সুকান্ত ঘোষ RSS feed

কম জেনে লেখা যায়, কম বুঝেও!

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
    ভারত আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র - মিল কতটুকু?একটি দেশ যদি বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী অর্থনীতি হয়, আরেকটির হাল বেশ নড়বড়ে - মানুষের হাতে কাজ নেই, আদ্ধেক মানুষের পেটে খাবার নেই, মাথার ওপরে ছাদ নেই, অসুস্থ হলে চিকিৎসার বন্দোবস্ত নেই। অবশ্য দুর্জনেরা বলেন, প্রথম ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    গরু বাগদির মর্মরহস্য➡️মাঝে কেবল একটি একক বাঁশের সাঁকো। তার দোসর আরেকটি ধরার বাঁশ লম্বালম্বি। সাঁকোর নিচে অতিদূর জ্বরের মতো পাতলা একটি খাল নিজের গায়ে কচুরিপানার চাদর জড়িয়ে রুগ্ন বহুকাল। খালটি জলনিকাশির। ঘোর বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে পচা লাশের মতো। যেহেতু এই ...
  • বাংলায় এনআরসি ?
    বাংলায় শেষমেস এনআরসি হবে, না হবে না, জানি না। তবে গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আজ ব্লক অফিসে গেছিলাম। দেখে তাজ্জব! এত এত মানু্ষের রেশন কার্ডে ভুল! কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম প্রায় সবার ভোটারেও ভুল। সব আইকার্ড নির্ভুল আছে এমন ...
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

সমস্ত রাতের গন্ধে তুমি কি পতঙ্গ রঙ পাও?

সুকান্ত ঘোষ

পর্ব – দুই
-------------------------------
সমস্ত রাতের গন্ধে তুমি কি পতঙ্গ রঙ পাও?

“ডাচেরা ফুল ভালোবাসে” এই নিয়ে কবিতা হতে পারে, অথচ ডাচেদের নিয়ে কবিতা লেখার তেমন কিছু নেই আপাত দৃষ্টিতে। ওরা আঁকতে পারে, ডাচেদেরও আঁকতে পারি – সেই উইন্ডমিল, কাঠের জুতো, সাদা-নীল ফ্রক পরে হাত ধরে ঘুরতে থাকা তরুণী, যৌবন, কানের পাশ দিয়ে লতিয়ে নামা সোনালী চুল। এ শহরে কেউ নীল সাদা ফ্রক পড়ে না – গ্রীষ্ম পোষাক উড়িয়ে দেয় নয়ত হিম হিম করে আসা কান ঢাকা, খয়েরী ঠোঁটের ওভারকোট মাথায় নীচু করে বাতাস এড়িয়ে চলে। কিংবা জং ধরা ক্রীং ক্রীং থেকে তাকিয়ে আছে প্রায় অপলক ভেজা রাস্তায়। আমি পাঁচতলা থেকে তেমনি দেখে চলেছি অনেকদিন, হাতে কফির কাপ জুড়িয়ে আসে – ডাচেরা ক্যানেল পেরিয়ে যায় নিয়মিত।

ওভানের টুং শব্দ জানান দেয় সকাল শেষ প্রায়, হাতের কফি ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। ঝুঁকে সেই মেয়েটিকে ডাকতে ইচ্ছে করে ফুলের ছাপ দেওয়া পলকা স্কার্ফ অজান্তেই পিছনে পড়ে থাকে যার। আমি কিছু কথা বলি নিশ্চিত, তবে জানালার কাঁচের ওপাশের কুয়াশা রয়ে যায়, ধূসর হয়ে আসা মসৃণ ইঁটে বিছানো চাদর, মেয়েটি বাঁকে হারায়।

“এই অণুক্ষণে আমি নেমে গিয়ে সুবর্ণরেখার সন্ধান করি
একদা যে জানালার আগে সবুজ পাতারা
আজ ধূলিকণা লাল ভাবে লেগে যায় একরাশ সতেজ বাতাসে
ওই যুবতীরে চিনি - ঠিক আগের মতই বাস ধরতে আসে সকালে

ইহা কবিতা নহে অথবা গোলাপি প্রচেষ্টা
তবুও নিয়মিত অবগাহন - সেই জলমগ্ন নদী
সেই অবধারিত বিকেলের পর যেমন ভাবে নিষিদ্ধ জামারা
দৌড়ে যায় আমার পাশের ট্রেডমিলে, আমি জানি এই অণুক্ষণ
কবিতা ছিল প্রতিটি পদক্ষেপে

বস্তুত উহাদের টি-সার্টের রঙ গোলাপী হতে পারত
এবং সতেজ বাতাস
বাইকের পিছনে নিষিদ্ধ কি দারুণ দিনগুলি
জলকন্যারা অবগাহনে যায়, তাদের মসৃণে ঝরে যায়
আমারই অলিখিত প্রতিটি অণু কবিতা”।

মেয়েটিকে নিয়ে কবিতা লেখাই যায় – মেয়েটির ফেলে আসা স্কার্ফ নিয়েও। চাদর ফেলে আসা এক স্বাভাবিক ঘটনা, আবার ইচ্ছাকৃতও। তোমার কি সেই ফেলে আসা চাদরের গন্ধ নিতে ইচ্ছা করে? গন্ধে মানুষ চেনা যায়, গন্ধ স্মৃতি ভার করে দেয় কারো কারো –

সঙ্গী কাঠের ব্রীজের পুরানো ঢালাই লোহার রেলিঙে হেলান দিয়ে বলে, তোমায় এক ওড়নার উপকথা শোনাই তাহলে। হেরেনগ্রাকট্‌ ক্যানেলের পাশের গীর্জার ঘড়িটা অনেক গভীর রাতের ঘোষণা দেয়। অদূরে সেন্ট্রাল স্টেশনের দিকে পিছন ফিরে সেই আধ পাগল বেহালা বাদক রোজকার মত আজকেও বেহালা বাজায় এতো রাতে। আমি তো সুরের অঙ্ক জানি না, তবুও মনে হয় এ যেন বেদনা মেপে লেখা। সঙ্গী ওড়নার উপকথা শোনায়, আমি দেখি সেই চুঁইয়ে আসা বেদনা ক্রমশঃ পায়ের দিকে গড়িয়ে আসছে। ওড়না ভিজে যাচ্ছে বেদনায় – রাতের অন্ধকারে বেহালা বাদকের চোখ ঢাকা – আমি ভেজা রং চিনে নিতে চাই। রাতের অন্ধকার যেন ফিস ফিস করে ওঠে, তুমি কি জানো না, বেদনার রং সব সময়েই নীল? সকালের গল্প রাতেই পরিণতি পায় – সকাল কিন্তু সর্বদা মনে রাখে না বেহালা বাদকের গা থেকে গড়িয়ে পড়া বেদনা কিংবা ওড়নার উপকথা।

“একই ভাবে বারান্দায় বিয়ার চাতক
অগণিত তরুণী হেঁটে যায় স্বাস্থ্য সচেতন
আর কাঁধের ওড়নার রঙ পাল্টে যাবতীয় পোষাকের
সাথে মেলালে বিকালগুলি কেমন ফেনাভ হয়ে ওঠে
যাহারা বিয়ার পান করে না তারাও স্বপ্নালু
আমিও যেমন ঈষৎ রক্তাভ চোখে পরোক্ষ মদিরা পানের
আহ্বানে পাই প্রগলভ নিউরোণ
এগুলি হয়ত কাঙ্খিত নয় অথবা বাস্তবও
যৌথভাবে মিলিত হবার আশঙ্কাকে
নাম দেওয়া হয় প্রবলতা, আর আমার যেহেতু ভাবে
আসে তেমনি সব ফেনিল অনুভূতি - উহাদের
সংঞ্চায় উত্তেজিত অথচ কামার্ত নয় এমন যুবতীরাই
ওড়ানার পাশে হেঁটে যায় রোদ কাঁচের
পাশে সেই বিয়ারীয় পিপাসা এক সম্ভাব্য
ঠান্ডা আর অবশ্যাম্ভাবী চুম্বন”।

আমার দেশ নদীমাতৃক, এদেশ ক্যানেল সজ্জিত। সেই সকল ক্ষীণধারার এক প্রযুক্তিগত প্রয়োজন এবং ব্যখ্যা ছিল, কিন্তু আজ আর কেউ তা মনে করিয়ে দেই না। এ কেবল সৌন্দর্য্য সাথী, গ্রীষ্মের নৌকাবিহার, শীতের স্কেটিং এবং সবসময়ের কফি বা পানীয়র গ্লাস নিয়ে বসে থাকা। ক্যানালের ধারে বিকালের রং অন্যরকম, সেই রঙের হদিশ পেতে আমি হেঁটেছি অনেক। আবার দৌড়েছিও অনেক, গায়ে গা ঠেকে যেত হয়ত অন্য বাদামী চুলের সাথে, তার হাত ধরা প্রণয়ের সাথে - সেই পর্যটক ভারাক্রান্ত সরু রাস্তায়। শুধু তা হলে বাদামী চুল কেন? জানি না – স্পর্শ তো অনেকেরই থেকে যায়, কেবল কে জানিনা স্মৃতিতে বাদামী চুল উঁকি মারে।

ক্যাথেরিনের চুল বাদামী ছিল নাকি সোনালী? ইম্পিরিয়াল থেকে পাশ করে সে আমাদের অফিসে এসে ঢুকলেও আমাদের বিভাগে নয়, ফলতঃ আলাপ হয়েছিল বিকেলের জিম্‌-এ। আমি তখন নদীর দিকে মুখ করা, যার দক্ষিণ দিকে রয়েছে আমষ্টারডাম সেন্ট্রাল ষ্টেশনের কিছু স্থাপত্য চূড়া – ট্রেডমিলে দৌড়াচ্ছি। বেশী কেন তাকানো যায় না? আমার পাশে সে দৌড়াতে শুরু করে – আমি পাই যেন চুলের ছোঁয়া, বড় কাছাকাছি, বড় দূরে। তোমার চুলে কি শ্যাম্পূর গন্ধ বেরোয়? তোমার ঘামের গন্ধ সরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে কি সেই শরীরে বড় লেগে থাকে অ্যাডিডাসে লাগানো কোন সৌখিন সুবাস? আরো অনেক পরে ক্যাথারিন তোমার শরীরে টের পেতাম আলবার্তোকে। ওকে আমি অনেক দিন থেকে চিনি যে!

শুক্রবার বিকেলে খুব কম কেউ জিমে আসে - জেটির কাছে সেই ‘কাফে ডি-পন্টের’ হাতছানি বরং আরো সমধুর। তবে তা ওই সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্তই – তারপর গৃহস্থ বাড়ি ফেরে স্টিমারে। শূন্য বাড়ির হাতছানির আমরা স্টেশনের ভিতর দিয়ে চলে যাই সেই ঘটমান পাড়ায়। আমাদের সিনিয়ররা চিনিয়ে দিয়েছিল বহু পুরানো, তাদেরও সিনিয়ারদের চিনিয়ে দেওয়া ছোট্ট কোনার পাব-টি। সবাই তার খোঁজ জানে না, আর জানলেও তার মাহাত্ম বুঝে উঠতে পারে না। এই শহরের সবচেয়ে পুরানো পাবগুলির অন্যতম – ভালোই হয়েছে কোন টুরিষ্ট গাইড বই-য়ে এখনো এর নাম ওঠেনি বলে। চেনা অনেকের সাথে দেখা হয়ে যায়।

“সন্ধ্যা ৭।৩০
পারস্পরিক মদিরাপানের আমন্ত্রণ উপেক্ষা করা গেল না
প্রিয়তমারা মানুষী হয়ে যায় এই সমস্ত পানশালায়
লৌকিক প্রথা মেনে । গোলাকার টেবিলের পতঙ্গ রঙ
মাখিয়ে ব্যবহার্য গ্লাসে ভরে তোলা যায় এক বিষাদ চুমুক
অভ্যাস মত । অথচ দেখা যায় মানুষীরাই প্রিয়তমা হয়ে ওঠে
সেই অমোঘ পানশালায়

বিকেল ৪।৩০
ঠিক এখন থেকেই গুণতে শুরু করে যারা গোধূলি আলো
আমি তাদেরই একজন বহুদিন ।
কিন্তু আহ্বান জানি বা আসবে এমনি বেলায়
অনেক পরের পতঙ্গ রঙ গায়ে মাখিয়ে নিতে ভালোবাসে
সবুজ জেনো । তাদের ফাঁকেই বিকেল গলতে গলতে সাঁঝবেলা
কেমনে ক্লোরোফিল হতেই পারে পতঙ্গভুক

দুপুর ১।৩০
স্যান্ডউইচ থেকে বেরিয়ে আসা লেটুস পাতারা
আমাকে বিকেলের কথা মনে পড়ায়, আবার তোমাকেও
যারা ঈর্ষায় সবুজ হয়ে যায় তাদেরই চোখে লেগে থাকে ক্লোরোফিল
গায়ের ত্বক দিয়ে চেনা যায় পতঙ্গ
এভাবেই খাদ্য আর খাদকের পারস্পরিক নির্ভরতা শুরু হয়
ক্রমশঃ দুপুর এগিয়ে এলে

সকাল ৯।৩০
সকাল মানেই কমলার রস সবুজ ঠোঁটের থেকে
সে এক প্রাত্যহিক নিহত হওয়া অমোঘ ভাবেই
জানি - তবু গোলাকার টেবিল ভালোবাসি যেখানে
ধূমায়িত হতে হতে গাঢ় রঙ মুছে দেয় কো্লরোফিল
ত্বকও দেখেনি প্রথম সূর্যের আলো শুধু জানালায়
আমি মিছেই চুমুক দিই এককাপ বিষাদে!

ভোর ৬।৩০
বিছানা প্রিয়তম হয়েছে - মানুষীও প্রিয়তমা
সমস্ত রাতের গন্ধে তুমি কি পতঙ্গ রঙ পাও?
প্রথা না মেনেই সব রাত
আমারই অমোঘ পানশালা ..............”।।।।

ক্যাথারিন অনেকবার এসেছিল আমার সাথে সেই পানশালায়। আলবার্তোর সাথেও আমি আসতাম প্রায়শঃই, আরো অনেকের সাথে। এইখান থেকেই তুমি কি প্রিয়তমা হতে শুরু কর ক্যাথারিন? প্রিয় ক্যাথ! আমিতো শহরের গল্প মনে করতে চাই ক্যাথ – যে শহরে তুমি থেকেছো। আমাদের পাশ দিয়ে রাতের টুরের বেরোনো সেই হিপি ধরণের গাইডের সাথে জনা দশেক তরুণ-তরুণী। এক রাতের কয়েক ঘন্টায় তোমরা কতটা চিনে নিতে পারবে এই শহর? তোমরা পুরানো গীর্জার আঁধারের কোণ থেকে যাত্রা শুরু কর। তোমাদের গাইড বলেছে কি আজকে সকালের প্রদর্শনীতে এই গীর্জায় ভিতর যেন কত অবহেলায় রাখা ছিল রেমব্রান্টের এক ছবি? ছবি দেখতে আর গীর্জায় কয়জন আসে! কয়জনই আর আসে নিয়মিত গীর্জায় বেহালাবাদন শুনতে। আমি গেছে অনেকবার – বেহালা বাদন শুনেছি, শুনেছি কনসার্ট – আমাকে নীচের ফ্ল্যাটের মোনিকা সঠিক সময়ে মেল করে দিত তার পারফরমেন্সের তারিখ। মোনিকা কোথায় চাকুরী করতে এখন আর মনে পড়ে না। মোনিকা স্বামী অফিসের কাজে ঘুরে বেড়াতো – অফিসের কাজে নাকি থেকেও যেত হত অন্য শহরে অন্য দেশে অনেক দিন। তারপর তার অন্য শহরে থেকে যাওয়ার সময় বেড়ে যেতে লাগল, ফেরার অন্তর কমতে থাকে। মোনিকাকে এই নিয়ে বিশেষ কোন উচ্চবাচ্চা করতে শুনি নি। তখনো ওদের জীবনে সন্তান নেই – বেহালা নিয়ে মোনিকা অবসর সময় কাটায় – গীর্জায় যায় মোনিকাকে পারফর্ম করতে। আমিও গিয়ে হাজির হই মাঝে মাঝে কনসার্ট শুনতে।

তুমি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস কর না? তোমাকে তো কোন দিন প্রার্থনা করতে দেখি না! তোমার ঘরে কেন অন্য ভারতীয়দের মত ছবির মাথায় ধূপ জ্বালানো নেই? এই প্রশ্ন আমাকে আর কে কে করেছিল মনে করতে ইচ্ছা করে – কিছু চমকপ্রদ উত্তরও আমার জানা, কিন্তু এখন আর কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। মোনিকা গ্যাব্রিয়াল, তুমি কি কখনো পতঙ্গ রঙ মেখেছো? আমার মত তুমিও চুমুক দাও বিষাদে – হালকা বিষাদগ্রস্ত থাকলে পতঙ্গ রঙ গায়ে বড় মানিয়ে যায়! না, না, নীল নয় – বেদনার রঙ নীল হয়, এ কেবল পতঙ্গ রঙই।

এই শহরের গল্পে সাইকেল আসবেই ঘুরেফিরে – এ শহরে সাইকেলে উপকথা তৈরী হয়, আমাদের গ্রামে যেমন দামোদরের চরে পড়ে আসা বিকেলবেলা। মোনিকা বসে আছে বেহালা কাঁধে ফেলে হালকা, ডান হাতে ছড় নিয়ে যেন উদাস খেলছে? কি ভাবছ মোনিকা? কালকের রাতের কথা যখন ফেরার কথা ছিল তোমার স্বামীর বুদাপেস্ত থেকে? আমি সেই আবছা অন্ধকারে মোনিকার চোখ বুঝতে পারি না – সে মনে হয় মনসংযোগ করছে আপ্রাণ, এই বুঝি শুরু হল তার বাজাবার পালা। এবার মোনিকা ছড় তুলে নেয়, ডান হাতের সুন্দর আঙুল এবং তারো বেশী সুন্দর তার নখ থেকে ছিটকে পড়ে আলো। আমি ডুবে যেতে থাকি বাখ্‌-এ।

বাজানো শেষে মোনিকা বেহালা ঢুকিয়ে নেয় খয়েরী বাক্সে – আমি তার পিছন পিছন বাইরে বেরিয়ে আসি, বাক্স উঠে যায় সাইলেকের পিছনে নির্দিষ্ট জায়গায়। এবার বাড়ি ফেরার পালা – রাত অনেক এখন, আমরা ফিরব যে পথে, জানি তখনো সেই পাগল বেহালা বাদক স্টেশনের ধারে সেই পথের ধারে বাজাতে থাকবে শেষ না হওয়া রাতের গল্প।

“একটি রাত্রির শেষে ওরা চলে যাবে
ওই রাস্তার উপর দিয়ে যেখানে বরফ জমেনি এখনো
এক আশ্চর্য্য অথচ সৎ আবাসভূমি

আমি মূলত একটাই কথাকার
এই পিঙ্গল রেখা, সেই রাত্রি শেষে চলে যাওয়া
সে তো ফিরে আসবে বলেই বরফেরা জমেনি
এখনো মৌখিক ভালোবেসে । আমি জানি এ বসতভূমি
ছেড়ে যেতে গিয়ে ভালোবাসা, কাগজে লেখা যত
স্মৃতি আর ছবি নিয়ে সকালের খেলা
আমি তো আগেই জানি এইভাবে কবিতারা আসে না!
অথচ তাদের অনভ্যস্ত পায়ে আজ নূপূর ধ্বনি
মিশে গিয়ে কথাকার-ও পেতে চায় অনাবিল এক
আশ্চর্য্য এক বরফ মাখানো সকাল
সমৃতি আর ছবি নিয়ে পিচ্ছিল বিরহ
সেই ধূসর ক্যানভাসে কথাকার প্রবাদপ্রতিম হতে চায়
বরফ গলানো জলরঙে

আমি ডুবুরি নই, সেই কথাকার-ও নই
তবুও প্রবাদ ভাঙার খেলায় আমারই নৈতিকতা
রাত্রি শেষে ওদের চলে যেতে বলে
ওই রাস্তার উপর দিয়ে যেখানে বরফ জমবে এখনি ......”.

বরফ পড়া শুরু হয় নি এখনো, জানি ইলিশ গুঁড়ির মত ছড়িয়ে নামবে মিয়ানো আলোর ল্যাম্পপোষ্টের চারি পাশ দিয়ে হয়ত এখনি। পকেটের ভিতর থেকে হাত বের করতে ইচ্ছে করে, দেখতে ইচ্ছা করে উলের গরমে আঙুল কতটা সজীব থাকে গভীর রাতেও। হীরের দোকানগুলি সেই কোন সন্ধ্যাবেলা বন্ধ হয়ে গ্যাছে। পড়ে আছে তাদের পশমের বাক্স – খালি, লালচে ভেলভেট আদুর গায়ে মেখে নিচ্ছে স্পটলাইট। সারি সারি ভেলভেট পারিয়ে যাই – এতো রাতেও চীজের দোকানটা খোলা কেন? ল-কলেজে পড়া পোলিশ মেয়েটি সাদা অ্যাপ্রণ গায়ে এখনো তৈরী করে যাচ্ছে স্যান্ডুইচ। আমার ফ্ল্যাটের অদূরের থাকে সে – মুখ চেনা, যদি তাকায় তাহলে হয়ত আসবে আমাকে দেখে। বরফ পড়ার কিছু আগে, এক চিলতে হাসি বড়ই মহার্ঘ্য মনে হয়। বিষাদ, বিষাদ – একমাত্র ক্ষুধাই ভুলিয়ে দিতে পারে ব্যাথাতুর রোমন্থন।

দূরে আইস স্কেটিং রিং টা দেখা যাচ্ছে – সারা দিন মশগুল থাকার পর সাদা বরফ বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, হয়ে গ্যাছে বড় এলোমেলো। কালো গামবুট পড়া এক বৃদ্ধ বরফ সমান করার কাজে ব্যস্ত মনে হয়। আমি দাঁড়িয়ে পড়ি কিছুক্ষণের জন্য – রিঙের মধ্যে ঘুরতে থাকা কাদের ভাবতে ভালো লাগে? খুব কাছে আসা যায়, দ্রুত সরে যাওয়া যায় - ক্ষণিকের উত্তেজনা তরঙ্গায়িত হয় ছেড়ে আসে পোষাকে। তোমাদের হিম লাগে না? ও, তোমরা পেশাদার? এতো পাতলা জামায় আমি বরফ দেখব নাকি নীল শিরার আস্ফালন? এই ভাবে তো আমারও ঘুরতে ইচ্ছে করে তোমাদের চারিদিকে। স্কেটিং-এ পরিবার জমা হয়। ভাই-বোন দ্যাখো কেমনে বাবার হাত ধরে অপটু পায়ে শিখে নিচ্ছে নিয়ম। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখি – অনেক দূরের পরিবারের কথা মনে হয়। আমাদের ছোটবেলায় সাদা বরফ ছিল না – একবার রাশিয়ান সার্কাস এসেছিল জীবনে। কিন্তু এত কাছ থেকে বাবার হাত ধরে কিছু কি শিখেছি? অন্যমনস্ক হয়ে যাই – পকেটের দিকে হাত চলে যায়। আমার পকেটে সিগারেট থাকার কথা নয়। সেদিনও ছিল না। আমি মুদ্ধ বালক দেখি, মুগ্ধ বালিকা দেখি – তাদের প্রথম সাবলম্বী হয়ে ওঠা। ভাবি বিষাদ – কিন্তু আনন্দের রিঙে বিষাদের ছায়া ফেলতে ইচ্ছে করে না। তার থেকে ছবি নিয়ে ভাবা যাক বরং –

“শেষ প্রায় দৃশ্যে উইন্ডমিল আঁকা পর্দা ক্লান্ত নেমে আসে
এবং কাঁপতে থাকে এবং কাঁপতে
তারপর
থাই রেস্তোঁরায় খেতে গিয়ে দেখি
একটি ঘন্টায় পেরিয়েছি দুটো ল্যাম্পপোষ্ট
বন্য তরকারিগুলো টেবিলে ছড়িয়ে থাকে
আঠালো ভাতের সাথে সাদা
কোণের টেবিলে ডন কিহোতে
ছুঁয়ে দেয় আঙুলগুলো আর পাঁচ নর্তকীর
যারা ঠিক একটি ঘন্টাতেই সাদা হয়ে আসে
লাল আর আঠালো ছাড়িয়ে
বাঁদিক থেকে সোনালি চুল চাকরাণী, বাগানে নাচতে
থাকা মেয়ে, বাদামী গাউনের রাজ-কন্যা এবং যারা যারা
বৃদ্ধা ছিল একটি ঘন্টা আগেও
তাদের বার্ধক্য খসে পড়তে কোনের দিকে
ডন কিহোতে, আমি, বন্ধুরা এবং ডন কিহোতে
ফেনানো থাই বিয়ার
তোমার বাড়ি কি পশ্চিমদিকে কিহোতে?
এভাবেই কি ব্যর্থ হয়ে যাও প্রতিটা উৎসবের দিন?
প্রায় উৎসবই নেমে আসে লাল ভেলভেট চেয়ারে
বুনো তরকারির স্বাদ মুখে নিয়ে যারা নাচতে থাকে
সেই - সবই ব্যালে হয়ে যায়
অজান্তেই
সোনালি পেশী ও সরু কোমরের দল
একটি ঘন্টায় দুটো ল্যাম্পপোষ্ট পেরিয়ে
রাত দশটা তিরিশে প্রজাপতি প্রতিদিন
মঙ্গলবারে থাই রেস্তোঁরায়
আমি ডন কিহোতে
কাঁচের দরজার ফাঁকে প্রথম নাইট বাস
কিহোতে ফিরছে হোষ্টেলে”।

আমার সামনে উইন্ডমিল ভেসে ওঠে – দুই দেশ মিলে যায়। একদেশে প্রায় সবসময় ইলশেগুঁড়ি আর অন্যদেশে ইলশেগুঁড়ি বরফ। একদেশে ল্যাম্পপোষ্ট পেরিয়ে প্রজাপতি ছুঁয়ে আমি ফিরতাম হোষ্টেলে আর অন্যদেশে এখন নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরি থাই রেস্তোঁরা ফেরত। কুৎসিত দৃশ্য দেখেছো কি তুমি যেখানে সব পাত্র পাত্রীই সুন্দর, কেবল দৃশ্যটা নিজেই কুৎসিত? আমি দেখেছি – অনেকবার, নিরুপায় থাই শক্ত জার্মান হাত ধরে বিয়ার খাচ্ছে। কারো মুখে হাসি, কিন্তু চোখে বিষণ্ণতা ঝরে পড়ছে নির্দিষ্ট ঘরে রওয়ানা দেবার আগে। আমি একদিন খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি – ছেড়ে যাওয়া টেবিলে এগিয়ে গিয়ে সাদা ট্যিসু দিয়ে মেয়েটির ফেলে যাওয়া বিষণ্ণতা মুছে নিই। ভিজে কাগজের দিকে তাকিয়ে সত্য ঘটনা অবলম্বনে কল্পনা করতে থাকি, সুদূর থাই দেশে কেউ কলেজ যাচ্ছে, কেউ কলেজ শেষে শক্ত হাত ধরছে – তবে সে অন্য রকম দৃঢতা। ছোট বোন প্রজাপতি হোক - এমনটাই একদিন বলেছিল মনে পড়ছে মাথা নিচু করে কাঁচের দরজার ফাঁকে।

[ক্রমশঃ]


560 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: pi

Re: সমস্ত রাতের গন্ধে তুমি কি পতঙ্গ রঙ পাও?

আঃ, কতদিন বাদে সুকির লেখা। জমিয়ে জমিয়ে যাদের লেখা পড়ি, তাদের একজন।
Avatar: Mahua

Re: সমস্ত রাতের গন্ধে তুমি কি পতঙ্গ রঙ পাও?

প্রথম পর্ব কৈ?
Avatar: সুকি

Re: সমস্ত রাতের গন্ধে তুমি কি পতঙ্গ রঙ পাও?



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন