Arijit Guha RSS feed

Arijit Guhaএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • মিঞা কবিতা এবং আসামের বীভৎস মজা
    আসামের নাগরিকপঞ্জি নিয়ে কী বীভৎস মজা চলছে, কাল তিস্তা শেতলবাদের লেখা ( https://www.telegrap...
  • সেলিব্রিটির প্রতি ভালোবাসা
    নিউজফিড ঘাঁটতে ঘাঁটতে বর্তমানের ফেমাস সিঙ্গার, মেয়েদের ক্রাশ মাঈনুল আহসান নোবেলের একটা ছবি হঠাৎ সামনে চলে এলো। ছবিটা দেখামাত্র আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একটা শিহরণ বয়ে গেল। ইউরেকা! পেয়েছি! আমার জীবনসঙ্গী,আমার বাচ্চার বাপ, আমার নাতি-পুতির দাদা। সেই ...
  • ভ্যান গগ ও একটি কুৎসিত তৈলচিত্র
    রঙ! শব্দটা শুনলে একটা অদ্ভুত অনুভূতি জাগে মনে। হঠাৎ যেন মনে হয় কেউ এক মুঠো লাল - হলুদ আবির ছড়িয়ে দিল হাওয়ায়। রঙ শুনলে আমার কেন জানি মনে হয়, একটা ক্যানভাসে খুব পাৎলা করে কেউ ক্রিমসন রেডের একটা শেডের উপরে ক্রোম ইয়োলোর এক পোঁচ ভেজা রঙ লাগিয়েছে। আপনাদের কি ...
  • সম্রাট ও সারমেয়
    একটি খুব স্নেহের মেয়ে, বিদেশে পড়াশুনো করছে, সূর্যের নীচে সবকিছু ভালোর জন্যই ওর গভীর ভালবাসা। মাঝে মাঝে পাগলামি করে বটে,আবার শুধরে নেওয়ায় কোন অনীহা নেই।আমার খুব পছন্দের মানুষ !সে একদিন লিখলো ইসলামে কুকুর নাপাক জীব। এইটাতে সে ভয়ানক খাপ্পা, কারণ কুকুর তার ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৬
    চিংড়ির হলুদ গালা ঝোলকোলাপোতা গ্রামটার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কপোতাক্ষ। এছাড়া চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে খাল বিল পুকুর। সবুজ জংলা ঝোপের পাশে সন্ধ্যামণি ফুল। হেলেঞ্চার লতা। উঠোনের কোন ঘেঁষে কাঠ চাঁপা। পঞ্চমুখী জবা। সদরের মুখটায় শিউলি। সাদা আঁচলের মতো পড়ে থাকে ...
  • যৌন শিক্ষা মহাপাপ...
    কিছুদিন ধরে হুট করেই যেন ধর্ষণের খবর খুব বেশি পাওয়া যাচ্ছে। যেন হুট করে কোন বিষাক্ত পোকার কামড়ে পাগলা কুকুরের মত হয়ে গেছে কিছু মানুষ। নিজের খিদে মিটাতে শিশু বৃদ্ধ বাছ বিচার করারও সময় নাই, হামলে পড়ছে শুধু। যদি বিষাক্ত পোকার কামড়ে হত তাহলে এই সমস্যার সমাধান ...
  • ইতিহাসবিদ সব্যসাচী ভট্টাচার্য
    আধুনিক ভারতের ইতিহাস চর্চায় সব্যসাচী ভট্টাচার্য এক উল্লেখযোগ্য নাম। গবেষক লেখক শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে তাঁর অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সবসাচীবাবুর বিদ্যালয় শিক্ষা বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট হাই স্কুলে। তারপর পড়তে আসেন প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগে। ...
  • পাগল
    বিয়ের আগে শুনেছিলাম আজহারের রাজপ্রাসাদের মতো বিশাল বড় বাড়ি! তার ফুপু বিয়ে ঠিকঠাক ‌হবার পর আমাকে গর্বের সাথে বলেছিলেন, "কয়েক একর জায়গা নিয়ে আমাদের বিশাল বড় জমিদার বাড়ি আছে। অমুক জমিদারের খাস বাড়ি ছিল সেইটা। আজহারের চাচা কিনে নিয়েছিলেন।"সেইসব ...
  • অশোক দাশগুপ্ত
    তোষক আশগুপ্ত নাম দিয়ে গুরুতেই বছর দশেক আগে একটা ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখেছিলাম। এটা তার দোষস্খালন বলে ধরা যেতে পারে, কিন্তু দোষ কিছু করিনি ধর্মাবতার।ব্যাপারটা এই ২০১৭ সালে বসে বোঝা খুব শক্ত, কিন্ত ১৯৯২ সালে সুমন এসে বাঙলা গানের যে ওলটপালট করেছিলেন, ঠিক সেইরকম ...
  • অধিকার এবং প্রতিহিংসা
    সল্ট লেকে পূর্ত ভবনের পাশের রাস্তাটায় এমনিতেই আলো খুব কম। রাস্তাটাও খুব ছোট। তার মধ্যেই ব্যানার হাতে একটা মিছিল ভরাট আওয়াজে এ মোড় থেকে ও মোড় যাচ্ছে - আমাদের ন্যায্য দাবী মানতে হবে, প্রতিহিংসার ট্রান্সফার মানছি না, মানব না। এই শহরের উপকন্ঠে অভিনীত হয়ে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মহাভারতে উদারতার আত্তীকরণ

Arijit Guha

চন্দ্রবংশজাত বিখ্যাত রাজা পুরুরবার পুত্র ছিল আয়ু। আয়ু হয়ত তত বিখ্যাত হতেন না, যদি না তিনি এক বিখ্যাত পুত্রসন্তানের জন্ম দিতেন। পুরাণে মহারাজ আয়ুকে সাধারণত ত্রিভুবন জয়ী রাজা নহুশের পিতা হিসেবেই দেখা হয়। পুত্রের পরিচয়য়েই মহারাজ আয়ু বিখ্যাত। নহুশের জন্মকাহিনী অনেকটা পুরনো দিনের হিন্দি সিনেমার মত। আয়ু ও ইন্দুমতীর কিছুতেই সন্তান জন্মাচ্ছে না। এক মুনির আশীর্বাদে একটি স্বর্গীয় ফল ইন্দুমতী খাওয়ার পর তিনি গর্ভধারণ করেন। এক দৈত্য দৈববলে জানতে পারে আয়ু আর ইন্দুমতীর যে পুত্র জন্মাবে তার হাতেই সেই দৈত্যের মৃত্যু ঘটবে। এই জন্য সেই দৈত্য ষড়যন্ত্র করে সদ্যোজাত পুত্র নহুশকে হরণ করে নিয়ে এলো। এরপর পাচকের হাতে সেই পুত্রকে দিয়ে বলল কেটে রান্না করে দিতে। কিন্তু শিশুর সেই সুন্দর মুখখানা দেখে পাচক আর শিশুপুত্রটিকে হত্যা করতে পারল না। এক হরিণ শিশু মেরে এনে তার মাংস দৈত্যরাজকে রান্না করে দিয়ে শিশুটিকে এক সহকারীর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিল দূরে কোথাও। সেই সহকারী এসে হাজির হল বশিষ্ট মুনির আশ্রমে। সেখানেই মানুষ হতে থাকল নহুশ। শুধু সিনেমা কেন, বহু পুরাণেও এরকম অনেক গল্প রয়েছে। গ্রীক পুরাণের রাজা অয়দিপাউসের গল্পই অনেকটা এরকম। যদিও সেখানে অয়দিপাউসের হাতে তাঁর পিতার মৃত্যু হবে লেখা ছিল। সেই কারণে অয়দিপাউসের পিতা অয়দিপাউসকে হত্যা করতে চায়।
তা এই নহুশ বশিষ্ট্যের আশ্রমে বড় হতে হতেই একদিন যখন বনে গেছে বশিষ্ট্যর জন্য ফলমূল সংগ্রহ করতে, ঘটনাক্রমে তখন সেই বনে সেই দৈত্যরাজও উপস্থিত। দুজনের মুখোমুখি সংঘর্ষ আর দৈত্যরাজের ললাটলিখন অনুযায়ী নহুশের হাতে মৃত্যু। নহুশ বেড়ে উঠতে থাকে বশিষ্ট্যের আশ্রমে। বড় হয়ে নহুশ সত্যনিষ্ঠা এবং ন্যায় ও নীতির পথে থেকে অনেক নাম করলেন। বিশাল ভুখন্ডের রাজাও হলেন। ঠিক এই সময়ে স্বর্গে ইন্দ্রের হাতে এক অন্যায় ঘটে গেল। স্বর্গের দেবতাদের শত্রু বৃত্রাসুর সদ্য সদ্য ইন্দ্রের হাতে মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু এই হত্যার জন্য ইন্দ্রকে অনেক ছলনার আশ্রয় নিতে হয়েছে। বৃত্রাসুরের হত্যার পর সেই কলঙ্ক মাথায় নিয়ে ইন্দ্র মর্ত্যে নেমে আসেন এবং আত্মগোপনে চলে যান। স্বর্গের দেবতাদের মাথায় হাত। স্বর্গে কোনো রাজা নেই। কি করা যায়! সব দেবতা সব ব্রাহ্মণরা মিলে ঠিক করল মর্ত্যের বিখ্যাত রাজা নহুশকে অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও স্বর্গের ভার নেওয়ার অনুরোধ করবে। নহুশ অনুরোধ পেয়ে রাজি হয়ে গেলেন। বসলেন ইন্দ্রের আসন। স্বর্গের রাজা হয়েই নহুশ গেলেন পালটে। স্বেচ্ছাচারিতা আর যত রকমের পাপ কাজ আছে সমস্ত কিছুতে ডুবে গেলেন। ইন্দ্রের স্ত্রীকে পর্যন্ত তিনি কামনা করলেন। অবশেষে অগস্ত্য মুনির মাথায় পদাঘাত করে স্বর্গচ্যুত হলেন। ব্রাহ্মণদের দ্বারা অভিশপ্ত হয়ে এক বিশাল সর্পের রূপ ধারণ করে বনের মধ্যে পড়ে রইলেন। এই সর্প বা নাগজাতির উল্লেখ পুরাণ মহাভারতে নানা জায়গায় বিভিন্ন সময়ে এসেছে। সম্ভবত অনার্য কোনো জাতি হবে এই নাগজাতি। তবে অনার্য হলেও এরা নিম্নশ্রেণীর ছিল না। বিভিন্ন সময়ে আর্যদের সাথে এদের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন হয়েছে। যেমন নাগরাজ কৌরব্যর কন্যা উলুপি, যার সাথে অর্জুনের বিবাহ হয়। সমুদ্রমন্থনের সময় আবার নাগরাজ বাসুকি মন্দার পর্বতকে পেচিয়ে দেবতা ও অসুরদের সমুদ্রমন্থন করতে সাহায্য করেন। অর্থাৎ নাগরা আর্য ও অনার্যদের মাঝামাঝি কোনো শ্রেনী ছিল বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। আবার নাগদের সাথে আর্যদের লড়াই সময় বিশেষে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হরিবংশে কৃষ্ণের কালিয়দমনের কথা রয়েছে। কালীয় নাগের জন্য যমুনার জল কেউ স্পর্শ করতে পারত না। অর্থাৎ বৃন্দাবনের ওই অংশটা ছিল নাগেদের অধিকৃত। বাইরের কারো প্রবেশ নিষেধ ছিল ওই অঞ্চলে। কৃষ্ণের নেতৃত্বে সেই কালীয় নাগেদের গোত্রকে উচ্ছেদ করে ওই জায়গায় যাদবদের দখলদারী সম্পন্ন হয়। হরিবংশের লম্পট কৃষ্ণের মহাভারতের ডিপ্লোম্যাট কৃষ্ণ হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কারণ সম্ভবত ওই যদুবংশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বারেবারে উচ্ছেদ হওয়া। তারা কোথাও একটা থিতু হতে চাইছিল। যদিও কৃষ্ণের ভূমিকা প্রথমে ছিল দূত হিসেবে যুদ্ধ থামানোর, কিন্তু যুদ্ধে জড়িয়ে পড়াটা হয়ত অবধারিতই ছিল কৃষ্ণের কাছে।
মহাভারতে নাগেদের সাথে সংঘর্ষের প্রথম প্রকাশ আমরা পাই খাণ্ডবদাহন পর্বাধ্যায়ে। খাণ্ডব বন দাহ করার সময়ে বিভিন্ন রকম পশুপাখীর সাথে তক্ষক নাগেরাও উৎখাত হচ্ছে খাণ্ডব বন থেকে। ডি ডি কোশাম্বির মতে মহাভারতের সময়ে নাগরা অরণ্যবাসী অনার্য জনজাতির নাগরা প্রায় সমীকৃত হয়ে গেছে। সম্ভবত এরা সর্পাকৃতির কোনো টোটেম ব্যবহার করত বা পূজা করত। বিভিন্ন পশু পাখীরা ছিল বিভিন্ন শ্রেনীর অনার্য মানুষদের গোত্রের রূপক। ইরাবতী কার্ভের মতে এই লড়াইটা আর্যদের ভূমি দখলের লড়াই। পশ্চিমাঞ্চল থেকে গাঙ্গেয় অববাহিকায় তখন আর্যরা বিস্তার লাভ করছে। সেই সময়ে তাঁদের নতুন নতুন অঞ্চল অধিকার করতে হবে। কাজেই খাণ্ডববনে যেসব অনার্য গোষ্ঠির লোকেরা ছিল তাঁদের সাথে পাণ্ডবদের লেগে গেল ভীষণ লড়াই। নাগরা খাণ্ডববন থেকে সেই যে উৎখাত হল, এরপর তারা প্রতিশোধ গ্রহণ করল অর্জুনের নাতি পরীক্ষীতের দংশনের মধ্যে দিয়ে। এরপর পরীক্ষীতের সন্তান জনমেজয় তক্ষশীলা অভিযান করেছেন। তক্ষকের সাথে তক্ষশীলা নামের মিলটা লক্ষ্যণীয়। তারপর সর্পযজ্ঞ করে লক্ষ লক্ষ সাপের মৃত্যুর কারন হয়েছে জনমেজয়। অর্থাৎ যে বিরোধিতা শুরু হয়েছিল খাণ্ডববন দাহনের মধ্যে দিয়ে, তার রেশ চলতে থাকে পাণ্ডবদের মহাপ্রস্থানের পরও।

যাই হোক, এবার আসল প্রসঙ্গে আসি। নহুশ যখন স্বর্গ থেকে বিতারিত হলেন ব্রাহ্মণদের পদাঘাত করে, তাঁর সর্প অবস্থায় বনের মধ্যে অবস্থানের মাধ্যমে আমরা ধরে নিতে পারি নহুশের থেকে চন্দ্রবংশ আলাদা হয়ে গিয়ে কোনো এক সর্প বা নাগবংশের উৎপত্তি হয়েছে। নহুশের ওপর অভিশাপ ছিল তারই কোনো এক উত্তরপুরুষ এসে তাকে অভিশাপ থেকে মুক্তি দেবে। সেই উত্তরপুরুষের নাম যুধিষ্ঠির। যদিও পাণ্ডবরা নাগবংশীয় নয়, কিন্তু লতায় পাতায় চন্দ্রবংশের সাথে অর্থাৎ নহুশের আদি বংশের সাথে তাঁদের সম্পর্ক ছিল।
মহাভারতের বনপর্বে অর্জুন মহাদেবের কাছ থেকে পাশুপত অস্ত্র পেয়ে স্বর্গ ঘুরে ফিরে এসেছেন পাণ্ডবদের কাছে। সেই সময়ে একদিন ভীম বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে এক বিরাট সাপের পাল্লায় পড়েন। কিছুতেই সেই বিরাট সাপের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে না পেরে যখন ভীম অবাক হয়ে ভাবছেন কার পাল্লায় পড়ল, সেই সময়ে যুধিষ্ঠির এসে ভীমের ওই অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। যুধিষ্ঠির সেই বিশাল সাপকে জিজ্ঞাসা করেন আপনি কে? মধ্যম পাণ্ডবকে এভাবে ধরে রেখেছেন কেন? তখন জবাবে সেই সাপ বলে আমি নহুশ। ব্রাহ্মণদের অভিশাপে আমি এই সর্পরূপ ধারণ করে রয়েছি। তুমি যদি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও তাহলে তোমার ভাইকে আমি ছেড়ে দেব। (এই প্রশ্ন উত্তরের পালা ভারতবর্ষের এক প্রাচীন রীতি। শুধু নহুশের সাথে যুধিষ্ঠিরের নয়, যক্ষের সাথে যুধিষ্ঠির এবং ঋষি যাজ্ঞবল্কের সাথে গার্গীর যে তর্কের পরম্পরা আমরা দেখেছি তাতে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে যায় প্রাচীন ভারতবর্ষে তর্কের যথেষ্ট পরিসর ছিল। তর্কের এই পরিসরই অমর্ত্য সেনের মতে ভারতবর্ষে গনতন্ত্রের শিকড়কে গভীরে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন করলেই দেশদ্রোহী আখ্যা দেওয়া হালের ফ্যাশন)।
নহুশ তখন যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করেন ব্রাহ্মণ কাকে বলে? এই প্রশ্ন নিয়ে যুধিষ্ঠিরের সাথে নহুশের এক দীর্ঘ তর্কালাপ চলে। যুধিষ্ঠির বলেন যিনি সৎ কার্য করেন, যিনি সৎভাবে জীবন যাপন করেন, যিনি ক্ষমা করতে জানেন, যাঁর চারিত্রিক বল দৃঢ়, যিনি তপস্যা করেন এবং যাঁর মধ্যে দয়া রয়েছে, তিনিই ব্রাহ্মণ। এই সর্পরূপী নহুশ সম্ভবত তাদের পূর্ব পুরুষ নহুশেরই কোনো এক বংশধর যারা গভীর অরণ্যে বাস করে। চন্দ্রবংশ থেকে এরা উৎখাত হয় ব্রাহ্মণদেরই অভিশাপে। অর্থাৎ তাদের পূর্বপুরুষকে জাতিচ্যুত করা হয়। সেই কারণেই ব্রাহ্মণ কারা এই প্রশ্ন তাদের মধ্যে যুগ যুগ ধরে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
যুধিষ্ঠিরের উত্তর শুনে নহুশ তখন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন তার মানে এই সব আচার যে কেউ পালন করলেই তিনি ব্রাহ্মণ হয়ে যাবেন? বংশ পরম্পরার কোনো ব্যাপার নেই? মহাভারতের সব থেকে কৌতুহল উদ্দীপক অংশ হচ্ছে এটাই৷ এই প্রশ্নের মাধ্যমে যুধিষ্ঠির বলে দিচ্ছেন ব্রাহ্মণত্য কোন পুরুষানুক্রমিক ব্যাপার নয়। অনার্য শ্রেনীও আচার আচরণ পালন করার মাধ্যমে ব্রাহ্মণত্যে উত্তীর্ণ হতে পারে। মনুর স্থির করে দেওয়া আচরণের মাধ্যমে যেখানে কঠোরভাবে বর্ণভেদ প্রথাকে মান্য করার কথা বলা হয়, মহাভারতের এই জায়গায় সেই বর্ণবাদের সাথে বিরোধ দেখা দিচ্ছে।
যুধিষ্ঠির আরো বলেন, আমি যে কথা বলি, যে শব্দ ব্যবহার করি, একজন শুদ্রও সেই একই কথা বলে একই শব্দ ব্যবহার করে। তাহলে পার্থক্য কোথায়। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য শুদ্র সবার মধ্যে যে প্রথায় মৈথুন চলে সেই প্রথাকে আলাদা করা কি কোনোভাবে সম্ভব? বাক্য মৈথুন জন্ম মরণ সবার একই প্রথায় ঘটে থাকে। 'বাঙমৈথুনমথো জন্ম মরনঞ্চ সমং নৃণাম'। শুদ্ধ জাতি বলে আসলে কিছু হয় না। একটাও এরকম জাতি দেখানো যাবে না যেখানে রক্তের মিশ্রণ ঘটে নি। একমাত্র মৈথুনের মাধ্যমে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য শুদ্রের রক্ত এমনভাবে মিশে গেছে যে শুদ্ধ ব্রাহ্মণ বা শুদ্ধ শুদ্র খুঁজে বের করা কখনোই সম্ভব নয়।

মহাভারতের অনেক প্রক্ষিপ্ত অংশ রয়েছে। সম্ভবত একটা সম্ভাবনা রয়েছে বৌদ্ধ ধর্ম মহাভারতের বেশ কিছু প্রক্ষিপ্ত অংশকে প্রভাবিত করেছে। এই অংশটাকেও প্রক্ষিপ্ত অংশ বলেই ধরা যেতে পারে। বৌদ্ধদের অবশ্য একটু নিচু নজরেই দেখা হয়েছে মহাভারতে। বেদের শিষ্য উতঙ্ক শিক্ষা সমাপন করে গুরু 'বেদ'কে গুরুদক্ষিণা দিতে চাইলে বেদ বলেন গুরুপত্নীকে জিজ্ঞাসা করতে তাঁর কী চাই। গুরুপত্নী তখন রাজা পৌষ্যের পত্নীর কুন্ডল চেয়ে বসেন। কুন্ডল নিয়ে আসার পথে খুব সতর্ক হয়ে রাস্তায় চলতে হয় উতঙ্ককে, কারণ তিনি জানতেন তক্ষকের লোভ রয়েছে এই কুন্ডলের ওপর। উল্লেখ্য যে উতঙ্কর আরেক সহপাঠীর নাম ছিল জনমেজয়। তো এখানেও নাগেদের সাথে শত্রুতা দেখানো হয়েছে। এবার যখন উতঙ্ক কুন্ডল নিয়ে পথ ধরে হেটে আসছেন, লক্ষ্য করে দেখলেন এক নগ্ন ক্ষপনক অর্থাৎ দিগম্বর সাধু বিশেষ পেছন পেছন হেটে আসছে। এই ক্ষপণক আসলে বৌদ্ধ। কুন্ডল রেখে উতঙ্ক নদীতে স্নান করতে নামতেই সেই ক্ষপণক তক্ষকের রূপ ধরে কুন্ডল চুরি করে নিয়ে চলে যায় পাতালে তক্ষকদের রাজত্বে৷ অর্থাৎ বৌদ্ধদের এখানে দেখানো হল চৌর্যবৃত্তির প্রতিভু হিসেবে। তা সত্ত্বেও বৌদ্ধদের মধ্যের যে উদার সংস্কৃতি সেটা অন্তর্ভুক্ত করতে মহাভার‍তের কোনো সমস্যা হয় নি। বৌদ্ধ ধর্মের উদারতা, মানুষকে ছোট বড়তে ভাগ না করা এগুলো গ্রহণ করতে মহাভারতের কোনো অসুবিধাই হয় নি।

তথ্যসূত্র- দেবতার মানবায়ন(নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী), কথা অমৃতসমান(নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী), মহাভারত(রাজশেখর বসু), yuganta(Iravati Karve), The Argumentative Indian(Amartya Sen)

199 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন