সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • অরফ্যানগঞ্জ
    পায়ের নিচে মাটি তোলপাড় হচ্ছিল প্রফুল্লর— ভূমিকম্পর মত। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেন কেউ আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে— সেই প্রচণ্ড কাঁপুনিতে ফাটল ধরছে পথঘাট, দোকানবাজার, বহুতলে। পাতাল থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছিল। ঝোড়ো বাতাস বইছিল রেলব্রিজের দিক থেকে। প্রফুল্ল দোকান থেকে ...
  • থিম পুজো
    অনেকদিন পরে পুরনো পাড়ায় গেছিলাম। মাঝে মাঝে যাই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়। বন্ধুদের মা-বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ভাল লাগে। বেশ রিজুভিনেটিং। এবার অনেকদিন পরে গেলাম। এবার গিয়ে শুনলাম তপেস নাকি ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একটু পরে তপেসও এল ...
  • কাঁসাইয়ের সুতি খেলা
    সেকালে কাঁসাই নদীতে 'সুতি' নামের একটা খেলা প্রচলিত ছিল। মাছ ধরার অভিনব এক পদ্ধতি, বহু কাল ধরে যা চলে আসছে। আমাদের পাড়ার একাধিক লোক সুতি খেলাতে অংশ নিত। এই মৎস্যশিকার সার্বজনীন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়। মনে আছে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ...
  • শুভ বিজয়া
    আমার যে ঠাকুর-দেবতায় খুব একটা বিশ্বাস আছে, এমন নয়। শাশ্বত অবিনশ্বর আত্মাতেও নয়। এদিকে, আমার এই জীবন, এই বেঁচে থাকা, সবকিছু নিছকই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া, এমনটা সবসময় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না - জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পরিণ...
  • আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই...
    দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। দেশের সবচেয়ে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে বুয়েট। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছু বরাহ নন্দন! কাওকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কি খুব সহজ কাজ? কতটুকু জোরে মারতে হয়? একজন মানুষ পারে ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭
    চন্দ্রপুলিধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন ...
  • গুমনামিজোচ্চরফেরেব্বাজ
    #গুমনামিজোচ্চরফেরেব্...
  • হাসিমারার হাটে
    অনেকদিন আগে একবার দিন সাতেকের জন্যে ভূটান বেড়াতে যাব ঠিক করেছিলাম। কলেজ থেকে বেরিয়ে তদ্দিনে বছরখানেক চাকরি করা হয়ে গেছে। পুজোর সপ্তমীর দিন আমি, অভিজিৎ আর শুভায়ু দার্জিলিং মেল ধরলাম। শিলিগুড়ি অব্দি ট্রেন, সেখান থেকে বাসে ফুন্টসলিং। ফুন্টসলিঙে এক রাত্তির ...
  • দ্বিষো জহি
    বোধন হয়ে গেছে গতকাল। আজ ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ, সন্ধ্যাবেলায় আমন্ত্রণ ও অধিবাস। তবে আমবাঙালির মতো, আমারও এসব স্পেশিয়ালাইজড শিডিউল নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই তেমন - ছেলেবেলা থেকে আমি বুঝি দুগ্গা এসে গেছে, খুব আনন্দ হবে - এটুকুই।তা এখানে সেই আকাশ আজ। গভীর নীল - ...
  • গান্ধিজির স্বরাজ
    আমার চোখে আধুনিক ভারতের যত সমস্যা তার সবকটির মূলেই দায়ী আছে ব্রিটিশ শাসন। উদাহরণ, হাতে গরম এন আর সি নিন, প্রাক ব্রিটিশ ভারতে এরকম কোনও ইস্যুই ভাবা যেতো না। কিম্বা হিন্দু-মুসলমান, জাতিভেদ, আর্থিক বৈষম্য, জনস্ফীতি, গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অভাব, শিক্ষার অভাব ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে

শক্তি দত্তরায় করভৌমিক

পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল।

গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি শব্দ আর বাটোয়ারা কথাটা জানলাম যথেষ্ট বড় হয়ে। আমারও ঠিক একই অভিজ্ঞতা। নিজের বাসভূমি, যাবতীয় অস্থাবর এবং ভূসম্পত্তির সঙ্গে পরিচয় এবং সম্মান সব হারিয়ে যারা কুটোর মতো ভাসতে ভাসতে পিতৃপুরুষের দেশ ছেড়ে অন্য ভূমিতে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে বাধ্য হয়েছিলো তারা রিফিউজী। কী ভয়ংকর পরিচয়। এই দেশত্যাগে বাধ্য মানুষের মধ্যে হাজার হাজার নারী শিশু কিশোর তাদের বিড়ম্বনা নিয়ে জিন্না নেহরু শ্যামাপ্রসাদ মাউন্টব্যাটন র‌্যাডক্লিফ কারোরই ভাবনা করার সময় ছিলো না। গান্ধীর পূজার বেদীতে অভিমানের কালিমা স্পর্শ করেছিল। কাহিনীর পাত্র পাত্রী লেখকের নিজের পরিবার যাঁরা কিশোরগঞ্জ থেকে ত্রিপুরার সীমান্ত হয়ে আগরতলা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে থিতু হয়েছিলেন। বছর মাস ধরে ধরে আন্তরিক মমতায় আঁকা হয়েছে তখনকার পূর্বপাকিস্তানে হিন্দু মুসলমানের চিরকালের সহাবস্থান ভেঙে টুকরো হয়ে যাওয়ার ক্ষত। যূঁই এর মতো কিশোরী যুবতী মেয়েদের নিরাপত্তাহীন নিরুপায়তা। সাজতে ভালোবাসে কিশোরী, মা নির্মমভাবে হাতে মুছে দিচ্ছেন তার কপালে মূসুরডাল আকারের টিপ্ পর্যন্ত।
বিপন্নতাও লড়াই দুটো নিয়ে রিফিউজী জীবন তার সঙ্গে জড়িত আসগর চাচা বা তাঁর মতো কিছু সংবেদনশীল উপকারী মানুষের কথা এসেছে। এসেছে সেই মুসলমান মুনীষের সঙ্গত অভিমান যে বলে আমি তো একটা মানু আমি বইছি দেইখ্যা গিন্নি মা গোবর দিয়া ঘর মুছতে কয়! কর্তারা বুঝতে পারেন না ভুলটা কই। ওই ভুলের মধ্যে কাঁটা ছিল। অনবধানের অন্যায় ছিল। সেই আগুনে ঝলসে গেছে গোটা মহাদেশ।

সব ইতিহাস বইয়ে নেই। গণস্মৃতিতে ধরা আছে। বাটোয়ারার যন্ত্রণা লাহোরে, করাচিতে, দিল্লিতে, রাওয়ালপিণ্ডিতে। ঊর্বশী বুটালিয়ার দ্য আদার সাইড অব সাইলেন্স নামের বিখ্যাত বই, দময়ন্তী সেহ্গেলের তখনকার পাঞ্জাব সার্ভে রিপোর্ট এর মতো আকর ছাড়াও মানুষের মুখে মুখে চলে আসা ভয়ঙ্কর কাহিনীগুলির উল্লেখ করেছেন লেখিকা মুখবন্ধে। রাওয়ালপিণ্ডির কাছে গ্রাম। শিখ বাসিন্দারা জানলেন গ্রামে গ্রামে দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে, শিখ মেয়েদের সম্মান শিখ্খি বাঁচাতে শিশুদের ‘রক্ষা’ করতে কোথাও কুয়োতে ঝাঁপিয়ে মরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মানুষ মৃত দেহে উপচে পড়ছে কুয়ো - মৃত্যু হচ্ছে না। এরকম একজন বেঁচে যাওয়া মানুষ লাজবন্তী দেবী। বৃদ্ধ শিখ পিতা অমরিন্দর সিং। কিশোরী কন্যা তাঁর কমলকলির মতো মুখ। পিতার কৃপাণ আটকে গেল তার ভারি ঘোমটা আর মোটা চুলের বেণীতে। ঘাড় ঘুরিয়ে হরিণ চোখে বাপের দিকে তাকিয়ে সে ওড়না কোমরে বেঁধে নিল, বেণী টেনে নিল সামনে, উবু হয়ে বসলো বাপের সামনে। অভ্রান্ত কোপে সম্ভ্রান্ত শিখ কন্যার খন্ডিত মস্তক পড়লো এসে আঠারো বছরের করণবীরের পায়ে। সেদিন করণবীরের আঠারো পূর্ণ হয়েছিল তা না হলে শিশুদের সঙ্গে তারও বলিদান হয়ে যেতো। বেঁচে গিয়েছে, মনে রয়ে গেছে কমলকলির মতো মুখটি। তার পরেও কতো ধর্ষণ কতো খুনের বিভীষিকা। জামুন নামের অনাথ বালকটি দিল্লিতে ট্রেন ভরা কর্তিত দেহাংশ দেখে মনের ভারসাম্য হারিয়ে ও রক্ষা করতে চায় সিন্ধু প্রদেশের সূক্ষ্ম রেশম শিল্পীপারসিক পাজনিগার পরিবারের স্মারক একটি রূপোর চুরুট কেস। পরিবারটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল। স্বাধীনতার পাঁচ বছর পর ১৯৫০এ কুমিল্লা ময়মনসিংহ আপ ও ডাউন ট্রেন থামিয়ে ভৈরব ব্রীজের মধ্যে কেটে ফেলা হয় সব হিন্দু যাত্রীদের। যারা জলে ঝাঁপ দিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল তাদের মাথা ফাটিয়ে জলে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।

একই দেশ ভাগ হলো অথচ এক যাত্রায় পৃথক ফল। পঞ্জাবে সম্পত্তি বিনিময় হলো বাংলার বাস্তুহারা সে আইনের সুবিধা পায়নি। ঘরছাড়া হিন্দুদের বাড়িঘর হয়ে গেল শত্রুসম্পত্তি। কেন শত্রু কার শত্রু হতভাগারা বুঝলো না। জমি জমা বিক্রি করা অসম্ভব হলো। তবুও কিছু সহৃদয় মুসলমান নায্য দাম দিয়ে জমি কিনলেন বা ‘হিন্দুস্থানের’ জমির সঙ্গে বিনিময় করলেন। যথাযথ সহায়তা করলেন এতদিনের প্রতিবেশীদের। ওপারের বিতাড়িত বিড়ম্বিত মানুষগুলো এপারেও তো অবাঞ্ছিত তখন। বাজারে দোকানপাটে ভাষা নিয়ে ব্যঙ্গ সইতে হয়। ওপারের ব্যাঙ্ক ম্যানেজার যোগেশ এপারে ব্যাঙ্কে কাজ খুঁজতে এসে ব্যঙ্গোক্তির মুখোমুখি হতে বাধ্য হন --ওপারে জমিদারি ও ছিলো আবার ব্যাঙ্কের ম্যানেজারিও ছিলো? যূঁই স্কুলে যায় পাড়ার মাসিমা খেদোক্তি করেন, বিদ্যেধরী ইস্কুলে চললেন, বেওয়া হওয়ার ভয় নেইকো। বাঙাল গুলো জানি কেমনধারা, আচার বিচার কিছু নেই কো। আবার হেডমিসস্ট্রেস স্নেহলতাদি আবার বাড়িয়ে দেন সাহায্যের হাত। খড়কুটো ধরে ভেসে থাকে বিপন্ন বাস্তুহারা পররিবার। যেমন বুড়ো দাড়িওলা অচেনা হয়তো হানাদার মুসলমান জীবনসঙ্গীকে মেনে নিয়ে অনঙ্গ দাদুর বালবিধবা বন্দিনী আর চিরবঞ্চিত কন্যা বুইড়্যা পিসি। সংসার পেয়েছে অন্যের নিন্দা মন্দে তার থোড়াই পরোয়া। দেশভাগের ঝড়ো মেঘের ধাক্কায় টাল খেয়ে যাওয়া স্থিতাবস্থা, সেখানে ঘর থেকে পুরো উপামহাদেশ উথালপাথাল। পরিবারটি মোচার খোলার মতোই ভেসে কূলের নাগাল পেয়েছে।

বাজিতপুর আর কোলকাতা টালমাটাল সংসার আস্তে আস্তে পালটায় আবার কোথায় যেন পরিবেশটিকে খানিকটা পালটে দেয় ও। দময়ন্তী নিপুণ কলমে তুলে ধরেছেন কোলকাতার মেস জীবনের টুকরো ছবি। ছিন্নমূল প্রৌঢ়া সুখো মেস বাড়িতে আড়াই টাকা মাইনেতে বহাল হয়েছে। তার হাতে বাঙাল রান্না কাঁচকলা খোসা বাটা, কপিডাঁটার ছেঁচকি মেসের রান্নাকে মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ এনে দেয়। একদিন তার সযত্নে রক্ষিত পুটুলি তাল্লাসি করা হোলো চোর সন্দেহে। পাওয়া গেলো দেশ থেকে আনা একটি সুপুরি কাটা ‘শরতা’ আর একগোছা চাবি। ঝকঝকে করে তেঁতুল দিয়ে মাজা। দেশে যে সে প্রত্যেকটা ঘর তালা দিয়ে এসেছে ভালো করে ফিরে গেলে খুলতে হবে তো। হায়রে, সুখের ঘরের চাবি।

ধাক্কাটা শুধু বাঙালিদের লাগেনি, যন্ত্রণার খবর জানি এপার থেকে যারা গেছে তাদেরও। মুহাজিরদের খবর যা আছে তাও কম ভয়ঙ্কর নয়। সেই নির্যাতনের শিকার মেয়ে যাকে জেলখানার ডাক্তারবাবু চিকিৎসা করতে শিহরিত - তার আর্ত গোঙানির সঙ্গে অ্যায় খোদা চিত্কার শুনে। হিংসা হিন্দু মুসলমান মানে না। ব্যক্তিজীবনের ঘাত প্রতিঘাত পাশাপাশি রাষ্ট্রজীবনে গান্ধীজীর মৃত্যু, জিন্নার মৃত্যু, নাথুরামের ফাঁসি, অযোধ্যার মন্দিরে রামলালার মূর্তি পাওয়া ইত্যাদি সব ঘটনা ঘটে গেল ১৯৪৮এর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। একটা ছোট ভুল চোখে পড়লো, আগামী সংস্করণে যদি লেখিকা ঠিক করার কথা বিবেচনা করেন - ৪৮শে তো নয়া পয়সা আসেনি, সম্ভবত নয়া পয়সার জন্ম ৫৭ ইংরেজিতে।
রুদ্ধশ্বাসে পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল। দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে ঘোর কাটাতে পারছি না। মনে হচ্ছে জড়িয়ে গেছি আগের প্রজন্মের সঙ্কটে। লেখনীর আন্তরিক মুন্সিয়ানায় না দেখা বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ ছলছল করছে মনের ভেতর। মনে এলো ছোটবেলায় শোনা ছেঁড়া ছেঁড়া গল্প। তারই মধ্যে মনে পড়ে গেল হিরণদির আকূতি --শক্তি, আমারার কথা লেখ্, কথা দে লেখবি।

হিরণদির আসতেন, দুপুরবেলা বসতেন। হিরণদি চইতেন তাঁর দুঃস্বপ্নের দিনরাত্রিগুলি নিয়ে আমি লিখি; সেই সময় আমার মানসিক স্থিতি ছিল না ধৈর্য ধরে লেখার, আজ দময়ন্তীর লেখা পড়ে মনে পড়ে গেল। অবসর প্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষক, স্বামীও একই পেশায় ছিলেন। দু’পক্ষেরই নির্ভরশীল বহু আত্মীয়। তিন সন্তানসহ তাঁদের প্রতিপালনের জন্য ভদ্রলোক প্রচুর টিউশনি করতেন। অকালে চলেও যান। আজকে ছেলে মেয়েরা সুপ্রতিষ্ঠিত। ঘরে ফল মাছ মিষ্টি আসে প্রচুর। ফেলাছড়া দেখে হিরণদির মনে পড়ে যায়, তাঁর স্বামী সবচেয়ে ছোট মাছের টুকরোটি খেতেন পাছে ভাইবোন, ছেলে মেয়েদের কম পড়ে। গেঞ্জি সপ্তাহে একবারের বেশি কাঁচলে রাগ করতেন পাছে খরচ বেশি হয়। আজকে যুদ্ধ শেষ। ক্লান্ত হিরণদির অতীত বর্তমানের চেয়ে বেশি কাছের। শৈশবের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা উজাড় করে দেন। তিনি নোয়াখালীর দাঙ্গার প্রত্যক্ষদর্শী। কলমা পড়ে ধর্ম পরিবর্তন করেছিলেন, আবার সহৃদয় মুসলমান প্রতিবেশীরাই পালাতে সাহায্য করেছিলেন।
জায়গাটা নোয়াখালী জেলা, গ্রামের নাম বোধহয় খিলপাড়া, ঠিক মনে পড়ছে না। হিরণদির বাবা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। পুজোর আগে দেশে এসেছিলেন। চারিদিকে আতঙ্ক। যদি জমি জমা কিছু বেচে দেওয়া যায়, পরিবার নিয়ে চলে যাবেন। তাঁরা গ্রামের সম্পন্ন গৃহস্থ ব্রাহ্মণ পরিবার প্রচুর দেবোত্তর জমি। একই বাস্তুভিটা, ত্রিশটি পরিবারের বাস। নিজস্ব মন্দির। বিগ্রহদের অনেক গয়নাগাটি, রূপো আর পিতল তামার বাসন। বাড়ির মেয়ে পুরুষের গয়না আর পরিবারের লোকসংখ্যাও কম না। গ্রামের মুসলমানদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক। তাঁরা ঠাকুরকর্তা বলেই সম্বোধন করে। কিছু দিন ধরেই বাইরের লোকজন গ্রামে ভরে যাচ্ছে। চারিদিকে চাপা ভয়ের আবহ। একদিন সন্ধ্যায় গ্রামের কয়েকজন মুসলমান সম্মানের সঙ্গে ঠাকুর কর্তা ডেকেই এলো। প্রথমেই সাবধান করে দিল কোন সম্পত্তি, বিগ্রহের গয়না যেন সরানোর চেষ্টা না হয়। বাড়িতে পাঁচ বছর থেকে যেসব কুমারী মেয়ে আছে সবাইকে কলমা পরিয়ে দিয়ে দিতে হবে। পুরুষদের ও ধর্মান্তর নিতে হবে। প্রাণে বাঁচার সেটাই শর্ত। তাঁরা উত্তর দিতে সময় চাইলেন, বললেন ধর্মান্তর নেবেন, রাজী। তবে লক্ষ্মীপুজোর পরদিন। বাড়ির ছেলেরা শেষবারের মতো কচ্ছপের মাংস খাবে সেদিন রাতে। মুসলমান হলে তো নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। অল্প শিক্ষিত চাষাভুষো মানুষ ঠাকুর কর্তাদের চানক্যবুদ্ধির সঙ্গে পারবে কেন? এতো সহজে এঁরা যখন রাজী তারাও রাজী। তবে মেয়েদের তখনই কলমা পড়তে হবে। তারা বন্ধক থাকবে। হিরণদির বাড়ির সব কুমারী মেয়েরা কলমা পড়ে আলাদা ঘরে রইলো। গ্রামের কিছু সম্ভ্রান্ত মুসলমান মেয়েদের সীমান্ত পার করালেন দুচারজন করে। গরীব মুসলমান মেয়েদের পোশাক পরে দুচারজন করে বর্ডার পার হওয়ার বিভীষিকা ভোলা কি সহজ। ব্রাহ্মণ বাড়ির মেয়েরা নিম্নবিত্ত মুসলিম মেয়েদের পোশাক পরতে চায় না - জন্মগত উন্নাসিকতায় কাঁদে। লক্ষ্মীপূর্ণিমার রাতেই পরিবারের পুরুষরা ও গ্রাম ছাড়েন, মুসলমান মাঝিই নৌকো পার করে দেয়। ট্রেনে উঠতে নব্বুই বছরের ঠাকুমাকে ঢিলের মতো ছুঁড়ে দিতে তিনি পড়লেন এক কাটা মুণ্ডু মৃতদেহের ওপরে। যা করে হোক পুরো পরিবার পৌঁছে গেল কাছাড়ে কোনো জায়গায়। সেখানে ভাষার সমস্যা। নোয়াখাইল্যা বাঙাল আর সিলইট্যা বাঙালের ভাষায় আকাশ পাতাল তফাত। এক চা বাগানের সাহেব সহায় হলেন, থাকতে দিলেন খালি একটা কোয়ার্টার। কাকিমা জেঠিমা ভয়ে অস্থির। পরাধীন ভারতের স্বদেশী যুগে তাঁরা সাহেবদের শত্রু বলে জেনে এসেছেন।
হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান কারোকেই যে শত্রু বা মিত্র বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না সে শিক্ষা তো ছিলোই না। ক্রান্তিকালে বিপদের মধ্যে সে শিক্ষা কী হোলো? বোধহয় না। হিরণদির এখন স্মৃতি চলে গেছে। মৃত্যু পথযাত্রী। দময়ন্তীর বই পড়ে হিরণদির আকূতি মনে পড়ে গেল শক্তি, লিখবি তো আমাদের কথা। দময়ন্তী লিখেছে হিরণদিদের কথা।

অসংখ্য মানুষ দুঃস্বপ্নে আতঙ্কে হারিয়ে গেছে, স্নেহময়ী দেশমাতৃকা তাদের রক্ষা করতে পারেনি। আজ যখন দেখি কিছু মানুষ অন্তরের বিদ্বেষবিষ জাগিয়ে তুলতে চাইছে তখন সেই আতঙ্ক ফিরে আসে। হিরণদিদের বাড়ির মেয়েদের সর্বনাশের মুখে দাঁড়িয়েও রক্ষাকর্তৃ মুসলমান মেয়েদের জামা কাপড় পরাতে অনীহা আর রইত্যার ক্রোধ - "ঠাহুরকর্তা আমি এট্টা মানু, আমি বইতাম বইল্যা মাঠাইরাইন জাগাডা এট্টা জানোয়ারের গু দিয়া মুসাইবো!! বওনের কাম নাই আমার" - এইসব একই সূত্রে বাঁধা, অপরিচয়, অবহেলা, অপমান ও অনীহার গ্লানিময় সুতোয়। এই অপরিচয়ের গ্লানিকে কাজে লাগায় বিদ্বেষের কারবারীরা। এই অপরিচয় চিনতে পারি যখন মনে হয় আজকের ভারতীয় ভুখন্ড থেকেও তো অনেককে এইরকম ভাবে বাস্তুচ্যূত হতে হয়েছে, তাঁদের কথা আমরা প্রায় কিছুই জানি না। খুশবন্ত সিংএর ট্রেন টু পাকিস্তানে কিছু আছে সন্দেহ অবিশ্বাস নিরাপত্তাহীনতাজনিত হিংসার কথা, মান্টোর ঠান্ডা গোস্ত বা খোল দো মনে পড়ে, তমস মনে পড়ে, হিংসার নির্মানের প্রক্রিয়া। হিংসার আগুন কোন পক্ষকেই রেহাই দেবে না, এই কথা আমরা মনে রাখি, কিন্তু মনে করাতেও হবে, যার ইঙ্গিত দময়ন্তীর লেখা মুখবন্ধেও আছে।

এই বইটা দেখলাম সিজন ওয়ান, তাই আশা করা যায় পরবর্তী ঋতুগুলি আমরা দেখতে পাবো। ওপারের কোন প্রতিবেশী প্রোটাগনিস্ট হয়ে আসতে পারেন ভবিষ্যতে, এই আশা রাখি।

236 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: খাতাঞ্চী

Re: দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে

.
Avatar: দ

Re: দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে

আরেহ! এটা মিসিয়ে গেসলাম। আপনাকে নিয়ে তৃতীয় একজন মাসীমা পড়ে জানালেন। প্রথমে এক গুরুভাইয়ের মা- ওঁর সাথে কথা বলে কি মন কখারা হয়েছিল। তারপর এক লেখিকা বন্ধুর মা, তিনি বরাবর এপারের কিন্তু বিচলিত হয়েছিলেন। আপনারা যেহেতু ওই সময়টা প্রায় সরাসরি দেখেছেন বা অনুভব করেছেন, আমার প্রতিবারই একটু অপরাধবোধ হয় আমি বোধয় আবার খুঁচিয়ে দিলাম।

কখনও যদি আর কোন সংস্করণ হয় তাহলে নিশ্চয় ঠিক করে দেব। অনেক ধন্যবাদ।

(এই শেষের প্রোটাগনিস্টের দাবীটা কি খাতাঞ্চিব্যটা জুড়ে দিল?)
Avatar: খাতাঞ্চী

Re: দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে

জুড়তে উস্কানি দিয়েছি বটে :)


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন