কুশান গুপ্ত RSS feed

নাম পরিবর্তন করি, এফিডেফিট বিনা।আসল নামে হাজার হাজার ডক্টর হাজরা আছেন, কে প্রথম জানা নেই, কে দ্বিতীয়, কে অদ্বিতীয়, এ ব্যাপারে ধারণা অস্বচ্ছ। অধমের ব্লগ অত্যন্ত ইনকনসিস্টেন্ট,কিছু বা খাপছাড়া, খানিকটা বারোভাজা ধরণের। কিন্তু গম্ভীর নিবন্ধের পর ক্লান্তি আসে, তখন কবিতা, তারপর ঘুম, ক্লান্তি ও নস্টালজিয়া। কোনো গন্তব্য নেই, তবু হাঁটতে হয় যেমন। একসময় অবকাশ ছিল অখন্ড, নিষিদ্ধ তামাশা লয়ে রংদার সমকাল চোখ মারিত। আজকাল আর মনেও হয় না, এ জীবন লইয়া কি করিব? আপনাদের হয়?

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ইতিহাসবিদ সব্যসাচী ভট্টাচার্য
    আধুনিক ভারতের ইতিহাস চর্চায় সব্যসাচী ভট্টাচার্য এক উল্লেখযোগ্য নাম। গবেষক লেখক শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে তাঁর অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সবসাচীবাবুর বিদ্যালয় শিক্ষা বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট হাই স্কুলে। তারপর পড়তে আসেন প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগে। ...
  • পাগল
    বিয়ের আগে শুনেছিলাম আজহারের রাজপ্রাসাদের মতো বিশাল বড় বাড়ি! তার ফুপু বিয়ে ঠিকঠাক ‌হবার পর আমাকে গর্বের সাথে বলেছিলেন, "কয়েক একর জায়গা নিয়ে আমাদের বিশাল বড় জমিদার বাড়ি আছে। অমুক জমিদারের খাস বাড়ি ছিল সেইটা। আজহারের চাচা কিনে নিয়েছিলেন।"সেইসব ...
  • অশোক দাশগুপ্ত
    তোষক আশগুপ্ত নাম দিয়ে গুরুতেই বছর দশেক আগে একটা ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখেছিলাম। এটা তার দোষস্খালন বলে ধরা যেতে পারে, কিন্তু দোষ কিছু করিনি ধর্মাবতার।ব্যাপারটা এই ২০১৭ সালে বসে বোঝা খুব শক্ত, কিন্ত ১৯৯২ সালে সুমন এসে বাঙলা গানের যে ওলটপালট করেছিলেন, ঠিক সেইরকম ...
  • অধিকার এবং প্রতিহিংসা
    সল্ট লেকে পূর্ত ভবনের পাশের রাস্তাটায় এমনিতেই আলো খুব কম। রাস্তাটাও খুব ছোট। তার মধ্যেই ব্যানার হাতে একটা মিছিল ভরাট আওয়াজে এ মোড় থেকে ও মোড় যাচ্ছে - আমাদের ন্যায্য দাবী মানতে হবে, প্রতিহিংসার ট্রান্সফার মানছি না, মানব না। এই শহরের উপকন্ঠে অভিনীত হয়ে ...
  • লে. জে. হু. মু. এরশাদ
    বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা অধ্যায় শেষ হল। এমন একটা চরিত্রও যে দেশের রাজনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল ছিল, এ এক বিরল ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধ না করে কোন সামরিক অফিসার বাড়িতে ঘাপটি মেরে বসে ছিলেন ...
  • বেড়ানো দেশের গল্প
    তোমার নাম, আমার নামঃ ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম --------------------...
  • সুভাষ মুখোপাধ্যায় : সৌন্দর্যের নতুন নন্দন ও বামপন্থার দর্শন
    ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’। এর এক বিখ্যাত কবিতার প্রথম পংক্তিটি ছিল – “কমরেড আজ নবযুগ আনবে না ?” তার আগেই গোটা পৃথিবীতে কবিতার এক বাঁকবদল হয়েছে, বদলে গেছে বাংলা কবিতাও।মূলত বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে সভ্যতার ...
  • মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র ভুবন
    মৃণাল সেনের জন্ম ১৯২৩ সালের ১৪ মে, পূর্ববঙ্গে। কৈশোর কাটিয়ে চলে আসেন কোলকাতায়। স্কটিশ চার্চ কলেজ ও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশুনো করেন। বামপন্থী রাজনীতির সাথে বরাবর জড়িয়ে থেকেছেন, অবশ্য কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ...
  • অলোক রায় এবং আমাদের নবজাগরণ চর্চা
    সম্প্রতি চলে গেলেন বাংলার সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক অলোক রায়। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শেষ দিক থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ছয় দশক জুড়ে তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের বিভিন্ন দিক নিয়ে লেখালেখি করেছেন। এর মধ্যে বাংলা ...
  • দুই ক্রিকেটার
    ক্রিকেট মানেই যুদ্ধু। আর যুদ্ধু বলতে মনে পড়ে ষাটের দশক। এদিকে চীন, ওদিকে পাকিস্তান। কিন্তু মন পড়ে ক্রিকেট মাঠে।১৯৬৬ সাল হবে। পাকিস্তানের গোটা দুয়েক ব্যাটেলিয়ন একা কচুকাটা করে একই সঙ্গে দুটো পরমবীর চক্র পেয়ে কলকাতায় ফিরেছি। সে চক্রদুটো অবশ্য আর নেই। পাড়ার ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

শ্রীপঞ্চমী: পুণ্য মাঘ মাস

কুশান গুপ্ত

"যায় অন্তরীক্ষেতে অঙ্গদ ডাকাবুকা।
বায়ুভরে উড়ে যেন জ্বলন্ত উল্কা।।
লঙ্কাপুরী গেল বীর ত্বরিত গমন।
পাত্রমিত্র লয়ে যথা বসেছে রাবণ।।"


গল্পটি শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সৌমেন্দ্রনাথ পালের কাছে শোনা। সৌমেনবাবু আমার বাবারই বয়েসী ছিলেন। স্যারের জন্মদিন বোধহয় 11ই মার্চ, বাবার 5ই মার্চ।

স্যার যাদবপুরেই পড়েছেন, তবে কিছুদিন প্রেসিডেন্সিতে পড়েছিলেন, পরে ছেড়ে দেন। সেটা ষাটের দশক। প্রেসিডেন্সির কোনো এক স্বনামধন্য বাংলার অধ্যাপক ক্লাশ নিচ্ছেন। সৌমেনবাবুর সহপাঠী একটি পাগলা মতন ছেলে, ক্লাস চলতে চলতেই 'ডাকাবুকা', 'ডাকাবুকা' এমত বিড়বিড় করতে থাকে। এতে অধ্যাপক বিরক্ত হন। ছেলেটিকে দাঁড়াতে বলেন। দাঁড় করিয়ে বলেন, 'কি বকে যাচ্ছ?'
ছেলেটি নিরুত্তর।
যেভাবেই হোক, স্যার শুনেছিলেন শব্দটি।
তাকে জিজ্ঞেস করেন, 'হঠাৎ এই শব্দটি কেনই বা বলছ?'
ছেলেটি বলল, 'এই শব্দ রামায়ণে আছে।'
অধ্যাপক মাথা নাড়েন, 'অসম্ভব।'
ছেলেটিও একরোখা, বলল, 'হ্যাঁ, স্যার, রামায়ণে আছে।'
-'তুমি দ্যাখাতে পারবে?'
-'পারব।'
-'বেশ, পরের দিন নিয়ে এসে দেখিও। দেখাতে পারলে আমি তোমাকে...'

অধ্যাপক কত একটা টাকা পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; সেটা ততটা প্রাসঙ্গিক নয়। তবে পরের ক্লাশেই ছেলেটি কৃত্তিবাসী রামায়ণ খুলে এনে শব্দটি দেখিয়ে দেয়। সমস্ত ছাত্রকূল এবং সেই অধ্যাপক বিস্মিত হন।

ছেলেটি জানত কি করে? অধ্যাপক জানতেন না? নাই জানতে পারেন, কিন্তু, বিস্ময়ের কারণ হলো, 'ডাকাবুকা' এই চলতি শব্দটি ততটা পৌরাণিক শব্দ নয় এবং তুলনায় আধুনিক শব্দ মধ্যযুগীয় বাংলার কবি কৃত্তিবাস লিখতে পারেন না, অধ্যাপকের হয়তো এরকম সংশয় ছিল।

কৃত্তিবাসী রামায়ণ তুলসীদাস বা আর এস এসের  রাম নয়। সেই রামের বর্ণনায় কৃত্তিবাস ওঝা  আরএসএস-দষ্ট রাম ও শ্যামা-ভূত দুর্বা ও সর্ষে ঝেড়ে তাড়াতে পারেন আজো। কৃত্তিবাসী বর্ণনায় রামের গায়ের রঙ দুর্বা ঘাসের মতন সবুজ, সেই রাম, দুর্বাদলশ্যাম। এই শ্যামল, এই নীলিমা বাংলার। সত্যেন দত্ত লেখেন, ' কোন দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল/ কোন দেশেতে চলতে গেলেই দলতে হয় রে দুর্বা কোমল।' এই কবিতা আবৃত্তি করে মাণিক বাবুর অপু, সুদুরের পিয়াসী অপু, গ্লোব পুরস্কার পায়। অপরাজিতের সেই অপু ততদিনে নিশ্চিন্তিপুর ছেড়ে এসেছে। তবু, বিভূতিভূষণের অপু নিশ্চয়ই শ্যামল কোমল দুর্বা ঘাস চিনত। এই শ্যামল-অনুষঙ্গে রবি ঠাকুর গেয়ে ওঠেন: ' শ্যামলে শ্যামল তুমি নীলিমায় নীল'। এই শ্যামল বাংলার, এই নীলিমা বরিশালের আশ্চর্য নীল, যা জীবনানন্দ দেখেছিলেন। তাই অবাক হই না, যখন দেখি কবীর সুমন আজো গেয়ে ওঠেন:

'শ্যামলে শ্যামল তুমি নীলিমায় নীল রবিগানে;
যে নদীর কূল নেই, সেখানে বৈঠা যারা টানে,
আব্বাসউদ্দিন দরিয়ায় ধরেছেন সুর-
শাশ্বত বেহুলার ভালোবাসা সিঁথির সিঁদুর'

কৃত্তিবাস এইভাবে পথ দেখিয়েছেন। তিনি রামকে বাংলার লোকায়ত মতে নির্মাণ করেছেন। নিজের মত করে বিস্তর লোকগল্প ঢুকিয়েছেন। বাংলার ঘরে ঘরে এই রামায়ণের কদর যুগে যুগে ছিল হয়ত এই কারণেই, বাঙালী নিজেকে এর সঙ্গে অনায়াসে আইডেন্টিফাই করতে পেরেছে। প্রথম বাংলা প্রিন্ট সংস্করণ যতদূর জানি উইলিয়াম কেরীর সৌজন্যে।

মাধ্যমিকে ন্যাশনাল স্কলারশিপের টাকায় একটি কৃত্তিবাসী রামায়ণ ঠাকুমা চারুবালা ঘোষকে উপহার দিই। চারুবালা প্রায় নিরক্ষর ছিলেন। শুধু অ আ ক খ টুকু চিনতেন। তাঁর সন্তান অবশ্য কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বি এস সি অনার্স ছিলেন। ঠাকুমার অনুরোধে সন্ধ্যেবেলা রামায়ণ পড়ে শোনাতে হতো। কিছু কিছু জায়গা এতটাই কানে লাগত যে পড়তে পড়তে আমার কানটান লাল হয়ে উঠত। তখন ওই এগারো ক্লাসে ভাবতাম, এই কি ধর্মগন্ত্রের নমুনা? এক এক জায়গায় প্রলম্বিত যৌন বর্ণনা থাকত, যা শুরু হতো, কিন্তু শেষ হতে চাইত না। ঠাকুমা কিন্তু ভাবলেশহীন। সান্ধ্যকালীন পাঠ শেষ হলে পরম ভক্তিভরে গ্রন্থটি স্পর্শ করার পর প্রণাম করতেন।

কৃত্তিবাস রামায়ণে আত্মপরিচয় দিচ্ছেন এইভাবে:

আদিত্য বার শ্রীপঞ্চমী পুণ্য মাঘ মাস
তথি মধ্যে জন্ম লইলাম কৃত্তিবাস।"

আজ ওই মাঘের শ্রীপঞ্চমী। বাংলা মাসের আজ আর প্রাসঙ্গিকতা নেই আদৌ। পয়লা বৈশাখ, পঁচিশে বৈশাখ এবং বাইশে শ্রাবণ আর কিছু বিয়ের কার্ডে নিয়মরক্ষার্থে লোকে লিখে থাকে। যারা বিবাহিত তাঁরাও সম্ভবত বলতে পারবেন না, কবে কোন বাংলা সনের কত তারিখে তাঁরা বিয়ে করেছেন। খুব কম জনই হয়তো নিজের বাংলা জন্মদিন হুট করে বলতে পারবেন। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন, মৃত্যুদিন হয়তো কন্ডিশন রিফ্লেক্সে বলতে পারবেন। তারপরে হয়ত, আমাদের দোষ নেই, আমরা জিজ্ঞেস করব:
'এবারে পঁচিশে বৈশাখ কবে পড়েছে রে?'

কবে থেকে এটা মুছে গেল জানতে ইচ্ছে করে। তবে মনে আছে বিষ্ণু দে 'উর্বশী ও আর্টেমিস' এই গ্রন্থে লিখেছেন: 'এপ্রিল তো চলে গেল হাস্য লঘু নেয়াড আমার'। প্রাক স্বাধীনতার গ্রন্থ। রবীন্দ্রনাথ এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। এমনকী রূপসী বাংলার কবির জন্মদিন  1899 সাল, সাহেবি নিয়ম মেনেই।

তবে, কী আশ্চর্য, সত্তরের কবিদের মধ্যে, নতুন গান যারা বাঁধছেন, তারা কোনোভাবে বাংলা মাস মনে রেখেছেন। মহীনের গানে পাচ্ছি:

'আমার দক্ষিণ খোলা জানলা
মাঘের এই অন্তরঙ্গ দুপুর বেলায়
না শোনা গান খুব পুরোনো
মনে পড়ে যায়
এক দমকা হাওয়ায়'

তবে এই গানটি কি অরিজিনালি মহীনের কারুর, নাকি পরে কেউ লিখেছেন, সেটা জানতেও ইচ্ছে করে।

বীতশোক ভট্টাচার্য থেকে পেলাম, সৌজন্য কাকলীদি:

মাঘ মাসের শেষের দিকে জেগে
স্তব্ধ দেখি সকাল মেঘে মেঘে
ঢাকা বিকেল কিংবা সন্ধেবেলা
ঈষৎ শীত,তোমার অবহেলা
সহ্য ক'রে কী দিকে দিকে জাগে
পুণ্য দেশে, নীরব আভা লেগে
বৃষ্টিধারা, মৃত্যু আমার, মাঘের।

অবাক লাগছে দুটি শব্দ দেখে। মাঘের আগে ওই পুণ্য শব্দটি দেখে এবং বৃষ্টিধারা ও মৃত্যু শব্দদ্বয় দেখে।

কৃষ্ণগোপাল মল্লিক বলে এক সাংঘাতিক সম্পাদক ছিলেন সত্তরের দশকে। তিনি 'গল্পকবিতা' বলে একটি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। পত্রিকার গুণমান ছিল নাকি দেখার মতন। আমি একটি সংখ্যাই দেখেছিলাম। তিনি নাকি বাংলার লোকায়ত, লোকাচার, পাঁচালি, ব্রত, বারো মাসের তেরো পার্বণের খুঁটিনাটি বিষয়ে অবহিত ছিলেন। তিনি নাকি উঠতি কবি সাহিত্যিকদের বলতেন এগুলো তোমাদের জানা উচিত। সত্যিই, কৃষিজ বাংলা, গ্রামীণ বাংলাকে আমরা কতটাই বা চিনি।

সত্তরের কবিদের মধ্যে পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, বীতশোক ভট্টাচার্য, অমিতাভ গুপ্ত, দেবীদাস আচার্য, শ্যামলকান্তি দাশ, নির্মল হালদার সহ অনেকের কবিতায় এই বাংলার নানাবিধ লোকায়ত ও গ্রামীণ উপাদান আছে। এঁরা মননে আধুনিক, কিন্তু এঁদের পা বাংলার মাটির গভীরে প্রোথিত ছিল। এঁরা নিজের মাটি, জল, গ্রাম, ভিটে স্বীকার করে কবিতা লিখেছেন।

ভাবতে অবাক লাগে কৃত্তিবাস এত বড় বই লিখেছেন, তাঁর কতদিন, কত বছর লেগেছিল? কৃত্তিবাস কোন কলমে লিখতেন? কাপড়ে বাঁধা সেই তালপাতার ভারী পুঁথি কিভাবে বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছেছিল? জানতে ইচ্ছে করে।

যশোপ্রার্থী কৃত্তিবাস যখন গৌড়ের রাজার কাছে যান, রাজা যখন জানতে চান আসার উদ্দেশ্য, কবি নাকি বললেন:

'আর কিছু নাঞি চাই করি পরিহার। 
যথা যাই তথায় গৌরবমাত্র সার।।'

এই উচ্চারণ যেন এক স্পর্ধা, যা কবিসুলভ এবং সহজাত। গৌড়ের রাজা, শোনা যায়, মালা পরিয়ে দেন ফুলিয়ার কবিকে।

ফুলিয়া না পূর্ববঙ্গের অন্য কোনো স্থান, কৃত্তিবাসের প্রকৃত জন্মস্থল- এই নিয়েও তর্ক ও পার্থক্য আছে। তবে কৃত্তিবাস সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ উচ্ছসিত ছিলেন। বুদ্ধদেব বসু বরং গ্রন্থ মূলানুগ নয় বলে কৃত্তিবাসকে কিছুটা সমালোচনা করেছেন। সোনার তরীতে একটি দীর্ঘ কবিতা আছে। কেমন সন্দেহ হয়, এই কবিতার পেছনে কি কৃত্তিবাসের রাজার কাছে যাওয়ার কোনো প্রসঙ্গের উল্লেখ?

'সেদিন বরষা ঝরঝর ঝরে , 
    কহিল কবির স্ত্রী — 
‘ রাশি রাশি মিল করিয়াছ জড়ো , 
রচিতেছ বসি পুঁথি বড়ো বড়ো , 
মাথার উপরে বাড়ি পড়ো-পড়ো 
    তার খোঁজ রাখ কি!'

সত্যিই তো এত বড় বড় পুঁথি লেখেন যিনি তিনি সংসার টানেন কি করে? স্ত্রীর গঞ্জনা তো শুনতেই হয়। কবি রাজ দরবারে গিয়ে কবিতা শোনান। রাজা তাঁর কবিতা শুনে মুগধ হন, শেষের দিকের একটু অংশ তুলছি, মূল কবিতাটি অত্যধিক দীর্ঘ:

পুলকিত রাজা , আঁখি ছলছল্ , 
আসন ছাড়িয়া নামিলা ভূতল— 
দু বাহু বাড়ায়ে , পরান উতল , 
         কবিরে লইলা বুকে । 
কহিলা , ‘ ধন্য , কবি গো , ধন্য , 
আনন্দে মন সমাচ্ছন্ন , 
তোমারে কী আমি কহিব অন্য— 
         চিরদিন থাকো সুখে । 
ভাবিয়া না পাই কী দিব তোমারে , 
করি পরিতোষ কোন্‌ উপহারে , 
যাহা-কিছু আছে রাজভাণ্ডারে 
         সব দিতে পারি আনি । ' 
প্রেমোচ্ছ্বসিত আনন্দ-জলে 
ভরি দু নয়ন কবি তাঁরে বলে , 
‘ কণ্ঠ হইতে দেহো মোর গলে 
         ওই ফুলমালাখানি । ' 

সেই ফুলমালা কৃত্তিবাস রাজার কাছ থেকে শুধু পাননি, পাঁচশো বছরের বাঙালির ঘরে ঘরে তিনি আছেন, মনে হয়, আজো।


















567 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: কুশান

Re: শ্রীপঞ্চমী: পুণ্য মাঘ মাস

সত্যেন দত্ত হবে। নিজগুণে ক্ষমা করবেন। অমার্জনীয় ভুল।
Avatar: কমল দাস

Re: শ্রীপঞ্চমী: পুণ্য মাঘ মাস

খুব ভাল লাগল
Avatar: kushan

Re: শ্রীপঞ্চমী: পুণ্য মাঘ মাস

অনবধানতায় কয়েকটি সিরিয়াস ভুল। মার্জনা চাইছি।
ক) 'পড়তে পড়তে আমার কানটান লাল হয়ে উঠত?' জিজ্ঞাসা চিহ্নের পরিবর্তে দাঁড়ি:
খ)'তিনি 'গল্পকবিতা' বলে একটি পত্রিকার সম্পাদক ছিল।- ছিলর পরিবর্তে ছিলেন হবে
একটু এডিট করার সুযোগ থাকলে ভাল হতো।
Avatar: প্রতিভা

Re: শ্রীপঞ্চমী: পুণ্য মাঘ মাস

মৃত্যু কথাটাও মৃত্যা হয়েছে। এতো সুন্দর লেখায় এতো টাইপো থাকলে হয়।!

কৃত্তিবাসী রামায়ণ আমাকেও সুর করে পড়ে শোনাতে হত। 😁
এখন বুঝি সে ভালো হত।
Avatar: Sampad Roy

Re: শ্রীপঞ্চমী: পুণ্য মাঘ মাস

চমৎকার লাগলো। খুব সুন্দর ভাবে লেখাটার শরীর গাঁথা হয়েছে । মাঘ মাস বাঙালির কাছে এতো প্রিয় আর এতো মেদুরতা মাখানো !
মফস্বল এর একজন কবি স্বপনবরণ আচার্য এর চার টি
লাইন মনে পড়ছে ।।

“ একটি টবে একটি ফুলের চারা
রোপন করে প্রণত হয়ে দাঁড়া,
কি ফুল চাস! কি রঙে অভিলাষ !
ফুটছে দ্যাখ একটি মাঘ মাস ।।”

ভালো থাকো ।। ভালো লেখো।।
Avatar: সন্দীপ মুখার্জী

Re: শ্রীপঞ্চমী: পুণ্য মাঘ মাস

লেখার বাঁধুনি খুব সুন্দর।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন