Tanwi,. Halder RSS feed

Tanwi,. Halderএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • তিরাশির শীত
    ১৯৮৩ র শীতে লয়েডের ওয়েস্টইন্ডিজ ভারতে সফর করতে এলো। সেই সময়কার আমাদের মফস্বলের সেই শীতঋতু, তাজা খেজুর রস ও রকমারি টোপা কুলে আয়োজিত, রঙিন কমলালেবু-সুরভিত, কিছু অন্যরকম ছিলো। এত শীত, এত শীত সেই অধুনাবিস্মৃত কালে, কুয়াশাআচ্ছন্ন পুকুরের লেগে থাকা হিমে মাছ ...
  • ‘দাদাগিরি’-র ভূত এবং ভূতের দাদাগিরি
    রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে, শ্যাওড়া গাছের মাথায়, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে, ছাপাখানায় এবং সুখী গৃহকোণে প্রায়শই ভূত দেখা যায়, সে নিয়ে কোনও পাষণ্ড কোনওদিনই সন্দেহ প্রকাশ করেনি । কিন্তু তাই বলে দুরদর্শনে, প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানেও ? আজ্ঞে হ্যাঁ, দাদা ভরসা ...
  • আর কিছু নয়
    প্রতিদিন পণ করি, তোমার দুয়ারে আর পণ্য হয়ে থাকা নয় ।তারপর দক্ষিণা মলয়ের প্রভাবে, পণ ভঙ্গ করে, ঠিক ঠিকখুলে দেই নিজের জানা-লা। তুমি ভাব, মূল্য পড়ে গেছে।আমি ভাবি, মূল্য বেড়ে গেছে।কখন যে কার মূল্য বাড়ে আর কার কমে , এই কথা ক'জনাই বা জানে?এই না-জানাদের দলে আমিই ...
  • একা আমলকী
    বাইরে কে একটা চিৎকার করছে। বাইরে মানে এই ছোট্টো নোংরা কফির দোকানটা, যার বৈশিষ্ট্যহীন টেবিলগুলোর ওপর ছড়িয়ে রয়েছে খাবারের গুঁড়ো আর দেয়ালে ঝোলানো ফ্যাকাশে ছবিটা কোনো জলপ্রপাত নাকি মেয়ের মুখ বোঝা যাচ্ছে না — এই দোকানটার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কেউ চিৎকার করছে। ...
  • গল্পঃ রেড বুকের লোকেরা
    রবিবার। সকাল দশটার মত বাজে।শহরের মিরপুর ডিওএইচেসে চাঞ্চল্যকর খুন। স্ত্রীকে হত্যা করে স্বামী পলাতক।টিভি স্ক্রিণে এই খবর ভাসছে। একজন কমবয়েসী রিপোর্টার চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলছে। কথা আর কিছুই নয়, চিরাচরিত খুনের ভাষ্য। বলার ভঙ্গিতে সাসপেন্স রাখার চেষ্টা ...
  • মহাভারতের কথা অমৃতসমান ২
    মহাভারতের কথা অমৃতসমান ২চিত্রগুপ্ত: হে দ্রুপদকন্যা, যজ্ঞাগ্নিসম্ভূতা পাঞ্চালী, বলো তোমার কি অভিযোগ। আজ এ সভায় দুর্যোধন, দু:শাসন, কর্ণ সবার বিচার হবে। দ্রৌপদী: ওদের বিরূদ্ধে আমার কোনও অভিযোগ নেই রাজন। ওরা ওদের ইচ্ছা কখনো অপ্রকাশ রাখেন নি। আমার অভিযোগ ...
  • মহাভারতের কথা অমৃতসমান
    কুন্তী: প্রণাম কুরুজ্যেষ্ঠ্য গঙ্গাপুত্র। ভীষ্ম: আহ্ কুন্তী, সুখী হও। কিন্তু এত রাত্রে? কোনও বিশেষ প্রয়োজন? কুন্তী: কাল প্রভাতেই খান্ডবপ্রস্থের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। তার আগে মনে একটি প্রশ্ন বড়ই বিব্রত করছিল। তাই ভাবলাম, একবার আপনার দর্শন করে যাই। ভীষ্ম: সে ...
  • অযোধ্যা রায়ঃ গণতন্ত্রের প্রত্যাশা এবং আদালত
    বাবরি রায় কী হতে চলেছে প্রায় সবাই জানতেন। তার প্রতিক্রিয়াও মোটামুটি প্রেডিক্টেবল। তবুও সকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া, মানে মূলতঃ ফেবু আর হোয়াটস অ্যাপে চার ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখলাম। বলাই বাহুল্য সবগুলিই রাজনৈতিক পরিচয়জ্ঞাপক। বিজেপি সমর্থক এবং দক্ষিণপন্থীরা ...
  • ফয়সালা বৃক্ষের কাহিনি
    অতিদূর পল্লীপ্রান্তে এক ফয়সালা বৃক্ষশাখায় পিন্টু মাষ্টার ও বলহরি বসবাস করিত । তরুবর শাখাবহুল হইলেও নাতিদীর্ঘ , এই লইয়া , সার্কাস পালানো বানর পিন্টু মাষ্টারের আক্ষেপের অন্ত ছিলনা । এদিকে বলহরি বয়সে অনুজ তায় শিবস্থ প্রকৃতির । শীতের প্রহর হইতে প্রহর ...
  • গেরিলা নেতা এমএন লারমা
    [মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে লেখকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তার প্রায় এক দশকের গেরিলা জীবন। কারণ এম এন লারমাই প্রথম সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পাহাড়িদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখান। আর তাঁর ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

যোজনগন্ধা

Tanwi,. Halder

ভূমিকা



এই উপন্যাসের
শুরু জানতে গেলে
সময়ের স্রোতকে বলতে হবে
একটু উল্টোবাগে চলো। আইন করে
নীল চাষ বন্ধ হয়েছে সদ্য সদ্য। তার
কিছু আগের থেকে এ উপন্যাসের কুশীলবদের
পথচলা শুরু। সুন্দরবন লাগোয়া ভবানীপুর গ্রামে
রামতনু মুখার্জ্জীর পারবারিক প্রথা পুত্রবধূর প্রথম রজঃপাত
হবে শ্বশুরের ভিটেতে। কিন্তু রামতনুর পুত্র শেখরের স্ত্রী আন্নার
বেলায় এ নিয়ম ব্যর্থ হয়। আন্নার ঠাকুরদা যদুপতি তিতুমীরের
সাথে লড়াইয়ে শহীদ হয়েছিল। রামতনুর পরিবার শেখরকে
না জানিয়ে আবার বিবাহ স্থির করে ...............।

তারপর চলে সময় এবং সম্পর্কের শাখাপ্রশাখার
ঝুড়ি ধরে উপন্যাসের গতি। সবকিছুর
মধ্যে জড়িয়ে আছে জলজ পটভূমিতে
থকথকে বাদাবনের পিরীতি কাদার
মতো মানুষ প্রকৃতির সম্পর্ক –

ভূমিকা



এই উপন্যাসের
শুরু জানতে গেলে
সময়ের স্রোতকে বলতে হবে
একটু উল্টোবাগে চলো। আইন করে
নীল চাষ বন্ধ হয়েছে সদ্য সদ্য। তার
কিছু আগের থেকে এ উপন্যাসের কুশীলবদের
পথচলা শুরু। সুন্দরবন লাগোয়া ভবানীপুর গ্রামে
রামতনু মুখার্জ্জীর পারবারিক প্রথা পুত্রবধূর প্রথম রজঃপাত
হবে শ্বশুরের ভিটেতে। কিন্তু রামতনুর পুত্র শেখরের স্ত্রী আন্নার
বেলায় এ নিয়ম ব্যর্থ হয়। আন্নার ঠাকুরদা যদুপতি তিতুমীরের
সাথে লড়াইয়ে শহীদ হয়েছিল। রামতনুর পরিবার শেখরকে
না জানিয়ে আবার বিবাহ স্থির করে ...............।

তারপর চলে সময় এবং সম্পর্কের শাখাপ্রশাখার
ঝুড়ি ধরে উপন্যাসের গতি। সবকিছুর
মধ্যে জড়িয়ে আছে জলজ পটভূমিতে
থকথকে বাদাবনের পিরীতি কাদার
মতো মানুষ প্রকৃতির সম্পর্ক –

ভূমিকা



এই উপন্যাসের
শুরু জানতে গেলে
সময়ের স্রোতকে বলতে হবে
একটু উল্টোবাগে চলো। আইন করে
নীল চাষ বন্ধ হয়েছে সদ্য সদ্য। তার
কিছু আগের থেকে এ উপন্যাসের কুশীলবদের
পথচলা শুরু। সুন্দরবন লাগোয়া ভবানীপুর গ্রামে
রামতনু মুখার্জ্জীর পারবারিক প্রথা পুত্রবধূর প্রথম রজঃপাত
হবে শ্বশুরের ভিটেতে। কিন্তু রামতনুর পুত্র শেখরের স্ত্রী আন্নার
বেলায় এ নিয়ম ব্যর্থ হয়। আন্নার ঠাকুরদা যদুপতি তিতুমীরের
সাথে লড়াইয়ে শহীদ হয়েছিল। রামতনুর পরিবার শেখরকে
না জানিয়ে আবার বিবাহ স্থির করে ...............।


তারপর চলে সময় এবং সম্পর্কের শাখাপ্রশাখার
ঝুড়ি ধরে উপন্যাসের গতি। সবকিছুর
মধ্যে জড়িয়ে আছে জলজ পটভূমিতে
থকথকে বাদাবনের পিরীতি কাদার
মতো মানুষ প্রকৃতির সম্পর্ক –

যোজনগন্ধা

তন্বী হালদার



আন্নাকালি কিছুতেই ভেবে ভেবে একটা কথা থৈ পাচ্ছিল না। সে কুমারীবেলায় টানা পাঁচ থেকে দশ বছর বয়স পর্যন্ত ‘সেঁজুতি’ ব্রত করেছে। তারপর গত আশ্বিনে জীবনের প্রথম দশটা বছর শেষ করল। কার্তিক মাসে ব্রত উৎযাপন করে। অঘ্রাণে নবান্ন ওঠার আগেই বিয়ে হয়ে গেল তার। তারপরও এক বছর বাবার বাড়ি ইছামতী নদীর ধারে রোজিপুর গ্রামটায় হেসেখেলে বেড়িয়েছে সে। বিয়ের বয়স হিসাবে আন্নার বয়স একটু বেশীই হয়ে গেছিল। কিন্তু কি করা যাবে। জলা জঙ্গলের দেশে কুলীন ব্রাহ্মণের পালটিঘর পাওয়াও তো আর চাট্টিখানি কথা না। আন্নাকালির ঠাকুমাদের সময় কন্যাসন্তান জন্মানোর পর মন্দিরের রাধামাধবের বিগ্রহের মাধবের সঙ্গে প্রকাণ্ড কাঁসার থালায় শুইয়ে উৎসর্গ করে রাখা হোত। কারণ শেষ পর্যন্ত সামাজিক বিবাহ না হলেও সে মেয়ের ‘জল চলতো’।
বার বছরে ‘ঘরবসত’ হওয়ার আগেই আন্নাকালি ঋতুমতী হয়ে যায়। মুখার্জ্জী বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী বাড়ির বৌয়ের প্রথম রজঃ পড়বে শ্বশুরকুলের ভুঁইয়ে। কিন্তু আন্নার বেলায় এমন বেহিসাবি খাপছাড়া ব্যাপার রামতনু মুখার্জ্জী আর তার পরিবার শশিকলার মধ্যে দাম্পত্য কলহ তৈরি করে। শশিকলা পাঁচ বছর বয়সে ‘গৌরীদান’-এ কুড়ি বছরের রামতনুর বধূ হয়ে এ বাড়িতে এসেছিল। রামতনুর মা চুনিরই কোলেপিঠে মানুষ শশী। এ বাড়িতে অধিকারবোধ তাই তার একটু বেশীই প্রকট। তাছাড়া আজন্মকাল সব মেয়েমানুষের যশভাগ্য সমান হয় না। সীতার কাহিনী স্মরণ করলেই তো বোঝা যায়। কি অসম্ভব ত্যাগ তিতিক্ষার পরেও যশের ঘরে শুধুই শূন্য। এমন মেয়েলোকও থাকে।
আন্নার বেলায়ও তাই হল। ধাপানো শরীরের বাড়ন্ত বেলার মেয়ে বাপের বাড়ি ঋতুমতী হয়ে পড়ায় রজিপুর গ্রামের সকলের কপাল চাপড়ানো ছাড়া আর কি বা করবার আছে। এদিকে আন্নার শ্বশুরবাড়ির গ্রাম ভবানীপুরে ঢি ঢি পড়ে যায়, এমন ধিঙ্গি মেয়েকে কি শেষ পর্যন্ত ঘরে ঢোকাবে মুখার্জ্জীমশাই? শশিকলা স্বামীকে শমন দেগেছিল, ‘ও বউ আমি ঘরে নেব না। ওকে ঘরে তুললে আমি গলায় দড়ি দেব’।
এমন তোপের মুখে রামতনু আগে কখনো পড়েন নি। তবে আন্নাকালির বাপের ঘরে যখন খবরটা গেল সর্বনাশ হয়ে গেল বলে মরা কান্না ওঠে। আন্নার মা মনে মনে মা শেতলাকে অনেক ডেকেছিল, ‘মাগো বসন্ত কিংবা ওলাওঠা যা হোক কিছু ঘটিয়ে মেয়েটাকে তোমার কোলে ঠাঁই দাও। ওর বাকি জীবন তো না সধবা না বিধবা। এমন আকাঁড়া জীবনের ওর কি দরকার’।
আন্নার বাবা একটু ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ। সে রুখে দাঁড়ায়, ‘এমন একটা তুচ্ছ কারণে ওনারা যদি আমার মেয়ে না নেন, তো না নেবেন। অমন পরিবারের সঙ্গে কুটুম্বিতা চাই না আমি’।


আন্নাকালির স্বামী বাইশ বছরের শেখর তখন কলকাতার হিন্দু কলেজের ছাত্র। তাকে দিনক্ষণ জানিয়ে জরুরী তার পাঠানো হয়, ‘সত্ত্বর চলে এসো’। চিঠি পড়ে যুবক শেখরের ঠোঁটে তখন হাসির ওম লাগে। শেখর তাদের এই পারিবারিক প্রথাটিকে জানত। তাই আশায় বুক বাঁধে। দুবছর আগে বিয়ে করে রেখে আসা বউটিকে এবার সে বেশ করে কাছে পাবে। মেস, কলেজ, কলেজের টিফিন, পথখরচের থেকে জমানো পয়সায় সে একটা নথ, এক শিশি সুগন্ধি আর একটা বর্ণপরিচয় কেনে। আন্না নামের মেয়েটাকে তার ভারী পছন্দ হয়েছিল। বাসরঘরে একগলা ঘোমটা না টেনে কেমন টুপটাপ করে কথা বলছিল। ‘কলকাতা কলেজে আপনি অনেক মোটামোটা বই পড়েন তাই না? ইস আমি যদি পড়তে পারতাম’।
সে কারণেই এই বর্ণপরিচয় কেনার সিদ্ধান্ত শেখরের। এখন কলকাতায় শুধুমাত্র ধনী ঘরের মেয়েরা লেখাপড়া করে না, মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরাও স্কুল কলেজে পড়ছে। সেখানে তাদের ওদিককার মেয়েগুলো যেন সুন্দরবনের জংলী গন্ধ চিন্তাভাবনা নিয়েই বেঁচে আছে আজীবন। তাই আন্নাকালির বই সংক্রান্ত আলোচনায় বড় খুশী হয়েছিল শেখর। এমন একটি স্ত্রীধনকে স্ত্রী হিসাবে পেয়ে বাপমায়ের উপর কৃতজ্ঞতার শেষ ছিল না। শেখর তার সহপাঠী বিমানের বাসরঘরের অভিজ্ঞতা তো শুনেছিল। বিমান নদীয়ার ছেলে। বউয়ের সঙ্গে আলাপ জমানোর জন্যে ‘নাম কি?’ জিজ্ঞাসা করলে সে মেয়ে নাকি ভয়ংকর কান্না জুরে দিয়ে বাড়ির লোক জড়ো করেছিল। সে হিসাবে শেখর পরম সৌভাগ্যবান।
কলকাতা থেকে ভবানীপুর আসা প্রায় দুদিনের ধাক্কা। গরুর গাড়ি অথবা পালকিতে করে চটিতে চটিতে বিশ্রাম নিয়ে নদী পার হয়ে তবেই না আসা। রামতনুবাবু অবশ্য পইপই করে পত্রে লিখে দিয়েছে পালকি ভাড়া করে আসবে। বাড়ির পালকি পাঠানো যেত। তবে তা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। প্রয়োজনটা এতই জরুরী যে অত সময় দেওয়া যাবে না। অতএব শেখর শেষ পর্যন্ত পালকিতে চড়ে বসল। বিমান যাত্রা করবার সময় পিঠ চাপড়ে মশকরা করে বলে, ‘দেখো ভায়া ইছামতীর জল আর আন্নাকালির চোখের জল পরীক্ষার রুটিনটা যেন ভুলিয়ে না দেয়’। মেস বাড়ির বিহারী ব্রাহ্মণ পাচক এক কুঁজো জল, এক ধামা চিড়ে, ফেনি বাতাসা দিয়ে দিয়েছে। বারবার বলে দিয়েছে, রাস্তায় পুকুর পড়লে চান করে আহ্নিক সেরে দুটি খেয়ে নেয় যেন। সেই সঙ্গে আর একটা অনুরোধও করেছে। সুন্দরবনের টাটকা খাঁটি মধু এক কলসি নিয়ে আসার জন্য। যশোর রোড দিয়ে পালকি চলতে শুরু করে। হুম হুম না / হুম হুম না / হুম হুম না।


বারাসাতে পালকি যখন আসে সূর্য তখন মধ্য গগনে। পান্নাঝিলের পাশে বেয়ারারা পালকি রাখে। বলে, ‘বাবু এমন কাকচক্ষু জল একটু নিয়ে নিন’।
শেখরের নাইবার ইচ্ছা ছিল না। সে তখন কতক্ষণে ঘরে ফিরে আন্নাকালির ঢলঢলে মুখখানা দেখবে তার অপেক্ষায় অধীর। কিন্তু আহ্নিক করতে হবে যে। সে কারণে পালকি থেকে নামে।
কলকাতা থেকে মাত্র একবেলার দূরত্বে এমন সুন্দর একটা জায়গা থাকতে পারে তা শেখরের কল্পনার বাইরে ছিল। কলকাতা আসা যাওয়ার সময় বারাসাতের উপর দিয়ে যাতায়াত করেছে। কিন্তু নামা হয়নি কখনো। পান্না ঝিলের জলে শরীর ডুবিয়ে অন্যরকম শান্তি পায় শেখর। বেয়ারাদের প্রায় পুরোটাই চিড়ে বাতাসা দিয়ে বলে, ‘যাও তোমরাও নেয়ে নাওগে’।
ঠাকুর ঘরের বাবুমশাইয়ের এমন উদার ব্যবহারে বেয়ারারা বাস্তবিক বিহ্বল হয়ে পরে। কালু বাউরি তো ডুকরে কেঁদেই ওঠে। শেখরের অবশ্য বেয়ারাদের ব্যস্ত রাখার অন্য একটা কারণ ছিল, আশপাশটা একটু ঘুরে দেখবার। কারণ সে শুনেছে মাত্র কিছুদিন আগেও এখানে নীল চাষের রমরমা ছিল, সঙ্গে ছিল নীলকর সাহেবদের অকথ্য অত্যাচার। পান্না ঝিলের দক্ষিণে পায়ে পায়ে কিছুটা আসে শেখর। স্নান করে ওঠার শ্রান্তিটুকু মুহূর্তে উধাও হয়ে যায়। বেলা শেষের রোদ তখন দইয়ের ফোঁটার মত চড়চড় করছে। চারদিকে ধূ ধূ মাঠ। শেখর ভাবে এত পতিত জমি আবাদ হয় না কেন? দূর থেকে একজন বৃদ্ধ লোককে আসতে দেখে শেখর তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। হাত জোড় করে নিজের পরিচয় দিলেও লোকটা বিন্দুমাত্র খুশি হয় না। ভ্রু কুঁচকেই থাকে।
শেখর জিজ্ঞাসা করে, ‘চার পাশে এত টাঁড় জমি আবাদ হয় না কেন?’
লোকটার সমস্ত রাগ যেন গিয়ে পড়ে শেখরের ওপর। মালকোঁচা মারা ধুতি, হাফহাতা ধুলোটে গেঞ্জি, কপালে অসংখ্য বলিরেখার জঙ্গল প্রাচীন বট, অশ্বত্থ গাছকে মনে করিয়ে দেয়। ঘোলাটে দৃষ্টি দেখলে বোঝা যায় এ চোখ অনেক দেখেছে, অনেক সয়েছে। স্বাভাবিক কন্ঠস্বরেও বিরক্তি, শ্লেষের ঝাঁঝ, ‘তা বাবু মশাইয়ের নিবাস কুনঠি? এ তল্লাটে রায়তদের খবর কিছু রাখা হয় না?’
শেখরের খাদির পাঞ্জাবি তখন ধূ ধূ মাঠের হু হু বাতাসে পতাকার মত পতপত করে উড়ছে। শান্তিপুরী কোঁচানো ধুতির ন্যাতানো রূপ সকল আভিজাত্য কেড়ে নিয়েছে। ঘাড় কাৎ করে শেখর নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করে, ‘শুনেছি বটে কিছু কিছু। আমাদের ওদিকেও কিছু কুঠি বাড়ি আছে। তবে আমার বন্ধু বিমান এ বিষয়ে অনেক খবর রাখে। ও বিভিন্ন পত্র পত্রিকার খবর কাটিং করে রেখে দেয়। ও বলে আইনতঃ নীলকর সাহেবদের নীল চাষ বন্ধ হলে কি হবে, ওসব জমির বুক ভেদ করে হৃৎপিন্ড পর্যন্ত বিষ চলে গেছে’।
হিস হিস করে গর্জন করে ওঠে লোকটা, ‘ঠিক বলেছে তোমার বন্ধু। বিষাক্ত সাপের কামড়ে মানসের শরীর যেমন নীল বন্ন হয়ি যায় এও তেমনি, সাদা বাঁদরের অত্যাচারে আমরাও নীল বন্ন হয়ি গেছি। আকন্ঠ বিষের জ্বালায় ছটফট করতেছি। জ্বলন শুধু বিষের জ্বলন’।
বেয়াড়া কালু বাউড়ি ছুটতে ছুটতে হাঁক পারতে থাকে, ‘ও বাবুমশাই সূয্যি পাটে বসে গেছে, সামনে তিতুমীরের গড় পড়বে। সে নাকি এখনও বড়ো আপদের জায়গা। তাড়াতাড়ি চলেন’।
শেখর এতক্ষণে খেয়াল করে বেলা পড়ে এসেছে। টাঁড় মাঠের দিগন্তে লাল বর্ণ আগুনের থালাটা গলে গিয়ে রক্ত জবার পাপড়ি ছড়াচ্ছে। ভারী কষ্ট হয় শেখরের। লোকটার দিকে দুহাত জোড় করে, ‘আজ্ঞে আমি ভবানিপুর যাব। আপনার পরিচয়টা একটু জেনে গেলে ভালো হত’।
ঘাড় নাড়ে লোকটা, ‘নিয্যস নিয্যস, আমি রাখাল সমাদ্দার। একসময় ভূস্বামী ছিলাম। তারপর তুচ্ছ কারণে নীলকর সাহেবরা দাদন নিতে বাধ্য করে আমারে, রাতারাতি রায়ত বনে গেলাম। আমার বিঘে বিঘে জমিতে দিনের পর দিন নীল চাষ হতি হতি বিষিয়ে গেল জমির শরীল। জমি এখন মহাদেবের মত আকণ্ঠ বিষ পান করি নীলাম্বর হয়ি আছে গো’।
রাখালের ধুলোটে চোখে মায়া ঝরে, ‘বাপ মার বাছা ঘর যাও। যদি এ তল্লাটে আসা হয় কাউরে জিগায়ো রাখাল কাকা কমনে থাকে, দেখায়ে দেবে’।
কালু বাউড়ির পেছন পেছন আসতে আসতে শেখর ভাবে, বিমান ঠিকই বলে কলকাতা শহরটা বট গাছের মত ক্রমশঃ ডালপালা ছড়াচ্ছে। নতুবা রাখাল পদবীতে সমাদ্দার হয়েও কত সহজে আপনজনের মত বললো, ‘এ তল্লাটে আসা হলে রাখালকাকার বাড়ি এসো’। মনের ভেতর বেশ সুখ হয় শেখরের। সে পালকিতে ওঠে। শেখর তো আর মেয়েমানুষ না যে পালকির পর্দা টেনে বসবে? তাই পালকির পর্দা সরিয়ে পটলচেরা নীলাভ কিশোর চোখের মণিদুটো অসীম পিপাসায় টানটান হয়ে দেখতে দেখতে চলে - হুম হুম না/ হুম হুম না/ পালকি চলে/ যাচ্ছে কেডা/ রাজার বেটা/ সামনে ভয়/ আমরা যম/ সামাল সামাল/ আমরা দামাল ...............।


শেখর বাস্তবিক সুন্দর। তার চেহারার এই রূপের মোড়কটা মাতৃকুলের পাওনা। সাদা কাগজের মত রঙ। বাঙালীদের যে নেওয়াপাতি চেহারার ধাঁচ তা শেখরের মধ্যে নেই। বরং একটা গ্রীক ভাস্কর্যের সাযুজ্য আছে। লাল টুকটুকে পাতলা ঠোঁট, নীলাভ চোখ, রেশমের মত বাদামি চুল, সুন্দরবন অঞ্চলের কালো কুলো কুঁদ কুঁদে দেহাতী কিংবা হাড় জিরজিরে চেহারার মানুষগুলোর মধ্যে বড়ই বেমানান। সেই সঙ্গে বেমানান তার আচার ব্যবহার। নতুবা বাসরঘরে নতুন বৌ মোটা মোটা বইয়ের খোঁজ করেছিল বলে সে বৌ এত প্রিয় হয়ে ওঠে!
শেখরের শরীরে এমন রূপের পেছনে একটা গল্প আছে। গল্পটা হল শেখরের মাতৃকুলের দিদিমার বাড়ির কারও শরীরে ইংরেজ রক্ত ঢুকেছিল। সেটাই জিনগত বৈশিষ্ট্য হয়ে আজও কারো কারো শরীরে দেখা দেয়। এ অবশ্য কথার কথা, প্রমাণ নেই। বড়ো মানুষের ঘর তায় আবার কুলীন ব্রাহ্মণ। প্রমাণ চাইতে যাবে এমন বুকের পাটা কার আছে?
পড়ন্ত বেলার হিমেল বাতাসে শেখরের আন্নাকালির কথাই ভাবতে ইচ্ছা করে। না জানি দেখতে সে কেমন হয়েছে এখন! আন্নাকালি কালো নয় তবে শ্যামলা। চোখগুলো খুব বেশি ডাগর। চোখের পাপড়িগুলো দেখলে মনে হয় যেন আলগা বসানো। নাকটা ভোতা না তবে একটু চাপা। সে নাকে সাদা পাথরের নাকচাবি। শেখরের আনা নথটা পড়লে আন্নাকে কেমন লাগবে। বাঁ দিকের গালের টোলটা, একটু হাসলেই সে টোল গভীর হয়। সে গভীরে ডুব দেয় শেখর। ডুব দিয়ে চড়াই উৎরাই ভাঙে। পুরু ঠোঁট জোড়া ভাবতে গিয়ে চোখ বুজে আসে শেখরের। অস্ফূটে উচ্চারণ করে ‘আন্না’। করেই নিজেই নিজের কাছে লজ্জা পেয়ে যায়। ধুস কি সব ভাবছে শেখর - মনে মনে কাটাখালি নদীটার পাশে গেঁউয়া, গরান আর হেঁতাল বনের জঙ্গলে ঘেরা, নদী আর খাঁড়ীর মাঝে বাঘ ভাল্লুক সাপে খোপে ভরা ভবানীপুর গ্রামটার প্রতি বিরক্ত হয়ে ওঠে। এত দূর - এত পথ যেতে লাগে। মাঝরাত পার করে নদী নালা ভেঙে সে যখন বাড়ি পৌঁছাবে তখন হয়তো আন্না বেচারী ঘুমিয়ে কাদা। এত সাধের উপহারগুলো বাসি করে দেখাতে ইচ্ছা করবে আর। এত ভাবাভাবির মধ্যে কখন যে বেলিয়াঘাটা পার করে বেড়াচাঁপা পৌঁছে গেছে টেরই পায়নি শেখর।
কালু বলে, ‘পর্দা টেনে দেন গো বাবুমশাই, হাড়োয়ার জঙ্গল পড়বে। যদি পথ আগলায় বড়ো ঘরের মেয়েলোক গঙ্গা স্নানে গেছিল বলে পার পাবার চেষ্টা করবুনে’।
আসলে হাড়োয়া সংলগ্ন বেড়াচাঁপার মাটি খুঁড়ে নাকি এখনও রাজ-রাজাদের সময়কার তালতাল মোহর পাওয়া যাচ্ছে। আর গুড় যেখানে সেখানে পোকার বাসা হবেই। স্বাভাবিকভাবেই এ তল্লাটে ডাকাতির উপদ্রব। উপদ্রব করে বিদ্যাধরী নদীতে হারিয়ে যায় তারা। মাটির পরতে পরতে লেখা রয়েছে সিন্ধু সভ্যতার আমল থেকে বাংলার পাল রাজাদের সময় পর্যন্ত কয়েক হাজার বছর ধরে এই চন্দ্রকেতুগড় এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চল ছিল এক ধারাবাহিক সভ্যতার পীঠস্থান। এখানকার বাতাসে এখনও কথকের সুরে সুরভিত হয় পীর গোরাচাঁদের কাহিনী, সতী রুমনা–ঝুমনার পালা, বড় খাঁ গাজীর পালা আর বিপ্রদাস পিপ্‌লায়ের মনসা বিজয়ের কাহিনী। খোঁড়াখুঁড়িতে জানা যাচ্ছে এখানে নাকি হাজার বছর আগে বৌদ্ধদের বিহার ছিল। উত্তরে ভাগীরথী, পুবে ইছামতী, দক্ষিণে বিদ্যাধরী এবং পশ্চিমে বিপ্রদাস পিপ্‌লায় কথিত সুরধনী নদী যা বর্তমানে মানুষজনের মুখে মুখে পদ্মা নামে পরিচিত। এ জায়গার নাম কখনো ‘চক্রদ্বীপ’, কখনো ‘বাগড়ী’ আবার কখনো বা ‘বালবল্লবী’। কালে কালে চন্দ্রকেতুগড় নামটা প্রমাণ করে এখানে আর্যদের পদধূলিও পড়েছে একসময়। গড় শব্দটা প্রমাণ করে এ অঞ্চল একসময় দূর্গ হিসাবে পরিচিত ছিল। ভূপ্রকৃতি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন জানায় এই গড়ের দক্ষিণ দিক বরাবর চল্লিশ ফুট কাঁকর মিশ্রিত মাটি দিয়ে তৈরি প্রাকার দ্বারা নগরীটি সুরক্ষিত ছিল। বাকি তিনদিকে ছিল বিশাল চওড়া নদী। তবে দক্ষিণ পূর্ব কোণে ছিল সিংহ দরজা। তার চিহ্ন নাকি এখনও আছে বলে শেখর শুনেছে।
কিন্তু কে ছিল এই রাজা চন্দ্রকেতু? তা কি সবটাই কিংবদন্তী আর পৌরাণিক!
পীর গোরাচাঁদের প্রকৃত নাম সৈয়দ আব্বাস আলি। দিল্লীতে মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই ইসলামী সুফি সন্ত এবং পীর ধর্মপ্রচারকগণ অনেক বেশী সংখ্যায় ভারতে আসতে শুরু করে। সিলেটে পীর শাহ্‌ জালালের সঙ্গে সৈয়দ আব্বাস আলি ধর্মপ্রচারের জন্য এই দেশে আসেন। সে সময়ে জনৈক শৈলেন্দ্র বংশীয় রাজা চন্দ্রকেতু রাজত্ব করছিলেন বলে কথিত আছে। চন্দ্রকেতুর মহিষী কমলা সৈয়দ আব্বাস আলির অপূর্বসুন্দর দেহকান্তিতে মুগ্ধ হয়ে নাম দেয় গোরাচাঁদ গাজী। তখন এ অঞ্চল সংকীর্ণ পথঘাটে ভর্তী ছিল। আর ঐ পথঘাটের লৌকিক নাম ছিল হাড় বা হাড়ি। তা থেকেই আজকের হাড়োয়া।
এ সব গল্প অবশ্য শেখর ছোটবেলায় শুনেছে। লোভে পড়ে এ অঞ্চলে ডাকাতি রাহাজানি চলছেই। গোরাচাঁদের কবরও আছে হাড়োয়ায়। বেয়াড়ারা এ অঞ্চলটুকু যেন রণপায়ে পার হল। শেখরেরও বুকের ভিতর যে ছমছম করছিল না তা নয়।
বসিরহাটের কিছু আগে লোকজন দেখে পালকি থামায় বেয়াড়ারা। এইটুকু পথ পার হতে তারা খুব শ্রান্ত। ভিতরে ভিতরে লজ্জা করে শেখরের। সে যদি পান্নাঝিলের ওখানে অত সময় না কাটাত বেচারাদের এত তাড়াহুড়ো করতে হোত না। মন করি খিদেও পেয়েছে খুব। কালু একটু হেঁটে এসে বলে, ‘বাবুমশাই এটি খোলাপোতার হাট। যদি বলেন তো দেখবো ফলার কিছু পাওয়া যায় কিনা’।
শেখর দেখে সূর্য পুরোপুরি অস্ত গেছে। বসিরহাট পৌঁছতে রাতের ঘোর লেগে যাবে। জিনিসপত্রের দাম চড়চড় করে বাড়ছে। শেখরেরও খুব খিদে লেগেছে। দুটাকা কালুর হাতে দিয়ে বলে, ‘ফল মণ্ডা যা পাও আনো’।
কালু বাউরি হাটে গিয়ে এক কাঁদি চিনিচম্পা কলা আর এক সের গজা কিনে আনে। শেখর নিজে খান ছয় কলা আর চারটে গজা দিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণ করে বাকিটা বেয়ারাদের হাতে তুলে দেয়। কালু যে আট আনা ফেরৎ এনেছিল সেটিও দিয়ে দেয়। শুধু বলে, ‘যেভাবেই হোক আমাকে রাত্রি প্রথম প্রহরের মধ্যে কাটাখালি নদীর কাছে পৌঁছে দিয়ে এসো। বাবা তারে আজকেই সত্ত্বর আসতে লিখেছে। বলে দিয়েছে ঘাটে নৌকো বাঁধা থাকবে’।
বেয়াড়ারা এমন ভদ্র, নরম ব্যবহার, পৌঁছনোর আগেই বকশিস পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই অভিভূত হয়ে পড়েছে। তারা শরীরে হাতির বল এনে ঘোড়ার মতো দৌড়তে শুরু করে।


বসিরহাট পর্যন্ত পৌঁছে বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করে ওঠে শেখরের। বসিরহাটেও প্রচুর নি-আবাদী জমি পড়ে আছে। মাঝখান দিয়ে কাঁচা রাস্তা। লোকজনও খুব কম। বসিরহাটে তখন সোলাদানার চরে পুরোদমে নিমক পত্তন চলছে। শেখর একবার দুর্গাপুজোর ঠাকুর দেখতে নীলকর সাহেবদের কুঠিবাড়ি, নীল তৈরীর জায়গা, যন্ত্রপাতি দেখে গিয়েছিল। সে তখন বেশ ছোট। নীলচাষ বন্ধ করে দাও বলে ফরমান জারি করলেই তো আর কায়েম হয় না।
যাকগে শেখরের আজ এসব নিয়ে ভাবতে ইচ্ছা করে না। টাকির কাছে এসে পড়ায় তার বুকের লাবডূব আরও বেড়ে যায়। আন্নাকালির বাপের বাড়ি এখানে। সে কি আছে এখানে? তারপরই নিজের অজ্ঞতায় নিজেই হেসে ফেলে - ধুস এসব কি ভাবছে সে? আন্নাকে ঘরবসত করতে নিয়ে গেছে বলেই না আন্নাকে এত তড়িঘড়ি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সে জন্যই না শেখরকে এমন জরুরী তলব। আন্নার গালের টোলটায় হারিয়ে যেতে যেতে শেখর কখন যেন রোজিপুর গ্রামটা পার হয়ে হাসনাবাদে কাটাখালি নদীটার ধারে এসে পড়ে।


কাটাখালি নদীতে শেখরদের নিজস্ব খেয়া নৌকো নোঙর করা আছে। মাঝি হুসেন মন্ডল হ্যাজাকের আলোয় পথ করে শেখরকে পাটাতনের উপর দিয়ে নিয়ে আসে। এত রাতে অচেনা দেশে বেয়াড়াদেরও ছেড়ে দেওয়া হয় না। তারাও পালকি সহ নৌকায় উঠে বসে। নৌকোয় উঠে নদীর জল ছোঁয়া ঠান্ডা বাতাসে এতক্ষণের পথ ভাঙার ক্লান্তিতে তাদের শরীর এলিয়ে পড়ে। আকাশে শুক্লাপক্ষের চাঁদ সবে গেছে। চারদিক আলো ঝলমলে না হলেও ভালো নজর করা যায়। মাথার উপর দিয়ে নিশাচর কোনো পাখি হুশ করে উড়ে যায়। সে দিকে চেয়ে কালু বাউড়ি ঘুম জড়ানো চোখে বলে, ‘বাবু মশাই, আপনাদের দেশে সক্কল মানশের পায়ে গড় করি। এমন আপ্যায়ন আমরা জম্মেও ভাবতে পারি নে’।
হুশেন মন্ডল ভাঁটার টানে দাঁড় বাইছিল। সে শেখরের বাবার ছোটবেলা থেকে এ পরিবারের নিজস্ব মাঝি। তার গলায় গর্বের সুর আরোহ অবরোহের ছর তোলে, ‘কোন পরিবারের খোকাকে তোমরা বয়ে এনোছো সেডা জানলে একথা তোমরা কইতে না’।
কালো বাউড়ি হুসেনের কাছে সরে আসে। নদীর ঠান্ডা বাতাসে মাথাটা বেশ খোলতাই হয়, গল্প করার মৌজ তৈরী হয়। আগ্রহ ভরে শক্তপোক্ত শরীরটাকে হুসেনের ছোঁয়া বাঁচিয়ে যতটা সম্ভব ঝুঁকিয়ে এনে ফিসফিস করে জানতে চায়, ‘কোন বাড়ির বাবু উনি?’
হুসেনের গোঁফের তলায় তখন তাচ্ছিলের হাসি। ভাবখানা এমন যেন এই সোজা খবরটা বেয়াড়াদের দল জানে না। গলার স্বরটা একটু মোটা খাদে নিয়ে গিয়ে বলে, ‘ভবানীপুরের ভূস্বামী মুখাজীদের বাড়ী গো’।
বাকি দু’জন বেয়াড়া নিজেদের মধ্যে গুলতানি করছিল। একজন শুধু আধ খাওয়া চাঁদের পানে চেয়ে চুপচাপ বসেছিল আর নাভীর গোড়া থেকে মাঝে মাঝে লম্বা লম্বা শ্বাস উঠে আসছিল। সে হল পবন হালদার। নদীয়ায় বাড়ি পবনের। তার বেশ কিছু জমি জিরেত ছিল। নীলকরদের কাছ থেকে দাদন নিতে বাধ্য হয়ে আজ সর্বশান্ত। মাটীর বুকে নীল বিষ। মাটি যেন মহাদেবের মত সকল গরল কন্ঠে ধারণ করে নীলকন্ঠ হয়ে গেছে। বাড়িতে পুষ্যি অনেক। কি করবে পোড়া পেট মানে না। তাই বাধ্য হয়ে পালকি বাহকের কাজ নেওয়া। অঘ্রাণ মাস। এখনই তো সোনারবরণ ধান ওঠার সময়। ধানের ছড়ার ঝুনঝুন শব্দ যেন মা লক্ষ্মীর পায়ের মল। নবান্ন হয়। সে সব যেন আজ ইতিহাস। আজ পেটের দায়ে অচেনা অজানা দেশের কোন বাবু ঘরের ছেলেকে বয়ে এনেছে বলে আহ্লাদে ফেটে পড়বে এমন মন তার তৈরী হয়নি এখনও। পাতলা জ্যোৎস্না আলোয় শেখরের দিকে তাকিয়ে বড়ো ছেলেটার কথা মনে পড়ে। তারও খুব লেখাপড়া করার শখ ছিল। এখন পরের জমিতে মুনিষ খাটে। কোথায় যেন ভোতা একটা কষ্টের সঙ্গে চিনচিনে ঈর্ষার অনুভূতি হয় পবনের।
হুসেন প্রায় ওপারের ঘাটের কাছাকাছি চলে এসেছে। কালু বাউড়ি হুসেনের কথার পৃষ্ঠে ছমক ধরে বকবক করেই চলেছে। হুসেন এখন বক্তা। এমন ভাবে নিজের জ্ঞান উজার করে শোনানোর শ্রোতাতো বড় একটা জোটে না। সে তাই বলে চলেছে, ‘কাটাখালি নদীটারে কি এমন দেখতেছো, এ অঞ্চলের নদী মানে সপ এড্ডা এড্ডা যেন সমুদ্দুর। রায়মঙ্গল, মাতলা, কালিন্দী, বিদ্যাধরী সপ যেমন নাম তেমন কাম। ঢেউ কি! নৌকোর খোলে বসে সে ঢেউয়ের মাথায় চড়লে তোমারে ওপরালার স্মরণ নিতেই হবে। অবশ্য আমি তো ফি দিন যাই সে সপ নদীতে’।
হুসেনের শেষ বাক্যটায় যেন অহং ঝরে পড়ে। নৌকোয় খড়ের উপর মার্কিন ধুতি পাতা, তার উপর ছইয়ের ব্যবস্থা। ওতে বাবু ঘরের লোকেরা বসে। শেখর তবে ছইয়ের বাইরেই বসেছিল। এদের কথাবার্তা কিছুই শুনছিল না। নিজের ছোট্ট টিনের বাক্স খুলে একবার হাত রাখে নথ, সুগন্ধীর শিশি আর বর্ণপরিচয়টাতে। হুসেন ঘাটে নৌকো নোঙর করতে করতে বলে, ‘নামো খোকা’।











বারাসাত থেকে টাকি পর্যন্ত তখন সড়ক পথ হয়ে গেছে। সন তারিখের নিরিখে তা মোটামুটি ১৮২৭-২৮ সাল নাগাদ। আসলে রাজা রামমোহন রায় ইংল্যান্ড গমনের পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের কাছ থেকে দ্বারকানাথ ঠাকুর ‘নিমক পত্তনের অথবা সল্ট বোর্ড’-এর দেওয়ানের পদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। সল্ট বোর্ডের দেওয়ান পদ পাওয়ার জন্য একজন স্বচ্ছল জামিনদারের প্রয়োজন হোত। এক্ষেত্রে কালীনাথ মুন্সী নির্দ্বিধায় দ্বারকানাথের জামিনদার হয়েছিলেন। আসলে তখন এদেশে লবণ কেনার প্রচলন ছিল না। স্বচ্ছল শ্রেণীর ব্যক্তিগণ নিজেদের প্রয়োজনমত লবণ নিজেরাই তৈরি করে নিত। ইংরেজরা এই ব্যবস্থা স্বহস্তে গ্রহণ করে আইন করে দেশজ ভূস্বামীদের লবণ ব্যবসা বন্ধ করে দেন। দ্বারকানাথের দেওয়ানী কর্মস্থল টাকির উত্তরে যমুনা ও ইছামতী নদীর তীরে ছিল। সোলাদানা কালীনাথের জমিদারের নিকটতম হওয়ায় দ্বারকানাথ মাঝেমাঝেই সোলাদানা যেতেন। সোলাদানা এলেই দ্বারকানাথ টাকি আসতেন। সোলাদানায় তখন একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট আর একজন ডাক্তার থাকতেন। দ্বারকানাথের এই যাতায়াতের অসুবিধার কারণে টাকির জমিদার কালীনাথ মুন্সী বারাসাত থেকে টাকি পর্যন্ত সড়কপথ তৈরি করেন আনুমানিক ৮০ হাজার টাকায়। বৈষ্ণবদের গানের আসরে টাকিতে জমিদারকে তুষ্ট করবার জন্য গান বাঁধা হয়েছিল ‘ধর্ম অবতার বাবু কালীনাথ / নতুন রাস্তা বাঁধিয়ে দিলে সোলাদানা বারাসাত’। তখন অবশ্য শেখরের বাবা রামতনুই জন্মায় নি। তা শেখর এত বিবরণ জানবে কেমন করে।
রামতনু বলেই দিয়েছিলেন ‘দূরদেশের মানুষ, বেয়াড়াদের সঙ্গে করে নিয়ে আসবে হুসেন’। তাই বাড়ির পালকি পাঠান নি। ঘাটে উঠে বেয়াড়ারা আবার পালকি কাঁধে তোলে।


বাড়ির সামনে গিয়ে রীতিমত তাজ্জব বনে যায় শেখর। হ্যাজাকের আলোয় আলোয় ছয়লাপ হয়ে আছে চারদিক। উঠোনে শামিয়ানা টানানো। শেখরের সব কিছু সবিস্তারে শোনার জন্য আর তর সইছিল না। মনে হচ্ছিল পালকি থেকে নেমে দৌড় লাগায়। বাড়ির ফটকের সামনে পালকি দাঁড়ালে শেখর পালকি বাহকদের সঙ্গে আর কোনো সৌজন্য বিনিময় না করে বাড়ীর ভেতর পড়ি কি মরি করে দৌড় লাগায়। দড়িদড়া, ত্রিপলে ভরে আছে উঠোনখানা। কিন্তু কাকে যে শুধোবে সেটাই বুঝতে পারে না। ছোটো কাকার মেয়ে গৌরীকে দেখে ছুটে আসে।
গৌরীর বাবা কালিপদকে সুন্দরবনে বাঘে খেয়েছে আর গৌরীকে মানুষ করেছে রামতনু। শেখরের মা শশীরই কোলে পিঠে মানুষ গৌরী। বুকের দুধ খেয়েছে। শশিকলার মাতৃকূলের বনেদিয়ানার ছাপ তাই শেখর আর গৌরীর নামকরণে স্পষ্ট। গৌরীর বিয়ে হয়ে গেছে পাঁচ বছর আগে। ঘরবসত হয়ে এক ছেলের মাও বনে গেছে। সন্দেশখালির ভূস্বামী ব্যানার্জ্জী পরিবারের বড় ছেলের দ্বিতীয়পক্ষ গৌরী। গৌরীর শ্বশুর রাঘব ব্যানার্জ্জীর ভয়ে এক সময় বাঘে-মানুষে এক ঘাটে জল খেত। অবশ্য মা বনবিবির বাহনকে এ তল্লাটে কেউ বাঘ বলে না, বলে ‘বড়মিঞা’। সম্মান জানায় আপনি সম্মোধনে। তা তেনাদের দাপটে এ অঞ্চল থরহরিকম্প।
গৌরীকে সামনে পেয়ে শুধোয় শেখর, ‘হ্যাঁরে বাড়িতে এত উৎসবের আয়োজন কিসের রে?’
শেখরের সামনাসামনি পরে গৌরী একেবারে হতবাক। বিস্ফারিত চোখে দাঁড়িয়ে থাকে।
শেখর হাসে, ‘মুখে কি খিল পড়লো নাকি, বাক্যি সরে না!’
গৌরী কোনোরকমে তুতলে বলে, ‘বড়োমা ঘরে আছেন যা না, বলবে খনে সব বৃত্তান্ত। ছেলেটা কেঁদে টাস লেগে গেল, আমি যাই’।
শেখরের মাথাটা সত্যি আর কাজ করে না। শেখর এতক্ষণে খেয়াল করে, গৌরী বেশ সেজে আছে। এই রাতের বেলা এক গা গহনা, জরি সুতোয় কাজ করা চেলি, বোধ করি মাথাতেও ঝুমকো লাগানো রুপোর কাঁটা পদ্ম খোপায় গোঁজা।
‘মা, ও মা’ বলে সিঁড়ি ভেঙে দাওয়ায় ওঠে শেখর। ইটের পাকা বাড়ি তবু বারান্দা প্রায় ছ’ফুট উঁচুতে। এখানে তো অবশ্য বারান্দাকে বলা হয় ‘হাতনে’। তা সে ঘরবাড়ি ইটের গাঁথনির সঙ্গে এঁটেল মাটির মিশ্রণে তৈরী। একেবারে নিকোনো তকতকে করে রাখা হয়। দেওয়ালে দেওয়ালে গেঁড়ীমাটি, আলতা আর মেটে সিঁদুর দিয়ে ফুল, লতাপাতার আলপনা আঁকা। হোক না আনাড়ী তবু তো ছবি। এক মুহূর্তের জন্য শেখর নিজের বাড়ির দেওয়ালের দিকে তাকায়। শাল কাঠের জানলা দরজা। তবে জানলায় কোনো খড়খড়ি না থাকায় সে জানলার আকৃতি এতই ছোট যে একটা বিড়ালও গলতে পারবে না। অনেক উঁচুতেও। লোহার মতো শক্ত গরান কাঠের খুঁটি আড় করে লাগানো। তার উপর টালি দেওয়া। এগুলো অবশ্য বাইরের ঘর। রামতনুর ঘরটা অনেকদিনের পুরনো জলছাদের তৈরি। কিছুদিন আগে শেখরের ঘরখানাও বসিরহাট থেকে রাজমিস্ত্রি নিয়ে এসে ছাদ দেওয়া হয়েছে। মই দিয়ে ছাদে ওঠাও যায়। ছাদ শেষ হওয়ার পর রামতনু সমস্ত গ্রামের লোককে একদিন ভোজ দিয়েছিল। বিন্তি পিসি জোর করে মই দিয়ে ছাদে উঠে নাকি বলে, ‘এত উঁচু থেকে চারপাশ তাকালে এত সুন্দর দেখতে লাগে মনে হয় ঝাঁপ দে মরলেও সুখ’।
সেই থেকে রামতনু কোনও মেয়ে লোককে ছাদে উঠতে দেয় না। তবে শেখর মনে মনে ঠিক করে রেখেছে ও বাবা যাই বলুক আন্নাকে নিয়ে সে একদিন ছাদে হাওয়া খেতে উঠবেই।
লম্বা বারান্দা দেওয়া পরপর ঘর। শেখরের নিজের ঘরের কপাট ভেজানো। বারান্দার একধারে ইয়া বড় এক মেটে জালা। তার পরে পেতলের ঘটি। শেখর সিঁড়িতে জুতো খুলেই উঠেছিল। এবার হাত পা ধোয়। বাইরে থেকে এসে হাত পা না ধুয়ে উঠলে শশিকলা বড্ড রেগে যায়। এ বাড়িতে বয়স্কা এবং বিধবা স্ত্রীলোক না থাকায় আচার বিচার যথেষ্ট কম। অথবা জলাজঙ্গলের দেশ বলে হয়তো অতকিছু মেনেও চলা যায় না। শেখর সটান ঘরে ঢুকে আরও অবাক হয়ে যায়। শশিকলা এত রাতে লাল পেড়ে গরদ পরে আছে আর খাটময় গহনা বিছানো।
‘মা’ বলে ডেকে উঠলে শশিকলা চমকে পিছনে তাকায়। তারপর এক গাল হেসে বলে, ‘বাপ আমার ঠিক সময়ে চলে এয়েচে। ভয়ে আমার বুকে ঢেঁকির পাড় দিচ্ছিল। লগ্ন সেই ভোররাতে তবু ......... ও সাবুর মা, যা দিদি আমার বাছার জন্যি সরবত আর নাড়ু আন। ও তো আর উপবাসে নেই’।
শেখর যেন এবার কথা বলবার ফুরসত পায়। প্রকাণ্ড এই ঘরখানার চারটে ঘুলঘুলি জানলা। পিদিম রাখার খোপ। সেগুন কাঠের ময়ূরপঙ্খী বিশাল খাট। সিন্দুক, চারখানা তোরঙ্গ। একটা শিরীষ কাঠের টেবিল। তাতে রামতনুর কিশোর বয়সে ইংরেজদের সঙ্গে জঙ্গলে বাঘ শিকারের একটা ছবি। শার্ট প্যান্ট পরা হাতে দোনলা বন্দুক, পাশে দুজন সাহেব। সাহেবদের পাশে রামতনুকে নেহাতই খোকা মনে হচ্ছে। কোনও কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় ছবিটা তোলা, ছবিতে তাই বলছে। সেদিকে একবার চোখ মেলতেই দেওয়াল জুড়ে ইংরেজ সাহেবের ‘গুড বয়’ ভূস্বামী হওয়ার জন্য যে প্রকাণ্ড বেলজিয়াম কাচের আয়না ছিল, নজরে আসে না। গেল কোথায়? ওটির প্রতি বাবা মা দুজনেরই প্রবল দুর্বলতা ছিল সেটা শেখর জানতো। তার বদলে ছোট একটা হাত আয়না সেখানটায়। এ বাড়িতে পা দেওয়ার পর থেকে চমকের পর চমক ঘটেই চলেছে। শেখর কোনটা ছেড়ে কোন প্রশ্নটা করবে মাকে, তাই বুঝতে পারে না। বলে, ‘ওমা আয়নাটা গেল কোথায়?’
সলজ্জ হাসে শশিকলা, ‘নতুন বউ আসবে, তা ও আয়না আর এ ঘরে মানায়? তাই তোর ঘরে টানিয়ে দিয়েছি’।
আক্ষরিক অর্থে শেখর কিছু বুঝতে পারছিল না। অবশ্য ঘরবসত না হওয়া পর্যন্ত সে মেয়ে নতুনই থাকে।
এ বাড়ির ঝি সাবুর মা এত রাতে দইয়ের শরবৎ আর প্রকাণ্ড সাইজের চারটে নাড়ু কাঁসার থালা গেলাসে করে নিয়ে আসলে শশিকলা নির্দেশ দেয়, ‘খেয়ে নাও বাবা। সময় কম’।
বিনা বাক্যে শরবৎ আর দুটো নাড়ু খেয়ে নেয় শেখর। হাতের তোরঙ্গটা মেঝেতে নামিয়ে রেখেছিল। সিমেন্টের লাল মেঝে। সেদিকে চেয়ে আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করে, ‘আমিতো কিছু বুঝতে পারছি না’।
শশিকলা হাসলে আজও খুব সুন্দর দেখায়। হাসিমুখে বলে, ‘তোমায় কিচ্ছুটি বুঝতে হবে নে। তুমি গঙ্গা বাবাজীর সঙ্গে ... আচ্ছা আমিই বাবাজীকে ডেকে পাঠাচ্ছি’।
গঙ্গা হল এ বাড়ির জামাই, গৌরীর স্বামী। বয়সে শশিকলার বড় বৈ ছোট নয়। শশিকলা পালঙ্ক থেকে নেমে বাইরে গেলে অন্য স্ত্রীলোকটিও বাইরে যায়। বিছানার উপর ছড়ানো একরাশ গহনার দিকে চেয়ে শেখর পুরো কিংকর্তব্যবিমূঢ়ভাবে জড়বৎ দাঁড়িয়েই থাকে। তার কলেজে পড়া মাথায় ঢোকে না এসব হচ্ছেটা কি?

গৌরী ছেলে কোলে গঙ্গার সঙ্গে ঘরে ঢোকে। গঙ্গার হাতে নতুন ধুতি, গেঞ্জি, আন্ডার ওয়্যার, টোপর আর সুতির গাত্রবস্ত্র। গৌরী মুখ নিচু করে বলে, ‘নাও দাদা তাড়াতাড়ি পরে নাও। লগ্নের আর বেশী দেরী নেই’।
শেখরের যেন সব ধৈর্য্য কামিনী ফুলের মতো ঝরে পড়ে, ‘তার মানে? মা কই মা? লগ্ন মানে? আমাকে নিয়ে কি তামাসা হচ্ছে নাকি?’
শশিকলা এতক্ষণ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতে শুনছিল। সে এবার কপাট ঠেলে ঘরে ঢোকে, ‘তামাসা তোমাকে নিয়ে আমরা করি নি। করেছেন ঐ টাকির ভালোমানুষের পো-রা। শোনো শেখর আন্নাকালিকে এ ভিটেতে বউ হিসাবে আর স্বীকার করা হবে না’।
শেখর কেঁদেই ফেলে, ‘কেন কি করেছে সে?’
শশিকলার ভিতরে মনসা ভর করে। বিষ ঢালে সে, ‘ছিঃ শেখর যে মেয়ের এখনও ঘরবসত হয় নি তারজন্য এত দরদ এত টান! এই তোমার কলকেতার কলেজে পড়ার শিক্ষে?’
শেখরের ইচ্ছা করলো একবার বলে – এর সঙ্গে কলকাতা কলেজের কি সম্পর্ক। কিন্তু সে এখন কি বলবে আর কি বলবে না তাল হারিয়ে ফেলেছে। তাই অতি কষ্টে হাতজোড় করে বলে, ‘আমাকে সব খুলে বল মা। কেন আমায় আবার বিয়ে বসতে হবে? সে কি করেছে?’
বড় নিষ্ঠুর হাসে শশিকলা, ‘কি করেছে সে?’
চোখের ইশারায় গৌরীকে নিয়ে বেরিয়ে আসে শশিকলা।
গঙ্গা হেসে বলে, ‘নাও ভায়া কাপড়জামা পর। ওদিকে তোমার হাবিরানি পথ চেয়ে বসে আছে’।
গলা তোলে শেখর, ‘কে হাবি?’
ফের হাসে গঙ্গা, ‘আজ্ঞে তোমার ভাবি বউ’।
‘আমার আবার বউ হতে যাবে কেন? আমি তো বিবাহিত। আমার বউ আছে। আন্নাকালি’।
গঙ্গা যেন আকাশ থেকে পড়ে, ‘ও মা! কি বলতেছ গো আমার শালাবাবু। পুরুষ মানসের দুচারটে বউ থাকবে তা কি এমন হাতি ঘোড়া ব্যাপার। তায় আবার আমরা কুলীন ব্রাহ্মণ’।
শেখরের যেন ধৈর্হ্যের বাঁধ ভাঙ্গে, ‘সেসব তো বুঝলাম। কিন্তু আন্নার তো ঘরবসতই হয়নি। তার আগেই আর একটা বিয়ে কেন?’
মুখে একটা চুকচুক শব্দ করে গঙ্গা, ‘ইস শালাবাবু আমার সত্যিই কিছু বোঝে না। আরে তোমাদের বাড়ির প্রথা অনুযায়ী বউ-এর প্রথম মাসিক হবে শ্বশুরবাড়ি। আর সেক্ষেত্রে তোমার আন্নাকালির শ্বশুরঘরে আসবার আগেই ............ হি হি হি’।
চোখের সামনে বাজ পড়া দেখলেও বোধহয় শেখর এতটা চমকে উঠত না। বয়সে অনেক বড় বোনের স্বামীর সঙ্গে এ ধরণের আলোচনায় গা ঘিনঘিন করে ওঠে শেখরের। সে বাক্যহারা হয়ে পড়ে। হাত-পা বাঁধা জন্তুর মতো এক এক করে পরনের জামাকাপড় খুলে ফেলে। গঙ্গার হাত থেকে নতুন জামাকাপড় নিয়ে পরে। নীলচে দুচোখ জলে ঝাপসা হয়ে আসে। গলার কাছে শক্ত হয়ে দলা মত পাকিয়ে ওঠে। গঙ্গা যখন তার মাথায় টোপরটা পরিয়ে দেয় সে সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলে। গঙ্গার হতবুদ্ধির শেষ থাকে না। পুরুষ মানুষের নতুন বউ তায় যদি সে দুগ্ধ পোষ্য কচি হয় সে তো বেশী মজা।
গঙ্গা তাই গঙ্গার মতো করে সান্ত্বনা দেয়, ‘আরে ভায়া মেয়েছেলের মতো চোখের জল ফেলছো কেন? আমিও তো তোমার বোনকে যখন দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেম তার তো তখন দশ বছর বয়স। অথচ আজ এক ছেলের মা। কেমন ডাগরটি হয়েছে বলো?’
শেখরের ইচ্ছা করে সম্পর্ক ভুলে গঙ্গা নামের এই লোকটার গালে ঠাস করে একটা চড় কষায়। বিমান বলে ‘মেয়েছেলে’ শব্দটার মধ্যে একটা অশ্লীলতা আছে। মেয়েছেলে বলতে সাধারণতঃ ‘তাদের’কে বোঝানো হয় যারা সন্ধ্যের পর সেজেগুজে ‘বাবু’দের জন্য অপেক্ষা করে। সেই শব্দটা আন্নাকালির নামটার সঙ্গে জড়িয়ে ব্যবহার করায় শেখরের সর্বাঙ্গে যেন আগুন জ্বলে ওঠে। বেশ জোরের সঙ্গেই বলে, ‘মেয়েদের সম্পর্কে সম্মান দিয়ে কথা বলবেন গঙ্গা দাদা’।
গঙ্গা এ বাড়ির জামাই। আর জামাই মানে মাথার মণি। তাকে এমন কটাক্ষ করে কেউ কথা বলতে পারে তা গঙ্গা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। বজ্রাহতের মতো ছিটকে বেড়িয়ে এসে চেঁচামেচি জুড়ে দেয়, ‘এক্ষুণি আমি এ ভিটে ছেড়ে চলে যাব। কলকেতায় গিয়ে দুকলম ইংরেজি কপচেছে বলে এত দম্ভ? এত অহংকার? এই আমি পৈতে ধরে অভিশাপ দিচ্ছি এ ভিটেতে ঘুঘু চড়বে’।
শশিকলা গঙ্গার পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কাতরকণ্ঠে বলে, ‘ও বাবা তোমার অভিশাপ ফেরায়ে নেও। আজ শুভদিন, শেখর ছেলেমানুষ কি বলতে কি বলেছে। তায় আমরা ওকে বিয়ের কথা গোপন রেখে তার পাঠিয়েছিলাম। তুমি ওকে ক্ষমা করে দেও বাবা’।
গঙ্গা তার জায়গায় অটল। সে এবার দ্বিতীয় হুঙ্কার দেয়, ‘গৌরীকে আমি ত্যাগ দিয়ে ছেলে নিয়ে চলে যাব’।
গৌরী এতক্ষণ থরথর করে কাঁপছিল। সে এবার তারস্বরে কেঁদে ওঠে, ‘ও জ্যাঠা আমার কি সর্বনাশ হল গো। ও দাদা তুই আমার ভাই হয়ে এত বড় ক্ষেতি করতে পারলি? আসলে আমি তোর নিজের মায়ের পেটের বোন না বলে তুই এমনডা করতে পারলি। ও বড়মা আমি তো তোমার বুকের দুধ খেয়ে বড় হইছি। তোমাদের তো মা-বাপ ভিন্ন অন্য জ্ঞান কোনদিন করিনি। তোমরা কিছু করো’।
রামতনু এতক্ষণ নীরব দর্শক হয়েই ছিলেন। গৌরীকে তিনি সত্যিই ভালবাসেন এবং স্নেহ করেন। তাই গৌরীর কান্না খুব আকুল করে তোলে তাকে। তিনি এসে গৌরীকে কাছে টেনে নিলে জ্যাঠার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে গৌরী, ‘আমাকে এট্টুসখানি সেঁকো বিষ দাও জ্যাঠা’।
শশিকলা চারদিক তাকিয়ে দেখে বাড়িতে আত্মীয় কুটুম, চাকর, পালকি বেয়াড়ারা, প্রতিবেশীরা সবাই এমনভাবে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে যেন সঙ দেখছে। শেখরকে হিড়হিড় করে টেনে আনে। বলে, ‘জোড়হাত করে ক্ষমা চা, মাপ চা বাবাজীর কাছে। অকাল কুষ্মাণ্ড পেটে ধরেছি’।
শেখর একবার গৌরীর অশ্রুসজল করুণ মুখখানার দিকে তাকায়। বুকের ভিতরটা ছ্যাঁক করে ওঠে। আরেকটা করুণ মুখ আবছা মনে পড়ে যায়। দুহাত জোড় করে বলে, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে, আমায় মাপ করে দিন গঙ্গা দাদা’।
গঙ্গা যেন এইটুকুর অপেক্ষাতেই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে মুখে তেল চুঁইয়ে পড়া আকর্ণ হাসি এনে বলে, ‘ঠিক আছে ঠিক আছে। নিন মা স্ত্রী আচার যা যা আছে তাড়াতাড়ি সেরে নিন। সময় কম’।
গৌরী ছুটে গিয়ে কোন একটা ঘর থেকে বরণকুলো এনে দেয়। শশিকলা যত্ন করে ছেলের যাত্রা আরম্ভ করে দেয়। যে গৌরী এতক্ষণ কেঁদে কঁকিয়ে জগৎ ভাসিয়ে ফেলছিল সে এবার খিলখিল করে হেসে বলে, ‘নে শেখর এবার বল, মা তোমার জন্য দাসী আনতে গেলুম’।
শেখর নিজের মায়ের হাসি মুখটার দিকে তাকায়। কেন জানিনা সে বুঝতে পারে সমস্ত শরীর মন যেন নিজের গর্ভধারিণীর প্রতি ঘৃণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। বড় ঘৃণাভরেই সে উচ্চারণ করে, ‘মা তোমার জন্য দাসী আনতে যাচ্ছি’।
সঙ্গে সঙ্গে শাঁখ উলুতে সরগরম হয়ে ওঠে জায়গাটা। রামতনু হাঁক পাড়ে পালকি বেয়াড়াদের। এবার বাড়ির পালকি করে যাবে শেখর। কিন্তু কলকাতা থেকে আসা পালকি বেয়াড়ারা এখানে এসে পড়ে এমন উৎসবের মধ্যে পড়বে ভাবতেও পারেনি। খুশিতে তাদের প্রাণ ডগমগ হয়ে আছে। তারা এসে হাতজোড় করে রামতনুর কাছে মিনতি জানায়, ‘বাবুমশাই আমাদের পালকিতেই চলুক না কেন ...’।
আসলে কন্যা পক্ষের ভোজটা পাছে হাতছাড়া হয়ে যায় এই তাদের চিন্তা।
রামতনু বলে, ‘ঠিক আছে’। গঙ্গাকেও একটু খুশী করার জন্য বলে, ‘গঙ্গা বাবাজী তাহলে গরুর গাড়িতে না গিয়ে বাড়ির পালকিতে তত্ত্ব নিয়ে বসুক’।
গঙ্গাও খুশী হয়। শেখর ধীরে ধীরে পালকিতে উঠে বসে। কেন জানি না তার আর কান্না পায় না। শুধু মনে হয় জন্মের শোধ এ বাড়ি থেকে তার চলে যাওয়া। একটুও মায়া হয় না। কষ্ট হয় না শেখরের। শুধু বুকের ভিতরটা নীল চাষের পর নীলের বিষে জজরিত ধূধূ টাঁড় জমিগুলোর মতোই হুহু করে ওঠে অলীক এক প্রতিহিংসা।






এ হল বাদার অঞ্চল। এখানে আবাদ হয় না। এখানকার জল আকুচ নুনে ভরা। এ অঞ্চলে তাই ইংরেজরা নীলচাষের রমরমা গাঁড়তে পারে নি। কারণ নীলচাষের জন্য দরকার পরিষ্কার মিঠে জল। এখানে ডাঙ্গায় বাঘ, জলে কুমীর নিয়ে মানুষের সংসার। ভবানীপুর গ্রামটা সুন্দরবন এলাকার মধ্যে হলেও পুরোপুরি জঙ্গলে ঢাকা না। প্রায় ১৭০০ থেকে ১৭৭৩ সালের মধ্যে ২৪ পরগণার তৎকালীন জেনারেল ক্লঁদে রাসেল তখন এ অঞ্চলের কিছু কিছু ব্যক্তিকে জঙ্গলের ইজারা দিতে শুরু করেন এই শর্তে যে প্রথম সাত বছর কাউকে কোন খাজনা দিতে হবে না। কিন্তু সাত বছর পর থেকে জঙ্গল কাটা অনুযায়ী মাপজোক করে জমির গুণাগুণ নির্ণয় করে নির্দিষ্ট হারে খাজনা নির্ধারণ করা হবে। তারপর প্রতি দশ বছর অন্তর জমির উৎকর্ষতা যাচাই করে খাজনার পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। এইভাবে ‘পতিতাবাদতালুক’ ইজারা দেওয়া শুরু হল। রামতনু মুখার্জ্জীর পরিবার প্রচুর জমির মালিক হয়ে ওঠে। সবটাই যে সরকারী জমির হিসাবের মাপজোখের মধ্যে আছে তা না। আবার যারা জঙ্গলের গভীরে গিয়ে জঙ্গল কেটে জমির মালিক হয়ে বসল তারা কোন চুক্তির ধার না ধেরেই এ কাজ করল। যেমন গঙ্গার পূর্বপুরুষেরা।
জমির লোভ সাংঘাতিক লোভ। জমির নেশা বড় ভয়ংকর। জমি-জিরেত কথাটা তো আর এমনি এমনি আসে নি। জমি আমাদের জিরোতে দেয় না। তাই একসঙ্গে জমি-জিরেত। কত দূর দূর জায়গা ছোটনাগপুর, বিহার মুলুক থেকে কোল, ভীল, সাঁওতাল শ্রেণীর কালোকুঁদো মানুষগুলো আসতে লাগল। তারা সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, ফলমূল যা পায় তাই খায়। কাজ করাটাই তাদের উৎসব। বেঁচে থাকাটাই আনন্দ। ফলে তাদের এখানে কোন অসুবিধা হল না। লাটকে লাট জঙ্গল কেটে পতিত জমি উদ্ধার করে তারাও বসবাস করতে শুরু করে। বংশ পরম্পরায় এখানে থেকে যায়। শরীরে তাদের অসুরের মতো বল। তাদের সঙ্গে এখানকার রোগা দুবলা হাড়- জিরজিরে মানুষগুলো পারবে কেন? এরাই হল সুন্দরবন এলাকার স্বঘোষিত জমিদার শ্রেণীর আসল শত্রু। এরা সন্ধিতে আসে না। প্রাপ্য অধিকার ছিনিয়ে নিতে চায়। ইংরেজদের সঙ্গে খাতির, উৎকোচ, জরিমানা, জো-হুজুরগিরিতে তবু ছাড়ান পাওয়া যায়। কিন্তু এই আদিবাসী জাতটা যেন পারদ। কিছুতেই মুঠোয় আসে না। পিছলে যায় সর্বক্ষণ। এদের আর একটা অসহ্য সম্পদ হল এদের ঘরের মেয়েগুলো। কালো হিলহিলে শরীরে সব যেন এক একটা কালাজ সাপ। নখ থেকে চুল পর্যন্ত বিষের আঠার প্রলেপ মেখে বেড়ায়। কোন কিছু রাখঢাখ নেই। আদুল গায়ের মতো আদুল এদের চলাফেরার ছমক।
ঘরে বাচ্চা-বাচ্চা মেয়েগুলোকে বউ করে যতই আনুক না সবই তো সেগুলো কাদার দলা। যেমন ছানবে তেমনি হবে। ওতে পুরুষের শরীরের সুখ হয় না। ফাই-ফরমাশ, ঘরের কাজ, ছেলে বিয়োনো এসবের জন্য এ ধরনের মেয়ে আদর্শ। কিন্তু ওতে পুরুষের আশ মেটে না। তাই ঐ নির্মেদ কালো চেহারার লকলকে মেয়েগুলোর শরীরের বিষ-আঠায় এঁটুলির মতো চোখ আটকে যায় গঙ্গার। ওদের জব্দ করবার নানারকম ফন্দিফিকির আঁটতে থাকে। স্বয়ং সাদা চামড়ার সাহেবগুলোও ঐ আদিবাসী মেয়েগুলোর উলুকঝুলুক চলনবলনে কেঁচোর মতো পড়ে থাকে। কেউ কেউ কৃপাও পায়। যেমন পেয়েছিলো ঝুমকো হেমব্রম। স্কট সাহেব সুন্দরবনের কমিশনার পদে নিযুক্ত হওয়ার পরে বেআইনিভাবে যেসব জমি অন্যের ভোগদখলে চলে গিয়েছিল সেগুলো উদ্ধার করে খাজনা বসাতে উদ্যোগী হয়। স্কট সাহেবের সঙ্গে ইংল্যান্ড থেকে বেশ কিছু সাঙ্গপাঙ্গও এসেছিল। এদের মধ্যে কার সঙ্গে আমাদের দিশি ঝুমকো জবার ভাব-ভালোবাসা আদানপ্রদান হয় তা অজানা। তবে বাড়ুয্যে পরিবারের লাট ঘেঁষে ঝুমকো হেমব্রমের ইজারার পত্তন হয়ে যায়। একটা কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারের জমির গা ঘেঁষাঘেঁষি করে একজন আদিবাসী পরিবারের ইজারার পত্তন মেনে নেওয়া খুব কঠিন। গঙ্গার পূর্বপুরুষদের সঙ্গে সেই থেকে ঝুমকো হেমব্রমের পারিবারিক বিবাদ। অবশ্য শেখরের পরিবারের সঙ্গে এ বিবাদের কোন সম্পর্ক নেই।


রামতনু মানুষ হিসাবে যথেষ্ট ‘ভালমানুষ’। কিন্তু শশিকলার কাছে কোন এক অজানা কারণে তার সব বিক্রম পরাস্ত হয়ে যায়। শশিকলার বাপের ঘরও ঐ হিঙ্গলগঞ্জে। গঙ্গাদের সীমানার পূবদিকের লাট। যাকে গুমোড়ের ভাষায় বলে জমিদারী। গৌরীর সম্বন্ধ তাই শশিকলার বাপের বাড়ি থেকেই দেওয়া। শশিকলার বাপের বাড়িতে কি করে যেন সাদা চামড়ার রক্ত ঢুকে গিয়েছিল। তার গল্পটাও খানিকটা এইরকম।
সে অবশ্য বহুকাল আগের কথা। তখনও তরা, আমুর, নোনাঝাউ, বনভেন্ডি, বনলেবু, চুলিয়াকাটা, বাওলেলতা, কেয়াকাটা সব গাছগুল্মের ছড়াছড়ি। জলে হাত দিলেই উঠে আসত কাঠকই, ন্যাদস, গুড়জাওয়ালি, নলখয়রা, সাতহেতে, উলুকাঁকড়া, চন্দনা কত রকমের মাছ। আকাশের দিকে চোখ মেললেই দেখা যেত কাঁক, হরিয়াল, বিগড়িহাঁস, শঙ্খচিল, কৃষ্ণচিলের ওড়াউড়ি। জঙ্গল কাটতে কাটতে সেসব আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এখন বাদারবন হল গিয়ে ‘সাবাড়ের দেশ’। বনবিবি, শাহজাঙ্গুলি, দক্ষিণা রায়ের জলজভূমিতে এখন শুধু থিকথিক করছে মানুষ। মানুষের হিংসা, ক্রোধ, প্রেম-অপ্রেমের কাহিনী। জঙ্গল পাতলা হতে হতে মানুষের ভয় ক্রমশঃ পিছিয়ে যাচ্ছে। ভয়ে গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেদেরকে।

অবিভক্ত বাংলাদেশ তখন এখনকার পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারতবর্ষ সব মিলিয়ে একটাই দেশ ভারতবর্ষ। যশোরের জজ সাহেব তখন ছিলেন টিলম্যান হেঙ্কেল। তিনি সে সময় গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে রায়তদের জন্য সুন্দরবন অঞ্চলে ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। সে অবশ্য স্কট সাহেব সুন্দরবনের কমিশনার পদে নিযুক্ত হওয়ারও আগের কথা। সন তারিখ নির্ণয়ে ১৭৮৫-৮৬ সাল নাগাদ হবে। হেঙ্কেল সাহেব সে সব গোমস্তাদের নিযুক্ত করে যে জঙ্গলের ‘পতিতাবাদতালুক’টুকু উদ্ধার করেন তার নাম হল ‘হেঙ্কেলগঞ্জ’। মানুষের মুখে-মুখে ভাঙতে ভাঙতে গড়তে গড়তে সে জায়গার নাম এখন ‘হিঙ্গলগঞ্জ’। গঙ্গার জমিদারী, শশিকলারও বাপের ঘর আর তার সঙ্গে বাদাড় অঞ্চলের থকথকে পিরীতি কাদার মতো অসহ্যভাবে লেপটে রয়েছে কোন এক স্বর্গীয় ঝুমকো হেমব্রমের খাসতালুক।


গঙ্গা পালকিতে করে আসবার সময় শ্বশুরবাড়ির শেষ ঘটনাটায় তার মনে বেশ আত্মসন্তুষ্টির বোধ তৈরি হয়েছিল। পালকিতে তত্ত্বসামগ্রী নিয়ে বসে মিটমিট করে হাসছিল। কিন্তু সেই সঙ্গে একটা বিষয় বাবলা কাঁটার মতো খচখচ করে বিঁধছে। তা হোল ‘গৌরী’। গৌরীর বড় সতীন সত্যবতীকে নিয়ে কোন সমস্যা নেই। টুপটাপ করে পরপর তিনটে মেয়ে বিইয়ে বেচারি কোণঠাসা হয়ে হেঁশেলকেই আশ্রয় করে নিয়েছে। বড় মেয়ে বিয়ে দিয়েছে বসিরহাটের ‘গাছা’তে। মেজোটা জন্মাবধি বোবাকালা। আর ছোটটা তো মাই খায়। সেখানে গৌরী প্রথমেই পুত্র সন্তান জন্ম দিয়ে গঙ্গার যেন বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছে। অথাৎ কিনা গঙ্গা যে আর একবার ছাদনাতলায় যাবে তার ঘরে এক ঘটি জল। শেখরের এমনভাবে বিয়েটা গঙ্গার মনের সুপ্ত ইচ্ছাটাকে প্রদীপের সলতের মতো উসকে দেয়। নতুন একটা মেয়ের শরীর ভাবতে গিয়ে কিছুতেই আর পাঁচ-ছ বছরের পুঁচকে বাচ্চাগুলোয় মন ওঠে না। আর উঠবেই বা কেন, সে এখন বছর পঁয়ত্রিশের ভরন্ত পুরুষ। তাই পাল্কিতে দুলতে দুলতে চলতে চলতে গঙ্গার শরীরে কামজ্বর তৈরি হয়। পালকির পর্দা টেনে দিয়ে সে আপনমনে নিজের শিশ্নতে হাত বোলায়। মাথার ভিতর চক্রাকারে দেখা-অদেখা মেয়েমানুষের নামগুলো পাক খেতে থাকে। সেখানে আন্নাকালিও বাদ যায় না। কিন্তু বারবার থমকে যায় পাশের তালুকের আদিবাসীদের জবা না টগর কি ছাতা একটা কিশোরী মেয়েটাতে। কদিন আগে গঙ্গা নৌকো করে ফিরছিল আর মেয়েটা নদীতে দাপিয়ে স্নান করছিল। পিছলে যাওয়া কালো কুচকুচে শরীরের উপর বুকদুটো যেন আলগা বসানো। সাঁতারের সময় ওঠানামার দৃশ্যটা মনে করতেই পালকির ভিতরেই গঙ্গার স্খলন হয়ে যায়। মুহূর্তে কামবোধ উধাও হয়ে গিয়ে অস্বস্তির শেষ থাকে না গঙ্গার। পালকির ভিতর তত্ত্বের নানা সামগ্রীর দিকে তাকিয়ে বেশ ভয়ও লাগে। শত হলেও কুলীন ব্রাহ্মণের ছেলে, এসব আচার-বিচারের শুদ্ধ জিনিস। শুভ কাজে চলেছিল সে। কি যে হয়ে গেল। কেমন একটা অপরাধবোধে ভিতরটা কেন্নোর মতো গুটিয়ে যায়। ধুতির খুঁটটা দিয়ে পালকির মেঝেটা মুছে দেয়। গঙ্গা পালকির দুলুনির সঙ্গে সঙ্গে একটা বিষয় তীব্রভাবে অনুভব করে তার সমস্ত রাগ, বিদ্বেষ, ঘৃণা সব গিয়ে পড়ে ঐ জবা না টগর কি যেন নাম মেয়েটার উপর। যে মেয়েটাকে দুহাতে আলতো করে ধরবার বাসনায় সমস্ত মনপ্রাণ এতক্ষণ ছটফট করছিল, এখন তাকে দুহাতে পিষে মারবার বাসনায় সমস্ত অন্তরাত্মা যেন ছটফটিয়ে মরে।

ওদিকে অন্য পাল্কিতে শেখর জীবন্মৃতের মতোই পড়েছিল। জীবনের সমস্ত চেতন বোধটাই যেন বা তার আর নেই। থেকে থেকে সমস্ত মন প্রাণ কিসের জন্য যেন কঁকিয়ে উঠে লুটিয়ে পড়তে চাইছে।
কালু বেয়ারা হাসি মুখে বলে, ‘বাবু কি জানতেন না আজ তার বে?’
পালকির ভেতর থেকে সাড়া আসে না।
আবার শুধোয় সে, ‘বাবু কি জানতেন না আজ তার বে?’
না এবারও কোন উত্তর আসে না।
কালুর অভিজ্ঞ মন কিসের জন্য যেন উতলা হয়ে ওঠে। সম্পর্কের শ্রেণী বিভাজন ভুলে পালকির ভিতর উঁকি দেয়। হয়তো বা এ দূরত্ব সেই কলকাতা থেকে আসার সময় শেখরই ঘুচিয়ে ফেলেছিল। তাই পাল্কিতে উঁকি দিয়ে সে আর্তনাদ করে ওঠে, ‘র র ও যদু, শিবু পালকি থামা। বাবুমশাই অচেতন হয়ে গেছেন’।
সত্যি শেখরের সহজ সরল শরীর মন সংসারের জটিল আবর্তের সমস্ত কদর্য নিয়মকানুন আর নিতে পারছিল না। তাই পালকির ভিতরেই জ্ঞান হারায় সে। পালকি থামালে কালুই ছুটে আসে। ছোঁয়াছুঁয়ি আর জল-চল-অচলের ব্যবধান ভুলে ঘটি করে পাশের ডোবা মতো একটা জলাশয় থেকে জল এনে শেখরের চোখেমুখে ছিটোতে থাকে। তার ভিতরে একটা পিতৃ হৃদয় হাহাকার করে ওঠে। অন্যান্য বেয়ারারা একটু দূরত্ব বজায় রেখে উৎকণ্ঠা ভরা চোখেমুখে চেয়ে আছে। সেই কাকভোর থেকে এই ছেলেটার সঙ্গে সঙ্গে তারা রয়েছে। কেমন যেন একটা মায়া পড়ে গেছে। কালু বাউরির দেওয়া জলের ছিটেতে আর প্রকৃতির ঠাণ্ডা বাতাসে জ্ঞান ফেরে শেখরের। একটু একটু করে চোখ মেলে। চোখ মেলেই শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে শেখর। কালু সহ আর সকল বেয়াড়াদের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। কালু আর সকল বেয়ারাকে তফাৎ যেতে বলে সমস্ত রকম ব্যবধান ঘুচিয়ে ঝুঁকে আসে শেখরের কাছে। এসে ফিসফিস করে বলে, ‘কি হয়েছে বাপ তোমার? বে করতে তোমার এত আপত্তি কিসের?’
শেখর কালু বাউরির একটা হাত চেপে ধরে। আপনজনের মতো বলে ওঠে, ‘আমায় বাঁচাও কাকা। এ বিয়ে আমি করবো না। আমি বিবাহিত। আমার স্ত্রী আছে। আন্না। টাকির রজিপুর গ্রামে থাকে। আমি ভেবেছিলাম বাবা মা বুঝি আমাকে ঘরবসত করবার জন্য জরুরী তার পাঠিয়েছেন। কিন্তু এসে দেখি ...............’।
কালুর কপালে গভীর বলীরেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে ভুলে যায় কার সঙ্গে কথা কইছে। তাই কথার পৃষ্ঠে কথা জুড়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, ‘ও মা সে কি! ঠাকুর আর ঠাকরুণ ঘরবসত হওয়ার আগেই তোমার বে দিতি চায় কেন?’
এ কথার উত্তর এমন একটা বিষয় যা শেখর মরে গেলেও কারও সঙ্গে বলতে পারবে না। তাই সে চুপ করে থাকে আর চোখ থেকে অনর্গল জল পড়ে। কালু বুক খালি করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কে জানে কার ভিতরে কোন কষ্ট জমা থাকে। মুখ ফিরিয়ে দেখে শেখরদের বাড়ির পাল্কিটা আসছে। তাতে এ বাড়ির কোন উঁচুদরের কুটুম বেজার মুখে বসে আছে। কালু তাড়াতাড়ি শেখরের কাছ থেকে সরে গিয়ে সম্মানজনক দূরত্বে দাঁড়ায়।


গঙ্গা অন্ধকারে দূর থেকে ঠিক বুঝতে পারছিল না ‘কি হয়েছে’। তাই বেয়াড়াদের তাড়া দেয়, ‘তাড়াতাড়ি চল, তোরা যে এটুকু পথ আসতে রাত কাবার করে দিবি’।
কাছে আসতে বুঝতে পারে এ তার শ্বশুরঘরের সেই ভাড়া করা পাল্কী। কিন্তু এ পাল্কী এতক্ষণে তো মেয়ের বাড়ি চলে যাওয়ার কথা। তা মাটিতে নামানো কেন!
গঙ্গাকে দেখে মহিমের গ্রাম থেকে যে ঘোষাল বামুন বর আনতে গিয়েছিল সে যেন হাতে চাঁদ পায়। ছুটে এসে বলে, ‘দেখোদিনি বাবা কি গেরো। মেয়েটা কি শেষে লগ্নভ্রষ্ট হবে?’
গাঁ-গঞ্জের নিঝুম রাত। মাথার উপর দিয়ে একটা লক্ষ্মীপেঁচা সাঁ সাঁ করে উড়ে যায়। অন্ধকারের মধ্যেও তার সাদা ফটফটে চেহারাটা নজরে আসে। গঙ্গার এতক্ষণ নিজেকে কেমন অশুচি অশুচি মনে হচ্ছিল। লক্ষ্মীপেঁচা দর্শনে মনের সে অস্বস্তি কেটে যায়। শিরশির করে ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে। বাঁ দিকের কোণ বরাবর একটা আঁশসেওড়া ঝোপের মাথায় চাপ চাপ জোনাকি পোকা উড়ে বেড়াচ্ছে। জোনাকির ওড়া দেখে এমন একটা পরিবেশেও গঙ্গার নারী শরীরের কথা মনে পড়ে যায়। কারণ যে জোনাকিগুলো দপদপ করে জ্বলছে সেগুলো মেয়ে জোনাকি, তারা পুরুষ জোনাকিদের ডাকছে ‘এসো গো, এসো, আমাতে অবগাহন কর’। তারপর অবশ্য নির্ধারিত ভাবে তোমার মৃত্যু। গঙ্গার ঠোঁটে নিষ্ঠুর হাসি খেলে যায়, ‘মৃত্যু আসুক তবুও তুরীয় সঙ্গমটা তো ভোগ করা যায়’।
কালু একবার শেখরের দিকে একবার গঙ্গার দিকে তাকায়। আঁশ-শেওড়ার ঝোপের দিকে হা হয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে বাস্তবিক ধৈর্য্য হারায়। হাত জোড় করে বলে ওঠে, ‘মাপ করবেন কর্তাবাবু, কথা না কয়ে আর থাকতে পারতেছিনে - বাবুমশাই তো মূর্ছা গেছেন’।
মূর্ছা শব্দটাতে ঘোর কাটে গঙ্গার। পাল্কীর ভিতর এলিয়ে থাকা শ্যালককে দেখে হতবুদ্ধি হয়ে যায়। একটু নরম সুরে ডাক দেয়, ‘শেখর!’
শেখর তখন কথা বলার মত অবস্থায় নেই। সে কোনোরকমে চোখ মেলে চায়। শেখরের এমন চাউনিতে গঙ্গার মত মানুষের ভেতরটা আর্দ্র হয়ে ওঠে। কোমলস্বরে জিজ্ঞাসা করে, ‘কি হয়েছে শেখর?’
শেখর যেন কি বলতে চায়। চোখ দিয়ে অনর্গল জল পড়ে। ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপে। কালুর বুক উজার করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে। গঙ্গা যেন হাকিমের রায় দেয়, ‘কি করবে ভায়া বল, এখন তো তোমার যে ভাবেই হোক শরীরে বল আনতেই হবে। একজনের তো যা হওয়ার হয়ে গেছে, এ জনও তো তোমার জন্য লগ্নভ্রষ্টা হবে’।
‘লগ্নভ্রষ্টা’ কি ভীষণ শব্দ। ঘোষাল বামুন কঁকিয়ে ওঠে, ‘চলুন গো .........’।
যে মেয়ে একবার লগ্নভ্রষ্টা হয় তার প্রাণে বেঁচে থাকাটা মরে যাওয়ারই সমান। সমাজে সে অপয়া, অলক্ষ্মী, কুলটা ছাড়া আর কিছু বলেই পরিচিত হবে না। পরিবারের সকলের কাঁটার বোঝা।
শেখরের পটলচেরা নীলাভ চোখদুটো তখনো জলে ভরা। সে অস্ফুটে উচ্চারণ করে, ‘আমি ঠিক আছি গঙ্গাদাদা, বেয়াড়াদের পালকি তুলতে বলুন’।
কালু কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে সবই শুনেছে। সে আর গঙ্গার আদেশের অপেক্ষা না করে অন্যদের হাঁকডাক করে পালকি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পালকি এবার বাতাসের আগে ছুটতে থাকে।


পাঁচ বছরের হাবিরাণী চ্যাটাজ্জী, সকলের হাবি তখন ঘুমিয়ে কাদা। জন্ম দিয়ে যে মেয়ের মা মরেছে, সে মেয়ের এমন ঘটা করে বে’র আয়োজন করেছে বিমাতা এই বা কম কি? হাবির বাপের অবস্থা শেখরদের বাড়ির ধার ঘেঁষে না। তবু হাবির বাবা মহিমের বংশ অনেক ঊঁচু, সাধ্যমত আয়োজনও করেছে। তবে তার আক্ষেপ একটাই হাবি নেহাৎ দুধের শিশু, তায় শেখর দোজবর। কিন্তু মহিমের দ্বিতীয় পক্ষ কমলার কাছে এসব ওজর আপত্তি খাটেনি। সে সাফ জানিয়েছে, ‘এমন সুযোগ বিধাতা বারবার দেয় না। মেয়ে সন্তানের আবার বয়েস কি? বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই ছেলে বিইয়ে সে পাটরাণী হয়ে যাবে মুখার্জ্জীদের’। তবে কমলার এত আগ্রহের পেছনে আসল কারণটা হল মেয়ে দেখতে আসার সময় শশিকলা কমলার জন্য প্রচুর উপহার এনেছিল। কমলা তখন তার নিজস্ব বুদ্ধির শুভঙ্করী ধাঁধায় একটা অঙ্ক দুইয়ে দুইয়ে চারে মিলিয়ে নিয়েছিল যে কুটুমবাড়ি হতে না হতেই এত, হলে পরে না জানি কি! আর রামতনুর পরিবারের দপদপার কথা এ অঞ্চলে কে না জানে! কমলার স্বামী মহিম যতই উঁচু বংশ হোক রামতনুর লাটের প্রজা বৈ তো আর কিছু না। এছাড়া সতীনের মেয়ের খোরাকি সে আর কত দিন টানবে।
হাবিকে পাড়া প্রতিবেশীরা জাগিয়ে রাখার অনেকরকম চেষ্টা করছিল কিন্তু সারাদিনের উপবাসে ক্লান্ত শিশুটি বারবার ঘুমিয়ে পড়ছিল। বাড়ি ভর্তী খাবার দাবারের গন্ধে ম ম করছে অথচ তাকে কিছুই দেওয়া হচ্ছে না, এ অনুযোগ লুকিয়ে লুকিয়ে বাপের কাছে করেওছিল। কিন্তু মহিমেরই বা কি করার আছে। এমনটাই তো নিয়ম। সে শুধু কচি মুখটায় সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, বে হয়ে যাওয়ার পর হাবির প্রিয় দুটো মাছের লেজা ভাজা আর চারটে মন্ডা খাওয়াবে। কপালের চন্দন উঠে গেছে। অনেক কষ্টে বাঁধা চুলও প্রায় সবটাই খুলে গেছে। শুধু রাঙাচেলিটা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বিড়ের মত করে পরানো। মহিমের অনুরোধে বা লোক কুটুমের কথার ভয়ে হাবির আজ কপালে মারধোরটা জোটেনি। নতুবা এমন গুরুতর সময়ে সে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে পড়ে আছে এটা ক্ষমার অযোগ্য।
মহিমের আটচালা ঘরখানায় আজ অনেক লোক। সকলেরই মুখে মুখে আজ কমলার জয়গান। রামতনুর পরিবারের সঙ্গে কুটুম্বিতা পাতাতে চলেছে মহিম, এ যে চরম ঈর্ষনীয় বিষয়। সকলের ঘরেই তো পাত কুড়ানো দু চারটে কন্যা সন্তান আছে। কার ভাগ্যে এমন শিকে ছিড়েছে? ভালো মানুষ মহিমের দ্বারা যে এ কাজ সম্ভব না এ সবাই জানে, অতএব কমলা। সৎ মা হয়েও কমলা যে এমন পাত্র যোগাড় করেছে এতে সাময়িক হলেও ধন্যি ধন্যি রব ওঠে।


নিকোনো উঠোনটায় ছাদনাতলা বাঁধা হয়েছে, সেখানে একটা হ্যাজাক বসানো। লগ্ন ছুঁই ছুঁই হওয়ার জন্য মহিমের সঙ্গে সঙ্গে পাড়ার লোকেদেরও ভ্রুকুটির শেষ থাকে না। আর যাই হোক তারাও দু’চারটে মেয়ের বাপ। ঘোষালমশাই সেই যে কখন বর আনতে গেছেন! এত বিলম্ব হওয়ার কথা তো নয়। নটু কমলার বড় ভাই। সে বেশ খেলিয়ে খেলিয়ে ব্যাপারখানা উপভোগ করে। মহিমের প্রতিবেশী যোগেন হালদার জাতে কায়েত হলেও কি হবে, ছোটো থেকে মহিম আর যোগেন দুজনে একেবারে হরিহর আত্মা। এক পাঠশালায় পড়েছে। সমস্ত সুখদুঃখের সাথী। তাই যোগেন নিজে থেকে উদ্যোগী হয়ে মহিমকে বলে, ‘আমি দু’একজনকে নিয়ে একটু এগিয়ে দেখি ও বাড়ির পালকির খবর কতদূর’।
মহিমের প্রথম পক্ষের কেউ এ বিয়েতে আসেনি। তারা নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেনি। তারা পরিষ্কার জানিয়েছে, এই বিয়েকে কেন্দ্র করে মহিমের সঙ্গে তাদের সকল সম্পর্কই উঠে গেল, কারণ দিনের আলোর মত পরিষ্কার মহিম কমলার কথাতেই এ বিয়ে দিচ্ছে। নতুবা আগুনের মত রূপের ক্ষাপরা নিয়ে যে মেয়ে জন্মেছে তার কি বরের অভাব হোত? তাছাড়া এখন যুগ পাল্টেছে। পাঁচ বছরের মেয়েকে কেউ বিয়ে দেয় না। আসলে লোভ লোভ। অর্থের সঙ্গে সঙ্গে পুণ্য অর্জনের লোভ। গৌরী দান করে মহিম পৃথিবীদানের পুণ্য কিনতে চায়। হোক রামতনু ধনী লোক। তা বলে হাবির জন্য দোজবর। হাবির জন্য কি সতীন ছাড়া শ্বশুরঘর খোঁজা যেত না? আজ যদি হাবির নিজের মা বেঁচে থাকত তাহলে কখনই এ বিয়ে হত না। মহিমও এ কথা মনে মনে হাজারবার স্বীকার করে, সত্যি তরুলতা যদি বেঁচে থাকত তাহলে কখনই আজ এ বিয়ে হোত না। যতই প্রথা থাক সহজ ব্যাপার মনে হোক তবু কোন বাপ মা হাতে করে নিজের প্রাণ পুত্তলিকে সতীনের ঘরে পাঠাতে চায়?


যোগেনকে বেশীদূর যেতে হল না। মহিমদের বাড়ির পূবদিক লাগোয়া বাঁশঝাড়টা পার হতেই শুনতে পেল হুম-হুম-না, হুম-হুম-না করে পালকি বওয়ার ছন্দের শব্দ। তারপর হ্যাজাকের আলোয় পালকিটাকে দেখতেও পেল। যোগেন সোল্লাসে প্রায় দৌড়োতে লাগল মহিমের অন্দরমহলে খবর দেওয়ার জন্য। এছাড়া হাবিকেও তো ঘুম থেকে তুলতে হবে।
দুটো পালকি মহিমের আঙিনায় পৌঁছতেই গঙ্গা আগে নামে। শেখর বিয়ের বর। তাকে আচার বিচার করে তবে নামানো হবে। তাছাড়া গঙ্গার আর একটা উদ্দেশ্যও আছে। শেখরের যে শরীর ভালো না সেটা সকলকে জানানো। শাস্ত্রীয় পর্বটুকু ছাড়া তাকে নিয়ে যেন কোন বাড়াবাড়ি না হয়। রামতনুও বিস্তর তত্ত্বসামগ্রী নিয়ে গরুর গাড়িতে করে রওনা দিয়েছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছবেন। কিন্তু লগ্ন এখন শিয়রে উপস্থিত। তাই আর এক মুহূর্ত দেরী করা চলে না। তাড়াতাড়ি স্ত্রী-আচার শেষ করে শেখরকে সরাসরি ছাদনাতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। শেখরদের সঙ্গে যে গরুর গাড়িটায় নাপিত পুরোহিত আর খুচরো কিছু আত্মীয় সজন রওনা দিয়েছিল ইতিমধ্যে তারাও এসে পৌঁছেছে। নিয়মকানুনের মিল অমিলের সুতোর গেঁড়োয় প্রথমেই দুপক্ষের মধ্যে এক প্রস্থ ঝগড়াও হয়ে যায়। এরপর পুরোহিতের পালা। এ বলে আমায় দেখ, তো ও বলে আমায় দেখ। খাঁটি বামুন হিসাবে কার কত দবদবা এটাই তো সময় তার প্রমাণ দেখানোর।
মহিম হাবিকে প্রায় কোলে করে এনে ছাদনাতলায় বসায়। হাবি চেহারাতেও এতটা ক্ষুদ্রাকৃতি যে তাকে মানুষ না বলে বড়সড় কোন পুতুল বলাই ভাল। ঘুমের জ্বালায় হাবি তখনও ঢুলছে। মহিম হাবির কানে কানে আর একবার সঞ্জীবনী মন্ত্র ঢেলে দেয়। হাবি যদি না ঘুমিয়ে সোজা বসে থাকে মহিম তাকে শুধু মাছের দুটো লেজা না ইয়া বড় মাছের মুড়োও দেবে একটা। মুড়োর কথা শুনে হেসেছিল হাবি। সত্যি বাবা? আস্ত মুড়ো! বাপের প্রাণটা তখন ধনুকের ছিলায় টঙ্কার লেগে ছিঁড়েখুঁড়ে পড়বার উপক্রম। হায় ভগবান! কার বিয়ে দিচ্ছে সে? যাকে বিয়ের আসরে জাগিয়ে রাখার জন্য মাছের মুড়োর লোভ দেখাতে হয়।

শেখরের শরীর ভাল না, আজই সে কলকাতা থেকে এসেছে। কোনরকম উৎপাত যেন না হয়। বেশ কঠিন সুরে শাসনের ভঙ্গীতে বলে দিয়েছে গঙ্গা। মহিম শেখরের হাঁটু ছুঁয়ে কন্যা সম্প্রদান করতে গিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। সংস্কৃত মন্ত্রের সঙ্গে বিশুদ্ধ বাংলায় আর একটা কথা যোগ করে, ‘মা মরা মেয়ে আমার, ওকে দেখো বাবা’।
শেখর তখন মনে মনে আন্নাকালিকে স্মরণ করে একটার পর একটা নিয়মকর্ম করে যাচ্ছে। শুভদৃষ্টির সময় বিশাল কাঁঠাল গাছের পিঁড়িটাকে উঁচু করে তোলা হয়। শেখরের অন্তরাত্মা যেন বিদ্রোহ করে ওঠে। না কিছুতেই সে এই মেয়ের মুখের দিকে তাকাবে না। ওদিকে বউঝিদের দলে জৈজাকারের মধ্যে থেকে কে যেন ফুট কেটে ওঠে, ‘ও হাবি আর ঘুমোস নে। চোখ খোল। বরকে দেখ’।
শেখর তখন আগের প্রতিজ্ঞা ভুলে পরিষ্কার তাকিয়ে দেখে সামনে উঁচু করে তুলে ধরে রাখা লাল চেলির মধ্যে মেমেদের গায়ের রঙের মতো পুঁচকে একটা বাচ্চা। চোখদুটো প্রায় বোজা। ঘাড়টাও একটু কাত হয়ে আছে। গঙ্গার তাড়াহুড়োয় আর হাবির অবস্থা দেখে বিয়ে তাড়াতাড়ি সম্পন্ন হল। শেখর একটা জেদ অন্ততঃ রাখতে পারলো – মহিম চ্যাটার্জ্জীর বাড়ি সে জল গ্রহণও করল না। শরীর যদি বেশী বিগড়োয় তাই কেউ আর তাকে জোর করে না। হাবি কিন্তু বাবার ধুতির খুঁট চেপে ধরে বলে, ‘বাবা আমি মাছ মণ্ডা খাবো না?’
মহিম বুকে চেপে ধরে হাবিকে। যোগেনকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘যোগেন নতুন বে’র স্বামী কিছু না খেয়ে উপবাসে থাকলো, আর তার বউকে আমি মাছ মণ্ডা খাওয়াচ্ছি এ অন্দরমহলে জানতে পারলে কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে। তাছাড়া হাবির শ্বশুরবাড়ির লোকও তো আছে’।
যোগেন বুঝতে পারে কাকে ভয় পাচ্ছে মহিম। বন্ধুর পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দেয়, ‘ঐ দেখ রাত প্রায় ভোর হয়ে গেছে। একটু পরেই পাখি ডাকবে। এখন বরং ওদের দুটিকে একটু জিরোতে দেও। জামাই বাবাজীর শরীর শুনলাম ভালো না। আর হাবি তো আমাদের দুধের বাচ্চা, একটুস না জিরোলে কালকের ধকল নিতে পারবে না’।
যোগেন হাবির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, ‘এখন খেলে পেট ছেড়ে দেবে। কাল শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে তো? কাল যাওয়ার আগে তোর বাপে না পারলেও আমি তোকে মাছ মণ্ডা খাওয়াবো, কেমন’।
মা মরা হাবি ছোট থেকেই কোন কিছু নিয়ে আবদার করতে শেখে নি। তাই ঘাড় কাত করে বলে, ‘আচ্ছা’।
তারপর যোগেনই উদ্যোগ নিয়ে ওদের বর শয্যার ঘরে পাঠিয়ে দরজা দিয়ে দেয়। গ্রামের বউঝিরা গঙ্গার কড়া আদেশে ও মুখো পা রাখতে পারে না।


কমলা আজ সকাল থেকে উপবাসী থেকে প্রকৃত মায়ের কাজই করেছে। এখন পড়শিদের ভিড় হালকা হয়ে গেলে সে উঠোনে নেমে দেখে মহিম আর রামতনু গরুর গাড়ি থেকে তত্ত্বসামগ্রী নামাতে তদারক করছে। রামতনু একেবারে বিয়ে হয়ে গেলে এসেছেন বলে আক্ষেপের শেষ নেই। তায় আবার গঙ্গার কাছ থেকে শুনেছেন শেখরের শরীর ভালো না। ছেলেটাকে একবার দেখতে ইচ্ছা করে রামতনুর। বারবার একটা কথা মনে হয় কাজটা বড় তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। শশীর জেদকে অত বেশী গুরুত্ব না দিলেই ভালো ছিল। আন্নাকালিকে খারিজ করা হয়েছে ঠিক আছে, কিন্তু এত তড়িঘড়ি আর একটা বিয়ের বন্দোবস্ত না করলেই হত, তাও শেখরকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে।
রামতনুকে সম্মানজনক ফলাহার দিলে উনি সামান্য কিছু মুখে দেন। না হলে নতুন কুটুমের অসম্মান হয়। তাছাড়া এই রাতের শেষ প্রহরে কোন গুরুপাক খাদ্যগ্রহণের প্রশ্নই আসে না। রামতনুকে বিশ্রামে পাঠিয়ে কমলা তত্ত্বসামগ্রীর ডালাগুলো নিয়ে বসে। মুখ তার খুশীতে উপচে পড়ছে। স্বামীকে কটাক্ষ করে বলে, ‘এমন ঘরে মেয়ে না দিলে এসব জিনিস জীবনেও চোখে দেখতে?’
মহিম এসব কথার কোন উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। চৌকির এক কোণে ঘুমন্ত জমজ ছেলেদুটোর গায়ে হাত বুলিয়ে আর একটা ঘুমন্ত মুখের কথা মনে পড়ে। বাপের প্রাণ হাহাকার করে ওঠে, ‘হে ঈশ্বর কাজটা ঠিক হল তো!’


বর শয্যার সুজনিপাতা বিছানাটায় হাবি হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে কাদা। সত্যি বলতে শাড়ি আর তার পরনে নেই। সেমিজটুকু পরা। তাও সে গুটিয়ে ঊরু পর্যন্ত উঠে গেছে। শেখরের মাথায় আগুন চড়ে যায়। বিছানার একপাশে বসে অনেকক্ষণ ধরে নিরীক্ষণ করে হাবিকে। হোক অনেক ছোট, বাচ্চা। কিন্তু বিয়ে যখন হয়েছে বউ। এই বউকে শেখর উচিত মতো কিছু কথা শুনিয়ে দিতে চায়। বুঝিয়ে দিতে চায় আন্না ভিন্ন দ্বিতীয় কোন মেয়ের কোন স্থান নেই শেখরের জীবনে। হাবিকে সে কোনদিনই ভালবাসতে পারবে না। কিন্তু ঘুমন্ত মানুষকে কিছু বলা যা, জড় বস্তুকেও বলা তাই। তাই শেখর হাবিকে ঘুম থেকে তোলবার জন্য ঠেলা দেয়। ভিজে জবজবে সেমিজে হাত লেগে ঘেন্নায় নাক-মুখ কুঁচকে ওঠে। হাবি বিছানায় পেচ্ছাব করেছে। শেখরের সমস্ত রাগ কান্নায় পরিণত হয়। কাঁদতে কাঁদতে একসময় শুনতে পায় পাখি ডাকছে। শেখরের ভেতর কে যেন কথা বলে ওঠে – ‘আর দেরী কোর না শেখর। যা হওয়ার হয়ে গেছে। তবু এখনও সময় আছে’।
দরজা খুলে বাইরে আসে শেখর। আকাশে তখনও শুকতারা রয়েছে। হিমেল বাতাস। উৎসবের বাড়ি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। শুধু পাখিরা যে যার বাসা ছেড়ে সারাদিনের জন্য স্বাধীন হতে উড়ে যাচ্ছে। শেখরকে ভেতরের শেখর আবার বলে, ‘এইতো সময় শেখর। আর দেরী না। এখান থেকে সামান্য দূরে কাটাখালি নদী। নদীটা পার হলেই হাসনাবাদ। মাঠ বরাবর দৌড়লে কতক্ষণ আর লাগবে, টাকির সেই রজিপুর গ্রাম পৌঁছতে! যে গ্রামটা সমস্ত স্বত্ত্বা দিয়ে শেখরকে গ্রহণ করার জন্য দুহাত বাড়িয়ে ডাকছে - এসো শেখর এসো। আমার কাছে এসো। আমি তো তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি’।



শেখর যখন ছুটতে শুরু করে তখন ভেবেছিল উঠোনের হুলো বিড়ালটা ছাড়া বুঝি আর কেউ দেখলো না। কিন্তু আর একজোড়া চোখ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। সে হল কালু বাউড়ি। কালু বাউড়ির পোড়া চোখে এমনিতেই ঘুম আসে না। তাও যদি বা আসে তাও কামিনী ফুলের মত টুপ করে ঝরে যায়। কালু বাউড়ি মানুষটা খুব ভাবে। ক’বছর আগে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সঙ্গে মেতে গিয়ে রাস্তায় মিছিল করে হেঁটেছিল। সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়েছিল – বাংলার মাটি বাংলার জল ...... পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান। পরিবারকে সেদিন হাঁড়ি চাপাতে দেয় নি। ইংরেজ জাতটার নিত্যনতুন অত্যাচারে, ফন্দিফিকিরে এদেশের মানুষের অবস্থা যে ক্রমশ কেঁচো হয়ে যাচ্ছে সে সবই ভাবছিল কালু বাউড়ি। নীলচাষের নাম করে আরও সর্বনাশ করে দিয়েছে ওরা। কালু বাউড়ির শক্তপোক্ত চেহারাটা নিয়ে একটাই আক্ষেপ। সে এ জীবনে একটা ইংরেজও মারতে পারলো না। আর তখনই গোলাপজাম গাছতলা দিয়ে কে যেন হুশ করে ছুটে বেড়িয়ে গেল। বিয়ে বাড়ি বলে কথা। কত দামী দামী জিনিস ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় রয়েছে। ব্যাস, কালুও দে ছুট ঐ চোরটার পিছু। পাল্কী ছোটানো, রণ পায়ে হাঁটা পা জোড়া দৌড়োলে এখনও চিতাবাঘ। কত দূর যাবে, কিন্তু একেবারে পিছনে এসে থমকে যায় কালু – কে? বাবুমশাই না? কাটাখালির জলে তখন সূর্যোদয়ের লাল আলো পড়েছে। হাওয়াতে কাঁপছে নদীর ছোট ছোট ঢেউগুলো।
কালুর গলার স্বর বিকৃত হয়ে ওঠে, ‘বাবুমশাই?’
শেখর ধরা পড়ে গেছে। শেখরের মনে হয় এ জন্মে তার আর আন্নাকালির কাছে পৌঁছনো হবে না।
কালুর তখনও ঘোর কাটে নি। সদ্য বিয়ের বর এভাবে ছুটছে কেন? কালু আবার ডেকে ওঠে, ‘বাবুমশাই’।
শেখরের পা দুটো ভূমির সঙ্গে আটকে যায়। দাঁড়িয়ে পড়ে শেখর। না পড়েও উপায় নেই। সামনে কাটাখালি নদী। কালু তখন শেখরের মুখোমুখি। এমনভাবে দৌড়নো শেখরের অভ্যাস নেই। তারপর কাল থেকে যা চলছে। রীতিমত হাঁপাচ্ছে শেখর। আদ্যির পাঞ্জাবীটা ঘামে ভিজে সপসপে। কালুর দুচোখে অনন্ত জিজ্ঞাসা। সেচোখে চোখ রেখে কেঁদে ফেলে শেখর, ‘এ বিয়ে আমি মানি না, আমার স্ত্রী আছে’। জোড়হাত করে বলে, ‘দয়া করে আমায় তার কাছে যেতে দাও’।
কালু মনে মনে আন্নাকালি নামক মেয়েটার জন্য আর একবার বিস্মিত হয়। কে সে মেয়ে যার জন্য বাবুমশাইয়ের এমন জীবনপণ অবস্থা। তবু মুখে একটা কথা না বলে পারে না, ‘বাবুমশাই কালরাতে যারে অগ্নিস্বাক্ষী করে বে করলেন তার কথা এট্টিবার ভাববেন না? সেও তো আপনার ধমর্পত্নী হয়ে গেছে’।
সজোরে মাথা নাড়ায় শেখর। প্রতিবাদের সুরে বলে, ‘না না না, কক্ষনও না, আমি আর কারও কথা ভাববো না। আমাকে দয়া করে তুমি আটকিও না কাকা’।
কাকা! কি শুনছে সে। একজন মুখার্জী বাড়ির বাবুমশাই সে কিনা সামান্য একজন বেয়াড়াকে বলছে – কাকা! বড় বেদনায় কালুর ঘোলাটে দুই চোখ কান্নায় ভরে যায়। কোনরকমে বলে, ‘সে পথ কি করে যাবে বাবা? ঘাটে তো নৌকো নেই। তাছাড়া তুমি যে নৌকোতেই যাও, তোমাকে তো সবাই চিনে ফেলবানে’।
শেখর যেন ওপরআলার আদেশ পেয়ে গেছে। আর কালবিলম্ব না করে ছুটে গিয়ে কাটা খালি নদীর বুকে ঝাঁপ দেয়। কালু কি আর্তনাদের ভাষায় একবার চীৎকার করেছিল! করেছিল বোধহয়। ‘বাবুমশাই’ বলে নাড়িছেঁড়া একটা আর্তনাদ করেছিল। কিন্তু তার আগেই শেখরের শরীরটা সাঁতারের ভঙ্গিমায় নদীর বুকে জল কেটে কেটে ভাসতে ভাসতে ওপারের দিকে এগোতে থাকে।
সূর্য তার লাটিমের আর কিছু সুতো ছেড়েছে। কালুর অবাক হওয়া ভাব কেটে গিয়ে এবার ভয় করতে শুরু করে। এমন একটা দুর্দান্ত ঘটনার স্বাক্ষী সে বৈ আর কেউ না। এই ঘটনা যদি জানাজানি হয় তাহলে বাদার দেশেই তার দেহশুদ্ধু প্রাণটা রেখে যেতে হবে। কালু তাই পাল্কী বওয়ার তালের ছন্দে লয়ে পা ফেলে হাঁটতে শুরু করে। পেছন ফিরে শুধু একবার দেখে শেখর তখন প্রায় ওপারে পৌঁছে গেছে। কালু দুহাত জোড় করে ভোরের সূর্যর দিকে তাকায়। জোরে জোরেই বলে, ‘তোমার মঙ্গল হোক বাবুমশাই। জীবনের সবকটা নদী যেন তুমি এইভাবে অবলীলায় সাঁতরে পার হয়ে যেতে পারো’।


হাবি এখনও ঘুমাচ্ছে। দরজা ভেজানো। বাড়ির লোকজন অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে।
রামতনু বলে, ‘ওদের তুলতে হবে। যথেষ্ট বেলা হয়ে গেছে। ফেরবার বন্দোবস্ত করুন আপনারা। আমার পরিবার বলে দিয়েছে বাসি বিয়ের অনুষ্ঠান সেখানেই হবে’।
মহিমের খুব ইচ্ছা করছিল একবার বলে – আমাদের বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী বাসি বিয়েটা এখানেই হোক। কিন্তু বড়লোক কুটুমবাড়ি তায় আবার নতুন তাই বলতে সাহস হয় না। চুপচাপ বন্ধ দরজায় হাত রেখে ডাক দেয়, ‘মা হাবি, হাবি, এবার দরজা খোলো’।
কালু ততক্ষণে এসে পৌঁছেছে। তার বুকের ভিতর এমন ধকধক করছে যে মনে হচ্ছে এখনই হৃৎপিণ্ডটা দেহের খোল ছেড়ে টুপ করে বাইরে বেরিয়ে আসবে। কমলা আর জনাকয় স্ত্রীলোক দাওয়ার খুঁটির নীচে দাঁড়িয়েছিল। কমলা আর কথা না বলে পারে না, ‘কি ঘুম দেখো মেয়ের’।
যোগেনও কাল এ বাড়িতেই ছিল। তার মাথাতেই প্রথম আসে – ও ঘরে তো শুধু হাবি না, শেখরও আছে। সে কেন সাড়া দিচ্ছে না! অতএব যোগেনই উদ্যোগ নিয়ে দরজায় মৃদু ধাক্কা দিলে দরজা সামান্য খুলে যায়। ঘরে চোখ রেখে যোগেন শেখরকে কোথাও দেখতে পায় না। হাবির সেমিজ প্রায় মাথায় উঠে গেছে। অকাতরে ঘুমাচ্ছে। যোগেনের বুকের ভিতর কিসের যেন একটা অমঙ্গলের আশঙ্কা ছ্যাৎ করে ওঠে। মহিমের দিকে ফিরে বলে, ‘জামাই বাবাজীকে দেখছি না মহিম। মনে হয় জলখরচের জন্য বাইরে গেছে। বৌঠানকে ডাকো। হাবিকে ঘুম থেকে তুলুক’।
কমলাকে ডাকতে হয় না। সে নিজেই আসে। যোগেনকে তার সঙ্কোচ নেই। তাই খরখরে গলায় বলে ওঠে, ‘ঘুম দেখেছেন মেয়ের’।
মহিম বলে, ‘আঃ চুপ করো। মানী লোকেরা রয়েছেন’।
দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে কমলার মাথায় প্রায় রক্ত চড়ে যায়। হাবির চুলের মুঠি ধরে ঘুম থেকে টেনে তোলে। আচমকা ঘুম ভেঙে এমন মারধোর হাবির জীবনে নতুন নয়। তবু সে ভ্যাক করে কেঁদে ফেলে। হাবির ভিজে শেমিজ দেখে আরও খেপে ওঠে কমলা, ‘তুই কালও বিছানায় মুতেছিস। ওরে মরণ হয় না কেন তোর’।
হাবি এখন আগের দিনের উপবাসে একেবারে ক্লান্ত। তবু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয়। এ্যাঁ এ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করে। মহিম আর থাকতে না পেরে দরজা ঠেলে ঢুকে আসে, ‘ওকি? ওকি? তুমি ওকে মারছো কেন?’
এ প্রশ্নের উত্তর কি দেবে কমলা – তাই মহিমকে প্রশ্নটা আবার রাখতে হয়, ‘বলি তুমি ওকে মারছো? ওর কাল বে হয়েছে। পরগোত্রী ও এখন। নতুন কুটুমরা বাড়িময় হয়ে আছে। আর শেখর বাবাজী সে যদি দেখে ফেলে কি মনে করবে বলতো?’
হাবি আর কি কাঁদবে, ক্ষোভে রাগে কমলারই তখন কেঁদে ফেলার মত অবস্থা। সে ঝংকার দিয়ে ওঠে, ‘বে হওয়া সদ্য পরগোত্রী আহ্লাদী মেয়ে কালও বিছানায় মুতে ভাসিয়েছে। ম্যাগো, ছি ছি ছি কি ঘেন্না। জামাইতো কাল ছিল এখানে সে জানতে বুঝতে পারলো কিনা কে জানে?’
মহিমের চেহারায় আহামরি জৌলুস নেই। বেঁচে থাকার লড়াই তার প্রতি অঙ্গে দাঁত বসাচ্ছে। তাই শেখর কোথায় গেল ভাবতে গিয়ে তার কপালে তিন চারটে ভাঁজ পড়ে। কমলাও চুপ করে গেছে। বেঁটে খাটো, শক্তপোক্ত শরীর মনটাতেও তারও একই প্রশ্ন বোধহয় জোয়ারভাঁটা খেলছে। উপবাসী হাবি জীর্ণস্বরে তখনও উঁ উঁ করে কেঁদে চলেছে। কমলা একবার মহিম আর একবার হাবির দিকে তাকিয়ে হাবিকেই একটা ঝাঁকি দেয়, ‘এই জামাই বাবাজী কোথায়?’
এ প্রশ্নটার একটা অক্ষরও মর্মোদ্ধার হয় না হাবির। তাই পুনরায় মার খাওয়ার ভয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে উঁ উঁ করে কান্নার সুরটায় দম দেয়। অগত্যা মহিমকেই হাবির পাশে এসে বসতে হয়। গায়ে মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে কমলার উপস্থিতি উপেক্ষা করেই জিজ্ঞাসা করতে হয়, ‘মা, কাল যার সঙ্গে তোমার বে হল, সে নতুন বরটা কোথায় গেছে জান তুমি?’
এর উত্তরে হাবি কান্নার শ্লেষ্মাজড়িত নাকি কণ্ঠে বলে, ‘আমি জানি না বাবা বরটা কোথায়। আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম’।
কমলা কি যেন বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই যোগেনের অসহিষ্ণু কণ্ঠস্বর শোনা যায়, ‘কি ব্যাপার মহিম, তেনারা তো অধৈর্য্য হয়ে উঠেছেন। এরপর বারবেলা পড়ে যাবে’।
মহিম নিশ্চিন্ত হয়, ‘যাও ছোটো বৌ, কাচা শেমিজ দিয়ে বৌঠানকে পাঠিয়ে দাও। আর দেখোগে জামাই বাবাজীর শরীর গতিক কেমন? কিছু না খাওয়ালে হবে কেমন করে’।
শেখরকে কিছু খাওয়াতে পারলে মহিম কাল যে আঁশ ভাঁড়ার থেকে দুটো লেজা ভাজা আর মুড়ো, শুকনো মণ্ডা কলাপাতা মুড়ে তোরঙ্গের ভিতরে লুকিয়ে রেখেছে সেগুলো হাবিকে খাওয়াতে পারে। ব্রাহ্মণ বাড়িতে এমন কাণ্ড যদি ধরা পড়ে সমাজে পুরো একঘরে হয়ে থাকতে হবে। নাপিত, ধোপা, তাঁতি, কামার, কুমোর সব বন্ধ হয়ে যাবে। মহিম যে সামান্য চাষবাস ছাড়াও চ্যাটার্জী কুলীন হওয়া সত্ত্বেও একটু আধটু যজমানগিরি করে সেটাতো টিকটিকির লেজের মত সবার আগে ধ্বসে যাবে। কিন্তু কি করবে মহিম, স্নেহ বড় বিষম দায়। কমলার দুচোখের দৃষ্টিতে ধুনুচির আগুনের ফুলকি ছুটে আসে, ‘ঢং দেখে মরে যাই’।
দুপদাপ করে কমলা ঘর থেকে বেড়িয়ে যেতেই মহিম হাবির মাথাটা বুকের ভিতর চেপে ধরে। হাবি ফিসফিস করে বলে, ‘বাবা আমি মাছ, মণ্ডা কখন খাব?’
মহিম আর্দ্রস্বরে বলে, ‘আগে তোর বরকে কিছু খেতে দিই’।
হাবি বাবার বুকে মুখ রেখেই বলে, ‘বরটা যদি আর না আসে বাবা’।
মহিম দুহাতে মেয়েকে ঠেলে দেয়, ‘ছিঃ মা, এ সব কি অলক্ষুণে কথা। এ সব বলতে নেই’।


যোগেন আর যোগেনের বৌ দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে। যোগেনের বৌ ঘোমটা টেনে মহিমের সঙ্গে কথা বলে, ‘আপনি এবার যান। আমি হাবিকে একটু গুছিয়ে দেই’।
‘হ্যাঁ বৌঠান, তাই দেন। সেই ভালো, সেই ভালো’ বলতে বলতে মহিম উঠে আসে।
বাইরে এখন রীতিমত সূর্যের আলো ঝলকাচ্ছে। বাতাসে উষ্ণতার পরশ। মহিম আর যোগেনের ছোঁয়াছুঁয়ির সম্পর্ক সেই ছোটকাল থেকেই আছে। তাই খুব সহজেই যোগেন মহিমের হাতখানা খপ করে চেপে ধরে, ‘জামাই কোথায় মহিম?’
এ প্রশ্নের মানে কি? মহিমের চোখে অসীম বিস্ময়। যোগেন মহিমের চোখে চোখ রাখে। কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে। যজ্ঞিডুমুর গাছটায় একটা হরিতাল পাখি বসে বসে পাকা যজ্ঞিডুমুর ঠোকরাচ্ছে। সে দিকে দৃষ্টি রাখে যোগেন, ‘জামাইকে পাওয়া যাচ্ছে না’।
মহিম ফ্যাসফ্যাসে গলায় যোগেনকেই জিজ্ঞাসা করে, ‘কেন? কোথায় যাবে সে?’
যোগেনের গলায় তপ্ত কড়াইয়ে খই ভাজার স্বর বাজে, ‘সে তো শিশু না যে শেয়ালে মুখে করে নিয়ে যাবে। আমার মত বলছে মহিম, এ বিয়েতে তার মত ছিল না’।
এ কি শুনছে মহিম। হাবি তো জলে পড়ে ছিল না। মুখার্জ্জী দম্পতি বিয়ের জন্য হাঁসফাঁস করছিল।
যোগেন মহিমের হাতে হ্যাঁচকা টান দেয়, ‘রামতনু বাবুর সঙ্গে কথা বলবে চলো’।
মহিম শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, ‘আমি যাব না। তুমি গিয়ে কথা বল’।
যোগেন চাপা ধমক দেয় বন্ধুকে, ‘মেয়ে তোমার মহিম। তাছাড়া আমার জাত ভিন্ন। আমি তোমার অনাত্মীয়। আমার সঙ্গে কথা বলায় উনি স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন না’।
অগত্যা মহিমকে স্থিতিজাড্যের অবস্থা থেকে গতিজাড্যের অবস্থার মধ্যে আসতে হয়।


গঙ্গা সকালবেলাই স্নান সেরে পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে পূব আকাশে মুখ করে খুব করে সূর্যস্তপ করে করে মনস্তাপ সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলে পুরো ঝরঝরে হয়ে গেছে। এখন সে কমলার দুঃখে কাতর। কমলা যে বিমাতা হয়ে চতুর্দিক সব সামলে হাবির মতো ছিঁচকাঁদুনে মেয়েকে সামলাচ্ছে, এ এক ধরনের চমৎকার ঘটনা। আটচালার দক্ষিণমুখো বারান্দায় একটা খাটিয়া বাঁধা আছে। সেটাতে বসে এক গামলা খই মুড়কি, চীনে গজা আর মর্তমান কলা দিয়ে প্রাতরাশ সারছে। আর ঘরের ভিতর এক গলা ঘোমটা টেনে ছেলেদুটোকে বার্লি খাওয়াতে খাওয়াতে কমলা কথাবার্তা সারছে। হাবির প্রশংসা করতে করতে তার একসময় চোঁয়া ঢেঁকুরের মতো উগড়ে আসে, ‘মেয়ের আমার ঘুমটা বড্ড বেশী। জামাই বাবা কখন যে ঘর ছেড়ে বেড়িয়েছে টেরই পায় নি’।
প্রকাণ্ড একটা খই মুড়কির দলা তখন গঙ্গার মুখের ভিতর মণ্ড পিণ্ড হয়ে গলা দিয়ে পেটের সুড়ঙ্গে নামবে বলে অপেক্ষায় কিন্তু দলাটা যেন বেয়াড়া নামছেই না। অগত্যা তখন গঙ্গা ঘটির জলটা ঢকঢক করে কিছুটা ঢেলে দলাটাকে নামিয়ে দেয়। না আর তার কমলার সঙ্গে রস-কষ-শিঙাড়া-বুলবুলি কথাবার্তায় মন চলে না। শেখর। কোথায় সে? একটা অসম্ভব অবাস্তব কল্পনায় গঙ্গার মতো মানুষেরও বুকের ভিতরটা হিম হয়ে আসে। দাওয়া থেকে প্রায় এক লাফ দিয়ে উঠোনে নামে সে। শ্বশুর মশাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে। কমলা তখনও ঘরের ভিতর একা একাই বলে চলে, ‘আপনি সত্যি দেবতুল্য মানুষ। আপনাদের মতো কুটুমবাড়ি পেয়ে আমরা ধন্যি। নিজের ঘর মনে করে এ লাটের দিকে যখনই আসবেন, চলে আসবেন’।
না গঙ্গার আর কমলার এই প্রাণজুড়ানো কথাগুলো শোনা হয় না। রামতনুর কাছে যাওয়ার আগে মহিম আর যোগেনের মুখোমুখি হয় সে। মহিম জোড়হাত করে বলে, ‘আজ্ঞে বাবাজীর তো এখনও কোন খোঁজ মিলল না’।
গঙ্গা ভাঙ্গে তবু মচকায় না। তাই বেশ রোষের সঙ্গে বলে, ‘আপনাদের ঘরে মেয়ে নিতে এসে এ তো দেখছি ভালো গেঁড়োয় পরা গেল। আপনাদের বাড়ি এল আর আপনাদের কোন হুঁশ থাকবে না? মানুষটা কি এক রাতের মধ্যে উড়ে গেল নাকি!’
মহিম তখন তেঁতুল পাতার মতো থিরথির করে কাঁপছে। যোগেন আর থাকতে না পেরে কথা বলে ওঠে, ‘মার্জনা করবেন। কথা না বলে আর থাকতে পারছি না। তা মানুষটা তো আর আমাদের হাবির বয়সী না যে লুকোচুরি খেলবে। তাছাড়া এটি তো বাবাজীর প্রথম বিয়ে না যে ............’।
যোগেন কথা শেষ করে না। গঙ্গা একটু আনমনা হয়ে যায়। এটি প্রথম বিয়ে না, এই ‘না’টাতেই যত শঙ্কা। সন্ধি প্রস্তাবের মতো গঙ্গা বলে ওঠে, ‘নিজেদের মধ্যে মনমালিন্য করে লাভ নেই। তার চেয়ে শ্বশুর মশাইয়ের কাছে চলুন। পরামর্শ করতে হবে’।
রামতনু তখন উপরি পাওয়ার মতো ছটফট করছিল। একবার মনে হচ্ছে শেখর বুঝি ভবানিপুর ফিরে গেছে। একবার মনে হচ্ছে কলকাতায়। রজিপুর গ্রামটা ভাবনার মধ্যে কি করে আসে! এত স্পর্ধা, এত নির্লজ্জ, বেহায়া রামতনুর ছেলে হতে পারে! তাই বাঘবন্দি খেলার মতো রামতনু খালি এ কোর্ট থেকে সে কোর্টে দান দিয়ে চলেছে। ভোরের দ্বিতীয় প্রহরে বিনাশ্রমেই তাই ঘেমে নেয়ে অস্থির তিনি। মহিম, যোগেন আর গঙ্গা সামনে এসে দাঁড়ালে বুকে বল পেয়ে শুধোয়, ‘কোন খোঁজ পেলে?’
গঙ্গা মাথা নাড়ে, ‘না বাবা’।
- এদিকে তো বারবেলা পড়ে যাবে।
কথাটা শেষ করে রামতনুর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বারবেলার চিন্তা রামতনুর মাথায় কি নেই? খুব আছে। ভিতরে ভিতরে তাই তিনি অত ছটফট করছেন। আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘শেখর কোথায় গেল বলতো গঙ্গা?’
এ উত্তর গঙ্গার অজানা। তবে ধোঁয়াশা ধরনের কিছু ভাবনা আছে। কিন্তু এই পরিবেশে এখন ব্যক্ত করা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারে না। তাই চুপ করে থাকে। ঠিক সে সময় কোত্থেকে হুসেন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর একবার সে এসেছিল মেয়ের হাতের মাপটা নেওয়ার জন্য। মহিমও তাকে চেনে। মেয়ের বাড়ির লোকের সামনে কথাটা বলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারে না। তাই রামতনুর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বাবু এট্টা কথা ছিল। যদি ওপাশে চলেন আইজ্ঞা’।
রামতনুর এতগুলো লোকের সামনে থেকে একজন মুসলমান মাঝির সঙ্গে কথা বলবার জন্য আড়াল আবডালে যাওয়ার ব্যাপারটা ভালো ঠেকছিল না। তাই বলে, ‘তুমি যা বলবার সকলের সামনেই বলো হুসেন দাদা’।
হুসেনের তবু ইতস্তত যায় না। সকলের দিকে একবার চেয়ে দৈববাণীর মত উচ্চারণ করে, ‘আইজ্ঞা ছোটবাবুরে কাটাখালি নদী সাঁতরে যেতে দেখেছি’।
কথাটায় এমন অবাক করা ব্যাপার আছে যে যদি হুসেন বলতো শেখরকে বাঘে বা কুমীরে নিয়ে গেছে তাহলেও সকলে বিশ্বাসযোগ্য ঘটনা বলে মেনে নিত।
রামতনু বিরক্তই হয়, ‘কি সব আবোল তাবোল বলছো’।
হুসেন বুঝতে পারে এরা তার কথা কেউ বিশ্বাস করছে না। তাই মরীয়া হয়ে ওঠে, ‘আল্লার কীরা। আমি আজ ভোরে হিঙ্গলগঞ্জ যাচ্ছিলাম। মধু আনবার জন্যি। কাটাখালি নদীতে দূর থেকে মনে হয় এড্ডা মানুষ বুঝি ভেসে যাচ্ছে। জোর হাল বাই। অনেকটা তফাতে থাকতেই বুঝতে পারি লোকটা ভেসে যাচ্ছে না, সাঁতরাচ্ছে। এই কাকভোরে কে মানুষটা বোঝবার জন্য এবার বৈঠা ঠেলি। তারপর বুঝতে যখন পারি কে, মানুষটা তখন সে ওপারের ঘাটের কাছে পৌঁছে গেছে। আমি প্রাণপণ চিক্কুর দিছিলাম – ছোটোবাবু, ও ছোটোবাবু কই যাও তুমি। তা একবার পেছনে ফেরলে, ফের ভিজে সপসপে অবস্থাতেই পাড়ে উঠে এমনভাবে ছুটতে লাগলে যেন বড়ো মিঞা তাড়া করেছে’।
মহিম তো এসব কথাবার্তার বিন্দুমাত্র কোনকিছু বুঝতে পারছিল না। শেখর নতুন বিয়ের বর, সে কেন ঐভাবে সাঁতার দিয়ে ওপারে যেতে চাইবে! কাটাখালি নদীতে কুমীর হাঙ্গরের ভয় নেই। তবে বলা তো যায় না কোনকিছু।
যোগেনও যে খুব ভালো বুঝতে পারছিল সবকিছু তা না। তার মনে হচ্ছিল কোথায় একটা রহস্যের জাল আছে। কিন্তু কি সে রহস্যটা খোলসা হচ্ছিল না। গঙ্গা রামতনুর দিকে স্পষ্টাস্পষ্টি তাকায়। অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় হয় একটা। গঙ্গা বলে, ‘যদি আজ্ঞা করেন তো সেখান থেকে ধরে নিয়ে আসি’।
রামতনু হাত তুলে থামিয়ে দেয় গঙ্গাকে। যোগেনের মাথাটা তখনই একটু একটু কাজ করতে শুরু করে। হাতজোড় করে বলে, ‘অপরাধ নেবেন না মুখার্জী মশাই। বাবাজীর প্রথম পক্ষের বাপের ঘর ওপাড়েই তো!’
মহিম ফ্যালফ্যাল করে সকলের দিকে তাকায়। আর গোপনতার কিছু নেই। রামতনু মুখ হেঁট করে বলে, ‘আমারও অনুমান শেখর বোধ করি সেখানেই চলে গেছে’।
মহিমের চারপাশে মনে হয় অমাবস্যা নেমে এসেছে। যোগেনের ফের মাথার ভিতর ধাঁধাঁ লেগে যায়। রামতনুকে শুধোয়, ‘তা সেখানে যাওয়ার জন্য এত কাণ্ড করার কি দরকার?’
রামতনু হাত জোড় করে বলে, ‘আমায় মাপ করবেন, এ বিয়েতে শেখরের মত ছিল না’।
যোগেনের মুখ থেকে শুধু একটা কথাই উচ্চারণ হয়, ‘মানে?’
তারপরেই কাটা কলাগাছ মাটিতে ধরাশায়ী হলে যেমন শব্দ হয় তেমনই শব্দ শুনে ঘাড় ঘুড়িয়ে সকলে দেখে মহিম মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। যোগেন আর্তনাদ করে ওঠে – ‘মহিম’।
গঙ্গার মুখেও কাতরতা দেখা যায়। হুসেন নিজেকে এমন একটা খবর বয়ে আনার জন্য মহাপাতক মনে করে হাপুস নয়নে কেঁদে ওঠে, ‘ও খোদা তোমার রাজ্যে এ কি বেনিয়ম। আমার মুখ থেকে এ কি জবান বার করলে তুমি?’


কালো বাউরি দূরে দাঁড়িয়ে কিছু যে হচ্ছে বুঝতে পারছিল। কিন্তু কি যে হচ্ছে তা বুঝতে না পেরে তার প্রাণটা ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতো হাপসি কাটতে থাকে। এ কোন দেশে এসে পড়েছে সে! কোন যন্ত্রণার গোপন সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকতে হবে তাকে সারাজীবন। কমলাকে কে যেন ছুটে এসে খবর দেয়, ‘ও বৌ মহিম যে সংজ্ঞা হারিয়েছে। শিগগিরি আয়’।
কমলা ছেলে দুটোকে উঠোনেই ছেড়ে দিয়ে সকলের সামনে মহিমের পায়ে আছড়ে পড়ে, ‘ও গো তোমার কি হয়েছে?’
একজন বয়স্কা স্ত্রীলোক এসে কমলার হাত থেকে মহিমের পা দুটো ছাড়িয়ে নেয়। স্বামী ভিরমিই খাক আর মরেই যাক পরপুরুষের সামনে তা বলে বেহায়ার মতো সেই পা আঁকড়ে বসে বিলাপ করবে তা সৃষ্টিছাড়া কাণ্ডই শুধু নয় গর্হিত অপরাধ। যোগেনের কাছেই তাই কমলা হত্যে দিয়ে পড়ে, ‘ও কায়েত ঠাকুরপো আপনার বন্ধুর কি হয়েছে? উনি মাটিতে পড়ে রয়েছেন কেন?’
যোগেন কোনরকমে বলে, ‘জামাই বাবাজীবন আগের স্ত্রীর কাছে পালিয়ে গেছে বৌঠান’।
কমলার মতো দুর্দান্ত মেয়েরও মুখে খিল পড়ে, ‘মানে?’
যোগেন সম্মান জ্ঞান ভুলে যায়, ‘মানে টানে জানি না, বাবাজীর নাকি এ বিয়েতে মত ছিল না’।
হাবি দ্বিতীয় দফায় সাজগোজ করে পুটুলি হয়ে সকলের দিকে তাকায়। বাবাকে ধুলোর উপর পড়ে থাকতে দেখে একে ওকে শুধোয়, ‘কি হয়েছে বাবার?’ শেষে কমলাকেই জিজ্ঞাসা করে, ‘ও মা বাবার কি হয়েছে? ভূয়ের উপর অমন করে শুয়ে আছে কেন?’
কমলা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে স্থান কাল পাত্র ভুলে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাবির উপর। চীৎকার করে ওঠে, ‘ন্যাকামো হচ্ছে না। এই তোর জন্য মানুষটার এই অবস্থা। বিয়ে হয়ে ইস্তক দেখছি নেই আর নেই। দু দুটো ছেলে দিলাম তবু এই বিষ পুটুলি কাছ ছাড়া করতে চায় না। কত বুঝিয়ে বিয়ে দিতে রাজী করালাম। ও মা আমার কপাল এমন যে তোর এমন ব্যবস্থা করে দিল ওপরঅলা যে এখানেই গোটা জীবনের ভাতজল লেখা হয়ে গেল। রাক্ষুসি নিজে এয়োতিটা হয়ে নিয়ে আমার শাঁখা সিঁদুর খাবি?’ হাবির পিঠে গুমগুম করে কিল পড়তে থাকে। চুলের মুঠি ধরে টানতেই যোগেনের বৌ শঙ্করীর অনেক কষ্টে বেঁধে দেওয়া চুলখানা থেকে জরির ফিতে, কাটা সব খসখস করে খুলে পড়তে থাকে।
হাবি কোনরকমে কমলার কাছ থেকে নিজেকে মুক্ত করে মহিমের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তারস্বরে কান্না জুড়ে দেয়, ‘ও বাবা, বাবা গো কি হয়েছে তোমার? চোখ বন্ধ করে আছো কেন? কথা বলছ না কেন? আমার উপর রাগ করেছো? আমি আর তোমার কাছে মাছ মণ্ডা খেতে চাইবো না। বাবা তুমি চোখ খোলো। বাবা বাবা গো’।
রামতনুর দীর্ঘ সুঠাম শরীরটা যেন তালগাছের পাতার মতো কাঁপতে থাকে। হাবি তার চন্দন কুমকুমে রাঙানো মুখখানা বাবার বুকে ঘষে ঘষে প্রায় সব তুলে ফেলেছে। পাগলের মতো আছাড়িপিছাড়ি করছে।


রামতনুর পক্ষেও নিজেকে সামলানো কঠিন হয়ে ওঠে। বেশ বুঝতে পারে শুধু বুকের ভিতর নয়, চোখের ভিতরটাও ক্রমশ আর্দ্র হয়ে উঠছে। যোগেন মহিমের চোখেমুখে জলের ছিটে দেয় আর বলে, ‘ও মহিম, চোখ মেলো’।
কমলার একটানা হাবিকে শাপশাপান্ত করে উচ্চস্বরে কান্নাকাটি, নেহাত দুটো বিড়ালছানার মতো কমলার ছেলে দুটো উঠোনের ধুলোয় হামা টেনে বেড়ানো, এসব দেখে রামতনুর একটা কথাই মনে হয় এ সবকিছুর জন্য তার ঔরসজাত সন্তানই দায়ী। এই পরিবারটিকে অন্যায়ভাবে কাঁদানো হচ্ছে। রাগে, দুঃখে, ঘেন্নায় সন্তানের প্রতি সমস্ত অন্তরাত্মা তার বিদ্রোহ করে ওঠে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ায়। উচ্চকণ্ঠে বলে, ‘শুনুন আমি নিজেও এ অন্যায় মানবো না। আমার সন্তানের আমার কাছে কোন ক্ষমা নেই। আমি সৎ ব্রাহ্মণ। ত্রিসন্ধ্যা আহ্নিক করি। তাই আমি এই পৈতে ছুঁয়ে বলছি আমি আমার একমাত্র পুত্র শ্রী শেখর কান্তি মুখার্জীকে ত্যজ্য ঘোষণা করলাম’।
এমন সাংঘাতিক ঘোষণায় কমলার কান্না থেমে যায়।
যোগেন বলে ওঠে, ‘আমাদের মেয়ের কি হবে?’
গঙ্গার বুকের ভিতর এক কোয়া আনন্দ চলকে ওঠে। তার মানে পাতে রইল গঙ্গা বাড়ুজ্জে নামে এই অধম। রামতনুর স্থাবর অস্থাবর উঃ আর ভাবতে পারে না গঙ্গা। তবে শ্বশুরকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বলে, ‘বাবা আপনার উচ্চ রক্তচাপ আছে। মধুমেয় আছে। উত্তেজিত হবেন না’।
কালু বাউরি এতক্ষণ পেয়ারাতলায় দাঁড়িয়ে ছিল। সে আর না পেরে চলে আসে। হাতজোড় করে বলে, ‘এটা কি করলেন গো বাবুমশাই? কাঁচা বয়েস, তাছাড়া সে তো পরস্ত্রীর কাছে যায় নি। ঝোঁকের মাথায় নিজের পারিবারের কাছেই চলে গেছে’।
কালু বাউড়ির মত ছোটলোকের কথায় কর্ণপাত করা চলে না। কিন্তু হুসেন মণ্ডল থামবে কেন? সে এ পরিবারের বহু কালের দোসর। রামতনুকে সে কোলে নিয়েছে পর্যন্ত। মুসলমান ভিন্ন জাত হলেও এ ছপ্পর তার গায়ে লাগেনি। সুতরাং রামতনুর পরিবারের কাছে তার একটা জোর আছে বৈকি। সেই জোরের জায়গা থেকেই সে সামনে এসে দাঁড়ায়। অনুযোগ করে, ‘এ তোমার ভারী অন্যায়, একমাত্র ছেলে তারে তুমি ত্যাজ্য করবে?’
রামতনু উঠোনের ধুলোয় মহিমের বুকের উপর লুটিয়ে থাকা হাবিকে টেনে তোলে। হাবির মাথায় হাত রেখে বলে, ‘আজ থেকে পুত্রবধু আমার পরিবারের সব’। যে সময় শ্বশুর ভাসুরের সামনা সামনি হওয়া তো দূরের কথা ছায়া পর্যন্ত কেউ মারাতো না সেখানে আস্ত হাবিরাণীকে রামতনুর মত শ্বশুর ছুয়ে ফেললে এমন তাজ্জব ঘটনা কস্মিনকালে কেউ দেখেছে না শুনেছে। রামতনুর ভবানীপুর লাগোয়া কাঁচপোকা গ্রামের মানুষগুলো একটা ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে থাকলো।
আর মহিম এমনই অভাগা রামতনুর এমন সাংঘাতিক প্রতিজ্ঞাটা শুনলও না, দেখলও না। জ্ঞান আসলে চারদিক ফ্যালফ্যাল করে তাকায় মহিম। তারপর বিড়বিড় করে, ‘যোগেন লেজা দুটো আর মণ্ডাটা কোথায় রাখলাম বলতো? মুড়োও আছে একটা’।
রামতনু সকলের উদ্দেশ্যে হাত জোড় করে বলে, ‘আপনারা আজ্ঞা দিন আমি মা’কে নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করি’।
মহিম বোবা দৃষ্টিতে চেয়েই থাকে। এত কাণ্ডের পর হাবি শ্বশুর বাড়ি চলে যাচ্ছে দেখে কমলার নারী হৃদয়ে কোথায় যেন কামড় বসায়। কোনোরকমে বলে, ‘একটু জলপান করে গেলে হত না? মেয়েটা কাল থেকে উপবাসী আছে’।
হাবির কিন্তু আর খিদে পাচ্ছে না। উঠোনের ধুলো থেকে ভাই দুটোকে কুড়িয়ে কমলার কাছে দিয়ে বলে, ‘আবার আনবে তো মা?’
কমলা আকুল হয়ে দু’হাত বাড়িয়ে হাবিকে কাছে টানতে গেলে মহিম এক সাংঘাতিক কাণ্ড করে বসে। কমলার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে আর একনাগাড়ে বলতে থাকে, ‘তুমি, তুমি খেয়েছো আমার মাছ আর মণ্ডা’।
কমলার ছেলেদুটো আর এক দফা মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খায়। তাদের চিল চীৎকারে কান পাতা দায় হয়ে পড়ে। রামতনু আর কালবিলম্ব না করে বেয়াড়াদের ডেকে হাবিকে বলে, ‘উঠে পড় মা’।


কালু বাউড়ির দল আগে তাদের পালকি নিয়ে আসে। হাবি ভয়ে ভয়ে উঠে পড়লেও সমানে কাঁদতে থাকে। কোনো আচার অনুষ্ঠান ছাড়াই হাবিকে নিয়ে পালকি রওনা দেয়। এ দৃশ্য দেখে মহিম কমলাকে ছেড়ে পালকির পেছন পেছন ছুটতে শুরু করে। চীৎকার করতে থাকে, ‘চোর চোর আমার মেয়ে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ওর বলে এখনও মাছ আর মণ্ডা খাওয়া হয় নি’।
মহিমের পেছন পেছন গোটা কাঁচপোকা গ্রামটা ছুটছে এমন কি কমলাও। বাচ্চা দুটো হামা টেনে টেনে ছাদনা তলায় এসে গত রাতের বিয়ের যজ্ঞের ভুসো ছাই গায়ে মাখছে আর খিল খিল করে হেসে একে অপরের কাছে বাহাদুরি প্রকাশ করছে।
যোগেন পুকুর ধারে মহিমকে ধরে ফেলে। মহিমের মুখ থেকে তখন গ্যাঁজলা বের হচ্ছে। অস্বাভাবিক দৃষ্টি নিয়ে বড় বড় চোখে যোগেনের দিকে তাকায় মহিম। তারপর অভিমানের গলায় বলে, ‘তুমি আমার ছোটবেলার বন্ধু হয়ে মাছ মণ্ডাটা খেয়ে নিলে?’









আন্নাকালি বাবার ঘরে সত্যি খুব আদরে মানুষ। একই সন্তান। তারপরে আন্নার ঠাকুর্দা একসময় নীলকর সাহেবদের সঙ্গে রীতিমত লড়াই করেছে বলে গ্রামে তো বটেই পড়শি গ্রামেও তার একটা সমীহ আছে। ১৮৩০ সাল নাগাদ তিতুমীর যখন পুড়া গ্রামের বাজার ও ধনী মুসলমানদের বাড়ি লুট করে নিজেকে ভারতের মুসলমান শাসকের প্রতিনিধি হিসাবে ঘোষণা করে, আতঙ্কে জমিদাররা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় নীলকর সাহেবরা। জমিদারদের নেতৃত্ব দেয় অধুনা বনগাঁ মহকুমার গোবরডাঙ্গার জমিদার কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়। তার সংগ্রহে ছিল চারশো পাইক, দুশো লাঠিয়াল ও কয়েকটি হাতি। কলকাতার লাটুবাবু পাঠালেন দুশো হাবসী পাইক। কালীপ্রসন্নর সাহায্যে মোল্লাহাটির নীলকর সাহেব ডেভিস পাঠায় দুশো লাঠিয়াল, সড়কিয়ালা ও বন্দুকধারী পাইক। তবু তিতুমীরের বিশাল বাহিনীর কাছে এই বাহিনী পরাজিত হয়। তিতুমীরের বাহিনীর অন্যতম সৈনিক ছিল আন্নার ঠাকুরদা যদুপতি ব্যানার্জী। কুলীন ব্রাহ্মণ, উচ্চ বংশ কিছুই তাকে সেদিন আটকে রাখতে পারে নি। তিতুমীরের বাহিনীতে যোগদান করে বীরের মতো লড়াই দিয়েছিল সেদিনের তরুণ যদুপতি। লড়াই শেষে বিজয়ী হয়ে ঘরে ফেরে। ঘরে আটকানোর জন্য রাতারাতি বিয়ে দেওয়া হয় তার। বছরখানেক ঘরের ছেলে ঘরে থাকে। কিন্তু যখন কানে আসে নদীয়া ও চব্বিশ পরগণা জেলার গ্রামাঞ্চল থেকে তিতুমীরের ভয়ে পুলিশ তার কাছারি বাড়ির ঘট উলটে পালিয়ে গেছে, বড় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে শুরু হয়েছে তিতুমীরের শাসন, নদীয়া ও বারাসাত এলাকায় বড় বড় নীলকুঠীর জমিদারীতে প্রজারা খাজনা দেওয়া বন্ধ করেছে, এমন সংবাদে যদুপতির প্রাণে হিল্লোল জাগে। যুবক বয়সের বৌ একেবারে খুকি না। তার গর্ভে পাঁচ মাসের আন্নাকালির বাপকে রেখে বলে, ‘দুদিনের জন্য যাবো’। সেই যে যাওয়া আর ফিরে আসে নি যদুপতি। বলে গেছিল - রাজা হয়ে গেছে আমাদের সেনাপতি। একবার গড় করেই চলে আসবো। শ্যামা ঘাড় কাত করে সায় দেয়। স্বামী বলে কথা। শ্যামার সম্মতি আদায় করে যদুপতি প্রায় তিন লাফে তিতুমীরের সামনে এসে যখন পড়ে তখন নীলকর বাহিনীর সঙ্গে তিতুর লড়াই চরম আকার নিচ্ছে। কুঠিয়াল জমিদার শ্রেণী তিতুমিরকে দমনের জন্য বারাসাতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন জানিয়েছে। কলকাতা থেকে বিরাট বাহিনী এসে হাজির হয় যশোর জেলার বাগুন্ডিতে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার তাদের নেতৃত্ব দিতে আসে। প্রায় একশো কুড়ি জন বন্দুকধারী সৈন্য নিয়ে হাজির হয়। বাদুরিয়ার রুদ্রপুরে নীল কনসার্নকে ঘিরে গড়ে ওঠে একের পর এক নীলকুঠি। নারকেলবেরিয়ায় ছিল সাধু খাঁদের নীলকুঠি। আর সেখানেই তৈরি করে তিতু তার বাঁশের কেল্লা। এদিকে অবশ্য আলেকজান্ডার বাহিনী তিতুর কাছে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। আলেকজান্ডারের ঘোড়া খালে গিয়ে পড়ে। সাহেবের তখন মুমুর্ষু অবস্থা। তিতুমীরের নির্দেশে কয়েকজন সাহেবকে সেবা শুশ্রূষা করে। এই লড়াইয়ে অন্যতম সৈনিক ছিল সেদিনের যদুপতি। কারণ সে একাই দুচারজন ইংরেজকে যুজতে পারে এবং দুচারটে ইংরাজি বলতে পারে। আলেকজান্ডার সাহেবকে সুস্থ করে বাগুন্ডির সিপাই কেন্দ্রে দিয়ে আসে। আলেকজান্ডারের নামে ছড়া বাঁধা হয় –

আলেকজান্ডার সাহেব এলো তিতুমীরকে মারতে
সঙ্গে এলো গোরা সেপাই খোঁড়াতে খোঁড়াতে
কি মারবে কি মারবে নীল বানরে
ব্যাঙ মারবে, ছুঁচো মারবে সামনে দিলে ধরে।

এই সব ঘটনা ঘটতে ঘটতে কটা পক্ষকাল পার হয়ে গেল হিসাব রাখেনি যদুপতি। শ্যামা নামের মেয়েটা আর তার ভিতরে ধুকপুক করে বেড়ে ওঠা কচি প্রাণটা বেমালুম উধাও হয়ে গেছে যদুপতির স্মৃতি থেকে। নারকেলবেরিয়ায় বাঁশের কেল্লায় তখন প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে তরবারি, বর্শা, সড়কি, স্তূপাকারে কাঁচা বেল, ইটের টুকরো জোগাড় করতেই ব্যস্ত যদুপতি। কারণ লড়াই একটা বাধবেই। আলেকজান্ডারের শোচনীয় পরিণতিতে লর্ড বেন্টিঙ্কের আদেশে নদীয়ার কালেক্টর ও জজ বহু সৈন্য, হাতি নিয়ে এলো। তার সঙ্গে যোগ দিল গোবরডাঙ্গার জমিদারের পাইক বরকন্দাজ। প্রথম আক্রমণে পরাস্ত হয় ইংরেজ বাহিনী। এরপর একশো গোরা সৈন্য, তিনশো দেশীয় সিপাহী, বহু সশস্ত্র কুলি নিয়ে জনৈক কর্ণেল যাত্রা করেন নারকেলবেরিয়ায়। প্রথমে আক্রমণ চালায় তিতু। কিন্তু ১৮৩১ সালের ১৪ই নভেম্বর কর্ণেল হাজির হয় একদম দুর্গের সামনে। গোরা সৈনিকরা বন্দুক উঁচিয়ে এগিয়ে আসে। তিতু বাহিনী তীর ধনুক, কাঁচা বেল, ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে। কিন্তু কামানের গোলায় কেঁপে ওঠে তিতুমিরের দুর্গ। বারবার গোলা বর্ষণে কেল্লা ধসে পড়ে। বহু মানুষ চাপা পড়ে মারা যায়। সেই অসংখ্য মানুষের মধ্যে যদুপতিরও তুচ্ছ প্রাণটা সৎকার্যে বিসর্জন হয়ে যায়। কোনও খবর আসেনি যদুপতির বাড়িতে। শুধু শ্যামা তার ছেলের জন্ম দেয় এবং স্বামীর অনুরোধ মত নাম রাখে ‘বিজয়’। এরপরও শাঁখাসিঁদুর পরে বার বছর অপেক্ষা করেছিল শ্যামা। তারপর প্রথামতঃ শাঁখা ভেঙ্গে সেজি মাটি দিয়ে মাথার সিঁদুর ঘষে ঘষে তুলে সাদা থান পরে সত্যিকারের বিধবা হয় শ্যামা। এর দুবছরের মধ্যে কলেরায় মারা যায় সে। বিজয় মানে আমাদের আন্নাকালির বাবার বয়স তখন মাত্র চোদ্দ। ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও ঠাকুর দেবতার বালাই খুব বেশী এই পরিবারটায় নেই। এ পরিবারের মানুষগুলোর রকমসকম ভারী গোলমেলে। বিজয়ও যেন বাপের অর্ধসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করতেই বদ্ধপরিকর হয়ে মেতে ওঠে। অতএব পরাও লাগাম।
বিজয়ের সঙ্গে আন্নাকালির মা বৈঁচির বিয়ের নয় বছরের মাথায় আন্নাকালির জন্ম। সকলে তো ধরেই নিয়েছিল ছেলে-পুলে আর বুঝি হল না। ছেলেপুলে না হলে প্রথম দোষ গিয়ে পড়ে বৌয়ের উপরেই। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া হয় আন্নার মা হল বাঁজা। ও খুঁতো মেয়েমানুষ দিয়ে আর যাই হোক সংসার চলে না। বংশরক্ষা তো করতে হবে। তাই বিজয়ের যখন আবার বিয়ের চিন্তাভাবনা চলছে সে সময় আন্নার জন্মের পূর্বাভাস দেখা দিল বৈঁচির শরীরে। এবং যথাসময়ে বৈঁচি আমাদের আন্নার জন্ম দিল। আশপাশের মানুষ, আত্মীয়স্বজন অবশ্য মুখ ভেটকেছিল – এতদিন পর যাওবা হল, তা সে মেয়ের কলা। ও তে-আঁটি শাকের বোঝা। না হোমে না যজ্ঞে, কোন কাজে লাগবে শুনি? বাপ-মা মরলে শ্রাদ্ধটুকুও করতে পারবে না।
বিজয় আর বৈঁচির কিন্তু মেয়ে পেয়ে আহ্লাদের সীমা ছিল না। মেয়েকে একটু বড় হলে যখন অক্ষরজ্ঞান করাতে শুরু করে, সকলে একেবারে হৈ হৈ করে উঠেছিল –
খেয়ে যায় নিয়ে আরও যায় চেয়ে
ঐ যায় ঐ যায় বাঙালীর মেয়ে।
বিজয় তবু আন্নাকে সুর করে পড়া শেখাতো – স্বরে অ স্বরে আ। চণ্ডীমণ্ডপে আসা যাওয়ার পথে মানুষজন যখন থমকে দাঁড়িয়ে কচি গলায় শুনতো – রাম অতি সুবোধ বালক, কখনও মিথ্যা বলিও না। আবার কখনও বা শুনতে পেতো আন্না আধো আধো স্বরে নামতা পড়ছে। বাপ সোহাগি মেয়ে বাপের সঙ্গে উঠোনে দড়ির খাটে শুয়ে উলটো মুখো হয়ে কখনও গানও ধরে – বন্দে মাতরম্‌, সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলম্‌। সমবয়সী বাচ্চাদের সাথে স্বদেশী স্বদেশী খেলে। নিজেকে ঝাঁসির রাণী বলে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে চীৎকার করে বলে – ইংরেজ তুমি ভারত ছাড়ো।
তা এসব ব্যাপার স্যাপারে গ্রামের লোক চমকিত হবে নাতো কে হবে! এমন সৃষ্টিছাড়া ঘটনাতো বড় একটা ঘটে না। তা মেয়ে বাপের ঘরে স্বামীর কলেজে পড়া মোটা মোটা বইপত্রের খবর নেবে নাতো কে নেবে? আর শেখরেরও জগৎসংসার সম্পর্কে উদাসীন মেয়েগুলো দুচোখের বিষ। তাই তো আন্নাকে তার এত মনে ধরে। আত্মীয়স্বজনের শত অনুরোধেও বিজয় কিন্তু মেয়েকে গৌরীদান করে নি। বরং বাড়িতে গুরুমশাই রেখে রীতিমত প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ শেষ করে ফেলে। কিন্তু পড়শি গঞ্জনা বৈঁচি কতদিন সইবে? পুকুরঘাটে মন্দিরে প্রতিবেশীর বাড়ি গেলেই সব বউঝিরা মুখ টেপাটেপি করে হাসে। বলে – বুইলে গো
নষ্ট আচার দুষ্ট রীতি
এই দুই-এ জমে পিরিতি।
তখন অন্য কোণের পড়শি বৌ বৈঁচিকে আড়চোখে দেখে নিয়ে বিষ পিঁপড়ের কামড়ের ঠোনা মারে – নাগো না, মুরগির তেল হোলি মৌলবিকে ঠ্যাং দেখায়। এ ধরনের টিটকারি তামাশা কাহাতক সহ্য করা যায়। বৈঁচি তাই একদিন স্বামীকে সত্যি সত্যি জানিয়ে দেয় – ঢের হয়েছে। মেয়ে তার বিদ্যেধরীর জাহাজ হবে না। এরপর গ্রামে ঢি ঢি পড়ে যাবে, আর টেকা যাবে না। অতএব বিজয়কে সমাজের কাছে হেঁটমুণ্ড করতেই হয়।
ভবানিপুরের মুখুজ্জে পরিবারের পাত্রের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিল। বৈঁচি স্বামীকে কোনরকম ট্যাঁ ফুঁ করতে দেয়নি। তাছাড়া শেখর পাত্র হিসাবেও যথেষ্ট লোভনীয়। গ্রামে লেখাপড়া শেষ করে কলকাতা কলেজে পড়াশোনা করছে। এমন পাত্র হাতছাড়া করতে বিজয়েরও মন চায় নি। অতএব প্রজাপতির বন্ধনে চার হাত বাঁধা পড়ল। কিন্তু সেই বিয়ের এক বছরের মধ্যে এমন সাংঘাতিক ঘটনা ঘটবে তা কেউ ভাবতেও পারে নি। বৈঁচি একটানা স্বামীকে দোষারোপ করে চলেছে। মেয়ের বিয়ের পরও বিজয় নাকি একটুও বদলায়নি। নতুন কুটুম বাড়ি একটু যেচে পড়ে গিয়ে খোশামোদ করে মান রাখে নি। তার বদলে ঐ নীলকর সাহেবদের ফেলে যাওয়া নীলচাষের জমি কোথায় কোথায় শিবঠাকুরের মতো এক বুক গরল পান করে নীলবর্ণ হয়ে আছে তাদের গিয়ে উদ্ধার করো। ফের আবাদে ফিরিয়ে আনো।

কিন্তু বিজয়ের মনস্তাপের শেষ নেই। সে শুধু একটা কথা ভেবেই চলেছে ছি ছি এত তুচ্ছ কারণে ওনারা এমন ছোটলোকের মতো কাজ করলেন! কিন্তু শেষ পর্যন্ত খবর যখন পেল বিয়ে হয়েই গেছে তখন বিজয়ের বুকের ভেতরটা নীলচাষের জমির মতোই বিষিয়ে যায়। মনে হয় সত্যি সে ভোলানাথের মতোই আকণ্ঠ গরল পান করে যন্ত্রণায় ছটফট করছে। কিন্তু অমৃত কোথায়? যা দিয়ে তার জ্বালা জুড়োবে। বিজয়ের জীবনের সমস্ত অমৃত তো ঐ একরত্তি মেয়েটা। কিন্তু তার দিকে সে আর ফিরে চাইতে পারছে না। মনেপ্রাণে নারী পুরুষ সমান সমান যতই ভাবুক, বিশ্বাস করুক এই প্রথম সে একটা চরম সত্য হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করে কন্যা সন্তানের পিতা হওয়ার মতো এ পোড়া দেশে যন্ত্রণা বিড়ম্বনার আর কিছু নেই।
আর আন্না। আন্নার হৃদয়ে উথালপাথাল কোন স্রোত বইছে না ঠিকই কারণ স্বামী কি বস্তু সে বোঝে নি। পড়শি বন্ধুদের সঙ্গে পুতুল খেলবার সময় বরবৌ-এর যতটুকু মাহাত্ম্য বুঝেছে সে টুকুই। তবু একটা বিষয় ভেবে কষ্টের থেকে লজ্জা হচ্ছে বেশী। এমন একটা কারণে তেনারা ছেলের বিয়ে দিলেন যে বিষয়ে আন্নার কোনও হাত ছিল না। চার দেওয়ালের ছোট্ট কামরা ঘরটায় নিজেকে আবদ্ধ করে রেখে সে শুধু বিয়ের খবর আসা ইস্তক একটা কথাই ভেবে চলেছে, সে তো সেই কোন ছোটকাল থেকে সেঁজুতি ব্রত করে আসছে, গত সনে বিয়ের বছরেও কার্তিক মাসের সংক্রান্তি থেকে আরম্ভ করে অঘ্রাণ মাসের সংক্রান্তির দিন পর্যন্ত প্রত্যেক দিন বিকালে নিষ্ঠাভরে সেঁজুতি ব্রত করেছে। বাহান্নখানা খোপখোপ করে ঘর কেটে মধ্যখানে ঘট বসিয়ে দুব্ব, মধু, চিনি, দই, জল, ঘি লাগে এই পুজোয়। প্রত্যেকটা খোপে খাট-পালঙ্ক, পিঁড়ি, গহনা, রান্নাঘর, কাজললতা, বাহান্ন রকম জিনিসের মনগড়া ছবি আঁকতে হয়। আর এক একটা ঘরে হাত রেখে এক একরকম মন্ত্র বলতে হয়। আয়নায় হাত দিয়ে বলতে হয় –
আয়না আয়না সতীন যেন হয় না
যদি সতীন হয় যেন মরে যায়।
শিব মন্দিরে হাত দিয়ে বলতে হয় -
অশ্বথ তলায় বাস করি
সতীনের ঝাড় বিনাশ করি সাত সতীনের সাত কৌটো
তার মাঝে আমার সোনার কৌটো
সোনার কৌটো নাড়িচারি
সাত সতীনকে পুড়িয়ে মারি।
কই কিছুই তো ফলল না। সকলে বলছে তেনার আবার বিয়ে হয়েছে, আন্নাকে শ্বশুর বাড়ি ত্যাগ দিয়েছে। আন্নার সতীন এসেছে সে ঘরে। এত নিষ্ঠা সহকারে সেঁজুতি ব্রত করবার পরও সতীন এসেছে। এটা কেমন করে সম্ভব। আন্না এই কথাটা ভেবে ভেবে থই পায় না। গোয়ালাদের মেয়ে ফুটফুটি দিদি বাচ্চা হতে বাপের বাড়ি এসেছে। তার শ্বশুরবাড়ি আর আন্নার শ্বশুরবাড়ির গ্রাম একই। সেই প্রথম এমন ভয়ংকর সংবাদটা বয়ে এনেছিল। তবে তার কাছে এটা কোন সাংঘাতিক খবর না। কারণ সে নিজেই দ্বিতীয় পক্ষ। আন্নার মা বৈঁচি যখন খবরটা শুনে কেঁদে কঁকিয়ে হিক্কা তুলে মুর্ছা যাওয়ার অবস্থা তখন ফুটফুটিই ভারী পেটটা নিয়ে জাবর কেটে বসতে বসতে বলে, ‘ও বামুন খুঁড়ি, তুমি এমন হেদিয়ে মরছ কেন গা? সতীন থাকলো তো কি হল! বাড়ি ভর্তী শউর, সাউরি, খুঁড়ি, খুঁড়ো, একপাল ভাসুর, ননদ, জা, বিধবা আত্মীয় সকলের সঙ্গে ঘর করতে পারলে একটা সতীন কি খুব বেশি হবে?’
এ জিজ্ঞাসার উত্তর হয় না। এ খুব সাধারণ জিজ্ঞাসা। তবু উত্তরটা খুব গোলমেলে কিংবা জলের মত তরল। বৈঁচি তাই নীরবই ছিল।
সতীন বিষয়টা কী খুব বেশি না বুঝলেও আন্নার শুধু একটা কথাই সমস্ত রাত ধরে মনে হয়েছে তার সেঁজুতি ব্রত বিফলে গেছে। বৈঁচি আন্নাকে বুকে জড়িয়ে সারারাত কেঁদেছে আর নিজের স্বামী আর মন্দ ভাগ্যকে দোষারোপ করেছে। ভোররাতে যখন মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বৈঁচির দুচোখের পাতা জুড়ে ঘুম নেমে আসে তখনও আন্নার দুচোখের পাতা এক হয় না। সে শুধু শেখর নামে স্বামীটার বকসাদা অবয়বটুকুই ভাববার চেষ্টা করে গেছে।
এমন সময় ধব করে উঠোনের মাঝে আওয়াজ হতে শক্ত হয়ে শোয় আন্না। বাইরে তখন পাখিরা যে যার কোটর থেকে বেড়িয়ে গেছে খাদ্যের খোঁজে। গ্রাম দেশে বাড়ির মেয়েমানুষ তো বটেই, পুরুষ মানুষদেরও বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকার রেওয়াজ নেই। কিন্তু এ পরিবারের ক্ষেত্রে এ নিয়ম আজ খাটে না। এ যেন মহা শোকের বাড়ি। তাই নারকেল কাঠির ঝ্যাঁটা দিয়ে উঠোন এখনও পর্যন্ত খসখস আওয়াজ তুলে বাগদী বৌয়ের ঝাঁট দেওয়ার শব্দ নেই। ঝাঁটা দিতে দিতে রাজ্যের খবর শোনানোর বাচালতা নেই। বৈঁচির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে গোবরজল ছেটানোর শব্দ নেই। আর নেই আন্না আর বিজয়ের বাসি কাপড় ছেড়ে পূবমুখো হয়ে হাতজোড় করে প্রভাত বন্দনার গান।
আন্না বিছানায় শক্ত হয়ে শুয়ে বোঝবার চেষ্টা করে শব্দটা কিসের হল। তারপর হঠাৎ করে পুরুষকণ্ঠে একটা গোঁগোঁ শব্দ শুনে বিছানায় শক্ত হয়ে বসে আন্না। চুপিচুপি মায়ের পাশ থেকে উঠে আসে। বারান্দায় নেমে দেখে আন্নাদের উঠোনে অনেক পুরনো খুদে জামগাছটার নীচে একটা মানুষ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। প্রথমটা তড়তড় করে নেমে আসে আন্না। তারপর স্বাভাবিক সংস্কারে একটু সময় দাঁড়িয়ে যায়। কেননা একটা অচেনা পুরুষমানুষ সে মৃতই হোক আর জ্যান্তই হোক তার সামনে সেয়ানা মেয়ে সরাসরি গিয়ে হাজির হবে এ গ্রাম্য রীতিতে নেই। তবে বিজয় ব্যানার্জ্জীর মেয়ে হবার জন্য এ সব কিছুর উর্দ্ধে আন্নার জীবন। আন্না সাহস ভরে একটু দূর থেকেই ডাক দেয়, ‘কে গা তুমি? এমন ভিজে সপসপে হয়ে কোত্থেকে এলে?’
কিন্তু সাড়া নেই। আন্না তখন আর একটু কাছে গিয়ে মুখখানা দেখার চেষ্টা করে। জলে ভেজা সাদা কাগজের মতো ফ্যাঁকাসে মুখখানা তাতে টিকালো নাক, পাকা কুঁচ ফলের মতো লাল টুকটুকে ঠোঁট জোড়ায় ঝাপসা কুয়াশার ওপারে মনের ভাবনাটাকে উলটোবাগে ঠেলে দিয়ে কাকে যেন মনে পড়িয়ে দেয় আন্নাকে। তারপরেই মনে হয় না না সেটা কি করে সম্ভব।
বাগদী বউ কি যেন গজগজ করতে করতে এ বাড়ির উঠোন পর্যন্ত এসে ‘মাগো ওটা কে? ও আন্না দিদি তুমি ও কার মুখ পানে ঝুঁকে পড়ে চেয়ে আছো?’ বলে চিল্লামিল্লি শুরু করে দেয়। আন্নারও তো একই প্রশ্ন। কে এই মানুষটা? এই ভোরে স্নান করে তাদের বাড়ির উঠোনে পড়েই বা রয়েছে কেন? বাগদী বউ আর সময় নষ্ট করে না। ‘ও মাগো কে কোথায় আছো গো, কি সব্বনাসে কাণ্ড ঘটে গেছে গো – একটা মানুষ পড়ে আছে এখানে। ওটা মরা না জ্যান্ত কে জানে!’ বলে হাউমাউ করে চিল চীৎকার জুড়ে দেয়।

বিজয় সমস্ত রাত রাধামাধবের নাটমন্দিরে বসে একটা কথাই ভেবেছে – ঠাকুর আমি তো তোমাকে কোনদিন সেভাবে ডাকিনী, কিছু বলিও নি। কিন্তু আজ বলছি, আমার আন্নার কপালে তুমি এ কি বিধান লিখেছিলে? ব্রাহ্মণের ছেলে হয়ে আমি তোমাকে সেভাবে ডাকিনী বলেই কি আজ আমায় এই শাস্তি দিলে ঠাকুর? কিন্তু আন্না, সে তো তোমার কাছে কোন অপরাধ করে নি, সে তো তার মায়ের সঙ্গে কতরকম উপোষ, কাপাস, ব্রত উদযাপন করেছে। তাহলে তার কপালে এত দুর্গতি কেন?
বিজয়ের যখন বুকের ভিতরখানা হুহু করে শুধু কান্নাই পাচ্ছে, খানখান হয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে সমস্ত প্রতিরোধ সে সময়ে একটা বাচ্চা ছেলে এসে বলে, ‘ও খুঁড়ো তোমাদের উঠোনে কে যেন একটা এসে চান করে ঘুমোচ্ছে। তাড়াতাড়ি চলো’।
বাচ্চা ছেলেটার কথা প্রথমে বিজয়ের কানেই যায় না। ছেলেটা তাড়া লাগায়, ‘ও খুঁড়ো চলো গো, থে হয়ে রইলে কেন?’
বিজয়ের তখন সম্বিত ফেরে। ধড়মড় করে ঘুম থেকে ওঠার মতো করে বলে, ‘কেন কি হয়েছে রে?’ তারপর ‘আচ্ছা চল’ বলে হাঁটতে শুরু করে।

বিজয়ের উঠোন জুড়ে তখন প্রায় যেন চালতের মেলা বসে গেছে। বৈঁচি উন্মাদিনীর মতো লুটোতে লুটোতে এসে বলে, ‘ওগো আমাদের জামাই, আন্নার স্বামী। শেখর বাবাজী’।
বিজয় যা শোনে তা বিশ্বাস হয় না। তারপর ভিড়ের জল ঠেলে যখন সামনে এসে দাঁড়ায় তখন সত্যি সত্যি নিজের চোখ কান কোনওটাকেই বিশ্বাস হয় না। আন্না সামনে এসে দাঁড়ালে, ‘বাবা’ বলে ডাক দিলে বিজয়ের সমস্ত অস্তিত্ব তোলপাড় করে ওঠে। শেখর – হ্যাঁ শেখরই তো বটে। নতুন কুচানো ধুতি, পাঞ্জাবী, ভিজে সপসপে হয়ে কাদামাটি মেখে বড় দৈন্য হয়ে রয়েছে। হাতে লাল সুতো বাঁধা। কাল তো বিবাহ ছিল শেখরের। সে বিয়ে কি তবে শেষ পর্যন্ত হয় নি! ক্ষীণ আশা যেন দেখতে পায় বিজয়। কিন্তু এভাবে এখানে মানুষটা এলো কীভাবে।
প্রতিবেশী মুকুল হালদার বিজয়ের কানে কানে ফিসফিস করে বলে, ‘বিজয় কিসে থেকে কি হয়েছে সে সব পরেও বিবেচনা করা যাবে। এখন ওকে ঘরে নিয়ে গিয়ে সাফসুতরো করে আগে কবিরাজকে খবর দাও’।
সকলে শেখরকে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে এসে শুইয়ে দেয়। আন্না তখন উঠোনে দাঁড়িয়ে শেখর যেখানে পড়েছিল সেখানে বসে শুধু একটা কথাই ভাবছে – এ কেমন হল। মানুষটার তো কাল কার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। সে হিসেব করলে এখন তো নতুন বউ নিয়ে তার ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমন ব্যাপার হল যে এই সাতসকালে মানুষটা আন্নাদের দাওয়ায় এসে একেবারে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকবে। আন্নার যেন সব গোলমাল ঠেকে। তার ছোট মাথাটাতে আর কিছু কাজ করে না। তবে একটা কথা ভেবে মনটা পুলকে ভরে ওঠে, নারী হৃদয় কুসুমিত হয়। মানুষটা যেভাবেই আসুক আর যে করেই, তার কাছে ফিরে এসেছে। শেখর তার স্বামী। স্বামী বিষয়টা বড়ো আপন, নিজের, একান্ত নিজের। কে যেন ঘরের ভিতর থেকে ডাক দেয়, ‘আন্না’।
ঘোর কেটে যায় আন্নার। ছুটে ঘরের ভিতরে আসে। বৈঁচি এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে। জামাই তার এমন সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটিয়ে শুধু আন্নার টানেই এতটা চলে এসেছে। বৈঁচির হৃদয়েও আনন্দ বাতাস বইতে থাকে। বিজয় কবিরাজ আনতে ছুটেছে। বৈঁচি মেয়েকে ডাক দেয়, ‘অত দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন, এদিকে আয়। আমি শাশুড়ি মানুষ ওকে ছুঁতে পারি? দে দেখি তোর বাবার ফতুয়াখানা ওকে পরিয়ে’।
আন্নার লজ্জায় কান মাথা ঝাঁঝাঁ করে। এত লোকের সামনে বলছে কি মা। কিন্তু বৈঁচি আজ বেপরোয়া, কোনও ভয় নেই তার। ভগবান যে কোনও সুযোগ বারবার দেন না। ভাঙাকপালি মেয়ের কাছে আকাশের চাঁদ নিজে এসে ধরা দিয়েছে। কোনও হেলাফেলায় সে সুযোগ নষ্ট করা যাবে না। বিজয়ের সঙ্গে সংসার করতে করতে তার অন্তত এই অভিজ্ঞতাটুকু হয়েছে যে লোকের কথা সবসময় না শুনলেও চলবে। বৈঁচি আন্নাকে এবারে বেশ কঠোরভাবেই নির্দেশ দিল, ‘কিরে হা করে দাঁড়িয়ে আছিস যে বড়, দেখছিস ছেলেটা সংজ্ঞাহীন। তারমধ্যে জলকাদায় একাকার হয়ে আছে’।
বৈঁচির কথার ঢঙে ঘরের ভিতরকার ভিড়টা হাল্কা হয়ে আসে। তবু বলা মুখ এমন সময়েও বলে যায়, ‘মাগো ছি ছি কি বেহায়া। সক্কলের সামনে মেয়ে রেখে দোর দিয়ে দেলে। এ কেমন শাউরী, জন্মের শোধ বাপু ...’।

স্বামী কেমন আগে কখনও টের পায় নি আন্না। পাওয়ার সুযোগও হয় নি। আজ যখন বদ্ধ ঘরে অচেতন স্বামীর ভিজে জামাকাপড় পালটে দেওয়ার মতো গুরুদায়িত্ব ঘাড়ে এসে পড়ল তখন মনের ভিতর রাজ্যের সঙ্কোচ আর দ্বিধা এসে জড়ো হল। প্রথমটা কিছুতেই যেন সরো হতে পারছিল না আন্না। তারপর অত্যন্ত কুণ্ঠাভরে মানুষটার গায়ে হাত রাখতেই ছ্যাৎ করে ওঠে হাত। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। আন্নার মনে হয় সে যেন গরম কড়াইতে ছেঁকা খেয়েছে। চমকে ওঠে আন্না। বার বছরের আন্না জননী স্বরূপিনী হয়ে ওঠে। পরম যত্নে শেখরের পোশাক বদলে গা মুছে দেয়। মাথাভর্তি মসৃণ নরম চুলগুলোয় হাত বুলিয়ে দিতে গেলে শেখর যেন অস্ফুটে কি বলে ওঠে, বোঝা যায় না। আন্না ভাবে জল চাইছে বোধহয়। দেরাজের উপর বসানো ঘটিটা থেকে জল গালে ঢেলে দিতে গেলে সে সময় মানুষটা গুঙিয়ে উঠে আবার যেন কি বলে। আন্না মুখ নিচু করে শোনবার চেষ্টা করে। শেখর বলে ওঠে, ‘আন্না’।
থরথর করে কেঁপে ওঠে আন্না। ভুল শুনল না তো সে। আর একবার মুখ নিচু করে শোনবার চেষ্টা করে। না ঠিকই শুনেছে। চোখ বন্ধ করে মানুষটা একনাগাড়ে করুণ, ক্ষীণ স্বরে বলে যাচ্ছে, ‘আন্না, আন্না, আন্না’।
না আর কোন ভুল নেই। মানুষটা তার কাছেই ফিরে এসেছে। আন্নার হৃদয়ে নারী হৃদয় কুসুমিত হয়। দুচোখ জলে উপচে ওঠে। পান পাতা ডৌলের গাল বেয়ে চিবুক হয়ে সে জল শেখরের বক্ষ স্পর্শ করে। মানুষটাকে নিয়ে অনেক কিছু করতে ইচ্ছা করে আন্নার। কিন্তু কি যে করবে সেটাই ঠিক করতে পারে না। তাই সে শেখরের বুকখানাতেই মুখ গুঁজে দেয়। মুখ গুঁজে দিয়ে পাগলের মতো ঘষতে থাকে। আর ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকে। কত না না বলা কথা সে অবিরাম বলে যেতে থাকে তার কোন ঠিক নেই – ‘ওগো চোখ মেলো তুমি। তাকিয়ে দেখ এই যে আমি আন্না, তোমার আন্না, তুমি ফিরে এসেছ আমার কাছে এ যে আমি ভাবতেই পারছি না’।
ওদিকে বন্ধ দরজার ওপারে ঘা পড়ে। বৈঁচির গলা, ‘আন্না, মা আমার দরজাটা খুলে দে। তোর বাবা কবিরাজ এনেছেন’।
আন্না যেন এতক্ষণ কোন ঘোরের ভিতর ছিল। সে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। একবার সংজ্ঞাহীন শেখরের মুখের দিকে তাকিয়ে ছুটে গিয়ে দরজার ছিটকিনি খুলে দেয়। বিজয় কবিরাজ নিয়ে ঘরে ঢোকে। বাইরের উৎসুক কৌতূহলী জনতাও হুরমুড়িয়ে ঘরে ঢুকতে চাইলে কট্টর আদেশ দেয় কবিরাজ, ‘দুজন ছাড়া এ ঘরে আর কারও থাকা চলবে না’।
বৈঁচি পা ঘষে ঘষে অনিচ্ছা সত্ত্বেও চৌকাঠে এক পা রেখে কবিরাজের দিকে মুখ ফিরিয়ে হাতজোড় করে বলে, ‘ও থাকুক কবরেজ মশাই’।
কবিরাজ চশমার কাঁচটা নাকের উপর একবার ঠেলে দিয়ে আন্নাকে নিরীক্ষণ করে বলে, ‘শুনলাম এ রুগী তোমাদের জামাতা। তা এটি মেয়ে বুঝি?’
কবিরাজ এ গাঁয়ের না। তাই বিজয়ের পরিবারকে ভাল করে চেনে না, জানে না।
বৈঁচি মাথা নাড়ে, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ’।
কবিরাজ আন্নাকে ভিতর থেকে দরজা দিয়ে দিতে বলে। বাইরে তখন কৌতূহলী জনতা পঞ্চ ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে ভিতরে কি হচ্ছে তা জানবার জন্য উদগ্রীব। কবিরাজ শেখরের গায়ে হাত রাখে। বলে, ‘এর গায়ে তো অসম্ভব তাপ। সংজ্ঞা নেই। আগে একে সজ্ঞানে আনা দরকার। এমন হাল হল কেমন করে। সেটি না জানলে চিকিৎসায় অসুবিধা হয়’।
বিজয়, বৈঁচি এমন কি আন্না পর্যন্ত মুখিয়ে আছে আসলে সেই কাকভোর থেকে সত্যি সত্যি কি ঘটেছে তা জানবার জন্য।
বিজয় বলে ওঠে, ‘সেই ভাল’।
আন্না তখন জোড়হাত করে গ্রামের ওলাইচণ্ডীতলায় মানত রাখে মানুষটার জ্ঞান ফিরলে সে সেখানে মিছরি বাতাসা ভোগ দেবে। এক মনে বিড়বিড় করে যায়, ঠাকুর ওকে ভাল করে দাও, ওকে ভাল করে দাও।
কবিরাজ মশাই নিজস্ব চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু করে। আন্নাকে বলে, ‘দোর খুলে দাও খুকী। মাকে ভিতরে আসতে বল’। তারপর কর্পূর আর কালজিরের পুটুলি বার করে শেখরের নাকের কাছে ধরে। বৈঁচিকে বলে শেখরের মাথায় হাওয়া দিতে। বিজয়ের মতো কঠিন মানুষও ইষ্টনাম জপ করতে থাকে। আর আন্না কাঠের পুতুলের মতো দেরাজের ডান দিকটা খামচে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পরে শেখর সামান্য চোখ খোলে। আন্না যেন এতক্ষণ দম আটকে নিজের সঙ্গে একটা কঠিন লড়াই করছিল। এবার সে হাঁফ ছাড়ে। বৈঁচি কবিরাজের উপস্থিতিতেই স্বামীর বাহু আঁকড়ে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, ‘ও গো ও চোখ মেলেছে’।
বিজয় চরম উৎকণ্ঠার ভেতর একটা ব্যাপারে ভয় পাচ্ছিল খুব, তা হল শেখর নিজের বাড়ি ছেড়ে, বিয়ের আসরে কি না কি ঘটিয়ে এখানে এসে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছে। তার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে তার পরিবারের কাছে কি কৈফিয়ত দেবে? এই একটা অজানা ভয়ে কাঁটা হয়ে ছিল এতক্ষণ। শেখর চোখ মেলতেই সে যেন স্বস্তির শ্বাস ফেলে। কবিরাজ গম্ভীরভাবে বলে, ‘বিকার অনেক গভীরে। আগে কি হয়েছিল তার খোঁজ নি’। তারপর মুখ নিচু করে শুধোয়, ‘কি হয়েছিল বাবা?’
শেখরের চোখে ঘোলাটে দৃষ্টি, মুখ পাংশুটে। বকসাদা গায়ের রঙ যেন আরও ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ঠোঁট নাড়ে শেখর, কি যেন বলবার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু বোঝা যায় না। শুধু দু’চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে।
বৈঁচি বলে ওঠে, ‘ওর বোধহয় খুব কষ্ট হচ্ছে’।
মাথা নাড়ে কবিরাজ মশাই, ‘তা তো হবেই বৌমা। কিন্তু আমার চিকিৎসা পদ্ধতি যে অন্যরকম। চিকিৎসা করতে গেলে প্রথমে জানতে হবে শরীরের রোগের সঙ্গে মনের রোগের সম্পর্কটা ঠিক কোথায়’।
বিজয় বিরক্ত হয়ে ওঠে, ‘আঃ তুমি চুপ করবে’।
কবিরাজ মশাই এবার একবাটি গরম দুধ চায়। বৈঁচি প্রথমে মেয়েকে, ‘যা তো মা রান্না ঘরে কাঠের উনুনে একটা কাঠ গুঁজে দিয়ে এক বাটি দুধ গরম করে নিয়ে আয় তো’ বলেই বলে ‘আচ্ছা তোকে যেতে হবে না আমি যাচ্ছি’।
ছিটকিনি খুলে বাইরে আসে বৈঁচি। সমস্ত গ্রামের মানুষ যেন তাকে মাছির মত ছেঁকে ধরে কি হয়েছে জানবার জন্য। ভিড় ঠেলে বৈঁচি রান্না ঘরের দিকে এগোতে এগোতে বলে, ‘বাবাজীর জ্ঞান ফিরেছে, আপনারা আর দুশ্চিন্তা না করে ঘরে যান, কবিরাজ মশাই গরম দুধ চেয়েছেন’।
গ্রামের মানুষ এমন কথায় সন্তুষ্ট হয় না। তারা একে অপরকে ঠোনা দেয়, ‘বাবা ঢঙ্গের ঠেলায় মরে যাই। জন্মের শোধ এমন সৃষ্টিছাড়া কান্ড তো আগে কখনো ঘটেছে বা শুনেছে বলে শুনিনি।‘ কেউ আবার বলে, ‘জামাই বাবাজী তো আবার বে করেছে বলে শুনেছি তা তার কি হল’। কেউ আবার ফিসফিস করে বলে, ‘বাণ মারল না তো! কি যা ছাতা রকমসকম বুঝি না কিছু’।
মন ভার হয় বৈঁচির। আজ সে কারও কোনো কথাতেই আমল দেবে না, এই তার পণ। বাবা বুড়ো শিব তার কথা রেখেছে। তাই বৈঁচি মাথা ঠাণ্ডা রেখে রান্না ঘরের কাঠের উনুনটায় কাঠ গুঁজে দিয়ে বাটীতে দুধ গরম করে নিয়ে আসে।
সেই পণ তাকে রাখতে হবে। কবিরাজের নিজস্ব হামানদিস্তায় কি সব জিনিস তখন থেঁতো করে পথ্য তৈরি হচ্ছে। কবিরাজ বলল, ‘দাও বৌমা, দুধটা এই পাত্রের মধ্যে ঢেলে দাও’।
বৈঁচি তাই করে। কবিরাজ পাথরের চামচ করে সেই দুধ একটু একটু গালে দেয় শেখরের। প্রায় বিশ পঁচিশ বার দেওয়ার পর শেখর চোখ মেলে চায়। কবিরাজের মুখে হাসি ফোটে। হাসি ফোটে আর সকলের মুখে। কবিরাজ মৃদুস্বরে বলে, ‘বাবা এবার বলতে পারবে, কি হয়েছিল তোমার? কেন তুমি এখানে?’
শেখর যেন ঘোর লাগা চোখে চারপাশ চেয়ে বুঝে নিতে চায় কোথায় আছে সে। তারপর আস্তে আস্তে বলে, ‘ও বিয়েতে আমার মত ছিল না’।
বিজয় ঝুঁকে পড়ে, ‘তবে বিয়ে কি তোমার হয় নি বাবা?’
শুয়ে শুয়েই ঘাড় নাড়ে শেখর, ‘হ্যাঁ হয়েছে। আমি ভোররাতে পালিয়ে এসেছি’।
বৈঁচি বলে ওঠে, ‘এত সকালে নদী পার হলে কি করে?’
‘সাঁতরে’।
ঘরটায় মুহূর্তের মধ্যে মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা নেমে আসে। এমনকি কবিরাজের হামানদিস্তার ঘটঘট শব্দও থেমে যায়। সামান্য সময় পরে উউ করে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ আছড়ে পড়ে ঘরের ভেতর। আন্না কাঁদছে। বড় দুঃখে কাঁদছে আন্না। বড় সুখে কাঁদছে আন্না। বৈঁচি উঠে মেয়ের হাত ধরে নিয়ে এসে খাটে শেখরের পাশে বসিয়ে দেয়।
বিজয় যেন শূন্যে চোখ মেলে। কণ্ঠস্বর বড় কঠিন – ‘তাহলে তার কি হল শেখর? যাকে তুমি গতকাল অগ্নিস্বাক্ষী করে বিয়ে করলে!’
বৈঁচি তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে, ‘বাবাজী এই দেখ চোখ মেলো। চেয়ে দেখো। এই যে তোমার আন্না’।
কবিরাজ মশাই কলাপাতার মোড়কে মোড়কে বেশকিছু জড়িবুটির ওষুধ পুরিয়া করে বৈঁচির হাতে দেয়। বলে, ‘ওষুধগুলোর নিয়ম বুঝে নাও বৌমা’। তারপর আন্নার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুমিও বুঝে নাও মা। তবে কি জানো, ওকে ভালো করে তোলবার জন্য তোমার ভালোবাসা, সেবাযত্নই বেশী দরকার’।







আন্নাকালি বাবার ঘরে সত্যি খুব আদরে মানুষ। একই সন্তান। তারপরে আন্নার ঠাকুর্দা একসময় নীলকর সাহেবদের সঙ্গে রীতিমত লড়াই করেছে বলে গ্রামে তো বটেই পড়শি গ্রামেও তার একটা সমীহ আছে। ১৮৩০ সাল নাগাদ তিতুমীর যখন পুড়া গ্রামের বাজার ও ধনী মুসলমানদের বাড়ি লুট করে নিজেকে ভারতের মুসলমান শাসকের প্রতিনিধি হিসাবে ঘোষণা করে, আতঙ্কে জমিদাররা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় নীলকর সাহেবরা। জমিদারদের নেতৃত্ব দেয় অধুনা বনগাঁ মহকুমার গোবরডাঙ্গার জমিদার কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়। তার সংগ্রহে ছিল চারশো পাইক, দুশো লাঠিয়াল ও কয়েকটি হাতি। কলকাতার লাটুবাবু পাঠালেন দুশো হাবসী পাইক। কালীপ্রসন্নর সাহায্যে মোল্লাহাটির নীলকর সাহেব ডেভিস পাঠায় দুশো লাঠিয়াল, সড়কিয়ালা ও বন্দুকধারী পাইক। তবু তিতুমীরের বিশাল বাহিনীর কাছে এই বাহিনী পরাজিত হয়। তিতুমীরের বাহিনীর অন্যতম সৈনিক ছিল আন্নার ঠাকুরদা যদুপতি ব্যানার্জী। কুলীন ব্রাহ্মণ, উচ্চ বংশ কিছুই তাকে সেদিন আটকে রাখতে পারে নি। তিতুমীরের বাহিনীতে যোগদান করে বীরের মতো লড়াই দিয়েছিল সেদিনের তরুণ যদুপতি। লড়াই শেষে বিজয়ী হয়ে ঘরে ফেরে। ঘরে আটকানোর জন্য রাতারাতি বিয়ে দেওয়া হয় তার। বছরখানেক ঘরের ছেলে ঘরে থাকে। কিন্তু যখন কানে আসে নদীয়া ও চব্বিশ পরগণা জেলার গ্রামাঞ্চল থেকে তিতুমীরের ভয়ে পুলিশ তার কাছারি বাড়ির ঘট উলটে পালিয়ে গেছে, বড় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে শুরু হয়েছে তিতুমীরের শাসন, নদীয়া ও বারাসাত এলাকায় বড় বড় নীলকুঠীর জমিদারীতে প্রজারা খাজনা দেওয়া বন্ধ করেছে, এমন সংবাদে যদুপতির প্রাণে হিল্লোল জাগে। যুবক বয়সের বৌ একেবারে খুকি না। তার গর্ভে পাঁচ মাসের আন্নাকালির বাপকে রেখে বলে, ‘দুদিনের জন্য যাবো’। সেই যে যাওয়া আর ফিরে আসে নি যদুপতি। বলে গেছিল - রাজা হয়ে গেছে আমাদের সেনাপতি। একবার গড় করেই চলে আসবো। শ্যামা ঘাড় কাত করে সায় দেয়। স্বামী বলে কথা। শ্যামার সম্মতি আদায় করে যদুপতি প্রায় তিন লাফে তিতুমীরের সামনে এসে যখন পড়ে তখন নীলকর বাহিনীর সঙ্গে তিতুর লড়াই চরম আকার নিচ্ছে। কুঠিয়াল জমিদার শ্রেণী তিতুমিরকে দমনের জন্য বারাসাতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন জানিয়েছে। কলকাতা থেকে বিরাট বাহিনী এসে হাজির হয় যশোর জেলার বাগুন্ডিতে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার তাদের নেতৃত্ব দিতে আসে। প্রায় একশো কুড়ি জন বন্দুকধারী সৈন্য নিয়ে হাজির হয়। বাদুরিয়ার রুদ্রপুরে নীল কনসার্নকে ঘিরে গড়ে ওঠে একের পর এক নীলকুঠি। নারকেলবেরিয়ায় ছিল সাধু খাঁদের নীলকুঠি। আর সেখানেই তৈরি করে তিতু তার বাঁশের কেল্লা। এদিকে অবশ্য আলেকজান্ডার বাহিনী তিতুর কাছে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। আলেকজান্ডারের ঘোড়া খালে গিয়ে পড়ে। সাহেবের তখন মুমুর্ষু অবস্থা। তিতুমীরের নির্দেশে কয়েকজন সাহেবকে সেবা শুশ্রূষা করে। এই লড়াইয়ে অন্যতম সৈনিক ছিল সেদিনের যদুপতি। কারণ সে একাই দুচারজন ইংরেজকে যুজতে পারে এবং দুচারটে ইংরাজি বলতে পারে। আলেকজান্ডার সাহেবকে সুস্থ করে বাগুন্ডির সিপাই কেন্দ্রে দিয়ে আসে। আলেকজান্ডারের নামে ছড়া বাঁধা হয় –

আলেকজান্ডার সাহেব এলো তিতুমীরকে মারতে
সঙ্গে এলো গোরা সেপাই খোঁড়াতে খোঁড়াতে
কি মারবে কি মারবে নীল বানরে
ব্যাঙ মারবে, ছুঁচো মারবে সামনে দিলে ধরে।

এই সব ঘটনা ঘটতে ঘটতে কটা পক্ষকাল পার হয়ে গেল হিসাব রাখেনি যদুপতি। শ্যামা নামের মেয়েটা আর তার ভিতরে ধুকপুক করে বেড়ে ওঠা কচি প্রাণটা বেমালুম উধাও হয়ে গেছে যদুপতির স্মৃতি থেকে। নারকেলবেরিয়ায় বাঁশের কেল্লায় তখন প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে তরবারি, বর্শা, সড়কি, স্তূপাকারে কাঁচা বেল, ইটের টুকরো জোগাড় করতেই ব্যস্ত যদুপতি। কারণ লড়াই একটা বাধবেই। আলেকজান্ডারের শোচনীয় পরিণতিতে লর্ড বেন্টিঙ্কের আদেশে নদীয়ার কালেক্টর ও জজ বহু সৈন্য, হাতি নিয়ে এলো। তার সঙ্গে যোগ দিল গোবরডাঙ্গার জমিদারের পাইক বরকন্দাজ। প্রথম আক্রমণে পরাস্ত হয় ইংরেজ বাহিনী। এরপর একশো গোরা সৈন্য, তিনশো দেশীয় সিপাহী, বহু সশস্ত্র কুলি নিয়ে জনৈক কর্ণেল যাত্রা করেন নারকেলবেরিয়ায়। প্রথমে আক্রমণ চালায় তিতু। কিন্তু ১৮৩১ সালের ১৪ই নভেম্বর কর্ণেল হাজির হয় একদম দুর্গের সামনে। গোরা সৈনিকরা বন্দুক উঁচিয়ে এগিয়ে আসে। তিতু বাহিনী তীর ধনুক, কাঁচা বেল, ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে। কিন্তু কামানের গোলায় কেঁপে ওঠে তিতুমিরের দুর্গ। বারবার গোলা বর্ষণে কেল্লা ধসে পড়ে। বহু মানুষ চাপা পড়ে মারা যায়। সেই অসংখ্য মানুষের মধ্যে যদুপতিরও তুচ্ছ প্রাণটা সৎকার্যে বিসর্জন হয়ে যায়। কোনও খবর আসেনি যদুপতির বাড়িতে। শুধু শ্যামা তার ছেলের জন্ম দেয় এবং স্বামীর অনুরোধ মত নাম রাখে ‘বিজয়’। এরপরও শাঁখাসিঁদুর পরে বার বছর অপেক্ষা করেছিল শ্যামা। তারপর প্রথামতঃ শাঁখা ভেঙ্গে সেজি মাটি দিয়ে মাথার সিঁদুর ঘষে ঘষে তুলে সাদা থান পরে সত্যিকারের বিধবা হয় শ্যামা। এর দুবছরের মধ্যে কলেরায় মারা যায় সে। বিজয় মানে আমাদের আন্নাকালির বাবার বয়স তখন মাত্র চোদ্দ। ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও ঠাকুর দেবতার বালাই খুব বেশী এই পরিবারটায় নেই। এ পরিবারের মানুষগুলোর রকমসকম ভারী গোলমেলে। বিজয়ও যেন বাপের অর্ধসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করতেই বদ্ধপরিকর হয়ে মেতে ওঠে। অতএব পরাও লাগাম।
বিজয়ের সঙ্গে আন্নাকালির মা বৈঁচির বিয়ের নয় বছরের মাথায় আন্নাকালির জন্ম। সকলে তো ধরেই নিয়েছিল ছেলে-পুলে আর বুঝি হল না। ছেলেপুলে না হলে প্রথম দোষ গিয়ে পড়ে বৌয়ের উপরেই। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া হয় আন্নার মা হল বাঁজা। ও খুঁতো মেয়েমানুষ দিয়ে আর যাই হোক সংসার চলে না। বংশরক্ষা তো করতে হবে। তাই বিজয়ের যখন আবার বিয়ের চিন্তাভাবনা চলছে সে সময় আন্নার জন্মের পূর্বাভাস দেখা দিল বৈঁচির শরীরে। এবং যথাসময়ে বৈঁচি আমাদের আন্নার জন্ম দিল। আশপাশের মানুষ, আত্মীয়স্বজন অবশ্য মুখ ভেটকেছিল – এতদিন পর যাওবা হল, তা সে মেয়ের কলা। ও তে-আঁটি শাকের বোঝা। না হোমে না যজ্ঞে, কোন কাজে লাগবে শুনি? বাপ-মা মরলে শ্রাদ্ধটুকুও করতে পারবে না।
বিজয় আর বৈঁচির কিন্তু মেয়ে পেয়ে আহ্লাদের সীমা ছিল না। মেয়েকে একটু বড় হলে যখন অক্ষরজ্ঞান করাতে শুরু করে, সকলে একেবারে হৈ হৈ করে উঠেছিল –
খেয়ে যায় নিয়ে আরও যায় চেয়ে
ঐ যায় ঐ যায় বাঙালীর মেয়ে।
বিজয় তবু আন্নাকে সুর করে পড়া শেখাতো – স্বরে অ স্বরে আ। চণ্ডীমণ্ডপে আসা যাওয়ার পথে মানুষজন যখন থমকে দাঁড়িয়ে কচি গলায় শুনতো – রাম অতি সুবোধ বালক, কখনও মিথ্যা বলিও না। আবার কখনও বা শুনতে পেতো আন্না আধো আধো স্বরে নামতা পড়ছে। বাপ সোহাগি মেয়ে বাপের সঙ্গে উঠোনে দড়ির খাটে শুয়ে উলটো মুখো হয়ে কখনও গানও ধরে – বন্দে মাতরম্‌, সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলম্‌। সমবয়সী বাচ্চাদের সাথে স্বদেশী স্বদেশী খেলে। নিজেকে ঝাঁসির রাণী বলে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে চীৎকার করে বলে – ইংরেজ তুমি ভারত ছাড়ো।
তা এসব ব্যাপার স্যাপারে গ্রামের লোক চমকিত হবে নাতো কে হবে! এমন সৃষ্টিছাড়া ঘটনাতো বড় একটা ঘটে না। তা মেয়ে বাপের ঘরে স্বামীর কলেজে পড়া মোটা মোটা বইপত্রের খবর নেবে নাতো কে নেবে? আর শেখরেরও জগৎসংসার সম্পর্কে উদাসীন মেয়েগুলো দুচোখের বিষ। তাই তো আন্নাকে তার এত মনে ধরে। আত্মীয়স্বজনের শত অনুরোধেও বিজয় কিন্তু মেয়েকে গৌরীদান করে নি। বরং বাড়িতে গুরুমশাই রেখে রীতিমত প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ শেষ করে ফেলে। কিন্তু পড়শি গঞ্জনা বৈঁচি কতদিন সইবে? পুকুরঘাটে মন্দিরে প্রতিবেশীর বাড়ি গেলেই সব বউঝিরা মুখ টেপাটেপি করে হাসে। বলে – বুইলে গো
নষ্ট আচার দুষ্ট রীতি
এই দুই-এ জমে পিরিতি।
তখন অন্য কোণের পড়শি বৌ বৈঁচিকে আড়চোখে দেখে নিয়ে বিষ পিঁপড়ের কামড়ের ঠোনা মারে – নাগো না, মুরগির তেল হোলি মৌলবিকে ঠ্যাং দেখায়। এ ধরনের টিটকারি তামাশা কাহাতক সহ্য করা যায়। বৈঁচি তাই একদিন স্বামীকে সত্যি সত্যি জানিয়ে দেয় – ঢের হয়েছে। মেয়ে তার বিদ্যেধরীর জাহাজ হবে না। এরপর গ্রামে ঢি ঢি পড়ে যাবে, আর টেকা যাবে না। অতএব বিজয়কে সমাজের কাছে হেঁটমুণ্ড করতেই হয়।
ভবানিপুরের মুখুজ্জে পরিবারের পাত্রের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিল। বৈঁচি স্বামীকে কোনরকম ট্যাঁ ফুঁ করতে দেয়নি। তাছাড়া শেখর পাত্র হিসাবেও যথেষ্ট লোভনীয়। গ্রামে লেখাপড়া শেষ করে কলকাতা কলেজে পড়াশোনা করছে। এমন পাত্র হাতছাড়া করতে বিজয়েরও মন চায় নি। অতএব প্রজাপতির বন্ধনে চার হাত বাঁধা পড়ল। কিন্তু সেই বিয়ের এক বছরের মধ্যে এমন সাংঘাতিক ঘটনা ঘটবে তা কেউ ভাবতেও পারে নি। বৈঁচি একটানা স্বামীকে দোষারোপ করে চলেছে। মেয়ের বিয়ের পরও বিজয় নাকি একটুও বদলায়নি। নতুন কুটুম বাড়ি একটু যেচে পড়ে গিয়ে খোশামোদ করে মান রাখে নি। তার বদলে ঐ নীলকর সাহেবদের ফেলে যাওয়া নীলচাষের জমি কোথায় কোথায় শিবঠাকুরের মতো এক বুক গরল পান করে নীলবর্ণ হয়ে আছে তাদের গিয়ে উদ্ধার করো। ফের আবাদে ফিরিয়ে আনো।

কিন্তু বিজয়ের মনস্তাপের শেষ নেই। সে শুধু একটা কথা ভেবেই চলেছে ছি ছি এত তুচ্ছ কারণে ওনারা এমন ছোটলোকের মতো কাজ করলেন! কিন্তু শেষ পর্যন্ত খবর যখন পেল বিয়ে হয়েই গেছে তখন বিজয়ের বুকের ভেতরটা নীলচাষের জমির মতোই বিষিয়ে যায়। মনে হয় সত্যি সে ভোলানাথের মতোই আকণ্ঠ গরল পান করে যন্ত্রণায় ছটফট করছে। কিন্তু অমৃত কোথায়? যা দিয়ে তার জ্বালা জুড়োবে। বিজয়ের জীবনের সমস্ত অমৃত তো ঐ একরত্তি মেয়েটা। কিন্তু তার দিকে সে আর ফিরে চাইতে পারছে না। মনেপ্রাণে নারী পুরুষ সমান সমান যতই ভাবুক, বিশ্বাস করুক এই প্রথম সে একটা চরম সত্য হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করে কন্যা সন্তানের পিতা হওয়ার মতো এ পোড়া দেশে যন্ত্রণা বিড়ম্বনার আর কিছু নেই।
আর আন্না। আন্নার হৃদয়ে উথালপাথাল কোন স্রোত বইছে না ঠিকই কারণ স্বামী কি বস্তু সে বোঝে নি। পড়শি বন্ধুদের সঙ্গে পুতুল খেলবার সময় বরবৌ-এর যতটুকু মাহাত্ম্য বুঝেছে সে টুকুই। তবু একটা বিষয় ভেবে কষ্টের থেকে লজ্জা হচ্ছে বেশী। এমন একটা কারণে তেনারা ছেলের বিয়ে দিলেন যে বিষয়ে আন্নার কোনও হাত ছিল না। চার দেওয়ালের ছোট্ট কামরা ঘরটায় নিজেকে আবদ্ধ করে রেখে সে শুধু বিয়ের খবর আসা ইস্তক একটা কথাই ভেবে চলেছে, সে তো সেই কোন ছোটকাল থেকে সেঁজুতি ব্রত করে আসছে, গত সনে বিয়ের বছরেও কার্তিক মাসের সংক্রান্তি থেকে আরম্ভ করে অঘ্রাণ মাসের সংক্রান্তির দিন পর্যন্ত প্রত্যেক দিন বিকালে নিষ্ঠাভরে সেঁজুতি ব্রত করেছে। বাহান্নখানা খোপখোপ করে ঘর কেটে মধ্যখানে ঘট বসিয়ে দুব্ব, মধু, চিনি, দই, জল, ঘি লাগে এই পুজোয়। প্রত্যেকটা খোপে খাট-পালঙ্ক, পিঁড়ি, গহনা, রান্নাঘর, কাজললতা, বাহান্ন রকম জিনিসের মনগড়া ছবি আঁকতে হয়। আর এক একটা ঘরে হাত রেখে এক একরকম মন্ত্র বলতে হয়। আয়নায় হাত দিয়ে বলতে হয় –
আয়না আয়না সতীন যেন হয় না
যদি সতীন হয় যেন মরে যায়।
শিব মন্দিরে হাত দিয়ে বলতে হয় -
অশ্বথ তলায় বাস করি
সতীনের ঝাড় বিনাশ করি সাত সতীনের সাত কৌটো
তার মাঝে আমার সোনার কৌটো
সোনার কৌটো নাড়িচারি
সাত সতীনকে পুড়িয়ে মারি।
কই কিছুই তো ফলল না। সকলে বলছে তেনার আবার বিয়ে হয়েছে, আন্নাকে শ্বশুর বাড়ি ত্যাগ দিয়েছে। আন্নার সতীন এসেছে সে ঘরে। এত নিষ্ঠা সহকারে সেঁজুতি ব্রত করবার পরও সতীন এসেছে। এটা কেমন করে সম্ভব। আন্না এই কথাটা ভেবে ভেবে থই পায় না। গোয়ালাদের মেয়ে ফুটফুটি দিদি বাচ্চা হতে বাপের বাড়ি এসেছে। তার শ্বশুরবাড়ি আর আন্নার শ্বশুরবাড়ির গ্রাম একই। সেই প্রথম এমন ভয়ংকর সংবাদটা বয়ে এনেছিল। তবে তার কাছে এটা কোন সাংঘাতিক খবর না। কারণ সে নিজেই দ্বিতীয় পক্ষ। আন্নার মা বৈঁচি যখন খবরটা শুনে কেঁদে কঁকিয়ে হিক্কা তুলে মুর্ছা যাওয়ার অবস্থা তখন ফুটফুটিই ভারী পেটটা নিয়ে জাবর কেটে বসতে বসতে বলে, ‘ও বামুন খুঁড়ি, তুমি এমন হেদিয়ে মরছ কেন গা? সতীন থাকলো তো কি হল! বাড়ি ভর্তী শউর, সাউরি, খুঁড়ি, খুঁড়ো, একপাল ভাসুর, ননদ, জা, বিধবা আত্মীয় সকলের সঙ্গে ঘর করতে পারলে একটা সতীন কি খুব বেশি হবে?’
এ জিজ্ঞাসার উত্তর হয় না। এ খুব সাধারণ জিজ্ঞাসা। তবু উত্তরটা খুব গোলমেলে কিংবা জলের মত তরল। বৈঁচি তাই নীরবই ছিল।
সতীন বিষয়টা কী খুব বেশি না বুঝলেও আন্নার শুধু একটা কথাই সমস্ত রাত ধরে মনে হয়েছে তার সেঁজুতি ব্রত বিফলে গেছে। বৈঁচি আন্নাকে বুকে জড়িয়ে সারারাত কেঁদেছে আর নিজের স্বামী আর মন্দ ভাগ্যকে দোষারোপ করেছে। ভোররাতে যখন মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বৈঁচির দুচোখের পাতা জুড়ে ঘুম নেমে আসে তখনও আন্নার দুচোখের পাতা এক হয় না। সে শুধু শেখর নামে স্বামীটার বকসাদা অবয়বটুকুই ভাববার চেষ্টা করে গেছে।
এমন সময় ধব করে উঠোনের মাঝে আওয়াজ হতে শক্ত হয়ে শোয় আন্না। বাইরে তখন পাখিরা যে যার কোটর থেকে বেড়িয়ে গেছে খাদ্যের খোঁজে। গ্রাম দেশে বাড়ির মেয়েমানুষ তো বটেই, পুরুষ মানুষদেরও বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকার রেওয়াজ নেই। কিন্তু এ পরিবারের ক্ষেত্রে এ নিয়ম আজ খাটে না। এ যেন মহা শোকের বাড়ি। তাই নারকেল কাঠির ঝ্যাঁটা দিয়ে উঠোন এখনও পর্যন্ত খসখস আওয়াজ তুলে বাগদী বৌয়ের ঝাঁট দেওয়ার শব্দ নেই। ঝাঁটা দিতে দিতে রাজ্যের খবর শোনানোর বাচালতা নেই। বৈঁচির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে গোবরজল ছেটানোর শব্দ নেই। আর নেই আন্না আর বিজয়ের বাসি কাপড় ছেড়ে পূবমুখো হয়ে হাতজোড় করে প্রভাত বন্দনার গান।
আন্না বিছানায় শক্ত হয়ে শুয়ে বোঝবার চেষ্টা করে শব্দটা কিসের হল। তারপর হঠাৎ করে পুরুষকণ্ঠে একটা গোঁগোঁ শব্দ শুনে বিছানায় শক্ত হয়ে বসে আন্না। চুপিচুপি মায়ের পাশ থেকে উঠে আসে। বারান্দায় নেমে দেখে আন্নাদের উঠোনে অনেক পুরনো খুদে জামগাছটার নীচে একটা মানুষ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। প্রথমটা তড়তড় করে নেমে আসে আন্না। তারপর স্বাভাবিক সংস্কারে একটু সময় দাঁড়িয়ে যায়। কেননা একটা অচেনা পুরুষমানুষ সে মৃতই হোক আর জ্যান্তই হোক তার সামনে সেয়ানা মেয়ে সরাসরি গিয়ে হাজির হবে এ গ্রাম্য রীতিতে নেই। তবে বিজয় ব্যানার্জ্জীর মেয়ে হবার জন্য এ সব কিছুর উর্দ্ধে আন্নার জীবন। আন্না সাহস ভরে একটু দূর থেকেই ডাক দেয়, ‘কে গা তুমি? এমন ভিজে সপসপে হয়ে কোত্থেকে এলে?’
কিন্তু সাড়া নেই। আন্না তখন আর একটু কাছে গিয়ে মুখখানা দেখার চেষ্টা করে। জলে ভেজা সাদা কাগজের মতো ফ্যাঁকাসে মুখখানা তাতে টিকালো নাক, পাকা কুঁচ ফলের মতো লাল টুকটুকে ঠোঁট জোড়ায় ঝাপসা কুয়াশার ওপারে মনের ভাবনাটাকে উলটোবাগে ঠেলে দিয়ে কাকে যেন মনে পড়িয়ে দেয় আন্নাকে। তারপরেই মনে হয় না না সেটা কি করে সম্ভব।
বাগদী বউ কি যেন গজগজ করতে করতে এ বাড়ির উঠোন পর্যন্ত এসে ‘মাগো ওটা কে? ও আন্না দিদি তুমি ও কার মুখ পানে ঝুঁকে পড়ে চেয়ে আছো?’ বলে চিল্লামিল্লি শুরু করে দেয়। আন্নারও তো একই প্রশ্ন। কে এই মানুষটা? এই ভোরে স্নান করে তাদের বাড়ির উঠোনে পড়েই বা রয়েছে কেন? বাগদী বউ আর সময় নষ্ট করে না। ‘ও মাগো কে কোথায় আছো গো, কি সব্বনাসে কাণ্ড ঘটে গেছে গো – একটা মানুষ পড়ে আছে এখানে। ওটা মরা না জ্যান্ত কে জানে!’ বলে হাউমাউ করে চিল চীৎকার জুড়ে দেয়।

বিজয় সমস্ত রাত রাধামাধবের নাটমন্দিরে বসে একটা কথাই ভেবেছে – ঠাকুর আমি তো তোমাকে কোনদিন সেভাবে ডাকিনী, কিছু বলিও নি। কিন্তু আজ বলছি, আমার আন্নার কপালে তুমি এ কি বিধান লিখেছিলে? ব্রাহ্মণের ছেলে হয়ে আমি তোমাকে সেভাবে ডাকিনী বলেই কি আজ আমায় এই শাস্তি দিলে ঠাকুর? কিন্তু আন্না, সে তো তোমার কাছে কোন অপরাধ করে নি, সে তো তার মায়ের সঙ্গে কতরকম উপোষ, কাপাস, ব্রত উদযাপন করেছে। তাহলে তার কপালে এত দুর্গতি কেন?
বিজয়ের যখন বুকের ভিতরখানা হুহু করে শুধু কান্নাই পাচ্ছে, খানখান হয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে সমস্ত প্রতিরোধ সে সময়ে একটা বাচ্চা ছেলে এসে বলে, ‘ও খুঁড়ো তোমাদের উঠোনে কে যেন একটা এসে চান করে ঘুমোচ্ছে। তাড়াতাড়ি চলো’।
বাচ্চা ছেলেটার কথা প্রথমে বিজয়ের কানেই যায় না। ছেলেটা তাড়া লাগায়, ‘ও খুঁড়ো চলো গো, থে হয়ে রইলে কেন?’
বিজয়ের তখন সম্বিত ফেরে। ধড়মড় করে ঘুম থেকে ওঠার মতো করে বলে, ‘কেন কি হয়েছে রে?’ তারপর ‘আচ্ছা চল’ বলে হাঁটতে শুরু করে।

বিজয়ের উঠোন জুড়ে তখন প্রায় যেন চালতের মেলা বসে গেছে। বৈঁচি উন্মাদিনীর মতো লুটোতে লুটোতে এসে বলে, ‘ওগো আমাদের জামাই, আন্নার স্বামী। শেখর বাবাজী’।
বিজয় যা শোনে তা বিশ্বাস হয় না। তারপর ভিড়ের জল ঠেলে যখন সামনে এসে দাঁড়ায় তখন সত্যি সত্যি নিজের চোখ কান কোনওটাকেই বিশ্বাস হয় না। আন্না সামনে এসে দাঁড়ালে, ‘বাবা’ বলে ডাক দিলে বিজয়ের সমস্ত অস্তিত্ব তোলপাড় করে ওঠে। শেখর – হ্যাঁ শেখরই তো বটে। নতুন কুচানো ধুতি, পাঞ্জাবী, ভিজে সপসপে হয়ে কাদামাটি মেখে বড় দৈন্য হয়ে রয়েছে। হাতে লাল সুতো বাঁধা। কাল তো বিবাহ ছিল শেখরের। সে বিয়ে কি তবে শেষ পর্যন্ত হয় নি! ক্ষীণ আশা যেন দেখতে পায় বিজয়। কিন্তু এভাবে এখানে মানুষটা এলো কীভাবে।
প্রতিবেশী মুকুল হালদার বিজয়ের কানে কানে ফিসফিস করে বলে, ‘বিজয় কিসে থেকে কি হয়েছে সে সব পরেও বিবেচনা করা যাবে। এখন ওকে ঘরে নিয়ে গিয়ে সাফসুতরো করে আগে কবিরাজকে খবর দাও’।
সকলে শেখরকে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে এসে শুইয়ে দেয়। আন্না তখন উঠোনে দাঁড়িয়ে শেখর যেখানে পড়েছিল সেখানে বসে শুধু একটা কথাই ভাবছে – এ কেমন হল। মানুষটার তো কাল কার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। সে হিসেব করলে এখন তো নতুন বউ নিয়ে তার ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমন ব্যাপার হল যে এই সাতসকালে মানুষটা আন্নাদের দাওয়ায় এসে একেবারে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকবে। আন্নার যেন সব গোলমাল ঠেকে। তার ছোট মাথাটাতে আর কিছু কাজ করে না। তবে একটা কথা ভেবে মনটা পুলকে ভরে ওঠে, নারী হৃদয় কুসুমিত হয়। মানুষটা যেভাবেই আসুক আর যে করেই, তার কাছে ফিরে এসেছে। শেখর তার স্বামী। স্বামী বিষয়টা বড়ো আপন, নিজের, একান্ত নিজের। কে যেন ঘরের ভিতর থেকে ডাক দেয়, ‘আন্না’।
ঘোর কেটে যায় আন্নার। ছুটে ঘরের ভিতরে আসে। বৈঁচি এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে। জামাই তার এমন সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটিয়ে শুধু আন্নার টানেই এতটা চলে এসেছে। বৈঁচির হৃদয়েও আনন্দ বাতাস বইতে থাকে। বিজয় কবিরাজ আনতে ছুটেছে। বৈঁচি মেয়েকে ডাক দেয়, ‘অত দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন, এদিকে আয়। আমি শাশুড়ি মানুষ ওকে ছুঁতে পারি? দে দেখি তোর বাবার ফতুয়াখানা ওকে পরিয়ে’।
আন্নার লজ্জায় কান মাথা ঝাঁঝাঁ করে। এত লোকের সামনে বলছে কি মা। কিন্তু বৈঁচি আজ বেপরোয়া, কোনও ভয় নেই তার। ভগবান যে কোনও সুযোগ বারবার দেন না। ভাঙাকপালি মেয়ের কাছে আকাশের চাঁদ নিজে এসে ধরা দিয়েছে। কোনও হেলাফেলায় সে সুযোগ নষ্ট করা যাবে না। বিজয়ের সঙ্গে সংসার করতে করতে তার অন্তত এই অভিজ্ঞতাটুকু হয়েছে যে লোকের কথা সবসময় না শুনলেও চলবে। বৈঁচি আন্নাকে এবারে বেশ কঠোরভাবেই নির্দেশ দিল, ‘কিরে হা করে দাঁড়িয়ে আছিস যে বড়, দেখছিস ছেলেটা সংজ্ঞাহীন। তারমধ্যে জলকাদায় একাকার হয়ে আছে’।
বৈঁচির কথার ঢঙে ঘরের ভিতরকার ভিড়টা হাল্কা হয়ে আসে। তবু বলা মুখ এমন সময়েও বলে যায়, ‘মাগো ছি ছি কি বেহায়া। সক্কলের সামনে মেয়ে রেখে দোর দিয়ে দেলে। এ কেমন শাউরী, জন্মের শোধ বাপু ...’।

স্বামী কেমন আগে কখনও টের পায় নি আন্না। পাওয়ার সুযোগও হয় নি। আজ যখন বদ্ধ ঘরে অচেতন স্বামীর ভিজে জামাকাপড় পালটে দেওয়ার মতো গুরুদায়িত্ব ঘাড়ে এসে পড়ল তখন মনের ভিতর রাজ্যের সঙ্কোচ আর দ্বিধা এসে জড়ো হল। প্রথমটা কিছুতেই যেন সরো হতে পারছিল না আন্না। তারপর অত্যন্ত কুণ্ঠাভরে মানুষটার গায়ে হাত রাখতেই ছ্যাৎ করে ওঠে হাত। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। আন্নার মনে হয় সে যেন গরম কড়াইতে ছেঁকা খেয়েছে। চমকে ওঠে আন্না। বার বছরের আন্না জননী স্বরূপিনী হয়ে ওঠে। পরম যত্নে শেখরের পোশাক বদলে গা মুছে দেয়। মাথাভর্তি মসৃণ নরম চুলগুলোয় হাত বুলিয়ে দিতে গেলে শেখর যেন অস্ফুটে কি বলে ওঠে, বোঝা যায় না। আন্না ভাবে জল চাইছে বোধহয়। দেরাজের উপর বসানো ঘটিটা থেকে জল গালে ঢেলে দিতে গেলে সে সময় মানুষটা গুঙিয়ে উঠে আবার যেন কি বলে। আন্না মুখ নিচু করে শোনবার চেষ্টা করে। শেখর বলে ওঠে, ‘আন্না’।
থরথর করে কেঁপে ওঠে আন্না। ভুল শুনল না তো সে। আর একবার মুখ নিচু করে শোনবার চেষ্টা করে। না ঠিকই শুনেছে। চোখ বন্ধ করে মানুষটা একনাগাড়ে করুণ, ক্ষীণ স্বরে বলে যাচ্ছে, ‘আন্না, আন্না, আন্না’।
না আর কোন ভুল নেই। মানুষটা তার কাছেই ফিরে এসেছে। আন্নার হৃদয়ে নারী হৃদয় কুসুমিত হয়। দুচোখ জলে উপচে ওঠে। পান পাতা ডৌলের গাল বেয়ে চিবুক হয়ে সে জল শেখরের বক্ষ স্পর্শ করে। মানুষটাকে নিয়ে অনেক কিছু করতে ইচ্ছা করে আন্নার। কিন্তু কি যে করবে সেটাই ঠিক করতে পারে না। তাই সে শেখরের বুকখানাতেই মুখ গুঁজে দেয়। মুখ গুঁজে দিয়ে পাগলের মতো ঘষতে থাকে। আর ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকে। কত না না বলা কথা সে অবিরাম বলে যেতে থাকে তার কোন ঠিক নেই – ‘ওগো চোখ মেলো তুমি। তাকিয়ে দেখ এই যে আমি আন্না, তোমার আন্না, তুমি ফিরে এসেছ আমার কাছে এ যে আমি ভাবতেই পারছি না’।
ওদিকে বন্ধ দরজার ওপারে ঘা পড়ে। বৈঁচির গলা, ‘আন্না, মা আমার দরজাটা খুলে দে। তোর বাবা কবিরাজ এনেছেন’।
আন্না যেন এতক্ষণ কোন ঘোরের ভিতর ছিল। সে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। একবার সংজ্ঞাহীন শেখরের মুখের দিকে তাকিয়ে ছুটে গিয়ে দরজার ছিটকিনি খুলে দেয়। বিজয় কবিরাজ নিয়ে ঘরে ঢোকে। বাইরের উৎসুক কৌতূহলী জনতাও হুরমুড়িয়ে ঘরে ঢুকতে চাইলে কট্টর আদেশ দেয় কবিরাজ, ‘দুজন ছাড়া এ ঘরে আর কারও থাকা চলবে না’।
বৈঁচি পা ঘষে ঘষে অনিচ্ছা সত্ত্বেও চৌকাঠে এক পা রেখে কবিরাজের দিকে মুখ ফিরিয়ে হাতজোড় করে বলে, ‘ও থাকুক কবরেজ মশাই’।
কবিরাজ চশমার কাঁচটা নাকের উপর একবার ঠেলে দিয়ে আন্নাকে নিরীক্ষণ করে বলে, ‘শুনলাম এ রুগী তোমাদের জামাতা। তা এটি মেয়ে বুঝি?’
কবিরাজ এ গাঁয়ের না। তাই বিজয়ের পরিবারকে ভাল করে চেনে না, জানে না।
বৈঁচি মাথা নাড়ে, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ’।
কবিরাজ আন্নাকে ভিতর থেকে দরজা দিয়ে দিতে বলে। বাইরে তখন কৌতূহলী জনতা পঞ্চ ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে ভিতরে কি হচ্ছে তা জানবার জন্য উদগ্রীব। কবিরাজ শেখরের গায়ে হাত রাখে। বলে, ‘এর গায়ে তো অসম্ভব তাপ। সংজ্ঞা নেই। আগে একে সজ্ঞানে আনা দরকার। এমন হাল হল কেমন করে। সেটি না জানলে চিকিৎসায় অসুবিধা হয়’।
বিজয়, বৈঁচি এমন কি আন্না পর্যন্ত মুখিয়ে আছে আসলে সেই কাকভোর থেকে সত্যি সত্যি কি ঘটেছে তা জানবার জন্য।
বিজয় বলে ওঠে, ‘সেই ভাল’।
আন্না তখন জোড়হাত করে গ্রামের ওলাইচণ্ডীতলায় মানত রাখে মানুষটার জ্ঞান ফিরলে সে সেখানে মিছরি বাতাসা ভোগ দেবে। এক মনে বিড়বিড় করে যায়, ঠাকুর ওকে ভাল করে দাও, ওকে ভাল করে দাও।
কবিরাজ মশাই নিজস্ব চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু করে। আন্নাকে বলে, ‘দোর খুলে দাও খুকী। মাকে ভিতরে আসতে বল’। তারপর কর্পূর আর কালজিরের পুটুলি বার করে শেখরের নাকের কাছে ধরে। বৈঁচিকে বলে শেখরের মাথায় হাওয়া দিতে। বিজয়ের মতো কঠিন মানুষও ইষ্টনাম জপ করতে থাকে। আর আন্না কাঠের পুতুলের মতো দেরাজের ডান দিকটা খামচে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পরে শেখর সামান্য চোখ খোলে। আন্না যেন এতক্ষণ দম আটকে নিজের সঙ্গে একটা কঠিন লড়াই করছিল। এবার সে হাঁফ ছাড়ে। বৈঁচি কবিরাজের উপস্থিতিতেই স্বামীর বাহু আঁকড়ে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, ‘ও গো ও চোখ মেলেছে’।
বিজয় চরম উৎকণ্ঠার ভেতর একটা ব্যাপারে ভয় পাচ্ছিল খুব, তা হল শেখর নিজের বাড়ি ছেড়ে, বিয়ের আসরে কি না কি ঘটিয়ে এখানে এসে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছে। তার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে তার পরিবারের কাছে কি কৈফিয়ত দেবে? এই একটা অজানা ভয়ে কাঁটা হয়ে ছিল এতক্ষণ। শেখর চোখ মেলতেই সে যেন স্বস্তির শ্বাস ফেলে। কবিরাজ গম্ভীরভাবে বলে, ‘বিকার অনেক গভীরে। আগে কি হয়েছিল তার খোঁজ নি’। তারপর মুখ নিচু করে শুধোয়, ‘কি হয়েছিল বাবা?’
শেখরের চোখে ঘোলাটে দৃষ্টি, মুখ পাংশুটে। বকসাদা গায়ের রঙ যেন আরও ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ঠোঁট নাড়ে শেখর, কি যেন বলবার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু বোঝা যায় না। শুধু দু’চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে।
বৈঁচি বলে ওঠে, ‘ওর বোধহয় খুব কষ্ট হচ্ছে’।
মাথা নাড়ে কবিরাজ মশাই, ‘তা তো হবেই বৌমা। কিন্তু আমার চিকিৎসা পদ্ধতি যে অন্যরকম। চিকিৎসা করতে গেলে প্রথমে জানতে হবে শরীরের রোগের সঙ্গে মনের রোগের সম্পর্কটা ঠিক কোথায়’।
বিজয় বিরক্ত হয়ে ওঠে, ‘আঃ তুমি চুপ করবে’।
কবিরাজ মশাই এবার একবাটি গরম দুধ চায়। বৈঁচি প্রথমে মেয়েকে, ‘যা তো মা রান্না ঘরে কাঠের উনুনে একটা কাঠ গুঁজে দিয়ে এক বাটি দুধ গরম করে নিয়ে আয় তো’ বলেই বলে ‘আচ্ছা তোকে যেতে হবে না আমি যাচ্ছি’।
ছিটকিনি খুলে বাইরে আসে বৈঁচি। সমস্ত গ্রামের মানুষ যেন তাকে মাছির মত ছেঁকে ধরে কি হয়েছে জানবার জন্য। ভিড় ঠেলে বৈঁচি রান্না ঘরের দিকে এগোতে এগোতে বলে, ‘বাবাজীর জ্ঞান ফিরেছে, আপনারা আর দুশ্চিন্তা না করে ঘরে যান, কবিরাজ মশাই গরম দুধ চেয়েছেন’।
গ্রামের মানুষ এমন কথায় সন্তুষ্ট হয় না। তারা একে অপরকে ঠোনা দেয়, ‘বাবা ঢঙ্গের ঠেলায় মরে যাই। জন্মের শোধ এমন সৃষ্টিছাড়া কান্ড তো আগে কখনো ঘটেছে বা শুনেছে বলে শুনিনি।‘ কেউ আবার বলে, ‘জামাই বাবাজী তো আবার বে করেছে বলে শুনেছি তা তার কি হল’। কেউ আবার ফিসফিস করে বলে, ‘বাণ মারল না তো! কি যা ছাতা রকমসকম বুঝি না কিছু’।
মন ভার হয় বৈঁচির। আজ সে কারও কোনো কথাতেই আমল দেবে না, এই তার পণ। বাবা বুড়ো শিব তার কথা রেখেছে। তাই বৈঁচি মাথা ঠাণ্ডা রেখে রান্না ঘরের কাঠের উনুনটায় কাঠ গুঁজে দিয়ে বাটীতে দুধ গরম করে নিয়ে আসে।
সেই পণ তাকে রাখতে হবে। কবিরাজের নিজস্ব হামানদিস্তায় কি সব জিনিস তখন থেঁতো করে পথ্য তৈরি হচ্ছে। কবিরাজ বলল, ‘দাও বৌমা, দুধটা এই পাত্রের মধ্যে ঢেলে দাও’।
বৈঁচি তাই করে। কবিরাজ পাথরের চামচ করে সেই দুধ একটু একটু গালে দেয় শেখরের। প্রায় বিশ পঁচিশ বার দেওয়ার পর শেখর চোখ মেলে চায়। কবিরাজের মুখে হাসি ফোটে। হাসি ফোটে আর সকলের মুখে। কবিরাজ মৃদুস্বরে বলে, ‘বাবা এবার বলতে পারবে, কি হয়েছিল তোমার? কেন তুমি এখানে?’
শেখর যেন ঘোর লাগা চোখে চারপাশ চেয়ে বুঝে নিতে চায় কোথায় আছে সে। তারপর আস্তে আস্তে বলে, ‘ও বিয়েতে আমার মত ছিল না’।
বিজয় ঝুঁকে পড়ে, ‘তবে বিয়ে কি তোমার হয় নি বাবা?’
শুয়ে শুয়েই ঘাড় নাড়ে শেখর, ‘হ্যাঁ হয়েছে। আমি ভোররাতে পালিয়ে এসেছি’।
বৈঁচি বলে ওঠে, ‘এত সকালে নদী পার হলে কি করে?’
‘সাঁতরে’।
ঘরটায় মুহূর্তের মধ্যে মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা নেমে আসে। এমনকি কবিরাজের হামানদিস্তার ঘটঘট শব্দও থেমে যায়। সামান্য সময় পরে উউ করে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ আছড়ে পড়ে ঘরের ভেতর। আন্না কাঁদছে। বড় দুঃখে কাঁদছে আন্না। বড় সুখে কাঁদছে আন্না। বৈঁচি উঠে মেয়ের হাত ধরে নিয়ে এসে খাটে শেখরের পাশে বসিয়ে দেয়।
বিজয় যেন শূন্যে চোখ মেলে। কণ্ঠস্বর বড় কঠিন – ‘তাহলে তার কি হল শেখর? যাকে তুমি গতকাল অগ্নিস্বাক্ষী করে বিয়ে করলে!’
বৈঁচি তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে, ‘বাবাজী এই দেখ চোখ মেলো। চেয়ে দেখো। এই যে তোমার আন্না’।
কবিরাজ মশাই কলাপাতার মোড়কে মোড়কে বেশকিছু জড়িবুটির ওষুধ পুরিয়া করে বৈঁচির হাতে দেয়। বলে, ‘ওষুধগুলোর নিয়ম বুঝে নাও বৌমা’। তারপর আন্নার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুমিও বুঝে নাও মা। তবে কি জানো, ওকে ভালো করে তোলবার জন্য তোমার ভালোবাসা, সেবাযত্নই বেশী দরকার’।








হাবিকে নিয়ে কালু বাউড়ির দল যেন শূন্যে ধুলো উড়িয়ে ছুটতে ছুটতে চলেছে। পালকিতে হাবি এই প্রথম উঠেছে। কিন্তু দরজাটা একটু খুলে সে গাছগাছালি, পাখপাখালির দৃশ্য দেখবে তার উপায় নেই। কেননা পাল্কিটা এত জোরে দুলছে যে হাবি ভেতরে বসে থাকা নাড়ুর মতো এপাশ ওপাশ হচ্ছে। বাবা তার পিছুপিছু ছুটতে ছুটতে আসছিল। এ দৃশ্য সে দেখেছে। আর তাই বাবার জন্য বুকের ভিতরটা টনটন করে ওঠে। বাবা অমন করে ছুটছিল কেন? ভাই দুটোর কথাও খুব মনে হয়। কমলাকেও মনে পড়ে। মনে হয় না কেবল গতকাল রাতে অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করা ইহকাল পরকাল শেখর নামের মানুষটাকে। কেনই বা পড়বে? সে তো কোনদিন হাবির কেউ ছিল না। পাল্কিটার ভিতর লটরপটর খেতে খেতে যখন হাবির পাল্কি শ্বশুরবাড়ির ভদ্রাসনের সামনে দাঁড়ালো তখন দুপুর গড়িয়ে বারবেলা ছুঁই ছুঁই। মাথার উপর সূর্যের প্রকাণ্ড থালাটা তামার পাত হয়ে ক্রমশ যেন নীচের দিকে নেমে আসতে চাইছে। হাবির তখন তেষ্টা পেয়েছে খুব। একটা গোলাপখাস আমগাছের নীচে পাল্কিটা রাখা হলে হাবির মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। চোখেমুখে আঁধার নেমে আসে। কালু বাউড়ি তার দলকে ডেকে বলে – আজ বিকালেই আমরা এখান থেকে চলে যাব। এখানে এমন সব ঘটনা ঘটছে যে আর কোনও ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকতে এখানে ভালোলাগছে না।
বাকি বেয়াড়ারাও সায় দেয় – সেই ভালো এখানে এমন সব ঘটনা ঘটছে তার আর সাক্ষী হতে কারোরই ভালোলাগছে না।
হাবির পাল্কির পেছন পেছন রামতনু বাড়ির পাল্কিতে এসেছেন। তার পেছনে গঙ্গা গরুর গাড়িতে চড়ে আসছে। রামতনু মাটিতে পা দিয়েই প্রায় ছুটে বাড়ির ভেতরে শেখরের মা শশিকলার কাছে যায়। শশী তখন বরণকুলোয় তিল আর ধানগুলোকে একটু তফাতে সরিয়ে রাখছিল যাতে একসঙ্গে মিশে না যায়। এমন সময় হুড়মুড় করে রামতনুর উপস্থিতি। শশী স্বামীকে দেখে একগাল হাসে। হাসলে শশীকে আজও অতি অসাধারণ লাগে। রসিকতা করে – কি গো বেয়াই মশাইয়ের দ্বিতীয় পক্ষ ছাড়ছিল না, না আমার বৌমা কেঁদেকেটে সারা হচ্ছিল, কোনটা?
রামতনু আর্তনাদের মতো করে বলে ওঠে – শেখর আজ কাকভোরে পালিয়েছে শেখরের মা।
শশী যেন প্রথমটা বুঝতেই পারে না রামতনু ঠিক কি বলছে। তাই আপনমনে মঙ্গলপ্রদীপের সলতেটাকে উস্কে দিতে দিতে বলে – আমার যে আজ কি আনন্দ হচ্ছে। এ পরিবারে আমি এসেছিলাম গৌরীদান হিসাবে আর এই নতুন বৌ এল ...........................।
রামতনু তখন প্রাণপণ চীৎকার করে বলে – শেখর আজ ভোরে ও বাড়ি থেকে পালিয়েছে।
শশীর যেন চেতনা ফেরে – পালিয়েছে? কোথায় পালিয়েছে? নতুন বিয়ের বর কোথায় পালাবে? আমার সঙ্গে রসিকতা করছো কেন? সরো দেখি বৌ বরণ করে ঘরে আনি।
ততক্ষণে গৌরীও ছেলে কোলে সামনে এসে দাঁড়িয়ে ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছে – হ্যাঁগো খুড়ি মা। ওর গরুর গাড়ি এসে পৌঁছল, বললে – তোমার ভাই নতুন বৌ ফেলে পালিয়েছে। সে গ্রামে নাকি ঢিঢি পড়ে গেছে। আর ...... বলে থেমে যায় গৌরী। রামতনুর মুখের দিকে তাকায়।
রামতনু ঋজু ভঙ্গীতে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। সমস্ত মুখের মাংসপেশিগুলো তখন শক্ত হয়ে আছে। বলে – আর বলে থামলি কেন বল – আমিও ঐ অকালকুষ্মাণ্ড ছেলেকে ত্যাজ্য ঘোষণা করে এসেছি।
শশীর যেন কম্প দিয়ে জ্বর এসেছে তেমনভাবেই কাঁপতে থাকে সে। কাঁপতে কাঁপতে হাতের বরণ কুলোয় এতক্ষণের ধৈর্য্য ধরে যে তিল আর ধান আলাদা করে বেছে রেখেছিল সব আবার মিলেমিশে এক হয়ে যায়। দুয়োরের খুঁটি ধরে ধপ করে বসে পড়ে সে। বুকের ভিতর কান্নাটা যেন ন্যাকড়ার দলা পাকিয়ে গেছে।
এ বাড়িতেও আত্মীয়সজন প্রতিবেশীরা বেবাক ভিড় জমিয়ে বেবাক থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে অথবা কেউ কেউ হুসহাস শব্দ তুলে আফসোস করছে। রামতনুর গলা ধরে এসে বিকৃত হয়ে ওঠে – আমি তখনই পইপই করে বলেছিলাম ছেলের বিয়ে অমন দুম করে ওকে না জানিয়ে দিতে যেও না। এখনকার ছেলে, তারও একটা মতামত আছে। এখন নাও ঠেলা সামলাও। তুমি চিরকাল অবুঝ শেখরের মা।
রামতনুর শেষের কথাটায় শশী যেন দপ করে জ্বলে ওঠে – কি বললে, কি বললে তুমি? আমি কার মা, আমি আর কারও মা নই গো। জন্মের শোধ তাকে আমরা বিসর্জন দিয়েছি। আমি আর কারুর মা নই।
গঙ্গা বারান্দায় এসে শাশুড়িমাকে উদ্দেশ্য করে বলে – এবারে তো তাকে ঘরে না আনলে আর নয়। পাল্কিতে বসে বসে ঢুলতে ঢুলতে বেচারি বোধহয় ঘুমিয়েই পড়েছে। গতকাল থেকে তার উপর দিয়ে তো কম ঝড় যায় নি।
শশী কিছু বুঝতে পারে না। স্বামীর মুখের দিকে তাকায়। রামতনু গম্ভীরভাবে বলে – মহিমবাবুর মেয়ে, আমাদের বৌমা, তাকে আমি নিয়ে এসেছি। ছেলের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবো। এ বাড়িতে তাকে আমি প্রতিষ্ঠা করবো। মাতৃহীনা শিশুটিকে সবকিছু দিয়ে ভরিয়ে তুলবো আমি।
শশী কয়েক ঝলক সকলের মুখের দিকে তাকায়। তারপর খুশীতে ঝলমলিয়ে ওঠে – ওমা, তোমরা তাকে নিয়ে এসেছো? কোথায় সে, এতক্ষণ বলনি কেন?
গঙ্গা নিজের মনেই বিড়বিড় করে – পাগল হয়ে গেল নাকি।
শশী বরণকুলো রেখেই প্রায় ছুটে সদরে আসে। নিজেই পাল্কির দরজা খুলে দেয়।
গৌরী চেঁচাতে চেঁচাতে ছোটে – খুড়ি বরণকুলো যে পড়ে রইলো।
শশী বলে – থাকুক। নিজের সন্তানকে ঘরে তুলবো তাতে বরণকুলো লাগবে না।
রামতনুরও মাথায় ঢোকে না শশী ঠিক কি করতে চাইছে। পাল্কির দরজা সরিয়ে শশী দেখে লতিয়ে পড়া লাল চেলিতে একটা পুতুল চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে। গায়ে হাত দিতেই ধড়ফড় করে জেগে ওঠে। ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। শশীর তখন বুকের ভিতর তোলপাড় করা মাতৃত্ব মোচড় দিচ্ছে। দুচোখ দিয়ে তা ফোঁটা ফোঁটা হয়ে নেমে আসছে। হাবি সেদিকে তাকিয়ে বলে – তুমি কাঁদছ কেন?
এত যন্ত্রণাতেও শশীর মুখে সুতোর মতো হাসির রেখা দেখা দেয় – ঠিক আছে আর কাঁদবো না। তুই যখন এসে গেছিস আর কাঁদবো না। আমি তোর কে হই বলতো?
হাবি শুধোয় – কে?
- মা, নিজের মা। হ্যাঁরে পাগলী নিজের মা।
- তাহলে আমি রাতের বেলা বিছানায় পেচ্ছাব করলে ঠ্যাঙা দিয়ে পিটাবে নাতো?
শশী শোক ভুলতে থাকে – না।
- মাছ মণ্ডা খেতে দেবে?
– হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ - বলে শশী আর সময় নেয় না। দুহাত বাড়িয়ে পাল্কির ভেতর থেকে লাল চেলীতে জড়ানো পুতুলটাকে বার করে কোলে তুলে নেয়।
পাখির থেকেও হালকা শরীরের একরত্তি হাবির যে কি মজাটাই লাগে। জ্ঞানে সে এই প্রথম কারও কোলে চাপলো। মা যখন ভাইদুটোকে কোলে নিত লোভ হত। কোনও মানুষের পেট পর্যন্ত উঠে একটু উঁচু থেকে গাছপালা, আকাশ, ভূমি দেখা যে এত মজার তা আগে হাবি জানতোই না। হাবি শাশুড়ির গলা জড়িয়ে পুটুর পুটুর করে বলে – ভাগ্যিস বে টা হল। নইলে নিজের মাকে তো কোনদিন পেতামই না।
শশী কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। তার তখন বুক ভেঙে শুধু কান্নাই আসছে। এই বাঁধভাঙা কান্নাকে আগল দেওয়া খুব কঠিন। হাবি হঠাৎ তার ছোট ছোট হাতদুটো দিয়ে শশীর চোখের জল মুছিয়ে দেয় – কাঁদছো কেন মা? কেঁদো না। আমিতো আছি।
শশী বুকের ভিতর হাবিকে জোরে চেপে ধরে।
গৌরী শুধু একবার মিনমিন করে বলে – শত হলেও এ বাড়ির বৌ হয়ে এল, নিয়ম-আচার কিচ্ছুটি হবে না?
শশী কোন কথা না বলে চুপচাপ হাবিকে বুকে জড়িয়ে ঘরে ঢুকে আসে। গঙ্গা তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেন কোনও সঙ-এর পালা দেখছিল, এমনটাই মনে হল তার। এদের রকমসকম বোঝা ভার। শেখরপর্বে যবনিকা পড়ে যাচ্ছে দেখে গঙ্গার মনের ভিতর অদ্ভুত পুলক জেগেছিল। এই যে রামতনুর বিশাল জমিজমা তার দাবিদার সে ছাড়া আর কে হবে। এমন সময় ঐ পুঁচকে মেয়েটা কোত্থেকে উদয় হল, যে শাউড়ি ঠাকরুন তাকে কোলে তুলে নাচতে নাচতে ঘরে ঢুকে গেল। যত্তসব। তার সব রাগ গিয়ে পড়লো গৌরীর উপর। স্ত্রীর দিকে ফিরে দাঁত কিড়মিড় করে বলে – আমারও তো কম নাচনকোঁদন গেল না, তা এবার একটু নাওয়া-খাওয়ার ব্যবস্থা কর, নাকি রামযাত্রা এখনও দেখে যেতে হবে।
গৌরী ছেলে কোলেই তেল গামছা এনে দিয়ে হেঁশেলে যায়। এ বাড়িতে বিধবা মেয়েমানুষ নেই বলে হেঁশেল একটাই। নিরামিষ হেঁশেল একটা আছে। তা সে অবরে সবরে প্রয়োজন মত ব্যবহার হয়। ঢেঁকীশালের পাশে গোবর নিকানো। সেখানেই আজ আঁচ পড়েছে প্রথমে। আঁশ হেঁশেলে তখন একটা পাঁচ কেজি ওজনের কাতলা মাছের খামি করা চলছে। গৌরীরও হঠাৎ করে মনে হয় – এসবের আর কি কোনও প্রয়োজন আছে। বিয়ে তো খেলাঘরে পরিণত হয়েছে। সেই সঙ্গে একটা কথা ভীষণভাবে মনে হয় – খুঁড়োমশাই ঐ মেয়েকে ঘরে তুলে আনলো কেন? কিছু সম্পত্তি লিখে দিয়ে ঝামেলা মিটিয়ে দিলেই তো পারতো। তা না করে পৈতে ধরে নিজের ছেলেকে ত্যাজ্য ঘোষণা করে কোথাকার কোন পুঁচকে মেয়ের জন্য এদের দরদের শেষ নেই। মানবচরিত্র মানব শরীরের মতই অতি জটিল ও অতি বিচিত্র। সেটাই আর একবার প্রমাণ করলো। গৌরীর দুই ভ্রূর মাঝখানে ভাঁজ পড়ে। সেও তো ছোট ছিল। পিতৃমাতৃহীন। খুঁড়ো খুঁড়ি তাকে দেখেশুনেই সতীনের ঘরে বিয়ে দিল। গঙ্গা বয়সেও তার দ্বিগুণ। কৈ তার জন্য ওদের মনে এমন আবেগ তো দেখেনি। ছোটবেলায় তাকে আদরযত্নে মানুষ করেছে এটা সত্যি। এখনও ভালো জিনিসটা আগে গৌরীর পাতে দেয় এটাও সত্যি। এই হতচ্ছাড়া বিয়েটা উপলক্ষ্যে তাকে একজোড়া বাজুবন্ধ, গঙ্গাকে একছড়া হার আর গৌরীর ছেলেকে রুপোর থালা গেলাস বাটি, গৌরীর শ্বশুরবাড়ির গুষ্টিসুদ্ধু সকলকে নতুন জামাকাপড় দিয়েছে এটাও সত্যি, কিন্তু তার মধ্যেও একটা সাংঘাতিক ধরনের মিথ্যে গোঁজ হয়ে থেকে যাচ্ছে তা হল এই হাবির প্রতি স্নেহ।
নিরামিষ হেঁশেল থেকে গঙ্গার জন্য কুমড়োর ছক্কা, ছোলার ডাল আর আমসত্ত্বের চাটনি, গোটা কুড়ি লুচি প্রকাণ্ড একটা কাঁসার থালায় সাজিয়ে নিয়ে আসতে গিয়ে খুঁড়ির মুখোমুখি হয় গৌরী। দেখে শশীর চোখ দুটো জবাফুলের মতো লাল। তবু গৌরীকে দেখে হেসে কথা কয় – ও গৌরী জামাইয়ের জন্য ওসব খাবার নিয়ে যাচ্ছিস? ওগুলো দিয়ে হাবির জন্য খানকতক লুচি আর একটু তরকারি আনিস তো। আর খানদুই মণ্ডাও আনিস। লুচি খাবে শুনে সে কি আনন্দ!
গৌরীর যেন ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙে। সে যা সচরাচর করে না তাই করে বসলো – তা তোমার এই বৌয়েরতো বেশ নোলা।
পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়ে শশী – ছিঃ ছিঃ গৌরী ওভাবে বলে না। ও খুব ছোট।
গৌরী আজ মুখরা। সেও তাই নোলক নাড়িয়ে বলে ওঠে – আমার যখন বে হল খুঁড়ি আমি তোমার ঐ হাবির চেয়ে কত বড় ছিলাম খুঁড়ি মা। তবু তো সতীনের ঘর। খিদেতে পেটে ভিজে গামছা বেঁধে পড়ে থেকেছি। তবু কেউ কিচ্ছুটি জানতে পারে নি। একবার ফেনি বাতাসা খিদের জ্বালায় চুরি করেছিলাম বলে শাশুড়ি চেলাকাঠ দিয়ে কি মারটাই না মেরেছিল। আর তোমাদের জন্যই ঐ ধুমসো মানুষটার ছোট কচি শরীরটাকে নিয়ে যে অত্যাচার চলতো রাতের পর রাত তার সামান্যতম কিছুই তুমি জানো না। আসলে কি জান খুঁড়িমা ঐ মেয়েটারও নিজের মা ছিল না বলে সতীন থাকা অবস্থায় মেয়ে দিল তেনারা, আমারও তাই। আমার যদি আজ নিজের মা থাকতো কখনই অমন বিয়ে দিত না।
শেষের দিকে গৌরীর কথাগুলো অসহায় জন্তুর আর্তনাদের মতো শোনায়। শশীর যেন চোখের সামনে মস্ত একটা কালো পর্দা ছিঁড়েখুঁড়ে যায়। হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করতে যায় – গৌরী আমি যে তোকে আর শেখরকে কোনদিন ভিন্ন চোখে দেখিনি ...............।
গৌরী শশীর হাত সরিয়ে দিয়ে ততক্ষণে চলে গেছে। শশী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপনমনে বিড়বিড় করে – সবকিছুর জন্য আমি আমি দায়ী। আমাকে এই সাংঘাতিক পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবেই।
শশীর আত্মবিশ্বাসে ঘুণ ধরে। ঝিঁঝিঁর কনসার্নের মতো একটা যন্ত্রণা। কিন্তু বুকের ঠিক কোন জায়গাটায় বয়ে চলেছে বুঝতে পারে না শশী। শেখর তার একমাত্র সন্তান। সেই সন্তান কত অবলীলায় তাকে ছেড়ে চলে গেছে। গৌরীকে সে পেটের মেয়ে ভিন্ন অন্যকিছু কোনদিন ভাবে নি। সেই গৌরী আজ কত সহজে বলে দিল - তুমি আমার ‘মা’তো নও, খুঁড়িমা।
আকাশের দিকে তাকায় শশী। এতখানি বয়স হয়েছে অথচ আকাশ দেখবার কথা কোনদিনতো মনে হয় নি। আজ তাকিয়ে মনে হয় সত্যি কি ঐ নীল সাদা ধোঁয়া ধোঁয়া জায়গাগুলোতে স্বর্গ আছে। দেবদেবীরা থাকেন সেখানে? নাকি সবটাই শূন্য। ঠিক শশীর মনের ভিতরটার মতো।
নিজেকে সামলায় শশী। সাবুর মা এসে বলে – ও মা তোমার ঐ নতুন বৌমাটি নুচি খাবে বলে ঘরের মেঝেতে তিড়িংবিড়িং করে গঙ্গা ফড়িঙের মতো লাফাচ্ছে।
শশী সাবুর মাকে ডাক দেয় – যা তো সাবুর মা, ওর জন্য নিরামিষ হেঁশেল থেকে যা যা হয়েছে সব একটু একটু করে নিয়ে আয়। আর শোন ওকে কেউ বৌমা বলবি নে। ওর হাবি নামটাও কুৎসিত। ওকে সকলে ‘টগর’ বলে ডাকবি।
শশী পেছন ফিরলেই মুখ বেঁকায় ঝি – কত তামাসা দেখবো। বাহারে নাম হল ‘টগর’।
শশী ফিরে এসে দেখে সত্যি হাবি চুপ করে বসে নেই। মেঝেতে এটা ওটা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শশীকে দেখে ভয়ে ভয়ে তাকায়। দুরন্ত বাচ্চা মেয়ের দিকে কপট শাসনে তাকিয়ে হেসে ফেলে শশী – লুচি আসছে। তার আগে চুপটি করে বসতো আমার কাছে।
হাবি সামনে এসে দাঁড়ায়। শশী বলে – আজ থেকে তোকে এখানে হাবি বলে কেউ ডাকবে না।
হাবি শুধোয় – তা কি বলে ডাকবে?
- টগর। তুই হলি এ বাড়ির টগরমণি মুখোপাধ্যায়।
হাবির ঘোর লাগে। ছিল হাবি, হয়ে গেল টগর।
শশী আবার বলে – টগরমণি মুখোপাধ্যায়। কি মনে থাকবে?
ঘাড় কাৎ করে হাবি – কিন্তু কেন?
শশী উত্তর দেয় – বাঃ এখানে এসে আমি তোর নিজের নতুন মা হলাম। ঐ লোকটা যে তোকে নিয়ে এলো নিজের নতুন বাবা হল আর একখানা নতুন নাম হবে না?
হাবির যেন মন সায় দেয় না। মা পর্যন্ত ঠিক ছিল, কিন্তু নিজের বাবা তো আছে। কাঁচপোকা গ্রামে। তবু চুপ করে থাকে। এখানে আসা পর্যন্ত সবাই তাকে ভালোবাসছে, আদর করছে, এ কি কম কথা। কিন্তু টগর নামটা যদি ভুলে যায় তখন কি হবে?
সাবুর মা এসে দাঁড়ালে হাবি হেসে ওঠে। দুধের দাঁতগুলো সবকটা দেখা যায়। শশী থালাখানা হাতে নিয়ে বলে – কাল থেকে তুই তোর সাবুকে নিয়ে এ বাড়িতে থাকিস সাবুর মা। আমার টগরের একটা খেলার সঙ্গী চাই তো।
সাবুর মা বড় দুঃখী মানুষ। থাকেও বড় কষ্টে। এমন একটা প্রস্তাবে আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠলেও চিনচিনে একটা অস্বস্তি থেকে যায়। মুখে বলে – বড় লক্ষ্মীমন্ত হয়েছে গো তোমার বউ, থুড়ি মেয়ে। নাও বাছা লুচি খাও।
শশী একটা করে লুচি ছিঁড়ে হাবির গালে দিলে সে খাটের কোণায় বসে পা ঝুলিয়ে দুলে দুলে চোখ বুজিয়ে সেটা চিবোতে থাকে। সাবুর মা খাওয়া দেখে ভাবে এ কিরকম নতুন বৌ গো।


গঙ্গা ধরতে গেলে গতকাল থেকে অভুক্ত ছিল। তাই এক থালা খাবার পেয়ে হাঁতহাঁত করে খেতে শুরু করে। গৌরী মাথা হেঁট করে স্বামীর খাওয়া দেখে। অর্ধেক খাওয়া যখন শেষ হয়ে গঙ্গা ঘটি ধরে জল খাচ্ছে গৌরী বলে – বিকেলবেলা চল। এখানে যা সব কাণ্ডকারখানা হচ্ছে থাকতে আর মন লাগছে না। তাছাড়া আসবার সময় পুঁটিটার জ্বর দেখে এসেছি। দিদি একা সামলাতে পারবে না।
গঙ্গা বউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে এই গুষ্টির সকলের মাথার দোষ আছে। মেয়েমানুষের বুদ্ধিশুদ্ধির প্রতি গঙ্গার কোনকালেই শ্রদ্ধাভক্তি ছিল না। কিন্তু এ বাড়ির পুরুষ মানুষগুলোর রকমসকম দেখেও পিত্তি চটে গেছে। কোথাকার কোন আপদ ঘরে তুলে আনলে। গঙ্গার সামনে সবকিছু কেমন পরিষ্কার হয়ে আসছিল, এখন যদি এরা খেয়ালের বশে ঐ মেয়েটাকে সমস্ত সম্পত্তি লিখে দেয় তাহলে তো গঙ্গার কপালে তালের আঁটি ফোঁপরা। সে এখানে দিনকতক থেকে এদের মনমতি বোঝবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু গৌরী এসে এমন কথা বলায় তার সমস্ত সত্ত্বা যেন মোচড় দিয়ে হর হর মহাদেব বলে ডাক ছেড়ে ওঠে। খিঁচিয়ে বলে ওঠে – কেন ? আজই চলে যেতে হবে কেন? তুমি বললে আর আমার লেজ উঁচিয়ে দৌড়তে হবে?
গৌরী তবু মিনমিন করে যায় – ওদিকে পুঁটির জ্বর দেখে এয়েলাম। দিদি একা পারবে কেন?
মিষ্টির একটু টুকরো গঙ্গার নীচের দিকের দাঁতের পাটির বাঁদিকে পোকা খাওয়া দাঁতের ভিতরে ঢুকে মাথা পর্যন্ত কিনকিনে যন্ত্রণা করছিল। এখন সেটা চচ্চড় করে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। মারমুখী হয়ে ওঠে – ওরে আমার সতীন পিরীতি মেয়েমানুষ গো। মুখ্যু মেয়েছেলে। এখন এখানে না পড়ে থাকলে তোমার খুঁড়োখুঁড়ির রকমসকম বুঝবে কি করে। ছেলেকে তো ত্যাগ দিয়েছে এখন যদি ঝোঁকের মাথায় বিষয়-সম্পত্তি ঐ হাবি না টেঁপি তার নামে লিখে দেয়......।
ভ্রু কুঁচকে নাকের পাটা ফুলে ওঠে গৌরীর - এ দিলেই হল! বিষয় কি ওনাদের একার নাকি, আমার বাবাও এর অর্ধেক মালিক ছিল। খুঁড়ো সম্পত্তি অনেক বাড়িয়েছে তবে আমার বাবার প্রাপ্যটা আমি বুঝে নেব না?
গঙ্গার হঠাৎ করেই দাঁতে ব্যথা কমে যায় যেন। তার বদলে গৌরীকে বেশ নিজের সহধর্মিণী সহধর্মিণী মনে হয়। গৌরীর হাত দুখানা খপ করে ধরে গঙ্গা - তোমার মাথাটা বেশ খোলতাই হয়েছে তো গো।
লাজুক হাসে গৌরী। বলে - ছাড়ো। বাড়ি ভর্তী লোক।
গঙ্গা উঠে গিয়ে দরজায় খিল লাগিয়ে দেয়। তারপর গৌরীকে টেনে পাশে বসিয়ে সোজা গায়ের জামার বাঁ দিকের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দেয়। গৌরী টাল সামলাতে গিয়ে ছেলেটা বুক থেকে পেট বেয়ে সড়সড় করে মেঝেতে নেমে এসে হামা দিতে থাকে। গঙ্গার এ হেন আচরণ নতুন না তবু এমন একটা পরিবেশে গৌরীর অস্বস্তির শেষ থাকে না। সে জানে এখন চুপ করে থাকা ছাড়া উপায় নেই। ছেলেটা কয়েকবার বাবা মার দিকে তাকায়। আপন মনে মেঝে থাবায়। হাসে। পেচ্ছাপ করে গায়ে মাখে। গঙ্গা মনের সুখে বেশ কয়েকবার মর্দনের পর বলে – তাহলে বলছো তুমি কিছু হাতছাড়া হতে দেবে না?
মাথা নাড়ে গৌরী। গঙ্গা চৌকির উপর গৌরীকে চেপে শুইয়ে দেয়। গৌরীর দুচোখে এখন জল। গঙ্গা গৌরীকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে শাড়ি সায়া সটান খুলে দিয়ে দুই ঊরু কসাইয়ের মতো ফাঁক করে দেয়। চৌকির মচমচ শব্দ শুনে গৌরীর ছেলেটা অবাক হয়ে বাবা মায়ের দিকে চেয়ে থাকে। গৌরীর দুচোখ দিয়ে তখন টপটপ করে জল গড়াচ্ছে।


গৌরী যখন শশীকে ছল করে বলতে গেল যে আজই তারা হিঙ্গলগঞ্জে ফিরে যাবে শশী প্রথমে বোবা হয়ে গেছিল। তারপর এতক্ষণ ধরে সমস্ত ঘটনাগুলো ঘূর্ণিঝড়ের মতো তোলপাড় করে আকুল হয়ে আছড়ে পড়ে – ও গৌরী তুইও এখনই আমায় ছেড়ে চলে যাবি? আমার যে নিজের বলতে কেউ আর রইলো না মা। আর কদিন থেকে যা না।
শশীর এই আকুলতায় বিন্দুমাত্র হেলদোল হয় না গৌরীর। সে পালঙ্কের এক কোণে গুটিসুটি হয়ে ঘুমিয়ে থাকা হাবির দিকে আঙুল তোলে – কেন? ঐ যে ঐ তোমার টগরমণি এসে গেছে। আমাকে আর কি প্রয়োজন।
বড় নিষ্ঠুর হাসে গৌরী।
শশী যেন বড় নিঃস্ব হয়ে গেছে, রিক্ত হয়ে গেছে। বোবা হয়ে গেছে। শেখর তার একমাত্র ছেলে। সে কি না কত অবলীলায় তাকে ছেড়ে চলে গেল। তার বাবা তাকে জন্মের শোধ ত্যাগ দিয়ে এলো। বাকি জীবনটা কি নিয়ে কাটাবে শশী? কত যন্ত্রণা নিয়ে বাঁচতে হবে তাকে! কাঁদতে শুরু করে শশী। উ উ উ করে শুরু হওয়া কান্নাটা সমস্ত আবেগকে তোলপাড় করে পালঙ্কের উপর লুটোপুটি খায়। শেখর, ও শেখর এ তুই কি করলি রে বাবা? পেটে ধরে এদ্দিন বড় করে তুললাম। অথচ আমিই তোর কেউ হলাম না, আমার কথা তুই একবারও চিন্তা করলি না। একদিনের বে হওয়া ঐ বৌ তোর সব হল! এত নিষ্ঠুর তুই?
শশীর কান্নার শব্দে হাবির ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে প্রথমে তার একটু সময় লাগে বুঝতে সে কোথায় আছে। শশীকে আকুল হয়ে কাঁদতে দেখে ছোট ছোট হাতদুটো দিয়ে ধাক্কা দেয় – মা, ও মা, মাগো, কি হয়েছে তোমার? অমন করে কাঁদছ কেন? এই দেখ আমি টগর। তোমার নতুন মেয়ে টগর।
শশী চুপ করে যায়। হাবি কচি আঙুলগুলো দিয়ে শশীর চোখের জল মুছিয়ে জিজ্ঞাসা করে – শেখর কে মা?
শশী হাবির দিকে চেয়েই থাকে।
হাবি আবার শুধোয় – শেখর কে মা?
শশী তীব্রতম অপরাধবোধে অ্যাঁ অ্যাঁ করে কেঁদে উঠে দুহাত বাড়িয়ে হাবিকে বুকে জড়িয়ে ধরে – তুই আমায় কথা দে টগর তুই আমায় ছেড়ে কোনদিন কোত্থাও চলে যাবি নে।
হাবি মাথা নাড়ে। না যাবে না।
- সত্যি বলছিস তুই?
হাবি তিন সত্যি কাটে – সত্যি সত্যি সত্যি।
- তোর বাপ নিতে এলেও যাবি নে?
হাবি এবারে একটু ধন্দে পড়ে যায়। বাবা নিতে এলেও সে যাবে না! কিন্তু কেন? তবু বলে – আচ্ছা।
শশী এবার নিজেই বলে – শেখর আমার ছেলে হয় টগর। কাল রাতে যার সঙ্গে তোর বে হল।
হাবিকে তখন কথায় পেয়েছে – সে আমাদের বাড়ি থেকে ভোর রাতে নাকি চলে গেছে? কেন চলে গেছে মা? কোথায় চলে গেছে?
শশী দেরাজের উপর রাখা স্বামীর কম বয়সের শিকার করতে যাওয়া ছবিটার দিকে তাকায়। ধীরে ধীরে বলে – সে তার প্রথম বউয়ের কাছে চলে গেছে।
তৎক্ষণাৎ হাবি জিজ্ঞাসা করে – কেন মা?
এই কেনর উত্তর শশীর কাছে নেই। তাই সে নিশ্চুপ থাকে। শশী হাবির দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। বলে – টগর আজ একখানা কথা দে তো মা আমায়, তুই লেখাপড়া শিখবি। অনেক কিছু জানবি, বুঝবি। যে অজ্ঞতার জন্য অবহেলা করে তোর স্বামী তোকে ফেলে চলে গেল সে যেন একদিন চরম আফসোস করে বড় ভুল হয়ে গেছে। দহন জ্বালায় জ্বলে।
এত শক্ত শক্ত কথা বুঝতে পারে না হাবি। তার মাথায় তখন একটা কথা পাক খাচ্ছে – এই বউটাতো তার বরের মা, তার মানে সাউড়ি। সাউড়ি কি কখনও নিজের মা হতে পারে?
গৌরী মনে মনে আদিখ্যেতা বলে ঠোঁট উল্টে চলে যায়।


এবার গৌরী কিছুক্ষণ বাদে সত্যি সত্যি বিদায় নিতে আসে। মনটা আজ তার সবদিক থেকেই কালমেঘের মতো তেঁতো হয়ে আছে। শশীর পায়ে হাত দিয়ে যেমন তেমনভাবে একটা প্রণাম ঠুকে নিয়ে বলে – খুঁড়োকে পেলাম না। তাই জানাতে পারলাম না। তোমাকেই বলি - ও একটা নতুন কিসের ব্যবসা করবে। কিছু টাকার দরকার। তা আমার বাবার প্রাপ্যের সম্পত্তিটুকু বাবদ যা হয় খুঁড়োকে বোলো হিসাব কষে রাখতে। সামনের মাসে ও একবার আসবে।
শশী যেন কিছু শুনতে পায় না। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে।
এই চেয়ে থাকা দেখতে গৌরীর সর্ব শরীরে যেন বিষ জ্বালা ওঠে। সে বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে বলে – আসলে শেখরতো এখন এ বাড়ির কেউ না। সে থাকলে ভাগের কথা ভাবতাম না। কিন্তু সে যখন নেই তখন মিছিমিছি আমি কেন বঞ্চিত হই বল। তার উপর সতীন নিয়ে ঘর করা কপাল আমার।
হাবির দিকে তাকায় গৌরী। মনে মনে ভাবে এই মেয়েটাই যত নষ্টের গোড়া। এই মেয়েটার জন্যই শেখর আজ ঘরছাড়া। হাবিকে একবার বিষ নজরে দেখে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায় গৌরী।
শশীর যেন এতদিন ধরে বেঁচে থাকার সমস্তটাই এলেবেলে মনে হয়। গৌরীর হঠাৎ করে এই সাংঘাতিক পরিবর্তনে শশীর জীবনের ষোল আনাই মিছে বলে মনে হয়। এতটা বয়স পর্যন্ত সমস্তরকম হিসেবটাই তার ভুলভাল হয়ে গেছে। এ ভুলের সংশোধন নেই। সত্যি কি নেই? কোনমতেই নেই?
শশীর হাঁটু ছুঁয়ে হাবি পুতুলের মতো বসে আছে। তার দিকে তাকায় শশী। নিজের কাছে নিজে একটা প্রতিজ্ঞা করে। না। এ ভুলটা আর কোনমতে করা যাবে না।
হাবি চুপটি করে বসে থাকে। ছোট মাথায় তার আর কিছু ঢুকছে না। তাই আবার চুপ করেই শুয়ে পড়ে। এ বাড়িতে আসা ইস্তক তাকে কথায় কথায় কেউ বকছে না, মারছে না - এটাই বা কম কি।







এদিকে হাবি চলে আসার পর থেকে মহিম সম্পূর্ণ বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। থেকে থেকে ডুকরে কেঁদে উঠছে আর আপনমনে বিড়বিড় করে বকে চলেছে। যাকে দেখছে তাকেই শুধোচ্ছে – হ্যাঁগো সেই মাছ ভাজা আর মণ্ডাটা কোথায় গেল? মেয়েটাকে দেব বলে এত করে লুকিয়ে রাখলাম। কিন্তু কোথায় গেল? কে খেয়ে নিল?
যোগেন চোখের জল আর বাঁধতে পারে না। কাঁদতে কাঁদতে বন্ধুকে বোঝায় – মহিম তুমি এমন করলে হবে? তেনারা তো হাবিকে নিয়ে গেছেন। কত ধনী লোক তারা। খেয়ে পরে হাবি সেখানে সুখেই থাকবে। আর শেখরের ঘটনাটাও দেখ কালেকালে সব কিছু মিটে যাবে। হাবি এখন ছোট। স্বামীর কিছুই বোঝে না। বরং সংসারকে, জীবনকে বুঝে নিতে কিছু সময় পেলে তার পক্ষে ভালই।
যোগেনের এসব কথার উত্তরে মহিম শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। তারপর ঘোর সন্দিগ্ধ চোখে মুখ নিচু করে আস্তে আস্তে বলে – যোগেন এ তোমার কাজ না তো? তুমি খেয়ে নাও নি তো আমার হাবির মাছ আর মণ্ডাটা?
যোগেনের তখন আকুল হয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করে। গ্রামের কবিরাজের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আর কমলা? তার দুর্দশাও কিছু কম না। দুটো দুধের শিশুকে নিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কি খাবে তার চিন্তায় অস্থির। ছেলেদুটো খিদের জ্বালায় যখন অস্থির হয়ে ওঠে, চিল চীৎকার জুড়ে পাড়া মাথায় করে তখন শুধু কমলা মাটির মেঝে চাপড়ায় আর নিজের ভাগ্যকে শাপমন্যি করে। এক অর্থে কমলার জীবনও ডাঁটা চচ্চড়ির মতো ঘেঁটে গেছে। গ্রামের লোকের দয়াদাক্ষিণ্যেই এই দিন-দুই তার চলছে। তারপর? তারপর মহিম যদি প্রকৃতিস্থ না হয় তখন কি হবে ভাবতে গিয়ে কমলার মতো দর্জালেরও বুকের ভিতরটা হিম হয়ে যায়।
হাবিকে সে কোনদিন সহ্য করতে পারে নি। একরত্তি মেয়েটাকে বড়লোকের ঘরে পাঠিয়ে রফা করে কুটুম্বিতা করবে বড় লোভ হয়েছিল। কিন্তু ভগবান যে এত বড় শাস্তি দেবে তা কল্পনাও করতে পারে নি। এই সংসারে যোগেন ছাড়া তার আজকে আপনার বলে বুঝি আর কেউ নেই। মহিম যখন কমলার কান্না দেখে দূরে বসে ফিক ফিক করে হাসে আর বলে, ‘আর খাবি? আমার হাবির জন্য রাখা মাছ মণ্ডা চুরি করে আর খাবি?’ তখন যোগেনও কমলার দুঃখে আর্দ্র হয়ে ওঠে। পুরুষ হৃদয়ের ভিতরেও কি যেন হয়। স্নেহঝর্ণা যা যোগেনকে এতদিনের অপছন্দের মানুষ কমলার কাছে পৌঁছে দেয়। মুখ থেকে বলায়, ‘কেঁদো না ওঠো বৌঠান। আমিতো আছি’।
‘আমিতো আছি’ কত বড় ভরসা, বরাভয়। মুখ তুলে তাকায় কমলা। দূরে কাঁঠালগাছের গুঁড়িতে উবু হয়ে বসে থাকা নিজের মানুষটাকে যেন মনে হয় কত জন্মের অচেনা। কেবল একখানা জড় পদার্থ। কমলার একটা কথা খুব মনে হয় মা মরা হাবির জন্য কমলাকে বিয়ে করে এনেছিল মহিম। ফুলশয্যার রাতেও অনুরোধ করেছিল, ‘নতুন বৌ আমাকে তুমি যদি ভাল না বাসতেও পার আমি মেনে নেব। কিন্তু মেয়েটাকে সন্তানের জায়গা দিও’। আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী এমনকি যোগেনও তাকে অনুরোধ করেছিল তাকে এ বিয়ে করবার জন্য। যোগেন বুঝিয়েছিল বিয়ে যদি না কর তাহলে হাবিকে দেখবে কে? অতটুকু দুধের শিশুকে মানুষ করা কোন পুরুষ মানুষের কম্ম নয়। ওকে তাহলে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দাও। কিন্তু মহিম রাজী হয় নি। হাবি ছিল তার প্রাণ- পুত্তলি। তাকে কোনমতেই পিতৃহৃদয় কাছছাড়া করতে চায় নি। তাই সে বিয়েতেই মত দিয়েছিল। কিন্তু সেই হাবির পাঁচ বছরের ক্ষুদ্র জীবনটাতে এমন অনেক কাণ্ড ঘটে যাবে তা কল্পনাও করতে পারে নি।
কমলা নিজের ছেলেদুটোর মুখে বার্লি জলে গুলে তুলে দিতে গিয়ে হাপুস নয়নে কাঁদে। মহিমের নাওয়া- খাওয়া কিছু নেই। কমলা ভেবে আতান্তর পায় না মহিম সুস্থ না হলে কিভাবে চলবে তার সংসার! হাবির প্রতি কখনও রাগ, কখনও ভালবাসা খানখান হয়ে যায়। কমলার বাপের বাড়ি গরীব। তাই সমবেদনা ছাড়া কিছুই করার নেই তাদের। কমলার মাথায় আর কিছু ঢোকে না। ঘরের শেষ খুদকুঁড়োটুকুতে কালরাতে জাওভাত করে খাওয়া হয়ে গেল।

আর সে রাতেই ঘটে গেল ভয়ঙ্কর ঘটনাটা। মহিমের ঘরে ঢোকা বের হওয়ার কোন তালজ্ঞান নেই বলে রাতে ছেলেদুটোকে বুকে জড়িয়ে বাধ্য হয়ে বারান্দার কামরাটার দরজাখানা হাট করে খুলে রেখে ঘরে খিল দেয় কমলা। গ্রাম আর গরীব বলে তো আর চোর ডাকাত লম্পটেরা ছেড়ে কথা বলবে না। শুয়ে শুয়ে সারারাতই প্রায় জেগে থাকে কমলা। মনে মনে ভগবানকে বলে - ঠাকুর কেউ না জানুক তুমি অন্তত জানো হাবিকে আমি কোনদিন নিজের সন্তান ভাবতে পারি নি একথা সত্যি। কিন্তু তা বলে আমি ওর কোনদিন এত বড় সর্বনাশও চাইনি। তবে আমাকে এত বড় শাস্তি দিলে কেন? যদিও বা আমায় দিলে শিশুদুটোতো কোন অপরাধ করেনি।
সারারাত কমলার দুচোখের পাতা এক হয় না। ছটফট করে। বিছানার এপাশ ওপাশ করে। কামরা ঘরটায় মহিমের হেঁটে বেড়ানো টের পায়। দুচোখের কল বেয়ে তার কেবলই কান্না নেমে আসে। বাচ্চাদুটোর গায়ে হাত বোলায়। একসময় মনে হয় ছেলেদুটো তো সবসময় খিদের জ্বালায় হাহা করে, ওদের মুখে কিছুটা সেঁকো বিষ ঢেলে দিয়ে তারপর নিজে কিছুটা খেয়ে নিলে কেমন হয়। এমন কতরকম ভাবনাই যে কমলার মাথায় ঘোরে তার ঠিক নেই। ঘুরতে ঘুরতে একসময় প্রকৃতির নিয়মেই ঘুমিয়ে পড়ে সে। গতরাতেও এমনটা হয়েছিল। এখন আর সংসারে সারবস্তু কিছু নেই। তাই সেই কাকভোরে উঠে গোবরছড়া, উঠোন লেপা এসব কাজেও মন উঠে গেছে তার। সারাদিন শুধু শাকপাতা কুটে কুটে খাওয়ার চিন্তা। যেন ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্যই শুধু বেঁচে থাকা। তাই কমলার এখন আর কোন তাড়াহুড়ো নেই।
সকালে কমলা কামরা ঘরটার দিকে একবার তাকায়। মহিম যদি ঘুমিয়ে থাকে তাহলে ঘুমন্ত স্বামীর মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকে। তারপর বেঁচে থাকার দায় দৈনন্দিন কাজগুলোয় হাত দিতে হয়। দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে কমলার।
তবু জীবন থেমে থাকে না। কমলা দেখে চৌকিটা খালি। কলের পুতুলের মতো একটু ঝাড়পোঁছ করে। উঠোনে নেমে দুপা হেঁটে দম আটকে দাঁড়িয়ে পড়ে কমলা। চোখদুটো তার ঠিকরে বেড়িয়ে আসতে চায়। কিছু সময় কোন শব্দ করতে পারে না। তারপর গোঁগোঁ করতে করতে অ্যাঁ অ্যাঁ অ্যাঁ শব্দ করে আকাশজোড়া চীৎকার করে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। কমলা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান থেকে হাত চার পাঁচেক দূরে কাঁঠাল গাছটার মগডালে মহিম গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলছে। পরনের ধুতিটা দিয়েই ফাঁস দিয়েছে। আন্ডার ওয়ার থেকে পা দুটো আরও বেশী লম্বা দেখাচ্ছে। মাথাটা বাঁদিকে কাত করা। জিবটা বেরিয়ে আছে। সাদা আন্ডারওয়ারের পিছনটা হলুদ। মৃত্যুযন্ত্রণায় মহিম মলমূত্র ত্যাগ করে ফেলেছে। বড় কষ্টে মৃত্যু হয়েছে তার। চোখ দুটো ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে। যেন শেষ মুহূর্তেও বলতে চেয়েছে, ‘তোমরা, তোমরাই খেয়ে নিয়েছো আমার হাবির মাছ আর মণ্ডাটা’।


কমলার যখন জ্ঞান আসে তখন তার কাঁদবার শক্তিটুকুও হারিয়ে গেছে। কারা যেন মহিমকে কাঁঠাল গাছ থেকে নামিয়ে বাঁশের চালিতে শুইয়ে রেখেছে। গায়ে সেই ফাঁস দেওয়া ধুতিটা দিয়ে ঢাকা দেওয়া। কমলা উঠে বসে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখে। বাচ্চাদুটো কার কোলে কোথায় লুটোপুটি খাচ্ছে কেউ জানে না। যোগেন মহিমের শরীরটা ধরে ঝাঁকাচ্ছে আর অঝোরে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে বলছে - এ তুমি কি করলে মহিম? হাবি তোমার সর্বস্ব ছিল। কিন্তু তা বলে ছেলেদুটো, বউঠানের কথা একটা বারও চিন্তা করলে না?
যোগেন সত্যিকারের আপনজনের মত দিশেহারা। সেই কবেকার বন্ধু ছিল মহিম। দুজনের মধ্যে সম্পর্কটা এতটাই গভীর ছিল যে জাতপাতের সমস্যাও তাদের আলাদা করতে পারেনি। আজ যেন বুঝতে পারে যোগেন মহিমের এই চরম পরিণতিতে সে বড় একা হয়ে গেল। কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে নিজেকে নিজে সে দোষারোপ করে কেন সে হাবির বিয়েতে মত দিল! কেন? কেন? সে তো জোর করতে পারতো। আর মহিমতো তার কথা কখনো ফেলে না। গ্রামশুদ্ধু সকলে যখন কমলার এই পরিস্থিতির জন্য কমলাকেই দায়ী করছে, তখন কোনো এক দুর্বোধ্য কারণে মুখরা, কুচুটে কমলার প্রতি যোগেনের পুরুষ হৃদয়খানা গুমরে গুমরে কেঁদে উঠছে। মানবচরিত্র সত্যি সত্যি অতি বিচিত্র। কিন্তু যত বড় শোকই হোক না কেন শোককে ঘিরে মানুষ অনন্তকাল বসে থাকতে পারে না। গ্রামের বর্ষীয়ান মাতব্বরেরা এবার সরব হয় - একে তো অপঘাতে মৃত্যু, তারপর বাসি করে বারবেলা ছুঁইয়ে দিলে ঘোর অমঙ্গল।
বৌঠানের বাপের বাড়ীতে একটা খবর দিতে হয় যখন বললো যোগেন তখন প্রথম কথা বলে কমলা - না তার কোনো দরকার নেই। মিছিমিছি তাদের ব্যস্ত করে লাভ নেই। আপনারা সকলে আমার আপনজন, আপনারা যা ভালো মনে করেন তাই করুন। শুধু হাবিকে যদি একটিবার আনতে পারতেন বড়ো ভালো হত। মেয়েটা তেনার প্রাণভোমরা ছিল।
কথাটা যোগেনেরও মনে লাগে। কিন্তু ঐটুকু শিশুকে নিয়ে এসে কি দেখাবে, কাকে দেখাবে সে! তাছাড়া যাওয়া আসা, কুটুমবাড়ির অনুমতি নিয়ে হাবিকে আনা অনেক সময়ের ব্যাপার, গ্রামের মাতব্বরেরা এত সময় অপেক্ষা করতে রাজী হবে না। অগত্যা মহিমকে সকলে মিলে কাঁধে তোলে। খই ছড়াতে ছড়াতে হরিধ্বনি দিতে দিতে সকলে যখন মহিমকে নিয়ে যায়, কমলার চোখে তখন খরালীর বাণ ডেকেছে। বৌঝিরা সামনাসামনিই বলতে শুরু করে - ওমা কি নিষ্ঠুর মেয়ে মানুষ গো, স্বামী মরলো অথচ চোখের কোণে এতটুকু জল নেই। এমন আবাগী কেউ কোনোদিন দেখেছে না শুনেছে। জন্মের শোধ তুই আর এ জীবনে শাখাসিঁদুর পরতে পারবি? এয়োতির সুখতো চিরজীবনের মত ঘুঁচলো।
তবু সকলের কাছে মুখরা হিসাবে পরিচিত কমলা যেন কথা বলা ভুলে গেছে। গাঁয়ের এয়োতিরা যখন তাকে আলতা সিঁদুর পরাতে আসে, কমলা সব কিছু চুপ করে বসেই পরে। নাপিত বউ এক কৌটো সিঁদুর মাথায় ঢেলে দিতে দিতে বলে - ও বৌ জন্মের শোধ আলতা সিঁদুর পরছিস একটু চোখের জল ফেল।
তবু নিশ্চুপ কমলা। পাথর। জগদ্দল পাথর। যেন নড়তে চড়তে পারবে না। কতশত বছর যেন সে একইভাবে বসে আছে। শামুকের খোলের ভেতর গুটিয়ে আছে। জীবনের সব রঙ তার মুছে গেছে। কমলা তবু কাঁদে না। এই না কাঁদাটা চরম অপবাদ আর তীব্র শ্লেষ হয়ে ভেসে বেড়ায় কাঁচপোকা গ্রামের আকাশে বাতাসে। নিস্তরঙ্গ গ্রাম্যজীবন যা হোক করে একটু উত্তেজনা চায়। কমলার এ হেন আচরণ সে সাধ মেটায়।
কিন্তু কমলার শুকনো চোখের শূন্য দৃষ্টি যোগেনকে বড় বিচলিত করে তোলে। উদাস করে তোলে জাগতিক চেতনা। মহিমের চালি কাঁধে তুলে যোগেন পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় কমলার দিকে। আলতা, সিঁদুরে মাখামাখি হয়ে কমলা যেন কোনও প্রাচীন বট অশ্বথ গাছ। যেখানে লাল সুতোয় ঢিল বেঁধে মেয়েরা মানসিক রাখে। যোগেন হরিধ্বনি দিয়ে ওঠে - বল হরি, হরি বোল।


গ্রামের শ্মশানেই দাহ করা হল মহিমকে। ছেলেদুটো নেহাৎই নাবালক বলে যোগেনকেই মুখাগ্নি করতে হয়। মুখাগ্নি করার আগে মহিমের মুখে মিষ্টান্ন দেওয়ার সময় যোগেন মনে মনে একটা কথা বলে - মহিম তুমি আমার বন্ধু থেকে কখন ভাই, আপনজন, আত্মার আত্মীয় হয়ে গেছিলে টেরই পাইনি। কোনোদিন তোমার কোনো দোষ দেখিনি কিন্তু আজ তোমার মৃত্যুকে ক্ষমা করতে পারলাম না। হাবির জন্য উন্মাদ হয়ে গেছিলে কিন্তু ঘরের মানুষটা আর নাবালক পুত্রদুটোর কথা একবারও মনে পড়লো না। তবু বেঁচে ছিলে, স্বামী আছে এটাই তো ছিল তার সান্ত্বনা। অবলার সাহারা ছিল। মাথার উপর ছাদ ছিল। তুমি তাকে আক্ষরিক অর্থে সর্বহারা করে তুললে। আমায় মাপ করো মহিম, আমি তোমায় ক্ষমা করতে পারলাম না।

মহিমকে দাহ করে সকলে যখন ফিরলো তখন পড়ন্ত বিকেল। কমলার শাখা ভাঙতে নিয়ে গেল যোগেনের মা। কিন্তু বিধবা পুকুরের ঘাটে গিয়ে কমলা যখন পাঁচ বছরের এয়োতির চিহ্নগুলো একাএকাই খুলে ঠুকে ভেঙে, যোগেনের মায়ের হাত থেকে সেজি মাটি নিয়ে একাএকাই সিঁথিতে ঘষে গলা জলে ডুব দিল, যোগেনের মায়ের তাজ্জব হয়ে যাওয়া মুখখানায় কথা ফোটে - ওমা কি মেয়েমানুষ গো তুমি? প্রাণের ভেতর কি একটুখানি দয়ামায়াও নেই! সতীনের মেয়েটাকে তো দেশান্তরী করে ছাড়লে, স্বামীটাকেও খেলে। এখন কি নিয়ে বাঁচবে গো তুমি? ছি ছি কি আড়মুখি মেয়েছেলে গো!
যোগেনের মাকে কমলা শুকনো গলায় শুধু বলে - খুড়িমা ঘাট থেকে আমি একলা ঘরে যেতে পারবো।
যোগেনের মা মুখ ঝামটে ওঠে - সে তুমি পারবে মা। যাও ঘরে গে দেখোগে যাও রাঁড় হয়ে কেমন রূপ খুলেছে দেখো।

কমলা ভাঙাচোরা শাখা, পলা, নোয়াটার দিকে তাকিয়ে ঘাটের সিঁড়িতে চুপ করে বসে থাকে। পায়ে আলতার দাগ ওঠেনি। সেদিকে তাকিয়ে লাল রঙের প্রতি হু হু করে ওঠে মনটা। যোগেনের মা সত্যি সত্যি উঠে দাঁড়িয়ে বলে - তাহলে আমি চললাম বাছা।
তবে একটা বিষয় মনে মনে নিশ্চিত হয় কমলাকে নিশ্চয়ই কোনো অপদেবতা ভড় করেছে। নতুবা যে বিধবা পুকুরের পাশ দিয়ে বেটা ছেলেরাও দিনের বেলা যেতে ভয় খায়, শুভ কাজে যাওয়ার সময় ভুলেও এ পথ মারায় না কেউ আর মেয়েরা তো মনের ভুলেও এদিকে চোখ তুলে তাকাতে সাহস পায় না সেখানে একা সময় কাটানোর দুঃসাহস পায় কি করে কমলা!

তাল, সুপারি নারকেল গাছে ঘেরা প্রখর গ্রীষ্মেও এখানকার জল থাকে কালো। জলের ভেতর থেকে হুশহাশ করে উঠে আসে নাকি দীর্ঘশ্বাস। রাতের বেলা ভাল করে কান পাতলে নাকি শোনা যায় বিধবাদের কান্না। পুকুরের চারদিক ঘিরে ছড়ানো ছিটানো এয়োতীদের চিহ্ন। ছেড়ে যাওয়া এয়োতী শাড়িগুলো দলা পাকানো থাকে বট গাছের নীচে। শ্মশানের বদু ডোম মাঝে মাঝে এসে সেগুলো পুড়িয়ে যায়। আর যেগুলো পছন্দ হয় নিয়ে যায়। তারপর মৃতের বাড়ী ঘুরে চাল, কাঁচকলা, ঘি গাছের ফল নিয়ে যায়।
এ যে-সে পুকুর না, এর নাম বিধবা পুকুর। শোনা যায় প্রায় দু’কুড়ি বছর আগে ভিন গ্রামের কোন মেয়ে বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিল। মাঠের আল ধরে পালকিতে করে যাওয়ার সময় সে সর্বনাশী নাকি পালকির গবাক্ষ দিয়ে চোখ মেলে বিধবা পুকুরের একফালি দেখে ফেলে। ব্যস এক দণ্ডের মধ্যে হঠাৎ করে আকাশ অন্ধকার করে কালো মেঘে ছেয়ে কড়কড় করে বাজ পড়ে নতুন বরের মাথায়। মৃত্যু হয় তার। সে মেয়ের শাঁখা নোয়া এ পুকুরেই রেখে বাপের ঘরে ফিরে যেতে হয়। গিয়ে অবশ্য সেও আত্মঘাতী হয়। কারণ বাঁচলে পড়ে যে জীবনটা তাকে কাটাতে হত তার থেকে মরে যাওয়া ঢের ভালো।
কমলা বটগাছের আড়ালে শাড়ি শেমিজ ছাড়ে। তারপর সাদা থান জড়িয়ে আর একবার জলে নামে। কোমর জলে নেমে কমলার একটা কথা মনে হয়। শুকনো কিছু ডাল গলায় বেঁধে তলিয়ে গেলে কেমন হয়। তাহলে তো এ জন্মে তার কপালখানা নিয়ে আর কেউ খোঁয়াড় করতে পারবে না। কিন্তু তারপরেই ছেলেদুটোর কান্না যেন স্পষ্ট শুনতে পায়, আর সে আবাগী যে কিনা জন্ম ইস্তক মাকে খেয়ে শান্তি হয় নি, বে’র রাতে একপ্রকার স্বামী হারা হল আর বাপের ভিটে ছাড়তে না ছাড়তে বাপকেও খেল, তার কথাটাও ভেবে বুকটা হুহু করে ওঠে। আজব মানুষের মন, কোন কারণে তার গতিপ্রকৃতি কোনদিকে চলে তা কেউ বলতে পারে না। নতুবা যে হাবি ছিল তার মনের বিষপুঁটুলি সে চলে যেতে কমলার ভিতর এত হাহাকার কেন? এত অপরাধ বোধ কেন? মাতৃহীন শিশুটিকে পরম স্নেহে কোলে নেওয়ার বদলে আপদবালাই বলে এদ্দিন দূরে ঠেলে আজ কেন মনে হচ্ছে খুব বড় পাপ করেছে কমলা, আর সেই পাপের সাজা আজকের সাদা থান।
পুকুরের জল নিয়ে বেশ ক’বার আচমন করে কমলা। মনে হয় গতরাতে খাওয়া চুনো মাছের চচ্চড়ির গন্ধটা তবু যাচ্ছে না। একটা নিমের দাঁতন পেলে ভালো হত। মুখের এই গন্ধটা দূর করা যেত। তারপর মনে হয় তার কি মাথার গণ্ডগোল হল নতুবা জন মনিষ্যিহীন এ তল্লাটে আধগলা জলে দাঁড়িয়ে কতক্ষণ ধরে কি সব ভেবে যাচ্ছে সে! আর তখনই চাপা অথচ গম্ভীর গলায় কে যেন ডেকে ওঠে – বৌঠান।
সচকিত কমলা। গা ছমছম করে নি কমলার বরং নিজেকেই জীবন্ত প্রেত বলে মনে হয়। তাই আর কয়েকটা বেশ করে ডুব দেয়।
আবার একটু উঁচু গলায় কে যেন ডেকে ওঠে – বৌঠান।
না এবার তো ভুল শোনে নি কমলা। বরং এ ডাক কেমন যেন চেনাচেনা লাগে। পিছন ফিরে সিঁড়ির ধাপ ভেঙে সেমিজ ছাড়া শুধু ভিজে সাদা থান পরা কমলার আঠাশ বছরের পুষ্ট শরীরটা উঠে আসে। চারপাশে সন্দেহের চোখে কাকে যেন খোঁজে। আর তখন জড়াজড়ি করে থাকা বট আর পাকুড় গাছের আড়াল থেকে সেই বৌঠান ডাকের মানুষটা সশরীরে কমলার সামনে এসে দাঁড়ায়। যোগেন! কি কাণ্ড যোগেন এখানে? কেন? হা ভগবান কমলা না হয় খুব খারাপ তাবলে এতটাই খারাপ যে ...............
কমলা আর ভাবতে পারে না। ভিজে শাড়ির লজ্জা ভুলে যোগেনের দিকে স্পষ্ট চোখে তাকায় আর কমলার অজান্তে লক্ষ্মীর ঝাঁপির মতো ভরাট দুটি স্তনের ডৌল থেকে চেয়ে থাকে স্পষ্ট দুটো বৃন্ত।
কমলার চেহারা যোগেনকে স্থির থাকতে দেয় না। বন্ধুকে দাহ করে এসে মায়ের কাছে কমলার নিজে নিজে শাঁখা ভাঙতে চাওয়ার কাহিনী তেলে জলে সাতকাহন করে শুনে আর গ্রামের লোকের ছিছিক্কারে মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল আর নয়। কমলাকে মুখের উপর কিছু কথা শোনাবে। কিন্তু তার বদলে যোগেনের মুখে কোনও শব্দ যোগায় না। তাই কমলার দিকে চেয়ে থাকে। চেয়ে চেয়ে রঙ হারা কমলার ভিজে শরীরের রূপ দেখে, দেখতে দেখতে মনটা আর্দ্র হয়ে ওঠে। তাই ভেজা গলায় কোনরকমে বলে – বাড়ি চলুন বৌঠান। গ্রামসুদ্ধু লোক আপনাকে মন্দ বলছে। আমার আর শুনতে ভালো লাগছে না।
এত দুঃখেও কমলার ঠোঁটের হাসিরেখা ফুটে ওঠে। কমলা বরাবরই সাহসী। বরাবরই মুখরা, কুচুটে, হিংসুটে। কিন্তু সেই কমলার দুর্নামে ছিছিক্কারে কারও খারাপ লাগতে পারে? পরপুরুষের সঙ্গে কথা কওয়া শোভন নয় তবু দরকারে আড়াল আবডালে বা কাউকে কাউকে মাধ্যম করে রেওয়াজ আছে কিন্তু এতো একবারে সরাসরি, নিরালায়।
এতক্ষণ ধরে জমিয়ে রাখা যন্ত্রণাগুলো থরথর করে কেঁপে উঠতে চায় কি এক আবেগে। কমলার শরীর, মন ভেঙে কান্না নেমে আসে। মহিম মরে যাওয়ার পর এই প্রথম কেঁদে ওঠে কমলা। পাষাণী নির্দয় কমলা। কাঁদতে কাঁদতে যোগেনের পায়ের কাছে বসে পড়ে কমলা। আর যোগেন সে কি ভুলে গেল নাকি রীতি নীতি সব রেওয়াজ, নতুবা কমলার দুবাহু ধরে বলতে পারে – উঠুন বৌঠান, আপনাকে শক্ত হতে হবে, এভাবে ভেঙে পড়লে ছেলেদুটোর কি হবে একবার ভেবে দেখেছেন? আমি তো আছি!
মুহূর্তের জন্য চমকে ওঠে কমলা। একই বরাভয় – ‘আমি আছি’। নারীর জীবনে এ যে পরমপ্রাপ্তি কিন্তু এমনভাবে থাকা তো কলঙ্ক, অসম্মানের। মহিমের কাছে কমলার গুরুত্ব ছিল হাবির ভালো মা হয়ে ওঠা। শ্বশুরকুলে গ্রামের লোকের কাছে সবসময় হাবির মায়ের সঙ্গে কমলার তুলনা শুনত। হাবির মায়ের রূপ-গুন শুনতে শুনতে, মহিমের পরলোকগতা প্রথমা স্ত্রী কমলার মৃতা সতীনের সম্পর্কে তার একটা কথাই মনে হত - হাতের কাছে পেলে গলাখানা টিপে ধরত সে মাগীর। হ্যাঁ এমনটাই মনে হত কমলার। কমলা এমনিই কুচুটে। মহিমও তার প্রথমা স্ত্রীর নিজে হাতে লাগানো জবা গাছ কিংবা গোড়ালেবু গাছটার দিকে পরম মমতায় উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকতো। হিংসুটে কমলা সতীন-ঝি হাবির নড়াটা ধরে তুচ্ছ কারণে ঘা কতক বসিয়ে দিয়ে অনায়াসে বলে দিত - রাক্ষসী জন্মের পর মাকে খেয়েছিস এখন আমার সংসারটাকে খাবি? এত বড় ধিঙ্গী, না ঘটে না পটে যদি কোনও কাজে লাগে।
মহিম কমলাকে ভয় পেত। ভালো বাসতে পারে নি তাই কমলার সামনে হাবিকে কাছে টেনে নিয়ে বলতো – কাঁদিস না মা।
কোথায় কমলাকে শাসন করে বোঝাবে, না তার বদলে হাবিকে বুঝিয়ে দেওয়া কমলা তোর মা নয় সৎ মা। কমলা তোকে ভালোবাসে না।
যোগেনের বুকের ভিতর লুটিয়ে পড়ে কমলা। কান্নার দমকে তার ভিজে শরীরটা নুয়ে পড়ে। শক্ত হাতে যোগেন কমলাকে ধরে রাখে। কমলারও কোনও মতলব ছিল না। এই মুহূর্তে কমলার প্রয়োজন ছিল সত্যিকারের সহানুভূতি। যা যোগেন তাকে দিয়েছিল আর তাই যোগেনের কাছেই কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়েছিল তার শরীর, মন। যোগেন পুরুষ কি মেয়েমানুষ প্রাধান্য পায়নি, পেয়েছিল শুধু একটা মানুষ। কাঁচপোকা গ্রামটায় এত বড় ইতিহাসের সাক্ষী আর কেউ হয়ে থাকলো না শুধুমাত্র গাছপালা, কতগুলো নিরীহ পশুপাখি আর বিধবা পুকুরের নিথর জল ছাড়া।
একসময় কমলাকেই বলতে হয় - আপনি ঘুর পথে এগোন কায়েত ঠাকুরপো। আমি আসছি।
হুশ ফেরে যোগেনের। কমলাকে ছেড়ে জোর পায়ে হেঁটে যায়। যেতে গিয়ে হোঁচট খায় একজোড়া চোখের সামনে। বদু ডোম। মহিমকে দাহ করেই তার পরিবারের ছাড়া বস্ত্রগুলো নেওয়ার লোভে আসছিল কিন্তু বিধবা পুকুরের দিক থেকে যোগেনকে আসতে দেখে হকচকিয়ে যায়। কিছুটা ভয়ও পায়। ভাবে এই লোকটাই মড়ার মুখাগ্নি করে এলো। তাই ভয়ে ভূ-এর এক পাশে জড়সড় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যোগেনই উল্টে ভয় পেয়ে প্রায় মুখ লুকিয়ে কি যেন এক অপরাধে ধরা পড়ার ভয়ে ঊর্ধশ্বাসে হাঁটা লাগায়। মানুষ পোড়ানো বদু কিছু না বুঝে শুকনো পাতা মাড়িয়ে নির্দিষ্ট বট গাছটার কাছে এসে দেখে শ্লথ পায়ে ভিজে সাদা থান পরে গ্রামের দিকে এক নারী মূর্তি চলে যাচ্ছে। বটগাছের তলায় হলুদ লালে মোটা জমির শাড়িটার দিকে তাকিয়ে বদু ভাবে – এরই তাহলে শাড়ি, আর ঐ লোকটা সে তাহলে এখানে কি করছিল?
বদু মানুষ পোড়ায়। মানুষের মাংস পোড়ার কটু গন্ধ ঢাকতে সে তাড়ী খায়, ভাঙ খায়। তাই সে মানুষের মন পুড়ে ছারখার হওয়ার হদিশ করতে পারে না। তার মোটা গোঁফের নীচে – ‘আচ্ছা বুঝেছি তোমার মতলব’ এই ধরনের হাসি খেলে গিয়ে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছায় – ‘লোভ’, হ্যাঁ মানুষ নামক দুপেয়ে প্রাণীটার লোভ বড় সাংঘাতিক নতুবা একটু আগে মুখাগ্নি করে আসা লোকটা বিধবা বউটার পরনের শেষ রঙিন শাড়িটা চুরি করতে আসতে পারে! ছি ছি! ছি! মানুষের কি কুপ্রবৃত্তি। বদু ডোমের প্রাপ্যটুকুতেও কেউ ভাগ বসাতে পারে?


মহিমের উঠোনে গুটিকয় স্ত্রীলোকের জটলায় অনেকেই আশা করেছিল কমলা বুঝি তার এ পোড়া মুখ আর কাউকে দেখাতে চায় না। তাই বিধবা পুকুরের কালো জলে সঁপে দেবে নিজেকে। কেউ দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বিলাপের সুরে বলে – দেবে নাতো কি, বামুনের ঘরের বৌ। বাপের বাড়িতো একেবারে ঝুলি শূন্য। দু’দুটো ছেলেকে নিয়ে চলবে কি করে বলতো। আর যাই হোক বামুনের বউকে দিয়ে তো আর ঢেঁকিতে পাড় দেওয়ানো যায় না। শ্বশুরবাড়িতেও মুরুব্বি বলে কেউ তো নেই, তাও ভাগ্যিস সতীন ঝিটার বে’টা হয়ে গেল।
কিন্তু সেই সতীন ঝিটার যার সঙ্গে বিয়ে হল তার হদিশ হল কিনা সে নিয়ে চিন্তিত কোন স্ত্রীলোক না। তারা জানে এমন একটা ঘরে হাবি গেছে যে ননী মাখবে আর দুধে নাইবে। আর মাছ মণ্ডা ফেলা ছেড়া করে কাপড়চোপড় বিলিয়ে রাজরানী হয়ে থাকবে। কিন্তু রাজা ছাড়া রাণীটার সমস্ত জীবনটা নিষ্ফলা হয়ে থাকবে, না এ প্রশ্ন কেউ করে না। অতদূর চিন্তাটাই মাথায় পাক খায় না। তবে যোগেনের মা বুড়ি খ্যান খ্যান করে। বলে – ও মেয়েলোকের কিচ্ছু হবে না। বাপরে স্বামী খোয়ানোর পরও কি দেমাক! বলে কিনা আপনি যান। নির্ঘাৎ ওকে কিছু ভড় করেছে।
দূর থেকে কার যেন কমলার সাদা থান নজরে আসে। আর চাপা গলায় বলে ওঠে – ঐ তো।
সবাই ফিরে তাকায়। সবার মুখে বাক্যি হরে যায়।
অপরাধীর মতো দাঁড়ায় কমলা। কাঁঠাল গাছের ডালটায় নজর যেতেই হুহু করে ওঠে ভিতর – এই গাছটা এই গাছটাতেই মহিম গলায় দড়ি দিয়েছিল। কালই সে ঐ গাছটা কাটিয়ে দেবে।
অমূল্য ঘোষের বৌ বলে – হ্যাঁ গো বামুনবৌ তোমাদের আত্মীয়স্বজন ইদিকে কেউই কি নেই?
ভিড়ের ভিতর কে যেন মুখ খোলে – যা মুখরা মেয়েমানুষ কে রাখবে সম্পক্ক।
তা সত্যি। কমলার দুর্জয় মুখ, অসভ্য ব্যবহারে কেউই সম্পর্ক রাখে না মহিমের পরিবারের সঙ্গে।
যোগেনের মা খড়খড়িয়ে ওঠে – নাও বাছা অনেকক্ষণ এয়েচি, কোমর ধরে গেছে। ফলারটুকু রাখো। আমার উনিটি মানে যোগেনের বৌ না বিইয়েই সূতিকাতে মরছে। যাই গিয়ে সে মহারাণীর সেবা করি গে। শোনো রাতে শুতে আসব খন।
কমলা সিঁড়ির ধাপে পা বাড়ায়। বলে – মাইমা ছেলেদুটোকে যদি শুধু এনে দেন তাহলেই হবে। রাতে একলা থাকতে পারবো।
তাজ্জব বনে যায় মেয়েমানুষের দল।
যোগেনের মা বলে - তা তুমি পারবে মা। তবে যোগেনতো মহিমের অভিন্ন আত্মা বন্ধু, তার পরাণটা কেঁদে কঁকিয়ে মরছে। আর সে আমায় ঠেলে ঠুলে পাঠাচ্ছে। যত্তসব।




বৈঁচি আর কোনও রাখঢাক করেনি। সরাসরি মেয়েকে বলেছিল, ‘স্বামীকে আঁচলে বাঁধার এই হল সুযোগ। তোর সেঁজুতি ব্রত নিষ্ফলা হয়নি আন্না। প্রাণ দিয়ে স্বামীসেবা কর। এমন পরমক্ষণ হেলায় হেলিস না। ভগবান তোর মুখ তুলে চেয়েছেন। আমি তোর বাবাকে অচ্ছেদা করতে বলছি না। তবে এসময় তোর বাবার নীতিকথাও কানে তুলিস না মা। তুই শুধু মনে মনে পঞ্চসতীকে ডাক আর স্বামীসেবা কর। ভগবান যে তোর দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন এ সুযোগ তুই হেলা করিস না’।
এগারো বছরের আন্নার মাথায় এত কথা ঢোকে না। কিন্তু তার মা যে তাকে টেনেটুনে হাতে পায়ে এবং মনটাতে লম্বা করে দিতে চাইছে সেটা আন্না বোঝে। বিজয়ের সঙ্গে বৈঁচির কিছু দাম্পত্যকলহ হয়ে গেছে এর মধ্যেই। বিজয় বারবার বলেছিল শেখরের বাড়ি গিয়ে খবর দেওয়া দরকার যে শেখর এখানে আছে।
বিয়ের পর থেকে মেয়েরা যে সংসারের কাছে ফেলনা নয়, তাদেরও একটা মূল্য আছে, তাদের অধিকার কেউ দিতে চায় না বলে তাদের নিজেদের অধিকার নিজেদেরকেই কিছু আদায় করে নিতে হয়, তা সে নরমে যদি না হয় কিছু গরমেই করতে হবে বৈকি। তা বৈঁচি এবার স্বামীর শেখানো রাস্তাতেই পথ ধরে। বুঝতে পারে আদর্শবান, নীতিবান স্বামীর কাছে এবার গরম হতে হবে। তাই স্পষ্ট বলে, ‘ভবানিপুর থেকে আমাদের রোজিপুর গ্রামটা কত ক্রোশ দূরে বলতে পার?’
বিজয় এমন প্রশ্নে খানিক অবাক হয়ে গিয়ে তাকিয়েই থাকে।
বৈঁচি মাথার ঘোমটাটা একটু খাটো করে দিয়ে বলে, ‘কটা নদী, সাগর, মহাসাগর, বনজঙ্গল পার করে তবে ভবানিপুর গ্রামটা থেকে রোজিপুর আসা যায়?’
এমন সব প্রশ্নের উত্তরে বিজয় মূক হয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে বলে, ‘এসব তুমি কি বলছ আন্নার মা?’
বৈঁচির ঘোমটাটা পুরোপুরি খসে পড়ে। দরজাটা ভেতর থেকে ছিটকিনি তুলে দিয়ে পাশে এসে বসে। বিজয়কে সে কোনদিনই খুব বেশী লজ্জা পায় না, ধরতে গেলে এ লজ্জার আড় বিজয়ই তার ভেঙেছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের নৈকট্য না থাকলে সে সম্পর্কের আত্মীয়তা থাকে না, শুধু থাকবে ভোগের সম্পর্ক। তা বিজয়ের দেওয়া তত্ত্বের দায় তাকে মানতে হবে। বৈঁচি স্বামীর পায়ের কাছে বসে। বোঝায়, ‘দুনিয়াসুদ্ধ মানুষ জানে শেখর অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় এখানে এসে উঠেছে। তার চিকিৎসার দরকার। এমন অবস্থায় এ মানুষকে ঠেলে দেওয়া তো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তা শেখর বাবাজী তো যে সে ছেলে নয় আমাদের একমাত্র জামাই’।
বিজয় কি যেন বলতে যাচ্ছিল তার আগে বৈঁচির ডানহাতের পাতাটা বিজয়ের বাঁহাতের পাতার উপর রাখে। জলভরা চোখে বিজয়ের চোখে চোখ রাখে বৈঁচি, টপটপ করে জল নেমে আসে। মিনতি জানায়, ‘তুমি এ নিয়ে দ্বিমত করো নাগো। আন্না আমাদের একমাত্র সন্তান। ওর কথা একটাবার ভাবো। বিনা দোষে তেনারা আমাদের কত বড় শাস্তি দিয়েছেন। আন্নার বাড়ন্ত গড়ন, ঘর বসতের নিয়ম অনুযায়ী এক বছর ধরে বাপের বাড়ি না রেখে ধুলো পায়ে ঘরবসত করানোর জন্য বেয়ান ঠাকরুনের হাত ধরে কত অনুরোধ করেছিলাম। তা অহংকারী মানুষ সে কথা কানেই নিলেন না’।
এ খবর বিজয়ের অজানা ছিল তাই বলে ওঠে, ‘সেকি! এ তো আমি জানতাম না’।
বৈঁচি অশ্রুসজল চোখে হাসে, ‘তুমি পুরুষমানুষ সংসারের কূটকাচালির মধ্যে তোমায় টেনে আনা কি ঠিক?’
বিজয়ের বুক খালি করে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। বহুদিন আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে যায়। সে সময়টার সঙ্গে আজকের সংসারের এই ঘটনার কোনও মিল নেই। তবু মনে পড়ে যায় অনেক কথা। তিতুমির বলতেন, ‘বড় স্বার্থের জন্য অনেক সময় ছোটো স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়। কিন্তু এখানে কোনটা বড়ো স্বার্থ আর কোনটা ছোটো স্বার্থ, সেটা গুলিয়ে যায় বিজয়ের। তবে শেষ পর্যন্ত বৈঁচির জয় হয়। বিজয় মনে না নিলেও মেনে নেয়। স্নেহ যে বড়ো বিষম দায়। আর স্নেহ যে মানুষকে নিম্নগামী করে দেয় একথা কে না জানে!

প্রথম কিছুদিন বাধোবাধো ঠেকলেও আন্না এখন বেশ সরো হয়ে গেছে স্বামীর কাছে। ঘোমটা দিয়ে খাটের পাশে দাঁড়িয়ে পুটুর পুটুর করে অনেক কথা বলে, শোনে। এর মধ্যে কবিরাজ এসে দুবার দেখে গেছেন। ওষুধপথ্যের ঠিকঠাক ব্যবস্থা করে গেছেন আর আন্নার কানেকানে একটা কথা বলে গেছেন, ‘দিদিভাই এইবেলা তোমাকে একটা কথা চুপিচুপি বলে রাখা ভালো, বাবাজীর ভালো হয়ে ওঠায় আমার কোনও কেরামতি নেই, সবটাই তোমার হাতযশ’।
লজ্জার আভা লেগেছে আন্নার গালে। গালের টোল ফেলে হেসেছে আর একটা জিনিস মনে মনে বুঝেছে আন্না - এই মানুষটার সঙ্গে সঙ্গে সবসময় থাকতে কি যে ভাললাগে। কাছে গেলেই মনে হয় সুখ, স্বামী সুখ। রাতে একঘরে শুলেও এক খাটে শোয় না আন্না। নীচে বিছানা করে ঘুমায়। তবে ঘুমায় আর কতটুকু সারাক্ষণই মাথায় হাওয়া করছে নতুবা হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। একদিন শেখর আন্নার হাতটা ধরেছিল। উফ কি শিহরণ। মাগো মানুষ মানুষের অঙ্গ স্পর্শ করলে এত ভাললাগে! শেখর মৃদু আকর্ষণ করে আন্নাকে কাছে টেনেছিল। শেখর একটু একটু করে সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিষয় বুঝতে পারে তার পুরুষত্ব জাগ্রত হচ্ছে। আন্নার হাতে ওষুধ খাওয়া, খাবার খাওয়ার বদলে অন্য কিছু পেতে ইচ্ছে করছে। আন্না একদিন শেখরের কোঁকড়া চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলে, ‘হ্যাঁগো তাকে দেখতে কেমন ছিল?’
শেখর যেন সত্যি ভুলে গেছে, তাই অবাক হয়ে তাকায় আন্নার দিকে। তারপর জিজ্ঞাসা করে, ‘কাকে?’
‘কাকে আবার? সে রাতে যার সঙ্গে তোমার বে হল, তার কথা শুধচ্ছি’।
ঐ পুঁচকে কাপড়ের দলার সাজে মেয়েটার কথা মনে পড়তেই একটা কথা মনে হয় শেখরের তা হল পেচ্ছাপ করে বিছানা ভাসানো। ঘৃণায় মুখ কুঁচকে ওঠে, একটা বমির ভাবও আসে। কোনরকমে নিজেকে সামলে বলে, ‘তুমি কোনদিন ও নিয়ে আর কিছু বলবে না। আমি যে সব সব ছেড়ে শুধু তোমার কাছে চলে এসেছি’।
সহসা আন্নার দু’হাত মুঠিতে ভরে নিজের বুকের উপর চেপে ধরে বলে, ‘তুমি আমার এইখানে আছো আন্না। আমি তোমাকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারি না’।
আশ্চর্য শশিকলার সন্তান হয়ে শেখর এত আবেগ পেল কোথায়?
শেখরের পাতলা লাল ঠোঁট জোড়া গ্রাস করে নেয় আন্নার। আঃ কি স্বাদ। পুলকে ভরে যায় শরীর মন। আন্নার চিবুক হেঁট হয়ে বুকের সঙ্গে মিশে যায়। লজ্জার আবেশে দুচোখ বুজে আসতে চায়। এইজন্য বোধহয় মা আন্নাকে বারবার বলে, ‘আন্না স্বামী হল গে পরম ধন। একে বুক দিয়ে আগলাতে হয়। এর সোয়াদ আর কিছুতে মেলে না। মেয়েমানুষ সমস্ত জীবন দিয়ে একটু একটু করে এই উপলব্ধির দোরগোড়ায় পৌঁছয়। তবু কতটুকু সে তার ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। অসংখ্যবার মুখ ধুলেও এ সোহাগ থেকেই যায়। এ হল তোর ভালোবাসার মানুষ। দেবতার দেবতা’।
হ্যাঁ এমনটাই মেয়ের কানের কাছে বলে বৈঁচি। অহরহ বলে। সে মা। নিজের মেয়ের জীবনের সুখশান্তির জন্য অন্যের কথা ভাবতে যাবে কেন? তর্কের খাতিরে মেনে নিতে হয় পুরুষমানুষের একাধিক বিবাহ শাস্ত্রসম্মত। কিন্তু সে তো নেহাত দায়ে পড়ে। এখানে শেখরের কোন দায়টা পড়েছিল? আন্না কি মা হতে পারবে না? আন্না কি ভ্রষ্টা? আন্না কি মৃতবৎসা? না কুলীন কন্যাকে উদ্ধার করার দায় রামতনুর পরিবার ঘাড়ে নিয়ে আন্নার জীবনটাকে নিয়ে বাঘবন্দির খেলা খেলল! তাছাড়া বিজয়ের কিছু শিক্ষা বৈঁচির ভেতরেও গেছে। সেই জ্ঞান কুলকুণ্ডলিনী পাক খেয়ে উঠে আসে। তা হল হৃদয়ের বন্ধন - ত্বমসি মম জীবনম্‌ ত্বমসি মম হৃদয়ম্ .........।
শেখর আন্নাকে ভালোবাসে। পাগলের মতো ভালোবাসে। এ কথা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। নতুবা নদী সাঁতরে অমনভাবে মরণকে পায়ে ঠেলে আসতে পারে! আর সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে আন্নার সিঁথির সিঁদুরের জোরই তো তাকে এ যাত্রা বাঁচিয়ে তুলল। এসব আখ্যানের মধ্যে ঐ পাঁচ বছরের হাবিরানি ফুঁৎকারে উড়ে যাবে বৈকি। জন্ম ইস্তক মাকে খেয়েছে। ভাগ্যে শেখর পালিয়ে এসেছে নতুবা না জানি আন্নার কপালেও কি দশা ঘটত। না এসব কি ভাবছে বৈঁচি! হে মা জগদম্বা মাপ করে দিও। মায়ের মন তাই কি ভাবতে কি ভেবে ফেলেছে। তার সঙ্গে অবচেতন মনের আর একটি যে তার মনের ভিতর গুমোরের নোঙর ফেলে তা হল – “বড্ড দেমাক তোমার না শশিকলা? ভেবেছিলে আমার ঘরের সকল আলোর পিদিম নিভিয়ে দিয়ে তুমি ঘরে রোশনাই জ্বালবে? দেখো এখন তোমার শিবরাত্রির সলতে কেমন আমার হাতে। আমি তাকে যেমন জ্বালাবো তেমনি জ্বলবে”।

এদিকে শেখর একটু সুস্থ হওয়া ইস্তক তার কলেজের চিন্তা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। বিমান হয়তো চিন্তা করতে করতে এতদিনে কতগুলো পত্র পাঠিয়ে দিয়েছে তার ঠিক নেই। না বিমানকে খুব তাড়াতাড়ি একটা পত্র পাঠাতে হবে।
বিজয়ের সঙ্গে শেখরের দেখা এবং কথা হয় খুব কম। দিনান্তে বিজয় একবার খোঁজ নিতে আসে, ‘কেমন আছো শেখর?’
শেখর মাথা নেড়ে বলে, ‘ভালো’।
বিজয় একটু সময় চুপ করে থাকে। তারপরই সে ঘর ছেড়ে চলে যায়। কেন জানি শেখরকে এভাবে দখল করে ভোগ করবার মধ্যে কোনও আনন্দ খুঁজে পায়না সে। কেবলই মনে হয় অন্যের সম্পত্তি কোনও কারণে তোমার ঘরে চলে এসেছে বলে যার ধন তাকে ফিরিয়ে না দিয়ে ভোগ করবে তুমি? শিষ্টাচারে বাধে বিজয়ের। কিন্তু আন্নার উজ্জ্বল মুখখানার দিকে চেয়ে সে শিষ্টাচারে বাঁধ দিতে হয়।
শেখর আন্নাকে বলে, ‘আন্না তোমার বাবাকে বোলো তো আমাকে একটা খাম এনে দিতে। বিমানকে একটা পত্র পাঠানো দরকার। সে হয়তো আমার কথা ভেবে ভেবে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। তাছাড়া আমার পরীক্ষা সামনে’।
শেখরের একবারের জন্যও মনে হয়না এরপর তার মেসের খরচ, কলেজের খরচ কে চালাবে?
আন্না বলে, ‘তোমার দুর্বল শরীর। তুমি লিখবে কেমন করে? তার চেয়ে তুমি বল আমি লিখে দেই’।
খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে শেখর, ‘তুমি লিখতে জানো!’
আন্না হাসে, ‘আমি ইংরাজি বর্ণও চিনি। তবে চুপ। একথা যেন আমার মা কক্ষনও না জানতে পারে। মা বলে, ম্লেচ্ছ ভাষা শিখলে নাকি বিধবা হয়’।
শেখর কৌতুক করে, ‘তবে তুমি শেখ কেন?’
‘আমার যে অনেক কিছু জানতে শিখতে খুব ভাললাগে’।
স্ত্রী গর্বে শেখরের সুন্দর মুখটা আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। নির্নিমেশ চেয়ে থাকে ঐ পানপাতা ডৌলের ভরাট মুখটার দিকে। সামান্য হাসলেই আন্নার গালের টোলের খাঁজটা পাগল করে দেয় শেখরকে। এ বাড়ির মানুষগুলো এমনকি পোষা জীবজন্তুগুলোর প্রতিও কেমন মায়া পড়ে গেছে শেখরের। বাগদি বৌ যখন কাকভোরে এসে আন্নার মায়ের পোষা সখের হাঁসগুলোকে ডাক দেয় তাদের ঘর থেকে বার করে পুকুরে নিয়ে যাওয়ার জন্য - ‘আঃ চৈ চৈ’ কি সুন্দর শোনায়। আন্নার বাবা যখন সকালে মুগুর ভাজে, অনেকবার শেখর জানলা খুলে দেখেছে। সব থেকে ভালো লাগে শেখরের বিজয় যখন গম্ভীর গলায় স্নান সেরে এসে সূর্যের দিকে মুখ করে সুর তুলে সূর্য বন্দনা করে তখন শেখরের রোমকূপ খাঁড়া হয়ে ওঠে। মনে হয় তুচ্ছ এই জগৎ সেই সঙ্গে তুচ্ছ এই মানুষের বেঁচে থাকা। মনটা বিহ্বল হয়ে পড়ে। বিজয় ঠাকুরঘরে ঢুকে ধ্যান, জপ করে আর আন্নার মা সমস্ত গৃহস্থালীর কাজ করে যায়। কিন্তু কোথাও কোনো হাঁকডাক নেই, চীৎকার-চেঁচামেচি নেই। অথচ শেখরদের বাড়ী ফি সপ্তাহে যে লক্ষ্মীর ব্রতকথাটুকু পড়া হয় তাতেও আড়ম্বরের শেষ নেই। শশিকলার অবশ্য অক্ষরজ্ঞান নেই, তাই সে এই ব্যাপারে অসহায়। তাই অন্যের পড়ে দেওয়া ব্রতকথা শুনে পুণ্য অর্জন করে। সংসারের কল্যাণ কামনা করে। শেখরদের বাড়ীর সব কিছুতে দেখনদারি যেন বেশি, অন্তরের যোগাযোগ নেই। কিন্তু সে এত বাড়ী বাড়ী ভাবছে কেন। সেখান থেকে সে তো জন্মের শোধ চলেই এসেছে। তবে? না সেখানে শেখরের জন্য কেউ নেই। শেখর পুত্রসন্তান হয়েও যেন তাদের হাতের পুতুল। যেমন খুশি সাজাবে, শেখরকে সাজতে হবে। তাঁদের ইচ্ছা হল শেখরকে বর সাজাবে তাই বলা নেই, কওয়া নেই দুম করে বিয়ের ঠিক করে বসলে। এই দুই বাড়ির মধ্যে সব থেকে প্রভেদ হল বিজয় যেখানে নীলচাষে পতিত হয়ে যাওয়া জমি কিভাবে চাষযোগ্য করে তোলা যায় তার জন্য মরীয়া, সেখানে রামতনু লাটকে লাট পতিত জমির মালিক হয়ে যাচ্ছে। প্রায় সময় বলে, ‘টাকি পর্যন্ত সড়ক পথ হয়ে গেছে। এই বাদার জঙ্গল আর জঙ্গল থাকবে না বেশি দিন। এখানে সাপ-খোপ, বাঘ-ভালুকের বদলে হবে মনুষ্য বসতি। তখন এই অঞ্চলের মাটি সোনার চেয়েও কাঁড়া হয়ে যাবে’। রামতনু সবসময় একটা কথা বলে, ‘মনে রেখো শেখর জমি বাপের নয়, দাপের। দবদবা যার যত বেশি সে তত বেশি জমিদার’।
কিন্তু নরম মনের শেখর কোনোদিন এমন দবদবা জমিদার হতে চায় না। বরং আন্না যখন চোখমুখ উজ্জ্বল করে তার বাবার মহিমা, আদর্শের কথা বলে তখন কি যেন একটা কষ্ট বুকের ভেতর ছলকে ওঠে শেখরের। বিজয়কে বাবা সম্বোধনে ভরে ওঠে মনটা। আন্না যখন সকালবেলা শেখরের ওষুধপথ্যি দিয়ে বলে, ‘জানো আমি তিতুমীরের আন্দোলনের গল্প জানি। সে কি ভয়ংকর লড়াইটাই না করেছিল ইংরেজদের সঙ্গে। আমার ঠাকুর্দাও তো ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই করেছিল’।
এমন একটা ভাসাভাসা খবর শেখর জানে বটে তবু পুরোটা শুনতে ইচ্ছা করে। তাই আন্নার কাছেই প্রশ্ন করে, ‘তোমার ঠাকুর্দা বন্দুক নিয়ে লড়াই করেছিল?’
আন্নার পানপাতা মুখটাতে আলো ছলকিয়ে ওঠে, ‘তুমি জানো না? আমি কতবার শুনেছি সে কাহিনী। শুনবে? সে বাঁশের কেল্লার গল্প’।
শেখর এখন বেশ সুস্থ। সর্বোপরি আন্নাদের বাড়ির সকলেই এমন সপ্রতিভ সব ব্যাপারে যে আন্নার সঙ্গে, সকলের সঙ্গে কথা বলতে দ্বিধা করে না। খাঁচার ভেতর থেকে আন্নার পোষা প্রিয় টিয়া পাখিটাকে শেখর খাঁচার সামনে গিয়ে বলে, ‘বল আন্না, আন্না’।
আন্না তখন অদ্ভুত এক পুলক অনুভব করে। বিজয় আকাশের বুকে স্বাধীন দেশকালের সীমানা দিয়ে না আটকানো পাখিদের খাঁচায় বন্দী করে রাখার ঘোর বিরোধী। কিন্তু আন্নার এই প্রিয় টিয়াটা আন্নাদের আমগাছের কোটোর থেকে পড়ে গিয়েছিল। তখন পাখিটা সবে মাত্র ছানা। পড়ে গিয়ে পাখিটার ডানা ভেঙে যায়। ওড়বার স্বাদ পাখিটা কোনোদিনই পায় নি। আন্নার পরিচর্যায় পাখিটা প্রাণে বাঁচে। তাই সে এখন এ বাড়ীর পোষ্য। আন্না কথা বলতে ভালোবাসে। কথা বলার সময় হেসে হেসে কথা বলে আর চোখ বড়ো বড়ো করে অদ্ভুত এক মুখভঙ্গী করে। সে সময় শেখর স্থান, কাল ভুলে মুগ্ধ দৃষ্টীতে চেয়ে থাকে। সে আন্নাকে বলে, ‘কি হল বলো বাঁশের কেল্লার গল্প। তোমার ঠাকুর্দার লড়াইয়ের কাহিনী’।
আন্না যেন কি একটু ভাবে। তারপর মুখ উজ্জ্বল করে বলতে শুরু করে, ‘তিতুমীরের কেল্লা নাকি ভরতপুরের কেল্লার মতো সুন্দর ছিল। কেল্লার ভেতর অনেকগুলো ঘর ছিল। বাবা বলে, মৌচাকের মতো ঘরের ভেতর ঘর। ঠাকুর্দারা নাকি বলতো এগুলো এক একটা প্রকোষ্ঠ। কোনো প্রকোষ্ঠে থাকতো মজুত খাবার। কোনোটাতে থাকতো বিভিন্ন রকম অস্ত্রশস্ত্র। তরবারি, বর্শা, সড়কি, বাঁশের তৈরী ছোটো বড়ো লাঠি। আবার জানো বেল, পাথরও থাকতো। বাবা বলে, একবার ভাব আন্না কি অসমসাহসী মানুষ ছিলেন এই তিতুমীর’।

বিজয় অনেকক্ষণ থেকেই উত্তরের বারান্দা থেকে মেয়ে আর জামাইটিকে লক্ষ্য করছিলেন। আন্না তার প্রাণ পুত্তুলি একথা সত্যি কিন্তু কখনও কোথাও যেন না দেখা বাপ-মা মরা বিয়ের রাতেই স্বামী পরিত্যক্তা একটা কচি মুখ মনে পড়ে। সে এখন কি করছে? তার ভবিষ্যৎখানার কি হবে! বিজয় শুনেছে শেখরের বাবা সেই বাচ্চা মেয়েটাকে ভবানীপুরে নিয়ে গিয়ে মহা সমারোহে প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু সে তো বিগ্রহহীন মন্দিরে পুজো করার সমান। আবার নিজের মেয়ের উজ্জ্বল মুখটার দিকে তাকিয়ে কোন বাবা জামাইকে বলতে পারে, বাবাজী আন্নাই তোমার কেবল স্ত্রী নয়। আরও একজন আছে। তোমার প্রতি তারও সম অধিকার। সেও তোমার অগ্নিস্বাক্ষী করা স্ত্রী। মেনে তোমাকে নিতেই হবে এ অমোঘ সত্য। কিন্তু বাস্তবে তা করা হয় না। বরং খানিকটা কৌতুহলেই দুই কিশোর কিশোরীর গল্পের মাঝখানে এসে উপস্থিত হয়। যা একেবারেই বেমানান। দৃষ্টিকটু এবং লোকলজ্জারও বটে। কিন্তু তাজা প্রাণের বাতাস যে এ বাড়ীর ওপর দিয়ে সব সময় বয়ে যায়। কৌতূহলই হয় বিজয়ের আন্না তার কিশোর স্বামীটিকে হাত মুখ নেড়ে কি এত বোঝাচ্ছে! আর বাধ্য ছাত্রের মতো শেখরও সে সব মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যাচ্ছে।
বিজয়ও হাসি মুখে আন্নার পাশে এসে দাঁড়ায়। শেখর শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াতে যায়। বিজয় বাধা দেয়, ‘না বাবা তুমি বস’। কৌতুক করে বলে, ‘আন্না কি তোমাকে কলেজের পড়া পড়াচ্ছে নাকি শেখর’।
কথাটা শেষ করে নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে ওঠে বিজয়। আন্না পাকা গিন্নীর মতো বলে ওঠে, ‘ও কিচ্ছু জানে না বাবা। তিতুমির যে নীল সাহেবদের সঙ্গে কি ভীষণ মরণপণ লড়াই করেছিল আর সে লড়াইতে যে আমার ঠাকুরদাও ছিলেন সে গল্পই ওকে বলছিলাম’।
নিজের বাবার প্রসঙ্গে বিজয়ের ঋজু শরীরে প্রশস্ত বুকের ছাতিটা আর একটু প্রশস্তই হয়। চোখের পাতা জোড়া তিরতির করে কি এক গর্বে কেঁপে ওঠে। শেখর সরে গিয়ে সম্ভ্রমের সঙ্গে বলে, ‘আপনি বসুন না বাবা’।
কিশোর এই ছেলেটার মুখে ‘বাবা’ ডাক যে কি মিষ্টি শোনায়, বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে বিজয়ের। কি লোভনীয় ডাক এই ‘বাবা’।
আন্নাও সরে বসে, ‘হ্যাঁ বাবা বস। তুমি ওকে গল্পখানা বল দেখি। আমি কি ছাই এত মনে রাখতে পারি। তুমিই বল আমি বরং আর একবার শুনি’।
এমন সুখের নীড়ের হিমেল বাতাসকে কে সাধ করে ছেড়ে দিতে চায়। বিজয়েরও যেন এক ঝটকায় অনেকখানি বয়েস নেমে আসে। বিজয় শ্বশুর, বাবার দূরত্ব ঘুচিয়ে কথক ঠাকুরের ভূমিকায় আসরে অবতীর্ণ হয়। আর মুগ্ধ বিস্ময়ে মনোযোগী দুই শ্রোতা অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে বিজয়ের দিকে। বিজয় নারকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে পিছলে পড়া চিরকি কাটা রোদটার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তিতুমিরের পুরো নাম মীর নিসার আলি। নির্ভীক, অকুতোভয়, জাতপাতের উর্ধে ছিল এই মানুষটি। নির্ভীক এই মানুষটির কাছে হিন্দু মুসলমান কোনও ভেদাভেদ ছিল না। নীলকরদের অত্যাচারে মানুষ যখন দিশাহারা, দিনের পর দিন দোফসলি, তেফসলি জমির বুকে মহাদেবের হলাহল পান করার মতো বিষের নীলে জর্জরিত, গ্রামের পর গ্রাম নীলকর সাহেবদের ভয়ে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে সে সময় এই অসমসাহসী মানুষটি এক সংগ্রামী বাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনী প্রথমে একজোট হয়ে আক্রমণ শুরু করে হিন্দু মুসলমান জমিদারদের। এর পর আঘাত আনতে শুরু করে ইংরেজ শাসকদের উপর। ভয়ে ইংরেজ শাসকরা সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। চারদিকে তিতুর চর। তাদের মাধ্যমে খবর পেয়ে নিজেদের পরিকল্পনা অনুসারে ঝাঁপিয়ে পড়ে তিতুর অনুগামীরা। ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার পরিচালিত বাহিনীকে গোবরডাঙ্গার কাছে এক যুদ্ধে বিদ্ধস্ত করে তিতুর বাহিনী। তিতু মরীয়া হয়ে ওঠে। ইংরেজদের রক্তে জয়টীকা পরাতে চায় দেশমাতৃকার ভালে। তিতুর শক্তি ক্রমশ বেড়ে যায়। নদীয়া, বারাসাতের বহু তালুকদার, মহাজন ও ধনী মুসলমানরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালায়। তিতু নিজেকে বাংলার মুসলমান শাসক হিসাবে ঘোষণা করে। তিতুর নির্দেশে এসব এলাকার প্রজারা জমিদারকে খাজনা দেওয়া বন্ধ করে। এদিকে আলেকজান্ডার বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ গভর্ণর জেনারেল লর্ড বেন্টিঙ্ক পেলেন। জমিদারদের স্বার্থ রক্ষায় তার আদেশে নদীয়ার কালেক্টর ও জজ বহু সৈন্য ও হাতি নিয়ে স্থল ও জলপথে তিতুর বাঁশের তৈরি দুর্গ ধ্বংস করতে বাদুরিয়ার নারকেল বেড়িয়া গ্রামে যাত্রা করল’।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিজয় বলে, ‘জান শেখর আমাদের এই দেশমায়ের সেদিন নদীয়া আর গোবরডাঙ্গার কিছু অপদার্থ জমিদার পাইক বরকন্দাজ নিয়ে তিতুর বিপক্ষে ইংরেজ বাহিনীর পক্ষে যোগ দিল’।
এ কথাটা বলে থেমে যায় বিজয়। তার গৌরবর্ণ প্রশস্ত কপাল শ্বেতবিন্দুতে ভরে গেছে। প্রকাশ না করলেও বোঝা যাচ্ছে বিজয় রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়তে চাইছে। কপালের নীল শিরাগুলো দপদপ করছে। ভয় পেয়ে যায় আন্না। শেখরও। আন্না বাবার হাত ধরে ঝাঁকাতে থাকে, ‘বাবা ও বাবা তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?’
শেখরেরও একই প্রশ্ন।
একটু সময় নিয়ে একটা শ্বাস ফেলে বিজয়, ‘কিছু না। আমি ঠিক আছি’।
ফস করে শেখর বলে ওঠে, ‘থাক বাবা আপনার ওসব বৃত্তান্ত আর বলতে হবে না’।
সম্পর্ক ভুলে বিজয় একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ওঠে, ‘সে কি গো শেখর দেশকালের খবর না জানলে, না রাখলে জীবনটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে কি করে? শুধুই খাওয়ার পরে শোওয়া বা শোওয়ার পরে খাওয়া আর কতগুলি সন্তানের জন্ম দিয়ে জীবনটাকে মজিয়ে দেওয়া! সেই সঙ্গে আর এক নেশাও অবশ্যি আছে, সম্পত্তি ও স্ত্রীধন বাড়ানো। নতুবা আমি ভূস্বামী তার ঠাটবাট বজায় থাকবে কি করে’।
শেষ কথাটায় শেখরকে কেউ যেন চাবুক মারে। আহত চোখে এই দুর্দান্ত পিতৃসম অভিভাবকটির দিকে তাকায় শেখর।

বৈঁচি রান্নাসালে বসে অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিল বিজয় মেয়েজামাই নিয়ে কি এত গল্প করছে! কৌতূহল মেটাতে না পেরে আসে। দরজা ধরে অনেকক্ষণ শোনে। কিন্তু জামাইকে এমন রূঢ় ভাষণের পর সে আর কপাটের আড়ালে থাকতে পারে না। ঘরে ঢুকে স্পষ্ট ভাষায় তিরস্কারের সুরে স্বামীকে বলে, ‘বাবাজীর দুর্বল শরীর, তুমি কি না ওকে বিশ্রাম নিতে না দিয়ে তখন থেকে বকিয়ে মারছ?’
আন্না প্রতিবাদ করে ওঠে, ‘কৈ মা বাবা তো কিছু বলে নি, উনিই তো তিতুমিরের গল্প শুনতে চেয়েছিলেন’।
বৈঁচি এতক্ষণে ক্ষোভ প্রশমন করবার ঠিকঠাক জায়গা পায়। আন্নাকে ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘ছিঃ আন্না তুমি কি এখনও সেই ছোটো মেয়েটি রয়ে গেছো নাকি? আজ বাদে কাল স্বামীর সঙ্গে ঘর করতে যাবে, সংসারের তো কোনও কাজই তোমার বাবা তোমায় শিখতে দেয়নি। এখন তো খানিক আমার হাতে হাতে সাহায্য করলে পারো’।
বিজয় বুঝতে পারে না তার ভুলটা ঠিক কোথায় হয়েছে। তাই চুপচাপ ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। আন্নাও মায়ের পিছুপিছু আসতে গেলে বৈঁচি হেসে বলে, ‘ওমা তা বলে আমি কি তোমাকে এখনই হেঁশেলে আসতে বলেছি নাকি?’
আন্নাকে পুরস্কার এবং তিরস্কার দুটোর সময়ই বৈঁচি ‘তুমি’ করে বলে।
বৈঁচি চলে যেতে শেখর মনে মনে ভাবে বিজয় মানুষটা যদি সত্যিকারের বাবা হত তাহলে শেখরের জীবনটা নিয়ে অত বড়ো অবিবেচনার কাজ করতে পারতো? সেই সঙ্গে বৈঁচির কথাটাও মনে হয়। আন্না শেখরের সঙ্গে ঘর করতে যাবে মানে? কোথায় যাবে? শেখরের ঘর কোথায়?



সাবুর মা এ বাড়ির রাতদিনের ঝি হিসাবে বহাল হয়েছে। অবশ্য কবে না কোন কাজে ছিল না সাবুর মা। এ বাড়ির ঠাকরুনের যখন প্রসব বেদনা ওঠে তখনও তো এই সাবুর মা গিয়ে দাই বুড়িকে ডেকে আনে। শেখরের থেকে সাবু বছর আটেকের ছোটো। এ বাড়ির উঠোনেই ধুলো মাখতে মাখতে সে বড়ো হয়ে গেল। সাবুর মায়ের জীবনের কাহিনীটি বড়ো নির্মম। কায়েতের ঘরের মেয়ে। শশিকলার বাপের বাড়ির দেশেই তার বাপ দাদাদের মাথাগোঁজার আশ্রয়। সে সুবাদে শশীর কাছে সাবুর মায়ের একটা বাড়তি খাতির আছে এবং সে বিশ্বস্ত। দুজনের মধ্যে কিছুটা বন্ধুসুলভ গল্পগাছাও হয় বটে। সেই সাবুর মায়ের বিয়েও হল শশিকলার শ্বশুর বাড়ির দেশ ভবানীপুরে। ভুজঙ্গ জঙ্গলে মধু আনার কাজ করতো আর অন্যসময় মাছ ধরতো, কাঠ কাটতো। শেখরদের বাড়িতে নানা ধরনের কাজেই ডাক পড়তো ভুজঙ্গর। কায়েতের ছেলে অভাবের তাড়নায় যখন যা পায় তাই করে। তবে ভুজঙ্গর একটা সাংঘাতিক নেশা ছিল তা হল বাঁশি বাজানোর নেশা। রায়মঙ্গলের উথালপাতাল ঢেউ দেখত। আর আপন মনে বাঁশি বাজাতো। কখনও বা বিভিন্ন পালাগানের দলের সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যেত। আর ফিরেও আসতো। লম্বা পিঠটান দিলে তখন সাবুর মায়ের দুর্গতির শেষ থাকতো না। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন কে কতদিন দুঃখ সোহাগ জানাবে এই জলা-জঙ্গলের দেশে। এখানে বেশীরভাগ সবাই গরীব মানুষ। তাই সাবুর মাকেই ঘুরে দাঁড়াতে হয়, স্বাবলম্বী হওয়ার ব্রত নিতে হয়। ভবানীপুর গ্রামটা সাবুর মায়ের শ্বশুরবাড়ির দেশ বলে এখানে তার বাপমায়ের দেওয়া বাহারে নামটা ‘সোহাগী’ বলে প্রায় কেউ ডাকেই না। আর বিয়ের পর মেয়েমানুষের নাম নিয়ে কুটকাচালি কেই বা করবে। সে তো তখন মা, জেঠি, কাকী, মামী, বৌদি, বৌমা ভূষণে ভূষিত, ফলে কে আর সাধ করে ডাকবে? তবু কখনও কোথাও কেউ কি ডাকে না? ডাকে। সাবুর মাকেও ডাকে - সোহাগী। সে ডাকে সোহাগীর রোমাঞ্চ হয় না, বড়ো ভয় করে। তবু প্রত্যুত্তর না দিয়ে থেমে যায় তার চলার গতি। ঘোমটার আড়ালে নিরুচ্চারে জানতে চায় – কি বাবু?

সাবুর মায়ের জীবনের নির্মম গল্পটা হল ভুজঙ্গ আজ বারো বছর হতে চলল বেপাত্তা। ভুজঙ্গ যখন বেপাত্তা হল সাবু তখন তার মায়ের গর্ভে সবে রক্তের গুটি পাকিয়েছে। সাবুর মা নিজেও ঠিকঠাক বোঝে নি তখন তার আগমনের বার্তা। ফলে ভুজঙ্গ জানতেই পারলো না তার উত্তরাধিকারী এখন পাঠশালায় যাচ্ছে আর তার মা পুরনো পরিচয়ের সুবাদে শশিকলার অনুগ্রহে খাস ঝিতে বহাল হয়েছে। এখন তো শশী আবার ফরমান দিয়েছে - তুই এখানে এসে পাকাপাকি থাক সাবুর মা। শশী কিন্তু বাপের ঘরের পরিচিত সাবুর মাকে সোহাগীই ডাকতো, কিন্তু শ্বশুর ঘরে শশীর আসনখানা সচেতন রাখতে সম্বোধন বদলিয়েছে। তাই ‘সাবুর মা’। আর সাবুর মার কাছে ‘ঠাকরুন’।
ভুজঙ্গর নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পর বারোটা বছর অপেক্ষা করতে হবে সাবুর মাকে। তারপর বিধান মতে সাদা থান গায়ে জড়িয়ে জন্মের শোধ এয়োস্ত্রীর সকল চিহ্ন ধুয়ে মুছে ফেলতে হবে। কিন্তু যদ্দিন না সেদিন আসছে মাছ হেঁশেলে ঠাই আছে তার। তবে পাকাপাকি রামতনু মুখার্জীর ঘরে উঠে আসতে চায়নি সে। আর সাবুর মায়ের এ বাড়িতে পাকাপকি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার খবরে রামতনু কুণ্ঠিত হয়েছিলেন।

শেখরের এই লণ্ডভণ্ড বিয়েটাকে কেন্দ্র করে অনেক কিছু তো ওলটপালট হয়ে গেছে সেখানে সাবু আর সাবুর মা জগৎসংসারের দুটো ক্ষুদ্র মনিষ্যি জীবনের দুটো পালক উড়ল কি পড়লো তাতে কার কিবা যায় আসে। তবে মহিমের মৃত্যুর পরদিন কাঁচপোকা গ্রাম থেকে ভবানীপুরে যোগেন এসেছিল মহিমের মৃত্যুর খবর নিয়ে। রাস্তায় সাবুকেই জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘মুখুজ্জেদের বাড়িটা কোন দিকে ঠিক খোকা?’
কোঁচড়ের খুটে কি যেন একটা খুঁজে নিয়ে ধুলো ধূসরিত গোপাল বালকটি তর্জনী উঁচিয়ে দেখিয়ে দেয় - ঐ তো উই যে মাঠের আল বরাবর হেঁটে গেলেই সে বাড়ি। তারপর একটু চিন্তা করে বলে - আমার সাথে চলো। আমরা তো এবার থেকে ও বাড়িতেই থাকবো।
যোগেনের কিছু ভালো লাগছিল না। সে কিছুতেই এখানে আসতে চাইছিল না। এত বড়ো ভয়ঙ্কর খবরটা সে পৌঁছে দেবে কি করে। বারবার বলেছিল - আমায় মাপ করুন বৌঠান। আমার দ্বারা এ কাজ অসম্ভব। তখন কমলাই তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল - আপনি তাহলে বলে দিন কার দ্বারা এ কাজ সম্ভব। আমি তো সকলের চোখের বিষ, আমার কথা কেউ শুনবে না। তাই আমার হয়ে আপনি তাকে অনুরোধ করুন।
যোগেন তখন একটা কথা না বলে পারে নি - এটা কি ঠিক হবে বৌঠান। তেনারা বড়ো ঘর। উঁচু ঘর। দেখলেন না কত সহজে প্রথম পক্ষকে ত্যাগ দিয়ে তারা দ্বিতীয় বিয়ের আয়োজন করলেন।
কমলা মনে মনে বলেছিল - হু তারা উঁচু দরের মানুষ বলে তাদের কর্মটি নজরে আসছে আর আমার মতো নিচু মনের মানুষের কোনও খলই আপনার চোখে পড়ছে না কেন কায়েত ঠাকুরপো। কিন্তু মুখে বলেছিল - আমার মন চাইছে খুদকুঁড়ো যা জোটে তা দিয়ে তেরাত্রির শ্রাদ্ধে হাবি আসুক। সে না আসলে ওনার আত্মা আমায় ক্ষমা করবে না।
সত্যি কি কমলা এতটাই রাতারাতি স্বচ্ছ মনের হয়ে গিয়েছিল না সুন্দরবনের খুঁড়িখাঁড়িগুলোর মতো আঁকাবাঁকা জলজ পথে তার মনের গুপ্ত বাসনা সেখানে ছিল না ‘বড়োলোক কুটুম হাতছাড়া করা যাবে না’।
কিন্তু যোগেন যে সেদিন পুকুরধারে কমলার দুঃখে কাতর হয়ে পড়েছিল আর তারপর কেবলই মনে হচ্ছে - কমলা বৌঠানের যন্ত্রণাটা কেউ বোঝে না এমন কি মহিমও বোঝে নি।

সাবুর সঙ্গে যোগেন এই নিয়ে দ্বিতীয়বার এ ভিটেতে পা রাখে। প্রথমবার এসেছিল শেখর আর হাবির বিয়ের কথা চালাচালির সময়।
সাবু তার কচি গলায় চীৎকার করে - ঠাকরুণ তোমার বউ-এর বাপের দেশের লোক এয়েছে।
হাবি ঘুমাচ্ছিল। তার জ্বরজ্বর ভাব। আর হবে না টাই বা কেন, ঐটুকু মানুষটাকে নিয়ে দুদিন ধরে তো কম ঘূর্ণিপাক খাওয়া হচ্ছে না।
রামতনু শশীর সঙ্গে বসেছিল। তিনি প্রায় নাওয়া খাওয়া ত্যাগ করেছেন। নিজের একমাত্র সন্তানের জন্য এভাবে তার দর্পচূর্ণ হবে একথা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি। বারবার তার একটা কথাই মনে হচ্ছে মানী লোকের মান গেলে থাকেটা কি?
যোগেন রামতনুর উঠোনে দাঁড়িয়ে চারদিক নজর করে ভাবে সত্যি এদের দবদবার কথা কারো সঙ্গে তুলনা হয় না। প্রাচুর্য যেন চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বিশেষ করে ধানের গোলাটির দিকে তাকিয়ে কমলার জন্য পুরুষ হৃদয়টা আর্দ্র হয়ে ওঠে। মানুষটার যে আগামী দিনগুলো কি করে চলবে। ঐ দুটো কচি বাচ্চার জন্য তার ভাবনা হয় প্রকৃত অভিভাবকের মতো। কমলার বন্ধুর মতো। সময়টা যেহেতু বৈশাখের শেষাশেষি তাই জামরুল গাছটায় সাদাসাদা থোকা থোকা রসালো জামরুলগুলোর দিকে তাকিয়ে যোগেনের জল পিপাসাটা বেড়ে যায়। এখনকার মতো তখন তো আর অলিতেগলিতে নলকূপের ব্যবস্থা ছিল না। আর এই বাদার দেশে জল মানেই আকুচ নুনে ভরা। মিঠে জলের পুকুর আছে তবে তা খুবই কম। আর বেশীর ভাগ পুকুরেই বড় মিঞাদের আনাগোনা।
যোগেন মনে মনে অস্থির হয়ে ওঠে - এরা কি যোগেনের সঙ্গে দেখাই করবে না। হাবিটাকেও দেখার জন্য মনটা ছটফটিয়ে ওঠে আর সে সময় প্রায় সমবয়সী দুজন স্ত্রীলোক ঘোমটা টেনে বারমহলে আসে। সালঙ্কারা চাঁপাফুলের মতো হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে যোগেন বুঝতে পারে ইনিই শেখরের মা - এ বাড়ির কর্ত্তী।
শীর্ণকায় স্ত্রীলোক যে কিনা ‘সাবুর মা’ সে এগিয়ে এসে বলে - ভিতরে আসেন কুটুম। ঠাকুরকে খবর করা হয়েছে। আসছেন। ছায়ায় বসে প্রাণটা জিরোক।
তারপর শশীর ইশারায় স্ত্রীলোকটি বাড়ির ভিতরে অদৃশ্য হয়ে যায়। শশী একটু উম গোছের শব্দ করে। আলাপ চালায় - কুটুম বাড়ির খবর কুশল তো?
এমন প্রশ্নে যোগেন প্রথমটা হতবাক হয়ে যায় - সেকি! কাঁচপোকা তো পাশের গ্রাম, এত বড়ো ভয়ঙ্কর খবরটা এদের কানে এসে পৌঁছোয় নি? তারপরেই মনে হয় পৌঁছবেই বা কি করে। মহিম এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছে মোটে তো একটা দিনরাত হল অথচ মনে হচ্ছে কতদিন যেন মহিম নেই। মহিম নামের মানুষটা যে কিনা আবাল্যের সঙ্গী ছিল যোগেনের, সমস্ত সুখদুঃখের সাথী ছিল সেই মহিম আজ নেই। যোগেনের দাওয়ায় এসে যখন তখন বলবে না - চারটি কিছু খেতে দেবে খুড়ি। সেই সকালে বেড়িয়েছি পেটে কিছু পড়ে নি। অথবা যোগেনকে বলে উঠবে - চলো যোগেন অনেকদিন মাছ ধরতে যাই না। মাছ ধরা ছিল মহিমের সাংঘাতিক নেশা।
শশীর কথার জবাবে কি যে বলবে যোগেন ভেবে থই পায় না, তাই ফস করে বলে ওঠে - মহিম তো নেই ঠাকুরুণ।
শশী অবাক হয় না। মনে মনে ভাবে বেয়াই মনে হয় শেখরের তল্লাশে গেছে। চাপা দীর্ঘশ্বাস শব্দ করে বেড়িয়ে আসে। হাবির জীবনটা নিয়ে তাদের যে দুর্ভাবনার শেষ নেই এটা তো সত্যি। শুধুমাত্র অগ্নিস্বাক্ষী করে গোত্রান্তর হয়ে গেছে বলে হাবিকে দখল করলেও শশীও বুঝতে পারছে হাবির জীবনটা বড় আলগা হয়ে গেল। খুব বড় একটা শূন্য দিয়ে শশী হাবির জীবনটা মিলিয়ে দিয়ে টগরমণিতে উত্তীর্ণ করতে চাইছে।
শশী শুধোয় – বেয়াই কোথাও গেছেন?
যোগেন ডুকরে কেঁদে ওঠে – হ্যাঁ ঠাকুরুণ মহিম চিরকালের মতো দেশান্তরী হয়েছে।
শশী ভয় পেয়ে যায়।
যোগেন ধুতির কোঁচায় চোখের জল মুছে বলে - গতপরশু ভোর রাতে মহিম গলায় দড়ি দিয়েছে ঠাকুরুণ। বোধকরি হাবির কথা ভেবে মাথাটাই খারাপ হয়ে গেছিল। পোড়াকপালি হাবির দুর্দশা মেনে নিতে পারে নি মহিম।
শশীর মনে হয় জগৎ সংসারটা তার সামনে দুলছে। আর খটখটে রোদে ভাসা চারদিকটা এত অন্ধকার মনে হচ্ছে কেন? হাবির দুর্দশার কথা ভেবে মহিম গলায় দড়ি দিয়েছে! এও ছিল শশীর ললাটে। ভবানীপুরের মুখার্জী বাড়িতে ঠাই পেয়েও মহিম মেয়ের জীবনের দুর্দশার কথা ভেবে পাগল হয়ে গিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিল। এতটা অপমান! এই অপমানের শিকড়ে পৌঁছোতে গিয়ে সেই আন্না নামের মেয়েটার বিন্দুতে পৌঁছোয় শশী। চোখদুটো জলে ভিজে আসার বদলে যেন জ্বলতে থাকে। এ অপমানের শোধ নেবে শশী, কিন্তু কার উপর - কে সে? শশী শঙ্কিত হয় এরা কি হাবিকে নিয়ে যেতে চায়! কিন্তু হাবি যে তার তুরুপের তাস। ঐ আন্নাকালিকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার জন্য এত বড় হাতিয়ার আর কোথায় পাবে। আর শেখর, মা বাপকে ছেড়ে কত দূর যাবে শেখর। হাবির যা রঙ রূপ দুচার বছর পরে আর চোখ ফেরানো যাবে না। তখন শেখর কেমন সরে থাকতে পারে সে দেখা যাবে। তাছাড়া শশী তো ঠিকই করেছে আন্নাকালির পরিবারের শিক্ষার গুমোর ভাঙার জন্য হাবিকে সে লেখাপড়াও শেখাবে।
যোগেনের কথায় শশীর ঘোর কাটে - আজ্ঞে ঠাকরুণ আমার একটু তাড়া আছে। মহিমের পরিবারে তেমন কেউ তো নেই, এখানে আমাকেই যা করার করতে হবে। বৌঠান বারবার বলে দিয়েছেন হাবিকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে। মেয়েটা তো মহিমের বুকের পাঁজর ছিল। তাই ...
যোগেনের কথা শেষ হওয়ার আগেই রামতনুর খড়মের শব্দ শোনা যায়। পেছন পেছন বড় কাঁসার থালায় শরবৎ, ফল আর ফেনি বাতাসা নিয়ে নিঃশব্দ পায়ে সাবুর মা।
রামতনু এসে হেসে বলে - দেরী হল আসতে। আপনি হঠাৎ? তবে বৌমার খবর নিতে আসতেই পারেন।
একই কথা বারবার বলতে ভালো লাগে না যোগেনের। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। তবু বলে মহিমের অপঘাতে মরার কথা। বলতে হয় তাকে।
রামতনু চেয়ারের উপর ধপ করে বসে পড়ে। মনে হয় তার মাথার ভিতর দিয়ে ষ্টীমারের ভোঁ শব্দে কিছু একটা চলছে। মনে হচ্ছে বুকের ভিতর অবিরাম ঘাই মেরে চলেছে মাছেরা আর সমস্ত চেতনায় রামতনুর দড়াম দড়াম করে বাজ পড়তে থাকে।
সাবুর মা আড়চোখে রামতনুকে দেখে নিয়ে যোগেনকে বলে - কুটুম এটুকু খেয়ে নিন।
যোগেনের চোখে তখনও জল, শরবতের গ্লাসটা তুলে নিয়ে বলে – আর পারবো না। আপনারা হাবিকে একটু ডেকে দেবেন, ওকে নিয়ে যাই।
‘সেই তো’ বলে রামতনু সাবুর মাকে কি যেন নির্দেশ দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই শশী বিনয়ের সঙ্গে বলে ওঠে - সেখানে গিয়ে বেয়ানের দুর্দশা বাড়িয়ে আর কি করবে আমার টগরমণি। তার চেয়ে আমি এখানে ওর সব ব্যবস্থা করে দেব।
যোগেন বাস্তবিক বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। এরা হাবিকে তার সঙ্গে পাঠাবে না? আর হাবিই বা কে এরা তো হাবিকে আস্ত টগরমণি বানিয়ে ফেলেছে।
বাইরের রোদটা কেমন গেরুয়া রঙের আকার নিয়েছে। অদ্ভুত বৈরাগ্যের তেজে ভেসে যাচ্ছে চারদিক। যোগেন মরীয়া হয়ে বলে - একটিবার মেয়েটাকে ডেকে দেবেন, দেখে যাই।
না, শশী এতটা নির্দয় না, শান্তভাবে বলে - দিচ্ছি তবে বাপ মরার খবরটা বলবেন না, আমি বুঝিয়ে বলবো।
শশী ভিতরে চলে যেতে বড় শান্ত হয়ে যায় পরিবেশটা। শুধু প্রত্যেককে ঘিরে উষ্ণ রুদালি বাতাস নৃত্য করে চলে শনশন করে।
রামতনু বুঝতে পারে বড় পাপ হয়ে গেছে কোথাও। সাবুর মা মায়াভরা চোখে দুটি পুরুষের দিকেই তাকায়। তারপর নিঃশব্দ পায়েই চলে যায়। দুটি পুরুষের দীর্ঘশ্বাসের দূষণে দগ্ধ হতে থাকে প্রকৃতি।
অল্প সময়ের মধ্যেই শশী হাবিকে নিয়ে এসে হাজির হয়। যোগেন দেখে এই সকালেও হাবির পরনে নতুন কাপড়, ভর্তী গহনা। যোগেনকে দেখে হাবি ছুটে এসে যোগেনের গলা ধরে ঝুলে পড়ে - খুঁড়ো, বাবা পাঠাল বুঝি, আমি জানতাম বাবা একদিনও আমায় না দেখে থাকতে পারে না। আমি এখানে অনেক মাছ, মণ্ডা খাচ্ছি। আমার শাউড়ি বলেছে সে সত্যকারের মা আমার।
যোগেন হাবিকে বুকে টেনে নিয়ে বলে - উনি ঠিকই বলেছেন উনিই তোমার সত্যিকারের মা। এখানে ভালো করে থাকো। এটাই তোমার নিজের বাড়ি।
হাবি জিজ্ঞাসা করে - বাবা, মা ভাইরা কি করছে খুঁড়ো।
যোগেন আর দাঁড়াতে পারে না। হাবিকে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়, হাত জোড় করে যাই বলে আর দাঁড়ায় না। এর মধ্যে শশী ঘর থেকে কাপড়ে মুড়ে কি যেন এনে যোগেনের সামনে ধরে বলে - এটা কমলা বোনকে দেবেন, বলবেন তার ভবানীপুরের দিদি পাঠিয়েছে আর সে যেন জগৎসংসারে কখনও নিজেকে একা না ভাবে।
হাবি এ সব কথার মানে বুঝতে পারছিল না। খুঁড়োকে দেখে সে তার কাঁচপোকা গ্রামে যাওয়ার জন্য বায়না জুড়ে দেয় – ও খুঁড়ো আমাকে নে যাবে না।
যোগেন অসহায়ভাবে তাকায় হাবির দিকে, কি বলবে সে?
শশী ঘোমটাটা টেনে বলে - ছোটো মেয়ে আপনাকে দেখলে বায়না করবে। ওকে তো আসতে আসতে এই সংসারটাকেই নিজের সংসার ভাবতে হবে।
যোগেনের জিভের ডগায় একটা কথা এসে গিয়েছিল - কাকে নিয়ে এখানে নিজের ঘর বাঁধবে সে, শেখর কোথায়?
কিন্তু হাবি এখানে অন্তত খাওয়াপরায় সুখে থাকবে, তাই চুপ করে থেকে পিছন ফিরে হাঁটতে থাকে। ফড়ফড় করে বাতাসের মতো হেঁটে চলে। অদ্ভুত এক ভিতরঘুন্নায় লাট খেতে খেতে মৃত বন্ধুর উঠোনে গিয়ে পৌঁছয় যোগেন। সদ্য বিধবা কমলা ছেলেদুটো কোলে নিয়ে দাওয়ায় কাঁঠাল গাছটার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। বড় নিস্তব্ধ নিঃসঙ্গ মহিমের ঘরদুয়ার। আর সেই নিঃসঙ্গতাটাকে আরও গিলে নিচ্ছে কোনও এক উদাসী ঘুঘু।
কমলা শুকনো চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে চায়।
যোগেন কাঁঠাল গাছের গুঁড়ির কাছে বসে পড়ে - হাবিকে ওরা পাঠাল না বৌঠান।
কমলার ভেতরটা আর্দ্র হয়ে হাহাকার করে ওঠে - মৃত স্বামীকেই তিরস্কার করে ওঠে - এত বড় শাস্তি দিলে তুমি আমায়......।
যোগেনের খেয়াল হয় ধুতির কোঁচড়ে বাঁধা শশিকলার দেওয়া বস্তুটা, কোঁচড় থেকে বার করে কমলার হাতে দেয়।
কমলা বলে - কি আছে এতে?
যোগেন বলে - জানি নে, ও বাড়ির ঠাকুরণ দিল, বলল - কমলাকে বলবেন সে যেন নিজেকে জগৎসংসারে একা না মনে করে, এই দিদিটি তার সবসময় আছে।
লাল কাপড়ের টুকরোয় মোড়ানো প্যাকেটটা খোলে কমলা। মৃদু হাসি তার ঠোঁটে। হাবিকে রফা করে শশিকলা কমলাকে তাহলে ঠিকই চিনেছে। তবে প্যাকেটটা খুলে অবাক হয়ে যায় কমলা - টাকা, এত টাকা! বাপের জন্মে কমলা কেন যোগেনও দেখেনি কখনও। দুজনেই হতভম্ব হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
যোগেনের মাথায় তখন একটা কথাই ঘোরে রামতনু মুখার্জীর পরিবার সত্যি খুব উঁচুদরের। আর কমলা ভাবে শশিকলা রফাটা খুব ভালো মতোই করলো। কমলা যোগেনের হাতে প্যাকেটটা দিয়ে বলে - আমার মাটির ঘর। ছেলেদুটোকে নিয়ে একলার জীবন। এ টাকা আপনার কাছে থাক। শ্রাদ্ধ সারুন ভালো করে। গ্রামের সব ব্রাহ্মণ ঘরে নতুন বস্ত্র দেবেন। আর শ্রাদ্ধের দিন সকলের কাছে বলবেন এক বছরের মধ্যে গয়ায় পিণ্ড দিতে যাবেন।
যোগেন বুঝতে পারে কমলা এই টাকার জোরে এত কথা বলছে। মনে মনে একটু ক্ষুণ্ণ হয়। কেন সে কি ভাবছে যোগেন কমলার জীবনে অপরিহার্য। হায় পুরুষ মন! যোগেন অভিমানী স্বরে বলে - গিয়ে তোমার ফলাহার নিয়ে আসি।
কমলা একটু গম্ভীরভাবে বলে – না, আপনি খুড়িমাকে পাঠিয়ে দিন।
যোগেনের তীব্র অভিমানের সঙ্গে অপমান যোগ হয়।
কমলা ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বলে - ঠাকুরপো আমার কিন্তু জগৎসংসারে সত্যি আপনি ছাড়া আর কেউ নেই।








১০

তিতুর গল্পটা সেদিন মাঝপথে থেমে গেছিল। কিন্তু শেখরের মনে তারপর থেকে কি যেন হতে থাকে। শেখর এখন বেশ সুস্থ। জানলা দিয়ে শেখর পুকুরের দিকে চেয়ে থাকে। একরাশ অদৃশ্য হাওয়ার দাপটে রোদ্দুর মোহরকুচি হয়ে ধানমেলার মতো ছড়িয়ে গেল পুকুরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। বাতাসের জলের কুচিতে তিরতিরে ঢেউ জাগে। ঢেউয়ের ওঠানামা দেখতে দেখতে শেখরের শরীরে কাম জাগে। মিলন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। ঢেউয়ের জলজ চেহারাগুলো অবিকল যেন কোনও নরনারীর অবয়বের আকার পায়। ঢেউয়ের মুদ্রাগুলো দেখলে শেখরের মনে হয় সেই নরনারীর সর্বপ্রিয় আদিম রিপুর খেলা, সম্ভোগ। শেখরের ঠোঁট শুকিয়ে আসে। মনে হয় গণ্ডূষে পান করে নেয় ঐ জল। শরীর জুড়ে তাপপ্রবাহ জাগে। জানলার খড়খড়িতে ঠোঁট ছুঁইয়ে আস্বাদ নেয়। বিড়বিড় করে বলে – আন্না।
পেছন থেকে খিলখিল হাসির শব্দে ধ্যান ভাঙে শেখরের। সত্যি সত্যি আন্না। কিন্তু একি রূপ তার, লালপেড়ে গরদ। কপালে শেষবেলার সূর্যের মতো ইয়া বড় লাল সিঁদুরের ফোঁটা। সিঁথিতে ডগডগে করে সিঁদুর। পায়ে আলতা, গা ভর্তী ঝলমল করছে সোনার গহনা। জানলা দিয়ে আসা রোদ পড়ে আন্নার নাকের নথখানা যেন ঝলমলিয়ে ওঠে। হা করে চেয়ে থাকে শেখর। সব সাজকে ছাপিয়ে আলো হয়ে ওঠে আন্নার হাসি। এত হাসছে কেন আন্না? শেখরের শরীর মনে ঘোর লেগে যায়। না শেখরের কোনও লজ্জা করে না এভাবে চেয়ে থাকতে আন্নার দিকে। আন্নার মুখ থেকে বুকে দৃষ্টি নামে শেখরের। পাকা পেয়ারার মতো সুস্বাদু ফল যেন আন্নার শরীরে বসানো। শেখরের ইচ্ছা করে আন্নার গায়ের জামা খুলে ঘ্রাণ নেয় ঐ ফলদুটোর৷ ছুঁয়ে দেখে। মুখ রাখে।
আন্না শেখরের কাছে এসে ঠেলা দেয় – কি হল গো তোমার? এই ভরদুপুরে তোমায় নিশিতে পেল নাকি?
শেখর উন্মাদের মতো এক ঝটকায় আন্নাকে কাছে টেনে নেয়। বেচারি সামলাতে না পেরে খাটের উপর চিৎ হয়ে পড়ে। শেখরের পুরুষত্ব তখন সমগ্র অর্থেই জাগ্রত। নদীর ভরা কোটালের বান ডাকার মতো হুড়মুড়িয়ে ঢুকছে কামনার জল। শুধুমাত্র একটা নারী শরীর, তার ভিতরে এত আনন্দ পাওয়া যায়! এত আরাম! শেখরের ইচ্ছা করে এই শরীরটার সবকিছু সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। পরতে পরতে কি এমন আছে এর ভিতরে। ইচ্ছা করে লেহন করে স্বাদ নেয় আন্না নামক এই মেয়েটার সমস্ত শরীরের, আনাড়ি চুম্বনে কমলালেবুর কোয়ার মতো আন্নার পুরু ঠোঁটজোড়া তখন শেখরের মুখের ভিতর। শেখরের জিহ্বা আন্নার মুখের স্বাদ নিচ্ছে। শেখর নিজেও জানে না তার হাতটা কখন উঠে এসেছে আন্নার পেয়ারা জোড়ায়। পিষ্ট হচ্ছে। আনাড়ি অনভিজ্ঞ যুবতীর জামার বোতাম হাতড়ে বেড়াচ্ছে। আর আন্না? তার শুধু মনে হচ্ছে শেখর এখনই এমন কিছু করুক যাতে তার শরীরটা আরও পিষ্ট হতে পারে। দুহাতে সে কখন যেন আঁকড়ে ফেলেছে শেখরকে। বুঝিবা দুই জানুও কিছু ফাঁক করে ফেলেছে। আর তখনই বৈঁচি চেঁচিয়ে ওঠে – আন্না, কিরে প্রসাদী ফুলটা না নিয়েই চলে গেলি?
আন্না এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করে। তখন সে রীতিমতো হাফাচ্ছে। আর শেখরের গৌরবর্ণ শরীরে ঘামের ফোঁটাগুলো যেন এক একটা মুক্তো বিন্দু। শেখর আন্না দুজনেই দেখে দরজাটার আগল লাগানো পর্যন্ত ছিল না। আন্না আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। ধ্যাবড়া সিঁদুরে মুখময় মাখামাখি হয়ে আলুথালু শাড়ি সামলাতে সামলাতে ছুট লাগায়।
বৈঁচি ঠাকুরঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এমনভাবে ছুটে আসার জন্য আন্নাকে কষে একটা ধমক লাগাতে গিয়ে থমকে যায়। তারপরই পুলকে ভরে যায় মন – দরজা দিয়ে ভিতরে বিগ্রহদের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে বলে - ঠাকুর তুমি এতদিনে মুখ তুলে চেয়েছো।

বৈঁচি অভিজ্ঞ, সংসারী, বুদ্ধিমতী বর্তমানে গিন্নীও বলা যেতে পারে। সে জানে কিভাবে প্রিয় পুরুষের তেষ্টার জল, শ্বাস নেওয়ার বাতাস হয়ে উঠতে হয়। যত দুর্দান্ত পুরুষই হোক না, কামনার নারীর শরীর তাকে পাগল করে দেবেই। পুরুষের পাগলামিতে মদত দিয়ে কিছুটা উদাসীন কিছুটা লজ্জা কিছুটা বা অংশগ্রহণে জীবন ধন্য হয়। মনে হয় বেঁচে থাকতে আর কি চাই - কিন্তু সংসার জলে অনেক দিন সাঁতরে বৈঁচি এখন বোঝে ওপরআলার ইচ্ছাতে যার ভাগ্যে যেটুকু আয়ুরেখা এঁকে দিয়েছে সেটুকু লঙ্ঘন করা কারোরই সম্ভব না। সে হিসাবে জীবন অনেক বড় আর সেই জীবনটাতে পুরুষের তেষ্টার জল আর শ্বাসের বাতাস হয়ে থাকলেই চলবে না। কিছু ডাঙা জমিরও প্রয়োজন - ঘর ফসলের জন্য। ফসলের কথা মনে হতেই বৈঁচি যেন স্পষ্ট দেখতে পায় আন্নার কোলে ছোট্ট ফুটফুটে সন্তান যাকে নিয়ে বৈঁচি নাড়ছেচারচে। আন্না তার অনেক বয়স খেয়ে হয়েছিল। তারপর আর ঠাকুর মুখ তুলল না। স্বামী তাকে যতই বোঝাক সংসারে পুত্র, কন্যা উভয়ই সমান কিন্তু বৈঁচির ভিতর একটা পুত্র সন্তানের আকাঙ্ক্ষা আজও বুঝি আছে। মরবার পর ছেলের হাতের আগুনটুকু না পেলে এ দেহ শুদ্ধ হয়ে স্বর্গ যাত্রা কি হবে!

আন্না ঘরে গিয়ে কিছু একটা ফেলেছে, বাসনকোসনই হবে। ঝনঝন শব্দটা তেমনই শোনাল। জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার ঘোর কেটে যায় বৈঁচির। আন্না ব’লে চেঁচিয়ে ওঠার আগেই পেছনে ভরাট এবং অতিপ্রিয় পরিচিত কণ্ঠস্বরে ফিরে তাকিয়ে দেখে বিজয়। বৈঁচির ভেতরে কি যেন জেগে উঠেছে। সে শাশুড়ি হয়েছে। মেয়েজামাই এ গৃহেই আছে তা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে আরক্ত হয়ে ওঠে তার মুখ। কিছুটা খাটো কিন্তু মেদুর কণ্ঠে বলে, ‘কতদিন পরে তোমার মুখে নিজের নামটা শুনলাম। আমার যে একটা বৈঁচি বলে নাম আছে তাতো ভুলতেই বসেছিলাম’। অভিমানে নাকের পাটায় কম্পন হয় বৈঁচির।
বিজয় সেসব খেয়াল করে না। খেয়াল করবার মতো অবস্থাও তার নেই। সে শোওয়ার ঘরে ঢুকে গম্ভীরভাবে ডাক দেয়, ‘ভিতরে এসো আন্নার মা। জরুরী কথা আছে’।
বৈঁচির এতক্ষণ ধরে মাথার ভিতর একদল প্রজাপতির কোরাস মিথুন নাচ মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যায়। কি এমন ঘটনা ঘটলো, মানুষটাকে তো সাধারণত এমন চিন্তিত তেমন কখনও দেখা যায় না। কোনও চিন্তাই যেন তাকে পেড়ে ফেলতে না পারে সেজন্য বিয়ের পর থেকেই বৈঁচি দেখে আসছে বিজয় রোজ ধ্যান করে। বলে এতে নাকি শরীর মন দুইই বশে থাকে। নিজের শরীর মনের চাবি নিজের হাতেই থাকে, তাকে ইচ্ছামতো খোলা-বন্ধ করা যায়।
নিঃশব্দ পায়ে ঘরে আসে বৈঁচি। স্বামীর পাশে বসে। বন্ধুর মতো শুধোয়, ‘হ্যাঁগো কি হয়েছে? কোনও খারাপ খবর?’
শান্ত, স্থিতধী, প্রাজ্ঞ, জ্ঞানী, নির্ভীক, বিদ্বান বিজয়েরও স্বভাবের স্খলন ঘটে। উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠে, ‘অন্যের ধনকে নিজের বলে ভাবা যায়, ভালবাসা সম্মান করা যায় কিন্তু তাকে কখনই ভোগ করা উচিত না। এতে পাপ হয়। মহাপাপ। আর এই পাপের সাজা বইতে হয় জীবনভোর’।
ধৈৰ্য্য হারায় বৈঁচিও। বিষয়টা যে শেখরকে নিয়ে সেটা বুঝতে পারে, তাই তার ভিতরেও রোখ তৈরি হয়, ‘বলবে তো কি ঘটেছে’।
বিজয়ের চোখে জল। গলা কেঁপে ওঠে, ‘শেখরের বাবা শেখরকে ত্যাজ্য করেছে’।
মুহূর্তের জন্য বৈঁচিও কেঁপে উঠে টাল খেয়ে যায়। পালঙ্কের বাজু ধরে সামলায় নিজেকে। শূন্য দৃষ্টিতে আড়ার দিকে তাকায়। ফ্যাসফ্যাসে ভয়ার্ত গলায় কোনরকমে বলে, ‘হে রাধামাধব, এসব কি বলছ তুমি! শেখর তাদের একমাত্র সন্তান। এ কাজ তারা কোনমতেই করতে পারে না - তাছাড়া সে কি এমন মহা ঘোর অন্যায়, পাপ কাজ করেছেটা শুনি?’
বিজয় মুহূর্তকাল স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক। বৈঁচিকে তার বরাবর যোগ্য সহধর্মিনী মনে হয়েছে। সময় বিশেষে প্রিয় সখি ভাবতেও অসুবিধা হয় নি। কিন্তু এ কোন বৈঁচিকে সে আজ দেখছে? কে এ! শুধুমাত্র স্বার্থ একজন মানুষকে এত নির্মম করে তোলে! বিস্ময়বোধ গোপন রাখতে পারে না বিজয়। বলেই ফেলে, ‘কি বলছ কি তুমি আন্নার মা? শেখর পাপ করেনি? কোনও পাপই কি করেনি শেখর? ক্ষুদ্র স্বার্থের বশে তুমি এত বড় অন্যায়কে, পাপকে সমর্থন করছ?’
আগুনে কর্পূর দেওয়ার মতো দপ করে জ্বলে ওঠে বৈঁচি, ‘ক্ষুদ্র স্বার্থ? কিসের ক্ষুদ্র স্বার্থ? নিজের সন্তানের স্বার্থ দেখা, ভালোমন্দ চিন্তা করা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা করার মধ্যে তুমি কোথায় ক্ষুদ্র স্বার্থ দেখলে আন্নার বাবা?’
এ প্রশ্নের কাছে বিজয়ের মতো বিপুল হৃদয়ের মানুষও অসহায় হয়ে পড়ে। বিজয় আধভেজা দরজা দিয়ে বাইরে তাকায়। দেখে উল্টোদিকের ঘরগুলো যেখানে এখন শেখর আছে তার বারান্দায় খাঁচায় রাখা পোষা প্রিয় টিয়াপাখিটাকে কাচালংকা খাওয়াচ্ছে আর বিড়বিড় করে কি যেন বলছে আন্না। এমন একটা দৃশ্যে বিজয়ের হৃদয় দ্রব হয়ে আসে। কথা হারায় বিজয়। খুব অসহায় লাগে। মনে হয় নদীকে যেমন প্রবল পরাক্রান্ত বাঁধ দিয়ে রোধ করা হয় তাকেও বুঝি বা থামিয়ে দিয়েছে। শুধু নিষ্ফল দুঃখ কষ্ট আক্রোশে ফেনিল জলরাশি যেমন বোল্ডারে বারবার তার শতসহস্র জলজ ফনার ঝাপটা দেয় তেমনই হচ্ছে তার ভিতরটা। কি করবে সে? সে যে পিতা আর ঐ স্বাস্থ্যবতী কিশোরী মেয়েটি তার আত্মজা। তার ঔরসজাত। তার রক্ত। স্নেহের পুত্তলি।
বৈঁচির ভেতরটা রাগে দপদপ করছে। কামারশালায় যেমন নিরেট গনগনে ইস্পাতে হাতুড়ী পিটিয়ে লোহা বেঁকানো হয়ে গেলেও ইস্পাতের গনগনানি থামতেই চায় না এও তেমনি। তবু বিজয় তার স্বামী। মন চাইলেও সব কথা মুখে বলা যায় না। সম্ভ্রম এবং সম্মান দুইই রক্ষা করতে হয়। তাই সমস্ত রাগ আক্রোশ ক্ষোভ গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসে। গলে জল হয়ে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে চোখ থেকে গাল চিবুক হয়ে নেমে আসে। যতটা ঝাঁঝ তৈরি হয়েছিল ততটা আর থাকে না। শুকনো মাটিতে জল পড়ার মতো আর্দ্র হয়ে ওঠে। অপেক্ষাকৃত কোমল সুরে বলে, ‘তুমি আমার ক্ষুদ্র স্বার্থের কথা বলছ আর তেনারা কি করলো, তাদের কর্মটা অন্যায় নয়?’
এ কথার উত্তর বিজয়ের জানা নেই, তাই আপনা হতেই তার দৃষ্টি নত হয়। কথা হারিয়ে যায়। নিজেকে নিজেই যেন বলে, ‘আর সেই মেয়েটা, হতভাগী, শুনেছি তো জন্ম ইস্তক মাকে হারিয়েছে। বিয়ের রাতে স্বামী ত্যাগ করলো, বাবাটাও আত্মঘাতী হল। সন্তানের জন্য কত যন্ত্রণা আর কত উৎকণ্ঠা ভয় সব তৈরি হলে মানুষটা আত্মঘাতী হতে পারে’।
মুহূর্তে সেই হতভাগ্য পিতার সঙ্গে নিজের পিতৃহৃদয় একাকার হয়ে ভুঁইয়ে লুটিয়ে পড়ে বড় অকিঞ্চনের মতো লুটোপুটি খেতে থাকে। বিজয় যেন স্পষ্ট অনুভব করে শ্বাসরোধ হয়ে গেলে মৃত্যুযন্ত্রণা কত ভয়ঙ্কর কষ্টের হয়। কত নির্মম হয়। এক বগ্‌গা ফনফনে ঈষৎ ধুলটে সবুজ লাউডগা গাছটা উঠোনের দক্ষিণ পার্শে মাচাটাকে ঢেকে ফেলেছে। জালি এসেছে অসংখ্য। সেদিকে চেয়ে বিজয়ের ভিতরেও একটা ভরভরন্ত সংসারের কোলাহল চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আন্না, আন্নাকে কেন্দ্র করে শেখর, আন্না শেখরকে কেন্দ্র করে তাদের সন্তানসন্ততিরা, বড় আহ্লাদ, বড় সুখ। বিজয় বুঝতে পারে তার গলার ফাঁস যেন ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যাচ্ছে। বুক ভরে প্রাণবায়ু নিচ্ছে বিজয়। এই পৃথিবীর সুগন্ধি বাতাস।
বৈঁচির চোখের জল চোখেই শুকায়। স্বামীর দিকে চেয়ে মনে হয় – কি পাষাণ হৃদয় মানুষ। নিজের মেয়েটার কথা একবারও ভাবছে নাকো। তেনারা অর্থ প্রতিপত্তির দবদবায় আজকের দিনের নিরিখে একটা তুচ্ছ কারণে ত্যাগ দিতে পারে তাতে কোনও অন্যায় নেই, পাপ নেই? কোনও আলাপ আলোচনা করে বিধিখন্ডন ব্যবস্থা না করে কোথাকার কোন হাড়হাভাতে ঘরের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিল।
বৈঁচি আর বসে না। চৌকাঠের ওপারে একটা পা রাখতেই বিজয় ফাঁকা মাঠে বয়ে যাওয়া হাহাকার করা বাতাসের মতো বলে ওঠে, ‘শুনে যাও আন্নার মা, চ্যাটার্জী মশাই শেখরকে ত্যাগ দিলেও সেই মেয়েটিকে কিন্তু ঘরে নিয়ে গেছেন এবং তাকে যথাযথ সম্মান দিয়ে অতি যত্নে তাকে প্রতিষ্ঠা করেছেন’।
চরম অবাক হয়ে বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে পড়ে বৈঁচি। স্পষ্ট বুঝতে পারে তার পা দুটো যেন কে মাটির সঙ্গে গেঁথে দিয়েছে। সমস্ত মুখ জুড়ে চোখ কান দিয়ে তার যেন আগুনের হলাহল বের হতে থাকে।
বৈঁচি বলে, ‘তবেই বোঝো কত নির্মম তাঁরা। এই তেনাদের ভদ্ররুচির পরিচয় মাগো ছিঃ...’।
বৈঁচিকে কেটে দিয়েই বিজয় জোর গলায় বলে ওঠে, ‘চুপ কর আন্নার মা। নিজের স্বার্থ দেখতে দেখতে তুমি অন্ধ হয়ে গেছো’।
বৈঁচি আর নিজেকে সামলাতে পারে না। তার ভিতরে কঠিন কটু যা আছে সব আজ উগড়ে দিতে চায় তার স্বামীর কাছে। তাই সম্মানের সীমা লঙ্ঘন করেই বলে ওঠে, ‘না বাপু তোমার মতো পরার্থপর হওয়ার থেকে ছোটমনের স্বার্থান্বেষী হওয়াই ভালো, তাতে অন্তত সংসারটা বাঁচে। সংসারের মুখে হাসি ফোটে’।
খাঁচায় থাকা টিয়েটা দু’বার ডানা ঝাপটা দিয়ে ‘আন্‌না আন্‌না’ বলে উঠলে বৈঁচি আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। দুপদাপ পা ফেলেই চলে যেতে গিয়েও ফের একবার দাঁড়িয়ে পড়ে। আগুন চোখে তাকায়, ‘তুমি এই বৃত্তান্তগুলো কোথা থেকে জানলে বুঝলে শুনি - মন করি সেই ভালোমানুষের পোরা নিজেরা স্বেচ্ছায় গায়ে পড়ে এ কাহিনী শুনিয়ে যান নি...’।
বৈঁচির কথা ফুরানোর আগেই বিজয়ও সমকণ্ঠে বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ তেমনটাই। ও বাড়ির জামাই গঙ্গা বাবাজীবনের সঙ্গে আজ বসিরহাটে দেখা হয়েছিল। সে তার প্রথম পক্ষের বড় মেয়ের শ্বশুরবাড়ি গাছা থেকে আসছিল। ইছামতীর ঘাটে দেখা হয়। সেই বলল। এও বলল এখান থেকে কাঁচপোকা গ্রামে যেতে হবে। সেখানে শেখর যাকে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেছে সেই মেয়েটির বাবা আত্মঘাতী হয়েছে। আজ তাঁর পারলৌকিক ক্রিয়া। তাই শেখরদের বাড়ির তরফে সে কুটুম্বিতা করতে যাবে’।
বৈঁচির মুখ থেকে ফস করে বেড়িয়ে আসে, ‘আত্মঘাতী হয়েছে! সেকি! কেন?’
বিষণ্ণ হাসে বিজয়, ‘এখানেও সেই স্বার্থ বুঝলে আন্নার মা। হতভাগী মা মরা মেয়েটাকে বিয়ের রাতে স্বামী ত্যাগ করে চলে গেল। আমাদের সমাজে কোন কুলীন বাপ এটা প্রাণে ধরে সইতে পারবে বল তো’।
এতক্ষণ ধরে অনেক কঠিন কটু বাক্য সে স্বামীকে বলেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সব যেন তার বাক্যহারা হয়ে যায়। হাবি নামক ছোট্ট একরত্তি অদেখা অচেনা মেয়েটার কাছে তাদের সকলের যেন কোথায় হার হয়েছে বুঝতে পারে। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে কি যেন বলতে গিয়ে থমকে গিয়ে দেখে বিজয়ের আয়ত চোখদুখানি বোজা। বন্ধ চোখের ভিতর থেকে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু নেমে আসছে। ঠোঁটদুটোও তিরতির করে কাঁপছে। বিজয় বলে, ‘তুমি এখন যাও। আমাকে একটু একা থাকতে দাও’।
বৈঁচির মনে হয় তার যেন কোথায় একটু পরাজয় হয়েছে। না না করেও একটা গ্লানি, অবসাদ, কষ্টও তাকে ঘিরে ধরে। ঘরের বাইরে এসে মাঝ উঠোনে দাঁড়ায়। সূর্যের এখন অস্ত যাওয়ার সময়। বেড়ার পাশে সাদা, গোলাপি হলুদ রঙের সন্ধ্যামণি ফুলের গন্ধ ম ম করছে।






১১

বিমানের পত্র এসেছে। শেখর কিছু মুখে না বললেও পত্র দেওয়ার পর থেকে বিমানের উত্তরের জন্য আকুলভাবে অপেক্ষা করেছে। বারবার ঘরবার করেছে। কলেজের পরীক্ষা, পড়াশোনা শরীর সুস্থ হওয়ার সাথে সাথে তাকে ব্যাকুল করে তুলেছে। সেই সঙ্গে একটা বিষয়ও তাকে বড় ব্যাথিত করে তুলেছে, তা হল বাবা মা সত্যি সত্যি তার কোনও খোঁজ করে নি। তবে মাথার ভিতর একটা বিষয় ভুলেও উঁকি দেয় নি তা হল অগ্নিস্বাক্ষী করে, সপ্তপদী হেঁটে যে মেয়েটাকে বিয়ে করেছিল তার কথা। এ জীবনের সমস্ত রাগ, ঘেন্যা সব যেন গিয়ে পড়েছে ঐ পুঁচকে মেয়েটার প্রতি। কি ঘিনঘিনে অনুভূতি সেই মেয়েটাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তা বলবার নয়। সেই সঙ্গে আর একটা ঘটনা তাকে অসহ্য করে তুলেছে তা হল তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এবং সমস্ত ঘটনার ভিতর দিয়ে আন্না প্রাপ্তি এ তার পরম বন্ধুকে না বলে স্বস্তি পাচ্ছে না। আন্নার পরিবারের প্রতি তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। সে তো মরেই গেছিল এ বাড়ির মানুষগুলো পরম যত্নে তাকে বুকে তুলে মমতায় সেবা শুশ্রুষায় বাঁচিয়ে তুলেছে। তার জীবনের জীয়নকাঠি আন্নাকে তার কাছে তুলে দিয়েছে। শেখর এখন প্রকৃত অর্থে পুরুষ। শেখর আন্নার শরীরের সাধ পেয়েছে। মেয়েমানুষ তার উপর সে যদি পরম কামনার হয় সে যে পুরুষের কতটা প্রাপ্তি, সে যে কতটা তেষ্টার জল হতে পারে সে যে পেয়েছে সেই শুধু অনুভব করতে পারে। এ যেন আজন্মের পিপাসা। এ মেটে না। মেটার নয়। যত গণ্ডুষ পান করে পিপাসা বেড়ে চলে, বেড়েই চলে। বাদার দেশে আকুচ নুনে ভরা জলের জায়গায় মিঠে জলের পুকুরের হাতছানি স্বয়ং বনের বড় মিঞাকেও টেনে আনে আর তুচ্ছ মনুষ্য জীব শেখর তো কোন ছার। শেখরের এখন যেন ভোর হলেই ভিতরে একটা অদ্যম অপেক্ষা তৈরি হয় রাতের জন্য। রাতের বেলাটা যেন শেখর আর নিজের ভেতর থাকে না। আন্না নামের যেন বেলে মাটিতে তৈরি তুলতুলে পুতুলটাকে নিয়ে খেলা যেন আর শেষ হয় না। পুতুলটা কখনও লজ্জায় হেসে লুটিয়ে পড়ে কখনও ঘনঘন শ্বাসের সঙ্গে তপ্ত হয়ে ওঠে তার সমস্ত শরীর। মুখ থেকে অস্ফুটে বার হয় কামনার শীৎকার। শেখরের তীব্র পেষণে আন্নার গোঙানি শেখরকে আরও তীব্র থেকে তীব্র করে তোলে। বাদার অসংখ্য খাঁড়ি, খাল বিলের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে চলা জটিল শিরা উপশিরার মতো জলরাশির ভিতরে যে অসংখ্য মানুষ তাদের মন, জটিল বেঁচে থাকা সব যেন বাতাসে মিশে শুধু সুখ আর সুখ। সুখের সাগর। আন্নাকে বুকের ভিতর ধরে, ঠোঁটে ঠোঁট রেখে সুখে আছে শেখর। আর আন্না, সে তো প্রতিদিনই একটা একটা করে পাপড়ি ছড়াচ্ছে। কুসুমিত হচ্ছে। তার শরীর, মন, আহ্লাদে গলে যাচ্ছে। পুরুষের আদরে তরল হয়ে যেতে কি সুখ সে শুধু মেয়েমানুষই জানে।
বিমান পত্রে লিখেছে, ‘বন্ধুবরেষু ভাই শেখর, পত্রে প্রথমে তুমি আমার অকৃত্রিম আন্তরিক ভালোবাসা গ্রহণ করিও। তোমার শ্বশুরমশাই ও শাশুড়ি মাতাকেও আমার প্রণাম জানাইও। আন্নাবৌঠানকে আমার স্নেহাশিস দিও। তোমার পত্র পড়িয়া আমার উৎকণ্ঠার শেষ নাই। তুমি যে কি নিদারুণ মনঃকষ্টে ও বিড়ম্বনার ভেতর দিয়া কালাতিপাত করিতেছ তাহা চিন্তা করিয়া আমি সহজেই অনুমান করিতে পারিতেছি। আন্নাকে তুমি যে কতটা পত্নী হিসাবে স্বীকার করিয়াছিলে এবং কতটা প্রগাঢ় প্রেম যে তোমার আন্নার প্রতি ছিল সে তোমার পরম বন্ধু হিসাবে আমি তো জানি। তোমার পিতামাতার কৃতকর্মের সমালোচনা করিব এমন ধৃষ্টতা আমার নাই, কিন্তু ওনারা তোমায় না জানাইয়া বিবাহের ব্যবস্থা করিয়াছেন সে কোথাও অবিবেচনা হইয়াছে। আর ইহার জন্য আন্নাকে যে কারণে ওনারা ত্যাগ দিতে চাহিয়াছিলেন তা প্রায় নিষ্ঠুরতার সামিল। আজকের এই নবজাগরণের যুগে তুমিও জানো আমিও জানি মানুষের শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়ার সহিত ভগবান বা মানুষের কোনও হাত নাই। ইহা বিজ্ঞান। আর এই পরম্পরা বিশ্বাস কোথাও যে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন তা আজ আর কাহারও জানিতে বাকি নাই। কিন্তু শেখর একটা বিষয় মনে কাঁটার মতো বিঁধিতেছে, তুমি যদি ঐ বালিকাটিকে বিবাহের পূর্বেই ত্যাগ করিয়া যেভাবে হোক পলায়ন করিতে বা অরাজি হইতে তাহা হইলে বোধহয় ভালো হইত। সে বেচারি কোথায় যেন নিতান্ত ভাগ্য পরিহাসের দ্বারা খেলার পুতুলে পরিণত হইল। সে বুঝিল না তাহার কি হইল অথচ তাহার ইহকাল পরকালের সবটুকুই তুমি হইয়া গেলো। পাঁচ বছরের বালিকা মানে নেহাত শিশু। আমাদের সমাজে এই বাল্যবিবাহের পীড়ন কবে যে বন্ধ হইবে, কে জানে। সতীদাহ প্রথাও তো মাত্র কয়েক বছর হইল আইন করিয়া বন্ধ করা হইয়াছে। কিন্ত তা বলিয়া কি সকলের অগোচরে কোনও কোনও বালিকাকে জীবন্ত দগ্ধ হইতে হইতেছে না! রামমোহন, ডিরোজিও, বিদ্যাসাগরের মতো কিছু মনীষী, মহান আত্মা এই পোড়া দেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিল বলিয়া রক্ষে, নতুবা আজও আকাশে বাতাসে বালিকাহত্যার মাধ্যমে সতীর জয়গান করা হইত। মাঝে মাঝে ধন্দ হয় ইংরেজরা না আসিলে সতীদাহ কি বন্ধ হইত না!
জানো শেখর, মাঝেমাঝেই বড়ো আক্ষেপ হয়, নিদারুণ মনঃকষ্টে বুকের ভেতরটা কাঁপিয়া ওঠে, এ মনুষ্যজন্ম কোনও কাজেই লাগিতেছে না। সেই কবে পিতামাতার ইচ্ছায় বিবাহ হইয়া গেছে অথচ বধূর সহিত এখনও সরল আলাপটুকুই জমিল না। সত্যিকারের সংসার পাইয়াও তাহার কাদামাটি, লতাপাতা দিয়া পাড়ার সমবয়সী সখীদের লইয়া খেলনাপাতির সংসারেই মন। অবশ্য এইটিই বয়সের ধর্ম। সেখানে তুমি ভাগ্যবান, আন্নাকে শুধু স্ত্রী নয় বন্ধু হিসাবেও পাইয়াছ। উহাকে মনের মতো গড়িয়া লও। কিন্তু গোলাপের সৌন্দর্যের ভেতর কাঁটার মতো তোমার জীবনে বিধিয়া রইলো তোমার দ্বিতীয় স্ত্রী। তুমি তাকে যতই অস্বীকার করো, মনের কোনওখানে ঠাই না দিলেও সে তোমার অগ্নিস্বাক্ষী করা, সপ্তপদী গমন মতে স্ত্রী। জানি এ সকল শুনিতে তোমার ভালো লাগিতেছে না কিন্তু ভাই শেখর ইহাই নির্মম বাস্তব।
এইবার তোমায় কিছু অন্য খবর দিই। তোমাদের বাদার দেশে সর্বোপরি তোমার এমন মানসিক অবস্থায় এসব খবর কর্ণগোচর হইয়াছে কিনা জানি না। তুমি যাওয়ার পরপরই আমার ঠাকুমা কাশী যাবেন তার আগে আমাকে একবার দেখিতে চাহিয়াছেন, সেই কারণে গৃহে যাইতে হইয়াছিল। কলকাতায় বসিয়া সংবাদপত্রে কিছু কিছু খবর পাইতেছিলাম বটে। সেখানে নীলকর চাষিদের যে কি দুরবস্থা তা নিজ চক্ষে না দেখিলে বিশ্বাস করিবে না। তুমি তো জানোই নীলচাষ আইন অনুযায়ী বন্ধ হইলেও আইনের ফোঁকর গলিয়া বেহুলার বাসরঘরে কালনাগিনী প্রবেশের মতো ১৮১৯ সালে সেই যে ইংরেজ সরকার জমিদারদের পত্তনী তালুক বন্দোবস্তের অধিকার দেয়, ইহার ফলে এক একটি পরগণায় সৃষ্টি হয় বহু তালুকের। এসব তালুক আবার পত্তনী নেয় নীলকর সাহেবরা। লর্ড আমহার্স্ট নীলকরদের অনুকূলে সুযোগ আনিয়া দেয় ১৮২৩ সালে। সে সময় যেসব রায়তরা দাদন পাইয়াছিল তাহাদের জমির উপর বিশেষ স্বত্ত্ব বা অধিকার পাইল নীলকররা। ইহাতেও তাহাদের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা মিটিল না। তাহারা নিষ্কণ্টক হইতে চায় এবং তাহাদের দাবী মিটাইতে ১৮৩০ সালের আইন। এই আইনে বলা হয় দাদন গ্রহণকারী রায়তদের নীল চাষ না করা বেআইনি। সুতরাং নীল চাষে অসম্মত রায়তদের বিরুদ্ধে এই আইন ফৌজদারি মামলার সুযোগ করিয়া দেয়। হতভাগ্য যে সব কৃষক ফৌজদারি মামলার যুপকাষ্ঠে গলা দিয়া রহিয়াছে তাহাদের দুর্দশা দেখিলে অতি পাষাণেরও হৃদয় দ্রব হইবে। তাহাদের জমি সাপে কাটা মৃতদেহের মতো নীল বর্ণ হইয়া রহিয়াছে। জমিতে লাঙল দিলে মাটি শুধু বিষ উগরায়। কোনও ফসল হয় না। তাহার পরে গোঁদের উপর বিষফোঁড়ার মতো মামলার খরচ বহন করা দিনের পর দিন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উকিল বাবুকে সঠিক টাকা দিতে না পারিবার জন্য তিনিও আদালতে দাঁড়াইয়া কথা খরচ করেন না। মামলার হার হয় রায়তদের। জেল জরিমানা, ভিটে মাটি দখল তাহাদের নিত্য সেবার মতো লাগিয়া থাকে। তুমি গৃহে যাইবার পরপর ঠাকুমার সহিত দেখা করিবার জন্য আমিও কয়েকদিনের জন্য নদীয়া গিয়াছিলাম। যাইয়া শুনিলাম আমাদের চৌগাছা গ্রামের সম্পন্ন কৃষক হরিহর কাকা দুইদিন পূর্বে নীল খাইয়া আত্মহত্যা করিয়াছেন। এমন হরিহর কাকা শয়ে শয়ে ছড়াইয়া যাইতেছে। একবার ভাবিয়া দেখ শেখর কি হৃদয় বিদারক ঘটনা। সব চাইতে দুঃখের বিষয় কি জানো এই মহতী আন্দোলনে রায়তদের কষ্টে আমাদের দেশীয় জমিদার শ্রেণীর হৃদয় বিন্দুমাত্র জারিত হয় নাই। বরং তাহারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের নীল হাত পুষ্ট করিয়াছে। নদীয়ার ম্যাজিস্ট্রেট হ্যাসেল নীল কমিশনে সাক্ষ্যে যখন বলেন – বাংলার রায়তরা যখন নীলকরদের বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রামে নামিয়া পড়িয়াছিল, তখন কিন্তু দেশীয় জমিদাররা অপমানের প্রতিশোধ নিতে কৃষকের হাত ধরে লড়াইয়ের ময়দানে নামিয়া পড়ে নাই। হয়তো কেউ রায়তদের বিদ্রোহে ছিলেন সহানুভূতিসম্পন্ন। পরোক্ষভাবে সাহায্য করিলেও মূল বিদ্রোহের বাহিরে ছিল তারা। বড় বড় জমিদাররা বরং বিদ্রোহ দমনে নীলকরদের সাহায্যে আগাইয়া আসিয়াছিল। হ্যাসেল আরও বলেন – জমিদাররা ইচ্ছা করিলে কৃষকদের যতখানি সাহায্য করিতে পারিতেন সে অনুপাতে কিছুই করেন নাই। বরং নদীয়ার কুখ্যাত নীলকর লারমুরকে বিদ্রোহ দমনে সাহায্য করিয়াছিল জমিদার শ্যামচন্দ্র পাল এবং হাবির উল হোসেন। ভাবো দেখি এ আমাদের দেশের কতখানি লজ্জা এবং কলঙ্কের কথা।
তবে হ্যাঁ জানো তো শেখর ঝাড়বাতি যাহার নাই সে প্রদীপের আলোতেই কাজ চালাইতে পারে। তোমাদের ওদিকে যেমন বিপ্লবী তিতুমীরের নাম করা যাইতে পারে আমাদের এই নদীয়াতেও বিষ্ণুচরণ, দিগম্বর বিশ্বাস, মেঘাই সর্দার এবং তাঁর স্ত্রী হেমাঙ্গিনী দেবীর নামও বলা যাইতে পারে। তাহাদের আত্মত্যাগে শেষ পর্যন্ত নীল বাঁদরেরা পিছু হটিতে বাধ্য হইয়াছে তো ............ তবে কয়লাতেই তো সোনা থাকে তাই লং সাহেবকে প্রণাম জানাইয়া পারা যায় না। তিনি নীলদর্পণের ইংরাজি অনুবাদ করিয়াছিলেন বলিয়া আদালতের শমন পর্যন্ত পাইলেন।
যাহা হউক শেখর এসব তোমার সহিত সাক্ষাৎ হইলে সব বলিব। এখন তুমি সত্বর কলিকাতা চলিয়া আইস। কলেজে পড়াশোনায় তুমি সত্যই অনেক পিছাইয়া পড়িয়াছ। তবে চিন্তা করিও না। আমি তোমার জন্য সকল কিছুই নকল করিয়া রাখিয়াছি। কলেজের স্যারেরাও তোমার খবর শুধাইতেছিলেন। আমি রাস্তায় রাস্তায় দেওয়াল পত্রিকা প্রকাশ করিয়া টাঙাইয়া দিব। এ ব্যাপারে তোমার সহিত আমার প্রচুর পরামর্শের প্রয়োজন।
তোমার শরীর মনের কুশল কামনা করিয়া পত্ৰ শেষ করিলাম। তবে পত্রপাঠ তুমি উত্তর করিও বা তার করিও –
ইতি
তোমার একান্ত বন্ধু
বিমান’।

শেখর পত্রখানা পরপর দু’বার পড়ে। তাঁর এখন নীলচাষ বা সেই সংক্রান্ত কোনকিছু ভালো লাগছে না। তবে কলেজের পড়াশোনা, সেখানকার পরিবেশ, বন্ধুদের কথা যেন হুড়মুড়িয়ে মনে পড়ে যায়। বহুদিন বইপত্তরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই। কিন্তু দ্বিতীয়বার অগ্নিসাক্ষী করে বিবাহিত স্ত্রী অনাদরে ফেলে আসা সেই ক্ষুদ্রাকৃতি পুতুলের মতো মেয়েটার কথা ভুলেও মনের কোণে উঁকি দেয় না। বরং বাবা মায়ের প্রতি দুর্জয় অভিমানে বুকের ভেতরটায় অব্যক্ত একটা যন্ত্রণা গুমরিয়ে ওঠে। অভিমান কষ্ট হয়ে দলা পাকায় গলার ভিতর। চোখ ভিজে আসে। মনের ভিতর একলা একলা কথা কয় শেখর - এত নিষ্ঠুর, নির্দয় হতে পারলে তোমরা! এখান থেকে ভবানিপুর গ্রামটা কত ক্রোশ দূর যে একটা বার খোঁজ নিতে এলে না কেউ। এত অহংকার তোমাদের। থাকো তোমরা তোমাদের গুমোর নিয়ে। বেশ আমার নামও শেখর মুখার্জী। তোমাদের রক্তের ধারা বইছে আমার শরীরে। তোমরা পারলে আমিই বা পারবো না কেন? খুব পারবো।
আন্না মানকচুর পাতায় করে খানিকটা আমকাসুন্দি আর খানিকটা আমচুর নিয়ে ছুটতে ছুটতে হাফাতে হাফাতে এসে চারপাশ ভালো করে দেখে মা আছে কিনা। কারণ বৈঁচি তাকে পইপই করে নিষেধ করেছে যে আন্না এখন আর আগের মতো নেই। এমন কি কিছুদিনের মধ্যে আন্না মা হতেও পারে। তাই সে যেন শব্দ করে দুপদাপ করে না হাঁটে। ছুটোছুটি না করে, জোরে জোরে কথা না বলে এবং কারণে অকারণে খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে না পড়ে। কিন্তু এখন আন্না তাঁর নাকের ডগায় পুঁতির দানার মতো ঘামের ফোঁটাগুলো বাঁহাতের চেটো দিয়ে মুছে নিয়ে শেখরকে বলে, ‘নাও খাও। ঘোষাল ঠাকুমা দিল’।
কথাটা বলবার সময় আন্না মায়ের শাসন, সতর্কতা ভুলে একচোট খিলখিলিয়ে ওঠে। উঠেই খেয়াল হয় শেখর কেমন থম মেরে আছে। চোখমুখ লাল। আন্নাকে দেখে খুশি হচ্ছে না। আচার নেওয়ার ছুতো করে আন্নার হাতখানা ছুঁয়ে দিচ্ছে না .........। হঠাৎ করেই আন্নার কি যেন খেয়াল হয়। পাকা ঘরণীর মতো শুধিয়ে ওঠে, ‘হ্যাঁগো, রাস্তায় ডাক কাকার সাথে দেখা হল। সে বললে, আমাদের বাড়ি তোমার নামে পত্র এসেছে’।
ঘাড় নাড়ে শেখর, ‘হ্যাঁ, বিমানের। কলেজের পড়ায় অনেক পিছিয়ে গেছি। পরীক্ষার আর খুব বেশী দেরী নেই। আমাকে এবার যেতে হবে’।
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আন্না। তাঁর দুই চোখে অবাক বিস্ময়। ভেজা পাখির ডানার মতো বারবার তাঁর দুচোখের পাতা ঝাঁপটায়। বালিকাসুলভ কণ্ঠে শুধোয়, ‘কোথায় যাবে?’
শেখর বলে, ‘কেন কলকাতায়। সেখানেই তো আমার সবকিছু। আমার কলেজ, পড়াশোনা, বন্ধুরা, আমার বন্ধু বিমান .........’।
আন্নার অভিমানে চোখ জ্বালা করে। উত্তপ্ত গলায় স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ‘তুমি আমার স্বামী। তুমি যখন যেখানে যে অবস্থায় থাকবে সেই অবস্থায় থাকবো’।
বালিকা হলেও স্ত্রীলোকের কাছে স্বামীর মহত্ত্বটা কি তা সে এতদিনে বুঝেছে। সেই সঙ্গে আর একটা কথাও বুঝেছে শেখর মুখে যতই বলুক - ‘আন্না আমি শুধু তোমার’ কিন্তু বুঝে গেছে আরও একজন আছে, যাকে সমাদরে নিয়ে গিয়ে আন্নার জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তবে একটা বিজয়ের হাসি হাসে আন্না - সে দেবালয় হল গিয়ে দেবতাশূন্য।
শেখর আন্নার হাতে চিঠিখানা দিয়ে বলে, ‘এই নাও পড়’।
আন্না হাসে। সে একটা সবুজ লাল ছাপা শাড়ি পরে আছে। ফলে তাকে খাঁচার টিয়াটার মতই লাগে। আন্না হেসে বলে, ‘ওমা এতো তোমার পত্তর। তুমি জান না কারোর পত্তর কাউকে পড়তে নেই’।
শেখর এমন কথা প্রথম শোনে। সে কিশোরসুলভ ভাবে বোকার মতো শুধোয়, ‘কেন পড়তে নেই?’
আন্না হাতমুখ নাড়িয়ে পাকা গিন্নীর মতো রব তোলে, ‘অতশত আমি জানি না, বাবা জানে। বাবা আমাকে বলেছে। বাবার এক বন্ধু নদীয়া থাকে। সে মাঝেমাঝে বাবাকে পত্তর লেখে। তাই আমি জানি। মা আমি কেউ পড়ি না সে পত্র। বাবার ওগুলো ব্যক্তিগত’।
এ বাড়িতে আসা ইস্তক বিজয়ের প্রতি শেখরের আকর্ষণ যেন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। এ বাড়ির নিয়মকানুন আদবকায়দার সঙ্গে তাঁর নিজের বাড়ির আদবকায়দার কোনও মিলই নেই। শেখর আন্নাদের বাড়িটার চারপাশে একবার তাকায়। প্রতিটি কাজেই পরিচ্ছন্নতা আর আন্তরিকতার ছোঁয়া। বারান্দার যে চৌকিটায় শেখর বসেছিল সেই বিছানাটার দিকে তাকায়। অপূর্ব একটা নকশিকাঁথা বিছানো। তাতে শকুন্তলার পতিগৃহে যাওয়ার দৃশ্যের দৃশ্যাবলী নক্সা করা। শেখর আপনমনে কাঁথাখানায় হাত বোলায়। এ বাড়ির সবকিছু এমনকি জল খাওয়ার গ্লাসের ঢাকনাগুলোও আন্নার মায়ের হাতের তৈরি কুরুসের বোনা। শেখর শুধোয়, ‘তোমার বাবা-মা কোথায় গেছেন আন্না?’
আন্না বলে, ‘বাবা বসিরহাট হাট করতে গেছে আর মা আজ অনেকদিন বাদে ঘোষাল ঠাকুমার বাড়ি বিন্তি খেলতে গেল’।
আন্না এখন নারী পুরুষের গোপন সম্পর্কের মানে বোঝে। তাই ঠোঁট টিপে হাসে। বেশ ঠোনা দিয়ে বলে, ‘কেন গা আমি থাকলে তোমার বুঝি ভূতের ভয়’। খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ে আন্না।
কিন্তু শেখরের মনে এখন ভিন্ন চিন্তা। সে ভাবছে আন্না বলছে সে শেখরের সাথে সংসার করতে যাবে। কিন্তু শেখর তো মেসে থাকে। আন্নাকে নিয়ে গিয়ে সে কোথায় তুলবে। সবচেয়ে বড় কথা শেখর তো এখনও কলেজের পড়ার পাস দেয় নি। চাকরি বাকরি কিছুই করে না। সুতরাং খাওয়াবে কি সে আন্নাকে। আর সংসার মানে তো খাওয়া আর থাকা না। তার বাইরেও অনেক কিছু। শেখর ভুলেও বোঝে নি বিবাহ শব্দের আক্ষরিক অর্থ অর্থাৎ বিশেষ অর্থে বহন মানে সত্যই বহন করা কঠিন। বিবাহ মানে শুধু একটা পছন্দের, কামনার স্ত্রীলোক তাঁর সাথে বাঘবন্দির খেলা খেলে আর পুটুর পুটুর গল্প করা নয়। শেখর সত্যি সত্যিই একগলা জল সমস্যায় পড়ে যায়। আন্নাকে কথার মানে না বুঝিয়ে সে কিছুক্ষণ যেন একলা হতে চায়। বলে, ‘আন্না আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। আমি বরং যাই গিয়ে কতক্ষণ শুয়ে থাকি’।
আন্না একটু চুপ করে থেকে তর্জনীতে নকশীকাঁথার গায়ে হরিণ শিশুটার গায়ে হাত বোলায়। তারপর বলে, ‘ঘরে চলো। আমি বরং তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেই গিয়ে’।
খাঁচার টিয়াটা দু’বার ডানা ঝাপটে ‘আন্না আন্না’ বলে চেঁচাতে শুরু করে। আন্নার স্নিগ্ধ ছায়ায় শেখরের মন জারিত হয়ে আসে। তাঁর দুচোখ জুড়ে ঘুম আসে। আন্না শেখরের প্রতি স্নেহে আর্দ্র হয়। মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে পাখার বাতাস করে। আহা শরীরটা এখনও দুর্বল মানুষটার।
জানলার পর্দা উড়ে আসে বাতাসে। আন্না চেয়ে দেখে ফিরোজা রঙের ধূসর মেঘের দলকে। চোখ বন্ধ শেখরের দিকে তাকায়। তার চোখের পাতার ঘনপল্লবে তার জমাট বাধে চিরন্তনী স্নেহ। বুকের ভেতর হীরা, মণিমাণিক্যের মতো স্বপ্ন। আন্না স্পষ্ট দেখতে পায় ছড়ানো ছিটানো সে ছবি। সংসার। তার নিজস্ব সংসার। তার হাতে সাজানো, তার হাতে গোছানো, লালিতপালিত সংসার। যে সংসারের কর্তী সে। আন্না ঘোর লাগা চোখে দেখে রোদ্দুর মোহরকুচি হয়ে ধানমেলার মতো ছড়িয়ে গেল পুকুরের এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত।





১২

বাস্তবিক কালু বাউড়ির এদেশে এসে বড়ো ভালো লেগে গেছে। তাই সে রামতনুর কাছে আর্জি জানিয়েছে, ‘আজ্ঞে ঠাকুর যদি রা কাড়েন তাহলে সে এখানে কিছুদিন বসবাস করে যায়’। অবশ্যি মাগনায় কখনই নয়, সে হুসেনের সাথে নাওতে যেতে চায়। প্রয়োজনে বাড়ির পাল্কি বইবে। তার মনের ভেতর বাবু মশাইয়ের ঘোর যেন কাটতেই চাইছিল না। ঐভাবে সেদিন নদীতে লাফিয়ে পড়ে সাঁতরে পার হওয়ার একমাত্র সাক্ষী সে। এই পোড়া চোখদুটোয় ঐ দুধসাদা, ফটফটে চাঁদপানা মানুষটাকে আরও একটিবার দেখবার জন্য মনটা তার আঁকুপাঁকু করে ছটফটাচ্ছে। কি হল তার? কেমন আছে মানুষটা? এ বাড়িতে মানুষটার নাম নেয় না কেউ। তাকে ত্যাজ্য করেছে। কালু তার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে একটা কথা ভেবে ভেবে কূলকিনারা পায় না, সন্তান কখনও ত্যাজ্য হয়? কে জানে এই বারোভাটির দেশের মানুষগুলোর রকমসকমই আলাদা। কালুর দল যে পাল্কিটা এনেছিল তা হল ভাড়ার পাল্কি। সে পাল্কি পবনদের নিয়ে যেতে বলে। কলকাতার বেলগাছিয়ার সরকার বাবুদের পাল্কির ব্যবসা। তাদেরই ভাড়ার পাল্কি। পবনরা অবশ্য খালি হাতে কেউ ফেরে নি। শশী তার টগরমণির হাত দিয়ে সক্কলকে একটা করে মার্কিন ধুতি, একজোড়া মুন্সীর গামছা আর ষোল আনা হাতে দিয়েছে। বেয়ারার দলও তাকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করে গেছে। রামতনুর সম্মতিতে কালু বাউড়ি রয়ে গেছে।
কালু এখন হুসেনের সঙ্গে গাঙে গাঙে ভেসে বেড়ায়। মাছ ধরে। হুসেনের কাছে নদীতে জাল ফেলার কলাকৌশল রপ্ত করে। মাছ ধরে এনে হাবির সামনে মেলে দিয়ে বলে, ‘দেখেন ছোট ঠাকুরুন আজ কত মাছ ধরে এনেছি। কইগুলো সব জ্যান্ত। আমাদের ছোট ঠাকুরুন কই মাছ ভাজা দে গরম ভাত খাবে’।
নাও-এর মাথায় বসে সুন্দরবনের গল্প শোনে কালু। হুসেন জলের বুকে বৈঠা টেনে জল কেটে কেটে যেতে যেতে বলে, ‘জান তো মিঞা সুন্দরবনের নাম সুন্দরবন হল কেনে?’
কালু বাউড়ি চোখ মুচড়ে জানতে চায়, ‘কেনে?’
‘সুন্দরবনে কত সুন্দরী গাছ দেখেছো? ইরি জন্যি এ বাদা বনের নাম সুন্দরবন’।
কালু বাউড়ি চারপাশ নজর করে। জল আর গাছ। মাঝে মাঝে হরিণের দেখা মেলে। দেখা মেলে ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া, বাঁদর। নদীর তীরে পলি কাদায় গোসাপ, কুমীর। তারা জলের বুকে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ জলজ শব্দ শুনে সড়সড় করে জলে নেমে যায়। কখনও বা শুশুক জল ছিটিয়ে হুশ করে ডুব দেয় জলের গভীরে। ঠেসমূল, শ্বাসমূলেরা সব একে অপরকে জড়িয়ে বাঁচে। ফুলের মতো ছড়িয়ে থাকে চিতি কাঁকড়া, তেলি কাঁকড়ার রাশি। গণে গণে মেয়ে কাঁকড়ার শরীরে ঘিলু জমে, তখন তার স্বাদই আলাদা। জল কেটে একেবেকে চলে যায় জলঢোড়া সাপ। শুয়োর, বন মুরগীর দেখা তো হরদমই পাওয়া যায়। আর আছে তেনারা। বনের রাজা দক্ষিণা রায়। লোকের মুখে বড়ো মিঞা নামেই পরিচিত। তেনাদের দেখা পাওয়া অবশ্য কোনও সুখের কথা নয়। কথায় বলে না - সাপের লিখন আর বাঘের দেখন, দুইই সমান সর্বনাশের।
বিড়ির গোঁড়ায় বাঁধা লাল সুতো পর্যন্ত টান দেয় হুসেন মিঞা। বলে, ‘আবার কেউ কেউ বলে বাখড়গঞ্জে সুগন্ধা নামে বড়ো নদী ছিল এড্ডা। উটির নাম থেকে নাম হয় সুন্ধা, তার থেকি সুন্দরবন। আবার চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের বনকে বলা হত চন্দ্রা বন, তার থেকিও সুন্দরবন বলে। জানো মিঞা এই সোঁদোর বনরে আমার পূর্বপুরুষের আমলে বলা হত ভাটির দেশ। নদীর ভাঁটার টান সবসময় দক্ষিণ দিকে বয়ে যেত বলে বলা হত ভাটির দেশ। তখন এইসব অঞ্চল বারোজন রাজার অধীন ছিল বলে বলতো বারো ভাটির দেশ’।
হুসেনের মুখে এসব গল্প কালু তন্ময় হয়ে শুনত আর তার ভিতরে হুসেনের প্রতি একটা সম্ভ্রম তৈরি হত। হুসেন তার নিজের জায়গা সম্বন্ধে কত বৃত্তান্তই না জানে। সেখানে কালু কলকাতায় চিৎপুরে যেখানটায় বাস করে তার প্রায় কিছুই জানে না।

সাবুর মা রামতনুর বাড়িতে পুরোপুরি আসতে চায় নি। কিন্তু শশিকলার জোরাজুরিতে আসতে হয়েছে। সাবুর মা আসার পর থেকে শশিকলা যেন অনেকটা মুক্ত। সে তার টগরমণিকে নিয়ে ইচ্ছামত খেলছে। হেঁশেল সামলায় রান্নী বামুন খুড়ি। সাবুর মা আসার পর সেই প্রায় সব সামলায়। পুকুরপাড়ে দক্ষিণ দিকে হোগলা পাতার ছাউনি দিয়ে তিন চালা একটা মাটির ঘর তুলে দিয়েছেন রামতনু। সাবুর মা তাকে নিকিয়ে একেবারে ছবির মতো তকতকে করে রাখে। মহিমের পারলৌকিক আচারও হাবিকে দিয়ে যথেষ্ট ঘটা করে করিয়ে একদিন পঙতি ভোজন করিয়েছে রামতনু, শশিকলার নির্দেশে। হাবি অবশ্য অতশত বোঝেনি। সে চাটনি, পাঁপরভাজা আর মিষ্টি দই খেয়ে মহা খুশি। এখানে সে একজন খেলার সাথীও পেয়েছে - সাবু। শশী সাবুকে বলেছে, ‘টগরকে তুই নাম ধরে ডাকবিনে। ওকে তুই ছোট ঠাকুরুন বলে ডাকবি’। সাবুর মা অবশ্য টগরমা বলে ডাকে। সাবু এ বাড়িতে আসা ইস্তক টইটই করে পাড়া বেড়ানো অনেক কমে গেছে। সে এখন শশীর কড়া নির্দেশে লক্ষ্মী ছেলের মতো গুরুমশাই আসলে নিজস্ব চাটাই পেতে বই নিয়ে বসে। সুর করে করে পড়ে স্বরে অ স্বরে আ। গড়গড় করে নামতা বলে, ছড়া বলে। সাবুর মায়ের দুচোখ আনন্দে জলে ভরে যায়।
রামতনুর চোখের ভাষা যেন দিনদিন বদলে যাচ্ছে। সেদিকে চোখ পড়লেই বুকের ভেতর এক পোয়া পড়ে পাওয়া আনন্দ চলকে ওঠার বদলে ভয়ে রক্ত হিম হয়ে যায় সাবুর মার। কারণ শশিকলা যদি কোনও কারণে টের পায় তার সুখের ঘরে ঘুঁটের ছাই উড়বে। শশী বড়ো চতুর আর জেদি। তার বাইরে দেখে ভেতর বোঝার উপায় নেই সেখানে কি ঘূর্ণিপাক চলছে। নতুবা ছেলের প্রথম পক্ষের বৌকে এককথায় খারিজ করে ছেলের বে দিলে, সেখানেও ছেলের অন্যায়কে গ্রাহ্য না করে সোজা ত্যাগ দিলে। অমন গৌরাঙ্গের মতো ছেলের জন্য মায়ের বুকের ভেতরটা কি টাটায় না? হাহাকার করে ডাঙায় তোলা মাছের মতো ছটফটিয়ে মরে না? অবশ্যই করে কিন্তু শশীকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। বরং সে টগরকে নিয়ে এমন মেতে আছে যেন এই তার পেটের মেয়ে, নাড়িছেঁড়া ধন।

সময় বদলায়। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলায়। বদলায় সম্পর্ক। প্রকৃতির নিয়মে বাড়তে থাকা গাছে। পাতা গজায়, ফুলফল ধরে। তবু কিছু নাছোড়বান্দা স্মৃতি লেপটে থাকে চিরকাল। ভুলতে দেয় না কোনকিছু। বাস্তুসাপের মতো সে স্মৃতি পয়মন্ত না। তবু থেকে যায়, থেকে যাবে। টগর মাঝেমাঝে তার বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য বায়না ধরত কদিন আগেও। সময়ের সাথে সাথে একরত্তি কচি মেয়েটাও যেন বুঝতে শিখে যাচ্ছে এখানেই তাকে থাকতে হবে। এটাই তার আসল জায়গা। তবে মাতৃহীনা শিশু সত্যিই শশীকে মা হিসেবেই পেয়েছে। শশীকে সে বড়ো ভালোবেসে ফেলেছে। আর অনুগত সাবুও তার একজন পছন্দের মানুষ হয়ে উঠেছে। সাবু তার সাথে পুতুল খেলে, রান্নাবাটি খেলে। নদীর পাঁক নিয়ে এলে পুতুল বানিয়ে তাতে পুঁই মেটুলি, ভুসোকালি দিয়ে রঙ করে দেয়। কচুরিপানা পুকুর থেকে তুলে এনে শিরিষ, বাবলা গাছের আঠা দিয়ে পুতুলের চুল বানিয়ে দেয়। এমনি কত কি যে সাবু তার ছোট ঠাকরুনকে এনে দেয়। গাবগাছ থেকে পাকা গাব, শৈলেন দাদুর বাড়ি থেকে কাশীর পেয়ারা, বরফ সাদা দেখতে টুসটুসে জলে ভরা জামরুল অনায়াসেই চুরি করে এনে দেয় চুপিচুপি।

সাবুর মা সেদিন শশীর চুলে তেল মালিশ করছিল। টুকিটাকি কথাবার্তা সারতে সারতে সাবুর মায়ের চোখ পড়ে আকাশ জুড়ে ছাইরঙা খণ্ডখণ্ড পাঁশুটে মেঘগুলোর দিকে। শশী ঘাড়টা বাঁকিয়ে শুধোয়, ‘হ্যাঁরে সাবুর মা। সাবুর বাবা চলে গেছে তা বারো বছর হতে চলল না?’
শশীর ঘন কোঁকড়া চুলগুলোর মাঝে সাবুর মায়ের আঙুল স্থির হয়ে যায়। দেওয়ালে ঝোলানো হাত আয়নার দিকে নজর পড়ে। নিজের সিঁথির সিঁদুরটার দিকে নজর করে বুকের ভিতরে ককিয়ে ওঠে। বারো বছর পার মানে জন্মের মতো তার এয়োস্ত্রী চিহ্ন ঘুচে যাবে। সে নিচু গলায় বলে, ‘এই শ্রাবণে বারো বছর পূর্ণ হবে’।
বারো বছর মানে সাবুর মাকে জন্মের শোধ এয়োতির চিহ্ন ঘুচিয়ে বৈধব্য নিতে হবে। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে শূন্য মনে হয় সাবুর মার। নিজের সোহাগী নামটা যে তার কে রেখেছিল কে জানে। নিজের নামটা নিজের কানেই এখন প্রহসনের মতো শোনায়। চোখ থেকে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা কান্না নেমে আসে। কান্না জড়ানো গলায় বলে, ‘ঠাকরুন, মানুষডা যদি ফিরে আসে কখনও?’
শশী নির্দয়, পরিষ্কার বলে দেয়, ‘কোত্থেকে আসবে শুনি? তবু যদি আসে শাস্ত্র অনুযায়ী যা বিধান আছে তাই হবে। তবে এই শ্রাবণে তোকে বেধবা হতে হবে সাবুর মা’।
সাবুর মার আঙুলগুলো যেন থেমে যায়।
শশী বলে, ‘কদিন ধরে ঘাড়ের কাছটা দপদপ করে টাটাচ্ছে। দে দেখি একটু দাবিয়ে’।

সাবুর মা বড়ো অসহায়ভাবে শশীর নরম তুলোর মতো কাঁচা হলুদ রঙের শরীরটার ঘাড় টিপতে থাকে। টিপতে টিপতে সে জীবন নৌকার পালের বাতাসকে উল্টোবাগে বইয়ে নিয়ে যায়, যেখানে ভুজঙ্গ নামের শক্তপোক্ত একটা লোক নদীর ধারে বসে আপনমনে বাঁশি বাজাচ্ছে। পড়ন্ত বেলায় নদীর জলে যেন কে লাল রঙ গুলে দিয়েছে। দুর থেকে খেয়াঘাটের হইচই কানে আসছে। আশ্চর্য এক সোনালি আভায় ভরে আছে চারপাশ। মাটির তলা থেকে উঠে আসছে ঘুঘড়ো পোকার ডাক। দূরে বট, অশ্বথ, পাকুর কোনও গাছের কোটর থেকে অনেক দিনের পুরনো কোনও তক্ষক ডেকে চলেছে – তক খক, তক খক। ভাটায় জল নেমে গিয়ে জোয়ারের জলে ডুবে থাকা গাছেরা ধারালো দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আবছা অন্ধকারের আকাশের দিকে। আজকের জরাজীর্ণ সাবুর মা সেদিনের ভরা যুবতী। সে গেছে মানুষটাকে ডাকতে, ‘কি গো, সন্ধ্যা নেমে আসছে। ঘরে যাবে না?’
ভুজঙ্গ নামের হারিয়ে যাওয়া মানুষটা বলে, ‘এট্টুস পাশে বোসো না সোহাগী। দেখ সূয্যিদেব কেমন চুপ করে জলের ভেতর হারিয়ে যাবে। আবার সেই কাল সকালে ওঠপে’।
সেদিন এসব কথা ভালো লাগতো না সাবুর মার। শ্বশুরবাড়ি, পাড়া প্রতিবেশীর ভয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠত, ‘তোমার সঙ্গে রঙ্গ করবার সময় নেই এখন আমার’।
মানুষটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ ফেরাতো। বড়ো করুণ গলায় বলতো, ‘তুমি ঘরে যাও আমি যাচ্ছি’।
সেদিন মানুষটা সাবুর মায়ের স্নিগ্ধ ছায়ায় মনকে জারিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু সাবুর মা রাজী হয় নি। নিজের তরল গৌরবে আচ্ছন্ন ছিল। আজ তাই ভিখারির অশ্রুর মতো দীনতায় লেপটে থাকে তার যন্ত্রণা।

রামতনু কোথায় যেন গিয়েছিল। এসে বারান্দার পাশে মেটে জালা থেকে জল নিয়ে পায়ে ঢেলে দরজার কাছে এসে ‘শশী’ বলে ডাক দিয়েই সাবুর মার সঙ্গে চোখে চোখ পড়ে যায়। জল ভরা চোখদুটো থেকে টুপ করে দু ফোঁটা জল পুঁতির ডানার মতো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। রামতনু কি যেন বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই সাবুর মার চোখের জল তার সব কিছু গুলিয়ে দেয়।
শশী বলে ওঠে, ‘শোন এই শ্রাবণে সাবুর বাপ নিরুদ্দেশ হয়েছে বারো বছর পূর্ণ হবে। ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলে সাবুর মায়ের বৈধব্যটা করিয়ে নিতে হবে’।
এই মুহূর্তে রামতনুর মনে হয় শশী সত্যি খুব নিষ্ঠুর।

হাবি এখন এখানে বহাল তবিয়তেই আছে। শশীকে সত্যি মা হিসাবেই পেয়েছে। এখানে তার দৌরাত্ম্য মাত্রাছাড়া। এতদিন সে যা পায় নি তা যেন সুদে আসলে উশুল করে নিচ্ছে। তারপর সাবুর মতো অনুগত বন্ধু পেয়ে সে সত্যি সত্যি রাজরানী হয়ে গেছে। পাঠশালার গুরুমশাই নিজে আসে তাকে পড়াতে। সাবুও অবশ্য তার সঙ্গে পড়ে। গুরুমশাই নিজে সুখ্যাতি করে গেছেন শশিকলার কাছে, ‘টগর মায়ের আমাদের মাথাটি বড়ো পরিষ্কার’।
সাবু তার ছেলে বইখাতা পেন্সিল নিয়ে নাড়াচাড়া করছে, এ এমন সুখের বিষয় তার কাছে যে বৈধব্য নিতেও তার আর বুকে বাজে না। ছেলেটা মানুষ হোক। কিন্তু রামতনু মানুষটার সামনে এলে, কাছে গেলে সে কোথাও কুঁকড়ে যায়। মানুষটা একদিন আড়ালে তাকে বলেছে, ‘আমি তোমার মনের কষ্ট বুঝি সোহাগী, কিন্তু সমাজ আছে তো তাই শশী ওকথা বলেছে’।
এমন প্রাণজুড়ানো কথায় সাবুর মায়ের চোখে জল আসলেও সে জলকে সে কোনরকমে বাঁধ দিয়ে রাখে। কোনরকমে শুধু বলে, ‘না ঠাকুর আমি ঠাকরুনের কথায় কিছু মনে করি নি। ঠাকরুন তো ঠিকই বলেছে। আপনাদের পায়ের তলায় জীবনটা পাত হলেই আমার স্বর্গপ্রাপ্তি হবে। শুধু ছেলেটা যদি একটু মানুষের মতো মানুষ হয়, এটুকুই যথেষ্ট’।
রামতনুর মন আর্দ্র হয়ে ওঠে, ‘ছিছি সোহাগী, এভাবে বোলো না’।
সাবুর মা আর দাঁড়ায় না। ঘোমটাটা ঈষৎ টেনে নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলে রামতনু আবার ডাক দেয়, ‘সোহাগী’।
সাবুর মায়ের পা দুটো ভুঁইয়ের সাথে আটকে যায়। এ ডাকের মানে সে জানে। তাই থরথর করে তেঁতুল পাতার মতো কাঁপতে থাকে।
রামতনু চাপা স্বরে বলে, ‘আজ রাতে একবার আমার ঘরে এসো’।
কিন্তু রামতনুর কথা শেষ হওয়ার আগেই একঝলক তাজা বাতাসের মতো হাবি ছুটে আসে। শশীর শিক্ষা মতো রামতনুকে দূর থেকে দেখে ঘাড়ের কাছ থেকে কাপড়টা টেনে মাথায় দেয়। তারপর আধো আধো স্বরে বলে, ‘ও সাবুর মা পিসি তুমি এখানে, মা তোমায় ডেকে ডেকে হেদিয়ে মলো গো’।
সাবুর মা আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ‘যাচ্ছি’ বলে প্রায় দৌড় লাগায়।
এই বাচ্চা মেয়েটাকে রামতনুই ঘরে এনে তুলেছে সম্মানের সঙ্গে। ভালোও বাসে। কিন্তু মেয়েটিকে দেখলেই পিতৃহৃদয় ককিয়ে টনটন করে ওঠে। শেখর একে স্ত্রী হিসাবে না মেনে চলে গেছে। রামতনু পৈতে ধরে ছেলেকে ত্যাজ্য ঘোষণা করে এসেছেন। কিন্তু তারপরেও তো পোড়া মন মানে না। ছেলেটা সেই যে কলকাতা থেকে এসে বিয়ে করতে চলে গেল এর মধ্যে রামতনুর সঙ্গে একদণ্ড কথা পর্যন্ত হয় নি। পিতৃহৃদয় সন্তানের মুখে ‘বাবা’ ডাক শোনবার জন্য হাহাকার করে ওঠে।
হাবি বলে, ‘যাই গো বাবা, দেখি গিয়ে সাবুটা কোথায় গেল। আজ আবার আমার মেয়ে জামাই আসবার কথা। দেখি গে। সাবুটাকে বাজারে পাঠাই’।
এমন সরল নির্বোধ কথায় রামতনুর মতো রাশভারী মানুষও হাহা করে হেসে ওঠে। বলে, ‘ও বাবা তাই নাকি। মায়ের কাছে মেয়ে জামাই আসবে নাকি। তা আমি তো বসিরহাট যাব আজ, মায়ের জন্য কিছু আনতে হবে নাকি?’
মাথা নাড়ে হাবি। মাথা নাড়ার চোটে তার ঘোমটা খুলে যায়। পা টিপে টিপে এগিয়ে এসে বলে, ‘মা ফেরিওয়ালার কাছ থেকে আমাকে একটা বৌ পুতুল এনে দিয়েছে। তুমিও ওর একটা বর পুতুল এনে দেবে। বোটা একা একা থাকে’।
রামতনুর প্রাণের সমস্ত কুসুম কোমল অনুভূতিগুলো এক নিমেষে যেন বরফের চাঙড় হয়ে যায়। কোনরকমে বলে, ‘দেবো মা’।
হাবি আর দাঁড়ায় না। বিনা ঘোমটাতেই পায়ের মল বাজিয়ে দৌড় লাগায়। কিন্তু রামতনুর পা দুটো যেন মাটির সাথে গেঁথে গেছে। সমস্ত শরীর তার অচল হয়ে গেছে। হাবি তো শিশু, না বুঝেই তার বৌ পুতুলের জন্য বর পুতুল চাইলো। কিন্তু রামতনুর মনে হচ্ছে তার বুকে হাবি যেন শেল গেঁথে দিয়ে চলে গেল। এই প্রথম সমস্ত অন্তরাত্মা শশীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে উঠলো। শশী বাস্তবিক এই শিশুটিকে নিয়ে পুতুল খেলছে। ‘শেখরের মা’ বলে জোরে হাঁক দেয়।
পৃথুলা শশী দুলে দুলে হাসিমুখে এসে বলে, ‘বাপরে বাপ কি ঝক্কি গো। আগে তো কখনও এ হ্যাপা সামলাই নি। মানুষ মলে যে শ্রাদ্ধ করতে হয় এ তার বাড়া। কত নিয়ম গো। তবে আমি সোহাগীকে বলে দিয়েছি - তুই কোনও চিন্তা করিস না। সব দায়িত্ব আমার। শ্রাদ্ধে কাকে কাকে নিমন্ত্রণ করবি কর’।
শশীর মুখে সোহাগী নামটা শুনে রামতনু যেন একটু চমকে ওঠে। শশী তো সাবুর মা বলেই ডাকে। তবে কি শশী কিছু বুঝতে পেরেছে.........। রামতনু অন্যদিকে মুখ ঘোরায়, ‘সে তুমি যা ভালো বোঝ করো’।
শশী খুব মিষ্টি করে জানতে চায়, ‘আমায় তুমি ডাকছিলে কেন গা?’
রামতনুর আর কিছু শশীকে বলতে ইচ্ছা করে না। বলে, ‘কি যেন বলবো বলে ডেকেছিলাম এখন আর মনে পড়ছে না’। কিন্তু মনে মনে বলে - শশী আমাদের একমাত্র সন্তান তাকে তোমার মনে পড়ে না? তুমি এমন পাষাণ হয়ে থাকো কি করে?
রামতনুকে চুপ করে থাকতে দেখে শশীই বলে, ‘গঙ্গা বাবাজী সেদিন অমন অশান্তি করে মেয়েটাকে নিয়ে চলে গেল। ওদের একটু খোঁজ নিও তো’।
রামতনু ‘আচ্ছা’ বলে শেখরের ঘরটাতে ঢোকে। বড়ো সাধ করে এ ঘরটা বানিয়েছিল। শেখর থাকবে তাই। দেওয়াল জোড়া বেলজিয়াম কাঁচের আয়নাটায় নিজের প্রতিকৃতিটা ফুটে উঠতেই রামতনুর আত্মজর জন্য বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে - বিড়বিড় করে বলে, ‘শেখর আমার ভুল হয়ে গেছে। তুই ফিরে আয় বাবা’। পরিপাটি করে গোছানো ঘরটার মাঝখানে এক বুক শূন্যতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।





১২

বাস্তবিক কালু বাউড়ির এদেশে এসে বড়ো ভালো লেগে গেছে। তাই সে রামতনুর কাছে আর্জি জানিয়েছে, ‘আজ্ঞে ঠাকুর যদি রা কাড়েন তাহলে সে এখানে কিছুদিন বসবাস করে যায়’। অবশ্যি মাগনায় কখনই নয়, সে হুসেনের সাথে নাওতে যেতে চায়। প্রয়োজনে বাড়ির পাল্কি বইবে। তার মনের ভেতর বাবু মশাইয়ের ঘোর যেন কাটতেই চাইছিল না। ঐভাবে সেদিন নদীতে লাফিয়ে পড়ে সাঁতরে পার হওয়ার একমাত্র সাক্ষী সে। এই পোড়া চোখদুটোয় ঐ দুধসাদা, ফটফটে চাঁদপানা মানুষটাকে আরও একটিবার দেখবার জন্য মনটা তার আঁকুপাঁকু করে ছটফটাচ্ছে। কি হল তার? কেমন আছে মানুষটা? এ বাড়িতে মানুষটার নাম নেয় না কেউ। তাকে ত্যাজ্য করেছে। কালু তার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে একটা কথা ভেবে ভেবে কূলকিনারা পায় না, সন্তান কখনও ত্যাজ্য হয়? কে জানে এই বারোভাটির দেশের মানুষগুলোর রকমসকমই আলাদা। কালুর দল যে পাল্কিটা এনেছিল তা হল ভাড়ার পাল্কি। সে পাল্কি পবনদের নিয়ে যেতে বলে। কলকাতার বেলগাছিয়ার সরকার বাবুদের পাল্কির ব্যবসা। তাদেরই ভাড়ার পাল্কি। পবনরা অবশ্য খালি হাতে কেউ ফেরে নি। শশী তার টগরমণির হাত দিয়ে সক্কলকে একটা করে মার্কিন ধুতি, একজোড়া মুন্সীর গামছা আর ষোল আনা হাতে দিয়েছে। বেয়ারার দলও তাকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করে গেছে। রামতনুর সম্মতিতে কালু বাউড়ি রয়ে গেছে।
কালু এখন হুসেনের সঙ্গে গাঙে গাঙে ভেসে বেড়ায়। মাছ ধরে। হুসেনের কাছে নদীতে জাল ফেলার কলাকৌশল রপ্ত করে। মাছ ধরে এনে হাবির সামনে মেলে দিয়ে বলে, ‘দেখেন ছোট ঠাকুরুন আজ কত মাছ ধরে এনেছি। কইগুলো সব জ্যান্ত। আমাদের ছোট ঠাকুরুন কই মাছ ভাজা দে গরম ভাত খাবে’।
নাও-এর মাথায় বসে সুন্দরবনের গল্প শোনে কালু। হুসেন জলের বুকে বৈঠা টেনে জল কেটে কেটে যেতে যেতে বলে, ‘জান তো মিঞা সুন্দরবনের নাম সুন্দরবন হল কেনে?’
কালু বাউড়ি চোখ মুচড়ে জানতে চায়, ‘কেনে?’
‘সুন্দরবনে কত সুন্দরী গাছ দেখেছো? ইরি জন্যি এ বাদা বনের নাম সুন্দরবন’।
কালু বাউড়ি চারপাশ নজর করে। জল আর গাছ। মাঝে মাঝে হরিণের দেখা মেলে। দেখা মেলে ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া, বাঁদর। নদীর তীরে পলি কাদায় গোসাপ, কুমীর। তারা জলের বুকে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ জলজ শব্দ শুনে সড়সড় করে জলে নেমে যায়। কখনও বা শুশুক জল ছিটিয়ে হুশ করে ডুব দেয় জলের গভীরে। ঠেসমূল, শ্বাসমূলেরা সব একে অপরকে জড়িয়ে বাঁচে। ফুলের মতো ছড়িয়ে থাকে চিতি কাঁকড়া, তেলি কাঁকড়ার রাশি। গণে গণে মেয়ে কাঁকড়ার শরীরে ঘিলু জমে, তখন তার স্বাদই আলাদা। জল কেটে একেবেকে চলে যায় জলঢোড়া সাপ। শুয়োর, বন মুরগীর দেখা তো হরদমই পাওয়া যায়। আর আছে তেনারা। বনের রাজা দক্ষিণা রায়। লোকের মুখে বড়ো মিঞা নামেই পরিচিত। তেনাদের দেখা পাওয়া অবশ্য কোনও সুখের কথা নয়। কথায় বলে না - সাপের লিখন আর বাঘের দেখন, দুইই সমান সর্বনাশের।
বিড়ির গোঁড়ায় বাঁধা লাল সুতো পর্যন্ত টান দেয় হুসেন মিঞা। বলে, ‘আবার কেউ কেউ বলে বাখড়গঞ্জে সুগন্ধা নামে বড়ো নদী ছিল এড্ডা। উটির নাম থেকে নাম হয় সুন্ধা, তার থেকি সুন্দরবন। আবার চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের বনকে বলা হত চন্দ্রা বন, তার থেকিও সুন্দরবন বলে। জানো মিঞা এই সোঁদোর বনরে আমার পূর্বপুরুষের আমলে বলা হত ভাটির দেশ। নদীর ভাঁটার টান সবসময় দক্ষিণ দিকে বয়ে যেত বলে বলা হত ভাটির দেশ। তখন এইসব অঞ্চল বারোজন রাজার অধীন ছিল বলে বলতো বারো ভাটির দেশ’।
হুসেনের মুখে এসব গল্প কালু তন্ময় হয়ে শুনত আর তার ভিতরে হুসেনের প্রতি একটা সম্ভ্রম তৈরি হত। হুসেন তার নিজের জায়গা সম্বন্ধে কত বৃত্তান্তই না জানে। সেখানে কালু কলকাতায় চিৎপুরে যেখানটায় বাস করে তার প্রায় কিছুই জানে না।

সাবুর মা রামতনুর বাড়িতে পুরোপুরি আসতে চায় নি। কিন্তু শশিকলার জোরাজুরিতে আসতে হয়েছে। সাবুর মা আসার পর থেকে শশিকলা যেন অনেকটা মুক্ত। সে তার টগরমণিকে নিয়ে ইচ্ছামত খেলছে। হেঁশেল সামলায় রান্নী বামুন খুড়ি। সাবুর মা আসার পর সেই প্রায় সব সামলায়। পুকুরপাড়ে দক্ষিণ দিকে হোগলা পাতার ছাউনি দিয়ে তিন চালা একটা মাটির ঘর তুলে দিয়েছেন রামতনু। সাবুর মা তাকে নিকিয়ে একেবারে ছবির মতো তকতকে করে রাখে। মহিমের পারলৌকিক আচারও হাবিকে দিয়ে যথেষ্ট ঘটা করে করিয়ে একদিন পঙতি ভোজন করিয়েছে রামতনু, শশিকলার নির্দেশে। হাবি অবশ্য অতশত বোঝেনি। সে চাটনি, পাঁপরভাজা আর মিষ্টি দই খেয়ে মহা খুশি। এখানে সে একজন খেলার সাথীও পেয়েছে - সাবু। শশী সাবুকে বলেছে, ‘টগরকে তুই নাম ধরে ডাকবিনে। ওকে তুই ছোট ঠাকুরুন বলে ডাকবি’। সাবুর মা অবশ্য টগরমা বলে ডাকে। সাবু এ বাড়িতে আসা ইস্তক টইটই করে পাড়া বেড়ানো অনেক কমে গেছে। সে এখন শশীর কড়া নির্দেশে লক্ষ্মী ছেলের মতো গুরুমশাই আসলে নিজস্ব চাটাই পেতে বই নিয়ে বসে। সুর করে করে পড়ে স্বরে অ স্বরে আ। গড়গড় করে নামতা বলে, ছড়া বলে। সাবুর মায়ের দুচোখ আনন্দে জলে ভরে যায়।
রামতনুর চোখের ভাষা যেন দিনদিন বদলে যাচ্ছে। সেদিকে চোখ পড়লেই বুকের ভেতর এক পোয়া পড়ে পাওয়া আনন্দ চলকে ওঠার বদলে ভয়ে রক্ত হিম হয়ে যায় সাবুর মার। কারণ শশিকলা যদি কোনও কারণে টের পায় তার সুখের ঘরে ঘুঁটের ছাই উড়বে। শশী বড়ো চতুর আর জেদি। তার বাইরে দেখে ভেতর বোঝার উপায় নেই সেখানে কি ঘূর্ণিপাক চলছে। নতুবা ছেলের প্রথম পক্ষের বৌকে এককথায় খারিজ করে ছেলের বে দিলে, সেখানেও ছেলের অন্যায়কে গ্রাহ্য না করে সোজা ত্যাগ দিলে। অমন গৌরাঙ্গের মতো ছেলের জন্য মায়ের বুকের ভেতরটা কি টাটায় না? হাহাকার করে ডাঙায় তোলা মাছের মতো ছটফটিয়ে মরে না? অবশ্যই করে কিন্তু শশীকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। বরং সে টগরকে নিয়ে এমন মেতে আছে যেন এই তার পেটের মেয়ে, নাড়িছেঁড়া ধন।

সময় বদলায়। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলায়। বদলায় সম্পর্ক। প্রকৃতির নিয়মে বাড়তে থাকা গাছে। পাতা গজায়, ফুলফল ধরে। তবু কিছু নাছোড়বান্দা স্মৃতি লেপটে থাকে চিরকাল। ভুলতে দেয় না কোনকিছু। বাস্তুসাপের মতো সে স্মৃতি পয়মন্ত না। তবু থেকে যায়, থেকে যাবে। টগর মাঝেমাঝে তার বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য বায়না ধরত কদিন আগেও। সময়ের সাথে সাথে একরত্তি কচি মেয়েটাও যেন বুঝতে শিখে যাচ্ছে এখানেই তাকে থাকতে হবে। এটাই তার আসল জায়গা। তবে মাতৃহীনা শিশু সত্যিই শশীকে মা হিসেবেই পেয়েছে। শশীকে সে বড়ো ভালোবেসে ফেলেছে। আর অনুগত সাবুও তার একজন পছন্দের মানুষ হয়ে উঠেছে। সাবু তার সাথে পুতুল খেলে, রান্নাবাটি খেলে। নদীর পাঁক নিয়ে এলে পুতুল বানিয়ে তাতে পুঁই মেটুলি, ভুসোকালি দিয়ে রঙ করে দেয়। কচুরিপানা পুকুর থেকে তুলে এনে শিরিষ, বাবলা গাছের আঠা দিয়ে পুতুলের চুল বানিয়ে দেয়। এমনি কত কি যে সাবু তার ছোট ঠাকরুনকে এনে দেয়। গাবগাছ থেকে পাকা গাব, শৈলেন দাদুর বাড়ি থেকে কাশীর পেয়ারা, বরফ সাদা দেখতে টুসটুসে জলে ভরা জামরুল অনায়াসেই চুরি করে এনে দেয় চুপিচুপি।

সাবুর মা সেদিন শশীর চুলে তেল মালিশ করছিল। টুকিটাকি কথাবার্তা সারতে সারতে সাবুর মায়ের চোখ পড়ে আকাশ জুড়ে ছাইরঙা খণ্ডখণ্ড পাঁশুটে মেঘগুলোর দিকে। শশী ঘাড়টা বাঁকিয়ে শুধোয়, ‘হ্যাঁরে সাবুর মা। সাবুর বাবা চলে গেছে তা বারো বছর হতে চলল না?’
শশীর ঘন কোঁকড়া চুলগুলোর মাঝে সাবুর মায়ের আঙুল স্থির হয়ে যায়। দেওয়ালে ঝোলানো হাত আয়নার দিকে নজর পড়ে। নিজের সিঁথির সিঁদুরটার দিকে নজর করে বুকের ভিতরে ককিয়ে ওঠে। বারো বছর পার মানে জন্মের মতো তার এয়োস্ত্রী চিহ্ন ঘুচে যাবে। সে নিচু গলায় বলে, ‘এই শ্রাবণে বারো বছর পূর্ণ হবে’।
বারো বছর মানে সাবুর মাকে জন্মের শোধ এয়োতির চিহ্ন ঘুচিয়ে বৈধব্য নিতে হবে। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে শূন্য মনে হয় সাবুর মার। নিজের সোহাগী নামটা যে তার কে রেখেছিল কে জানে। নিজের নামটা নিজের কানেই এখন প্রহসনের মতো শোনায়। চোখ থেকে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা কান্না নেমে আসে। কান্না জড়ানো গলায় বলে, ‘ঠাকরুন, মানুষডা যদি ফিরে আসে কখনও?’
শশী নির্দয়, পরিষ্কার বলে দেয়, ‘কোত্থেকে আসবে শুনি? তবু যদি আসে শাস্ত্র অনুযায়ী যা বিধান আছে তাই হবে। তবে এই শ্রাবণে তোকে বেধবা হতে হবে সাবুর মা’।
সাবুর মার আঙুলগুলো যেন থেমে যায়।
শশী বলে, ‘কদিন ধরে ঘাড়ের কাছটা দপদপ করে টাটাচ্ছে। দে দেখি একটু দাবিয়ে’।

সাবুর মা বড়ো অসহায়ভাবে শশীর নরম তুলোর মতো কাঁচা হলুদ রঙের শরীরটার ঘাড় টিপতে থাকে। টিপতে টিপতে সে জীবন নৌকার পালের বাতাসকে উল্টোবাগে বইয়ে নিয়ে যায়, যেখানে ভুজঙ্গ নামের শক্তপোক্ত একটা লোক নদীর ধারে বসে আপনমনে বাঁশি বাজাচ্ছে। পড়ন্ত বেলায় নদীর জলে যেন কে লাল রঙ গুলে দিয়েছে। দুর থেকে খেয়াঘাটের হইচই কানে আসছে। আশ্চর্য এক সোনালি আভায় ভরে আছে চারপাশ। মাটির তলা থেকে উঠে আসছে ঘুঘড়ো পোকার ডাক। দূরে বট, অশ্বথ, পাকুর কোনও গাছের কোটর থেকে অনেক দিনের পুরনো কোনও তক্ষক ডেকে চলেছে – তক খক, তক খক। ভাটায় জল নেমে গিয়ে জোয়ারের জলে ডুবে থাকা গাছেরা ধারালো দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আবছা অন্ধকারের আকাশের দিকে। আজকের জরাজীর্ণ সাবুর মা সেদিনের ভরা যুবতী। সে গেছে মানুষটাকে ডাকতে, ‘কি গো, সন্ধ্যা নেমে আসছে। ঘরে যাবে না?’
ভুজঙ্গ নামের হারিয়ে যাওয়া মানুষটা বলে, ‘এট্টুস পাশে বোসো না সোহাগী। দেখ সূয্যিদেব কেমন চুপ করে জলের ভেতর হারিয়ে যাবে। আবার সেই কাল সকালে ওঠপে’।
সেদিন এসব কথা ভালো লাগতো না সাবুর মার। শ্বশুরবাড়ি, পাড়া প্রতিবেশীর ভয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠত, ‘তোমার সঙ্গে রঙ্গ করবার সময় নেই এখন আমার’।
মানুষটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ ফেরাতো। বড়ো করুণ গলায় বলতো, ‘তুমি ঘরে যাও আমি যাচ্ছি’।
সেদিন মানুষটা সাবুর মায়ের স্নিগ্ধ ছায়ায় মনকে জারিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু সাবুর মা রাজী হয় নি। নিজের তরল গৌরবে আচ্ছন্ন ছিল। আজ তাই ভিখারির অশ্রুর মতো দীনতায় লেপটে থাকে তার যন্ত্রণা।

রামতনু কোথায় যেন গিয়েছিল। এসে বারান্দার পাশে মেটে জালা থেকে জল নিয়ে পায়ে ঢেলে দরজার কাছে এসে ‘শশী’ বলে ডাক দিয়েই সাবুর মার সঙ্গে চোখে চোখ পড়ে যায়। জল ভরা চোখদুটো থেকে টুপ করে দু ফোঁটা জল পুঁতির ডানার মতো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। রামতনু কি যেন বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই সাবুর মার চোখের জল তার সব কিছু গুলিয়ে দেয়।
শশী বলে ওঠে, ‘শোন এই শ্রাবণে সাবুর বাপ নিরুদ্দেশ হয়েছে বারো বছর পূর্ণ হবে। ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলে সাবুর মায়ের বৈধব্যটা করিয়ে নিতে হবে’।
এই মুহূর্তে রামতনুর মনে হয় শশী সত্যি খুব নিষ্ঠুর।

হাবি এখন এখানে বহাল তবিয়তেই আছে। শশীকে সত্যি মা হিসাবেই পেয়েছে। এখানে তার দৌরাত্ম্য মাত্রাছাড়া। এতদিন সে যা পায় নি তা যেন সুদে আসলে উশুল করে নিচ্ছে। তারপর সাবুর মতো অনুগত বন্ধু পেয়ে সে সত্যি সত্যি রাজরানী হয়ে গেছে। পাঠশালার গুরুমশাই নিজে আসে তাকে পড়াতে। সাবুও অবশ্য তার সঙ্গে পড়ে। গুরুমশাই নিজে সুখ্যাতি করে গেছেন শশিকলার কাছে, ‘টগর মায়ের আমাদের মাথাটি বড়ো পরিষ্কার’।
সাবু তার ছেলে বইখাতা পেন্সিল নিয়ে নাড়াচাড়া করছে, এ এমন সুখের বিষয় তার কাছে যে বৈধব্য নিতেও তার আর বুকে বাজে না। ছেলেটা মানুষ হোক। কিন্তু রামতনু মানুষটার সামনে এলে, কাছে গেলে সে কোথাও কুঁকড়ে যায়। মানুষটা একদিন আড়ালে তাকে বলেছে, ‘আমি তোমার মনের কষ্ট বুঝি সোহাগী, কিন্তু সমাজ আছে তো তাই শশী ওকথা বলেছে’।
এমন প্রাণজুড়ানো কথায় সাবুর মায়ের চোখে জল আসলেও সে জলকে সে কোনরকমে বাঁধ দিয়ে রাখে। কোনরকমে শুধু বলে, ‘না ঠাকুর আমি ঠাকরুনের কথায় কিছু মনে করি নি। ঠাকরুন তো ঠিকই বলেছে। আপনাদের পায়ের তলায় জীবনটা পাত হলেই আমার স্বর্গপ্রাপ্তি হবে। শুধু ছেলেটা যদি একটু মানুষের মতো মানুষ হয়, এটুকুই যথেষ্ট’।
রামতনুর মন আর্দ্র হয়ে ওঠে, ‘ছিছি সোহাগী, এভাবে বোলো না’।
সাবুর মা আর দাঁড়ায় না। ঘোমটাটা ঈষৎ টেনে নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলে রামতনু আবার ডাক দেয়, ‘সোহাগী’।
সাবুর মায়ের পা দুটো ভুঁইয়ের সাথে আটকে যায়। এ ডাকের মানে সে জানে। তাই থরথর করে তেঁতুল পাতার মতো কাঁপতে থাকে।
রামতনু চাপা স্বরে বলে, ‘আজ রাতে একবার আমার ঘরে এসো’।
কিন্তু রামতনুর কথা শেষ হওয়ার আগেই একঝলক তাজা বাতাসের মতো হাবি ছুটে আসে। শশীর শিক্ষা মতো রামতনুকে দূর থেকে দেখে ঘাড়ের কাছ থেকে কাপড়টা টেনে মাথায় দেয়। তারপর আধো আধো স্বরে বলে, ‘ও সাবুর মা পিসি তুমি এখানে, মা তোমায় ডেকে ডেকে হেদিয়ে মলো গো’।
সাবুর মা আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ‘যাচ্ছি’ বলে প্রায় দৌড় লাগায়।
এই বাচ্চা মেয়েটাকে রামতনুই ঘরে এনে তুলেছে সম্মানের সঙ্গে। ভালোও বাসে। কিন্তু মেয়েটিকে দেখলেই পিতৃহৃদয় ককিয়ে টনটন করে ওঠে। শেখর একে স্ত্রী হিসাবে না মেনে চলে গেছে। রামতনু পৈতে ধরে ছেলেকে ত্যাজ্য ঘোষণা করে এসেছেন। কিন্তু তারপরেও তো পোড়া মন মানে না। ছেলেটা সেই যে কলকাতা থেকে এসে বিয়ে করতে চলে গেল এর মধ্যে রামতনুর সঙ্গে একদণ্ড কথা পর্যন্ত হয় নি। পিতৃহৃদয় সন্তানের মুখে ‘বাবা’ ডাক শোনবার জন্য হাহাকার করে ওঠে।
হাবি বলে, ‘যাই গো বাবা, দেখি গিয়ে সাবুটা কোথায় গেল। আজ আবার আমার মেয়ে জামাই আসবার কথা। দেখি গে। সাবুটাকে বাজারে পাঠাই’।
এমন সরল নির্বোধ কথায় রামতনুর মতো রাশভারী মানুষও হাহা করে হেসে ওঠে। বলে, ‘ও বাবা তাই নাকি। মায়ের কাছে মেয়ে জামাই আসবে নাকি। তা আমি তো বসিরহাট যাব আজ, মায়ের জন্য কিছু আনতে হবে নাকি?’
মাথা নাড়ে হাবি। মাথা নাড়ার চোটে তার ঘোমটা খুলে যায়। পা টিপে টিপে এগিয়ে এসে বলে, ‘মা ফেরিওয়ালার কাছ থেকে আমাকে একটা বৌ পুতুল এনে দিয়েছে। তুমিও ওর একটা বর পুতুল এনে দেবে। বোটা একা একা থাকে’।
রামতনুর প্রাণের সমস্ত কুসুম কোমল অনুভূতিগুলো এক নিমেষে যেন বরফের চাঙড় হয়ে যায়। কোনরকমে বলে, ‘দেবো মা’।
হাবি আর দাঁড়ায় না। বিনা ঘোমটাতেই পায়ের মল বাজিয়ে দৌড় লাগায়। কিন্তু রামতনুর পা দুটো যেন মাটির সাথে গেঁথে গেছে। সমস্ত শরীর তার অচল হয়ে গেছে। হাবি তো শিশু, না বুঝেই তার বৌ পুতুলের জন্য বর পুতুল চাইলো। কিন্তু রামতনুর মনে হচ্ছে তার বুকে হাবি যেন শেল গেঁথে দিয়ে চলে গেল। এই প্রথম সমস্ত অন্তরাত্মা শশীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে উঠলো। শশী বাস্তবিক এই শিশুটিকে নিয়ে পুতুল খেলছে। ‘শেখরের মা’ বলে জোরে হাঁক দেয়।
পৃথুলা শশী দুলে দুলে হাসিমুখে এসে বলে, ‘বাপরে বাপ কি ঝক্কি গো। আগে তো কখনও এ হ্যাপা সামলাই নি। মানুষ মলে যে শ্রাদ্ধ করতে হয় এ তার বাড়া। কত নিয়ম গো। তবে আমি সোহাগীকে বলে দিয়েছি - তুই কোনও চিন্তা করিস না। সব দায়িত্ব আমার। শ্রাদ্ধে কাকে কাকে নিমন্ত্রণ করবি কর’।
শশীর মুখে সোহাগী নামটা শুনে রামতনু যেন একটু চমকে ওঠে। শশী তো সাবুর মা বলেই ডাকে। তবে কি শশী কিছু বুঝতে পেরেছে.........। রামতনু অন্যদিকে মুখ ঘোরায়, ‘সে তুমি যা ভালো বোঝ করো’।
শশী খুব মিষ্টি করে জানতে চায়, ‘আমায় তুমি ডাকছিলে কেন গা?’
রামতনুর আর কিছু শশীকে বলতে ইচ্ছা করে না। বলে, ‘কি যেন বলবো বলে ডেকেছিলাম এখন আর মনে পড়ছে না’। কিন্তু মনে মনে বলে - শশী আমাদের একমাত্র সন্তান তাকে তোমার মনে পড়ে না? তুমি এমন পাষাণ হয়ে থাকো কি করে?
রামতনুকে চুপ করে থাকতে দেখে শশীই বলে, ‘গঙ্গা বাবাজী সেদিন অমন অশান্তি করে মেয়েটাকে নিয়ে চলে গেল। ওদের একটু খোঁজ নিও তো’।
রামতনু ‘আচ্ছা’ বলে শেখরের ঘরটাতে ঢোকে। বড়ো সাধ করে এ ঘরটা বানিয়েছিল। শেখর থাকবে তাই। দেওয়াল জোড়া বেলজিয়াম কাঁচের আয়নাটায় নিজের প্রতিকৃতিটা ফুটে উঠতেই রামতনুর আত্মজর জন্য বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে - বিড়বিড় করে বলে, ‘শেখর আমার ভুল হয়ে গেছে। তুই ফিরে আয় বাবা’। পরিপাটি করে গোছানো ঘরটার মাঝখানে এক বুক শূন্যতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।






১৩

কাঁচপোকা গাঁয়ের লোক জানলে কমলা তার বিয়ের দু’একটি গহনা যা ছিল তাই বেঁচে স্বামীর পারলৌকিক ক্রিয়া সারলো। এমন ভোজ খেয়ে গ্রামের সকলে ধন্যি ধন্যি করতে লাগে। ব্রাহ্মণদের ব্রহ্ম-অভিশাপের ফাঁড়া কাটানোর জন্য নতুন বস্ত্রদান ভালো কাজে লাগে। মুখরা, দজ্জাল, কুচুটে স্বভাবের কমলা একমুহূর্তে সদ্যবিধবা, অভাগিনী, দয়ালু বিমাতায় পরিণত হয়। শ্রাদ্ধ সারে ঘোষাল মশাই। তিনি হাবির বিয়েরও স্বাক্ষী। চারদিনের ব্যবধানে যে হাত ধরে কন্যাদান করেছিল, সেই মানুষটার ছবির সামনে শ্রাদ্ধের মন্ত্র পড়তে বুকের ভেতরটা মোচড় দেয়। বর্ষীয়ান মানুষটার কাছে মহিম ছিল সন্তানবৎ। কমলা দুই ছেলে কোলে নিয়ে নিষ্ঠাভরে শ্রাদ্ধ সারে। মাঝে মাঝে চোখের জলে আকুল হয়ে ওঠে। তখন নিঃসন্তান যোগেনের বৌ কমলার কোল থেকে ছেলেদুটিকে কোলে তুলে নিয়ে বলে, ‘ওদের আমায় দাও দিদি’।

শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়ার পর ব্রাহ্মণদের ফলাহারের সময় কমলা একগলা সাদা থানের ঘোমটা টেনে হাতজোড় করে বলে, ‘আপনাদের কাছে আমার একটা ভিক্ষা আছে’।
ব্রাহ্মণেরা বলে, ‘বল বৌমা’।
কমলা আবেগমথিত গলায় বলতে থাকে, ‘এখন থেকে আপনারাই তো আমার অভিভাবক, তাই আপনারা যদি আদেশ দেন তিন মাসের ভেতর কায়েত ঠাকুরপোকে পাঠিয়ে গয়ায় পিণ্ড দিয়ে ওনার আত্মার উদ্ধারের ব্যবস্থা করি’।
এমন কথায় ‘সাধু সাধু’ রব ওঠে। সকলেই প্রায় সমস্বরে বলে, ‘এ তো অতি উত্তম প্রস্তাব। তুমি মহিমের যোগ্য সহধর্মিনী’।
কমলা এবার একটু মুখ তোলে। আনত চোখে বলে, 'আপনাদের কাছে আমার আর একটা মিনতি আছে’।
ব্রাহ্মণের দল গদগদ হয়ে জানতে চায়, ‘বল বৌমা’।
কমলা যোগেনের দিকে একবার চোখ তুলে চেয়ে বলতে থাকে, ‘আমার একান্ত ইচ্ছা গয়া যাত্রাকালে ঘোষালঠাকুর ঠাকুরপোর সঙ্গী হন’।
দু’একজন ব্রাহ্মণ ভিতরে ভিতরে অসূয়া বোধ করলেও মুখে বলে, ‘এও তো অতি উত্তম প্রস্তাব’।
ঘোষাল মশাইয়ের প্রাণের ভিতরটা আহ্লাদে আটখানা হয়ে ওঠে। কবেকার সাধ তার একবার স্বচক্ষে বিষ্ণুর পদচিহ্ন দর্শন করে, ফল্গুর জল মাথায় ছিটিয়ে পুণ্যি অর্জন করে। কিন্তু গরীব ব্রাহ্মণের পক্ষে সেই মুলুক যাওয়ার পাথেয় কোথায়। তবু মুখে বলতে গিয়ে হরষে বিষাদে কেঁদেই ফেলে, ‘বেশ তাই হবে বৌমা। মহিম তো আমার সন্তানবৎ বৈ কিছু ছিল না’। ধুতির খুটোয় চোখ মোছে ঘোষাল মশাই।
কমলা এবার ঘাড় উঁচু করে ঘোমটা টেনে যোগেনের দিকে ফিরে বলে, ‘আপনাদের কাছে আমার শেষ প্রার্থনা’।
ব্রাহ্মণেরা বলে, ‘বল মা’।
কমলা একটু শক্ত গলায় জানায়, ‘আমি এই কাঁঠালগাছটা কাটিয়ে এখানে একটা রাধাগোবিন্দের মন্দির গড়তে চাই গাঁয়ের সকলের জন্য। ঘোষালমশাই গয়া থেকে ফিরে এসে নিত্যসেবার ভার নেবে। বিকাল করে ভাগবত, রামায়ণ, মহাভারত সব পাঠ হবে। গাঁয়ের বউঝিরাও শুনতে আসবে – ঠাকুরপোর বউতো পড়তে জানে। সেও মাঝে মাঝে পড়বেখন’।
কমলার কথা শেষ হওয়ার আগে যোগেনের মা এসে কমলাকে জড়িয়ে ধরে চিবুক ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘ও বৌ তোর ভিতরে একখানা এমন নরম মাটির মতো মন ছিল তাতো কোনদিন টের পাইনি। তোর মঙ্গল হোক বৌ’।
গ্রামের সবথেকে অবস্থাপন্ন ব্রাহ্মণ গোপাল ভট্টাচাৰ্য্য উঠে দাঁড়িয়ে দৃপ্ত গলায় বলে, ‘এই মন্দির তৈরির কাজে আমার তরফ থেকে সব সাহায্য পাবে’।
একে একে সকলেই বলে, ‘আমাদের তরফ থেকেও সাহায্যের দরজা খোলা থাকল’।
যোগেনের বৌ সুষমাও যৎপরোনাস্তি খুশি। এতদিনে তার লেখাপড়া শেখাটার একটা হিল্লে হল। কমলা বৌঠানের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ডুবুডুবু হয়ে ওঠে। ব্রাহ্মণের দল কমলার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যে যার বাড়ি ফেরে। যোগেন খানিক হতবুদ্ধি হয়ে ভাবতে থাকে কমলা বৌঠান ঠিক করতে চাইছেটা কি আর কমলা ভাবে মন্দিরটা হলে গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থাটা হয়ে যায় অন্তত। আর এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে গ্রামের কোনও শ্রেণীর মানুষজন কমলাকে অচ্ছুত করে ফেলে রাখতে পারবে না।
সারাদিন অসম্ভব ধকল সয়ে কমলার ছেলেদুটো নেতিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। সুষমা বলে, ‘দিদি ওদের আমি বাড়ি নিয়ে যাই। পরিষ্কার করে দুটি খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেইগে’।
বাবার শ্রাদ্ধের কারণে বাচ্চাদুটিকে ন্যাড়ামাথা করা হয়েছে। কমলা সেই ছোটো ছোটো বেলের মতো মাথায় হাত বুলিয়ে করুণ হেসে বলে, ‘লবকুশকে তোমায় দিয়ে দিলাম ভাই। তুমি তো লেখাপড়া শিখেছ, ওদের ঠিক মতো মানুষ করো। আমি মুখ্যু মানুষ। এখন যে কিভাবে পোড়া পেট চালাব তারই ঠিক নেই’।
সুষমা কমলার দুঃখে কাতর হয়ে ওঠে। চোখের জল ফেলে বলে, ‘অমন বল না গো দিদি। ঠাকুর গত হতে তুমি যা করছ কজন মেয়েলোকের বুকের পাটা থাকে এমন সৎকাজ করে। আমার সাউরি তো বলছিল - তুমি যা করে দেখালে তা নাকি হেঁটে হেঁটে স্বর্গে যাওয়ার ব্যবস্থা করে রাখলে পরকালের জন্য’।
সজোরে মাথা নাড়ে কমলা। কাঁঠালগাছটার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, ‘না গো না, আমি কিছুই করি নি। তালে কি আর স্বামীকে অমনভাবে খাই। তাইতো ছেলেদুটোকে তোমায় দিতে চাইছি পাছে ওদের উপর আমার কুনজর পড়ে’।
সুষমা কমলার মুখ চেপে ধরে, ‘এমনভাবে বল না দিদি। খোকাদের অমঙ্গল হবে। তুমি জানো না - কুসন্তান যদিও হয় কুমাতা কখনও হয় না’।
কমলা হাতজোড় করে বলে, ‘এখন শুধু রাধামাধবের মন্দিরটা বানিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠা করে দাসি হয়ে জীবনটুকু পার করে দিতে পারলেই বাঁচি’।
সহজ সরল সুষমা ছেলেদুটোকে বুকে চেপে ধরে বলে, ‘এদের কথা একটিবার ভাববে না’।
মৃদু হাসে কমলা, ‘সকলের কথাই রাধামাধব ভাববে। তুমি ভাই ঠাকুরপোকে আর একটু সময় থেকে যেতে বলবে?’
লবকুশকে বুকে আঁকড়ে সুষমা বলে, ‘নিয্যস বলে যাচ্ছি দিদি, লবকুশকে রাতে পাঠিয়ে দেব’।
কমলা বলে, ‘না ভাই তোমার আপত্তি না থাকলে ওরা আজ রাতে তোমার কাছেই থাক’।
বিস্ময়ের পারদ একের পর এক চড়তেই থাকে সুষমার, ‘বলছ কি আজ রাতে তুমি একা থাকবে?’
সুষমার চোখে চোখ রাখে কমলা, ‘হ্যাঁ, আমার বিশ্বাস তিনি আজ আমায় দেখা দেবেন। তিনি আসবেন। হাবির সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি। মা-মরা মেয়েটার কোনদিন মা হয়ে উঠতে পারিনি। অনেক কুকথা, গালমন্দ, মারধর করেছি। তেনার কাছে আমায় ক্ষমা চাইতে হবে বোন’।
কমলার মুখে এসব কথা শুনে সুষমার প্রায় ভিরমি খাওয়ার অবস্থা। ভয়ে ভয়ে কাঁঠালগাছটার দিকে একবার চেয়ে মুখ আমসি করে বলে, ‘এসব তুমি কি বলছ কি গো দিদি। শুনে তো আমার বুকের ভিতরটা ঢেঁকির পাড় দিচ্ছে’।
ম্লান হেসে ফিসফিস করে বলে কমলা, ‘তুমি যেন আজই এ কথা কাউকে বলে দিও না’।
মাথা ঝাঁকিয়ে ‘না’ বলে ছেলেদুটোকে দুই কাঁধে ফেলে ঘোমটা টেনে নিয়ে যেখানে রান্না হয়েছিল সেখানে যোগেন ময়রার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কি যেন কথা বলছিল সেখানে এসে দাঁড়ায়। মুখ নিচু করে বলে, ‘আপনাকে দিদি খানিক সময় থেকে যেতে বলেছে’।
সুষমার কোলে বিড়ালের ছানার মতো বাচ্চাদুটোর দিকে তাকিয়ে যোগেন বলে, ‘এদের তুমি কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?’
নিজের ভেতরের শূন্যতাকে পূর্ণতায় রূপ দিতে একটু জোর গলায় বলে সুষমা, ‘ওরা আজ রাতে আমার কাছে থাকবে’। বলে আর দাঁড়ায় না সুষমা। পাছে যোগেন আদেশ দেয় – না তুমি এদের রেখে যাও।

পড়ন্ত বেলার সন্ন্যাসীর গৈরিকে রাঙা হয়ে উঠেছে কাঁঠালগাছের মাথাটা। চারদিকে নিঃশব্দে ঘোষণা করছে মহাকালের ডমরু ধ্বনি। জড়ের বিরুদ্ধে চিৎ করেছে বিদ্রোহ ঘোষণা। চারদিকের হলুদ উন্মাদনায় যেন ভেসে যাচ্ছে। প্রকৃতি হাসছে। পাখিরা আকাশের বুকে সাতনরী হারের মতো করে ফিরে আসছে যে যার কুলায়। কমলা আবার একটা দুঃসাহসী রফা করলো। সন্তানহীনা সুষমা কচি শিশুর শরীরের ঘ্রাণে বুঁদ হয়ে রাতটা কাটাবে। এটা কি নারী জীবনের তার কম পাওনা, তাই নিজেই হাসি মুখে স্বামীকে বলে যেতে পারলো, ‘দিদি তোমায় কিছু সময় থেকে যেতে বললে’।

ময়রার সাথে সন্দেশ আর দইয়ের হিসাব নিয়ে কথা বলছিল যোগেন। মহিমের ঘরের ভিতর দিকে তাকায়। কমলাকে দেখা যায় না। বাগদী আর জেলেপাড়ার কতগুলো বৌ মেয়ে ভিড় করে আছে দাওয়ার সামনের উঠোনে। যোগেন ভাবে বৌঠান টাকাকটির জোরে কি করতে চাইছে কে জানে। কিন্তু কমলাকে দেখা যায় ঘরের ভিতর থেকে একটা রঙিন কাপড়ের পুঁটুলি নিয়ে এসে দাওয়ায় মেলে ধরে। বাগদী আর জেলে স্ত্রীলোকগুলো চকচকে চোখে সেদিকে চায়।
কমলা বলে, ‘তোমাদের খবর করেছিলুম কারণ এইসব রঙিন শাড়ি আমার তো আর কোনও কাজে লাগবে না, তাই তোমাদের দিয়ে দেব’।
শাড়িগুলো এক এক করে সকলের হাতে তুলে দেয়। তারপর ঘর থেকে কলাপাতায় মুড়ে মুড়ে কি যেন এনে সকলের হাতে ধরিয়ে দেয়। একজন বয়স্কা স্ত্রীলোক ডুকরে কেঁদে উঠে বলে, ‘তোমার মঙ্গল হোক ঠাকুরুন’। তার দেখাদেখি সকল মেয়ে বৌ কাঁদতে শুরু করে। মুহূর্তে কান্নার রোল পড়ে যায় মহিমের উঠোন জুড়ে। কমলার দুচোখ ভেসে যায় জলে। বয়স্কা স্ত্রীলোকটি বলে, ‘তুমি নাকি রাধামাধবের মন্দির গড়বে?’
কমলা দৃঢ় স্বরে জানায়, ‘হ্যাঁ’।
সকলেই প্রায় একসঙ্গে বলে, ‘আমরা তোমার মন্দিরে আসতে পারবো বামুন বৌ?’
কমলা হাসে, ‘আমার মন্দির বলছ কেন গা, এ মন্দির রাধামাধবের আর রাধামাধব হলেন সকলের তাই তার মন্দিরে সক্কলে আসবে’।
জেলে বাগদী বউরা প্রায় জয়ধ্বনি দিতে দিতে যায়। গাঁয়ের যে কজন খুচরো মানুষজন মহিমের বাড়িতে ছিল তারাও কমলার ব্যবহারে এমন অভিভূত যে জল চল-অচলের বিষয়টা ভুলে গেল বা আমলই দিল না। আজ কাঁচপোকা গ্রামে সকলে ধন্যি ধন্যি করছে কমলাকে নিয়ে। কমলা আজ এখানে একটা ইতিহাস গড়ে তুললো।

ছড়ানো ছিটানো জিনিসপত্র, খাওয়ার এঁটো কলাপাতা এসব একটা মুনিষ দিয়ে পরিষ্কার করানো দরকার। এসব যখন যোগেন উঠোনের একপাশে কাঁঠালিচাঁপা গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে ভাবছিল সে সময় খোনা গলায় কে যেন মিনমিন করে বলে, ‘বাবু মা জননী শুনলাম গাঁয়ের সক্কলের খাবার বিলোচ্ছেন, তা আমি তো ঠাকুরকে পোড়ালাম, আমার সিধেটা দেন’।
পিছনে ফেরে যোগেন। বদু ডোম। এখনই গাঁজার নেশায় চোখ লাল করে আছে। নেশার ঘোরেও চমকে ওঠে বদু। এই বাবুটিকেই তো সেদিন বিধবা পুকুরের পাড়ে দেখেছিল। বিরক্তি ভরে গলা চড়িয়ে ডাক দেয় যোগেন, ‘বৌঠান একটা সিধে নিয়ে এসে আপদটাকে বিদায় করুণ তো’।
খানিক বাদে কমলা সিধে নিয়ে আসে, সঙ্গে মহিমের পুরনো একজোড়া ধুতি। আলগোছে হাতে দিয়ে বলে, ‘নতুন বস্ত্র দেওয়ার ক্ষমতা নেই বাপ’।
মহিমের ধুতি ডোমকে দেওয়াতে যৎপরোনাস্তি বিরক্ত হয় যোগেন।
কমলা মৃদু হেসে বলে, ‘মানুষটাকেই ধরে রাখতে পারলাম না। অহেতুক তার পোশাকগুলো আঁকড়ে ধরে থেকে কি লাভ?’
বদু পেন্নাম ঠুকতে ঠুকতে ভাবে - ইস্ ঠাকুরুন জানতেই পারলে না, বিধবা পুকুর ধারে এই লোকটাই চুরি করতে গেছিল।

কে যে কার কি চুরি করে তা বুঝি স্বয়ং বিধাতা পুরুষেরও ঠাওর করতে কখনও কখনও হিমসিম লেগে যায়। চোর বেচারা নিজেও বোঝে না ঠিক সে কি চুরি করলে। আর যার চুরি গেল সেও নাচার হয়ে ভাবতে বসে কি বস্তু চুরি গেল আমার! সাদা চোখে সবই ফরসা। দিনমানের আলোর মতো ঝকঝকে পরিষ্কার। কিংবা তেঁতুল দিয়ে মাজা পেতলের বাসনের মতো ঝাঁ চকচকে উজ্জ্বল। মুখ দেখা যায়। কিন্তু অন্তরের চোখ সে বড়ো বিষম বস্তু। ত্রিনয়নের মতো মুদে থাকে সারাক্ষণ, সময় বিশেষে চেতন হয়। চেতন হয়ে জেগে ওঠে। বুক ধড়ফড়ের আকুতি নিয়ে চোর বামাল ধরা পড়ে। কিন্তু জগতের কি লীলা। গৃহস্থ মুচকি হেসে দুনেত্র মুদে পালানোর পথ করে দেয়। শুধু অন্তরচক্ষু পিটির পিটির করে দেখে রাখে তার গতিপথ। ভাবখানা যেন - যাবে কতদূর রশি আমার হাতে। সময় মতো টেনে নেব। তখন শুধু আমার চুরি যাওয়া বস্তু নয় তোমার যথাসর্বস্ব নিয়ে লুটিয়ে পড়বে এই শ্রী চরণে।
মানুষের দেহ পোড়ানো বদু ডোম খবর রাখে না মানুষের মন পোড়ার গল্প। দেহ পোড়ানোর কটু গন্ধে অভ্যস্ত সে। মরা দেহের হাড়ের গিঁটগুলো একটা প্রকাণ্ড তেলানো শক্ত বাঁশ দিয়ে ফটাফট ভেঙ্গে দেয়। মড়া যাতে নাংগা হয়ে খাড়িয়ে না যেতে পারে। পুড়তে পুড়তে খসে যাওয়া হাত পা সাঁড়াশীর মতো দুহাতে বাঁশের আগায় ধরে বিশেষ কায়দায় চিতায় ফেলে দেয়। মানুষের ঘিলু ছিটকে পড়ার দৃশ্য দেখে সে। মানুষের মাথার খুলি ফেটে যাওয়ার শব্দ চেনে সে। পেটের নাড়িভুড়ি ফেঁসে জল গড়িয়ে পড়া দেখে কোনদিন বদুর চোখে জল আসে না। ঘেন্নায় মুখ ঘোরায় না। কারণ ব্রাহ্মণ বাবা চিতের কাঠ সাজানোর সময় প্রতিবারই বদুর সামনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘বন্দু যে কতো পুন্যির কাজ করে তা বলার নয়’। বদুর মনে তাই অহংকার জাগে। বুকের ছাতি ফুলে ওঠে। সে যে মানুষটার চামড়ার খোলে ঢাকা জীবনটার মুক্তি ঘটিয়ে দিল। এবার লোকটা স্বর্গে যাবে না নরকে যাবে সেটা তার ব্যাপার। যেমনি কর্ম করবে তেমনি ফল পাবে। বদু মৃত মহিমের ধুতিজোড়া বুকে চেপে ধরে। চাল, ডাল, আলু, কাচকলার সিঁধেখানা সামলাতে সামলাতে টলমল পায়ে শ্মশানমুখো হাঁটতে হাঁটতে একটা হিসেব পরিষ্কার মিলিয়ে ফেলে। সে মনে মনে মহিমকে বলে, বাবা ঠাকুর তুমি সজ্ঞে গিয়ে খুব ভালো থেকো। অনেক আঙ্গুরফল খেয়ো। মলমলে ধুতি পরো। আর ঠাকুর দেবতারা তো সবসময় জগ্যি করে, তাদের পুরুতগিরি কর। আসলে জীবনে একবার আঙ্গুরফল খেলেও মলমলে ধুতি পরা তো দূরের কথা কোনদিন ছুঁয়েও দেখে নি বদু। তাই ওদুটো বস্তুর প্রতি তার বড়ো লোভ। কমলার সিঁধেতে দেওয়া গাওয়া ঘিয়ের গন্ধে বদুর মনটা কমলার প্রতি বড়ো নরম হয়ে ওঠে। সে আপনমনে জোরে জোরেই বলতে বলতে যায়, ‘জগৎজননী মা তুমি হেঁটে হেঁটে স্বর্গে যাবে’। কপাল কুঁচকে একটা কথাও মনে মনে বলে, ‘যে বদু ডোমের প্রাপ্যে ভাগ বসানোর জন্যে চুরি করার কথা ভাবে তার মরণ পর্যন্ত না, বেঁচে থাকতেই নরকবাস হবে’। (ক্রমশ)






১৪

বসিরহাটের ঐতিহ্য অতি প্রাচীন। তার জন্ম ধরতে গেলে বিজয়ের যুবক বয়সের কিছু পরে। ১৮৬১ সালের জানুয়ারি মাসে। তখন আন্না সবে এক পা, দু’পা হাঁটতে শিখেছে। মুখে আধো আধো দু'একটা বোলও ফুটেছে। বাব্‌বা, ম্‌মা কিংবা উতা, এতা এইসব। বসিরহাটকে ঘিরে ইছামতী, বিদ্যাধরী, পিয়ালি, রায়মঙ্গল, যমুনা, সোনাই সব নদীরা যতই থাক ইছামতীর গর্ব কেউ নিতে পারে নি। বসিরহাটের মতোই ইছামতী প্রাচীন হয়। অথচ তার বয়স বাড়ে না। বিজয় বসিরহাটে হাট করতে গেলেই অনেক সময় কাটায় ইছামতী নদীর ধারে। বিজয়ের মনে হয় যে নদীতে অবিরাম জোয়ারভাঁটা খেলে সে নদীর সত্যিই প্রাণ আছে। ১০৮০ কিলোমিটার নদীর গতিপথ বারবার পরিবর্তন হয়েছে। বিজয় নদীটাকে এতটাই ভালোবাসে যে নদীয়ার পাবাখালিতে হুগলী নদীর শাখা চূর্ণী থেকে ইছামতীর জন্মস্থান দেখে এসেছে। আর বিয়ের পরে অনেকগুলো বছর যখন পার হয়েও বৈঁচির কোলে সন্তান আসছিল না, সকলে বলছিল হাড়োয়ায় গিয়ে পীর গোরাচাঁদের মাজারে চাদর চড়ালে বৈঁচি নাকি মা ডাক শুনতে পাবে। হুট বলতে বাপু স্ত্রীকে নিয়ে বের হওয়া যায় না। তাই বিজয় এ সুযোগ হাতছাড়া করে নি। পীর গোরাচাঁদের অপমান করে নি, চাদর চড়িয়েছিল সত্য কিন্তু ঢিবির কাছে ইছামতীর যে যমুনা নদীর সঙ্গে মিলন হয়েছে তা দেখিয়ে এনেছিল বৈঁচিকে। আহা দুটি নদীতো নয় যেন দুই সখি। গলা জড়াজড়ি করে সোহাগ করছে। এবার বিজয়ের মনে সুপ্ত একটা বাসনা চাগাড় দিয়েছে, সে হল আন্না আর শেখরকে নিয়ে সুন্দরবনের ভেতর কদমতলী নদীর সঙ্গে ইছামতী মিশে কেমনভাবে সাগরে পড়েছে তা দেখিয়ে আনার। কিন্তু শেখর আর আন্নার দাম্পত্য সুখটা কড়কচ লবণের মতো বড়ো খচখচ করে গলার কাছে। সর্বক্ষণ মনে হয় দুঃখী একটা পিতৃহৃদয় তার সঙ্গে চলেছে। বলছে, বিজয় তুমিও তো আমার মতোই একজন কন্যার বাপ। তা তুমি শুধু তোমার সন্তানের কথাই চিন্তা করবে? আমার মা মরা মেয়েটার কথা একটি বারও ভাববে না? সে বিগ্রহহীন দেবালয়ে পুতুল খেলা করছে মাছ মণ্ডা খাওয়ার লোভে। নিজের বুকটায় নিজে হাত বোলায় বিজয়। কি নির্মম, কি নির্মম এই বাস্তব। ইছামতীর তো দুটো শাখা নদী। বরুণহাটের কাছে গৌড়েশ্বর নদী আর হাসনাবাদের কাছে কাটাখালি নদী। তাহলে বিজয়ও দুটি কন্যার বাবা হতে পারে। আন্না আর হাবি। কিন্তু তারপরেই মনে হয় ইছামতীর উৎসমুখের জলধারা যতই মিষ্টি হোক, মোহনার জল কিন্তু লবণাক্ত। সে যতই কন্যাস্নেহে ভাবুক হাবিকে, আন্নার সঙ্গে সম্পর্কটা তার সতীন কাঁটার আর সেখানেই সব গোল বেধেছে। বিজয় পরাজিত। না দেখা মহিমের অদৃশ্য আত্মা যতই ঘ্যান ঘ্যান করুক বিজয় অপারগ।

বিজয় টাকি থেকে বসিরহাট বেড়িয়েছে সেই কাকভোরে। স্নান, সূর্যপ্রণাম আর গায়ত্রী মন্ত্র জপ করে আর ঘরে পাতা দই, খই, গাছের আম, কলা দিয়ে ফলার করে গরুর গাড়ি চেপে রওনা দিয়েছে। ফিরতে ফিরতে রাত গড়িয়ে যাবে সে কথা বৈঁচি, আন্না জানলেও শেখর জানে না। শেখর তাই আন্নাকে শুধোয়, ‘তোমার বাবা তো অনেক সময় বসিরহাট গেছেন, এখনও এলেন না যে’।
আন্না বেশ গর্বের সঙ্গে বলে, ‘বাবা তো প্রতিদিনই পাখি ডাকে আর বিছানা ছাড়ে। আর যেদিন যেদিন বসিরহাট যায় সকালে যখন শুকতারাটা মা কালীর তৃতীয় নয়নের মতো জ্বলজ্বল করে আকাশের বুকে ফুটে ওঠে বাবা তখন হরি জ্যাঠার গরুর গাড়িতে রওনা দেয়। ফেরবার সময় অবশ্য নদীপথে ফেরে। হরি জ্যাঠার কাছে কিছু জিনিস দিয়ে দেয়’।
শেখর অবাক হয়ে আন্নার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কি সুন্দর করে কথা বলে আন্না। মেয়েমানুষ যে এমন সুন্দর ভঙ্গী করে, সুন্দর ভাষায় কথা কইতে পারে আন্নার সঙ্গে বিয়ে না হলে শেখর জানতেই পারতো না। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ফের শুধোয়, ‘কেন তোমাদের কি আত্মীয়কুটুম্ব আছে বসিরহাটে যে এত দেরী হয়?’
এইবার আন্না একটু সময় চুপ করে থাকে। কি যেন ভাবে, তারপর মুখ নিচু করে ফিসফিস করে বলে, ‘তুমি আমার স্বামী। তোমার কাছে মিথ্যে বলবো না, লুকবোও না। তবে তুমি আমার গা ছুঁয়ে কথা দাও, প্রাণ থাকতে তুমি একথা কাউকে বলবে না’।
শেখর অবাক হয়। বাপরে কি এমন কথা যা আন্নার গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করতে হবে। সে হাসিমুখে আন্নার হাতটা কোলের মধ্যে নিয়ে মুঠোর ভেতর আঙুল নিয়ে খেলা করতে করতে বলে, ‘বেশ বলবো না। এই তোমাকে ছুঁয়ে দিব্যি করলাম’।
আন্না শেখরের কোলের মধ্যে দখলীকৃত হাতটার দিকে তাকিয়ে আবেগের আবছা স্তর থেকে মননের ভিত্তিভূমিতে যেন থিতু হয়। ফিসফিস করে সে বলে, ‘আমার বাবা একজন স্বদেশী’।
শেখর চমকে ওঠে। আন্নার হাতটা কোল থেকে স্খলিত হয়ে যায়। প্রায় শ্বাস বন্ধ করে বলে, ‘কি বললে?’ আন্না শেখরের মুখে হাত চাপা দেয়, ‘আস্তে। মা শুনতে পেলে আস্ত রাখবে না আমায়’।
শেখরের বকসাদা মুখটা আরও ফ্যাঁকাসে হয়ে যায়। ঠোঁট শুকিয়ে ওঠে। জল তেষ্টা পায় শেখরের। আন্না একই ভঙ্গীতে বলে, ‘আমার বাবা বসিরহাটে চাষিদের নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সভা করে। ব্রিটিশের চর তো চারদিকে ছেয়ে আছে। তাই নদীতে খেয়া নৌকোয় সভা হয়। বাবা বলে, ইংরেজ এসে প্রজাদের টাকার মাধ্যমে খাজনা দেওয়া চালু করে কৃষকদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইংরেজ যাদের জমিদার হিসাবে ঘোষণা করেছে তারা চাষিদের থেকে অন্যায়-জুলুম-অত্যাচার করে যা খুশি খাজনা নিয়ে একটা নির্দিষ্ট অংশ ইংরেজদের দিয়ে নিজেদের পেট মোটা করছে। জানো বাবা বলে, ১৭৯৩ সালে কর্ণওয়ালিশ যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তন করেছিল তাতে খালি ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে, পরিবর্তন কিছু হয় নি। কেন তুমি তো কলেজে পড়, শোন নি হফতম আইনের কথা। চাষি নিজের এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও মজুরী পেলেও জমি চাষ করতে যেতে পারবে না’।
ঘাড় নাড়ে শেখর। অর্থাৎ সে জানে। হঠাৎ করে মুখরা হয়ে ওঠে আন্না। মাথা ঝাঁকিয়ে ওঠে। মাথা ঝাঁকানোর ফলে তার এলো খোঁপা খুলে পিঠ ঝাঁপানো অজস্র চুল ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘাড়, পিঠ, কানের উপর দিয়ে। শেখরের হঠাৎ মনে হয় অজস্র কালনাগিনী যেন ফণা উঁচিয়ে আসছে শেখরের দিকে। ভয় করে শেখরের। আন্নার চোখদুটোও কেমন ধারালো আর জ্বলজ্বল করছে কাস্তের ফলার মতো। আন্নার যে পুরু ঠোঁট দুটিকে শেখর নিজের মুখের ভেতর নিয়ে পাকা কামরাঙার স্বাদ পেতো সেখানে মনে হয় বিষের প্রলেপ মাখানো।
আন্না থামে না। তার নাকের পাটা স্ফীত হয়, ‘জানো ১৮১২ সালের পনজম আইন লোক ঠকানো বঙ্গীয় খাজনা আইন ইংরেজদের জমিদারদের সাথে মিলে চাষিদের হাতে-ভাতে মারবার চক্রান্ত’। তারপর গালে টোল ফেলে সেই মায়াবী হেসে বলে, ‘তুমি ফেরত না এলে আমি তো ঠিক করে নিয়েছিলাম স্বদেশী দলে নাম লিখিয়ে ইংরেজ মারবো’।
শেখরের গলা থেকে তীরের মতো ছিটকে আসে, ‘কি? কি বললে? স্বদেশী দলে নাম লিখিয়ে ইংরেজ মারতে! মেয়েমানুষ হয়ে খুন করার কথা ভাবতে তোমার বুক কাপে নি? কি ভীষণ মেয়ে গো তুমি! আগে যদি জানতাম ...............’।
কথা শেষ করে না শেখর। আন্না ওর পুরুষ্ট হাত দুখানা দিয়ে শেখরের গলা জড়িয়ে ধরে। শেখর বসেছিল। এর ফলে সে আন্নার বুকের কাছটিতে ঝুঁকে পড়ে।
আন্না হঠাৎ আদুরে হয়ে ওঠে। ফিসফিস করে বলে, ‘কি আগে জানলে আসতে না আমার কাছে? আমার সতীনকে নিয়ে সংসার করতে তাই তো?’
শেখর আন্নার বাহু বেষ্টনীর মধ্যে থেকে নিজেকে মুক্ত করে। কি সব বলছে আন্না। আন্নার সতীন মানে তো সেই মেয়েটা। যে কিনা বাসর রাতে বিছানায় ......... ভাবতে গিয়ে গা গুলিয়ে মোচড় দিয়ে ওঠে শেখরের। না কক্ষণও না। এ জীবন থাকতে না। সে আন্নাকে বলে, ‘তুমি আজ আমায় কথা দাও আন্না মানুষ খুন করার কথা তুমি স্বপ্নেও আর কোনদিন ভাববে না। বলবে না’।
আন্না অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে স্বামীর দিকে। তারপর ঠোঁট মুচড়ে হেসে বলে, ‘মানুষ খুনের কথা কে বলল তোমায়। আমি তো ইংরেজ মারার কথা বলেছি’।
শেখর তাজ্জব বনে যায়, ‘কি সাংঘাতিক! ইংরেজ মানুষ না?’
সজোরে মাথা নাড়ায় আন্না। ফলে তার চুলে এলো খোঁপা ফের আর একবার খুলে যায়। কৃষ্ণের কালীয় দমনের মতো অসংখ্য ফণিনীর ফণা শেখরের পানে উঁচিয়ে আছে। তার মধ্যে তুলতুল করছে আন্নার শ্যামলা রঙের মুখখানা। স্বামীর কথায় সে বুঝিবা একটু আহত। তবু দৃঢ়তার সঙ্গেই জানায়, ‘ইংরেজ অমানুষ'।
শেখরের এসব আলোচনা একদম ভালো লাগছিল না। সে খানিক উষ্মার সঙ্গে বলে, ‘তোমার বাবা তোমায় এত বলেন, ডেভিড হেয়ারের কথা বলেন নি? বিমান তো বলে, ইংরেজের ছদ্মবেশে স্বয়ং ভগবান এসেছিলেন আমাদের দেশে’।
আন্না দমবার পাত্রী নয়। সেও বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ আমি ওনার নাম শুনেছি। কিন্তু বাবা বলে, ওনার কাজ কলকাতাকে কেন্দ্র করে। এই বাদাবনের দেশে ওনার কাজের মূল্যায়ন যবে হবে তবে তুমি আমি না আমাদের ছেলেপুলেরাও মরে হেজে ফর্সা হয়ে যাবে’।
শেখর যেন কি বলতে গিয়েও থমকে যায়। এমন বয়স্কা মহিলার মতো কথা আন্না বলতে পারে তা শুনে বাস্তবিক শেখর স্তম্ভিত হয়ে গেছে। আর তখনই কলা গাছের পাশ থেকে সড়সড় করে একটা মানুষের ছায়া এগিয়ে এসে খুশিখুশি গলায় বলে ওঠে, ‘এই না হলে আমার মেয়ে’।
আন্না ছুটে গিয়ে বিজয়ের হাত জড়িয়ে ধরে, ‘বাবা তুমি কখন এলে? আমার জন্য কি এনেছ?’
বিজয় মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, 'এই তো কিছুক্ষণ আগে এলাম’। তারপর মেয়ের কানে ফিসফিস করে কি যেন বলে। আন্নার মুখখানা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বিজয় এসে শেখরের পাশে বসে। হঠাৎ করে সম্পর্কের দূরত্ব ভুলে পিঠে হাত রাখে, ‘এখন শরীর কেমন বোধহয় শেখর?’
ঘাড় নাড়ে শেখর, ‘ভালো’।
বিজয় বেশ প্রফুল্ল বদনে বলে, ‘বাঃ এবার তো তাহলে কলেজে যাওয়ার দরকার। পড়ায় তো অনেক পিছিয়ে গেছো এ কদিনে’।
মাথা নাড়ে শেখর। এই মানুষটার সামনে আসলে শেখর যেন ক্ষুদ্র হয়ে পড়ে। গোপনীয়তা খোঁজে। আবার সামনে আসার জন্য অদ্ভুত আকর্ষণ বোধ করে।
বিজয় হঠাৎ করে বলে ওঠে, ‘শেখর!’
শেখরও চমকে গিয়ে বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ, বলুন বাবা’।
বিজয় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘না কিছু না। আমি যাই হর খুঁড়ির জন্য বাতের ব্যথার তেল এনেছি, যাই গিয়ে দিয়ে আসি। বুড়ো মানুষ রাত করলে ঘুমিয়ে পড়বে’।
বিজয় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আন্নাও উঠে দাঁড়ায়। শেখরকে বলে, ‘তুমি একটুখানি বস। আমি আসছি’।

আন্না আর বিজয় চলে যাওয়ার পর চারদিকে নিস্তব্ধতার চাদরে ঢেকে যায়। শুনশান। ঝিঁঝিঁ পোকাদের একঘেয়ে ডেকে চলা সময়ের দৈর্ঘ্যকে যেন আরও বেশী বাড়িয়ে দেয়। আন্নাদের বাড়িতে বাড়তি লোক কেউ নেই। কাজকর্মে যারা আসে তারা সূর্যিঠাকুর পাটে বসার আগে যে যার মতো চলে যায়। এতো নিরালাতে শেখরের বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে। হঠাৎ করে ভীষণ কান্না পেয়ে যায় শেখরের। ভবানীপুর গ্রামখানার জন্য তার বুকের ভেতরে কি যেন ঘাই দেয়। মায়ের জন্য, বাবার জন্য, হুসেন দাদার জন্য, বাড়ির ঝি, চাকর, মুনিষ, পোষা গরুবাছুর এমনকি গঙ্গার জন্যও মন খারাপ করে শেখরের। হুহু করে তার কেবলই কান্না পায়। জানলা দিয়ে বাইরের কৃষ্ণপক্ষের রাত দেখে শেখর। ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু আকাশের দিকে চোখ পড়লে মনে হয় বিশাল শামিয়ানার গায়ে অসংখ্য চুমকির চকমকি ঝকঝক করছে। সেদিকে তাকিয়ে আন্নার ‘একটু ... আসছি' বলে যাওয়া কথাগুলো বারবার প্রতিধ্বনি তোলে। আন্না স্বদেশীদের সমর্থন করে। ইংরেজ খুন করাকে বাহাদুরির চোখে দেখে। কিছুতেই মেলাতে পারে না শেখর। এ কোন আন্না? এ তার স্ত্রী! না না এমনটা চায় নি শেখর। তাদের বাড়ি, শেখরের মামার বাড়ি, এমনকি গঙ্গা দাদাদের বাড়িতেও ইংরেজদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলার চল। সে জন্মইস্তক এ সব দেখে এসেছে। সেখানে তার নিজের মানুষটির এমন উল্টোপুরাণ মনের গতিক সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। সেই সঙ্গে তার আর একটি কথা মনে হয় সত্যি সত্যি কি জন্মের শোধ সে আর বাড়ি যেতে পারবে না! হায় অদৃষ্ট! এই সুকুমার নবীন যুবকটি জানেই না তার পিতা তাকে ত্যজ্য ঘোষণা করেছে। কুলীন ব্রাহ্মণের পৈতে ধরে শপথ নেওয়া সে যে কি ভীষণ গুরুতর ব্যাপার তা কে না জানে। শপথ খণ্ডালে পরে বংশ পরম্পরায় ব্রহ্মশাপের থেকে কেউ মুক্তি পাবে না। সমাজে মহাপাতক হতে হবে।

আন্না যে কারণে উঠে এসেছিল তা বিজয় জানে। বাবাকে সে বলে, ‘চল বাবা হরদাদুর বাড়ি যাওয়া আসার পথে আজকের মিটিনের গল্পটা শুনি’।
বিজয় বলে, ‘নারে আন্না, তোকে আর এ সবের মধ্যে জড়ানো ঠিক হবে না। আজ বাদে কাল তুই নিজের সংসার করতে কলকাতায় চলে যাবি, সেখানে মন বসাতে পারবি না। আর তাছাড়া তোর মা জানতে পারলে আমাকে রক্ষে রাখবে না’।
অন্ধকারে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে আন্না। বিজয়ের দুহাত জাপটে ধরে বলে, ‘বাবা আমি কলকাতায় গে বাস করলে তোমার কত সুবিধা হবে ভেবে দেখেছো?’
না ভাবে নি বিজয়। কিন্তু মেয়ের কথায় তার ভেতরটা যেন ভাঙচুর হয়ে যায়। শুধুমাত্র মেয়ে হয়ে জন্মানোর জন্য এমন একটি মেয়েকে আজীবন ঘরসংসারের পুতুল খেলে যেতে হবে। দেশের কাজে পুরুষের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে না। অন্ধকারে চোখ মেলে বিজয়ের অদ্ভুত একটা কথা মনে হয় – শেখর যদি আর ফিরে না আসতো তাহলে আন্নার জীবনটার পুরোপুরি একটা সৎব্যবহার হতো।
আন্না বাবার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়, ‘কি হল বল। আমার যে আর তর সইছে না’।
বিজয় গম্ভীর গলায় বলে, ‘তুই এসবের কিছু বলিস নি তো শেখরকে, আন্না?’
আন্না ছোট হলেও বুদ্ধিমতী। বাবা মেয়ের এসবের গোপন শলা বৈঁচিও জানে না। তাই সে বুঝে যায় সে যে শেখরকে বলে ফেলেছে এ কথা জানলে বাবা ভয়ানক রাগ করবে। হয়তো আর কোনদিন এ নিয়ে কোন কথা বলবে না। তাই সে জীবনে এই প্রথম মিছে কথা বলে, ‘না বাবা। আমি কিছু বলি নি। তুমি নিশ্চিন্তে আমাকে আজকের মিটিনের কথা বল। কি হল? জীবনকাকুরা সক্কলে এসেছিল?’
বিজয় এই আত্মজাটির দিকে বড়ো স্নেহাতুর চোখে তাকায়। তারপর জোনাকিজ্বলা কামিনী ফুলের ঝোপটার দিকে তাকিয়ে ঈষৎ গাঢ় স্বরে জানায়, ‘হ্যাঁ সকলেই এসেছিল। তোকে আগে বলেছিলাম না, কোম্পানি ১৭৬৫ সালে দেওয়ানী নেওয়ার পঞ্চাশ বছর পরে যে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নেমে আসে, তাতে এতো মানুষ মারা গেছে যে অনেক জমি অনাবাদী পড়ে আছে। আর সেখানে ইংরেজ চাষিদের ধরে নিয়ে গিয়ে জোর করে নীল চাষ করাচ্ছে। মুর্শিদাবাদের নবাব আলিবর্দি এবং তার পরবর্তী নবাবরা ভূমিরাজস্ব না বাড়িয়ে বিভিন্ন উৎসবের ছুতো করে উৎকোচ নিত। কিন্তু কোম্পানি যে আকাশছোঁয়া রাজস্ব বাড়িয়েছে তাতে কৃষকের নাভিশ্বাস উঠেছে। টাকার মাধ্যমে রাজস্ব চালু করার জন্য আর এক সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। মুদ্রাসঙ্কটের জন্য চাষি বাধ্য হচ্ছে নীলকর অথবা লবণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সুদে অগ্রিম টাকা ঋণ নিতে। সেলামী, মাঙ্গল, বাটা, পার্বণী, ভিক্ষা, গারদ সেলামী এতরকমের খাজনা ইংরেজরা আমাদের উপর ধার্য করেছে যে কতো দেশীয় জমিদারদের জমিদারী নিলামে উঠে যাচ্ছে তার ঠিক নেই। আমাদের সুন্দরবন অঞ্চলের চাষিদের অবস্থা তো আরও করুণ। আকুচ নুনে ভরা পাঁক জমিকে চাষযোগ্য করার জন্য কত দূর দূর মুলুক থেকে মানুষ ধরে আনছে। তাদের লোভ দেখানো হচ্ছে এখানে তারা নিজের জমি পাবে। বাস করবার, খেতালী করবার। অসহায় মানুষগুলো ভারবাহী পশুর মতো বাধ্য হচ্ছে ইংরেজের সবকিছু মেনে নিতে। কিন্তু যেইমাত্র কিছু অনাবাদী জমিকে আবাদি করে তোলা হচ্ছে তার পরেই খাল কেটে হতভাগা মানুষগুলোর জমিতে নুনজল ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের তাড়িয়ে ছাড়ছে’।
আন্না চমকে ওঠে, ‘সে কি বাবা! এত বদমায়েশ তারা?’
বিজয়ের কণ্ঠস্বরে কান্না ঝরে পড়ে, ‘সাঁওতাল, মুন্ডা সব আদিবাসীদের ধরে ধরে নিয়ে এসে অমানসিক পরিশ্রম করাচ্ছে। তারপর কাজ মিটে গেলে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। আর আমরাও জাতপাতের দোহাই দিয়ে সে মানুষগুলোকে কাছে টেনে নিচ্ছি না। এক দেশমায়ের সন্তান হয়ে আমরা তাদের সাথে সৎভাইয়ের মতো আচরণ করি’। বিজয় একটু গলা খাটো করে চুপিচুপি বলে, ‘কেন শেখরের বোনাই গঙ্গা ব্যানার্জীদের যে তালুক আছে তার পাশে ঝুমকো হেমব্রমের তালুকের বিবাদ কি আজকের? সেই কবে থেকে ওরা বিভিন্ন অত্যাচার শানিয়েই যাচ্ছে। আমার কাছে খবর আছে আন্না, একটা রক্তারক্তি লড়াই লাগলো বলে’।
কথাটা বলেই বুঝতে পারে বিজয়, আন্নাকে বলা ঠিক হল না। শত হলেও এরা আন্নার শ্বশুরবাড়ির মানুষ। শেখরের একান্ত আপনজন। আন্না যদি মুখ ফসকে বলে ফেলে শেখরকে তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
আন্না শাড়ির আঁচলটা কোমরে ভালো করে পেঁচিয়ে নিয়ে বলে, ‘তালে তোমরা ফি দিন কিসের মিটিন করো বাবা? নিজের দেশের মানুষগুলোকেই এক করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে পারছ না?’
চমকে ওঠে বিজয়। কি কঠিন সত্য কথাটা এই একফোঁটা মেয়েটা অনায়াসে বলে দিল। তারপরক্ষণেই নিজের কাছে নিজেই হেসে ওঠে। এ যেন ভাবের ঘরে চুরি করতে এসে ধরা পড়ে যাওয়া। কাকে সে একফোঁটা বলছে। যে মেয়ের দুবছর হল বিয়ে হয়ে গেছে। আর আগামী দুবছরের মধ্যে সন্তানের মা হয়ে যেতে পারে। আর এখানেই মনে হয় সাদা চামড়ার ঐ মানুষগুলো খাঁটি। অনেক এগিয়ে আছে তাদের থেকে কিছু কিছু জায়গায়। তারা নিজেদের স্ত্রী লোককে সম্মান দেয়। শিক্ষার আলো, জ্ঞানের আলো থেকে তাদের বঞ্চিত করে রাখে না। এই শিশুসমান বালিকাগুলোর বিবাহ মানে তো প্রকারান্তরে এক ধরনের যৌন ব্যাভিচারকে প্রশ্রয় দেয়া। সমাজসিদ্ধ করে দেওয়া। তাদের শরীর মন কোনটাই গঠিত হয় না। ভালো লাগে না বিজয়ের। তার খুব মন খারাপ হয়ে যায়।

শেখর রাতে ভালো করে খেতে পারে না। বৈঁচি হা হা করে ওঠে, ‘কেন বাবা খাচ্ছ না যে বড়ো। শরীর কি আবার খারাপ লাগছে?’
মাথা নাড়ে শেখর। তার মনের মধ্যে নদীর ঘূর্ণির মতো পাক খেতে থাকে আন্নার বলা কথাগুলো।
বিজয়ও জিজ্ঞাসা করে, ‘কি হয়েছে শেখর?’ তারপর নিজেই যেন নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায়, কি আর হবে, বাড়ির জন্য মন খারাপ করতেই পারে।
কোনরকমে খাওয়াদাওয়া সেরে ঘরে ঢুকে যায় শেখর। তার কেবলই কান্না পাচ্ছে। আন্না পাশে এসে বসলেও কোনও কথা হয় না। তবু আন্না শুধোয়, ‘হ্যাঁগো তোমার কি হয়েছে?’ আন্নার ভেতরটা উশখুশ করছিল আজকের গল্পগুলো সবিস্তারে শেখরকে শোনানোর জন্য। কিন্তু শেখর এমন পাড়া মুখ করে থাকলে শেখরকে কি করে শোনায় সে কথা। তাই ভাব জমানোর জন্য শেখরের গলা জড়িয়ে ধরে।
শেখর বিরক্ত হয়ে বলে, ‘আঃ আন্না ছাড়ো, ভালো লাগছে না’।
আন্না আহত হয়। আহত হয়ে ক্রুদ্ধ সর্পিনীর মতো ফোঁস করে ওঠে, ‘হয়েছেটা কি তোমার?’
শেখর কিছু না বলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। আন্নাও উল্টো দিকে মুখ করে শুয়ে পড়ে। শেখরের ভাবনা মাথা থেকে উবে যায় নিমেষে। কৌতুকের সুরে নিজের মনে বলে যায়, ‘সেবার জানো আমার বুদ্ধিতেই পুলিশ এসেও বন্দুকখানা খুঁজে পায় নি’।
শেখরের সমস্ত শরীর শক্ত পাথরের মতো হয়ে গিয়ে ঠাণ্ডা হতে থাকে। মুখ থেকে আপনা-আপনি বেড়িয়ে আসে, ‘তুমি বন্দুক দেখেছো?’
‘হু’ বলে উঠে বসে আন্না, ‘দোনলা দেশী বন্দুক না গো। এই এট্টুসখানি বন্দুক। কালো। কেমন হিমহিম শরীর। বাবা কি করে যেন খবর পেয়েছিল - পুলিশ আসবে। বলে - সর্বনাশ আন্না, কোথায় লুকিয়ে রাখি এটা? আমি বলি, চিন্তা করো না। আমার কাছে দে তুমি নিশ্চিন্তে থাকো!’ শেখরের মুখের কাছে ঝুঁকে এসে বলে, ‘কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলাম জানো?’
শেখর বিমূঢ়। বাক্যিহারা।
আন্না বলে, ‘চুলের মধ্যে’।
শেখরের দম আটকে আসে। এ পাশ ফিরে আন্নার মাথাভর্তী ঠাঁসা কোঁকড়ানো চুলগুলোর দিকে তাকায়। অন্ধকারে ফিতে দিয়ে বাঁধা আন্নার বেড়াবিনুনি করা বিনুনিদুটোকে মনেহয় যেন দুটো খরিশে শঙ্খ লেগেছে। তেমনই জড়াজড়ি করে আছে বিনুনিদুটো। ভয় হয় শেখরের। এ কাকে সে পাগলের মতো ভালোবেসে ঘর ছেড়ে চলে এসেছে।
শেখর উঠে বসে। আন্না ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেছে। আন্নার মুখের দিকে তাকাতে ভয় করে শেখরের। জানলার কাছে এসে দাঁড়ায়। বাইরে কিছুদূরের পুকুরের ঠান্ডা বাতাস ভেসে এসে ঝাপটা দিয়ে যায় শেখরের চোখে মুখে। কি করবে শেখর বুঝতে পারে না। কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়েই থাকে। একটা নিশাচর পাখি তারস্বরে ডেকে চলে যায়। আন্না ঘুমের ভেতর কি যেন উ উ করে বলে ওঠে।
একটা নিঘুম রাত কাটানোর পরে ভোররাতে শেখর দরজার আগল খুলে চুপিচুপি বাইরে আসে। আন্নাদের বাড়ি থেকে কাটাখালি নদীর ধারে এসে দাঁড়ায়। ভোরের সূর্য তখন টকটকে লাল জবাফুলের রঙ ধারন করে নদীর জলে গুলে যাচ্ছে। দূর থেকে একটা নৌকাকে আসতে দেখে শেখর। নৌকোটা এ পাড়েই আসছে। হঠাৎ মনে হয় নৌকোটা যেন একটু দ্রুতই এদিকে আসছে। নৌকোর বৈঠায় বসে থাকা মানুষটাকে দেখে বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। হুসেনদাদা। নৌকোর খোলের ভেতর কালু বাউড়ি। এ যে তাদের বাড়ির নৌকো। অবাক হয়ে যায় শেখর। কি কান্ড কালু বাউড়ি এদ্দিন ধরে ভবানীপুরেই ছিল নাকি! আরও তিনজন আছে। এরাও সেদিন পাল্কী বয়ে এনেছিল কলকাতা থেকে। এদের প্রত্যেকের কোলেই বড়সড় একটা পুঁটুলি। পাল্কীটাও আছে। কিন্তু তারা কাটাখালি নদী হয়ে হাসনাবাদ না গিয়ে এদিকে বাঁক নিল কেন? শেখরের মনে হয় তার পা’দুটো যেন মাটির সঙ্গে কে গেঁথে দিয়েছে। নৌকোটা এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নৌকোর মানুষগুলোও শেখরকে দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়ে নিজেদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু করে দিয়েছে। শেখরের কানে ঝাপসা ভেসে আসে, ‘ছোটঠাকুর যেও না, যেও না রও আমরা আসতিছি’।
নৌকো ঘাটে লাগালে কালু বাউড়ি তার পুটুলিখানা বগলে চেপে প্রায় এক লাফে ডাঙায় আসে। কোঁকিয়ে ওঠে কালু, ‘বাবু মশাই আপনার এখানে দেখা পাব ভাবতিই পারিনি’।
হুসেনও ডাঙায় উঠে এসেছে। শেখরকে দেখে চোখের জল গোপন করতে পারে না, ‘এটা তুমি কি করলে ছোটঠাকুর? বড়ো খারাপ কাজ করেছো। বাপ, মায়ের মনে অতবড়ো দাগা কেউ দেয়!’
শেখর ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে, ‘বাবা, মা কেমন আছে হুসেন দাদা? আমার কথা তাঁরা কেউ কিছু বলে না?’
মাথা নাড়ে হুসেন, ‘ভালো নেই তারা। কেউ ভালো নেই। তোমাকে যে ত্যাজ্য করেছে তেনারা, তাই মুখে কিছু বলে না। কিন্তু আমি জানি তাঁদের অন্তরখানা কেঁদে কেঁদে সারা হচ্ছে। বুঝিবা তাদের চোখের জলে নদী হয়ে যাবে একখানা’।
এ খবর শেখর জানতো না যে রামতনু তাকে ত্যাজ্য করেছে! শেখরের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। কালু অভিজ্ঞ মানুষ, সে বুঝতে পারে এই অজানা তথ্যখানা শেখরের না জানলেও হতো। তাই যাত্রাপালার অভিনয়ের ঢঙে সে বলে, ‘ও বাবুমশাই আপনি ভেবেন না, বাপ-মায়ের রাগ শীতে জমা ঘিয়ের মতো। রোদ উঠলে গলে জল। এই দ্যাখেন কত্ত কিছু ওনারা আমাদের দিয়েছেন। ছোটঠাকুরুণ নিজে হাতে আমাদের এক জোড়া গামছা, ধুতি, নগদ দুটাকা দিয়েছেন’।
শেখর ভ্রু কুঁচকে জানতে চায়, ‘ছোট ঠাকুরুণটি কে?’
হুসেন এবার উত্তর দেয়, ‘কেন তোমার বে করা বৌ। যারে তুমি বিনা কারণে ফেলে পলালে। কি সুখের আশায় তুমি পলালে ছোটঠাকুর? সে সুখ তুমি পেয়েছো তো? একজনের চোখের জলের বিনিময়ে অন্যজন সুখি হয় না গো’।
শেখরের মনে হয় অবাক হওয়ারও একটা সীমা আছে। তার মানে বাবা সেই মেয়েটাকে বাড়ি নিয়ে গেছে। অথচ শেখরকে ত্যাজ্য করেছে। এসবের মানে কি! ভেবে থৈ পায় না। তবে সকাল এখন অনেক পরিষ্কার হয়ে গেছে!

বিজয় প্রতিদিনই সকালে নদীতে স্নান করতে আসে। ঘাটে এত লোক দেখে অবাক হয়ে যায়। আরও অবাক হয়ে যায় এদের মাঝে শেখরকে দেখে। এত সকালে শেখর নদীর ধারে কেন? বিজয়কে দেখেও শেখর বোবা হয়ে যায়। বিজয় শুধোয়, ‘শেখর তুমি এত সকালে এখানে? এরা কারা?’
কোনোরকমে শেখর বৃত্তান্ত বলে। বলে, ‘গরম লাগছিল তাই নদীর হাওয়া খেতে বেড়িয়েছিলাম’।
কথাটা বিশ্বাস হয় না বিজয়ের। মুখে বলে, ‘বেশ তো। ওদের নিয়ে বাড়ি যাও। আমি স্নান সেরে আসছি। আজ ওরা এ বাড়ির অতিথি হোক, তারপর যাবে’।
হুসেন জানায়, না সে এখনই ভবানীপুর ফিরে যাবে। বিজয়কে দেখে তার বাস্তবিক রাগই হচ্ছিল।
শেখর কালু ও তার দলবল নিয়ে রওনা দেয়। কালু শেখরকে পাল্কীতে বসতে বলে। বিজয় নদীতে গলা জলে দাঁড়িয়ে সূর্যদেবের দিকে তাকিয়ে মনেমনে ভাবে, না আর নয়। অনেক দেরী হয়ে গেছে। কালই সে ভবানীপুর যাবে। যাদের ধন তাদের ফিরিয়ে নিতে অনুরোধ করবে। (ক্রমশ)





১৫

মানুষ মরলে বুঝিবা এর থেকে কম হ্যাপা। বাপরে বাপ। পুরুত মশায়ের রাজ্যের সৃষ্টিছাড়া ফর্দ। এই লাগবে ঐ লাগবে। শশী যেদিন থেকে বিধান দিয়েছে, ‘সাবুর মা তোকে এবার বেধবা হওয়া লাগবে’, তারপর থেকে তার নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। সারাক্ষণ ছটফটাচ্ছে। কিন্তু প্রতি পলে সাবুর মার আড়ালে ‘সোহাগী’ নামের মানুষটা যে ডাঙায় তোলা মাছের মতো খাবি খেয়ে চলছে তার খবর কে রাখে। মাতলা নদীর মতো তল না পাওয়া কি এক অসীম যন্ত্রণায় ভেঙ্গেচুরে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে সে। এর মধ্যে দুবার ডাক পড়েছিল রামতনুর ঘরে। সে ডাক উপেক্ষা করার সাধ্যি তার নেই। রামতনুও সোহাগীর কাছে উজাড় করে দিয়েছিল নিজের সন্তানের জন্য তিলতিল করে জমানো কষ্ট। দৌর্দন্ডপ্রতাপ মানুষটা শিশুর মতো ডুকরে ডুকরে কেঁদেছে সোহাগীর কোলে মাথা রেখে। আর তার পরদিনই শশীর সেই পুরনো ঘাড়ের ব্যথাটা চাগাড় দিলে ডাক পড়ে সাবুর মার। বলে, ‘দে তো দেখি ঘাড়টা দাবিয়ে। টনটন করছে’। তারপর অতি তাচ্ছিল্যে হাই তুলে বলে, ‘হ্যারে সাবুর মা, কাল কি তুই রাতে ভেতর বাড়ি এয়েছিলি?’
চমকে উঠে থমকে যায় সাবুর মার হাত। কোনরকমে বলে, ‘কই নাতো ঠাকুরুন’।
শশী উদাস ভঙ্গীতে বলে, ‘তালে আমারই ভুল হয়েছে। বিড়ালটা হবে। বাচ্চা দিয়েছে তাই ঠাই দিলাম বাড়ির ভেতরে। কিন্তু ফাঁক পেলেই দুধ, মাছে মুখ দেবে। বিড়াল খুব নিমকহারাম হয় জানিস তো। ভেবেছিলাম দূর করে দেবো, কিন্তু কি করবো আমার টগরের যে ভারি ন্যাওটা হয়ে উঠেছে বাচ্চাগুলো’।
সাবুর মা ভয়ে সিটিয়ে একসা হয়ে যাচ্ছিল। দরদর করে ঘামছিল সে। তবে কি সত্যি সত্যি শশী ..। মনে হয় একবার শশীর দুপায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে মাপ চায়। কিন্তু তার আগেই শশী ঘাড় বেঁকিয়ে সাবুর মার দিকে তাকায়। তার আয়ত চোখদুটোয় কে যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তারপরেই হেসে ফেলে বলে, ‘দেখেছিস তালেগোলে আসল ব্যাপারটাই ভুলে গেছি’।
ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করে সাবুর মা, ‘কি ঠাকুরুন?’
শশী তেমনই হাসিমুখে আগের কথার খেই ধরে বলে যায়, ‘সাবুর বাপের শ্রাদ্ধের মোটে আর তিনদিন বাকি। অথচ নাপিত বৌকে এখনও খবর করা হল না’।
সাবুর মা নীরব।
শশী মুখরা – নখের সাথে সাথে তোর চুলগুলোও যে মুড়িয়ে কাটা দরকার। বেধবা হয়ে এক পিঠ খোলা চুল নিয়ে ঘুরে বেড়ানো তো আর যায় না।
আঁতকে শিউরে ওঠে সাবুর মা। মুখ থেকে তারা খসার মতো আপনা আপনি খসে পড়ে, ‘ঠাকুরুন! এ কাজটি না করলেই কি নয়। মানুষডার বড় প্রিয় ছিল এই চুলগুলো। বিয়ের পর বসিরহাটের হাট থেকে বেশ কবার লুকিয়ে লুকিয়ে গন্ধ তেল এনে দিয়েছে’।
শশী বেশ জবরদস্ত গলায় বলে ওঠে, ‘তুই আর ছেনালি করিস নাতো। মানুষটাই মরে ফর্সা। তায় আবার চুলের জন্য দরদ। নে নে অনেক হয়েছে নিজের কাজে যা’।
হঠাৎ শশীর চোখ যায় বাইরের রাস্তা থেকে সদর দরজা দিয়ে সাবু ও টগর নামের শিশুদুটোর দিকে। সুপুরি পাতার খোলে পুঁটুলির মতো বসে আছে এখনকার টগরমণি। আর সেই পাতার মাথার দিকটা ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসছে সাবু। মুখে সে ‘বোঁ ও ও ও .........’ শব্দ করে বলতে বলতে আসছে ‘সরে যাও, সরে যাও, লাট সাহেবের ফিটন গাড়ি আসছে’।
সুপুরির খোলের যেখানটায় টগর বসে আছে তার সামনের দিকটা শক্ত করে ধরে আছে সে। চোখেমুখে খুশি উপচে পড়ছে। শশীকে দেখে সে খিলখিল করে হেসে ওঠে। বলে, ‘মা দেখেছো, আমি কেমন ফিটন গাড়ি চড়ে বেড়াতে বেড়িয়েছিলুম’।
মুহূর্তে শশীর মুখের রঙ পালটে যায়। রাগে দপদপ করতে থাকে কপালের দুই পাশ। তার তপ্ত কাঞ্চন বর্ণ রাগে রক্তিম হয়ে ওঠে। তীক্ষ্ম গলায় বলে, ‘এই সাবু তুই ওকে নিয়ে সুপুরির খোলে বসিয়ে পাড়া বেড়াতে গিয়েছিলি? বাড়ির ভেতরে এতখানি উঠোন, পেছনে বাগান, ঘোরার জায়গা হচ্ছে না?’
সাবু মিনমিন করে বলে, ‘ছোট ঠাকুরুনই তো বলল - সাবু, আমিতো কাঁচপোকা গ্রামের সবার বাড়ি, সবকটা পুকুর, কার বাড়িতে কি গাছ আছে, কোন গাছে কোন পাখিতে ডিম পেড়েছে সব জানতাম। তুমি আমাকে একটু পাড়া বেড়াতে নিয়ে চলো না! চিনে আসি সব!’
শশী গলার স্বর খাদে নামিয়ে নরম গলায় বলে, ‘না মা এখানে তোমাকে ঐভাবে পাড়া বেড়াতে গেলে লোকে মন্দ বলবে। তুমিতো এই চ্যাটার্জী বাড়ির ছোট ঠাকরুন। আর কটা দিন যাক আমিই তোমাকে নিয়ে গিয়ে পড়শিদের সাথে আলাপ করিয়ে আনবো। এখন এসো দেখি, গা মুছিয়ে তোমার শাড়িখানা বদলে দি। ধুলো মেখে ভূত হয়ে আছে’।
সুপুরির খোল থেকে দুহাতে ভর দিয়ে টগর উঠতে গেলে পায়ে শাড়ি পেঁচিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়ার আগেই সাবু ওকে দুহাতে ধরে ফেলে। বারান্দার হাতা থেকে শশী রুদ্ধশ্বাসে নেমে এসে সাবুর গালে ঠাস করে এক চড় কষায়। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব মেরে যায় তিনজনে। সাবু ভ্যা করে কেঁদে ওঠে। আর সাবুর মা দাওয়ার খুঁটি ধরে ভগবানের উদ্দেশ্যে বলে, ‘হা ঠাকুর আমার পাপের সাজা ছেলেডারে কেন দিতেছ!’
টগর কোনরকমে বলে, ‘ওকে মারলে কেন মা?’
টগরকে কোলে তুলে নিয়ে শশীর তীক্ষ্মস্বরের সাথে ঘৃণা যোগ হয়, ‘এইজন্য বলে ছোটলোকদের মাথায় তুলতে নেই। তোকে খুব ভালো করে বলে দিলাম সাবু, আর কোনদিন টগরকে ছুঁয়ে দিয়েছিস তো তোর হাত আমি মুচড়ে ভেঙে নুলো করে রেখে দেবো। যা এখন সঙের মতো দাঁড়িয়ে না থেকে নাপিত বৌয়ের কাছে যা। ওকে গিয়ে বলে আয়’।
সাবু নাক মুছে হাতের চেটোয় চোখের জল মুছে নিয়ে নাকি সুরে বলে, ‘কি বলবোঁ সেটাই তোঁ বললে নাঁ’।
শশী মুখ ভেংচে বলে, ‘কি আবার বলবি, বলবি তিনদিন পর আমার বাপের ছেরাদ্দ। তাই আমার মার মাথা চুল মুড়িয়ে কাটতে হবে। ঠাকুরুন ডেকে পাঠিয়েছে’।
কথা শেষ করে এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না শশী। দুপদাপ করে পা ফেলে টগরকে কোলে নিয়ে পুকুরঘাটের দিকে চলে যায়। সাবুর মা দাওয়া থেকে ছুট্টে নেমে এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে। সে কান্না কি শশীর কানে পৌঁছল? কে জানে!

শশী তো টগরমণির সাথে কি কথা নিয়ে যেন হাহা করে হেসে উঠলো। অনেকদিন বাদে এ বাড়ির আমগাছে টিয়া পাখির ঝাঁক এসে বসেছে। সেদিকে চোখ পড়তেই শশী টগরকে দেখিয়ে বলে, ‘ঐ দ্যাখ টগর কত্ত টিয়াপাখি। আমি কালই হুসেনকে বলে দেব আমার টগরমণির জন্য একটা টিয়ার ছানা এনে দিতে। আমার টগর খাঁচায় ভরে পুষবে’।
টগরের কিন্তু এমন কথাতেও মন ভালো হয় না। সে পিছন ফিরে সাবুকে দেখার চেষ্টা করে। মনেমনে ভাবে ইস তার জন্যই আজ সাবুটা মার খেলো। এই বাড়ির নতুন বাবাটা গতবার বসিরহাট বাজারে গিয়ে কোন এক লালমুখো সাহেবের কাছ থেকে একটা সুন্দর রংপেন্সিল নিয়ে এসে টগরকে দিয়েছিল, সেটা ভারি পছন্দ সাবুর। সে বারবার পেন্সিলটার গায়ে হাত বোলায়। পেন্সিলটা দিয়ে একটা পদ্ম আর একটা গোলাপ ফুলও এঁকে দিয়েছে টগরকে। টগর ঠিক করে সেই পেন্সিলটা সে সাবুকে দিয়ে দেবে। কিন্তু একটা কথা তার ছোট্ট মাথাটায় কিছুতেই ঢোকে না, তাকে ছুঁয়ে দিয়েছে বলে সাবুকে মার খেতে হল কেন! সে তো পড়ে যাচ্ছিল। সাবু ধরল বলেই না সে হুমড়ি খেয়ে পড়ল না।

সোহাগী খুব ভালোভাবে বুঝতে পারে সে ধরা পড়ে গেছে। আর ধরা পড়েছে এমন এক মানুষীর কাছে যে কি না লালমুখো সাহেবের বাড়া। সোহাগী নিজের ঘরে গিয়ে চুপচাপ জানলার দিকে তাকিয়ে থাকে। কি এক টাটানো যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে নীল হয়ে যেতে থাকে। জীবনের এক বিন্দু সুখ নিতে গিয়ে জীবন বড়ো দাঁও মেরে দিয়েছে। আজ তারজন্য শশী সাবুর গায়ে হাত তুলেছে। ঝি মেরে বউ শাসন করার ধরণ সোহাগী জানে। কিন্তু শশীর বিরুদ্ধে যাওয়ার ক্ষমতা সোহাগীর নেই। শশী এই পরিবারের ঠাকরুণ। মনিবের বউ। শশী না চাইলে দশখানা রামতনুর ক্ষমতা ছিল না সোহাগীকে এখানে আশ্রয় দেওয়া। সে হিসাবে দেখতে গেলে সোহাগী নেমকহারামীই করেছে শশীর সাথে। আবার উল্টোবাগে ভাবলে জীবন তাকে যে প্রবঞ্চনা করেছে তার শোধ তুলেছে সোহাগী। ভুজঙ্গ তাকে কেন ছেড়ে চলে গেল? গেল তো গেল, এই আস্ত বারোখানা বছরে তার হদিশ পাওয়া গেল না। সোহাগী নামের অবলা মানুষীটি মরল না বাঁচল একবার জানতে ইচ্ছা করলো নি গো। সেখানে শশীর উপচে পড়া জীবনের একবিন্দু যদি সোহাগীর কপালে জোটে তালে অন্যায় কোথায়? কিন্তু যতই সে নিজেকে এ যুক্তিতে বোঝাক সোহাগীর ধর্মভীরু মন বারবার ঘাই খেতে থাকে। এ অন্যায়, এ পাপ, এ অনাচার। ওপরওয়ালা যার অদৃষ্টে যেটুকু মাপিয়ে দেয় সেটুকুই তার। খোদার ওপর খোদকারি করলে ফল ভাল হয় না। সে জানে রামতনু কোনদিন তার পক্ষে দাঁড়াবে না। সেখানে সমাজ আছে, রামতনুর সম্মান আছে। কিন্তু সম্মান কি শুধু একা রামতনুর আছে? সোহাগীর নেই? তাই সে স্থির করে শ্রাদ্ধের পাট চুকে গেলে সে একবার অন্তত রামতনুর মুখোমুখি দাঁড়াবে। সাদা থান পরে। মাথা মুড়িয়ে।

এই শ্রাদ্ধ উপলক্ষ্যে এবং গঙ্গা বাবাজীবনের মান ভাঙানোর জন্য রামতনু নিজে গঙ্গাদের বাড়ি গিয়ে বলে এসেছে। গঙ্গা খেলুড়ে মানুষ। সে তাই এ সুযোগ হাতছাড়া করে নি। গৌরীকে সঙ্গে নিয়ে দুদিন আগে এসেই হাজির হয়েছে। ভাবখানা এমন আমিই তো এখন আপনাদের পুত্রসম। গৌরী আবার নিজের ছেলে আর সতীনের মেজ মেয়েটাকে নিয়ে এসেছে। গৌরী আজ আর খুকীটি নেই। তাই তার মস্তিষ্কে কেবলই ঘা দিচ্ছে খুড়ো খুড়িমা অর্থ ধ্বংস করতে পারলেই যেন সুখী। নতুবা কোন এক ঝি মাগীর ভাতার বারো বছর নিরুদ্দেশ বলে এমন জাঁক করে ছেরাদ্দ করে! তার উপর গোদের ওপর বিষফোঁড়া ঐ এক রত্তি মেয়েটা। ছেলেকে ত্যাজ্য করে ওকে মাথায় করে ড্যাং ড্যাং করে নে এসেছে। ঢঙ। আদিখ্যেতা। আর শেখর। ভাই হলে কি হবে। সেও কি কম বজ্জাত। কি হতো যদি দুটো বউ নে সংসার করতিস। কেন গঙ্গা করছে না। গৌরীকে দ্বিতীয় পক্ষে বে দেওয়ার সময় এমন উদারতা তো খুড়ো, খুড়ি কেউ দেখায় নি। হ্যাঁ, বাটি, ঘটি পাশাপাশি থাকলে মাঝে মাঝে ঠোকাঠুকি লাগে। তেমনি সতীনে সতীনে লাগবে। এটাই তো স্বাভাবিক। তা না যত্তসব।
গঙ্গার মনটাও বেশ কিছুদিন ধরে একদম ভালো নেই। গঙ্গা অনেক পাত্তা লাগিয়েও এখনও পর্যন্ত জানতে পারে নি পশ্চিমের তালুকের সেই আদিবাসী কিশোরীর নাম কি? কিন্তু মেয়েটা গঙ্গার পাশের তালুকে থেকে রঙে ঢঙে এমন ফুলে ফেঁপে উঠছে দিনকে দিন যে গঙ্গার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ করেই গঙ্গার কানে বেজে ওঠে সেই হাসির শব্দ – হি হি হি। গঙ্গা নামে গঙ্গা হলে কি হবে। গঙ্গা অপবিত্র, কলুষিত। সুখভোগ ছাড়া জীবনে সে কিছু বোঝে না। তার কাছে জীবনের চাওয়া পাওয়ার হিসাবটা খুব পরিষ্কার। কোনও ছলচাতুরী নেই। বরং পাওয়ার জন্য যে কোনও ছলচাতুরী করতে তার বাধে না। মনমেজাজ তার বহুদিন ধরেই খারাপ। গৌরীর খুড়ো খুড়ি ছেলেকে ত্যাজ্য করেও কোত্থেকে একটা ছারপোকা ধরে এনেছে। গঙ্গার চিন্তা ঐ উটকো আপদই না এখন সব সম্পত্তির মালিক হয়ে বসে। কাঁচপোকা গ্রামের মহিমের বিধবা বৌটার সঙ্গে সেদিন বসিরহাট থেকে ফেরার পথে ভাব জমাতে গেছিল। আহা কাঁচা বয়সের বেধবা। তাও রোগভোগ কিচ্ছুটি না। টুপ করে টিকটিকির লেজ খসার মতো বরটা গলায় দড়ি দিয়ে মরল। গঙ্গা ভেবেছিল গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে এট্টুস সান্ত্বনা দেবে। ওমা তা মাগী এখন “সতী হলী কবে ভাতার মরল যবে”র ভেক ধরে গলায় তুলসীর মালা গলিয়ে সাধের বোষ্টমী হয়েছে। বাড়িতে রাধা-মাধবের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছে। গঙ্গাকে দেখে বলে, ‘বড়ো কুটুম আজ তো আমার একাদশী, নির্জলা উপবাস। ছেলে দুটোকে যোগেন ঠাকুরপোর বউ শঙ্করী নিয়ে গেছে। আপনি দয়া করে রাধামাধবের প্রসাদ খেয়ে যাবেন’। শেখরের বিয়ে করা ঐ পুঁচকে আপদটার কথাও জিজ্ঞাসা করে বসল, ‘আমার হাবি কেমন আছে? সন্তান বলে তো তাকে কোনদিন কাছে টানি নি, কিন্তু আজ তাকে খুব দেখতে মন চায়। দুষ্টুমি করে বেড়ায় নিশ্চয়ই সারাদিন?’ কিন্তু এত পাজী, নচ্ছার মেয়েছেলে শেখরের কথা কিছু জানতে চাইলো না। তা গঙ্গা সেখানে বাতাসা জল ভিন্ন কিছু খায় নি। মাঝে পড়ে বসিরহাটের ঢাকাই মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে এক টাকায় কিনে আনা মণ্ডাগুলো জলে চলে গেল। কমলা সেগুলো তার মন্দিরে রাধামাধবের প্রসাদের থালায় ঢেলে দিল। এমন বেইজ্জতি গঙ্গা কোনদিন হয় নি। এদিকে বড় বউটা বেশ কিছুদিন ধরেই ভুগছে। পা ফুলে ঢোল হয়েছে। সেদিন গৌরী পর্যন্ত বলেছে, ‘কোবরেজ দে দিদির ব্যামো সারবে নি। তারে সাহেব ডাক্তার দেখাও, কলকেতা নে যাও’।
গঙ্গা খিঁচিয়ে উঠেছিল, ‘অ্যাঁ সাহেব ডাক্তার! কলকেতা! ঝাড়ফুঁক করাও। আমি গুণিনের কাছ থেকে তেল পোড়া নে নি আসবো। তিনদিন লাগালেই ওসব ব্যামো ফুঁৎকারে উড়ে যাবে’।
কিন্তু গঙ্গার তো জ্ঞান টনটনে, তাই জানে এমন ভাত কাপড়ের ঝি কোথাও পাবে না। এখন যা আকালের দিন। তাছাড়া স্বাদ বদলের জন্যও বড় বউয়ের হার জিরজিরে কাঠামোটা তো আছে।
এ বাড়ির সব ছিরিছাঁদই যেন কেমন ধারা। এ বাড়ির ঝি-এর ভাতার নাকি বারো বছর বেপাত্তা। তাই ছেরাদ্দ হচ্ছে। গঙ্গার প্রায় মুখে এসে গেছিল আসলে পয়সার ছেরাদ্দ হচ্ছে। রিরি করে গা জ্বলছিল। এইসব ধেইতা নাচনের পোদে জলবিছুটি ঘষে দিতে পারলে গঙ্গার শান্তি হত। তা কি করা যাবে! এইসব দেখে শুনে জলবিছুটি যখন গঙ্গার নিজের গায়ে পড়ে, সে সময় হঠাৎ দেখে বলির পাঁঠার মতো দুটো হারগিলে বেধবা বুড়ি এ বাড়ির ঝিটার হাত ধরে না ঠিক হাত ধরে না, টানতে টানতে নিয়ে চলেছে পুকুরের দিকে। একজন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলে, ‘ঠাকরুন নাপিত বৌ এয়ে গেছে। চুল মুড়িয়ে শাঁখাসিঁদুর ভেঙে আনি’।
শশী খুব উৎসাহের সঙ্গে বলে ওঠে, ‘দাঁড়াও খুড়ি ঘর থেকে সাদা থানটা এনে দি’।
আর তখনই রামতনুর সঙ্গে সাবুর মার চোরাচাহনি মিলন হয়। রামতনুর বুকের ভেতরটা জবাই করা পশুর মতো ছটফটায়। নিজেকে ভয়ংকর ধরনের একজন অক্ষম পুরুষ বলে মনে হয়। সোহাগীর দুচোখের বোবা জল তার ভেতরে ঢেউ তোলে। সে ঢেউ আছড়ে পড়ে জীবন কিনারে। পাড় ভাঙে। শশী থান হাতে এসে বলে, ‘নে সাবুর মা। এমন মিহি সুতোর কাপড় বাপের জন্মে পড়িস নি’। বুড়ি দুটোর উদ্দেশ্যে বলে, ‘তোমাদেরও আছে খুড়ি। বাড়ি যাওয়ার আগে নে যেও’।
জগৎ জননীর উদ্দেশ্যে জই-জোকার দেয় যেন তারা, ‘ঠাকুরুন আমাদের সাক্ষাৎ জননী’।
অন্যজন বলে, ‘নতুবা কি ঝি মাগীর বরের প্রায়চিত্তির ছেরাদ্দে এমন ঘটা হয়’।
রামতনুর সত্যি সত্যি বুকের বাঁ দিকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মাথাটা টাল খায়। চোখ ঘোলা লাগে। সবকিছু কেমন অন্ধকার লাগে। শুধু মনে হয়, না আর নয়। শশীর বিরুদ্ধে এবার দাঁড়াতে হবে। শেখরকে সে নিজে গিয়ে ঘরে ফিরিয়ে আনবে। দরকার হলে আন্নাকেও। কিন্তু সবকিছু অতলে তলিয়ে যাওয়ার আগেই ছোট্ট দুটো হাত রামতনুকে জড়িয়ে ধরে, ‘ও বাবা, বাবা, তোমার কি শরীল খারাপ লাগছে? ভিরমি খাচ্ছ কেন?’
শশী পেছন ফিরে আতর্নাদ করে ওঠে, ‘ও মা কে কোথায় আছো গো শিগগিরি এসো’।
মুর্ছা গেছে রামতনু। তার ঐ বিশাল শরীরটা কোনরকমে সকলে ধরাধরি করে এনে পালঙ্কে শুইয়ে দেয়। শশী বিকারগ্রস্তের মতো টগরের দুহাত ধরে প্রলাপ বকার মতো করে বলে যাচ্ছে, ‘ও টগর আজ তুই না থাকলে আমার কি সব্বনাশ হতো রে! তুই সারাজীবন এই হাত দুটো দে এ সংসারটাকে আগলে রাখবি তো মা?’
যতটা ঢাকঢোল পিটিয়ে ভুজঙ্গর শ্রাদ্ধ করবে ভেবেছিল শশী ততটাই আয়োজন করেছিল। কিন্তু বাধ সাধলো রামতনুর এই আচমকা ভিরমি খাওয়া। শশীর ভেতরে সন্দেহের যে কাঁটাখানা সূক্ষ্ম গোলাপের কাঁটা হয়ে বিঁধছিল তা এখন গজাল হয়ে নদীর পাঁকে গেঁথে গেছে।

শশী বুঝতে পেরেছে ভেতরে ভেতরে তার পরাজয় ঘটেছে। কিন্তু এত বড়ো একটা পরাজয় সামলাবে কিভাবে বুঝতে পারছে না শশীর মতো মানুষও। কিন্তু সত্যি কি বাড়ির ঝি? না না এসব কি ভাবছে শশী। ঐ তো কবিরাজমশাই বলছেন, ‘ঠাকুরুন ঠাকুরের পিত্ত গরম হয়েছে। আমি ওষুধ দিচ্ছি কিন্তু আসল হল পথ্য আর যত্ন। লঘু পথ্য আর যত্নের খুব প্রয়োজন’।
সাজিমাটি দিয়ে ঘষে ঘষে মাথার সিঁদুর তুলে, শাঁখা ভেঙে, মাথা ন্যাড়া করে সাদা থান পড়িয়ে যখন সোহাগীকে রামতনুর উঠোনে আনা হল তখন সে ঝড় জলে ভেজা একটা পাখি। তিরতির করে কেঁপেই চলেছে। গৌরী এসে মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, ‘তুই বড়ো অপয়া সাবুর মা, তোর বরের ছেরাদ্দ করতি গে খুঁড়ো ভিড়মি খেল’।
এ কি শুনছে সোহাগী, রামতনু মূর্ছা গেছিলো! অসুস্থ হয়ে পড়েছেন! কিন্তু কেন? মানুষটাকে একটিবার দেখবার জন্য তার প্রাণখানা ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতো ছটফটাতে থাকে। কি যেন বলবার জন্য সোহাগীর ঠোঁটদুটো নড়ে ওঠে। কিন্তু তার আগেই শশী দাওয়ায় এসে দাঁড়ায়। সোহাগী চেয়ে দেখে শশীর চোখদুটো রাতের ক্ষুধার্ত শেয়ালের মতো জ্বলছে। সোহাগী প্রাণ ভয়ে ভীত শশকের মতো আশ্রয় খোঁজে। একটু আশ্রয়। শশী আদেশ দেয়, ‘ঠাকুরমশাই এসে গেছে। এই তোরা দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ওকে নে গে ছেরাদ্দের আসনে বসা’।
গৌরী বিড়বিড় করে, ‘এঃ মাগী যেন গায়ে হলুদের জন্য কলাতলায় যাচ্ছে’।
বালক সাবু নিজেও নেড়ামাথা হয়েছে। কিন্তু মায়ের এ রূপ দেখে সে বেচারা ঘাবড়ে গেছে। কিছুটা ভয়ও। মা নেড়া মাথা কেন? সাদা থান পরা কেন? এমন শাড়িতো যাদের বর মরে তারা পরে। সাবুতো জন্ম ইস্তক মৃত বাপের অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে আছে। মায়ের আঁচল ধরে সেও শ্রাদ্ধ করতে বসে। ঠাকুরমশাই এ বাড়ির মাস মাইনেতে বহাল। সে প্রথমে এ বাড়ির কর্তাকর্ত্রীর মঙ্গল কামনায়, এই বংশের পূর্বপুরুষদের খ্যাতি নিয়ে লম্বা ভাষণ দেয়। তারপর খনিকটা তাচ্ছিল্য করে বলে, ‘ভাগ্যি করে জন্মেছিলে গো মেয়ে। এ বাড়ির ঝি হতে পেরে জেবনটা তোমার বেঁচে গেল। নতুবা প্রায়শ্চিত্তি ছেরাদ্দে এত ঘটা হয়!’
শ্রাদ্ধের ক্রিয়াকর্ম শুরু হয়। পুতুলনাচের পুতুলের মতো মা - পোয়ে পুরুতঠাকুরের কথামত সব করতে থাকে। পুরুতঠাকুর বেশ চীৎকার করে বলতে থাকে, ‘বিষ্ণুরোঁ তৎসৎ অদ্য জ্যৈষ্ঠমাসি কৃষ্ণপক্ষে কাশ্যপ গোত্রস্য প্রেতস্য ভূজঙ্গ মন্ডল দেব শমর্ণঃ অশৌচান্তাৎ দ্বিতীয়েহহ্নি কাস্যপগোত্রঃ শ্রীভূজঙ্গদেবশর্মা অশৌচকালোৎপন্ন-পঞ্চশূনাজনিত পাপক্ষয়কামন্যা কৃতৈতৎ সভোজ্যাছাদন কাঞ্চনদানকর্মণঃ সাঙ্গতার্থং দখিণামিদং যৎকিঞ্চিৎ কাঞ্চন্মূল্যং শ্রীবিষ্ণুদৈবতং যথাসম্ভব গোত্রনাম্নে ব্রাহ্মণায়াহং দক্ষিণামিদং যৎকিঞ্চিৎ কাঞ্চন্মূল্যং শ্রী বিষ্ণুদৈবতৎ যথাসম্ভব গোত্রনাম্নে ব্রাহ্মণায়াহং সম্প্রদদে’।
আর তখনই গ্রামের একজন ছুটতে ছুটতে এসে বলে, ‘নদীর ধার দে ভূজঙ্গকাকার পারা একজনরে আসতে দেখলাম। একমুখ দাঁড়িগোঁফের জঙ্গল কিন্তু হাতের বাঁশিখানা...’।
গঙ্গা প্রায় হুঙ্কার ছাড়ে, ‘ধরে আন তাকে’।
সোহাগীর নেড়া মাথা থেকে ঘোমটা খসে পড়ে। শীর্ণ চেহারাখানা আরও বেশি শীর্ণ বলে মনে হয়। সে মা বনবিবির কাছে মিনতি করে, ‘মাগো কিছুতেই সে যেন না হয়। আমি বিধবা। আমার স্বামী বারবছর আগে নিরুদ্দেশ। আমার পরিচয় আমি ভবানীপুরে এই ঠাকুর পরিবারের খাস ঝি। আমি সাবুর মা’।


বার বছরে অনেক কিছুর সাথে ভুজঙ্গের চেহারারও আমূল পরিবর্তন হয়েছে। মাথাভর্তী কাঁচাপাকা চুলের জট। গালভর্তী কতকালের বাসি দাড়ি। কাধে শতছিন্ন ঝোলা। শুধু হাতের ঐ বাঁশিটা যা কিনা সোহাগীর ভীষণ ভাবে চেনা। সোহাগীর কোটরাগত চোখ নির্নিমেশ তাকিয়ে থাকে মানুষটার দিকে। সাবুর ছোট মাথায় কিছু ঢুকছে না। সব দেখে সে ভ্যাবলা মেরে গেছে। আর ভুজঙ্গ, সে তো কিছুই ভাবতে পারছে না। সবকিছুই তার অচেনা লাগছে। ঐ যে রোগা, ন্যাড়া মাথা কোটরাগত দুই চোখে ভয়ার্ত দৃষ্টি নিয়ে সাদা থান পরে বসে থাকা বৌটা কে? কেমন শকুন পানা লাগছে। আর বৌটার পাশে বসে থাকা ঐ ন্যাড়া মাথা বাচ্চা ছেলেটাও বা কে? ওর মুখের আদলের সাথে সে কি নিজের মুখের আদল দেখতে পাচ্ছে? ভুজঙ্গ স্থির। স্থাণুবৎ। ভুজঙ্গ ভুলে গেছে সে কি ভাষায় কথা বলতো। তার পায়ের তলা দিয়ে শিকড় গজিয়ে গেছে। এ শিকড় তো তার অনেক বছর আগেই এখানে ছিল। কিন্তু ভুজঙ্গ আর এখন মানুষ নেই। গাছ হয়ে গেছে। গাছ ভুজঙ্গের হাত থেকে কখন যেন বাঁশিটা টুক করে খসে পড়ে ভুঁইয়ে। সাবু জুলজুলে চোখে বাঁশিটার দিকে হাত বাড়াতে গেলে, সোহাগী গগনফাটা আর্তনাদ করে ওঠে, ‘ও সাবু ও তোর বাপ রে ...............’।
আর্তনাদ অনুরণন তোলে। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে পৌঁছে যায় শশীর কান পর্যন্ত। সোহাগী এক ছুটে গিয়ে নিজের ঘরে দোর দেয়। তার মিহি সাদা থান মাটির ধুলোয় লুটোতে থাকে।
রামতনুকে নিয়ে শশী ব্যস্ত ছিল। একটা বিষয় নিয়ে তার তৃতীয় চক্ষু খুলে গেলেও শশী খুব ভালোভাবে জানে তার সব দবদবা ঐ রামতনুকে ঘিরেই। তাই মানুষটাকে জিওল মাছের মতো জিইয়ে রাখা একান্ত দরকার। গৌরী ছুটে এসে খবর দেয়, ‘ও খুড়ি শিগগিরি চলো। ছেরাদ্দের ওখানে পালা হচ্ছে। চাঁদবেনের পালাকেও হার মানাবে গো’। গৌরী মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হেসে ওঠে, ‘হিহিহি’।
শশী দাবড় দেয়, ‘খুড়োর জেবনমরণ সমস্যা। আর তুই এখানে রঙ্গ করছিস! যা বলবার খোলসা করে বল। নতুবা দূর হ এখান থেকে’।
অন্যসময় হলে গৌরীও দুকথা শুনিয়ে দিত। কিন্তু এখন সে এসব গায়ে মাখে না। সে একটু সুর করে বলে, ‘তুমার ঐ খাস ঝি মাগী সাবুর মার ভাতার ফিরে এয়েচে গো। এট্টুস খানি চলো গে। দেখবে। কি তামাসাখানাই না চলছে সেখানে’।
শশী বধির হয়ে গেছে। সে আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না। এ কি চলছে তার জীবনে। সব জায়গায় এতো পরাজয়! আন্নাকালি, তার পরিবারকে জব্দ করতে গিয়ে নিজের সন্তানই হাতছাড়া হয়ে গেল। সোহাগীর প্রতি ঘৃণায় রামতনুর এই অবস্থা। একেই কি বলে পাপ বাপকেও ছাড়ে না। সেই সঙ্গে আর একটা ব্যাপারে শশী দৃঢ় সিদ্ধান্তে পৌঁছয়, ‘সত্যই সৎসঙ্গে স্বর্গবাস। অসৎসঙ্গে নরকবাস’। নতুবা যে খুড়ো খুড়িকে গৌরী একসময় দেবতা জ্ঞান করতো তাদের সামনে অনেক খারাপ কথা গৌরী উচ্চারণ করলো কি করে। (ক্রমশ)






১৬

সমস্ত রীতিনীতি আচার আচরণ মেনেই রাধামাধবের মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ঘোষালমশাইকে সঙ্গে নিয়ে যথাসময় যোগেনও গয়া গিয়ে প্রেতলোকে পিণ্ড দিয়ে এসেছে। যোগেনেরও মধ্যবিত্ত পরিবার। তাই এ কদিনে তার সংসারেও খরচ চালিয়েছে কমলা। কমলার ছেলেদুটোও দিনে দিনে শঙ্করীর বেশ ন্যাওটা হয়ে উঠেছে। কমলা বলেছে, ‘কায়েত বৌ, তুমি ওদেরকে ছোটোমা বলতে শিখিও। তুমিই তো ওদের মা। আমিতো কেবল পেটে ধরেছি। কিন্তু ফিদিন তুমিই তো ওদের আসল মা হয়ে উঠছো। আমি ভাই তোমার হাতে ওদেরকে ফেলে দে নিশ্চিন্তি আছি। তাছাড়া তোমায় চুপিচুপি একটা কথা বলি শঙ্করী বুন। আমি মা হওয়ার যোগ্যই নই। নতুবা ঐটুকুন বাচ্চা মেয়ের জেবনটা নে ছেলেখেলা করতে পারি? আমার শ্বাসে বিষ’।
শঙ্করী আর শুনতে পারে না। ডুকরে কেঁদে উঠে কমলার মুখ চেপে ধরে। বলে, ‘চুপ করো দিদি। চুপ করো। তোমার মতো সতীর মুখ থেকি এমন কথা বের হলি ত্রিভুবন টলে যাবে। মহাদেব যেমন সতীমার অপমান মেনে নিতি না পেরি প্রলয় নেত্য জুরে সবকিছু ছারেখারে করে দেছিল তেমনি স্বগ্‌গ থেকি বটঠাকুর সব শুনি সবকিছু ছারখার করি দেবেন গো। আমার এসপ কথা শোনা কত বড়ো পাপ তা তুমি ভাবতেও পারবে না। লবকুশ আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ। মা। আমি ওদের মা। তোমার ছেলেদের মুখে আমি ছোটোমা ডাক শুনবো এ কি আমার কম ভাগ্যির, কম পুণ্যির’।
অগত্যা থামতে হয় কমলাকে। জীবনে এমন স্তুতি, এমন প্রশংসা কে না চায়। দুই নারীর দুই রকম প্রাপ্তিতে জীবনপাত্র টইটম্বুর ভরে উঠেছে। অদ্ভুত এক সুখের ঘামতেলে ওরা সিক্ত। ওরা আপ্লুত।


গয়া থেকে ফেরা পর্যন্ত ঘোষালমশাই প্রায় কমলার জন্য জীবন দিয়ে দিতেও প্রস্তুত। গাঁয়ের গরীব বামুন। চাল-কলার পুরোহিত। জন্ম ইস্তক মনের ভেতর সুপ্ত ইচ্ছা ছিল একটিবার গয়াধামে গিয়ে ত্রিপাদভূমি দর্শন করবে। কিন্তু অভাবের সংসারে স্বপ্ন যে এভাবে পূরণ হবে তা ভাবতেও পারে নি কোনদিন। এখানে সেখানে পুজো করে ফল, সিধে যা পায় কমলার দুয়ারে তার কিছুটা নামিয়ে রেখে যেতে না পারলে শান্তি নেই। কমলার কোনও ওজর আপত্তিই খাটে না। ঘোষালমশাই বলে, ‘মাগো লবকুশের দায়িত্ব আমাদের এ গাঁয়ের সকলের। তুমি হলে কাঁচপোকা গাঁয়ের সীতা মা। রামচন্দ্র তোমাকে অকালে ত্যাগ দিয়েছে। সে জন্মের শোধ সগ্‌গে গে বাস করছে। কিন্তু তা বলে মা এই বাল্মিকী বাবা তোমায় ত্যাগ দেবে কেমন করে বলো’।
যোগেন পাশ থেকে ফুট কেটে হেসে বলে, ‘তাই তো দেবর লক্ষণও তার পাশ থেকে সরতে পারে না। এবার থেকে আমাদের বাড়ির কালি, ধলার দুধের থেকে বৌঠানের জন্য এক পো করে বরাদ্দ হয়েছে’।
কমলা বলে, ‘না না এ হয় না। ছেলেদুটো তো ওখানেই খায়। সেখানে শঙ্করী যে নিজেকে বঞ্চিত করেও তাদের দুধে ভাতে রাখবে এ আমার জানা। কিন্তু আমি এ নিতি পারবো না ঠাকুরপো’।
এ কথার শেষে যোগেন কমলার দিকে তাকায়। কমলার চোখের তারায় যোগেনের মনের ছবি ফুটে ওঠে। সেখানে লেখা আছে, ‘নেবে না তুমি? আমি যে এনেছি। কর দেখি প্রত্যাখ্যান। কত ক্ষমতা আছে তোমার কমলা বৌঠান?’
কিন্তু সেখানে মুখে শুধু বলে, ‘আমি না। মা আর লবকুশের ছোটোমা বলে দেছে। ওরা বারবার বলে দেছে তুমি স্বপাক নিরামিষ খাও। তায় একবেলা। এই দুধটুকু না খেলে শরীর টিকবে না’।
এরপর আর উত্তর চলে না। শুধু মনে মনে হাসে কমলা, ‘এ শরীর নিয়ে আমি আর কি করবো। আমি যে আমার দেবতারে মেরে ফেলেছি। তাকে জন্মের শোধ মন্দির থেকে তাড়ায়েছি। যাক না যত তাড়াতাড়ি পঞ্চভূতে মিলিয়ে যায় এ শরীর’।
তাহলে কি কমলার সত্যিই পরিবর্তন ঘটেছে। নাকি অলক্ষ্যে দয়াল মুচকি হাসলেন। কেননা কমলার জন্মের ছ’রাত্রিতে বিধাতা পুরুষ তারজন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছেন তা জেনে।


কখনও কখনও মৃত্যু শেষ কথা বলে না। বরং মৃত্যুর পর খুলে যায় অনেক কথামুখ। মহিমের কথা এখন আর কেউ খুব একটা বলে না। মহিম এখন ক্রমশ আবছা স্মৃতির জগতে চলে যাচ্ছে। কমলা ক্রমশ মুখরা, ঝগড়ুটে, কুচুটে কমলা থেকে জননী, পরিত্রাণময়ী দেবী কমলায় পরিণত হচ্ছে। প্রচণ্ডভাবে জল চল-অচলের দেশে বসেও কমলা বিপ্লব ঘটালো। কমলার ইচ্ছায় বানানো রাধামাধবের মন্দির এ বিপ্লবের প্রথম ধাপ। বসিরহাটের ‘ভেব’-এর পালপাড়া থেকে যোগেন সোনা পালকে দিয়ে বানিয়ে অপূর্ব কান্তিময় রাধামাধবের মূর্তি নিয়ে এসেছে। আপাতত মন্দিরের গর্ভগৃহতে প্রতিষ্ঠিত।
রাধার মুখের দিকে চেয়ে যোগেন যেন কমলাকেই দেখে। আর রাধার পাশে শ্যামবর্ণ মাধবকে কি নিজেকেই দেখে! সম্পর্কের নকশিকাঁথার বুননে কখন যে কি ছবি ফুটে ওঠে আজকাল যোগেন যেন তা ঠাওর পায় না। আবাল্যের সাথী মহিমকে কি তাহলে যোগেন ভুলতে বসেছে? ভোলা কি যায়? যখন নিজের বাড়িতে যায়, লবকুশকে দেখে, তখনই মনে পড়ে ঐ তো মহিম। দ্বিখণ্ডিত হয়ে আছে দুই শিশুর মাঝে। সেদিন দেখল শঙ্করী ওদেরকে বেশ করে তেল মাখাচ্ছে। শঙ্করী যোগেনকে দেখে হাসিমুখে বলে, ‘কাল কলু বাড়ি থেকে ঘানির শর্ষের তেল এনে দিয়ো তো বিচ্ছু দুটোর জন্য’।
যোগেন দেখে শঙ্করীর জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই। আর তখনই যোগেনের বুক কেঁপে ওঠে। বলে, ‘ওদেরকে আজ রাতে বৌঠানের কাছে ঘুমাতে পাঠিও’।
শঙ্করী পা লম্বা করে কুশকে পায়ের উপর উল্টো করে শুইয়ে নরম শরীরটাতে আচ্ছা করে ডলাইমলাই করছিল। পাশে বসে লব। তার হাতে চুষিকাঠি। সে একমনে ভাইয়ের তেল মাখানো দেখছে। শঙ্করী যোগেনের দিকে না ফিরেই উত্তর করে, ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? দিদি বলে এখন জপতপ নিয়েই থাকে। দিনমানে মানুষ তারে তো এট্টুস কেউ স্বস্তি দেয় না। সেদিন তো দেখি বদু ডোম উঠোন পানে হাঁটু মুড়ে বসে আছে। আর দিদি তাকে কি যত্নেই না কলাপাতায় খেতে দিচ্ছে। আমি তো বাপু মরে গেলেও পারবো না। চাঁড়াল। কোথায় না কোথায় নেশা ভান করে পড়ে থাকে। মড়া পোড়ায়। ম্যাগো’।
যোগেন এবার বেশ রাগ দেখিয়েই বলে, ‘আমি যে এতক্ষণ রোদে তাতে পুড়ে এলাম সেদিকে তোমার খেয়াল আছে? এট্টুস জল বাতাসা দিতে হয়। নাকি পরের ছেলে নে আদিখ্যেতা করতে গে সেটা ভুলে গেছো?’
শঙ্করী এবার আহত চোখমুখে স্বামীর দিকে তাকায়। তার শ্যামলা রোগাটে মুখটায় চোখদুটো বেশ টানাটানা। ঘন চোখের পল্লবের জন্য কাজল ছাড়াই মনে হয় সে বুঝি চোখে কাজল দিয়েছে। এখন সেচোখে তার ভীতা হরিণীর ভাষা। মুখে বলে, ‘ছিঃ এসপ তুমি কি কইছো? বটঠাকুর সগ্‌গ থেকে শুনলে মনে বড়ো ব্যথা পাবে যে। তুমি আছো বলেই না বটঠাকুর গলায় ফাঁসি দিতে পেরেছিল। বটঠাকুর, দিদি, তাদের ছেলেরা কি আমাদের পর? ওরা যে আমার সাত রাজার ধন এক মাণিক’।
শঙ্করী কুশকে কোলে তুলে নিয়ে চুমোতে চুমোতে ছোট্ট নরম তুলতুলে শরীরটাতে ভরিয়ে দিতে থাকলে লব মাটিতে চুষিকাঠি ফেলে এ্যা এ্যা করে কাঁদতে কাঁদতে শঙ্করীর গায়ে হামা দিয়ে উঠে আসে। শঙ্করী তেল মাখা দুই হাত দিয়ে দুজনকে জড়িয়ে ধরে সোহাগে গলে যেতে যেতে বলে, ‘ওলে বাবা। তোমায় আদর করা হয় নি। এই তো আমার জোড়া মাণিক। আমার সোনা ছেলে। আমার গোপাল’।
যোগেন বুঝতে পারে শঙ্করীর কাছে তার প্রয়োজন শেষ। শঙ্করী বেশ ঝাঁঝের সঙ্গেই বলে, ‘এক ঘটি জল দুটো নাড়ু নে খেলি কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়?’
যোগেন কোনও কথা না বলে উঠোন মুখো হাঁটতে শুরু করে। শঙ্করী সেদিকে খেয়ালও করে না। সে লবকুশের সাথে খেলায় মত্ত।


কমলা দিনে দিনে মিতভাষী হয়ে উঠেছে। তার চলন, বলনে সে এখন অনেক বুঝদার। মাত্র কদিনের আগের মুখরা, কুচুটে, অসভ্য কমলা বউ ক্রমশ দেবীতে উত্তরণ ঘটাচ্ছে। কমলার এখন সারাদিনের নিত্তকর্ম বলতে স্বপাক দুটি ফুটিয়ে খাওয়া। তাও পূর্ণিমা, একাদশীতে বাদ পড়ে। ঘরদোর পরিষ্কার, শাড়ি জামা ধোয়া, উঠোন লেপা সবই তো গ্রামের বিশেষত অন্তজ শ্রেণীর কেউ না কেউ করে দিয়ে যায় পালা করে। ঘোষালমশাই বলেছিল, ‘মায়ের আহার দুটি যদি আমার ঘর থেকে আসে অসুবিধা কি?’
বিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে কমলা। বলেছে, ‘না ঠাকুর আমার পাপের ঘড়া পূর্ণ, তাকে আর উপচে পড়তে দেবেন না’।
কমলার এখন বেশীরভাগ সময় কাটে রাধামাধবের মন্দিরেই বসে। সেখানে বসেই সে চিন্তা করছিল, মন্দিরের সামনের জমিতে নাটমন্দির হয়েছে। প্রতি সন্ধ্যায় সেখানে রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত আলোচনা হচ্ছে। গর্ভগৃহে কষ্টিপাথরের শ্যাম রায়। তার পাশে শ্বেত শুভ্র রাধা। আহা ভাবতে গিয়ে প্রাণ জুড়ায়। কোনরকমে নম নম করে মন্দির উদ্বোধন হয়েছে। কমলার সুপ্ত ইচ্ছে সামনের বছর মহাধূমধাম করে বাৎসরিক পুজো করে। প্রতি বছর এই পুজোর রোশনাই বাড়তে বাড়তে গ্রাম গ্রামান্তরে ছড়িয়ে যাবে। এই পুজোকে কেন্দ্র করে মেলা বসবে। রাধামাধবের মাহাত্ম্য নিয়ে মানুষ কথা কইবে। কিন্তু অন্তঃসলীলা ফল্গুর মতো কার মাহাত্ম্য নিয়ে লোকে কথা কইবে বলে সাধ হয় কমলার? সে কি দেবী কমলা! নেড়া উঠোনে বসে গ্রামের মাতব্বরেরা কত গল্পগাছা করে। যদি নাটমন্দির হয় তেনাদের একটা ঠাই হয়। সেই সঙ্গে কমলার একটা সূক্ষ্ম ইচ্ছা মনের ভেতর ঢালা উপুড় হয় – ‘ইস সে যদি একটু পড়তে জানতো’। শঙ্করী বউ কেমন সুন্দর সুর করে শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম পড়ে। রামায়ণ, মহাভারত পাঠ করে। তখন সব মানসে তো শঙ্করী বউকেই ধন্য ধন্য করে। কিন্তু সব স্বপ্ন পূরণের প্রথম শর্ত অর্থ। সে ব্যাপারটা কমলা খুব ভালো ভাবে বুঝেছে।

সেদিন রামায়ণ পাঠের পর গ্রামের মাতব্বরেরা কি সব আলোচনা করছিল। ইংরেজদের বিষয় নিয়ে। কমলা ঠিক বুঝতে না পারলেও অদূরে বসে খুব বোঝবার চেষ্টা করছিল। তেনারা বলছিলেন যে কি সব বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনে বেআইনি খাজনা সম্পর্কে নির্দেশ থাকলেও কজন জমিদার তা মানে। সুন্দরবনের জমিকে ‘উঠতি’ জমি করার জন্য জমির লোভ দেখিয়ে যেসব আদিবাসীদের ধরে এনে জঙ্গল কাটতির কাজে জুতে দেওয়া হল তারপর তারা তো আর ফিরল নিকো। তারা সাপ, ইঁদুর, খরগোশ, পাখি, মাছ যা পাচ্ছে ধরে খাচ্ছে। কে যেন ফুট কাটে, ‘বাকি বোধহয় জঙ্গলের বড়ো মিঞাকে ধরে খেতে’।
উত্তর আসে, ‘যা বলেছো’।
কিন্তু তারা জানে না শশীবালার বাপের তালুক কিম্বা গঙ্গাদের তালুকের জমিদাররা এইসব মানুষগুলোকে বছরের পর বছর হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করিয়ে জমিনের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের রক্ত-রস শুষে নেয়। তারপর যেই তারা একটু থিতু হয়, নিষ্ঠুর মানুষগুলো তাদের সাধের বানানো চাষের জমিতে লেঠেল দিয়ে বাঁধ কেটে নোনা জল ঢুকিয়ে দেয়। পরপর দুচার বছর ফসল না পেয়ে অথচ খাজনার চাপে জর্জরিত মানুষগুলো স্বপ্ন ছেড়ে বাস্তবের মাটিতে আছড়ে পড়ে। যারা থেকে যায় তারা মজুর, বর্গাদারে পরিণত হয়। তাদের চোখের জল মিশে যায় নদীর নুনজলে। বহিরাগত প্রজারা যারা জমির জন্য নগদ উচ্চ মূল্য বা সেলামী দিতে পারল তাদের ঐসব জমি পুনরায় বিলি করা হল।

যোগেন ঠাকুরপো সেদিন কমলার বাড়িতে এসে কিছু চা পাতা দিয়ে বলে, ‘বৌঠান এগুলো রাখো। কত মানুষ এখন এখানে আসেন তাদের মাঝেমধ্যে চা করে দিও। আমার পরিচিত একজন কলকাতা গেছিলেন তাকে দিয়ে আনিয়েছি। আমাকেও মাঝেমধ্যে এট্টুস তোমার প্রসাদ দিও’।
কমলা চা পাতাগুলোর ঠোঙা ধরে গন্ধ শোঁকে। ভারী সুবাস। তার মুখের ওপর মুখশ্রীর গম্ভীর মুখোশখানা সরে যায়। সূর্যের ওপর থেকে মেঘ সরে গেলে যেমন সূর্যের আলো ঝলমলিয়ে ওঠে এও যেন তেমনি আগের কমলা। গালের টোলে হাসি। বলে, ‘কায়েত ঠাকুরপো কি সোন্দর বাস। আমার বহুদিনের ইচ্ছে ছিল একবার চা খাই। কিন্তু কিভাবে বানায় তা তো আমি জানি নে’।
যোগেন মহা উৎসাহে বলে, ‘উনুনে আগুন দাও। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি’।
উঠোনে পাতা কাঠের জ্বালের উনুনটায় শুকনো পেয়ারার ডাল ঠেসে দিতেই বগবগিয়ে আগুন ওঠে। গ্রাম্য সৌজন্যকে ভুলে যোগেন কমলার পাশে বসে চা করা শেখায়। চা-চিনি-দুধের মাপ বোঝায়। আর বোঝাতে গিয়ে দুজনেই তরল হয়ে ওঠে। হাসে। আহা জগৎসংসারে এতো সুখ থাকে। কমলা এখন দেবীর পর্যায়ে। তাই তার লোকভয় নেই। কিন্তু যোগেন। কি হয়েছে তার? সে কি ভুলে গেছে এই বাড়িতে ঐ বাইরে পাতা চৌকিটায় বসে সে আর মহিম কত সময় কাটিয়েছে। নারকেল নাড়ু, তালের বড়া, ক্ষীর খেয়েছে। কখনও বা চালভাজা। কিন্তু চায়ের পাত্রে ওঠা ধোঁয়ার মিষ্টি গন্ধ কমলা বৌঠানের এত নৈকট্য সেসব ভুলিয়ে দিয়েছে। দাওয়ায় পাতা চৌকিতে চায়ের বাটি নিয়ে বসে দুজনে। যোগেনের খুব আফসোস হয়, ইস এ বাড়িতে যে বিস্কুটের বালাই নেই তার একেবারে মনে ছিল না। লবকুশের কারণে এখন যোগেনের বাড়িতে বিস্কুট থাকে। নতুবা গাঁয় গঞ্জে এমন সৌখিন খাবারের চল নেই। মুড়ির মোয়া, খই-মুড়কি, চালভাজা এসবেরই চল।
শ্মশানের পাশে পতিত জমিটায় পাকা কলার কাঁদি ফলেছিল। মর্তমান কলা। হলুদ রঙের। গাছ পাকা কলার গন্ধে মম করছে চারপাশ। বদু খুব উৎসাহের সঙ্গে লম্বা লম্বা পা ফেলে তার মা জননীর জন্যে সেই কলার কাঁদি ঘাড়ে করে নিয়ে আসছিল। কিন্তু গলা থেকে ‘ম জননী’ ডাক বেরোবার আগে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে থমকে যায়। আরে সেই বিধবা পুকুর ধারের চোরটা না? হ্যাঁ তাই তো, চোরটাই তো। বদু এ কদিনে জেনে গেছে চোরটা জাতে কায়েত। লোকে না জেনে এই লোকটাকে বেশ মান্যিগন্যি করে। কিন্তু বদুর চোখে লোকটা ‘বদুরও অধম’।
‘হেই মা শ্মশানকালী। যে লোক বদুর প্রাপ্যে ভাগ বসায় তাকে শাস্তি তুই দিস মা’। মনে মনে প্রার্থনা জানায় বদু। লোকটা বদুর মা জননীর পাশে বসে হেসে হেসে বাটিতে করে কি যেন খাচ্ছে। বদু কলার কাঁদি কাঁধে নিয়ে পেছন ফেরে। মনে মনে সে ঠিক করে এই লোকটাকে নজরে নজরে রাখতি হবে। যাতে মা জননীর কোনও ক্ষেতি না করতি পারে।

সেদিন কমলার উঠোনে আলোচনা হচ্ছিল ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনে বেআইনি খাজনা সম্পকে নির্দেশ থাকলেও সুন্দরবন এলাকার কজন জমিদার তা মেনে নিয়েছেন? জমি উঠতি করার প্রয়োজনে বহিরাগত প্রজাদের ডেকে এনে জমি বিলি করা হচ্ছে। কমলা চা বানাতে বানাতে মন দিয়ে কান খাড়া করে সেসব শুনছিল। তার মাথায় কিছুতেই একটা বিষয় ঢুকছিল না লালমুখো সাদা চামড়ার লোকগুলো সেই সাতসমুদ্র তেরো নদী পাড় হয়ে কোন কোন মুলুক থেকে এ দেশে এসে রাজত্বি চালাচ্ছে। কিন্তু তারা সংখ্যায় কজন। এই কাঁচপোকা গাঁয়ে যত মানুষ আছে তারা কি এতগুলো মানুষেরও বেশী। সেদিন যোগেন ঠাকুরপো টাকির বিজয় নামের কার কথা বলছিল। তার ঠাউরদা নাকি তিতুমিরের সঙ্গে সাহেবদের বিপক্ষে যুদ্ধ করেছিল। বিজয় নামটা খুব চেনাচেনা লাগছে। কে সে? মাথার ভেতর অনেককিছু ঢালাউপুড় করতে করতে একটা সময় থিতু হয় যে সম্পর্কে তার নাম আন্না। বিজয় তো আন্নার বাপ। হাবির সতীন আন্না। এই আন্নার জন্যই হাবির সর্বস্ব গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজয় নামে মানুষটার প্রতি সমীহ হয় কমলার। আহা মানুষ তো নয় যেন দেবতা। তার কীর্তি শুনলে আপন হতেই মাথা নুয়ে আসে ভুঁইয়ে। এট্টাবার সামনে থেকে দেখবার জন্য প্রাণের ভেতরটা আঁকুপাঁকু করে ওঠে।

সময় বড়ো যেন দ্রুত বহে যাচ্ছে। ঠিক যেভাবে বহে যায় সুন্দরবনের নদীনালা বিরামহীনভাবে। ১৮৭১-৭২-এ ম্যালেরিয়া সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র সঙ্কট সৃষ্টি করেছিল। তার বড়ো কারণ ছিল এখানকার মিঠে পানির অভাব। অর্থাৎ কিনা সুপেয় পানীয় জলের অভাব। এখানকার সব জলাশয়ই তীব্র আকুচ নুনে ভরা। কাঁচপোকা গ্রামে নির্দিষ্ট কোনও জমিদার বা ধনবান ব্যক্তি না থাকায় এখানে সমস্ত ব্যবস্থাই বড়ো অপরিকল্পিত। ঘরে ঘরে বাচ্চাদের রিকেট, আমাশা, কাশি, জ্বর নিত্যসঙ্গী। গ্রামে কোনও পাঠশালার পর্যন্ত বালাই নেই। এট্টুস অক্ষর শিক্ষা করবার জন্য যেতে হয় পাশের গ্রামে। সেসব নিয়ে সেদিন যোগেনকে এসব বলেছিল কমলা। কিন্তু যোগেন তার উত্তরে স্পষ্ট বলেছে, ‘বৌঠান তুমি এসব নিয়ে ভেবো না তো। একটা বার শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখো তো নিজে কি হাল করেছো। অমন সুন্দর চোখ তোমার কোটরে বসে তলায় কালি পড়ে গেছে। কণ্ঠার হার বেরিয়ে গেছে। তাছাড়া এসব পুরুষ মানুষের ভাবনার বিষয়। তুমি এসব নিয়ে ভেবো না’।
যোগেন যেন কবে কিভাবে বিনা অনুমতিতে কমলাকে তুমি বলে ডাকা শুরু করেছিল। কমলা ভেবেছিল পুরুষ মানুষের মন এতে যদি শান্ত হয় তো হোক। ভুল ভেবেছিল কমলা। যোগেনের নিশ্চুপ দাবী ক্রমশ অধিকার হয়ে উঠছে। কমলার শরীর শরীর করে বেশী ভাবিত। কিন্তু কমলার চাহিদা যেন ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। সে মানবী নয় দেবী। তাই তার মুখ থেকে ফস করে বেরিয়ে গেছিল, ‘বিধবার আবার শরীর। এ শরীর যত তাড়াতাড়ি আগুনে ছাই হয় ততই ভালো’।
কমলাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে ডান হাতের পাতা দিয়ে কমলা বৌঠানের মুখ চেপে ধরেছিল যোগেন, ‘বল বৌঠান, বল তুমি এমন অলক্ষুণে কথা আর কখনও মুখে আনবে না। কথা দাও আমায়। তোমার কি সত্যি কেউ নেই বৌঠান?’
কমলা এই প্রথম ভয় পায়। তাও আবার যোগেনকে। তার চোখে ধেনো জমির মাঝ রাতের আলেয়া দপদপিয়ে জ্বলছে। সেখানে কুহু ডাক বড়ো তাড়াহুড়ো, দাবী, অধিকার। কমলা একটু জোরের সঙ্গেই যোগেনের হাত সরিয়ে দেয়। বলে, ‘বদু আসতে পারে’।
যোগেনের হাতের পাতায় তখনও কমলার পুরু ঠোঁটের উষ্ণতা। নিজের হাতের পাতার দিকে চেয়ে ক্ষুণ্ণ স্বরে একটু বা বিরক্ত তেমনভাবে বলে, ‘তুমি ঐ চাঁড়ালটাকে এত লাই দাও কেন বলতো বৌঠান? সেদিন মহিমের ব্যবহার করা ধুতি, জামা, এমন কি পিরানটাও দিয়ে দিলে? কেন ও কি বাবু সেজে কাঁধে পিরান ঝুলিয়ে মড়া পোড়াবে? একটা জন্তু। একদিকে মড়া পোড়ায় একদিকে ভাত রাঁধে। ভাবলেই বমি পায়। না বৌঠান বদুকে তুমি আর লাই দিও না’।
কমলা যোগেনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। হাসি পায় তার। হায় পুরুষ! শেষ পর্যন্ত বদু ডোমকে নিজের প্রতিপক্ষ ভেবে নিয়ে নিজের আগুনে নিজেই পুড়ছো।
যোগেন বড়ো অশান্ত হয়ে উঠেছে শরীর, মনে। তার আরও অনেক কিছু বলার আছে। কিন্তু তার আগেই ঘোষাল মশাইয়ের গলা শোনা যায়, ‘ও জানকী মা, আছো নাকি ঘরে। দিন দিন কি আকাল পড়েছে গো। পৃথিবীর কোনখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ না ছাইপাঁশ কি সব হল আর আমাদের এখানে জিনিসের দাম আকাঁড়া হয়ে গেল। তাছাড়া তো বন্যা, মড়ক সব লেগেই আছে। বাপ রে গরুর দাম কি বেড়ে গেছে গো মা। ফি বছরে তো গরুর মড়ক লেগেই আছে। গরু না থাকার জন্য চাষিগুলো দিনে দিনে এ গ্রামে ও গ্রামে জমিদারের মজুরে পরিণত হচ্ছে। দেখে এলাম মা, আজও ভবানীপুর পাড়ি দিচ্ছে কজন চাষি। এইজন্যই বলে অভাগার গরু মরে, ভাগ্যবানের বউ। বউ মরলে আর যা হোক দেশান্তরি হতে হয় না’।
কমলা ছিটকে ঘর থেকে বের হয়। ঘোষালমশায়ের নাতিটার কাঁধে পেল্লাই সাইজের মর্তমান কলার কাঁদি। কমলা কিছু বলবার আগেই ঘোষালমশাই হেসে বলে, ‘আমি না। বদু ব্যাটা দে গেল। সে নাকি নিজেই আসছিল তোমার বাড়ি। তা পথে দূর থেকে হরিধ্বনি শুনেছে তাই আমার বাড়ি নামায়ে দে গেল। নাও মা বল কোথায় রাখব?’
যোগেন ঘরে দাঁড়িয়েই আছে। তার ঘোষালমশাইয়ের সামনে বের হতে কুণ্ঠা হচ্ছে। কমলা সহজ করে দেয়, ‘কায়েত ঠাকুরপো আপনার হিসাব পরে করবেন। বাইরে এসে দেখেন বদুর কাণ্ড’।
উহ্‌ আবার সেই বদু। চিরবিরিয়ে ওঠে গাটা। তবু মুখে হাসির প্রলেপ দিয়ে বাইরে আসে যোগেন। জিজ্ঞাসা করে, ‘কেন কি করল আপনার বদু?’
কমলা বুঝতে পারে যোগেন খোঁচা দিল। এবং আপনি-তুমি ব্যবহারেও সচেতন। কমলা গায়ে ফুঁ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে আঙুল দিয়ে কলার কাঁদি দেখিয়ে বলে, ‘ঐ দেখেন’। তারপর একটু দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করে, ‘ঘোষালমশাই, পরশু পূর্ণিমা। ঐ কলার কাঁদি সৎব্যবহার হোক। রাধামাধবের সিন্নি চরুক। আর গাঁয়ের সব লোক প্রসাদ পাক’।
ঘোষালমশাই প্রায় বাচ্চা ছেলের মতো নেচে ওঠে, ‘সাধে কি বলি তুমি মা জননী। এই বুড়ো ছেলে থাকতে তোমার কোনও চিন্তা নেই। আমি এখনই গ্রামে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দিচ্ছি’।
কমলা মুখ টিপে হেসে বলে, ‘বদুটাকেও একটা খবর পাঠাবেন। আর ঠাকুরপো আপনারই তো সব দায়িত্ব। ঘোষালমশাইয়ের সাথে গে যা করবার করে ফেলুন’।
কমলা ঘরে ঢুকে চোখ বুজিয়ে তৃপ্তির শ্বাস নেয়। স্বপ্ন দেখে – বাড়ির পেছনে যে পাঁচ কাঠা জমিটা আছে তাতে শানবাঁধানো মিঠে জলের পুকুর। আহা! সবাই খাবার জল নিতে আসছে আর জয়ধ্বনি দিচ্ছে – ‘জয় কমলামায়ের জয়, জয় কমলাদেবীর জয়, জয় কমলা দেবীমায়ের জয়, জয় ঠাকরুন কমলা দেবীমায়ের জয়’। (ক্রমশ)




১৭

শেখর পাল্কী চড়ে আসছে এটা প্রথমে বুঝতে পারে নি বৈঁচি। তাদের উঠোনে পাল্কী এসে দাঁড়ালে সে ঘোমটা দিয়ে একটু তফাতে গিয়ে দাঁড়ায়। মনের ভেতর অজস্র প্রশ্ন মৌমাছির ঝাঁক হয়ে গুনগুনিয়ে ওঠে - এরা কারা? শেখর কি এখনও ঘুমাচ্ছে? আন্না, সে কি করছে? সে কেন এখনও ওঠে নি? তারপরই বুকের ভেতর ভয়পাখিটা ঝাঁপটা মারে। আচ্ছা শেখরের বাড়ির লোক আসে নি তো শেখরকে নিয়ে যেতে? শেখর আর আন্নার ঘরের দরজাটার দিকে তাকায়। মেয়ে জামাইয়ের বন্ধ ঘরে কড়া নাড়া কি ঠিক হবে? আর তখনই বৈঁচিকে চরম অবাক করে দিয়ে পাল্কীর ভেতর থেকে শেখর বেড়িয়ে আসে। বৈঁচী এত অবাক হয়ে যায় যে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না। অজস্র প্রশ্নের বান মাথার ভেতর এলোপাথাড়ি ঢেউ তুলে জট পাকিয়ে যায়। এত সকালে শেখর কোথায় গেছিল? পাল্কী করে এসেছে কেন? আন্না, সেই বা কোথায়?
বৈঁচীকে অমন হতভম্ভের মতো চেয়ে থাকতে দেখে শেখরও থমকে যায়। কালু দুজনের দিকে নজর করে নৈঃশব্দের আড় ভাঙে, ‘আজ্ঞে পেন্নাম হই মা জননী, আজ্ঞে সেই পেথ্যম দিন মানে বাবুমশাইয়ের বিয়ের দিন আমরাই তাকে কলকেতা থেকে বয়ে এনেছিলাম। তা সুন্দরবনের নোনা জলবাতাসে ক’টা দিন জিড়িয়ে নে এবার ফিরছি। কিন্তু মন বললো বাবুঘরের মানুষটিকে আর কোনদিন দেখতি পাব কিনা ঠিক নেই, তাই একবারটি তার দর্শন করে যাই। দেবতা মানুষ এই বাবুমশাই’। জিভের ডগায় তার প্রায় এসে গেছিল ‘কেবল বে’র রাতে বড়োমিঞার তাড়া খাওয়া হরিণের মতো পলায়ে আসাটা ঠিক হয়নি’।
বৈঁচীর বিরক্তিতে সর্বশরীর টিসটিস করে ওঠে - ন্যাকামো। বাবুমশাইয়ের দর্শন করতে মন চেয়েছিল। তবু সৌজন্যবশতঃ আর খানিকটা বিজয়ের ভয়ে মুখে বলে, ‘বেশ তো পুকুরে গে মুখ, হাত ধুয়ে এসো। আমি চা দিচ্ছি’।
‘চা’ শুনে কালুবাউড়ির দলের কারো বাক্যি ফোটে না। এনারা চা খায়!


চোখ কচলাতে কচলাতে ঘর থেকে যখন আন্না বের হয়, শেখরকে পাশে না দেখে ভেবেছিল সে বুঝি আগেই উঠে গেছে। কিন্তু উঠোনভর্তী কতগুলো অচেনা লোক আর তার মা ও শেখরকে দেখে রীতিমত তাজ্জব বনে যায়। এরা কারা! এত সকালে তাদের বাড়ি কি করছে? দেখে তো মনে হচ্ছে শেখরের চেনা। আবার পাল্কীও আছে! তারপরেই বুকের ভেতর অমঙ্গলের আশঙ্কাটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে - এরা কি শেখরকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে? শেখর কি আন্নাকে ছেড়ে চলে যাবে? না। কক্ষনো না। আন্নার মন বিদ্রোহ করে ওঠে। শেখর তার। শুধুমাত্র তার।
বৈঁচী সৌজন্যতা ভুলে আন্নাকে এক দাবড় দেয়, ‘এত বেলা অব্দি ঘুমিয়ে থাকিস কি করে শুনি? তোর বাবা তোকে লাই দে দে মাথায় তুলেছে। এখন এখানে হা করে দাঁড়ায়ে আছিস যে বড়ো। বাবাজীকে নে ঘরে যা’।
কালু বুঝতে পারে এই সেই আন্না। যার জন্য বাবুমশাই ছোটঠাকরুণকে ছেড়ি জেবন ঝুঁকি নে নদী সাঁতরে বাপ, মা’রে ছেড়ি চলে এয়েছে।

বিজয় আজ তাড়াতাড়ি স্নান সেরে ফিরেছে। উঠোনে পা দিতেই বৈঁচির সাথে চোখাচোখি হয়। বৈঁচির চোখের ভাষায় রাজ্যের অসন্তোষ। বিজয়ের বিরক্তই লাগে। বৈঁচি চাপা স্বরে বলে, ‘তালে এখন কোথাকার কোন বেজাতের বেয়াড়াদের পাত পেড়ে খাওয়ার ব্যবস্থা করতি হবে তো?’
বিজয় এখনও ভিজে গায়ে। বৈঁচির ঠোনা মারা কথায় হঠাৎ রেগে ওঠে, ‘আচ্ছা তুমি নিজের মেয়ের স্বার্থ ছাড়া আর কিছু বোঝো না, তাই না আন্নার মা?’
বৈঁচি বুঝতে পারে বিজয় রেগে গেছে। ‘আন্নার মা’ সম্বোধনটা তার প্রমাণ।
বিজয় গলা তুলে ডাক দেয়, ‘আন্না, আন্না, মা এদিকটায় একটি বার শুনে যাও তো’।
আন্না বাসি কাপড়জামা ছেড়ে এখন পরিচ্ছন্ন। সে শেখরের কাছে কালু বাউরিদের গল্প শুনছিল। বলে, ‘কি বাবা?’
বিজয় খুব নরম গলায় বলে, ‘যাও তো মা, তোমার গোয়ালা পিসিকে একটিবার ডেকে আনো তো। বলো হাতে সময় নে সে যেন আসে। কজন বাইরের লোক খাবে। বাইরের উনুনে রেঁধে দিক খানিক ঝালেঝোলে। যেন নিজেও এখান থেকে নেয়ে খেয়ে যায়। ভজকেও যেন নে আসে’।
আন্না মায়ের দিকে তাকালে বিজয় বলে, ‘তোমার মায়ের শরীরটা ভালো নয়। কাল রাত থেকেই তার মাথার ব্যথাটা বেড়েছে’।
আন্না বলে, ‘তালে আমি কবিরাজ দাদুকে কি এট্টিবার খবর করে যাব?’
আন্না যেন আরও কি বলতে যাচ্ছিল। বিজয় তার আগেই বলে ওঠে, ‘তার দরকার নেই। তেমন হলে আমিই খবর পাঠাবো’।
কোমরে শাড়ির আঁচলটা জড়িয়ে আন্না খানিকটা লাফিয়ে লাফিয়ে এক্কাদোক্কা খেলার ঢঙে চলে যায়। মেয়ের এই চলনে বৈঁচির বিরক্ত লাগে। ততোধিক বিরক্ত লাগে যে কোনও কাজে বিজয়ের তাকে গ্রামে টইটই করতে পাঠানো। কিন্তু বিজয়ের মেজাজ বুঝে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায় বৈঁচি।
বিজয় গম্ভীর গলায় ডাক দেয়, ‘শোন বৈঁচি, আমি জানি এই বেয়াড়ারা তোমার সমস্যা না। তোমার সমস্যা লোকগুলো শেখরের বাড়ি থেকে এসেছে বলে। ওদের কাঁধে চেপেই বিয়ের দিন কলকাতা থেকে শেখর ভবানীপুর এসেছিল। লোকগুলো এতদিন সেখানেই ছিল। ওখানকার ভালোমন্দের বিস্তর খবর ওদের পেটে। সে খবর শেখরের কাছে পৌঁছবে। কিন্তু কি জানো, এভাবে অন্যের সম্পদ ভোগ করা যায় না। কথায় বলে না, ভগবানের মার দুনিয়ার বার। অদৃষ্ট যদি না চায় তোমার ক্ষমতা নেই তাকে আটকে রাখার’।
বৈঁচি আর নিজেকে সামলাতে পারে না। কেঁদে ফেলে সে, ‘কতগুলো অজাত বেয়াড়াদের জন্য তুমি আমাকে এতগুলো কথা শোনাচ্ছ! তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? স্নান সেরে এসে এসব কি বলছ তুমি! অদৃষ্ট যদি না চায় মানে? শেখর আন্নার সোয়ামী। শেখর আন্নার অদ্দেষ্টে না থাকা মানে তুমি বোঝো?’
বৈঁচি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে রান্নাঘরে যায়।

কালুর দল পুকুর থেকে একেবারে নেয়ে এসেছে। সুদেহী বিজয়ের সামনে এসে আপনাআপনি কালুর মাথা নিচু হয়ে আসে। বলে, ‘গড় হই নতুন ঠাকুর’।
কালুর এটা একটা সুন্দর অভ্যাস। অপরিচিত কাউকে পছন্দ হলেই নিজেই তাকে নতুন সম্বোধনে সম্পর্ক পাতিয়ে নেয়। কালুর দেখাদেখি সকলে প্রণাম করে বিজয়কে। বিজয় উঠোনে কাঁঠাল গাছের তলায় পাতা খাটিয়াটা আঙুল দেখিয়ে বলে, ‘ওটিতে বোসো তোমরা। বৈঁচি তোমাদের জলখাবার দিচ্ছে। আমি পুজোটা সেরে নি। দেরি হয়ে গেছে অনেক’।
আন্নার পোষা টিয়াটা ডানা ঝাপটে হঠাৎ ডেকে ওঠে, ‘আন্‌ না’।
কালু শুধোয়, ‘পাখি কি কইল নতুন ঠাকুর?’
বিজয় হেসে বলে, ‘আমার মেয়ের নাম। আন্না’।
কালুর কপালে ভাঁজ পড়ে – তালি সে কেন শুনল ট-গ-র!


বিজয় সেই অর্থে কোনও কেউকেটা না। ধনীও না, জমিদার, জোতদার কিছুই না। তবু তাকে রোজিপুর গ্রামে সকলে মানে, ভালোবাসে। কিন্তু সম্প্রতি সুখেন দত্ত নামে এক পরিবার উঠতি বড়লোক হয়ে এ গ্রামের প্রভু হয়ে বসতে চাইছে। রোজিপুরের সাথে সুন্দরবনের সরাসরি যোগাযোগ নেই। তাই জঙ্গল কাটনির ধান্দা সে করতে পারে না। তারপর বসিরহাটে বাগুন্ডি, নৈহাটির ওদিকে নীলচাষের ব্যবসা ফেঁদেছিল। সেই ব্যবসায় মানুষের রক্ত চুষে সে এখন টুসটুসে ছারপোকা। বেশ কিছুদিন আগে থেকে জমিদারদের পাশাপাশি তালুকদার, হাওলাদার, গাঁতিদার, চকদার শ্রেণীর আবির্ভাব হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। এইসব মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা জমিদারদের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে পূর্বের প্রজাদের উচ্ছেদ করে। এই জমি খাসজমি হিসাবে বাৎসরিক উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক দেবার চুক্তিতে প্রজাদের দিয়ে জমি চাষ করায়। এইভাবে বর্গাদার প্রথার সৃষ্টি হয়। জমিচাষের সমস্ত খরচ বর্গাদারদের। বাংলার অন্যত্র জমির মালিকরা বর্গাচাষিকে বীজধান বা অন্যান্য নানা ধরনের সাহায্য করতো। কিন্তু সুন্দরবন এলাকায় এ ধরনের কোনও সাহায্য তারা পেত না। অর্থবানদের উঠোনে ১৫/২০ টি পর্যন্ত ধানের গোলা আছে। শেখরদেরই তো আছে ১৮টা আর গঙ্গাদের ১৩টা। ১ম মহাযুদ্ধের পরপর সুন্দরবনের দক্ষিণাংশে এক বিস্তীর্ণ এলাকায় স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটন দরিদ্র মানুষদের জন্য মানব কল্যাণমূলক চিন্তাভাবনা নিয়ে সুদূর স্কটল্যান্ড থেকে এসেছিলেন। তিনি গোসাবাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষকদের অর্থনৈতিক স্বয়ংভরতা নিয়ে আসার ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সমবায়ভিত্তিতে গ্রামের মানুষদের উৎসাহিত করে ব্যাঙ্ক, ধর্মগোলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতির ব্যাপারে উদ্যোগ নেন। ফসল ওঠার সময় প্রজাদের মুষ্টিভিক্ষার মধ্য দিয়ে এই ধর্মগোলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। চাষিদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে এখানে রাখা হত। অভাবের সময় চাষিকে খুব কম দামে এখান থেকে ধান দেওয়া হত। কারণ নোনা জল ঢুকে ধান নষ্ট হলে চাষির খোরাকি বলতে কিছু থাকতো না। তারা বাধ্য হত দাদন নিতে। আর একবার দাদন নিলে সুদে আসলে সে জন্মের শোধ তো বটেই তার উত্তরসূরিরাও এই মারাত্মক অসুখের হাত থেকে রেহাই পেত না। ধনী ব্যক্তি বুঝতে পেরেছিল নিজেরা জমি চাষ করার থেকে ঐ গরীবগুর্বো অসহায় মানুষগুলোকে দাদনের জালে জড়িয়ে চাষ করানোই লাভের। ঐ অসহায় পরিবারগুলোতে একটা শিশু জন্মাত ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে, মারাও যেত ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে। মৃত্যুতেও সে ঋণ শোধ হত না। নীল কমিশন পর্যন্ত তদন্ত রিপোর্টে এই একই কথা পেশ করেছিল মাত্র ক’বছর আগে। নীলকর সাহেবরা বুঝেছিল নিজেদের উদ্যোগে জমি চাষ করানোর থেকে অগ্রিম দাদন দিয়ে নীলচাষ করা অনেক লাভজনক।
এই ধর্মগোলার কথা লোক মুখে মুখে সমস্ত সুন্দরবন ছড়িয়ে পড়ে। বিজয়ের এমন ব্যবস্থা কানে যেতেই নিজেকে নিজের জাতিকে ছিছি ধিক্কার দিয়েছিল। সেই সঙ্গে একটা ব্যাপারে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে একমাত্র মানুষ ইচ্ছা করলেই যে কোনও পরিস্থিতিতে ভালো কাজ ও মন্দ কাজ দুটোই করতে পারে। এরজন্য শুধু চাই মন। নতুবা কোন সুদূর স্কটল্যান্ড থেকে এক সাহেব এসে জঙ্গল, সাপখোপ, জন্তু-জানোয়ারে ভরা সুন্দরবনের জন্য সেখানকার অবহেলিত, বঞ্চিত মানুষগুলোর জন্য এত ভাবে! কই তাদের কারও মাথায় তো ধর্মগোলা করে সমবায় প্রথার মাধ্যমে নিজেদের সমস্যার সমাধানের কথা কেউ ভাবতে পারে নি। হ্যাঁ কলকাতায় অনেক জনহিতকর, কল্যাণমুখী কাজ হচ্ছে কিন্তু সমুদ্রের অনেক ঢেউ যেমন পাড়ে আসতে আসতে ভেঙে যায় এও তেমনি, সুন্দরবনের আগেই তার সকল তেজ হারিয়ে যাচ্ছে। বিজয় তাই ভেবেছিল এ গ্রামে অমন দু’চারটি ধর্মগোলার দরকার। সেই কারণে আজ বাড়িতে সকালবেলায় গ্রামের প্রতি পরিবারের মাথাকে আসতে বলেছিল। জাত-পাত নির্বিশেষে। মঙ্গলারা জাতে গোয়ালা। ওর স্বামীর বছর দুই আগে কালাচের কামড়ে প্রাণ গেছে। বিজয়ই ভেঙ্গে পড়তে দেয় নি মঙ্গলাকে। ভাইফোঁটার দিন মঙ্গলার হাতে ফোঁটা নিয়ে বলেছিল, ‘আজ থেকে এই দাদাটা তোর পাশে আছে। ছেলেমেয়ে নিয়ে শক্ত হাতে দুধের ব্যবসায় হাত লাগা। মেয়েমানুষ বলে কেউ ঠোনা দেবে, বদনাম দেবে, পিছনেও লাগবে। কিন্তু সকলের মুখে দুয়ো দিয়ে তোর কাজ তুই করে যা, লক্ষ্যে পৌঁছবি’।
মঙ্গলা শুনেছিল বিজয়ের কথা। অবশ্য এ কথাও সত্যি বৈঁচি সেদিন বিজয়কে সমর্থন করে পাশে না দাঁড়ালে এত বড়ো দায়িত্ব সে নিতে পারতো না। মঙ্গলার গোয়ালের দুধ এখন পাইকারি জোগান হয় আশপাশের সবকটি মিষ্টির দোকানে।
মঙ্গলা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বিজয়ের বাড়ি হাজির হয়ে চীৎকার করেই বলে, ‘ও বৌদি আমি এয়ে গেচি। শিগগিরি আনাজ, মশলা, চালডাল বার করি দাও’।
ভজ আন্নার থেকে বছর তিনেকের ছোট। তার মধ্যে বালকসুলভ চপলতা পুরো মাত্রায় বিদ্যমান। সে ছুটে পাখির খাঁচার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বৈঁচি ততক্ষণে এক ধামা মুড়ি, তাতে সর্ষের তেল, কাঁচা লঙ্কা, কাঁচা পেঁয়াজ আর শীতের সময় শুকিয়ে রাখা বরবটির দানা নিয়ে এসে হাজির হয়। ডাক দেয়, ‘ভজ আয় তো বাপ, এই ধামাখানা বেয়াড়াদের নে দে তো। তোর জন্য দুধ, চিড়ে, পাকা কলা, কদমা রেখেছি’।
বৈঁচির হাতে চায়ের ঘটি থেকে সুগন্ধি ধোঁয়া ওঠা দেখে ভজ। সে জানে এ বাড়িতে চায়ের পাট আছে। তার মা এসে মাঝেমাঝে চা খেয়ে যায়। বহুবার চা খাওয়ার জন্য ভজর বুকের ভেতরটা হাঁকপাঁক করেছে তবু লজ্জায় বলতে পারেনি। আজ সামনে থেকে ঘটি ভর্তী চা বেয়াড়াদের কাছে চলে যাচ্ছে দেখে সে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, ‘আমি ঐ দুধ, চিড়ে খাব না বড়ো খুড়ি’।
ভজর আচমকা এমন কান্নায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় বৈঁচি। জিজ্ঞাসা করে, ‘খাবি না মানে? কি খাবি তালে?’
ভজ নাক টেনে বলে, ‘লোকগুলোরে যা দিচ্ছ। আমি চা খাব’।
বৈঁচির এতক্ষণের সমস্ত গুমোট ভাব উধাও হয়ে গিয়ে হা হা করে হেসে ওঠে। মঙ্গলাও লুটোপুটি খায়। বেয়াড়ারাও হেসে গড়িয়ে পড়ে।
ভজ গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলে, ‘যা বাবা, এত হাসির কি বললাম’।
বিজয় পুজোর ঘর থেকে সব শুনেছে। সে পুজো থামিয়েই কোমল গলায় বলে, ‘দাও গো ভজর বড়ো খুড়ি, ভজবাবুকে পেয়ালা পিরিচে সাজিয়েই চা দাও’।
বৈঁচি আর রাগে না। সে সত্যি সত্যি পেয়ালা ভরে থালায় করে চা এনে দেয় ভজকে। ভজর খুশি আর ধরে না। সে থালাখানা হাতে নিয়ে বলে, ‘ঐ খাটিয়ায় বসে খাব বড়ো খুড়ি?’
বৈঁচি তার চুল ঘেঁটে দিয়ে বলে, ‘যা বসে খা। থালায় ঢেলে ফুঁ দিয়ে দিয়ে ঠাণ্ডা করে খাবি। তারপর কিন্তু দুধ চিড়ে খেতে হবে’।
বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ে ভজ, ‘আচ্ছা’।

বিজয়ের বাড়িতে জাতপাত ছোঁয়াছুঁয়ির কচকচি খুব বেশি নেই। তবু সমাজের তো একটা বাছবিচার আছে। সেখানা তো তুমি ফুঁ দিলে আর নিভে গেল তা হয় না। ভজর কোমল হৃদয়স্পর্শে বৈঁচি এখন অনেকখানি নরম স্বাভাবিক। সে জানে মঙ্গলাকে মাছ দিলে সে কেটে বেছে রেঁধে স্নান করে নেবে। কিন্তু বৈঁচির বিবেকে বাধে। কাঁচা বয়সের বিধবা যতই ওজর দেখাক ‘ভজ, গোপালীর জন্য আমাকে তো বাড়িতে মাছ ছুঁতে হয় বৌদি তালে এখানে কি দোষ করলো’, মা বৈঁচির কোথায় যেন বাধে। সে বলে, ‘না ঠাকুরঝি তোমার বাড়িতে আর কেউ নেই। তুমি রেঁধে না দিলে বাচ্চাদুটো মাছের সোয়াদ তো ভুলে যাবে। কিন্তু এখানে তোমাকে দিয়ে সে কাজ করিয়ে আমি পাপ কুড়োতে পারবো নি’।
বিজয় পাড়ার ভোম্বলকে দিয়ে পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরিয়ে নিয়েছে। ইয়া বড়ো একখানা কাতলা মাছ ধরা পড়েছে। সঙ্গে পুঁটি, খলসে, খানকতক তেলাপিয়া।
বিজয় বলে, ‘তেলাপিয়াগুলো খুব ছোট। পুকুরে ছেড়ে দে ভোম্বল’।
রান্নাঘর থেকে বৈঁচি বলে, ‘না ওগুলো বেছে কেটেকুটে দিতে বল। পুকুরে ফের আর কিছু ছাড়তে হবে না। ওগুলো ভাজা করে দেবো। ঠাকুরঝি নে যাবে। গোপালীটাকে নে এলে না কেন গো?’
নটেশাক বাছতে বাছতে মঙ্গলা বলে, ‘বাড়ি পাহারা দেবে কে? অতগুলো গোরু’।
মুখে এ কথা বললেও গোপালীকে না নিয়ে আসার আসল কারণ আন্না। গোপালী আন্নারই সমবয়সী। তবু এখনও পাত্রস্থ হয় নি। ঠিক হয়নি না, মঙ্গলাই গা করে না। এ ব্যাপারে বিজয়েরও প্রচ্ছন্ন সায় আছে। তাই মঙ্গলা যখন বলেছিল, ‘দাদা আমি গোপালীর এখনই বিয়ে দিতে চাই না। ও লেখাপড়া করতে চায়। পাঠশালায় যেতে চায়। অঙ্কে ওর মাথা খুব পরিষ্কার। ওই তো আমার গোয়ালের অতগুলো গোরুর দুধ বিক্রির হিসাব রাখে’; বলে, লুকিয়ে নিজের মেয়ের জন্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল, তখন বিজয় বলেছিল, ‘বাঃ খুব ভালো। আমার কাছে মাঝে মাঝে পাঠাস। আমি ওকে ইংরাজি শেখাবো। জানিস তো আমাদের দেশের এখন প্রতিটা মানুষের প্রধান কর্তব্য ইংরেজকে তাড়ানো। কিন্তু শত্রুকে না জানলে তাকে তাড়াবে কি করে। তাই ওদের ভাষাটা আমাদের শিখতে হবে। তাছাড়া ঐ একফোঁটা মেয়েগুলোকে বিয়ে দিয়ে জীবন নষ্ট করে কি লাভ?’
মঙ্গলা কি তা আর বোঝে না। হাড়ে মজ্জায় বোঝে। তাই তো মেয়েকে আরও কিছুদিন অনূঢ়া করেই রাখতে চায়।
বিজয় আরও বলেছিল, ‘জানিস তো কলকাতায় বিদ্যাসাগর মহাশয় বাল্যবিবাহ রুখে বিধবাবিবাহ চালু করবার আন্দোলন চালিয়ে কতক জায়গায় শুরুও করে দিয়েছেন’।
এমন কথা শুনে মঙ্গলার হা মুখ আর বন্ধ হচ্ছিল না। বিস্ময়ে সে বাক্‌রুদ্ধ হয়ে গেছিল – বিধবার বিয়ে! এ যে সোনার পাথরবাটি।


কালু আর তার দলবলের এখানে এসে বাস্তবিক আনন্দের শেষ হচ্ছিল না। এমন চা দিয়ে আতিথেয়তার শুরু। তাদের জন্য পুকুরে জাল ফেলা। তাছাড়া এত সুন্দর নিকানো তকতকে ঘরবাড়ি মন কেড়ে নিচ্ছিল কালুদের। জীবন যেন এখানে ছবির মতো সুন্দর। ভবানীপুরে রামতনুর বাস্তুও জাঁকজমক, আড়ম্বর ঠাটবাটে অতুলনীয় কিন্তু কোথায় যেন প্রাণের অভাব। তার উপর শশীকে সকলে যে ভয় পেয়ে চলে সেটাও এ কদিনেই বুঝে গেছে কালু। শুধু যেটুকু ছড়ায় তা ঐ কচি মেয়েটা। তার আধো আধো বুলি। কালুদের ছোট্‌ ঠাকুরুণ।
শেখর কালুদের কাছে গিয়ে দাঁড়ালে কালু প্রায় আপ্লুত হয়ে ওঠে।
শেখর কোনরকমে শুধোয়, ‘ওদিককার সব খবর কুশল তো?’
কালু কেঁদে ফেলে, ‘বাইরে থেকে যা দেখা যায় তাই তো সব নয় বাবুমশাই। বাপ-মায়ের অন্তর কত যে টুটি ফাটা হচ্ছে তা বাইরে থেকে তো বোঝা যায় না। আর ......’ বলে থেমে যায় কালু।
শেখর ফের শুধোয়, ‘আর কি?’
কালু কিছু না বলে ঘাড় নাড়ে।
বিজয় এসে বলে, ‘তোমরা নিজেদের মতো থাকো। অসুবিধা নেই। আসলে আজ চণ্ডীমণ্ডপে গ্রামে ধর্মগোলা স্থাপন নে সভা আছে। আমি কদিন ধরেই ব্যস্ত’।
শেখর অবাক চোখে তাকায়।
কালু জিজ্ঞাসাই করে, ‘সেটা কি নতুন ঠাকুর?’
তার আগেই আন্না এসে বলে, ‘ওমা তুমি ধর্মগোলা জানো না। চাষিরা ধান মজুত রাখবে প্রয়োজন মতো কর্জ নেবে বলে’। তারপর বিজয়ের দিকে ফিরে বলে, ‘জানো বাবা আমাদের এই রোজিপুরে যদি ধম্মগোলা স্থাপন হয় খুব ভালো হবে। আমি ঐ মিটিনে থাকবো তো বাবা?’
বিজয় কিছু বলবার আগেই শেখর আচমকা বলে ওঠে, ‘তুমি কি করতে থাকবে, পুরুষ মানুষের ব্যাপার। আমিও তো থাকবো না’।
বিজয়ের মনে হয় আচমকা হ্যাঁচকা টানে বুকের শেকল ছিঁড়ে গেল। আন্না এখন অন্যের দখলে। আন্নার অভিভাবক তার স্বামী, শেখর।
আন্না কি বলতে যাচ্ছিল।
বিজয়ের গলা বুজে আসে। কোনরকমে বলে, ‘দূর পাগলী, তুই কি করতে যাবি?’
আন্না বলে, ‘মঙ্গলা পিসি, গোপালীও যাবে’।
বিজয় কোনরকমে বলে, ‘না আন্না, তোমার এখন অন্য লড়াই। তুমি শেখর যা বলবে শোন’।
দূর থেকে বৈঁচি সব শুনে বড়ো খুশি হয়।

শেখরের হঠাৎ মনে হয় আচ্ছা সে কালুদের সাথে কলকাতা ফিরে গেলেই তো পারে। বাস্তবিক এখানে তার অসহ্য লাগছিল। (ক্রমশ)





১৮

ভূজঙ্গ ফিরে আসা যেমন নাটকীয় ততোধিক নাটকীয় সোহাগী সেই যে ‘ও সাবু ও তোর বাপরে’ বলে ঘরে দোর দিয়ে আর দোর না খোলা। অবশ্য জনতার এখন সোহাগীকে নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই। তারা ভূজঙ্গকে নিয়েই ব্যস্ত। আস্ত বারোখানা বছর লোকটা গায়েব ছিল। কোথায় ছিল? কি বৃত্তান্ত সব কিছু। কিন্তু সোহাগীর ভেতর কি যন্ত্রণার উথালিপাথালি ঢেউ! মাতলা নদীর মতো পাগল করে তোলা। মানুষ সবসময় নতুন কিছু চায়। সাদা থান পরা, নেড়া মাথা, শীর্ণ চেহারার অসহায় মানুষীটিকে নিয়ে বিন্দুমাত্র কৌতূহল কারও নেই। বেচারা সাবু কিছুই বুঝতে পারছে না। তাকে সকাল থেকে ‘তোর বাপের ছেরাদ্দ’ বলে উপোস করে রেখে দিয়েছে সকলে। বাপ সশরীরে সেখানে উপস্থিত হলেও কারও মনে হয় না ‘আহারে ছোটো ছেলেটা না খেয়ে আছে’। তবে এই তালেগোলে ভূজঙ্গর খিদে বোধটা উধাও। ভূজঙ্গও যেন এত বছরের অদর্শনে সোহাগী নামের মানুষীটির প্রতি কৌতূহল হারিয়ে ফেলেছে। বরং নিজে এদ্দিন কোথায় ছিল, কি করে ছিল সে সব জাহির করে বলতেই ব্যস্ত। পুরুতমশাইয়ের চিন্তায় কপালের তিনটে বলিরেখা ছ’খানা হয়ে গেছে। আরে যার জন্য এই ছেরাদ্দ সেই মানুষ যদি নিজে এসে হাজির হয় তাহলে দক্ষিণার বা কলাটা, মুলোটার কি হবে! ঠাকরুন বলেছিল, এক জোড়া মিহি সুতোর ধুতি, পিরান সব দেবে।
ভূজঙ্গ জানায় সে নাকি পশ্চিমে ছিল এদ্দিন।
তা হারু মল্লিক ফুট কাটে, ‘তা বাপ এদ্দিন ওখানে কি করছিলে তুমি? বাঁশি বাজাচ্ছিলে? নাকি বে থা করে সেখানেও একটা সংসার করে রেখে এয়েছো?’
ভূজঙ্গ বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই খোকোনের মা বলে ওঠে, ‘মরণ আর কি। এখানে বলে সংসার আছে। তা ভূজঙ্গ তুমি তো তোমার ব্যাটাকে চোখেই দেখনি। জম্ম দেওয়ার আগেই পগার পার। এই যে তোমার সেই ছেলে’। ‘আই সাবু’ বলে চীৎকার করে ওঠে খোকোনের মা।
সাবু ভয়ে আরও গুটিসুটি মেরে এর ওর আড়ালে লুকিয়ে যায়। শশী এসে যে দাঁড়িয়েছে সেটা সকলের খেয়াল হতেই জনতার ভেতর মৃদু গুঞ্জন ওঠে। গঙ্গাও এসে দাঁড়িয়েছে বিনি পয়সার তামাসা দেখতে। গৌরী আর তার পিছু পিছু টগরমণিও এসেছে। তবে ছোট্ট টগরের মাথায় কিছুই ঢুকছে না। সে ভীড়ের ভেতর এক পলক নেড়া মাথা সাবুকে দেখে ফিক করে হেসে দেয়। শশী ভেতরে ভেতরে ভেঙে চুড়মার হয়ে যাচ্ছে তবু শক্ত থাকে। থাকতে হয়। সকলে শশীকে জায়গা করে দেয়। শশী ভূজঙ্গর সামনে এসে দাঁড়ালে, ভূজঙ্গ ভুঁইয়ে লুটিয়ে পড়ে, ‘প্রেণ্ণাম হই মা ঠাকরুন’ বলে। শশী প্রণাম নেয়। এ যেন তার ন্যায্য প্রাপ্য।
শশী চিনিচম্পা কলার মতো মিষ্টি গলায় ডাক দেয়, ‘সাবু কোথায় গেলি বাপ?’
সাবু আরও ভয় পেয়ে যায়। গৌরী গিয়ে হিড়হিড় করে টেনে আনে। ভয়ে সাবু ঠকঠক করে কাঁপতে থাকলে শশী সেদিকে নজর করে সুন্দর করে হেসে বলে, ‘তোর জন্য হতচ্ছাড়া ছেলেটাকে নেড়া মাথা হতে হল। তবে যা গরম পড়েছে। নেড়া হতেই হত। নে ছেলে দেখ ভূজঙ্গ। তোর ছেলে’।
ভূজঙ্গ সোহাগীর পেটে সন্তান আসার খবর জানতো না তাই কিছুটা ঘাবরে গিয়ে নেড়া মাথা বালকটির দিকে তাকিয়ে থাকে।
শশী বলে, ‘ও সাবু যা তোর বাপ। প্রণাম কর’।
সাবু তবু আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
শশী এক ঝলক হাসি দিয়ে বলে, ‘ও মুখপোড়া তুই ছেলেটাকে কাছে নে। শোনো তোমরা যারা যারা ভোজ খাওয়ার জন্য এসেছিলে কেউ চলে যেও না। এ খাবার তো ফেলা যাবে। তবে ভূজঙ্গর ফিরে আসার আনন্দে এর ঢের আমিষ ভোজ হবে রাতে’।
শশীর নামে জৈজাকার দেয় সকলে। ভূজঙ্গ সাবুর একখানা হাত ধরতে গেলে সাবু সে হাত ছাড়িয়ে দে দৌড়। শশীর রাগে গা কিরকির করে উঠলেও হাসে। বলে, ‘ছোঁরা লজ্জা পেয়েছে’।
সাথে সাথে সবাই বলে, ‘পাবেই তো’।
এতক্ষণে পুরুতঠাকুরের দিকে চোখ যায় শশীর। সকলের সামনে হঠাৎ করে প্রণাম করে বলে, ‘ঠাকুরমশাই আজ বড়ো পূণ্যির দিন। আজ আপনার জন্যই এতবড়ো ঘটনা ঘটলো’।
পুরুতঠাকুর বুঝতে পারছিল না সে কি করলো। তবু ঠাকুরুণের মুখের উপর কথা চলে না। তাই তাকিয়ে থাকে।
শশি গৌরীকে আদেশ দেয়, ‘গৌরী যা তো মা, ঠাকুরমশাইয়ের সিধে, ধুতি, দক্ষিণা, সব আমার ঘরে রাখা আছে, নে আয়’।
ঠাকুরমশাই এতক্ষণে শ্বাস নেয়। বলে, ‘মা ঠাকুরুণ এজন্যি আপনারে জগজ্জননী বলে সকলে’। ভূজঙ্গকে বলে, ‘যা নেয়ে খেয়ে আমার কাছ থেকে নতুন ধুতি পড়ে এক্কেরে নতুন হয়ে নতুন জেবন শুরু কর’।
শশীর দুচোখ যাকে খুঁজে চলে সে হল সোহাগী। শশী হেসেই বলে, ‘হ্যাঁ তা আমাদের সাবুর মা’টি কই। চুল নেই তাই নেড়া মাথায় স্বোয়ামীর সামনে আসতে লজ্জা পাচ্ছে?’
কে যেন বলে, ‘সে তো ঘরে গে দোর দেছে ঠাকুরুণ’।
শশীর ভেতরটা খচখচ করলেও সকলের সামনে বলে, ‘দেবেই তো। থাক ওকে আজকের দিনটা নিজের মতো থাকতে দাও সক্কলে। আর চুলের জন্য শোক করতে বারণ করো, ও আমি বসিরহাট থেকে এক নম্বর সাহেবি তেল আনিয়ে দেব। আর ভূজঙ্গ তুইও ওকে ক’টা দিন নিজের মতো থাকতে দিস। শত হলেও মরা স্বামীর বেঁচে ওঠা তো’।
ভূজঙ্গ ঘাড় নারে। শশির জলের মতো সব সমস্যার সমাধান করে ফেলতে দেখে গঙ্গা ভাবে - বাঃ রে বা। আমার শাউড়ি ঠাকুরুণ তো গোরাদের সাথেও টক্কর দিতে পারবে।
সাবুর পেটের ভেতর খিদেতে ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে। তার ঐ ভূজঙ্গ নামে বাবাটার প্রতি বেদম রাগ হয়। আজ বলে এ বাড়িতে কত খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ঐ লোকটার আসার জন্য সব মাটি। মা’টাও ঘরে গিয়ে দোর দিয়ে কি করছে কে জানে! সে থাকলেও খাওয়ার একটা ব্যবস্থা হতো। রাগে, দুঃখে সাবু পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে। বসে বসে পুকুরে ঢিল ছোড়ে। দু’চারটে ছোড়ার পরেই নিজের সঙ্গে নিজেই একটা প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। রোখ চেপে যায় সাবুর। এই পরের ঢিলটা আরও দূরে ছুরবো। আর তখনই পেছনে কচি গলার খিলখিল করে হাসির আওয়াজ শোনে। এ হাসি তার চেনা। তবু পেছন ফেরে। হাসি মুখে বলে, ‘ছোটঠাকুরুণ তুমি! কখন এলে?’
টগর বিজ্ঞের মতো বলে, ‘এইতো এলুম। তা সাবু - নেই কাজ তো খই ভাজ করছো?’
সাবু খুব করুণ মুখ করে বলে, ‘কি করবো বলো, মা দোর দে আছে। ঠাকুরুণ মা’রে জ্বালাতন করতে নিষেধ করেছে নতুবা তো এতসময়ে ব্যবস্থা হতো’।
টগর ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করে, ‘কি ব্যবস্থা হতো?’
‘আমার খাবার। আমি সক্কাল থেকি কিচ্ছুটি খাইনি ছোটঠকুরুণ’ বলে কেঁদে ফেলে সাবু।
টগরের দুই চোখও জলে ভরে যায়। সে আবার পাকাগিন্নির মতো বলে, ‘ওমা কি কান্ড! তোমায় কেউ খেতে দেয় নি? এসো আমার সুঙ্গি এসো’।
বলে সাবুর হাত ধরে ওঠাতে গেলে সাবু ছিটকে সরে যায়। সরতে গিয়ে সে খানিকটা পুকুরের দিকে ছেঁচে যায়। বলে, ‘একদম আমাকে ছুঁয়োনা ছোটঠকুরুণ, ঠাকুরুণ কি বলে দিয়েছে মনে নেই। একবার জানতে পারলে আমাকে আর আস্ত রাখবে না’।
টগর কি যেন বলতে যাচ্ছিল কিন্তু চুপ করেই যায়। তার ছোট মগজখানাও এ’কদিনে বুঝে নিয়েছে এখানে শশির কথাই শেষ কথা। কাজীর বিচার। বলে, ‘বেশ আমার পেছু পেছু এসো। নিরামিষ রান্নাশালের পেছনে একটা কলাপাতা নে গে দাঁড়াও। আমি আস্তিছি’।
টগর আর দাঁড়ায় না। বেশ জোরে জোরেই পায়ের মল বাজিয়ে রান্নাঘরের দিকে যায়। কিন্তু ঢুকতে গিয়ে ভয় পায়। শশী দেখলে কি বলবে! আর তখনই কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া তার বিয়ে নামে অনুষ্ঠানে সারাদিনরাত অভূক্ত থাকার কথা মনে পড়ে যায়। উঃ কি খিদেটাই না পেয়েছিল। বাবা বারবার বলেও তাকে মাছ-মন্ডা কিচ্ছু খেতে দেয় নি। সে চারপাশ একবার দেখে টুক করে রান্না ঘরে ঢুকে যায়। শশি বিধান দিয়েছিল সব খাবার ফেলে দিতে। কিন্তু এতো মহার্ঘ খাবার সব ফেলতে কোনো ঝির বুঝি প্রাণে লেগেছে। তাই সে বেশ ক’টা লুচি আলু পটলের দম আর কি কি যেন রেখে দিয়েছে। টগর তাড়াতাড়ি একটা কাসার বাটিতে পাঁচটা লুচি আর আলুপটলের দম তুলে নিয়ে রান্নাঘরের পেছনে আসে। সাবুর দুই চোখ বিস্ফারিত। ছোটঠাকুরুণ পেরেছে। কলারপাতা মেলে ধরে। টগর অন্নপূর্ণার মতো খাবারটুকু ঢেলে দিয়ে বলে, ‘এখন খেয়ে নাও। রাতে তো তোমার বাপ ফিরে এয়েছে বলে আমিষ ভোজ হবে তখন আবার খেও’।
সাবু কেন জানি কান্নাটাকে আগল দিতে পারে না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলে, ‘ও খাবার আমি খাবুনে ছোটঠাকুরুণ। এতেই আমার হবে। তুমি যাও’।
হায় অদৃষ্ট সাবু যে বাপের উপর নাম না জানা অভিমানে খাবো না বললো সেই বাপেরই অর্ধেক হওয়া শ্রাদ্ধের খবার খেল।


সত্যি সত্যি রাতের বেলা হেজাকের আলোয় রীতিমতো অনুষ্ঠান বাড়ির আঙিনা মনে হয় রামতনুর বাড়িটাকে। সবার মুখে মুখে ধন্যি ধন্যি রব, শশি বলেই সম্ভব। ভূজঙ্গ দাঁত বার করে নিজেও পাত পেরে খেল। সাবু দূর থেকে দেখে। খালি মনে হচ্ছিল, ‘ইস গুলতি দিয়ে লোকটার কপালটায় যদি আলু করে দেওয়া যেত খুব ভালো হতো’। নতুন ধুতি পরে ভূজঙ্গ বেশ খোলতাই হয়ে বেড়াচ্ছে। ওদিকে সাবুর মা বা সোহাগী নামের মানুষীটার যে কি অবস্থা কেউ জানতেও চাইলে না। নাকি শশির এটাও একটা চাল তা কে জানে! টগর আগেই জেনেছিল সাবু খাবে না। তারও আর খেতে ইচ্ছা করে না। সে বলে, ‘মা আমার খিদে পাচ্ছে না’।
শশী মনে ভাবে ছোট মেয়ে ও বেলায় কখন কি খেয়েছে থাক তাহলে। একগ্লাস দুধ এনে জোর করে টগরকে খাইয়ে দিয়ে শুইয়ে দেয়। আজ তার ঘুম হবে না। অনেকগুলো হিসাব গরমিল হয়ে গেছে সেগুলো নিয়ে বসা দরকার। আর নরম বিছানায় শুয়ে এই মাটার ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে গিয়েও সাবুর জন্য মন খারাপ করে টগরের। কে জানে সাবুটা আজ রাতে কোথায় থাকবে! ওর মা তো দোর দে বসে আছে। শুধু গৌরী এসে একবার বলে, ‘খুড়িমা তোমার ঝি মাগী যদি আত্মহত্যা করে?’
শশী বলে, ‘করলেও ওকে আজ কেউ জ্বালাবি নে। বড়ো দাগা পেয়েছে মনে’।
খুড়ির কথা শুনে মনে মনে গৌরী বলে, ‘কত রঙ্গ দেখবো’। রাতে গঙ্গাকে বলে, ‘কালই বাড়ি যাব’।
গঙ্গা বলে, ‘ওমা কি সুন্দর যাত্রা পালা জমে উঠেছিল চলে যাবে?’
শশীর মনে কি চলছে কেউ টের পায় না। সে রাতে রামতনুর জন্য দুধ, খই মর্তমান কলা নিয়ে গিয়ে সামনে বসে। খুব যত্ন করে খাওয়ায়। আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে বলে, ‘তোমার শরীরটা খারাপ বলে বলিনি, কি কান্ড হয়েছে জানো, ভূজঙ্গ মুখপোড়া ফিরে এয়েছে। আসবি তো আয় এক্কেরে ছেরাদ্দের বাসরে। তবু ভালো সাবুটা তো জন্মে ইস্তক বাপের মুখ দেখিনি দেখে নিল। আর... যাকগে কথা বাড়িয়ে কাজ নেই, তুমি ঘুমাও’।
রামতনুর ভেতরটা সোহাগীর কথা জানবার জন্য ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতো ছটফটায়। শশি আড়চোখে স্বামীকে দেখে। তার ভেতরটাও শিঙ্গিমাছের কাঁটা ফোঁটানোর যন্ত্রণায় ছটফট করে। শশি হাসলে বড়ো সুন্দর দেখায় এখনও। হয়তো এটাই সত্যি। হাসি মানুষের রূপ খুলে দেয়। শশি নিজের রূপ সম্পর্কে অল্পবিস্তর সচেতন। সে রামতনুর একটু ঘনিষ্ট হয়ে বসে। বলে, ‘তুমি কিচ্ছুটি ভেবো না। আমি ওবেলার খাবার সব ফেলে রাতে ভুজঙ্গ আসার আনন্দে আমিষ ভোজের ব্যবস্থা করেছি। নাও তুমি এবার চোখ বোজো দেখি। আমি টগরের কাছে না গেলে ঘুমাবে না’।
রামতনু চোখ খুলে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভেতরটা হাহাকারের মতো করে। কোনরকমে বলে, ‘হে দয়াল তুমি এ কি খেলা খেলছো?’


বেচারা সাবুর কথা কারও মনে হয় না। ছোটো বালক তাদের ঘরের বারান্দাতেই বসে বসে ঝিমোতে ঝিমোতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। রাত নিঝুম হয়ে গেলে, আম গাছের ওপর যখন পেঁচার ডানা ঝাপটানি শোনা যাচ্ছিল, আর বাদুর, চামচিকির দল বেড়াতে বেড়িয়েছে, মাঠের পুকুরপার থেকে শেয়ালের সম্মিলিত হুক্কাহুয়া ডাক আর তার একটু পরেই কুকুরের পালের চীৎকার ডাকাবুকো দস্যি ছেলেটাকে ভয় পাইয়ে দেয়। দরজার কাছে গিয়ে মনে হয় ঘা দেয়। মা’কে ডাকে। কিন্তু শশির কথা মনে পড়ে যায় - ‘খবরদার আজ কেউ সাবুর মা’কে জ্বালাবি না। সাবু তুই ও না’। সাবু ঠাকুরুণকে বড়ো ভয় পায়। তার স্থির বিশ্বাস ঠাকুরুণের অনেকগুলো চোখ আছে। নতুবা কোথায় কি হচ্ছে সব জানতে পারে কি করে!
আর ভূজঙ্গ, তার আজ জামাই আদর সকলের কাছে। সে নিজের ভিটেতে গিয়েই সেঁধিয়েছে। তার মনেও সোহাগীর অস্তিত্ব বেমালুম ভো ভা। সে মনের সুখে বাঁশিতে ফুঁ দেয়। নিজের ছেলে বলে যে বাচ্চাছেলেটাকে দেখলো এক পলক তাকেও ভাবতে ভালো লাগে না। এদ্দিন বাদে নিজের গাঁ, নদী, দূরে ঐ সুন্দরবনের আবছা জঙ্গল তাকে পেয়ে বসে, পেট ভর্তি ভালো, ভালো খাবার বাঁশিতে সুর উথলে ওঠে। বড়ো সুখি মনে হয় নিজেকে এ পৃথিবীতে। ভবানীপুর গ্রামটায় আজ ঘরে ঘরে একটাই আলোচনা - সোহাগীর কি ভাগ্যি! আর শশির জয়জয়কার।
শশী দাওয়ায় এসে দাঁড়ায়। তার চোখ দুটো জ্বলে। জ্বলন্ত চোখে সোহাগীর বন্ধ দরজার দিকে তাকায়। তখনই খেয়াল হয় কে যেন শুয়ে আছে বারান্দায়। কাছে গিয়ে দেখে সাবু। সত্যি সত্যি মায়া হয় শশির। একবার ভাবে ডেকে কোনো একটা ঘরে নিয়ে আসে। কিন্তু তারপরেই ঘরের ভেতরে থাকা মানুষীটির কথা মনে হয়। মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু শশিও তো মা। ঘরের থেকে একটা চাদর আর বালিশ এনে সাবুর মাথার নিচে এবং গায়ে দিয়ে দেয়। সাবু টের পায়। টের পেয়ে ভয়ে কাঠ হয়ে যায়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সারাজীবনের জন্য সে শশির কাছে বিক্রি হয়ে যায়। গোলাম বনে যায় এ পরিবারের কাছে সারাজীবনের জন্য। কেন জানি গলার কাছে দলা মতো পাকিয়ে চোখ দিয়ে অনর্গল জল নেমে আসে। ঘুমিয়ে পড়ে সাবু। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে শশির। না আর একজনও আছে অস্পষ্ট ভাবে এ বাড়ির ছোটঠাকুরুণ। হায় বালক সে স্বপ্নে অভাগী মা’খানার স্থান নেই কোনো। সাবুর স্বপ্নটা দেখতে বেশ ভালো লাগে। সে চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নেয়। ঘুমের অতলে তলিয়ে যায় সাবু। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপন দেখে, ‘মা তাকে রীতিমতো মর্তমান কলা দিয়ে দুধ, ভাত খাইয়ে দিচ্ছে। পাশে ছোটঠাকুরুণও বসে আছে। স্বপ্নের মধ্যে সাবুর একটু খারাপ লাগে ছোটঠাকুরুণকে মা কেন খাইয়ে দিচ্ছে না!’ এতটুকুই দেখেছিল স্বপ্নটা।
সারারাত কি ঘুমিয়ে ছিল শশি? মানুষের শরীর তো। ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে গিয়েছিল। কিন্তু সারা রাতের মধ্যে একবারও ঐ প্রাণীটির কথা মনে পড়লো না! সেও তো সারাদিন নির্জ্জলা উপবাস। একটু বুক কাঁপলো না যদি কিছু করে ফেলে! কে জানে শশির মনের কথা অন্তর্যামিও জানে বলে মনে হয় না। উঠোন ঝাঁটাতে এসে কাওড়াবৌ প্রথম ঠকঠকায় সোহাগির দোর। সাবু ঘুম চোখে উঠে বসে বলে, ‘মা’কে ডাকছো যে বড়ো, জানোনা ঠাকুরুণ আদেশ দেছে মারে জ্বালাতন না করতি’।
কাওড়া বৌ মুখ ঝামট দেয়, ‘চুপ করতো ছোঁড়া, সে আদেশ তো কালকের জন্যি ছেল। আজ যে দিনমান হয়ি গেছে সে খেয়াল আছে?’
সাবু কথাটা ভাবে, তা বটে। মনে বল পায়। সেও দরজা ধাক্কাতে থাকে। মা ও মা বলে ডাকতেও থাকে। কাওড়া বৌ কিন্তু থমকে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
সাবু বলে, ‘বুঝলে পিসি মা মনে হয় খুব ঘুমিয়ে গেছে’।
কাওড়াবৌয়ের বুকের ভেতরটা ধরাস, ধরাস করে ওঠে। মন কু’ গায়। সাবুর দিকে তাকিয়ে চোখে জল চলে আসে। তারপর দাওয়া থেকে নেমে শশির কাছে যায়। আর শশি সে যেন ভুলেই গেছে কালকের সব ঘটনা। সে অন্দরবাড়িতে পায়রাকে চাল খাওয়াতে ব্যস্ত। কাওড়াবৌ সামনে এসে দূরত্ব বজায় রেখে অভ্যাস মতো পেণ্ণাম ঠোকে। বলে, ‘মা ঠাকুরুণ সাবুরমা’র দরজায় এতো ঘা দিলাম ভেতর থেকে তো সাড়াশব্দ নেই’।
শশীর রাগে মুখ লাল হয়ে যায়। তাকে না বলে কে ওস্তাদি করতে বলেছে। এজন্য বলে ছোটোজাতদের মাথায় তুলতে নেই। কিন্তু সে যা আশা করেছে তা যদি দুইয়ে দুইয়ে চার হয়ে যায়। না তাহলে তো শশির হাতে অনেক কাজ। ঘরের দিকে একবার তাকায়। রামতনু ঘুমাচ্ছে। শরীর ভালো না তাই। নতুবা এতবেলা পর্যন্ত শুইয়ে তিনি থাকেন না। আর এত সকালে টগরকে শশিই তোলে না। চালের সরাটা রেখে বলে, ‘চল দেখি ভিড়মি টিড়মি খেল কিনা’।
গলায় মিছরির শরবৎ ঢেলে শশি ডাক দেয় ‘সাবুর মা, ও সাবুর মা, দরজাটা খোল দেখি। নে এবার ভুজঙ্গর সাথে মান অভিমানের পালাটা শেষ কর দেখি। তোদের ফের চার হাত এক করে দে আমি এট্টুস শান্তি পাই’।
না দরজা খোলে না সোহাগি।
কাওড়াবৌ ডুকরে ওঠে, ‘মা ঠাকুরুণ মরে গেল না তো?’
শশী আড়চোখে সাবুকে দেখে নিয়ে বলে, ‘মাগি তুই থামবি। সাবু যা তো বাপ, হুসেনদাদার ঘরে গিয়ে বল একজন লেঠেল নে এক্ষুনি আসতে’।
শিমূলতুলোর মতো খবরটা ছড়িয়ে যায় ভবানীপুর গ্রামময়। গৌরী শশির পাশে এসে বলে, ‘আমি কালই সন্দেহ করেছিলাম। তোমার ঝি মাগির যা চুল, নেড়া হয়ে সে শোকেই না মরে’।
শশী কিছুতেই শক্তপোক্ত যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিল না কিভাবে ব্যাপারটাকে সাজাবে। গৌরির কথায় মাঝনদীতে হঠাৎ করে পাড়ে আসার তীর দেখতে পায়। মুখে মিষ্টি করে বলে, ‘ঐ যে হুসেন এয়ে গেছে যা গৌরি তুই ঘরে যা মা। তোর কোলে কচি ছেলে। এসপ তোকে দেখে কাজ নেই’।
গৌরির মনে মনে কি হচ্ছে, কি হতে পারে সে সব দেখার খুব ইচ্ছা থাকলেও ছেলের কথায় দমে যায়। সে পায় পায় ভেতর বাড়ি চলে যায়।
লেঠেলের দু’ঘায়েই সাবুরমা’র সাধের ঘরের দরজা ভেঙে পড়ে। সবাই একসঙ্গে আঁতকে ওঠে, ঐ তো ঘরের খেঁজুর গাছের আড়ার সঙ্গে সোহাগির দেহখানা ঝুলছে। গলায় নিজেরই কাপড় দিয়ে ফাঁস দিয়েছে সে। মরার আগে নেড়া মাথায় সিঁদুরের কারি ঢেলেছে, পায়েও আলতা পরা। এই এত্তখানি জীভ বেড়িয়ে। সাবু ছুটতে গিয়ে মায়ের পা’দুখানা জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে, ‘মা ওমা তুমি মরে গেলে কেন? আমি এখন কোথায় থাকবো? কে খেতে দেবে?’
শশীর মতো মানুষও টাল খায়। কোনোরকমে বলে, ‘ওরে সাবুকে এখান থেকে কেউ নে যা। যাও বাপ তুমি যাও’।
খবরটা ভূজঙ্গর কানেও গেছে। সেও ছুটে এসেছে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কিছুতেই মানতে ইচ্ছা করে না এ তারই বৌ ছিল। শশি শক্ত হয়। শশি কাঁদে। চোখে জল নে বলে, ‘আমি বুঝতে পারিনি ভূজঙ্গ সোহাগির যে চুলের প্রতি এত টান ছিল। ও তো আমার ঝি ছিল নে। বন্ধু হয়ে গেছিল। আমার বাপের গ্রামের মেয়ে। তাই সুখ দুঃখের কথা কইতো। বলতো আমার এ চুল সাবুর বাপের খুব পছন্দের জানো ঠাকুরুণ। তা চুল তো তোর মাথায় গজাতো। এ কাজ কেউ করে!’
গ্রামের লোক একে অপরকে বলতে থাকে সত্যি তো এমন বোকার হদ্দ কেউ হয়। কিন্তু একে অপঘাতে তায় কতক্ষণের বাসি মরা কেউ জানে না। তাই আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না, গ্রামের বয়স্কমানুষেরা বলতে থাকে। ঠিক সে সময় গঙ্গার হাত ধরে রামতনু এসে হাজির হয়। গঙ্গা তাকে ইচ্ছা করেই এনেছে। রামতনু ক্ষীণ গলায় বলে, এতো গোল কিসের?’
শশীর মাথার ভেতরটা দপদপ করে ওঠে। সবার সামনেই সে স্বামীকে প্রায় জড়িয়ে ধরে বলে, ‘তুমি এই শরীরে এখানে কেন? চলো ঘরে চলো’। গঙ্গাকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘আর দেরী করো না বাবাজীবন। যা করবার তুমিই করো। আর একখানা ছোট্ট শরীর ভিড়ের মাঝে কখন এসে দাঁড়িয়েছে কেউ দেখেনি। সে হল টগরমণি। তারই প্রথম মনে হয়, ‘এ বাবা চুলের জন্য কেউ মরে নাকি! কি বোকা সাবুরমা পিসিটা। ইস সাবুটার কি হবে!’
রামতনুকে একপ্রকার পাঁজাকোলা করে ঘরে এনে ঘুম হওয়ার জড়িবুটি খাইয়ে দেয় শশি। রামতনু বারবার জিজ্ঞাসা করে, ‘শশী, সাবুর মা কি মরে গেছে? গঙ্গা কি সব বলছিল?’
রামতনুর হিসাবটা পড়ে মেটাবে শশি। এই ভেবে সে রামতনুকে বিছানায় শুইয়ে টগরকে খুঁজতে বাইরে আসে।

ভূজঙ্গের ফিরে আসা যেমন নাটকীয় ততোধিক নাটকীয় সোহাগী সেই যে ‘ও সাবু ও তোর বাপ রে’ বলে ঘরে দোর দিয়ে সেঁকো বিষ খেয়ে নেওয়া। এমন একটা ঘটনা ঘটবে কেউ ভাবে নি। ভেবেছিল নেড়া মাথা, সাদা থান পরা অবস্থায় সোয়ামি দেখেছে এ লজ্জা, দুঃখে বেচারি ঘরে দোর দেছে। কিন্তু সোহাগী যে অভিমান যন্ত্রণায় খানখান হয়ে গেছিল, কিছুতে সে নিজেকে আর জোড়া লাগাতে পারবে না বুঝতে পেরেছিল তাই অবলীলায় ইঁদুর, ছুঁচো মারার বিষ খেয়ে নিয়েছিল। মানুষও ভুজঙ্গকে পেয়ে কৌতূহলের পর কৌতূহল মেটাচ্ছিল। সোহাগীর এয়োতির কি জোর সেই নিয়ে লম্বা চওড়া ভাষণও দিচ্ছিল।

আর টগর সে হঠাৎ করে জড়সড় হয়ে গেছে। পুকুরপাড়ে সাবুকে খুঁজে পেয়ে তাকে নিয়ে এ বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে নদীর কাছে জল টুসটুসে জামরুল গাছতলায় গিয়ে বসেছে। সাবু দু’হাঁটুতে মুখ গুঁজে সমানে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। টগর নিজেও খুব ভয় পেয়ে গেছে। তার বাপও যে ঐভাবে মরেছিল তা সে জানে না। তার সারা শরীর কাঁপছে। জ্বরজ্বর ভাব। তবু সাবুকে ছেড়ে সে যায় না। সাবু কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘তুমি দেকো ছোট্‌ ঠাকুরুন আমি ঐ ভুজঙ্গের গুলতি দে মাথা না ফাটিয়েছি তো আমার নাম সাবু না’।
টগর ছোটো। তবু সে বলে, ‘ছিঃ সাবু। ঐ লোকটা তোমার বাপ। ওভাবে বলে না’।
সাবু বলে, ‘ঐ লোকটার পক্ষি নে তুমি কথা বলছ ছোট ঠাকুরুন!’
টগর বলে, ‘না সাবু, আমি তোমার বাপের হয়ে কথা বলচি না। কিন্তু সে তো তোমার বাপ’।
কথাটা সাবুর মনঃপুত হয় নি। সে মুখ গোঁজ করে বসে। দু’হাঁটুর ভেতর মুখ গুঁজে মাটির ঢেলা ভাঙে। হঠাৎ করে দূর থেকে হরিধ্বনি ভেসে আসে – বলহরি হরিবোল। বলহরি হরিবোল। বুকের ভেতর থেকে মর্মভেদী আর্তনাদ করে ওঠে সাবু, ‘ও ছোট্‌ ঠাকুরুন ওরা মা’রে নে যাচ্ছে’।
টগরও কেঁদে ফেলে। কোত্থেকে বাতাসে ভর করে রামতনুর একজন লেঠেল এসে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সাবুর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলে, ‘এই ছোড়া তুকে লোকে খুঁজে খুঁজে হন্যে আর তুই এখানে বসে আছিস? চ’ বলি তুর মার মুখে আগুন দেবে কেডা, আমি?’
মুহূর্তে দপ করে আলেয়ার মতো জ্বলে ওঠে টগরমনি, ‘খপরদার। ঐভাবে সাবুর হাত ধরে টানতেছো কেন?’
ঐটুকু বাচ্চা মেয়ের গলায় বাঘিনীর তেজ দেখে ঘাবড়ে যায় পাহাড়ের মতো লেঠেল লোকটা। ভয়ে তাড়াতাড়ি সাবুর হাত ছেড়ে দিয়ে বোকার মতো হেসে বলে, ‘পেন্নাম হই ছোট্‌ ঠাকুরুন’।
টগর বেশ শশীর কায়দায় বলে, ‘যাও সাবু, গে মায়ের মুখে আগুন দে এসো। তোমার আগুন না পেলে তো পিসি স্বগ্‌গে যেতি পারবে নি’।
সাবু হঠাৎ করে মায়ের শোক ভুলে হা করে তাকিয়ে থাকে তার এই ছোট্‌ ঠাকুরুনটির দিকে। গতকাল রাতে শশী সাবুর গায়ে চাদর আর মাথায় বালিশ দিয়ে যে গোলামত্বের বীজ বুনেছিল, আজ টগরের আচরণে তা মাটির তলা ফাটিয়ে অনেকদূর প্রথিত হয়। দূর – অদূরের বাদাভূমি, নোনাজল, পাখ-পাখালি সবাই বুঝতে পারে যেন এ লাটের আগামী শাসনকর্তীকে। সাবু উঠে চোখ মুছে শ্মশানের দিকে পা বাড়ায়। (ক্রমশ)




১৯

ঠিক হয়েছিল পূর্ণিমার দিন রাধামাধবের নামে সিন্নি চড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তার অনেক বেশি আয়োজনই এই ক’দিনের মধ্যে হয়েছে। তা হচ্ছে খিচুড়ি আর লাবড়া। গ্রামের জোয়ান মদ্দ সব মিলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল-ডাল আনাজপাতির বন্দোবস্ত করেছে। এছাড়াও কলাটা, মুলোটা যে যার জমির নিয়ে এসে কমলার উঠোনে ডাই করে রাখছে। বদুর আনা মর্তমান কলায় সিন্নি চড়বে, এটা শুনে বদুর যেন আনন্দে একটা লেজ গজিয়ে গেছে। সে পেল্লাই সাইজের দুটো কুমড়ো নিয়ে এসে হলুদ দাঁত দেখিয়ে বলে, ‘মা জননী এই কুমড়ো দুখানা আমার পোঁতা গাছের’।
কমলা হাসে। বদু ধন্য হয়।
কমলা বলে, ‘তুমি এত কিছু কেন আনো বদু। সেদিন ঘোষাল মশাই বলছিল তোমার নাকি দাহকাজে আর তেমন মন নেই। দিনরাত যদি শ্মশান ছেড়ে এদিকে পড়ে থাকো তোমার চলবে কি করে’।
ঘাড় নাড়ে বদু, ‘হ। কিন্তু উ কাজ আমার ভালো লাগতেছে না আর। একবেলা খেতি না পেলেও শান্তি কিন্তু মড়া ঘাটতে আর ভাল লাগে না। মানষে বড়ো ঠুকরায়। ঘেন্যা করে। আর তাছাড়া আমি ইদিক পানে না থাকলে যদি ঐ ……………………’। থেমে যায় বদু। ভয় কাজ করে। মা জননী যদি রেগে যায়, তাই ঠোঁটের ডগায় এসেও চোরটার কথা বলা হয় না।
কমলা শুধোয়, ‘তাছাড়া তুমি ইদিকে না থাকলে কি বদু?’
বদু ঘাড় নাড়ে, ‘না কিছু না’।
কমলা বোঝায়, ‘মানুষ দাহ করা কোনও ছোটো কাজ না বদু। তুমি তো ঐ মরা মানুষগুলোর সদ্গতি করছ। সগ্গে যাওয়ার পথ করে দিচ্ছ। আত্মা মানুষের দেহ ছেড়ে চলে গেলেই তো তার মুক্তি ঘটে না বদু। যতক্ষণ না এ দেহ পঞ্চভূতে মেশে। তাই তুমি বড়ো পুণ্যির কাজ করছ বাবা’।
বদু বাবার জন্মে এমন কথা কারও কাছে শোনে নি। তার হা মুখ আর বন্ধই হতে চায় না। স্বয়ং মা জননী বলছে বদু চাঁড়াল অচ্ছুৎ নয়। বদুর কাজ ঘেন্যার নয়। পুণ্যির কাজ।
কমলা বলে, ‘আমি মলে পড়েও তো তোমাকেই এ দেহ আগুনে পোড়াতে হবে বাপ’।
না কক্ষনও না। বদু দু’হাতে মুখ চাপে। কাঁদতে কাঁদতে উঠে পালায়।
কমলা নিজের কথা, আচরণে নিজেই অবাক হয়ে যায়। কবে শিখল সে এমনভাবে কথা বলা। ভাবতে শেখা। তবে কি সত্যি সত্যি সেই কুচুটে, মুখরা, দজ্জাল কমলার মৃত্যু ঘটেছে। কমলার নিজের ভেতর নিজে দেবীবোধে নিজেই চমৎকৃত হয়। সে স্পষ্ট শুনতে পায় ঐ তো কারা যেন জয়ধ্বনি দিচ্ছে জয় কমলা দেবী মায়ের জয়।

কমলার ঘরবাড়িতে সংকুলান হয় না। আশপাশের বাড়িতেও পাত পড়ছে। আর সে কি খিচুড়ির সোয়াদ। অমৃত। আর সে হবে না টাই বা কেন। খিচুড়ি রেঁধেছে স্বয়ং কমলা। কমলার প্রায় বয়ে যাওয়া ছেলেদুটো আজ রাজার দুলাল হয়ে এর ওর কোলে চড়ে বেড়াচ্ছে। শঙ্করী যোগেনকে দিয়ে হাটের থেকে ছেলেদের জন্য নতুন জামা প্যান্ট কিনিয়ে আনিয়েছে। শঙ্করীর তীক্ষ্ণ নজর সেদিকে। পুজো আচ্চা প্রসাদ বিতরণ, খিচুড়ি ভোগ সব খাওয়াদাওয়ার পর কমলা বলেছে, তার একটা নিবেদন আছে। গ্রামের সবাই যেন দয়া করে থাকে। এ কথা শোনার পর থেকে ফিসফাস গুঞ্জন চলছে। কমলা মায়ের ঘোষণা মানে নিশ্চয়ই আবার এমন খিচুড়ি ভোজের দিনক্ষণ ঠিক হবে। যোগেন আজকে যেন কোনোভাবেই কমলার নাগাল পাচ্ছে না। বৌঠান কি এমন বলবে যা যোগেনেরও অজানা। অবলা মেয়েমানুষ। কি বলতে কি বলবে। একটা বার যোগেনের সঙ্গে আলোচনা করে নিলে কী হত? যোগেন কি বাধা দিত? সে কি মহিম গত হওয়ার পর থেকে কমলার কোনও কাজে বাধা দিয়েছে? আর তখনই নজরে আসে বদু চাঁড়াল কমলার দেওয়া মহিমের ধুতিপাঞ্জাবি পিরান চাপিয়ে মাথায় এক গাবলা তেল মেখে শূন্য কাঁঠাল গাছের গুঁড়িটার কাছে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যোগেনের সেদিকে চোখ পড়তেই বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে ওঠে। মহিম না থেকেও প্রচ্ছন্নভাবে যেন রয়ে গেছে। যোগেন দূর থেকে বদুকে দেখে হন্তদন্ত হয়ে কমলার কাছে এসে হাজির হয়। বেশ রোষের সঙ্গে চাপাস্বরে বলে, ‘তোমার বলিহারি আক্কেল বৌঠান, দেখো এখন নিজের চোখেই দেখো। চাঁড়ালটা মহিমের পোশাক পরে কেমন বাবু সেজে এসেছে। লাই দিয়ে দিয়ে কোথায় তুলেছ দেখো’।
কমলা চুপ করে থাকে। এবং এই প্রথম মনে হয় যোগেন যেন দিনদিন তার গলার ফাঁস হয়ে উঠছে। কিন্তু কমলা এখন আর তার আগের জীবনে ফিরে যেতে চায় না। সে ক্রমশ দেবীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে চলেছে। আর আজ বিশেষত তার জীবনে একটা বিশেষ দিন। এই দিনটাকে সে কোনমতে হেলায় নষ্ট করতে চায় না। ঘোষালমশাই আজকের দিনের জন্য কমলার জন্য বসিরহাট থেকে নতুন সাদা থান এনে দিয়েছে। সেই কাকভোরে স্নান সেরে সেখানাই পরেছে কমলা। মানী লোকের মান দিতে হয়। তাছাড়া ঘোষালমশাইও এখন আর শুধু চালকলার পুরোহিত না। কমলার সাথে তারও জীবনে পদমর্যাদা ঘটেছে। এছাড়া উনি কমলাকে সত্যিকারের স্নেহ করেন।
ঘোমটা টেনে মুচকি হেসে বদুর দিকেই পা বাড়ায় কমলা। যোগেনের ইচ্ছা করছিল কমলার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে রেখে দেয়। কেন যে কমলা বৌঠান ঐ ছোটলোক, চামার ডোমটাকে এত প্রশ্রয় দেয়!
কমলা বদুর সামনে গিয়ে দাঁড়ালে বদুর মুখে শিশুর মতো সারল্যের হাসি খেলে। সে ভুঁইয়ের দিকে চোখ আনত করে। কমলা বলে, ‘বাঃ বদু, ঠাকুরের পোশাক পরে তোকে বেশ খোলতাই লাগছে’।
কমলা হঠাৎ করে বদুকে ‘তুই’ করে কেন বলে জানে না। হয়তো বদুর সারল্যে তার কাছে সন্তান জ্ঞানেরই উদয় হয়। বদু দূরত্ব রেখে মাটিতে মাথা ঠুকে প্রণাম করে কমলাকে। তারপর ফস করে বলে ওঠে, ‘মা তোমার জন্য আমার খুব ভয় করে’।
কমলার কপালে ভাঁজ পড়ে, ‘ভয়! কেন বদু?’
বদু চোখ বড়ো বড়ো করে বলে, ‘ঐ যে চোরটা .........’।
কথা শেষ হয় না। ঘোষালমশাই এসে বলে, ‘মা গো তুমি ইখানে, গ্রামের মুরুব্বিরা সব এয়ে পড়েছেন, প্রসাদও নিয়েছেন। এবার তুমি যদি তোমার কি কাজের কথা আছে বলো ভালো হয়’। তারপর বদুর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বদু নাকি? ......... আজ সব ব্রাহ্মণেরা এখানে আছেন, তুই উদিকটায় যাস না যেন’।
বদু মাথা নাড়ে। কমলা ঘোষালমশাইয়ের পিছুপিছু আসে।

শতরঞ্চি পেতে বসার জায়গা হয়েছে উঠোনে। একদিকে পুরুষেরা অন্যদিকে মেয়েরা। কচিকাঁচারাও আছে। মেয়েদের প্রথম সারিতে শঙ্করী বসে আছে। তার দুপাশে লবকুশ। কমলা নিজের ছেলে দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এরা আর কমলাকে মা বলেই ভাবে না। শিশুমন যেখানে ভালোবাসা যত্নআত্তি পাবে সেখানটাই ওদের আপন হয়ে উঠবে। তাই শঙ্করী ওদের আপন। শঙ্করী ওদের ছোটো মা। চোখদুটো ভিজে উঠে ঝাপসা হয়ে আসে। মাথার ঘোমটাটা ভালো করে টেনে নেয়। উপস্থিত জনতা আর ধৈর্য্য রাখতে পারছে না। উত্তেজনায় ছটফট করছে। ফিসফাস তো চলছেই। সভাটার বেশ দূরে বদু দাঁড়িয়ে। হঠাৎ যোগেন এসে মাতব্বরের ভূমিকা নেয়।
বেশ যাত্রার ঢঙে বলে, ‘বৌঠান আজ আপনাদের কাছে বিশেষ কিছু ঘোষণা করবেন’।
কি সেই বিশেষ ঘোষণা তা শোনবার জন্যই তো সবাই উদগ্রীব হয়ে আছে। কমলা হাতজোড় করে দাঁড়ায়। হঠাৎ কেমন ভয় ভয় আর শীত শীত করে। পারবে তো সে স্বপ্নকে সাকার করতে।
ভট্টাচার্যী মশাই বলেন, ‘বলো মা, বেলা পড়ে আসছে’।
কমলা বলে, ‘আজ্ঞে আপনারা যদি অভয় দেন তাহলে একটা নিবেদন ছিল’।
সমস্বরে রব ওঠে, ‘বলো মা, বলো কোনও ভয় নেই’।

এ কমলাকে চেনে না যোগেন। তাই তেরচা চোখে তাকায় কমলার দিকে। কমলা যেখানে সেই কাঁঠাল গাছটি ছিল সেখানে তাকায়। সেখানে একরাশ শূন্যতা। সেই শূন্যতাকে ভেদ করে আরও অদূরে দৃষ্টি রাখে কমলা। বলে, ‘আমি আমার বাড়ির পেছনের জমিতে একটা পুকুর খুঁড়তে চাই। আর তা যদি শানবাঁধানো হয় তো কথাই নেই। প্রথম যেদিন মাটিতে কোদালের কোপ পড়বে সেদিন আশপাশ গাঁয়ের মানুষকে আগে থেকে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে নিমন্ত্রণ দিয়ে আসা হবে। জিলাপি, পাঁপরভাজা, ছোটো ছেলেমেয়ের খেলনা দিয়ে শুরু হোক। তারপর ফি বছর ঐ সময় মেলা বসতে বসতে সক্কলে আমাদের রাধামাধবের কথা জেনে যাবে’।
এমন একটা প্রস্তাবে সত্যি বলতে মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। তারা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। কমলা মুচকি হেসে বলে, ‘আমার আর একখানা কথা ছিল’।
ঘোষাল মশাই বড়ো আকুতি নিয়ে বলে, 'বলো মা, বলো’।
কমলা বলে, ‘এই আপনেরা যেখানে বসেছেন সেখানে এট্টা নাটমন্দির যদি হয়। আপনেরা মানী মুরুব্বী মানুষ খোলা উঠোনে বসেন, সে ভারী খারাপ লাগে আমার’।
সবার মুখে রামধনুর ছটা খেলে যায়।
কমলা বলে, ‘আর............’।
ফস করে যোগেন বলে ওঠে, ‘আবার কি?’
ভট্টাচার্যী মশাই রেগে গিয়ে বলেন, ‘আঃ যোগেন তুমি আজকাল বড়ো কথা বলো। মা’কে বলতে দাও...'।
অপমানে যোগেনের কানের লতি গরম হয়ে ওঠে। কমলার সত্যি সত্যি এবার দুচোখ জলে ভরে যায়, ‘সে এখন না হোক কোনও এক সময় রাধামাধবের মূর্তি যদি পাথরের বানানো যায়, কিন্তু সে তো আমার পক্ষে সম্ভব না। তাই গ্রামের সক্কলে যদি প্রতি মাসে সামর্থ্য মতো মন্দিরে দান করেন এ স্বপ্ন সফল হয়’।
সকলে কমলাকে সাধু সাধু করতে লাগে। শঙ্করীর গর্বে বুকটা টইটুম্বুর হয়ে উঠলেও যোগেনের ভেতর চিনচিনে ঈর্ষার অনুভূতি মাথাচাড়া দেয়। এতো বড়ো কর্মযজ্ঞে কমলা বৌঠান কি তার নাম ধরে একবারও বলতে পারলো না কোনও কথা। সেই তো সবকিছু যোগেনকেই সামলাতে হবে।
কমলা এবার বলে ওঠে, ‘তালে ঘোষাল মশাই যোগেন ঠাকুরপোকে সঙ্গে নে আপনেরা ঠিক করে নেন কে কোন দায়িত্ব পালন করবেন’।
আর বদু জারুল গাছের পেছন থেকে মুখ বার করে।
কমলা হেসে বলে, ‘কাল থেকেই গ্রামে গ্রামে ঢ্যাঁড়া চাড়িয়ে দাও। ও আগামী পয়লা আষাঢ় যদি পুকুর কাটার দিন ঠিক হয়?’
ঘোষাল মশাই বলে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো বড়ো পুণ্যির দিন, রথযাত্রা’।
বদু গগন ফাটানো চীৎকার করে ওঠে, ‘জয় কমলা মায়ের জয় ..................’। (ক্রমশ)



২০

রোজিপুর গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপটায় আজ লোক থৈথৈ করছে। সবারই বুকে একরাশ উৎসাহ। নতুন উদ্যমে নতুন কিছু করবার বাসনায় ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্য টগবগ করে ফুটছে। কিন্তু শর্ষের মধ্যেও ভূত থাকার মতো সুখেন দত্তর লোকও আছে সেই ভিড়ে। আর মিটিঙে কি হয় তা জানতে সুখেন তাকে পাঠিয়েছে। পায়ে পায়ে কালু বাউরির দলও এসে দাঁড়িয়েছে চণ্ডীমণ্ডপের এক কোণে। কলকাতায় পাল্কী নিয়ে চলবার সময় মাঝে মাঝে মিটিং মিছিল চোখে পড়ে। গোরা সেপাইয়ের তাড়া খেয়ে ছুটে পালাতেও দেখেছে মানুষকে। কিন্তু এমন জলা জঙ্গলের দেশে এমন অভিনব ব্যাপার তারা ভাবতেই পারে না।
বিজয় এসে চণ্ডীমণ্ডপে দাঁড়ালে যেন চারদিকে সূর্যের ছটা ছড়িয়ে পড়ে। বিজয় এসে চণ্ডীমণ্ডপে প্রণাম করে উদাত্ত কণ্ঠে বলে, ‘ভাইসব, এখানে আমরা অকারণ সময় নষ্ট করতে আসিনি। এখন আমাদের যে যার রুটিরুজির পেছনে ছোটার সময়। কিন্তু এখন আমরা এক কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে পথ ছুটছি। বিভিন্ন জায়গায় রায়ত চাষিরা সংঘবদ্ধ হয়ে বিভিন্নভাবে জমিদার জোতদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। সেই তুলনায় আমাদের এই লাটের অঞ্চলে আমরা সবাই পিছিয়ে আছি। ওদিকে বসিরহাট, দন্ডীরহাট, বাগুন্ডি, সোলাদানায় নীলকর সাহেবরা জাঁকিয়ে বসেছে। সাদা বাঁদরে আমাদের রক্ত চুষে খাচ্ছে। এইসব লাট অঞ্চলে যারা ভূস্বামী নিজনিজ এলাকায় জমিদার সেজে বসে আছে সাধারণ মানুষের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে তারা সাধারণ মানুষের ভালোমন্দ দেখে না। যে যার আখের গোছাতে ব্যস্ত। এইসব জমিদাররা পাষাণ। এরা এতটাই পাষাণ যে এই পাষাণ গলে না। পাষাণ একমাত্র আছড়ে দিলে ভাঙে। আমাদের ঠিক সেই কাজটাই করতে হবে। ওদের আছড়ে ফেলতে হবে। ভেঙে দিতে হবে ওদের মেরুদণ্ড’।
নতুন ঠাকুরটির এমন কথাতে কালুর গায়ের রক্ত গরম হয়ে রোম খাড়া দিয়ে ওঠে। তার অনেক দিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে পারে এমন স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে কালু। তার তেল চুকচুকে গরাণ গাছের লাঠিটা দিয়ে দেবে মাথাটা দু ফাঁক করে কোনও এক গোরা সাহেবের।
বিজয় বলে, ‘সেইজন্য আমাদের এক হতে হবে। কথায় বলে না, দশের লাঠি একের বোঝা। গড়ে তুলতে হবে আমাদের ধর্মগোলা। সেই সুদূর স্কটল্যান্ড থেকে স্যার ডানিয়েল হ্যামিলটন সাহেব এসে আমাদের দেশে এই প্রথার প্রচলন করলেন। আর আমরা চুপ করে বসে আছি। এই চণ্ডীমণ্ডপের দেবোত্তর জমিতেই গড়ে উঠবে আমাদের ধর্মগোলা। ধান ওঠার পর প্রত্যেকে তার ধানের পরিমাণ অনুযায়ী সামান্য কিছু ধান এই গোলায় জমা রাখবে। তারপর অভাবের সময় খুব অল্প সুদে আমরা এই গোলা থেকে ধান কর্জ পাব। যে সুদের টাকা আমাদের জমবে তা মূলধন করে কিছুদিন পর থেকে আমরা অনেক ভালো কাজ করতে পারবো। পাঠশালার উন্নতি, চিকিৎসার উন্নতি, গ্রামের মেয়ের বিয়েতে প্রয়োজনে সেই পরিবারকে কর্জ দেওয়া বা পরিস্থিতি বুঝে সাহায্য করা। অনেক অনেক কিছু’।
বিজয়ের চোখের সামনে স্বপ্নগুলো জীবন্ত টগবগ করে ফোটে। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে বড়ো বড়ো চোখ মেলে পানপাতা মুখটাকে না দেখতে পেয়ে বুকটা ভারী টাটায়।
বিজয় বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করে, ‘বন্ধুগণ, আপনারা সবাই আমার সাথে বলুন - বাজে আদায় দেব না, খামার ছিলানী দেব না, দরোয়ানী দেব না, ভাগ সেলামী দেব না। এই রোজিপুরের ধর্মগোলা তোমার আমার সবার গোলা’।
শতশত মানুষ আবালবৃদ্ধবনিতা বিজয়ের কণ্ঠে কণ্ঠ মেলায়। অদ্ভুতভাবে কালুও বিড়বিড় করে, ‘এ ধর্মগোলা তোমার আমার সবার গোলা’।

বাবা চলে যাওয়ার পর আন্না সেই যে ঘরে এসে বিছানায় মুখ গোঁজ করে শুয়েছে আর ওঠে নি। তার সাধের পাখিটাকেও কাঁচা লঙ্কা খাওয়ায় নি। গোপালী মাঝে ডাকতে এসেছিল, ‘কিরে চ, ঐদিকি যে মিটিন শুরু হয়ি গেল। মামা আজ অনেককিছু বলবে’।
গোপালীকে বলে দিয়েছে, 'তুই যা আমার শরীর ভালো নেই। তাছাড়া বাবা ওখানে কি বলবে আমি পরে শুনে নেবখন'।
এমন একটা দিনে যেখানে গাঁয়ের সকল মানুষ হাজির, সেখানে আন্না যেতে পারবে না। তাও কেন যেতে পারবে না, শেখর চায় না বলে। আন্নার ভেতর রাগ, দুঃখ, অভিমানের ঘূর্ণি পাক খেতে থাকে। কে এই শেখর? কদিন আগেও যার নাম ভিন্ন চেহারাটাও চিনতো না। সে এখন থেকে যা বলবে আন্নাকে মেনে নিতে হবে। আন্না তো শুনেছে শেখর নাকি আবার বিয়ে করেছে এবং সেই বিয়ের দিনই সে নদী সাঁতরে পালিয়ে এসেছে। আর এখানে এসেই .................। আন্নাকে থামতে হয়। তার রাগক্রোধে লাগাম পরাতে হয়। কেন সে প্রাণের ঝুঁকি নে ঐভাবে আসবে। সেতো আন্নার জন্যই। আন্নাকে ভালোবাসে বলেই। তবু বাবার অত লোকের সামনে নিজের মুখে বলা কথাগুলো শুনতে পারলো না বলে আফসোসের শেষ নেই।
তবে বৈঁচির কাছে মেয়ের এ হেন আচরণ চরম অসভ্যতা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। বৈঁচির সব রাগ গিয়ে পড়ে বিজয়ের উপর। তার আশকারাতেই মেয়ের আজ এই অবস্থা। ছিছি শেখর কি ভাবছে। তার মধ্যে হতচ্ছাড়া বেয়াড়াগুলো এদ্দিন ও বাড়িতে থেকে আবার এখানে তাদের ‘বাবুমশাই’কে দেখতে এসেছে। যত্তসব ন্যাকামো। এখন যদি কোনও কারণে আন্নার এ হেন আচরণে শেখরের মন ঘুরে যায়। সে যদি ঐ নতুন বিয়ে করা বৌয়ের কাছে ফিরে যেতে চায়। অজানা শঙ্কায় মায়ের বুক ঢিপঢিপ করে। ইচ্ছে করে গিয়ে মেয়ের নুড়ো ধরে দেয় ঘা কতক কষিয়ে।
মিটিং শেষে কালু আর তার দলবল উঠোনে কলাপাতায় পাত পেড়ে হাপুস হুপুস করে খায় ভাত, কলাইয়ের ডাল, মুলোর বড়ি ভাজা, ঘ্যাঁট, কাতলা মাছের ঝোল, মৌরলা মাছের টক দিয়ে। মঙ্গলা খেতে দিলেও বৈঁচি আড়ালে দাঁড়িয়ে, ‘আর চাড্ডি নেও’ বলে তত্ত্বাবধান করেছে। লোকগুলো ভবানিপুর থেকে এসেছে বলে অসহ্য লাগছে ঠিকই কিন্তু খেতে দিতে কাউকে অচ্ছেদ্দা করতে নেই এ বৈঁচির সহজাত শিক্ষা। বিজয় এসেও বলে গেছে, ‘তোমরা যেন কেউ লজ্জা করে খেও না। যা লাগবে চেয়ে নেবে। মঙ্গলা সবাইকে আর এক পিস করে মাছ দে’।
গোপালী, ভজ, আন্না এক পাতে খেয়েছে। তবে মঙ্গলাকে বলে বলেও খাওয়ানো যায় নি। সে বলেছে, ‘বেলা গেছে, এখন খেলে আই ঢাই করবে’। বৈঁচি তাকে নানারকম জিনিস দিয়ে ছ্যাদা বেঁধে দিয়েছে।

বিজয় ফিরে আসবার পরেও গ্রামের কিছু মানুষজনের আনাগোনা চলতেই থাকে। প্রথম কাজ হচ্ছে ধানের গোলা তৈরি করা। তারপর তো ধান রাখার কথা। বিজয় বলে, ‘বেশ একটা শুভদিন দেখে গোলা তৈরির কাজে হাত দিয়ে দাও’।
এদিকে আন্নার আজ মান হয়েছে অথচ শেখর তাকে একটুও সোহাগ করে মান ভাঙাতে এলো না এটা আন্নার কাছে আরও যন্ত্রণার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কেঁদে কেঁদে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। গ্রামে এত বড়ো একটা কাণ্ড হতে চলেছে। ধর্মগোলা স্থাপন। আর সে কিনা সেখানটায় একটু যেতে পর্যন্ত পারলো না। আর বাবাই বা কেমন আচরণ করলো, শেখরের পছন্দ অপছন্দেই সায় দিল। আন্নার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোনও দামই নেই বিজয়ের কাছে। কে এই শেখর? কদিন আগেও এর অস্তিত্ব কোথায় ছিল। আন্নাই তো ছিল বিজয়ের সব। গোরা সেপাইদের হাত থেকে সেই তো কালো মিশমিশে হিমশীতল যন্ত্র রিভলবারটাকে তার চুলের খোঁপার মাঝে লুকিয়ে রেখেছিল। মা পর্যন্ত জানে না ব্যাপারটা।

এদিকে শেখরের মন প্রাণ অন্তরাত্মা সব যেন একসঙ্গে গুটিয়ে গেছে। এখানে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। জন্ম ইস্তক সে তাদের বাড়িতে গোরাদের সাথে সখ্যতাই দেখে আসছে। এসব তার একদম ভালো লাগে না। এবং অদ্ভুতভাবেই এই একটা ঘটনাই নববধূটির প্রতি শরীর মনের সকল আকর্ষণকে উল্টোবাগে নিয়ে যায়। ভবানিপুর ফেরার রাস্তা নিজে হাতেই বন্ধ করে এসেছে। তাহলে সে যাবে কোথায়! মাথার ভেতর অজস্র চিন্তারা ঢালাউপুর হতে হতে একটা সিদ্ধান্তে স্থির হয়। তাহল বিমানের কাছে ফিরে যাওয়া। এতদিন পরে তার মনে হয় সে কলেজের পড়ায় অনেক পিছিয়ে গেছে। তার বইপত্তর, তার ফেলে আসা জীবন, কলকাতা শহর তাকে প্রবলভাবে হাতছানি দিয়ে ডাকে। ফেলে আসা জীবন, মেস বাড়ি, মেস বাড়ির রান্নার ঠাকুর, এমন কি তাদের মেস বাড়ির উচ্ছিষ্টে লালনপালন হওয়া ভুলুর কথাও। মনের গতি আলোর থেকেও বেশী। তাই ধরতে গেলে পৌঁছেই যায় হেদুয়ার পাশে মেস বাড়িটিতে। তার উপর কালুদের এখানে উপস্থিতি তাকে বিহ্বল করে দেয়। কেননা এই কালুদের সাথেই সে কলকাতা থেকে এসেছিল ভবানিপুরে। আবার ফিরে গেলেও তো হয়। মনের ভিতর ডানা ঝাঁপটায় খাঁচায় থাকা পাখি। আন্নার প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য নিয়েও মনের ভেতর বিন্দুমাত্র দোলাচল সৃষ্টি করে না। আর টগর, তাকে তো সেই বিয়ের রাতেই ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে এসেছে। তাহলে সেই হাতে রইল পাঁচের মতো কলকাতা শহর আর তার মেস বাড়ি। কলেজের পড়াশোনা সবকিছু তাকে যেন আকুল হয়ে ডাকছে।

বিজয়েরও মন ভালো নেই। কেন জানি তার বারবার মনে হচ্ছে শেখর ফিরে না এলেই ভালো হত। আন্না তার শুধু মেয়ে ছিল না। ছিল একটা স্বপ্ন। নিজের হাতে নিজের স্বপ্নের এইভাবে গলা টিপে মারতে কার ভালো লাগে। বৈঁচিও কেমন যেন অস্থির অস্থির হয়ে আছে। তার ভেতর কেবলই কু ডাকছে। কি দরকার ছিল ঐ বেয়াড়াগুলোর ফিরে আসা। মানুষের মন না মতি। শেখর যদি এক রাতের বিয়ে করে আসা বৌয়ের কাছে ফেরত যেতে চায় তখন আন্নার কি হবে। এসব চিন্তাভাবনায় তার পাগল পাগল লাগে।

রাতে খেতে বসে অনেক কষ্ট করেই শেখর কথাটা পাড়ে, ‘আমি বলছিলাম কি কালু কাকারা যখন আজ রয়েই গেল তাহলে আমি কাল ওদের সঙ্গেই রওনা দেই’।
শেখরের কথা শুনে বৈঁচির হাতার ডাল চলকে নীচে পড়ে। সে বলে, ‘সে কি বাবা কোথায় যেতে চাও?’
শেখর একটু ক্ষুণ্ণ মনে জানায়, ‘কোথায় আবার, কলকাতায় আমার মেস বাড়িতে। আমার কলেজের পড়াশোনা তো অনেক এগিয়ে গেছে। বিমানের সাহায্যে সেগুলো আয়ত্বে আনতে হবে’।
দরজার পাশ থেকে আন্না সব শুনছিল। এ কথায় তার মন আনন্দে ভরে ওঠে। শেখর কলকাতায় যাবে মানে তো সেও যাবে। বসিরহাট শহর ভিন্ন সে কোনদিন বারাসাতেও যায় নি। সে কারণে কলকাতার নামে তার ভেতরটা আনন্দে ছটফটিয়ে ওঠে।
বিজয় মুখের গ্রাস থামিয়ে বলে, ‘সে তো অতি উত্তম কথা। তুমি পড়াশোনায় ফিরতে চাইছ এর থেকে ভালো আর কি হতে পারে’।
বৈঁচি প্রায় ককিয়ে উঠে বলে, ‘কিন্তু আন্না! সে থাকবে কোথায়। তুমি তো মেস বাড়িতে উঠবে। সেখানে কি বউ নিয়ে যাওয়া যায়? বাসা ভাড়া করে আন্নার বাবা তোমাদের দুটিকে রেখে আসবে। দরকার হলে আমিও যাব। মেয়ের সংসার গুছিয়ে দিয়ে আসবো’।
শেখর মাথা নেড়ে আপত্তি জানায়, ‘না। এখন আন্নাকে নিয়ে গেলে পড়ার ক্ষতি হবে। সামনে আমার পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ হোক। আমি বাসা দেখে আপনাদের পত্র পাঠাবো’।
বিজয় নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে শেখরের দিকে। বুঝতে পারে পাখি খাঁচায় ছটফট করছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘সেই ভালো। কাল তুমি যাত্রা করো। কালুরা তোমার চেনা মানুষ। আমারও চিন্তা থাকবে না’।
কেঁদে ফেলে বৈঁচি। আন্না ঘরের কপাটের আড়ালে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। দম বন্ধ হয়ে আসে তার।
বিজয় বলে, ‘বৈঁচির মা, যেটুকু পারো রাতের মধ্যে শেখরের জন্য তা গোছগাছ করে দাও’।

অদ্ভুত একটা বিনিদ্র রজনী এই পরিবারের সকলের কাটে। শেখর হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিল আন্নাকে। কিন্তু আন্না কপট ঘুমের দেশে তলিয়ে থাকে। বুকের ভেতর তালগোল পাকানো নাম না জানা কষ্টটা বারবার ছিটকে বেড়িয়ে আসতে চায়। বিজয় আর বৈঁচি দুজনেই একই কথা সারারাত ধরে ভাবে। সত্যি কি যা নিজের সবটা নয় তা এভাবে ভোগ করা যায় না। শুধু কালুদের ঘুম হয় ভালো। এই লাটের দেশে এমন সম্মান আতিথেয়তা তারা জন্মেও আশা করে নি। পরদিন আক্ষরিক অর্থেই এই জলাজঙ্গলের দেশে নতুন একটি সূর্যোদয় হতে চলেছে।

(প্রথম খণ্ড সমাপ্ত)



5383 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 14 -- 33
Avatar: অসীম বসাক

Re: যোজনগন্ধা

অসাধারণ লাগছে। যেন কোনও অতীত ভারতবর্ষে হারিয়ে যাচ্ছি।
Avatar: de

Re: যোজনগন্ধা

খুব ভালো হচ্ছে -
Avatar: de

Re: যোজনগন্ধা

অপূর্ব!
Avatar: pi

Re: যোজনগন্ধা

কই ? কই ?
Avatar: শঙ্খ

Re: যোজনগন্ধা

পড়ছি। খুব ভালো লাগছে।
আচ্ছা, একটা প্রশ্ন, যে সময়ের গল্প, সে সময়ে গ্রামের মানুষ (মহিম) আন্ডারওয়ার পরতো? এই জায়গাটা খুব বিশ্বাসযোগ্য ঠেকলো না।
Avatar: স্বাতী রায়

Re: যোজনগন্ধা

পরের অংশ জলদি আসুক, জলদি -
Avatar: সুন্দর

Re: যোজনগন্ধা

সুন্দর, মায়া জড়ান
Avatar: aasha

Re: যোজনগন্ধা

একদিন জীবনে তন্বীর সাথে আলাপ হবে
Avatar: Tanwi,. Halder

Re: যোজনগন্ধা

নিশ্চয়ই আলাপ হবে। তবে আপনারা যারা পড়ছেন অন্যকে ও পড়তে বলবেন এবং মতামত দেবেন। পাঠক ই আমার সব
Avatar: kumu

Re: যোজনগন্ধা

খুব ভাল লাগছে।প্রতিটি চরিত্রের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে,ছাঁচে ঢালা নয়-এটা প্রশংসনীয়।আন্নার মুখের ভাষা,মাঝে মাঝে বেশ লম্বা বাক্যে কথা বলা তাকে আলাদা করে তুলেছে।
একটি প্রশ্ন-"শেখর কালু ও তার দলবল নিয়ে রওনা দেয়।" শেখর বাড়ি ফিরে গেল?
Avatar: তন্বী হালদার

Re: যোজনগন্ধা

আপনি আপনারা যে মন দিয়ে যোজনগন্ধা পড়ছেন তার জন্য আমি কৃতজ। পড়তে লাগুনা জানতে পারবেন শেখর কোথায় গেল। কি হবে তার,,,
Avatar: তন্বী হালদার

Re: যোজনগন্ধা

আপনি আপনারা যে মন দিয়ে যোজনগন্ধা পড়ছেন তার জন্য আমি কৃতজ। পড়তে লাগুনা জানতে পারবেন শেখর কোথায় গেল। কি হবে তার,,,
Avatar: স্বাতী রায়

Re: যোজনগন্ধা

@তন্বী হালদার খুব কৌতূহল হচ্ছে। আর একটু তাড়াতাড়ি দেওয়া যায় না ? নিদেন পক্ষে সপ্তাহে একটা করে?
Avatar: Tanwi,. Halder

Re: যোজনগন্ধা

স্বাতী আপনি পড়ছেন নিয়মিত আমি সত্যিই খুব খুশি। আসলে আমি খুব অলস তাই লেখা টাই হয় না।
Avatar: কুমু

Re: যোজনগন্ধা

রামতনুর কি সোহাগীর প্রতি ঘৃণা ছিল?
আমার বোধহয় বোঝার ভুল।হচ্ছে।
Avatar: স্বাতী রায়

Re: যোজনগন্ধা

তন্বী ম্যাডামকে এবার কিডন্যাপ করে নিয়ে গিয়ে একখান ল্যাপটপ দিয়ে একটা ঘরে বন্দী করে রাখতে হবে। শেষ না হওয়া অবধি নো ছাড়ান ছোড়ন। ৫ জুনের পরে ২৬ জুলাই - এ তো তোমার দেখা নাই রে গাইতে গাইতে গলা ভেঙ্গে গেল! ...। কমলার চরিত্রের বদলটা বেশ ইন্টারেস্টিং - যদিও পিছনের অনুপ্রেরণাটা খুব একটা স্পষ্ট হয় নি, অবশ্য হয়ত এমন গড়াতে গড়াতেও একেক দিকে চলে যাওয়া যায়।
Avatar: Kaktarua

Re: যোজনগন্ধা

আপনার সোনার কলম অক্ষয় হোক। কিকরে যেন এই টওই টা miss হয়ে গেছিলো।এক নিঃস্বাশে পড়তে গিয়ে এতটাই পুরোনো দিনে চলে গেছিলাম যে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখছি মনে হলো। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
Avatar: স্বাতী রায়

Re: যোজনগন্ধা

কিস্তিগুলো আর একটু ঘন ঘন পেলে ভালো হত!

কথাটা কি বেয়াড়া নাকি বেয়ারা ( বেহারা > বেয়ারা) ?
Avatar: স্বাতী রায়

Re: যোজনগন্ধা

এই লেখাটা কি আর আসবে।।হাঁ করে বসে আছি যে ...।
Avatar: শঙ্খ

Re: যোজনগন্ধা

বেশ। প্রথম খন্ড ভালো লাগল। বানান ভুল গুলো একটু চোখে লাগছে। পরবর্তী খন্ডের অপেক্ষায় রইলুম।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 14 -- 33


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন