Rouhin Banerjee RSS feed

Rouhin Banerjeeএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • দক্ষিণের কড়চা
    গরু বাগদির মর্মরহস্য➡️মাঝে কেবল একটি একক বাঁশের সাঁকো। তার দোসর আরেকটি ধরার বাঁশ লম্বালম্বি। সাঁকোর নিচে অতিদূর জ্বরের মতো পাতলা একটি খাল নিজের গায়ে কচুরিপানার চাদর জড়িয়ে রুগ্ন বহুকাল। খালটি জলনিকাশির। ঘোর বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে পচা লাশের মতো। যেহেতু এই ...
  • বাংলায় এনআরসি ?
    বাংলায় শেষমেস এনআরসি হবে, না হবে না, জানি না। তবে গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আজ ব্লক অফিসে গেছিলাম। দেখে তাজ্জব! এত এত মানু্ষের রেশন কার্ডে ভুল! কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম প্রায় সবার ভোটারেও ভুল। সব আইকার্ড নির্ভুল আছে এমন ...
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...
  • খানাকুল - ২
    [এর আগে - https://www.guruchan...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

নানা রঙের দিনগুলিঃঃ ঝটিকা সফরে অসম

Rouhin Banerjee

এটা আরো আগে লেখা যেত, আরো পরেও কোন সময়ে লেখা যেত - সত্যি বলতে কি, আদৌ না লিখলেও হত। কারণ এটা নেহাৎই একটা ব্যক্তিগত গপ্প। তবুও লিখছি - গেছোদাদা, মারিয়া আর পাই এর চক্করে। মূল গপ্পটা খুব ছোট, তাই একটু ভূমিকা টুমিকার গোঁজামিল দিয়ে বড় করতেই হচ্ছে আর কি।

সময়টা ২০০৯। আমি তখন একটা বীমা কোম্পানিতে অপারেশনস ম্যানেজারের কাজ করতাম। এখানে একটু এই কাজের বিষয়টা সামান্য বিস্তার করি - ডাইনামিক্সগুলো বুঝতে। আমার ডেজিগনেশন ছিল "অ্যাসিস্টান্ট ব্রাঞ্চ সার্ভিস ম্যানেজার" বা এবিএসেম, যদিও ওই "অ্যাসিস্ট্যান্ট"টা কেন ছিল তার ব্যখ্যা আজও আমার কাছে স্পষ্ট নয়। বোধ করি ওটা না রাখলে কোম্পানির পার্কুইজিট বাবদ আমার পিছনে কিছু বাড়তি খচ্চা হত বলেই। তো আমি দেখতাম কলকাতা ২ রিজিয়ন - দক্ষিণ কলকাতা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগণা মিলিয়ে মোট ১৪ টা ব্রাঞ্চের অপারেশন। যারা ফিনান্স সেক্টরে কাজ করেছেন, তারা সবাই জানেন, যারা জানেন না, তাদের জন্য - এখানে কর্মীদের দুটি প্যারালাল ধারা - সেলস আর অপারেশনস, সুয়োরাণী আর দুয়োরাণী। সেলস অবশ্যই সুয়ো, কারণ সে বেওসা আনে, কোম্পানির হয়ে রেভিনিউ আর্ন করে, আর অপস হল দুয়ো - তাদের কাজ কাঠি করা। এই ডকুমেন্ট ঠিক নেই, সেই প্রসেস গণ্ডগোল, সই মিলছে না - এসব যত রাজ্যের বায়নাক্কা। অতএব অপস যে ভিলেন, এতে সন্দেহ কি?

আমার এক সহকর্মী ছিল উজ্জ্বল মিত্র - সে কথায় কথায় বলত - " কুমীরের চোয়াল, দরমার দেয়াল আর বড়লোকের খেয়াল - এর কোনটারই কোন ভরসা নেই"। তো সেই কথারই ডেমো দিতে আমাদের বসের বস এর (ইস্ট জোনাল হেড) মনে হল, সেলসের লোকেরা বড্ডই ফাঁকি দিচ্ছে, এদের পিছনে একটু পুলিশগিরি করা দরকার। কে করবে? ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো - এ বি এস এম রা তো আছেই। এই টিকটিকিগিরির গালভরা নাম হল "সেলস অডিট" - গোটা পঁচিশেক চেক পয়েন্ট ধরে ধরে কমপ্লায়েন্স দেখতে হবে। কিন্তু ট্রিকটা হল, নিজের বা আশেপাশের রিজিয়নে সব বন্ধু বন্ধু - অতএব দূরের রিজিয়নে যাও। আমরা দেখলাম এ মন্দ নয়, অফিসের পয়সায় বেশ ঘোরাঘুরি হয়ে যায়।

এই চক্করেই সেই ২০০৯ সনের এপ্রিল মাসে (তারীখ মনে পড়ছে না) আমি চললাম বঙ্গাইগাঁও রিজিয়ন অডিট করতে। বঙ্গাইগাঁও, পাঠশালা, বরপেটা, বরপেটা রোড, কোকরাঝাড়, বিলাসিপারা, ধুবুরি, তুরা (মেঘালয়) এবং গোয়ালপারা - মোট ন'টি ব্রাঞ্চ - আমার হাতে একটি রবিবার সহ দশদিন সময়। নর্থ-ইস্টে যাতায়াতের জন্য কোম্পানি ফ্লাইটের খরচা দিত তখন (পরে কাটছাঁট হয়েছিল), কিন্তু ট্রাভেল ডেস্কের খরচাটা বাঁচাত - টিকিট আমাদের নিজেদের কাটতে হত - পরে সেই টিকিটসহ বিল করলে টাকা রি-ইমবার্স হয়ে যেত। তো তখন একসাথে অনেকগুলো টাকা চলে যাবে আর ওদিকে আসাম, মেঘালয় একটু ঘুরে দেখারও শখ কাজের ফাঁকে, তাই যাবার সময়ে ট্রেন, ফেরাটা ফ্লাইট - এরম ব্যবস্থা করা গেল। ট্রেন মানে সরাইঘাট এক্সপ্রেস - শিলিগুড়ি বাদে নর্থ বেঙ্গল বা নর্থ ইস্টের যে কোন জায়গায় যেতে এখনো ওটাই সেরা ট্রেন আমার মতে। রবিবার দুপুরে চড়ে সোমবার বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ পৌঁছান গেল বঙ্গাইগাওঁ। হোটেলে চেক ইন করে, স্নান খাওয়া সেরে অফিস ঢুকলাম একটা নাগাদ।

যে ন'টা ব্রাঞ্চের নাম করলাম, বঙ্গাইগাওঁ তাদের রিজিওনাল অফিস, রিজিওনাল ম্যানেজারও এখানেই বসেন, তাকে রিপোর্ট করতে হবে। ভদ্রলোক বাঙালি, আমার সঙ্গে বেশ খোশমেজাজেই আলাপ সারলেন, ওখানকার ব্রাঞ্চ ম্যানেজারকেও ডেকে আলাপ করিয়ে দিলেন। তারপর ব্রাঞ্চ অডিটের পালা। যদিও বুঝতে পারছি এসব কচকচি একটু বেশীই হয়ে যাচ্ছে, তবুও এটা একটু বলি। আগেই বলেছি যে এটা ইন্টারনাল অডিট, আমাদের জোনাল হেডের মস্তিষ্কপ্রসূত। তাতে মোট পঁচিশটি অডিট পয়েনট চেক করতে হবে। কিন্তু আমরা ট্রেনিং এর সময়েই বুঝে নিয়েছিলাম কার্যতঃ ১০টা পয়েন্ট ঠিকঠাক মিলিয়ে নিতে পারলেই বাকি পয়েন্টগুলি লজিকালি ডিডাক্ট করে নেওয়া যায় (অবশ্যই এটা ট্রেনার বা জেড বি এইচ বা সেলসের লোকেদের জানানোর প্রশ্নই ওঠে না - অপস ক্লাসিফায়েড নলেজ)। ফলে পুরো অডিটটা করতে মেরেকেটে দু ঘন্টার বেশী লাগে না। বঙ্গাইগাওঁ এর অডিট সারা হয়ে গেল সাড়ে চারটের মধ্যে - বিশেষ নন কমপ্লায়েন্স নেই, আর এম, বি এম দুজনেই খুশী। আমরা তিনজনে চললাম মদ খেতে।

মদ তো শুধু খাওয়া যায় না ; তার সাথে দু ধরণের অনুপান লাগে। প্রথমতঃ চাট, বড় বড় জায়গায় বলে স্ন্যাক্স, আর দ্বিতীয়তঃ আড্ডা। এটাও অনেক সময়ে চাটে পরিণত হয় বটে কোন কোন দুর্ভাগার জন্য - কিন্তু সেদিন তো আমাদের সবারই বৃহস্পতি তুঙ্গে - শুক্র কোথায় বলতে পারব না অবশ্য। অতএব আমার পুরো হপ্তার টুর প্ল্যান করতে বসা গেল। দেখা গেল এই গতিতে পাঠশালা, বরপেটা আর বরপেটা রোড একদিনেই করে ফেলা সম্ভব। ওদিকে বিলাসিপারা আর ধুবড়িও তাই। ফলে তিনদিন বেঁচে যাচ্ছে, সাথে একটা রবিবার - দিন চারেক আমি ফ্রী - কাজিরাঙা বা মানস (খুবই কাছে) ঘুরে নেওয়াই যায়। তুরায় (মেঘালয়) একদিন এক্সট্রা থেকে যাবারও পরামর্শ দিলেন আর এম। এবং আগেকার দিনের উপন্যাসে যেমন লেখা থাকত - "বিধাতা আড়াল হইতে হাসিলেন"।

পরদিন বাসে পাঠশালা, সেখান থেকে বরপেটা, বাইকে বরপেটা রোড সেরে ট্রেন ধরে আবার বঙ্গাইগাওঁ। ওই রিজিয়নের এবিএসেম দুশ্মন্ত বড়ুয়া, আমাদের দুশী ভাই তখন আমার রিজিয়নে অডিট করছে - ক্যানিং ঘুরে এসে কেলিয়ে পড়েছে - ওদিকে আমার চারখানা ব্রাঞ্চ সারা। দুশী খচেমচে বলল " আসামমে ইতনা আসান নেহি হোতা হ্যায় বাবু - বনধ হোনে সে মুশকিল মে পড় যায়েগা"। আমি ভাবছি শালা শকুনের অভিশাপে গরু মরে না। তুমি বেটা হিংসুটে মাতাল জ্বলে মরো, আমায় মানস ডাকছে। পরেরদিন কোকরাঝাড়ও সেরে চলে আসা গেল - পুরো ক্রিস গেলের মত ব্যাটিং - আস্কিং রেট সাতদিনে চারটে। বুড়া লুই আমায় ডাকছে।

খেলা ঘুরল সেদিন রাতেই। কোকরাঝাড় থেকে ফেরার কিছুক্ষণ পরেই গুয়াহাটির এবিএসেম প্রীতমের ফোন - "আপ বঙাইগাওঁ (অসমীয়ারা এটাই উচ্চারণ করেন) আ গয়ে?" আমি বললাম এসে গেছি, ফ্রেশও হয়ে গেছি। প্রীতম বলল "চলো আচ্ছা হুয়া - ইধার আসু নে বনধ ডিক্লেয়ার কিয়া - কাল বাহার মাত নিকলনা। বাঙালি লোগোঁকো দেখনে সে ইয়ে লোগ অওর চড় যাতে হ্যায়"। বেশ ভাল কথা - তাহলে পরের দিনটা গেল। হোটেলে শুয়ে বসে, সিগারেট পুড়িয়ে আর টিভি দেখে সময় আর কাটেনা। তখনও ফোন এত স্মার্ট হয়নি - ফেবু টেবু করা মহা দিকদারী। বিকালের দিকে একটু ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে চলেও এলাম - সিগারেট কিনতে হতই। তেমন কিছু বিপদ হল না - সিগারেটের দুতিনটে দোকান খোলাই ছিল। একটা সিডির দোকানও খোলা পেয়ে গোটা তিন চার নিয়ে আসলাম - সিনেমা দেখে যদি কিছুটা সময় কাটে ভেবে।

বনধ পরদিনও চলল, তার পরের দিনও। আমার কষ্ট করে জমানো তিনটে দিন হোটেলেই কেটে গেল - মানস হারিয়ে গেল মানসপট থেকে। পরদিন রবিবার - কাজ হবে না। এবারে টেনশন শুরু। চারটে ব্রাঞ্চ বাকি - চারটেই দূরের। বিলাসিপারা, ধুবুরি, তুরা আর গোয়ালপারা। এদিকে হাতে আছে মেরেকেটে আড়াই দিন - বুধবার বিকেল তিনটে কুড়িতে গুয়াহাটি থেকে ফেরার ফ্লাইট। কিন্তু কাহিনী তখনো বাকি ছিল। সোমবারে পালটা বন্ধ ডাকল বোড়োল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট। এদিকে এরা নাকি সরকারের শরিক দল!! সব মিলিয়ে টানা পাঁচদিন গোটা অঞ্চল স্তব্ধ! ওদিক থেকে দুশিভাই আমায় স্বান্তনা দিচ্ছে - আসামমে অ্যায়সাই চলতা হ্যায় ভাই - টেনশন মাত লে। ফ্লাইট টিকেট ক্যান্সেল করকে একদিন পিছে কর দে। আর আমি মনে মনে ওকে খিস্তাচ্ছি, আর এম কে খিস্তাচ্ছি, জেড বি এইচ কে খিস্তাচ্ছি। এবং খচে মচে ঠিক করলাম, বনধ অর নো বনধ, কাল আমি বেরোচ্ছিই। বঙ্গাইগাওঁ ব্রাঞ্চ ম্যানেজার লোকাল ছেলে, ওর সঙ্গে বসে পুরো রুট ম্যাপটা যতটা সম্ভব আত্মস্থ করার চেষ্টা করলাম সোমবার সারাদিন - কন্টিঞ্জেন্সি, খাবার ব্যবস্থা, জলের ব্যবস্থা, কোথা দিয়ে শুরু, কিভাবে যাওয়া, ইত্যাদি। সেই সঙ্গে চারটে ব্রাঞ্চের ম্যানেজারদের ফোন - আমার ঝটিকা সফর অনুযায়ী সময় অ্যাডজাস্ট করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে।

পরদিন মঙ্গলবার, ভোর পাঁচটা কুড়ির বাসে বঙ্গাইগাওঁ থেকে রওনা হলাম বিলাসিপারার উদ্দেশে। পথে পড়ে চম্পাবতী নদী - সে গিয়ে পড়েছে ব্রহ্মপুত্রে। চম্পাবতী পার হয়ে বিলাসিপারা পৌঁছাতে বাজল সাড়ে আটটা। ব্রাঞ্চ ম্যানেজার জানত সকাল সকাল আসব - তাই সেদিন তাড়াতাড়ি অফিস খুলে রেখেছিল। অডিট হল যথারীতি - ঝড়ের বেগে, তার মধ্যে প্রায় জবরদস্তি কিছু ব্রেকফাস্টও খাইয়ে দিল। বেরোলাম সাড়ে দশটা নাগাদ। এর পরের অংশটুকু সহজ - বিলাসিপারা থেকে ধুবুরি - ব্রহ্মপুত্রের পাড় ঘেঁষে আধ ঘন্টা চল্লিশ মিনিটের রাস্তা। এক সেলস ম্যানেজারের বাইকে এগারোটা পনেরোর মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ধুবুরি। এবারে আবার ঝড়। সাড়ে বারোটায় কাজ শেষ। তারপর লাঞ্চ। ধুবুরি ঘাটে গিয়ে একটা হোটেলে প্রচণ্ড ঝাল পাঁঠার ঝোল আর ভাত দিয়ে সুলাতে সুলাতে লাঞ্চ সেরে উঠে বসলাম বোটে। এবারে একেবারে বুড়ালুই এর বুকের ওপর।

প্রায় চল্লিশ মিনিট লাগলেও পরে জেনেছিলাম আমি নেহাৎই ব্রহ্মপুত্রের এপার ওপার করেছি। জল দুর্লভ, চড়ার মাঝে দিয়ে পথ খুঁজে খুঁজে এগিয়ে চলল বোট - ভটভটি। যে ঘাটে লাগাল তার নামটা ঠিক মনে নেই - সেখান থেকে খানিক দূরে গিয়ে ফুলবাড়ি বাজার। সেখানে সার দেওয়া টাটা সুমোরা তুরা তুরা হাঁকছে। চড়ে পড়া গেল তারই একটায় - জানলা না পেলেও ভাগ্যক্রমে সামনের সীটেই পড়ল আসন (ওখানে সুমোতেও সীট নম্বর দেওয়া টিকিট ছিল) - পথের দৃশ্য দেখতে কোন অসুবিধা হবে না।

শুরুতে খানিকটা সমতল, তারপর পাহাড়ে চড়া শুরু। গারো পাহাড়। তুরার উচ্চতা কত তা এখন আর মনে নেই - তবে ঠান্ডা লাগছিল বেশ এটা মনে আছে। কারণ তুরা পৌঁছাতে বাজল প্রায় সাড়ে সাতটা। যথারীতি এখানেও আমার অনুরোধে ব্রাঞ্চ খোলা ছিল - সেই রাতেই সেরে ফেলা গেল অডিট। বস্তুতঃ এখানেই সবচেয়ে মন দিয়ে অডিট করতে পেরেছিলাম, নিশ্চিন্তে। তারপর হোটেল, খাওয়া, ঘুম। আজ অবধি যত হোটেলে থেকেছি, এই রিকম্যান কন্টিনেন্টালে সম্ভবতঃ সংক্ষিপ্ততম সময় বাস।

পরদিন ভোর ছটায় রওনা - এবারে বাহন একটি টাটা উইঙ্গার। আগের দিন যে পথে এসেছিলাম, সে পথে না গিয়ে সম্পূর্ণ অন্য পথে নামতে লাগলাম। দু-তিনটে ঝর্ণা পড়ল পথে। তারপর পাহাড় শেষ - সমতল ধরে চলছি তো চলছি। গোয়ালপারা পৌঁছালাম সকাল সাড়ে নটা নাগাদ। আবার ঝড়ের বেগে অডিট। আশা করি আপনাদের মনে আছে, সেদিন বুধবার। বিকাল তিনটে কুড়িতে আমার ফ্লাইট গুয়াহাটি এয়ারপোর্ট থেকে ছাড়বে। আসামের ম্যাপটার দিকে একবার তাকালেই বুঝতে পারবেন, আই অ্যাম ততক্ষণে, যাকে বলে ইন ডীপ শীট।

ব্রাঞ্চ ম্যানেজার অডিট চলতে চলতেই একটা প্রাইভেট গাড়ি বুক করার জন্য লোক পাঠিয়েছিলেন। ভাগ্যিস। এবারে আর লাঞ্চ করার ঝুঁকি নিইনি - অডিট শেষ করেই গাড়িতে বসে দৌড়। ড্রাইভার সাহেব বললেন একটু খাবেন, আমি বললাম আপনি একটা বেলা উপোস দিন, আমি আপনাকে ভাড়ার ওপর বিরিয়ানি খাবার টাকা দেব, আপনি আগে পৌঁছে দিন। দিন বলা সহজ, করা অত সহজ নয় মোটেই। প্রায় ১২০ কিমি রাস্তা - বেশীটাই হাই ওয়ে যদিও, কিন্তু জ্যাম লেগেই থাকে। বিশেষ করে মালিগাওঁ থেকে। এদিকে হিসেব করছি, ড্রাইভারকে বিরিয়ানি + ভাড়ার টাকা দিয়ে আমার কাছে কত থাকবে - দমদম থেকে বাসে যেতে হবে কি না। কিন্তু কী আর করা।

অবশেষে যখন গুয়াহাটি এয়ারপোর্টে ঢুকলাম, তিনটে বাজতে দু মিনিট বাকি। আমি নিশ্চিত বোর্ডিং পাশ পাব না - রিপোর্টিং টাইম অনেক্ষণ পেরিয়ে গেছে, সম্ভবতঃ বোর্ডিং কল হয়ে গেছে। ক্যান্সেল করলে কত ফেরৎ দেবে? ট্রেনের টিকিট কাটা যাবে না ধার করতে হবে? এইসব সাত সতেরো ভাবছি আর দৌড়াচ্ছি - কী ঘোষণা হচ্ছে আর শোনাই হয়নি। শেষে ইন্ডিগোর কাউন্টারে গিয়ে জানা গেল, কলকাতার ফ্লাইট দু ঘন্টা ডিলেড - খারাপ আবহাওয়ার জন্য। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল যেন। আরো কিছুক্ষণ লাগল বোর্ডিং পাশ পেতে - তারপর চেক ইন। তখন গুয়াহাটি এয়ারপোর্টে স্মোকিং জোন ছিল, এখন আছে কি না জানিনা। সর্বাগ্রে সেখানে।

খারাপ আবহাওয়া হলে কী হয় সেটা টের পেয়েছিলাম সেবার প্লেনে বসে - কলকাতা আমাকে স্বাগত জানিয়েছিল কালবৈশাখী হাঁকিয়ে। কিন্তু সেটা অন্য গল্প, অন্য কোন দিন।

357 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: Rouhin Banerjee

Re: নানা রঙের দিনগুলিঃঃ ঝটিকা সফরে অসম

এইত্তো।

এইসব অফিস ট্যুরগুলো অধিকাংশ পাবলিকের জন্য খুবি চাপের হলেও আমাদের ক্যাটাগরির জন্য হেব্বি।
ধুবুরির লঞ্চঘাটের কাছের হোটেলগুলো খুব ভাল মাছ আর মাটন রান্না করে। ডিসি অফিসের উত্তরে প্রশান্তি ট্যুরিস্ট লজ, সরকারী, অনবদ্য রান্না।

জুলাই-সেপ্টেম্বর, তুরার আনারস, খুবি ভাল। বাকী সময় কলা।

আসামের নদীগুলোতে নৌকো করে ঘুরে বেড়াতে পারলে বেশ হত।

আর একটা কথা, এই বন্ধ টন্ধ কে বেশী পাত্তা না দিলেও চলে। চুপচাপ ভিড়ে মিশে যেদিক খুশি চলে যাও, কিচ্ছু হয় না। মানে গত তিনবছরে সেরকম কিছু দেখিনি।


Avatar: Rouhin Banerjee

Re: নানা রঙের দিনগুলিঃঃ ঝটিকা সফরে অসম

এটা গেছোদাদা ছিল। নাম এল না দেখলাম।
Avatar: Rouhin Banerjee

Re: নানা রঙের দিনগুলিঃঃ ঝটিকা সফরে অসম

আমার ব্লগে কেন যে এরকম হয় তা মামুই জানে। হাজারে হাজারে হাজরার মত হাজারে হাজারে রৌহিন 😶
Avatar: dd

Re: নানা রঙের দিনগুলিঃঃ ঝটিকা সফরে অসম

ভালো লাগলো পড়ে।
Avatar: গেছোদাদা

Re: নানা রঙের দিনগুলিঃঃ ঝটিকা সফরে অসম

রৌহিন,

বিহুর সময় চলে আয়।
Avatar: r2h

Re: নানা রঙের দিনগুলিঃঃ ঝটিকা সফরে অসম

ত্রিপুরা নিয়েও দুটি লেখো না!


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন