ন্যাড়া RSS feed
বাচালের স্বগতোক্তি

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৬
    চিংড়ির হলুদ গালা ঝোলকোলাপোতা গ্রামটার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কপোতাক্ষ। এছাড়া চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে খাল বিল পুকুর। সবুজ জংলা ঝোপের পাশে সন্ধ্যামণি ফুল। হেলেঞ্চার লতা। উঠোনের কোন ঘেঁষে কাঠ চাঁপা। পঞ্চমুখী জবা। সদরের মুখটায় শিউলি। সাদা আঁচলের মতো পড়ে থাকে ...
  • যৌন শিক্ষা মহাপাপ...
    কিছুদিন ধরে হুট করেই যেন ধর্ষণের খবর খুব বেশি পাওয়া যাচ্ছে। যেন হুট করে কোন বিষাক্ত পোকার কামড়ে পাগলা কুকুরের মত হয়ে গেছে কিছু মানুষ। নিজের খিদে মিটাতে শিশু বৃদ্ধ বাছ বিচার করারও সময় নাই, হামলে পড়ছে শুধু। যদি বিষাক্ত পোকার কামড়ে হত তাহলে এই সমস্যার সমাধান ...
  • ইতিহাসবিদ সব্যসাচী ভট্টাচার্য
    আধুনিক ভারতের ইতিহাস চর্চায় সব্যসাচী ভট্টাচার্য এক উল্লেখযোগ্য নাম। গবেষক লেখক শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে তাঁর অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সবসাচীবাবুর বিদ্যালয় শিক্ষা বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট হাই স্কুলে। তারপর পড়তে আসেন প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগে। ...
  • পাগল
    বিয়ের আগে শুনেছিলাম আজহারের রাজপ্রাসাদের মতো বিশাল বড় বাড়ি! তার ফুপু বিয়ে ঠিকঠাক ‌হবার পর আমাকে গর্বের সাথে বলেছিলেন, "কয়েক একর জায়গা নিয়ে আমাদের বিশাল বড় জমিদার বাড়ি আছে। অমুক জমিদারের খাস বাড়ি ছিল সেইটা। আজহারের চাচা কিনে নিয়েছিলেন।"সেইসব ...
  • অশোক দাশগুপ্ত
    তোষক আশগুপ্ত নাম দিয়ে গুরুতেই বছর দশেক আগে একটা ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখেছিলাম। এটা তার দোষস্খালন বলে ধরা যেতে পারে, কিন্তু দোষ কিছু করিনি ধর্মাবতার।ব্যাপারটা এই ২০১৭ সালে বসে বোঝা খুব শক্ত, কিন্ত ১৯৯২ সালে সুমন এসে বাঙলা গানের যে ওলটপালট করেছিলেন, ঠিক সেইরকম ...
  • অধিকার এবং প্রতিহিংসা
    সল্ট লেকে পূর্ত ভবনের পাশের রাস্তাটায় এমনিতেই আলো খুব কম। রাস্তাটাও খুব ছোট। তার মধ্যেই ব্যানার হাতে একটা মিছিল ভরাট আওয়াজে এ মোড় থেকে ও মোড় যাচ্ছে - আমাদের ন্যায্য দাবী মানতে হবে, প্রতিহিংসার ট্রান্সফার মানছি না, মানব না। এই শহরের উপকন্ঠে অভিনীত হয়ে ...
  • লে. জে. হু. মু. এরশাদ
    বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা অধ্যায় শেষ হল। এমন একটা চরিত্রও যে দেশের রাজনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল ছিল, এ এক বিরল ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধ না করে কোন সামরিক অফিসার বাড়িতে ঘাপটি মেরে বসে ছিলেন ...
  • বেড়ানো দেশের গল্প
    তোমার নাম, আমার নামঃ ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম --------------------...
  • সুভাষ মুখোপাধ্যায় : সৌন্দর্যের নতুন নন্দন ও বামপন্থার দর্শন
    ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’। এর এক বিখ্যাত কবিতার প্রথম পংক্তিটি ছিল – “কমরেড আজ নবযুগ আনবে না ?” তার আগেই গোটা পৃথিবীতে কবিতার এক বাঁকবদল হয়েছে, বদলে গেছে বাংলা কবিতাও।মূলত বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে সভ্যতার ...
  • মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র ভুবন
    মৃণাল সেনের জন্ম ১৯২৩ সালের ১৪ মে, পূর্ববঙ্গে। কৈশোর কাটিয়ে চলে আসেন কোলকাতায়। স্কটিশ চার্চ কলেজ ও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশুনো করেন। বামপন্থী রাজনীতির সাথে বরাবর জড়িয়ে থেকেছেন, অবশ্য কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

তুষারঝড়

ন্যাড়া

নিউ ইয়র্কের জেএফকে এয়ারপোর্টে যখন নেবেছি তখন বেলা প্রায় দেড়টা। নাবার কথা ছিল সকাল নটায়। স্যান ফ্র্যান্সিসকো থেকে সোজা নিউ ইয়র্ক। বাজে আবহাওয়ার জন্যে প্লেন ঘুরে এল ডেনভার দিয়ে। ব্যস সাড়ে চার ঘন্টা মায়া। আমরা যাব নায়াগ্রা ফলস। এয়ারপোর্ট থেকে সময় লাগবে সাত ঘন্টা। নটায় নাবলে পথে থেমে-টেমেও ছটার মধ্যে হোটেলে ঢুকে যাবার কথা। হতচ্ছাড়া শীতকাল।

অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল শীতের মাঝে একবার নায়াগ্রা ফলস দেখতে যাব। চতুর্দিক সাদা, নায়াগ্রারও অনেক অংশ জমে গেছে, তারই মাঝে সে ঝিরঝিরি বয়ে আচমকা দেড়শো ফুট ঝাঁপ দিচ্ছে। এ জিনিস দেখার মজাই আলাদা। তাছাড়া শীতে টুরিস্টের হট্টগোলও কম থাকে। বউও এক কথায় রাজী।

কিন্তু আমি জানি আমার কাছে নায়াগ্রাটাই আসল নয়। তার থেকেও বড় হল আপস্টেট নিউ ইয়র্কের ভেতর দিয়ে যাওয়া। আমি অ্যামেরিকার অনেক জায়গা দেখিনি। কিন্তু যা দেখেছি তার মধ্যে ন্যাশানাল বা স্টেট পার্কগুলো বাদ দিলে নিউ ইয়র্ক রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের মতন সুন্দর জায়গা আর একটাও নেই। স্রেফ হাইওয়ে ধরে বিঙহ্যামটন, সিরাকিউজ, রচেস্টর, বাফেলো হয়ে যে পথে যেতে হবে সে পথই এত সুন্দর যে বার বার যেতে ইচ্ছে করে। একটু ঘুরে গেলে ইথাকাও পথে পড়ে যাবে। এই সব শহরগুলোতেই নামী বিশ্ববিদ্যালয়। তাছাড়া বিশেষ কিছু নেই। মাঝে মাঝে সমতল, মাঝে মাঝে পাহাড়ি রাস্তা, দুপাশে বিস্তীর্ণ জমি। একটা দুটো বাড়ি। রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা অতি অল্প। এখানে নির্জণতার রং এক এক ঋতুতে এক এক। এখন সাদা। রেড আই ফ্লাইট ধরার কারণও ছিল এই। যাতে সূর্যের আলোয় আপস্টেট নিউ ইয়র্কের সৌন্দর্য ড্রাইভ করতে করতে যতটা পারা যায় শুষে নেওয়া যায়। কিন্তু হতচ্ছাড়া শীতকাল।

স্থির করলাম গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। পুরো রাস্তা যদি যেতে ইচ্ছে না হয় তবে বিঙহ্যামটন না সিরাকিউজে রাত্রিবাস করে নেব। একটা লাল ফোর্ড এস্কর্ট গাড়ি দিল গাড়িভাড়া কোম্পানি। "দোষ কারো নয় গো মা, আমি মরি স্বখাতসলিলে" গাইতে গাইতে গাড়িতে উঠে পড়লাম। শীতের হুলটি যথেষ্ট বেদনাদায়ক। নম্বরে বলতে গেলে পাঁচ ডিগ্রি ফারেনহাইট, মাইনাস পনেরো ডিগ্রি সেলসিয়াস। মানে মোক্ষম শীত। চালাও ফুল স্পিডে হিটার। একটু পরেই গাড়ির ভেতরে আরামের ওম জমল। বাইরে ঝকঝকে রোদ। কাল রাতে অল্প বরফ পড়েছিল। রাস্তার ধারে বরফের সাদায় সেই রোদ পড়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। আলংকারিক আর আক্ষরিক - দুই অর্থেই। উষ্ণতার নিরাপত্তায় বসে সেই রোদ দেখলে বোঝার উপায় নেই বাইরে এত ঠান্ডা।

পাঁচটার মধ্যে বিঙহ্যামটনে পৌঁছে গেলাম। যদিও শীতের দিন বলে অন্ধকার প্রায় ঘন হয়ে এসেছে, তাও স্থির করলাম একেবারে সিরাকিউজে গিয়ে রাত্রিবাস করব। বিঙহ্যামটন পেরোতেই হাল্কা বরফ পড়া শুরু হল, এখানে যাকে ফ্লারি বলে। গা করিনি। কিন্তু মাইল পাঁচেক যেতেই প্রবলবেগে স্নোফল শুরু হল। অন্ধকার ততক্ষণে ঘনিয়ে এসেছে। হেডলাইটের আলোর দুটো বিমে দেখছি পাগলের মতন বরফ ঝরছে। বরফের হাল্কা কুচি আমাদের দিকে ধেয়ে এসে গরম উইন্ডশিল্ডে ধাক্কা খেয়ে গলে পড়ে যাচ্ছে। তাকিয়ে থাকলে নেশা ধরে যায়। গাড়ির ভেতরে আশা ভোঁসলে গাইছেন, "প্রদীপের শিখায় জ্বলে মরুক প্রজাপতি"।

আর মাইল দুয়েক যাবার পরে যা অবস্থা হল, তাতে অন্তরাত্মা খাঁচাছাড়া। বরফের বেগ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সবচেয়ে জোরে ওইয়াপার চালিয়েও কিছু হচ্ছে না। ওইয়াপার যেই এক জায়গা থেকে সরছে, অমনি এক ঝাঁক বরফ এসে সেই জায়গা ঢেকে ফেলছে। আন্দাজে গাড়ি চালাচ্ছি। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি কিনা, সেও জানিনা কারণ রাস্তা, ধারের শোল্ডার, নয়ানজুলি - সব বরফে ঢেকে সমতল। সদ্য-পড়া বরফে গাড়ি স্কিড করার সম্ভাবনা কম, কিন্তু খানাখন্দে পড়ে যেতে পারি। আর সবচেয়ে বড় কথা চতুর্দিকে কোন বাড়ির চিহ্ন নেই। বা থাকলেও মুষলধার বরফের পর্দার পেছনে পড়েছে। ত্রিসীমানায় কোন গাড়ির যাতায়াতও নেই। গাড়িটাকে আন্দাজে যেখানটা রাস্তার ধার বলে মনে হচ্ছে, সেখানে দাঁড় করালাম। বরফ পড়াটা একটু কমুক।

আধঘন্টা পরে বরফের বেগ অনেকটা কমল। কিন্তু ততক্ষণে যে পরিমাণ বরফ জমিতে পড়েছে, তাতে গাড়ি নিয়ে এগোন সম্ভব নয়। আন্দাজে যেটা রাস্তা বলে মনে হচ্ছে, তার একপাশে গাড়ি থামালাম। এ সেলফোনের যথেচ্ছ ব্যবহারের আগের কথা। কাজেই ফোন -টোন করে যে সাহায্য চাইব তার কোন উপায় নেই।

কিছুক্ষণ গাড়িতে বসে থাকার পরে বউকে বললাম, এভাবে বসে থেকে লাভ নেই। বরফ পড়া বন্ধ হয়েছে, এবার বেরিয়ে হেঁটে দেখতে হবে কাছেপিঠে কিছু আছে কিনা। গাড়ি থেকে নাবতেই ঠান্ডা জেঁকে ধরলেও, যত ঠান্ডা ভেবেছিলাম, দেখলাম তত নয়। তবে পায়ের তলায় বরফ প্রায় হাঁটু অব্দি। অন্ধকার নেবে গেলেও আসমানের মেঘ আর জমিনের বরফে মিলে অন্ধকার জমাট বাঁধতে দেয়নি। একটা হাল্কা আভায় বেশ কিছুদূর অব্দি দৃষ্টি যাচ্ছে। কিন্তু চারিদিক নিস্তব্ধ। শুধু নিজদের পায়ের জুতোয় ভার্জিন আইস মাড়ানোর শব্দ। সবে অন্ধকার, ঠান্ডা, নৈঃশব্দর সঙ্গে ধাতস্ত হচ্ছি, হঠাৎ নজরে গেল একটু দূরে একটা চৌফালি আলো। জানলার আলো। আন্দাজে মনে হল আধা-মাইল বা তার কমই হবে। ভগবানে বিশ্বাস ফিরে আসার মতন ব্যাপার। জ্যাকেটের জিপার ভাল করে টেনে, গ্লাভস এঁটে, জ্যাকেটের হুড তুলে গাড়ির ট্রাঙ্ক থেকে কেবিন লাগেজ দুটো হাতে তুলে হাঁটা লাগালাম।

হাইওয়ে থেকে একটা ফ্যাকড়া রাস্তা বেরিয়েছে। বোধহয় কাঁচা, বরফে ঢাকা পড়ে গেছে বলে বোঝার উপায় নেই। দুধারে ফেন্স। রাস্তা বেঁকে বাড়িটার বারন্দায় গিয়ে থেমেছে, এদেশে যাকে প্যাটিও বলে। আশ্চর্য বাড়ি! অন্ধকারে যদ্দুর চোখ গেল আর একটাও স্ট্রাকচার চোখে পড়ল না। ফার্মে সাধারণতঃ একাধিক স্ট্রাকচার থাকে। প্যাটিওতে উঠে দরজায় টোকা দিলাম। দরজা খুললেন বছর ষাটেকের হাসিখুশি চেহারার একজন সাদা মহিলা। আমরা আমাদের গর্দিশ ব্যক্ত করলাম। ভদ্রমহিলা খুব আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করে ভেতরে যেতে বললেন।

ছোট বাড়ি, কিন্তু কী আরামের গরম ওম জমে আছে। চড়চড় করে আওয়াজ করে ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছে। ছোট লিভিং-কাম-ফ্যামিলি রুমে বড় বড় সোয়েডের সোফা। সঙ্গে কিচেন আর ডাইনিঙের ছোট জায়গা। আমরা অনেক ক্ষমা চেয়ে আর তার থেকেও বেশি পরিমাণে ধন্যবাদ দিয়ে সোফায় গা এলালাম। কী আরাম, কী আরাম। ভদ্রমহিলা, নাম বললেন সুজান, কেটলিতে গরম জল চাপিয়ে বললেন, "তোমাদের হট চকলেট করে দিই।" হট চকলেট খেতে খেতে কথা জমল।

সুজানের শ্বশুরের ফার্ম এটা। ছোট ফার্ম, কিন্তু লাভ দেয়। এখন চালায় সুজান আর সুজানের বর ফ্র্যাঙ্ক প্যাটারসন। ফ্র্যাঙ্ক আগে নিউ ইয়র্কে কাজ করত। তখন তারা নিউ ইয়র্কে থাকত। এখন রিটায়ার করে এখানে এখানে পাকাপাকি থাকে। কিন্তু সব বন্ধুবান্ধব শহরে। তাই এখনও মাসে একদিন ফ্র্যাঙ্ক শহরে তাস পেটাতে যায়। ফেরার সময় সওদা করে আনে সুজানের ফরমায়েসি ফ্যান্সি জিনিস যা শহরে সহজলভ্য কিন্তু এই গন্ডগাঁয়ে পাওয়া অসম্ভব। ফ্র্যাঙ্ক আজ সকালে শহরে গেছে। রাতে ফেরার কথা, কিন্তু ফোন করে জানিয়েছে বরফের জন্যে আজ না ফিরে কাল ফিরবে।

তারপরে গতানুগতিক কথা। আমাদের কথা, ক্যালিফোর্নিয়ায় কী করি, ইন্ডিয়ার কোথায় বাড়ি, পারমিতার কানের দুলের প্রশংসা এসব কথা বলতে বলতেই হাতে হাতে সবজি, চিকেন-টিকেন কেটে তিনটে পট-পাই বেক করে ফেললেন। সেই গরম ও উমদা পট-পাই খেয়ে দুটো কামরার একটায় আমরা শুয়ে পড়লাম। নিঃসন্তান দম্পতি। সুজান বলল, ঘর ফাঁকাই পড়ে থাকে। অবরে-সবরে শহরের বন্ধুরা আসে, তবে রাত্রিবাস করে অল্পই। সবই ভাল, কিন্তু এদের সারাবাড়িতেই একটা পুরনো ধুলোর গন্ধ। আর আসবাব, অ্যাপ্লায়েন্স সবই অত্যন্ত পুরনো। পারমিতাও বলল লক্ষ্য করেছে।

বিছানায় শুতে না শুতেই ঘুম। হঠাত ঘুম ভেঙে গেল টেলিফোনের শব্দে। চতুর্দিক ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। রেডিয়াম ঘড়ি বলল, রাত চারটে পঞ্চাশ। সুজান শুনলাম কথা বলছে ফোনে। একটু পরে বন্ধ দরজার তলায় আলো দেখে বুঝলাম সুজান লিভিং রুমে এসেছে। তারও মিনিট খানেক পরে দরজায় খটখট। সুজান খুব কুণ্ঠার সঙ্গে বলল, "খুব খারাপ লাগছে তোমাদের এই সময়ে বিরক্ত করতে, কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক খুব ভোরে বেরিয়ে বাড়ি আসতে গিয়ে বরফে এক জায়গায় গাড়ি খারাপ হয়ে আটকে গেছে। আমাকে আনতে যেতে হবে। একটু বাদেই আলো ফুটে যাবে। তাছাড়া আর মিনিট পনেরোর মধ্যেই বরফ সরাবার গাড়ি এসে রাস্তা পরিস্কার করে দেবে। তোমাদের কোন অসুবিধে হবে না। আমি কফি করে দিচ্ছি। আধঘন্টার মধ্যে বেরিয়ে পড়তে পারলে ভাল হয়। নইলে বেচারা ফ্র্যাঙ্ক ঠান্ডায় স্ট্র্যান্ডেড হয়ে থাকবে।"

আমরা চোখের ঘুম তাড়িয়ে ঝটপট গুছিয়ে মিনিট পনেরোর মধ্যে লিভিং রুমে এসে দেখলাম ওই সকালেও সুজান কফি আর কুকি সাজিয়ে দিয়েছে। আমরা ঝটপট কফি খেয়ে নিলাম। সঙ্গের দুটো ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সুজানের সঙ্গে ঠিকানা-ফোননম্বর অদল-বদল করে প্রভূত কৃতজ্ঞতা আর ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। সুজান বলল, "আমি ফার্মের পেছনের ব্যাকরোড দিয়ে চলে যাব, হাইওয়ে ধরার দরকার হবেনা। ড্রাইভ কেয়ারফুলি।"

গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন গরম করার জন্যে চালিয়ে কিছুক্ষণ বসে আছি। সেই ফাঁকে ম্যাপ-ট্যপগুলোও আরেকবার ঝালিয়ে নিচ্ছি, হঠাৎ নীল-কমলা আলোর ঝলক। পেছনে পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। কী ব্যাপার রে বাবা! গাড়ির দুদিক থেকে দুজন পুলিশ নেবে আমার জানলায় এসে জিগেস করল, "এনি প্রবলেম?" আমি বললাম, "না, প্রবলেম কিছু নয়। গাড়ি গরম করছি।"
- কেন? তোমরা কী এখানে অনেকক্ষণ থেমে আছ?
- আমরা এখানে একজনের বাড়িতে রাত্রিবাস করছিলাম।
- কার বাড়ি?
- প্যাটারসনদের বাড়ি।
পুলিস দুজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপরে একজন বলল, "ক্যান ইউ প্লিজ স্টেপ আঊট? ভয়ের কিছু নেই।" আমি গাড়ি থেকে নাবলাম। পুলিশ বলল, "বাড়িটা কোথায় দেখাতে পারবে?" দিগন্ত তখন অল্প ফর্সা হতে শুরু করেছে। বাড়িটা সিল্যুয়েটে দেখা যাবার কথা। কিন্তু নেই। বাড়িটা জাস্ট নেই। কিচ্ছু নেই। সাদা বরফ ছড়ানো আদিগন্ত মাঠ। কোন বাড়ি নেই। কোন ফার্ম নেই। কিচ্ছু নেই। আমার মাথা ঘুরতে শুরু করেছে। আমি গাড়ির দরজা ধরে ফেললাম। আমার অবস্থা দেখে পারমিতা গাড়ি থেকে নেবে এসেছে। তারও একই অবস্থা। পুলিশ দুজন বলল, "আই থিংক আই ক্যান এক্সপ্লেন। প্লিজ ফল মি।"

আমার হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। পুলিশের গাড়িটার পেছন পেছন যাচ্ছি। কোথায় তা জানিনা। কত পথ গেছি তাও জানিনা। একটা স্ট্রিপ মলে পুলিশ ঢুকল। তার পেছন-পেছন আমরা। পুলিশ এসে আমাদের দরজা খুলে নিয়ে এল একটা ডোনাট শপে। টেবিলে বসলাম। কেউ একটাও কথা বলিনি। একজন পুলিশ গিয়ে চারটে কফি আর গরম গরম ডোনাট নিয়ে এসে টেবিলে রাখল। কোনরকম ভনিতা না করে বলতে শুরু করল, "এখান থেকে প্রায় বাইশ মাইল দূরে প্যাটারসনদের ফার্ম ছিল। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে। ফার্মটা এখনও আছে, তবে হাত বদল হয়েছে। নামও বদলেছে। তবু লোকাল লোকেরা সবাই ওটাকে প্যাটারসন ফার্ম বলেই জানে।"
কফিতে চুমুক দিয়ে ডোনাট খেল। আমার আর পারমিতার দিকে ডোনাটের প্লেটটা ঠেলে দিল।
"ফ্র্যাঙ্ক আর সুজান প্যাটারসন ফ্র্যাঙ্কের বাবা মারা যাবার পরে নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে চলে এসেছিল। সেটা চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি। তারপরে, উনিশশো পঞ্চাশ সালে একদিন সিটি থেকে ফেরার সময়ে তুষারঝড়ে পথ হারিয়ে দুজনে স্ট্র্যান্ডেড হয়ে যায় জনমানবহীন জায়গায়। সে বছর সিভিয়ার উইন্টার হয়েছিল। পরপর পাঁচদিন ক্রমাগত বরফ পড়ে পুরো নিউ ইয়র্ক স্টেট অকেজো হয়ে যায়। দুদিন স্ট্র্যান্ডেড থেকে, কোন সাহায্য না পেয়ে, সেখান থেকে হেঁটে বেরোতে গিয়ে দুজনেই ঠান্ডায় হাইপোথার্মিয়া হয়ে মারা যায়। তিনদিন পরে গাড়ি থেকে প্রায় মাইল খানে দূরে জঙ্গলের মধ্যে দুজনের দেহ পাওয়া গিয়েছিল। তারপর থেকে এই পঞ্চাশ বছরে আমাদের এই এলাকায় আজ অব্দি আর কোন ট্র্যাভেলার স্ট্র্যান্ডেড হয়নি। কখনও সুজান, কখনও ফ্র্যাঙ্ক, কখনও দুজনেই এসে কোন-না-কোনভাবে ট্র্যাভেলারদের বাঁচিয়ে দিয়েছে। আজ তোমরা যেদিকে চলে গেছিলে সেটা হাইওয়ে থেকে অনেক পূবে। পথ না জানলে ওখান থেকে তোমাদের পক্ষে হাইওয়েতে ফেরা অসম্ভব ছিল।"

নীরবতা। অন্য পুলিশটা মুখ খুলল, "ভোরবেলা রেডিওতে খবর এল একটা লাল গাড়ি ওই রাস্তায় স্ট্র্যান্ডেড হয়ে গেছে। নইলে আমাদের ওইদিকে যাবার কোন প্রয়োজন ছিল না।"

- কে খবর দিল?

পুলিশ দুজন কোন কথা না বলে টুপিটা অল্প তুলে দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল।

518 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: dc

Re: তুষারঝড়

গল্পটা ভালো, তবে এক্কেবারে স্ট্রেটকাট ভুতের গল্প। মানে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ার সাথে সাথেই বুঝে গেছি রাস্তায় ভুত দেখা যাবে। লাস্টের দিকে একটা টুইস্ট আনলে হতো।
Avatar: রিভু

Re: তুষারঝড়

গল্পটা প্রেডিক্টেবল, কিন্তু সেটা মাঝপথে বুঝেও পুরোটা পড়ে ফেললাম। এত্ত মিষ্টি ভাষা। জাস্ট চুমু। রম্যরচনার বই বেরোচ্ছে কি?
Avatar: .

Re: তুষারঝড়

ঐ রাস্তায় ২০১৫ তেও গাড়ী চালিয়ে একদিনে জার্সি থেকে বাফেলো হয়ে নায়েগ্রা গেছি। এখনো খুব সুন্দর।
Avatar: aranya

Re: তুষারঝড়

হ্যাঁ, রাস্তাটা খুবই সুন্দর।
ন্যাড়া-র লেখা আরও সুন্দর :-) । রম্য রচনা-র বই অতি অবিশ্যি বেরোনো উচিত
Avatar: aranya

Re: তুষারঝড়

আমরা জানি ন্যাড়া ভূতের গপ্পো লেখে, তাই ডিসি শুরুতেই বুঝতে পারছে।

'সবই ভাল, কিন্তু এদের সারাবাড়িতেই একটা পুরনো ধুলোর গন্ধ। ' - নতুন পাঠক এই লাইন-টার আগে গেস করতে পারবে না, যে এটা ভুতের গপ্প
Avatar: dc

Re: তুষারঝড়

অরণ্যদা, তা নয় ঃ)

"নিউ ইয়র্কের জেএফকে এয়ারপোর্টে যখন নেবেছি তখন বেলা প্রায় দেড়টা। নাবার কথা ছিল সকাল নটায়"

যেকোন গল্পে এই লাইনটা পড়ে যে কেউ আন্দাজ করবে হয় রাতের দিকে অ্যাডভেঞ্চার (মানে চেন স ম্যাসাকার টাইপের কিছু) নাতো ভুতের গল্প।
Avatar: Biplob Rahman

Re: তুষারঝড়

মাঝারি মানের হইছে!👍
Avatar: শঙ্খ

Re: তুষারঝড়

বাহ দারুণ!!👍
Avatar: দ

Re: তুষারঝড়

এটা বেশ। শুধু বরফ কাটা লোকেদের আসার কথা ছিল, আগের দিনও বরফের জন্য এগোন যায় নি, কিন্তু পুলিশের গাড়ি এলো এবং তার পিছনে বেমালুম গাড়ি চালিয়ে চলেও গেলেন -- এইটা একটু আলগামত।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন