Kallol Lahiri RSS feed

Kallol Lahiriএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ইতিহাসবিদ সব্যসাচী ভট্টাচার্য
    আধুনিক ভারতের ইতিহাস চর্চায় সব্যসাচী ভট্টাচার্য এক উল্লেখযোগ্য নাম। গবেষক লেখক শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে তাঁর অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সবসাচীবাবুর বিদ্যালয় শিক্ষা বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট হাই স্কুলে। তারপর পড়তে আসেন প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগে। ...
  • পাগল
    বিয়ের আগে শুনেছিলাম আজহারের রাজপ্রাসাদের মতো বিশাল বড় বাড়ি! তার ফুপু বিয়ে ঠিকঠাক ‌হবার পর আমাকে গর্বের সাথে বলেছিলেন, "কয়েক একর জায়গা নিয়ে আমাদের বিশাল বড় জমিদার বাড়ি আছে। অমুক জমিদারের খাস বাড়ি ছিল সেইটা। আজহারের চাচা কিনে নিয়েছিলেন।"সেইসব ...
  • অশোক দাশগুপ্ত
    তোষক আশগুপ্ত নাম দিয়ে গুরুতেই বছর দশেক আগে একটা ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখেছিলাম। এটা তার দোষস্খালন বলে ধরা যেতে পারে, কিন্তু দোষ কিছু করিনি ধর্মাবতার।ব্যাপারটা এই ২০১৭ সালে বসে বোঝা খুব শক্ত, কিন্ত ১৯৯২ সালে সুমন এসে বাঙলা গানের যে ওলটপালট করেছিলেন, ঠিক সেইরকম ...
  • অধিকার এবং প্রতিহিংসা
    সল্ট লেকে পূর্ত ভবনের পাশের রাস্তাটায় এমনিতেই আলো খুব কম। রাস্তাটাও খুব ছোট। তার মধ্যেই ব্যানার হাতে একটা মিছিল ভরাট আওয়াজে এ মোড় থেকে ও মোড় যাচ্ছে - আমাদের ন্যায্য দাবী মানতে হবে, প্রতিহিংসার ট্রান্সফার মানছি না, মানব না। এই শহরের উপকন্ঠে অভিনীত হয়ে ...
  • লে. জে. হু. মু. এরশাদ
    বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা অধ্যায় শেষ হল। এমন একটা চরিত্রও যে দেশের রাজনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল ছিল, এ এক বিরল ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধ না করে কোন সামরিক অফিসার বাড়িতে ঘাপটি মেরে বসে ছিলেন ...
  • বেড়ানো দেশের গল্প
    তোমার নাম, আমার নামঃ ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম --------------------...
  • সুভাষ মুখোপাধ্যায় : সৌন্দর্যের নতুন নন্দন ও বামপন্থার দর্শন
    ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’। এর এক বিখ্যাত কবিতার প্রথম পংক্তিটি ছিল – “কমরেড আজ নবযুগ আনবে না ?” তার আগেই গোটা পৃথিবীতে কবিতার এক বাঁকবদল হয়েছে, বদলে গেছে বাংলা কবিতাও।মূলত বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে সভ্যতার ...
  • মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র ভুবন
    মৃণাল সেনের জন্ম ১৯২৩ সালের ১৪ মে, পূর্ববঙ্গে। কৈশোর কাটিয়ে চলে আসেন কোলকাতায়। স্কটিশ চার্চ কলেজ ও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশুনো করেন। বামপন্থী রাজনীতির সাথে বরাবর জড়িয়ে থেকেছেন, অবশ্য কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ...
  • অলোক রায় এবং আমাদের নবজাগরণ চর্চা
    সম্প্রতি চলে গেলেন বাংলার সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক অলোক রায়। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শেষ দিক থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ছয় দশক জুড়ে তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের বিভিন্ন দিক নিয়ে লেখালেখি করেছেন। এর মধ্যে বাংলা ...
  • দুই ক্রিকেটার
    ক্রিকেট মানেই যুদ্ধু। আর যুদ্ধু বলতে মনে পড়ে ষাটের দশক। এদিকে চীন, ওদিকে পাকিস্তান। কিন্তু মন পড়ে ক্রিকেট মাঠে।১৯৬৬ সাল হবে। পাকিস্তানের গোটা দুয়েক ব্যাটেলিয়ন একা কচুকাটা করে একই সঙ্গে দুটো পরমবীর চক্র পেয়ে কলকাতায় ফিরেছি। সে চক্রদুটো অবশ্য আর নেই। পাড়ার ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৫

Kallol Lahiri

মালপোয়া

ভোর থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তার অনেক আগেই। অন্ধকার ঘরটায় শুয়ে বৃষ্টির আওয়াজ শুনছিলেন ইন্দুবালা। অল্প অল্প বাতাসে দুলছিল জানলার হালকা পর্দা গুলো। তার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছিল একটু একটু করে ফর্সা হতে থাকা আকাশটা। একতলায় ভাতের হোটেলের ওপরে তাঁর ঘরটা ছোট্ট হলেও বেশ খোলামেলা। অন্তত এই বাড়ির অন্য ঘর গুলোর থেকে। ঘরের চারিদিক বরাবর বেশ কয়েকটা জানলা। সামনের দিকে এগিয়ে গেলে ছেনু মিত্তর লেন। হরেক মানুষ, গাড়ি ঘোড়ার যাতায়াত। আর পেছন দিকটা শাশুড়ির আমলের ছোট্ট বাগান। সিড়িঙ্গে নারকেলগাছ। ঘোষদের ডোবার পাশে একটা ঝাকড়া তালগাছ। উঠোনের আমগাছের ডালপালা আরও কয়েকটা জানলায় ছড়ানো ছিটানো। এই ঘরটা আসলে ছিল ইন্দুবালার স্বামী মাষ্টার রতনলাল মল্লিকের আমোদের জায়গা। তিনি তাঁর ইয়ার বন্ধুদের নিয়ে এসে এই ঘরেই জোটাতেন। দিন রাত তাস পেটা চলতো। তার সাথে গেলাসের পর গেলাস হুইস্কি আর সোডা। ঘর খানায় ঢুকলে মনে হতো কেউ যেন সক্কালের আঁচ ধরিয়েছে। ঝাঁট দিয়ে জড়ো হতো রাশীকৃত পোড়া সিগারেট আর তার প্যাকেট। শাশুড়ি উঠতে বসতে খোঁটা দিতো বউয়ের গতর নিয়ে। যে গতরে তাঁর বাহির মুখো ছেলে অন্দরে মন বসাতে পারলো না। অথচ নাতি নাতনির অভাব হলো না মোটেও। তিন তিনটে সন্তানকে রেখে মাষ্টার রতনলাল মল্লিক যখন ইহ জীবনের মায়া ত্যাগ করলেন তখন ইন্দুবালা ভেতরের ঘর থেকে বাইরের এই ঘরে এসে থাকতে শুরু করলেন। শুধু কি অনেক আলো হাওয়া বাতাসের জন্য? না তা মোটেই না। এই ঘরে থাকলে তিনি নীচের হোটেলের রান্নাঘর থেকে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের উপস্থিতি টের পেতেন। সিঁড়ির মুখ থেকে এই ঘরের দিকে নজর দেওয়া যেতো খুব সহজে। আর এই ঘরটায় এলেই যেন ইন্দুবালার কোলাপোতার বাড়ির দাওয়াখানা মনে পড়ে যেত। চারিদিকে সবুজের চাঁদোয়া।

ইন্দুবালা পাশ ফিরলেন।

এই এতো বয়সেও স্মৃতি গুলো কেন এলোমেলো হয়ে যায় না? ভুলেও তো যেতে পারে মানুষ অনেক কিছু? নিয়তিকে দোহাই দেন ইন্দুবালা। হয় ভুলিয়ে দাও। না হলে ভুলিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দাও। অদৃষ্টকে সাত গাল পাড়লেও অনেক কিছু ভোলা হয়না ইন্দুবালার। ভাগ্যিস ভোলা হয় না। তাই তো আনাজের চুবড়ি থেকে। সূচ সুতোর কৌটো থেকে। ভাতের হাড়ির সুবাস থেকে বেরিয়ে আসে কত কত গল্প। ইন্দুবালা চোখ বন্ধ করে আবার একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করলেন। ঠাম্মা সন্ধ্যেবেলায় আফিম খেতো। ছোট ছোট কালো কালো গুলি করা থাকতো কৌটোতে। বাবা খুলনা শহরের বড় এক আড়তদারের কাছ থেকে নিয়ে আসতো। ফুরিয়ে আসতে থাকলেই ঠাম্মার মাথা যেত খারাপ হয়ে। একটানা আবদার চলতো তার। ধুয়ো টেনে টেনে ঠাম্মা বলে চলতো, ও হরি...নিয়ে আয় না বাবা। শেষ হয়ে গেল যে গুলি। সেই কাতর চাহনি এখনও যেন মনে পড়ে ইন্দুবালার। ঠিক মরে যাওয়া মানুষের সাথে তার কি কোন মিল ছিল? ছ্যাঁৎ করে ওঠে বুকটা। শাশুড়ির কথা মনে পড়ে। স্বামীর কথাও। মৃত মানুষের চাহনি ইন্দুবালাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।

মুকুলে ভরা আম গাছের তলায় শোয়ানো হয়েছিল দাদুকে। ইন্দুবালা তখন খুব ছোট। কিছুক্ষণ আগে ঠাম্মা ভাজছিল দাওয়া আলো করে নতুন গুড়ের মালপোয়া। গোটা গ্রামে যেন ছড়িয়ে পড়েছিল গন্ধ। তেলের ছ্যাঁক ছুক আওয়াজে উমনো ঝুমনোর পিঠে খাওয়ার গল্পটা আগাগোড়া বলে চলেছিল ঠাম্মা। হাঁ করে বসে শুনছিল ছোট্ট ইন্দুবালা। দাদু স্নান করতে যাচ্ছিল বোসদের পুকুরে। বাবা গিয়েছিল ধান বিক্রি করতে হাটে। মা ছিল শোওয়া। ভাই তখন পেটে। দাদুর ইচ্ছে হয়েছিল অসময়ে মালপোয়া খাওয়ার। মুখ ফুটে যে মানুষ চায় না কিছু সেই মানুষ যখন মালপোয়া খেতে চেয়েছে ইন্দুবালার ঠাম্মার আনন্দ আর গোপন থাকেনি। নিজেই গম পিষিয়ে নতুন আটা বের করেছেন জাঁতি ঘুরিয়ে। চাল কুটেছেন ঢেকিতে। বেঁটেছেন শিলনোড়ায় মিহি করে। নতুন গুড়ের হালকা একটা রস করেছেন। কয়েকদিন খুব ব্যস্ত থেকেছেন নানান তরিজুতের ছোট খাটো উপকরণ নিয়ে। আর ইন্দুবালা ঠাম্মার আঁচল ঘিরে, কাপড় জড়িয়ে, কোলে শুয়ে সেই আখ্যানের অংশীদার হয়েছে। উমনো ঝুমনোর গল্প যখন ফুরিয়ে এসেছে। শেষ মালপোয়া যখন তেলের ওপর লাল হয়ে ফুলে উঠছে। মউরির সুবাস যখন কোলাপোতা গ্রামে মো মো করে উঠছে, দাদু স্নান সেরে এসে তুলসী প্রনাম করতে গিয়ে বসে পড়লেন দাওয়ায়। জীবনের শেষ প্রার্থনা আর তাঁর করা হলো না। একদিন কথা বন্ধ রেখে পরের দিন ভোরের সূর্য ওঠার আগে দাদু চলে গেল। আম তলায় শোয়ানো থাকলো তাকে। হরিনাম সংকীর্তনের দল গোল হয়ে ঘিরে ঘিরে ইনিয়ে বিনিয়ে সুর তুললো। বাড়ি থেকে কেউ মরা কান্নার চিৎকার করলো না। ঠাম্মা বসে থাকলো পাথরের মতো। বাবা কি করবে বুঝতে পারলো না। মায়ের তখন প্রসব যন্ত্রণা। ইন্দুবালা চুপি চুপি দাওয়ার পাশে ছোট্ট বেড়ার ধারে রান্নাঘরে তখন। কাঁসার রেকাবিতে চাপা দেওয়া আছে মালপোয়া। এদিক ওদিক তাকিয়ে হাতে তুলেছিল সবে ছোট্ট মেয়েটা। গ্রামের কোন এক বউ দেখে ফেলেছিল। রে রে করে উঠে এসে ধরেছিল হাত। অশৌচের বাড়িতে খেতে আছে কোন কিছু? ফ্যাল হাত থেকে। ফ্যাল বলছি। ইন্দুবালা ফেলতে পারেনি সেই মালপোয়া। গোটা রাত ধরে নতুন গুড়ের রসে সেগুলো যেন তখন আরও অনেক ফুলে ফেপে উঠেছিল। হালকা গন্ধ বেরোচ্ছিল মউরির। এতোক্ষণ যে ঠাম্মা কারো সাথে কথা বলেননি। চুপ করে বসেছিলেন। তিনি উঠে এলেন। খুব শান্ত অথচ কঠিন গলায় বললেন, ছেড়ে দাও ওকে পাঁচুর মা। ওর খাওয়া মানে ওর দাদুর আত্মার শান্তি পাওয়া। আত্মা না জুড়ালে মায়া কাটবে কী করে? গপ গপ করে গোটা তিনেক মালপোয়া খেয়ে নিয়েছিল ইন্দুবালা। তার হাতে মুখে লেগেছিল রস। ঠাম্মা গড়িয়ে দিয়েছিল জল। নিজে হাতে খাইয়েছিলেন নাতনিকে। ঠিক সেই সময়ে আঁতুর ঘর থেকে ভেসে এসেছিল নবজাতকের কান্নার শব্দ। ঠাম্মা নাতির মুখ দেখে বলেছিলেন সেই ফিরে আসতে হলো তো? কোথায় যাবে আমায় ছেড়ে? তাঁর বিশ্বাস ছিল দাদু ফিরে এসেছে আম, জাম, কাঁঠাল, মালপোর গন্ধ বুকে নিয়ে। বাবা ফিরেছিল শ্মশান বন্ধুদের সাথে বিকেলেরও পরে। ততক্ষণে ঠাম্মার সাদা থান পরা হয়ে গেছে। ছোট্ট ভাইটা হাঁ করে ঘুমোচ্ছে তার কোলে। এদের কারো মৃত মুখ দেখেননি ইন্দুবালা। ভাগ্যিস দেখেননি।

খাটের ওপর চিৎ হয়ে শোন ইন্দুবালা। পিঠের ব্যাথাটা আরও বাড়ে। শুয়ে শুয়ে বুঝতে পারেন রাস্তার উলটো দিকে কর্পোরেশানের কলে জল নিতে আসছে টুকটাক করে বাজারের লোকজন। উঠতে ইচ্ছে করছে না। সারা দেহের অবসাদ আজ যেন মনে নেমে এসেছে। ঠাম্মার মৃত্যু সংবাদ যেদিন ভাই নিয়ে এসেছিল সেদিন ইন্দুবালার সাধ। বাড়ি ভরতি লোক বিয়েতেই হয়নি সাধে হবে ভাবাটাও বোকামো। নিজের বউভাতের রান্না যেমন ইন্দুবালাকে নিজেই করতে হয়েছিল ঠিক তেমনি সাধের রান্নাটাও। গোনা গুন্তি মাছের দাগা ছিল। চাল নেওয়া হয়েছিল মাথা গুনে। শাশুড়িকে খাইয়ে। স্বামীকে খাইয়ে যখন ইন্দুবালা খেতে বসতে যাবেন দরজায় কড়া নড়লো। রান্নাঘর থেকে উঠে এসে সদর খুলতে হলো তাঁকেই। শ্রাবণের চড়া রোদ আর বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভাইটা। তারই সামনে। কতদিন পরে। চোখে তখন দিদির কপোতাক্ষের টলটল জল। ইচ্ছামতী গাল বেয়ে গড়াচ্ছে। বাড়িতে ঢুকতে বলবেন কি? ভাষাই হারিয়ে ফেলেছেন যেন ইন্দুবালা ভাইকে দেখে। ঠোঁটের ওপর গোঁফের রেখা। গালে কচি ঘাসের মতো দাড়ি। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। ঠিক যেন মনিরুল সেজে দাঁড়িয়ে আছে ভাই।

ভেতরে আসতে বলবি না? এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো?

ইন্দুবালা ভাইয়ের হাত ধরেন। ঝুপ করে যেন তাকে ছুয়ে ফেলে কোলাপোতার গ্রামটা। বোসদের পুকুর। তেপান্তরের ধানক্ষেত। কতবেলের আচার। আর ভাই দেখে তার দিদি আরও সুন্দর হয়েছে। গা থেকে খসে গেছে অজ গাঁয়ের পুরনো চাদর। নতুন মা হবার যাবতীয় সব কিছু যেন গা থেকে ফুড়ে বের হয়ে আসছে তার। ঠিক এই সময়ে তো ইন্দুবালার থাকা উচিত ছিল গ্রামে। ঠাম্মা কি খুশী হতো। উঠোন ভরে উঠতো আচারের বয়ামে। মা বিশালক্ষ্মী তলায় পুজো দিতো।

বিরক্ত হলেন শাশুড়ি। শুভ বাড়িতে অশৌচে এয়োচো নাকি? মাথা নেড়েছিল ভাই। কাজ কর্ম মিটিয়ে তারপরে এসেছে। আরও বিরক্ত হয়ে বুড়ি বলেছিল তাহলে আর কি! গেলাও এবার ভাইকে। ইন্দুবালা আসন পেতে। কাঁসার থালায়, বাটিতে সাজিয়ে দিয়েছিল নিজের খাবারটুকু। পরম আদরে খাইয়েছিল ভাইকে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। যতক্ষণ না খাওয়া শেষ হয়। ভাইয়ের মধ্যে ইন্দুবালা কাকে খুঁজছিলেন সেদিন? বাবাকে? মনিরুলকে? নাকি নিজের ফেলে আসা অতীতকে? চলে যেতে চেয়েছিল ভাই সেদিনই। কলেজস্ট্রিট। সেখান থেকে কোন এক বন্ধুর বাড়ি। যেতে দেননি ইন্দুবালা। নিজের ঘরে শুইয়ে ছিলেন ভাইকে। ঘুমো চিন্টু। তারপরে বিকেলে না হয় বেরোস। ভাই যতক্ষণ না ঘুমিয়ে পড়ে ইন্দুবালা ঠায় বসে থাকেন তার মাথার কাছে। যতক্ষণ দেখা যায়। ঘুমিয়ে থাকা মানুষের মুখের প্রশান্তি ভালো লাগে তার। এই প্রশান্তি কি মারা যাবার সময়েও থাকে না? পুকুরে ভাসছিল যে স্বর্ণলতার দেহ। তার বড় বউ সাজার শখ ছিল। রিয়াজও ভালোবাসতো তাকে খুব। স্বর্ণলতার ফুলে ওঠা দেহটাকে যখন জল থেকে তোলা হল কী যে প্রশান্তি ছেয়েছিল মুখটায়। যেন ডুব সাঁতার দিয়ে উঠলো সে এক্ষুনি। কথা ছিল রিয়াজ দাঁড়িয়ে থাকবে খেয়া ঘাটে। রাতের নৌকা তাদের পার করে দেবে সভ্য জনপদ। দূরে কোথাও তারা ভালোবাসার জঙ্গলের মধ্যে আশ্রয় নেবে। যেখানে কেউ তাদের চেনে না। জানে না। ধর্মের পরিচয় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে না। স্বর্ণলতা ঠিকই পৌঁছেছিল সময়েই। খেয়াও ছিল ঘাটে বাঁধা। শুধু রিয়াজ আসেনি। অনেক ভোরে আকাশ ফর্সা হবার আগে বাড়ি ফিরে আসার পথে স্বর্ণলতা রিয়াজকে পেয়েছিল আলের ধারে। রিয়াজের কাছে সব কিছুই ছিল শুধু প্রানটুকু ছাড়া। কারা যেন তার শ্বাসনালীটা কেটে দিয়েছিল এফোড় ওফোড় করে। স্বর্ণলতার তখন কান্নায়, দুঃখে লুকিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছিল। ডুব সাঁতার দিয়েছিল সে জলে। যখন ভেসে উঠেছিল তখন বেলা গড়িয়ে গেছে।

খবরটা প্রথমে এনেছিল মনিরুল। ইন্দুকে বলার পর ফুঁপিয়ে কেদেছিল মেয়েটা। সেদিনও যে স্বর্ণলতা স্বপ্ন দেখতো সংসারের। রিয়াজের সাথে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে কোথাও। এর আগে কোনদিন মনিরুল ইন্দুকে কাঁদতে দেখেনি। যদিও প্রথম চিঠিটা ততদিনে দেওয়া হয়ে গেছে দুজনের। ছটফট করে ওঠেন ইন্দুবালা। তাহলে কি এতোক্ষণ ভাইয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে সে মনিরুলের কথা চিন্তা করছিল? উঠে পড়ে্ন ইন্দুবালা। পেটের ভেতর থেকে লাথি মারছে বাচ্চাটা। যেমন ক্ষিদে পেয়েছে তার মায়ের। তেমনি তারও। রান্নাঘরে এসে দেখেন চাল বাড়ন্ত। ভাত বসাবেন তার যোগাড়টুকু নেই। এই এতো বেলায় কি খাবেন? নজরে পড়লো বেতের ঝুড়ি শালপাতায় মোড়া। ভাই এনেছে। তাকে এতোক্ষণ যত্ন আত্তি করতে গিয়ে সেদিকে নজরও পড়েনি। ভুলেই গিয়েছিলেন ইন্দুবালা। শালপাতায় বাঁধা টুকরিটা খুললেন। তারমধ্যে থরে থরে সাজানো আছে মালপোয়া। চোখ ফেটে জল এলো ইন্দুবালার। গোগ্রাসে খেতে থাকলেন তিনি। যেন কত জন্মের ক্ষিদে নিয়ে তার দাদু ঢুকে পড়েছে তাঁর পেটে। ঠাম্মার হাতে না হোক গাঁয়ের ভোলা ময়রার দোকানের মালপোয়া খেতে চাইছে গোটা শরীর তোলপাড় করে। অনেকটা খাওয়ার পর যখন থামলেন ইন্দুবালা। জলতেষ্টা পেয়েছে বড়। কিন্তু জল এগিয়ে দেওয়ার মতো কেউ নেই। ঠিক তখন সেই মুহূর্তে বুক ছাপিয়ে, গলা কাঁপিয়ে কান্না পেলো তাঁর মৃত ঠাম্মার জন্য। পায়ের তলায় গোটা পৃথিবীটা যেন নড়ে উঠলো হঠাৎ। চোখে অন্ধকার দেখলেন। যা খেয়েছিলেন উগড়ে দিলেন সব। রান্নাঘর ভেসে গেল সাধ না খাওয়া নতুন মায়ের বমিতে।

দরজা খোলার শব্দ পেলেন ইন্দুবালা। ধনঞ্জয় ঘর ঝাঁট দিতে এসেছে। নীচের রান্নাঘরে উনুনের ধোঁওয়া কুন্ডলী পাকিয়ে উঠছে আকাশের দিকে। বাজার কিন্তু কিচ্ছুটি করা নেই মা। কি রান্না হবে? ধনঞ্জয় জানতে চায়। ইন্দুবালা চুপ করে থাকেন। কী গো বলো কিছু? শরীর খারাপ নাকি তোমার? ইন্দুবালা ধোঁওয়া দেখছেন। কুন্ডুলী পাকিয়ে পাকিয়ে ওপরে উঠছে। বাজারের লোকেরা এসে বলেছিল নিমতলার ইলেকট্রিক চুল্লীতে কাজ চলছে মা। বডি কাঠে পোড়াতে হবে। তখনও শ্মশানে স্বামীর খাট ছুঁয়ে বসে আছেন ইন্দুবালা। দূরে লছমী ছেলে-মেয়েদের সামলাচ্ছে। তোমরা যা ভালো বোঝ করো। এই টুকুই বলতে পেরেছিলেন তিনি। মাষ্টার রতনলাল মল্লিকের বডি যখন চিতায় তোলা হল তখনও ইন্দুবালা আঁচ করতে পারেননি কাঠে পোড়ানোর বিভৎসতা। প্রিয় মানুষ ছিল না কোনদিনই মাষ্টার। কিন্তু যে মানুষটা চারপাশে ঘুরে বেড়াতো, এদিক ওদিক দিয়ে যন্ত্রণা দিতো। সময় নেই অসময় নেই ঘাড়ের ওপর চেপে বসতো। জোর করে সরিয়ে দিত শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ। সেই মানুষটা আগুন পাওয়ার সাথে সাথে কেমন যেন চড়বড় করে উঠতে শুরু করলো। শরীর ফুড়ে বেড়িয়ে আসতে থাকলো জল। যেন সারা জীবনের হুইস্কি, সোডা এক্ষুনি এই জ্বলন্ত সর্বগ্রাসী চিতাকে নিভিয়ে দেবে। লছমী এসে মুখ ঝামটা দিয়েছিল। কী করছিস কি এখানে দাঁড়িয়ে তুই? আমাদের কি এসব দেখতে আছে? চল মেয়েটাকে দুধ খাওয়াবি চল। বড় কাঁদছে যে। কি দেখেছেন আর কি দেখেননি সেই হিসেব কষতে গেলে বেলা কাবার হয়ে যায় ইন্দুবালার।

পাশ ফিরে শুয়ে ধনঞ্জয়কে বলেন উনুন ধরিয়েছিস কেন? গ্যাস কি ফুরিয়েছে? ধনঞ্জয় হাতের ঝাটাখানা মেঝেতে রেখে বলে ওই দেখ। আজকের দিনটা কি ভুলে গেলে মা তুমি? ইন্দুবালা হাতড়াতে থাকেন মনের মধ্যে। আজকে আবার কী? ধনঞ্জয় মাথায় হাত দিয়ে বলে সত্যি এবার তোমার বয়েস হয়েছে মা। আজ যে রথ। ভুলে গেলে সব কিছু? কুমোরটুলিতে দুর্গার কাঠামোয় মাটি পড়বে। ইস্কনের লম্বা রথ বেরোবে। কত সাহেব সুবো নাচানাচি করবে।... হোটেলের সামনে বোর্ডে তো গতকাল লিখে রেখেছো...। উঠে পড়েন ইন্দুবালা। কী লিখেছি রে? খিচুরী, পাঁপড়ভাজা, আনারসের চাটনি, আর কাঁঠালের ক্ষীর। বিড়বিড় করে জানতে চান ইন্দুবালা, আর মালপোয়া? ধনঞ্জয় রে রে করে ওঠে। না না ওইসব একদম কিচ্ছু লেখা ছিল না। হাঙ্গামা বাধিও না মা। চিনির দাম বড্ড বেড়েছে। আটা বাড়ন্ত। ময়দা বাড়ন্ত। গোল মরিচ আনা নেই। ইন্দুবালা জানতে চান আর মউরি? ধনঞ্জয় জবাব দেয় না। চিরকালের অভ্যেসের মতো সে কাকে যেন একটা গাল পাড়ে। সেই অদৃশ্য মানুষটাকে দেখতে বড় ইচ্ছে করে ইন্দুবালার। কিন্তু তিনি জানেন ধনঞ্জয়ের একমাত্র ইন্দুবালা ভাতের হোটেল ছাড়া আর কেউ নেই। ঠিক যেমন চারপাশে তিন ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি থেকেও ইন্দুবালা একা। তাঁরও এই ভাতের হোটেল ছাড়া কেউ নেই।

অনেক রাতে কলেজস্ট্রিট পাড়া ঘুরে বাড়ি আসে ভাই। হাতে তার একখানি চটি বই। ‘তিন পাহাড়ের স্বপ্ন’। বেড়াতে যাওয়ার বই বুঝি? ইন্দুবালা জানতে চান। ভাই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। খুলে দেখলেই বুঝতে পারবি। এগিয়ে দেয় বইটা। ইন্দুবালা অবাক হন। কবিতা পড়িস নাকি তুই আজকাল? ঘাড় নাড়ে ভাই। তুই আর মনিরুলদা যেমন পড়তিস। কথা বাড়াতে চান না ইন্দুবালা। এরপর কথা বললে আরও অনেক কথা উঠবে। সেই কথা মনের মধ্যে হাওয়ার সাথে উথাল পাথাল হলে রাতে ঘুম হবে না। এই ভরো ভরো অবস্থায়ও মাষ্টার রতনলাল মল্লিক আঁকড়ে ধরতে চাইবে তাকে। দম বন্ধ হয়ে আসবে তার। মাটিতে এখন তাই বিছানা। শরীরটাকে কোনরকমে আড়াল করার চেষ্টা। ওপরের ঘরে শুতে ভয় করবে তোর ভাই? অবাক হয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকায় ভাই। একদম মনিরুল। চোখ সরিয়ে নেয় ইন্দুবালা। ভয় করবে কেন? আমি তো এখন একাই শুই মাঝের ঘরটা। ঠাম্মার ঘরটা তো বন্ধই থাকে। ইন্দুবালা জানতে চান, ভয় করে না তোর? ভাই বলে ধুস...। ভয় করবে কেন? ইন্দুবালার যখন বিয়ে হয় তখন ভাই তার কাছে শুতো। জড়িয়ে আঁকড়ে ধরে। কতটুকুনি ছিল তখন। আর একদিন থেকে যাবি? মাথা নাড়ে ভাই। নারে হবে না দিদি। কাল তো রথ। স্কুল ছুটি। পরশু পরীক্ষা। না গেলে স্যার খুব বকবে। আর বাবার শরীরটাও...। থেমে যায় ভাই। ইন্দুবালা জানে তার বাবার শরীরও ভালো না। মাঝে মাঝে জ্বর হয়। কাশি হয়। মা লিখেছে কাশির সাথে রক্ত ওঠে। ভাই ঘুমিয়ে পড়ে। ইন্দুবালা টেনে নেয় পাশে রাখা চটি বই খানা। কবে থেকে পড়তে শুরু করলো তার ভাই কবিতা? তিন পাহাড়ের স্বপ্ন কবিতার বইটার লেখক কে যেন এক বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পাতা খানা উলটে দেখলো ইন্দুবালা। আর ঠিক তখনি ডাক পড়লো তার নীচের থেকে। মাষ্টার রতনলাল মল্লিক ঘরে অপেক্ষা করছেন।

পেঁচিয়ে উঠছে ইন্দুবালা। তার গা দিয়ে। শরীর দিয়ে। আরও একটা শরীর পেঁচিয়ে উঠছে। মাষ্টার রতনলাল মল্লিক তার পোয়াতি বউটাকে পেঁচিয়ে উঠছে। ঠিক যেমন বিষধর সাপ ওঠে গাছের গায়ে। বন্ধ হয়ে আসছে ইন্দুবালার শ্বাস প্রশ্বাস। ভাই যেন চিলে কোঠার ঘর থেকে পড়ে চলেছে ছোট্ট চটি বইখানি খুলে। গড়গড় করে। “ঘুমের মধ্যে শুনতে পেলাম /শঙ্খ চূড়ের কান্না/ ‘এ আনন্দ অসহ্য বোন;/ দিসনে লো আর, আর না’।/ জেগে উঠলাম; দেখতে পেলাম/আর না দেবার সুখে/কেয়া ফুলটি ঘুমিয়ে আছে/বিষধরের বুকে।” গলা বুজে আসছে ইন্দুবালার। কান্নায়। ঘেন্নায়। ভোররাতে উঠে ঠান্ডা জল মাথায় ঢালেন তিনি। একবার নয় বারবার। তারও অনেক দিন পরে। ভাই যখন আর নেই। স্বামী যখন আর নেই। চারিদিক শূন্য খাঁ খাঁ। হোটেলের ঘরে কে যেন একটা কবিতার বই ফেলে রেখে গিয়েছিল। পড়ে ফেলেছিলেন ইন্দুবালা কবির নামটা। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তখন কলকাতায় বোমা। রাস্তায় ঘাটে মৃত দেহের সারি। ছোট ছোট ছেলে মেয়ে গুলো গঙ্গায় ভাসছে লাশ হয়ে। অনেক রাতে একটা ছেলে বইটা ফেরত নিতে এসেছিল লুকিয়ে। সঙ্গে নিয়ে এসেছিল এক পেট ক্ষিদে। হ্যাঁ সেদিনটাও ছিল রথের দিন। মনে আছে ইন্দুবালা পাঁপড় ভেজেছিলেন। হিঙের গন্ধ মাখানো খিচুড়ি হয়েছিল। আর ছিল চুসির পায়েস। প্রথম দিন ইন্দুবালার সাথে তার কোন কথা হয়নি। কোঁচড় থেকে রিভলবারটা বের করে রেখেছিল টেবিলে। অলোকের কথা আগেও অনেকবার বলেছে ইন্দুবালা আপনাদের। তবে বিস্তারের ব্যাখ্যান অবশ্যই আসবে পরে। সাধে কি আর ভালোবেসে নাম দেবেন প্যাঁচা?

তাড়াতাড়ি শিল নোড়া পেড়ে ফেলে ধনঞ্জয়। এই বেলা চাল না বেটে রাখলে বুড়ি নিজেই বাটতে শুরু করে দেবে। এই গুচ্ছের লোকের জন্য মালপোয়া বানানো কি মুখের কথা? এরই মধ্যে জলহস্তির ছানা গুলো ঘুরে গেছে। মানে সামনের হোস্টেলের ওই ছেলে মেয়ে গুলো। ঠাকুমা দেওয়ালে কি লিখছে দেখতে এসেছে হুড়মুড়িয়ে। কি গো সব পালটে দিচ্ছো নাকি? শুক্তো ভাত এই সব কিন্তু কিচ্ছু খাবো না আজকে। ছোট করে ছেলেদের মতো চুল ছাটা মেয়েটা ঘাড় ঘুরিয়ে বলে। ধনঞ্জয়ের মনে হয় ঠাস করে গালে একটা ঠাটিয়ে থাপ্পড় দিই। সেদিন আবার সিগারেট কিনছিল দেখেছে ধনঞ্জয়। ইন্দুবালাকে বলতে এলে নিজেই ধাঁতানি খেয়েছিল বেশি। কেন তুমি বিড়ি ফোঁকো না? তাও তো ওরা মনের সুখে দুটো টান দিতে পারে। আমরা কি পেয়েছি জীবনে? ধনঞ্জয় কথা বাড়ায়নি আর। বাবুই পাখির বাসার মতো চুল যে ছেলেটার সেটা আরও ধ্যাষ্টা। কী গো? কি কি চেঞ্জ করছো? তাই বলে কাঁঠাল ক্ষীরটা চেঞ্জ করো না প্লিজ। ওটার যে গল্পটা বলেছিলে সেটা কিন্তু আমি কালকে ফেসবুকে শেয়ার করেছি। ওখান থেকে অনেকে আসবে বলেছে খেতে। মোটা ছেলেটা এরপর এগিয়ে আসে। তোরা বড় ছটফট করিস। আগে দেখ না কি লেখে ঠাকুমা। একরাশ ছেলে মেয়ে। আর তাদের মাঝে সত্তর পেরোনো এক বুড়ি সাত সকালে ভাতের হোটেলের সামনে ভিড় করে থাকে। খিচুড়ি, পাঁপড়ভাজা, আনারসের চাটনি, কাঁঠাল ক্ষীরের নীচে বড় করে লেখা হয় মালপোয়া। ভিড়টা যেন একসাথে চিৎকার করে ওঠে ইয়া...। জড়িয়ে ধরে ইন্দুবালাকে ওরা সবাই। কেউ তার মধ্যেই ফেসবুক লাইভ করে দেয়। কাল যে আপনাদের কাঁঠাল ক্ষীরের গল্পটা বলেছিলাম আজ তার সাথে ইনক্লুড হয়েছে মালপো...। জোরে জোরে চাল বাটে ধনঞ্জয়। কারণ সে জানে এরপর স্নান সেরে এসে রান্নার ধুম পড়বে বুড়ির। একটা নেশার মধ্যে থাকবে সেই দুপুর পর্যন্ত। যতক্ষণ না শেষ রান্নাটুকু হয়। যতক্ষণ না শেষ মানুষটা খেয়ে চলে যায় হোটেল থেকে।

নতুন সাইকেল কিনেছে মনিরুল। সেটা দেখাতে এসেছিল। ইন্দু জানে এটা একটা অছিলা। আসলে তারা আজ যাবে মোক্তার পাড়ায় রথের মেলায়। মাকে কি করে বলবে? সাইকেল শেখাটা খুব সহজ মিথ্যের রাস্তা। ছেলে মেয়ে দুটো বাড়ছে যেন তালগাছের মতো। মায়ের মন সায় দিতে চায় না। তার আগে বাবা বলে দেয় সরল মানুষের মতো যাবি তো যা না। সামনের বারে আর একটু বড় ক্লাসে উঠলে ইন্দুকেও কিনে দেবো সাইকেল। তখন দুজনে একসাথে স্কুলে যাবি সাইকেল চালিয়ে। সে সৌভাগ্য হয়নি ইন্দুবালার। তার আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল তার। স্বর্ণলতার আত্মহত্যা চোখ খুলে দিয়েছিল অনেক মায়ের। তারা কিছুতেই আগুন আর ঘি পাশাপাশি রাখতে চায়নি। বরং আগুনেই মেয়েকে বিসর্জন দিয়েছিল। জ্বলে পুড়ে শেষ হয়েছিল মেয়ে গুলো। কজন ইন্দুবালা হতে পেরেছিল? যাদের নিয়ে লেখা হয়েছিল খবরের কাগজে? ফেসবুকে?

সামনের রডে বসতে লজ্জা করেছিল ইন্দুর। তবুও বসেছিল সে। হাওয়ার মতো উড়ছিল মনিরুলের সাইকেল কপোতাক্ষের তীর ধরে। হাতে হাত ঠেকে যাচ্ছিল দুজনের। শ্বাসে প্রশ্বাসে চরম উত্তেজনা। ওরা কাছ থেকে পাচ্ছিল দুজনের ওম। চোখ বন্ধ করেছিল ইন্দু। সে যেন কাঠের নাগোরদোল্লা, ঘোড়ার দোল্লা, বুড়ির চুল, ঝাল ঘুগনি, পাঁপড় ভাজা রথের মেলা এইসব ছাপিয়ে মউরির গন্ধ পাচ্ছিলো মনিরুলের গা থেকে। যে মউরির গন্ধ পেয়েছে সে তার ঠাম্মার মালপোয়ায়। ভোলা ময়রার দোকানে। অনেক পরে রিভলবার নিয়ে খেতে আসা অলোকের কবিতার বইয়ে। স্নান সেরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ান ইন্দুবালা। কতদিন পর আজ তিনি মালপোয়া ভাজবেন? তাঁর চোখে মুখেও কি ফুটে উঠছে না এক প্রশান্তি? যা কি মৃত্যুর বার্তাবহ? মনিরুলের মৃত মুখ তিনি দেখেননি। কিন্তু আন্দাজ করতে পারেন। খান সেনারা গোটা বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। সেই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে মনিরুল তাকিয়ে আছে স্থির দৃষ্টিতে। গোটা বাড়িটা যতক্ষণ না জ্বলন্ত সূর্য হয়ে উঠছে মনিরুল ততক্ষণ চোখ বন্ধ করছে না। সে জানে একটা ভাষার জন্য একটা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছে সে। আর ইন্দুবালা? কি স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি? সে কথা কেউ কোন দিন জানতে চায়নি। আজও না।

হইচই পড়ে গেছে গোটা অঞ্চল জুড়ে। ছেনু মিত্তির লেনে একেই ভিড় লেগে থাকে। আজ যেন আরও বেশি ভিড়। তাও সেটা ইন্দুবালা ভাতের হোটেলকে ঘিরে। হাফবেলা অফিস করে কালেক্টার অফিসের কেরানীকুল চলে এসেছে। হোস্টেলের ছেলে মেয়ে গুলো হাজির হয়েছে। তার সাথে নিয়মিত বাজারের খদ্দেররা আছে। কিছু ফ্লাইং কাস্টমার তো থাকেই। এর সাথে জুড়েছে রাজ্যের ফেসবুক ফ্রেন্ডরা। চারিদিকে শুধু কচিকাচাদের কলকলানি। মাথা খারাপ হবার অবস্থা ধনঞ্জয়ের। হোটেলটাও হয়েছে আজ দেখার মতো। সেখানে যেন তার প্রবেশ নিষেধ। ছেলে মেয়ে গুলো নিজেরাই হাতে হাতে কাজ করে নিচ্ছে। কেউ জল দিচ্ছে। কেউ ক্যাশ সামলাচ্ছে। কেউ থালা পাতছে। কেউ পরিবেশন করছে। আর রান্নাঘরের দিকে তো যাওয়াই যাচ্ছে না। সেখানে আরও ভিড়। সবাই ঝুঁকে পড়েছে তাদের মোবাইল ক্যামেরা নিয়ে। সেই ছোট্ট স্ক্রিনে ফুলে ফুলে উঠছে লাল হয়ে যাওয়া মালপোয়া গুলো। বড় ছাকনিতে সোজা চলে যাচ্ছে চিনির হালকা রসে। মউরির গন্ধ, গোল মরিচের স্বাদ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। আর এসবের মধ্যে প্রশান্তি মাখা মুখ নিয়ে রান্না করে চলেছেন ইন্দুবালা। না এই মুহূর্তে স্মৃতিরা তার আসেপাশে কেউ নেই। নেই খুলনা...কোলাপোতা...ছেনু মিত্তির লেন। এখন তিনি যেন এক শিল্পী। কারিগর। নতুন সৃষ্টির উন্মাদনায় মেতে আছেন। তার বুড়ো ডালপালা গুলো চারিদিক থেকে যেন শুষে নিচ্ছে তারুণ্যের আস্বাদ। নতুন করে বেঁচে থাকার আকাঙ্খা। (ক্রমশ)

ছবি সৌজন্য- গুগুল ইমেজ

ঋণ-
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
ঠাম্মা, মনি, দিদা, রাঙা, বড়মা আর মা। এছাড়াও বাংলার সেইসব অসংখ্য মানুষদের যাঁদের হাতে এখনও প্রতিপালিত হয় আমাদের খাওয়া দাওয়া। জিভে জল পড়ার ইতিহাস।



276 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: Kallol Lahiri

Re: ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৫

আহা।
Avatar: ফরিদা

Re: ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৫

একদিন ঠিক চলে যাব।
Avatar: দ

Re: ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৫

আহা অপুর্ব


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন