Tathagata Dasmjumder RSS feed

Tathagata Dasmjumderএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • আমাদের চমৎকার বড়দা প্রসঙ্গে
    ইয়ে, স-অ-অ-অ-ব দেখছে। বড়দা সব দেখছে। বড়দা স্রেফ দেখেনি ওইখানে এক দিন রাম জন্মালেন, তার পর কারা বিদেশ থেকে এসে যেন ভেঙেটেঙে মসজিদ স্থাপন করল, কেন না বড়দা তখন ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুম ভাঙল যখন, চোখ কচলেটচলে দেখলেন মস্ত ব্যাপার এ, বড়দা বললেন, ভেঙে ফেলো মসজিদ, জমি ...
  • ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ?
    যেকোন নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে সামনে আসার পর নাগরিক হিসাবে আমাদের একটা ঈমানি দায়িত্ব থাকে। দায়িত্বটা হল অভিযুক্ত ধর্ষকের কঠোরতম শাস্তির দাবি করা। কঠোরতম শাস্তি বলতে কারোর কাছে মৃত্যুদন্ড। কেউ একটু এগিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ার ...
  • তোমার পূজার ছলে
    বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না ...
  • The Irishman
    দা আইরিশম্যান। সিনেমা প্রেমীদের জন্য মার্টিন স্করসিসের নতুন বিস্ময়। ট্যাক্সি ড্রাইভার, গুডফেলাস, ক্যাসিনো, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, দা অ্যাভিয়েটর, দ্য ডিপার্টেড, শাটার আইল্যান্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট, সাইলেন্টের পরের জায়গা দা আইরিশম্যান। বর্তমান সময়ের ...
  • তোকে আমরা কী দিইনি?
    পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন -********তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, ...
  • ইশকুল ও আর্কাদি গাইদার
    "জাহাজ আসে, বলে, ধন্যি খোকা !বিমান আসে, বলে, ধন্যি খোকা !এঞ্জিনও যায়, ধন্যি তোরে খোকা !আসে তরুণ পাইওনিয়র,সেলাম তোরে খোকা !"আরজামাস বলে একটা শহর ছিল। ছোট্ট শহর, অনেক দূরের, অন্য মহাদেশে। অনেক ছোটবেলায় চিনে ফেলেছিলাম। ভৌগোলিক দূরত্ব টের পাইনি।টের পেতে দেননি ...
  • ছন্দহীন কবিতা
    একদিন দুঃসাহসের পাখায় ভর করে,ছুঁতে চেয়েছিলাম কবিতার শরীর ।দ্বিখন্ডিত বাংলার মত কবিতা হয়ে উঠলোছন্দহীন ।অর্থহীন যাত্রার “কা কা” চিৎকারে,ছুটে এলোপ্রতিবাদী পাঠক।ছন্দভঙ্গের নায়কডানা ভেঙ্গে পড়িপুঁথি পুস্তকের এক দোকানে।আলোক প্রাপ্তির প্রত্যাশায়,যোগ ধ্যানে কেটে ...
  • হ্যালোউইনের ভূত
    হ্যালোউইন চলে গেল। আমাদের বাড়িতে হ্যালোউইনের রীতি হল মেয়েরা বন্ধুদের সঙ্গে ট্রিক-অর-ট্রিট করতে বেরোয় দল বেঁধে। পেছনে পেছনে চলে মায়েদের দল। আর আমি বাড়িতে থাকি ক্যান্ডি বিতরণ করব বলে। মুহূর্মুহূ কলিং বেল বাজে, আমি হাসি-হাসি মুখে ক্যান্ডির গামলা নিয়ে দরজা ...
  • হয়নি
    তুমি ভালবাসতে চেয়েছিলে।আমিও ।হয়নি।তুমিঅনেক দূর অব্দি চলে এসেছিলে।আমিও ।হয়নি আর পথ চলা।তুমি ফিরে গেলে,জানালে,ভালবাসতে চেয়েছিলেহয়নি। আমি জানলামচেয়ে পাইনি।হয়নি।জলভেজা চোখে ভেসে গেলআমাদের অতীত।স্মিত হেসে সামনে এসে দাঁড়ালোপথদুজনার দু টি পথ।সেপ্টেম্বর ২২, ...
  • তিরাশির শীত
    ১৯৮৩ র শীতে লয়েডের ওয়েস্টইন্ডিজ ভারতে সফর করতে এলো। সেই সময়কার আমাদের মফস্বলের সেই শীতঋতু, তাজা খেজুর রস ও রকমারি টোপা কুলে আয়োজিত, রঙিন কমলালেবু-সুরভিত, কিছু অন্যরকম ছিলো। এত শীত, এত শীত সেই অধুনাবিস্মৃত কালে, কুয়াশাআচ্ছন্ন পুকুরের লেগে থাকা হিমে মাছ ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

চাকুম চুকুম চকোলেট

Tathagata Dasmjumder

স্বপ্নস্বাদ

আমাদের ছোটবেলায় চকোলেট ছিল বেশ দুর্লভ একটা জিনিস, লেবু লজেন্স, টিকটিকি লজেন্সের স্বাদে আমোদিত দিনগুলোয় একটা ডেয়ারী মিল্কের বার হাতে পাওয়া মানে চাঁদ পাওয়ার চেয়ে কম কিছু ছিলনা। সেই বার রাখা থাকত তালাবন্ধ মীটসেফের কোনে। মন দিয়ে পড়ে বাবা মাকে খুশি করতে পারলে তবেই মিলত সেই বারের একটা টুকরো। তাই চকোলেট জিনিসটা দেবতার খাদ্য ছাড়া কিছু ভাবতেই পারিনি। প্রবাসী আত্মীয় দেশে ফেরার সময় নিয়ে আসতেন টবলেরোনের ত্রিভুজ, সে জিনিস আবার অমৃতের কাছাকাছি, টোবলেরোনের খালি খোল সংগ্রহ করে স্কুলব্যাগে করে নিয়ে যাওয়াও চলত। উদ্দেশ্য আর কিছুইনা, একটু রোয়াব, হুঁ হুঁ বাবা, আমি সুইস চকোলেটেও খাই, আমাকে সম্মান জানানো হোক।
তখন থেকেই ধারনা ছিল চকোলেট মানেই সুইটজারল্যান্ড (যদিও তখন নামটা সুইজারল্যান্ডই বলতাম)। সেখানে গরুদের বাঁট থেকে দুধের বদলে চকোলেট বেরোয়, বাচ্চাদের দুধের বদলে দেওয়া হয় হট চকোলেট। তখন কি আর জানতাম যে চকোলেটের সূর্য আদতে উদিত হয়েছিল অতলান্তিকের অপর পারে।
ইয়ে, ছেলেবেলার সেই চকোলেটপ্রেম আমার মধ্যে এখনো সমপরিমাণে বিরাজমান। ছেলের জন্য কিনে আনা চকোলেট মাঝে মাঝেই চুরি করি এবং ছেলের হাতে ধরাও পড়ি। জরিমানস্বরূপ আরো চকোলেট কিনতে হয়, এবং এই ঘটনা চক্রবৎ চলতেই থাকে।

অল্পবিজ্ঞান

কিন্তু ছেলেবুড়ো নির্বিশেষে চকোলেটের এই অমোঘ আবেদনের কারন কি?
সবচেয়ে সোজা উত্তর হল খেতে ভাল। সে তো অনেক কিছুই খেতে ভাল, কিন্তু সব খেতে ভাল জিনিসের আবেদন তো এরকম স্থানকালের সীমা অতিক্রম করেনা, তাহলে?
আসলে মূলত দুটো কারন আছে। চকোলেট বলতে আমরা যা বুঝি তা হল কোকো বিনসের গুঁড়ো, কোকো বাটার, দুধ আর চিনির মিশ্রণ। বিবর্তন মানুষকে এমনভাবে গড়ে তুলেছে যে স্নেহপদার্থ ও শর্করার প্রতি তার টান অপরিসীম কারন এই দুই পদার্থই তাকে সহজে শক্তিপ্রদান করে। কিন্তু সে তো রসগোল্লার ক্ষেত্রে বা নলেন গুড়ের সন্দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, চকোলেটের বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ কারণটা কি?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে সেই চূর্ণীকৃত কোকো বিনস আর কোকো বাটারের মধ্যে। কোকো জিনিসটা নিজে কিন্তু মিষ্টি নয়, বরং তেতো (যেকারনে ডার্ক চকোলেটের স্বাদে কিছু কটূভাব লক্ষ্য করা যায়)। এই কোকো জিনিসটার মধ্যে প্রায় শতিনেক উপাদানের সন্ধান পাওয়া যায়, যার মধ্যে কয়েকটা হল থিওব্রোমিন, ফেনিলিথিল্যামিন ও সামান্য পরিমাণে ক্যাফিন (অবাক হবেন না, কফির সাথে সম্পর্কযুক্ত না হলেও এতে ক্যাফিন থাকে), এই উপাদানগুলোর বৈশিষ্ট্য হল যে এগুলো আমাদের স্নায়ুকে সতেজ করে তোলে। চকোলেট খাওয়ার পরে যে একটা চনমনে ভাব আসে সেটা মূলত শর্করা ও স্নায়ুউত্তেজক পদার্থগুলোর সম্মিলিত প্রভাব আরকি।
কোকোতে আরও একটা জিনিস থাকে, যেটার নাম আনান্দামাইড, যার তুলনা করা যায় গাঁজায় প্রাপ্ত একটি উপাদান টিএইচসির সাথে। এই আনান্দামাইড জিনিসটা হল একটা ফিল গুড রাসায়নিক, যা মস্তিষ্কে তৈরি হওয়া মানবদেহের স্বাভাবিক আনাম্দামাইডের প্রভাবকে ত্বরাণ্বিত করে ও তাকে দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে সাহায্য করে আমাদের নেশা ধরিয়ে দেয়। চকোলেট মুখে যখন গলে যেতে থাকে, তার স্বাদ ও গন্ধ ঠিক এজন্যই কোকো বাটার, কোকোর গুঁড়ো, দুধ আর চিনির মিশ্রণ আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক পদার্থের ক্ষরণ ঘটায়। যা দেয় সুখানুভূতি, মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তি। ঠিক যেন প্রেমাস্পদের গভীর চুম্বন, যা হৃদস্পন্দন দ্রুত করার মাধ্যমে মনের গভীরে জাগায় মোক্ষলাভের অনুভূতি, তাই হয়ত প্রেমের অভিজ্ঞান হিসেবেও চকোলেট এত জনপ্রিয়। সেইসাথে শৈশবে চকোলেট উপহার পাওয়ার সুখস্মৃতি, বন্ধুর সাথে একটা বার শেয়ার করা মিলিয়ে চকোলেট হয়ে ওঠে সত্যিকারের অমৃত।

ক্ষুদ্রপুরাণ

অনেক অনেকদিন আগেকার কথা। টোলটেকরা তখন সবে চাষবাস, বাড়ি বানানো আর কাপড় বোনা শিখেছে। দেবতারা তাঁদের জ্ঞান দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে মানুষকে সাহায্য করতেন জজীবনধারনে। জীবন ছিল সহজ, তবুও কিসের যেন একটা অভাববোধ ছিল, যেকোন ব্যাপারে দেবতাদের সাহায্য চাইতে আর কাঁহাতক ভাল লাগে? প্রধান দেবতা কেতজাকোয়াটল (Quetzacoatl) ভাবলেন, এভাবে চললে তো মানুষ কোনদিনই সাবালক হতে পারবেনা। মানুষের মাঝে জ্ঞান ও চিন্তাশক্তির বিকাশ যদি না হয় তাহলে তো দেবতারা কোনদিন ব্যস্ত থাকলে তো মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যাবে সঠিক দিশার অভাবে।
দেবতাদের জ্ঞান ও বুদ্ধির উৎস ছিল স্বর্গের এক গাছ, যার ফল গুঁড়ো করে ফুটিয়ে পান করে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করতেন তাঁরা। কেতজাকোয়াটল ভাবলেন, আচ্ছা এই গাছ যদি মানুষকে দেওয়া যেত, তাহলে এর ফল থেকে সৃষ্ট পানীয় নিশ্চয় মানুষদেরও জ্ঞানবৃদ্ধি ঘটাবে? কিন্তু মুশকিল হল, এই গাছ দেবতারা কিছুতেই মানুষকে দিতে চান না, যা করার গোপনে করতে হবে। একদিন গভীর রাতে কেতজাকোয়াটল ছোট্ট একটা চারাগাছ নিয়ে টোলটেকদের কাছে গিয়ে বললেন। এই গাছ আমি তিয়ালক শহরের মাঝে পুঁতছি, তোমরা জল দিয়ে এর বৃদ্ধি ঘটাও, দেবী জোচিকেতজালকে বললেন এই গাছকে ফুলে ফুলে ভরিয়ে তোল। 
গাছে যখন ফল এল, সেই ফলের বীজ নিয়ে কেতজাকোয়াটল বললেন
"মেয়েরা এই বীজকে আগুনে ঝলসে নিয়ে গুঁড়ো করে জলে মেশাও"
কেতজাকোয়াটলের কথা শুনে টোলটেক মেয়েরা তাড়াতাড়ি বীজ গুঁড়ো করে জলে মেশালো, তাতে দিল লঙ্কার গুঁড়ো। একপাত্র থেকে আরেকপাত্রে ঢালাঢালি করে পানীয়র ওপরে ফেনা তৈরি করে সবাইকে পরিবেশন করল সেই পানীয়, যার নাম চকোলাটল। সেই পানীয় পান করে টোলটেকরা জ্ঞান ও বুদ্ধিতে হয়ে উঠল দেবতাদের সমান।
টোলটেকরা জ্ঞান ও বুদ্ধিতে দেবতাদের সমান হয়ে ওঠায় অন্য দেবতাদের খুব হিংসা হল, তারা ঠিক করল যে মানুষদের শিক্ষা দিতে হবে আর কেতজাকোয়াটলকে প্রধান দেবতার পথ থেকে সরাতে হবে। কি করা যায়? কেতজাকোয়াটল যে মানুষদেরকে ভালবেসে তাদেরকে শকোলাটল দিয়েছিলেন, সেই মানুষদের সামনেই তাঁকে হীন প্রতিপন্ন করতে হবে। দেবতারা শ্মরণ নিলেন শুকতারার দেবতা কেতজাকোয়াটলের সবচেয়ে বড় শত্রু তেজকাতলিপোকার, যিনি আবার অন্ধকার ও রাত্রির দেবতা। তিনি পৃথিবীতে নেমে এসে এক সওদাগরের রূপ নিলেন। ইতিমধ্যে শুকতারার দেবতা কেতজাকোয়াটল খবর পেয়েছেন দেবতাদের এই ষড়যন্ত্রের, ভালমানুষ কেতজাকোয়াটল বড় মুষড়ে পড়লেই এই খবর শুনে, কারন এরকম কিছু হলে সবচেয়ে বিপদে পড়বে তাঁরই প্রিয়তম টোলটেকরা। 
এইসময় তাঁর কাছে এলেন সওদাগরের ভেকধারী রাত্রির দেবতা। আগাভে গাছের রস পচিয়ে তিনি গোপনে পুলকে নামের এক মদিরা প্রস্তুত করেছিলেন, তা দুধের মত সাদা, দেখো মনে হবে পৃথিবীর পবিত্রতম বস্তু। 
কেতজাকোয়াটলকে সওদাগর প্রশ্ন করল,
"হে দেব, আপনাকে দেখে এত দুঃখী মনে হচ্ছে কেন?"
"দেবতারা আমাকে সরাতে চান এবং টোলটেকদের ধ্বংস করতে চান" বললেন কেতজাকোয়াটল।
সওদাগর কেতজাকোয়াটলকে পুলকে দিয়ে বলল,
"এই নিন আপনার জন্য এনেছি সুখের ওষুধ, নিজে পান করুন, টোলটেকদেরও পান করান। সবাই নিমেষের মধ্যে সুখী হয়ে উঠবে"
কেতজাকোয়াটল সরল মনে পুলকে পান করেই চললেন, কিছুক্ষণ পরেই মদিরা তার কাজ শুরু করল। চরম মাতা মি শুরু করলেন কেতজাকোয়াটল। টোলটেকরা কেতজাকোয়াটলের মাতলামি দেখে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল। 
পরদিন সকালে কেতজাকোয়াটল যখন ঘুম থেকে উঠলেন, তিনি দেখলেন যে টোলটেকরা আর তাঁকে পোঁছেনা। কেতজাকোয়াটল বুঝলেন যে টোলটেক ও তাদের সাথে মহানগর টোল্লানের পতন আসন্ন, যা রোধ করা তাঁরও সাধ্য নয়। মনের দুঃখে কেতজাকোয়াটল সন্ধ্যাতারার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। পথে যেতে যেতে তিনি দেখলেন যে যে গাছগুলো তিনি পুঁতেছিলেন জ্ঞানবর্ধক শকোলাটল তৈরির জন্য, সেগুলো সব শুকিয়ে গিয়ে আগাভে কাঁটাঝোপ হয়ে গেছে। তাঁর আর বুঝতে বাকি রইলনা যে এই আগাভের রস পচিয়েই তাঁকে মাতাল করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর চোখ ফেটে এল জল, তাও তিনি হাঁটা থামালেন না যতক্ষণ না তিনি সমুদ্রপারে তাবাস্কোর দেশে এসে পৌঁছলেন। তাবাস্কোর দেশে নিজের কাছে থাকা শকোলাটলের শেষ কয়েকটা বীজ তিনি পুঁতে দিলেন মাটিতে, আর সমুদ্রে পাড়ি দিলেন।
সমুদ্রপারের ওই বীজই পরে আবার শকোলাটলের গাছ হয়ে উঠল যেগুলো কিছুতেই আগাভে হয়ে গেলনা বহু চেষ্টা সত্ত্বেও, দেবতার পানীয় পাকাপাকিভাবে মানুষের হাতে এল। এই ছিল মেক্সিকোকে কেতজাকোয়াটলের শেষ উপহার। সেই সাথে ছিল প্রতিশ্রুতি, কেতজাকোয়াটলের ফিরে আসার।

দীর্ঘাতিহাস : বিটারসুইট

বিটারনেস ইন দ্য এন্ড

পুরাণের কথা তো শুনলাম, পুরাণকে যদি ডায়নামিক ইতিহাস হিসেবে কল্পনা করা যায় তাহলে তার মধ্যে থেকেই আসল ইতিহাসের খোঁজ পাওয়ার সম্ভবপর হয়ে ওঠে। অতিপ্রাকৃত ব্যপারগুলোকে বাদ দিয়ে চিন্তা করা যাক?

দুধ আর চিনি বাদ দিলে চকোলেটে যেটা পড়ে থাকে সেটা হল কোকো বা ক্যাকাও। এই কোকো বা ক্যাকাও তৈরি হয় কোকোগাছের ফলের মধ্যে থাকা শুঁটি বা বীনকে প্রথমে ফারমেন্ট করতে দেওয়া হয়, ফার্মেন্টেশনের মাধ্যমেই কোকোর সুগন্ধ বাইরে আসে। তারপর সেই ফার্মেন্টেড বীনগুলোকে রোদে শুকিয়ে পাঠানো হয় ফ্যাক্টরিতে। সেখানে কোকো বীনের খোলা ছাড়িয়ে রোস্ট করা হয় যাতে সুগন্ধ আরো ফুটে বেরোয়। ছাড়ানো বীনকে বলা হয় কোকো নিবস, এই কোক নিবসগুলোকে বিশেষধরণের পেষাইযন্ত্রে পিষে তৈরি হয় একটা পেস্ট, যাকে বলে কোকো লিকর। এই কোকো লিকরকে আরো প্রসেস করে দুটো জিনিস তৈরি হয়, কোকো বাটার আর কোকো পাউডার। কোকো বাটার হল সাদা আর কোকো পাউডার বাদামী। তারপর নামা অনুপাতে কোকো লিকর, কোকো বাটার আর কোকো পাউডারের নানা অনুপাতে মিশিয়ে তৈরি হয় স্বর্গীয় স্বাদের ডার্ক চকোলেট, হোয়াইট চকোলেট ও মিল্ক চকোলেট। বড় ঝামেলা না? তা দেবতাদের খাবার খেতে গেলে একটু ঝামেলা তো হবেই। প্রসঙ্গত বলে রাখা যাক, কোকোগাছের বৈজ্ঞানিক নাম হল থিওব্রোমা ক্যাকাও, যার অর্থ আক্ষরিকভাবেই দেবতার খাদ্য।
সবচেয়ে মজার কথাটা হল চকোলেটের প্রায় চারহাজার বছরের ইতিহাসের প্রায় ছত্রিশশো বছর চকোলেট শেষপাতের মিষ্টির বদলে ঝালঝাল মশলাদার পানীয় হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।

দেবতার বাগান

নানা দেশের পুরাণ ঘাঁটলে দেখা যায় যে স্বর্গ বলতে যা বোঝায় তা মূলত এক আদিম উদ্যান যেখানে প্রকৃতি তার সকল সম্পদকে অকাতরে দান করেছেন। প্রাকৃতিকভাবে কোকোগাছের উৎসস্থল হল আমেরিকার ট্রপিকাল রেনফরেস্ট। বৃহৎ বনস্পতিরা সেখানে তরুণ কোকোগাছকে রোদ, ঝড় বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। পাঁচবছর পরে যখন কোকোগাছ যুবক হয়ে উঠে দেবতাদের খাদ্যের যোগান দিতে শুরু করে।
প্রথম প্রশ্ন তাহলে আসে কোকোগাছের উৎস কোথায়?
কোকোগাছ যেহেতু রেনফরেস্টের মত পরিবেশ ছাড়া জন্মায়না, তাই প্রথমেই দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তরাংশ ও মধ্য আমেরিকার দক্ষিণাংশের কথা মাথায় আসে। আগেই বলা হয়েছে যে কোকোগাছের বৈজ্ঞানিক নাম হল থিওব্রোমা ক্যাকাও, এই থিওব্রোমা গোত্রের গাছ কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার অরণ্যেই প্রথম অভিযোজিত হয়। কিন্তু থিওব্রোমা ক্যাকাও ঠিক কোথাকার এটা নিয়ে কিছু মতবিরোধ আছে। কয়েকটি এলাকাকে চিহ্নিত করা যেতে পারে এজন্য।
এক) আমাজন অববাহিকার উত্তরে :- এই অঞ্চলের ঘন রেনফরেস্ট এই গাছের অভিজোযনের জন্য আদর্শ।
দুই) ওরিনোকো অঞ্চলের উত্তরে (বর্তমান কলম্বিয়ার উত্তরপূর্ব ও বর্তমান ভেনেজুয়েলার উত্তরপশ্চিম):- এই অঞ্চলে প্রাপ্ত বন্য কোকোগাছের জেনেটিক ডাইভার্সিটি সর্বাপেক্ষা বেশি, তাই খুব সম্ভবত এই অঞ্চলই কোকো তথা চকোলেটের জন্মস্থান।
তিন) কলম্বিয়ার উত্তর পশ্চিমে আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশে:- এই অঞ্চলে কোকোগাছ অনেকগুলি প্রজাতির সন্ধান পাওয়া এবং মেক্সিকোতে পৌঁছান সহজ হওয়া আবার এই অঞ্চলকেই চকোলেটের জন্মস্থান হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে সহজেই। (তুষারশুভ্র পর্বতমালা ও অদ্ভুত সৌন্দর্যময় উপত্যকা দেখলে স্বর্গ বলেই বোধ হয় কিন্তু)
চার) মধ্য আমেরিকা:- মেক্সিকোর লাকান্ডান জঙ্গল বা তাবাস্কো অঞ্চল দিয়ে বয়ে চলা উসুমাসিন্টা নদীর উপত্যকাই কোকোর উৎপত্তিস্থল (কেতজাকোয়াটল চলে যাওয়ার সময় তাবাস্কো অঞ্চল দিয়েই সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিলেন কিন্তু)
এই অঞ্চলগুলোর কোন একটা থেকেই কোকোগাছ ছড়িয়ে পড়েছিল দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরে ও মধ্য আমেরিকায়। প্রাকৃতিকভাবে? নাকি কোন মানুষ নিয়ে এসেছিল? (কেতজাকোয়াটল?)। এখনো অজানা

সভ্যতার জন্ম

কোকোর ব্যবহারের প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় হন্ডুরাসের উলুয়া উপত্যকার এক গ্রামে। আজ থেকে চারহাজার বছর আগে সেই গ্রামের মানুষের এমন কিছু কাপ ব্যবহার করত যা শুধুমাত্র কোকো থেকে তৈরি পানীয় শকোলাটল পান করতেই ব্যবহৃত হত। এই উলুয়া উপত্যকাকেই শকোলাটলের জন্মস্থান বলে চিহ্নিত করেন অনেকেই। তবে মজার কথা হল, তারা কিন্তু মোটেই গানগুলো খেতনা, বরং কোকোগাছের ফলের শাঁসকে পচিয়ে মদ তৈরিতেই বেশি আগ্রহী ছিল তারা।
কোকো ব্যবহারের পরবর্তী উল্লেখ পাওয়া যায় আমেরিককা মহাদেশের প্রথম সভ্যতার জনক ওলমেকদের মধ্যে, চকোলেটকে তারা ব্যবহার করত ওষুধ হিসেবে। ওলমেকদের ব্যবহৃত মৃৎপাত্রের গায়ে লেগে থাকা পদার্থকে পরীক্ষা করে কোকো ও লঙ্কার মিশ্রণের সন্ধান পাওয়া গেছে। সম্ভবত কোকোর উত্তেজনাবর্ধক ধর্মকে তারা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করত তারা। এও প্রায় চৌত্রিশশ বছর আগের ঘটনা।

আরো কয়েকশ বছর এগিয়ে যাওয়া যাক। ছশো খ্রীষ্টপূর্বাব্দে, আমেরিকা মহাদেশদ্বয়ের একমাত্র স্বাক্ষর সভ্যতা মায়া সভ্যতার সময়কালে কোকো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোকো বিন গুঁড়ো করে, তার সাথে ভ্যানিলা ও লঙ্কা মিশিয়ে জলে গুলে লস্যির মত একপাত্র থেকে আরেকপাত্রে বারবার ঢেলে তৈরি হত ফেনাযুক্ত শকোলাটল। যদিও এর ব্যবহার মূলত অভিজাতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এমনকি শকোলাটলের জন্য ব্যবহৃত পাত্রগুলোতে পর্যন্ত গোটা গোটা অক্ষরে লেখা থাকত "ইহা কেবল শকোলাটল পান করিবার নিমিত্ত"। কোকোর উপাদানগুলো যেহেতু সুখানুভূতির জন্ম দেয়, তাই এটাও মনে করা হত যে শকোলাটল যৌনক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটায়, তাই মহিলা ও শিশুদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল এই পানীয়। কোকো যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা মায়া ভাষায় ক্যাকাও শব্দের অর্থ দেখলেই বোঝা যায়। ক্যাকাও = Carrying over from those who walk, work or cultivate, অন্যভাবে দেখলে এটাও বলা যায় যে ক্যাকাও হল টাকা।

আরেকটু এগিয়ে আসা যাক। নশো খ্রীষ্টাব্দে টোলটেকদের সময়কাল, ক্যকাও বা কোকোর গুরুত্ব কোনভাবে কমে তো নি, বরং বেড়েছে যার সর্বোচ্চ রূপ দেখা যায় ত্রয়োদশ খ্রীষ্টাব্দে টোলটেকদের উত্তরসূরি আজটেকদের সময়কালে।

দেবতার প্রত্যাবর্তন (?)

ত্রয়োদশ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ আজটেকরা বর্তমান মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার অনেকটা অংশই দখল করে নেয়। কোকোর গুরুত্ব আজটেকদের মধ্যে কমে তো নিই, বরং ক্রমশ বেড়েছে। কিন্তু আজটেকদের মুশকিল হল যে তাদের সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে নটেই কোকো জন্মায়না। কি করা যায়? তারা ঠিক সেই পন্থাই নিল যা যেকোন সাম্রাজ্যই নিয়ে থাকে। করদ রাজ্যগুলোর প্রতি তাদের নির্দেশ ছিল যে প্রদেয় করের অনেকাংশই দিতে হবে কোকো বিনসের রূপে। ক্রমশ কোকো বিনস টাকা হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করল। একটি সূত্র থেকে জানা যায় যে সেসময়ে একটি টার্কির দাম ছিল একশো কোকো বিনের সমান। এমনকি শকোলাটল নিয়ে তারা চল্লিশদিনব্যাপী এক উৎসব করত, যেখানে শত্রুপক্ষের এক যোদ্ধাকে কেতজাকোয়াটলরূপে সাজিয়ে তাকে পুজো করা হত উৎসব শেষে বলি দেওয়ার জন্য। সেই হতভাগ্য মানুষটি যদি আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে হতাশ হয়ে পড়ত তাহলে তাকে শকোলাটলের এমন এক রক্তবর্ণ মিশ্রন পান করানো হত যা খেয়ে সে উত্তেজিত হয় নিজের মৃত্যুকে নিজেই আহ্বান করত। চল্লিশদিন শেষ হলে দেবতার সামনে তাকে হত্যা করে তার হৃদয় উৎসর্গ করা হত।
তারা যেহেতু শকোলাটলকে যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়ক বলেও মনে করত, তাই সম্রাট হারেমে যাওয়ার আগে পঞ্চাশপাত্র শকোলাটল পান করতেন যাতে সকল সঙ্গিনীকে তিনি খুশি করতে পারেন।
মাদ্রিদ কোডিসেস ও ফ্লোরেন্স কোডিসেস, যা স্পেনের পাদ্রীরা মধ্যআমেরিকার সংস্কৃতিকে পর্যবেক্ষণ করে বানিয়েছিলেন তাতে কোকোর ভেষজগুণ সম্পর্কেও বিস্তারিত লেখা আছে। কোকো সর্দিকাশি কমায়, হাঁপান কমায়, জ্বর কমায়, যৌনক্ষমতা বাড়ায় এরকম কত বিশ্বাস যে আজটেকদের ছিল তা এই স্বপ্লপরিসরে লিখে শেষ করা যাবেনা। এককথায় সর্বরোগহর অমৃত।
এইসময়েই ১৫১৯ খ্রীষ্টাব্দে এলেন স্প্যানিশ কঙ্কিস্তাদোর হার্নান কর্তেজ। প্রথমে আজটেকরা তাঁকে দেখে ভেবেছিলেন কেতজাকোয়াটল ফিরে এলেন বুঝি (ঠিক একই ভুল ইনকারাও করেছিল পিজারোকে ভিরাকোচা ভেবে)। কেতজাকোয়াটল তথা কর্তেজের সম্মানে আয়োজন করা হয় এক বিরাট ভোজসভার, যেখানে পানীয় হিসেবে ছিল শকোলাটল (কর্তেজের আগে কলম্বাস তাঁত চতুর্থ ভয়েজে গুয়ানাজা দ্বীপে প্রথম কোকো বিনসের সম্মুখীন হলেও তার গুরুত্ব বুঝতে পারেননি, তাঁর সহযাত্রীরা মনে করেছিল এটা বুঝি এক নতুন ধরনের আমন্ড বাদাম, স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে কোকো বিনের গুরুত্ব দেখে তিনি বিস্মিতই হন। তাই তিনি কোক বিন নিয়ে স্পেনে ফিরলেও তা মোটেই জনপ্রিয় হয়নি)। কর্তেজ এসেছিলেন সোনার খোঁজে, কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই আরো একটা রত্নের সন্ধান পেলেন। যার নাম চকোলেট।

সুইটস্টোরি

স্প্যানিশ কঙ্কিস্তাদোর ও পাদ্রীরা কোকোর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে কোকোর নিজস্ব চাষ শুরু করলেন আমেরিকায়। ১৫২৮ খ্রীষ্টাব্দে হার্নান কর্তেজ স্পেনে কোকো বিন রপ্তানীর সূত্রপাত করলেন। কোকো বিন থেকে তৈরি শকোলাটল স্প্যানিশ রাজসভায় আদ্রিত তো হলই, সেইসাথে শঙ্কার মেঘও ঘনীভূত হল। যে পানীয় মানুষকে এক শক্তি দেয় যে পুরো দিন হাঁটার পরেও মানুষ ক্লান্ত হয়না, সেই পানীয়তে শয়তানের জাদু নেই তো? তাও, স্প্যানিশ রাজসভার অভিজাতরা কিন্তু শকোলাটলের লোভ ছাড়তে পারেননি। ধীরে ধীরে শকোলাটল হয়ে উঠতে লাগল সেযুগের হরলিক্স, যদিও শুধুই রাজারাজড়াদের জন্য।

ছত্রিশশো বছর ধরে ঝালঝাল মশালাদার পানীয় শেষপাতের মিষ্টি হয়ে উঠতে শুরু করল ১৫৯০ খ্রীষ্টাব্দে, যখন স্প্যানিশ রাজসভার জন্য পাদ্রীরা কোকোর সাথে মেশালেন মধু, ভ্যানিলা ও আখের রস। ব্যস, শকোলাটল চকোলেট হওয়ার পথে প্রথম ধাপ পার হল। আর তারপরেই ওল্ড ওয়র্ল্ডে চকোলেটের জয়যাত্রার সূচনা। ১৬০৬ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ সওদাগররা চকোলেটকে পৌঁছে দিল হল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানী এবং ....... 'সুইটজারল্যান্ডে'।
১৬৫৯ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ ফ্রান্স নিজস্ব চকোলেটিয়ার পেয়ে গেল, দাভিদ শিলাউ চকোলেট কুকি ও চকোলেট কেক তৈরি করতে শুরু করলেন। যদিও তখনো তা অভিজাতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

চকোলেটের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সাথে সাথেই যেকোন জনপ্রিয় জিনিসের মতই তাতে ধর্মের কুনজর পড়ে গেল। চকোলেট সেনসুয়ালিটি বাড়ায়, অতএব তা ধর্মবিরোধী, বন্ধ করতে হবে (কি আজকের যুগের সাথে মিল পাওয়া যাচ্ছে?)। ১৬৬০ খ্রীস্টাব্দে এসব দাবী তুলে দিলেন ধর্মনায়করা। কিন্তু যা হয়, অর্থই তো আদতে ঈশ্বর। আর চকোলেট মূলত অর্থবান অভিজাতদের পানীয় বলে (হ্যাঁ, মিষ্টি হলেও তখনো চকোলেট পানীয়ই) চার্চ চকোলেটকে মেনে নিতে বাধ্য হল। ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে কি হবে অ্যাঁ? চকোলেট ও চার্চের সেই ভালবাসা আজও চলছে।
এরই মধ্যে ১৬৭১ খ্রীষ্টাব্দে ডিউক অফ প্রেসি-প্রাসলিনের শেফ লাসাগনে আমন্ডের ওপর ক্যারামেলের পরত তৈরি করে প্রালিনের আদিরূপের জন্ম দিলেন, যদিও চকোলেটে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতে আরো আড়াইশো বছর লেগে যাবে।

পরবর্তী দুশো বছরে চকোলেট পান করার পদ্ধতিতে সেরকম কোন পরিবর্তন না এলেও ক্রমশ যেটা হচ্ছিল সেটা হল শিল্পবিপ্লবের কারনে হাইড্রলিক প্রেস ইত্যাদি যন্ত্রের ব্যবহার কোকো প্রসেসিংকে করে তুলছিল কম খরচসাপেক্ষ। ফলে চকোলেট ক্রমশ অভিজাতদের শখ থেকে জায়গা করে নিচ্ছিল সাধারণের মাঝে। দেশে দেশে জন্ম নিচ্ছিল চকোলেট ফ্যাক্টরী। হট কোকোর কাপ ঘরে ঘরে মানুষকে তূরীয় আনন্দ দিতে শুরু করল। শকোলাটল ব্যবহার শুরুর আটত্রিশশ বছর পরে এভাবেই গণতন্ত্রীকরণ ঘটছিল চকোলেটের। তারপরেই হৈ হৈ করে এসে গেল বিপ্লব। কিভাবে?

সালটা ১৮৪৮, একদিকে প্রকাশিত হচ্ছে প্রকাশিত হচ্ছে কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো, অন্যদিকে কোকো বাটার, কোকো লিকর আর চিনি মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে প্রথম চকোলেট বার। দুধ বা জলে মিশিয়ে পেয় প্রিয় পানীয় পরিণত হচ্ছে খাদ্যবস্তুতে। সাম্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে চকোলেটে, আর দিনবদলের স্বপ্ন রূপ নিচ্ছে রাজনীতিতে। কেতজাকোয়াটল হয়ত এর স্বপ্নই দেখছিলেন। আর কে না জানে বিপ্লবের যৌবনজলতরঙ্গ একবার হইতে শুরু করলে আর থামেনা। চকোলেটের বিশ্ববিপ্লবের উজ্জ্বল শিখার প্রাবল্যও তাই বাড়তেই থাকল। ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দে সুইটজারল্যান্ডের হেনরি নেসলে দুধের জলীয় অংশকে বাষ্পীভূত করে গুঁড়োদুধ আবিষ্কার করলেন, জন্ম হল নেসলে কোম্পানীর। সেই সুইটজারল্যান্ডেরই ড্যানিয়েল পিটার ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে সদ্যআবিষ্কৃত গুঁড়ো দুধ চকোলেটে মিশিয়ে তৈরি করে ফেললেন মিল্ক চকোলেট যার আধুনিক রূপ হল আজকের ডেয়ারী মিল্ক। সুইটজারল্যান্ডেরই রুডলফ লিন্ড ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে কঞ্চিং মেশিন আবিষ্কার করে ফেললেন যাতে চকোলেটকে কয়েকঘন্টা ধরে মাখা যায়, তৈরি হল স্বর্গীয় স্বাদের লিন্ড চকোলেট। প্রবাসীরা ভারতে আসার সময় টবলেরোনের সাথে লিন্ড আনতেও ভোলেননা। আমেরিকা মহাদেশের শক্তিবর্ধক পানীয় এভাবেই ইউরোপের হৃদয়ং শেষপাতের মিষ্টি হিসেবে জায়গা করে নিল। বিশ্ববিখ্যাত সুইস চকোলেটের ঐতিহ্যেরও জন্ম হল এভাবেই।
দেখতে দেখতে এসে গেল বিংশ শতাব্দী, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি, এশিয়া ও আফ্রিকায় কোকোচাষের সূচনা চকোলেটকে একেবারে মধ্যবিত্তর হাতের মুঠোয় এনে দিল।
১৯১২ খ্রীষ্টাব্দে বেলজিয়ামের বিশ্ববিখ্যাত নিউহাউস কোম্পানীর জঁ নিউহাউস চকোলেটের শেল তৈরি করতে সমর্থ হলেন, যার মধ্যে ভরা থাকত ক্রীম বা বাদামের পেস্ট, এককথায় জন্ম হল প্রালিনের (লাসাগনের আবিষ্কার এতদিন পরে কাজে লাগল)।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এসে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ততদিনে চকোলেট এতটাই সস্তা হয়ে উঠেছে যে ক্যালরিঘনত্বের বিচারে সবচেয়ে সস্তা খাদ্যের নাম হয়ে উঠল চকোলেট। যদিও এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ক্যালাবাউ কোম্পানীর। হাই কোকো বাটার ও ফ্যাট কন্টেন্টের ক্যুভার্তুরে তৈরির মাধ্যমে চকোলেটকে তরল অবস্থায় সস্তায় সারা পৃথিবীতে পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তি এনে দিল সত্যিকারের বিশ্ববিপ্লবের। তাই যুদ্ধক্ষেত্রেও সৈনিকদের র্যাশনের অন্যতম উপাদান হয়ে গেল চকোলেট। তারপর চকোলেট নিয় কত পরীক্ষানীরিক্ষা হয়ে গেছে, চকোলেট শেলের মধ্য রাম, ওয়াইন ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হয়েছে ওয়াইন চকোলেট, রাম চকোলেট ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। একে কি আমরা ব্যাক টু বেসিকস বলতে পারি? কোকোগাছ ফলের শাঁস পচিয়ে মদ বানাবার মধ্যে দিয়েই কিন্তু কোকো ব্যবহারের সূত্রপাত।

তার পরের ইতিহাসটা শুধুই চকোলেটের বিশ্বজয়ের, দেশ থেকে দেশে হাত থেকে হাতে ছড়িয়ে পড়ার।
কিন্তু মিষ্টস্বাদের দৌরাত্মে কি সেই ঝালঝাল মশালাদার শকোলাটল কি বিলুপ্ত হয়ে গেল? তা কেন হবে, মেক্সিকোতে চিলাতে বলে একটি পানীয় আজও জনপ্রিয়, যা আদতে শকোলাটলই।

ডার্ক সাইড অফ দ্য ফোর্স

এপর্যন্ত পড়ে মনে হবে কেতজাকোয়াটলের শেষ উপহার মানবজাতিকে ক্রমশই সুখী করে তুলছে। কেতজাকোয়াটল জিতছেন আর তেজকাতলিপোকা হারছেন। কিন্তু ঠিক সেসময়েই একটা ডকুমেন্টারীর কথা মনে পড়ে গেল। যার নাম 'ডার্ক সাইড অফ চকোলেট'। নাম শুনলে প্রথমে মনে হবে এটা বুঝি ডার্ক চকোলেট নিয়ে কোন ছবি বোধহয়। ডার্ক চকোলেট নিয়ে নিয়ে অবশ্যই, কিন্তু একটু পাঁচালোভাবে। আগেই বলেছি যে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকেই কোকোর উৎপাদন ক্ষেত্র মধ্য আমেরিকা থেকে আফ্রিকা ও এশিয়ার ট্রপিকাল রেনফরেস্ট অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে পশ্চিম আফ্রিকা হয় ওঠে কোকোর সবচেয়ে বড় যোগানদার। পৃথিবীর কোকো উৎপাদনের প্রায় সত্তর শতাংশ আসে এই অঞ্চল থেকেই। তবে সবচেয়ে বেশি আসে যেদুটিযদেশ থেকে, তারা হল ঘানা ও আইভরি কোস্ট। এদুটো দেশ মিলিতভাবে বিশ্বের কোকো উৎপাদনের ষাট শতাংশের উৎপাদক। আর এখানেই তেজকাতলিপোকা তাঁর থাবা বাড়িয়েছেন। ঘানা ও আইভরি কোস্টের কোকো প্লানটেশনগুলো ছোটদের জন্য স্বপ্ন তৈরী করে, কিন্তু সেই স্বপ্নের সাথে জড়িয়ে থাকে ছোটদেরই ঘাম ও রক্ত। দশ থেকে পনেরো বছর বয়সী বাচ্চাদের কোনরকম মজুরী না দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাজ করানো হয় কোকোগাছের ফল ছাড়িয়ে বিন বের করার জন্য। স্কুল? লেখাপড়া? সেসব অন্য পৃথিবীর জিনিস যে। সবচেয়ে দুঃখের কথা হল চকোলেট উৎপাদনের সবচেয়ে বড় কোম্পানীগুলো, যেমন নেসলে, হার্শিজ হল ছোটদের রক্তে তৈরি কোকোর সবচেয়ে বড় ক্রেতা। কোকো প্লান্টেশনের পাশ দিয় যদি ভোরবেলা হাঁটেন তাহলে দেখবেন পাঁচ থেকে পনেরোর বাচ্চাদের সৈন্যবাহিনী। রামদা আর করাত হাতে তারা চলেছে বিশ্বের অন্যপ্রান্তে চকোলেট পাঠাবার ব্যবস্থা করতে। ভোর ছটায় শুরু হয় কাজ, গাছে উঠে কোকোফল পাড়া, রামদার এক কোপে ফল ফাটিয়ে বিন বের করার সময়ে কত বাচ্চার যে হাত পা ভাঙে, এমনকি অঙ্গচ্ছেদ হয় তার সঠিক হিসেব কেউ জানেনা। কাজ শেষ হলে তারা ঘুমোতে যায় কাঠের ঘরে, যেখানে একটা জানলা পর্যন্ত নেই, কে জানে সেখানে তারা চকোলেটকে স্বপ্নে পুলকে হিসেবে দেখে কিনা। বিশ্বায়ন চায় যেকোন প্রোডাক্ট সবচেয়ে কম খরচে তৈরি করতে, খরচ কমাবার জন্য কে ব্যবহৃত হচ্ছে তাতে তার বয়েই গেল। কেতজাকোয়াটলের দানকার দেবতার খাদ্য তেজকাতলিপোকার থাবা হয়ে ওঠে আফ্রিকার কোকো প্লান্টেশনে।









423 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: somen basu

Re: চাকুম চুকুম চকোলেট

চকোলেটপুরাণ। চকলেটের মতোই স্বাদু। দারুণ লেখা...
Avatar: রৌহিন

Re: চাকুম চুকুম চকোলেট

অসাধারণ। সংগ্রহে রাখলাম
Avatar: b

Re: চাকুম চুকুম চকোলেট

কোথায় যেন পড়েছিলাম, কোকো গুঁড়ো, কোকো মাখন, চিনি আর জল/দুধ মিশিয়ে চকোলেট তৈরিতে প্রথম প্রবলেম ছিলো কোকো বাটার আর জলের মিশ না খাওয়া। নেসলে কোম্পানি সেটাকে সলভ করে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন