Saikat Bandyopadhyay RSS feed

Saikat Bandyopadhyayএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • জীবন যেরকম
    কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটা পোষ্ট করেছিলাম “সাচ্‌ ইজ লাইফ” বলে। কেন করেছিলাম সেটা ঠিক ব্যখ্যা করে বলতে পারব না – আসলে গত দুই বছরে ব্যক্তিগত ভাবে যা কিছুর মধ্যে দিয়ে গেছি তাতে করে কখনও কখনও মনে হয়েছে যে হয়ত এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি মানুষ চট করে হয় না। আমি যেন ...
  • মদ্যপুরাণ
    আমাদের ভোঁদাদার সব ভাল, খালি পয়সা খরচ করতে হলে নাভিশ্বাস ওঠে। একেবারে ওয়ান-পাইস-ফাদার-মাদা...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ৩
    ঊনবিংশ শতকের শেষে বা বিংশশতকের প্রথমে বার্সিলোনার যেসব স্থাপত্য তৈরী হয়েছে , যেমন বসতবাটি ক্যাথিড্রাল ইত্যাদি , যে সময়ের সেলিব্রিটি স্থপতি ছিলেন এন্টোনি গাউদি, সেগুলো মধ্যে একটা অপ্রচলিত ব্যাপার আছে। যেমন আমরা বিল্ডিং বলতে ভাবি কোনো জ্যামিতিক আকার। যেমন ...
  • মাসকাবারি বইপত্তর
    অত্যন্ত লজ্জার সাথে স্বীকার করি, আমি রিজিয়া রহমানের নামও জানতাম না। কখনও কোনও আলোচনাতেও শুনি নি। এঁর নাম প্রথম দেখলাম কুলদা রায়ের দেয়ালে, রিজিয়া রহমানের মৃত্যুর পরে অল্প কিছু কথা লিখেছেন। কুলদা'র সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নটুকু পড়ে খুবই আগ্রহ জাগে, কুলদা তৎক্ষণাৎ ...
  • ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা... বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার দিন
    বিএনপি এখন অস্তিত্ব সংকটে আছে। কিন্তু কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। ক্ষমতার তাপে মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল দলটার। ফলাফল ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড মেরে হত্যার চেষ্টা। বিরোধীদলের নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা করলেই ...
  • তোমার বাড়ি
    তোমার বাড়ি মেঘের কাছে, তোমার গ্রামে বরফ আজো?আজ, সীমান্তবর্তী শহর, শুধুই বেয়নেটে সাজো।সারাটা দিন বুটের টহল, সারাটা দিন বন্দী ঘরে।সমস্ত রাত দুয়ারগুলি অবিরত ভাঙলো ঝড়ে।জেনেছো আজ, কেউ আসেনি: তোমার জন্য পরিত্রাতা।তোমার নমাজ হয় না আদায়, তোমার চোখে পেলেট ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ২
    বার্সিলোনা আসলে স্পেনের শহর হয়েও স্পেনের না। উত্তর পুর্ব স্পেনের যেখানে বার্সিলোনা, সেই অঞ্চল কে বলা হয় ক্যাটালোনিয়া। স্বাধীনদেশ না হয়েও স্বশাসিত প্রদেশ। যেমন কানাডায় কিউবেক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মনে হয় এরকম একটা জায়গা থাকে, দেশি হয়েও দেশি না। ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ১
    ঠিক করেছিলাম আট-নয়দিন স্পেন বেড়াতে গেলে, বার্সিলোনাতেই থাকব। বেড়ানোর সময়টুকুর মধ্যে খুব দৌড় ঝাঁপ, এক দিনে একটা শহর দেখে বা একটা গন্তব্যের দেখার জায়গা ফর্দ মিলিয়ে শেষ করে আবার মাল পত্তর নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ভোর রাতে রওনা হওয়া, আর এই করে ১০ দিনে ৮ ...
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

Saikat Bandyopadhyay

হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান আদতে একই প্রকল্পের অংশ। আজকের সরকারি হিন্দি একটি অর্বাচীন ভাষা, তথাকথিত নব্য হিন্দুত্বের হাত ধরেই তার জন্ম। দেশভাগের আগে একটি-পৃথক-ভাষা হিসেবে হিন্দির কোনো অস্তিত্ব ছিলনা। ১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেসের ভাষণে সুভাষচন্দ্র বসু অখণ্ড ভারতবর্ষের যোগাযোগরক্ষাকারী হিসেবে প্রস্তাব করেছিলেন 'হিন্দুস্তানি'কে, হিন্দি নয়। হিন্দি বা উর্দু নামের আলাদা কোনো ভাষা সে সময় ছিলনা। শব্দদুটো ছিল, তারা লিপির পার্থক্য বোঝাতে হিন্দুস্তানির প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হত মাত্র। আর এই হিন্দুস্তানি কোনো নির্দিষ্ট ভাষা ছিলনা, ছিল একটি ছাতা মাত্র, যার মধ্যে নানারকম ভাষা বা কথনরীতি ঢুকে ছিল। আজ যাকে উর্দু বলি, সে তো ছিলই, আরও ছিল খড়িবোলি, আওধী, ভোজপুরি, মৈথিলী ইত্যাদি প্রভৃতি।

এ হেন সেকুলার এবং বহুমাত্রিক হিন্দুস্তানিকে সরিয়ে হিন্দি নামক অর্বাচীন একটি ভাষার উদ্ভব হয় দেশভাগের পরে ( প্রকল্পটি আগে থেকেই চালু ছিল, কিন্তু সে জটিলতায় এখানে ঢুকছিনা)। এর দুটি কারণ ছিল। একটি ডাহা সাম্প্রদায়িক। যেজন্য উর্দু এবং হিন্দি দুটি আলাদা ভাষা তৈরির দরকার হল। যেন হিন্দি হিন্দুর ভাষা এবং উর্দু মুসলমানের। ভারত এবং পাকিস্তান তৈরির সঙ্গে এই সাম্প্রদায়িক বিভাজন একদম খাপে-খাপে যুক্ত। এই পদ্ধতিতেই ফার্সি শব্দ তাড়িয়ে, তৎসম শব্দ ঢুকিয়ে কৃত্রিম 'হিন্দি' নামক একটি ভাষা তৈরি শুরু করা হয়। প্রক্রিয়াটি দেশভাগের আগে থেকেই চালু ছিল, কিন্তু দেশভাগের পর সেটা সর্বশক্তিমান কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প হয়ে দাঁড়ায়। দুই নম্বর কারণটি এর সঙ্গেই আসে। হিন্দি যেহেতু 'ভারত'এর ভাষা, তাই, সমস্ত আঞ্চলিক ভাষার উপরে কার্যত 'রাষ্ট্রভাষা' হিসেবে হিন্দি চাপানো শুরু হয়। একটু একটু করে আওধী, মৈথিলী, ভোজপুরির মতো ভাষাগুলিকে মেরে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অন্যান্য উত্তর ভারতীয় ভাষাগুলির ক্ষেত্রে, পরোক্ষে হলেও, ধংসের পরিকল্পনাটি একই। এবং একই সঙ্গে ভারতকে একটি বহুজাতিক যুক্তরাষ্ট্রের বদলে এক-জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে চালানো শুরু হয়। 'এক ভাষা, এক সংস্কৃতি', 'বোম্বে আর ক্রিকেট আমাদের ঐক্যের প্রতীক', ইত্যাদি। বৈচিত্র্য বাদ দিয়ে স্রেফ ঐক্যের উপর জোর দেওয়া হয়। রাজভাষা প্রসার সমিতি সরকারিভাবে এবং বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আধা-সরকারি ভাবে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে। বোম্বে সিনেমা খুব সূক্ষভাবে 'হিন্দু লব্জ' আর 'মুসলমান লব্জ'কে আলাদা করে দেয়। দেশবিভাগের আগে মান্টো হিন্দুস্তানি সিনেমার চিত্রনাট্য লিখতেন, কস্মিনকালেও তাঁর তাতে কোনো অসুবিধে হয়েছে বলে শোনা যায়না। কিন্তু ক্রমশ জানা যায় মান্টো যে উর্দু লেখক, আর প্রেমচাঁদ হিন্দি লেখক। এইসব তথ্য খুব সিস্টেমেটিকালি আমরা জানতে শুরু করি।

এই প্রকল্প বিনা বাধায় হইহই করে চলেছিল এমন না। দেশভাগ যেমন বাকি সবাইকে বাদ দিয়ে কয়েকজন মাথার সিদ্ধান্তে প্রায় পিছনের দরজা দিয়ে সেরে ফেলা গিয়েছিল, এটা সেরকম হয়নি। ১৯৪৪ সালেও আজাদ-হিন্দ-ফৌজে সুভাষ চন্দ্র বসু রোমান হরফে হিন্দুস্তানির প্রচলন করেছিলেন যোগাযোগের ভাষা হিসেবে। ১৯৪৮ সাল থেকে সিপিআই এক-জাতি-এক-ভাষা তত্ত্বের বিরোধিতা করতে থাকে। পার্টির মধ্যেই একদিকে আসতে থাকে উর্দুকে পুনরন্তর্ভুক্তির দাবী, অন্যদিকে রাহুল সাংকৃত্যায়ন প্রমুখরা খড়িবোলি-আওধী-ব্রজভাষার সীমান্ত অনুযায়ী নতুন রাজ্য তৈরির কথা বলেন। ১৯৪৯ সালে সিপিআইএর নানা দলিলে খুব স্পষ্ট করেই ভারতকে একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র (মাল্টিনেশন) বলা হয়। এবং মারোয়াড়ি-গুজরাতি পুঁজিপতিদের আধিপত্যের ছক হিসেবে এক-ভাষা (হিন্দি) কে তুলে ধরার তীব্র বিরোধিতা করা হয়। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মাতৃভাষায় বলতে দেবার দাবীতে কক্ষত্যাগও করেছিলেন তাঁরা। অন্যদিকে আঞ্চলিকভাবেও ভাষাগত জাতিসত্ত্বার দাবী মাথাচাড়া দিতে থাকে। ১৯৫২ সালে তেলুগু জাতিসত্ত্বার অধিকারের দাবীতে স্বাধীন ভারতে আমরণ অনশনে প্রাণ দেন শ্রীরামালু। কেন্দ্রীয় সরকার নতুন অন্ধ্র রাজ্য ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। ওই দশকেই জাতিসত্ত্বার লড়াই লড়ে বাংলার মানুষ এবং বামপন্থীরা বাংলা-বিহার সংযুক্তির পরিকল্পনা ঠেকিয়ে দেন। ১৯৬১ তে মাতৃভাষার দাবীতে প্রাণ দেন বরাকের মানুষ। এক-জাতি-এক-রাষ্ট্র তত্ত্বটি আপাতদৃষ্টিতে পরাস্ত হয় এবং ভাষাই রাজ্যগঠনের মাপকাঠি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এতে করে অবশ্য আগ্রাসন তার চরিত্র বদলায়নি। পদ্ধতি বদলেছিল মাত্র। এর মূল কারণ নিহিত ছিল 'শক্তিশালী কেন্দ্র'তে। সমকালীন একজন রাশিয়ান লেখক লিখেছিলেন, তাঁদের মিউনিসিপ্যালিটিগুলি ভারতের রাজ্য সরকারের থেকে বেশি ক্ষমতা রাখে। কেন্দ্র-রাজ্য দ্বন্দ্ব এক আলাদা বিষয়, সেটায় এখানে ঢুকবনা, এখানে পয়েন্টটা হল, 'শক্তিশালী কেন্দ্র'র নেতৃত্বে অর্বাচীন হিন্দিকে তৈরি করা শুরু হয়। এর আগে কংগ্রেসি হুইপ সত্ত্বেও মাত্র এক ভোটে সরকারি ভাষা হিসেবে 'হিন্দি'কে চয়ন করা হয়। দক্ষিণী একটি সংবাদপত্র লিখেছিল, কংগ্রেস হাইকম্যান্ড হস্তক্ষেপ না করলে হিন্দি ভোটে হারত।

পঞ্চাশের দশকের নতুন হিন্দি ভাষা বলাবাহুল্য খোঁড়াচ্ছিল। ফার্সি এবং অন্যান্য 'বিদেশী' শব্দ বিতাড়ন করে সংস্কৃত শব্দ ঢোকানো প্রচুর হাস্যরসেরও সূচনা করে। বহুল প্রচলিত 'উজির'কে তাড়িয়ে 'সচিব', 'মজলিশ' বা 'দরবার'কে তাড়িয়ে 'লোকসভা', এরকম হাজারো শব্দ তৈরি করা হচ্ছিল সে সময়। ভাষায় এগুলির চল ছিলনা, ফলে তথাকথিত হিন্দিভাষীরা ব্যবহারও করতে পারতেননা বা জানতেননা। দক্ষিণী সংবাদপত্রে এই নিয়ে ঠাট্টা করে বলা হয়, হিন্দিভাষীরা নেতারা নিজের ভাষায় বক্তব্যই রাখতে পারেননা। কথাটা ঠাট্টা হলেও একেবারে মিথ্যে ছিলনা। হ্যারিসন ওই দশকের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, সেই সময়ের শিক্ষিত বাঙালিরা ইংরিজির পাশাপাশি নিজের ভাষা জানতেন, অন্তত রবীন্দ্রসাহিত্যে দীক্ষিত ছিলেন। কিন্তু নব্য 'হিন্দি'ভাষীদের সেসব চল ছিলনা। মান্টো-চুঘতাই-ফয়েজ আর হিন্দি নয়, ফলে সে ঐতিহ্য থেকে তাঁরা বঞ্চিত। আওধীতে লেখা লক্ষৌএর মিঠে গজল-ঠুংরি আর তাঁদের নয়। মৈথিলীর অপার্থিব গীতিকবিতাকে হিন্দি তাঁরা বলতে পারেননা। অতএব হিন্দি তৈরি করা শুরু হয় কৃত্রিম, সংস্কৃতবোঝাই রসকষহীন একটি ভাষা হিসেবে।

এই কৃত্রিম, অর্বাচীন ভাষাটিকে 'জাতীয়' ভাষা হিসেবে তুলে ধরা সহজ ছিলনা। সেজন্য প্রথমে বহু-জাতির পরিবর্তে এক-জাতির একটি প্রকল্প হাজির করা জরুরি ছিল। একাধিক যুদ্ধ এই প্রকল্পটিকে তৈরি করতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে ১৯৬২ সালের চিন-ভারত যুদ্ধে, এমনকি কমিউনিস্ট পার্টিও ভেঙে যায়। যদিও তাত্ত্বিকভাবে কারণ ছিল আলাদা, কিন্তু অন্তত যুদ্ধটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল বলতে কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়। ১৯৭১ এর বাংলাদেশ যুদ্ধ বিষয়টিকে আরও একধাপ এগিয়ে দেয়। ইন্দিরা গান্ধী কার্যত 'জাতির নেত্রী' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান। 'জাতিয়তা' হিসেবে বাঙালি বা গুজরাতি নয়, ভারতীয়ত্ব প্রাধান্য পেতে শুরু করে। বহু-জাতির বিপরীতে এই 'জাতিয়তা' এবং তার সঙ্গে হিন্দির সংযোগস্থাপনের কাজে বোম্বের চলচিত্র শিল্পও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনো রাজভাষা প্রসার সমিতি নয়, এক এবং অদ্বিতীয় বোম্বের উদ্যোগেই 'ভারতীয়' হিসেবে 'হিন্দি' সিনেমাকে উপস্থাপন করা শুরু হয়। এটা একেবারেই বেসরকারি পুঁজির জয়যাত্রা নয়, ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্র প্রত্যক্ষভাবে বিষয়টায় সহযোগিতা জুগিয়েছিল। নেহরু পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকেই হিন্দি সিনেমার বিশ্বজয়ের অন্যতম কান্ডারি ছিলেন। তাঁর সক্রিয় উদ্যোগ রীতিমতো ঐতিহাসিকভাবে নথিভুক্ত।

অনেকে অবশ্য বলেন, হিন্দি সিনেমা ছিল 'ইনক্লুসিভ'। উর্দু জবানকে সে নিজের অক্ষে স্থান দিয়েছিল, 'বিশুদ্ধ' হিন্দিকে নয়। কিন্তু, বস্তুত হিন্দি সিনেমা খুব স্পষ্ট করে হিন্দি-উর্দু বিভাজনকে তুলে ধরেছে এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে এদের যোগাযোগ স্পষ্ট করে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি 'উমরাও জান' এর মতো সিনেমা, যেখানে উর্দু জবানকে ব্যবহার করা হয়েছে মুসলমান খানদানির সঙ্গে যোগ করে। এটি নিঃসন্দেহে 'বাস্তবতা'র কারণে হয়নি। কারণ বাস্তবতা হল সিনেমায় বর্ণিত এলাকার ভাষা ছিল আওধী। ওই অঞ্চলেই ওয়াজিদ আলি শা লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত বন্দিশগুলি, যা কখনই কথাকথিত হিন্দি বা উর্দু নয়। অবশ্য লক্ষৌতে প্রায় সমসময়েই কাটিয়ে গেছেন গালিবের মতো কবি, তিনি আওধীতে লেখেননি, যদিও তাঁর ভাষাও নিঃসন্দেহে শিক্ষিত সমাজ বুঝত। কিন্তু গালিব নিজের ভাষাকে আখছারই 'হিন্দি' বলেছেন। সে ভাষা ছিল সুন্দর ও পালিশ করা। সুমিত সরকার বলেছেন এই শীলিত ভাষায় হিন্দু ও মুসলমানদের সমান অধিকার ছিল। ফলে উর্দু=মুসলমান, হিন্দি=হিন্দু -- এই সমীকরণদ্বয় মোটেই বাস্তবসম্মত নয়, কিন্তু ভারত এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্রের মতো বোম্বে সিনেমাও এই একই বস্তুকে দাগ কেটে জনমানসে গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছিল।

ফলে যুদ্ধ, সরকারি ভাষা, বোম্বে সিনেমা, এসবের যোগফলে গোটা সমীকরণটি দাঁড়ায় এরকমঃ ভারতবর্ষ বহুজাতিক দেশ নয়, একটিই জাতি। তার রাজভাষা (এই শব্দটি খুব সুকৌশলে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ভাবেই ব্যবহার করা হচ্ছে) হল হিন্দি। ভারতের জাতিয়তার মূল সূত্র যেমন পাকিস্তান-বিরোধিতা (অর্থাৎ মূলগত সাম্প্রদায়িকতা), তেমনই রাজভাষার মূল সূত্র হল উর্দুর বিপরীতে সংস্কৃত নিয়ে দাঁড়ানো (সেই একই সাম্প্রদায়িকতা)। ভারতের ঐক্যের সূত্র যেমন শক্তিশালী কেন্দ্র, তেমনি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ভাষা। আসমুদ্র হিমাচল যতবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হাত মুঠো করে শপথ নিয়েছে, যতবার দেব আনন্দ থেকে অমিতাভ হয়ে শাহরুক খানে মুগ্ধ হয়ে 'গুরু' বলেছে, ততবারই এই মূলসূত্রগুলি গেঁথে গেছে জনতার বুকে। আধুনিক হিন্দি যেমন একটি শিকড়হীন ভাষা, ভারতের শক্তিশালী এককেন্দ্রিক (বৈচিত্র্যের সমাহারের বিপরীতে) 'জাতিয়তা' যেমন একটি কয়েক দশকের তৈরি করা ডিসকোর্স, একই ভাবে বোম্বের সিনেমাও সামগ্রিকভাবে একটি অলীক (রিয়েলিজমের বিপরীতে) জগতের সিনেমা।

এই এক-জাতি-এক-ভাষা ডিসকোর্স দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করা হয়েছে। যুদ্ধ-সিনেমা-ক্রিকেট এবং সরকারি উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরেই চালু ছিল। মতাদর্শগত আধিপত্য তৈরি হতে সময় লাগে। অবশেষে আশির দশকে এসে পুরো আধিপত্যের গল্পটি হয়ে ওঠে আরও সরাসরি। দূরদর্শনে চালু করা হয় 'জাতীয় কার্যক্রম' এর বাধ্যতামূলক হিন্দি শিক্ষাক্রম। এর আগে পর্যন্ত রেডিওর জমানায় 'স্থানীয় সংবাদ' এবং 'দিল্লির খবর' দুইই প্রতিটি জাতির ভাষায় প্রচার করা হত। খোদ দিল্লি থেকেই শোনা যেত গোটা দেশের খবর। টিভি এসে এক ধাক্কায় 'জাতীয় কার্যক্রম'= হিন্দি/ইংরিজি করে দিল। এক-জাতি-এক-ভাষা তত্ত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হল। তবে এবার আর শুধু হিন্দি নয়, তার সঙ্গে আস্তে আস্তে ঢুকল আরেকটি যোগাযোগরক্ষাকারী ভাষা -- ইংরিজি। সেটা অবশ্য আরও একটু প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে আসে। ইন্দিরা গান্ধির জমানায় শিক্ষাকে রাজ্য তালিকা থেকে সরিয়ে যুগ্ম তালিকায় নিয়ে যাওয়া হয়, তৈরি হয় কেন্দ্রীয় বোর্ড, যার মাধ্যম মূলত ইংরিজি। পরবর্তী কয়েক দশক শিক্ষার আঞ্চলিকতাকে ধ্বংস করে নতুন এই 'রাজভাষা'র বিজয়ের দশক। ক্রমশ এই দুই ভাষায় তৈরি হবে গাদা-গাদা 'জাতীয়' চ্যানেল, তৈরি হবে গাদা 'কেন্দ্রীয়' বোর্ডের বিদ্যালয়। আঞ্চলিকতাকে অগ্রাহ্য করে 'ভারতীয় জাতিয়তা'র হুঙ্কারও সর্বোচ্চ গ্রামে পৌঁছবে ধীরে-ধীরে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও নব্বইয়ের দশক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র শব্দটা কার্যত অচ্ছুত হয়ে যাবে। রাজ্যগুলির একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়াবে বিদেশী পুঁজি আকর্ষণ করার জন্য কামড়াকামড়ি। নিজের জাতির বা ভাষার হয়ে কথা বলার একমাত্র নাম হবে 'প্রাদেশিকতা'। ভুলে যাওয়া যাবে, ভারতে কোনো প্রদেশ নেই। ভারত নেশন-স্টেট নয়, যুক্তরাষ্ট্র, বহু জাতির বহু জাতিয়তার সমন্বয়। সেই জন্যই এই অঙ্গগুলিকে 'রাজ্য' বলা হয়, 'প্রদেশ' নয়।

আধিপত্য অবশ্য এতে থামবেনা। এক-জাতি-এক(বা দুই)-ভাষা জিগিরের পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপ হল 'ঐক্য'এর অন্তরায় খুচরো 'প্রাদেশিকতা'কে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া। প্রথমে তা আসে ভাষার উপরে। এ কোনো অলীক কল্পনা নয়। মৈথিলী বা ভোজপুরি আজ প্রান্তিক। এমনকি বামপন্থীদের পোস্টারবালক বেগুসরাইয়ের ছেলে কানহাইয়া কুমারও আর বেগুসরাইয়ের মৈথিলী বলেননা, প্রাত্রিষ্ঠানিক হিন্দিতে কথা বলেন, একটু 'বিহারি' টান সহ। বাঙলার বিপ্লবী অবিপ্লবী নির্বিশেষে রাজনীতিকরা বিহারি শ্রমিকদের ভাষাকে 'সম্মান' দিয়ে যখন তাঁদের সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলতে যান, তখন ভুলে যান, যে, এ একেবারেই একজন ওড়িয়ার ভাষাকে সম্মান করে তার সঙ্গে অসমীয়া বলার মতো ব্যাপার । কারণ বেশিরভাগ বিহারি শ্রমিকেরই ভাষা হিন্দি নয়, তাঁদের ওটা আলাদা করে শিখতে হয়েছে, এবং সেই কারণেই তাঁদের ভাষা অবলুপ্তপ্রায়।

গোটা খন্ডিত ভারতবর্ষ জুড়েই এই হিন্দি-ইংরিজি যুগলবন্দী এক শিকড়হীন অদ্ভুত 'ঐক্য'এর ধারণার জন্ম দিয়েছে। বোম্বে, ক্রিকেট আর পাকিস্তান-বিরোধিতা (অংশত বাংলাদেশ) ছাড়া এর আর কোনো জমিগত ভিত্তি নেই। বোম্বের চড়া দাগের গান, নাচ আর মোটামোটা ডায়লগ ছাড়া এর কোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নেই। সেই কারণেই হিন্দির জায়গায় ক্রমশ ইংরিজির ঢুকে পড়ায় এর কোনো অসুবিধেও নেই, কারণ রক্ষা করার মতো কোনো ঐতিহ্যই এর নেই। আদ্যন্ত সাম্প্রদায়িক উৎসের এই আধিপত্যমূলক শিকড়হীন 'ভাষা' তৈরির প্রক্রিয়াটিতে উত্তর-ভারতের বুদ্ধিজীবীরা বিশেষ বাধা দেননি (কিছু বামপন্থী এবং কিছু তথাকথিত উর্দুভাষীর বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ ছাড়া)। তার ফল হিসেবে গোটা ভারত রাষ্ট্র জুড়ে এই শিকড়হীনতার প্রচার, প্রসার এবং গ্লোরিফিকেশন চলেছে এবং চলছে। এবং এই প্রক্রিয়ায় গুঁড়িয়ে যাচ্ছে বহুজাতিক এই রাষ্ট্রের বহুজাতীয় ঐতিহ্যগুলি। ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, যাপনের বৈচিত্র্য, সবকিছু।

চল্লিশের শেষে বা পঞ্চাশের শুরুতে সিপিআই এর তাত্ত্বিক রামবিলাস শর্মা লিখেছিলেন, রাষ্ট্রভাষার দাবী ভারতীয় বৃহৎ পুঁজির সাম্রাজ্যবাদী এবং ঔপনিবেশিক অভিব্যক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। নানা বর্ণের কমিউনিস্টদের অবস্থান গত ষাট-সত্তর বছরে অনেক বদলেছে, বদলেছে লব্জ, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পর্ক সম্পর্কে মৌলিক অবস্থান মোটের উপর একই আছে। তবুও তাঁদের মুখেও আর এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধতার লব্জ আর শোনা যায়না। হেজিমনি আর প্র্যাগম্যাটিজম বড় মায়াবী জিনিস।

2063 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3]   এই পাতায় আছে 21 -- 40
Avatar: কল্লোল

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

বোম্বের হিন্দি সিনেমায় ৬০/৭০এর দশকে হিন্দুস্তানীই চলতো।
শহরের বাবু/বিবির চরিত্র(হিন্দু) হিন্দুস্তানী বলতেন। হিন্দুস্তানী মানে হিন্দি-উর্দ্দুর মিশেল)।
যো ওয়াদা কিয়া য়ো নিভানা পড়েগা/রোকে জামানা চাহে রোকে খুদাই তুমকো আনা পড়েগা
দিলবর, জানেজানা, মেহেবুবা, ইয়াদ, আঁসু, জিন্দেগী, খ্যায়র, বদতমিজ, দিল, মুহব্বত, শীশা, নিগাহ, শাম, জাম, সুবহ, খত, খতরা এমনতরো সহস্রাধিক উর্দ্দু শব্দ হিন্দি সিনেমায় আখচার ঘুরে ফিরে বেড়াতো। শউরে রাজ কাপুর থেকে অমিতা বচপনএর মুখের ভাষা মূলতঃ হিন্দুস্থানী।
"শুধ" হিন্দি বিষয়টা ৭৭এর পর থেকে জনতা পাট্টি পরে ভাজপা প্রকল্প।
এর সাথে হিন্দি(হিন্দুস্থানী)কে রাষ্ট্রভাষা করে তোলার প্রকল্পের যোগ নাই বলে আমার মনে হয়।
হঠাৎ মনে পড়লো, গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেল - এদের জনসভার ভাষা কি ছিলো? কোই রোশনী দিখায়েঁ ?

Avatar: S

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

এখনও হিন্দি সিনেমাতে কিছুটা হিন্দুস্তানীই চলে, বিশেষ করে গানে। কারণ খুব কম কয়েকজন লেখক ছাড়া বাকীরা মুলতঃ উর্দু কবি।

তবে কমে আসছে। তার সাথে পান্জাবী আর ইদানিং হরিয়ানি ভাষার খুব চল হয়েছে। বাজারের কারণে।
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি পরিকল্পিত হিন্দি আগ্রাসন ছড়াচ্ছে শুধু তাই নয়, এপারে ডোরিমন কার্টুন দেখে বাচ্চারাও হিন্দি বলতে শুরু করেছিল, পরে সরকার নিষিদ্ধ করে সেটা বন্ধ করেছে।

লেখা ও মন্তব্যগুলো থেকে শিখছি। উড়ুক 👌
Avatar: কল্লোল

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

বাংলা ভাষাকে পঙ্গু বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে টিভি বিজ্ঞাপনে। প্রায় সব বংলা বিজ্ঞাপনই হিন্দির উপর ডাব করা। ফলে লিপ সিংকিংএর ঠেলায় অদ্ভুত বাংলা শোনা যাচ্ছে।। কি একটা শ্যাম্পুতে চুলের "লম্বাই" নিয়ে বলা হচ্ছে।

Avatar: এলেবেলে

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

স্যার জর্জ গ্রিয়ার্সন The Linguistic Survey of India গ্রন্থে ভারতের ভাষাচিত্রের যে ছবি তুলে ধরেছিলেন তা এখানে দিলাম।


https://i.postimg.cc/nV1vctQR/1.jpg

কল্লোলবাবু গান্ধী-নেহরু-প্যাটেলের কথা উল্লেখ করেছেন। আমি কেবল এ ব্যাপারে গান্ধীর মত তুলে ধরলাম। বলাই বাহুল্য, গান্ধীর মতই বাকি দু’জনের মত। ১৯২৫ এর কানপুর কংগ্রেসে এ ব্যাপারে যা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তা হল “This Congress resolves that the proceedings of the Congress AICC and the Congress Working Committee shall ordinarily be conducted in Hindustani”. ১৯৩৬ সালে অখিল ভারতীয় সাহিত্য পরিষদের নাগপুর অধিবেশনে তিনি কিন্তু বলেন, “The national language is Hindi ‘athava’ Hindustani”. স্বাধীনতার অব্যবহিত পুর্বে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, “… that Hindi in Devanagari script can never become the national language of India”. কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৪৯এর নম্ভেম্বর মাসে লোকসভায় দেবনাগরী লিপিকেই ‘national language’ হিসাবে গণ্য করার প্রস্তাব পাশ হয়। প্রসঙ্গত national language কিন্তু কোনও অর্থেই ‘রাষ্ট্রভাষা’ নয়, লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা মাত্র।
Avatar: sm

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

বাংলা ভাষায় কিছু হিন্দি শব্দ ঢুকে পড়লো,এতে বাংলা ভাষার ত্রাহি মধুসূদন হওয়া উচিত নয়
হিন্দিতেও প্রচুর উর্দূ শব্দ ঢুকে বসে আছে
নিয়মিত পাঞ্জাবী শব্দ ধুঁকছে আর ভাইসে ভার্সা।বরঞ্চ তলিয়ে দেখা উচিত সাউথ ইন্ডিয়ার লোকেরা কি করে হিন্দি বর্জন করে চালাচ্ছে।
Avatar: কল্লোল

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

এলেবেলে। ওসব তো দলের অন্দরে মিটিংএর কথা। কিন্তু এঁরা যখন মাঠে ঘাটে বক্তৃতা করতেন তখন কি ভাষায় বলতেন?

Avatar: এলেবেলে

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

কল্লোলবাবু, অবশ্যই হিন্দুস্থানিতে। সেখানে উর্দুর অবাধ প্রয়োগ ছিল। মালব্য প্রমুখেরা শুদ্ধ মানে সংস্কৃতায়িত হিন্দিতে।

কিন্তু সৈকতবাবু এটা কী লিখলেন? "দেশভাগের আগে একটি-পৃথক-ভাষা হিসেবে হিন্দির কোনো অস্তিত্ব ছিলনা"। বেসিকে এত গণ্ডগোল থাকলে তো গোটা ন্যারেটিভটাই জোলো হয়ে যাবে।

উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ এবং অযোধ্যায় ১৮৬০-৬১ সালে ৬৯,১৩৪ ছাত্র ছিল হিন্দি নিয়ে পড়ার, উর্দুর ছাত্র ছিল ১১,৪৯০ জন। ১৮৭৩এ হিন্দি পড়ুয়া ৮৫,৮২০ এবং উর্দু শিক্ষার্থী ৪৮,২২৯ জন।

১৮৯১তে হিন্দি সংবাদপত্র ২৪টা, সার্কুলেশন প্রায় ৮ হাজার; উর্দু আখবর ৬৮টা, সার্কুলেশন ১৬ হাজারের বেশি। ১৯১১তে হিন্দি কাগজ ৮৬, সার্কুলেশন ৭৭ হাজারের বেশি; উর্দু ১১৬টা অথচ সার্কুলেশন ৭৬ হাজার।

পিটার হার্ডি, The Muslims of British India, 1972, pp. 142-144
Avatar: Ishan

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

আপনার বাকি কথার উত্তর পরে দিচ্ছি। একটু চা-জল খেয়ে। কিন্তু এই হিন্দি-উর্দুর যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন, সেটা বস্তুত বৃটিশের এবং আরও বেশি করে পরবর্তী ভারত-পাকিস্তান সরকারের ন্যারেটিভ। আপনার পুরো চিন্তায় সেটাই ঘুরছে, ফলে কাউন্টার ন্যারেটিভটায় সমস্যা হচ্ছে।

ন্যারেটিভটা আরও একবার বলি। এই যে, হিন্দি সংবাদপত্র এবং উর্দু সংবাদপত্র -- এদের তফাত হল লিপিতে। ভাষায় নয়। উর্দু, হিন্দি এবং হিন্দুস্তানি -- যে সময়ের কথা বলছি, এরা মোটামুটি সমার্থক ছিল। কখনও লিপির তফাত বোঝাতে, কখনও শীলিততর বোঝাতে, কখনও শুধুই একে অপরের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হত। কিন্তু হিন্দি, উর্দু কোনো আলাদা ভাষা হিসেবে স্বীকৃত হতনা (আলাদা লিপি মানেই আলাদা ভাষা নয়)।

আলাদা লিপি=আলাদা ভাষা = আলাদা ধর্ম -- এই সমীকরণ প্রাথমিকভাবে বৃটিশ শুরু করে। একেই অনেক গুণ বাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয় স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তানে।

এই তো ন্যারেটিভ। এতে সমস্যা কোথায়? আপনি কি বলছেন হিন্দি, উর্দু, হিন্দুস্তানি -- এরা আলাদা ভাষাই ছিল? এই ধারণাটা মাথা থেকে ঝাড়ানোর জন্যই তো এতটা লেখালিখি। :-)

আগের পোস্টের উত্তর পরে দিচ্ছি।
Avatar: lcm

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

কথ্য হিন্দি এবং কথ্য উর্দু-র মধ্যে পার্থক্য বড় কিছু না, আজও নেই ---
Hindi and Urdu are considered different registers of a single language Hindustani, with Hindi drawing much of its vocabulary from Sanskrit and Urdu being more influenced by Persian.

কিন্তু লেখার পদ্ধতি হিসেবে ধরলে দুটি ভিন্ন জগৎ। আলাদা অক্ষর, আলাদা গ্রামার, একটি লেখা হয় বাঁ দিকে থেকে ডান দিকে, অন্যটি উল্টো।
বলছে -
Both Hindi and Urdu are almost entirely mutually intelligible with one another, but have somewhat slightly distinct vocabulary and minor terminological differences. Another major difference is their writing systems are entirely different, with Hindi using Devanagari and Urdu using the Nastaliq script.

হিন্দি এবং উর্দু - দুই ভাষারই ব্যুৎপত্তি খারিবোলি থেকে, উর্দুতে ফারসী শব্দের প্রাধান্য বেশি, হিন্দিতে সংস্কৃতের।

খারি বোলি=দিল্লির অঞ্চলের ভাষা (৯০০-১২০০) যার উৎস ছিল প্রাকৃত ভাষা, খারি বোলি (stiff word) কে বলা হত শ্রুতিতে সামান্য কর্কশ, এর একটু মধুর ভার্সান ছিল ব্রজ ভাষা এবং অযোধ্যা অঞ্চলের সামন্য ভেরিয়েশনের আওয়াধি ভাষা।

হিন্দি এবং উর্দুকে একসঙ্গে বলা হত হিন্দুস্তানি ভাষা নামে। মুঘল আমলে হিন্দুস্তানি ভাষাই ছিল কথ্য ভাষা, এবং উর্দু ছিল অফিসিয়াল ভাষা।

বৃটিশরা শুরুতে ইংরেজির সঙ্গে উর্দুকে করেছিল অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ। এটা করেছিল কারণ তখনকার মুঘল আমলের কোর্ট-কাছারি রেজিস্ট্রেশন-দলিল সংক্রান্ত কাজ ফার্সি/উর্দু-তে হত, ওরা বেসিক অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ স্ট্রাকচারটা পাল্টাতে চায় নি।
Avatar: lcm

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

"আলাদা লিপি=আলাদা ভাষা = আলাদা ধর্ম -- এই সমীকরণ প্রাথমিকভাবে বৃটিশ শুরু করে।"

এটা পুরোপুরি ঠিক নয়। অফিস কাছারির নথিপত্রে ইংরেজির সঙ্গে আরাবিক অক্ষরমালার পরিবর্তে দেবনাগরী অক্ষরে লেখালখির দাবী উঠেছিল বহুদিন ধরে। শুরুতে এই দাবীকে বৃটিশরা পাত্তা দেয় নি, কারণ আবার অন্য অক্ষরের প্রিন্ট বানাও, একগাদা ফালতু খরচ।

প্রেমচন্দ শুরুর দিকে উর্দুতে লিখতেন। কিন্তু পরে বাধ্য হন হিন্দিতে লিখতে, কারণ ততদিনে উর্দু প্রেস কমে গেছে, হিন্দি ছাপাখানা সহজলভ্য ছিল।

সংস্কৃত/হিন্দি=হিন্দু, ফারসী/উর্দু=মুসলিম ---- এই সমীকরণ আগে ছিল না তা নয়। বরাবরই ছিল। শাসককুলেরা সুযোগ মতন এর সুবিধে নিয়েছেন।
Avatar: Ishan

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

"প্রেমচন্দ শুরুর দিকে উর্দুতে লিখতেন। কিন্তু পরে বাধ্য হন হিন্দিতে লিখতে, কারণ ততদিনে উর্দু প্রেস কমে গেছে, হিন্দি ছাপাখানা সহজলভ্য ছিল।"

অর্থাৎ সমস্যাটা হরফের। ভাষার পার্থক্যের না।

আরও আগেরও উদাহরণ দিয়েছি। গালিব যে ভাষায় লিখতেন তার লিপি ছিল ওই তথাকথিত পারসিক। কিন্তু তাঁর ভাষা, তিনি বারবার বলেছেন হিন্দি। তখনও মুঘল সম্রাটরা দিল্লিতে।

নবাব ওয়াজিদ আলি শা। তাঁর বিখ্যাত ঠুংরির একটি লাইনঃ চার কাহার মিলে মোরি ডোলিয়া সাজাবে। লিপিঃ ওই তথাকথিত পারসিক।

ফলে মুঘল আমলে "লিপি = ভাষা" এই সমীকরণ ছিলনা। ভারতীয় মুঘল এবং লক্ষৌ এর শাসকরা উর্দু/হিন্দি/হিন্দুস্তানিকে ভারতীয় ভাষা হিসেবেই গণ্য করতেন। তাঁদের পছন্দের লিপি অবশ্যই ওই পারসিক ঘেঁষা বস্তুটিই ছিল।
Avatar: lcm

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

ঠিক, লিপি=ভাষা সমীকরণ ছিল না।
Avatar: এলেবেলে

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

নাঃ ইঞ্জিরি না লিখলে দেখছি সৈকতবাবু পাত্তাই দিচ্ছেন না!

The difference between 'Hindi' and 'Urdu' includes
1. That of Script. Devanagari for Hindi and Arabic script for Urdu.
2. That of vocabulary. For Hindi preference of words coming from Sanskrit and Prakrits (vernaculars). For Urdu preference of words borrowed from Arabic and Persian.

Persian remained the language of the Moghul court for more than two centuries (1526-1761). By the end of the seventeenth century Urdu had become highly Persianized, rich in vocabulary and refined enough for graces of courtly address. Shah-i-Alam II who was enthroned in 1761 wrote poetry in Urdu and was a patron of Urdu poets. So was Bahadur Shah II, the last Moghul king
91837-1857).

The Muslim leaders resorted, saying that Urdu is a blend of underdeveloped vernaculars of north India which got groomed, refined, and enriched by Muslim poets and prose writers who chose to write it in the Arabic script. The Hindi of seven centuries ago, they said, was of the 'ap bharanash' ( a vernacular without a regular standardised grammar).

মামুর কলে বোল্ড, ইটালিক্স না দিতে পারার কী জ্বালা সেটা যদি মামু একবার বুঝতেন!

এইবার চা-জল খেয়ে লেগে পড়ুন পার্থক্য বোঝাতে।
Avatar: এলেবেলে

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

* So was Bahadur Shah II, the last Moghul king (1837-1857).
Avatar: S

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

For Hindi preference of words coming from Sanskrit and Prakrits (vernaculars). For Urdu preference of words borrowed from Arabic and Persian.

এইটা কি প্রথম থেকেই ছিল? নাকি পরে ধর্মের টুপি পড়াতে গিয়ে জোড় করে করা হয়েছে?
Avatar: এলেবেলে

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

@S, বহু আগে থেকেই ছিল। হিন্দি পাতি, উর্দু রিফাইন্ড। তখন এই ধর্মের জিগির ওঠেইনি।
Avatar: Ishan

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

আদা জল খাবার কিছু নেই। এটা আপনি যেখান থেকে কোট করেছেন, সেটা পুরোটাই আমার বক্তব্যের অন্যতম উৎস। পুরোটা কোট করলেই হত।

The "two languages" called "Hindi" and "Urdu" were now almost completely identical in grammatical structure. The The difference between them included
1. That of Script. Devanagari for Hindi and Arabic script for Urdu.
2. That of vocabulary. For Hindi preference of words coming from Sanskrit and Prakrits (vernaculars). For Urdu preference of words borrowed from Arabic and Persian.

এছাড়াও প্রবন্ধে এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অন্যান্য লক্ষণ টক্ষণ গুলিও পরিষ্কার ভাবে বলা হয়েছে। পুরোটা পড়লে, বা কোট করলেই বোঝা যেত।

অবশ্য আপনি অন্য কোনো সেকেন্ডারি সোর্স থেকেও পড়ে থাকতে পারেন, যারা অপকর্মটি করেছে। আমার সূত্র হল ইন্ডিয়ান ক্রিটিকস অফ গান্ধি। এই নিবন্ধের লেখক দাউদ রাহবার। এইটা যে এইভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, আমার কল্পনারও অতীত ছিল। পুরোটা কোট করে দিতে পারলেই ভালো হত। কিন্তু অত টুকব কীকরে। :-)
Avatar: Ishan

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

ওহো লেখা হলনা। "হিন্দি" এবং "উর্দু" এর কোটেশন মার্কগুলি লক্ষ্য করবেন। ব্যাকরণগতভাবে প্রায় সম্পূর্ণ এক হওয়া সত্ত্বেও তারা "তথাকথিত" ভাবে আলাদা বোঝানোর জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে। এই কৃত্রিম বিভাজন তৈরির জন্য "হিন্দু রাজনীতি" অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে দায়ী করা হয়েছে। ওই নিবন্ধে।
Avatar: এলেবেলে

Re: হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান

কী মুশকিল! প্রথমত আপনিই চা-জলের কথা বলেছিলেন, সেটা আদা-জল কীভাবে হল? দ্বিতীয়ত আমিও ওই প্রবন্ধটি থেকেই লিখেছি। তবে সেই নিবন্ধের লেখক সম্পর্কে হ্যারল্ড কাওয়ার্ড যা লিখেছেন তাতে তিনি 'অপকর্ম' করেছেন সেটা বুঝব কী উপায়ে? বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক, কেম্ব্রিজের পি এইচ ডি কেন 'অপকর্ম'টি করলেন সেটা যদি না বুঝিয়ে বলেন?

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3]   এই পাতায় আছে 21 -- 40


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন