Salil Biswas RSS feed

[email protected]
Salil Biswasএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • অরফ্যানগঞ্জ
    পায়ের নিচে মাটি তোলপাড় হচ্ছিল প্রফুল্লর— ভূমিকম্পর মত। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেন কেউ আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে— সেই প্রচণ্ড কাঁপুনিতে ফাটল ধরছে পথঘাট, দোকানবাজার, বহুতলে। পাতাল থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছিল। ঝোড়ো বাতাস বইছিল রেলব্রিজের দিক থেকে। প্রফুল্ল দোকান থেকে ...
  • থিম পুজো
    অনেকদিন পরে পুরনো পাড়ায় গেছিলাম। মাঝে মাঝে যাই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়। বন্ধুদের মা-বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ভাল লাগে। বেশ রিজুভিনেটিং। এবার অনেকদিন পরে গেলাম। এবার গিয়ে শুনলাম তপেস নাকি ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একটু পরে তপেসও এল ...
  • কাঁসাইয়ের সুতি খেলা
    সেকালে কাঁসাই নদীতে 'সুতি' নামের একটা খেলা প্রচলিত ছিল। মাছ ধরার অভিনব এক পদ্ধতি, বহু কাল ধরে যা চলে আসছে। আমাদের পাড়ার একাধিক লোক সুতি খেলাতে অংশ নিত। এই মৎস্যশিকার সার্বজনীন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়। মনে আছে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ...
  • শুভ বিজয়া
    আমার যে ঠাকুর-দেবতায় খুব একটা বিশ্বাস আছে, এমন নয়। শাশ্বত অবিনশ্বর আত্মাতেও নয়। এদিকে, আমার এই জীবন, এই বেঁচে থাকা, সবকিছু নিছকই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া, এমনটা সবসময় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না - জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পরিণ...
  • আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই...
    দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। দেশের সবচেয়ে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে বুয়েট। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছু বরাহ নন্দন! কাওকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কি খুব সহজ কাজ? কতটুকু জোরে মারতে হয়? একজন মানুষ পারে ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭
    চন্দ্রপুলিধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন ...
  • গুমনামিজোচ্চরফেরেব্বাজ
    #গুমনামিজোচ্চরফেরেব্...
  • হাসিমারার হাটে
    অনেকদিন আগে একবার দিন সাতেকের জন্যে ভূটান বেড়াতে যাব ঠিক করেছিলাম। কলেজ থেকে বেরিয়ে তদ্দিনে বছরখানেক চাকরি করা হয়ে গেছে। পুজোর সপ্তমীর দিন আমি, অভিজিৎ আর শুভায়ু দার্জিলিং মেল ধরলাম। শিলিগুড়ি অব্দি ট্রেন, সেখান থেকে বাসে ফুন্টসলিং। ফুন্টসলিঙে এক রাত্তির ...
  • দ্বিষো জহি
    বোধন হয়ে গেছে গতকাল। আজ ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ, সন্ধ্যাবেলায় আমন্ত্রণ ও অধিবাস। তবে আমবাঙালির মতো, আমারও এসব স্পেশিয়ালাইজড শিডিউল নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই তেমন - ছেলেবেলা থেকে আমি বুঝি দুগ্গা এসে গেছে, খুব আনন্দ হবে - এটুকুই।তা এখানে সেই আকাশ আজ। গভীর নীল - ...
  • গান্ধিজির স্বরাজ
    আমার চোখে আধুনিক ভারতের যত সমস্যা তার সবকটির মূলেই দায়ী আছে ব্রিটিশ শাসন। উদাহরণ, হাতে গরম এন আর সি নিন, প্রাক ব্রিটিশ ভারতে এরকম কোনও ইস্যুই ভাবা যেতো না। কিম্বা হিন্দু-মুসলমান, জাতিভেদ, আর্থিক বৈষম্য, জনস্ফীতি, গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অভাব, শিক্ষার অভাব ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

দু’হাজার চুরাশী

Salil Biswas

বহুদিন আগে লেখা। এখন লিখলে এই কথাগুলোই লিখতাম। কিচ্ছু তো পাল্টায়নি। নাম ইংরেজিতে লিখেছিলাম : An Infernal Tragedy

সমস্ত দিন পরীক্ষার হলে পাহারাদারী করিয়া এবং কতিপয় অসাধু বালকের সহিত বচসা করিয়া সন্ধ্যাবেলা ক্লান্ত দেহে বাড়ী ফিরিয়াছি। চা জলখাবার খাওয়া হইয়া গিয়াছে। সবেমাত্র আরামকেদারায় গা এলাইয়াছি, হঠাৎ দেখিলাম, ঘরের দেওয়াল চতুষ্টয় অতি দ্রুত পিছনে হটিয়া গেল, সম্মুখের টেবিল চেয়ার বইপত্র সমস্ত কিছু কাঁপিতে কাঁপিতে অদৃশ্য হইল। দুই চক্ষে অন্ধকার দেখিলাম। শরীরে কোন অনুভূতি নাই, কেবল প্রচণ্ড এক শৈত্য-প্রবাহের অমোঘ টানে আমি কোথায় ভাসিয়া চলিলাম।
এইরূপ কতক্ষণ কাটিল জানিনা। এক পল অথবা এক যুগ পরে অবাক হইয়া দেখিলাম এক গগনচুম্বী অট্টালিকার সম্মুখে আমি দাঁড়াইয়া আছি। তাহার শিখরদেশ মেঘের মধ্যে অদৃশ্য। তাহার সর্বাঙ্গে কোথাও কোন জানালা নাই, কোন বারান্দা নাই। সম্ভবত কংক্রীটের খাড়া দেওয়াল। সেই অপূর্ব ভবনের প্রবেশদ্বার – বিশাল এবং ভীমদর্শন কপাট মেলিয়া কাহার অপেক্ষায় আছে কে জানে। আমার দুই পার্শ্বে তাকাইয়া দেখিলাম, দিগন্তবিস্তৃত রুক্ষ প্রান্তর। প্রান্তরের শেষে আবছা দেখা যাইতেছে একটি প্রাচীর যাহা সম্ভবত এই প্রান্তরকে ঘিরিয়া রাখিয়াছে। পিছনে ফিরিয়া দেখিলাম, সেই দিকেও সেই একই রুক্ষতা এবং দূরে প্রতীয়মান সেই প্রাচীর। আমি কি করিব, কোন দিকে যাইব, কোথায় আসিয়াছি, কি ঘটিয়াছে ইত্যাদি ভাবিতে ভাবিতেও লক্ষ্য করিলাম যে আমার মন এইরূপ অদ্ভুত পরিস্থিতিতেও শান্ত রহিয়াছে। যেন কোনো উপায়ে আমার মস্তিষ্ককে আশ্বস্ত করিয়া রাখা হইয়াছে।
হঠাৎ আমার কাঁধে কাহার করস্পর্শ অনুভব করিলাম। ফিরিয়া দেখি, এক বিশালকায় পুরুষ, পরিধানে ধুতি পাঞ্জাবী, গলায় চাদর, নাসিকার নিচে অতিপুষ্ট সিন্ধুঘোটকলাঞ্ছিত গুম্ফযুগল, আমার দিকে চাহিয়া মৃদুমন্দ হাসিতেছেন। তাঁহার চেহারা আমার অতিপরিচিত বোধ হইল। জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনাকে অত্যন্ত চেনা লাগিতেছে। আপনি কি স্যার আ---?”
গম্ভীর কন্ঠে উত্তর শুনিলাম, ‘হ্যাঁ বৎস। আমিই সেই ব্যক্তি।’
কিন্তু......... কিন্তু আপনি তো............’।
‘বহুকাল আগে গত হইয়াছি? ঠিকই। কিন্তু বর্তমান যুগে, অর্থাৎ, এই দু’হাজার চুরাশী সালে, বিজ্ঞান অতিশয় উন্নত হইয়াছে এবং অতি সহজেই অতীত হইতে বিভিন্ন ব্যক্তিকে প্রয়োজনে এই বর্তমানে লইয়া আসা যায়। মৃত্যুর পরেও যে-কোন ব্যক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করা যায়। বৈজ্ঞানিকগণ কালজয়ী যন্ত্রের দ্বারা আমাকে এই সময়ে লইয়া আসিয়াছে। উদ্দেশ্য, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরীক্ষা-ব্যবস্থা যথেষ্ট সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত কি না তাহা পরিদর্শন করা। অতি সুখের কথা, ব্যবস্থা দেখিয়া আমি যারপরনাই প্রীত হইয়াছি। দু’একটি অতি সামান্য পরিবর্তনের কথা বলিয়াছি। সে সমস্ত কথা এখন আলোচনাধীন।’
শুনিয়া আমি চমৎকৃত হইলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘ইহা কোন স্থান? আমি এখানে কি করিয়া আসিলাম? সম্মুখের এই অট্টালিকাই বা কি? আপনি আমার ন্যায় সামান্য লোকের সহিত কেনই বা কথা বলিতেছেন?’
‘ইহা কলিকাতা শহরেরই একটি অংশ। এইস্থানে এক সময়ে একটি কারাগার ছিল। তাহা ঈষৎ পরিবর্তন করিয়া একশত বৎসর পূর্বে এইখানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তরিত করা হয়। তাহার আরও পরে পুরাতন সমস্ত বাড়ী ভাঙ্গিয়া এই অট্টালিকা নির্মাণ করা হয় কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগার রূপে। চতুর্দিকের এই প্রান্তর মনুষ্যসৃষ্ট এবং সুউচ্চ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। এই প্রাচীর ও অট্টালিকা-মধ্যবর্তী প্রান্তর সম্পূর্ণ জনমানবশূন্য ও লতাগুল্মহীন হওয়ার ফলে ইহা পাহারা দেওয়া খুব সহজ। কোন দুষ্কৃতকারী পরীক্ষার্থীকে সাহায্য করিতে আসিবে তাহার কোন উপায় নাই। অবশ্য বর্তমান ব্যবস্থা এত উন্নত যে নকল করিবার সাধ্য কাহারো হইবে না। এই যে অট্টালিকা দেখিতেছো, ইহাই কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগার। ইহা তোমাকে দেখাইবার জন্য অতীত হইতে তোমাকে এই বর্তমানে আনা হইয়াছে। এই যুগের বৈজ্ঞানিকগণ তোমাদের যুগের উপর বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে শ্যেনদৃষ্টি রাখেন। তোমাদের সময়ে সরকার পরীক্ষা-ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধন করেন এবং বর্তমান বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থার অভিব্যক্তির পথ প্রশস্ত করেন। আজ সমস্ত দিন পরীক্ষাগৃহে তোমার কার্যকলাপ, বিশেষতঃ অসাধু শয়তান বালকবৃন্দের প্রতি তোমার ঘৃণা দেখিয়া আমরা অতীব আনন্দিত হইয়াছি। সে-কারণে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছে তোমাকে পথ দেখাইয়া সমস্ত কিছু ব্যাখ্যা করিয়া দিব। চল, আর বিলম্বে কাজ নাই। দৈনন্দিন কার্যক্রম এতক্ষণে শুরু হইয়াছে।’
এই বলিয়া সেই বৃকোদর পুরুষ আমাকে তাঁহার সহিত আসিতে আদেশ করিয়া অট্টালিকার সিংহদরজার দিকে অগ্রসর হইলেন। আমি তাঁহাকে অনুসরণ করিলাম।
এতক্ষণ কথায় কথায় লক্ষ করি নাই, এইবার দেখিলাম, কোথা হইতে বহুসংখ্যক তরুণ ও তরুণী সেই দরজা দিয়া ওই অট্টালিকায় প্রবেশ করিতেছে। তাহাদের মুখমণ্ডল বিষাদে আচ্ছন্ন এবং প্রচ্ছন্ন ভীতিতে মলিন। তাহাদের পরিধানে বস্ত্র অতি সামান্য – তরুণেরা কৌপীনমাত্র পরিয়া আছে, তরুণীগণ সালোয়ার-কামিজ। তাহাদের সহিত আমরাও প্রবেশদ্বার অতিক্রম করিলাম। অন্যেরা আমাদের দিকে চাহিয়াও দেখিল না। পরস্পরের দিকেও যে তাহারা দেখিতেছিল এমন নহে। ভিতরে ঢুকিয়া তরুণেরা একদিকে চলিল এবং তরুণীরা গেল অন্যদিকে। দুইটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রতর দরজা, যাহাদের উপরে ‘পুরুষ’ ও ‘নারী’ লেখা রহিয়াছে, তাহাদের জন্য খোলা ছিল। দুইটি দরজার মধ্যবর্তী দেওয়ালে তৃতীয় একটি দরজা স্যার আ-কে দেখিয়া নিজেই খুলিয়া গেল। আমরা একটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিলাম।
সেইখানে দুই দেওয়ালে দুইটি টেলিভিশনের পর্দা। তাহাদের সম্মুখে দুইজন গেরুয়া কাপড়ের আলখাল্লাপরিহিত, মুণ্ডিত মস্তক, কুলিশ-কঠোর মুখমণ্ডল পুরুষ বসিয়া আছেন এবং পর্দা দুইটির প্রতি লক্ষ রাখিতেছেন। আমি সমস্ত ব্যাপার কিছুই বুঝিতে পারিতেছিলাম না। স্যার আ-কে প্রশ্ন করিলাম, ‘এইখানে কি ঘটিতেছে আমাকে দয়া করিয়া একটু বুঝাইয়া বলিবেন কি? এই তরুণ-তরুণীগণ কাহারা? এই দুই ব্যক্তি কি করিতেছেন? আমার তো কিছুই হৃদয়ঙ্গম হইতেছে না!’
‘না হওয়াই স্বাভাবিক। এই তরুণ-তরুণীগণ পরীক্ষার্থীবৃন্দ। বিভিন্ন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হইতে আসিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর বিভিন্ন কেন্দ্রে পরীক্ষার ব্যবস্থা করে না, সকল পরীক্ষাই এইখানে গ্রহণ করা হয়। পরীক্ষার্থীদের এইখানে আসিতে হয়। ইহাদের পরিধেয় বস্ত্রের স্বল্পতা নকল করিবার উদ্দেশ্যে গোপনে কোন পুস্তকাদি আনিবার পথ রুদ্ধ করিয়াছে। প্রশ্ন করিতে পারো, বস্ত্রের স্বল্পতা তরুণমনে কোনো কু-প্রবৃত্তির উদ্রেক করে কিনা। সে সম্ভাবনা একেবারেই নাই, কেননা পরীক্ষার ভীতি এই সময়ে তাহাদের মন হইতে প্রায় অন্যসব চিন্তাই দূর করিয়া দেয়। তাছাড়া, ইহাদের মস্তিষ্ক বিভিন্ন উপায়ে শোধিতও করা হইয়াছে। আর যাহারা ইন্‌ভিজিলেটর? তাঁহারা এই সমস্ত সামান্য কামনা-বাসনার অনেক উর্ধ্বে। পরীক্ষা গ্রহণই তাঁহাদের ধ্যানজ্ঞান। পরীক্ষার্থীদের মধ্যে সততা ও শৃঙ্খলারক্ষার্থে সবকিছু করিতে তাঁহারা প্রস্তুত। এই মহান্‌উদ্দেশ্য একাগ্রতার সহিত নির্বিকারচিত্তে সাধিত করিবার জন্য লজ্জা, ঘৃণা, ভয়, মোহ, কাম এবং ক্রোধ তাঁহারা বিসর্জন দিয়াছেন। অনেকে বলে যে এই মহান ব্রত পালনে শল্যচিকিৎসকগণ তাঁহাদের সাহায্য করিয়াছেন।’
‘তাহা কি সত্য?’ আমার সমস্ত শরীর শিহরিত হইল।
স্যার আ- কেবল একটু হাসিলেন। ‘এই যে দুই মহাপ্রাণকে দেখিতেছ, ইঁহারাও ইনভিজিলেটর। ইঁহাদের আজ প্রধান দ্বারপর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছে।’
হঠাৎ আমাদের দক্ষিণের ইনভিজিলেটর সম্মুখের টেবিলে একটি বোতাম টিপিয়া কি একটি কথা বলিলেন। সম্মুখের টেলিভিশন পর্দায় দেখিলাম, মুহূর্ত মধ্যে দুইজন নারী ইনভিজিলেটরের আবির্ভাব ঘটিল এবং তাঁহারা একটি তরুণীকে ধরিয়া তাহার পোশাকের ভিতর হইতে একটি ক্ষুদ্র কাপড়ের থলি বাহির করিলেন। তরুণীটি কিছু বলিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু একজন মুণ্ডিতমস্তক নারী হস্তধৃত একটি দণ্ড তাহার গণ্ডে স্পর্শ করাইতেই সে প্রস্তরমূর্তির ন্যায় স্থির হইয়া গেল। তাহার হাত ধরিয়া ইনভিজিলেটরদ্বয় পর্দার দৃষ্টির বাহিরে চলিয়া গেলেন। অন্যান্য তরুণীগণ এই ঘটনায় বিচলিত হইল কি না বোধগম্য হইল না, তাহারা যেমন পুত্তলিকাবৎ চলিতেছিল তেমনই অগ্রসর হইতে লাগিল। ‘দেখিলে,’ স্যার আ-র কণ্ঠে খুশী ঝরিয়া পড়িল, ‘দেখিলে, কী অসাধারণ ক্ষিপ্রতা ,কী অসাধারণ শ্যেনদৃষ্টি!’
আমার মুখে কথা সরিল না।
এইবার আমরা প্রবেশপথের বিপরীতের দ্বার খুলিয়া একটি অপ্রশস্ত গোলাকার প্রকোষ্ঠে আসিয়া পড়িলাম। অনুভব করিলাম আমাদের প্রবেশের সাথে সাথে নিঃশব্দে প্রকোষ্ঠটি উপর দিকে উঠিতে শুরু করিল। কয়েক মুহূর্ত পরে দ্বারটি খুলিয়া গেল এবং আমরা একটি বিরাট হল-অভ্যন্তরে নিষ্ক্রান্ত হইলাম। আমাদের দেখিয়া দুইজন ব্যক্তি আগাইয়া আসিয়া আমার করমর্দন করিলেন এবং কুশল প্রশ্ন করিলেন। ইঁহারাও মুণ্ডিতমস্তক এবং আলখাল্লাপরিহিত কিন্তু তাহার বর্ণ কৃষ্ণ। ইঁহাদের মুখে অবশ্য ততটা কাঠিন্য নাই। বয়সও খুব বেশী নহে। একজন আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির উত্তরে বলিলেন, ‘আমরা ইনভিজিলেটর নহি। আমরা মহাকালের সেবক। সময়ের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ আমরাই করি। প্রয়োজনে অতীতে বা ভবিষ্যতে যাতায়াতও করিয়া থাকি। তাই আমাদের শারীরিক বয়োবৃদ্ধি বড় একটা ঘটে না।’
অপর ব্যক্তি বলিলেন, ‘সেই কারণেই কেবল আমরাই আপনার সহিত কথা বলিতে পারি। স্যার আ- অতীত হইতে আসিয়াছেন বলিয়া তিনিও কথা বলিতেছেন। অন্য সকলেই কেবল একটিমাত্র বর্তমানের অঙ্গ। সে-কারণে আপনাদের তাহারা দেখিতেও পায়না এবং আপনাদের উপস্থিতি তাহাদের স্পর্শও করে না। অবশ্য আমরা ইচ্ছা করিয়াই এই ব্যবস্থা করিয়াছি। কেননা অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ একত্র হইলে বহুবিধ বিপর্যয় ঘটিতে পারে।’ এই কথা বলিয়া সেই ব্যক্তি চান্স, প্রোবাবিলিটি এবং অ্যাকসিডেন্টের পারস্পরিক সম্পর্ক লইয়া একটি দীর্ঘ ও জটিল দার্শনিক বক্তৃতা আরম্ভ করিলেন। স্যার আ- তাঁহাকে বেশী কথা বলিতে নিষেধ করিলেন। ‘তোমাদের “কালদর্শন” যন্ত্রটি দেখাও। আমাদের হাতে সময় বেশী নাই।’
‘আপনারা “কালদর্শন” যন্ত্রের মধ্যেই দন্ডায়মান।’ এই বলিয়া প্রথম ব্যক্তি তাঁহার হস্তধৃত বর্তুলাকার একটি যন্ত্রের উপর চাপ দিতেই সেই প্রকোষ্ঠের চারিটি দেওয়াল প্রথমে নিকষ কালো, তারপরে রক্তিম ও তারপরে নীলাভ হইয়া শেষে দুগ্ধশুভ্র স্ফটিকে পরিণত হইল এবং ধীরে ধীরে সেখানে একটি ছবি ফুটিয়া উঠিল। ‘আপনাকে অতীতের একটি দৃশ্য দেখাইতেছি। ইহা প্রাচীন মধ্যপ্রাচীন মধ্যপ্রাচ্য।’
আমি অবাক হইয়া দেখিলাম, একটি বিরাট ধংসস্তুপের মধ্যে আমরা আসিয়া পড়িয়াছি। স্পষ্ট অনুভব করিলাম, একটি বিরাট বিস্ফোরণের পর একটি বিশাল প্রাসাদ চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া পড়িয়া আছে। চতুর্দিকে আহতের আর্তনাদ। জীবিতদের গালিগালাজ। উদ্ধারকারীদের কর্মব্যস্ততা। তখনও ধ্বংসস্তূপ হইতে নির্গত ধুম্রজালে চতুর্দিক আচ্ছন্ন। হঠাৎ পট পরিবর্তন হইল এক রাজসভা। অপূর্ব তাহার কারুকার্য। সিংহাসনে এক অসাধারণ সুপুরুষ উপবিষ্ট। তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান ক্রন্দনরতা দুই নারী। তাঁহার পদতলে একটি শিশু। মুহূর্ত মধ্যে দেওয়ালগুলি আবার তাহাদের সাধারণ চেহারা ফিরিয়া পাইল। আমি হতবাক হইয়া তাকাইয়া রহিলাম।
মহাকালের সেবকদের একজন আমার হাত ধরিয়া একটি ছোট টেলিভিশনের পর্দার সামনে লইয়া গেলেন। সেখানে দেখিলাম, আমার বাড়ীর বসিবার ঘর। সেখানে আরাম কেদারায় গা এলাইয়া আমি নিদ্রিত। বিমূঢ় হইয়া প্রশ্ন করিলাম, ‘কি ব্যাপার?’
‘ভীত হইবেন না। উহা আপনার একটি ত্রিমাত্রিক প্রতিচ্ছবি মাত্র। আপনার পরিবারবর্গকে আমরা চিন্তিত করিতে চাহি নাই। প্রয়োজনে ওই প্রতিচ্ছবি আপনার সকল কর্তব্য-কর্ম সম্পাদন করিবে।’
আমি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া কহিলাম, ‘সে কি! আমার ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আপনাদের কে দিল?’
উত্তরে স্যার আ- বলিলেন, ‘মূর্খের ন্যায় কথা কহিও না! তোমাকে যে সুযোগ আমরা দিয়াছি তাহা কয়জনা পায়! চল, চল, আসল জিনিস তুমি এখনও দেখ নাই।’
পুনরায় আমরা সেই ক্ষুদ্র গোল প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিলাম। আবার তাহা উপরদিকে ধাবিত হইল। এইবার গতি আরও দ্রুত। মাঝে মাঝে তাহার দেওয়ালের গায়ে এক-একটি তলার দৃশ্য ক্ষণেকের তরে ফুটিয়া উঠিয়া মিলাইয়া যাইতেছিল। দেখিয়া বুঝিলাম, সকল তলাতেই পরীক্ষা চলিতেছে। খানিক পরে প্রকোষ্ঠটি আবার থামিল। এইবার আমরা একটি অতিবৃহৎ হলঘরে নিষ্ক্রান্ত হইলাম। সেই ঘরের চতুর্দিকে অজস্র টেলিভিশন পর্দা। প্রতিটি পর্দার সম্মুখে একজন করিয়া ইনভিজিলেটর বসিয়া আছেন। কেহ নারী, কেহ পুরুষ। সকলেই নিঃশব্দে পর্দাগুলি নিরীক্ষণ করিতেছেন। কয়েকজন, মনে হয়, উচ্চপদস্থ ব্যক্তি, ঘুরিয়া ঘুরিয়া সবদিকে লক্ষ্য রাখিতেছেন। বুঝিলাম ইহা কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগারের প্রাণকেন্দ্র। মূল পরিচালনাগৃহ। পর্দাগুলি অবলোকন করিয়া আমি মুগ্ধ বিস্ময়ে রুদ্ধবাক হইয়া রহিলাম। কি সুবিশাল কর্মকাণ্ড! কি অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা! হাজার হাজার শত শত পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়া চলিয়াছে। কোথাও কোন শব্দ নাই, কোন গোলযোগ নাই। শুধু নিঃশব্দ কলম সঞ্চালন!
স্যার আ- আমার বিমূঢ় ভাব দেখিয়া হাসিলেন। ‘এদিকে দেখ। একটি ঘরে এখনই পরীক্ষা শুরু হইবে। পদ্ধতি কি তাহা লক্ষ্য কর।’
একটি বিশেষ পর্দার সামনে আমরা উপস্থিত হইলাম। একটি ঘর দেখা যাইতেছে। ঘরটি মৌচাকের ন্যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খুপরিতে বিভক্ত। প্রতিটি খুপরির মধ্যে টেবিলের সম্মুখে একজন করিয়া পরীক্ষার্থী বিপন্ন মুখে বসিয়া আছে। দুই হাত টেবিলের উপর জড়ো করা। একটি ঘন্টা বাজিয়া উঠিল। সাথে সাথে টেবিলের মধ্যস্থিত একটি ফোকর হইতে একটি প্রশ্নপত্র, একটি খাতা ও একটি কলম বাহির হইয়া টেবিলের উপর পড়িল। পরীক্ষার্থীদের মুখে মৃদু চাঞ্চল্য দেখা দিল। কিন্তু কেহই প্রশ্নের দিকে হাত বাড়াইল না। পর্দার এক কোণে একটু নড়াচড়া দেখিয়া সেইদিকে তাকাইলাম। একজন পরীক্ষার্থী গলা বাড়াইয়া প্রশ্নপত্র পাঠ করিবার চেষ্টা করিতেছে। আমাদের সম্মুখস্থ ইনভিজিলেটর একটি বোতাম টিপিলেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই পরীক্ষার্থীটির চক্ষু বিস্ফারিত হইল, মস্তকের কেশরাশি সোজা দাঁড়াইয়া উঠিল এবং তরুণটি টেবিলের উপর মুখ থুবড়াইয়া পড়িল। আমি চমকিত হইয়া স্যার আ-র দিকে তাকাইলাম।
‘ও কিছু নহে। বিপথগামীদের শায়েস্তা করিবার ব্যবস্থা মাত্র! উহাকে মৃদু বৈদ্যুতিক “শক” দেওয়া হইল। একটু পরেই ও সুস্থ হইয়া উঠিবে।
ইতিমধ্যে টেবিলগুলির উপর একটি করিয়া সবুজ আলো জ্বলিয়া উঠিয়াছে। পরীক্ষার্থীরা কোনোক্রমে প্রশ্নপত্র ও খাতা টানিয়া লইয়া উন্মাদের ন্যায় লিখিতে শুরু করিল।
‘আরেকটি ঘরে পরীক্ষা শেষ হইতেছে। দেখিবে আইস।’
স্যার আ-র টানে পুত্তলিকাবৎ তাঁহার সহিত চলিলাম। যাইতে যাইতে লক্ষ্য করিলাম, বিদ্যুৎপৃষ্ট তরুণটি জাগিয়া উঠিয়া যন্ত্রণাকাতর মাথা নাড়িতে নাড়িতে হাত বাড়াইয়া খাতা কলম টানিয়া লইল।
অন্য একটি পর্দার সামনে আসিলাম। সেই ঘরে দ্রুতগতিতে লেখা চলিতেছে। হঠাৎ টেবিলে একটি লাল আলো জ্বলিয়া উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে সব খুপরিতে লেখা থামিয়া গেল। একটি খুপরিতে লেখা থামাইতে কিঞ্চিত বিলম্ব হইয়াছিল। সেই পরীক্ষার্থী, এইক্ষেত্রে একজন তরুণী, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হইয়া টেবিলে লুটাইল। আবার একটি ঘণ্টা বাজিল। পরীক্ষার্থীবৃন্দ তাহাদের প্রশ্নপত্র; খাতা ও কলম টেবিলের সেই ফোকরের মধ্যে ঢুকাইয়া দিল। ইনভিজিলেটর একটি হাতল ঘুরাইলেন। খুপরিগুলির দেওয়াল মেঝের মধ্যে প্রবেশ করিল এবং কক্ষটি একটি বড় হলের রূপ লইল। এইবার পরীক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে হল হইতে বাহিরে যাইতে আরম্ভ করিল।
হঠাৎ পরিচালনাকেন্দ্রের ঘরে একটি ঘন্টা বাজিয়া উঠিল। দেখিলাম একটি বিশেষ পর্দার দিকে সব কয়জন ভ্রাম্যমান কর্তাব্যক্তি দ্রুতপদে অগ্রসর হইতেছেন। আমরাও সেইখানে উপস্থিত হইলাম। পর্দায় দেখিলাম, বেশ কয়েকজন পরীক্ষার্থী টেবিলগুলির উপর অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া আছে। তথাপি সমস্ত ঘরের সব খুপরীর মধ্যে কোলাহল চলিতেছে। স্যার আ- ইনভিজিলেটরদের কথা শুনিয়া আমাকে জানাইলেন, এই হলের সকল প্রশ্নপত্রই নাকি পাঠক্রম-বহির্ভূত, তাই পরীক্ষার্থীরা বিচলিত। সত্যই প্রশ্নগুলি পাঠক্রমের বাহিরের, কিন্তু তাই বলিয়া বিশৃংখলা সহ্য করা হইবে না এবং পরীক্ষার নিয়ম অনুযায়ী যে প্রশ্নই আসুক না কেন তাহারই উত্তর লিখিতে হইবে। সুতরাং ... ...
উচ্চপদস্থ ইনভিজিলেটরদের একজন দেওয়ালের গায়ে একটি ছোট চাকা ঘুরাইতে লাগিলেন। সাথে সাথে পর্দায় প্রতীয়মান ঘরটির মধ্যে একটি ধুম্রজাল ধীরে ধীরে ছড়াইয়া পড়িতে লাগিল। পরীক্ষার্থীরা কেহ বুকে, কেহ গলায় হাত দিয়া একে একে অজ্ঞান হইয়া পড়িতে লাগিল।
চমকের পর চমক আমার চেতনাকে আচ্ছন্ন করিয়া দিয়াছিল। কিন্তু তবুও এই অমানুষিক ব্যাপার দেখিয়া আমি অত্যন্ত কাতর হইলাম ও স্যার আ-কে বলিতে গেলাম, যদি কোন পরীক্ষার্থী অসুস্থ থাকে তাহা হইলে গ্যাস প্রয়োগে তাহার মৃত্যু হইতে পারে। স্যার আ-বাজখাই গলায় আমাকে ধমক দিয়া বলিলেন, ‘তুমি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পবিত্রতা রক্ষা করিতে না চাহ তাহা হইলে তোমাকে মেসোজোইক যুগে নির্বাসিত করা হইবে। তোমাকে টেরোড্যাক্‌টিলের খাদ্যে পরিণত হইতে হইবে!’ আমি ভয়ে চুপ করিয়া গেলাম।
‘চল, এইবার পরীক্ষার ফল-প্রকাশ কি করিয়া হয় তাহা দেখিবে।’
‘পরীক্ষার ফল? কিন্তু পরীক্ষা তো এইমাত্র শেষ হইল!’
‘অতীতের কথা কিছুতেই ভুলিতে পারিতেছ না? বর্তমানে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব পরীক্ষার খাতা যন্ত্রগণক পরীক্ষা করে। পরীক্ষার ফল এক ঘন্টার মধ্যে প্রকাশ করা হয়।’
আবার সেই প্রকোষ্ঠ। আবার উপরদিকে দ্রুত আরোহণ। ‘পরীক্ষার্থীরা পায়ে হাঁটিয়া উপরে ওঠে। শ্রমের মর্যাদা শেখে এবং এক ঘন্টা সময়ও অতিবাহিত হইয়া যায়।’
‘পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরে কি হয়?’
‘ফল প্রকাশের পরে পাশ করিয়া সার্টিফিকেট লইয়া তরুণ-তরুণীরা চাকুরীর বাজারে প্রবেশ করে।’
‘সকলেই কি চাকুরী পায়?’
‘কখনই নহে। তাহারা সকলে চাকুরী পাইবার উপযুক্ত হয় মাত্র। বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বাহির হইয়া বিশাল বিশ্বে এইবার তাহারা প্রতিযোগিতায় নামিবে।’
‘যাহারা পাশ করিতে পারে না?’
‘তাহাদেরও বাহিরে নিক্ষেপ করা হয়। পরে তাহারা কোন কটাহে পতিত হইল সে-বিষয়ে আমাদের কোন মাথাব্যথা নাই।’
এইবার আমরা একটি দীর্ঘ আয়তাকার কক্ষে নিষ্ক্রান্ত হইলাম। অপ্রশস্ত কক্ষটি আলোআঁধারিতে রহস্যময়। অতি গম্ভীর একটি সঙ্গীতের মুর্চ্ছনায় কক্ষটির বাতাস ভারি হইয়া আছে। এক প্রান্তে বিশাল যন্ত্রগণক দণ্ডায়মান। তাহার সর্বাঙ্গে বিভিন্ন বর্ণের আলো জ্বলিতেছে, নিভিতেছে। আমরা দাঁড়াইয়া দেখিতে লাগিলাম, একজন পরীক্ষার্থী কক্ষে প্রবেশ করিল এবং ধীরে ধীরে স্খলিতচরণে যন্ত্রগণকের দিকে অগ্রসর হইল। বুঝিলাম, ভয়ে তাহার সর্বাঙ্গ কম্পমান। যন্ত্রগণকের সম্মুখে সে উপস্থিত হইতেই বজ্রকণ্ঠে আদেশ হইল, ‘নত হও !’
কাঁপিতে, কাঁপিতে তরুণটি হাঁটু মুড়িয়া বসিল। যন্ত্রগণকের নিম্নদেশে একটি ধাতুর পাত সরিয়া গেল। একটি যান্ত্রিক হাত বাহির হইয়া আসিয়া পরীক্ষার্থীর সামনে তাহার পরীক্ষার ফলসমেত প্রাপ্ত সংখ্যার তালিকা ধরিয়া দিল। কম্পিতহস্তে সে তালিকাটি হাতে লইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। সেই বজ্রকণ্ঠ এইবার বলিল, ‘অভিনন্দন! এইবার যাও। কর্মসন্ধানে ব্যাপৃত হও।’
পরীক্ষার্থীর মুখে ভয়মিশ্রিত একটি হাসি ফুটিয়া উঠিল। সে উৎফুল্ল হইতে সাহস পাইতেছিল না, পাছে অপরাধ হয়।
তাকাইয়া দেখিলাম, যন্ত্রগণকের পার্শ্বে একটি দেওয়াল ধীরে ধীরে সরিয়া গেল। বাহিরে উন্মুক্ত আকাশের নিচে একটি বারান্দা। পরীক্ষার্থীটি সেই বারান্দায় গিয়া দাঁড়াইল। দেওয়ালটি পুনরায় বন্ধ হইতে শুরু করিল। সম্পূর্ণ বন্ধ হইবার পূর্বে দেখিলাম জ্যা-মুক্ত তীরের ন্যায় পরীক্ষার্থীটির দেহ উপরদিকে নিক্ষিপ্ত হইল। তীক্ষ্ণ একটি আর্তনাদের শব্দ আমার কানে ভাসিয়া আসিল।
‘তরুণটি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষাগারের চৌহদ্দির বাহিরে গিয়া পড়িবে। সেখানে একটি জালে আটকাইবার পর সে কাজ খুঁজিতে বাহির হইবে।’
আমি স্তম্ভিত, হতচকিত হইয়া স্যার আ-র দিকে তাকাইয়া রহিলাম। আমার সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হইতে লাগিল। স্যার আ- প্রশ্ন করিলেন, ‘কেমন দেখিলে? পছন্দ হইল?’
আমি অতিকষ্টে মুখে নিষ্ঠিবন আনিয়া শুষ্ক জিহ্বা সঞ্চালিত করিয়া কহিলাম, ‘কিন্তু পরীক্ষা ব্যতীত আর কিছুই কি বিশ্ববিদ্যালয় দেখে না? শিক্ষাদান কিভাবে হয়?’
‘শিক্ষা? পরীক্ষার সহিত শিক্ষার সম্পর্ক একটি প্রাগৈতিহাসিক ধারণা মাত্র। এই বর্তমানে বাস করিতে হইলে ঐ সকল শূন্যগর্ভ চিন্তা ত্যাগ করিতে হইবে। তুমি আজ সমস্ত দিন পরীক্ষার হলে দুরাচার দেখিয়া যেরূপ চিন্তিত হইয়াছিলে তাহাতে আমরা বুঝিয়াছি যে তুমি এই বর্তমানের সহিত সুন্দরভাবে খাপ খাইবে। সুতরাং অতীতের সহিত সম্পর্কচ্ছেদ করিতে প্রস্তুত হও।’
আমি অতিশয় ভীত হইয়া কহিলাম, ‘স্যার আ-, আমি সামান্য এক ব্যক্তি। এই বিশাল কর্মকাণ্ডের সহিত যুক্ত হইবার যোগ্য কোনোমতেই নহি। আমার মধ্যে ষড়রিপু প্রবলভাবে উপস্থিত। ইনভিজিলেটর হওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। তাহা ব্যতীত, এই পরীক্ষা-ব্যবস্থার সহিত মানসিকভাবে নিজেকে মিলাইতে কিছুতেই পারিব না। দয়া করিয়া আমাকে অতীতে, আমার নিজস্ব বর্তমানে, প্রেরণ করার ব্যবস্থা করুন।’
স্যার আ- কিছুক্ষণ আমার দিকে চাহিয়া রহিলেন। তারপর বিরস বদনে কহিলেন, ‘চল, তাহাই করিব। তুমি একটি কাপুরুষ। তোমার মস্তিষ্কও নেহাতই নিরেট।’
আবার আমরা সেই মহাকালের সেবকদ্বয়ের কাছে আসিলাম। আবার সেই প্রবল শৈত্যপ্রবাহ আমাকে আচ্ছন্ন করিল। এক পল অথবা এক যুগ পরে দেখিলাম আমি আমার আরাম কেদারায় বসিয়া আছি। মেঝের উপরে পরীক্ষার হল হইতে বাজেয়াপ্ত ‘টুকলি’ করিবার কাগজ গড়াগড়ি যাইতেছে।


239 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: Salil Biswas

Re: দু’হাজার চুরাশী

লেখক শিক্ষাবিদ এবং লেখক রূপে সুপরিচিত। কল্পবিজ্ঞানও কখনো কখনো তাঁহার বিষয় হইয়াছে।
শিক্ষাক্ষেত্র সম্বন্ধে তাঁহার জ্ঞান এবং কল্পবিজ্ঞানে তাঁহার দখল এই দুইয়ে মিলিয়া মিশিয়া যে লেখা খানি প্রস্তুত হইয়াছে তাহা যেমন চমকপ্রদ, তেমনি মর্মন্তুদ। শিক্ষক ও পরীক্ষাগৃহে নজরদার রূপে নিজের অভিজ্ঞতায় প্রথমে উল্লসিত হইলেও ধীরে ধীরে এই শিক্ষাব্যবস্থার সকল হৃদয়হীনতা এবং অর্থহীনতা চক্ষুর সম্মুখে প্রতিভাত হইয়া উঠিল এবং মন বিষাদভারাক্রান্ত হইল।
সাধারণত এই অন্তর্জাল পুস্তিকায় সাহিত্যের বহুপাঠ্য শাখারই সাক্ষাৎ পাই। সেই স্থলে এই রচনাটি শৈলী, বিষয় এবং সমাজমনস্কতার কারণে বিশেষ প্রশংসার দাবী জানায়।
Avatar: Salil Biswas

Re: দু’হাজার চুরাশী

উপরের মন্তব্য খানি আমি অর্থাৎ প্রতিভা সরকার দ্বারা কৃত। কোন মন্ত্রবলে লেখকের নামখানি জাজ্বল্যমান হইয়া উঠিল তাহা গবেষণার বিষয়।
Avatar: সুমিতা সরকার

Re: দু’হাজার চুরাশী

অসাধারণ একটি লেখা বঙ্কিমী ধাঁচে। একজন শিক্ষিকা হিসেবে লেখাটির বক্তব্য কায়মনোবাক্যে সমর্থন করি। উপরি পাওনা অপূর্ব ভাষা। আরও লিখুন।
Avatar: Du

Re: দু’হাজার চুরাশী

উপভোগ করলাম ঃ)


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন