও সময়ের প্রতিফলন। খুব বেশি এক্সপেরিমেন্টাল সিনেমার একটা প্রবলেম হল, আল্টিমেটলি ফাইনাল প্রোডাক্টটি কি দাঁড়াল সেটি বোঝা যায় না, সিনেমার নন-টেকনিক্যাল দর্শক যারা এই বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বা পদ্ধতিগত পরীক্ষানিরীক্ষা ধরতে পারছেন না, তাদের কাছে ফাইনাল প্রোডক্টটি সামান্য দুর্বোধ্য হয়ে উঠতে পারে। মৃণালের কিছু সিনেমা এই ফাঁদে পড়ে গেছে।


Avatar: (?)

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

“হবুল” পড়াও কি কোনও অপ্রচলিত পারিবারিক বাংলা? ন্যাড়ার থেকে অনেক নতুন শব্দ শিখছি। ধন্যবাদ
Avatar: ন্যাড়া

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

ইউ আর ওয়েলকাম। মাথায় থানইঁট-দের শেখানো সামাজিক কর্তব্য।
Avatar: রঞ্জন

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

"মৃণাল চাইতেন তার সিনেমা দেখে দর্শক একটু, সামান্যতম হলেও, একটু ভাবুক। সিনেমার মিডিয়ামকে পিওর আর্ট ফর্মের মধ্যে রেখেও সমাজ ব্যবস্থার দর্পণ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন, নিউজ মিডিয়া নয়, ডকুমেন্টারিও নয়, সিনেমার ন্যারেটিভ এর মধ্যে দিয়ে সমসাময়িক সমাজ ও সময়ের প্রতিফলন"।
--- আমার চোখে এটাই মৃণালের সিনেমার ইউ এস পি।
বেশি ভাল লেগেছে -- ভুবন সোম, আকালের সন্ধানে, একদিন প্রতিদিন এবং খন্ডহর ও এক দিন অচানক।
Avatar: রঞ্জন

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

" অর্থাৎ কেতাবী অবিচুয়ারি যেখানে শেষ হয়, তার পর থেকে শুরু হোক আপনার পরবর্তী আলোচনা।"
-- ইয়েস। ঃ))
Avatar: খুকখুক

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

এডিটিং নিয়ে একটু বলবেন মানিক-মৃণাল পাশাপাশি তুলনামূলক অল্প করে? বচ্চনবাবু দুজনের সিনেমাতেই শুধু ভয়েস ওভার দিয়েছেন, তিনি মানিকবাবুর এডিটিং নিয়ে উচ্ছ্বসিত সংগত কারণেই - "উস টাইম মে উয়ো ফিল্ম কা চরকা চলতা থা, ক্যায়সে উয়ো আন্দাজ লাগাতে থে কে ইয়েহি পে কাট হোনা চাহিয়ে? ডিজিটাল মে তো ফট সে হো যাতা হ্যায়" ইত্যাদি। তো সেই ফিল্ম কা চরকার যুগে বসে মৃণালের এডিটিং কি সেই মানেরই?
Avatar: এবরোখেবড়ো

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

আসলে আমি একটু রাতের দিকে সাইটে আসি। তাই এই সামান্য লেখা নিয়ে এত এত আলোচনা এতক্ষণে নজরে পড়ল। প্রায় সবাইকে আমার মতো করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।

@ন্যাড়া, মানে যাঁকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় ছিল, তিনি অনেকটা লিখেছেন। তাঁর ভাবনাকে সম্মান করেও বলি তাঁর আলোচনা আমার অত্যন্ত গতানুগতিক লেগেছে। কেন গতানুগতিক? বলি এক এক করে।

উনি লিখেছেন --- ১) খনুর সঙ্গে খুব একমত হলাম আর এক ব্যাপারে যে মৃণাল সেন মূলত লিনিয়ার ন্যারেটিভ (ধরে নিচ্ছি খনু ন্যারেটিভ বলতে লিনিয়ার ন্যারেটিভই বুঝিয়েছে) বানানোর ব্যাপারে স্কিলড। ... ভুবন সোম, মৃগয়া থেকে খন্ডহর, খারিজ, চালচিত্র - সবই একজন কম্পিটেন্ট স্টোরি-টেলিং-এর চিহ্ন।

আমি তা একদমই মনে করি না। এবং আশ্চর্য ব্যাপার মৃণালের প্রশংসা মানেই গপ্পো বলা এবং নিন্দা মানেই গপ্পো না বলা এবং আঙ্গিকের অতি ব্যবহার। মৃণাল তো ইচ্ছাপূরণও বানিয়েছেন কিন্তু তাই বলে কি আমরা ওই ছবিটাকে আলোচনায় রাখি? মৃণাল যেখানে ন্যারেটিভ ভাঙছেন, কিংবা অজস্র ন্যারেটিভ দিয়ে একটা অখণ্ড ন্যারেটিভ নির্মাণ করছেন সেখানেই তাঁর মুনশিয়ানা। সে কলকাতা ৭১ হোক বা কোরাস।

২) কলকাতা ট্রিলজি - অর্থাৎ কলকাতা ৭১, কোরাস আর ইন্টারভিউ থেকে মৃণাল ফর্ম নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে গেলেন। --- এইটা মৃণালের অতি গতানুগতিক সমালোচনা। প্রথমত তথ্যের খাতিরে বলি, মৃণালের কলকাতা ট্রিলজি হচ্ছে ইন্টারভিউ-কলকাতা ৭১-পদাতিক। দ্বিতীয়ত মোটেই ওই পর্ব থেকে মৃণাল ফর্ম নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা শুরু করেননি। করেছেন ঢের আগে মানে সেই নীল আকাশের নীচে থেকেই। আমরা দেখি মৃণালের কোনও ছবিতেই ডিজলভ বা মিক্স ইনের ব্যবহার নেই। বদলে আছে শার্প কাট। কোরাস কি শুধুই ফর্ম? তার কনটেন্ট নেই? আছে, তীব্রভাবে আছে। অথচ গুগাবাবা বা হীরক রাজার দেশের সেট নিয়ে যত বাক্য বয়িত হয়, তার সিকিভাগও বরাদ্দ হয় না কোরাসের ইনডোর নিয়ে। আকালের সন্ধানেতেও তাই।

৩) তার ফলে ঋত্বিককেও স্বীকার করতে হয়েছে, "লম্বুর মতন ক্যামেরা বসাতে আর কেউ পারেনা"। --- এইটা অতিশয়োক্তি বললে কম বলা হয়। মানে লম্বুর ছবিতে একটাই পোস্ট, বাকি সব ল্যাম্পপোস্টের মতো শোনায় আর কি! ওই ঋত্বিক যে অভিযানের ক্যামেরা বসানো নিয়ে তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করে হল থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন সেসব ডকুমেন্টেড।

ব্যাপারটা আসলে আমার কাছে ঋত্বিক-মৃণাল-সত্যজিৎ এই ক্রমে আসে। সবার তা ভালো না-ও লাগতে পারে।


Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

@এলসিএম আমার অনেক আগেই যা যা লিখে ফেলেছেন তার অনেকটাই আমার কথা। আলাদা করে ধন্যবাদ দিচ্ছি না। শুধু ব্রেশটিয় আঙ্গিক বোঝাতে গিয়ে চমৎকারভাবে উনি যেভাবে ইন্টারভিউয়ের দৃশ্যটা উদাহরণ হিসাবে দিয়েছেন তার কলাকৌশলটা শিখে নিতে চাইছি। পরবর্তীতে ছবি ধরে ধরে মৃণালের স্বকীয়তা দেখানোর জন্য যা আমার কাজে লাগবে।
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

@খুকখুক, এডিটিং নিয়ে সত্যজিৎ-মৃণালের তুলনামূলক আলোচনা চেয়েছেন যদিও সাক্ষীগোপাল হিসাবে অমিতাভকে ধরে তিনি সত্যজিৎকেই এগিয়ে রেখেছেন। এক্ষেত্রেও ওই লম্বুর ছবিতে একটাই পোস্ট, বাকি সব ল্যাম্পপোস্টের সিনড্রোম পরিদৃশ্যমান!

দুলাল দত্ত প্রথমাবধি সত্যজিতের ছবির সম্পাদনা করেছেন, মৃণালের ছবির বেশিটাই করেছেন গঙ্গাধর নস্কর। বাঙালি নস্করবাবুর নাম শুনেছে কিনা সন্দেহ যদিও তিনি একদিন প্রতিদিন এবং আকালের সন্ধানের জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পাদনার পুরষ্কার পেয়েছেন।

মৃণাল নিজে সম্পাদনার টেবিলে বহু ইমপ্রোভাইজেশন করেছেন। কলকাতা ৭১ বা চালচিত্র দেখলে বোঝা যাবে তিনি শহর কলকাতার মুডকে ধরেছেন অসংখ্য খণ্ডচিত্রের মাধ্যমে। এই কোলাজ মৃণালের ছবিকে বিশেষত্ব দিয়েছে। আরেকটা ব্যাপারও লক্ষণীয়, কলকাতার বা অন্য কোনও জায়গার মিছিলের ছবিতে ফ্রেম বেঁকেছে, নিটোল হয়নি, ক্যামেরা হাতে ধরে তোলা হয়েছে এবং অবিকল একই রাখা হয়েছে সম্পাদনার পরেও। এটাও কিন্তু যথেষ্ট সাহসের পরিচায়ক। সিনেমা যে এভাবেও তোলা যেতে পারে সেটা ভাবায় বইকি। বা ভুবন সোমে গরুর গাড়ি যখন জোরে ছুটছে তখন দ্রুতগতির ট্রেনের আওয়াজ অথবা পদাতিকে শাওয়ার চালিয়ে স্নান করার সময় বোমার শব্দ -এগুলোও কিন্তু ভারতীয় চলচ্চিত্রে নতুনই।

সত্যজিতের সব কিছুই খেরোর খাতায় লিপিবদ্ধ, একচুল এদিক ওদিক হওয়ার জো নেই, মৃণাল-ঋত্বিকের খেরোর খাতা তাঁদের মস্তিষ্কে।
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

@#, আপনাকে এর আগেও বলেছি আপনি টেকনিক্যাল ব্যাপারে যতটা চোস্ত, আমি ঠিক ততটাই ল্যাদারুস। অনেক ধন্যবাদ মৃণাল সম্পর্কিত লেখাপত্তরগুলো এক জায়গায় রাখার জন্য, আরও কিছু লেখার সন্ধান দেওয়ার জন্য। চলচ্চিত্রপঞ্জী বানানোই যায়, তবে যেহেতু @কেসি আমার লেখায় উল্লিখিত সমস্ত বইই পড়েছেন, তাই তাঁকে অনুরোধ করব শিলাদিত্য সেন-এর বইটা থেকে সেটা টাইপ করে দেওয়ার।


পুরস্কার নিয়ে আপনি যা যা লিখেছেন সেটা বাদে সামান্য সংযোজন করি এখানে।

১)পুনশ্চ - ১৯৬১ - তৃতীয় শ্রেষ্ট কাহিনিচিত্রের জাতীয় পুরস্কার
২) আকাশকুসুম - ১৯৬৫ - শ্রেষ্ঠ বাংলা কাহিনিচিত্রের জাতীয় পুরস্কার
৩) মাটির মনিষ - ১৯৬৬ - শ্রেষ্ঠ ওড়িয়া কাহিনিচিত্রের জাতীয় পুরস্কার
৪) ইন্টারভিউ - ১৯৭০ - শ্রীলঙ্কা চলচ্চিত্র উৎসবে ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড
৫) একদিন অচানক - ১৯৮৯ - শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেত্রী (উত্তরা বাওকর)-র জাতীয় পুরস্কার

Avatar: agantuk

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

ন্যাড়াবাবুর জন্য একটা ছোট সংশোধনঃ মৃণালের আসল শুরু কিন্তু ১৯৫৫য়, ছবি বিশ্বাস/সাবিত্রী/উত্তম কুমার অভিনীত 'রাত ভোর' দিয়ে, যেটিকে পরিচালক সারা জীবন ধরে আরো প্রবলভাবে ডিস-ওন করে এসেছেন।

২০১১তে রঞ্জন দাসগুপ্তকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মৃণাল বলেনঃ I never consider it to be my first break as a director. It was not at all a memorable film of mine by any standards. I have forgotten “Raat Bhor” and do not want to preserve any memories of the film.

যদিও, ন্যাড়াবাবু যেমন বলেছেন, 'নীল আকাশের নিচে' নিয়েও মৃণাল সন্তুষ্ট ছিলেন না। সত্তরের দশকে Cineaste পত্রিকার গ্যারি ক্রাউডারকে বলেনঃ I think it’s too sentimental and I wouldn’t want to be remembered for that film.

আর একটা কথাঃ গদার, ব্রেশট নিয়ে আলোচনা ভাল। কিন্তু আমরা হামেশাই চোখ মেলে ঘরের দু'পা বাইরের শিশির বিন্দু দেখতে ভুলে যাই। মৃণাল কিন্তু রঞ্জন দাসগুপ্তকে এও বলেছিলেনঃ Tapan Sinha was also improving as a director film by film around that period and I literally cried after watching his “Khanaker Atithi” in the late '60s, an unforgettable cinematic creation. I admired the works of Rajen Tarafdar, Ajay Kar and Asit Sen, who contributed substantially for the development of Bengali cinema.


Avatar: অর্জুন

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার


গীতা সেন তপন সিংহের খুব বড় ফ্যান ছিলেন। স্বামীকে বলেছিলেন 'তোমাদের মধ্যে তপনই একমাত্র পরিচালক যার ছবি আমার ভাল লাগে, বুঝতে পারি।'
Avatar: অর্জুন

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার


যদিও এ লেখায় এটার গুরুত্ব আছে কিনা জানিনা। তা হল মৃণাল সেন ও সত্যজিৎ রায়ের বিরোধ বিষয়ক । দুজনের ঠোকাঠুকি লাগত বেশ। মৃণাল সেন কড়া কথা শোনাতে ছাড়তেন না। সত্যজিৎ- প্রিয় বাঙালী যার জন্যে সবসময়ে মনে করে এসেছে মৃণাল, রায় সাহেবকে হিংসে করে।

সত্যজিতের মৃত্যুর পরে মৃণাল সেনের আক্ষেপ ছিল 'আর কার সঙ্গে ঝগড়া করব। ঝগড়া করার লোক চলে গেল'।
Avatar: খুকখুক

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

ধন্যবাদ এবড়োখেবড়ো-দা এডিটিং নিয়ে প্রশ্নটার উত্তর দেয়ার জন্যে। অমিতাভকে আনলাম কারণ উনি যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন - 'ফিল্ম কাটতে থে উসকো জোড়তে থে ফির সে উয়ো চরকা চলতা থা' সেই যুগেই তো মৃণালও ছিলেন, উনি কীভাবে কাজ করতেন সেটা জানার আগ্রহেই প্রশ্নটা, আর আপনি খুবই গুছিয়ে লিখলেন। খেরোখাতা সত্যজিতের এন্ড টু এন্ড প্ল্যানের অঙ্গ হলেও কোন জায়গায় বাড়তি কথা বা এক্সপ্রেশন বাদ দেবেন সেটা সব কি আর খাতায় থাকত? অন স্পটও অনেক কিছুই নির্মমভাবে ছেঁটে দিতেন। যার যেরকম কাজের অ্যাপ্রোচ।
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

এ হে! এ টই তো মায়ের ভোগে!! একটু খুঁচিয়ে তুলি।

@খুকখুক মৃণাল সেনের সম্পাদনার বিষয়ে কিছু জানতে চেয়েছিলেন। এ বিষয়ে মৃণাল নিজে যা বলেছেন --- “আমি যখন এডিট করতে বসি, তখন টেবিলের ওপর অনেকগুলো শট থাকে। আমি এডিটরকে নিয়ে এখান থেকে ওখান থেকে এটা নিয়ে ওটা নিয়ে প্রতি মুহূর্তে উদ্ভাবন করি। এটা যেন একটা বাচ্চা ছেলের কিউবস্‌ নিয়ে খেলা করার মতন।”

এর আগে ভুবন সোমে মাস্ক শটের ব্যবহার নিয়ে বলেছি। তা কেমনভাবে মৃণালের মাথায় আসল, তা জানাতে গিয়ে তিনি বলছেন, “ভুবন সোম করার সময় ভাবিনি যে মাস্ক শট নেব। পরে এডিটিং-এর সময় যখন কিছু স্টিল নিয়ে বসেছি তখন মাথায় এল”। অর্থাৎ সব কিছু পূর্বনির্ধারিত নয় একেবারেই।

আর একটা উদাহরণ দিই ওই ভুবন সোম নিয়েই। গুজরাটের ভূতবাংলোয় শ্যুটিং হচ্ছে, অভিনয়ে উৎপল আর সুহাসিনী। কথা বলতে সুহাসিনীর হঠাৎ চোখ চলে গেল জানলার বাইরে। সাদা ডানায় ভর করে অসংখ্য পাখি নামছে, আকাশ থেকে সমুদ্রে। সংলাপ ভুলে তিনি চিৎকার উঠলেন, ‘লুক, মৃণালদা লুক’। কাটলেন না মৃণাল, কে কে মহাজন জানলা থেকে সমুদ্রের পাখিদের ওপর ক্যামেরা ঘোরালেন। ছবিতে ওই দৃশ্যটাই রইল। শুধু উৎপল দত্তের সঙ্গে সংলাপ বলার সময় সুহাসিনীর চেঁচানোটা ‘দেখো দেখো’ বলে ডাব করে নিলেন। কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারেনি।



Avatar: #

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

এ লেখার সময়ে "চলচ্চিত্র চর্চা" (সম্পাদক - বিভাস মুখোপাধ্যায়) প্রকাশিত দুই খণ্ডে - [সংখ্যা - ২২, নভেম্বর ২০১৬] "প্রসঙ্গ মৃণাল" (বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন, অন্বেষণ - ৩৪ টি লেখা, ৩৭০ পৃষ্ঠা) ও [সংখ্যা - ২৪, ১৪ মে ২০১৭] প্রসঙ্গ মৃণাল সেন (চলচ্চিত্র সমালোচনা - ৫৯ টি লেখা, ৩৯২ পৃষ্ঠা) পত্রিকা সংখ্যা দুটো দেখেছেন নিশ্চয়।
Avatar: এবড়োখেবড়ো

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

সবিনয়ে স্বীকার করি, দেখিনি। নিজস্ব ভালো লাগা, নিজের সিনেমা দেখা আর নিজের পড়া কয়েকটা বই ছাড়া এ লেখায় আর কিছুই দেখা হয়ে ওঠেনি। তার সবচেয়ে বড় কারণ, এই পত্রিকা সংখ্যা দুটোর নামই শুনিনি।
Avatar: #

Re: মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার

সম্পাদকীয়তে আপনাদের উপরোক্ত আলোচনাকে যে স্বল্পবাক স্পষ্টতায় ধরা রয়েছে -

১) তিনি গল্প বলার ফর্ম আর ডকুমেন্টরি ফর্ম এই দুয়ের মিলনের চেষ্টা করেছিলেন।
২) গল্প বলা ছবিকে ভেঙে চলচ্চিত্রে প্রবন্ধধর্মীতা আনার ব্যপারে তিনি সার্থক, পুরোপুরি সফল না হলেও তিনিই পথিকৃৎ - যে প্রচেষ্টার মূল্য অনাগত কাল দেবে বলে বিশ্বাস, কেননা গল্প বলা নিয়ে অনন্তকাল চলবে না।
৩) রাজনৈতিক চলচ্চিত্র - কে প্রথম রচনা করেহেন - তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু রাজনৈতিক চলচ্চিত্রে আমাদের শিক্ষিত করেন তিনিই প্রথম।
৪) মধ্য শ্রেণির মানুষের দ্বিচারীতাকে তাঁর মত আঘাত এত ঘনঘন কেউ করেননি।
৫) ছবিতে চেয়েছিলেন জনমনোরঞ্জন নয় জনমানসে ধাক্কা দেওয়া।

শিলাদিত্য সেনের চলচ্চিত্রপঞ্জীর সাথে চলচ্চিত্র চর্চার পঞ্জী মিলিয়ে নেওয়া দরকার মনে করি, এইটি লেটেস্ট।

সাহিত্য বা সিনেমা সংক্রান্ত যে কোনো আলোচনা, সাহায্য, বই, রেফারেন্স, তথ্য -র জন্য চন্দন গোস্বামীকে ৯৬৭৪৪৫৭০৭৬ এ কল করতে পারেন। খুশিই হবেন।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 21 -- 40


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন