বকলমে RSS feed

বকলমের খেরোর খাতা। (যাঁরা টেকনিকাল/অন্য কোনো সমস্যার কারণে ব্লগে লিখতে পারছেন না, তাঁদের হয়ে ব্লগ পোস্ট করার জন্য এই প্রোফাইল।)

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ?
    যেকোন নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে সামনে আসার পর নাগরিক হিসাবে আমাদের একটা ঈমানি দায়িত্ব থাকে। দায়িত্বটা হল অভিযুক্ত ধর্ষকের কঠোরতম শাস্তির দাবি করা। কঠোরতম শাস্তি বলতে কারোর কাছে মৃত্যুদন্ড। কেউ একটু এগিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ার ...
  • তোমার পূজার ছলে
    বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না ...
  • The Irishman
    দা আইরিশম্যান। সিনেমা প্রেমীদের জন্য মার্টিন স্করসিসের নতুন বিস্ময়। ট্যাক্সি ড্রাইভার, গুডফেলাস, ক্যাসিনো, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, দা অ্যাভিয়েটর, দ্য ডিপার্টেড, শাটার আইল্যান্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট, সাইলেন্টের পরের জায়গা দা আইরিশম্যান। বর্তমান সময়ের ...
  • তোকে আমরা কী দিইনি?
    পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন -********তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, ...
  • ইশকুল ও আর্কাদি গাইদার
    "জাহাজ আসে, বলে, ধন্যি খোকা !বিমান আসে, বলে, ধন্যি খোকা !এঞ্জিনও যায়, ধন্যি তোরে খোকা !আসে তরুণ পাইওনিয়র,সেলাম তোরে খোকা !"আরজামাস বলে একটা শহর ছিল। ছোট্ট শহর, অনেক দূরের, অন্য মহাদেশে। অনেক ছোটবেলায় চিনে ফেলেছিলাম। ভৌগোলিক দূরত্ব টের পাইনি।টের পেতে দেননি ...
  • ছন্দহীন কবিতা
    একদিন দুঃসাহসের পাখায় ভর করে,ছুঁতে চেয়েছিলাম কবিতার শরীর ।দ্বিখন্ডিত বাংলার মত কবিতা হয়ে উঠলোছন্দহীন ।অর্থহীন যাত্রার “কা কা” চিৎকারে,ছুটে এলোপ্রতিবাদী পাঠক।ছন্দভঙ্গের নায়কডানা ভেঙ্গে পড়িপুঁথি পুস্তকের এক দোকানে।আলোক প্রাপ্তির প্রত্যাশায়,যোগ ধ্যানে কেটে ...
  • হ্যালোউইনের ভূত
    হ্যালোউইন চলে গেল। আমাদের বাড়িতে হ্যালোউইনের রীতি হল মেয়েরা বন্ধুদের সঙ্গে ট্রিক-অর-ট্রিট করতে বেরোয় দল বেঁধে। পেছনে পেছনে চলে মায়েদের দল। আর আমি বাড়িতে থাকি ক্যান্ডি বিতরণ করব বলে। মুহূর্মুহূ কলিং বেল বাজে, আমি হাসি-হাসি মুখে ক্যান্ডির গামলা নিয়ে দরজা ...
  • হয়নি
    তুমি ভালবাসতে চেয়েছিলে।আমিও ।হয়নি।তুমিঅনেক দূর অব্দি চলে এসেছিলে।আমিও ।হয়নি আর পথ চলা।তুমি ফিরে গেলে,জানালে,ভালবাসতে চেয়েছিলেহয়নি। আমি জানলামচেয়ে পাইনি।হয়নি।জলভেজা চোখে ভেসে গেলআমাদের অতীত।স্মিত হেসে সামনে এসে দাঁড়ালোপথদুজনার দু টি পথ।সেপ্টেম্বর ২২, ...
  • তিরাশির শীত
    ১৯৮৩ র শীতে লয়েডের ওয়েস্টইন্ডিজ ভারতে সফর করতে এলো। সেই সময়কার আমাদের মফস্বলের সেই শীতঋতু, তাজা খেজুর রস ও রকমারি টোপা কুলে আয়োজিত, রঙিন কমলালেবু-সুরভিত, কিছু অন্যরকম ছিলো। এত শীত, এত শীত সেই অধুনাবিস্মৃত কালে, কুয়াশাআচ্ছন্ন পুকুরের লেগে থাকা হিমে মাছ ...
  • ‘দাদাগিরি’-র ভূত এবং ভূতের দাদাগিরি
    রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে, শ্যাওড়া গাছের মাথায়, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে, ছাপাখানায় এবং সুখী গৃহকোণে প্রায়শই ভূত দেখা যায়, সে নিয়ে কোনও পাষণ্ড কোনওদিনই সন্দেহ প্রকাশ করেনি । কিন্তু তাই বলে দুরদর্শনে, প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানেও ? আজ্ঞে হ্যাঁ, দাদা ভরসা ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

শুভায়ু শুক্রবার

বকলমে

প্রতিভা সরকার

দিল্লীর রাজপথে শিরদাঁড়া সোজা করে বসে আছে একদল বাচ্চা ছেলেমেয়ে। স্কুলে না গিয়ে তারা এইখানে। হাতে প্ল্যাকার্ড "স্কুলে যাইনি, বড়দের শেখাব বলে"। ব্যাঙালুরুতে কিশোররা গম্ভীর মুখ। হাতে লেখা "পিতৃতন্ত্র নয়, প্ল্যানেট বাঁচাও"। বার্লিনে বাচ্চারা লিখেছে "সিস্টেম পাল্টাও, ক্লাইমেট নয়"।
কি শেখাতে চায় ওরা সবজান্তা বুড়োদের ? কেন প্রত্যেক শুক্রবারের এই স্কুল-পালানো আন্দোলনের জয়জয়কার গোটা পৃথিবী জুড়েই?
গ্রেটা থানবার্গ নামে এক সুইডিশ স্কুলছাত্রী পর পর তিন শুক্রবার সেদেশের পার্লামেন্টের সামনে বসে থেকেছে স্কুলে না গিয়ে। তার দাবী পরিবেশ-সমস্যা মোকাবিলায় অনুষ্ঠিত প্যারিস এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী কার্বন এমিশনের মাত্রা বেঁধে দিতে হবে। এবং আমেরিকা সহ সমস্ত দেশকে তা মেনে চলতে হবে। এই আন্দোলনের নাম ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার।
গ্রেটার দাবী ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পৃথিবীতেই। ছাত্রছাত্রীরা বুঝেছে জলবায়ুর ক্ষতিকর পরিবর্তন সম্বন্ধে শুধু সচেতনতা গড়ে তুললে হবে না, হাতে হাত মিলিয়ে নিজেদের পরিবেশ বান্ধব বলেও প্রমাণ করতে হবে। অন্যান্য দেশের মতোই ভারতে সাড়া ফেলেছে এই আন্দোলন। অন্যান্য শহরের মতো কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ছাত্রদের প্ল্যাকার্ড হাতে দেখা গেছে। এখন দূর দূর গ্রামাঞ্চলে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়া সময়ের অপেক্ষা। এই পৃথিবীকে নবজাতকের বাসযোগ্য করে রেখে যাবার ব্যাপারে আমরা ডাহা ফেল করেছি। এখন ব্যাটন তাই ওদের হাতে।

নতুন প্রজন্ম পরিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গমন, যাকে সারা পৃথিবী কার্বন এমিশন বলে জানে, তার পরিমাণ কমিয়ে আনতে মরীয়া। কারণ পরিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন গ্যাস এবং অন্যান্য গ্রীণহাউস গ্যাসের আধিক্য ডেকে নিয়ে আসছে পৃথিবীর মরণ -- গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্বজোড়া উষ্ণায়ন। মানুষ তার নানা অভ্যাস ও ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে পরিবেশে এতো কার্বন নির্গমন ঘটাচ্ছে যে পৃথিবীর তা শোধন করে নেবার সহজাত ক্ষমতায় আর কুলোচ্ছে না। এই অতিরিক্ত অশোধিত গ্যাসীয় ভার ভূত্বকের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ। ফলে সমুদ্রের জলস্ফীতি ঘটছে, ঋতুপর্যায় উল্টোপাল্টা হয়ে যাচ্ছে, বন্যার্তরা খরায় মরছে, রুখা জমিতে হঠাৎ বন্যা। আর কিছুদিনের মধ্যেই সুন্দরবনকে গ্রাস করে নেবে লোণা জল। তারপর কলকাতা শহরের পালা। ওদিকে বরফ গলছে মেরুপ্রদেশে। অটুট হিমশৈলে অজস্র ফাটল। টান ধরছে জলভান্ডারে। আছড়ে পড়ছে দানবীয় ঝড়, সুনামি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়। পরের প্রজন্মকে মহা বিপদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি আমরা। এবার বুড়োদের অবিমৃষ্যকারিতার বিরুদ্ধে তারাই রুখে উঠেছে দেশবিদেশে।

মুশকিল, খুব মুশকিল এই কার্বন এমিশন কমিয়ে আনার ব্যাপারটা। কারণ সভ্যতা আর উন্নয়নের নামে পরিবেশ, প্রতিবেশ, প্রাণিকুল, উদ্ভিদ জগতকে পাত্তা না দিয়ে যে স্বার্থগত বিলাস আর অনাচারের স্রোতে আমরা ক্রমাগত গা ভাসিয়েছি তা এখন আমাদের অভ্যাস আর জীবনযাত্রার প্রাথমিক শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন এসি। অনেক বাবা মাকে পুঁচকে বাচ্চার ঘুম নিশ্ছিদ্র হয় না এসি না চালালে এইরকম হামেশাই বলতে শুনি। যেন সমস্ত মানবজাতি তার শৈশব থেকে এসিতে অভ্যস্ত। ফ্ল্যাটে মাত্র একটাই টিমটিমে এসি কেন এই নিয়ে আমায় অনেক জবাবদিহি করতে হয়। অথচ আমরা জানি না বা জেনেও না জানার ভাণ করি যে প্রত্যেকটি এসি, ফ্রিজ,কুলিং সিস্টেম থেকে নির্গত ফেরন গ্যাস বা আর একটু কম ক্ষতিকারক টেট্রাফ্লুয়োরেথান আমাদের মাথার ওপরের ওজোন স্তরের ছাদ আক্ষরিক অর্থেই ফুটো করে দিচ্ছে। আর সেই গর্ত দিয়ে ধেয়ে আসছে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির ক্ষতিকারক প্রভাব যা বাড়িয়ে দিচ্ছে নানা চর্মরোগ থেকে শুরু করে ক্যান্সারের মতো মারণরোগ। কিন্তু কুজোর জল আর তেষ্টা মেটায় না, বাচ্চারা বাইরে থেকে ফিরে ঢকঢক করে গলায় ঢালে ফ্রিজ-ঠান্ডা জল। তাতে ওদের স্থূলত্ব বহুগুণ বেড়ে ওরা ওবেসে হয়ে যাবে একথা বহু বাবা মা জেনেও বাধা দেননা।

ভোগবাদ আর তাৎক্ষণিক আরাম হচ্ছে এইরকম বিষমবস্তু। নিজের ও পরিবেশের মৃত্যু ত্বরাণ্বিত হচ্ছে জানলেও মানুষ তা থেকে বেরোতে পারে না। এই ভোগবাদেই আবার প্রোথিত রয়েছে অসাম্যের বীজ। কারণ সব মানুষকে সমান ভোগের সুযোগ করে দিতে গেলে একটায় কুলোবে না, বরং অনেকগুলো পৃথিবীভর্তি বিপুল প্রাকৃতিক সম্ভারের প্রয়োজন। কারণ উন্নয়নের নামে যাইই করা হোক না কেন, খাদ্য উৎপাদন, জ্বালানি ব্যবহার, রাস্তা, অট্টালিকা নির্মাণ, যানবাহন ব্যবস্থা ইত্যাদি, সবগুলোতেই কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যন্য গ্রীণহাউস গ্যাস নির্গত হবেই। হাতে যখন একটাই মাত্র পৃথিবী রয়েছে বরবাদের জন্য, তখন জোর যার মুলুক তার এই নীতিতে বিশ্বাসী উন্নত দেশগুলো কার্বন এমিশন কমাতে মোটেই রাজী নয়। তারা গরীব দেশগুলোকে এমিশন কমাতে ফরমান জারি করে। যেন বালিতে মুখ গুঁজে উটপাখি ধুলোর ঝড় এড়াতে পারে।

উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোতে আবার সুবিধাভোগীরা বেশিরভাগ মানুষকে শোষণ ও বঞ্চনার মধ্যে ঠেলে দিয়ে ভোগের অধিকার হাসিল করে নেয়। গোটা মুম্বাইয়ের বাতাস দূষিত হয়ে গেলেও যেন আম্বানির জাহাজবাড়ির অন্দরমহল বেঁচে যাবে। তিনলাখ টাকার বিয়ের কার্ডওয়ালা ধনীদের ভোগ্যপণ্য নির্মাণ কার্বন এমিশনের একটি প্রধান কারণ। কলকারখানা চাই, কিন্তু পরিবেশের বিপুল ক্ষতি করে শুধু মুনাফার জন্য যথেচ্ছ নির্মাণ আমাদের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করবে। এর মধ্যেই খবর এসে গেছে নিরপরাধ মানুষের রক্তে হাত রাঙানো শ্বেতাঙ্গ আতঙ্কবাদীর প্রশ্রয়দাতা ট্রাম্প(নিউজিল্যান্ড মসজিদকান্ডের পর দেওয়া বক্তৃতা শুনতে অনুরোধ রইল) ভারতের জন্য নতুন সওগাত পাঠাচ্ছে একাধিক পারমানবিক চুল্লী নির্মাণে সহায়তা। এই চুল্লীগুলির উপকারের থেকে অপকারের ক্ষমতা অনেক বেশী সেব্যাপারে প্রমাণাভাব নেই। পরিবেশের ক্ষতি করে অন্য স্বার্থে এই কুটনৈতিক গলাগলি চিরকালের জন্য বন্ধ হোক।

এ যেন পুকুরে ঢিল ছুঁড়ে তৈরি জলের বৃত্ত। একটার মধ্যে আর একটা, এইভাবে অগুন্তি। পরিবেশ নিয়ে ভাবতে গেলেও এইরকম অগুন্তি সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতার বৃত্ত তৈরি হয়। সেগুলো ডিঙোতে না পেরে প্যারিসের পরিবেশভাবনার ওপর বিশ্বজমায়েত ব্যর্থও হয়ে যায়। সে ব্যর্থতার মূল দায় উন্নত দেশগুলির,বিশেষ করে ট্রাম্পের আমেরিকার। যদিও পৃথিবী জোড়া দূষণে তাদের দায় সবচেয়ে বেশি, প্যারিস কনভেনশন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবার আগেই আমেরিকা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে কার্বন এমিশন কমানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বিশ্বের কম সচ্ছল পড়শিদের স্বার্থে বিন্দুমাত্র ত্যাগেও সে আগ্রহী নয়। অনুন্নত দেশগুলো এখন কার্বন এমিশন করে ঠিক কথা, কিন্তু তারও দেড়শ দুশো বছর আগে থেকে সেই কাজ করে আসছে উন্নত দেশগুলো। সে দায় নেওয়া দূরে থাক, দাবানলে যে দেবালয় বাঁচে না একথাটুকুই ট্রাম্পসাহেবকে শেখানো আর বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধা বোধহয় একই ব্যাপার।

এইজন্য পরিবেশ ব্যাপারটি লঘুচিন্তা নয়, বরং এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে তীব্র রাজনৈতিক চাল, পুঁজিবাদের বিকট স্বার্থগন্ধ। সেগুলো খুব পরিণত চিন্তার খোরাক। প্রশ্ন উঠতেই পারে নিজের খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী উৎপাদন করবার জন্য প্রকৃতিকে আত্মসাৎ না করে উপায় কি ? ঠিকই, অন্য উপায় নেই, কিন্তু শ্রেণিবিভক্ত সমাজে প্রকৃতিকে সর্বজনীন অধিকার হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তরিত করা অব্দি একরকম চলছিল। কিন্তু তারপর পুঁজিবাদের নেতৃত্বে যখন শুরু হল জবরদস্তি ব্যাপক লুন্ঠন তখনই ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে গেল। পনের শতক থেকে আঠার শতক অব্দি বাণিজ্যিক পুঁজি এই লুঠতরাজ ভালোমতো কায়েম করে। বিশেষ করে জমির ওপর তাদের জবরদস্তি অধিক লাভের উদ্দেশ্যে উৎপাদনের ধারাটিকেই পালটে দেয়। এর উপযুক্ত উদাহরণ হল আমাদের দেশে নীলচাষ। এতে কৃষকরাই শুধু সর্বস্বান্ত হয়নি, ভূমিরূপের সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছিল। মৃত্তিকার হারিয়ে ফেলা স্বাভাবিক পুষ্টি উপাদান পুনর্নবীকরণের কোন চেষ্টাই হয়নি। ফলে বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল পুনরায় উৎপাদন ব্যবস্থা। বস্তুত তখন থেকেই উৎপাদন মুনাফার সঙ্গে যোগ হল প্রকৃতিকে লুণ্ঠন করবার বিপুল লাভ বা মুনাফা। আবার সে নতুন রূপে সেজে এসেছে বিটি চাষের মধ্য দিয়ে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কম্পানীর জায়গায় এসেছে মনস্যান্টো।

পরিবেশের ব্যাপক ধ্বংসের শুরু এইখান থেকে। তারপর অষ্টাদশ-উনবিংশ শতাব্দীতে শিল্পবিপ্লব তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এইভাবে পুঁজিবাদী উন্নয়ন ও শিল্পায়ন পরিবেশ সমস্যার স্থানীয় সমাধানের সম্ভাবনাকে সমূলে বিনষ্ট করেছে। আন্তর্জাতিক প্রবল প্রচেষ্টা ছাড়া এর সমাধান আর সম্ভব নয়।অথচ প্যারিস কনভেনশন সার্থক হল না, এটা বুঝেও যে পরিবেশ সমস্যা স্থানীয়ভাবে মেটানো কখনই সম্ভব নয়। ইকোলজিরও এখন ভুবনায়ন ঘটেছে। পরিবেশ উন্নয়নে মৌলিক অগ্রগতির জন্য পরিবেশের ধ্বংস সাধনে সবচেয়ে বেশি দায়ী পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মোকাবিলা করতে হবে কেন্দ্রীয়ভাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই কথাটি সবিশেষ সত্যি। স্থানীয় ভাবে পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রথমেই লড়তে হয় লোভী পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যারা ভালো কাঠের লোভে বনভূমিকে উজাড় করে দেয়। এদের তুলনায় সাধারণ গ্রামবাসী যারা বন কেটে ঘর বানায়, জ্বালানি সংগ্রহ করে, পাতা কুড়োয় তারা একেবারেই নিরীহ। ওই লোভী কাঠব্যবসায়ীদের ঠিক পেছনের সারিতেই থাকবে সেইসব পুঁজির দালালরা যারা পর্যটন শিল্পের নামে যথেচ্ছ হোটেল ও রিসর্ট বানায়। তাদের কাছে পরিবেশ নয়, মুনাফাই সব। এদের মাথায় হাত থাকে রাজনীতিকদের। বনবেচা টাকায় ইলেকশনের ফান্ড তৈরি হয়েছে এই অভিযোগ ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন নয়। এইভাবে পরিবেশ ধ্বংসের একটা চক্র গড়ে ওঠে সবখানে। এইসবই দেখিয়ে দেয় যে পরিবেশ সমস্যা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা এবং তা কোন ভাবেই শ্রেণিনিরপেক্ষ নয়। পরিবেশ আন্দোলন যেদিন সমস্ত বিশ্বজুড়ে আধিপত্যকামী আর্থ-রাজনৈতিক ভাবনা বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে যাবে সেদিন তা হবে অপ্রতিরোধ্য। এই শিশুরা সেইদিন আনতে পারবে কিনা জানা নেই, কিন্তু আপাতত শুক্রবারগুলিকে সবুজ ও তাজা করে দেবার জন্য বয়স্কদের তরফ থেকে তাদের অনেক ধন্যবাদ।

পরিশিষ্টে জানাই, আমি খুব ভয়ে আছি। ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার আন্দোলনের ধাত্রী গ্রেটা থানবার্গ বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন কিশোরী। জন্ম থেকেই অটিজম তার সঙ্গী। হয়ত এই কারণেই সে যেমন ভাবে পরিবেশকে নিয়ে ভাবে আমরা তা পারিনা। তার একরোখা জেদি ভালবাসা আমাদের মতো নানা বিবেচনার শিকার হয়ে স্তিমিত হয়ে যায় না। পরিবেশের প্রশ্ন তার কাছে কেবল কাগুজে সমস্যা নয়, নিজের জীবনমরণের প্রশ্ন। কাগজে পড়ছি তার নাম বিবেচিত হচ্ছে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য। হঠাৎ কোন ভ্রান্তমতি রাষ্ট্রপ্রধান তাকে নিয়ে বা তার মাকে নিয়ে অসংবেদনশীল ঠাট্টায় হাসির হররা বইয়ে দিতে পারেন, এই আমার ভয়, একইসঙ্গে লজ্জাও।

সব প্রতিবন্ধকতা, ষড়যন্ত্র, কুযুক্তি, বিদ্রূপ ঠেলে পরিবেশ আন্দোলন জয়যুক্ত হোক।


https://i.postimg.cc/nLVV2hVk/env0.jpg

https://i.postimg.cc/gkpC8B2y/env2.jpg

https://i.postimg.cc/Jz6SwrcK/env1.jpg

https://i.postimg.cc/QtL4sHBg/env3.jpg
ছবিঃ দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা

1356 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: শুভায়ু শুক্রবার

ঢাকাতে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা লিখেছিলো, রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলিতেছে!

জয় হোক কিশোর বিপ্লব।। 💕
Avatar: তন্বী

Re: শুভায়ু শুক্রবার

আসলে বয়েস অনেক সময় শুধু একটা সঙ্খ্যার কাজ করে। পরিণত ব্যাপারে পঞ্চাশ বছরের মানুষ ও অনেক সময় ন্যাক থেকে যায়। ছোটোখাটো চেহারা গুলো অনেক বড় কিছু করে দেখা লো
Avatar: কুশান

Re: শুভায়ু শুক্রবার

অসামান্য লিখন, প্রতিভাদির কলম ছাড়া আর কার হাত থেকে বেরুবে এমন ক্ষুরধার লেখা?

দ্যাখা যাচ্ছে আগামী প্রজন্মই পথ দেখাচ্ছে। আমরা পারছি না, ওরা পারছে। আপনি ভাগ্যিস এই লেখাটা লিখলেন। নইলে তো জানতেও পারতাম না এই অভিনব আন্দোলনের বিষয়ে।

আরো, আরো লিখুন।
Avatar: বকলমে

Re: শুভায়ু শুক্রবার

প্রতিভা একটা ব্যাপার দেখো , প্রায় সব শিক্ষিত মানুষ কিন্তু বিপদটা জানেন । অথচ কী ভীষণ উদাসীন । এই উদাসীনতা আর ভোগের চাহিদা সমস্ত সচেতনতা কে ছাপিয়ে যাচ্ছে । এটা সবচেয়ে বেশি হতাশাজনক ।
Avatar: দ

Re: শুভায়ু শুক্রবার

লেখাটা ভাল, অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
একটা ছোট অনুপপত্তি, এই যে অংশটা
"কিন্তু কুজোর জল আর তেষ্টা মেটায় না, বাচ্চারা বাইরে থেকে ফিরে ঢকঢক করে গলায় ঢালে ফ্রিজ-ঠান্ডা জল। তাতে ওদের স্থূলত্ব বহুগুণ বেড়ে ওরা ওবেসে হয়ে যাবে একথা বহু বাবা মা জেনেও বাধা দেননা।"
এটা একটা প্রচলিত মিথ। ঠিক নয়। আই হোক বা গরম সেটা খেলে ওজন বাড়বে কী করে!

Avatar: Prativa Sarker

Re: শুভায়ু শুক্রবার

ঠিকই, ওটা ফ্রিজ ঠান্ডা কোক হবে।
Avatar: স্বাতী রায়

Re: শুভায়ু শুক্রবার

ভোগবাদ খারাপ সেটা জেনেও ঠিক কোথায় যে দাঁড়ি টানব, সেটা বুঝতে পারি না! আজকাল ছাপানো বই কিনতেও কেমন দ্বিধা হয়, তবে কি একটা গাছ কাটায় উৎসাহ দিচ্ছি! তবু না কিনেও পারি না! প্লেন, গাড়ী কতটা বর্জন করতে পারব ? উত্তর জানা নেই...।
Avatar: aranya

Re: শুভায়ু শুক্রবার

দারুণ লেখা। খুবই ভাল লাগল। বাচ্চারা সফল হোক


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন