RSS feed

দ'এর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • অরফ্যানগঞ্জ
    পায়ের নিচে মাটি তোলপাড় হচ্ছিল প্রফুল্লর— ভূমিকম্পর মত। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেন কেউ আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে— সেই প্রচণ্ড কাঁপুনিতে ফাটল ধরছে পথঘাট, দোকানবাজার, বহুতলে। পাতাল থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছিল। ঝোড়ো বাতাস বইছিল রেলব্রিজের দিক থেকে। প্রফুল্ল দোকান থেকে ...
  • থিম পুজো
    অনেকদিন পরে পুরনো পাড়ায় গেছিলাম। মাঝে মাঝে যাই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়। বন্ধুদের মা-বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ভাল লাগে। বেশ রিজুভিনেটিং। এবার অনেকদিন পরে গেলাম। এবার গিয়ে শুনলাম তপেস নাকি ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একটু পরে তপেসও এল ...
  • কাঁসাইয়ের সুতি খেলা
    সেকালে কাঁসাই নদীতে 'সুতি' নামের একটা খেলা প্রচলিত ছিল। মাছ ধরার অভিনব এক পদ্ধতি, বহু কাল ধরে যা চলে আসছে। আমাদের পাড়ার একাধিক লোক সুতি খেলাতে অংশ নিত। এই মৎস্যশিকার সার্বজনীন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়। মনে আছে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ...
  • শুভ বিজয়া
    আমার যে ঠাকুর-দেবতায় খুব একটা বিশ্বাস আছে, এমন নয়। শাশ্বত অবিনশ্বর আত্মাতেও নয়। এদিকে, আমার এই জীবন, এই বেঁচে থাকা, সবকিছু নিছকই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া, এমনটা সবসময় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না - জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পরিণ...
  • আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই...
    দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। দেশের সবচেয়ে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে বুয়েট। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছু বরাহ নন্দন! কাওকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কি খুব সহজ কাজ? কতটুকু জোরে মারতে হয়? একজন মানুষ পারে ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭
    চন্দ্রপুলিধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন ...
  • গুমনামিজোচ্চরফেরেব্বাজ
    #গুমনামিজোচ্চরফেরেব্...
  • হাসিমারার হাটে
    অনেকদিন আগে একবার দিন সাতেকের জন্যে ভূটান বেড়াতে যাব ঠিক করেছিলাম। কলেজ থেকে বেরিয়ে তদ্দিনে বছরখানেক চাকরি করা হয়ে গেছে। পুজোর সপ্তমীর দিন আমি, অভিজিৎ আর শুভায়ু দার্জিলিং মেল ধরলাম। শিলিগুড়ি অব্দি ট্রেন, সেখান থেকে বাসে ফুন্টসলিং। ফুন্টসলিঙে এক রাত্তির ...
  • দ্বিষো জহি
    বোধন হয়ে গেছে গতকাল। আজ ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ, সন্ধ্যাবেলায় আমন্ত্রণ ও অধিবাস। তবে আমবাঙালির মতো, আমারও এসব স্পেশিয়ালাইজড শিডিউল নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই তেমন - ছেলেবেলা থেকে আমি বুঝি দুগ্গা এসে গেছে, খুব আনন্দ হবে - এটুকুই।তা এখানে সেই আকাশ আজ। গভীর নীল - ...
  • গান্ধিজির স্বরাজ
    আমার চোখে আধুনিক ভারতের যত সমস্যা তার সবকটির মূলেই দায়ী আছে ব্রিটিশ শাসন। উদাহরণ, হাতে গরম এন আর সি নিন, প্রাক ব্রিটিশ ভারতে এরকম কোনও ইস্যুই ভাবা যেতো না। কিম্বা হিন্দু-মুসলমান, জাতিভেদ, আর্থিক বৈষম্য, জনস্ফীতি, গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অভাব, শিক্ষার অভাব ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মৌরীগন্ধি দিন

সেই যে যখন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী রোড দিয়ে টঙ টঙ ঘন্টা বাজিয়ে ট্রাম চলত ২৯ নম্বর, ৩১ নম্বর। উজ্জ্বল সবুজ গড়ের মাঠ ছুঁয়ে , গ্র্যান্ড হোটেলের সামনে বসা দোকানের ছোট ছোট দম দেওয়া গাড়ি, হাত পা ছোঁড়া পুতুল পাশ কাটিয়ে ব্রেবোর্ন রোড দিয়ে যাবার সময় বাগড়ি মার্কেটের উপচে আসা বাজির বাজারকে এক ঝলক টা টা করে হাওড়া ব্রীজ পেরিয়ে সোজা হাওড়া স্টেশান। সাবওয়ে তখনও তৈরী হচ্ছে, এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের পাশ দিয়ে সোজা ঢুকে পড়া যেত। কালীপুজো আর ভাইফোঁটার মাঝের দিনটায় ৩/ডি ইন্দ্র রায় রোডের বাড়ির খুকীর হাত ধরে, খুকীর ভাইকে কোলে নিয়ে আর একটা ব্যাগে জামাকাপড় আরো কিসব ঠেসেঠুসে খুকীর মা ঐ ট্রামের ফার্স্টক্লাসে চড়ে বসত। খুকীর তখন ট্রামের সেকেন্ড ক্লাসের দিকে ভারী কৌতুহল – সিটগুলো কেমন ন্যাড়াবোঁচা, মাথার উপরে মস্ত পাখা নেই, কেমন মনে হত ওখানে জায়গা অনেক বেশী, কিন্তু মা ভারী গম্ভীর হয়ে বলত ‘কথার অবাধ্য হবে না’। তা সেই ট্রাম আবার মাঝেমধ্যে গড়ের মাঠের পাশ দিয়ে চলতে গিয়ে একদম দাঁড়িয়ে পড়ত, কখনো বা গ্র্যান্ড হোটেলের সামনেটায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকত চুপ করে, হাওড়া পৌঁছাল হয়ত দেড় কি দুই ঘন্টা পরে। মা কিন্তু ট্রাম ছাড়া অন্য কিছুতে সহজে চড়বে না, হ্যাঁ ট্রাম যদি একদম থেমে যায় আর না যায় আর কন্ডাকটার কাকু এসে ভাড়া ফেরত দিয়ে দেয়, তাহলে মা কন্ডাকটার কাকুকেই বলত বাসে তুলে দিতে। এতসব কান্ড করেও সন্ধ্যের আগেই কোন্নগর পৌঁছে যেত ওরা।
.
সেই সময় জগুবাজারের বলরাম মল্লিক ছিল একটা ছোটমত একমেটে দোকান, যাদের লাল রসগোল্লা আর লালদই খুব পছন্দ ছিল ৩/ডি ইন্দ্র রায় রোডের বাসিন্দাদের। মা তাই এক কেজি লাল দই সঙ্গে নিয়েই আসত আর কিছু লাল রসগোল্লাও। তবে স্টেশান রোডের তৃপী সদন আর নবগ্রামের মিষ্টিমহলের মিষ্টি ছাড়া আবার ভাইফোঁটা হয় নাকি! কাজেই মা আবার বেরোত দিদা বড়মামীমা, ছোটদিকে নিয়ে মিষ্টি কিনতে। যেবার কালীপুজো আর ভাইফোঁটার মধ্যে দুটো দিন পড়ত সেবার খুব মজা, একদিন ঠাকুর দেখা হবে অনেকটা সময় নিয়ে। সন্ধ্যে হতে না হতেই হয় ছোটমামা নয় বড়মামীমা খুকী আর ছোটদিকে নিয়ে বেরোবে, কোন কোনবার মাও ভাইকে বেনাড্রিল খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে ওদের সঙ্গে বেরোবে। কোন্নগরের অলিতে গলিতে কালীপুজো, আর সে কি লাইটের খেলা সব। কোথাও ডাকিনী যোগিনী গিলতে আসছে, কোথাও কালীর হাতে ধরা মুন্ডু থেকে টপ টপ করে লাল রক্ত ঝরছে ফোঁটা ফোঁটা, কোথাও কালী বাচ্চা মেয়ে হয়ে রামপ্রসাদকে বেড়া বেঁধে দিচ্ছে। ওর জন্য তো ১৫-২০ মিনিট লাইনে দাঁড়ানোই যায়। এমনি করে সব দেখে বাড়ি ফিরতে রাত ন’টা। ওরা তো খেয়েদেয়ে ঘুম। মা’রা বসে মিষ্টিগুলোকে গুছিয়ে রাখবে, কচুরীর জন্য মৌরী বেটে কড়াইতে নেড়েচেড়ে একটু আঁশিয়ে তাই দিয়ে ময়দা মেখে রাখবে, তবে ঘুমোবে। বড়মাইমা তো আবার সক্কাল সক্কাল চান করে মিষ্টি নিয়ে শ্যামবাজার রওনা দেবে ভাইফোঁটা দিতে।
.
পরের দিন সকাল থেকেই তুমূল হুলুস্থুল। সবাইকে ঘুম থেকে উঠেই লাইন দিয়ে স্নান করে নিতে হবে। তারপর খুকীরা যাবে ঘাসের উপর থেকে শিশির নিয়ে একটা এইটুকুনি তামার বাটিতে জমা করতে। দাদু আগেই পঞ্জিকা দেখে রেখেছে, বলবে বেলা আটটা এগারো মিনিটে দ্বিইত্যা লাগব। তরা চান টান কইর্যাথ রেডি হইয়া থাক। এদিকে বড়মামার তো অ্যালকালিতে ছুটি নেই, উসখুস করতে থাকবে দেরী হয়ে যাচ্ছে – বড়মামা কোনদিন আটটার পরে অফিসে ঢোকে না। দাদুর ঘরের মেঝেতে দিদা আসন পাতবে, ছাঁটাফুলের আসন, সামনে কাঁসার থালায় ধান দূর্বা আবির ছোট্ট চুড়ো করা। এরমধ্যে হ্য় খুকী নয় ছোটদি শ্বেতচন্দন বেটে ফেলেছে এত্তখানি, খুকী একে ফাঁকিবাজ তায় একটু ট্যালা, প্রায়ই গোলমাল করে আর দিদা দাঁতে দাঁত চেপে কিসকিস করে বকে। ছোটদি ভারী লক্ষী, সে সুন্দর করে বেটে থালায় তুলে দেয় চন্দনটা। থালার পাশে তামার ঘটে আমপল্লব, আর একটাঘটে গঙ্গাজলের সাথে টুকিয়ে আনা শিশিরটুকু মিশিয়ে নেওয়া হয়েছে, পাশে একটা প্রদীপ জ্বলছে, সলতে ছোট করে কমিয়ে রাখা। ফোঁটা শুরু হলে বাড়িয়ে নেওয়া হবে। তিনটে আসন বড়মামা ছোটমামা আর খুকীর ভাইয়ের। একদম ধারে দিদার শাঁখ আর দাদুর পাখা রাখা। সেজমামা তো ব্যারাকপুর থেকে দুপুরে কি বিকেলে আসবে। মা এর মধ্যে কচুরিগুলো কয়েকটা বেলে আর কয়েকটা গুলি পাকিয়ে রেখেছে, যাতে ঝপাঝপ ভেজে দিতে পারে। দ্বিতীয়া লেগে যেতেই দাদুর ঘোষণামত বড়মামা ছোটমামা আসনে বসে গেছে, ভাইকেও বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকের ফোঁটার সময় দিদা শাঁখ বাজাবে মস্ত ঢেউ খেলিয়ে --- কলকলিয়ে উলু দেবে, ভাইয়েদের গাল আর কপাল তিনবার করে শিশিরমেশানো গঙ্গাজলে ধোয়ানো, তারপর চন্দন আর আবীরের ফোঁটা তিনবার করে সাথে মন্ত্র ‘স্বর্গে হুলুস্থুল মর্ত্যে জোকার, না যেও ভাই যমের দুয়ার, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা, বোন ভাইকে দেয় দ্বিতীয়ার ফোঁটা’। এমনভাবে বলতে হবে যাতে কপালে ছয়টা ফোঁটা দেওয়া আর পুরো মন্ত্রটা তিনবার বলা একসাথে শেষ হয়। এরপরে তো পাখার বাতাস আর বোন বা ভাই যে বড় সে প্রণাম করবে আর প্রণম্যজন আশীর্বাদ করবে। তারপরেই আসল মজা, মা দেবে দুটো শার্টপিস, মামারা দেবে শাড়ি। এরপরে মিষ্টির থালা ধরিয়ে মা দৌড়াবে রান্নাঘরে। ট্যাবলা টোবলা ভাইটা এদিকে প্রদীপের শিখাটা ধরার জন্য হাত বাড়িয়েছে। দিদাও যাবে সাথে বেলে দিতে। থালাভর্তি ফোলা ফোলা কচুরি আর মিষ্টি হল জলখাবার। খুকী আর ছোটদির জন্য অতগুলো না হলেও তিনটে করে মিষ্টি আর কচুরি থাকবে। হাতে সারা সকাল লেগে থাকবে মৌরীর গন্ধ।
.
এদিকে দাদু তো বাজার যাবার জন্য ধুতি পাঞ্জাবী পরে রেডি। দিদা এসে নাক অবধি ঘোমটা টেনে টাকা দিতে দিতে বলবে রুইমাছডা ৪ থেইক্যা ৫ কেজির আনুয়িন যে। মাংসডা দেইখ্যা আনুয়িন, চর্বি আর হাড্ডি না দ্যায় য্যান। অন্যদিন হলে দাদু বেজায় রেগে যেত, আজ কিন্তু রাগ করবে না, ‘হ হ বুঝছি’ বলে তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে যাবে, মাংসের দোকানে আজ মস্ত লাইন বেশী দেরী হয়ে গেলে আগে থেকে কেটে রাখা পাঁঠা নিতে বলবে বিশুর বাপ। দুপুরে বড়মামা আবার বাড়িতে খেতে আসবে, ছোটমামা আজ ছুটিই নিয়ে নিয়েছে। গরম সাদা ভাত তাতে বাড়িতে তৈরী লালীর দুধের সরথেকে তোলা ঘি এক চামচ করে, মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল, সাথে বাজারে ফুলকপি উঠে গেলে বেসনে চোবানো ফুলকপির বড়া, নাহলে বেগুন ভাজা, রুই মাছের দইমাছ, ঘি চপচপে পোলাও আর বড় বড় আলু দেওয়া মাংস, আমসত্ত্ব আর খেজুরের চাটনি, শেষপাতে বলরামের লালদই। বড়মামা বলবেই ‘এত খাইতে পারি না, এতডি করসস ক্যারে?’ মা বলবে ‘এতডি কই? খাইয়া ল কিচ্ছু হইব না।’ ভাই কিছুতেই মাছ খেতে চাইবে না, ছোটদি ভুলিয়ে ভালিয়ে খাওয়াবার চেষ্টা করবে। বিকেলে আসবে সেজমামা আর ফোঁটা নিয়ে শুধু ডাল আর মাছ দিয়ে ভাত খেয়ে চলে যাবে। মেজমামা তো সেই ফরাক্কায়, এখন আর আসতে পারে নি, সবাই মিলে একবার তার জন্য একটু দুঃখ করবে। তারপর তো আবার যে যার জীবনচক্রে জুড়ে যাবে। খুকীর হাতে পোলাওয়ের ঘি আর মাংসের গন্ধ ছাপিয়েও একটু একটু মৌরীর গন্ধ লেগেই থাকবে আরো কতদিন।
.
খুকীরা যখন কোন্নগরেই পাকাপাকি থাকতে চলে এল তখনও কিছুদিন একরকমই ছিল সব, শুধু ওদের আর কালীপুজোর পরের দিন আসা আর ভাইফোঁটার পরের দিন ফেরা ছিল না, জিজি আর মীনামার ফোঁটার যোগাড় ছিল না, ওরা কোন্নগরে চলে আসত খুকীর ফোঁটাদেওয়া দেখতে, মা’র আর একটাও লালপাড় শাড়ি ছিল না, আর ঘোমটা দেওয়াও ছিল না। তারপরে সেজমামা চলে গেল ফরিদাবাদ, ছোটমামা রাঁচি, মেজমামা চলে এল কলকাতায় পূর্বাশা, ছোটদি শ্যামবাজারে পড়াশোনা করতে। ভাইফোঁটায় বড়মামা মেজমামা আর এদিকে মা, ছোটদি আর খুকী। খুকীদের বাড়িতে কে এক বোন নাকি বহুকাল আগে দীর্ঘক্ষণ উপোস করে ভাইকে ফোঁটা দিতে গিয়ে পড়ে মারা গিয়েছিল, তাই ওদের বাড়ি খেয়ে দেয়ে ফোঁটা দেবার নিয়ম , তাই নিয়ে মা আর মেজমামা হাসাহাসি করে, কোনওবার ছোটমামাও আসে, সেও হাসে। কচুরি ভাজার সময় মা কেমন তাচ্ছিল্যভরে একটা কচুরি ঠেলা দিয়ে এগিয়ে দেয় খুকীর দিকে ‘কি আতুসি বোন ছিল বাবা, একটু উপোস করতেই একেবারে মরেই গেল! নেঃ খেয়ে নে।’ খুকীর ভারী অপমান লাগে, খায় না। মা তো খুব রাগী, ভুরুতে ত্রিশূল বানিয়ে বলে ‘আমার গুচ্ছের কাজ পড়ে রয়েছে এখন অত নক্সার সময় নেই, খেয়ে গিয়ে ফোঁটা দিয়ে এসে আমাকে এদিকে বেলে দাও’। খুকী দাঁতমুখ চেপে ভাঁড়ার ঘরে গিয়ে জানলা দিয়ে কচুরিটা মুখার্জী জেঠুদের ওদিকে ফেলে দেয়, মোটাকাক নেমে টপাৎ করে মুখে নিয়ে সোওজা নারকেলগাছের মাথায় উঠে যায়। ইতিমধ্যে জিজি এসে গেছে ফোঁটা দেওয়া দেখবে বলে। আরো দিন যায় খুকী আরো একটু বড়, একদিন কটকট করে বলে দেয় ‘তোমাদের নিয়মটা যে সবচেয়ে ভাল সেটা কে বলেছে?’ মা বেজায় রেগে বলে আমাদের কেন এটাই সবার নিয়ম তোদের বাড়িই যত উল্টোপাল্টা। খুকী এতদিনে বাড়িতে ‘মুখভারতী’ নাম পেয়েছে আর সবাই এমনিতেও নিন্দে করে তাই চুপ না করে বলে ‘কই শুভ্রাদের বাড়ি তো প্রতিপদে ফোঁটা, দেবুদা শিবুদাদের বাড়ীও তাই, মৃণালজেঠুদের বাড়ীও তাই, তাহলে তোমরা কেন দ্বিতীয়ায় দাও? সবাইদের মত করো না কেন?’ মা আরো রেগে মুখ লাল করে দুমদুম করে খুকীর পিঠে দু’ঘা দিয়ে দেয়। খুকী বুঝে যায় ঠিকঠাক উত্তর জানে না মা, আর বুঝেই বেশ অনেকটা বড় হয়ে যায়। এর পরের বার থেকে ফোঁটার আগে মা জিগ্যেস করত ‘কিরে খাবি নাকি?’ খুকী ইচ্ছে হলে খেত, না ইচ্ছে হলে নয়।
.
এরপর তো কত দিন কেটে গেল, দাদু আর বিছানা ছাড়তে পারে না, মা’ই এখন বাজার করে। খুকী এতদিনে এগারোক্লাস আকনা গার্লস। শ্রীরামপুর স্টেশান থেকে হেঁটে গিয়ে বাসভাড়ার পঁচিশ পয়সা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে ভাইয়ের জন্য কিনেছিল ‘পান্দব গোয়েন্দা’ আর বলিভিয়ার ভয়ঙ্কর, বার্মূডা ট্রায়াঙ্গল রহস্য, আর একটা কি বই যেন, মোট ৪ টে বই। ভাইফোঁটা দেবার পরে লাল ফিতেবাঁধা বইগুলো দেবার পরেই ভাইয়ের সে কি আনন্দ আর তিড়িং বিড়িং লাফ। রাত্রিবেলাও বইগুলো হাতছাড়া করতে চায় না। ততদিনে খুকীই বেলে নিয়ে ভাজে ভাইয়ের কচুরি, খুকীই মায়ের তত্ত্বাবধানে শিখে নেওয়া পোলাও রান্না করে সবার জন্য । মা’য়ের রান্না পোলাওয়ের খুব সুনাম ছিল আত্মীয়মহলে। রান্নাবান্না হয়ে যাওয়ার পরের হাতের ঘি মৌ মৌ গন্ধ ছাপিয়ে মৌরীবাটার গন্ধ লেগে থাকত তখনও। আরো দিন যায়, আরো স্বাধীন খুকী সারা কলকাতা ঘুরে ঘুরে কিনে আনে নানারকম মিষ্টি। ফোঁটা হয়ে যাবার পরেই ভাই সেগুলো বাক্সে ভরে ফ্রীজে তুলে রাখে, কুড়ি পঁচিশ দিন ধরে একটু একটু করে খাবে ও। এখন আর দইমাছ সব বছর হয় না, এত পদ কেউ খেতে চায় না, শুধু সকালে মৌরীবাটা দেওয়া কচুরি আর দুপুরে ঘি চপচপে পোলাও আর মাংস হবেই, আমসত্ত্ব আর খেজুরের চাটনিও। লালী তো কবেই মরে গেছে, আকাইম্যা কিছুতেই গাভীন হল না বলে তাকে বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাড়িতে আর গরু নেই, এখন ঘি আসে তৃপীসদন থেকে। এমনই এক ভাইফোঁটার দিন এসে মা’য়ের কাছে ফোঁটা নিয়ে খুকীর কাছ থেকে ছোটমামার দুর্গাপুরের কোয়ার্টারের ঠিকানা আর পৌঁছানোর হদিশ বুঝে নিয়ে যায় মেজমামা। পরের দিনই নাকি যাবে দেখতে। বড়মামাদের বাড়ি ততদিনে ফোন এসে গেছে। , আরো ৬ দিন পরে উদ্বিগ্ন মেজমামীমার ফোন সেখানে, মেজমামা এখনো ফেরে নি, কোনও খবরও নেই, ৩ দিনে ফেরার কথা বলে গেছিল। ছোটমামার অফিসে ফোন করে প্রতিবেশিরা জানতে পারেন মেজমামা সেখানে আদৌ যায়ই নি। আরো ৭ দিন খোঁজাখুজির পরে মেজমামার দেহ পাওয়া যায় মর্গে, সময় নিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য ছোটমামার বাড়ি বেড়াতে যাবার নিখুঁত গল্প সাজিয়ে গেছিল ভাইফোঁটার দিন।
.
ভাইফোঁটা তার সমস্ত তাৎপর্য্য হারিয়েও চলেছে আরো কত বছর। খুকী যখন প্রায় বুড়ি তখনও মা’কে ‘ভাইফোঁটা’ নিয়ে প্রশ্ন করলে মা রেগে আগুন হয়ে যায়। সংস্কারের এই দাসত্ব খুকী আর পারে না, কালীপুজোর আশেপাশে বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে। মা’ও জিগ্যেস করে করে একসময় চুপ করে যায়, ভাইফোঁটার তামা, কাঁসার ঘটি, প্রদীপ ট্রাঙ্কে বন্দী পড়ে থাকে, ছাঁটা ফুলের আসনও পড়ে থাকে ধুলো মেখে বেরঙিন হয়ে, শুধু ভাইফোঁটার সকালে এখনও খুকীর হাতে লেগে থাকে মৌরীবাটার গন্ধ।

991 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: dd

Re: মৌরীগন্ধি দিন

ইইইস
Avatar: aranya

Re: মৌরীগন্ধি দিন

ছুঁয়ে যাওয়া লেখা

Avatar: aranya

Re: মৌরীগন্ধি দিন

'ছুঁয়ে যাওয়া', 'ঋদ্ধ হওয়া' এজাতীয় শব্দবন্ধ নিয়ে লোকে ঠাট্টা, এয়ার্কি করে বটে, কিন্তু আর কি ই বা লিখব
ইংরিজিতে 'টাচিং' কইতে পারি :-)
Avatar: Du

Re: মৌরীগন্ধি দিন

সেই কবে যে শিউলি তুলে আনতাম তার সবটুকু কোমলতা নিয়ে ফিরে এলো এই লেখায়।

বড় মনখারাপ হয়ে গেল শেষে। মর্মান্তিক স্মৃতি।

ছেলেবেলায় সাত মামা সার দিয়ে বসতো প্লাস পেছনের বাড়ির রতনমামা মায়ের কাছে ফোঁটা নিতে আর এই ভাইফোঁটাতেই আমি প্রথম রেসিপি দেখে রানা করেছিলাম চিংড়িমাছের মালাইকরি। আজ মা নেই কতদিন, টিমটিম করে দুই মামা বাড়িতে এখন। তবুও হয় ভাইফোঁটা আর আমার আধবুড়ো হয়ে যাওয়া দাদা প্রবাসী বোনের ফোনের অপেক্ষাটা করেই এখনো।
Avatar: দ

Re: মৌরীগন্ধি দিন

ডিডিদাদা, :-)

অরণ্য, সত্যিই ফ্যাক ফ্কযাক রে হেসে ফেললাম। ঃ-)) থ্যাঙ্কু যাহোক।

দু, ভালবাসা নিও।
Avatar: pi

Re: মৌরীগন্ধি দিন

লেখাটা কালই পড়েছি, পরে পড়ব ভেবেও। শুরু করে ছাড়তেই পারিনি। কিন্তু শেষটা পড়ে মনে হল
... যাহোক। মৌরিগন্ধই থেকে যাক।
Avatar: aranya

Re: মৌরীগন্ধি দিন

'টাচিং' লিখলেও কি হাসি পেত, 'হনেস্ট'লি বলবেন :-)

তাপ্পর ধরুণ, দু-এর এই লাইনটা - 'সেই কবে যে শিউলি তুলে আনতাম তার সবটুকু কোমলতা নিয়ে ফিরে এলো এই লেখায়' - এটা পড়ে তো অবশ্যই মনে হয় দু-কেও আপনার লেখাটা বেশ ছুঁয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে হাসি পেল না কেন - দু এক শব্দে ভাবপ্রকাশের বদলে দু বড় করে লিখেছেন বলে?

Avatar: হু

Re: মৌরীগন্ধি দিন

আমার মায়ের দিকের বাড়িতে ভাই-বোন দুইতরফেই উপোস রাখে। আমরাও সেরকম শিখেছি যত দিন নিয়ম মেনে এসব কিছু হত। মায়ের দুই জ্যাঠতুতো ভাই কলকাতা থেকে মফস্বলে আমাদের বাড়ি ফোঁটা নিতে আসতেন। তাঁরা না খেয়েই থাকতেন ফোঁটা না নেওয়া পর্যন্ত। বাবার দিকের বাড়িতে ছেলেরা উপোস রাখে না দেখে অবাক লাগত। তবে আমরা দুই ভাইবোন সেই অনায্য নিয়ম মানতাম না। এর জন্য মা হয়ত কিছু মন্তব্য শুনে থাকবে। অত জানি না।
Avatar: Tim

Re: মৌরীগন্ধি দিন

আমাদের বাড়িতেও দুই দিকেই দিকে এই নিয়মটা ছিলো, ভাই বোন সবাইকেই উপোস করে থাকতে হতো। তাছাড়া আরেকটা জিনিস হতো, দুব্বো তোলা চন্দন বাটা এইগুলো আমি আর আমার পিসতুতো দিদি শেয়ার করতাম। মশার কামড় ইত্যাদি দুজনকেই পোহাতে হয়েছে।
Avatar: দ

Re: মৌরীগন্ধি দিন

না না দু-এর লেখা পড়ে একটুও হাসি পায় নি।

হুচি/টিমি,
না এখানে অন্তত ছেলেমেয়ে ভেদটা নেই। মায়ের দিকে ভাইবোন দুজনেই না খেয়ে ফোঁটা। বাবার দিকে ভাইবোন দুজনেই খেয়ে ফোঁটা।

পাই, থ্যাঙ্কুউ
Avatar: দ

Re: মৌরীগন্ধি দিন

ওহ টাচিং - তাআআ বাংলা লেখায় ইংরিজি প্রতিক্রিয়া দেখতে একটু কেমন লাগে যেন।
Avatar: aranya

Re: মৌরীগন্ধি দিন

প্রতিক্রিয়া টা তো ইংরিজি বা কোন ভাষারই সম্পত্তি নয়, সর্বজনীন।


Avatar: শঙ্খ

Re: মৌরীগন্ধি দিন

👏👏👏
Avatar: দ

Re: মৌরীগন্ধি দিন

ধন্যবাদ শঙ্খ। (আমিও ইমজি খুজোচিলম, পেলাম না)
Avatar: kushan

Re: মৌরীগন্ধি দিন

এমন গদ্য লিখতে পারলে বর্তে যেতুম। এই লিখন যেন... লীলা মজুমদারের ছদ্মবেশে শীতের লেপ হয়ে নভেম্বরে জড়িয়ে ধরল।

নিজস্ব, নিজস্ব, নিজস্ব উচ্চারণ হলেই তা ব্যক্তিগত পরিসর ছাপিয়ে পাঁচ পাঁচ জনের হয়ে ওঠে।

Avatar: দ

Re: মৌরীগন্ধি দিন

আরে কুশান, ধন্যবাদ জানবেন।
Avatar: i

Re: মৌরীগন্ধি দিন

মৃত্যুর গন্ধ পেরিয়ে ভাজা মৌরির গন্ধ, ঘিয়ের গন্ধ নাকে লেগে রইল। জীবন্ত স্মৃতিচারণা।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন