Debasis Bhattacharya RSS feed

Debasis Bhattacharyaএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    (টিপ্পনি : দক্ষিণের কথ্যভাষার অনেক শব্দ রয়েছে। না বুঝতে পারলে বলে দেব।)দক্ষিণের কড়চা▶️এখানে মেঘ ও ভূমি সঙ্গমরত ক্রীড়াময়। এখন ভূমি অনাবৃত মহিষের মতো সহস্রবাসনা, জলধারাস্নানে। সামাদভেড়ির এই ভাগে চিরহরিৎ বৃক্ষরাজি নুনের দিকে চুপিসারে এগিয়ে এসেছে যেন ...
  • জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-১৪
    তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায়...আসলে যে কোনও শিল্প উপভোগ করতে পারার একটা বিজ্ঞান আছে। কারণ যাবতীয় পারফর্মিং আর্টের প্রাসাদ পদার্থবিদ্যার সশক্ত স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। পদার্থবিদ্যার শর্তগুলি পূরণ হলেই তবে মনন ও অনুভূতির পর্যায় শুরু হয়। যেমন কণ্ঠ বা যন্ত্র ...
  • উপনিবেশের পাঁচালি
    সাহেবের কাঁধে আছে পৃথিবীর দায়ভিন্নগ্রহ থেকে তাই আসেন ধরায়ঐশী শক্তি, অবতার, আয়ুধাদি সহসকলে দখলে নেয় দুরাচারী গ্রহমর্ত্যলোকে মানুষ যে স্বভাবে পীড়িতমূঢ়মতি, ধীরগতি, জীবিত না মৃতঠাহরই হবে না, তার কীসে উপশমসাহেবের দুইগালে দয়ার পশমঘোষণা দিলেন ওই অবোধের ...
  • ৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড
    পুরোনো কথার আবাদ বড্ড জড়িয়ে রাখে। যেন রাহুর প্রেমে - অবিরাম শুধু আমি ছাড়া আর কিছু না রহিবে মনে। মনে তো কতো কিছুই আছে। সময় এবং আরো কত অনিবার্যকে কাটাতে সেইসব মনে থাকা লেখার শুরু খামখেয়ালে, তাও পাঁচ বছর হতে চললো। মাঝে ছেড়ে দেওয়ার পর কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ ...
  • কাশ্মীরের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসঃ ১৯৩০ থেকে ১৯৯০
    ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সূর্য অস্ত যায় ১৯৪৭ এ। মূল ভারত ভূখন্ড ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হয়। কিন্তু ভুখন্ডের ভাগবাঁটোয়ারা সংক্রান্ত আলোচনচক্র ওতটাও সরল ছিল না। মূল দুই ভূখণ্ড ছাড়াও তখন আরও ৫৬২ টি করদরাজ্য ছিল। এগুলোতে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ঘরে ফেরা

Debasis Bhattacharya

[এ গল্পটি কয়েক বছর আগে ‘কলকাতা আকাশবাণী’-র ‘অন্বেষা’ অনুষ্ঠানে দুই পর্বে সম্প্রচারিত হয়েছিল, পরে ছাপাও হয় ‘নেহাই’ পত্রিকাতে । তবে, আমার অন্তর্জাল-বন্ধুরা সম্ভবত এটির কথা জানেন না ।] …………

আঃ, বড্ড খাটুনি গেছে আজ । বাড়ি ফিরে বিছানায় ঝাঁপ দেবার আগে একমুঠো খেয়ে নেবার মত ইচ্ছেটুকুও আর অবশিষ্ট থাকবে কিনা কে জানে ! ট্যাক্সি ধরলাম অফিসের সামনে থেকে । ক্লান্ত, তাই গাড়িতে উঠেই সিটে শরীরটা এলিয়ে দিলাম । অনেক রাত হয়ে গেল আজ । কাল আবার গোটা কুড়ি ই-মেল পাঠাতে হবে, আর সাত-আট জনকে মিট করতে হবে । রোজই চলতেই থাকে এই রকম, চলতেই থাকে । কোনও দিনই কি আর এইসব অর্থহীন ছুটোছুটি শেষ হবে ?

এইসব ভাবতে ভাবতে চোখটা একটু বুজে আসছিল, এমন সময় হঠাৎ ড্রাইভারের সিটের পেছনে লেখা ট্যাক্সির নম্বরটা চোখে পড়তেই চমকে উঠলাম । মুহূর্তের জন্য যেন এক তীব্র কাঁপুনি শরীরকে গ্রাস করে ফেলল, চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এল । তবে সে কেবল ওই এক মুহূর্তের জন্যই, তারপর আবার সোজা হয়ে বসলাম । কিন্তু মুখ দিয়ে সজোরে বেরিয়ে এল, ‘ওঃ’ !

ড্রাইভার একটুও মুখ না ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হল স্যার ?’ বললাম, ‘ও কিছু না, কিন্তু আপনার সিটের পেছনের নম্বরটা কোন ভাষায় লেখা ? দু-তিনটে অক্ষর যেন খুব কায়দা করে লেখা বাংলা আর ইংরিজি, গোটা দুয়েক রাশিয়ান ধাঁচের, আরও গোটা দুয়েক গ্রিক অক্ষরের মত লাগছে, আর বাকিগুলো বোধহয় চিনে-জাপানি গোছের কিছু হবে । গাড়ির নম্বর আবার এ রকম হয় নাকি ?’

ড্রাইভার মৃদু হাসল কিনা বোঝা গেল না । তবে একই ভঙ্গীতে বলল, ‘আপনি এতগুলো ভাষা জানেন স্যার ?’
ব্যস্ত হয়ে বললাম, ‘আরে না না, তবে অক্ষর-টক্ষর একটু একটু চিনতে পারি । হাতিঘোড়া ব্যাপার কিছু নয়, অনেকেই পারে । এখন আপনার নম্বরটা কী ধরনের, সেইটা বলুন।’ ড্রাইভার আবারও একই ভঙ্গীতে বলল, ‘গাড়ির নম্বর নয় স্যার, ওটা আমার কোড ।’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার আবার ট্যাক্সি ড্রাইভারদের জন্য এই রকম আন্তর্জাতিক কোড কবে থেকে চালু করল ?’ একমুহূর্ত স্তব্ধতার পর উত্তর এল, ‘ওটা পৃথিবীর ভাষা নয় স্যার । আপনি আপনার চেনা হরফগুলোর সাথে যে মিলটা দেখতে পাচ্ছেন সেটা সম্পূর্ণ কাকতালীয় । আমি হচ্ছি একটা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র যার মধ্যে এখন আপনি আছেন । আর, ড্রাইভার যেটাকে বলছেন সেটা স্রেফ একটা হাত-পা নড়া মূর্তি । সাজানোর জন্য রাখা ।’

আরে ধুত্তোর, কোথায় আরাম করে ঝিমোতে ঝিমোতে বাড়ি পৌঁছব তা নয়, পড়লাম এক বদ্ধ পাগলের পাল্লায় । ভাবলাম লোকটার পিঠে একটা সজোরে থাবড়া মেরে বলি, ওহে হাত-পা নড়া মূর্তি, মুখে কুলুপ এঁটে এখন আমায় চটপট বাড়ি নিয়ে চল দিকিনি ! কিন্তু তা আর করা হল না, কারণ আমায় হতচকিত করে কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘কল্পনায় সেটা পারলেও বাস্তবে মোটেই পারবেন না । আপনার এখন হাত নেই, পা নেই, গোটা দেহটাই নেই ।’

হতচকিত হলেও সামলে নিয়ে বললাম, ‘অঅঅ, নেই বুঝি । তো, আমার জলজ্যান্ত দেহটা তাহলে গেল কোথায় ?’

উত্তর এল, ‘কোত্থাও যায়নি স্যার । যে অবস্থায় আপনি সিটে এসে বসেছিলেন, ঠিক সে অবস্থায়ই ওটা ওখানে পড়ে আছে কাঠের মত শক্ত হয়ে । তবে কিনা, তাতে প্রাণ নেই । ওতে ঢোকানো আছে মাথার চুলেরও কোটি ভাগ সরু সব অদৃশ্য তারের গুচ্ছ, সংখ্যায় কয়েক লক্ষ কোটি হবে । তাই দিয়ে আপনার গোটা শরীর, মস্তিষ্ক আর স্মৃতি আমি পড়ে ফেলেছি । এই যন্ত্রে উঠেই আপনি যে কাঁপুনিটা টের পেয়েছিলেন, সেটা কিন্তু অদ্ভুত ভাষা দেখে নয়, ওই অত তার একসঙ্গে শরীরে ঢোকবার জন্যেই । তারপর আপনি আর মাত্রই সেকেন্ড খানেক বেঁচে ছিলেন । তবে, আপনার সব তথ্য পড়ে নিতে তার বেশি সময় লাগেনি ।’ শুনে একটু ঢোক গিলতে হল, কিন্তু তখনও আমার গলায় খেলা করছে মজা --- ‘ও, আমি তাহলে এখন হলাম গিয়ে ভূত-প্রেত ? অশরীরি ?’ এবার উত্তর এল --- ‘উঁহু, অশরীরি নন । খুব ছোট হলেও শরীর একটা আছে আপনার । তবে সেটা দেখতে মোটেই আপনার ওই পরিত্যক্ত দেহটার মত নয় ।’

এ প্রলাপে অবশ্য কান দেবার একদমই দরকার নেই, কারণ আমার দেহ এবং বাকি সবকিছুই যেমন ছিল ঠিক তেমনিই আছে । মজার খেলাটা চালিয়ে যাবার জন্য হালকা করে বললাম, ‘আচ্ছা তাহলে, আমার এই পুরোনো দেহের বদলে নতুন যেটা হয়েছে তার চেহারা খুব একটা ভদ্রলোকের মত হয়নি বলছেন ?’ কণ্ঠস্বর বিনীতভাবে বলল, ‘আজ্ঞে তা নয় । ও জিনিসের মত সুন্দর আঁটোসাঁটো ছিমছাম চেহারা এ দুনিয়ায় খুব কমই আছে ।’ হেসে জিজ্ঞেস করলাম, ‘জিনিস ? আমার শরীরকে ‘জিনিস’ বলছেন ?’ জবাব এল, ‘হ্যাঁ বলছি, কারণ ওটা দেখতে একটা খুব ছোট পেন ড্রাইভের মত, যদিও আসলে ওটা পেন ড্রাইভ নয়, একটা গোটা মহাশক্তিশালী কম্পিউটার । পৃথিবীর সব কম্পিউটার এক করলেও ওর সমান শক্তিশালী হবে না । ওতেই আপনার শরীর ও মনের যাবতীয় তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে । আর সেইসব তথ্য দিয়ে আপনার ব্যক্তিত্বের অনুরূপ এক প্রক্রিয়া চালু রাখছে ওই কম্পিউটারে রাখা একটা বিরাট বড় ও সূক্ষ্ম প্রোগ্রাম ।’

ওব্বাবা, মাথায় একটু ছিট থাকলেও এই ড্রাইভারটি দেখছি অনেক কিছু জানে । রদ্দি সায়েন্স ফিকশন পড়ে পড়ে হেড আপিসে গণ্ডগোল বাধিয়েছে বটে, তবে এক সময় হয়ত মেধাবী ছাত্রই ছিল । কোনও কারণে পড়াশোনা শেষ করতে না পেরে ড্রাইভারিতে ঢুকেছে । উল্টোপাল্টা বকলেও গাড়িটা অবশ্য খারাপ চালায় না দেখতে পাচ্ছি । যেভাবে গাড়ি চলেছে তাতে বাড়ি পৌঁছতে আর বড়জোর আধঘন্টা । সেই সময়টুকু ভুলভাল বকে যদি সারাদিনের ক্লান্তিটা ভুলে থাকা যায়, মন্দ কী ? তাই জিজ্ঞেস করতে গেলাম, আমার মত সামান্য লোকের তথ্য লোকে রেকর্ড করতে যাবে কেন, করলেও তার জন্য এত শক্তিশালী কম্পিউটার লাগবে কেন, পেন ড্রাইভের মত ছোট্ট জায়গার মধ্যে অত শক্তিশালী যন্ত্র কী করে বানানো গেল, আর কারাই বা কী উদ্দেশ্যে এত সব বানাল, এই সব নানা কথা । কিন্তু তার আগেই শুনতে পেলাম, ‘কে কেন এ সব বানাল ওসব পরে জানলেও হবে । কিন্তু এইটা কি ভেবে দেখেছেন যে, আপনার এত বড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও কেন আপনি কিছুই বুঝতে পারেন নি, আর আমিই বা কীভাবে আপনি যা ভাবছে সেটা জেনে যাচ্ছি ?’

আমি এখন কী ভাবছি তা যে কেউই আন্দাজ করতে পারত, কিন্তু এই লোকটির সাথে যুক্তিতর্ক করে মজা মাটি করার কোনও অর্থই হয় না । তাই সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘ভাবব না কেন, নিশ্চয়ই ভেবেছি । এ তো সোজা ব্যাপার । আমার পরিবর্তন আমি কিছুই বুঝতে পারিনি কারণ আপনার ওই পেন-ড্রাইভ-কম্পিউটারে আমার তথ্য খুব ভালভাবে এবং মুহূর্তের মধ্যে কপি হয়ে গেছে, এবং ওই সব তথ্য নিয়ে যে প্রোগ্রামটা চলছে সেটা আমার বুদ্ধিস্মৃতি-ব্যক্তিত্ব ঠিকঠাকই রেখেছে । আর, আমার মনের কথা যে আপনি জেনে যাচ্ছেন তার কারণ হচ্ছে আমি, মানে ওই ছোট্ট বিদঘুটে কমপিউটারটি, আপনার দেহের মধ্যে ইউ এস বি পোর্ট জাতীয় কোনও এক স্লটে গোঁজা আছি, আর আপনি প্রতি মুহূর্তেই আমার মনের ভেতরকার সব তথ্য পড়ে ফেলছেন । কি, তাই তো ?’

প্রত্যুত্তরে এবার যেন একটু খুশির আভাস পাওয়া গেল, ‘হ্যাঁ, কাছাকাছি । কথাগুলো ঠাট্টা করেই বলেছেন বটে, তবে মোটের ওপর ঠিকই বলেছেন । আপনি বেশ বুদ্ধিমান । ওরা খুশি হবে ।’

এ কথার পর যা স্বাভাবিক তাই জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওরা মানে ? কারা খুশি হবে ?’

কিন্তু সে কথার জবাব না দিয়ে সেই আশ্চর্য ড্রাইভার বলল, ‘আপনি ঠিক উত্তর দিলেও আরও কয়েকটা কথা কিন্তু ভাবতেও পারছেন না । এই যে আপনি বেশ নিশ্চিন্তে রয়েছেন তার কারণ হচ্ছে, আপনার নিজের শরীর আর চারপাশের সব কিছুই আপনি অনুভব করতে পারছেন, জানলা দিয়ে চেনা রাস্তার চেনা দৃশ্যও দেখতে পাচ্ছেন । কিন্তু আসলে এগুলো হচ্ছে দেখা-শোনা-ছোঁয়ার তথ্যওয়ালা একটি ফাইল যা আপনার মধ্যে চালানো হচ্ছে, যেভাবে কমপিউটারে সিনেমা চলে।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘জানি, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির কথা বলছেন । কিন্তু বন্ধু, আমার বাড়ি তো এসে গেল, আর হয়ত কয়েক মিনিট । এখন কথা হচ্ছে, আপনার গল্পটা পুরো না শুনে তো নামতে পারব না । একটু ছোট করে বলে দিন না, প্লিজ।’

এবার জবাব এল একটু দেরিতে, গলায় বিষণ্ণতা আছে কিনা বোঝা গেল না, ‘হ্যাঁ, আমি একমত । সত্যিই আমাদের সময় হয়ে এসেছে এবার । তার আগে বিষয়টা আপনাকে বুঝিয়ে দেওয়াটা আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে । আপনি একটা মহাজাগতিক প্রোজেক্টের অঙ্গীভূত হতে চলেছেন । আমাদের এই গ্যালাক্সি, যাকে আপনারা ছায়াপথ বলেন, তার কেন্দ্রের কাছাকাছি একটা গোটা তারাকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে এক মহাকায় জ্ঞানযন্ত্র, ওই তারার সমস্ত শক্তিটুকুই লেগে যাবে ওই যন্ত্র চালাতে । আমাদের জানা যাবতীয় সভ্যতার সমস্ত জ্ঞান-বুদ্ধি দেওয়া হচ্ছে এই যন্ত্রকে, যেটা ঠিকমত বানাতে পারলে ব্রহ্মাণ্ডের কোনও রহস্যই আর অজ্ঞাত থাকবে না । জ্ঞান তখন নিজেই নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে চলবে, কোনও বিশেষ প্রাণি বা সভ্যতার মুখ চেয়ে থাকবে না । এই প্রোজেক্ট-টা চালাচ্ছে এই গ্যালাক্সির সবচেয়ে উন্নত প্রায় একশোটি সভ্যতার এক মহাজাগতিক জোট । সেই জোটের হাতে আছে ফেমটো-টেকনোলজি --- পদার্থের সূক্ষ্মতম মৌলকণা একটা একটা করে সাজিয়ে জটিল সব জিনিস তৈরির ইঞ্জিনিয়ারিং । অনেকটা আপনাদের ‘ন্যানোটেকনোলজি’-র মতই, কিন্তু তার সাথে এর ক্ষমতার তুলনা চলেনা । এ দিয়ে একটা ধূলিকণার সমান জায়গার মধ্যে একটা সুপার কম্পিউটার কিম্বা বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে ফেলা যায় । তাহলে গোটা তারাকে ঘিরে থাকা অতবড় একটা যন্ত্রের ক্ষমতা কেমন হতে পারে ভাবুন । ওরই একটা ছোট্ট স্লটে গুঁজে দেওয়া হবে আপনাকে, আরও ওই রকম লক্ষ-কোটি প্রাণির মত ।

তাদের মধ্যে কয়েকজন অবশ্য খুবই জ্ঞানী, স্বেচ্ছায় আত্মত্যাগ করেছেন জ্ঞানের অগ্রগতির স্বার্থে । তাছাড়া এ এক ধরনের অমরত্ব, তার লোভও তো কম নয় ! বলা বাহুল্য, আপনিও পাবেন সে অমরত্ব । আপনাদের হিসেবে আর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই আমরা জেনে যাব সংখ্যা, পদার্থ, শক্তি, মন ও সভ্যতার আদি ও অন্ত । সে জানার মধ্যে থাকবেন আপনিও । অনন্তকাল ! শুভেচ্ছা আপনাকে । এবার আপনাকে আমার শরীর থেকে খুলে নেওয়া হবে, কারণ আমরা গন্তব্যে এসে পৌঁছেছি । তার আগে শুধু এইটুকু আপনাকে বলা দরকার, যে, আমি হচ্ছি গ্যালাক্সি ঢুঁড়ে নমুনা সংগ্রহ করার জন্য তৈরি এক যন্ত্র মাত্র । নমুনা সংগ্রহ করে, তাকে কম্পিউটারে কপি করে, ঠিকভাবে কপি হয়েছে কিনা যাচাই করে যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়াই আমার কাজ । আমাকে খুব সাবধানে এগুলো করতে হয়, কারণ কপি করার সময় নমুনা শারীরিক বা মানসিক আঘাত পেলে কপি ভাল হয়না । আপনার সঙ্গে গল্প করাটা ছিল ওই যাচাই করবার একটা অঙ্গ । আশা করি আপনাকে আঘাত দিইনি । আচ্ছা, ধন্যবাদ, বিদায় !’

তার পর মুহূর্তের নিস্তব্ধতা । আর তারও পরে ............ অন্ধকার, অন্ধকার, স্রেফ অন্ধকার ।

* * *
ছায়াপথ নক্ষত্রপুঞ্জের কেন্দ্রের কাছাকাছি মাঝারি আকারের এক উজ্জ্বল তারাকে ঘিরে আস্তে আস্তে গড়ে উঠছে নিউক্লীয় ধাতুর তৈরি কল্পনাতীত আকারের এক কাঠামো --- অসাধারণ কারুকার্যওয়ালা । কোথাও কোথাও কাজ সম্পূর্ণ হয়ে এসেছে, তবে বেশির ভাগ জায়গাতেই এখনও শুধুই ধাতুর কঙ্কাল । অসংখ্য রোবট মসৃণ দক্ষতায় চালিয়ে যাচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন নির্মাণকার্য । মাঝে মাঝে কিছু বিচিত্রদর্শন প্রাণি ইতস্তত ঘুরে ঘুরে কাজকর্ম দেখভাল করছে । দূরে কোথাও দেখা যাচ্ছে ধাতব ছক কাটা ধূ ধূ প্রান্তর, তাতে অহরহ মহাকাশযান উঠছে আর নামছে । এই সমস্ত কিছু পরিচালনার জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি অত্যাশ্চর্য ডিজাইনের প্রকাণ্ড অফিস-বিল্ডিং, মাথায় তাদের মুকুটের মত ঝলমল করছে রকমারি সব জটিলাকৃতি গম্বুজ । তারই একটির মধ্যে এক প্রায় ফাঁকা ঘরে নিবিষ্টমনে কাজ করছিলেন একজন ।

তাঁর নিচের দিকটা প্রায় একটা উদ্ভিদের কাণ্ডের মত, ঘন সবুজ । আর তার ওপরে অনেক ফুটোওয়ালা রামধনু রঙের এক তাল দেহ, তা থেকে চতুর্দিকে বেরিয়েছে বেগুনি আর মেরুন রঙের উনিশটা শুঁড় । তাঁর সামনে রয়েছে ত্রিমাত্রিক ভিডিও মনিটর, তাতে শূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে বিচিত্র দৃশ্যাবলী । আশ্চর্য ব্যাপার, দৃশ্যগুলো সবই পৃথিবীর । তাঁর সামনে আরও কাছে শুঁড়ের নাগালের মধ্যেই ভাসছে একটি ফুটবলাকৃতি কীবোর্ড । রামধনু-অক্টোপাসের শুঁড়গুলো বিদ্যুৎগতিতে ফুটবল-কীবোর্ডের চতুর্দিকের বোতামগুলোকে টিপতে লাগল, এক অপরূপ লয় ও ছন্দ সহকারে । বার্তা গেল সেই মহাকায় জ্ঞানযন্ত্র-উপনিবেশের বিপরীত প্রান্তে ।

সেখানে আর এক মুকুট-গম্বুজের মধ্যে আরামদায়ক কিন্তু প্রায়-অদৃশ্য আসনে সমাসীন রয়েছেন এক প্রতিভাধর প্রযুক্তিবিদ, পদমর্যাদায় এই প্রকল্পের সর্বাধিনায়কের ঠিক চার ধাপ নিচে, যদিও অল্পবয়সী যন্ত্র-জাদুকর হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত খ্যাতি সর্বাধিনায়কের থেকে এমন কিছু কম নয় । কম নয় অবশ্য তাঁর বপুটিও --- লেজ ধরলে তাঁর দৈহিক উচ্চতা কুড়ি ফুটের সামান্য বেশিই হবে । তিনি ত্রিমাত্রিক মনিটরে খুঁটিয়ে দেখছিলেন নির্মীয়মাণ জ্ঞানযন্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশের নকশা । সাংঘাতিক জটিল । এক প্রথমসারির মহাজাগতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল এটি প্রস্তাব করে পাঠিয়েছেন, এবং এটিকে বিবেচনা করে গ্রহণ বা বাতিল করার জন্য তিনি ঘন্টা দুয়েকের বেশি সময় পাবেন না । তাঁর কুমিরের মত লম্বা চোয়াল ঝুঁকে পড়েছে, নিবিষ্ট বাদামী চোখ আর ডিম্বাকৃতি সবুজ তারার চকচকে আস্তরণের ওপর প্রতিফলিত হচ্ছে ত্রিমাত্রিক মনিটরে ভেসে বেড়ানো নকশার টুকরো টাকরা, লেজ রয়েছে টানটান । আঁশওয়ালা আঙুলগুলো চেপে ধরেছে অদৃশ্য চেয়ারের হাতল, সেই আঙুলের ডগায় লম্বা আর বাঁকানো তীক্ষ্ণ নখগুলোতে লাগানো এক অদ্ভুত নেলপালিশ বিকিরণ করছে কচি কলাপাতা রঙের হাল্কা আলো । প্রায়ান্ধকার ঘরটিতে ত্রিমাত্রিক মনিটর ছাড়া আলোর উৎস বলতে ওটাই । হঠাৎ মনিটরের নকশা সরে গিয়ে ভেসে উঠল এক বার্তা --- ‘সুর্যের তৃতীয় গ্রহ থেকে ভাল নমুনা এসে পৌঁছেছে স্যার । আমি পুরোটা দেখেছি, চমৎকার রেকর্ডিং ! সভ্যতা তত উন্নত নয়, কিন্তু ভীষণ ইন্টারেস্টিং প্রজাতি । এদের সম্পর্কে আগে থেকেই আমাদের ভাল রিসার্চ আছে ।’

একবার উচ্চকিত হয়েই ব্যস্ত প্রযুক্তিবিজ্ঞানীর বাদামী চোখ বিরক্তিতে কুঁচকে কালচে হয়ে এল । তাঁর কমলা জিভ আর হলুদ কাঁটার সারির মত দাঁতগুলো একবার দেখা গেল । মাথার মাঝখান থেকে শুরু হয়ে পিঠের মেরুদণ্ডের ওপর দিয়ে প্রায় লেজের শেষপর্যন্ত চলে যাওয়া করাতের দাঁতের মত কালচে কাঁটাগুলো সামান্য খাড়া হয়ে উঠল । আঁশওয়ালা আঙুলগুলো চেয়ারের হাতল থেকে আলগা করে মেঝেতে লেজ আছড়ালেন তিনি । তারপর কচি-কলাপাতা-আলো খচিত নখ দিয়ে প্রকাণ্ড অবতল কীবোর্ডে দ্রুত টাইপ করলেন, ‘এই সামান্য কারণে বিরক্ত করলে ? কত জরুরি কাজ করছি সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র ধারণা আছে তোমার ? আরে তোমার তো রুটিন কাজ ! নমুনা এসেছে, ঠিকঠাক স্লটে লাগিয়ে দেবে । কোনটা কোন স্লটে যাবে তা যদি নিজে নিজে বুঝতে না পারো তাহলে আর নিজেকে ইঞ্জিনীয়ার বোলো না । সঙ্গে সঙ্গে মনে না পড়লে যে মনিটরে স্কিম্যাটিক সাইট-ম্যাপটা দেখে নিতে হয়, এও বুঝি আমায় বলে দিতে হবে ? যাক গে যাক । ওটা তেরশো একান্ন নম্বর সেক্টরের পঞ্চান্নর দুই সাব-স্লটে ঢুকিয়ে দিতে বল । রোবট বাহিনীর ইনচার্জ-কে নির্দেশ দাও । এক্ষুনি ।’

--- না স্যার, সে সব তো জানি, চিন্তা করবেন না । কিন্তু বলছিলাম কি ............ আমতা আমতা করেন রামধনু-অক্টোপাস ।

--- ওফ, আবার কী ? বল বল, তাড়াতাড়ি বল । তাড়া লাগালেন কুমির-মানব ।

--- বলছি স্যার । রেকর্ডিং প্লেব্যাক-এ দেখলাম, এই নমুনাটি বহুক্ষণ একটানা কাজের শেষে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল । যেখানে শেষপর্যন্ত এসে পৌঁছল সেও তো এক রকমের বাড়িই । প্রকাণ্ড, চিরকালের বাড়ি । এর চেয়ে ভাল বাড়ি আর কোথায়ই বা পেত বলুন স্যার ? ওদের প্রজাতি নিয়ে আমাদের গ্রহের তুলনামূলক সভ্যতাতত্ত্বের বিশারদরা খুব ভাল কাজ করেছেন, আমি অনেকটা পড়েছি । ওদের সমাজ-সংগঠন, ব্যক্তিসম্পর্ক আর আবেগের প্যাটার্ন-টা আমাদের সঙ্গে খুব মেলে, যদিও সভ্যতার স্তরটা অনেক নিচে, আর জীব হিসেবেও ওদের সাথে আমাদের কোনও মিলই নেই । কী আশ্চর্য ব্যাপার, তাই না স্যার ?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রযুক্তি-বিশারদ কুমির-মানব তাঁর আঁশওয়ালা আঙুলে টাইপ করেন, ‘শোন হে, মনে হচ্ছে ডাক্তারের দেওয়া ওষুধপত্তরগুলো ঠিকঠাক খাচ্ছ না, আর তোমার ঘরের কার্বন মনোক্সাইড সাপ্লাইয়েও বোধহয় কোনও গণ্ডগোল হচ্ছে । চিন্তা নেই, তোমার কথা শুনতে শুনতেই আমি জায়গামত খবর পাঠিয়ে দিয়েছি, লোক চলে যাবে । আর তোমার ছুটির ব্যবস্থাও আমি করব, কিন্তু সামনের ডেডলাইন-টা সাক্সেসফুলি মিট করতে পারলে তবেই, তার আগে কিছুতেই নয় । এখন কাব্যি-টাব্যি ছেড়ে দিয়ে মন দিয়ে কাজ কর, আর খুব ক্রিটিক্যাল ব্যাপার ছাড়া আমায় ডেকো না । ওক্‌কে ?’

--- ওকে, স্যার । জবাব দিলেন রামধনু-অক্টোপাস ।

--- ওহো, ইয়ে, শোন ! কী মনে করে আবার বার্তা পাঠালেন কুমির-মানব ।

--- ইয়েস স্যার ? তৎপর হয়ে সাড়া দিলেন রামধনু-অক্টোপাস ।

--- নমুনার দেহটার কথা আবার ভুলে যেও না, ওটা যেন সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় মিউজিয়ামে চলে যায় । ওর কপিতে পরে কোনও গণ্ডগোল হলে ওই দেহ কিন্তু রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগবে ।

--- হ্যাঁ স্যার, সে তো স্ট্যাট্যুটরি রুল । করে দেব, চিন্তা করবেন না স্যার । ওভার ।

--- ওভার ।

ব্যস্ত প্রযুক্তি-জাদুকর আবার জটিল নকশার খুঁটিনাটিতে মনোনিবেশ করলেন ।


857 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন