সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • সোনারপুরে সোনার মেলা
    শীত ভাল করে পড়তে না পড়তেই মেলার সীজন শুরু হয়ে গেছে। গুরু এবারে ওমনিপ্রেজেন্ট – গাদাগুচ্ছের মেলাতে অংশ নেবার মনস্থ করেছে। একেবারে সূচনাপর্বেই সোনারপুর মেলা – বোতীনবাবুর দৌলতে তার কথা এখন এখানে অনেকেই জানেন। তো সেই সোনারপুর বইমেলাকেই পদধূলি দিয়ে ধন্য করব ...
  • এন জি রোডের রামলাল-বাংগালি
    রামলাল রাস্তা পার হইতে যাইবেন, কিছু গেরুয়া ফেট্টি বাঁধা চ্যাংড়া যুবক মোড়ে বসিয়া তাস পিটাইতেছিল— অকস্মাৎ একজন তাহার পানে তাকাইল।  রামলাল সতর্ক হইলেন। হাত মুষ্টিবদ্ধ করিলেন, তুলিয়া, ক্ষীণকন্ঠে বলিলেন, 'জ্যায় শ্রীরাম।'পূর্বে ভুল হইত। অকস্মাৎ কেহ না কেহ পথের ...
  • কিউয়ি আর বাঙালী
    পৃথিবীতে ছোট বড় মিলিয়ে ২০০র' কাছাকাছি দেশ, তার প্রায় প্রতিটিতেই বাঙালীর পদধূলি পড়েছে। তবে নিউজিল্যাণ্ড নামে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে একটি দ্বীপমালা আছে, সে দেশের সঙ্গে ভারতীয়দের তথা বাঙালীদের আশ্চর্য ও বিশেষ সব সম্পর্ক, অনেকে জানেন নিশ্চয়ই।সে সব সম্পর্কের ...
  • মহামহিম মোদী
    মহামহিম মোদী নিঃসন্দেহে ইতিহাসে নাম তুলে ফেলেছেন। আজ থেকে পাঁচশো বছর পরে, ইশকুল-বইয়ে নিশ্চয়ই লেখা হবে, ভারতবর্ষে এমন একজন মহাসম্রাট এসেছিলেন, যিনি কাশ্মীরে টিভি সম্প্রচার বন্ধ করে কাশ্মীরিদের উদ্দেশে টিভিতে ভাষণ দিতেন। যিনি উত্তর-পূর্ব ভারতে ইন্টারনেট ...
  • পার্টিশানের অজানা গল্প ১
    এই ঘোর অন্ধকার সময়ে আরেকবার ফিরে দেখি ১৯৪৭ এর রক্তমাখা দিনগুলোকে। সেই দিনগুলো পার করে যাঁরা বেঁচে আছেন এখনও তাঁদেরই একজনের গল্প রইল আজকে। পড়ুন, জানুন, নিজের দিকে তাকান...============...
  • কাশ্মীরের ইতিহাস : পালাবদলের ৭৫ বছর
    কাশ্মীরের ইতিহাস : পালাবদলের ৭৫ বছর - সৌভিক ঘোষালভারতভুক্তির আগে কাশ্মীর১ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে চলে যাবে এই ব্যাপারটা নিশ্চিত হয়ে গেল, তখন দুটো প্রধান সমস্যা এসে দাঁড়ালো আমাদের স্বাধীনতার সামনে। একটি অবশ্যই দেশ ভাগ সংক্রান্ত। বহু আলাপ-আলোচনা, ...
  • গাম্বিয়া - মিয়ানমারঃ শুরু হল যুগান্তকারী মামলার শুনানি
    নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস—আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে করা গাম্বিয়ার মামলার শুনানি শুরু হয়েছে আজকে। শান্তি প্রাসাদে শান্তি আসবে কিনা তার আইনই লড়াই শুরু আজকে থেকে। নেদারল্যান্ডের হেগ শহরের পিস ...
  • রাতপরী (গল্প)
    ‘কপাল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যায়। পালানোর কি আর উপায় আছে!’- এই সপ্তাহে শরীর ‘খারাপ’ থাকার কথা। কিন্তু, কিছু টাকার খুবই দরকার। সকালে পেট-না-হওয়ার ওষুধ গিলে, সন্ধেয় লিপস্টিক পাউডার ডলে প্রস্তুত থাকলে কী হবে, খদ্দের এলে তো! রাত প্রায় একটা। এই গলির কার্যত কোনো ...
  • রাতপরী (গল্প)
    ‘কপাল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যায়। পালানোর কি আর উপায় আছে!’- এই সপ্তাহে শরীর ‘খারাপ’ থাকার কথা। কিন্তু, কিছু টাকার খুবই দরকার। সকালে পেট-না-হওয়ার ওষুধ গিলে, সন্ধেয় লিপস্টিক পাউডার ডলে প্রস্তুত থাকলে কী হবে, খদ্দের এলে তো! রাত প্রায় একটা। এই গলির কার্যত কোনো ...
  • বিনম্র শ্রদ্ধা অজয় রায়
    একুশে পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অজয় রায় (৮৪) আর নেই। সোমবার ( ৯ ডিসেম্বর) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অধ্যাপক অজয় দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা অসুখে ভুগছিলেন।২০১৫ ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

নববর্ষের এলোমেলো লেখা আর আগরতলার গল্প

শক্তি দত্তরায় করভৌমিক

খুব গরম। দুপুরের ঘুম ডাকাতে নিয়ে গেছে। মনে পড়লো গতকাল অর্থাত্ হারবিষুর দিনে তেতো খাওয়া। আগের দিন বিকেলে আমার বিশালাক্ষী, চোপায় খোপায় সমান ঠাকুরমা আমাকে ভীষ্ম আর হারুকে নিয়ে সরজমিন তদন্তে নেমেছেন,--- গাঙ্গের তলে (চৈত্রের গরমে জল নেমে যাওয়া নদীর ঘাটে) দেখছিলাম রাইজ্যের গিমা শাক, চল্ কয়ডা তুইল্যা আনি। প্রাক্তন ডাকাত জব্বর আলি এখন আজ্ঞাবহ মুনিশ। জব্বর, বাপ্ যাওসেন সতু রুনুরার বাগানো গিয়া কয়ডা বন জামিরের পাতা ছিঁড়া আনসেন। ভীরু চোখে তাকায়, আমতা আমতা করে প্রাক্তন ডাকু, জেডিমা সকালে তিতা না খাইয়া কুইশ্যারের (আখের) রস খাইলে পেট মস্তক ঠাণ্ডা থাকে। তিতা কেনে খাইতা। সে জানে সবার সঙ্গে তাকেও সকালে আধকাপ তেতো খেতে হবেই। অতি সুন্দরী আর নিরীহ গৌরী কাকিমা ঘোমটার তলায় স্মিতমুখী। তাঁকেই হামনদিস্তায় ভোররাতে চৌদ্দ তেতোর রস করতে হবে। জব্বর, সুস্থ থাইক্যা খাইট্যা খুইট্যা সংসার চালাইতে গেলে ইতা খাইতে লাগে। জব্বর সায় দেয়, ঠিকউ কথা। তখন তো বাজারে সব গুছিয়ে বেচে না। জোগাড় করতে হয়, তেলাকুচো পাতা, ব্রাহ্মী শাক। দুপুরবেলা চৌদ্দ তেতোর শাক, তেতো ডাল, নিমপাতা ভাজা। সেওয়াই, সন্দেশ, নাড়ু ঘিয়ে ভাজা চিঁড়ের জলখাবার বিকেলে।

~~~
আজকে সংক্রান্তি। তেতো নৈব নৈব চ। জলখাবারে খই দই, গুঁড়ো খইএর ঝাল ঝাল গুড়ের কড়াপাক নাড়ু, মোয়া। দুপুরবেলা সীম বীচি ভাজা দিয়ে ঢেঁকি শাক, মটর ডালের বড়া আর ঘি গরম মশলা দিয়ে এঁচড়, আম দিয়ে মিষ্টি ডাল, আম টক। নিরামিষ কিন্তু পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে। এঁচোড় কাটা কি সোজা? আমাদের গাঙ্গুলি বাগানের বাজারে এঁচোড়ে পাকা মাসিরা জিজ্ঞেস করে, কিরম কাটা এঁচোড় চান, ঘটি না বাঙাল? আরে বাঙাল বুঝি একরকম? বাঙালের কতো শাখা প্রশাখা। গাঙ্গুলি বাগানের বাঙাল এঁচোড় আমাদের মতো না। আমাদের পরিপুষ্ট বীচি বাইরের আবরন ছাড়িয়ে, পুষ্ট কোয়া আলাদা করে নিয়ে খোসার মাংস মতো অংশ যুত করে কাটাতে হয়। ধৈর্য, সূক্ষ্ম নজর না হলে "ইঁচড়"খাওনের কাম নাই ।

পশ্চিমবঙ্গের মায়েরা নীলপুজোর দিন বলে মানেন আজকের দিনটা।উত্তর পূর্বাঞ্চলে বাঙালির কাছে হারবিষু নাম। নীলপুজো করেন অনেকে, তবে ঘরে ঘরে হয়না। নববর্ষের প্রথম দিনে পয়লা বৈশাখ মাছ মাংস দৈ মিষ্টি। অসমে এই সময়টাতে রঙালি বিহুর নাচ গান।ত্রিপুরায় গড়িয়া পুজো, বিজু উৎসবের ধূম। গাজন সঙ ঢাকির নাচ আমরা দেখি অংশ গ্রহণ করেন বেশির ভাগ গ্রামীণ চাষীরা। তাঁরা ভাঙর ভোলা শিবের প্রিয়। কে জানে কি নিয়ে আসবে নূতন বছর ।আশা আশঙ্কা দুইই থাকে মনে।

কালকে তো নববর্ষ। কোনো বাধা নেই, মাছ, মাংস, দই, মিষ্টি সব খাও তবে দিয়ে থুয়ে। একলা খাইও না। আমরা দুদিন নিরামিষের পর মসূরডালে পেঁয়াজ ফোঁড়ন আর মাছভাজা খাই। পয়লা বৈশাখ পান্তা ভাত খাওয়ার কথা পাঁচ সাত বছর আগে ও শুনিনি। পুরোনো বছরের বাসি রান্না কিছুই খেতে নেই শুনেছি। তবে পান্তা ভাত গরমের সকালে বেশ ভালো খাবার। সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা হলে কথাই নেই। ঠাকুরমার নিয়ম একটুখানি পরিবর্তন পরিমার্জন হয় যদি ক্ষতি কি?

~~~

গতবছর অনেক দিন পর ত্রিপুরায় ছিলাম। বইমেলা উপলক্ষ করেই যাওয়া। সায়ন কোনোদিন ত্রিপুরার রেল চড়েনি তাই একদিন উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগর যাওয়ার প্ল্যান হলো। সেই সঙ্গে ঊনকোটি, কৈলাশহর। গেলাম ট্রেনে ফেরাটা ট্রেনে হলো না।স্করপিও না কি একটা আরামপ্রদ গাড়ি ভাড়া করা হোলো। দিনটা গেল, বছরের হারবিষু। মনে ছিলো নিরামিষ খেতে হবে, তেতো খাওয়া প্রথা। নিরামিষ খাবার পাওয়া যাবে, তেতো পাওয়া কঠিন।সুকন্যার মা, বাবা, আমি আর সায়ন। সুকন্যার বাবা অমায়িক মিশুকে মানুষ। আমি, সায়ন, সুকন্যার মা সে তুলনায় কম সপ্রতিভ। খুঁতখুঁতে সবাই প্রায় এক রকম। চা খাওয়া হোলো, ডাব খাওয়া হোলো, মধ্যাহ্নভোজের জায়গা আর মনোমতো হয়না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল - তেলিয়ামুড়া পাহাড়ের গায়ে একটি সুন্দর জায়গা পাওয়া গেল। উঠোন পরিচ্ছন্ন। মুকুলিত দুটি আমগাছ। ফুলে ভরে আছে একটি নিমগাছ। পেছনে মালিকের সম্ভ্রান্তরুচি বাড়ির আভাস। পরিচ্ছন্ন খাবার ঘরে কেউ কেউ খাচ্ছেন। টিয়া পাখি ঝুলছে খাঁচায়। কয়েকটা পরিষ্কার জলের সুবিধা যুক্ত ওয়াশরুম যা এসব এলকায় থাকেই না। বিদেশে যেমন রেস্ট এরিয়া থাকে অনেকটা সেইরকম। এতক্ষণ ধুলিধূসর পথযাত্রার পরে হাতমুখ ধুয়ে স্বস্তি। রতিরঞ্জনবাবু ততক্ষণে মালিকের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছেন। উঠোনের গাছ থেকে কচি নিমপাতা ছিঁড়ে মুচমুচে গরম ভাজা, বাড়ির ভেতর থেকে এলো ঘি আর সোনামুগের ডাল। কচি আমের পাতলা টক। আর কি চাই? হয়ে গেল সেবারের হারবিষুর আচার পালন।
পাহাড়ের কোলে ছোট্ট আড়ম্বর মুক্ত সেই হোটেলটির নাম সাগর লাইন হোটেল। আতিথেয়তার বাড়তি ব্যঞ্জনা নিয়ে হোটেল পরিচয় ছাড়িয়ে মনে থাকলো। সীমা -প্রাচীর পেরোনো এমন কি আর কঠিন।

~~~

অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা, প্রতিশ্রুতি নিয়ে একটা নূতন বছর মানুষের সামনে দাঁড়ায়। মলিন, বিমর্ষ সময়ে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রোজ্জ্বল সুদিনের স্বপ্ন দেখে, অপরকে দেখাতে ভালোবাসে, না হলে এগোবে কি করে। নিজের শুভ কামনা প্রিয় জনকে জানায়, তার জন্য খোঁজে নিজস্ব সরণি। কেউ বা ঐতিহ্য কে বেছে নেয়।

অনাদি অনন্ত বিশ্ব, কাল নিরবধি। তার আবার নূতন কি পুরোনোই বা কি। রাজা শশাঙ্ক না মোগল সম্রাট না আর কেউ বঙ্গাব্দের প্রবর্তক সে তর্ক তোলা থাক্ পণ্ডিত জনের জন্য। অনাদি কালকে যুগ বত্সর মাসের হিসেবে ভাগ করা হয়েছে সে তো আজকে নয়। সেই সঙ্গে জড়িয়ে গেছে প্রণাম আশীর্বাদ আলিঙ্গনে প্রীনন প্রথা। কোলাকুলির সৌজন্যে এই সেদিন ও শত্রু মিত্র মিলিত হতেন। আর নববর্ষের চিঠি - না, দামী কম্পানির কার্ড নয়, হাতে লেখা চিঠি। কাঁপা হাতে লেখা ঠাকুমার আশীর্বাদ পাকা হাতের লেখায় জ্যাঠামশাইয়ের কুশল কামনা, গোটা গোটা অক্ষরে বৌদির শুভেচ্ছা, কাঁচা হাতে প্রবাসী পিতাকে শিশু কন্যার প্রণাম। মনে কি পড়ে?

চিঠি আর লেখা হয় না, একজনের মনের কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ার সুখ, এমনকি বহুযুগের পরেও তাতে চিরন্তনের সোনা খুঁজে পাওয়ার আনন্দ, পরবর্তী প্রজন্ম বুঝি তার থেকে বঞ্চিতই থাকলো। হবু স্বামী ভাবী স্ত্রীকে সোনালী হরিণ আঁকা কার্ডে লিখেছেন শুধু শুভ নববর্ষ - সেই শুভেচ্ছার অপার বৈভব মৃত্যুঞ্জয়ী।

যে মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাস করে তার পক্ষে এই বিশ্বাসও স্বাভাবিক যে আমার শুভ কামনা ইশ্বর আমার প্রিয় জনের জন্য সফল করবেন। ঈশ্বর বিশ্বাস মানে যদি হয় কল্যাণে, মঙ্গলে বিশ্বাস, তবে অন্তর্লীন আনন্দে অবগাহন, দুঃখ দিনেও গান আসে -'এই করেছো ভালো নিঠুর হে'। তীব্র দহন বহন করার জন্য যে সুমহান ধৈর্য প্রয়োজন তা রবীন্দ্রনাথকে ঈশ্বর দেন, জীবনানন্দ পান অতল বিষণ্ণতা। তিনি যখন কষ্ট দেন "নিঠুর পীড়নে নিঙাড়ি বক্ষ দলিত দ্রাক্ষা সম" তার ভয়ঙ্কর ভীষণতা যদি না উপলব্ধি করতেন রবীন্দ্রনাথ তাইলে ঐ উপমা তাঁর কলমে আসতো না। দুঃখের অন্ধকার তাপ তমসায় বার বার শিশুকাল থেকে ডুবছেন ভেসে উঠে স্মিত হেসে আকাশে চোখ মেলে বলছেন - আনন্দ রূপমমৃতমযদ্বিভাতি। প্রতি নববর্ষে লিখছেন নূতন আশার গান। অসাধারণ ভাষণ, অনবদ্য চিঠি। আমাদের মতো আকুল মানুষেরা তাঁর গানে কাব্যে কথায়ই ঈশ্বর কে স্পর্শ করতে চাই। পত্রসাহিত্য হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের ধরা ছোঁয়ায় অল্পই থাকবে। নূতন দিনের ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসয়াপ শুভ নববর্ষ বার্তায় ভরে ওঠে; তা উঠুক না - গতানুগতিক অভিনব সব শুভেচ্ছাবাণীতে। আমার তো ভালোই লাগে।

~~~

তা যাক, খাওয়া দাওয়ায় ফিরি। ঠাকুরমার নিয়ম পাল্টে গেছে তো বটেই। যুগ পাল্টেছে যখন পাল্টাতে বাধ্য। যদিও এখনও অনেক বাড়িতে নববর্ষ বিজয়ায় পাঠার মাংস ছাড়া কিছু হেঁশেলে ঢোকেনা কিন্তু অনেক বাড়িতে পছন্দের পদ মুরগী, কোয়েল, আদিবাসীরা শুয়োরের মাংস পছন্দ করলেও শুভদিনে অনেকেই এড়িয়ে চলেন। রাজবাড়ির, উজীরবাড়ির বা তাঁদের অনেক আত্মীয়দের বাড়িতে গৃহদেবতা প্রতিষ্ঠিত। পুরোনো নিয়মে তাঁরা শাস্ত্রীয় বিধান মানেন। আবার পাহাড়ের অনেক গোষ্ঠীর পূজায় শুয়োর এবং মোরগবলি বিধিসম্মত। আমার ঠাকুরমা যেমন তাঁর পুরোনো ঐতিহ্য মেনে নববর্ষের মেনু বলতেন কুসুম কলি কলই বা মাতাই কতর রিয়াংএর ঠাকুরমা তাঁদের ঐতিহ্য মানবেন, সেটাই স্বাভাবিক। জীবন কেটেছে ত্রিপুরার নানা জায়গায়। লেখার শুরুতে ছিলাম বরাক উপত্যকার কুশিয়ারার তীরে। শেষে চলে এসেছি গোমতী, হাওড়া, ধলাই, রাইমা শরমার কূলে। ত্রিপুরার ছোট পরিসরে অনেক জাতি সম্প্রদায় নিজেদের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেও মিলেমিশে চলেন। মণিপুরীরা বাড়ির হেঁশেলে মাংস ঢোকান না। লেখিকা করবী দেববর্মন তাঁদের নিজস্ব ঘরানার সিদ্ধ চালে সীমের বীচি কাঁঠাল বীচি দিয়ে অসাধারণ পোলাও রান্না করে খাওয়াতেন। ছাত্রীরা বাড়ি থেকে বাঙ্গুই নিয়ে আসতো। বাঁশের চোঙে নানা রকম মশলা পাতা দিয়ে পুড়িয়ে নেয়া খরগোশের, সজারুর বা বুনো পাখির মাংস। উত্তর দক্ষিণ পশ্চিম ত্রিপুরার বাঙালিদের মধ্যেও রীতি নীতি খাওয়া দাওয়ার পার্থক্য আছে। উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগর কৈলাশহর সিলেটী অধ্যুষিত এলাকা। দক্ষিণে সাব্রুম বিলোনীয়ায় নোয়াখালীর প্রাধান্য। তাঁদের নববর্ষের চেয়েও বড় পরব চৈত্র সংক্রান্তি। চড়ক, গাজন, নানা সব্জি দিয়ে পাঁচন, নারকেল দিয়ে তৈরি খণ্ড ওখানকার বৈশিষ্ট্য। আগরতলার অধিবাসী বেশির ভাগ কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আগত বাঙালি। খাওয়াদাওয়া বলতে মাছ মাংস দৈ মিষ্টি নাড়ু সন্দেশ। যতকিছু খাওয়া লেখে বাঙালির ভাষাতে। তবে অনেকের কাছে শুঁটকি প্রিয় হলেও নববর্ষ বিজয়ার ভোজে ব্রাত্য।

খাওয়াদাওয়া হবে ঠিক আছে কিন্তু একটা কথা না বললে নববর্ষ উদযাপনের কথা বলাই হয়না। ভোরে উঠে স্নান করে নিজের পছন্দমতো ঠাকুরের নাম লিখতে হবে। সে ঠাকুর হরি বিষ্ণু কার্লমার্কস গাঁধীজী যে কেউই হতে পারেন। তারপর অঙ্ক ইংরেজি বাংলা সব একটু একটু পড়তে হবে। আমি তো এই বুড়ো বয়সে ও লিখি পাঁচ বার শ্রীহরি নমঃ তারপর ছোটবেলার হাতের লেখা অভ্যাসের বয়ান গড ইজ গুড - এটা ঠাকুরের নাম লেখা ও হোলো, ইংরেজি লেখা ও হোলো। অঙ্কে বরাবর কাঁচা তাই সোজা অঙ্ক ৫+৩=৮ ভুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এই করতে করতে গেদুমিঞার মসজিদের ফজরের নামাজ হয়ে যায় একটু নাদিরশাইল ধানের মুড়ির মোয়া বা ঘিচূড় খেয়ে নিয়ে দল বেঁধে নানা বয়সী বন্ধুরা পথে বেরিয়ে পড়ার পালা, বেশিরভাগক্ষেত্রে গন্তব্য লক্ষ্মীনারায়ণবাড়ী মন্দির। ঠাকুর চাঁপা ফুলের মালা, গুলঞ্চ ফুলের মালায় চন্দনে সেজে নিয়েছেন পরিপাটি। দিঘীর বাঁধানো ঘাটে মধুর পবন। সূর্য দিঘীর চোখে প্রথম আলো ছুঁইয়ে বলছেন -বলো তুমি সুন্দর। বলো আমি ভালোবাসি। কৈশোর যৌবনের লাজুক কবিতারা জলে দেখছে আলোক লতার কাঁপন। সবাই কি আর কবি? পেটুকরা ভীড় জমায় "বুড়া মহিলার প্যাড়ার দোকানে" (ওটিই দোকানের নাম)। ঠাকুরকে ছুঁইয়ে নিয়ে পেটায় নমঃ। উপরি পাওনা লক্ষ্মীনারায়নজীর সুস্বাদু চরণামৃত। বাইরের মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সুগারের রোগীরা ঢুকতে শুরু করেছেন, বেশি চিনি দিয়ে ফোটানো চা নিমকি ক্ষীরতোয়া খেয়ে নিচ্ছেন একটুখানি। বাড়িতে গিন্নির, কন্যার এমনকি মায়ের শাসন, খেতে দেয়না কিচ্ছু ।
~~~
আগরতলার যেমন লক্ষ্মীনারায়ণবাড়ী, উদয়পুরের মায়ের বাড়ি, সাব্রুমে দৈত্যেশ্বরী কালীবাড়ী, আগরতলার বুদ্ধমন্দির নববর্ষের ভোরে নদীর পাড়ে, কাটাখালের ব্রীজ, আস্তাবলের ধার, মন্ত্রীবাড়ি রোড (সরকার পরিবর্তনের পর এই রাস্তার নাম শ্যামাপ্রসাদ মার্গ হয়ে গেছে)। সবই বেড়ানোর জায়গা। নববর্ষের প্রভাতে কোন বড় সংগঠিত শোভাযাত্রার চল ছিলো না, পাড়ার ছেলেরা প্রভাতফেরিতে বেরুতো যদিও। ছোট শহর, সবাই সবার চেনা। প্রণাম, কোলাকুলি, চোরা হাসির ছড়াছড়ি। পথপাশে পাখি পুচ্ছ নাচায়, বৈষ্ণব ভোর কীর্তন গায়। পথের ধারে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, কুর্চি, কনকচাঁপা। সবচেয়ে বেশি সোঁদালের হলুদ, মে ফ্লাওয়ারের গোলাপী, লাল শিরিষের রক্তিমা। বিকেলের গান বাজনা, কবিতার আসর, নিখাদ আড্ডা, মালঞ্চনিবাসের অঙ্গনে রবীন্দ্রসঙ্গীতের আসর হ্যাজাকবাতির আলোয়, অনেক দূরে বড়মুড়া পাহাড়ের রেখা ধরে নেমে আসে সন্ধ্যা।

~~~

"হায় রে কবে চলে গেছে কালিদাসের কাল "--না বোধহয়। গেল বছর নববর্ষের সকালে ছিলাম তো আগরতলায়। সত্য বিজন তেওয়ারী (সতব্রত ভট্টাচার্য, বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী, সরযূ তেওয়ারী - তিন হরিহরাত্মা, সে যুগের আগরতলার যেকোন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে এই তিনজন ছিলেন অপরিহার্য) উপস্থিত ছিলেন না কিন্তু রবীন্দ্র পরিষদ জনাকীর্ণ দেখলাম। যাই যাই করেও সব যায় না।

সেই প্রভাতে কিছু পুরনো মুখ হারিয়ে যায়, কিছু নতুন মুখ আসে। তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি।

বৈশাখ এরকমই নূতন হয়ে দেখা দিচ্ছে, সে কতদিন হয়ে গেল, বারবার।

504 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: খাতাঞ্চী

Re: নববর্ষের এলোমেলো লেখা আর আগরতলার গল্প

.
Avatar: i

Re: নববর্ষের এলোমেলো লেখা আর আগরতলার গল্প

এই সব লেখাপত্র যেন শান্তিজল-
Avatar: Ela

Re: নববর্ষের এলোমেলো লেখা আর আগরতলার গল্প

আহা বসেছিলাম কবে আপনি লিখবেন!
Avatar: দ

Re: নববর্ষের এলোমেলো লেখা আর আগরতলার গল্প

আহা তিতার ডাইল, আম ডাইল, সইজনাফুলের বড়া নিমপাতা ভাzI এইসবই চৈত্র বৈশাখে খেতে হয়।
Avatar: শিবাংশু

Re: নববর্ষের এলোমেলো লেখা আর আগরতলার গল্প

অক্ষরের স্বস্তিভাষ, জুড়িয়ে দেয়...
Avatar: de

Re: নববর্ষের এলোমেলো লেখা আর আগরতলার গল্প

কি সুন্দর!
Avatar: শঙ্খ

Re: নববর্ষের এলোমেলো লেখা আর আগরতলার গল্প

বাহ, খুব সুন্দর। মনকাড়া লেখা
Avatar: দ

Re: নববর্ষের এলোমেলো লেখা আর আগরতলার গল্প

পড়ে শেষ করলাম। ভারী চমৎকার। বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয় (যটা এই ফেসবুক করে করে গোল্লায় যেতে বসেছে)।


Avatar:  দ

Re: নববর্ষের এলোমেলো লেখা আর আগরতলার গল্প

ধুত এটা এই ব্লগের না। ইগনোর ইগনোর


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন