Samrat Amin RSS feed

Samrat Aminএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বার্সিলোনা - পর্ব ১
    ঠিক করেছিলাম আট-নয়দিন স্পেন বেড়াতে গেলে, বার্সিলোনাতেই থাকব। বেড়ানোর সময়টুকুর মধ্যে খুব দৌড় ঝাঁপ, এক দিনে একটা শহর দেখে বা একটা গন্তব্যের দেখার জায়গা ফর্দ মিলিয়ে শেষ করে আবার মাল পত্তর নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ভোর রাতে রওনা হওয়া, আর এই করে ১০ দিনে ৮ ...
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    (টিপ্পনি : দক্ষিণের কথ্যভাষার অনেক শব্দ রয়েছে। না বুঝতে পারলে বলে দেব।)দক্ষিণের কড়চা▶️এখানে মেঘ ও ভূমি সঙ্গমরত ক্রীড়াময়। এখন ভূমি অনাবৃত মহিষের মতো সহস্রবাসনা, জলধারাস্নানে। সামাদভেড়ির এই ভাগে চিরহরিৎ বৃক্ষরাজি নুনের দিকে চুপিসারে এগিয়ে এসেছে যেন ...
  • জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-১৪
    তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায়...আসলে যে কোনও শিল্প উপভোগ করতে পারার একটা বিজ্ঞান আছে। কারণ যাবতীয় পারফর্মিং আর্টের প্রাসাদ পদার্থবিদ্যার সশক্ত স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। পদার্থবিদ্যার শর্তগুলি পূরণ হলেই তবে মনন ও অনুভূতির পর্যায় শুরু হয়। যেমন কণ্ঠ বা যন্ত্র ...
  • উপনিবেশের পাঁচালি
    সাহেবের কাঁধে আছে পৃথিবীর দায়ভিন্নগ্রহ থেকে তাই আসেন ধরায়ঐশী শক্তি, অবতার, আয়ুধাদি সহসকলে দখলে নেয় দুরাচারী গ্রহমর্ত্যলোকে মানুষ যে স্বভাবে পীড়িতমূঢ়মতি, ধীরগতি, জীবিত না মৃতঠাহরই হবে না, তার কীসে উপশমসাহেবের দুইগালে দয়ার পশমঘোষণা দিলেন ওই অবোধের ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

কাশ্মীরের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসঃ ১৯৩০ থেকে ১৯৯০

Samrat Amin

ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সূর্য অস্ত যায় ১৯৪৭ এ। মূল ভারত ভূখন্ড ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হয়। কিন্তু ভুখন্ডের ভাগবাঁটোয়ারা সংক্রান্ত আলোচনচক্র ওতটাও সরল ছিল না। মূল দুই ভূখণ্ড ছাড়াও তখন আরও ৫৬২ টি করদরাজ্য ছিল। এগুলোতে রাজতন্ত্র কায়েম ছিল। ব্রিটিশ শাসককে কর দিয়ে স্বায়ত্বশাসন উপভোগ করত তারা। এই স্বায়তশাসিত ভুখন্ড গুলি ভারতের সঙ্গে যুক্ত হবে, না পাকিস্তানের সঙ্গে সেটা নিয়ে দীর্ঘ বাদানুবাদের পালা চলে।

সমস্যা সমাধানের জন্য তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টবেটেন এই সব স্বায়তশাসিত ভুখন্ডগুলির জন্য তিনটি বিকল্পের কথা বলেন। যার মধ্যে যেকোন একটা তারা নিজেদের সুবিধার্থে বেঁছে নেবে -- ১. মূল ভারত ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ২. পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ও ৩. স্বায়ত্বশাসিত স্বাধীন ভুখন্ড হিসাবে থেকে যাওয়া। সেই সঙ্গে মাউন্টবেটেন মনে করিয়ে দেন যে "প্রিন্সলি ষ্টেট" গুলো বিকল্প বেছে নেওয়ার সময় যাতে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখে -- ভারত ও পাকিস্তান ভুখন্ডের নিরিখে অঞ্চলবিশেষের ভৌগলিক অবস্থান এবং অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচিতি এবং জনসাধারনের চাহিদা।

কাশ্মীর ছিল অন্যতম বড় স্বায়তশাসিত করদ অঞ্চল। তখন স্বাধীন কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং। স্বাধীনচেতা ছিলেন । তৃতীয় বিকল্পটি বেঁছে নেন। আলাদা করে ভারত বা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হতে চাননি। বদলে চেয়েছিলেন আগের মতোই স্বাধীন স্বতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষ ভুখন্ড। ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর দুইমাস অব্দি কাশ্মীর ছিল স্বায়তশাসিত ভূখন্ড। আলাদা প্রধানমন্ত্রী ছিল একটা লম্বা সময়। ছিল আলাদা সংসদ। এই হরি সিং ছিলেন ডোগরা রাজাদের বংশধর এবং মহারাজা গুলাব সিং এর নাতি। গুলাব সিংকে "মহারাজা" উপাধি দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসকরা ১৮৪৬ সালে। এটা ছিল ব্রিটিশ শাসনের প্রতি তাঁর আনুগত্যের পুরস্কার।

গুলাব সিং ছিলেন এক হিন্দু যোদ্ধার সুযোগ্য পুত্র। নিজ প্রচেষ্টায় জম্বু কাশ্মীর ভুখন্ডের দক্ষিন অংশ নিজের দখলে এনেছিলেন। বাকি অংশটা ব্রিটিশদের কাছ থেকে ১ কোটি টাকায় কিনে নেন এবং করদ রাজ্য হিসাবে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। তখন তাঁর সাম্রাজ্য বলতে জম্মু কাশ্মীর (ভারত ও পাক অধীকৃত দুইই), লাদাখ, গিলগিট এবং বালতিস্তান। এর মধ্যে জম্মু ছিল হিন্দু অধ্যুষিত, কাশ্মীর সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত এবং লাদাখ বৌদ্ধ অধ্যুষিত ও কিছুটা শিয়া মুসলিম। ভুখন্ড হিসাবে বিশাল বড় না হলেও অঞ্চলটিতে বহু ধর্মীয়, ভাষাগত ও জাতিগত ভিন্নতা চোখে পড়ার মতো। অঞ্চলটির নিজস্ব ভৌগলিক ভিন্নতা এর অন্যতম বড় কারন। এই ভিন্নতার দরুন ১৯২০ সালে সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীর ভ্রমন করে ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ ও মিশনারী টিন্ডেল বিস্কো লেখেন,
" To write about ... Kashmiris is not easy as the country of Kasmir, including the province of Jammu, is large and contains many races of people. Then again, these various countries included under the name Kashmir are separated... by high mountain passes, so that the people... differ considerably... in features, manners, customs, language, character and religion". (Contested Lands: Sumantra Bose, Havard University Press).

দূর্গম এলাকা বলে প্রাক্তন শিখ রাজার থেকে অধিগৃহিত ভুখন্ড ব্রিটিশ শাসকেরা নিজেদের অধীনে রাখেনি। গুলাব সিংকে সেই মোতাবেক মোটা টাকায় বিক্রি করে দেয়। কাশ্মীর ভুখন্ডে সে কারনে সেভাবে ব্রিটিশবিরোধী বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান ঘটে নি। কারন সেখানে সরাসরি ব্রিটিশ শাসন ছিল না। তবে কাশ্মীরে রাজতন্ত্রবিরোধী একটি জনরোষ ছিলই। সেই জনরোষই বিংশ শতকের তৃতীয়ার্ধে প্রবলভাবে মাথা চাড়া দেয়। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন শের-ই-কাশ্মীর শেখ আব্দুল্লা। মূল ভারত ভূখন্ডে যখন শোনা যাচ্ছে ব্রিটিশবিরোধী বৈপ্লবিক শক্তির শ্লোগান, সমগ্র কাশ্মীর তখন ফুঁসছে রাজতন্ত্রবিরোধীতায়।

কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মিরী ব্রাম্ভন সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে কাশ্মীরে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ ব্যবসা বানিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমরা ছিল কৃষি শ্রমিক, শিল্প সামগ্রী ও পর্যটন শ্রমিক। হরি সিং এর পৃষ্ঠপোষক ছিল হিন্দু জমিদার মালিক ও কাশ্মীরী পন্ডিত শ্রেনি। অন্যদিকে তিনি জানতেন তার রাজ্যের প্রজাদের সংখ্যাগরিষ্ঠই মুসলিম। এই মুসলিমদের গরিষ্ঠ অংশই শ্রমিক মজদুর। মালিকশ্রেনির অত্যাচারহেতু তাদের একটি চাপা ক্ষোভ ছিল। ডোগলা রাজারা নিজেদের পরিজন ও পৃষ্ঠপোষক উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেনীর মানুষদের সরকারি উচ্চ পদে বসাতো। ফলত মজদুর শ্রেনির হিন্দু ও মুসলমানরা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্ষেপে ছিল।
কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রাজতন্ত্রবিরোধী ক্ষোভটাকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন শেখ মুহম্মদ আব্দুল্লা। গড়ে তোলেন "নিখিল জম্মু কাশ্মীর মুসলিম ন্যাশানাল কনফারেন্স" ১৯৩০ এর দশকে। নামের সঙ্গে "মুসলিম" কথাটি থাকলেও নিম্নবিত্ত হিন্দুরাও এই সংগঠনের সঙ্গে শামিল হয়েছিল। আন্দোলনের ভরকেন্দ্র ছিল কাশ্মীরি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ। পরে অবশ্য আন্দোলনের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে সম্মান জানানোর জন্য শেখ আব্দুল্লা সংগঠনের নাম থেকে "মুসলিম" কথাটি ছেঁটে দেন। এটা ছিল বাল্যবন্ধু জহরলাল নেহেরুর অনুরোধ। সালটা ১৯৩৮।

আন্দোলনের চাপে পড়ে হরি সিং একটি পরিষদ গঠন করলেন। পরিষদে মহারাজের পছন্দের জমিদার শ্রেনির মানুষেরাই ছিলেন। শ্রমিক শ্রেনির প্রতিনিধি তেমন ছিল না। কারা কারা ভোট দিয়ে এই পরিষদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে সেটাও হরি সিং নিজে ঠিক করে নিয়েছিলেন। এহেন স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্র উচ্ছেদ ও গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই ছিল ন্যশনাল কনফারেন্সের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

১৯৪০ এর দশকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কান্ডারি জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে ন্যশনাল কনফারেন্সের নেতাদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী নেতা জহরলাল নেহেরুর সঙ্গে। নেহেরুর পরিবার ছিল কাশ্মীরি পন্ডিত শ্রেনির। এককালে কাশ্মীর থেকে পরিবারটি উত্তর ভারতের সমতলে চলে আসে। নিজের পিতৃভূমি কাশ্মীর ও কাশ্মীরীদের প্রতি নেহেরুর একটি আগ্রহের জায়গা ছিল। যাই হোক, জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে এই সখ্যতা ভালভাবে নেয় নি হিন্দু মহাসভা ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। তারা জল ঘোলা করতে মাঠে নেমে পড়ে। কাশ্মীরের জাতীয়তাবাদী মুক্তিকামী আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। আদ্যোপান্ত রাজতন্ত্রবিরোধী মুক্তিকামী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে তারা "মুসলিম আন্দোলন" বলে জোর প্রচার শুরু করল। মহারাজাও শেষমেস নিজের গদি বাঁচাতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির দিকে ঢলে পড়লেন। অন্যদিকে শেখ আব্দুল্লা মুসলিম লিগের দ্বিজাতি তত্ত্বের নীতিকে ঘোর অপছন্দ করতেন। মুহম্মদ আলি জিন্না এই মুক্তিকামী "কাশ্মীরকো ছোড় দো" আন্দোলনকে "গুন্ডাদের আন্দোলন" বলে অবিহিত করলেন।

কাশ্মীর সম্পূর্ণভাবে তখন আলাদা রাজতান্ত্রিক ভূখন্ড । ফলতঃ কাশ্মীরের জাতিসত্ত্বার আন্দোলনে ব্রিটিশ শাসিত ভারত ভূখন্ড থেকে জাতীয় কংগ্রেস মৌন সমর্থন ছাড়া আর বিশেষ কিছু করতে পারে নি। কিন্তু কাশ্মীরকে নিয়ে ভারত ভূখন্ডের দেশভাগ সংক্রান্ত রাজনীতি যথেষ্ট মাইলেজ পেয়েছিল। ইতিমধ্যে তখন লাহোরে মুসলিম লীগের "পাকিস্তান রেজুলিউসন" সম্পন্ন হয়েছে। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল গুলি পাকিস্তান ভুখন্ডের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যে কারনে কাশ্মীরিদের জাতিসত্ত্বার আন্দোলন মুসলিম লীগ পছন্দ করত না। জিন্না ১৯৪৪ এ কাশ্মীর ঘুরে এসে কাশ্মীরের মানুষের আবেগ বোঝার চেষ্টা করলেন। শেখ আব্দুল্লাকে সরিয়ে গুলাম আব্বাসকে নেতা বানানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু গুলাম আব্বাস ছিলেন অকাশ্মীরি উর্দুভাষী। উর্দুভাষীদের কাছে কিছুটা জনসমর্থন পেলেও গরিষ্ঠ অংশের কাশ্মীরিদের কাছে গুলাম আব্বাস তেমন গ্রহনযোগ্যতা পান নি। চেষ্টা করেও কাশ্মীরের জনমানসে শেখ আব্দুল্লার জনপ্রিয়তায় চিড় ধরানো গেল না। উপায়ান্তর না দেখে জিন্না শেষমেস ঘোষনা করেন "প্রিন্সলি ষ্টেট কাশ্মীরের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমরা নাক গলাব না, কাশ্মীরের মানুষ ও মহারাজা সেটা বুঝে নেবে"। জিন্না এরপর পুরোপুরিভাবে ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতিতে মনোনিবেশ করলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ষ্ট্যাফোর্ড ক্রিপ্স ব্রিটেন থেকে উড়ে এসে নতুন "ক্যবিনেট মিশন পরিকল্পনা" নিয়ে হাজির হলেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হবে। তাতে সদস্য হবেন ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক নেতারা। জিন্না তার মুসলিম লীগের সদস্যদের সবাইকে সদস্যপদ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। প্রস্তাব গৃহিত হয় নি। ক্ষোভে জিন্নার মুসলিম লীগ অন্তর্বর্তী সরকার গঠন থেকে বিরত থাকল। গুরুত্বপূর্ণ পদ গুলো দখল করে বসল জাতীয় কংগ্রেসের নেতারা। পরে যখন ভুল বুঝে জিন্না ফিরে এলেন তখন পুরোপুরিভাবে জাতীয় কংগ্রেস অন্তর্বর্তী সরকারের চালিকা শক্তি। এই সরকার দেশীয় রাজনৈতিক সমস্যা ও প্রিন্সলি ষ্টেট গুলির অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব নিল। সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৫৬৫ টি প্রিন্সলি ষ্টেটের অন্তর্ভূক্তি সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণের দায় সংশ্লিষ্ট মহারাজাদের উপর ছেড়ে দেওয়া হল। মহারাজাকে পূর্ণ স্বাধীনতা ছেড়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত শেখ অব্দুল্লা মেনে নিতে পারলেন না। এটা ছিল কাশ্মীরের গনতান্ত্রিক চেতনার মূলে কুঠারাঘাত। কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মহারাজার সার্বভৌমত্ব মেনে নিতে চাইল না।

শেখ আব্দুল্লার "কাশ্মীর কো ছোড় দো" আন্দোলন আরও ব্যাপক আকার ধারন করল। কাশ্মীরের পুলিশ বাহিনীর একটা অংশ স্বৈরতন্ত্রী রাজার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে পড়ল। সমগ্র কাশ্মীর জুড়ে সৃষ্টি হল অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। মহারাজা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ও হিন্দু মহাসভার সদস্যদের জন্য নিজের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র তুলে দিলেন। নিজের সিংহাসন বাঁচাতে হিন্দু মহাসভা ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবকের উপর অতি মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন মহারাজা হরি সিং। দেশদ্রোহিতার অভিযোগে শেখ আব্দুল্লাকে গ্রেফতার করা হল। আইনশৃংক্ষলার আরও অবনতি হল। গান্ধীজি, মৌলানা আজাদ ও সর্দার বল্লবভাই প্যাটেল হরি সিংকে বোঝালেন। পরিস্থিতি আয়ত্বে আনার জন্য কাশ্মীরে নেহেরু ও আসফ আলিকে পাঠানো হল। বন্ধু নেহেরুর তৈরি করা বয়ানে শেষমেস আব্দুল্লা স্বাক্ষর করলেন। বন্ধুরই অনুরোধে "ডোগরা শাসক কাশ্মীরকো ছো দো" আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলেন তিনি। কিন্তু তারপরেও আব্দুল্লা ও তার সহ যোদ্ধারা মুক্তি পেলেন না। মাঝখান থেকে রাজতন্ত্রবিরোধী গনতান্ত্রিক আন্দোলনের আগুন অনেকটাই নিভে গেল।

কাশ্মীর ভুখন্ড নিয়ে জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে দীর্ঘ টালবাহানা চলে। নেহেরু ও সর্দার প্যাটেলের মতো জাতীয় কংগ্রেসের নেতারা হরি সিংকে বোঝাতে লাগলেন ভারত ইউনিয়নের সঙ্গে কাশ্মীর ভুখন্ডের যুক্ত হওয়ার সুবিধাসমূহ। যদিও হরি সিং নেহেরুকে খুব একটি পছন্দ করতেন না। তার অন্যতম বড় কারন ছিল শেখ আব্দুল্লার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু তাৎপর্যপূর্নভাবে জিন্না সদর্পে ঘোষনা করলেন যে কাশ্মীর স্বায়ত্বশাসন চাইলে মুসলীম লীগের কোন আপত্তি নেই। মহারাজা হরি সিং সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে লাগলেন। মাউন্টবেটেনের ফর্মূলা অনুযায়ী তার পাকিস্তানের দিকে যাওয়ার কথা। কারন ডেমোগ্রাফিক্যালি সামগ্রিক জম্মু কাশ্মীর মুসলিম অধ্যুষিত। প্রায় ৮০ শতাংসই মুসলিম। কিন্তু আঞ্চলিক বিভাজনের নিরিখে জম্মু হিন্দু অধ্যুষিত ও লাদাখ বৌদ্ধ অধ্যুষিত। পাকিস্তানের সঙ্গে গেলে হিন্দু ও বৌদ্ধরা এবং ভারত ইউনিয়নের সঙ্গে গেলে মুসলিমরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে। আবার স্বায়ত্বশাসন নিলে প্রস্তাবিত পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সঙ্গে কাশ্মীরের যে বানিজ্যেক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে সেটা অনেকটাই কমে যাবে।
এমন এক সিদ্ধান্তহীনতার পরিস্থিতিতে মুসলিম লীগের নেতারা রাজা হরি সিং এর সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার চেষ্টা করে। সেই চেষ্টা পুরো বিফলে যায় নি। শেসমেস ১৯৪৭ এর ১৪ ই আগষ্ট পাকিস্তান এবং ১৫ ই আগষ্ট ভারত ইউনিয়ন স্বাধীন হল। মহারাজা হরি সিং জম্মু কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের দিকে ঝুঁকলেন। ভারত বা পাকিস্তান কারোর সঙ্গেই যুক্ত হলেন না। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন। সেই চুক্তি অনুযায়ী বৈদেশিক বানিজ্যে সংক্রান্ত কিছু ব্যাপার ছিল। পাশাপাশি চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানের দায়িত্ব ছিল জম্বু ও কাশ্মীরের টেলিকম ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দেখার। অন্যদিকে জুন মাস থেকেই পুঞ্চ এলাকায় (এখন আজাদ কাশ্মীর) চলছে প্রজা বিদ্রোহ। তারা স্বৈরাচারী রাজাকে কর দিতে অস্বীকার করে। সেপ্টেম্বর মাসে মহারাজা বিদ্রোহ দমনের জন্য সেনা পাঠান। কোন লাভ হয় নি। ১৫ই আগষ্টের পর উপজাতি বিদ্রোহ আরও ভয়ঙ্কর আকার ধারন করে। ধীরে ধীরে এই বিদ্রোহ মুক্তিযুদ্ধে পরিনত হয়। পুঞ্চ, ইয়াসিন, গিলগিট, মুজাফফরারাবাদ, মীরপুর, স্কারডু এলাকার উপজাতিরা শ্রীনগরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

মহারাজা হরি সিং পাক সরকারের কাছে সাহায্য চাইলেন। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র হরি সিংকে সাহায্য তো করেই নি, উল্টে উপজাতি বিদ্রোহীদের সমর্থন জানিয়ে দিল। যুক্তি হিসাবে পাকিস্তান খাড়া করল যে চুক্তি অনুযায়ী জম্মু কাশ্মীরের আভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়টি দেখার কথা নেই। তাই কাশ্মীরের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে তারা সেনা পাঠাতে পারবে না। ফলতঃ ১৯৪৭ এর ২৪ শে অক্টোবর পুঞ্চের উপজাতি বিদ্রোহীরা তাদের এলাকায় স্বাধীনতা ঘোষনা করল। গঠিত হল আজাদ কাশ্মীর। রাজধানী মুজাফফরাবাদ। পাকিস্তানের মিডিয়ায় আজাদ কাশ্মীর গঠিত হওয়ার খবর সম্প্রচারিত হল দিনভোর। হরি সিং ভয় পেয়ে গেলেন। সপরিষদে ২৫ শে অক্টোবর ভারতের রাজধানী দিল্লি উড়ে চলে এলেন। খবর পেয়ে উপজাতি বিদ্রোহীরা সেই আনন্দে উল্লাশে ফেটে পড়ল। এই আজাদ কাশ্মীর এখন খাতায় কলমে (বাস্তবিকভাবে কতটা সেটা প্রশ্নযোগ্য) স্বায়ত্বশাসন ভোগ করছে। তাদের আলাদা প্রধানমন্ত্রী, আলাদা সংসদ ও সংবিধান রয়েছে। তাদের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে অধুনা পাকিস্তান রাষ্ট্র। যার দরুন পাকিস্তান আজাদ কাশ্মীরকে এক প্রকার বগলদাবা করে রেখেছে। আজাদ কাশ্মীরের হাইকোর্ট ১৯৯৩ এর ৮ই মার্চ রায় দিয়েছিল যে পাকিস্তান রাষ্ট্র জোর করে আজাদ কাশ্মীরের গিলগিট দখল করে নিয়েছে। অন্যদিকে এপারের কাশ্মীরিদের অবস্থা হয়ে গেল না ঘরকা, না ঘটকা।

পুঞ্চে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৪৭ এর ২৯ শে সেপ্টেম্বর শেখ আব্দুল্লা জেল থেকে মুক্তি পেলেন। সদলবলে দিল্লী উড়ে গেলেন। বন্ধু নেহেরু তখন স্বাধীন ভারতের নব্য প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করলেন কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে। নেহেরু নিজে পৈতৃক সুত্রে কাশ্মিরী ছিলেন। নেহেরুর আবেগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেন। কাশ্মীর ভূখন্ড ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে বললেন নেহেরুকে। নেহেরু বললেন কাশ্মীর স্বাধীন ভুখন্ড, আলাদা রাষ্ট্র। ভারতের পক্ষে আলাদা রাষ্ট্রের ভুখন্ডে সেনা পাঠানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে আজাদ কাশ্মীর গঠন হওয়ার পর ২৬ শে অক্টোবর নেহেরুর বাড়িতে মেহেরচাঁদ মহাজন নেহেরুকে কাতর অনুরোধ করলেন কাশ্মীরে সেনা পাঠানোর জন্য। কিন্তু নেহেরু বললেন, "আপনারা যদি চান কাশ্মীরে ভারত সেনা পাঠাক, তাহলে কাশ্মীর ভূখন্ডকে ভারত ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে"। হরি সিং ও তাঁর পারিষদবর্গ রাজি হয়ে গেল। ২৬ শে অক্টোবর রাত্রেই হরি সিং এর সঙ্গে নেহেরুর চুক্তি স্বাক্ষরিত হল। চুক্তি অনুযায়ী কাশ্মীর ভূখন্ড ভারত ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হল। কাশ্মীর স্বায়ত্বশাসনের অধিকার পেল। চুক্তিতে আরও ঠিক হল প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক নীতি ও মুদ্রা ছাড়া ভারত সরকার কাশ্মীরের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপে করতে পারবে না।

পরদিন ভারতীয় সেনা জওয়ানদের বিমান শ্রীনগর বিমানবন্দরে নামল। ভারতীয় সেনা জওয়ানদের তাড়া খেয়ে উপজাতি ও পুঞ্চ এলাকার কাশ্মীরি যুব বিদ্রোহীরা পিছু হটতে লাগল। ২৭শে অক্টোবর, ১৯৪৭, শুরু হল কাশ্মীরে মিলিটারি শাসন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য আজাদ কাশ্মীর গঠিত হওয়ার পরেও এপারের কাশ্মীরে পাঠান উপজাতিরা হানা দিতে থাকে। বিদ্রোহের শক্তি ছিল পুঞ্চ এলাকার কাশ্মীরি যুবকরা। এরা প্রায় সবাই ছিল প্রাক্তন সেনা। তখন পুঞ্চ এলাকা ছিল রাজা ধ্যান সিং এর জায়গীরের অন্তর্গত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৭০ হাজার কাশ্মিরী যুবক মহারাজের ডাকে অংশগ্রহন করেছিল। যুদ্ধ শেষ হলে তারা নিজ এলাকায় ফিরে আসে। ফিরে এসে দেখে মহারাজা বিবিধ জিনিসের উপর অহেতুক কর চাপিয়ে বসে আছেন। যেগুলো সাধারন প্রজাদের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে মহারাজা তার সৈন্যদলের যুদ্ধফেরৎ মুসলিম যুবকদের নিতে চাননি। তার সৈন্যদলে কেবল হিন্দু ও শিখ যুবকরাই ছিল। ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হতে লাগল মুসলিম যুবকদের। মুসলিমদের উপর নির্যাতন ও অবহেলা মাত্রা ছাড়ায়। প্রানভয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে পালিয়ে যায় দুই লাখ মুসলিম। গুজব ছড়ায় যে মহারাজা মুসলিম নিধনের উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রাক্তন সৈন্যরা সর্দার আব্দুল কায়ূমের নেতৃত্বে জোটবদ্ধ হয়েছিল স্বৈরাচারী মহারাজার বিরুদ্ধে। এইসময় উত্তর-পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশ থেকে উপজাতি শ্রেনির পাকিস্তানিরা এদের সাথে যোগ দেয়। এরাই অস্ত্র সরবরাহ করে। পুরো ঘটনায় পাকিস্তান সরকারের প্রচ্ছন্ন ইন্ধন ছিল।

আজাদ কাশ্মীর গঠন হওয়ার পরও তাদের সেই ক্ষোভের আগুন নেভে নি। মহারাজা হরি সিং এর আবেদনে ভারত সরকার কাশ্মীরে সেনা নামাতেই আজাদ কাশ্মীরের যোদ্ধারা পাকিস্তান সরকারের সাহায্য চাইল। তাদের দাবি ছিল আজাদ কাশ্মীর গঠিত হওয়ার পর পলাতাক রাজা হরি সিং এর কোন অধিকার নেই ভারত ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি করার। তারা প্রচার করতে থাকে হরি সিং এর ভারতভুক্তির চুক্তি বে-আইনি। কাশ্মীরের মানুষকে না জানিয়ে মহারাজা একক ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন বলে তারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। স্বার্থগন্ধী পাক সরকার এমন পরিস্থিতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে ছাড়ল না। ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়ল তারা। সাহায্য এল আফগানিস্থান থেকেও। আফগান শাসক আহম্মেদ শাহ আবদালির শাসনকালের সময় (১৭৫১) থেকে কাশ্মিরীদের সঙ্গে আফগানদের একটি বন্ধন ছিলই। সেই সলিডারিটির জায়গা থেকেই কাশ্মিরী যুবকদের সাহায্যার্থে তাদের এগিয়ে আসা।

২৭ শে অক্টোবর, ১৯৪৭। ভারত ডমিনিয়নের গভর্নর জেনারেল মাউন্টবেটেন মহারাজা হরি সিংকে চিঠি লিখলেন। চিঠির বয়ান ছিল যে পাক হানাদারদের যখন পাল্টা ফেরত পাঠানো গেছে এবং কাশ্মীরে আইনশৃঙ্খলা ফিরে এসেছে তখন কাশ্মীরের মহারাজার ভারতভুক্তি সংক্রান্ত চুক্তির বিষয়টি কাশ্মীরের জনসাধারণের সম্মতিক্রমে অনুমোদিত হওয়া উচিৎ। ১৯৪৭ এর ২ রা নভেম্বর নেহেরুও ঘোষনা করলেন, "শুধু কাশ্মীরের জনগন নয়, গোটা বিশ্বের সম্মতিক্রমে কাশ্মীরের বিষয়টি ঠিক হবে ... রাষ্ট্রপুঞ্জের তত্ত্বাবধানে কাশ্মীরে গনভোট হবে"। কাশ্মীরের মানুষই ভোটের মাধ্যমে ঠিক করবে তারা কার সঙ্গে যেতে চাই, ভারত ইউনিয়ন, নাকি পাকিস্তান। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারী মাসে ভারত ইউনিয়ন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপুঞ্জে নালিশ জানাই যে পাক-মদতে কাশ্মীরে হানাদারি চলছে। সেই নালিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ একটি কমিটি গঠন করে দেয় - United Nations Commissions for India and Pakistan" (UNCIP). রাষ্ট্রপুঞ্জের এই কমিশনের দায়িত্ব ছিল কাশ্মীরে গনভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের চিরস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান সুনিশ্চিত করা। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৭ এই নয় বছর ধরে নিরাপত্তা পরিষদ বারংবার রাষ্ট্রপুঞ্জের তত্ত্বাবধানে কাশ্মীরে গনভোটের জন্য রেজোলিউশন পাস করে গেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের সেই রেজোলিউশন আজও বাস্তবায়িত হয় নি।

ভারত-পাক যুদ্ধের আবহ আবার নতুন করে তৈরি হয় ১৯৪৮ সালের ফ্রেব্রুয়ারী মার্চ মাসে। এই যুদ্ধে ভারত ও পাকিস্তানের সেনা সরাসরি যুদ্ধে নামে। পরের বছর জানুয়ারী মাসে যুদ্ধ বিরতি ঘোষনা হয়। কাশ্মীর উপত্যকা ও জম্বুর একটি বড় অংশ এবং খাড়াই লাদাখ অঞ্চল নিজেদের আয়ত্বে আনতে সমর্থ হয় ভারতীয় সেনা। অন্যদিকে পাকিস্তানের ঝুলিতে যায় জম্মু ও কাশ্মীরের অল্প অংশ এবং গিলগিট ও বালতিস্তান। কাশ্মীর ভুখন্ড নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুই রাষ্ট্রের খাবলাখাবলির সেই শুরু। যুদ্ধের নিরিখে কাশ্মীর দ্বন্দ সংক্রান্ত বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন ফেলেছিল। সেই সঙ্গে আজাদ কাশ্মীর (পাক অধিকৃত কাশ্মীর) পাক সরকারের কাছে স্বায়ত্বশাসন বুঝে নিতে থাকল। পাক রাষ্ট্রের ধূর্ত নেতারা বুঝেছিল যে জোর করে অন্তর্ভূক্ত করে রাখার থেকে সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন দিয়ে আজাদ কাশ্মীরের উপর ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা অনেক বেশি ফলদায়ী। আজাদ কাশ্মীর স্বাধীন থাকলে ক্ষতি নেই। বরং পাকিস্তানে থেকে স্বায়ত্বশাসন নিলেই পাক সরকারের লাভ।

১৯৪৮ সালের মার্চে ভারত অধীকৃত কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী (মূখ্যমন্ত্রী নয়) হলেন শেখ আব্দুল্লা। মন্ত্রী পারিষদে থাকলেন বক্সী গোলাম মুহম্মদ, গিরিধারীল লাল দোরগা, কর্ণেল পীর মুহম্মদ, সর্দার বুধ সিং, শ্যামলাল শরাফ প্রমুখ। শুরু থেকেই শেখ আব্দুল্লা ভূমি সংস্কারে মন দিলেন। কাশ্মীরের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা জোর ধাক্কা খেল। খাজনা ও ঋণের ভারে জর্জরিত কৃষকদের ঋণ মকুবের ব্যবস্থা করতে লাগলেন। ধীরে ধীরে জমিদার শ্রেনি ও উচ্চ মধ্যবিত্ত কাশ্মীরি পন্ডিতদের চক্ষুশূল হয়ে উঠলেন শেখ আব্দুল্লা। জায়গীরদারী, চকদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদের আপ্রান চেষ্টা করতে লাগলেন। আবার এই জমিদার জোতদার শ্রেনিই ছিল মহারাজা হরি সিং এর পৃষ্ঠপোষক। এই শ্রেনিই ছিল ডোগরা রাজত্বের প্রানভোমরা। ফলতঃ শেখ আব্দুল্লার সঙ্গে মহারাজা হরি সিং এর সম্পর্ক খারাপ হতে লাগল। হরি সিং পদত্যাগ করলেন। ১৯৪৯ এর ২৫ শে মে কাশ্মীরের মহারাজার পদে বসলেন হরি সিং এর পুত্র করণ সিং। এই করণ সিং ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবকের সক্রিয় সদস্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য শেখ আব্দুল্লার জমিদারবিরোধী ভূমি সংস্কারের নীতি নেহেরুর জাতীয় কংগ্রেসের খুব একটি পছন্দ হয় নি। নেহেরুর সঙ্গে আব্দুল্লার কিছুটা মানসিক দুরত্ব তৈরি হল।

কাশ্মীরে গনভোটের ব্যাপারটি ঝুলেই রইল। গনভোট না করার পিছনে জাতীয় কংগ্রেসের যুক্তি ছিল যে গনভোটের শর্ত অনুযায়ী পাক অধীকৃত আজাদ কাশ্মীর থেকে পাকিস্তান সেনা সরাই নি এবং পাক মদতে এখনও কাশ্মীরে অনুপ্রবেশ চলছে। পাক সরকারের পাল্টা অভিযোগ ছিল জম্বু কাশ্মীর ভুখন্ডে অন্যায়ভাবে ভারত মিলিটারি শাসন জারি রেখেছে, আগে ভারত সেনা তুলুক। যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির গেরোয় পড়ে কাশ্মীরে গনভোটের বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। জাতীয় কংগ্রেসও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ থেকে ব্যাপারটিকে ধীরে ধীরে কৌশলগতভাবে আড়াল করতে থাকে। ১৯৫১ সালে কাশ্মীরে সাধারন নির্বাচন হয়। শেখ আব্দুল্লার ন্যাশনাল কনফারেন্স বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৪৫ টি আসনে জয়লাভ করে। আব্দুল্লার নতুন সরকার প্রধানত দুটি বিষয়ের উপর বেশি নজর দিল -- কাশ্মীরের নতুন সংবিধান তৈরি ও ভারতভুক্তির বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে আসা। শেখ আব্দুল্লা নিজে ভারতভুক্তিতে সায় দিলেও কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে অনড় ছিলেন। এই অনড় মনোভাবের জন্য কাশ্মীরের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পেরেছিলেন।

শেষমেস ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারায় কাশ্মীরে স্বায়ত্বশাসন সুনিশ্চিত হল। কাশ্মীরের জন্য আলাদা সংবিধান, আলাদা প্রধানমন্ত্রী ও স্বায়ত্বশাসন পছন্দ হয় নি জনসঙ্ঘ (অধুনা বিজেপি) ও জম্বু কাশ্মীর প্রজা পরিষদ এর। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ অব্দি এই "জম্বুকাশ্মীর প্রজা পরিষদ" জম্বু কাশ্মীরের রাজনীতিতে বেশ সক্রিয় ছিল। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বলরাজ মাধোক। এক সময়ের একনিষ্ঠ আরএসএস কর্মী। ১৯৪৭ এ কাশ্মীর দাঙ্গায় সাম্প্রদায়িক বিষ ও গুজব ছড়ানো এবং মহারাজা হরি সিং এর পিঠ চাপড়ানিতে দাঙ্গায় সক্রিয় ভূমিকা গ্রহন করেছিল। যার জেরে প্রানভয়ে দুই লক্ষ শ্রমজীবি মুসলিম ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে পাকিস্তনের পাঞ্জাব প্রদেশে পালিয়েছে. (Kashmir in Conflict, Victoria Schofield, ed. I.B Tauris, p- 42). এই সংগঠন আবার নতুন করে জেগে উঠেছিল জনসঙ্ঘের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে। তারা জম্বুর নিরিহ ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দু জনগোষ্ঠীকে উস্কানি দিতে থাকে। এদের উদ্যোগেই ১৯৫১-৫২ সাল থেকে "কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ" কথাটির জোর প্রচার শুরু হয়। প্রচারের তীব্রতা এতটাই সূদুরপ্রসারী ছিল যে কাশ্মীরের এযাবৎ সুদীর্ঘ রাজতন্ত্রবিরোধী মুক্তিকামী আন্দোলনের ইতিহাস ধীরে ধীরে ফিকে হতে থাকে।

কিন্তু তবুও জম্বু ও কাশ্মীরের জন্য আলাদা বলিষ্ঠ সেকুলার সংবিধান তৈরির জায়গা থেকে শেখ আব্দুল্লাকে নড়ানো গেল না। তিনি ও নেহেরু যৌথভাবে ঘোষনা করলেন যে জম্বু কাশ্মীরের সংবিধানে হিন্দু অধ্যুষিত জম্বু ও বৌদ্ধ অধ্যুষিত লাদাখ এর আঞ্চলিক স্বশাসন স্থান পাবে। বুদ্ধিমত্তার সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে গুরুত্ব দিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিস্তারকে কিছুটা হলেও কব্জায় রাখার চেষ্টা করলেন। একদিকে মুসলিম সাম্প্রদায়িক শক্তি আর অন্য দিকে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি এই দুই শক্তিকে সমানভাবে উপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু জনসঙ্ঘ থামল না। তারা হরি সিং এর সঙ্গে নেহেরুর চুক্তি অমান্য করে "এক দেশ, এক বিধান, এক প্রধানমন্ত্রী" ক্যাম্পেন শুরু করল। কিন্তু পূর্বে মহারাজা হরি সিং চাপে পড়ে ১৯৪৭ এর ২৬শে অক্টোবর এই শর্তে নেহেরুর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন যে কাশ্মীর ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হবে ঠিকই, কিন্তু তার স্বতন্ত্র সংসদীয় সাংবিধানিক ও রাজকোষ সংক্রান্ত ব্যবস্থা থাকবে। তাদের এই প্রচার ছিল ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক যেখানে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা রয়েছে। (Contested Lands, Sumantra Bose, ed. Havard University Press) ).

১৯৪৮-৪৯ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর আজাদ কাশ্মীর (পাক অধিকৃত) ও ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের সীমান্ত রেখা আঁটোসাটো হল। এই সীমান্তরেখার তখন নাম ছিল CFL (Ceasefire Line). সিয়াচেন গ্লেসিয়ার পর্যন্ত্য বিস্তৃত এই রেখার দৈর্ঘ্য ৭৪২ কিলোমিটার। পরে ১৯৭২ সালে সিমলা চুক্তির সময় "CFL" এর নাম পালটে LOC (Line of Control) হয়। এই রেখা ধরেই কাশ্মীর এফোঁড় ওফোঁড় হয়েছে। নিয়ন্ত্রন রেখার এপারে ভারত অধিকৃত কাশ্মীর, আর ওপারে পাক অধীকৃত "আজাদ কাশ্মীর" যাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নাম রাজা ফারুখ হায়দার (ইমরান খান নন)। কাশ্মীরিরা মনে করে তাদের মাতৃভূমিকে বিকৃত করেছে এই রেখা। এই নিয়ন্ত্রণ রেখা ধরে বেড়া নির্মানের পর প্রথম দিকে অবশ্য এত বজ্রআঁটুনি ছিল না। CFL পারাপারের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নিলেই হত। এই রেখা ধরে বহু কাশ্মীরি পরিবার ভাগ হয়ে গেছে। আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে সামাজিক আদানপ্রদান বজায় রাখা ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এলাকার মানুষজনদের নিয়ন্ত্রনরেখা পারাপার করতেই হত। ১৯৮০র দশক থেকে সীমান্তরেখার বেড়া আরও উঁচু হয়ে হয়েছে। অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণভাবে রোধ করার জন্য বেড়া বৈদ্যুতিকরণ করে মোসন সেন্সরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

১৯৫১ সালে গনতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে পুরোপুরিভাবে অঙ্গীভূত হওয়ার জন্য কাশ্মীরে জনমত তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল শেখ আব্দুল্লার ন্যাশনাল কনফারেন্স। কিন্তু জনসঙ্ঘ ও জম্বু কাশ্মীর প্রজা পরিষদ আন্দোলন করে কাশ্মীরের স্বায়ত্বশাসনের অধিকারও কেড়ে নিতে চেয়েছিল। এমন প্রচার ও আন্দোলন কাশ্মীরি জাতিসত্ত্বার স্বতন্ত্র ইতিহাস ধূলোয় মিশিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। শেষমেস শেখ আব্দুল্লা মাথা নোওয়ালেন। নেহেরু আব্দুল্লার সঙ্গে চুক্তি করলেন ১৯৫২ সালের ২৬ শে জুলাই। চুক্তি অনুযায়ী কাশ্মীরিদের পৃথক নাগরিকত্ব, পৃথক আইন, পৃথক পতাকা তৈরির অধিকার বাতিল করে দেওয়া হল। বাদ গেল কাশ্মীরের বংশানুক্রমিক "মহারাজ" (রাষ্ট্রপতির সমতুল) পদ। পরিবর্তে নতুন পদ হল সদর-ই-রিয়াসৎ। ঐ বছরই ৭ ই নভেম্বর হরি সিং এর ছেলে করন সিং সদর-ই-রিয়াসৎ পদে আসীন হলেন। কালক্রমে রাজতন্ত্র থেকে মুক্তি এল ঠিকই কিন্তু জাতির শত্রুর জায়গায় স্থান নিল অন্য আর এক রাষ্ট্র। পরিনামে জাতিসত্ত্বার লড়াই এর অভিমুখ রাজতন্ত্র থেকে সরে ভারত ইউনিয়ন নামক রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল।

জাতীয় কংগ্রেসের ষড়যন্ত্রে ১৯৫৩ সালে শেখ আব্দুল্লাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। শেখ আব্দুল্লা গ্রেপ্তার হলেন। পরবর্তী ২২ বছরের একটা বড় সময় তিনি জেলের ঘানি টেনেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি নাকি নতুন করে ভারত ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন কাশ্মীর ভূখন্ড গঠনের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। যিনি পাকপন্থী উগ্র রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করে এলেন, যিনি নেহেরুর অনুরোধে ধর্মনিরপেক্ষতার বলিষ্ঠ আদর্শ ধরে রাখার জন্য নিজের রাজনৈতিক দলের নাম থেকে "মুসলিম" কথাটি ছেঁটে দিলেন, যিনি ১৯৪৭ (২৯ শে সেপ্টেম্বর) সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়েই দিল্লি উড়ে এলেন কাশ্মীরের ভারতকভুক্তি সংক্রান্ত ব্যবস্থা নিতে নেহেরুর সঙ্গে আলোচনা করতে, তাঁকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করা হল। কিন্তু আসল ঘটনা হচ্ছে জাতীয় কংগ্রেস পরিকল্পিতভাবে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ধীরে ধীরে গিলে নিচ্ছিল নানা রকম কৌশলগত কেন্দ্রীয় ও একত্রীকরন ব্যবস্থা গ্রহনের মাধ্যমে ( Contested Lands, Sumantra Bose, Harvard University Press, p 169-170) . শেখ আব্দুল্লা সেটা হাড়ে হাড়ে টের পান। জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে তার বনিবনা তলানিতে এসে ঠেকে। জাতীয় কংগ্রেস চেয়েছিল কাশ্মীরে পুতুল সরকার যারা জাতীয় কংগ্রেসের প্রতি দাসমনোবৃত্তি নিয়ে জম্বু কাশ্মীরে ক্ষমতায় থাকবে। শেখ আব্দুল্লার গ্রেফতারির সঙ্গে সঙ্গে কাশ্মীর তার প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র হারায়। বক্সী গুলাম আহাম্মেদকে ক্ষমতায় বসানো হয়। এটা ছিল পুতুল সরকার। গোলাম আহাম্মেদ কাশ্মীরি জাতিসত্ত্বার শেষ সম্বল হিসাবে স্বায়ত্বশাসনের যেটুকু বাকি ছিল সেটুকুও ধীরে ধীরে নেহেরু সরকারের হাতে ছেড়ে দিতে লাগলেন।

১৯৫৩ সালে শেখ আব্দুল্লার গ্রেপ্তারির পর কাশ্মীর জুড়ে বিক্ষোভ মিছিল দেখা দেয়। ন্যাশনাল কনফারেন্সের তেত্রিশ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয় "Indian-controlled Kashmir's Public Security Act" আইনে। যে আইনটি আব্দুল্লার বিরোধীদের উপর এতদিন প্রয়োগ করছিল কংগ্রেস সরকার, সেটা এবার আব্দুল্লার অনুগামীদের উপর প্রয়োগ করতে লাগল। মীর্জা আলম বেগ ১৯৫৩ তে ন্যাশনাল কনফারেন্স ভেঙে দেন। সেই সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রস্তাব মতো কাশ্মীরে গনভোট করানোর জন্য জোর প্রচার চালান। চাপে পড়ে ভারত ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কাশ্মীর সংক্রান্ত বিষয়ে সেই বছরেই দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসেন। আলোচনায় ঠিক হয় দুই দেশই কাশ্মীর থেকে তাদের সেনা সরিয়ে নেবে। কাশ্মীরে গনভোটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গনভোটের জন্য আধিকারিক নিযুক্ত হন ১৯৫৪ সালে। সেই বছর সেপ্টেম্বর মাসে কংগ্রেস সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনল যে পাক সরকারের মদতে কাশ্মীরে অস্ত্রশস্ত্র মজুত হচ্ছে। পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশের নাম আমেরিকা। অভিযোগ করার পরই ভারত সরকার আরও ২১ হাজার সেনা নামিয়ে দিল কাশ্মীরে। ঘোষনা করল পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে গনভোটের আয়োজন সম্ভব নয়।

সময়টা ছিল আমেরিকার সঙ্গে সোভিয়েত রাশিয়ার ঠান্ডা লড়াই এর শুরু। বিশ্বের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ শক্তির ঠোকাঠুকির মশলা তখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মুখরোচক খবর। পাকিস্তান ইতিমধ্যে আমেরিকা লবিতে যোগ দিয়েছে। নিজের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বাড়ানোর জন্য পাকিস্তান আমেরিকাপোষিত "The Southern Asia Treaty Organization"(মানিলা চুক্তি) ও "Central Treaty Organization"(বাগদাদ চুক্তি) এর সঙ্গে যুক্ত হয় ১৯৫৪-৫৫ সালে। অন্যদিকে সোভিয়েত রাশিয়া ভারত ইউনিয়নের আবেদনে সাড়া দেয়। ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার দুই নেতা কুরুশেভ ও বুলগেনিয়ান ভারত সরকারের আমন্ত্রনে শ্রীনগর ভ্রমনে আসেন। আতিথেয়তায় তুষ্ট হয়ে কুরুশেভ শ্রীনগরে ঘোষনা করেন, " কাশ্মীর যে প্রজাতান্ত্রিক ভারতবর্ষের অংশ সেটা কাশ্মীরের মানুষই ঠিক করেছেন" । বন্ধুত্বের টোকেন হিসাবে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে গনভোটের বিপক্ষে ভেটো প্রয়োগ করল রাশিয়া। ভারত ইউনিয়নও দুই হাত তুলে বন্ধু রাশিয়াকে কৃতজ্ঞতা জানাল।
এদিকে আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কাশ্মীরে আসীন বক্সী গুলাম আহাম্মেদের সরকার। দিল্লীর আজ্ঞাবহ। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৫ এই সময়টা কাশ্মীরের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম সংকটকাল। সংসদীয়, সাংবিধানিক ও রাজকোষ সংক্রান্ত স্বশাসন কাশ্মীর থেকে একটু একটু করে পুরোটাই দিল্লীর হাতে চলে যায়। দিল্লীর রাজনৈতিক কৌশলের কাছে হার মেনে যায় কাশ্মীর। ওদিকে জেলে থাকার দরুন শেখ আব্দুল্লার রাজনৈতিক জীবন প্রায় শেষ হতে বসে। ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরে সাধারণ নির্বাচন হয় ১৯৫৭, ১৯৬২, ১৯৬৭ এবং ১৯৭২. এগুলো আদৌ নির্বাচন ছিল না । ছিল নির্বাচনের নামে প্রহসন। নির্বাচন কিভাবে হবে এবং কে সরকার গঠন করবে সব দিল্লি থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। দিল্লীর আজ্ঞাবহ বক্সী গুলাম আহাম্মেদই সরকার গড়েন বারবার। ভারতীয় সংসদে নেহেরু তাঁকে অভিনন্দন জানালেন জনসাধারানের "ইচ্ছার সুযোগ্য প্রতিনিধিত্ব" করার জন্য। কাশ্মীররের জন্য তৈরি করা সাংবিধানিক বিধি লাগু হল ১৯৫৭ সালে প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন। ভারত ইউনিয়নের সঙ্গে পুরোপুরিভাবে "একাত্ম" হওয়ার প্রতিকী দিন হিসাবে ২৬ শে জানুয়ারীকে বেঁছে নেওয়া হয়। কালক্রমে আলাদা রাষ্ট্র কাশ্মীর ভারতের একটি রাজ্যে পরিনত হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ মূখ্যমন্ত্রীতে নেমে আসে।

কাশ্মীর মিলিটারি শাসন থেকে মুক্ত হয় নি। তার কারন যেকোন মূল্যে পাক হানাদারদের অনুপ্রবেশ রুখতে হবে। ফলতঃ আকছার গনগ্রেপ্তার, আটক, হত্যার পাল্টা হত্যা, হিংসার পাল্টা হিংসা কাশ্মীরের সামাজিক যাপনে পরিনত হয়। ১৯৬২ সালের নির্বাচনে কাশ্মীরে ৭৪ টি আসনে জনবিচ্ছিন্ন নেতা গুলাম আহাম্মেদ ৬৮ টি আসন জেতেন। নির্বাচনী প্রহসনের পর নেহেরু গুলাম আহাম্মেদকে চিঠি লিখলেন, “It would strengthen your position much more if you lost a few more seats.”. ( Sumantra Bose, Kashmir: Roots of Conflict, Cambridge, P-78)। ১৯৬৩ সালে বক্সী গুলাম আহাম্মেদ দিল্লীর সঙ্গে স্বার্থ সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। গুলাম সাহেব সহ তার অনুগামী আরও ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় ঔপনিবেশিক সময়ের "Defence of India Rules" এর বলে। গুলাম আহাম্মেদের ঠাঁই হয় সেই একই জেলে যে জেলে শেখ আব্দুল্লা দিল্লীর সঙ্গে সংঘাতের "অপরাধে" ১১ বছর ধরে পচে মরছেন।

কাশ্মীর সমস্যা সৃষ্টির প্রায় এক দশক পর থেকে ভারত ইউনিয়ন নিজের অবস্থান থেকে সরে নি। ততদিনে "কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ" এই মিথটি ভারতের জাতীয়তাবাদের বাজারে ভাল রকমের বাজারিকরণ হয়ে গেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান এই ডগমার বিরুদ্ধে চ্যালঞ্জিং মনোভাব নেয়। সেনাপ্রধান আয়ুব খানের নেতৃত্বে পাক সেনারা "অপারেশন গিবরেলটার" এর পরিকল্পনা ছকে ১৯৬৩-৬৪ সালে। উদ্দেশ্য ছিল ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতরাষ্ট্র বিরোধী আবেগকে উস্কে দেওয়া। পরিকল্পনা মতো ১৯৬৫ সালের আগষ্ট মাসে হাজার হাজার পাকসেনা আজাদ কাশ্মীর থেকে নিয়ন্ত্রনরেখা পেরিয়ে ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরে ঢুকে পড়ে। কিন্তু তাদের মিশন প্রায় ব্যার্থতায় পর্যবসিত হয়। কেননা কাশ্মীরের মানুষ এই অনুপ্রবেশ ভাল চোখে নেয় নি। ১৯৪৭ এ কাশ্মীরে পাক উপজাতি অনুপ্রবেশের দরুন যে ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল সেই স্মৃতি তারা ভুলে যায় নি। কাশ্মিরী মুসলিমদের উপর পাকহানাদারদের সেসময়কার অত্যাচার ভুলে যাবার নয়। ফলতঃ পাক সেনারা যেটা আশা করেছিল যে কাশ্মীরের মানুষের কাছ থেকে সহযোগীতা পাবে, সেটা পাওয়া হয়ে ওঠে নি। কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ গনচেতনা স্বায়ত্বশাসন চেয়েছিল, পাকিস্তানভুক্তি চাই নি। এই সংকটকালীন সময়ে পরের মাসে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধের দামামা বেঁধে যায়। যুদ্ধ চলে প্রায় ২২ দিন। এই যুদ্ধের পর নিয়ন্ত্রণরেখার (তৎকালীন CFL) কিছুটা রদবদল হয় ঠিকই, কিন্তু কাশ্মীর দ্বন্দ জিইয়েই থাকে।

এদিকে বক্সী গুলাম আহাম্মেদকে জেলে পাঠানোর পর খাজা শামসুদ্দিনকে জম্মু কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রীর পদে বসানো হয়। জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তাকে বরখাস্ত করা হয়। ১৯৬৪ সালের ১লা মার্চ ক্ষমতায় বসানো হয় দিল্লীর অনুগত গুলাম সাদিককে। এরা ছিল নামকাওয়াস্তে প্রধানমন্ত্রী। সবটাই দিল্লীর অঙ্গুলীহেলনে চলত। এদের পদপ্রাপ্তি বা অপসারনের ক্ষেত্রে কাশ্মীরের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কোন মতামতই গ্রহন করা হত না। যাবতীয় সিদ্ধান্ত দিল্লী এদের উপর চাপিয়ে দিত। ক্ষমতাপ্রয়োগের বৈধতা কংগ্রেস সরকার পেয়েছিল বিশেষ এক আইন বলে। ১৯৫৪ সালে যে ভারত-কাশ্মীর চুক্তি হয়েছিল তাতে ভারত ইউনিয়ন কাশ্মীরের তিনটি বিষয় দেখভালের দায়িত্ব পেয়েছিল -- প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও বৈদেশিক। কিন্তু এই বছরেই ভারতের রাষ্ট্রপতি কাশ্মীরের উপর প্রযোজ্য একটি সাংবিধানিক নির্দেশ জারি করে। সেই নির্দেশ অনুযায়ী কংগ্রেস সরকার এই তিন বিষয় ছাড়াও কাশ্মীরের অন্যান্য আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার অর্জন করে নেয়। সাদিক প্রধানমন্ত্রী পদে বসার পরের মাসে শেখ আব্দুল্লা জেল থেকে ছাড়া পান ১১ বছর পর। কাশ্মীরি জাতিসত্ত্বা আন্দোলনের নেতা তখন ক্লান্ত বিদ্ধস্ত সৈনিক। ততদিনে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের প্রায় সবটাই দিল্লীর হাতে চলে গেছে। তবুও স্বায়ত্বশাসন ধরে রাখার শেষ আশা নিয়ে তিনি নেহেরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন। নেহেরু তখন প্রচন্ড অসুস্থ। ১৯৬৪ সালের ২৭শে মে নেহেরু মারা যান। সব আশা নিভে যায়।

নেহেরু মারা যাওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে বসেন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। কাশ্মীরের "সদর-ই-রিয়াসৎ" তখন কারন সিং। লাল বাহাদুরের আমলে সেই পদটিকে হঠিয়ে "রাজ্যপাল" বানানো হয়। গুলাম সাদিকের প্রধানমন্ত্রীর পদ নেমে আসে মূখ্যমন্ত্রীত্বে। কাশ্মীর আলাদা রাষ্ট্র থেকে পরিনত হয় ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে। কাশ্মীরের "রাজ্যপাল" কে হবে না হবে সবই দিল্লী নিজের হাতে নিয়ে নিল। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লালা বাহাদুর শাস্ত্রীর বিরুদ্ধে কাশ্মীরে তীব্র জনরোষ সৃষ্টি হয়। কাশ্মীরের মানুষ ভারত রাষ্ট্রকে "সাম্রাজ্যবাদী" তকমা দিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। কাশ্মীরের এই আগুনে ঘি ঢালে লাল বাহাদুরের আর এক নীতির প্রয়োগ -- সংবিধানের ২৪৯ ধারা। কেন্দ্র ও রাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা জানি তিনটি তালিকা থাকে -- কেন্দ্র তালিকা, রাজ্য তালিকা ও যৌথ তালিকা। রাজ্যতালিকাভুক্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে রাজ্য নিজেই আইন প্রণয়ন করতে পারে। এ বিষয়ে কেন্দ্র হস্তক্ষেপ করতে পারে না। কিন্তু কাশ্মীরের ক্ষেত্রে কেন্দ্র রাজ্যতালিকাভুক্ত বিষয়গুলিতেও অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে থাকে। ফলতঃ রাজ্য হিসাবে কাশ্মীরের যেটুকু স্বাধীনতা পাওয়ার কথা সেটুকুও আর রইল না। কাশ্মীরের মানুষ জাতীয় কংগ্রেসের নেতাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে শুরু করল।

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আবার নতুন করে জাতীয় কংগ্রেস বিরোধী আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠলেন শেখ আব্দুল্লা। ষাঠোর্ধ বৃদ্ধ আবার গ্রেপ্তার হলেন ১৯৬৫ সালের ৮ই এপ্রিল। এবারে তাঁর গ্রেপ্তারির 'কারন' ছিল চিনের সঙ্গে যোগসাজশ। কাশ্মীরের রাস্তায় আবার বিক্ষোভ, প্রতিবাদ। পরের বছরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী মারা গেলেন। ১৯৬৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসলেন নেহেরুকন্যা ইন্দিরা গান্ধী। নীতিগতভাবে তিনি নেহেরুর থেকে আলাদা ছিলেন না। আন্দোলন দমনের নামে কাশ্মীরে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের মাত্রা আরও বাড়ে। আক্ষেপ করে শেখ আব্দুল্লা বলতেন, "ভারতের গনতন্ত্র পাঠানকোটে (ভারত-অধীকৃত কাশ্মীরের সীমান্তের কাছাকাছি পাঞ্জাবের শেষ শহর) এসে থমকে যায়, পাঠানকোট থেকে বনিহাল (জম্বু ও কাশ্মীরের মধ্যে যোগাযোগের পার্বত্য পথ) অব্দি গনতন্ত্রের কিছুটা ছিটেফোঁটা থাকে। বনিহাল পেরোলে গনতন্ত্রকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কাশ্মীরের ভাগ্যে জুটেছে ঔপনিপেশিক শাসনের জঘন্যতম রূপ।"

ভারতের নব্য প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে দরদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জয়প্রকাশ নারায়ন একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠির বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, --
"আমরা গনতন্ত্রের কথা বলি, কিন্তু বলপ্রয়োগ করে কাশ্মীর শাসন করি। আমরা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলি, কিন্তু হিন্দু জাতীয়তাবাদ আমাদের নীতিভ্রষ্ট করে দেয়। কাশ্মীর নীতি বিশ্বের কাছে ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। সমস্যা এটা নয় যে পাকিস্তান কাশ্মীর দখল করতে চাই, বরং সমস্যা হল এটা যে কাশ্মীরি জনমানসে ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে" । (India, the Seige Within, M.J Akbar, ed. Penguin, P -267)

এই সময় কাশ্মীরের সমাজকর্মী ছিলেন কাশ্মীরি পন্ডিত প্রেমনাথ বাজাজ। ১৯৬৭ সালে তিনি লিখলেন,
"For a clear and realistic appraisal of the Kashmir situation it is necessary to recognize the fact that by and large the State’s [Indian-controlled Kashmir’s] Muslims are not very friendly toward India. An overwhelming majority among them are not happy under the present political set-up and desire to be done with it. But they are reluctant to bring about change through warfare and bloodshed." (Contested Lands, Sumantra Bose, Cambridge, p -175)

তিনি আরও যোগ করলেন,
“India may reject the plebiscite and turn down UN resolutions as outdated and impractical, India cannot forever defraud the State [IJK] people of their constitutional right to free elections .... if free elections are held, it may be taken for granted that the majority of seats will be captured by those unfriendly to India.” (Kashmir Conflict, Sumantra Bose, Harvard, p- 85)

এদিকে শ্রীমতী গান্ধীর "পরামর্শে" গুলাম সাদিক সদলবলে ন্যাশনাল ফ্রন্ট ভেঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করলেন। ৬৭-র নির্বাচনে তিনি জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে ভোটে জেতেন। কাশ্মীরে জাতীয় কংগ্রেসের সেরকম সংগঠনই ছিল না। কিন্তু দিল্লী থেকে জাতীয় কংগ্রেসের "আশীর্বাদ" মাথায় থাকলে সেসময় নির্বাচন বৈতরণী পার হওয়া কোন ব্যাপারই ছিল না। তিন বছর পর ১৯৬৮ সালের শুরুর দিকে শেখ আব্দুল্লা কিছু দিনের জন্য জেল থেকে ছাড়া পান। উপত্যকায় যেদিন এলেন তার পরেরদিন ইংরেজী দৈনিক Times of India তে রিপোর্ট বেরোয় " almost the entire population of Srinagar turned out to greet him". অনন্তনাগে তাকে ঘিরে হাজার হাজার কাশ্মিরী উচ্চস্বরে "শের-ই-কাশ্মীর জিন্দাবাদ, আমাদের দাবি গনভোট" শ্লোগানে মুখরিত হয়। আবেগে ভেসে শেখ আব্দুল্লা তাদের আশ্বস্থ করলেন, "রাষ্ট্রীয় দমননীতি কখনই কাশ্মীরিদের স্বাধীনতার কামনাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না"।
(Kashmir Conflict, p- 87) .

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খান ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। পাক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ( অধুনা বাংলাদেশ) তখন জ্বলছে। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে (দুই পাকিস্তান মিলিয়ে) সাধারণ নির্বাচন হয়। পূর্ব পাকিস্তানে ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি জিতে নেন আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে আওয়ামী লীগের সরকার গঠন করার কথা। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী মুক্তিযোদ্ধাদের উপর নারকীয় হত্যালীলা চালায় পাকসেনারা। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ ঢাকায় সেই গনহত্যার পোষাকি নাম "অপারেশন সার্চলাইট"। ভারত পূর্ব পাকিস্তানকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। ভারতীয় সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ প্রচেষ্টায় পাক সেনারা শেষমেষ আত্মসমর্পণ করে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয় ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর।

১৯৭২ সালে সিমলায় পাক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সিমলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। জেনেভা প্রোটোকল মেনে ভারত মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধবন্দী পাকসেনাদের মুক্তি দিল। দুই কাশ্মীরের মধ্যবর্তী CFL রেখার নাম পরিবর্তন করে রাখা হল 'LOC' (Line of Control)। চুক্তি অনুযায়ী ভারত ও পাক সেনারা এই নিয়ন্ত্ররেখা অতিক্রম করতে পারবে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য আজাদ কাশ্মীর (পাক অধীকৃত) ও ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের মধ্যবর্তী এই নিয়ন্ত্রনরেখা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। যদিও ১৯৫০ এর দশক থেকে নেহেরু বারবার পাক সরকারের কাছে এই রেখাটিকে আন্তর্জাতিক সীমান্তে রূপান্তরিত করার প্রস্তাব রেখে এসেছেন। কিন্তু লিয়াকত আলি থেকে শুরু করে, মহম্মদ আলি বোগরা হয়ে পারভেজ মোশারফ অব্দি, কেউই এই প্রস্তাব মানেন নি। ২০০২ এর ফেব্রুয়ারিতে পারভেজ মোশারফের কাছে যখন প্রশ্ন রাখা হয় দুই জম্মু কাশ্মীরকে LOC বরাবর আন্তর্জাতিকভাবে ভাগ করে দিতে তাঁর নমনীয়তা আছে কি না ? পারভেজ মোশারফ রেগে উত্তর দেন " ম্যাঁয় বেয়াকুফ নেহি হুঁ"।

পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পর আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য অনেকটাই ভারতের দিকে চলে যায়। শেখ আব্দুল্লা তখন জেলে। তিনি বুঝতে পারেন দক্ষিন এশিয়ার সর্ববৃহৎ শক্তি ভারত ইউনিয়নের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষুদ্র ভূখন্ড কাশ্মীরের স্বায়ত্বশাসনের দাবি করা অনর্থক। উপায়ান্তর না দেখে কাশ্মীরিদের দীর্ঘ দিনের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি ত্যাগ করলেন। ভারতের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে চুক্তিতে সই করলেন ১৯৭৫ সালে। বিনিময়ে আব্দুল্লা পেলেন জেল থেকে মুক্তি। চুক্তির পর শেখ আব্দুল্লা আর কোনদিন কাশ্মীরে গনভোট ও স্বায়ত্তশাসনের কথা বলেন নি। এই আপোষমুখী চুক্তিতে কাশ্মিরীরা নিরাশ হয়ে গেল। তারা আন্দাজ করল এবার হয়ত তাদের ভয়েস শেখ আব্দুল্লা সদলবলে জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করবেন। কিন্তু আব্দুল্লা কাশ্মিরীদের জনসমর্থন হারানোর ভয়ে সেটা করতে পারেন নি। ১৯৭৫ সালে নির্বাচনে জিতে কাশ্মীরের মূখ্যমন্ত্রী হলেন শেখ আব্দুল্লা। এই বছরই দেশে জরুরী অবস্থা জারি করলেন শ্রীমতি গান্ধী। সমস্তরকম গনতান্ত্রিক কাজকর্ম ও দাবিদাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হল। সংবাদ মাধ্যমের ক্ষমতা প্রায় কেড়ে নেওয়া হল। এই হটকারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসে জনতা পার্টি। প্রধানমন্ত্রী হন মোরারজি দেশাই। ১৯৭৭ সালের জুনমাসে কাশ্মীরে আবার নির্বাচন হল। অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচনে শেখ আব্দুল্লা ৭৫ টির মধ্যে ৪৭ টিতে জিতে ফের কাশ্মীরের মূখ্যমন্ত্রী হলেন। ১৯৮২ তে শের-ই-কাশ্মীর শেখ আব্দুল্লার জীবনাবসান হয়। ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতৃত্বের ভার গ্রহন করেন শেখ আব্দুল্লার পুত্র ফারুখ আব্দুল্লা।

জনতা পার্টির গষ্ঠীদন্দ্ব সংক্রান্ত কারনে জাতীয় কংগ্রেস ১৯৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে আবার দিল্লীর মসনদে বসে। অন্যদিকে তিনি ফারুখ আব্দুল্লার রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অখুশি ছিলেন। কারন ফারুখ কাশ্মীরের আঞ্চলিক নেতা থেকে জাতীয় স্তরের নেতা হওয়ার উদ্যোগ নিতে শুরু করেছিলেন। সে কারনে তিনি সারা দেশজুড়ে কংগ্রেসবিরোধী একটি জনমত তৈরির চেষ্টা ও ঐক্য ফ্রন্ট তৈরির পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন। এই উদ্যোগের পাল্টা ভাষ্য তৈরি করার জন্য শ্রীমতি গান্ধী হালকা চালে জাতীয় ঐক্যের খোলসে সংখ্যাগুরু সংহতির তাস খেলতে শুরু করেন। এহেন জাতীয় ঐক্যের ভাষ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম ও শিখরা "Other" হিসাবে থেকে যায়। তারা এই বয়ানের সঙ্গে একাত্ম হতে পারে নি। কেননা তারা বিচ্ছিন্নতাকামী হিসাবে প্রতিপন্ন হচ্ছিল। ১৯৮৪ তে লোকসভা নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচন বৈতরণী পার হওয়ায় ছিল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যেই শ্রীমতী গান্ধী কাশ্মীর বিধানসভাকে পরীক্ষাগার হিসাবে ব্যবহার করেন। জাতীয় ঐক্যের যে সংখ্যাগুরু ভাষ্য নির্মান করা হচ্ছিল সেটা জম্বু অঞ্চলের সংখ্যাগুরু হিন্দু জনমানসে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৮৩ তে কাশ্মীরে বিধানসভা নির্বাচন হয়। ৭৬ টি আসনের মধ্যে ৪৭ টি আসন পেয়ে ফারুখ আব্দুল্লার নেতৃত্বে ন্যশনাল কনফারেন্স সরকার গঠন করে। জাতীয় কংগ্রেস ২৭ টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের আসনে বসে। কিন্তু দিল্লীতে ক্ষমতায় থেকেও "আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন" শ্রীমতি গান্ধীর পক্ষে কাশ্মীরের বিধানসভায় বিরোধী আসনে বসা আত্মসম্মানের প্রশ্ন।
১৯৮৪ তে ফারুখের সরকার এক বছর পূর্ণ করে। কোন এক অদৃশ্য মায়াবলে লোকসভা নির্বাচনের আগেই ন্যশনাল কনফারেন্সের ৪৭ জন বিধায়কের মধ্যে ১২ জন দলত্যাগ করেন। পিছনের সারির নেতা ও শেখ আব্দুল্লার জামাতা গুল মুহম্মদ শাহ ছিলেন দলত্যাগের কান্ডারী। ফারুখ আব্দুল্লা অভিযোগ করেন "পুরোটাই জাতীয় কংগ্রেসের চক্রান্তে হয়েছে"। জম্মু কাশ্মীরের তৎকালীন রাজ্যপাল জগমোহন জাতীয় কংগ্রেসের নির্দেশ মতো ফারুখ আব্দুল্লাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। রাজ্যপালের কাছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নতুন করে নির্বাচনের আর্জি জানিয়েও কোন লাভ হয় নি। এই জগমোহনকে মাত্র তিন মাস আগে রাজ্যপাল পদে বসানো হয় আগের রাজ্যপাল বি.কে নেহেরুকে নাটকীয়ভাবে সরিয়ে। কারন বি.কে নেহেরু দিল্লীর নির্দেশ মতো চলতে চাননি। এই সেই জগমোহন যিনি ১৯৮৪তে দিল্লীর মুসলিম বস্তিতে বুল ডজার চালিয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন। যাই হোক, কাশ্মীরের মানুষ গনতান্ত্রিক পরিবেশ পেয়েছিল ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৪ অব্দি। তারপর আবার গনতন্ত্র লাপাতা হয়ে যায়। কাশ্মীরের মূখ্যমন্ত্রীর পদে বসলেন জনবিচ্ছিন্ন নেতা গুল মুহম্মদ শাহ। জাতীয় কংগ্রেস ও শাহের পিপলস ফ্রন্টের বিরুদ্ধে কাশ্মীরের জনসাধারণ মারাত্মক ক্ষুদ্ধ ছিল। বিক্ষোভ এমন পর্যায় পৌঁছায় যে ক্ষমতায় বসার প্রথম তিন মাসের মধ্যে ৭২ দিনই গুল মুহম্মদ শাহকে কারফিউ জারি রাখতে হয়ে। যে কারনে কাশ্মীরে তাঁর পরিচয় "কারফিউ মূখ্যমন্ত্রী" হিসাবে।

১৯৮৪ সালের ৩১শে অক্টোবর দুই শিখ দেহরক্ষীর হাতে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু হয়। দেশজুড়ে প্রবল সংখ্যালঘু শিখবিরোধী পরিবেশ তৈরি হয়। এহেন সাম্প্রদায়িক আবহে সেই বছরের ডিসেম্বরে সংসদীয় নির্বাচন হয়। সিমপ্যাথির হাওয়ায় ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র রাজীব গান্ধী বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। কিন্তু তাৎপর্যপূর্নভাবে কাশ্মীরে কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়। ন্যাশনাল কনফারেন্স পায় ৪৬% ও কংগ্রেস পায় ৩০ % ভোট। গুল মুহম্মদ শাহের সরকার ১৯৮৬র মার্চ অব্দি টিকে ছিল। আর্টিক্যাল ৩৫৬ অনুযায়ী আইনি শাসনের বিকল হয়ে পড়ায় শাহ সরকারের পতন ঘটে। কাশ্মীরের রাজ্যপাল জগমোহন কাশ্মীরের একনায়কে পরিনত হন। ঠিক এই সময় থেকেই উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির কাশ্মিরী পন্ডিতদের উপর হিংসার আবহ তৈরি হয় কাশ্মীর উপত্যকার দক্ষিন অংশে বিজবেহরা নামক ছোট শহরে। এই শহরেই ভারত অধিকৃত কাশ্মীরেই প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা মুফতি মুহম্মদ সৈয়দের বাড়ি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে এর আগে দীর্ঘ চার দশক ধরে কাশ্মীরী জাতিসত্ত্বা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসংক্রান্ত আন্দোলন চলছে। এই আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও গনতান্ত্রিক। কিন্তু সংখ্যালঘু কাশ্মিরী পন্ডিতদের উপর হিংসার কোন ঐতিহাসিক নমুনা নেই। তাহলে হঠাৎ করে জগমোহনের শাসনামলে কি এমন হল ? এই হিংসার পিছনে কারা ছিল, কি উদ্দেশ্য ছিল, পিছনে কোন গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছিল কি ? উত্তর খুঁজব।

নাটকীয়ভাবে ১৯৮৬ সালে ফারুখ আব্দুল্লা জাতীয় কংগ্রেসের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এটা কাশ্মিরীদের কাছে অনভিপ্রেত ছিল। পরিনামে গোটা উপত্যকা ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে। ফারুখ এই অবস্থায় নিজের ভোলবদলকে জাষ্টিফাই করার জন্য বললেন, "উন্নয়নের স্বার্থে ও দারিদ্র দূরীকরণের জন্য কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গে তাঁর হাত মেলানো আশু প্রয়োজন"। আত্মসমর্পণের পুরস্কার হিসাবে ফারুখ আবার মূখ্যমন্ত্রীর পদে বহাল হলেন। কাশ্মীরের বিক্ষুদ্ধ যুবারা "মুসলিম ন্যশনাল ফ্রন্ট" গড়ে তুলল। ১৯৮৭ তে কাশ্মীরে বিধানসভা নির্বাচন হল। ন্যাশনাল কনফারেন্স ও জাতীয় কংগ্রেস জোটের সঙ্গে লড়াই হল MUF এর। রিগিং এর হাওয়ায় এই নির্বাচনে MUF খড়কুটোর মতো উড়ে গেল। ন্যাশনাল কনফারেন্স ও জাতীয় কংগ্রেসের এই জয় ভারতীয় মিডিয়ায় গনতন্ত্রের জয় বলে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হল। তবুও "MUF" এর নেতা কাজী নিসার ভারতীয় সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। নির্বাচনী প্রহসনের পর সখেদে বললেন, "I believe in the Indian Constitution. How long can people like us keep getting votes by exploiting Islam? We wanted to prove we can do something concrete. But this kind of thing makes people lose all faith in India.” (পাক-পন্থী এক মিলিট্যান্ট গোষ্ঠী ১৯৯৪ সালে অনন্তনাগে নিসার সাহেবকে হত্যা করে)। MUF এর আর এক নেতা আব্দুল গনি হান্দওয়ারা থেকে কোনরকমে জিতেছিলেন। কিন্তু সেনাকর্তৃক তার সমর্থকদের গনহারে গ্রেপ্তারির পর তার জয় মূল্যহীন হয়ে গেল। তিনি বললেন, "If people are not allowed to vote, where will their venom go but into expressions of anti-national sentiment?”

প্রায় জনসমর্থনহীন ফারুখ আব্দুল্লার সরকার টিকে ছিল তিন বছর। ১৯৯০ অব্দি। এই সময় তিনি পুরোপুরিভাবে বিলাসিতায় ডুবে গেছিলেন। নামীদামি শহরে ডিস্কো ঠেকে যাওয়া, গলফ খেলা, বিদেশ ভ্রমন ছিল তাঁর নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। কাশ্মীরের মানুষের কাছে তাঁর নতুন পরিচয় হল "ডিস্কো মূখ্যমন্ত্রী"। জাতীয় কংগ্রেসের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন একাধারে দাম্ভিক ও খামখেয়ালি। ১৯৮৮ এপ্রিল মাসে Kashmir Times ও Hindustan Times কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার বয়ান গুলো ছিল এরকম, "আমি লক্ষ লক্ষ কাশ্মীরিকে জেলে পুরো দিতে পারি, আমার পিছনে জাতীয় কংগ্রেস আছে। জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে দেওয়ার আগে ঠ্যাং ভেঙ্গে খোড়া করে দেব"। এই সময় নাগাদ কাশ্মীরে এক রহস্যময় ঘটনা ঘটল। কাশ্মীর উপত্যকার কিছু গ্রাম ও শহর এলাকা থেকে কিছু জন যুবক রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেল। এরা ছিল ভারত ইউনিয়নের প্রতি বীতশ্রদ্ধ অ্যাংরি ইয়ংম্যান। গোপনে LOC পেরিয়ে এরা পাক অধীকৃত আজাদ কাশ্মীর থেকে অস্ত্রসহ কমব্যাট ট্রেনিং নিয়ে আসে। ঘটনাচক্রে এই বছরই জুন মাসে শ্রীনগরে বিদ্যুতের আকাশছোঁয়া দামবৃদ্ধির প্রতিবাদে একটি নাগরিক মিছিল বের হয়। সেই মিছিলকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য সিআরপিএফ নাগরিক মিছিলের উপর গুলি যায়। কয়েকশো বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়। কিছুদিন পরেই ৩১ শে জুলাই শ্রীনগরে টেলিগ্রাফ অফিসের কাছে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সেনা কর্তৃক কয়েকশো কাশ্মীরি হত্যার পাল্টা হিসাবে বিস্ফারণটি ঘটায় আজাদ কাশ্মীর ফেরৎ অস্ত্র প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত যুবকেরা। পরিকল্পনার মাষ্টারমাইন্ড ছিল আজাদ কাশ্মীরের বাসিন্দা JKLF নেতা মুহম্মদ রউফ কাশ্মিরী। শুরু হল কাশ্মীরে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বনাম জঙ্গী সন্ত্রাসের বাতাবরণ।

এই JKLF (Jammu & Kashmir Liberation Front) গঠিত হয় ১৯৬৪ সালে আজাদ কাশ্মীরে। এতদিন অব্দি প্রায় নখদন্তহীন একটা সংগঠন ছিল। এপারের কাশ্মীর থেকে তেমন জনসমর্থনও ছিল না। সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল ভারত অধিকৃত ও পাক অধীকৃত কাশ্মীর নিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম ভূখন্ড তৈরি করা। সংগঠনের সহপ্রতিষ্ঠাতা আমানুল্লা খান ১৯৭০ এর দশকে নিজেদের সংগঠনের লক্ষ্য সম্পর্কে প্রায়শই বলতেন, “a united, neutral, secular and federal republic of Kashmir" ( Contested Lands, Harvard University Press, P- 179)। তারা এতদিন কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী সুফী আদর্শে দীক্ষিত ছিল। কিন্তু ৮০র দশকের শেষদিকে এসে তারা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়। এইসময় JKLF পাকিস্তানি ISI (Inter-Services Intelligence) এর ছত্রছায়ায় আসে। একদিকে মিলিটারি শাসনের মাধ্যমে কাশ্মীরিদের উপর ভারত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গনগ্রেপ্তারি, হাজার হাজার যুবককে রহস্যজনকভাবে গুম করে দেওয়া, আর অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে অনবরত উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গি সন্ত্রাস রপ্তানি -- এই দুয়ের পরিণামে JKLF ভাল রকমের মাইলেজ পেয়ে যায়। পাকিস্তানের ISI পাকিস্তানের সেনা শাসক জেনারেল জিয়ায়ুল হকের সময় গঠিত হয়। আমেরিকার Central Intelligence Agency-র পোষ্য হিসাবে কাজ করত। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত লাল ফৌজ তাড়ানোর জন্য ISI কে ব্যবহার করেছিল আমেরিকা। ১৯৮৯ এ সোভিয়েত লাল ফৌজ আফগানিস্থান থেকে বিদায় নিলে ISI পুরোপুরিভাবে কাশ্মীরের রাজনৈতিক পরিবেশের উপর মনোনিবেশ করে। আড়ালে ধীরে ধীরে কাশ্মিরের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি দখল নিতে শুরু করে।

পুরো উপত্যকা জুড়ে যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল সেটা ঘোলাটে হয়ে গেল বিশেষ এক ঘটনার সুত্র ধরে -- কাশ্মীরি পন্ডিতদের বিতাড়ন। এরা ছিল কাশ্মীরের সংখ্যালঘু শ্রেণি। ১৯৮১র আদম সুমারী অনুযায়ী কাশ্মীরে হিন্দু জনসংখ্য ছিল ১২৪০৭৮ জন। শতাংশের হিসাবে ৪%। এদের মধ্যে একটা বড় অংশই কাশ্মীরি পন্ডিত শ্রেনির। ১৯৮৯-৯০ সালে এদের জনসংখ্যা ছিল ১৩০,০০০ থেকে ১৪০,০০০ এর মতো। বর্তমানে এদের বড় অংশ ভারতের বিভিন্ন বড় বড় শহরে বসবাস করে। দায়িত্বশীল উচ্চ প্রশাসনিক পদে কর্মরত। ১৯৯০ সালের ফ্রেব্রুয়ারী মার্চের দিকে বিদ্রোহ যখন চরমে উঠল তখন প্রায় এক লক্ষ কাশ্মিরী পন্ডিত উপত্যকা ছেড়ে জম্মু ও দিল্লী শহরে পালিয়ে এসেছিল। এই ঘটনাটি ভারতের ধর্মীয় রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা। RSS প্রভাবিত কাশ্মিরী পন্ডিতদের সংগঠন বারংবার অভিযোগ তোলে যে নিছক "এথনিং ক্লিঞ্জিং" এর জন্য তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হিংসা ও সন্ত্রাস চালানো হয়েছে। অন্যদিকে স্বাধীনতাকামী মুসলিম সংগঠনের দাবি যে আন্দোলনের চরিত্রকে ঘোলাটে করে দেওয়ার জন্য ভারতীয় প্রশাসন এই ষড়যন্ত্রটি করেছে। তারা আরও অভিযোগ করে যে বিশেষ করে জম্মু কাশ্মীরের তৎকালীন রাজ্যপাল জগমোহন সিং ইচ্ছাকৃতভাবে কাশ্মিরী পন্ডিতদের মনে ইসলামোফোবিয়ার আগুন জ্বালিয়েছে যাতে করে স্বাধীনতা আন্দোলনের চরিত্র সাম্প্রদায়িক রূপ পায়।

মতের এই দুই বিপরীত মেরুর মাঝখানে থেকে আমাদের পুরো ব্যাপারটি দেখা প্রয়োজন। স্বাধীনতাকামী মিলিট্যান্টরা যাদেরকে ভারত সরকারের চর বলে মনে করত তাদেরই হত্যা করত। ১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পরের বছর ফেব্রুয়ারি মার্চ অব্দি যত জন তাদের হাতে খুন হয়েছে তাদের মধ্যে কিছু উচ্চ প্রশাসনিক ও বিভাগীয় পদে কর্মরত কাশ্মীরি পন্ডিত ছিলেন। "ইন্ডিপিন্ডেন্ট ইনিসিয়েটিভ অভ কাশ্মীর" এর রিপোর্ট অনুযায়ী চর সন্দেহে মিলিট্যান্টদের হাতে খুন হওয়া ১০০ জনের মধ্যে ৩২ জন হিন্দু, বাকি ৬৮ জন মুসলিম। মিলিট্যান্টদের মতানুযায়ী, "একজন বিশ্বাসঘাতক ৫০ জন দখলদার ভারতীয় সেনার সমান। হিন্দু মুসলিম যায় হোক, আমরা কাউকে ছাড়ব না" (ইন্ডিপিন্ডেট পত্রিকা, ১০.৬.৯০)। হাই প্রোফাইল কাশ্মীরি পন্ডিত যারা JKLF এর হাতে শ্রেণীশত্রু হিসাবে খুন হয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিজেপির কাশ্মীর ইউনিটের প্রেসিডেন্ট, একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক যিনি এক দশক আগে JKLF এর সহপ্রতিষ্ঠাতা মকবুল বাটকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন এবং ভারত-সরকার পোষিত দূরদর্শনের শ্রীনগর কেন্দ্রের ডিরেক্টর। এরকম প্রভাবশালী কাশ্মীরি পন্ডিতদের হত্যার ফলে এই সম্প্রদায়ের সাধারন মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার হয়েছিল। সেই ভীতি থেকেই তারা ভিটেমাটি ছেড়েছে। কিন্তু JKLF এর বয়ান অনুযায়ী এই সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষকে হত্যা করা নয়, বরং যেকোন ধর্মীয় সম্প্রদায় নির্বিশেষে ভারত সরকারের "চর" দের হত্যাই তাদের উদ্দেশ্য।

পাশাপাশি একটা আর্থসামাজিক কারনও ছিল। বিভিন্ন সরকারী চাকুরিতে সংখ্যালঘু কাশ্মীরি পন্ডিতদের উপস্থিতি খুব বেশি ছিল। জনসংখ্যার বিচারে চাকুরিক্ষেত্রে কাশ্মিরী মুসলিমদের উপস্থিতি তেমন ছিল না। এটাকে স্থানীয় মুসলিমরা বঞ্চনার নজির হিসাবেই মনে করেছিল। মুসলিমদের প্রতি বঞ্চনার এই লিগ্যাসি ডোগরা রাজাদের সময় থেকেই চলে আসছে। কাশ্মিরী পন্ডিতরা বংশগতভাবে ডোগরা রাজাদের পৃষ্ঠপোষক ছিল। ফলতঃ ডোগরা রাজত্বের সময় মহারাজাদের আশীর্বাদে উচ্চ প্রশাসনিক পদগুলি কাশ্মীরি পন্ডিতরা দখল করে বসেছিল। তার উপর আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ডোগলা রাজাদের তেমন সখ্যতা ছিল না। যার দরুন সংখ্যালঘু হলেও পন্ডিতরা আর্থসামাজিক দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। ১৯৯০ এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে উপত্যকায় য্র ধর্মান্ধ মৌলবাদী স্লোগান ধ্বনিত হয়েছিল বলে অভিযোগ আনা হয় তার কারন হতে পারে এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।

ইসলামীয় স্লোগান ব্যবহার হলেও সামাজিক বঞ্চনাজনিত ক্ষোভই আসল কারন। এই ঘটনার পর থেকে কাশ্মিরী পন্ডিত বিতাড়ন ইস্যু ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশাল বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। মিডিয়া প্রোপাগাণ্ডা কাশ্মীরে মিলিটারি শাসন জারি রাখার ক্ষেত্রে সবথেকে বড় যুক্তি হিসাবে কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নের ঘটনাটিকে খাড়া করে।
কিন্তু এহেন সাম্প্রদায়িক হিংসা কাশ্মীরের ঐতিহ্য নয়। বরং সম্প্রীতি ও সহাবস্থানই কাশ্মির ভূখন্ডের আদর্শ ছিল। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগতভাবে কাশ্মিরীরা সুফি ধারাকে এতদিন মেনে চলেছে। পীর দরগা মাজারে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সবাই যেত। নিজেদের জাতিগত সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রতা ও মূল্যবোধকে বোঝাতে কাশ্মীরিরা "কাশ্মিরিয়াৎ" শব্দটি ব্যবহার করে। বাঙালীর বাঙালীয়ানার মতো। ধর্মীয় সমন্বয়, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিই "কাশ্মিরিয়াৎ" এর প্রানভোমরা। "কাশ্মিরিয়াৎ" আত্মপরিচয়ে কাশ্মীরের হিন্দু মুসলিম সবাই নিজেদের আইডেন্টিফাই করতে পারে। ঠিক এই কারনেই কাশ্মীরের ইতিহাস নিয়ে আজীবন গবেষক অধ্যাপক সুমন্ত্র বসু কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়ন ইস্যু নিয়ে অন্বেষণ করতে গিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন। বহু কাশ্মীরী পন্ডিত যারা ভিটে ছেড়ে পালিয়ে গেছিলেন তাদের অনেকেই ফিরে এসেছেন। তাদের অনেকেই সেই সময় কিছু ধর্মান্ধ মুসলমানের উগ্রতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেয়।

আবার অনেক পন্ডিত জানায় যে যেদিন তারা পুনরায় উপত্যকায় ফিরে আসে প্রতিবেশী মুসলিমরা তাদের সাদরে গ্রহন করে, গোটা মহল্লা তারা মিষ্টি বিতরন করে উৎসব পালন করে। আবার কিছু পন্ডিত স্বাধীনতাকামী মিলিট্যান্ট গ্রুপের প্রতি সলিডারিটিও জানায়। কিছু মুজাহিদ গোষ্ঠীও পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে কাশ্মীরি পন্ডিতদের স্বভূমিতে ফিরে আসার আহ্বান জানায়। সেই সঙ্গে তারা স্থানীয়দের সতর্ক করে দেয় যে কেউ যাতে পন্ডিতদের সম্পত্তি বেদখল করে না নেয়।

হিজবুল্লা নামে এক মুজাহিদ গোষ্ঠী ১৯৯১ এর নভেম্বরে এক কাশ্মীরি পন্ডিত দম্পতিকে অপহরন করেছিল। ৪৫ দিন পর তারা ছাড়া পায়। ফিরে আসার পর তাদের বয়ান ছিল,
"During this time we lived for varying periods in 57 [Muslim] homes. All those people showered love and hospitality on us. We owe them all a debt of gratitude. with their sympathy we were better able to cope... We met a cross-section of people in the villages and a sizeable number of youth belonging to militant organizations. We talked with them about education, religion, social life, politics, Kashmiriyat [the meaning and values of Kashmiri identity], human emotions, and above all ways of building bridges and winning hearts. These interactions reinforced our faith in the values of love and goodness which are still deeply ingrained in the Kashmiri ethos"
[Khemlata Wakhloo and O. N. Wakhloo, Kidnapped: 45 Days with Militants in Kashmir (Delhi: Konark, 1993), 396]

ভারতীয় মিডিয়া ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকরা প্রায়শই অভিযোগ করে এসেছে যে বাবরি মসজিদ কান্ডের পরে জম্মু কাশ্মীরে প্রচুর মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে। এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য ১৯৯৩ সালের ফ্রেব্রুয়ারী মাসে দেশের প্রথম সারির ম্যাগাজিন একটি অনুসন্ধান চালিয়ে ছিল। সাংবাদিকদের অস্ত্র সহ একটি তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিজেপির দিল্লী অফিস থেকে দেওয়া এই তালিকায় ছিল ২৩ টি জায়গার মন্দিরের নাম, যে মন্দির গুলো নাকি ধ্বংস করা হয়েছে। বিজেপির সর্বোচ্চ নেতা লালকৃষ্ণ আদবানী উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তদন্তের আগে বললেন, " কাশ্মীরে যে এত গুলো মন্দির ধ্বংস করা হল, কেউ কিছু বলল না, কেন এই দ্বিচারিতা?" তদন্তকারীর দল বিস্তর তদন্ত করে এসে ছবি দেখাল যে ২৩ টি মন্দিরের মধ্যে ২১ টিই অক্ষত আছে। আর অন্য দুটি হালকা কিছু ড্যামেজ হয়েছে, সেটা সহজেই সারিয়ে নেওয়া যায়।

তদন্তকারীর দল প্রতিবেদন পেশ করল,
“even in villages in which only one or two Pandit families are left, since the exodus of 1990, the temples are safe . . . even in villages full of [armed] militants. The Pandit families have become custodians of he temples. They are encouraged by their Muslim neighbors to regularly offer prayers.”
[India Today, 28 Feb. 1993, 22–25]

এই প্রতিবেদনই বলে দিচ্ছে ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, বরং সমন্বয়ই কাশ্মীরের এতদিনের ঐতিহ্য। ঘৃণা নয়, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি নিয়ে পারস্পরিক সহাবস্থান, এটাই কাশ্মিরিয়াৎ।

১৯৯০ এর কাছাকাছি সময় থেকে কাশ্মিরে জোর কদমে শুরু হওয়া আজাদির লড়াই থেকে অদ্যাবধি সময়টাকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায় -- ১) ইন্তিফাদা বা আরোহন পর্ব (১৯৯০-১৯৯৫), ২) অবক্ষয় পর্ব (১৯৯৬ -১৯৯৮) এবং ৩) ফিঁদায়ে পর্ব (১৯৯৯-- ) । এদের মধ্যে ফিঁদায়ে পর্বটি হল ইসলামীয় মৌলবাদকে আশ্রয় করে ক্রমশ ঝিমিয়ে যাওয়া আন্দোলনকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার পর্যায়। পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে 'ফিঁদায়ে' (আত্মঘাতী) হামলা চালাতে শুরু করে মূলত এই সময় থেকেই।

১৯৮৭-৮৮ থেকে কাশ্মিরী যুবাদের হাত ধরে বিপ্লবের যে আগুন একটু একটু করে জ্বলছিল সেটি ১৯৯০ এর জানুয়ারিতে চরম মাত্রায় পৌঁছায়। এতদিন আজাদ বাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় সেনা বাহিনীর সংঘর্ষ হলে সাধারন মানুষ পালিয়ে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নিত। কিন্তু এইসময় থেকে বিদ্রোহ আর আজাদ বাহিনীর কিছু বিক্ষুদ্ধ যুবকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। কাশ্মিরের আজাদির লড়াই গন্ডী ছাড়িয়ে রীতিমত গনআন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করল। যে জনগন এতদিন গনতান্ত্রিকভাবে ভারতরাষ্ট্রের বিরোধীতা করে এসেছে তারা এবার লাখে লাখে পথে নামতে শুরু করে। তাদের শ্লোগান ছিল "কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি"।

এই বছরের জানুয়ারি মাসে শ্রীনগর ও আশপাশের এলাকা থেকে কাশ্মিরের অসংখ্য মানুষ বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। জেকেএলএফ নেতৃত্ব নিজেও হঠাৎ এত এত মানু্ষের আবেগের বিচ্ছুরণে হকচকিয়ে যায়। কাশ্মিরের মানুষের এমন ব্যাপক সাড়া তাদের কাছে অভাবনীয় ছিল। শ্রীনগর সহ সুপুর, বারমুলা এবং অনন্তনাগে লাখ লাখ কাশ্মিরী এই বিক্ষোভে সামিল হয়। কাশ্মিরের পাথর ছোড়া বাহিনীর সঙ্গে অস্ত্রসজ্জিত ভারতীয় সেনাবাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ চলে কয়েকদিন। আশ্চর্যজনকভাবে এই সময় জম্মু কাশ্মীরের লোকাল পুলিশ বাহিনী রাতারাতি উধাও হয়ে যায়। বদলে পুরো এলাকার দখল নেয় প্যারামিলিটারি ফোর্স। প্রথম দিকে ভারতীয় ফোর্স ডিফেন্সিভ নীতি গ্রহন করেছিল। কিন্তু পরের দিকে তারা মেজাজ হারিয়ে ফেলে। জানুয়ারীর ২১ তারিখ থেকে ২৩ তারিখ অব্দি চলা তিন দিনের সংঘর্ষে সেনাবাহিনীর গুলিতে ৩০০ জন নিরস্ত্র কাশ্মিরীর মৃত্যু হয়।

এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন ফারুখ ওয়ানি। পেশায় সরকারি ইঞ্জিনিয়ার। ২১ শে জানুয়ারীর সেই বিভৎস অভিজ্ঞতা তিনি সংবাদ মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন --
"আমার পায়ে গুলি লাগে। আমি ভয়ে রাস্তায় শুয়ে পড়ি। আমার আশেপাশে শুধু রক্তাক্ত মৃতদেহ। আমি দেখছিলাম ছোট ছোট বাচ্চার বুকে মাথায় গুলি লেগে বেঘোরে প্রান যাচ্ছে। তারপর সেনাবাহিনীর এক অফিসার এলেন। তিনি শুয়ে থাকা আহত ব্যক্তিদের উপর গুলি চালিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করছিলেন। একটি বাচ্চা ছেলেকে দেখলাম ঝিলাম নদীর ব্রিজের তলায় ভয়ে লুকিয়ে ছিল। বুকে গুলি লেগে সেও মারা যায়। যেই আমি অসাবধানে মাথাটা তুলেছি একজন সিআরপিএফ জোরে চেঁচিয়ে বললেন , "ও আদমি আভি জিন্দা হ্যায়"। আমি তাদের কাছে অনুনয় করলাম, দয়া করে আমায় ছেড়ে দিন, প্লিজ আমায় মারবেন না, আমি সরকারি কর্মচারী। অফিসার আমায় জোর গলায় বললেন, " শালে, ইসলাম চাতে হো ?" এটা বলেই আমার দিকে গুলি চালালেন। আমার পিঠের ধার ঘেষে ও হাতে গুলি লাগল। আর একজন সিআরপিএফ এগিয়ে এসে আমায় বলল, "তুম, শালে জিন্দা হো, মারা নেহি হ্যায়"। আমার পিঠে দু লাথ দিয়ে সে পালিয়ে গেল। তারপর একটি ফাঁকা ট্রাক এলো। আহত ও নিহত যারা সবাই মাটিতে পড়েছিল সবাইকে পাঁজা করে ট্রাকে তোলা হল। সেই ট্রাকে প্রায় ৩০-৩৫ টি মৃতদেহ ছিল। ট্রাকে আর জায়গা হল না। অফিসার ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন, " বাকি কো নালে মে ফেক দো"। আমাদের উপর একটি ত্রিপল বিছিয়ে দেওয়া হল। কিছুদুর যাওয়ার পর বুঝলাম জনা কয়েক আহত ব্যক্তি মরার ভান করেছিল। তারা নিজেদের মধ্যে মৃদু স্বরে কাশ্মিরী ভাষায় কথা বলছিল। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ একজন যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে উঠল। শব্দ শুনে একজন লোকাল পুলিশ এল। সে বলল, " হায়, রাম, ইঁহাপে আভি কুছ জিন্দা আদমি হ্যায়।" (Kashmir: Roots of Confliict, Paths to Peace, ed. Harvard University Press, 2007, P-109-10).

ফারুখ ওয়ানির শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছ'খানা গুলি লেগেছিল। এরপরেও পুনর্জন্ম পাওয়ার মতো তিনি বেঁচে ফিরেছিলেন। পরে ফারুখ ওয়ানি শুনেছিলেন যে ঐ পুলিশ তাঁকে বাঁচিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই সেই পুলিস "হার্ট অ্যাটাকে" মারা যান।

এহেন গনহত্যার দিন কয়েক পরে প্রতিহিংসা হিসাবে জেকেএলএফ শ্রীনগরের উপকন্ঠে চারজন নিরস্ত্র সেনাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। হিংসা ও প্রতিহিংসার এই খেলায় কাশ্মীরে জীবনহানির ঘটনা আকছার ঘটতে থাকে। এই বছর এপ্রিল মাসে এক ভারতীয় সাংবিদক তার প্রতিবেদনে বলেন, "
“...azadi movement had united workers, engineers, schoolteachers, shopkeepers, doctors, lawyers, even former MLAs [members of the IJK legislative aassembly] and Jammu and Kashmir police. The nonsurgical response rapidly turned the relationship between the Indian state and the valleys’s population into an occupier-occupied relationship, sealing a bitter divide". (India Today, 30 Apr. 1990, 13)

ভারত সরকার জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর অব্দি পুরো উপত্যকাকে পুরোপুরিভাবে সামরিক আইনের আওতায় আনে। একসঙ্গে তিন ধরনের আইন কাশ্মীরে লাগু হল -- Armed Forces Soecial Powers Act (AFSPA), Disturbed Areas Act এবং Terrorism and Disruptive Areas Activities (Prevention) Act ( TADA). এসব আইনের বলে কাশ্মীরে একপ্রকার সামরিক শাসন কায়েম হয়। কাশ্মীরের রাস্তা, পাবলিক প্লেস, বাজার এলাকা অস্ত্রসজ্জিত প্যারামিলিটারি ফোর্সে ছেয়ে গেল। সংখ্যার হিসাবে প্রতি সাত জন কাশ্মিরী পিছু একজন করে প্যারামিলিটারি নিযুক্ত হয়।

এই বছর গুলোতে কাশ্মিরী যুবাদের 'বিপ্লবী' বনে যাওয়া প্রায় ফ্যাসানে পরিনত হয়েছিল। LOC র ওপারে আজাদ কাশ্মীর বা পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের কাছাকাছি আফগান সীমান্তে কিছু অস্ত্র কারখান ও বাজার ছিল। সেখান থেকে নিয়মিত অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ হত। ভুঁইফোড় কমান্ডার কিছু বন্দুকধারী কাশ্মিরী যুবাকে নিয়ে তাঞ্জিম গড়ে তুলত। তাঞ্জিম হল ভারতরাষ্ট্র বিরোধী গেরিলা বাহিনী। অতর্কিতে সেনাদের উপর হামলা চালানোর জন্য এইসব তাঞ্জিম গুলো গড়ে তোলা হত।

তথ্যসুত্রঃ
1. Kashmir in Coflict: India, Pakistan and Unending War (Victoria Schofield, ed. I.B Tauris, 2003).
2. Kashmir: Roots of Conflict, Paths to Peace ( Sumantra Bose, Harvard University Press, 2003).
3. Contested Lands: (Sumantra Bose, ed. Harvard University Press, 2007).
4. কাশ্মীরে আজাদির লড়াইঃ একটি ঐতিহাসিক দলিল (প্রবীর ঘোষ, দে'জ পাবলিশিং, 2010).

© আশরাফুল আমীন সম্রাট


821 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন