I RSS feed

Indranil ghosh dastidarএর খেরোর খাতা

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
    ভারত আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র - মিল কতটুকু?একটি দেশ যদি বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী অর্থনীতি হয়, আরেকটির হাল বেশ নড়বড়ে - মানুষের হাতে কাজ নেই, আদ্ধেক মানুষের পেটে খাবার নেই, মাথার ওপরে ছাদ নেই, অসুস্থ হলে চিকিৎসার বন্দোবস্ত নেই। অবশ্য দুর্জনেরা বলেন, প্রথম ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    গরু বাগদির মর্মরহস্য➡️মাঝে কেবল একটি একক বাঁশের সাঁকো। তার দোসর আরেকটি ধরার বাঁশ লম্বালম্বি। সাঁকোর নিচে অতিদূর জ্বরের মতো পাতলা একটি খাল নিজের গায়ে কচুরিপানার চাদর জড়িয়ে রুগ্ন বহুকাল। খালটি জলনিকাশির। ঘোর বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে পচা লাশের মতো। যেহেতু এই ...
  • বাংলায় এনআরসি ?
    বাংলায় শেষমেস এনআরসি হবে, না হবে না, জানি না। তবে গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আজ ব্লক অফিসে গেছিলাম। দেখে তাজ্জব! এত এত মানু্ষের রেশন কার্ডে ভুল! কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম প্রায় সবার ভোটারেও ভুল। সব আইকার্ড নির্ভুল আছে এমন ...
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

I

পর্ব ১
-------
( লালগড় সম্প্রতি ফের খবরের শিরোনামে। শবর সম্প্রদায়ের সাতজন মানুষ সেখানে মারা গেছেন। মৃত্যু অনাহারে না রোগে, অপুষ্টিতে না মদের নেশায়, সেসব নিয়ে চাপান-উতোর অব্যাহত। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে বোধ হয় বিতর্কের অবকাশ নেই, প্রান্তিকেরও প্রান্তিক এইসব মানুষজনের বেঁচে-থাকার কিস্যা, খেতে পাওয়া- না পাওয়া, রোগ হওয়া-না হওয়া, রোগ হলে ওষুধ পাওয়া-না পাওয়া,নেশা করা-না করার কাহিনীতে আমাদের, মূলস্রোতের নগরবাসীদের তেমন কিছু এসে যায় না ; আমরা, নাগরিকেরা, প্রান্তের প্রতি,লালগড়-আমলাশোলের প্রতি ঠিক ততটাই উদাসীন ঠিক যতটা উদাসীন আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র।

তবে কিনা এখনো, এত হাজার দোষ-ঘাটের পরেও আমাদের এই দেশ একটি গণতন্ত্র; খুঁতো- খোঁড়া গণতন্ত্র, কিন্তু তা-ও গণতন্ত্র। অনেক বিকিয়ে যাওয়ার পরেও সংবাদমাধ্যম লালগড় নিয়ে , আমলাশোল নিয়ে খবর করে, ছবি ছাপায়; আমরা হঠাৎ নড়েচড়ে বসি, নড়ে বসে রাষ্ট্রও। বিবেকী যুবক-যুবতীরা খবর জানতে গিয়ে, প্রতিবাদ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে যান, আবার সাময়িক কিছু ডোল মেলে প্রান্তিক মানুষজনের, কাঠামোগত হিংসা যাদের খুবলে খেয়েছে, খায় রোজই। এর ফলে সাময়িক একটি বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পায় দেশ- সমাজ; প্রশাসন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, আমরাও পাশ ফিরে ঘুম দিই আবার। খবরের কাগজে, টিভির পর্দায় নতুনতর বিনোদন উঠে আসে। আমরা মনেও রাখি না, দেশের ৪০% শিশু আজো অপুষ্টিতে ভোগে (1), প্রতি রাতে ক্ষিদে পেটে নিয়ে ঘুমোতে যান লক্ষ লক্ষ মানুষ। অন্তেবাসী মানুষের এনডেমিক ক্ষুধায় অভ্যস্ত আমরা মন্বন্তরের এপিডেমিক থেকে রক্ষা পেলেই খুশী হয়ে যাই।

যদিও এমন দিন ছিল না চিরকাল। উদাসীনতা ছিলই, হিংসা ও নিষ্ঠুরতা ছিলই, ক্ষিদে ও ভুখমারি ছিল। ছিল না সংবাদমাধ্যমের এত তৎপরতা, তথ্যপ্রযুক্তির রমরমা।ফলে রাষ্ট্রকে কে আর খোঁচায়, আমাদের ঘুমিয়ে থাকা বিবেককে কে আর জাগায়! মন্বন্তরের বন্যার জল বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে বইতে থাকলেও তাই আমাদের ঘুম ভাঙে নি। যখন জেগেছি, তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে, শবে ভরে গেছে সারা দেশ। কার্যকরী গণতন্ত্রের অভাব, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার অভাব, অমর্ত্য সেন বলে গেছেন , মন্বন্তরের রাজসড়ককে প্রশস্ত করে। ভারতবর্ষের, বাংলার ইতিহাস তাই অন্তহীন মন্বন্তরের ইতিহাস। সেই ধারাবাহিক মৃত্যুমিছিলের শেষ মহাজুলুস, মহামন্বন্তর ঘটে গেছে ১৯৪৩ সালে। ২০১৮তে তার ৭৫ বছর পূর্তি।এই লেখায় তাকে স্মরণ করবার চেষ্টা।)

---

"লোকে প্রথমে ভিক্ষা করিতে আরম্ভ করিল, তার পরে কে আর ভিক্ষা দেয়!-উপবাস করিতে আরম্ভ করিল। তার পরে রোগাক্রান্ত হইতে লাগিল। গোরু বেচিল,লাঙ্গল জোয়াল বেচিল, বীজধান খাইয়া ফেলিল, ঘরবাড়ি বেচিল। জোতজমা বেচিল। তার পর মেয়ে বেচিতে আরম্ভ করিল। তার পর ছেলে বেচিতে আরম্ভ করিল। তার পর স্ত্রী বেচিতে আরম্ভ করিল। তার পর মেয়ে,ছেলে,স্ত্রী কে কিনে? খরিদ্দার নাই, সকলেই বেচিতে চায়।খাদ্যাভাবে গাছের পাতা খাইতে লাগিল, ঘাস খাইতে আরম্ভ করিল, আগাছা খাইতে লাগিল।ইতর ও বন্যেরা কুক্কুর, ইন্দুর, বিড়াল খাইতে লাগিল। অনেকে পলাইল, যাহারা পলাইল, তাহারা বিদেশে গিয়া অনাহারে মরিল। যাহারা পলাইল না, তাহারা অখাদ্য খাইয়া, না খাইয়া, রোগে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল।'

'৪৩-এর মন্বন্তরের বর্ণনা নয়। '৪৩ তখনো ঘটতে ঢের দেরী। এ আমাদের চেনা গদ্য। ৪০-৫০ এর দশকের নয়। কিছু প্রাচীন।বঙ্কিমচন্দ্র। আনন্দমঠের প্রথম পৃষ্ঠা, উপক্রমণিকা বাদ দিলে। প্রকাশকাল ১৮৮২ খ্রীষ্ঠাব্দ। তার আরো ৬০ বছর বাদে ১৯৪৩-এর মন্বন্তর আসবে। বঙ্কিম স্বভাবতই তা দেখে যেতে পারবেন না। কিন্তু কী আশ্চর্য, ৬০ বছর আগেই প্রায় অলৌকিক ভবিষ্যতদ্রষ্টার প্রিসিশনে তিনি লিখে যাবেন ঐ পংক্তিমালা, যাকে প্রায় অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে নেওয়া যাবে ১৯৪৩-এর মন্বন্তরের বর্ণনার সঙ্গে।

আসলে তো আশ্চর্য কিছু নয়। ভবিষ্যৎ নয়, তিনি খুঁড়ে দেখছিলেন অতীত। তিনি খুঁজে দেখছিলেন ১১৭৬ বঙ্গাব্দ, ইংরেজী ১৭৭০ সন। ছিয়াত্তরের মহামন্বন্তর। সংবাদপত্রের রিপোর্টাজকে
তাঁর প্রতিভাবান কলম বদলে দিচ্ছিল সাহিত্যে, যেমনটা বাংলাভাষা আগে আর কখনো দেখে নি-

"১১৭৬ সালে গ্রীষ্মকালে এক দিন পদচিহ্ন গ্রামে রৌদ্রের উত্তাপ বড় প্রবল। গ্রামখানি গৃহময়, কিন্তু লোক দেখি না।...রাজপথে লোক দেখি না, সরোবরে স্নাতক দেখি না, গৃহদ্বারে মনুষ্য দেখি না, বৃক্ষে পক্ষী দেখি না, গোচারণে গরু দেখি না, কেবল শ্মশানে শৃগাল-কুক্কুর। এক বৃহৎ অট্টালিকা-...তাহার অভ্যন্তরে ঘরের ভিতর মধ্যাহ্নে অন্ধকার,অন্ধকারে নিশীথফুল্লকুসুমযুগলবৎ এক দম্পতি বসিয়া ভাবিতেছে। তাহাদের সম্মুখে মন্বন্তর।"

৭৬-এর মন্বন্তর।মারা যাবেন এক কোটি মানুষ। সেসময়কার বাংলার মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ। পরবর্তী ১২৭ বছরে ভারতবর্ষ নামক কলোনিতে ঘটে যাবে কমপক্ষে আরো ২৫টি দুর্ভিক্ষ (2) । আশ্চর্য এই, গ্রামবাংলা, গ্রামভারতের মানুষ এই এতগুলো বছর ধরে রয়ে যাবে সেই একই কালে। যে কালে প্রায়ই সে খেতে পায় না, ক্ষিদের জ্বালায় ছেলে-মেয়ে-বৌ বেচে,লতা-পাতা খায়, পালে পালে ইঁদুরের মত মরে। যে কালে তার সামনে, তার ঘরের দরজা আগলে সবসময় বসে থাকে এক রুদ্রচন্ডাল । মন্বন্তর। পৃথিবী কত পাল্টে যায়, শিল্পবিপ্লব ঘটে একরকম তারই টাকায়, যোগাযোগ-যানবাহন বদলে যায়,কোম্পানীর হাত থেকে রাণীর হাতে চলে যায় দেশ, একটা মহাযুদ্ধ পেরিয়ে দু নম্বর মহাযুদ্ধে ঢুকে পড়ে মানুষ; সে তবু পাল্টায় না। পাল্টায় না তার ক্ষিদে। তার মরবার ধরণ।

অথচ আশ্চর্য এও, যে সবদিন এমন ছিল না। একেবারেই ছিল না।ক্লিশে শোনালেও সত্যিই বাংলা ছিল এককালে সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা। ১৬৬৫ খ্রীষ্টাব্দে ফরাসী চিকিৎসক ফ্রাসোঁয়া বার্নিয়ের বাংলায় এসে তার সম্পদ আর প্রাচুর্য দেখে হাঁ হয়ে যাবেন। বলবেন, বাংলা হল "the finest and most fruitful country in the world... Bengale abounds with every necessary of life...(t)he rich exuberance of the country ,together with the beauty and amiable disposition of the native women,has given rise to a proverb in common use among the Portuguese,English and Dutch, that the kingdom of Bengale has a hundred gates open for entrance,but not one for departure. "(3)। ভিনদেশী ব্যবসায়ীরা বাঙ্গালী ব্যবসাদারদের সঙ্গে বানিজ্যে নামতে পারে না, কেননা বাংলার অভাব তো কোনো কিছুর নেই। বাংলার চাল যায় সিংহল ও মালদ্বীপে,চিনি যায় আরব ও মেসোপটেমিয়ায়, রেশম ইউরোপে।বাংলার তুলোর গুণমান দেখে পৃথিবীর লোকে অবাক হয়ে যায়, কুড়ি গজী একটি মসলিন কাপড় একটা নস্যির কৌটোর মধ্যে এঁটে যায়। এরকমই একটি মসলিন সমসাময়িক আরেক পর্যটক মীর্জা নাথান ৪০০০ টাকা দিয়ে কিনবেন; পাঠক, মনে রাখুন , তখন এক টাকায় কুড়িটি মুরগী কিনতে পারা যেত (4)।নিতান্ত হেঁটো মানুষেরাও ভাত খেত তিন-চার রকমের তরি-তরকারি আর ঘি-মাখন দিয়ে। মাছ-মাংস ছিল অপর্যাপ্ত।

বার্নিয়েরের বাংলাভ্রমণের প্রায় একশো বছর বাদে ইংরেজ ভাগ্যাণ্বেষী যুদ্ধবাজ লেফটেন্যান্ট কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ এসেও বাংলাদেশ দেখে মুগ্ধ হয়ে যাবেন, এলাকাটিকে তিনি 'ভূস্বর্গ' বলে বর্ণনা করবেন। তার পরের ইতিহাস সকলেরই জানা।১৭৬৫ সালে, বক্সারের যুদ্ধের এক বছর পরে মীর জাফর মারা গেলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁর এক ছেলেকে বাংলার মসনদে বসাবে ২,৩০,০০০ পাউন্ড অর্থের বিনিময়ে। এবং বাংলার শাসনভার বকলমে নিজেদের হাতে তুলে নেবে। বাংলা তখনো ভারতের সমৃদ্ধতম প্রদেশ (5) । পলাশীর যুদ্ধের পর ক্লাইভ তাঁর লুটের মাল দুই জাহাজ ভর্তি করে বিলেতে পাঠানোর পরেও।

এবং পাঁচ বছরের মধ্যেই বাংলা ভারতের দরিদ্রতম প্রদেশে পরিণত হবে। কোম্পানির ডিরেক্টর থেকে শুরু করে সাধারণ ইংরেজ কর্মচারী সকলেই যে যতটা পারে ফুলে-ফেঁপে লাল হবে; ইংল্যান্ডে কোম্পানির শেয়ারের দাম আকাশ -ছোঁয়া হবে, মহামান্য ইংরেজ রাজসরকার বছর বছর ৪,০০,০০০ পাউন্ড মুনাফার ভাগ পাবেন। এবং খাজনা-আদায়কারীর অত্যাচারে চাষীরা প্রায়শঃ সন্তান বিক্রি করতে বাধ্য হবে; কেউ বা দেশ ছেড়ে পালাবে। আসবে ১৭৭০ সন; ১১৭৬ বঙ্গাব্দ।আসবে ভয়াবহ অনাবৃষ্টি। ক্ষেতের ফসল ক্ষেতেই শুকিয়ে যাবে। চালের দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় ব্রিটিশ কর্মচারীরা যত পারে চাল কিনে নেবে;খাজনা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় জবরদস্তি খাজনা আদায় শুরু করে দেবে। দয়াহীন প্রাবৃটহীন প্রখর গ্রীষ্মে শুকিয়ে যাওয়া ধানগাছের মতই লক্ষ লক্ষ বাঙালী চাষী মরে যেতে থাকবে। বাংলার লক্ষ লক্ষ দম্পতি স্তম্ভিত হয়ে দেখবে-"তাহাদের সম্মুখে মন্বন্তর।"
-----

সার উইলস্টন লিওনার্ড স্পেন্সার চার্চিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ছিলেন ব্রিটিশ রয়াল নেভি'র রাজনৈতিক প্রধান (First Lord of Admirality)। তাঁর নেতৃত্বেই ব্রিটিশ নৌবাহিনী জার্মানীর বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ জারি করে , যাতে অবরুদ্ধ দুর্গের ভেতরে আটকে -পড়া মানুষের মত অবরুদ্ধ,অসহায় জার্মানরা ক্ষিদে সইতে না পেরে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। এ কাজে তিনি এত সফল হন, যে ফ্রান্সে তাঁর ডাকনাম হয়ে যায় 'ভুখমারা'-The Famisher। চার্চিল ও তাঁর সঙ্গীসাথীরা জানতেন আধুনিক সমর-বিদ্যায় ক্ষিদেকে অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করবার মাহাত্ম্য।জানতেন যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগে সবচেয়ে জরুরি কাজগুলির মধ্যে একটি হল দেশের খাদ্য-সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

১৯৩৬ সালের গ্রীষ্মে ব্রিটেনে র‌্যাশনিংয়ের জন্য একটি সাবকমিটি তৈরী করা হল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখনো তিন বছর দূরে। কিন্তু ঈশানকোণে যুদ্ধের ছায়া ঘনিয়ে উঠতে শুরু করেছে। সে বছরের ডিসেম্বরে হিজ ম্যাজেস্টি'জ গভর্নমেন্টের একটি জরুরী খাদ্যবিভাগ চালু হয়ে গেল। অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য, যথা মাখন, চিনি, বেকন,হ্যাম ও অন্যান্য মাংসের জন্য র‌্যাশনিংয়ের পরিকল্পনা ছকে ফেলা হল। সবচেয়ে জরুরী খাদ্য রুটি ও আলুর জন্য প্রচুর ভর্তুকির ব্যবস্থা হল। একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী কেনাকাটা'র (bulk purchasing) ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী হল। কেননা কর্তারা সঠিক ভাবেই বুঝেছিলেন, মজুতদারী-কালোবাজারী রুখতে হলে এছাড়া উপায় নেই। ঠিক করা হল যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই একটি খাদ্য মন্ত্রক কাজ করা শুরু করে দেবে।

হলও তাই। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্বকথিত খাদ্যসামগ্রীগুলি র‌্যাশনিংয়ের আওতায় চলে গেল। চা, মার্জারিন, চীজ ও জামাকাপড়ও ক্রমে র‌্যাশনড হল। ক্যানড্‌ মাছ, শুকনো ফল, বিস্কুট, চালের ওপর পয়েন্ট্স-র‌্যাশনিং চালু হল।শ্রমিকদের জন্য প্রচুর ভর্তুকি দিয়ে ক্যান্টিন চালু করা হল। পাঁচ বছরের কমবয়সী বাচ্চাদের জন্য নিখরচায় ফলের রস আর কড লিভার অয়েলের ব্যবস্থা হল। স্কুলের ছেলেমেয়েদের দৈনিক খাবার দেওয়া হতে থাকল।
ফল হল অদ্ভুত। নিয়মিত বোমাবর্ষণ আর কমে-আসা রসদ সত্ত্বেও যুদ্ধের শেষে দেখা গেল ব্রিটিশ জনগণের গড় স্বাস্থ্যের মান বেড়ে গেছে।(6)

তবে কিনা কলোনি তো আর এম্পায়ার নয়। অতএব ভারতের জন্য আলাদা বন্দোবস্ত। কিম্বা বন্দোবস্তের অভাব। ১৭৭০ থেকে ক্রমাণ্বয়ে চলে আসা মন্বন্তর ঠেকাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বা মহারাণীর সরকার কেউই বিশেষ উদগ্রীব ছিলেন একথা বললে তাঁদের নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হবে। কিন্তু মন্বন্তর চলতে থাকলে কালা আদমী মরার সঙ্গে সঙ্গে আরো একটি আনুষঙ্গিক ক্ষতি হয়- তা হল রাজস্ব শুকিয়ে আসা। কাজেই নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছু একটা করতে হয়। ১৮৮০ সালে সরকার নড়ে বসেন; বাংলায় একটি ফ্যামিন কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশন ঠিক কী কাজ করেছিল জানা নেই, কেননা তার ১৬ বছর পরেই বাংলা এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখে পড়ে-১৭৭০ সালের পরে সবচেয়ে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। ১৮৯৬-৯৭য়ের সেই দুর্ভিক্ষের সময় 'বেঙ্গল ফ্যামিন কোড' নামে একটি পুস্তিকা চালু হয়। সেটি শেষ আপডেট করা হয়েছিল ১৯১৩ সালে। তারপর দীর্ঘ সময় সেই কোডের কী হাল হল, সে নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা ছিল না।তার আবার খোঁজ পড়ে '৪৩-এর মন্বন্তরের সময়। এবং মজার কথা-দেখা যায়, সেটি তখন আউট অফ প্রিন্ট। এবং তার কোনো কপিও কারো কাছে নেই। ৪৪ সালে ফ্যামিন কমিশনের কাছে সাক্ষ্য দিতে এসে বিধায়ক কে সি নিয়োগী বলেন, তিনি যতটুকু জানেন,১৯৪১ সালে ছাপা একটি ফ্যামিন ম্যানুয়াল দিয়েই কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছিল; সেই ম্যানুয়ালটিও সহজলভ্য ছিল না। নিয়োগীমশায় কোনোমতে তার একটি কপি হস্তগত করেছিলেন। এহেন ম্যানুয়ালটির সূচনাতেই অবশ্য বলে দেওয়া ছিল-এটি কোনোমতেই বেঙ্গল ফ্যামিন কোডের বিকল্প নয়, এখানে ঐ কোডের মূল নিদের্শাবলির হদিস দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র ।
-----

যুদ্ধ নিয়ে অবশ্য বাংলার গ্রামগুলিতে কারো তেমন মাথাব্যথা ছিল না। কেননা যুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই ১৯৩০-এর মহামন্দার জেরে বাঙালী চাষীর অবস্থা সঙ্গীন হয়ে উঠেছিল; অন্য কিছু ভাবার তার আর সময় ছিল না, সুযোগও না। ১৯৩৪ সালে পাটের দর একধাক্কায় নেমে গেল আগের দামের ৪০ শতাংশয়। ধানের দামও তথৈবচ। ৫ বছর আগের দরের আদ্ধেক দরে চাষীকে ধান বেচতে হল। এদিকে জীবনযাত্রার খরচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার তুলনায় দেড় গুণ বেড়ে গেছে।অজস্র চাষীকে মহাজনের কাছ থেকে বিপুল ধার নিয়ে চাষ করতে হল। কিন্তু চাষ করে লাভের দেখা নেই, বরং লোকসান। অগত্যা আরো ধার, আরো লোকসান। এই বিষচক্র কেটে বেরোতে গেলে জমি-জমা, গরু-ছাগল, ঘটিবাটি অবধি বিক্রি-বন্ধক দেয়া ছাড়া উপায় নেই। কাতারে কাতারে চাষী ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকে পরিণত হল। অবস্থা এমন যে, মহাজনেও আর ধার দেয় না।ত্রিশের দশকের শেষদিক থেকেই বাংলার অনেক চাষীর ঘরে অনাহার নিত্যসঙ্গী হয়ে গেল (7) । যদিও এমন কি '৩৩ সালে করা একটি সার্ভেতেই দেখা যাচ্ছিল ভারতের সব প্রদেশের মধ্যে বাংলাতেই অপুষ্টির হার সবচেয়ে বেশী- বাঙ্গালীদের মধ্যে ৪৭% মানুষ অপুষ্টিতে ভোগেন আর ৩১% ভয়ঙ্কর অপুষ্টির শিকার। (8)

'৩৯ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক বছরের মধ্যে চালের দাম লাফ দিয়ে ৩৩% বেড়ে গেল। '৪১ সালে বাড়লো আরো ৩৬%। পাল্লা দিয়ে বাড়লো চিনি,ডাল, তেল, কেরোসিনের দাম। তাঁতের দাম এত বেড়ে গেল যে অসংখ্য তাঁতী ব্যবসা বন্ধ করে দিল। নোয়াখালি-টিপেরায় ফ্যামিন কোড অনুযায়ী Test Work ( ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য শ্রম-শিবির) চালু হল। বিশাল সংখ্যক মানুষ এসে ক্যাম্পে যোগ দিলেন। কোডের হিসেবমত এক্ষেত্রে সরকারীভাবে 'দুর্ভিক্ষ' ঘোষণা করার কথা। কিন্তু তা করা হল না। উত্তরবঙ্গে গরীব চাষী ও ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকরা জোতদারদের ধানের গোলা লুঠ করতে শুরু করল।এলাকায় এলাকায় রিলিফের দাবীতে ভুখমিছিল শুরু হল।

শহর কলকাতার অবস্থাও তখন খুব একটা সুবিধার নয়। মহামন্দার হাত থেকে কারোই রেহাই নেই। বাড়তি বেতন আর 'যুদ্ধ বোনাস'এর দাবীতে মহানগর উত্তাল। হুকুমচাঁদ জুট মিলে ১১,০০০ শ্রমিক ধর্মঘট করলেন। মিলমালিকদের অ্যাসোসিয়েশন সবার ১০% বেতন বাড়াতে বাধ্য হলেন(যুদ্ধের সময় বাংলার পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা তখন তুঙ্গে)। ১৯৪০-এর মার্চে কলকাতা কর্পোরেশনের ২০০০০ শ্রমিক(ধাঙ্গড়-ঝাড়ুদাররা) ধর্মঘটে গেলেন। সেপ্টেম্বরে ট্রাম কোম্পানি আর পোর্ট ট্রাস্টের কর্মচারীরা বাড়তি যুদ্ধ-বোনাসের দাবী জানালেন। '৪১-এর ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত সরকার Essential Service Maintenance Ordinance আনলেন। এই অর্ডিন্যান্সের আওতায় যেসব শিল্প এল, তাদের 'ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি' বলে ঘোষণা করা হল। এইসব ইন্ডাস্ট্রির শ্রমিকরা বিনা কারণে ছুটি নিলে কিম্বা চাকরি ছেড়ে দিলে তাঁদের জেল-জরিমানার বিধান দেওয়া হল অর্ডিন্যান্সে। বিনিময়ে অবশ্য সরকার তাঁদের 'অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক' (Priority Citizen) বলে ঘোষণা করলেন। আগামী কয়েক বছরে এই তকমা হবে দুর্ভিক্ষের মধ্যে তাঁদের বেঁচে-থাকার পরোয়ানা। সে কথা অবশ্য তখনো কেউ তাঁরা কল্পনাতেও আনতে পারবেন না।

Notes
1.https://www.livemint.com/Politics/OIdNvn30nqdrGQC6pARu3J/India-has-largest-number-of-malnourished-children-in-the-wor.html
2.Janam Mukherjee, Hungry Bengal,Oxford University Press, 2015, p.28
3.Madhusree Mukherjee, Churchill's Secret War, Penguin Random House India, 2010,prologue, p.xix (Bernier, Travels in the Mogul Empire,pp.438-39)
4.Ibid, p. xviii
5.Ibid, p.xxii (Dutt, The Economic History of India, Vol.1, p.21)
6.Janam Mukherjee, p.26, (Zweiniger-Bargielowska quoting Board of Trade, Report, 1937,p.14)
7.ibid, p.39
8.Madhushree Mukherjee, p. 55.


দ্বিতীয় পর্বের লিংক-
http://www.guruchandali.com/blog/2018/11/25/1543093729731.html?author=
indradr

পর্ব ২
--------

আসন্ন জাপানী আক্রমণের হাত থেকে ভারতকে বাঁচাবার কোনো বন্দোবস্ত ব্রিটিশ সরকার অন্ততঃ ১৯৪১এর শেষদিক অবধি করে উঠতে পারে নি। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে তখন ১০ লাখ সৈন্য, কিন্তু অধিকাংশই আনপড়; অস্ত্রশস্ত্রের অবস্থাও তথৈবচ। সেরা সাতটি ভারতীয় ডিভিশন তখন ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অক্ষশক্তির সঙ্গে প্রাণপণ লড়াইয়ে ব্যস্ত। এদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের "দ্বিতীয়" শহর কলকাতা প্রায় অরক্ষিত। কোনো অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান, এয়ার রেইড ফ্লাড লাইট বা রাডার সেট নেই; নেই কোনো আধুনিক ট্যাঙ্ক বা ফাইটার প্লেন। জেনারেল অকিনলেক ওয়ার ক্যাবিনেটের কাছে গোটা ভারতের জন্য নিদেনপক্ষে একটিমাত্র সাঁজোয়াবাহিনী চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। "কিন্তু জেনারেল, আপনি কি করে জানলেন যে ওগুলি আমাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে না?'' এই ছিল চার্চিলের উত্তর। (1)

চার্চিল ভারতের সুরক্ষাবলয় শক্তিশালী করায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর মনে সদাই ভয় ছিল, ভারতীয় সেনাবাহিনীতে উন্নতমানের প্রশিক্ষণ বা অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার শুরু হলে ভারতীয় সৈন্যরা কোনদিন তাই দিয়ে উল্টে আর একটি মহাবিদ্রোহ শুরু করে দেবে, যেমনটা হয়েছিল ১৮৫৭তে। তাছাড়া সিঙ্গাপুরের দুর্ভেদ্যতার উপর চার্চিলের বিশ্বাস ছিল অটল।

জাপানী সৈন্যরা অবশ্য অন্যরকম ভেবেছিল। সিঙ্গাপুরের দক্ষিণ তটরেখা বরাবর কংক্রীটে গাঁথা সারি সারি অ্যান্টি এয়ারক্র্যাফট গান, তাদের পেরিয়ে জাপানী বাহিনীর ক্ষমতা নেই সিঙ্গাপুরের কেশাগ্র স্পর্শ করে। উত্তরে দুর্ভেদ্য পাহাড়-জঙ্গল, সেখানে ট্যাংক তো দূরস্থান, নিদেনপক্ষে একটা আর্মি জিপও ঢোকা সম্ভব না; বাহুল্য বিবেচনা করে ব্রিটিশ সৈন্য সেদিকে পাহারা দেয় না। জাপানী সৈন্যরা স্রেফ বাইসাইকেলে করে সেই গভীর জঙ্গল পেরিয়ে সিঙ্গাপুরের ব্যুহ ভেদ করে ফেলল। প্রায় বিনাযুদ্ধে কর্নেল হান্ট তাঁর ৬০০০০ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পন করলেন।দক্ষিণ তটরেখার অ্যান্টি এয়ারক্র্যাফট গানগুলি যেমন ছিল, তেমনই রইল, একটিও গোলা ছোঁড়া হল না।

'৪২ এর ১৫ই ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুরের পতন হয়। ৭ই মার্চ রেঙ্গুন। দলে দলে ইউরোপীয়রা যাবতীয় সামরিক-অসামরিক যানবাহন দখল করে বার্মা ছেড়ে পালায়। বার্মার স্থানীয় মানুষজন/ভারতীয় সৈন্য/অভিবাসী ভারতীয়-কারো দিকে তারা ফিরেও থাকায় নি। প্রায় ৬ লাখ ভারতীয় রিফিউজি সম্পূর্ণ নিজেদের চেষ্টায় নানান পথ ধরে ভারতে এসে পৌঁছয়। এদের মধ্যে ৪ লাখ মানুষ ৬০০ মাইল পথ পাহাড়-জঙ্গলের মধ্য দিয়ে কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো খচ্চর-টানা গাড়িতে করে ঘোর পাহাড়ী বৃষ্টিতে ভিজে, খাদ্যহীন-আশ্রয়হীন-ওষুধপথ্যহীন অবস্থায় পাড়ি দেয়। ভারত সরকার এদের সামান্যতম সাহায্যও করে নি। রাস্তাতেই প্রায় ৮০০০০ মানুষ মারা যায়। এদের একটা বড় অংশ ছিল বাঙালী; পথের বিভীষিকা কাদা-জঙ্গল-জোঁক-বন্যজন্তু, সাথীদের মৃত্যু, অনাহার-ম্যালেরিয়া-আন্ত্রিক-গুটি বসন্ত-সব মিলিয়ে এই মানুষদের আধমরা করে ফেলেছিল; সেই অবস্থাতেই ধুঁকতে ধুঁকতে তারা বাংলার গ্রামগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে; হাটে-বাজারে ভিক্ষে করে খায়, জাপানী-অত্যাচার-ব্রিটিশ অসহযোগিতা আর নিজেদের দুর্দশার কথা বলতে বলতে নিজেরাই শিউরে ওঠে। তাদের প্রলাপ-জড়ানো কথার মধ্য থেকে সত্যিটুকু ছেঁকে বের করা কঠিন।

রেঙ্গুনের পতনের সাথে সাথে কলকাতা হয়ে দাঁড়ায় পূর্ব রণাঙ্গনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শেষ শিল্পনগরী। ১৮ই ডিসেম্বর কলকাতা ও তার শহরতলীগুলিকে সরকারের পক্ষ থেকে "বিপজ্জনক এলাকা " বলে ঘোষণা করা হয়। কলকাতার স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব তখন বিশাল- যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে করেই হোক এই শহরকে সচল রাখতে হবে।কলকারখানাগুলিকে চালু রাখতে হবে, যুদ্ধসামগ্রী ও রসদ উৎপাদনে যেন এতটুকুও ভাঁটা না পড়ে। কিন্তু দলে দলে পরিযায়ী শ্রমিকরা কারখানা ছেড়ে মুলুকে পাড়ি দিতে থাকে, অর্ডিন্যান্স-জেল-জরিমানার তোয়াক্কা না করে।মারোয়ারী ব্যবসায়ীরা ব্যবসাপত্তর গুটিয়ে নিয়ে মধ্য ও উত্তর ভারতের দিকে রওনা হয়ে যায়। বাঙালী সঙ্গতিবান মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তরা রওনা হয়ে যায় শহর ছেড়ে বাংলার গ্রামগুলির পথে। কলকাতা তখন এক ভুতুড়ে নগরী, প্রতি রাত্রেই ব্ল্যাক আউট আর এয়ার রেইডের গুজব; হাওয়ায় ভাসছে আসন্ন ব্রিটিশ -পরাজয়ের কথা।

যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন ভারত খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বাবলম্বী নয়। বার্মা আর থাইল্যান্ড থেকে প্রতি বছর এক থেকে দু মিলিয়ন টন চাল না আনলে ভারতের চলে না। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় জাপান আস্তানা গেড়ে বসার সাথে সাথে সেই চালের আমদানি বন্ধ হয়ে গেল। এদিকে সেই সময় থেকেই যুদ্ধের জন্য ভারত খাদ্যশস্য আমদানির বদলে উল্টে রপ্তানী করা শুরু করেছে (2)। ১৯৪২-এর এপ্রিল মাসে ভারত থেকে রেকর্ড ৬৬০০০ টন চাল বিদেশে রপ্তানি হয়; যদিও তখন তাকেই কে খাওয়াবে তার ঠিক নেই। (3)

যুদ্ধ শুরুর আগে বাংলায় চালের দাম ছিল মণপ্রতি ৯ টাকা। '৪২ -এর মার্চ মাস নাগাদ কোনো কোনো জেলায় সে দর ঠেলে উঠল ১০০ টাকা প্রতি মণ (4)। 'অশনি সংকেত'-এ গঙ্গাচরণ হাট থেকে ফিরে এসে অনঙ্গ বৌ-কে বলেছিল-"আজ একটি আশ্চর্যি কান্ড দেখলাম-.. পয়সা হোলেও জিনিস মেলে না এই প্রথম দেখলাম... চালও কিনে রাখতে হবে নাকি।" কিন্তু তখনো তাদের আরো অনেক কিছু দেখা বাকি। খুব শিগগিরই তারা দেখতে পাবে দুবেলা চাল কিনে খেতে পারে, এত পয়সাওলা মানুষ মেলাও মুশকিল। গ্রামে তখন গিজগিজ করছে কলকাতা থেকে পালিয়ে আসা শহুরে বাবুদের দঙ্গল। পয়সার লড়াইয়ে তাদের হারিয়ে চাল-ডাল কিনে খায়, এত ট্যাঁকের জোর গাঁয়ের মানুষের নেই।

'৪২ এর ৬ই ফেব্রুয়ারি ভাইসরয়ের ডাকে দিল্লীতে চতুর্থ প্রাইস কন্ট্রোল কনফারেন্স বসল (এর আগের তিনটি কনফারেন্স অশ্বডিম্ব প্রসব করে মারা যায়)। দ্রব্যমূল্য বেঁধে দেওয়ার বদলে কমিটি উল্টে মুক্ত বাণিজ্যের পক্ষে সওয়াল করল। প্রদেশগুলিকে বলা হল পণ্যের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার কথা; ভাবা হল, প্রদেশগুলির মধ্যে খাদ্যসামগ্রীর অবাধ বাণিজ্য চালু হলেই অভাবী প্রদেশগুলিতে খাদ্যশস্যের দাম কমে আসবে। মার্চ মাসে ভারত সরকার বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্সকে ডেকে জানালেন, নিজেদের কারখানার শ্রমিকদের খাওয়ানোর ভার নিজেদেরই কাঁধে নিতে হবে; সরকার কোনোরকম সহযোগিতা করতে পারবেন না- ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফার্মগুলি যেন আগামী তিন মাসের প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য মজুদ করে রাখে (5) । সরকার নিজেই এহেন সাবধানবাণী শোনালে বাজারের ওপর তার প্রতিক্রিয়া কী হয় তা সহজেই অনুমেয়। শিল্পপতি, ধান্দাবাজ ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ সবাই মিলে পাগলের মত খাদ্যসামগ্রী মজুদ করতে শুরু করল। জুন মাসে চালের দাম আরো ৩০% বেড়ে গেল।


'৪১-এর নভেম্বর মাসেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল কলোনির পরাজয়সম্ভব এলাকাগুলিতে নির্দয়ভাবে পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করবার ওপর জোর দেন। ভারতমহাসাগর সংলগ্ন এলাকাগুলির জন্য এই সতর্কবার্তা বিশেষভাবে প্রযোজ্য বলে ওয়ার অফিস বার্তা পাঠায়। ঠিক হয়, সেনা বাহিনী কল-কারখানা, সেনাঘাঁটি ও রাস্তাঘাট ধ্বংস করবার ব্যবস্থা করবে। অসামরিক কর্তৃপক্ষ স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য ন্যূনতম ব্যবস্থা রেখে বাকি খাদ্যসামগ্রী হয় সরিয়ে আনবে, নয়তো কোনোভাবে নষ্ট করে দেবে (জলে ফেলে কিংবা পুড়িয়ে)।

মার্চের শেষদিকে বাংলার গভর্নর হার্বার্ট সেইমত উপকূলবর্তী বাংলার জন্য একটি পোড়ামাটি নীতি প্রণয়ন করেন। বিখ্যাত ব্রিটিশ ইউফেমিজমের রীতি মেনে এর পোষাকী নাম দেওয়া হয় 'ডিনায়াল'।মন্ত্রীসভার কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে গভর্নর হার্বার্ট তাঁর বিশেষ ক্ষমতাবলে ভাইসরয়ের ব্যক্তিগত সচিব এল জে পিনেলকে বাংলায় ডিনায়াল অপারেশন কার্যকরী করবার দায়িত্ব দেন । বাংলার বিধানসভার অধিবেশন তখন ইস্টারের ছুটি উপলক্ষে স্থগিত, অতএব নির্বাচিত বিধায়্করা এর আগামাথা কিছুই জানতে পারলেন না। সামরিক প্ল্যানাররা কলকাতার কমবেশী কুড়ি মাইল দক্ষিণে ম্যাপের ওপর পুব থেকে পশ্চিম অবধি একটি লাইন টেনে দিলেন; এর বাইরের এলাকাগুলিতে পুরোদস্তুর ডিনায়াল কার্যকরী হবে। জরুরী ফাইলপত্তর ও শ্বেতাঙ্গ মহিলাদের এইসব এলাকা থেকে সরিয়ে আনা হল।

ডিনায়াল ঠিক কবে থেকে চালু হয়েছিল, তা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। আই সি এস অশোক মিত্র তাঁর আত্মজীবনীতে লিখে গেছেন, ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকেই তিনি জানতে পারেন, পুলিশ গ্রামে গ্রামে ঘুরে চাল বাজেয়াপ্ত করছে। সাংবাদিক সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত দাবী করেন, পূর্ব বঙ্গের তিনটি নদী বন্দরে মজুত কয়েক হাজার টন চাল নদীতে ফেলে দেওয়া হয় (6)।

বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক পরে অভিযোগ করেছিলেন (এবং সে অভিযোগের যথেষ্ট সারবত্তা আছে), গভর্নর হার্বার্ট জনৈক অফিসারকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে বাংলার তিনটি জেলা-মেদিনীপুর, খুলনা ও বরিশাল থেকে বাড়তি চাল সরিয়ে ফেলবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আলোচ্য অফিসারটি হলেন শ্রম ও বাণিজ্য দপ্তরের জয়েন্ট সেক্রেটারি এম কে কৃপালনী। তিনি হিসাব করে দেখেছিলেন, এই তিন জেলায় মোটামুটি ১,২৩,০০০ টন 'উদ্বৃত্ত' চাল রয়েছে। এবং এই বিপুল পরিমাণ চাল এত অল্প সময়ে বাজার থেকে বাজেয়াপ্ত করা প্রশাসনের কম্মো নয়। অগত্যা তিনি চালের বাজারের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যবসায়ী ইস্পাহানীকে ধরলেন। এদিকে ইস্পাহানী মুসলিম লীগের নেতা, এবং তাঁকে এই ভার দিলে ফ্জলুল হক, শ্যামাপ্রসাদ ও কংগ্রেসের নেতারা রেগে আগুন হয়ে যাবেন। ইস্পাহানী নিজেও তা আঁচ করে তাঁর নিজের নামের বদলে তাঁরই এজেন্ট মির্জা আলি আকবরের নামে এই এজেন্সি বরাদ্দ করতে বললেন। নিরুপায় কৃপালনী সেই মুহূর্তে রাজী হয়ে খরচাবাবদ ইস্পাহানীকে আগাম ২০ লক্ষ টাকা মঞ্জুর করলেন। (7)

কিন্তু খবর চাউর হতে দেরী হল না। বিধানসভা খোলার সঙ্গে সঙ্গে এই নিয়ে তুমুল হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। অগত্যা প্রশাসনের তরফ থেকে আরো চার জন এজেন্টকে নিয়োগ করা হল, এঁদের একজন হিন্দু মহাসভার নেতা, একজন শিডিউল্ড কাস্ট মন্ত্রীর প্রস্তাবিত সদস্য, একজন কংগ্রেসী মুসলিম ও অন্যজন এক বড় ব্যবসায়ী। মজার কথা এঁদের অনেকেরই এই কাজে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না।তদুপরি নানান জন নানান বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, কাজেই এঁদের মধ্যে বোঝাপড়া বলে কিছু নেই।

বাংলায় তিনধরণের চাষের মধ্যে (আউশ, আমন, বোরো) আমন ধানের চাষই প্রধান; মোট ধান চাষের প্রায় ৭৫ % উৎপাদনই ছিল আমন ধান। আমন ফসল তোলার পরের কয়েক মাস(মাস চারেক মত) চাষীর হাত থাকত প্রায় শূন্য; দিন কাটত অনাহারে-অর্ধাহারে। এই সময় বেঁচে থাকার জন্য চাষীকে নির্ভর করতে হত পাইকার-ব্যাপারী-ফড়েদের ওপর, যাদের অধিকাংশই আবার মহাজনী ব্যবসাও করত। ছোট ব্যবসায়ীরা অনেকেই চাষীর কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনত। অর্থাৎ ধান-চালের ব্যবসার গোটা অর্থনীতি দাঁড়িয়ে থাকত অনেকটাই চাষী-ব্যাপারী-পাইকারের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর। '৪২ সালে ডিনায়াল অপারেশনের জন্য যেসব এজেন্ট ও সাব-এজেন্টদের নিয়োগ করা হয়েছিল, তারা সকলেই বাইরের লোক,কেউই এই গোটা ব্যবস্থার মধ্যে কখনো ছিল না এবং এ ব্যাপারের বিন্দুবিসর্গও জানতো না। বহিরাগত আক্রমণকারীর মত তারা এই জটিল বাজার-ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে চাল বাজেয়াপ্ত করতে শুরু করল, অনেকক্ষেত্রেই গায়ের জোরে, কেননা সরকারী নির্দেশ অনুযায়ী তারা প্রশাসনের কাছ থেকে এব্যাপারে সম্পূর্ণ মদত পেত। স্পেশ্যাল অফিসার পিনেল লিখেছেন-"যাঁরা বাংলার চাষীদের জানেন তাঁরাই বুঝতে পারবেন গোটা ব্যাপারটা ছিল কতখানি হৃদয়-বিদারক।" (8)

রাইস ডিনায়াল নিয়ে খোলাখুলি জোচ্চুরি চলেছিল সেসময়। প্রায়শঃই সরকারী এজেন্টরা ডিনায়াল-এলাকার বাইরে অন্যান্য জায়গা থেকেও সরকারের নাম করে জবরদস্তি চাল বাজেয়াপ্ত করত। বাজেয়াপ্ত করা চালের খুব অল্প অংশই সরকারী গুদামে জমা পড়ত। যুদ্ধের সময় পরিবহন ব্যবস্থা অপ্রতুল-তার ওপর রাইস ডিনায়ালের পাশাপাশি 'বোট ডিনায়াল'ও চলছে জোরকদমে- ফলে বাজেয়াপ্ত চালের বেশ কিছু অংশ গ্রামেই পড়ে থেকে নষ্ট হত। অনেক সময় সরকারী অফিসারদের ঘুষ দিয়ে বড় চাল-ব্যবসায়ী ও ধান-কল মালিকরা স্পেশ্যাল পারমিট বের করে ডিনায়ালের চাল নিজেরা কিনে নিত ও সরিয়ে ফেলত।

বোট ডিনায়াল-এর ধাক্কাও ছিল মারাত্মক।বাংলার কৃষি-অর্থনীতি আর পরিবহনে (বিশেষতঃ পূর্ববঙ্গে) নৌকার মাহাত্ম্য বাঙ্গালীকে বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। নোয়াখালির খালাসীরা নৌকায় করে বার্মা থেকে মেদিনীপুর চষে বেড়াত। খুলনা-বাখরগঞ্জের চাষীরা নৌকা করে নদীর চরে যেত চাষ-আবাদ করতে। চাঁটগাঁয়ের কুমোরদের মাটি আসত নৌকায়।নৌকাই ছিল জেলেদের একমাত্র ভরসা। পাট বলো পাট, ধান বলো ধান- ফসলমাত্রেই মাঠ থেকে বাজারে গিয়ে পৌঁছত নৌকায়। পোড়ামাটি নীতির নাম করে এই দেশী নৌকাগুলিকে ধ্বংস করা হল। উপকূলবর্তী জেলায় যে সমস্ত নৌকা ১০ জন বা তার বেশী মানুষ পরিবহন করতে পারে, তাদের রেজিস্ট্রি তৈরী হল। কমবেশী ৬৬০০০ এই জাতীয় নৌকার মধ্যে প্রায় ৪৬০০০ নৌকা বাজেয়াপ্ত করে পুড়িয়ে বা জলে ডুবিয়ে নষ্ট করে দেওয়া হল। নৌকার মালিকদের খেসারত দেওয়া হল, কিন্তু যেসব জেলে-কুমোর-খালাসী-চাষী এইসব নৌকা ইজারা নিয়ে জীবিকানির্বাহ করত তারা পেল লবডঙ্কা। অনেক প্রতিবাদের পরে ঠিক হয় তাদের তিন মাসের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। তিন মাসের ক্ষতিপূরণে তাদের আর কী হয়-দুয়েক প্রজন্মের উপার্জনের উপায় যেখানে এক নিমেষে কেড়ে নেওয়া হল। বিশেষ করে ঐ ভয়ংকর সময়ে, যখন এক মাসের রোজগারেই এক হপ্তাও চলে কিনা সন্দেহ। জনম মুখার্জী লিখেছেন-"অনেকের মনে হল, জাপানীরা নয়, ব্রিটিশরাই যেন বাংলার গ্রামগুলির বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করেছে" (9)। 'হরিজন' পত্রিকায় গান্ধী লিখলেন -'পূর্ববঙ্গের মানুষের কাছ থেকে নৌকা ছিনিয়ে নেওয়া তাদের দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়ার সামিল।'

ডিনায়াল অবশ্য জোরকদমে চলল। শুধু নৌকাই নয়, স্টীমার, বাইসাইকেল, গোরুর গাড়ি, প্রাইভেট কার-যাবতীয় বেসামরিক যানবাহন বাজেয়াপ্ত করে নষ্ট করা হতে থাকল। শুধু মেদিনীপুর জেলা থেকেই ১০০০০ বাইসাইকেল বাজেয়াপ্ত হল।(১০)

এতেই শেষ নয়। এরোড্রোম, সেনা ছাউনি, সাপ্লাই অফিস বসাবার জন্য কলকাতার দক্ষিণে ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে জমিজায়গা দখল করা শুরু হল। গভর্ণর বানিজ্যমন্ত্রককে নির্দেশ দিলেন ২৪ ঘন্টার মধ্যে এরকম ৪৭টি এলাকা দখল করতে হবে(১১) ডায়মণ্ড হারবারে কমপক্ষে ৩৬০০০ মানুষকে ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করা হল; নোয়াখালিতে ৭০০০০। ফ্যামিন এনকোয়ারি কমিশন পরে স্বয়ং স্বীকার করবেন-"Compensation was of course paid, but there is little doubt that the members of many of these families became famine victims in 1943." (12)

Notes
1.Madhushree Mukherjee, p.56
2.Ibid, p.55 (Ghosh, Kalicharan, Famines in Bengal, p.31)
3.Janam Mukherjee, p.55
4.Lizzie Collingham, The Taste of War, World War 2 and the Battle for Food, Penguin Books
5.Janam Mukherjee, p. 57
6.Madhushree Mukherjee, p.68 (অশোক মিত্র, তিন কুড়ি দশ, পৃ ১৪০-৪১; সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত, বঙ্গসংহার এবং, পৃ ৩৫)
7.Janam Mukherjee, p. 59 ( Nanavati papers, p.743).
8.Ibid, p.62 (Nanavati Papers, Testimony of L.G. Pinell, p.545).
9.Ibid, p.65.
10. Madhushree Mukherjee, p.67 (Nanavati papers, Vol II, p.544,547)
11.Janam Mukherjee, p.66 (Nanavati Papers, p.868)
12.Ibid, (Famine Enquiry Commission, Report on Bengal, p.27)
পর্ব ৩
------
'৪২ -এর ৮ই অগাস্ট এ আই সি সি-র অধিবেশনে 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের প্রস্তাব পাশ হল। পরদিন ভোরবেলাতেই ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়ে পুলিশ কংগ্রেসের অধিকাংশ প্রথম সারির নেতা ও কর্মীকে গ্রেপ্তার করে ফেলল। এতে দমে যাওয়া তো দূরের কথা, উল্টে ব্যাপক স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছড়িয়ে গেল উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের তৃণমূল স্তরের মানুষের মধ্যে।এই বিপুল আন্দোলন (যাকে লিনলিথগো ১৮৫৭-র পরে সবচেয়ে ব্যাপক আন্দোলন বলে বর্ণনা করেছেন) দমনে ব্রিটিশ পুলিশ-প্রশাসন-সেনাবাহিনী সেসময় যে বর্বরতা দেখিয়েছিল, তা সম্ভব হত না যদি না তাদের কাজকর্মে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল থেকে শুরু করে ভারতসচিব আমেরি হয়ে ভাইসরয় লিনলিথগো-এঁদের প্রত্যেকের সক্রিয় মদত থাকতো। ২রা সেপ্টেম্বর হাউজ অফ কমন্সে ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে বক্তৃতা দেবার প্রাক্কালে ক্ষিপ্ত চার্চিল আমেরির সামনে ফেটে পড়েন-"I hate Indians. They are a beastly people with a beastly religion."(1) তিনটি মহাদেশে যুদ্ধরত ব্রিটেনের সামনে 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন যেন যুদ্ধের আরেকটি ফ্রন্ট খুলে দিল। নিরস্ত্র মানুষের মিছিলে বিমান থেকে মেশিনগান দিয়ে গুলি চালনা কিংবা 'ডিনায়াল' নীতিকে সামনে রেখে আন্দোলনকারীদের ভুখা মারার চেষ্টা, বন্যার্ত মানুষকে ত্রাণ পাঠাতে অস্বীকার করা-এইজাতীয় বর্বরতাকে এছাড়া আর কী দিয়েই বা ব্যাখ্যা করা যায়!

কলকাতার ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি-র জন্য অবশ্য সদাসর্বদা আলাদা ব্যবস্থা। ১লা জুলাই সরকার চালের উর্ধ্বসীমা বেঁধে দিল। আড়তদাররা বিক্ষোভে ফেটে পড়ল, কেননা বাজারের দাম ইতিমধ্যেই এই উর্ধ্বসীমার অনেক ওপরে-সরকারী দামে চাল বেচতে হলে তাদের ডাহা ক্ষতি। অগাস্ট মাসে একশোটি সরকার-অনুমোদিত ব্যক্তিমালিকানাধীন কন্ট্রোল শপ খোলা হল। এই দোকানগুলির জন্য বীরভূম থেকে সরকার স্বয়ং নিজের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে অনেক বেশী দামে চাল কিনল। ফলে চালের বাজারে আতঙ্ক,আতঙ্কের সুযোগ নিয়ে কালোবাজারী, তার ফলে চালের দরবৃদ্ধি-এই বিষচক্র শুরু হয়ে গেল।

মেদিনীপুর জেলার তমলুকে ততদিনে অজয় মুখার্জি-সুশীল ধাড়া'র নেতৃত্বে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। জাতীয় সরকারের মুখপত্র 'বিপ্লবী'র প্রথম সংখ্যায় খবর বেরোলো-দানিপুর চালকল থেকে চাল বোঝাই করে একটি সরকারী নৌকা যাচ্ছিল; গ্রামবাসীরা সেটি আক্রমণ করে চাল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ গুলি চালালে তিনজন মারা যায়। দিনাজপুরে দশহাজার মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে সরকারী বাড়ি আক্রমণ করে ও আড়তদারদের কাছ থেকে ধান-চাল ছিনিয়ে নেয়। দু-সপ্তাহ বাদে জলপাইগুড়িতে এরকম এক বিক্ষুব্ধ জনতার জমায়েত হয়-স্থানীয় অফিসাররা আড়তদারের কাছ থেকে চাল নিয়ে খোলা বাজারে তা বেচার বন্দোবস্ত করলে তবে বিক্ষোভ প্রশমিত হয়। পুলিশের ডেপুটি ইনস্পেক্টর জেনারেল জানান-ডাকাতির ঘটনা খুব বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রেই ডাকাতির উদ্দেশ্য শুধু বাসন-কোসন/ জামা-কাপড় কিংবা খাবার-দাবার ছিনিয়ে নেওয়া, মূল্যবান সম্পদ হাতানো নয়-যেটা খুবই অস্বাভাবিক (2)।কাজেই দুর্ভিক্ষের সময় মানুষ যে টুঁ শব্দটি না করে নীরবে মারা গেছে, সেটা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। যদিও এটা ঠিক কথাই, কলকাতা শহরে কোনো বড় গোলমাল হয় নি, কেননা দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষেরা যখন কলকাতা শহরে এসে পৌঁছচ্ছে, তখন তারা মৃত্যুর মুখে, ছিনিয়ে খাওয়ার মত শক্তিটুকু তাদের আর অবশিষ্ট ছিল না।

১৬ই অক্টোবর এক ভয়াবহ সাইক্লোন মেদিনীপুর ও চব্বিশ পরগনার উপকূলবর্তী এলাকায় আছড়ে পড়ল। ঝড়ের এমন দাপট ছিল যে কোথাও কোথাও কুড়ি ফুট অবধি ঢেউ উঠে যায়।ঢেউয়ের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ১২০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা; বন্যার জলে আরো ১০০০ বর্গ কিলোমিটার। প্রবল ঝোড়ো হাওয়া আর মুষলধারে বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় ৮৩০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা (3)। ৭৪০০ গ্রাম তছনছ হয়ে যায়। কয়েক হাজার বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে হাজারে হাজারে মৃতদেহ ছড়িয়ে থাকে। সরকারী হিসেবেই মারা যায় প্রায় সাড়ে চোদ্দ হাজার মানুষ; বেসরকারী হিসেবে কমপক্ষে তিরিশ হাজার। মৃত গবাদি পশুর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১,৯০,০০০। প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ আত্মীয়্পরিজন-ঘরবাড়ি-গরুছাগল-ধানচাল-চাষের ক্ষেত হারিয়ে পথে বসেন। মেদিনীপুর জেলার মানুষজন '৪২-এর সেই ১৬ই অক্টোবরকেই মন্বন্তরের শুরুর দিন বলে মনে রেখেছেন।

এদিকে সাইক্লোনের আগে থেকেই এক ধরনের ছত্রাক রোগে (ব্রাউন স্পট ডিজিজ) আমন ধানের ক্ষতি হচ্ছিল। সাইক্লোনের সুযোগে এই ছত্রাকের স্পোর আরো বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে; বন্যায় যতটা না ফসলের ক্ষতি হয়েছিল, তার চেয়েও বেশী ক্ষতি হয় এই রোগে।

সাইক্লোনে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তমলুক আর কাঁথি-যে দুই এলাকাতে বিপ্লবী কার্যকলাপ চলছিল তুঙ্গে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্রশাসন সেখানকার রিলিফের কাজ চালু করতে দেয় নি। মেদিনীপুরের জেলা জজ ঘোষণা করেন -যতক্ষণ না চুরি-যাওয়া বন্দুক উদ্ধার হচ্ছে এবং 'ভবিষ্যতে আর কোনো সরকার-বিরোধী কাজকর্ম করা হবে না' বলে গ্রামবাসীরা মুচলেকা দিচ্ছে-ততক্ষণ সরকার সেখানে কোনো রকম ত্রাণকার্য চালাতে দেবে না। কলকাতা থেকে ত্রাণ নিয়ে আসা একটি স্বেচ্ছাসেবী দলকে গ্রেপ্তার পর্যন্ত করা হয়। (4)

সরকার অবশ্য এই বিপর্যয়ের খবর সম্পূর্ণ চেপে দেয়। একজন সেনা প্রধান স্টেটসম্যান-এর সম্পাদক ইয়ান স্টিফেন্সকে ডেকে পাঠিয়ে বলেন-এই খবর যেন ছাপানো না হয়; বাংলার উপকূল যে অরক্ষিত, জাপানী সেনা সে কথা জানতে পারলে সমূহ বিপদ(জাপান যদিও ঝড়ের শুরু থেকেই গোটা ব্যাপারটা পুঙ্খানুপুঙ্খ জানত)।ঝড়ের ১৮ দিন পরে ৩রা নভেম্বর স্টেটসম্যান পত্রিকায় খুব ছোট করে খবরটি বের হয়। অনেক টালবাহানার পর অনেক দেরীতে সরকার ত্রাণের কাজ শুরু করতে রাজী হয়। রাজস্বসচিব বিনয় রঞ্জন সেনকে এই ত্রাণকাজের ভার দেওয়া হয়। চালের জন্য তিনি নবগঠিত বেসামরিক সরবরাহ বিভাগে যোগাযোগ করলে তাঁকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়-চাল তাঁকে নিজেকেই বাজার থেকে কিনে নিতে হবে। সিভিল সাপ্লাই বিভাগ এই চাপ নিতে পারবে না। এত হাজার হাজার মানুষকে বাজার থেকে চাল কিনে খাওয়ানো যে একটি অবাস্তব প্রস্তাব, সরকার সেটি বুঝতে পারে নি, এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। মেদিনীপুরের মানুষজনের মতই ইতিহাসবিদ পল গ্রিনো-ও (Paul Greenough) মনে করেন , এই সাইক্লোনই ছিল বাংলার দুর্ভিক্ষের প্রথম ধাপ। (5)

ডিসেম্বর মাসে ক্রিসমাসের ছুটি কাটানোর জন্য বড়লাট লিনলিথগো কলকাতা এসে পৌঁছন (দিল্লীর হাড়-কাঁপানো ঠান্ডার বদলে মনোরম শীতের কলকাতায় ক্রিসমাস কাটানো অবশ্য তিনি বরাবরই পছন্দ করতেন)। আমেরিকে তিনি লেখেন-কলকাতার অবস্থা বেশ ভালো; গাদা গাদা ব্রিটিশ সৈন্য রাজপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে... কলকাতা যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত(6)। লিনলিথগো ফিরে যাবার পরের দিনই অবশ্য কলকাতার যুদ্ধপ্রস্তুতির পরীক্ষা নেয় জাপ বোমারু-বিমান। ২০শে ডিসেম্বর কলকাতায় প্রথম জাপানী বোমাবর্ষণ হয়। তারপর ২১,২৩,২৪ ও ২৮শে ডিসেম্বর। এর মধ্যে ২৪শে ডিসেম্বরের বোমাবর্ষণ ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। শহর ছেড়ে পালানোর হিড়িক আবার শুরু হয়ে যায়। ডিসেম্বরের শেষে বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স হিসেব করে বলে-প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ মানুষ কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। জনহীন শহর পরিষ্কার করবার লোক পর্যন্ত নেই-'রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দুর্গন্ধময় আবর্জনা - তাই নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে কাক-চিল-কুকুরের দল' (7)। সরকার অবশ্য এই উদ্বাসনের খবর সম্পূর্ণ অস্বীকার করে।

কলকাতা তখন জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মিত্রপক্ষের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি।হাজারে হাজারে ব্রিটিশ, আমেরিকান, অস্ট্রেলিয়ান, আফ্রিকান, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত্যের অন্যান্য প্রদেশের সৈন্য কলকাতায় এসে পৌঁছচ্ছে,থাকছে, রণাঙ্গনে চলে যাচ্ছে। খিদিরপুর বন্দর নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাচ্ছে না, কয়লা আর আকরিক লোহা জাহাজে করে চালান যাচ্ছে পশ্চিমের কারখানাগুলিতে। কলকাতার যুদ্ধসামগ্রী তৈরীর কারখানাগুলিতেও তৎপরতা তুঙ্গে। এদিকে চালের অভাবে বাংলা ধুঁকছে। দোকানপাট-গুদাম-আড়ত বন্ধ, মারোয়ারী ব্যবসায়ীরা কলকাতা থেকে ভাগলবা। কিন্তু চাল নেই বলে যুদ্ধ তো আর থেমে থাকতে পারে না! ২৭শে ডিসেম্বর একটি আদেশ জারী করে সিভিল সাপ্লাই দপ্তরকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হল -যে কোনো বন্ধ দোকান-পাট, চালের গুদামের তালা ভেঙে তারা চাল-গম -তেল-নুন-কেরোসিন ইত্যাদি যাবতীয় রসদ বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। খোলা বাজার থেকে যত ইচ্ছা চাল বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও পেয়ে গেল দপ্তর। কয়েকদিনের মধ্যেই কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার খোলাবাজারের চালের দুই-তৃতীয়াংশ চাল মজুদ করে ফেলল সিভিল সাপ্লাই দপ্তর।

কালোবাজারের কেশাগ্রও অবশ্য স্পর্শ করা গেল না। উল্টে যেসব আড়তদার খোলাবাজারে চাল বিক্রি করছিল, সরকারের ওপর থেকে তাদের যাবতীয় বিশ্বাস উঠে গেল। লাফিয়ে লাফিয়ে কালোবাজারী বাড়তে লাগল। সেইসঙ্গে বাড়তে লাগল সরকারের নাড়ির গতি। সরকারের এই ভীতির আঁচ পেয়ে সাধারণ মানুষ-শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিও ঘাবড়ে গেল। মজুতদারী বাড়তে থাকল;সেই সঙ্গে বাড়তে থাকল চালের দাম। বাড়তে বাড়তে গরীব মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেল।

অবশ্য চালের দাম সাধ্যের মধ্যে থাকলেও তাদের কোনো লাভ ছিল না। খোলাবাজারে কোথাও চাল নেই। কলকাতার প্রায়োরিটি শ্রেণীকে খাওয়ানোর জন্য গোটা গ্রামবাংলা থেকে ঝেঁটিয়ে চাল বাজেয়াপ্ত করা শুরু করল সরকারী এজেন্টরা,আবার। তাদের পেছনে বন্দুক হাতে পুলিশ, কখনো-সখনো মিলিটারি। এদিকে শহরের চটকল-সুতো কল-কাগজকল-পোর্ট ট্রাস্ট -রেল-সেনাবাহিনী- সবাই মিলে পাগলের মত যে যেমন দরে পারছে চাল কিনছে। পরবর্তীকালে ফ্যামিন কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সিভিল সাপ্লাইয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিরেক্টর পিনেল জানাবেন, তাঁদের সামনে দুটি রাস্তা খোলা ছিল- 'গ্রামবাংলায় অসংখ্য মানুষের মৃত্যু' অথবা 'কলকাতা শহরে বিশৃংখলা', যার অর্থ যুদ্ধ প্রস্তুতিতে ঘাটতি। "আমরা প্রথমটি বেছে নিলাম"-পিনেল বলবেন।(8)

অবশ্য তাই বলে যেন কেউ না ভাবেন শহর কলকাতার সব খেটে খাওয়া মানুষেরাই দু-বেলা পেট পুরে খেতে পাচ্ছিলেন।বড় বড় শিল্পের শ্রমিকরা 'এসেনসিয়াল' তকমা পেলেও অনেক ছোট ছোট কারখানার মজুর, মেথর-চাকর-কনট্রাক্ট লেবারাররা সরকারী সুরক্ষাবলয়ের বাইরেই থাকলেন। মধ্যবিত্তের দুর্গতিলাঘবের দিকে অবশ্য সরকারের পুরো নজর ছিল।নবগঠিত খাদ্য-বিভাগের পক্ষ থেকে মধ্যবিত্তদের জন্য ক্যান্টিন-ব্যবস্থা চালু হল (বিভাগের সদস্য রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী নলিনী সরকার ক্যান্টিন চালু করতে এসে জানালেন মধ্যবিত্তরা কী দুর্দশার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে; একে তো খাদ্যাভাব, চালের চড়া দাম, তার ওপর আবার নতুন যন্ত্রনা শুরু হয়েছে-চাকর-বাকররা সব পালিয়ে যাচ্ছে। আহা!) এদিকে গৃহহীন মানুষদের খাওয়ানোর জন্য তৈরী একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ভর্তুকি-দেওয়া দরে চাল কিনবার পারমিট চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হল। (9)

'৪৩ এর জানুয়ারি মাস বরাবর কলকাতার রাস্তাঘাট ভরে যেতে লাগল ভিখারীতে। তপন রায়চৌধুরী লিখেছেন- ' কলকাতার রাস্তায় ভিখারী কিছু নতুন দৃশ্য নয়। কিন্তু এই নবাগতরা অন্য ধরনের মানুষ। এক-এদের দেখলেই বোঝা যেত যে, ভিক্ষাবৃত্তি এদের স্বাভাবিক পেশা না। অনেক সময়েই দেখা যেত মা-বাপ-ছেলেমেয়ে নিয়ে একটা পুরো পরিবার এসে রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে। কলকাতায় ভিক্ষাবৃত্তির এটা সাধারণ লক্ষণ নয়। দ্বিতীয় কথা-প্রথম প্রথম এরা ভিক্ষা চাইত না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত। বোঝা যেত এরা গৃহস্থ মানুষ। সঙ্কোচ কাটিয়ে ভিক্ষা করতে পারছে না। কখনও কখনও শহরবাসীরা এদের দুরবস্থা দেখে নিজের থেকেই কিছু ভিক্ষে দিয়ে যেত। কিন্তু তখন চালের দাম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মন প্রতি তিন/সাড়ে তিন টাকা থেকে বেড়ে মন প্রতি চল্লিশে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং দুঃস্থ পরিবারগুলির সবচেয়ে যা প্রয়োজন সেই চাল দেওয়ার মত অবস্থা বেশী লোকের ছিল না।।।ক্রমে শহরের পথে সেই অবিস্মরণীয় আবেদন শোনা যেতে লাগল, চাল ভিক্ষা করা বৃথা জেনে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ অন্য সুর ধরলঃ "ফ্যান দাও গো, ফ্যান দাও।" ' (10)

স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদকীয়তে কৌতূহল প্রকাশ করা হল-কলকাতা শহরে এত ভিখারী আসছেটা কোথা থেকে ! উত্তর অবশ্য সহজ ছিল-এরা আসছে সাইক্লোন ও বন্যাবিধ্বস্ত মেদিনীপুর থেকে, সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের জন্য ভিটেমাটিহারা ডায়মন্ডহারবার থেকে, চাল-কেড়ে- নেওয়া রংপুর-রাজশাহী থেকে।

জনম মুখার্জী লিখেছেন , ফ্যামিনের বাংলা হল দুর্ভিক্ষ; অর্থাৎ ভিক্ষার অভাব। এমন এক অভাগা দেশ বাংলা, সে কতকাল ধরে না খেয়ে থাকে। যখন ক্ষিদে আর সহ্য হয় না, কাঙাল মানুষগুলো তাদের অবস্থাপন্ন সহনাগরিকদের কাছে হাত পেতে অন্নভিক্ষা নিয়ে কোনোরকমে মৃত্যু ঠেকায়। যুদ্ধের এই ডামাডোলে, সরকার আর পুঁজির চাপে সমাজের উঁচুতলার মানুষ ছাড়া আর সকলেরই ত্রাহি ত্রাহি রব উঠে গেছে। কে আর কাকে সাহায্য করে, কে দান-খয়রাত করে। সবাই বাঁচার দৌড়ে উঠে পড়ে লেগেছে। সহানুভূতি শুকিয়ে গেছে, এই দৌড়ে প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতিদ্বন্দী। কলকাতা ভিখারীতে ভরে গেছে; তাদের সমবেত আর্তনাদ আর কারো বধির কানে এসে পৌঁছচ্ছে না। দুর্ভিক্ষ, অতএব এসে হাজির হয়েছে। লক্ষ লক্ষ বাঙালী দম্পতি ভয়ে-বিস্ময়ে বিবশ হয়ে দেখছে-'তাহাদের সম্মুখে মন্বন্তর।'

Notes
1.https://www.independent.co.uk/news/uk/politics/not-his-finest-hour-the-dark-side-of-winston-churchill-2118317.html ( The Leo Amery Diaries, p. 832).

2.Janam Mukherjee, p.76 (Nanavati papers, p.1092).

3.https://en.wikipedia.org/wiki/Bengal_famine_of_1943 (Greenough, Paul R. (1982). Prosperity and Misery in Modern Bengal: The Famine of 1943–1944. Oxford University Press. ISBN 978-0-19-503082-2.)
4.Madhushree Mukherjee, p.93 (Brennan, Government Famine Relief in Bengal, p. 549)
5.Janam Mukherjee,p. 79
6.Ibid,p. 82
7.Ibid, p.83 (Stephens,Ian, Monsoon Morning, p.82)
8.Madhushree Mukherjee, p. 99 (Nanavati Papers, file 6B)
9.Janam Mukherjee, p.90 (The Statesman, 10 January, 1942, "No Supplies")
১০.তপন রায় চৌধুরী, বাঙালনামা, আনন্দ পাবলিশার্স, তৃতীয় মুদ্রণ, জুন ২০১২, পৃ ১২৬-১২৭।

1417 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: aranya

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

পড়ছি
Avatar: Du

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

পড়ছি।
Avatar: b

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

বঙ্কিমের ""লোকে প্রথমে ভিক্ষা করিতে আরম্ভ করিল...,

এটা অনেকটাই হান্টারের অ্যানালস অফ রুরল বেঙ্গল থেকে অনুবাদ।
"All through the stifling summer of 1770 the
people went on dying. The husbandmen sold their
cattle ; they sold their implements of agriculture ;
they devoured their seed-grain ; they sold their
sons and daughters, till at length no buyer of
children could be found ; they eat the leaves of
trees and the grass of the field; and in June 1770
the Resident at the Durbar affirmed that the living-
were feeding on the dead.
Avatar: Nahar Trina

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।
Avatar: dd

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

এটা খুব ভালো লেখা হচ্ছে। এটা আরো চলবে তো ?
Avatar: dd

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

পই পই করে বলেছি, Yasmim Khanর The Raj at war : A people's history of India's second waorld war বইটা পড়তে।
তো আমার কথা শুনবে কি?
Avatar: খ

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

ভালো লেগেছে।
জনম মুখার্জির লেখাও ভালো লাগে। খুব লজিকাল লাগে। দাঙ্গা র ইসুতে যেমন এমন অ্যানালিসিস আছে যেগুলো অন্যত্র দেখিনি।

কিন্তু আমার কলোনিয়াল পিরিয়ড এর ইকোনোমিক হিস্টরিকাল ডেটা অ্যানালিসিস নিয়ে দুটো কথা মনে হয়েছে।

- সেটার কতটা ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ইভেন্ট হিসেবে স্বীকৃত তার সঙ্গে কতটা কোন কোন ক্ষেত্রে জোড়া যায় আর যায় না। এবং সেটার টাইম ভ্যারিয়েশন কতটা মেজারেবল কিনা। ধর, ১৯২০ র আগে যে ভাবে জোড়া যেত, ১৯৪০ এর পরে তার চেয়ে বেশি জোড়া যায় এটা যেমন বলা যায়, কিন্তু এর কোনো সেকটোরাল ডিফারেন্স আছে কিনা।
কলোনীর অত্যাচার আর শোষন জোড়া না গেলেও কমে না, কিন্তু আমার এই অ্যানালিটিকাল লাইনটায় একটু কিন্তু আছে, যে অ্যানালিস্ট কোন কারণে মনে করছেন না তো, যে ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ইভেন্ট এর সঙ্গে জুড়ে আলোচনা না করলে, সমস্যাটা যথেষ্ট জোরালো ভাবে বলা হহ্ছে না? আরেকটা হল, প্রোডাকশন ডেটা ইত্যাদি কত দূর অব্দি রিলায়েবল। মানে ৩০ এর দশকে জতটা রিলায়েবল, ১৯২০ র আগে কি ততটা রিলায়েবল বা যাকে বলে সারা দেশের ক্রাইসিস বোঝার জন্য যথেষ্ট কম্প্লিট?
আমি আন্দাজ করছি ১৯২৮ এ ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট এর স্বীকৃতির অনেক আগে কতটা কম্প্লিট সার্ভে হয়েছে, কারণ ১৯২৬ এ ইন্গ্ল্যান্ড এ জেনেরাল স্ট্রাইক সংক্রান্ত বড় বিতর্ক হচ্ছে। তার সঙ্গে এই সার্ভে গুলো লিংক্ড কিনা। হয়তো জনম এর বই য়েই সব এভিডেন্স আছে, কিন্তু আমার মনে এই প্রশ্ন গুলো রয়ে গেছে। তোর অন টপ অফ হেড কিসু মনে পড়ছে? মানে অ্যানালিটিকাল টেকনিক টা কতটা ডাইরেক্ট এভিডেন্সিং করা গেছে, আর যার ভিত্তিতে করা হচ্ছে, সেটা কতটা কম্প্লিট।
Avatar: খ

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

কিন্তু ওভারল আমার জনম মুখার্জির লেখা হেবি লাগে। খ
Avatar: খ

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

খ। না আমার ই ভুল, ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ইভেন্ট টাই আপ করাই উচিত, বিশেষত কলোনিয়াল পিরিয়ডে, বা যত টা জানলে বলা যায় , টাই আপ করা কঠিন ততটা আমি জানি না।
আসোলে ঘটনাটা হল, ধর, আমেরিকান টোবাকো ট্রেড, বা স্লেভারি, এর শিপিং ডেটা যে ভাবে আছে বা বোস্টন টি পার্টির ডেটা যে ভাবে আছে, সেগুলো কে ধরে অ্যানালিসিস অনেক ধরে হচ্চে, পোলিটিকাল অ্যানালিসিস এর ক্ষেত্রে, এটা হতে পারে, ইকোনোমিক্স এর ক্ষেত্রে, ইকোনোমিস্ট দের পারসপেক্টিভ থেকে আমার অ্যাওয়ারনেস রাডার ফিকে ভাবে হলেও স্বাধীনতা পরবর্তী ডেটা যে ভাবে আছে বা ধর ইকোনোমিক হিস্টরি র খেত্রে মুঘল রেভিনিউ ডেটা যে ভাবে আছে, সেটা হয়তো কলোনিয়াল ইকোনোমিক ডেটা সেভাবে নেই, বা বলা ভালো সুভো বসু দের কাজ এর কারণে বা ট্রেড ইউনিয়ন হিস্টরি তে রণদিভে দের নানা লেখার কারণে লেবার ডেটা নিয়ে যে ভাবে ফ্যামিলিয়ারিটি আছে, অন্য ইকোনোমিক ডেটা নিয়ে সেভাবে নেই। এবং এই পারসেপশনের ল্যান্ড স্কেপ টাই জনম বদলাতে চাইছেন। আই স্ট্যান্ড কারেকটেড, আমি আত্ম বিস্মৃত হয়েছিলাম।
Avatar: I

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

এই data -র অভাব নিয়ে জনম তেমন মুখ খুলেছেন কোথাও বলে তো মনে পড়ছে না। যদিও তিনি বেঙ্গল ফ্যামিনকে economic perspective থেকে দেখা হয় নি সেরকম, বলে দুঃখ করছেন, যেখানে বলছেন-When I began this work, it surprised me that there was such a lack of critical work on the Bengal famine to be found.Lurking in this deficit, I detect a certain bias in historiography. How many books of history have been written on the political economy of the Great Depression in the US, or on hyperinflation as a prelude to Nazism in interwar Germany?Why is it that economy is seen as so central to the socio-political dynamics of North America or Europe, whereas it is most often "culture" that is turned to in the analysis of non-western societies?

উৎসা পট্টনায়ক একটা ইন্টারেস্টিং কাজ করেছেন দেখলাম এই সেদিন।হিসেব করেছেন , ব্রিটিশ রাজ ভারত থেকে দুশো বছরে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ সাইফন করেছে। তুমি কি দেখেছো এই লিং টা-https://www.livemint.com/Companies/HNZA71LNVNNVXQ1eaIKu6M/British-Raj-siphoned-out-45-trillion-from-India-Utsa-Patna.html?fbclid=IwAR2fyy37QGuJRc6aE-gHGFRVH5ikYBhzA8LYx5c5_o4ZdPr5VAA4UMeLp_w?
এই হিসেবটাই বা কী করে করা সম্ভব হল, আমার বেশ কৌতুহল জাগে। কিন্তু জেগেও লাভ নেই, কেননা গোটা ব্যাপারটাই আমার কাছে শিশি-বোতল। আমারে ইকোনমিক্স নিয়া তুমি আর খোঁচায়ো না, উ সবে হামি ক-অক্ষর গোমাংস আছি।সইত্য বলতে, আমি হিউম্যান ট্রাজেডির দিক থেকে ইতিহাসের কাছে আসি, সে তুমিও জানো, এবং এসে এই গোটা ঝামেলাঝঞ্ঝাটে জড়ায়া পড়ত্যাসি। এর পর ঋত্বিকের মত বলতে হবে, ঋত্বিক যেমন ইন্টারভিউয়ের মাঝখানে একবার বলেছিল -বাবারা, আমি আর কথা বলবো না, আমি মদ খাই, আমায় মদ খেতে দাও (কিঞ্চিৎ কিম্বা অনেকখানি প্যারাফ্রেজিত)।
Avatar: I

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

ডিডিদা,
নেন। The Raj at War নামায়ে নেলাম। কদিন আগে নরিন্দর সারিলা নামায়েছি। ওঃ, ডিসি বইচুরির কী মোক্ষম উপায়টাই না বাতলায়ে দেসেন !

আপনে বরং ইয়াসমিন খানের The Great Partition পইড়া ফ্যালান।
Avatar: avi

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

dcর পন্থা একবার শেয়ার করা হোক, কেননা লিবজেন নীরব থাকছে।
Avatar: I

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

b-ok.cc

এটায় ট্রাই করুন তো [email protected]
Avatar: প্রতিভা

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

অসাধারণ লেখা। অপেক্ষা পরের কিস্তির জন্য।
Avatar: I

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

প্রতিভাদি, পরের কিস্তি তো বেরিয়ে গেছে।লেখার ঠিক নিচে লিংক দেওয়া আছে।
Avatar: dd

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

দুর। পরের কিস্তি কখনো আগেই বেরিয়ে যায়? তৃতীয় পর্ব মানে পরের কিস্তি কবে বেরুবে, শুনি?


Avatar: I

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

নিন। একসঙ্গে তিন কিস্তি জুড়ে দিয়েছি। আবার আলাদা করেও তিন নম্বর কিস্তি বের করেছি। বাইটের অপচয়ের হদ্দমুদ্দ। কেয়া করেগা, গরীব আদমী বাবু। যার যেখান থেকে খুশী পড়ুন। বাফে আছে, পাত পেড়ে খাওয়ার ব্যবস্থাও রইল।
Avatar: সিকি

Re: ভুখা বাংলাঃ '৪৩-এর মন্বন্তর

ধ্যার, এতগুলো দরকার ছিল না। প্রথমটার নিচেই অ্যাপেন্ড করে দিলে পারতে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন