ফরিদা RSS feed

প্রচ্ছন্ন পায়রাগুলি

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • আমাদের চমৎকার বড়দা প্রসঙ্গে
    ইয়ে, স-অ-অ-অ-ব দেখছে। বড়দা সব দেখছে। বড়দা স্রেফ দেখেনি ওইখানে এক দিন রাম জন্মালেন, তার পর কারা বিদেশ থেকে এসে যেন ভেঙেটেঙে মসজিদ স্থাপন করল, কেন না বড়দা তখন ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুম ভাঙল যখন, চোখ কচলেটচলে দেখলেন মস্ত ব্যাপার এ, বড়দা বললেন, ভেঙে ফেলো মসজিদ, জমি ...
  • ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ?
    যেকোন নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে সামনে আসার পর নাগরিক হিসাবে আমাদের একটা ঈমানি দায়িত্ব থাকে। দায়িত্বটা হল অভিযুক্ত ধর্ষকের কঠোরতম শাস্তির দাবি করা। কঠোরতম শাস্তি বলতে কারোর কাছে মৃত্যুদন্ড। কেউ একটু এগিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ার ...
  • তোমার পূজার ছলে
    বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না ...
  • The Irishman
    দা আইরিশম্যান। সিনেমা প্রেমীদের জন্য মার্টিন স্করসিসের নতুন বিস্ময়। ট্যাক্সি ড্রাইভার, গুডফেলাস, ক্যাসিনো, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, দা অ্যাভিয়েটর, দ্য ডিপার্টেড, শাটার আইল্যান্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট, সাইলেন্টের পরের জায়গা দা আইরিশম্যান। বর্তমান সময়ের ...
  • তোকে আমরা কী দিইনি?
    পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন -********তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, ...
  • ইশকুল ও আর্কাদি গাইদার
    "জাহাজ আসে, বলে, ধন্যি খোকা !বিমান আসে, বলে, ধন্যি খোকা !এঞ্জিনও যায়, ধন্যি তোরে খোকা !আসে তরুণ পাইওনিয়র,সেলাম তোরে খোকা !"আরজামাস বলে একটা শহর ছিল। ছোট্ট শহর, অনেক দূরের, অন্য মহাদেশে। অনেক ছোটবেলায় চিনে ফেলেছিলাম। ভৌগোলিক দূরত্ব টের পাইনি।টের পেতে দেননি ...
  • ছন্দহীন কবিতা
    একদিন দুঃসাহসের পাখায় ভর করে,ছুঁতে চেয়েছিলাম কবিতার শরীর ।দ্বিখন্ডিত বাংলার মত কবিতা হয়ে উঠলোছন্দহীন ।অর্থহীন যাত্রার “কা কা” চিৎকারে,ছুটে এলোপ্রতিবাদী পাঠক।ছন্দভঙ্গের নায়কডানা ভেঙ্গে পড়িপুঁথি পুস্তকের এক দোকানে।আলোক প্রাপ্তির প্রত্যাশায়,যোগ ধ্যানে কেটে ...
  • হ্যালোউইনের ভূত
    হ্যালোউইন চলে গেল। আমাদের বাড়িতে হ্যালোউইনের রীতি হল মেয়েরা বন্ধুদের সঙ্গে ট্রিক-অর-ট্রিট করতে বেরোয় দল বেঁধে। পেছনে পেছনে চলে মায়েদের দল। আর আমি বাড়িতে থাকি ক্যান্ডি বিতরণ করব বলে। মুহূর্মুহূ কলিং বেল বাজে, আমি হাসি-হাসি মুখে ক্যান্ডির গামলা নিয়ে দরজা ...
  • হয়নি
    তুমি ভালবাসতে চেয়েছিলে।আমিও ।হয়নি।তুমিঅনেক দূর অব্দি চলে এসেছিলে।আমিও ।হয়নি আর পথ চলা।তুমি ফিরে গেলে,জানালে,ভালবাসতে চেয়েছিলেহয়নি। আমি জানলামচেয়ে পাইনি।হয়নি।জলভেজা চোখে ভেসে গেলআমাদের অতীত।স্মিত হেসে সামনে এসে দাঁড়ালোপথদুজনার দু টি পথ।সেপ্টেম্বর ২২, ...
  • তিরাশির শীত
    ১৯৮৩ র শীতে লয়েডের ওয়েস্টইন্ডিজ ভারতে সফর করতে এলো। সেই সময়কার আমাদের মফস্বলের সেই শীতঋতু, তাজা খেজুর রস ও রকমারি টোপা কুলে আয়োজিত, রঙিন কমলালেবু-সুরভিত, কিছু অন্যরকম ছিলো। এত শীত, এত শীত সেই অধুনাবিস্মৃত কালে, কুয়াশাআচ্ছন্ন পুকুরের লেগে থাকা হিমে মাছ ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

আরও একটি ভ্রমণ কাহিনী - কুমায়ুনে চারদিন

ফরিদা



প্রাককথন

যেমন আর পাঁচটা বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে হয়, কোথায় যাওয়া হবে, তারিখ, ফেরা কবে, কতদূর যাব এইসব টালবাহানা চলে, এবারেও ঠিক তাই ছিল। তা, সেই পর্ব মিটে যায় ভালোয় ভালোয়। আরও একটা বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা যেমন থাকে, তবু তার বাইরেও অনেকটা অনিশ্চয়তা থাকে, সংশয় থাকে, বিশেষত যে ব্যাপারটার একেবারে তল পর্যন্ত দেখে সে তো প্রায় হাঁড়িকাঠে মাথা দিয়ে বসে। কাজেই, পরিকল্পিত জায়গাগুলোর বুকিং আর রেল টিকিটের মাঝখানের সময়টা ঝড়ের আগের শান্তি।

যাত্রা শুরুর কিছুদিন আগে ফের গা-ঝাড়া দিয়ে বাকি অংশটুকু ছকে নেওয়া হল। এর পরে আর পালানর পথ নেই। ভোর ছ’টায় নয়া দিল্লি স্টেশন থেকে ট্রেন। সকাল চারটে নাগাদ বেরোন। ওলা ট্যাক্সি আসবে কি না, নাকি পাড়ার ট্যাক্সিওলা বলা হবে, যেখানে পৌঁছব সেখানে গাড়ি ঠিকঠাক আসবে কি না, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বাকিদের ঠিকঠাক প্রস্তুত করা হয়ে উঠবে কি না ভোর চারটে নাগাদ।


১ - ১৭ইজুন ২০১৭
একটা ঘোরের মতো মিটে যায় সেইসব, খুব বেশি সমস্যা না বাড়িয়ে। ট্যাক্সিওলা কে ভোর তিনটে নাগাদ ঘুম ভাঙিয়ে একটু গল্প করা, তারপর চা তৈরি করে বাকিদের জাগান। স্টেশন পৌঁছে শান্তি। তখন ভোরের আলো ফোটার কথা, কিন্তু ফোটেনি। এগার নম্বর প্ল্যাটফর্মের ঘড়িতে তাকিয়ে দেখা গেল সময় ৫:৮৮ -ইংরাজি সংখ্যায়। তখন ঝিলিক দিয়ে ওঠে সেই হগওয়ার্টসের ট্রেনটি। প্ল্যাটফুরম নম্বর পৌনে দশের জায়গায় ৫:৮৮।

শতাব্দির ভ্রমণ সাধারণ। খাওয়ার হাল সাধারণতর হয়ে উঠলেও অতিরিক্ত দু-পিস পাউরুটি মাখন সমেত চাইলেই পাওয়া যায় যদিও।

কাঠগোদাম স্টেশনের ট্যাক্সিওলা আনন্দ ও ভাস্কর ছিল বন্ধুভাবাপন্ন। ঠিক দিল্লির লোক নয় বলে, অথবা পাহাড়ি অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় বলে অনেকটা ঠান্ডা। পাইন দেবদারুর ছায়া যেমন হয়, ঠান্ডা, ফুরুফুরে, আরামদায়ক।

কথা ছিল মাঝরাস্তায় থামা হবে দুপুরের খাওয়া সারতে। তেমন চলতে চলতে আচমকা রেশমীর চোখ পড়ে গেল পথিপার্শ্বে বিশুদ্ধ বাঙলা ভাষায় “বাংলা রান্না” লেখা বোর্ডটির ওপর। গাড়ি থামাতে বলতে বলতে একটু এগিয়ে গেল। আগের গাড়িকে ফোনে জানান হল থামার জন্য। সুমন নেমে দেখল রাস্তার ডানদিকে একটা দোতলা বাড়ি, তার একতলাটায় একচিলতে রেস্তোরাঁ, সেখানে একসঙ্গে খুব বেশি হলে পনেরজন বসতে পারে। সেই রেস্তোরাঁর মধ্যেই একটা ঘেরা জায়গায় রান্না হচ্ছে।

আগের মানালির অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সে হিন্দিতেই কথা শুরু করে, সে দেখেছিল মানালিতে এমন বাংলা সাইনবোর্ড দেওয়া খাবার দোকান স্থানীয়রাই চালান, তাদের নিজস্ব রীতিনীতি নিয়ে। এখানে তাকে অবাক করে সেই রান্নাঘরের দু-জনের মধ্যে বয়স্কজন বললেন - “আপনি বাঙালি?”

সাতজনের মতো ডাল ভাত আলুভাতে (শচীনের খুব প্রিয়) মাছভাজা বানাতে ত্রিশ -চল্লিশ মিনিট লাগবে- জানালেন মাঝবয়েসী দোকানের মালিক তথা অন্যতম রাঁধুনি অর্জুনবাবু। ম্যানেজমেন্ট এর ডিপ্লোমাধারী অর্জুনবাবু পারিবারিক সমস্যার কারণে অফিসে ইস্তফা দিয়ে এই রেস্তোরাঁ খুলেছেন বছর তিনেক হল। বলা হয়নি সেখানে আরও একটি বাঙালি পরিবার খাওয়া দাওয়া সারছিলেন। রাজেন ঘোষ, ফরিদাবাদ এর বাসিন্দা স্ত্রী ও ক্লাস সিক্সের পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে পোঁছেছেন আগের দিন। সাতজনের এই বাঙালি দলটির সঙ্গে বেশ গল্পগাছাতে রান্নার সময়টুকু কেটে গেল তেমন অনুযোগ অভিযোগ ছাড়াই।

খাওয়া শুরু করতে না করতেই জানা গেলে চাইলে নাকি পাঁঠার মাংস পাওয়া যাবে। তার মানে! বিশ্বাস হতে চায় না যেন। তবু বাস্তবিকই হাজির হল লাল লাল অল্প ঝোল সমেত পাঁঠার সুস্বাদু টুকরোরা। জানিয়ে রাখা ভালো, জায়গাটি কাঠগোদাম থেকে আলমোরা যাওয়ার রাস্তায় বাওয়ালি (ইংরাজি বানান Bhowali) শহরের অল্প আগে। অর্জুনবাবুর ফোন নম্বর হল 9411102328

প্রথম গন্তব্য ছিল পিওরা ডাক বাংলো। জায়গাটা আলমোরা যাওয়ার রাস্তায় আলমোরা আসার আঠারো কিলমিটার আগেই। কাঠগোদাম থেকে প্রায় ৮০-৮৫ কিলোমিটার গাড়িতে যেতে আড়াই তিনঘন্টা লাগার কথা যদি না অর্জুনবাবুর আতিথেয়তায় পাঁঠার মাংস না খাওয়া হয়।

যেহেতু ডাক বাংলোর প্রদীপ গুপ্তাই গাড়ির ব্যবস্থা করেছিলেন তাই গন্তব্য নিয়ে নিশ্চিন্ত আরোহীরা। পৌঁছে দেখা গেল অন্যভাবে চেষ্টা করলে পৌঁছন বেজায় কঠিন ছিল। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তার বাঁ পাশে একা একটা ছোট্ট দোকান, যাতে সবকিছু প্রায় রাখা হয়, উল্টোদিকে একটা টিউবওয়েল, ব্যস।

গাড়ি সেখানে থামতে অবাক হওয়ারই কথা। অন্য গাড়িটি এসে পৌঁছতে না পৌঁছতেই কোথা থেকে যেন উদয় হলেন প্রদীপবাবু আরও দু-জনকে নিয়ে। দেখা গেল রাস্তার বাঁ পাশেই পাহাড়ের গা বেয়ে একটা পায়ে চলা পথ নেমে গেছে। এই সাতজনের দলে চারজনই সত্তরের আশেপাশে। তাঁদের কথা জানা ছিল বলে প্রদীপবাবু সঙ্গে চারটে ওয়াকিং স্টিকও মজুত রেখেছেন। পায়ে চলা নেমে যাওয়া পথটির প্রথমটা যথেষ্ট ঢালু।

বেশি না। ২০০ মিটার চলতেই দেখা গেল সাধারণ ছোট লোহার গেটে। ভেতরে যেতেই চোখে পড়ল ১৯০৫ এ তৈরি হওয়া চুনকাম করা ডাক বাংলোটি। তার বাঁদিকে যেদিক দিয়ে ঢোকার রাস্তা সেখানে প্রায় সমবয়সী একটি বিরাট চেস্টনাট গাছ। তার পাড়টি বাঁধান। সুমন তো সেখানেই ক্যামেরার গুনধুপসি ব্যাগ খুলে ১০০-৪০০ র লেন্স লাগিয়ে নিল। তখন প্রায় বেলা চারটে। পাখিদের স্কুল ছুটি হওয়ার সময় সমাগত।

বাকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাংলোর দাওয়াতে রাখা ইজি চেয়ারে বা ঠিক বাইরের উঠোনে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসছেন, উঠছেন, ঘুরে ঘুরে দেখছেন সেই উঠোনের জায়গায় জায়গায় রাখা মরশুমি ফুলের কেয়ারিগুলো। বাংলোর সীমানা পার হলেই ঢালু পাহাড় নেমে গেছে। সেখানে ঘন জঙ্গল। আকাশ মেঘলা, ফুরফুরে হাওয়া বন্ধ হয়ে গেলেও গরমের নামগন্ধ নেই। চা এল অনতিবিলম্বে। প্রদীপ নিজে এসে কুশন দেওয়া প্লাস্টিকের চেয়ারগুলো টেনে আনলেন উঠোনের পাথরের টেবিলের পাশে। চা এনে রাখলেন সতীশ। চা খেতে খেতেই জানা গেল পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কে চাকুরীরত প্রদীপবাবু যুক্ত ছিলেন এই অঞ্চলের একটি এন জি ও আরোহীর সঙ্গে, যারা স্থানীয় গরীব বাচ্চাদের পড়াশোনা, মহিলাদের স্বনির্ভরতা নিয়ে কাজ করেন। সেই সূত্রেই খোঁজ পান এই পরিত্যক্ত ডাক বাংলোটির। সরকারী দপ্তরে ঘোরাঘুরি করে বছর দশেক আগে লীজ নেন ডাক বাংলোটি ২০ বছরের জন্য। তারপর তাকে বাসযোগ্য করেছেন। বাংলোর আউটহাউসটি পরিণত হয়েছে রান্নাঘর ও প্রদীপবাবুর আস্তানা হিসেবে।

ডাক বাংলোটিতে তিনটে ঘর দুই-পাশের ঘরদুটি অপেক্ষাকৃত বড় মাঝেরটির চেয়ে। মাঝের ঘরটিও দৈর্ঘ্য প্রস্থ উচ্চতায় অন্যান্য থাকার জায়গার তুলনায় অনেকটাই বড়। প্রতিটি ঘরে আলাদা আলাদা কিচেন আছে। গ্যাসস্টোভ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বাসনকোশন সমেত। ভারতীদি’র চায়ের যোগান ছিল অফুরান।

ঘরগুলি ঠিক ততটাই মেরামত করা হয়েছে যতটা ডাক বাংলোর সাবেক মেজাজকে অক্ষুণ্ণ রাখে। দেওয়ালগুলি ততটা মসৃণ করা নয়। ঘরের কার্পেট, ট্র‍্যাপেস্ট্রি, দেওয়ালের তাক,কাবার্ড, চেয়ার টেবিল একেবারে যেন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা। দু-পাশের ঘরের লাগোয়া অ্যান্টিরুমও ছিল যেখানে তিনদিক কাঁচের জানলা ঘেরা নিচু বিছানা ওলা “অ্যালকোভ”। যার পর্দা সরালে বিভিন্ন শেডের সবুজ ছাড়া অন্য রঙ দেখা গেল না।

প্রতিটি ঘরেই বেশ কয়েকটি বই রাখা। ইংরাজি পেপারব্যাক, থ্রিলার, সাহিত্য এইসব। শঙ্কর তো মহাখুশি। চায়ের টেবিলে বসার আগেই একটা বই সে তুলে নেয়। ওদিকে শম্পা, ভারতী দু বোন গল্পে মশুগুল
শতাব্দি এক্সপ্রেসে সবাই অল্পবিস্তর ঘুমোলেও এই দুই বোন গল্প করে গেছে। রেশমীও তাতে যোগ দিল চায়ের টেবিলে। ক্লাস টেনের সাম্পান এখন সেই বয়সটায় যাতে সব কিছুকেই তেরছা করে দেখে। চায়ের টেবিলে তার কানে হেডফোন দেখা গেল।

চায়ের সময় সুমন এসেছিল ক্যামেরা নামিয়ে, তারপর আবার গাছের কাছে গিয়ে খুঁজে যাচ্ছে। আলো পড়ে আসতে সে আবার ক্যামেরা রেখে ব্যস্ত হল রান্নার জোগাড়যন্ত্র দেখতে।

হয়েছে কি, ডাক বাংলোয় সবই ঠিক শুধু ওখানে নিরামিষ খাবার পাওয়া যাবে এটা জানা ছিল। তার সঙ্গে রান্নার ব্যবস্থা আছে এবং সেখানে মাংস রান্নায় বাধা নেই- এই ব্যাপারটা যোগ করতেই বেরিয়ে আসে পৌঁছনর পথে মাংস কেনার ব্যাপারটা। এক কিলো চিকেন এক কিলো পাঁঠা ও পোয়াটাক মেটে কেনা হয়ছিল ওই বাওয়ালি বাজার থেকে।

সন্ধে নামতেই তাই চটপট তেল মশলা আলু পেঁয়াজ আদা রসুন জোগাড় করল সুমন প্রদীপবাবুর স্ত্রী শুভার কাছ থেকে।

সন্ধ্যায় সামান্য হুইস্কি ও সঙ্গে আনা চানাচুর দিয়ে ফের আড্ডা বাংলোর বড় বড় ঘরের ভারী আসবাব হলদে ডুমের আলোয় তখন মায়াময়। রান্নাঘর থেকে মাংসের সুঘ্রাণ। মাঝে মাঝে নেড়েচেড়ে আসছে ওরা। বলা বাহুল্য, রেসিপিটি ছিল চিকেন ডাক বাংলা।

২ - ১৮ই জুন ২০১৭
খুব সকালে ঘুম ভেঙে যায় সুমনের। কৃষ্ণা সপ্তমীর অর্ধেক চাঁদ তখন মাঝ আকাশে। প্রথম পাখি ডাকল তিনটে বেজে আটান্ন মিনিটে। কি প্রয়োজন এ তথ্যের? তার জানা নাই। তবু তার কাছে এত বেশি এই রকম ঝোপঝাড় থাকে, সে রাখে বলেই। তার ফলেই দরকারে কিছুই খুঁজে পায় না সে। সহজ প্রশ্নে ফ্যাল ফ্যাল তাকায়। এখানে আসা ইস্তক সে তার ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে। ভাবছে, পাখির দেশে এসে পাখি হলে কেমন লাগে। গতরাতে খাওয়া দাওয়া সারতেই চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছিল। এখন আলো ফোটার মূহুর্তে ঘুম ভেণে বাইরে এসেছে, ক্যামেরা নিয়েই। অত সকালে আলো ফোটেনি বলে পাখির ছবি তোলা দায়, তবে শব্দ তো থেমে নেই। পাখিরা কি ঘুম থেকে উঠেই এজমালি কলঘরে লাইন দেয় নাকি পড়তে বসে, নাকি গলা সাধে ওরা, নাকি ছোট পাখিদের ঘুম থেকে তুলে রেডিবকরায় স্কুলে যাওয়ার তাড়া দিতে দিতে দিতে?

এইসব প্রশ্ন নিয়ে খেলতে খেলতে, সে দেখে চাঁদ ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে রক্তাল্পতায়, দেখে সেই আলো ছড়িয়ে পড়ছে গোটা আকাশে। সেই শূন্য আকাশে এপার থেকে ওপারে ট্যাঁ ট্যাঁ করে দ্রুত উড়ে গেল একঝাঁক টিয়া। ওদের ক্যামেরায় আঁটাতে শেখেনি সে এখনও। তাই ঘরে ফিরে দু-কাপ চায়ের জল বসায়। জল ফুটে গেলে চা-পাতা দিয়ে ঢাকা দিয়ে ডাকে রেশমীকে।

গতকাল রাতেই খাওয়ার সময় প্রদীপবাবু তদারক করছিলেন। তখনই জানালেন ডাকবাংলোর অন্য গেট থেকে বেরিয়ে কিছুটা হাঁটলেই দেখা মিলবে একটা জলের উৎসের। সেখানে নাকি অনেক পাখি আসে সকালে। রেশমী শুনেই বলল সেও যাবে সুমনের সঙ্গে। তাই তাকে ডাকা।

সেই সরু জঙ্গুলে রাস্তাটি বড় মনোরম দু-পাশেই ঘন জঙ্গল। হেঁটে যেতে গেলে মূহুর্মূহু মুখে জড়িয়ে যায় মাকড়শার জাল। পাখিদের ডাকে ঝালাপালা চারিদিক। তবে তারা নেহাৎই ছটফটে, লাজুক, অন্ত্যন্ত দ্রুত ও সঙ্গীতজ্ঞ।

সকালের ভ্রমণে পাখি তেমন না পাওয়া গেলেও অনেক চেনাশোনা হয়- শব্দের সঙ্গে, ভাষার সঙ্গে, কথার সঙ্গে। জঙ্গলের মধ্যে এক জায়গার কাঠের গুঁড়ি দিয়ে খিল দেওয়া একটা কুঁড়েঘর দেখা গেল। সেই ঘর যেন প্রাচীন দাদামশাই ধরণের। সংসারের কোনো কাজে আসেন না। তার কোলে পিঠে জানলা দরজা দেওয়াল ঢেকেছে লতাপাতা বুনো ঝোপ। রোদ্দুর এসে পড়েছে এক ঝাঁকড়া পীচফলের গাছে। ফলগুলি পাকা টসটসে কয়েকটি খসে পড়ে ঘাসের মিষ্টত্ব বাড়ায়। পাখিরা বসছে, খুঁটে কাচ্ছে ফল, উড়ে যাচ্ছে ফের।

এদিকে বাকিরা ঘুম ভেঙে উঠে চা পেয়েছে সতীশের কাছ থেকে। সেদিন রৌদ্রকরোজ্জ্বল বলে উঠোনের ফুলের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতি আসছে।

কথা ছিল সেদিন যাওয়া হবে মুক্তেশ্বর। তবে বেরোনর তাড়া নেই ড্রাইভার আসবে বেলা এগারটায়। চায়ের পর্ব শেষ হলেও গল্প গাছা চলতে থাকে দুই-বোনের। শঙ্কর যথারীতি বইমুখে বসে। শচীন কেতাদুরস্ত পোশাকে মোবাইল ফোনে ফুলের ছবি তুলে চলেছেন।

সকালের জলখাবারের ব্যবস্থা প্রদীপবাবুর ডেরা কাম রান্নাঘরের বাইরেই, আকাশের নীচে একটা নিচু টেবিলে। দেখা গেল আমুল বাটার এর সঙ্গে আছে ঘরে বানান সাদা মাখন, অ্যাপ্রিকট জ্যাম ও অরেঞ্জ জ্যাম। সঙ্গে ছিল তাজা ফল - পীচ তরমুজ, কলা পেঁপে। সতীশ এনে এনে রাখছিলেন মুচমুচে পাউরুটি টোস্ট। প্রদীপবাবু বললেন - পাউরুটিতে এক পোঁচ মাখন লাগিয়ে তারপর জ্যাম প্রয়োগ করতে। দেখা গেল তা অতি উপাদেয় হয়। সাম্পান এই সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে একটু দেরিতে এল। একটু বেশি ঘুমিয়েছে, কিন্তু দেখা গেল কান থেকে হেডফোন সে খুলে রেখেছে।

এই ফল পাউরুটি পর্বের পরেও এসেছিল গরম ওমলেটরা ও চা, কফি - পছন্দ অনুযায়ী। এই সময়েই গুরুত্বপুর্ণ একটি কাজ করা হল। আগের দিন এনে রাখা মাটনটা ডিপ ফ্রিজ থেকে বের করে বাইরে রাখা। সেটা দুপুরে ফিরে এসে ম্যারিনেট করা হবে।

মুক্তেশ্বর যাওয়ার পথে ড্রাইভার আনন্দ জানালেন মুক্তেশ্বর পৌঁছনর পাঁক্স কিলোমিটার আগে একটা পায়ে চলা পাকদণ্ডী আছে তাতে দেড় কিলোমিটার উঠলেই মুক্তেশ্বর। সময় লাগে ঘন্টাখানেক। পুরোটাই চড়াই, কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটার পথটুকু হারিয়ে ফেলার মতো নয়। ঠিক হল রেশমী সাম্পান ও সুমন সেই পথে যাবে। বাকি বয়স্কদের নিয়ে গাড়ি মুক্তেশ্বর গিয়ে অপেক্ষা করবে।

জঙ্গলের রাস্তাটি মনোরম। ডানপাশের পাহাড় আর বাঁদিকের খাদ মাঝখানে সরু পায়ে চলা পথের দু-পাশেই অজস্র বড় বড় পাইন দেবদারু। তাদের কাণ্ডে পুরু মসের আস্তরণ। আর প্রচুর গুল্ম জাতীয় গাছ ভরে রেখেছে জমি থেকে দশ ফুট মতো উচ্চতা, সেখান থেকেই দেবদারুর শাখা শুরু হল বলে পুরো জঙ্গলময় সবুজ কালো আলো আঁধারির খেলা। এর মধ্যে দেখা গেল সাদা লোমে ঢাকা কালো মুখের হিমালয়াল লেঙ্গুর। তারা যথেষ্ট দাপুটে। সুমন একজমের ছবি তুলতেই দলের বাকিরা এত হুটোপুটি লাগিয়ে দিল যে বলার কথা নয়। নেহাৎই হনুমান, তা না হলে কি কেউ গাছের মগডাল থেকে পথচারী তাগ করে হিসি করে দেয়? কি ভাগ্যিস, তা ওদের গায়ে লাগে নি।

তবু কিছু পাখি দেখা হল ওদের। কিছুটা পথ খাড়া চড়াই। এদের কারোর অভ্যেস তেমন নেই, তাই থেমে থেমে যাওয়া হচ্ছিল। গন্তব্য যখন যাত্রাপথ, তখন তা সম্পূর্ণ উপভোগ্য।

যা হয়। মুক্তেওশ্বরের ওপরে দেখা গেল কুমায়ুন মণ্ডলের ট্যুরিস্ট লজটি সবচেয়ে মোক্ষম জায়গায়। জুন মাসে যদিও তুষার শৃঙ্গরা দৃশ্যমান নয়, তবু সামনের অনেকটা বিস্তার আরামদায়ক চোখের পক্ষে।

সাবধানে কাটিয়ে দেওয়া হল কিছু গাইডের অনুরোধ, তারা মন্দির দেখাতে চাইছিলেন। কিছুটা তাদের অনুরোধের জ্বালাতেই গাড়িতে উঠে বসল সবাই। প্রদীপবাবু বলেছিলেন “চান্দি মাটি’ তে দুপুরের খাওয়া খেতে।

ভাবা হচ্ছিল “চান্দি মাটি’ নিশ্চই নিরামিষ গোছের কিছু হবে। যাই হোক সান্ত্বনা দেওয়া হল রাতে তো পাঁঠার মাংস আছেই।

তার সামনে পৌঁছতেই প্রথমে চোখে পড়ল অরবিন্দ আশ্রমের একটা দোকান। অরোভিল এর। তার পাশেই কেতাদুরস্ত কাফে ধরণের রেস্তোরাঁ “চান্দি মাটি”। বাইরেই ব্ল্যাকবোর্ডে রঙিন চক দিয়ে লেখা সেদিনের মেনু। তার প্রথম নাম - “মাটন রোস্ট উইথ আপ্পান” দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠল সুমন ও সাম্পান। মুগডালের খুচুড়ি, কুমায়ুন থালি ও মাটন রোস্ট উইথ আপ্পান - এই সব মিলিয়ে মিশিয়ে হল খাওয়া। সম্পুর্ণ অনাস্বাদিত খাওয়া দাওয়া এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল বলে ভালো লাগা বেড়ে যায় অনেকটাই।

ডাক বাংলোয় ফিরে আসার পর প্রদীপ প্রস্তাব দিলেন তার এক ছাত্রস্থানীয় যুবক দিল্লিতে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ছে। সে নাকি ছুটিতে বাড়ি এসেছে। সে হোটেল এর রাঁধুনি হিতে চায়। এরা চাইলে সে নাকি এসের জন্য মাটন রান্না করে দেবে। এমনকি সন্ধ্যায় হুইস্কির সঙ্গে মেটে চচ্চরিটিও।

সবচেয়ে খুশি হল সুমন। রান্নাটা তারই দায়িত্ব ছিল। কাজেই সে কালক্ষেপ না করে ঢুকে গেল জঙ্গলে পাখিদের ক্যামেরাবন্দী করতে।

এদিকে সেইদিন আবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনাল ভারত-পাকিস্তান। প্রদীপদের নিজস্ব একটি টিভি আছে, কিতু সেটি তার শোওয়ার ঘরে। নেট যোগাযোগের যা দশা তাতে লাইভ স্ট্রিমিং চলে না। অগত্যা সাম্পান ও তার লম্বাদাদু শচীন ক্রিকইনফোর আপডেট গলো করতে লাগলেন। ভারতের ইনিংস শুরু হতে না হতেই সেই ম্যাচ নিয়ে আর কিছু উৎসাহ চলে গিয়েছিল।

শুভম এদিকে দারুণ রেঁধেছিল। সুমন যদিও বলে দিয়েছিল কেমন চাইছে ওরা প্রিপেরেশনটা। তবু তার যত্নটা চোখে পড়ার মতো। শুধু তাই নয়। আগের রাতের অবশিষ্ট চিকেনটিকেও সে ঝোল কমিয়ে ধনেপাতা দিয়ে স্বাদুতর করেছিল নিজে থেকেই। আর মেটে চচ্চড়ি ও জনি ওয়াকার সেই অন্ধকার জঙ্গলে জোনাকির মতো জ্বলে জ্বলে পাশাপাশি হাঁটছিল। ঝকঝকে আকাশের সপ্তর্ষিমণ্ডল তা পুরোটা দেখেছে বলে ভাবা যায়।


- চলবে
লেখা চলছে - ততক্ষণ ছবি রইল

https://m.facebook.com/sumanmanna13/albums/10212464197496556/?ref=book
marks

৩- ১৯ শে জুন

পাখিদের ডাক সত্বেও কীভাবে ঘুমোন যায় সকাল চারটের পর - সুমনের মাথায় আসে না। যদিও মনে পড়ল রেশমী মুক্তেশ্বর থেকে ফেরার পরেই ঘরে রাখা একটা আগাথা ক্রিস্টি নিয়ে বিকেলের সময়টা কাটিয়েছে। রাতে সেটা নিয়েই আলকোভে গেল শুতে, সুমনকে সাম্পানের পাশে পাঠিয়ে দিয়ে। কত রাত অবধি পড়েছে কে জানে। তাই সে একাই এই ভোরবেলা নিয়ে একা বসে আছে।

কয়েকটা সময়, কয়েক মূহুর্ত, মানুষের কাছে যখন সে সম্রাট হয়ে যায়। এই আলো ফুটে ওঠার মূহুর্তে যখন চার দিক থেকে পাখিরা ডেকে উঠছে, একে একে আর তার সুর, লুয়, তীব্রতা বেড়ে চলে আলো বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, তার আশেপাশে আর কোনও মানুষ নেই এটা প্রত্যক্ষ করার পরও অবিশ্বাস্য লাগছিল তার। সে অনেকক্ষণ চুপ থাকতে চাইল। পাখির মতোই যেন সে একবার কুশনওলা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসছে। কিছুক্ষণ পরে আবার উঠে বসল পাথরের টেবিলটায়। কানে এল একটি নতুন পাখির ডাক বাঁ দিকের বড় চেস্টনাট গাছ থেকে। সেই পাখিটাকে খুঁজল, পেল না। কিছু পরে সে দেখল সেই কালো পাখিটাকে বেরিয়ে এসে কোনো দিকে না তাকিয়ে গতরাতের ডিনার টেবিলে চড়ে বসতে। রোদ্দুরে খেয়াল হল সে পাখিটা কালো নয় মোটেও। গাঢ় নীল। পরে জেনেছিল সে ওর নাম মালাবার থ্রাস।

পাখির নাম নিয়ে মাথা ঘামায় নি সে এতদিন। পাখির নাম, গাছের নাম তাও দূরের কথা, মানুষের নাম অবধি তার মনে থাকে না। আজ অবধি একটা পড়ে ভালো লাগা গল্প বা উপন্যাসের নাম সে মনে করতে পারে নি সহজে। বহুবার পড়া কবিতার একসঙ্গে তিন লাইন করেই মনে থাকে তার।

তবু, এই পাখিদের সমুদ্রে, এত রঙ, এত সুকণ্ঠ, ক্ষিপ্রতা, যেন অনুচ্চারে দাবি জানায় - অন্তত নামটা শিখে রাখো না কেন - সম্রাট হওয়ার দু:খ সে টের পায় সে। পাইনের ফাঁকে বসে থাকা পাখির অবয়ব সিল্যুট সাদা কালো আসে। হোয়াইট ব্যালেন্স বদলে টাংস্টেন করলে সে অদ্ভূত নীল হয়ে যায়। পাইনের সরু সরু পাতাগুলি ঘিরে রাখে পাখির অবয়বটিকে গভীত মমতায় সেই গাঢ় নীলে।

কিছু পরে সকালের রৌদ্রে সেই ছটফটে নার্সারিতে পড়া বাচ্চাদের মতো পাখিরা এসে হাজির হয় ক্রমে। ডালিমে ঠোকরায়, কিচকিচ করে মাথায় করে সেই আলোয় ভরা জঙ্গল। অনেক চেষ্টায় ক্যামেরায় আটকাতে পারে কয়েকটি মাত্র। একটা ত্রিমাত্রিক কুমীরডাঙা খেলার মতো উড়ে বেড়াবে ওরা। একডাল থেকে অন্য ডালে বিদ্যুৎ গতিতে উড়ে যাবে তখন ছোঁয়া যায় না। এক ডালে বসলে ক্যামেরা ফোকাস করতে না করতেই আবার পালাবে। সে পড়েছিল এক জায়গায়, ছটফটে পাখির ছবি তুলতে গেলে দু-চোখ খোলা রাখা বাঞ্ছনীয়, তা আর সে শিখবে তবে না। তবু জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে এক অন্য সখ্যতা জন্মায়।

এদিন আবার এদের ফেরা। ফেরার পথে এরা দেখতে চাইল “আরোহী”র স্কুলটি। সেটি বড় রাস্তায় তিন চার কিলোমিটার যেতে পড়ে। সে স্কুলের গরমের ছুটি শুরু হয়ে গিয়েছিল বলে বাইরে থেকেই দেখা হল তা। বেশ বড় স্কুল। রাস্তার পাশে একটি দোকান আছে যাতে “আরোহী”র মানুষদের বানান হাতের কাজ কিনতে পাওয়া যায়। তা কিছু কেনা হল। এদিকে রেশমী যে আগাথা ক্রিস্টিটা শুরু করেছিল সেটা আর মাত্র কয়েক পাতাই বাকি, সে ভাবছিল পরে ফিরে গিয়ে নেট থেকে বাকিটা পেয়ে যাবে হয়ত। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে প্রদীপ নিজেই জিজ্ঞেস করলেন বইটা শেষ হয়েছে কি না, এবং শেষ হয়নি জেনে রেশমীকে সেটা উপহার দিলেন।

দু-দিন এবার কাটবে ভিমতালের “দ্য রিট্রীট” এ। বারোটা নাগাদ বেরিয়ে পড়াই ভালো। দুপুরের খাওয়া ঠিক হল সেই অর্জুনবাবুর ডেরায়। গত কয়েক দিনের গুরুভোজন সামলাতে অর্জুনবাবুকে বলা হল আলু-পোস্ত, বিউলির ডাল আর মাছের ঝোল বানাতে এবং অবশ্যই কিছুটা আলুভাতে। যখন সে বাওয়ালি তে ওরা পৌঁছল শুনল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে ফেলে আসা সাতখোলের ডাক বাঙলোয়।

বাওয়ালি থেকে যে রাস্তা সোজা কাঠগোদাম যাচ্ছিল, তাতে ভীমতাল বাইপাস এর সঙ্কেত দেখে ড্রাইভার গাড়ি ঘুরিয়ে দিল ডানদিকে। অনতিবিলম্বে দেখা গেল ভীমতালের সবুজ জল। তাকে বাঁদিকে রেখে কিছুটা যেতেই ডানদিকের একটা এবড়োখেবড়ো সরু পাহাড়ে উঠে যাওয়া বদখত রাস্তায় ঢোকাল গাড়ি ড্রাইভার আনন্দ। জানা ছিল প্রদীপ সপরিবারে দিন কয়েক আগেই ঘুরে গেছেন এই ব্রিট্রীট। তখন আনন্দ এসেছিল। সে জায়গাটা চেনে। তবে ভীমতালের পাশ থেকে রিট্রিট অবধি রাস্তা বেশ দুর্গম। একে তো চড়াই বেশ কঠিন, তার ওপর জায়গায় জায়গায় রাস্তা ভেঙে বড় বড় খাদ তৈরি হয়েছে। এদিকে রাস্তাটি বেশ সরু উল্টোদিক থেকে আসা গাড়িকে ব্যাক করে অপেক্ষাকৃত চওড়া অংশে দাঁড়ালে তবে আসা যাওয়া চলে।

জঙ্গল ঘন হচ্ছিল সেই রাস্তায় প্রতি বাঁক ঘুরতেই। বেশ কয়েকটি সাহেবি নামের থাকার জায়গা পার করে এক জায়গায় ধাঁ করে গাড়ি থামল।

প্রথমে দেখা গেল এক পরিত্যক্ত ধরণের বাংলো - যখন এরা একটু সন্দিগ্ধ হতে শুরু করেছে এরা তখন পাহাড়ের পাশ থেকে উদয় হলেন পদ্মিনী। আগে ছবি দেখে চেনা ছিল সুমনের। আলাপ পরিচয় হল বাকিদের সঙ্গে। দেখা গেল বাঁদিকে জঙ্গলে ঘেরা একটা পর্যাপ্ত সিঁড়ি উঠে গেছে। বড়জোর দোতলা সমান উচ্চতায় পৌঁছতে হবে। পদ্মিনী বয়স্কদের কথা মাথায় রেখে ড্রাইভার আনন্দ কে বোঝালেন একটু ব্যাক করে অন্য একটা রাস্তায় গাড়ি নিয়ে ওপরে আসতে, যাতে বয়স্কদের সিঁড়ি ভাঙতে না হয়। কিন্তু যাদের জন্য বলা, সেই ভারতী, শম্পা শচীন ও শঙ্কর সমস্বরে জানালেন তাঁরা এই সিঁড়ি বেয়েই যাবেন। মালপত্র নিয়ে এলেন আসলাম ও আরও একজন।

সিঁড়ি বেয়ে ওপরে আসতেই দেখা দিল ঝলমলে রিট্রিট। এই জায়গাটার একটা ছোট ইতিহাস আছে। প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো এই বাংলোটি পরিচিত ছিল জোনস এস্টেট নামে। এদিকে ১৯৩০ নাগাদ জার্মানী থেকে নাৎসি অত্যাচারে দেশত্যাগ করেন পিটার স্মেটাসেক। জাহাজে করে কলকাতায় পৌঁছে নিজস্ব ব্যাবসা চালু করেন তিনি। বিয়ে করেছিলেন টিপু সুলতান বংশের একজনকে। কলকাতার ব্যবসায় অনেক পয়সা উপার্জন করে পিটার এইখানে চলে এসে জোনসের এই বাংলো কিনে সেখানে থাকতে শুরু করেন। নিয়মিত নিমন্ত্রণ করতেন অৎকালীন সমাজের মাথাদের। পদ্মিনী স্মেটাসেক বিবাহসূত্রে সেই বংশের উত্তরসুরী ।

এখানেও সামনের চত্ত্বর সাজানো মরশুমি ফুলের কেয়ারিতে। সামান্য সমতল ঘাসজমি রেখে বাকিটা পুরো জঙ্গল। বাংলোর ডানপাশ থেকে একটা সরু পথ গেছে, যাতে একমাত্র একটা ছোট গাড়ি একমুখে চলাচল করতে পারে।

প্রথমেই চোখে পড়ে বাংলোর ঠিক মাঝখানে কাঁচে ঢাকা অংশটি। এটি বাংলোর ড্রইং -ডাইনিং রুম। দরজার বাইরে টুপি ও ওভারকোট ঝোলানর ব্যবস্থাটি অক্ষুন্ন রাখা হয়েছে। দালান পাথরকূঁচি বিছোন। সেখানে বেতের চেয়ার টেবিলে এরা জড়ো হলে হাতে হাতে এল ব্রুনাশ (রডোডেবড্রন) এর সরবত। আগে বলা হয় নি, রডোডেনড্রন এবারে দেখা গেল না তেমন। এপ্রিল মে মাস লাল হয়ে থাকে আলমোরা সন্নিহিত জায়গাটি রদোডেনড্রনে। মুক্তেস্বরের ওই স্বল্প ট্রেকিঙের সময় দু-একটি গাছে অল্প কিছু ফুল যেন ওদের জন্য রাখা ছিল।

এখানেও তিনটে ঘর অতিথিদের জন্য। দুটো ঘরের সঙ্গে লাগোয়া অ্যান্টি রুম আছে যার একটিতে দুটো সিঙ্গল বেড আর অন্যটিতে বাঙ্ক বেড সহ তিনজনের অতিরিক্ত শোওয়ার ব্যবস্থা।

কিন্তু সে সব তো পরের কথা, তার আগে সেই ড্রইংরুম থেকে ভেতরে যেতে হবে তো, সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সাজান এত কিছু এবং প্রতিটি নিজস্বতায় সপ্রতিভ, তারা সহজে উদাসীন হতে দেয় না - সে দেওয়ালের মুঘল মিনিয়েচার পেন্টিঙের ফ্রেমবন্দী রূপ হোক, অথবা হলদে হয়ে আসা সাদা কালো ফোটোগ্রাফ। একপাশে রাখা একটি পিয়ানো। বিরাট ডাইনিং টেবিলটা ঘরে ঢুকতেই ঠিক সামনে। কিছু দূরে একটা নিচু টেবিল ঘিরে আড্ডা জমিয়েছে কয়েকটি অলস কৌচ, গদি আঁটা, তার কারণ সামনেই ফায়ার প্লেস। ঠিক তার পাশেই কাঠের লগ নাড়াচাড়া করার সরঞ্জাম। দেওয়াল জুড়ে কাঁচের আলমারিতে থরে থরে সাজানো পানীয় পেয়ালার সারি জায়গাটি সৌখিন করেছে। আবার পিয়ানোর পাশের বইয়ের র‍্যাকটি ছোট, কিন্তু অর্থবহ।

বাংলোর বাইরে থেকে যদি সেই কাঁচে ঘেরা ড্রইং রুমটি বাংলোর বিউটি স্পট ভাবা যায়, তবে সেই ড্রইং রুমের ভিতর থেকে বিকেলের পড়ে আসা আলোয় সেই জানলা জায়গাটিকে মোহময় করে তোলে। আলো যা আসে, তা এই ঘরের প্রতিটি আসবাব টুকিটাকি প্রাচীনতা গুলি যে যতটা পায় তাতে ভাস্বর স্নিগ্ধ হয়ে থাকে। কাড়াকাড়ি নেই, পারস্পরিক হৃদ্যতা অনুভব করা যায় সহজেই।

অচিরেই বৃষ্টি নামল। এমনিতে এদিকে চারপাশটা যথেষ্ট সবুজ ছিলই আগে থেকে, এখন যেন একটা সবুজ অন্ধকার হয়ে এল।

বৃষ্টি থামতে ক্যামেরা কাঁধে সুমন ফের বাইরে। শঙ্কর দেখেই বললেন জায়গাতা যেন উডহাউসের বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে। বলে সেই র‍্যাক থেকে খুঁজে উডহাউসের বই নিয়েই বসলেন।

চা এলে, পদ্মিনীকে জানান হল রাতে কন্টিনেন্টাল খাওয়াই ভালো। ভারতী, শচীন মাংস খান না। এদিকে বেড়াতে এসে মাছটা সব জায়গায় সহজলোভ্য নয় বলে ওরা বেড়াতে এলে নিরামিষ খেয়েই থাকেন। মাছ পাওয়া যাবে শুনে সবাই ঠিক করল মাছই হোক।

চায়ের টেবিলে আলাপ হল বিপ ও ট্যাসির সঙ্গে। বিপ ছেলে, ট্যাসি মেয়ে। বিপ একটূ ভোলাভালা ধরণের, ট্যাসি একটু রাশভারী। বিপ কালো, সরু মুখের, সহজেই আলাপ জমাতে ভালোবাসে, সামনে এসে গলাটা তুলে দিয়ে আদর খেতে চায়। ট্যাসি সামান্য দূর থেকে দেখে, একটু আধটু ল্যাজ নাড়ে। কাছাকাছি কেউ তার ঘাড়ে মাথায় হাত বুলোলে চোখ বন্ধ করে বটে, কিন্তু নিজে থেকে চায় না।

যতক্ষণ আলো থাকে সুমন ঘুরে বেড়াল জঙ্গলে। গত দু-দিনের অভ্যাসে সে একটু সড়গড় হয়েছে পাখিদের খামখেয়ালিপনায়। ছবি তোলাতে সে উন্নতি বোঝা যায় না। তবে পাখি ফসকে গেলে সে আর মুষড়ে পড়ে না।

সাহেবি বাংলোর কৌচে সঙ্গে আনা চিজ কিউবের সঙ্গে স্কচ খেল ওরা খানিক। এদিকে সেই ডাইনিং টেবিল ধীরে ধীরে সেজে উঠছে বোন চায়না ক্রকারিতে, ঝকঝকে কাটলারি সেট এ। স্যুপ খাওয়ার চামচটা রূপোর ছিল। স্যুপের পরে এসেছিল হোয়াইট স্যসে রান্না করা সব্জী একটা বড় পাত্রে আস্ত বেক করা সিঙারা মাছ।

সুমনের মতো খাইয়ে থাকা সত্বেও সেই মাছের মুড়োটা আস্ত থেকে গিয়েছিল শেষ অবধি।

*********************************************************


৪- ২০শে জুন
আগের রাত্রে বলে রেখেছিলেন পদ্মিনী, কেউ ভোরবেলা উঠে চা খেতে চাইলে তার যোগাড় থাকবে ডাইনিং রুমে। ইলেকট্রিক কেটলি তে জল ফুটিয়ে চা নিয়ে বাইরের বেতের চেয়ারে বসতে বসতে সুমন দেখল আলো ফুটছিল। কিন্তু মেঘ করে আছে। টিপটিপে বৃষ্টি। তাই ক্যামেরা নিয়ে বাইরে যেতে পারছিল না। এদিকে আগের দিন পদ্মিনীকে একটা পাখির ছবি দেখিয়ে নাম জিজ্ঞেস করাতে সে তার বইয়ের ভাণ্ডার থেকে সেলিম আলি র বই বের করে দিয়েছিল। তার পাতা ওল্টাচ্ছিল সে।

চা শেষ করে আর একটা বিস্কুট নিতেই বিপ এসে হাজির, সঙ্গে আরও একজন। এ ট্যাসি নয়। দেখতে বিপের মতোই, কিন্তু এ একটু দুরন্ত গোছের। সুমনকে দেখে একচোট ঘেউ ঘেউ শুনিয়ে দিল। এদিকে বিপ সুমনের গা ঘেঁসে ওকে বোঝাতে চাইছে এরা খুব অনভিপ্রেত নয়। লোক তো তেমন খারাপ নয়। তা সে বুঝল একসময় কিন্তু গজগজানিটা থামাল না।

শম্পা উঠলেন। ততক্ষণে আসলামও উঠে পড়েছে বলে চা আর বানাতে হল না। বৃষ্টি কমে গেছে বলে সুমন নেমে পড়ল বাইরে। কিন্তু, আলোর অবস্থা বেশ খারাপ। আই এস ও বাড়ালেও শাটার স্পিড যথেষ্ট বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। আর এদিকে যারা আছেন, তারা এত ছটগটে যে কম স্পিডে তাদের মন পাওয়া দায়।

গাড়ি চলা পথ দিয়ে কিছুটা নামতেই সুমন দেখল শম্পা ওদিকেই ঘুরছেন। আর তাঁর পায়ের কাছে লুটিয়ে গড়িয়ে আহ্লাদ জানাচ্ছে ক্রিম রঙের ভারি চমৎকার দেখতে একজন। একেও কাল দেখা যায় নি।

জঙ্গলের একটা ব্যাপার আছে। ঠাসবুনোট জঙ্গলের একেবারে কাছে চলে গেলে তখন এক আধটা পথ চোখে পড়ে। দূর থেকে তারা সহজে ধরা পড়ে না। অনেকটা “শক্ত” বা “কঠিন” কবিতা যেমন হয়। একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে মনে হয় - পাগল না হলে কি এর ধারকাছ দিয়ে কেউ যায়? একটু ঠাহর করলে, বা হঠাৎ আচমকা সেই জঙ্গলে একটা পাখি ডেকে উঠলে, সেই শব্দ অনুসরণ করতে কাছে যেতে হয়। তখন আলাদা আলাদা গাছ চোখে পড়ে। চোখে পড়ে কত অপর্যাপ্ত পাতা রাশির মধ্যে কত কত রঙ বেরঙের ফুল ফুটে রয়েছে। কত ফল। পোকাগুলো, মৌমাছিরা, একটা নির্দিষ্ট ছন্দে ফুলে বসছে, উড়ে যাচ্ছে। গাছের গোড়ার ফার্ণগুলিও ফেলনা নয়। মেঘ ছিঁড়ে রোদ্দুর বেরোলে তা সেই ফার্ণের পাতাগুলিকেও সুপ্রভাত বলে যাবে। হাওয়া এসে দোল খাইয়ে সেই পাতার ডগায় ঝুলন্ত বৃষ্টিফোঁটা খসিয়ে মজা দেখবে। মাকড়শার জাল তৈরি হতে থাকবে যুদ্ধকালীন ক্ষিপ্রতায়। এইসব দেখতে দেখতে এইভাবে কাছে যেতে যেতে যত গভীর জঙ্গল হোক না কেন, যত “কঠিন” বলুক না লোকে কবিতাটি - পথ ঠিকই খুঁজে পাওয়া যায়।

নাম না জানলে সমস্যা হয় বৈকি। লিখতে না জানলেও হয়। পাখি, গাছ, পোকাগুলির নাম জানলে আরও স্পষ্ট করা যেত সকালটি। বলে রাখা যায়, জঙ্গলের ভিতরে পায়ে চলাচলের পথ থাকে সাধারণত। আর তা খুব বেশি না ঘুরিয়ে আবার চওড়া সহজ রাস্তায় এনে ফেলে। আধুনিক কালে দীর্ঘ কবিতা ও বিশাল জঙ্গল দুই-ই সহজলোভ্য নয়।

এদিকে বেলা গড়ালে বাকিরাও একে একে উঠে পড়েছে। রোদ্দুর বেশ ঝমঝমে। এতে মুশকিল হয় পাখির ছবিতে। পাখি তো আর ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল মেপে খাবার খুঁজবে না, তাই প্রায়শই ব্যাকলাইট হয়ে গিয়ে ছবি কেঁচে যায়। সুমনের তাই যাচ্ছিল। ও তো তেমন আয়ত্ত করতে পারেনি কলা কৌশল সমূহ। এর আগের দিনগুলোয় বেশিরভাগ সময়ে মেঘলা থাকায় একটা ডিফিয়ুসড আলো পাচ্ছিল। ঝকঝকে রোদ্দুর যে ছবি কেঁচিয়ে দেবে সে কি আর অতশত জানত।

জলখাবারের আগেই এদিকে বাংলোর সামনের চত্ত্বরে জমে গেছে খেলা। ওই ক্রিম রঙের সুন্দর ছানাটি, যে কিনা শম্পার পায়ে লুটোপুটি খাচ্ছিল জানা গেল ওর নাম “ভালু”। কুকুরের নাম ভালু - তারা শোনেনি এযাবৎ। ভালু খুবই মায়াবী প্রাণী। কথা বিনিময় ছাড়াই বাকিদের সঙ্গে খাতির জমে যায় তার দ্রুত। আর ওই বিপের মতো দেখতে কিন্তু অল্প বেশি খিটখিটেটির নাম জানা গেল ‘পপি’।

খেলা বলতে ভালু যখন এদিকে মানুষজনের সঙ্গে আলাপ পরিচয় চালাচ্ছে, পপি এসে পিছন থেকে তার ঠ্যাঙ কামড়াবে। ভালু ঘুরে দাঁড়িয়ে পপির সামনের পায়ে কামড়াবে। তারপর পপি ভালুকে তাড়া করবে ও ভালু তীরবেগে একেঁবেঁকে দৌড়ে তাকে এড়িয়ে যাবে। এড়য়ে যেতে যাওয়ার খেলায় এই সাতজন যেন তার চোর চোর খেলার বুড়ি।

সুমন বেচারা হয়ত অনেক কষ্টে একটা কাঠঠোকরা কে বাগে আনতে পেরেছে। ফোকাস হয়ে গেছে শাটার মারেছি কি মারেনি, ভালু এসে সোজা এসে দু-পায়ের মাঝকানে হাঁটুর পিছনে এসে মারল এক গোত্তা। কোথায় পাখি কোথায় ফোকাস। সে যেন বুড়ি ছুঁয়ে কৃতার্থ করেছে এমন মুখে তাকিয়ে আছে সুমনের দিকে। আর যে তাকে তাড়া করছিল সেই পপি থেমে গেছে। ভাবটা এমন - যাক, এ যাত্রা বেঁচে গেলি, দেখি পরের বার কে বাঁচায় তোকে।

ব্রেকফাস্টের কেতা এখানে বেশি, দুধ কর্ণফ্লেক্সের ব্যাপারটা আগের পিওরা তে ছিল না। কিন্তু ওই কেতার বাইরেও যে থাকে সেটা ওমলেট। এখানের ওমলেটের কথা সুমন আগে শুনেছিল - যখন সে জায়গা পছন্দ করছিল। কিন্ত তার স্বাদ দেখা গেল একটুও বাড়িয়ে বলা নয়।

জানা গেল, এই জায়গাটা থেকে বিভিন্ন পায়ে চলা পথ গেছে, কোনোটি সাত তালে যায়, কোনোটি ভিমতালে। ঢিমেতালে কোনো রাস্তা আবার পাশেত পাহাড়েও তুলে দেবে। যেখান থেকে পায়ে চলা পথ শুরু সেখানে একটা “বাটারফ্লাই মিউজিয়াম” এর বোর্ড আছে। সেটা নাকি সবচেয়ে কাছে। কথা হল সবাই যেতে পারবে তাই ওখানেই যাওয়া ভালো। এদিকে আকাশে মেঘ করে এসেছে, এক পশলা বৃষ্টিও হয়ে গেল, তাই লম্বা পথ পাড়ি না দেওয়াই ভালো।

পায়ে চলার পথটা সরু, ভিজে ভিজে। মেঘলা আবহাওয়ায় চলে সবুজ কালো আলো আঁধারির খেলা। কিন্তু পুরোটাই পাখির কলকাকলিতে মুখরিত, জীবন্ত। পাতা ঠাসা জঙ্গলে সে পাখির ডাক অনুসরণ করে তাকে খোঁজে তেমন কৌশল সুমন জানে না। আর বাটারফ্লাই মিউজিয়ামে হেঁটে যাওয়া আর বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা ভেবে সে ক্যামেরা ছাড়াই বেরিয়েছে।

এদিকে সেই প্রজাপতি যাদুঘরের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। আধঘন্টা টাক পরে জঙ্গল ফিকে হয়ে আসতে দেখা গেল ডানদিকে পাহাড়ের নিচে কয়েকটি পাকা বাড়ি। ভাবা হল ওখানেই হয়ত সেই জায়গা। আরও কিছুটা যেতে গাড়ি চলা পিচ রাস্তায় এসে নামিয়ে দিল সেই পাহাড়ি সরু পথটি।

পথচলতি দু-একজনকে জিজ্ঞেস করেও সে মিউজয়ামের খোঁজ পাওয়া গেল না। কিন্তু হাঁটাটা সবারই ভালো লেগেছিল। হয়ত এই পিচ রাস্তা দিয়েই সেই যাসুঘরে পৌঁছন যেত। কিন্তু ডানদিকে যাওয়া হবে না বাঁদিকে? কতদূর আরও যেতে হবে, এইসব অনিশ্চয়তা, তার ওপর রাস্তাটি ঢালু, যেদিকেই যাওয়া হোক না কেন, একপিঠে তো চড়াই ভাঙতেই হবে। তাই ফেরাই সব্যস্ত হলে সেখান থেকে।

ফেরার পথে মাঝামাঝি আসতে এক জায়গায় দেখা গেল একটা বাজ পড়া নিস্পত্র গাছে ছাইরঙা মাথাওলা টিয়া (পরে দেখা গেল ওটা স্লেট হেডেড হিমালয়ান প্যারাকিট) টিয়াপাখির ছবি এর আগে ভালো পায়নি বলে সে আবার রিট্রিটে ফিরে গিয়ে ক্যামেরা নিয়ে ফেরৎ আসতে চলল।

বৃষ্টি বাদলা দিন বলে হেঁটে গিয়ে জায়গায় খোলা প্রাঙ্গনে বসে ম্যাগি খেয়ে লাঞ্চের প্ল্যানও বানচাল হয়েছিল। পদ্মিনী কে বোঝান হল আমরা বৃষ্টি হলে খিচুড়ি ডিমভাজা খাই। সে যত্ন নিয়েই বানাল।

সেই খাওয়ার টেবিলেই জানা গেল সেই বোর্ড, যেখান থেকে পায়ে চলার পথ শুরু সেই সাইনবোর্ডের পাশের একটা সাধারণ লোকজন থাকে টাইপের বাংলোতেই সেই মিউজিয়াম। একটা পরিবার, যারা সেটা চালায় তারা তখন কী কাজে যেন বেরোবে। এরা সুবিধামতো তা দেখে নেবে পরে।

যাই হোক, বৃষ্টি বাদলার দিনে ভরপেট খিচুড়ি খেয়ে অল্প ঘুম সবাই হয়ত চাইছিল। তাই তেমনটাই হল।

পরের খণ্ডে সমপ্য।



572 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: R

Re: আরও একটি ভ্রমণ কাহিনী - কুমায়ুনে চারদিন

লেখার সাথে, ঐ গুনধুপসি ব্যাগের ক্যামেরাতে তোলা ছবি দেখতে পেলে ভালো লাগবে। আর যদি খরচ-খরচা এবং যোগযোগের বিষয়্গুলি জানা যায় তবে বেশ ভালো হয়।
Avatar: pi

Re: আরও একটি ভ্রমণ কাহিনী - কুমায়ুনে চারদিন

আরে, চলুক!
আর ছবিগুলো এখানেও আসুক!
Avatar: ফরিদা

Re: আরও একটি ভ্রমণ কাহিনী - কুমায়ুনে চারদিন

9719816154 - প্রদীপ গুপ্তা
9897089674 - শূভা গূপ্তা
এটা ডাক বাংলোর প্রদীপ ও শুভার ফোন নম্বর। ওখানে তিনটে ঘর আছে। দু-পাশের ও মাঝের ঘরের ভাড়া যথাক্রমে ৪০০০, ৩৫০০ ও ৩০০০। আমরা তিমটে ঘরই নিয়েছিলাম। খাওয়ার খরচ ২০০ টাকা প্রতিজন প্রতি মিল। ব্রেকফাস্ট ১৫০ করে। চা কফিগুলো ফ্রি। ফোনে তারিখ কনফার্ম করে নেট ব্যাঙ্কিনঙে টাকা পাঠিয়ে বুকিং পাকা করেছিলাম। এরা ৫০% থাকার চার্জ অ্যাডভান্স নিয়েছেন। বাকিটা ক্যাশে। ক্রেডিট কার্ড চলে না।


8171031968 পদ্মিনী স্মেটাসেক
এটা "দ্য রিট্রিটের" পদ্মিনীর। এদেরও তিনটে ঘর। ভাড়া আলাদা করে মনে পড়ছে না, আমাদের জন্য ১২,০০০ করে পড়েছিল প্রতিদিন ৩ টে ঘরের জন্য। এখানে ব্রেকফাস্ট ফ্রি। খাওয়া দাওয়া অসম্ভব ভালো ও দামী। প্রতি মিল প্রতি জন ৬৫০-৭০০ টাকা নন ভেজ। এরা ১০০% থাকার পয়সা অ্যাডভান্স নিলেন। ক্রেডিট কার্ড এখানেও চলে না।

Avatar: Arindam

Re: আরও একটি ভ্রমণ কাহিনী - কুমায়ুনে চারদিন

অতুলনীয় অসাধারণ চিত্রকল্প! জমজমাট আর নিটোল!

তবে "মুগডালের খুচুড়ি" -র বিষয়ে আরও জানার আগ্রহ রইলো ঃ)
Avatar: Arindam

Re: আরও একটি ভ্রমণ কাহিনী - কুমায়ুনে চারদিন

প্রগলভতা টি নিজগুণে মাপ করে দেবেন, আশা করি ঃ) !
Avatar: Shuchismita Sarkar

Re: আরও একটি ভ্রমণ কাহিনী - কুমায়ুনে চারদিন

কি ফুরফুরে লেখা!
Avatar: দ

Re: আরও একটি ভ্রমণ কাহিনী - কুমায়ুনে চারদিন

তারপর?
Avatar: ফরিদা

Re: আরও একটি ভ্রমণ কাহিনী - কুমায়ুনে চারদিন

তিন নং এসে গেছে :)
Avatar: ফরিদা

Re: আরও একটি ভ্রমণ কাহিনী - কুমায়ুনে চারদিন

R, পাই, অরিন্দম, শুচিস্মিতা, দ ও বাকিরা যারা পড়ছেন তাদের অনেক ধন্যবাদ।
অরিন্দম, মুগডালের খুচুড়ি" - সে এক ভারী বিপজ্জনক ব্যাপার। মোটা মোটা থ্যাবড়া আঙুল ও রিডিং গ্লাস না নিয়ে বসলে এটা সহজেই রাঁধা যায়:)

তবে সত্যি, পড়ে দেখলাম অনেক বানান ভুল হয়েছে, আরও যত্নবান হওয়া উচিৎ ছিল।
Avatar: শঙ্খ

Re: আরও একটি ভ্রমণ কাহিনী - কুমায়ুনে চারদিন

ভালো লাগছে। পড়ছি...


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন