সৈকত ভট্টাচার্য RSS feed

লেখালিখি ইচ্ছেমত। অনিয়মিত। শখ মূলতঃ ঘোরাঘুরি। ছবি দেখা, ছবি তোলা। আর সুযোগ পেলে নতুন নতুন বেকিং রেসিপি ট্রাই করা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • দক্ষিণের কড়চা
    গরু বাগদির মর্মরহস্য➡️মাঝে কেবল একটি একক বাঁশের সাঁকো। তার দোসর আরেকটি ধরার বাঁশ লম্বালম্বি। সাঁকোর নিচে অতিদূর জ্বরের মতো পাতলা একটি খাল নিজের গায়ে কচুরিপানার চাদর জড়িয়ে রুগ্ন বহুকাল। খালটি জলনিকাশির। ঘোর বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে পচা লাশের মতো। যেহেতু এই ...
  • বাংলায় এনআরসি ?
    বাংলায় শেষমেস এনআরসি হবে, না হবে না, জানি না। তবে গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আজ ব্লক অফিসে গেছিলাম। দেখে তাজ্জব! এত এত মানু্ষের রেশন কার্ডে ভুল! কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম প্রায় সবার ভোটারেও ভুল। সব আইকার্ড নির্ভুল আছে এমন ...
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...
  • খানাকুল - ২
    [এর আগে - https://www.guruchan...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

কালচক্রের ছবি

সৈকত ভট্টাচার্য

বৃষ্টিটা নামছি নামছি করছিল অনেকক্ষন ধরে। শেষমেশ নেমেই পড়ল ঝাঁপিয়ে। ক্লাশের শেষ ঘন্টা। পি এল টি ওয়ানের বিশালাকৃতির জানলার বাইরে ধোঁয়াটে সব কিছু। মেন বিল্ডিং এর মাথার ওপরের ঘড়িটা আবছা হয়ে গেছে। সব্যসাচী কনুই দিয়ে ঠেলা মারল। মুখে উদবেগ। আমারও যে চিন্তা হচ্ছিল না, তা নয়। না না, বাড়ি যাওয়ার জন্য মোটেই চিন্তিত আমরা কেউ নই। চিন্তা এই বৃষ্টিতে সিনেমা হবে তো? কলেজের ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল চলছে। ছাত্র-সংসদ থেকে প্রতিবার হয় যেমন। এবারও নানা দেশ-বিদেশী ছবির মধ্যে চোখ আটকে গেছিল একটা নামে – ‘কিম-কি-দুক’।
ভদ্রলোকের নাম শুনেছিলাম আমার এক বন্ধুর মুখে। সে যাদবপুরের ছাত্র। ওদের একটা ফিল্ম বিষয়ক আলোচনা সভায় নাকি কেউ কোন প্রসঙ্গে তুলেছিলেন এনার নাম। ও বলেছিল আমায়। তাই ফিল্ম-ফেস্টিভ্যালের লিস্টে নাম দেখেই ঠিক করে ফেলি এ ছবি দেখতেই হবে। যে ছবিটা দেখানো হবে, নাম – “স্প্রিং সামার ফল উইন্টার এন্ড স্প্রিং”।
জীবনের কিছু কিছু দিনের কথা বা মুহূর্তের কথা খুব যত্ন করে রয়ে যায় আমাদের বুকের ভিতরকার খুপরি ঘরে। ভালোবাসা, খারাপ-বাসা, রোজকার রোজনামচার থেকে বেশ কিছু ভালো লাগা সঞ্চিত হয়ে থাকে ওই খানে – ঠিক যেমনটা দেখিয়েছে ‘ইন্সাইড আউট’ ছবিতে, ঠিক তেমনি। এক একটা সোনালি বল টুক করে ঢুকে পড়ে মনের মধ্যিখানে আর ‘লং টার্ম মেমরি’ হয়ে থেকেও যায় দিব্যি। এ দিনের ব্যাপারটাও ঠিক সেরকম ছিল। বৃষ্টিতে আধভেজা হয়ে ডিরোজিও হলের পাখার তলায় ঠান্ডা লাগাতে লাগাতে যা দেখেছিলাম সে আজ অবধি মনের গভীরে রয়ে গেছে একটা সোনালি বল হয়ে। মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে আলোচনায় শুনি এক একটা ছবি কিভাবে কবিতা হয়ে ওঠে। এই যেমন সত্যজিতের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’। হিমালয়কে সাক্ষী রেখে এক সকাল ঘটনার মধ্যে দিয়ে জীবনের নানা ভাষা কবিতা হয়ে ওঠে। কিমের এই ছবিটিও ঠিক তেমনি।
এ এক জলে ভাসমান বৌদ্ধ মঠের কবিতা। নিবিড় বনানীর মধ্যে এক ছোট্ট হ্রদ, তার মধ্যে একটা কাঠের পাটাতনের উপর এই ছোট্ট সাধনগৃহ। সেখানেই আবর্তিত হয় এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী আর এক ছোট্ট ছেলের জীবন। বৃদ্ধ বৌদ্ধ ছোট ছেলেটির আচার্য্য। এই ছেলেটিই এই ছবির ‘প্রোটাগনিস্ট’ যার জীবনের এক একটি অধ্যায়ের সাথে সমীকরণে বাঁধা পড়ে প্রকৃতির ঋতু সম্ভার। এই ছবিটি যখন দেখি, তার আশে-পাশেই কোন এক সময় আমার পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীত শোনা শুরু। ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল বললেই যেকটা নাম চোখের সামনে ভেসে ওঠে – বিঠোফেন, মোৎজার্ট, বাখ – এঁদের সবার পাশাপাশি আমার পরিচয় হয় আর একজনের সাথে, যাঁর নাম ভিভালডি। সব্যসাচীই আমাকে একটা সিডিতে কিছু ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক দেয়। রাতের বেলা আমার ঘরের আকাশ-বাতাস জুড়ে তারপর থেকে প্রায়ই ভেসে বেরাতে থাকে লেগ্রো, আলেগ্রো, অপেরা, কনচের্তো, সিম্ফনি। এমনই এক রাতে ইন্টিগ্রেশনের ফাঁক দিয়ে বুক জুড়ে বাসা বাঁধে জুলিয়া ফিশারের ভায়োলিনে ভিভালডির বসন্ত। তারপর একে একে গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত, আবার বসন্ত। কিমের ছবির মতোই পরতে পরতে ছবি এঁকে চলেছিল ভায়োলিনের ছড়। চলচ্চিত্র দৃশ্য মাধ্যম হওয়ায় এখানে রঙ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় – বিশেষ করে আমাদের এই রঙিন ছবির যুগে। কিমের এই ছবিতে তাই এক একটা ঋতু উপস্থিত হয়েছে তার কালার টোন নিয়ে। ঝলমলে বসন্ত, রোদ জ্বলা গ্রীষ্ম, ফুলেফলে ভরা শরৎ বা রুক্ষ সাদা শীত। ভিভালডির নোটেশনও সুরের ছন্দ দিয়ে করেছিল ঋতুর চরিত্রায়ণ – তাই আজ এই ছবির কথায় বার বার মনে পড়ছে সেকথা।
কিমের ছবির মজাই হল – কথা কম, কাজ বেশী। প্রধান চরিত্রের মুখের সংলাপ প্রায় নেই বললেই চলে। যেমন ‘থ্রি আয়রন’ ছবিতে দেখেছিলাম – প্রোটাগনিস্ট ‘তাই-সুক’কে। গোটা ছবিতে একটাও সংলাপ না বলিয়ে শুধু মাত্র অভিনয় আর অভিব্যক্তি নির্ভর করে ছবিকে এগিয়ে গেছেন কিম। ‘টাইম’ ছবি আবার ঠিক উলটো – সংলাপের সাথে গল্প এগিয়েছে ধীরে সুস্থে। আর চরিত্রদের অস্বাভাবিকতাই কিমের তুরুপের তাস। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চরিত্র বাস করে চিরাচরিত চলমান আমাদের চারপাশের পৃথিবীর থেকে অন্যরকম ভাবে। ছবি দেখতে শুরু হওয়ার সাথে সাথেই আমরা ‘ফ্রেম অফ রেফেরেন্স’ বদলে ঢুকে পড়ি তাদের জগতে – তখন রোজকার স্বাভাবিকতা কেই মনে হয় অস্বাভাবিক, আর মন জুড়ে থাকে চরিত্রের মায়াময় জগত। যেমন, আবার থ্রি আয়রণের কথাই বলি – ‘তাই-সুক’এর কাজ হল যে সমস্ত বাড়িতে কেউ নেই, মানে হয়ত কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে গেছে কোথাও, সেখানে ঢুকে তাদের গৃহস্থালি কাজ কর্ম করে দেওয়া – কাপড় কাচা, বাসন মাজা। কি অদ্ভুত না? কিন্তু ছবিটা দেখতে শুরু করলে মনে হবে, এটাই তো স্বাভাবিক – অদ্ভুত তো আমাদের রোজকার অপরিস্কার জগত। এরকম অস্বাভাবিক স্বাভাবিকতা আমাদেরকে নিজেদের জগতে বিচরণ করিয়ে আনে ‘ব্রিদ’এর ‘ইয়েওন’, ‘ড্রিম’এর ‘জিন’এর সাথেও।
যে কথা দিয়ে এই শিবের গীত শুরু করেছিলাম – সেই বর্ষার দিনে দেখে ফেলা ‘স্প্রিং সামার ফল উইন্টার এন্ড স্প্রিং’। ভাসমান বৌদ্ধ মঠের রোজনামচা। বৃদ্ধ সন্ন্যাসী প্রতিদিন বাচ্চা ছেলেটিকে নানারকম শিক্ষা দেন, পাঠান হ্রদের তীরের থেকে গাছ-গাছালি সংগ্রহের জন্য। একটিই নৌকা আছে – তীরের সাথে যোগাযোগের জন্য। ছেলেটি একদিন নৌকা করে গাছ-গাছালি সংগ্রহ করতে গিয়ে পৌঁছায় একটা ছোট জলাশয়ের কাছে। সেখানে দুষ্টুমি করে একটি মাছের পাখনায় একটি পাথর বেঁধে দেয়। একই জিনিস একটি নির্বিষ সাপ আর ব্যাঙের সাথে করে। বৃদ্ধ সন্ন্যাসী আড়াল থেকে লক্ষ্য করেন। এখানে খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জন্ম নেয় যে, সন্ন্যাসী ওই খানে পৌঁছলেন কিভাবে? কারণ একমাত্র নৌকাটি তো ছেলেটি একাই চালিয়ে এসেছে। পরে যদিও একটি দৃশ্যে দেখা যায় যে সন্ন্যাসী হাতছানি দিলেই তাঁর ‘পারের তরী’ এসে হাজির হয় তাঁর কাছে। ওই যে বললাম না, এক মায়ার আবেশ ছড়িয়ে থাকে কিমের ছবির মধ্যে দিয়ে! এবং সেগুলো খুব খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে তার মত করে। যাই হোক, সন্ন্যাসী ছেলেটিকে কিছু না বলে চলে যান নীরবে। ছেলেটিও ফিরে আসে মঠে। পরদিন সকালে ছেলেটি ঘুম ভেঙে দেখে, তার পিঠে একটি পাথর বেঁধে দিয়েছেন বৃদ্ধ। ছেলেটিকে তিনি বলেন, কাল সে যা করেছে, তার জন্য তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। এই পাথর পিঠ থেকে সে খুলতে পারবেনা, যতক্ষণ না সে ওই যায়গায় ফিরে গিয়ে প্রাণীগুলিকে মুক্ত করে। আর যদি তারা ইতোমধ্যে মারা গিয়ে থাকে, তাহলে এই পাথর তাকে বুকের মধ্যে নিয়ে বইতে হবে সারা জীবন। ছেলেটি সেখানে ফিরে যায় এবং দেখে মাছটি এবং সাপটি মৃত – ব্যাঙটি তখনও বেঁচে আছে আর চেষ্টা করে যাচ্ছে বেঁচে থাকার। ছেলেটি কাঁদতে শুরু করে। সন্ন্যাসী আবার আড়াল থেকে সব লক্ষ্য করেন। বসন্ত চলে যায়।
বসন্তের সাথে চলে যায় শৈশব। গ্রীষ্ম যখন আসে, ছেলেটি যুবক। বসন্তের মতই গ্রীষ্মের শুরু হ্রদের প্রবেশ পথ দেখিয়ে। মঠে এক মা তার কিশোরী মেয়েকে নিয়ে আসেন। মেয়েটি অসুস্থ। মেয়েটিকে সন্ন্যাসীর কাছে কিছুদিন রেখে সারিয়ে তোলাই তাঁর উদ্দেশ্য। মা চলে যান। ধীরে ধীরে প্রকৃতির নিয়মে ছেলেটি মেয়েটির প্রতি আকৃষ্ট হয়। তারা গোপণে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলে। একদিন যখন তারা রতিক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল ভাসমান নৌকাটির মধ্যে, সন্ন্যাসী তাদের দেখতে পান। না জাগিয়ে শুধু নৌকার স্টপককটি খুলে দেন তিনি। ভিতরে উঠে আসা জল ঘুম ভাঙায় তাদের। মেয়েটি চলে যায় মঠ ছেড়ে। ছেলেটিও রাতের বেলা মেয়েটির খোঁজে মঠের থেকে পালিয়ে যায়। সাথে নিয়ে যায় পোষা মোরগ এবং ভগবন্‌ বুদ্ধের মূর্তি – বৌদ্ধ শিল্পে মোরগ আকাঙ্ক্ষার প্রতীক আর বুদ্ধের মূর্তি দ্যোতনা করে ছেলেটির এত বছরের সব শিক্ষাকে।
শুধু এভাবে গল্প বলে গেলে হয়ত ছবির কাব্যিক রূপটা কিছুটা বোঝানো যেতে পারে – কিন্তু সবটা নয়। কবিতার মধ্যে যেমন একটা নিগূঢ় ছন্দ থাকে, এ ছবির চলনের মধ্যেও অনুরূপ। চরিত্রগুলির চলন – বলন, তাদের কাজ – সব কিছু একটা নির্দিষ্ট ছন্দে বাঁধা পড়ে। তার সাথে মেদহীন রূপকের ব্যবহার বারে বারে প্রমাণ করে দিয়ে যায় এই মহাকাব্যিকতাকে।
শরৎ ফিরিয়ে আনে চলে যাওয়া যুবককে। সে এখন ফেরারী আসামী। আইনের হাত থেকে পালাতে আশ্রয় নেয় তার ফেলে যাওয়া মঠে, তার আচার্য্যের কাছে। আচার্য্য তাকে মারেন, শাস্তি দেন, পরিশেষে বলেন মঠের কাঠের পাটাতনের উপর একটি বৌদ্ধ সুত্র লিখতে বারবার। এর মধ্যে দুজন পুলিশ ছেলেটির খোঁজে এসে উপস্থিত হয়। বৃদ্ধ সন্ন্যাসী তাদের অপেক্ষা করতে বলেন – যতক্ষণ না ছেলেটির লেখা শেষ হয়। তারা অপেক্ষা করে। এক সময় লিখতে লিখতে ছেলেটি ক্লান্ত হয়ে পড়লে তারা স্বতপ্রণোদিত হয়ে হাত লাগায় লেখা শেষ করার জন্য। বৌদ্ধ সূত্র একজন আইন ভঙ্গকারী আর আইনের রক্ষককে একাসনে বসিয়ে দেয়, একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ওঠে। শরৎ শেষ হয় বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর স্বেচ্ছামৃত্যু দিয়ে। তিনি বোঝেন এ পৃথিবীতে তাঁর আর প্রয়োজন ফুরিয়েছে। নিজের চোখ, নাক, মুখ কাগজ দিয়ে বন্ধ করে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কাছে নিবেদন করেন নিজেকে। শুধু একটু খানির জন্য চোখের কাগজটি ভিজে ওঠে – ব্যথায় না নির্বাণের আনন্দে, তা অধরাই থেকে যায় আমাদের কাছে।
শীত আসে। সম্পুর্ণ হ্রদটি বরফ জমাট। আমাদের ছেলেটি এখন পূর্ণ বয়স্ক। এই মঠের ভার এখন তার। একটি মহিলা একদিন এসে একটি শিশুকে রেখে চলে যায়। যাওয়ার সময় বরফ জমা হ্রদের ফাটলে পড়ে তার মৃত্যু হয়। শিশুটি মঠেই থেকে যায়। আমাদের প্রোটাগনিস্ট মঠাধ্যক্ষ তার সব প্রায়শ্চিত্ত পূরণের জন্য একটি পাথরের বৌদ্ধ চক্র, যা কিনা জীবন-মৃত্যুর দ্যোতক, তাকে পিঠে বেঁধে একটি মৈত্রেয়র মূর্তি নিয়ে যাত্রা করে পাহাড়ের পথে। ভারী পাথরটা টেনে এই পথে উঠতে উঠতে তার সে মাছ বা সাপটির সাথে করা দোষ স্খলিত হয়। অনেক কষ্টের পর পাহাড় চূড়ায় পৌঁছে মৈত্রেয়র মূর্তিটি সেখানে স্থাপণ করে সে। নীচে তখন হ্রদের মাঝে মঠ দৃশ্যমান।
একটা ছবি তো শুধু তার কাহিনীগুণে অনন্য হয়ে ওঠে না, যেহেতু এ এক দৃশ্য-মাধ্যম, এর সাথে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে থাকে সিনেমাটোগ্রাফি। যে কবিতার কথা বলছিলাম, ক্যামেরার গুণে তা যেন সত্যিই মহাকাব্যিক হয়ে ওঠে। পাহাড়চূড়া থেকে সম্পূর্ণ উপত্যকা, তারমধ্যে হ্রদ, তারমাঝে ভাসমান মঠ – এ দৃশ্য যেন আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় নিজের ফেলে আসা জীবনকে ফিরে দেখার জন্য একটি অনুরূপ পর্বতপ্রান্তের উপর, যেখানে অনাগত মৈত্রেয় জন্ম নেয় নিজের অনাগত বোধির প্রতিভূ হয়ে। নেপথ্যে বেজে চলে কোরীয়ান লোকসঙ্গীত। দৃশ্য, শব্দ মিলে জন্ম নেয় এক প্যাস্টোরাল সিম্ফনির।
এই ছবির শেষভাগে মঠে ফেলে যাওয়া শিশুটি বড় হয়। আমাদের প্রৌঢ় ছেলেটি তার আচার্য্যপদে অভিষিক্ত। শিশুটি হ্রদের তীরে যায়, সেই ছোট্ট জলাশয়ে গিয়ে একটি মাছের মুখের মধ্যে পাথর ভরে দেওয়ার চেষ্টা করে। জীবন ফিরে আসে সেই একই বিন্দুতে। আবার বসন্ত আসে ওই হ্রদের মধ্যে। কালচক্রাসীন মৈত্রেয়কে দেখিয়ে ছবি শেষ হয়।
সেদিন এই ছবি দেখে বের হয় মনটা কেমন হয়েছিলো, তার হয়ত নির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা হয়না। বাবার সাথে, মায়ের সাথে অনেকবার সিকিমে গেছি। বেড়াতে। সুবিশাল হিমালয়ের কোলের মধ্যে নানা বৌদ্ধ মঠে সন্ধ্যা নামতে দেখেছি। আপাত অন্ধকার গর্ভগৃহে দাঁড়িয়ে একে একে জ্বলে উঠতে দেখেছি বুদ্ধের পাদপ্রদীপগুলি। অপাপবিদ্ধ, করুণাময় তথাগতর স্বল্পালোকে উদ্ভাসিত সে মুখের দিকে তাকিয়ে বার বার বোধ হয়েছে এক পরিপূর্ণ শান্তি। যে শান্তি ধর্মের বাঁধন মানে না, মহাযান, হীনযানের সংজ্ঞা মানেনা। শুধু সহস্র সহস্র বছর ধরে সে বাণী ছড়িয়ে যায় দূরপ্রাচ্য থেকে সুদূর-প্রাচ্যে। আর সেই এক প্রাচ্য পরিচালকের বৌদ্ধ ছবিতে ঠিক এটাই তো চাওয়া - পূর্ণতা, নির্বাণ, যা কিনা সমস্ত বিতর্ক, চলচ্চিত্রের ভাষা, ছবির ব্যকরণের থেকে অনেক অনেক ঊর্ধে উঠে সত্য হয়ে থাকে সেই অনাগত মৈত্রেয়র মত।

713 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: প্রতিভা

Re: কালচক্রের ছবি

চমৎকার কথন ! বিষয়বস্তু জেনে ফিল্মটা এখুনি দেখতে ইচ্ছে করছে। লিংক দেওয়া যায় ?
Avatar: তি

Re: কালচক্রের ছবি

ইউটিউবে আছে সিনেমাটি
Avatar: শঙ্খ

Re: কালচক্রের ছবি

প্রিয় সিনেমা।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন