Kallol Lahiri RSS feed

Kallol Lahiriএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • দক্ষিণের কড়চা
    গরু বাগদির মর্মরহস্য➡️মাঝে কেবল একটি একক বাঁশের সাঁকো। তার দোসর আরেকটি ধরার বাঁশ লম্বালম্বি। সাঁকোর নিচে অতিদূর জ্বরের মতো পাতলা একটি খাল নিজের গায়ে কচুরিপানার চাদর জড়িয়ে রুগ্ন বহুকাল। খালটি জলনিকাশির। ঘোর বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে পচা লাশের মতো। যেহেতু এই ...
  • বাংলায় এনআরসি ?
    বাংলায় শেষমেস এনআরসি হবে, না হবে না, জানি না। তবে গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আজ ব্লক অফিসে গেছিলাম। দেখে তাজ্জব! এত এত মানু্ষের রেশন কার্ডে ভুল! কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম প্রায় সবার ভোটারেও ভুল। সব আইকার্ড নির্ভুল আছে এমন ...
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...
  • খানাকুল - ২
    [এর আগে - https://www.guruchan...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

শান্তিগোপাল

Kallol Lahiri

গুটি গুটি পায়ে নেমে আসছে শীতের সন্ধ্যে আমাদের বালির বাসার দশ ফুট বাই দশফুটের উঠোনে। আজ একটু তাড়াতাড়ি মনি সন্ধ্যে দিয়েছে। শাঁখ বাজিয়েছে। ঠান্ডা লাগবে বলে মা আমাকে দুটো গেঞ্জির ওপর একটা ফুলহাতা সোয়েটার পরিয়েছে। ভালো করে মাথা, কান আর গলা ঢেকে জড়িয়ে দিয়েছে মাফলার। তারপরেও ব্যাগে রেখেছে একস্ট্রা একটা চাদর, পা ঢেকে বসার জন্যে। ডিবে ভর্তি করে সাজানো হয়েছে পান। মনি আর মা খাবে। ছোট্ট এ্যালুমনিয়ামের টিফিন কৌটোতে নেওয়া হয়েছে বিস্কুট। পিসির ভাজা নিমকি। আমি ঠাকুরের থালা থেকে গোটা কতক বাতাসাও লুকিয়ে রেখেছি সেখানে। আমরা তিনজনে চলেছি গঙ্গার ধারের মাঠে। আজ সেখানে যাত্রা হবে। তরুন অপেরার ‘আমি সুভাষ বলছি’।

পাঁচুদা একমাস ধরে রিক্সা করে মাইক নিয়ে টিকিট বিক্রি করেছে। সকাল সন্ধ্যে লোকটাকে চিতকার করে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি এপাড়া-ওপাড়া। আজ পাঁচুদা হাসি হাসি মুখ করে একটা বড় ভলেন্টিয়ার ব্যাচ আটকে বসে আছে মাঠে ঢোকার বড় গেটের পাশে। সব টিকিট শেষ। হাউজ ফুল। “মাসিমা একটু তাড়াতাড়ি পা চালান, সামনের দিকে তো সব বেপাড়ার লোক ভর্তি করে দিলো।” আমরা তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারি না। কিছুদিন আগে রিলিফ ক্যাম্পে মনির ছানি অপারেশান হয়েছে। দুই মহিলার একমাত্র পুরুষ প্রতিনিধি আমি। দায়িত্ত্ব কি কম? মনিকে বলি আস্তে হাঁটো তো, জায়গা আমাদের ঠিক রাখা থাকবে। ওরা অবাক হয়। “আমাদের জায়গা কে রাখবে টুকনু?” আমি বলি কেনো? যাত্রা দলের লোকেরাই রাখবে। মা ধমকায়। ভাবে এও বুঝি আমার খেলনাবাটির কাল্পনিক সংসার। মাকে তো আর বলিনি ভলেন্টিয়ার ব্যাচ না থাকলেও কতবার যে ঢুকেছি প্যান্ডেলে তার ইয়ত্তা নেই। কতবার যে গ্রীন রুমের সামনে গিয়ে উঁকি দিয়েছি। বাস থেকে যাত্রা দলের জিনিস নামানোর সময় দাঁড়িয়ে থেকেছি ঠায়। বড় বড় টিনের সিন্ধুকের মধ্যে আছে সৈন্যদের পোষাক। বন্দুক। কামান। এই সব আমাকে কানাই বলেছে। তার সাথে ভাব করে নিয়েছি। সেই আমাকে বলেছে কনর্সাট দলের পাশেই জায়গা রাখবে।

সে এক হই হই... রই রই... ব্যাপার! গঙ্গার ধারের মাঠে দাঁড়িয়ে আজ নেতাজী চিতকার করে বলবে “দিল্লী চলো।” যুদ্ধ ঘোষণা করবে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে। তাই কাছ থেকে না দেখলে চলে? “নেতাজী কে জানিস তো?” কানাই বড় বড় চোখ করে আমার কাছে জানতে চায়। আমি ঘাড় নেড়ে বলি খুব। এইসব গল্প আমাকে গোরা নকশাল বলেছে। গোরা নকশালের একটা পা খোড়া। পুলিশ নাকি ভেঙে দিয়েছে। থাকে গঙ্গার ধারের বাড়িটার চিলে কোঠায়। অনেক বই আছে জানো গোরা নকশালের। কানাই বলে “সেতো আমাদের বাবুর বাড়িতেও আছে।” কে তোমাদের বাবু? “উফ, তুই তো দেখছি কিছুই জানিস না!” বিরক্ত হয় কানাই। “এই যাত্রা দলটা যার। যে আজ সুভাষ সাজবে। খুব পন্ডিত মানুষ। ধন্যি ধন্যি করে লোকজন। শান্তিগোপালের নাম শুনিস নি তুই?”

কানাইয়ের সাথে আমি সেঁটে থাকি সারাদিন জল ছবির মতো। আমি শুনি যাত্রা দলের কথা। কানাইয়ের কথা। শুনি কত নতুন নতুন জায়গায় ওরা যাত্রা করতে যায়। রাতের পর রাত বাসেই কেটে যায় অনেক সময়। ঘাড় উঁচু করে স্বপ্ন দেখি আমিও বেড়িয়ে পড়েছি কানাইয়ের সাথে। আমারো বাসের সামনে লেখা ‘তরুন অপেরা’। বেলা পড়তে থাকে। কানাই বড় স্টোভ জ্বালায়। বড় একটা কেটলিতে জল ঢালে। সাদা এ্যাম্বাসাডারে করে আসেন শান্তিগোপাল। আমি দূর থেকে দেখি। কানাই ডাকলেও যেতে পারি না। কারণ ওখানে তো দেখছি স্কুলের হেডমাষ্টার, মনি স্যার সবাই আছে। খুব কথা বলছেন সবাই। গেলেই যদি জানতে চায় আজ স্কুলে যাইনি কেনো?

লেলিনের বড় কাট আউটের পাশের গেটটায় বেশি ভিড়। সেখান দিয়ে আমরা ঢুকি। শক্ত করে হাত ধরে রেখেছে মা আমার। পাছে হারিয়ে যাই। আমাদের টিকিট একেবারে সামনে। চাটাইয়ে বসার। কিন্তু সেখানেও গিজ গিজ করছে লোক। এতো লোক আমি কোনোদিন দেখিনি। বিকেলে যে স্টেজটাকে অসুন্দর মনে হয়েছিলো এখন সেখানে কত রকমের আলো। লোকের আওয়াজে গমগম করছে মাঠটা। কিন্তু কানাই কোথায়? মা বসিয়ে দেয় আমাকে। কিছুতেই যেতে দেয় না ভিড় ঠেলে কনর্সাটের কাছে। আমি খুঁজে পাই না অত ভিড়ে কানাইকে। আলো ক্রমে কমে আসতে থাকে। ঘন্টা পড়ে ঢং। বেজে ওঠে হারমোনিয়াম। সানাই। স্টেজের লাইটগুলো বন বন করে ঘুরতে থাকে। সেই আলো আঁধারির মধ্যে যুদ্ধ হয়। কত শত মানুষ মরে। কত শত মানুষ প্রান দেয় দেশের জন্যে। উঠে আসেন সুভাষ। জনতার হাততালিতে ফেটে পড়ে মাঠ। উত্তেজনায় আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। খুলে ফেলি মাফলার। এই লোকটাকেই তো আজ বিকেলে দেখেছি। এই মুহূর্তে সে চিতকার করে বলছে, “তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো।” পাশে চেয়ে দেখি মনির ছানি কাটা চোখেও করুনাধারা। দেশ ছাড়া গ্রাম ছাড়া মানুষগুলো অবাক হয়ে চেয়ে থাকে সেই নানা রঙের আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সুভাষের দিকে। যে একদিন সত্যি বলেছিলো স্বাধীনতা এনে দেবে। মনি শেষদিন পর্যন্ত বিশ্বাস করতো নেতাজী থাকলে দেশভাগ হতো না।

তারপর যে কতবার গোরা নকশালের চিলেকোঠায় আমাদের যাত্রা যাত্রা খেলার মধ্যে আপনি নেমে এসেছেন শান্তিগোপাল তার হিসেব আমার কাছে এখন আর নেই। ঠিক করে ফেলেছিলাম বড় হয়ে যাত্রা করবো। টো টো করে ঘুরে বেড়াবো আপনার মতো এক জেলা থেকে আর এক জেলায়। হয়নি। কিন্তু কি আশ্চর্যের সমাপতন, বহুদিন পর এক ঐতিহাসিক লগ্নে আপনার সাথে আমার দেখা হয়েছিলো। আপনি তখন অসুস্থ। ঘোষণা করেছিলেন আপনার শেষ অভিনয়ের দিন। গিরিশ মঞ্চে সেদিন বাঁধ ভাঙা ভিড় ছিলো না। পাদ প্রদীপের শেষ আলোয় যখন শেষ বারের মতো আপনি এসে দাঁড়ালেন মঞ্চে, আমি তখন হাত তালির শব্দ খুঁজছিলাম। আমি খুঁজছিলাম মনিকে, গঙ্গার মাঠটাকে। গমগম করা মানুষের ভিড়কে। খুঁজছিলাম সেই সন্ধ্যাটাকে যাকে আমি হারিয়ে এসেছি বহু যুগের ওপারে। সেদিন লক্ষ্মীর ভাঁড় ভেঙে যে মানুষ গুলো আপনার যাত্রার টিকিট কেটেছিলো তারা আজ নেই। কিন্তু রয়ে গেছে স্মৃতি। আপনি আমার সেই স্মৃতির শ্রদ্ধা গ্রহণ করুন।

315 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: শান্তিগোপাল

রেসের ঘোড়ার মতোই বুঝি কীর্তিমান জগত শো-বিজ। বিদায় বেলা তুমুল করতালি, বাগান শূন্য করা ফুল না থাক, কিছু নিভৃত ভালবাসা আছে, এটুকুও সামান্য নয়।

আরো লিখুন।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন