souvik ghoshal RSS feed

souvik ghoshalএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • আমাদের চমৎকার বড়দা প্রসঙ্গে
    ইয়ে, স-অ-অ-অ-ব দেখছে। বড়দা সব দেখছে। বড়দা স্রেফ দেখেনি ওইখানে এক দিন রাম জন্মালেন, তার পর কারা বিদেশ থেকে এসে যেন ভেঙেটেঙে মসজিদ স্থাপন করল, কেন না বড়দা তখন ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুম ভাঙল যখন, চোখ কচলেটচলে দেখলেন মস্ত ব্যাপার এ, বড়দা বললেন, ভেঙে ফেলো মসজিদ, জমি ...
  • ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ?
    যেকোন নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে সামনে আসার পর নাগরিক হিসাবে আমাদের একটা ঈমানি দায়িত্ব থাকে। দায়িত্বটা হল অভিযুক্ত ধর্ষকের কঠোরতম শাস্তির দাবি করা। কঠোরতম শাস্তি বলতে কারোর কাছে মৃত্যুদন্ড। কেউ একটু এগিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ার ...
  • তোমার পূজার ছলে
    বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না ...
  • The Irishman
    দা আইরিশম্যান। সিনেমা প্রেমীদের জন্য মার্টিন স্করসিসের নতুন বিস্ময়। ট্যাক্সি ড্রাইভার, গুডফেলাস, ক্যাসিনো, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, দা অ্যাভিয়েটর, দ্য ডিপার্টেড, শাটার আইল্যান্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট, সাইলেন্টের পরের জায়গা দা আইরিশম্যান। বর্তমান সময়ের ...
  • তোকে আমরা কী দিইনি?
    পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন -********তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, ...
  • ইশকুল ও আর্কাদি গাইদার
    "জাহাজ আসে, বলে, ধন্যি খোকা !বিমান আসে, বলে, ধন্যি খোকা !এঞ্জিনও যায়, ধন্যি তোরে খোকা !আসে তরুণ পাইওনিয়র,সেলাম তোরে খোকা !"আরজামাস বলে একটা শহর ছিল। ছোট্ট শহর, অনেক দূরের, অন্য মহাদেশে। অনেক ছোটবেলায় চিনে ফেলেছিলাম। ভৌগোলিক দূরত্ব টের পাইনি।টের পেতে দেননি ...
  • ছন্দহীন কবিতা
    একদিন দুঃসাহসের পাখায় ভর করে,ছুঁতে চেয়েছিলাম কবিতার শরীর ।দ্বিখন্ডিত বাংলার মত কবিতা হয়ে উঠলোছন্দহীন ।অর্থহীন যাত্রার “কা কা” চিৎকারে,ছুটে এলোপ্রতিবাদী পাঠক।ছন্দভঙ্গের নায়কডানা ভেঙ্গে পড়িপুঁথি পুস্তকের এক দোকানে।আলোক প্রাপ্তির প্রত্যাশায়,যোগ ধ্যানে কেটে ...
  • হ্যালোউইনের ভূত
    হ্যালোউইন চলে গেল। আমাদের বাড়িতে হ্যালোউইনের রীতি হল মেয়েরা বন্ধুদের সঙ্গে ট্রিক-অর-ট্রিট করতে বেরোয় দল বেঁধে। পেছনে পেছনে চলে মায়েদের দল। আর আমি বাড়িতে থাকি ক্যান্ডি বিতরণ করব বলে। মুহূর্মুহূ কলিং বেল বাজে, আমি হাসি-হাসি মুখে ক্যান্ডির গামলা নিয়ে দরজা ...
  • হয়নি
    তুমি ভালবাসতে চেয়েছিলে।আমিও ।হয়নি।তুমিঅনেক দূর অব্দি চলে এসেছিলে।আমিও ।হয়নি আর পথ চলা।তুমি ফিরে গেলে,জানালে,ভালবাসতে চেয়েছিলেহয়নি। আমি জানলামচেয়ে পাইনি।হয়নি।জলভেজা চোখে ভেসে গেলআমাদের অতীত।স্মিত হেসে সামনে এসে দাঁড়ালোপথদুজনার দু টি পথ।সেপ্টেম্বর ২২, ...
  • তিরাশির শীত
    ১৯৮৩ র শীতে লয়েডের ওয়েস্টইন্ডিজ ভারতে সফর করতে এলো। সেই সময়কার আমাদের মফস্বলের সেই শীতঋতু, তাজা খেজুর রস ও রকমারি টোপা কুলে আয়োজিত, রঙিন কমলালেবু-সুরভিত, কিছু অন্যরকম ছিলো। এত শীত, এত শীত সেই অধুনাবিস্মৃত কালে, কুয়াশাআচ্ছন্ন পুকুরের লেগে থাকা হিমে মাছ ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র ভুবন

souvik ghoshal

মৃণাল সেনের জন্ম ১৯২৩ সালের ১৪ মে, পূর্ববঙ্গে। কৈশোর কাটিয়ে চলে আসেন কোলকাতায়। স্কটিশ চার্চ কলেজ ও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশুনো করেন। বামপন্থী রাজনীতির সাথে বরাবর জড়িয়ে থেকেছেন, অবশ্য কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন না।

চলচ্চিত্র নির্মাণ পর্বের আগে চলচ্চিত্র নিয়ে তাত্ত্বিক পড়াশুনো ও লেখালেখি শুরু করেছিলেন। রুডলফ আর্নহেইমের ফিল্ম এসথেটিকস, নীলসনের সিনেমা অ্যাজ এ গ্রাফিক আর্ট এর মতো বই তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

১৯৫৫ সালে তাঁর প্রথম ছবি নির্মিত হয়, রাতভোর। ছবিটিকে নিজেই আখ্যাত করেন অত্যন্ত জঘন্য বলে। উল্লেখ করার মতো তথ্য হল এই সিনেমায় উত্তমকুমার অভিনয় করেছিলেন, যদিও তিনি চলচ্চিত্র মহলে তখন উল্লেখযোগ্য কোনও ব্যক্তি হয়ে ওঠেন নি।

১৯৫৯ সালে তৈরি হয় মৃণাল সেনের দ্বিতীয় সিনেমা নীল আকাশের নীচে। এক আন্তর্জাতিক আত্মীয়তাবোধ এই ছবিটির মূল প্রেরণা। ছবিটিতে আমরা দেখি এক চিনা ফেরিওয়ালাকে যে তার রুজি রুটির তাগিদে এদেশের সাথে নিবিড় সম্পর্কে জড়িয়ে যায় এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের শরিক হয়ে পড়ে।

ফেরিওয়ালা চরিত্রকে তার পরের ছবি বাইশে শ্রাবণ (১৯৬০) এও নিয়ে আসেন মৃণাল সেন। চিনা ফেরিওয়ালা এসেছিল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। আর এই সিনেমার বাঙালি ফেরিওয়ালা চরিত্রটি আসে দুর্ভিক্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে। মৃণাল সেনের অত্যন্ত সাড়াজাগানো এই ছবিটি মূলত একটি পরিবারের গল্প। ফেরিওয়ালা, তার স্ত্রী ও তাদের জীবন সংকটের গল্প। একটি পরিবারের গল্পের মধ্যে দিয়ে দুর্ভিক্ষকালীন সমাজের সংকটিকে ভাষা দেন মৃণাল সেন।

১৯৬১ তে মৃণাল সেন তৈরি করেন পুনশ্চ ছবিটি। পটভূমি সরে আসে গ্রাম থেকে শহরে। মধ্যবিত্ত এক পুরুষ নারীর, প্রেমিক প্রেমিকার এই গল্পে মৃণাল সেন দেখান পুরুষ প্রাধান্যের সমাজে নারীর অর্থিনৈতিক স্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা কীভাবে খর্বিত হচ্ছে।

১৯৬২ তে পরের ছবি অবশেষে নির্মিত হয়। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক, প্রেম, বিচ্ছেদের এই কমেডি ছবিটি তেমন সাড়া ফেলতে পারে নি আগের ছবি পুনশ্চের মতোই।

১৯৬৪ তে পুরুষ শাসিত সমাজে মেয়েদের অবস্থা নিয়ে প্রতিনিধি নামে আরেকটি ছবি তৈরি করেন মৃণাল সেন। মেয়েদের সামাজিক ভয় ভীতি ভেঙে বেরিয়ে আসার ডাক রয়েছে এখানে।

১৯৬৫ তে মৃণাল সেন বানান আকাশ কুসুম। ছবির স্বপ্নবিলাসী নায়ক অজয় মধ্যবিত্তের বেড়া টপকে উচ্চবিত্ত হয়ে উঠতে চায় খুব দ্রুত। এজন্য বড়লোকের মেয়ের সাথে কৌশলী প্রেম সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়ে। অজয় চরিত্রটি নিয়ে পরিচালক কৌতুকই করেন ছবিতে। কৌশলী প্রেম স্বাভাবিকভাবেই সার্থকতা পায় না। ছবিটি শৈলীগত পরীক্ষা নিরীক্ষার কারণে আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৯৬৬ সালে কালিন্দীচরণ পাণিগ্রাহীর কাহিনী অবলল্বনে ওড়িয়া ভাষায় মৃণাল সেন তৈরি করেন মাটির মানুষ ছবিটি। এর পটভূমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে স্থাপিত। ওড়িষ্যার এক কৃষক পরিবারে সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা কীভাবে যৌথ সংসারে ভাঙন নিয়ে আসছে, জমির দ্বন্দ্ব কীভাবে পারিবারিক সম্পর্কে ছায়া ফেলছে সেটা এখানে অভিব্যক্ত হয়েছে। বড় ভাই নিজে জমির অধিকার ত্যাগ করে, কিন্তু তবু মানসিকতায় সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব আঁকড়ে থাকে। ছোটভাই না চাইলেও সম্পত্তির অধিকারী হয়। সেটা তার সামন্ততন্ত্র বিরোধী লড়াইয়ের মানসিকতাকে দুর্বল করে না। কৃষক ও কৃষি প্রশ্নকে কেন্দ্রে রেখে নির্মিত এই সিনেমাটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী নির্মাণ।

১৯৬৯ সালে বনফুলের কাহিনী অবলল্বনে হিন্দি ভাষায় মৃণাল সেন তৈরি করেন তাঁর বিখ্যাত ছবি ভুবন সোম। এই ছবির মুখ্য ভূমিকায় উৎপল দত্তের অসামান্য অভিনয় এবং এর শৈলীগত নিরীক্ষা একে একটি ক্লাসিকে পরিণত করেছে। অনেকে মনে করেন এই ছবিটির মধ্যে দিয়েই হিন্দি প্যারালাল ছবির ধারাটি জন্ম নেয়। ছবিতে রেলের জাঁদরেল অফিসার ভুবন সোম সৎ ও কর্মনিষ্ঠ মানুষ, ভিক্টোরীয় আদর্শবাদের প্রতিনিধি। নিজের ছেলেকেও তিনি নিজের সততা রক্ষার জন্য চাকরী থেকে বরখাস্ত করতে পারেন। কিন্তু এই সমীহযোগ্য আদলটিকে এরপর মৃণাল সেন ভেঙে দেন। দেখা যায় ক্ষমতা তৃপ্তির জন্য দুর্নীতিকে তিনি প্রশ্রয় দিতে পারেন। রেলের রুটিন কাজের বাইরে গুজরাটে একবার পাখি শিকারে যান ভুবন সোম। সেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পটে এক নারীর লাবণ্যের শিকার হয়ে যান তিনি। সততা রক্ষার রুটিন ভেঙে সেই লাবণ্যময়ীর স্বামীর দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেন।

১৯৬৯ এ রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প অবলম্বনে ইচ্ছাপূরণ নামে এক শিশুচিত্র তৈরি করেন তিনি।

এরপরেই শুরু হয় মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র নির্মাণ জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল পর্বটি। আমরা পরপর তাঁর কাছ থেকে পাই ইন্টারভিউ (১৯৭১), কলকাতা ৭১(১৯৭২), পদাতিক (১৯৭৩), কোরাস (১৯৭৪), একদিন প্রতিদিন (১৯৭৯)। সত্তর দশকে তৈরি এই পাঁচটি ছবি মৃণাল সেন এর সবচেয়ে আলোচিত ছবিগুলির মধ্যে অন্যতম।

নিঃসন্দেহে সত্তর দশকের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বাস্তবতা মৃণাল সেনের এই নাগরিক ছবিগুলি নির্মাণের পেছনে মূল প্রেরণা হিসেবে সক্রিয় থেকেছে। একদিকে নকশালবাড়ি আন্দোলন, মুক্তির দশক হিসেবে সত্তর দশককে দেখে ছাত্র যুবর প্রতিস্পর্ধী রাজনীতি ভাবনাচিন্তা জীবনচর্যা, অন্যদিকে এই আন্দোলনকে দমন করার জন্য নির্মম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, নাগরিক জীবনে অস্থিরতা এই দশকের কয়েকটি মূল বৈশিষ্ট্য, যাকে মৃণাল সেন তাঁর এই পর্বের সিনেমায় নিয়ে আসেন।

ইন্টারভিউ ছবিতে আমরা এক যুবককে দেখি যে চাকরীর সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়। শেষমেষ দেখা যায় একটা স্যুট না থাকার জন্য তার চাকরীটা হল না। ভারতের নয়া শাসনও যে আধা ঔপনিবেশকতার পাঁকে পাঁকে জড়িয়ে আছে, সেই রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বাস্তবতার উপস্থাপণ ঘটে এখানে। ছবির শেষে ক্রুদ্ধ যুবকের ম্যানুকুইনের মূর্তি ভাঙা যেন সেই রাজনৈতিক মূর্তি ভাঙা আন্দোলনেরই দ্যোতক, যা ঔপনিবেশিকতার কাঠামো নির্মাণের সহযোগী দেশীয় বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকার নতুন মূল্যায়ন থেকে উঠে এসেছিল।

পরের ছবি কলকাতা ৭১ তিনটি আলাদা গল্প অবলম্বনে তৈরি। গল্প তিনটির লেখক যথাক্রমে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবোধ সান্যাল এবং সমরেশ বসু। গল্প তিনটির পটভূমি যথাক্রমে ১৯৩৩, ১৯৪৩ ও ১৯৫৩ সাল। প্রথম আখ্যানে এক বস্তিবাসী পরিবারের বর্ষার রাতে দুর্ভোগের ছবি, পরের গল্পে এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক অনটনের কথা রয়েছে। তৃতীয় গল্পে পাই চালের চোরাচালানকারীদের কথা, যারা সব মূল্যবোধ পেছনে ফেলে যেভাবে হোক বেঁচে থাকতে চায়।

মৃণাল সেনের কোলকাতা ট্রিলজির শেষ ছবিটি হল পদাতিক। তখন ব্যক্তিহত্যার পথে এগনো নকশালবাড়ির রাজনীতি ধাক্কা খেয়ে গেছে। গণসমাবেশের প্রয়োজনিয়তা সম্পর্কে ভাবনাচিন্তা আত্মপ্রকাশ করছে। ছবিতে আমরা দেখি এক যুবককে যে গ্রেপ্তার হবার পর পুলিশের ভ্যান থেকে পালায়। আশ্রয় পায় এক পাঞ্জাবী মহিলার বাড়িতে। যার ভাই এক রাজনৈতিক কর্মী। এখানে যুবকটির রাজনীতির ধরণ নিয়ে নতুন বিশ্লেষণ শুরু হয়। গণসমাবেশের রাজনীতির প্রয়োজনিয়তাকে সে উপলব্ধি করে।
পরবর্তী কোরাস ছবিটিতে সিনেমার টেকনিক নিয়ে অনেক অভিনব পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন মৃণাল সেন। ১৯৭৬ এ হিন্দি ভাষায় মৃগয়া ছবিটি তৈরি করেন তিনি। ভুবন সেন আর মৃগয়ার মাঝে ১৯৭২ সালে সুবোধ ঘোষের গোত্রান্তর গল্প অবলম্বনে "এক আধুরী কাহানী" নামেও একটি হিন্দি ছবি তিনি বানিয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে প্রেমচন্দ্রের কাহিনী অবলম্বনে তেলেগু ভাষায় তৈরি করেন ওকা উরি কথা।

বাংলা সিনেমার জগতে আবার ফেরেন পরশুরাম ছবির মধ্যে দিয়ে। একদল বস্তিবাসীর জীবনচিত্র নিয়ে তৈরি এই সিনেমা।

১৯৭৯ তে তৈরি মৃণাল সেনের একদিন প্রতিদিন সিনেমাটি একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ের অফিস থেকে সময়ে বাড়ি না ফেরা নিয়ে উদ্বেগ দুশ্চিন্তার প্রেক্ষাপটে তৈরি। তখন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস থেমেছে, কিন্তু অনিশ্চয়তা দুর্ভাবনার রেশ থেকে গেছে। তার সাথেই জড়িয়ে থেকেছে মানসিকতার ক্ষুদ্রতা, অসহায়তা, স্বার্থপরতা।

আশির দশকে তৈরি মৃণাল সেনের ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে আকালের সন্ধানে (১৯৮০) চালচিত্র কলকাতা (১৯৮১) খারিজ (১৯৮৩) খণ্ডহর (১৯৮৪), জেনেসিস (১৯৮৪) একদিন আচানক (১৯৮৯)।
সোভিয়েত ভাঙনের পর উঠে আসা নতুন প্রশ্নচিহ্নগুলি নিয়ে তিনি বানালেন মহাপৃথিবী (১৯৯১)। সাদাত হাসান মান্টোর গল্প অবলম্বনে ১৯৯৩ তে তৈরি হল অন্তরীণ।

মৃণাল সেন তাঁর ছবিতে একটানা গল্পবলার ন্যারেটিভ টেকনিককে বারবার ভেঙেছেন এবং সিনেমার ভাষা নিয়ে নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে গিয়েছেন। বামপন্থী ভাবনাচিন্তায় বিশ্বাস রেখে তিনি নানা প্রশ্নে নিরন্তর খোঁজ চালিয়ে গিয়েছেন তাঁর ছবিতে। সত্তরের কলকাতা ট্রিলজীতে সময়ের ক্ষোভ যন্ত্রণাকে তুলে আনতে তিনি যেমন সফল, তেমনি ভুবন সোম এ সচেতনভাবে অ্যারিস্ট্রোকাট ব্যুরোক্রেসির চকচকে আদলটিকে ভেঙে ফেলতেও পারদর্শী। একদিন প্রতিদিন বা একদিন আচানক এ যথাক্রমে এক যুবতী মেয়ে ও এক বৃদ্ধ অধ্যাপকের বাড়ি না ফেরা নিয়ে নানা কথা ভাবনার সূত্রে নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের সমস্যাগুলিকে তিনি উন্মোচিত করে দেন অনায়াস দক্ষতায়।
জীবৎকালেই বাংলা সিনেমা তথা সংস্কৃতি জগতের লিভিং লিজেন্ডে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। দেশবিদেশের চলচ্চিত্র জগতের নানা পুরস্কারে তিনি সম্মানিত হয়েছেন, বহুবার তাঁর ছবি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। মস্কো, বার্লিন, কান, ভেনিস, শিকাগো, মন্ট্রিয়েল, কায়রো - সমস্ত বিখ্যাত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেই পুরস্কৃত হয়েছে তাঁর বিভিন্ন ছবি। সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটকের পাশাপাশি বাংলা সিনেমার উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হিসেবে তিনি সমাদৃত হবেন দীর্ঘদিন।

169 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন