সুকান্ত ঘোষ RSS feed

কম জেনে লেখা যায়, কম বুঝেও!

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...
  • খানাকুল - ২
    [এর আগে - https://www.guruchan...
  • চন্দ্রযান-উন্মত্ততা এবং আমাদের বিজ্ঞান গবেষণা
    চন্দ্রযান-২ চাঁদের মাটিতে ঠিকঠাক নামতে পারেনি, তার ঠিক কী যে সমস্যা হয়েছে সেটা এখনও পর্যন্ত পরিষ্কার নয় । এই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে শুরু হয়েছে তর্কাতর্কি, সরকারের সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে । প্রকল্পটির সাফল্য কামনা করে ইসরো-র শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীরা ...
  • দেশত্যাগ...
    আমার এক বন্ধু ওর একটা ভিজিটিং কার্ড আমাকে দিয়েছিল। আমি হাতে নেওয়ার সময় কার্ডটা দেখে বুঝতে পারলাম কার্ডটা গতানুগতিক কোন কার্ড না, বেশ দামি বলা চলে। আমি বাহ! বলে কাজ শেষ করে দিলাম। আমি আমার বন্ধুকে চিনি, ওর কার্ডের প্রতি এরচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখালে ও আমার মাথা ...
  • পাঠকের সঙ্গে তাদের হয় না কো দেখা
    মানস চক্রবর্তীকবিতা কি বিনােদনসামগ্রী? তর্ক এ নিয়ে আপাতত নয়। কবিতা কি আদৌ কোনাে সামগ্রী? কোনাে কিছুকে পণ্য হয়ে উঠতে হলেও তার একটা যােগ্যতা দরকার হয়। আজকের দিনে কবিতা সে-অবস্থায় আদৌ আছে কি না সবার আগে স্পষ্ট হওয়া দরকার। কবিতা নামে একটা ব্যাপার আছে, ...
  • হে মোর দেবতা
    তোমারি তুলনা তুমি....আজ তাঁর জন্মদিন। আমার জংলা ডায়রির কয়েকটা ছেঁড়া পাতা উড়িয়ে দিলুম তাঁর ফেলে যাওয়া পথে।দাঁড়াও পথিকবর....জন্ম যদি তব অরণ্যে," সবুজ কাগজেসবুজেরা লেখে কবিতাপৃথিবী এখন তাদের হাতের মুঠোয়"(বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)মহাভারত...
  • বেকার ও সমীকরণ
    'বেকার'-এই শব্দটি আমাকে আজন্ম বিস্মিত করেছে। বাংলায় লেখাপড়া শিখে, এমনকী একাদশ শ্রেণীতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে, সে কী বাংলায় পদার্থবিদ্যার বিদ্যা বালানীয় চর্চা! যেমন, 'ও বিন্দুর সাপেক্ষে ভ্রামক লইয়া পাই।' ভ্রামক কি রে? ভ্রম না ভ্রমণের কাছাকাছি? না, ভ্রামকের ...
  • ধানবাদের রায়বাবু
    অরূপ বসুবেশ কয়েকমাস আগে লিখেছিলাম, ভাল নেই ধানবাদের রায়বাবু। অরুণকুমার রায়ের স্মিত হাসিমুখ ছবির সঙ্গে সেই খবর পড়ে অনেকেই বিচলিত হয়েছিলেন। এখন লিখতে হচ্ছে, ধানবাদের রায়বাবু আর নেই! যে খবর ইতিমধ্যেই অনেকের হৃদয়, মন বিবশ করেছে। রায়বাবু নেই, কিন্তু ...
  • চন্দ্রকান্ত নাকেশ্বর
    চন্দ্রযান-৩ যখন ফাইনালি টুক করে চাঁদে নেমেই পড়ল তখন 'বিশ্বে সে কী কলরব, সে কী মা ভক্তি, সে কী মা হর্ষ'-র মধ্যে বোম্বে ফিল্ম কোম্পানি ঠিক করল একটা ছবি বানাবে। চন্দ্রযান-১ যখন চাঁদে গেছিল, তখন একটুও ফুটেজ পায়নি। কিন্তু তারপর মঙ্গলযান নিয়ে একটা আস্ত ছবি হয়ে ...
  • পাখিদের পাঠশালা
    'আচ্ছা, সারা দেশে মোট কতজন ক্যান্ডিডেট এই পরীক্ষাটা দেয়?', লোকটা সিগারেটে একটা টান দিয়ে প্রশ্ন করলো।-'জানা নেই। তবে লাখ দশেক তো হবেই।', আমি বললাম।- 'বাব্বা! এতজন! সিট কতো ?'-'বলতে পারব না। ভাল কলেজ পেতে গেলে মেরিট লিস্টে যথেষ্ট ওপরে নাম থাকতে হবে।'-' তার ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

সুকান্ত ঘোষ

নব্বই এর দশকে “শাসো কি জরুরত হ্যা জ্যায়সে...” এবং “ইয়ে কালে কালে আঁখে...” এই দুই যুগান্তকারী ঢেঊয়ের মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে আমাদের সাথে পরিচয় হয় ‘ক্যালোরি’ নামক জিনিসটির। তবে সেই ক্ষণে ক্যালোরির অর্থ আমাদের কাছে নিতান্তই আক্ষরিক ছিল – শক্তির একক হিসাবে। আরো খুলে বলতে গেলে যান্ত্রিক শক্তি কেবলমাত্র। পড়াশুনার গন্ডির বাইরে এই ক্যালোরি জিনিসটি নিয়ে যে নাড়াঘাঁটা করতে হতে পারে ভবিষ্যতে, সেই ভাবনা আমাদের কল্পনাতেও আসে নি। তবে কিনা ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন এই প্রবাদবাক্য মেনে অভিজ্ঞতা হল যে খাবারের সাথে শারীরিক শক্তির সরাসরি কোন সম্পর্ক আছে এবং তার পর থেকে অ্যাকাডেমিক জগতের বাইরেই ক্যালোরির উচ্চারণ আমরা বেশি করেছি। বহু বহু দিন পর্যন্ত আমরা খেতাম কেবলমাত্র খিদে পেত বলে এবং খেতে ভালো লাগত বলে। আর মায়েরা আমাদের খেতে দিত খাবার পর অন্য কাজে মনোনিবেশ করতে হবে বলে। ক্যালোরির সাথে খাবারের কোন সম্পর্ক আছে সেই কৈশোর বেলায় আমাদের কাছে কেউ বলতে এলে বামপন্থী ভাবধারার আন্ডারে থাকা আমরা তা নিছক সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত বলে উড়িয়ে দিতাম। কানপুরের পাঁচ নম্বর হোষ্টেলের চার নম্বর ব্লকে থাকা সাউথ ইন্ডিয়ান সনম্মুগম নামে ছেলেটিকে আমি বহুদিন ঝাঁটু চোখে দেখতাম যবে প্রত্যক্ষ করেছিলাম যে সে ভিখারীকে ৫০ পয়সা ভিক্ষা দিয়ে খাতায় ততক্ষণাৎ নোট করে নেয়। কিন্তু সেই সনম্মুগমের উপর রাগও আমার জল হয়ে গেল যখন খাবার টেবিলে দেখলাম সিঙ্গারা খেয়ে পাবলিক ১৪০ ক্যালোরি খেলাম বলে নোট করল! মোবাইল অ্যাপস তখনো আসে নি – ক্যালোরি ক্যাল্কুলেটর অ্যাপস চালু হবার পর আমি প্রায় বাকরহিত হয়ে গিয়েছিলাম এবং ঠিক করেছিলাম যে ছেলেকে যতদিন না পড়াতে বসতে হচ্ছে ততদিন আর ক্যালোরি কথাটি মুখে উচ্চারণ করব না – দরকার হলে লিখে বোঝাবো বা ডি ডি ওয়ান-এর রবিবারের একটা পনেরোর খবরের মত দুই হাত নেড়ে।

যেহেতু বাল্য, কৈশোর এবং কলেজবেলায় ক্যালোরি নামক কোন বাউন্ডারি কন্ডিশন আমাদের সামনে কেউ দেয় নি, তাই পরের পয়সায় খাবার ব্যাপারে আমাদের তরফে কোন কৃপণতা ছিল না। “পরের পয়সায় বিষও খাওয়া যায়” – এই ছিল মোটামুটি আমাদের জীবনের মোটো। কিন্তু প্রবলেম হল ছাত্র জীবনের শেষে মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানিতে কাজ করতে ঢুকে। পরের পয়সায় খাওয়া কনসেপ্টটা একটু ঘেঁটে গেল। কেউ যেন এক অদৃশ্য বাউন্ডারি কন্ডিশন লেপে দিল ‘এটিকেট’ যার নাম। আমার অবস্থা তখন ওই অনেকটা গ্রামের অ্যামেচার দলে ভালো যাত্রা করা ছেলের কলকাতার নামী গ্রুপ থিয়েটারে চান্স পেয়ে যাবার মত হল। শম্ভু – অজিতেশ কি ভাবতে পারে সেই ভেবেই টেনশনে গুটিয়ে গেলুম, পারফর্ম করব কি! খাবো নাকি খাবো না? খেলেও কতটা খাবো! একেবারে তুলে নেব, নাকি বারে বারে ঠোকর! হাত দিয়ে সাঁটাবো নাকি কাঁটা-চামচের ব্যবহার মাষ্ট! ঢেঁকুর তোলা যাবে কি না! খাবার যেখানে সাজানো আছে সেটা এক চক্কর লাগাবার পর চ্যুজ করব, নাকি প্রথম ডাব্বা থেকেই হাতা মারতে হবে! পুরো কনফিউশন – কোম্পানী নিজে যেচে কোন কালচারাল ট্রেনিং না দেওয়াতে আমাকে নিজে ঠোকর খেতে খেতে অ্যাডাপ্ট করতে হল। প্রথম যেটা আবিষ্কার করলাম তা হল – গোমড়া মুখে খেলে বেশী চোখে পড়ে, হাসি হাসি মুখে খেলে কম এবং হাসতে হাসতে খেতে শিখে নিতে পারলে অনেকটাই কম চোখে পড়ার সম্ভাবনা। বেশী হাসলে অবশ্য আপনি নিজে চোখে পড়ে যাবেন – কিন্তু তবুও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে আপনার খাওয়াটা হাইলাইট হবে না। আপনি নিজের ব্যক্তিত্বকে স্যাক্রিফাইস করে খাওয়া আড়ালে রাখতে পারবেন – চয়েস আপনা আপনা। আমরা যে স্কুল অব্‌ থটস্‌ এ মানুষ হয়েছি সেখানে ব্যক্তিত্ব বজায় রাখার থেকে পরের পয়সায় ভরপেট খেয়ে নেওয়া অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত পেত। তাহলে কি পরের পয়সায় ঢেলে খাওয়া আর ব্যক্তিত্ব বজায় রাখা দুটো একসাথে হতে পারে নে? পারে হয়ত – কিন্তু তার জন্য আপনাকে পাওয়ারফুল হতে হবে, কেউকাটা। আমি এই নিয়ে বেশী রিসার্চ করি নি, যারা উৎসুক তারা ডেল কার্ণিগির বই কনসাল্ট করে দেখতে পারেন।

জানুয়ারী মাসে সেই কোম্পানীতে জয়েন করলাম – ফেব্রুয়ারীতে বলে কি, তোমার পাসপোর্ট আছে? সেই হাতে লেখা পাসপোর্টে আমার ছবি দেখে এক সহকর্মী বলল তোমাকে তো পুরো টেরোরিষ্ট দেখাচ্ছে! আমি নত মস্তকে মেনে নিলাম – প্লেন উঁচু বাড়ীটায় ধাক্কা দিয়েছে মাত্র মাস চারেক হল। প্যাচালে অনলাইন পাবলিক প্রশ্ন করতে পারে আজকের যুগে – কেন ভাই, মেনে নিলে কেন? টেরোরিষ্টদের কি কোন স্পেশাল টাইপের দেখতে হয়? ডিস্ক্রিমিনেট করছ কেন? আমার সাফাই হল, আমি পুরানো হিন্দী সিনেমা ফিলোসফিতে বিশ্বাসী, সেখানে দেখলেই ভিলেন চেনা যাবে, মানে ভিলেন হবে ভিলেনের মত দেখতে। তবুও মিন মিন করে বললাম, পাসপোর্টের ছবি তো তবু ভালো, আমার ভোটার কার্ডের ছবি দেখলে কি বলবে? বলে – দেখি, দেখি। দেখালাম – দেখে হাসতে হাসতে পরের পয়সায় পাওয়া কফি চলকে ফেলল পরের দ্বারা পরিষ্কৃত ফ্লোরে। ভোটার কার্ডে আমি নাকি আরো বড় টেরোরিষ্টের মত দেখতে। নিমো উন্নত অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটার কার্ডের ছবি তোলার ক্যাম্প থেকে যখন আমাদের ছবি তোলার ডাক এল তখন আমি সবে আমি নিমো স্টেশনের পাশের মাঠে সকালের ক্রিকেট প্র্যাক্টিসে নিজের স্পেলের ফোর্থ ওভারের তৃতীয় বলটা করা শেষ করেছি। ঘাম ঝরা মুখ, ঘেমে ভিজে জামা, উস্কোখুস্ক চুল – ইত্যাদি ইত্যাদি। তখনো পর্যন্ত আমি জানতাম আমার ভোটার কার্ডের দৌড় নিমো পঞ্চায়েত বা বড়জোর মেমারীর বি ডি অফিস পর্যন্ত। কোনদিন আমার ভোটার কার্ড ব্যাঙ্গালোর পৌঁছবে জানলে না হয় চুলটা আঁচড়ে জামাটা পাল্টে আসতাম! বরং পাসপোর্ট ছবির জন্য আমাকে দোষ দেওয়া যেতে পারে – ল্যাদ খেয়ে খেয়ে ছবি না তুলে যখন ডেডলাইন মিট করতে ছবি তুলতে হল তখন আমি কানপুর আই আই টি বনাম কানপুর আর্মি ফ্রেন্ডলি ফুটবল ম্যাচ খেলে ফিরেছি সবে। কেবল জামাটাই পালটানো হল – নিজের এলাকায় আর্মিকে আধিপত্য না করতে দেবার জন্য যে দৃঢপ্রতিজ্ঞা এবং কাঠিন্য গড়ে তুলতে হয়েছিল তার সাথে জুড়ে থাকা ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনটা আর পালটানো হল না!

আমেরিকার ভিসা হল আমাকে কনফারেন্সে পাঠাবার জন্য। নিজের পেপার নেই, কারণ সেটাই প্রথম বছর কোম্পানিতে। তবু পাঠানো হল কারণ ‘কানেকশন’ গড়ে তুলতে হবে এবং তার সাথে কোম্পানীর অন্য জায়গার লোকেদের সাথে আলাপও হবে। সব ঠিক আছে – নিয়ম কানুন সব জেনে নিলাম। হোটেল তো না হয় কোম্পানী বুক করে দিচ্ছে, কিন্তু থাকার থেকেও আমার বেশি চিন্তা খাব কি? মানে বাঙালি বা ইন্ডিয়ান খাবার খোঁজার কথা বলছি না – সেই নিয়ে আমার ফ্যসিনেশান নেই। কিন্তু খাবার দাবারের রুল কি? যা চাই তা খেতে পারি টাইপের ব্যাপার কি? আমাকে একগাদা ট্রাভেলার্স চেক দিয়ে দেওয়া হল এবং জানানো হল যা মন চাই খেলে সেই নিয়ে কোন প্রবলেম নেই। তবে অ্যালকোহল বাদ। আরো জানানো হল যে কর্পোরেট ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দেওয়া হবে, তাই সমস্যা থাকার কিছু নেই। আমি ভাবতে ভাবতে যেতাম আর কি চাই! প্রথম বছর কনফারেন্স ছিল কলোরাডোতে। এস বি আই কর্পোরেট ক্রেডিট কার্ড অ্যাপ্লাই করে দেওয়া হল। কিন্তু যাবার দিন এগিয়ে আসে, কার্ড আর আসে না – যাবার দিন সকালে অফিস গেলাম, তখনো কার্ডের পাত্তা নেই। আমাদের ফিনান্স ম্যানেজার ব্যাঙ্কে একটা কল দিল আবার। বিকেলে ফ্লাইট ব্যাঙ্গালোর থেকে মুম্বাই – সেখান থেকে ডিট্রয়েট – তার পর কলোরাডো। ব্যাঙ্গালোরের পুরানো হ্যাল এয়ারপোর্টে চেক ইন করে বসে আছি – এমন সময় এস বি আই থেকে খোদ ব্রাঞ্চ ম্যানেজার এল ক্রেডিট কার্ড ডেলিভারী দিতে! কার্ড অলরেডি অ্যাক্টিভেটেড! আমার তো প্রায় আবেগে কেঁদে ফেলার অবস্থা – চোখ ছলছল করে উঠল। তবে সেটা কার্ড পাবার জন্য নয় – স্টেট ব্যাঙ্ক থেকে লোক এসে কার্ড দিয়ে যাচ্ছে সেটা দেখে। মেমারী স্টেশন বাজার স্টেট ব্যাঙ্ক থেকে গরু-ছাগলের মত ব্যবহার পেতে অভ্যস্ত সেই আমি। সেখানে ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের সাথে দেখা করে কথা বলা ভগবানের দেখা পাওয়ার মতই অসম্ভব ব্যাপার। আমি কার্ড হ্যান্ডওভার নিয়ে তড়িঘড়ি টয়লেটে গিয়ে চোখে জলের ঝাপটা দিয়ে এলাম।

তখনকার দিনে মুম্বাই ডোমেষ্টিক থেকে চেঞ্জ করে ইন্টারন্যাশানাল টার্মিনাল যেতে হত। গভীর রাতে ফ্লাইট বলে মুম্বাইতে কিছু খেয়ে নিতে হত রাতে। তা সেই ইন্টারন্যাশানাল টার্মিনালে যতদূর মনে পড়ছে অশোকা গ্রুপের একটা ক্যাফে টাইপের কিছু একটা ছিল। গলাকাটা দাম – খাবার মোটামুটি। কোম্পানির পয়সায় খাওয়া সেই শুরু যাকে বলে। ডিট্রয়েটে পৌঁছে এয়ারপোর্টে কি খাই কি খাই ভেবে ভেবে সামনেই পেয়ে গেলাম একটা আইস্ক্রীমের দোকান। মিষ্টী জিনিসটির প্রতি আমার এক আসক্তি আছে চিরকালীন – দিলাম একটা সবচেয়ে বড়টা অর্ডার করে, লিষ্টে সবচেয়ে দামীটা। আর সেই আমার প্রথম পরিচয় আমেরিকান লার্জ সাইজের সাথে। আমি সেই আমি – আর আইসক্রীম – তাতেও আমি হাঁফিয়ে গেলাম মাল শেষ করতে। বুঝলাম আমেরিকান লার্জ হল গিয়ে সত্যি করেই লার্জার দ্যান লাইফ।

একটা কনফারেন্সের খাওয়া-দাওয়ার ফিরিস্তি দেবার ইস্তেহার এটা নয় – তা ছাড়া আমার কাছে কোন নোট নেওয়া নেই যে পরপর ঘটনা লিখে যাব। মোটামুটি যে সব ঘটনা মনে আছে, আগুপিছু টাইমলাইনে নিয়েই এই ভাঁট। যেমন সঠিক মনে আছে যে আমাদের রিসার্চ বা ইন্ডাষ্ট্রি এরিয়ার সবচেয়ে বড় এই কনফারেন্স নিজে থেকে কেবল একদিনই লাঞ্চ দেয়, এই এতো দিনেও সেটা চেঞ্জ হয় নি। বাকি ডিনার ইত্যাদি সবই আছে, কিন্তু সব পয়সা দিয়ে কিনে খাও। নেহাত বাধ্য করা না হলে বা নিজে পুরষ্কার হ্যান্ডোভার নিতে যেতে না হলে মানুষ কেন যে যেচে ওই জাতীয় ডিনারে যায় কে জানে! চারিদিকে আঁতেল এবং গ্রাম্পি লোকেদের ভীড় – আপনি বিলক্ষণ জানেন লোকজন কিলবিল করছে চারিদিকে প্রগাঢ ধান্দা নিয়ে (ইনক্লুডিং আপনি নিজেও), তার মাঝে কি ভাবে মানুষ ডিনার এনজয় করে কে জানে! অবশ্য আপনি বলতে পারেন যে, ভাই দেখ তুমি একবারেই গাঁইয়া টাইপের মানুষ তাই বুঝতে পার নি – এই সব ডিনারে মানুষ পয়সা দিয়ে যায় ডিনার করার জন্য নয়, ওই বাকি তোমার মতে যেটা অকাজ সেটা করার জন্য। আমি পয়সা দিয়ে ডিনারে যাচ্ছি, কিন্তু আদপে ডিনার করার মূল লক্ষ্য নিয়ে নয়! এই ফিলসফি আমাদের ক্লাসিক্যাল স্কুল অব থটসের কাছে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মত ধোঁয়াটে।

তা যেটা বলছিলাম, কনফারেন্স সূচীতে ফ্রী লাঞ্চ দেখে মনটা নেচে উঠল। আমি নিজে তখন কোম্পানীর পয়সায় ফ্রী খাচ্ছি, তবুও ফ্রী দেখে সেই আদিখ্যেতা – মাইন্ড কোরাপসন এতটাই গভীরে প্রোথিত ছিল। কিন্তু হয়ত সত্যি করেই আমার মাইন্ডে তখনও নিষ্পাপ কিছু বেঁচে ছিল, এখন হলে আমার ধুরন্ধর মন যে কিনা কর্পোরেট চক্রান্ত নিয়ে দিনরাত ভেবে চলে, বুঝতে পারতাম – সত্যি করে খাওয়াবার মতলব থাকলে কেউ সপ্তাহ ব্যাপি কনফারেন্সের লাঞ্চ বৃহস্পতিবার আয়োজন করে না, সেখানে কিনা শুক্রবার প্রথম হাফে কনফারেন্স ফুস্‌। কানফারেন্সে লোক ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছে, যে হারে লোক প্রথম চারদিন অ্যাটেন্ড করেছিল, আমি সিরিয়াসলি মঙ্গলবার রাত থেকে ঘুমাতে যাবার আগে পনেরো মিনিট করে ভাবছিলাম, খাবার শেষ হয়ে যাবার আগে এবং সবচেয়ে শর্ট রুট দিয়ে কিভাবে খাবারের কাছে পৌঁছানো যায়। লাঞ্চ দেখলাম সার্ভ করা হবে একজিবিশন সে হলে হয়েছে সেখানে। একটু চিন্তা কমল বৃহস্পতিবার, কারণ সেই হলটা বিশাল ছিল, দুটো তিনটে ফুটবল মাঠ ঢুকে যাবে প্রায়। সকাল ১১টা থেকে লাঞ্চ পরিবেশিত হবে, সাড়ে এগারোটায় গিয়ে দেখি লম্বা লাইন, কিন্তু এগুছে খুব তাড়াতাড়ি। একটা খটকা লাগল – লাইন একটু কমলে দেখি কোন ব্যুফের ব্যবস্থা নেই, পাবলিক একটা করে স্যান্ডুউইচের প্যাকেট আর এক ক্যান করে সফট ড্রিঙ্কস নিয়ে সাইড হচ্ছে। একসাথে প্রবল হতাশা এবং ক্রুর আনন্দ মনের মধ্যে জেগে উঠল – শিবে জ্যাঠা শুনলে খুশী হত। ফ্রী তে খাবার দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ার ফিলসফিতে বিশ্বাসী জনতা সেই খোদ সাহেবদের দেশেও আছে! এই ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি প্রতিবছর তার পর থেকে দেখে এসেছি।

এর থেকে বরং কিছুটা ইনটারেষ্টিং ছিল ওই কনফারেন্সের সময় আমাদের কোম্পানীর আয়োজিত ডিনার। নানা দেশ মিলিয়ে প্রায় ১৫-২০ জন করে আমাদের কোম্পানীর লোক প্রতি বছর সেই কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করত। বেশীর ভাগ সময় আমাদের রিসার্চের হেড ডিনারের আয়োজন করত – আমি যতদিন ছিলাম আয়োজন করত প্রথম দিকে লিসা এবং পরে ল্যারি। এবং অ্যডমিট করতে হবে ওদের দিক থেকে কোন কার্পণ্য ছিল না ডিনারের খরচের, অ্যালকোহল সমেত। যেই শহরে কনফারেন্স হত সেখানকার আশে পাশের কোন এক বিখ্যাত রেষ্টুরান্টে সাধারণত আমরা একত্রিত হতাম। সেই ডিনারের খাওয়া নিয়ে আমার কোন ক্ষোভ নেই, কেবলমাত্র আমি আমার কোরিয়ান-আমেরিকান কলীগ কিম্‌-এর আমাকে কাঁচা মাছ খাওয়াবার প্রায় বর্ডারলাইন অনুরোধ জাতীয় জোরজবস্তি ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখতে পারি নি। বাই দি ওয়ে আমি তখনো সুসি কি জিনিস কোনদিন খেয়ে বা চোখে দেখি নি। পরে বুঝতে পেরেছিলাম কিম্‌ আমাকে মহার্ঘ্য সুসি খাওয়াবার চেষ্টা করেছিল ভালোবেসেই – কিন্তু এই এখনো এতদিন পরেও প্রকৃত সুসি আমার কাছে একটু দূরের হয়েই রয়ে গ্যাছে। আমি মাকি-র দলে – এখন আমি নিয়মিত সুসি রেষ্টুরান্টে যাই, তবে মূলত মাকি খেতে। খোদ জাপানে নানা জায়গায় গেছি প্রকৃত জাপানিদের সাথে ট্রাডিশনাল খাবার খেতে – সুসি ট্রাই করেছি উত্তরে সাপোরো থেকে দক্ষিণে হিরোশিমা অবধি, কিন্তু সুসি এখনো আমার পেয়ারের লোক হয়ে উঠতে পারে নি। খেতে পারি, কিন্তু কেন খাব টাইপের ব্যাপার। সেই গল্প অন্য কোন সময়। কাঁচা এবং ঠান্ডা (মানে কোল্ড ড্রিংকস, আইসক্রীম ইত্যাদি ছাড়া) স্টার্টার বা মেন কোর্সের প্রতি আমার এক সন্নিগ্ধ ভাব রয়ে গ্যাছে আজও। সংশয় চিত্ত নিয়ে কি আর পুরোপুরি স্বাদ উপভোগ করা যায়! কে জানে! সেই একই কারণে কুঁচো বরফের বিছানোর শোয়ানো খাসা খাসা চিংড়িও আমাকে আকৃষ্ট করতে পারে নি অনেক দিন, সে তুমি পাশের মালসায় যতই সালসা শস্‌ রাখো।

বিদেশী কনফারেন্সরা খাওয়ানোর ব্যাপারে মোটের উপর কৃপণ হয় – কারণ জানি না, তবে মনে হয় ব্যাপারটা কালচারাল। কারণ উপরিউক্ত অ্যাসোশিয়েশনের ইন্ডিয়ান সেকশনের কনফারেন্স যখন মুম্বাইতে হয়, তখন খাওয়া ঢাওয়া এলাহি – তখন আবার মনে হয় খাওয়াটাই মনে হয় প্রধান। কানপুর আই আই টির পুরানো প্রফেসরের সাথে দেখা সেই পাওয়াই লেকের ধারে বিখ্যাত হোটেলের কনফারেন্স সেন্টারে। দেখা, তাও আবার লাঞ্চ আওয়ারে – কথা কি? কথা পরে হবে। স্যারের সাদা বড় প্লেট থেকে উপচে পড়ছে মাছ, মাংস, পনির, ডাল, ভাত – ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজু শ্রীবাস্তবের ব্যুফে নিয়ে জোক মনে পড়ে যায় এখন, সে হক কথা বলেছিল। একেবারেই ডুব দাও, পরের বার চান্স কখন পাবে কে জানে! লাঞ্চ এর পরের যে সেশনটায় আমি ছিলাম তার চেয়্যারম্যান ছিলেন স্যার – সে কি ঢেঁকুর, কি ঢেঁকুর। ইন্ট্রোডিউস করতে গিয়ে ঢেঁকুর, প্রশ্ন করতে ঢেঁকুর। ঢেঁকুর, হেঁচকি, পাদ এরা আবার সমব্যাথী উপসর্গ। একজন ঢেঁকুর তুলছে দেখলে অন্যজনের অবদমিত ঢেঁকুরেচ্ছা যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠে! আমার টক্‌ এই ভাবেই ঢেঁকুরে ঢেঁকুরে ছয়লাপ হয়ে গেল। ভ্যাগিস বড় বড় হোটেলে আজকাল আজকাল টাইমার লাগানো অটোমেটিক এয়ার রেফ্রেসনার লাগানো থাকে এবং তার সাথে এয়ার ভেন্টিলেশান – না হলে সেই ঢেঁকুর আর পাদের গন্ধে কনফারেন্স কি ভাবে এগুতো কে জানে!

তবে আমাকে যে টেররিষ্টের মত বা নিদেন পক্ষে নন-কর্পোরেটিয় দেখতে ছিল সেই কালে তা আরো একবার প্রমাণ হল পাওয়াই লেকে ধারে সেই ফাইভ স্টার লেকের ধারে। হোটেলে চেক ইন করে বিকেলের দিকে হোটেল কমপাউন্ডের ভিতরের লেকের দিকটায় হাঁটছি, হেই হেই করে সিকিউরিটি ছুটে এল। বলল- অ্যাই কতদিন বলেছি এই দিকে না আসতে, তবু ঢুকবি তোরা! আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। তুই বলার জন্য নয়, সিকিউরিটির ড্রেস পরা কেউ আমাকে তুই বলবে সেটাই আমার কাছে স্বাভাবিক ছিল। আমি অবাক হলাম এই ভেবে যে আমাকে বারণ করল কবে, এই তো চেক ইন করলাম। হালকা স্বরে তাকে বললাম, আমাকে তো বারণ করা হয় নি। তুই ঢুকলি কোন ফাঁক দিয়ে? আমি জানালাম আমি কোন ফাঁক দিয়ে ঢুকি নি, এই হোটেলে আছি। মিথ্যা বলছিস, মিথ্যা বলছিস – এই বলে হাঁইতাই। শেষে পকেট থেকে রুম কি-কার্ড দেখিয়ে মুক্তি পাই।

আমি বিদেশে একটাই খাওয়ানোর ব্যাপারে অকৃপণ কনফারেন্স যেতাম, আর সেটা হল গর্ডন কনফারেন্স, নিউ হ্যাম্পসায়ারে। মনে হয় আমন্ত্রিত রিসার্চ কনফারেন্স ছিল বলেই খাওয়া দাওয়া অত ভালো ছিল – সব ইনক্লুডেড, ব্রেকফাষ্ট, লাঞ্চ, ডিনার সব। পাঁচ দিনের কনফারেন্সে আবার একদিন থাকত ট্র্যাডিশনাল লবষ্টার ডিনার। সে কি বিশাল বিশাল লবষ্টার। খাবার টেবিলে লবষ্টার খাবার ইনষ্ট্রাকশন, কাঁচি-সাঁড়াশি, গলায় জড়ানোর ছোট অ্যাপ্রণ এই সব তো ছিলই এবং তার সাথে ফাউ ছিল সুন্দর সুন্দর কম বয়েসী মেয়ে যারা হাতে কলমে দেখিয়ে দিত কোন খানে চাপ দিয়ে কি ভাংতে হবে, কি টানতে হবে, কিভাবে বের করে খেতে হবে এই সব। আমি গলায় অ্যাপ্রণ বেঁধে শুরু তো করলাম, কিন্তু হাতুরী, কাঁচি, শর্ণা – এই সব দিয়ে কি আর ম্যানাজ করা যায় নাকি? শালা ওই ভয়ে ডাক্তারী পড়ার চেষ্টা দিই নি! চেষ্টা করছি আপ্রাণ এবং আড়চোখে চারিদিকে দেখছি পাবলিক কি করে। বেশীরভাগই স্ট্রাগল করছে, কিন্তু তারা জানত কি স্ট্রাগলটা করতে হবে – প্রতি দুই বছর অন্তর এই একই জিনিস হয়ে আসছে সেই ডাইনিং হলে। কিন্তু খেতে খেতে বাধা পেলে বা খাওয়া মসৃণ না হলে আমার বংশের প্রাচীন কংগ্রেসী রক্ত আমার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আমি দেখলাম অনেকেরই মুখ নালে-ঝোলে মাখা – রস টপ টপ করে পড়ছে গলার ন্যাপকিনে। আমি ভাবলাম, হাত দিয়ে, দাঁত দিয়ে ডাইরেক্ট খেলে এর থেকে কি আর বাজে হবে! প্রশ্ন হলে ব্যাপারটা অ্যাকসেপ্টেড কিনা। ফিসফিস করে পাশে ক্রিশ্চিয়ানোকে জিজ্ঞেস করলাম, হ্যাঁরে, হাতে করে দাঁত দিয়ে ভাঙে খাব? বলল – হোয়াই নট্‌, ইফ ইউ ক্যান? ব্যাস গোরা ইতালিয়ান যখন পারমিশন দিয়েছে আর আমাকে আটকায় কে! আর তা ছাড়া “ইফ ইউ ক্যান” বলে আমার পৌরষত্বকে নাড়া দেওয়া? ব্যাটা কি আমার দাঁত কি জিনিস জানে?

আমার দাঁতের জোরের এককালে খুব নাম ডাক ছিল চেনাশোনা সার্কেলে। সেই দাঁত দিয়ে নারকেল ছাড়িয়ে যার শুরু। মোড়লদের বাগানে নারকেল তো চুরি করে পাড়লাম, কিন্তু কাটারি আনতে ভুলে গেছি বাড়ি থেকে। দোমালাই নারকেল সামনে পড়ে থাকবে আর আমরা হা হুতাশ! এ হয় নাকি? আমি দাঁত দিয়ে দিলাম ট্রাই – দেখলাম বেশ হচ্ছে। একটা – দুটো – তিনটে – এই করে প্রথম দিন ছটা নারকেল ছাড়ালাম। এবার সেই থেকে নাম ফাটতে শুরু করল। নারকেল চুরি করতে গিয়ে কেউ আর কাটারি আনার প্রয়োজন বোঝ করত না। নারকেল পারো – জড়ো করো – সুকানের দিকে বাড়িয়ে দাও। এগারোটা পর্যন্ত টানা ছাড়িয়ে আমার নিজের রেকর্ড। নাম ছড়িয়ে আমি তখন মধগগণে – কৈশোর বয়স, মেয়েদের প্রতি টান আসছে, সুন্দরী হলে তো কথাই নেই। এমন সময় পিসির ছেলের বিয়ে হল – সুন্দরী বৌদি, আলাপের জন্য মন আন চান। শেষ পর্যন্ত দাদা আলাপ করিয়ে দিচ্ছে, “এ হল সুকান, আমার বড় মামার ছেলে – খুব ভালো দাঁত দিয়ে নারকেল ছাড়ায়”। মানলাম দাঁত দিয়ে নারকেল ছাড়ানো কৃতিত্বের, কিন্তু আমার তো আরো অনেক ক্রেডেনশিয়াল ছিল – ভালো ফুটবল খেলতাম, আরো ভালো ক্রিকেট, নিমো ভারত সেবক সমাজের অ্যাক্টিভ সদস্য, এমনকি ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত আনন্দমার্গ ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছিলাম। যাই হোক, দাদা অনেক কিছু ভুলে গেলেও আমার দাঁতের জোরকে মর্যাদা দিয়েছিল। আর সেই দাঁতকে চ্যালাঞ্জ করা! তাও কিনা খেয়ে কুলকুচি না করা সাহেব বাচ্ছার? ছুরি – কাঁচি – হাতুরী পাশে সরিয়ে রাখলাম। “লবষ্টার ঘুমিয়ে আছে, ওকে দাঁত দিয়ে জাগাও”। কবির সেই অমোঘ পুকার মেনে পুরো ধুলিস্যাৎ করে দিলাম লবষ্টারটিকে। এত মনযোগ গিয়ে ধ্বংস করছিলাম সে লক্ষ্য করি নি আমাকে অনেকে হাঁ করে দেখতে শুরু করেছে। খাবার শেষে হাততালি – পেপার প্রেজেন্ট করার শেষের কম হাততালি ডাইনিং হলে ব্যালেন্স হয়ে গেল। সাধে কি বলে সময় সমতা এনে দেয়!

আমি যেই সাবজেক্টে রিসার্চ করতাম বা এখনো কর্পোরেটে নাড়াচাড়া করি সেই বিষয়ে ইন্ডাষ্ট্রি অ্যাপ্লিকেশান প্রভুত, প্রচুর ইত্যাদি ইত্যাদি – কিন্তু সারপ্রাইজিংলি অ্যাকাডেমিক সার্কেলটা বেশ ছোট। পৃথিবীতে প্রায় হাতে গোণা ভালো ইউনিভার্সিটি আছে যারা সেই নিয়ে পড়ায় বা রিসার্চ করে। ফলতঃ প্রতি কনফারেন্সে এই প্রায় একই লোকেদের, ছাত্রদের, প্রফোসেরদের সাথে দেখা। প্রথম এক বছরে অ্যাকাডেমিক কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করা শুরু করে দ্বিতীয় বছর থেকেই কনফারেন্সের গতি প্রকৃতি বেশ প্রেডিকটেবল হয়ে গেল। এমন কি ডিনার শেষে কোন কোন প্রফেসর (পুরুষ এবং মহিলা) আমাদের সাথে পাবে এবং ডিস্কোতে যাবে সেটাও। প্রথম দিকে বেশ অবাক লেগেছিল যে যাদের লেখা বই, জার্ণাল, থিওরী পড়েছি, তাদের অনেকের সাথে গভীররাতে নেশাগ্রস্ত হয়ে “এ সি ডি সি – এ সি ডি সি” বলে চিৎকার করে উদ্দাম নৃত্য। আমি অবশ্য মদ ইত্যাদি ততদিনে খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি, কিন্তু নাচতে কি আর বাধা। বলতে বাধা নেই যে, নেশাগ্রস্ত ছাত্রদের নিয়ে পাবে খুব বেশী ঝামেলা আমার মনে নেই – কেবল মাত্র একবার সেবাষ্টিয়ান-কে (সেব হল গিয়ে সংক্ষেপ) দামড়া-মুশকো বাউন্সার এসে রাত দুটোর সময় বলেছিল –

- স্যার, আই হ্যাভ টু আস্ক ইউ টু লিভ

জড়িত স্কাউসার অ্যাক্সেন্টে সেব বলল

- মে আই নো হোয়াই?
- বিকজ্‌ ইউ আর ড্রাঙ্ক
- সো হোয়াট, আই হ্যাভ নেভার বিন আসকড টু লিভ এ রেষ্টুরান্ট বিকজ্‌ আই অ্যাম ফুল!

উপরের ডায়লগটি এর অনেক পরে আমি ড্যানি বয়-এর স্ট্যাণ্ড-আপ কমেডিতে শুনেছি, তাই বুঝতে পারি নি কে কার থেকে ঝেড়েছে, নাকি সেটা ইংল্যান্ডের একটা স্ট্যান্ডার্ড রসিকতা। যাই হোক, ইমিগ্রেশান অফিসার আর পাব বাউন্সারের সাথে যে তর্কে যেতে নেই, সেই শিক্ষা সেবের তার পর থেকেই শুরু। তবে এটাও এই ফাঁকে বলে নেওয়া যায় যে অ্যালকোহল কিন্তু সেবের প্রথম ফ্যাসিনেশন ছিল না, বরং তৃতীয়। তার প্রথম দুই ফ্যাসিনেশন নিয়ে আমাকে অনেক কিছু পোয়াতে হয়েছে – কারণ তার প্রথম ফেসিনেশন ছিল লিভারপুল আর দ্বিতীয় থাই মেয়ে। সেই গল্পও অন্য কোন জায়গায়।

আমি ভালো ছিলাম, মানে বেশ ভালো – পিএইচডি করতে গিয়ে যে এতো ভালো থাকা যায় (খাবার-দাবার দিক থেকে বলছি আর কি), সেটা আমি আগে কল্পনাতেও আনতে পারি নি। আমার দুই সুপার-ভাইজারের একজনের ফ্যাসিনেশান ছিল ভালো থাকার জায়গা – অন্য জনের ছিল ভালো খাওয়া-দাওয়া। ফলতঃ আমরা ছাত্ররা অ্যালিসনের বুক করা হোটেলে থাকতাম আর খেতে যেতাম ব্রায়ান-এর সাথে। অ্যালিসনের আবার ফ্যাসিনেশান ছিল হুইস্কি –এই প্রমাণ পেয়ে শান্তি পেলাম যে কেমব্রীজে অ্যালিসনের মত নেশাড়ু-ও পড়েছে। এটা প্রায় রুটিন হয়ে গিয়েছিল যে কনফারেন্সে ডিনার শেষে পাবে যাওয়া, পাব থেকে ফিরে হোটেলে নিজের নিজের রুমে যাবার আগে অ্যালিসনের অহ্বান – আমার ব্যাগে একটা সিঙ্গেল মল্ট আছে, কেউ কেউ ইন্টারেষ্টেড হলে আমার রুমে চলে এস। আর কেউ না গেলেও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান স্টুডেন্টরা যেতই – কারণ ওদের অনেকের কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করার মূল উদ্দেশ্যই ছিল মদ খাওয়া, বিশেষত বিয়ার। নরওয়ে, সুইডেন বা ডেনমার্কে বিয়ার অনেকটাই দামি ইংল্যান্ড, বাকি ইউরোপ বা আমেরিকার থেকে। আর ছাত্র জীবনে সেই বিয়ার তেমন পর্যাপ্ত অ্যাফর্ড করা যেত না, যেমনটা যেত অন্য জায়গায়। তাই সকাল ন-টায় পেপার প্রেজেন্ট করতে হবে, কিন্তু ভোর চারটে পর্যন্ত মদ খেতে দেখে যেত ওদের অনেককেই। প্রফেসরেরা অনেকে আবার সমব্যাথী ছিলেন, তাই ওদের টকের পর প্রশ্নও কম করা হত।

ব্রায়ানের সাথে খেতে গিয়েই আমার প্রথম আলাপ ক্যালজোন নামক পিৎজা ফ্যমিলির সাথে – থিন ভার্সেস স্টাফড্‌ পিৎজা বেসের পার্থক্যও সেখান থাকে জানা। বেশীর ভাগ ইতালিয়ানরা যে নর্মাল আমেরিকান পিৎজাকে নীচু চোখে দ্যাখে, সেটাও প্রথম লক্ষ্য করা।

কনফারেন্সের সময় রেষ্টুরান্টে খেতে গিয়ে স্টুডেন্ট বা মাল্টিন্যাশানাল কম্পানিতে চাকুরী করা কালীন কোন পৃথক ব্যবহার পাই নি – ফেল কড়ি মাখো তেল। কিন্তু এয়ার লাইন্স বা হোটেল ওলাদের কাছে ভি আই পি ট্রীটমেন্ট এই আমিও পেয়েছি মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানিতে চাকুরী করা কালীন, অবশ্যই নানা কারণে। যেমন হিউষ্টনে এক ফাইভস্টার হোটেলের ম্যানেজার নিজে ফলের বাক্সেট উপহার নিয়ে আমার রুমের দরজায় নক করেছিল – কেন, সেই গল্প পরের বার।


[ক্রমশঃ]


605 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: সুকি

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

অনেকদিন পর একটা লেখা দিলাম - ওই খাবার দাবার সিরেজেরই অংশ এটা।
Avatar: PM

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

দারুন দারুন !!! যাকে বলে ডি লা গ্রন্ডি মেফিস্টোফিলিস ঃ)
Avatar: de

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

খুব্ভালো!
Avatar: amit

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

অনেক দিন পর সুকি। ভালো লাগলো পড়ে।
Avatar: শেসে

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

ওঃ! কি ঝরঝরে লেখা রে বাবা! তড়তড়িয়ে পড়ে ফেললাম আর কত্তো অজানা খাবারের নাম জানলাম ় পরের কিস্তি আসতে ষেন দেরী না হয় ়
Avatar: dd

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

হ্যাঁ, সুকি অনেকদিন পরে।

খাবারের গল্প সততই সুখের। এটাও জমেছে।
Avatar: sm

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

এসব লেখা মন ভালো করে দেয়।সুস্বাদু লেখা ততোধিক সুস্বাদু খাবারের বর্ণনা।
দারুন।
Avatar: paps

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

এক কথায় স্টুপেন্ডাস! পরের পর্ব তাড়াতাড়ি আসুক।
Avatar: Du

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

অনমনীয় দৃঢ়তার ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনটা পাল্টানো হল না ---ঃ))))
Avatar: T

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

বেড়ে লেখেন মশায় আপনি।
Avatar: dd

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

ভালো কথা। এই লেখাটার নামকরনের মানে তো বুঝলাম না।

"কম্পানি কোম্পানি কনেফারেন্স"। এটার কী অর্থ ?
Avatar: সুকি

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

লেখা পড়ার এবং মতামত দেবার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।

ডিডিদা,
এক কম্পানী অর্থে 'সঙ্গী' বোঝাতে চেয়েছিলাম, কোম্পানী অর্থে সংস্থা। মানে মোদ্দা কথায় চাকুরী বা পি এইচ ডি জীবনে পরের পয়সায় কনফারেন্স বা বিজনেস ট্রাভেল করার সময় খাওয়া দাওয়া এবং সাথীদের গল্প - এই আর কি।
Avatar: pi

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

দিব্ব ! কত গল্প মনে পড়ে গেল !
Avatar: শিবাংশু

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

বাহ...
তবে খাদ্য-অখাদ্যের ফাঁকে এসবিআই আর স্বদেশদাকে উপাদেয় করে পরিবেশন, আলাদা করে , বাহ...
Avatar: Titir

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

সুস্বাদু লেখা। তারিয়ে তারিয়ে পড়লাম।
Avatar: ব্যোমকেশ

Re: কম্প্যানি কোম্পানি কনফারেন্স

"বিদেশী কনফারেন্সরা খাওয়ানোর ব্যাপারে মোটের উপর কৃপণ হয় – কারণ জানি না, তবে মনে হয় ব্যাপারটা কালচারাল। কারণ উপরিউক্ত অ্যাসোশিয়েশনের ইন্ডিয়ান সেকশনের কনফারেন্স যখন মুম্বাইতে হয়, তখন খাওয়া ঢাওয়া এলাহি – তখন আবার মনে হয় খাওয়াটাই মনে হয় প্রধান।"

লেখার এই অংশটা পড়ে একটা কৌতুহল জাগছে— বিদেশে খাওয়ানোর ব্যাপারে যে কৃপণতার কথা লিখেছেন সেটা কি কেবল ইউরোপ এবং আমেরিকায় দেখা যায় নাকি এশিয়ার অন্যান্য দেশেও একই ধারা?


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন