বিপ্লব রহমান RSS feed

[email protected]
বিপ্লব রহমানের ভাবনার জগৎ

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • আমাদের চমৎকার বড়দা প্রসঙ্গে
    ইয়ে, স-অ-অ-অ-ব দেখছে। বড়দা সব দেখছে। বড়দা স্রেফ দেখেনি ওইখানে এক দিন রাম জন্মালেন, তার পর কারা বিদেশ থেকে এসে যেন ভেঙেটেঙে মসজিদ স্থাপন করল, কেন না বড়দা তখন ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুম ভাঙল যখন, চোখ কচলেটচলে দেখলেন মস্ত ব্যাপার এ, বড়দা বললেন, ভেঙে ফেলো মসজিদ, জমি ...
  • ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ?
    যেকোন নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে সামনে আসার পর নাগরিক হিসাবে আমাদের একটা ঈমানি দায়িত্ব থাকে। দায়িত্বটা হল অভিযুক্ত ধর্ষকের কঠোরতম শাস্তির দাবি করা। কঠোরতম শাস্তি বলতে কারোর কাছে মৃত্যুদন্ড। কেউ একটু এগিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ার ...
  • তোমার পূজার ছলে
    বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না ...
  • The Irishman
    দা আইরিশম্যান। সিনেমা প্রেমীদের জন্য মার্টিন স্করসিসের নতুন বিস্ময়। ট্যাক্সি ড্রাইভার, গুডফেলাস, ক্যাসিনো, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, দা অ্যাভিয়েটর, দ্য ডিপার্টেড, শাটার আইল্যান্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট, সাইলেন্টের পরের জায়গা দা আইরিশম্যান। বর্তমান সময়ের ...
  • তোকে আমরা কী দিইনি?
    পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন -********তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, ...
  • ইশকুল ও আর্কাদি গাইদার
    "জাহাজ আসে, বলে, ধন্যি খোকা !বিমান আসে, বলে, ধন্যি খোকা !এঞ্জিনও যায়, ধন্যি তোরে খোকা !আসে তরুণ পাইওনিয়র,সেলাম তোরে খোকা !"আরজামাস বলে একটা শহর ছিল। ছোট্ট শহর, অনেক দূরের, অন্য মহাদেশে। অনেক ছোটবেলায় চিনে ফেলেছিলাম। ভৌগোলিক দূরত্ব টের পাইনি।টের পেতে দেননি ...
  • ছন্দহীন কবিতা
    একদিন দুঃসাহসের পাখায় ভর করে,ছুঁতে চেয়েছিলাম কবিতার শরীর ।দ্বিখন্ডিত বাংলার মত কবিতা হয়ে উঠলোছন্দহীন ।অর্থহীন যাত্রার “কা কা” চিৎকারে,ছুটে এলোপ্রতিবাদী পাঠক।ছন্দভঙ্গের নায়কডানা ভেঙ্গে পড়িপুঁথি পুস্তকের এক দোকানে।আলোক প্রাপ্তির প্রত্যাশায়,যোগ ধ্যানে কেটে ...
  • হ্যালোউইনের ভূত
    হ্যালোউইন চলে গেল। আমাদের বাড়িতে হ্যালোউইনের রীতি হল মেয়েরা বন্ধুদের সঙ্গে ট্রিক-অর-ট্রিট করতে বেরোয় দল বেঁধে। পেছনে পেছনে চলে মায়েদের দল। আর আমি বাড়িতে থাকি ক্যান্ডি বিতরণ করব বলে। মুহূর্মুহূ কলিং বেল বাজে, আমি হাসি-হাসি মুখে ক্যান্ডির গামলা নিয়ে দরজা ...
  • হয়নি
    তুমি ভালবাসতে চেয়েছিলে।আমিও ।হয়নি।তুমিঅনেক দূর অব্দি চলে এসেছিলে।আমিও ।হয়নি আর পথ চলা।তুমি ফিরে গেলে,জানালে,ভালবাসতে চেয়েছিলেহয়নি। আমি জানলামচেয়ে পাইনি।হয়নি।জলভেজা চোখে ভেসে গেলআমাদের অতীত।স্মিত হেসে সামনে এসে দাঁড়ালোপথদুজনার দু টি পথ।সেপ্টেম্বর ২২, ...
  • তিরাশির শীত
    ১৯৮৩ র শীতে লয়েডের ওয়েস্টইন্ডিজ ভারতে সফর করতে এলো। সেই সময়কার আমাদের মফস্বলের সেই শীতঋতু, তাজা খেজুর রস ও রকমারি টোপা কুলে আয়োজিত, রঙিন কমলালেবু-সুরভিত, কিছু অন্যরকম ছিলো। এত শীত, এত শীত সেই অধুনাবিস্মৃত কালে, কুয়াশাআচ্ছন্ন পুকুরের লেগে থাকা হিমে মাছ ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

আমার বাবা আজিজ মেহের

বিপ্লব রহমান

আমার বাবা আজিজ মেহের (৮৬) সেদিন সকালে ঘুমের ভেতর হৃদরোগে মারা গেলেন।

সকাল সাড়ে আটটার দিকে (১০ আগস্ট) যখন টেলিফোনে খবরটি পাই, তখন আমি পাতলা আটার রুটি দিয়ে আলু-বরবটি ভাজির নাস্তা খাচ্ছিলাম। মানে রুটি-ভাজি খাওয়া শেষ, রং চায়ে আয়েশ করে চুমুক দিয়ে বাবার কথাই ভাবছিলাম।

আজ তাকে কাছেই সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে। দুদিন আগে তিনি পর পর তিনবার বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলেন। ৮৬ বছর বয়সে এই প্রথম তার পা ফস্কে গেল। নইলে এতো বছর ধরে সব কাজ তিনি একাই করেছেন। অস্বাভাবিক পরিস্কার স্মৃতি তার। আর ভীষণ বই পড়ার বাতিক।

এইসব ভাবতে না ভাবতেই অনিন্দ্য, আমার ভাতিজার টেলিফোন, দাদু, দাদু করে ওর হু হু কান্না শুনেই বুঝে গেলাম, বাবা আর নেই। বাবা অনিন্দ্যর বাসাতেই আছেন গত বছর বিশেক ধরে।

আমি তরিঘড়ি করে দৌড়ালাম। কাছেই মগবাজারে অনিন্দ্যর বাসা। সেখানে আমার বড় বোনেরা, বাবার বোনেরা, আরো সব আত্নীয়-স্বজন জড়ো হতে থাকেন। বাবাকে সিরাজগঞ্জের গ্রাম মুগবেলাইয়ে, তার পারিবাকি কবরস্থানে দাফন করার সিদ্ধান্ত হয়। পুরো বাড়িটি ধীরে ধীরে মরা বাড়িতে পরিনত হয়। অদ্ভুদ সব অচেনা লোকেরা পুরনো এপার্টমেন্টটিতে গিজ গিজ করে।

আমি একটি আ্যাম্বুলেন্সে করে বাবার মরদেহ কমিউনিটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেই, ডেফ সার্টিফিকেটের জন্য। সেখানে আমার বন্ধু ঝন্টু চাকমার স্ত্রী সাথি চাকমা বৌদি সহায়তা করেন। জরুরি বিভাগে কিছুটা অপেক্ষা করতে হয়। আমি হাসপাতালের লবিতে পাখার নীচে বসে মোবাইল চিপে বাবাকে নিয়ে ছোট্ট একটি ফেসবুক নোট লিখি। জানাই তার চলে যাওয়ার সংবাদ। আমার অফিসেও ফোন করে জানাই বাবার মৃত্য সংবাদ। হেড অফ দা নিউজ তার সম্পর্কে আরো জানতে চান। আমি ফেসবুক নোটটির কথা বলি। আমি দু-তিনদিন ছুটি চাই, তখনই তা মঞ্জুর হয়।

ফেসবুক দেখে, আমার কর্মস্থলের টিভি সংবাদ দেখে একের পর এক টেলিফোন আসতে থাকে। সবাই জানতে চান, কখন, কিভাবে? আহা, তার মতো আদর্শিক লোক হয় না। পুরোনো কমিউনিস্ট নেতা বিমল বিশ্বাস ফোন করেন। বাবার স্নেহভাজন জুনায়েদ সাকী সহমর্মিতা জানান জার্মানি থেকে। গণ সংহতি আন্দোলনের আরো অনেক বন্ধু, শুভাকাংখী ফোন করেন। সাংবাদিক বন্ধুদের অনেকেই। অচেনা নম্বর থেকেও একের পর এক ফোন আসতে থাকে। আমি কথা বলতে বলতে অসুস্থ বোধ করতে থাকি। এরপর আমি সেলফ সেন্সর করে বেছে বেছে ফোন ধরি। এছাড়া আমার কোনো উপায় থাকে না।

বাবার মরদেহ বাসায় আনার পর দু-একজন আত্নীয়-স্বজন কান্নাকাটির চেষ্টা করেন। আমি তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করি। অনিন্দ্যর ছোট বোন, ভাতিজি প্রার্থণা দাদুর বিছানার পাশে বসে নিরবে চোখ মোছে। আমি স্কুল পড়ুয়া কিশোরীটির চোখ মুছে দেই। সবার সামনে বলি, উনি তার কোর্স পূর্ণ করেছেন। একটুও না ভুগে, কাউকে না ভুগিয়ে মারা গেছেন, এতে কান্নার কিছু নেই। জন্মের মতো মৃত্যুও স্বাভাবিক, ইত্যাদি ইত্যাদি।

স্নানের পর হিমায়িত লাশবাহি গাড়িতে বাবার মরদেহ সিরাজগঞ্জ রওনা হয়ে যায়। আমি আর অনিন্দ্য কল্যানপুর থেকে বাস ধরে সিরাজগঞ্জের পথে রওনা দেই। সঙ্গে আমার মেজ বোন, আরেক মামাতো বোন।

আমর চারটি প্রাণী যখন সিরাজগঞ্জের মুগবেলাই গ্রামে পৌছাই তখন ঘুট ঘুটে আধার। সবার হাতে হাতে টর্চ দেখে বোঝা গেল, পল্লী বিদ্যুতের খুব ঘন ঘন লোড শেডিং হয়। দাদু বাড়ির সামনের উঠোনে বাবার মরদেহ আনা হয়। সেখানে আশেপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ টিপটিপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, আধার ভেঙে নামাজে জানাযায় দাড়ান। আরো আসেন বাবার কৃষক কর্মীরা, যাদের নিয়ে তিনি জীবনের ৪০টি বছর কাটিয়েছেন।

এরপর বাড়ির পেছনে পারিবারিক কবরস্থানে বাবাকে গোর দেয়া হয়। আমি ভীড় থেকে একটু দূরে অন্ধকারে শাল গাছের নীচে দাড়িয়ে পাথর মুখে সব দেখি। আমি জানি, চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়।

একজন চোয়াল ভাঙা, খোঁচা খোঁচা দাড়ির বয়স্ক লোক আমার দিকে টর্চের আলো ফেলে বলেন, তুই টিংকু (বাবার ডাক নাম) ভাইয়ের ছেলে না? আমি তোর মোমেন চাচা হই। পাশেই সৈয়দ গাতি গ্রামে থাকি। আমি আর তোর বাবা অনেক কৃষক সংগ্রাম করেছি। অনেক আন্দোলন-সম্মেলন করেছি। সে মেলা কথা। একদিন আসিস তো! সব বলবো নে। আমি মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দেই।

এরই মধ্যে কেউ একজন এক মুঠো মাটি এনে বাবার গোরে দিতে বলে। আমি মাটিটুকু ঢেলে দেই। এক লাহমায় আমার মনে পড়ে যায়, কবরে শোয়ানো বুড়ো লোকটির আত্মত্যাগ, আদর্শের দীর্ঘ যাত্রা।

বাবা আজিজ মেহের ছিলেন সাবেক নকশাল নেতা, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল, মতিন-আলাউদ্দীন) এর সাধারণ সম্পাদক। সারাজীবন অনেক কৃষক আন্দোলন করেছেন, মওলানা ভাষানীর সাথে কাগমারী সম্মেলন করেছেন, সন্তোষের মহা সমাবেশ করেছেন, পাকিস্তান আমলে বহু জেল খেটেছেন, সবশেষ কারা বরণ করেছেন জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসন আমলে।

বাংলাদেশ আমলে তিনি “বস্তু প্রকাশন” নামে একটি প্রকাশনা গড়ে তোলেন। ‘বস্তু প্রকাশন’এর বইগুলো সবই ছিলো চিন্তাশীল এবং যথারীতি ব্যবসা-বিফল। বাবা প্রকাশ করেছিলেন — ড. আহমদ শরীফ, বদরুদ্দীন উমর, অধ্যাপক আহসাব উদ্দীন আহমেদ, আহমদ ছফা, আনু মুহাম্মদ, আরজ আলী মাতুব্বর, এমন কি মাওসেতুং, লু-সুন’ও। মাতুব্বরের ’সত্যের সন্ধান’ ও ‘সৃষ্টি রহস্য’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ হয়েছিলো আদি প্রচ্ছদে ‘বস্তু প্রকাশন’ থেকেই। সে কথা একটু পরেই আবার বলছি।

আটের দশকে আমার বাবা সাপ্তাহিক খবরেরকাগজ সহ বিভিন্ন কাগজে নিয়মিত কলামও লিখতেন।

তখন আমি কলেজে পড়ি, তখন আমি আর্জেস গ্রেনেড, দারুণ যৌবনকাল! সে সময় লিটল ম্যাগাজিনের ভূত ঘাড়ে চেপে বসায় আমি অকালপক্ক বয়সেই জেনে গিয়েছিলাম, ছাপাখানার কল-কব্জা। সীসার হরফ, কাঠের ব্লক, তেল-কালি মাখা গ্যালি-বয়, মেশিন ম্যান, ল্যান্ড মাইনের মতো ছাপার কালির টিন, এমনকি আলো-আঁধারিতে ঘোলা বাল্বের নীচে ভাড়ি চশমা আঁটা প্রুফ-রিডার — সবই আমাকে খুব টানতো।

আরো পরে এলো কম্পিউটার, ডিমাই ও ডাবল ডিমাই আকৃতির অফসেট প্রেস। সংবাদ পত্র, বই-পত্র, পোস্টার-লিফলেট, এমন কি লিটল ম্যাগাজিনও ছাপা হতে লাগলো কম্পিউটারে। প্রথমে অ্যাপেল ম্যাকিনটস-এর ছোট্ট সাদা-কালো মনিটর, পরে আইবিএম-এর ঢাউশ-আকৃতির সাদাকালো মনিটর ওয়ালা কম্পিউটারই ভরসা।…

আমার বাবা অনেক চেষ্টা করেছিলেন তার প্রকাশনাটিকে দাড় করাতে। কয়েকটি কম্পিউটার না হোক, অন্তত একটি ডিমাই আকৃতির অফসেট প্রেস কেনার। তাতে হয়তো তার প্রকাশনার ব্যবসার সুবিধা হতো। নিজস্ব বই প্রকাশ ছাড়াও বাইরের অন্যান্য ছাপার কাজও তিনি হয়তো পেতেন। কিন্তু মা’র রেডিও অফিসের কেরানীর চাকরি, আমরা ভাই-বোনগুলো তখন মাত্র একে একে পাস করে বেরিয়েছি, কোনো পারিবারিক সঞ্চয় নেই –সংসার চালানোই দায়, এ অবস্থায় কিছুতেই বাবা কোনো প্রেস কিনতে পারলেন না। উনি বই প্রকাশ করতে শুরু করলেন রশিদ মিয়ার প্রেস, আল-আমিন প্রিন্টার্স, ৭২ নম্বর, নারিন্দা থেকে।

পারিবারিক উত্তপ্ত আলোচনা থেকে ওই বয়সেই আমি জেনেছিলাম, বাবা বই প্রকাশ করতেন দাদুর আমলের আম-কাঁঠালের বিশাল বাগানের পুরনো সব গাছ উজাড় করার টাকায়। আর তার ব্যাক্তি পরিচিতির কারণে তিনি লেখক সন্মানী দিতে পারতেন সামান্যই। এই করে তিনি রশিদ মিয়ার বাকী টাকা শোধ করতে পেরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু যথারীতি ব্যবসাটি খুব শিগগিরই লাটে উঠে যায়।…

এখনো মনে আছে, পুরনো পল্টনে বাসস অফিসের নীচে, বাবার অফিস ঘরের পেছনে স্তুপ করে রাখা হতো অবিক্রিত বই। খাগড়াছড়িতে আমার পাহাড়ি বন্ধুরা পাঠাগার খুলতে চাইলে বাবার কাছ থেকে আমরা বিনা পয়সায় এক ট্রাক নিউজ প্রিন্টে ছাপা (সুলভ সংস্করণ) বই পেয়েছিলাম। …

কমিউনিস্ট আন্দোলন নিয়ে বাবার লেখা একটি বই ‘নিষিদ্ধ কথকথা’! সে বইটি বাজারে নেই অনেক বছর। তাকে উদ্ধত করে আমি মুক্তমনাসহ বিভিন্ন সাইটে একটি নোট লিখেছিলাম, ‘সিরাজ সিকদার: অন্য আলোয় দেখা’, গুগল করলেও সেই লেখাটি বোধহয় পাওয়া যাবে।

আমার বাবা আপোষহীন আদর্শ আর হাজার তিনেক বই ছাড়া কোন সম্পদ রেখে যাননি। তাকে নিয়ে আমি গর্বিত।

ওইদিনই রাতে লাস্ট বাস ধরে আমি আর অনিন্দ্য ঢাকায় ফিরি। তখন ঝিরি ঝরি বৃষ্টি। আমি মোবাইল খুল হোয়াটস এপে এক বন্ধুর খুব শান্তনা নেই। ফেসবুক খুলে বাবাকে নিয়ে লেখা মন্তব্যগুলো অনিন্দ্যকে পড়ে শোনাতে শোনাতে আমার গলা ধরে আসে। অনিন্দ্য চোখ মোছে। আমরা বন্ধুর মতো হাত ধরে পাশাপাশি বসে থাকি অন্ধকার বাসে। শ্যামলী পরিবহনের বাসটি যেন মহাসড়ক ছেড়ে উড়াল দিয়েছে, এমনই গতিপ্রাপ্ত বলে মনে হয়।

বাবার কথা ভাবতে ভাবতে আমি আধো ঘুম-জাগরণ, তীব্র মাথা ব্যাথা ও বিবমিষায় ভুগি। ফিস ফিস করে যেন নিজেকেই বলি, তব যাত্রা হোক শুভ। ভাল থাকুন বাবা, লাল সেলাম!
*সংযুক্ত...

আমার বাবা রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি যৌবনে ভাল স্টিল ফটোগ্রাফি করেছেন। এরপর কি করে যেন জড়িয়ে পড়েছিলেন চলচ্চিত্রেও। বাবার পৈত্রিক নাম কিন্তু ছিল এসএম মসিউর রহমান। আর সিনে জগত ও গোপন পার্টির ছদ্মনাম ছিল আজিজ মেহের। শেষে তিনি এই নামেই পরিচিতি পানা। কালক্রমে তার আসল নামটিই হারিয়ে যায়। বাবা সর্বত্র পরিচিত ছিলেন আজিজ মেহের নামেই।

তিনি পাকিস্তান আমলের বিখ্যাত ছবি “জাগো হুয়া সাবেরা”র সম্ভবত সহকারি পরিচালক ছিলেন। পরে উনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান এবং আলমগীর কবিরের সঙ্গে দু-একটি ছবিতে কাজ করেছেন। আলমগীর কবিরের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র “ধীরে বহে মেঘনা” ছবির প্রধান সহকারী পরিচালক ছিলেন বাবা।

স্বাধীনতার পর পরই আমার বাবা “বিচার” নামে একটি সামাজিক ছবি নির্মাণ করেছিলেন। সুচন্দা ছিলেন এই ছবির মায়ের চরিত্রে। ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যাবে, মা কুপুত্রকে নিজেই দোনালা বন্দুকের গুলিতে হত্যা করেন—এটিই ছিল তার বিচার।

আটের দশকে তিনি ড. আহমদ শরীফের ওপর একটি প্রামন্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন, “উজান স্রোতের যাত্রী”। গণসংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের “উজান স্রোতের যাত্রী/ ওরে ও ছাত্রছাত্রী/ মশাল জ্বালো, মশাল জ্বালো, মশাল জ্বালো…” গানটি থেকে কথা নিয়ে এই ছবিটির নামকরণ আমিই করেছিলাম।

এখনো মনে আছে জহির রায়হানের ক্যামেরা ম্যান লক্ষণ দাস ছিলেন এই ছবিটির চিত্রগ্রাহক। কলকাতার বিদ্যাসগর মহিলা কলেজের অধ্যাপিকা, ড. আহমদ শরীফের পালক কন্যা, ড. প্রথমা রায় মন্ডল ছিলেন এর প্রযোজক। সম্ভবত এর একটি রাশ প্রিন্ট এখনো তার কাছে রয়েছে। ড. শরীফের পরিবারের কাছে এর মূল কপিটি থাকার কথা।


* সংযুক্ত -০২//

এক বন্ধুর সাথে আলাপচারিতায় হঠাৎ মনে পড়ল। পরে মনে হল, এখানেও টুকে রাখি।...

আমার জন্মের সময় বাবা আজিজ মেহের নকশাল বাড়ি কৃষক বিদ্রোহ করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন, তার জেল হয়েছিল। সেখানে তাকে প্রচুর টর্চার করা হয়। সে সময় তার টিবি হয়েছিল।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাবা জেল থেকে ছাড়া পান। সে সময় তিনি অনেক ভুগেছেন। হয়তো মরেই যেতেন, এমন দশা। পরে মা সৈয়দা আজগারি সিরাজীর কাছে সেই গল্প শুনেছি।

অভাবের সংসারে বাবার অষুধপত্র, দুধ, ডিম, মাখন, ফলমূল ইত্যাদি পুষ্টি যোগাতে মাকে খুব হেনস্থা হতে হয়েছিল। আমরা ছোট ছোট পাঁচজন ভাইবোন।

সেই সময় মা নিজের সব গহনা বিক্রি করে খরচ জুগিয়েছেন। যুদ্ধের বাজারে তেমন দামও পাননি।

আরো পরে সাদাকালো ছবিতে মার সে সব পুরনো নকশার ভাড়ি ভাড়ি গহনা দেখেছি, যেন সুচিত্রা সেন!

আমার মা সারাজীবনে আর কখনও গহনা কিনতে পারেন নি।
ছেলেমেয়েদের বিয়েতেও কোন গহনা দিতে পারেননি। আহারে রেডিও অফিসের আপার ক্লার্ক মা জননী, আমার চির দুখী মা, মধু, ওরফে মধুমালা! 💔

গহনা হারানো নিয়ে তার দুঃখের যেন সীমা ছিল না; বংশ পরম্পরায় পাওয়া সব গহনা। দেখ, "ছিল না" ই লিখলাম। কারণ মা এখন আর থেকেও যেন নেই, বছর দুয়েক হল পুরোপুরি স্মৃতিভ্রষ্ট, আলঝাইমার্স! 💔


431 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: শঙ্খ

Re: আমার বাবা আজিজ মেহের

বিপ্লবদা, শক্ত থাকবেন, সাবধানে থাকবেন।
...বিরহ দহন লাগে
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে...
Avatar: h

Re: আমার বাবা আজিজ মেহের

খুব কষ্ট হলো পড়ে। কি আর বলবো। শক্ত থাকেন।
Avatar: aranya

Re: আমার বাবা আজিজ মেহের

এক্জন মানুষের মত মানুষ চলে গেলেন
Avatar: শিবাংশু

Re: আমার বাবা আজিজ মেহের

স্পর্শ করলো। ভালো থাকবেন...
Avatar: পাই

Re: আমার বাবা আজিজ মেহের

এইসাব লেখায় কী লিখব, অস্বস্তি হয়।
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: আমার বাবা আজিজ মেহের

চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়।

এই লেখাটি পড়ে আমার বাবা আজিজ মেহেরের মৃত্যুতে যারা শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে জানাই কৃতজ্ঞতা!

মূল লেখায় কি করে যেন বাবার সংক্ষিপ্ত চলচ্চিত্র জীবন বাদ পড়ে গিয়েছিল, এখন সেটি সংযুক্ত করেছি।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন