Soumyadeep Bandyopadhyay RSS feed

নিজেকে পল্লবগ্রাহী মনে করে কলার তোলেন | অল্প কিছুদিন হলো জলচর থেকে উভচর হওয়া সম্ভব হয়েছে | প্রচুর নিষিদ্ধ বস্তু সেবন করে করে শীঘ্র খেচর হবার সম্ভাবনা ও প্রচুর | বর্তমানে আন্টার্কটিকায় হনুমান সম্পদ নিয়ে বিশদ গবেষণায় ব্যস্ত |

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা... বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার দিন
    বিএনপি এখন অস্তিত্ব সংকটে আছে। কিন্তু কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। ক্ষমতার তাপে মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল দলটার। ফলাফল ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড মেরে হত্যার চেষ্টা। বিরোধীদলের নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা করলেই ...
  • তোমার বাড়ি
    তোমার বাড়ি মেঘের কাছে, তোমার গ্রামে বরফ আজো?আজ, সীমান্তবর্তী শহর, শুধুই বেয়নেটে সাজো।সারাটা দিন বুটের টহল, সারাটা দিন বন্দী ঘরে।সমস্ত রাত দুয়ারগুলি অবিরত ভাঙলো ঝড়ে।জেনেছো আজ, কেউ আসেনি: তোমার জন্য পরিত্রাতা।তোমার নমাজ হয় না আদায়, তোমার চোখে পেলেট ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ২
    বার্সিলোনা আসলে স্পেনের শহর হয়েও স্পেনের না। উত্তর পুর্ব স্পেনের যেখানে বার্সিলোনা, সেই অঞ্চল কে বলা হয় ক্যাটালোনিয়া। স্বাধীনদেশ না হয়েও স্বশাসিত প্রদেশ। যেমন কানাডায় কিউবেক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মনে হয় এরকম একটা জায়গা থাকে, দেশি হয়েও দেশি না। ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ১
    ঠিক করেছিলাম আট-নয়দিন স্পেন বেড়াতে গেলে, বার্সিলোনাতেই থাকব। বেড়ানোর সময়টুকুর মধ্যে খুব দৌড় ঝাঁপ, এক দিনে একটা শহর দেখে বা একটা গন্তব্যের দেখার জায়গা ফর্দ মিলিয়ে শেষ করে আবার মাল পত্তর নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ভোর রাতে রওনা হওয়া, আর এই করে ১০ দিনে ৮ ...
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মেয়ে

Soumyadeep Bandyopadhyay



১)
কিছুতেই কলকাতা যেতে চাইছিল না টুকি ওরফে শ্যামলী রাহা | স্কুলের স্যারের বলা চোখ বড় বড় করে দেওয়া ইতিহাসের গল্প , বিশ্বাস দাদুদের বাড়ির পিছনের জঙ্গলে টিয়াবাচ্ছার তদারকি , পুকুরে ডুব সাঁতার দিয়ে হাঁসেদের সাথে ছোটাছুটি , দামোদরের পারে মাঝে মাঝেই চড়ুইভাতি এহেন জরুরী কাজ ছেড়ে ট্রেনে করে শহরে যাবে কোন মুখ্যু ? তাও আবার এক আধ বেলার জন্য ঘুরতে যাওয়া নয় ওখানেই থাকা | ওর দু ক্লাস উঁচুতে পড়া পুতুল দু বার গেছে কলকাতায় , কালিঘাটে পুজো দেবার জন্য | ওর কলকাতা যাবার কথা শুনে চোখ কপালে তুলে বলেছিল, কিরম একটা অদ্ভূত, লোক আর গাড়ী গিজ গিজ করা একটা গম্ভীর শহর | একদিন গিয়েই তাই পালাই পালাই করে বাড়ি আসার বায়না ধরেছিল | কিন্তু , পরানের কাছে মেয়ের অত বোকা বোকা যুক্তি শোনার মত সময় ছিল না | টুকির পরেও আরো দুটো মেয়ে পার করার চিন্তায় তার দৈনিক তিতকুটে মুখে ভাত ঘুমের পরে এক নম্বর বিড়ির স্বাদ ও ফিকে লাগে | তাই তার চোখে এই মুহুর্তে ভাসছিল, জগা অর্থাৎ পাড়ার জগন্নাথের দেখানো মাস গেলে হাজার টাকার কড়কড়ে স্বপ্ন |

বছর কয়েক আগে হলে হয়ত টাকা নিয়ে এত দুশ্চিন্তা গ্রস্ত হত না সে | কিন্তু, সরকারী হাসপাতালে বউ এর লম্বা চিকিত্সা খরচা ( দালাল খরচা ধরে) তার প্রায় ঘটি বাটি বন্ধক রাখার অবস্থা করে দিয়েছে | এত করেও যদি বউ টা বাঁচতো | এরই মধ্যে পর পর দুবার চাষের খরচা ওঠাতে না পারার মহাজনী ধার ও তার মাথার ওপরে | গোদের ওপর বিষফোঁড়া গ্রামের বর্তমান হর্তা কর্তা বিধাতার সাথে তার সামান্য একটা বাঁশবন নিয়ে শরিকী ঝামেলা | ফলত সরকারী বাবু দের দেওয়া একশ দিনের কাজ তো দূরে থাক এক দিনের উপযোগী কিছুও তার ভাগ্যে জোটেনি | তাই তার একমাত্র ভরসা এখন খেত মজুরী আর কখনো সখনো জোগাড়ের কাজ করা | সেই চিরস্থায়ী অভাব জনিত ব্যক্তিত্বের ঘাটতি তার রাশভারী সদ্য ধনী বাল্যবন্ধু জগন্নাথ কে আর জগা বলতে সাহস দেয় না | তবুও জগা ঘনিষ্ঠ হয়ে তাকে বুঝিয়েছিল , শহরে থাকতে থাকতে টুকি আদব কায়দাও শিখে যাবে, ভবিষ্যতের বিয়ের বাজারে এ সহবতের দামই প্রচুর | তার সাথে দু বেলার খাবার, পুজোয় না হোক অন্তত একটা নতুন জামা , খারাপ কি | আর কাজ বলতে তো তিন জনের সংসারে ফাইফরমাশ খাটা | এর মধ্যে বাড়ীর বাবু প্রায় ই বাইরে থাকেন , বাকি সদস্য বলতে একটা বাচ্চা মেয়ে আর তার মা, যাকে জগন্নাথ মেডাম বলে | মোটের ওপর প্রায় শুয়ে বসেই কাটানো যাকে বলে | তবুও একটু কিন্তু কিন্তু করছিল পরান | পোষ্যর সংখ্যা কমলে তার সবদিক দিয়েই খুশী হওয়া উচিত নিয়মমাফিক | কিন্তু টুকির সব চেয়ে ছোট বোন কে জন্ম দেবার প্রায় দেড় বছরের মাথায় মরে যাওয়া বউ টার মুখ বসানো যেন অপয়া মেয়েটার শরীরে | গ্রামে জগন্নাথেরও খুব একটা সুনাম নেই, অনেকেই আড়ালে বলা বলি করে ওর যা যা ঠাট বাট অনেকটাই নাকি মেয়ে পাচার করে | দিন রাত খাটা খাটনি করা মোটা মাথায় এই সন্দেহ টা পাক দিচ্ছিল বারবার | মনের ভাব গোপন করার মত শিক্ষা ছিলনা বলেই হয়তো ওর চিন্তা ভাবনা টা মুখে পড়ে নিয়ে আশ্বাস দিয়েছিল জগন্নাথ , একবার নিয়ে গিয়ে ওদের বাড়ীতে পরান কে নিয়ে গিয়ে নিজেই সব দেখিয়ে শুনিয়ে নেবে |
এর পরেও আর কি সন্দেহ থাকতে পারে | সে তাই সেদিন থেকেই একমনে হিসেব করার চেষ্টা করছিল , পাঁচ বছরে কত টাকা জমাতে পারবে টুকি কাজ টা নিলে | ফলে আপাতত সব কিছু ছেড়ে মেয়েকে রাজী করানোর জন্য উঠে পড়ে লাগলো সে | অনেক মিষ্টি প্রলোভন , নতুন সাইকেল এমনকি পুজোতে সরকার বাজার থেকে কিনে আনা জিন্স প্যান্টের প্রতিশ্রুতি সব কিছু যখন বিফল , তখন বাধ্য হয়ে হাতের ব্যবহার করতে হলো | যদিও জানতে পেরে মেয়ের স্কুলের মিত্র দিদিমনি বাড়ী বয়ে এসেছিলেন বোঝাতে, যে এত ছোট মেয়ের যেন লেখা পড়া বন্ধ না করা হয় | কিন্তু, মেয়ে মানুষের কথা শুনলে সংসার চলে না | এত পড়াশোনা করে কি হয় তা মাইতি দের মেয়েটাকে দেখেই বোঝা যায় | বাপ প্রায় নিজে না খেয়েও স্কুলে পাঠাত | মেয়ে নাকি পড়াশোনা করবে | সে মেয়ে সাত ক্লাসের আগেই পালিয়ে বিয়ে করে ভাগলবা | কোনো খোঁজ নেই, কেউ বলে নাকি মুম্বাই তে বিক্রী হয়ে গেছে কেউ বলে শেঠদের দেশে , কেউ বলে বাচ্চা নষ্ট করতে গিয়ে মারা গেছে | মেয়ে যেত ঠিক আছে, কিন্তু পুরো বংশের মুখে কাঠ কয়লা ঘষে দিয়ে গেল যেন | ওর বুড়ো বাপ আর মা এখন কিরম পাগলাটে হয়ে গ্রামে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় | একটাই মেয়ে তাকে কেউ পড়তে পাঠায় ?


সুতরাং এর মধ্যেই একবার জগন্নাথের সাথে গিয়ে কলকাতায় সব ঠিক ঠাক করে বাড়ী ফিরেছে পরান | বাড়ী ফিরেই বড় মেয়েকে প্রায় কলকাতার মাহাত্ম্য নিয়ে পাঁচ পাতার পাঁচালী শুনিয়েছে আর বোঝাতে চেষ্টা করেছে কলকাতায় কত সুযোগ সুবিধা | শেষ পর্যন্ত সিনেমায় নিয়ে যাবার লোভ ও দেখিয়েছে | তাতেও কাজ না হতে নির্লজ্জ্ হয়ে মেয়ের কাছে নিজের নুন আনতে পান্তা ফুরনোর গল্প আর পান্তার অভাবে দুই বোনের ভবিতব্য নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনারও চেষ্টা করেছে , ঝুল পড়া কেরোসিনের লম্পে তার মুখের ছায়া ছায়া ভাষা বাচ্চা মেয়ের কাছে কতটা বোধগম্য হয়েছিল কে জানে !

২)

অনেকদিন পর আজ প্রচুর হালকা লাগছিল ইশানীর | ছয় মাস ধরে এই ইন্টার্নশিপ টার বেড়া টপকানোর চেষ্টা করছিল | এমনিতেই এই বিজনেস স্কুলে চান্স পায় প্রায় হাজার জনে এক জন , আর এরকম গোনা গুনতি জায়গা থেকেও এরকম কুলীন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কে ইন্টার্নশিপ পায় হয়তো একশ তে এক জন | অবশেষে গ্রুপ ডিসকাসন, ইন্টারভিউ , সাইকোমেট্রিক টেস্ট সব বাধা পেরিয়ে আজকের এই লক্ষ্য ভেদ | ওদের কলেজের চুয়ান্ন জনের মধ্যে ও একাই | এবার তিন মাসের ইন্টার্নশিপ করতে ওকে পাড়ি দিতে হবে, ওদের সদর দপ্তরে | যখন প্রথম ও এম বি এ করবে ঠিক করেছিল এত কিছু ভাবেইনি | পড়াশোনা তে ভালই ছিল ছোট থেকে , বিশেষ করে অঙ্কে | তাই যখন কিছুটা সিনিয়র দের দেখে আর কিছুটা নিজের ইচ্ছেতে ক্যাটের কোচিং এ ভর্তি হয় , ফিনান্স নিয়েই পড়বে ঠিক করেছিল | আজ এই খবর টা তার আরো নিজের সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস বাড়িয়ে দিলো | জুনিয়র রা এসেছিল ম্যাগাজিনের জন্য একটা ইন্টারভিউ নিতে | প্রথম এই কলেজের কোনো মেয়ে এখানে সুযোগ পেয়েছে | ফলে ও এখন বেশ লোভনীয় বিজ্ঞাপন কলেজের জন্য | ক্লাসের বাকিরা এসে ঈর্ষাতুর অভিনন্দন জানিয়ে চলে গেছে অনেকক্ষন | তার রুম মেট ও ইন্টার্নশিপ করতে গেছে মুম্বাই য়ে | কিছুক্ষণ একটা বই এর পাতা ওলটপালট করলো নিজের মনে | উত্তেজনায় ঘুম আসছে না | হঠাৎ কি মনে হতে নিজের ব্লগে শুধু একটা লাইন টাইপ করলো , মনে হচ্ছে আমি যেন আকাশে উড়ছি আজ , কিন্তু আকাশটা কি ভীষণ ফাঁকা ফাঁকা !

বাপী আর মম খবর পেয়ে তো খুবই খুশী , তার প্রথম ইন্টার্নশিপ এর মাইনেই ভারতীয় মুদ্রায় তার মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির এ ভি পি বাপীর মাইনের প্রায় দেড় গুণ | কিন্তু সবার মন ও খারাপ কারণ , জয়েন করতে হবে তিনদিনের মধ্যে | ফলে , এত বড় খুশী বাড়ীতে এসে সবার সাথে ভাগ করে নেওয়া এখন আর সম্ভব নয় | ভেবেছিল, একটা মেল করে এক সপ্তাহ বাদে জয়েন করবে , কিন্তু সিনিয়র রা সবাই বলল ওখানে কম্পিটিশন প্রচন্ড | যত আগে জয়েন করা যায় ততই ভালো | একবার যদি প্রি প্লেসমেন্ট অফার ( পি পি ও) পেয়ে যায় তাহলে মাইনের অঙ্ক টা অবিশ্বাস্য | মোটামুটি পাঁচ জনের জন্য একটা অফার আসার সুযোগ , মানে সব মিলিয়ে দশ জনের শিকে ছেঁড়ার সম্ভাবনা | এত হিসেব নিকেশ করে শেষমেষ পরের দিনের ভোরের কানেক্টিং প্লেন বুক করেই নিল ঈশানী | বাপী আর মম দুজনেই প্রচুর চিন্তায় ছিল মেয়ের একা বিদেশ যাত্রা নিয়ে , কিন্তু মেয়ের ক্রমবর্ধমান সাফল্য আর ও দেশেই থাকা ওর জ্যেঠার সাহস যোগানো দুয়ে মিলে বিশেষ কোনো জট বাঁধলোনা | শুধু বাপী বলে দিল পাসপোর্ট সাবধানে রাখতে আর মা প্রতিবারের মতোই মনে করিয়ে দিল তার মৃগীর ধাত আছে | লিস্ট করে দেওয়া ওষুধ গুলো যেন অবশ্যই খায় মনে করে |
এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে বুক ভরে একবার নতুন দেশের হাওয়া টেনে নিল ঈশানী | একদিন স্কুল বেলায় ম্যাপে মহাদেশে যে সব নতুন নতুন জায়গা দেখাতেন সার আর ওরা অবাক হয়ে ভাবতো তার ই মধ্যে একটায় আজ সে দাঁড়িয়ে আছে | ট্যাক্সিতে যেতে যেতে ঝকমকে শহর টাকে প্রান খুলে দেখে নিচ্ছিল আর ভাবছিল, হয়তো এখানেই তার নতুন জীবন শুরু হবে | জেট ল্যাগ পেরিয়ে ক্লান্ত ঈশানী ঘুমিয়ে পড়ল ট্যাকসিতেই | ঘুম ভাঙ্গলো একেবারে অফিস কোয়ার্টারে পৌছে | অবশ্য , কোয়ার্টার নামেই ….ঘর গরম রাখার ব্যবস্থা, আধুনিক আসবাব পত্র , ওয়াই ফাই সুসজ্জিত প্রায় পনেরোশ স্কয়ার ফিটের কামরা অপেক্ষা করছিল বিছানার উষ্ণতা নিয়ে যেন ওর জন্যেই | বাড়ীর সাথে একটা ছোট্ট ভিডিও কল সেরে ইন্টারকমে খাবারের অর্ডার দিয়েই বিছানায় গড়িয়ে গেল ঈশানী |

অফিসে রিপোর্টিং ছিল সকাল সাত টায় | সাঁইত্রিশ তলার ঝাঁ চকচক অফিসের পায়ের তলায় কুন্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে নতুন শহর | য়াকোরিয়ামের মত সাজানো শহরে পাশ দিয়ে ঝকঝকে নদী তে ঘুরে বেড়াচ্ছে আনন্দ ফেরি | কিন্তু এখন নতুন শহর উপভোগ করার সময় নয় | মোট ৬ জন এই অফিসে , আর ওদের গাইড একজন স্প্যানিশ নাম মিগুএল | দুজন ইউ এস থেকে , একজন ইংল্যান্ড আর জার্মানি , একজন হং কং ..একটা বেশ ছোট পৃথিবী | তবে ওদের সাথে আর কোনো মেয়ে নেই | খুব প্রাঞ্জল ভাবে মিগুএল যা বোঝালো তার সারাংশ , এর পরের তিন মাস ইন্টার্ন কোয়ার্টার আর অফিস ই জীবন | মোটামুটি ইন্টার্নদের কাছ থেকে কোম্পানি দিনে ১৫-১৬ ঘন্টা কাজ আশা করে, বেশী হলে আরো ভালো | বিশ্বের বিলিয়ন ডলার বটিক ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম এর মধ্যে একটা হলো এই কম্পানি । বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ওঠাপড়া নির্ভর করবে ইন্টার্নদের ওপরেই প্রায় |

এর পর সময় মেনে প্রাতরাশ বিরতি | সবাই সবার সাথে হাত মিলিয়ে নিয়ে নিজেদের পি পি ও প্রতিদ্বন্দী দের আরেকবার ভালো মত মেপে নিয়ে টেবিলে নিজেদের খাবারে মনোনিবেশ করলো | ওদের সাথে আলাপ করতে কোম্পানির সাত জন ভি পি ও এসেছিলেন | এদের রিপোর্টের ওপর ই নির্ভর করবে পি পি ও র সম্ভাবনা | ঈশানীর মনে পড়ল প্রথম দিন এম বি এ কলেজের ওরিয়েন্টেশনে ডিনের বলা কথা গুলো “ ডিয়ার অল , রিমেম্বার অলওয়েজ দ্যাট ইটস আ ডগ ইটস ডগ ওয়ার্ল্ড . দেয়ার উইল বি ব্লাড ইন দা ফ্লোর , এভরি ডে’’ | সেদিন হাসাহাসি করলেও আজ বেশ বুঝতে পারল ঈশানী , রিঙে ওঠার আগের ঘন্টা পড়ে গেছে |

৩)

অতএব নির্দিষ্ট দিনে স্টেশনে রওনা দিলো টুকি | আগের দিন অনেক বার করে বাড়ীর পিছনের কচুরিপানা ভরা পুকুর টাকে বলে এসেছিল , যেন কলকাতায় বেশিদিন না থাকতে হয় ওকে | স্টেশনে জগন্নাথ ও ছিল | দিদি ন্যাওটা দুই বোন স্টেশনে আসেনি, বুদ্ধি করে আগের দিন ই পাশের গ্রামে নিজের কাকার বাড়ীতে রেখে এসেছিল পরান | একজনের বয়স তিন , আরেক জনের দুই , তাই ওদের বোঝার ক্ষমতাও ছিল না যে কি হচ্ছে | তার যাওয়া টা নিশ্চয়ই খুব জরুরী এটা জেনেও গ্রামের পথ ঘাট গাছ পালা পাখ পাখালি তার হাত পা জড়িয়ে তাকে আটকাতে চেষ্টা করে ফলত স্টেশনে আরেক বার , আমি যাব নাগো বাবা বলতেই , তিতিবিরক্ত পরান একটা থাপ্পড় কষিয়ে দেয় আট বছরের মেয়েকে| এতেও চুপ না করে ফোঁপাতে থাকা মেয়েকে, যে কোনো একটা স্টেশনে নামিয়ে দেবার ভয় ও দেখায় | শেষ পর্যন্ত জগন্নাথই একটা পেপসি কিনে দিয়ে কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করে টুকি কে | এর পর ফাঁকা স্টেশন কে ধমকে ট্রেন চলে আসে সময় মতই, আর প্রায় ফাঁকা একটা কামরা বেছে নিয়ে তিনজনে বসে পড়ে | পরান আর জগন্নাথ বসে অনেক কথা বার্তা শুরু করে দিলেও সেদিকে টুকির মন ছিল না | সে এক মনে , বাইরের দিকে ছিটকে যাওয়া মাঠ, পুকুর বাড়ী ঘর দেখছিল | প্রতিটা নিশ্বাসের সাথে তার গ্রাম যত দূর থেকে দূরে চলে যাচ্ছিল , আর সে আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরছিল তার ছেঁড়া খোঁড়া ব্যাগ টা | ওতে একটা টুপি আর গোঁফ অলা , লাঠি ধরা একটা লোকের ছবি আছে | দিদিমণি বলেছে লোকটার নাম চাল্লি ,আর ব্যাগের ভিতরে তার টুকি টাকি জিনিস , দুটো পুতুল আর তিনটে ছবির বই | আসার সময় ওদের তিনজন কে কোলে পিঠে মানুষ করা বিধবা জেঠিমা , একটা কৌটো ভর্তি মোয়া আর নাড়ু ভরে দিয়েছিল | সেটাও একটা কোণে রাখা আছে ব্যাগের । মাঝে মাঝে ফাঁকা ট্রেনে দুলতে দুলতে ওটার মধ্যে ঠন ঠন আওয়াজ হচ্ছে যেন ওর রোগা মা তুলসী তলায় প্রদীপ দিয়ে ছোট ঘন্টা টা একবার নেড়ে দিচ্ছে |
ট্রেন যখন শিয়ালদা পৌছালো তখন প্রায় দুপুর । এত লোকজন দেখে ভয়েই সিঁটিয়ে যাচ্ছিল টুকি । এখানে হারিয়ে গেলে ও ফিরবে কেমন করে । বাবার হাত শক্ত করে ধরে শুধু ভাবছিল , উফ এত ভীড় দেখে বাবা যদি একবার বলে তোকে আর এখানে থাকতে হবে না, গ্রামেই ফিরে চ । কিন্তু, পরানের সেরম কোনো ব্যস্ততা ছিলনা । বরং ভাবছিল, কত তাড়াতাড়ি ফেরার ট্রেন ধরে বাড়ী ফিরবে | হাতে কিছু টাকা আসলে প্রথমেই প্রায় পড়পড় ঘরটা সরিয়ে নিতে হবে | আরো কিছু করতে হবে নিশ্চয়ই, কিন্তু তার মাথায় খুব বেশী পরিকল্পনা করার সাহস আর ক্ষমতা কোনটাই না থাকায় ভাবা বন্ধ করে দিয়ে আপাতত সে আবশ্যিক কাজে মন দিল | তিনজনের ই প্রবল খিদে পেয়েছিল তাই স্টেশনের ওখানে একটা ভাতের হোটেল এ খেয়েই ওরা রওনা দিলো বাবুদের বাড়ীর দিকে । জগন্নাথই পয়সা দিলো অবশ্য আর পইপই করে মনে করিয়ে দিল কলকাতায় সার আর মেডাম বলতে, ওটাই নাকি এখানে সবাই পছন্দ করে ।

ওরা যখন পৌছালো , তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে । ফাঁকা ফাঁকা জমির আশেপাশে দুটো একটা করে বাড়ী এদিক ওদিক ছড়িয়ে রয়েছে | যে বাড়ীটার সামনে এসে জগন্নাথ বলল এসে গেছি ,তত বড় বাড়ি এর আগে ও কোনদিন দেখেনি । দরজায় সোনালী হরফে নাম লেখা সুভাষ আর অতসী সেনগুপ্ত | দরজার পাশে লাগানো একটা বোতাম টিপতেই বাইরে থেকে শোনা গেল একটা মিষ্টি পাখী ডেকে উঠছে , অবিকল ওদের বাড়ীর পাশের গাছটায় আসা কোকিল টার মত | দরজা খুললেন যিনি তাকে দেখতে বেশ অঙ্ক দিদিমনির মতো, কিন্তু চুল কি ছোট করে ছাঁটা | কাকা আর বাবা কে দেখেই বুঝতে পারল, যে ইনিই মেডাম , প্রণাম করতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই ওকে বারণ করে থুতনি টা নেড়ে মেডাম বললেন বাহ বেশ মিষ্টি মেয়ে তো | এরপর ওদের বাইরের ঘরে বসিয়ে টুকিকে জিজ্ঞেস করলেন কি কি কাজ করতে পারে , স্কুলে পড়েছে কিনা এই সব টুক টাক । উত্তর দেবে কি , ও তো অবাক হয়ে দেওয়ালে , কাঁচের আলমারিতে সাজানো কত পুতুল দেখছিল । ওর কাছে এত সুন্দর পুতুল নেই। না, বড় হলেই এরম আরো কয়েকটা সুন্দর পুতুল কিনতে হবে মনে মনে ঠিক করে রাখল টুকি । বাইরে নারকেল গাছ থেকে দুটো কাঠবেড়ালী ডাকাডাকি করছিল , ওদের গ্রামের হলুদ পাখী টাকেও দেখতে পেল টুকি | এমন সময় ঘরের ভেতর থেকে একটা ওর বোনের বয়সী কিন্তু খুব সুন্দর সাজু গুজু করা একটা মেয়ে এসে ম্যাডামের কোলে মমি মমি বলে ঝঁপিয়ে পড়ল | চোখ মুখ ফোলা ফোলা , ঘুমোচ্ছিল নিশ্চয়ই | মেডাম মেয়েটার চুল নেড়ে ঘেঁটে বললেন , এই দিদিটা আজ থেকে এখানেই থাকবে ঝুনু | শুনে পরান খুবই কৃতার্থ বোধ করলো | দুটো হাত কচলে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে ম্যাডামের দিকে একবার, একবার জগন্নাথের দিকে দেখল আর আদর দেখে টুকির বুকটা মায়ের জন্যে কেমন একটা গিট্ পাকিয়ে গেল | মেডাম উঠে ভিতরের ঘরে চলে গেলে টুকি কিরম ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে দেখে, পরান ওর হাতে যত্নে জমানো একটা ১০০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলল, মন দিয়ে কাজ কর্ম শিখে নিস | মেডাম যা বলবে চুপচাপ শুনবি | আমি আসতে না পারলেও তোর কাকা মাঝে মাঝেই আসবে | এর পর কি বাবার চোখটাও একটু ছল ছল করে উঠলো ,নাকি ওর চোখে জল বলেই এরম মনে হল কে জানে | ভিতরের ঘর থেকে বেরিয়ে মেডাম পরানের হাতে একটা খাম দিতেই পরানের মনে পড়ে গেল ফেরার ট্রেন ধরতেই হবে এখন, তাই প্রায় ছুটেই জগন্নাথ কে নিয়ে বেরিয়ে গেল |
আর টুকির মনে হলো এত বড় শহরে ও পুরো একা হয়ে গেল আজ | মা এর কথা মনে পড়ছে খুব |

৪)

প্রথম দিন বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট এর লোকের সাথে দেখা করে, ফর্ম ফিলাপের মধ্যে দিয়ে কেটে গেল | আর তার পরের দিন থেকে দিন গুলো মোটামুটি ছুটতে লাগলো আলোর বেগে | রোজ সকালে সাড়ে সাত টায় তে অফিসে চলে আসা লাগোয়া কোয়ার্টার থেকে | ওখানেই অফিস ক্যান্টিনে কফি , চা ও ঢালাও প্রাতরাশের বন্দোবস্ত | কিন্তু, অত আয়েশ করার সময় থাকে না মিনিট দশ পনেরোয় ই খেয়ে দেয়ে লেগে পড়তে হয় কাজে | স্টক মার্কেট খোলার আগেই সমস্ত আর্থিক বিশ্লেষণ করে রাখতে হয় | তার পর ক্রমাগত কম্পুটার এর দিকে নজর রাখা আর বড় বড় পর্দায় দেশবিদেশের বাজারের সূচকের ওঠা পড়া পর্যবেক্ষন করা |এই করতে করতে মধ্যাহ্নভোজের সময় হয়ে যায় | আধ ঘন্টা বরাদ্দ , তাও ইন্টার্ন দের জন্য | বাকিরা নিজের অফিস ডেস্কেই খেয়ে নেয় সময়ের অভাবে | এই আধ ঘন্টাই দিনের একমাত্র সময় যেখানে ইনটার্ন দের একে অপরের সাথে দেখা হয় | কেউই কারো ব্যক্তিগত অনুভূতি উন্মুক্ত করে দেখাতে প্রস্তুত নয় , তাই নিজেদের বিভিন্ন রিপোর্টের কাজ কদ্দুর এগোলো না এগোলো ছাড়া অন্য কোনো পারস্পরিক আলোচনা হয়না | তবে এর মধ্যেই এরিক কে বেশ আলাদা লাগল ঈশানীর | কিছুটা ছটফটে , সোনালী চুলের এরিক কে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কের চেয়েও বেশী মানাত ফুটবল মাঠে | ড্রেসডেনে ওদের বাড়ীর কথা শুনে ,ছবি দেখে জার্মানি যাবার ইচ্ছে বেড়ে গেল ওর |

প্রথম দিন এই ভাবে দুপুরের খাওয়া শেষ করে অফিসে ফিরেই কনফারেন্স রুমে দুটো গ্লোবাল ভিডিও কনফারেন্স | এর পর একটা আই পি ও লন্চ নিয়ে প্রচুর তর্ক বিতর্ক চলল ৫ টা অবধি | তারপর একটা জটিল ফিনান্সিয়াল মডেল তৈরির কাজ | সেটা একটা জায়গায় আনতে আনতে রাত ১২ টা | তারপর অফিসের গাড়ী ওকে আবার কোয়ার্টারে পৌছে দিল |

পরের দিন সকালে অফিসে এসে জানতে পারল একটা শাঁসালো ক্লায়েন্ট এর জন্য পিচ বুক বানাতে হবে পরের দিনের মধ্যে | সেদিন সন্ধ্যে হয়ে গেল ওটা বানাতে বানাতেই | তার পর ফিনান্সিয়াল মডেলের রিভিউ মিগুএলের সাথে শেষ করে কোয়ার্টারে পৌছালো যখন , রাত প্রায় দুটো | তখনও অত্যাধুনিক আলোয় আলোয় পুড়ে যাচ্ছে শহরের এদিক ওদিক | সারাদিনে দুটো বিস্বাদ স্যান্ডউইচ , পাঁচকাপ ব্ল্যাক কফি আর দুটো আপেল ছাড়া কিছুই খাওয়া হয়নি | কোনরকমে মুখে চোখে গরম জল দিয়ে বিছানায় একটা বস্তার মত গড়িয়ে গেল ঈশানী | আর ঘন্টা চারেক ঘুমানোর সময় মোটে | তারপর ই আবার গাড়ী আসবে অফিস নিয়ে যেতে |
সেদিন সকালে অফিসে এসে জানলো একটা চুক্তির কিছু টুকটাক টেকনিক্যাল দিক ঠিক করার জন্য যেতে হবে অন্য শহরে ,একটা আইনি সংস্থার সাথে মিটিং এ ,সাথে একজন সিনিয়র ভি পি | সকাল দশ টায় যখন প্লেন ধরল, শহর তখনও বেশ ঠান্ডা | ভি পি খুবই পেশাদার, কি কি নিয়ে আলোচনা করতে হবে তার একটা ছক প্লেনে যেতে যেতেই বানিয়ে ফেললেন ব্রেকফাস্ট করতে করতে | তারপর মিনিট ৪৫ এর উড়ান শেষে , বারোটা থেকে মিটিং যা শেষ হল প্রায় চারটেতে | প্লেন যখন আবার ফেরত উড়ান দিল, ঈশানী ঘুমিয়ে কাদা | তারপর সেখান থেকেই আবার অফিস, কিছু বকেয়া প্রেসেন্টেশন ঘষা মাজা করতে করতে রাত প্রায় এগার টা |
এই ভাবেই , প্রচুর রিসার্চ , তথ্য কাটাকুটি , মিটিং , প্রেসেন্টেশন ভরা দিন গড়িয়ে সপ্তাহে পৌছালো | রবিবার ছুটি, তাই অল্প কিছু রিসার্চ আর সংখ্যা নাড়াচাড়া করে বিকেলে একটু খালি হলো ঈশানী | একটা ঝলমলে নতুন শহর বাইরে তার পায়ের অপেক্ষায় বুক পেতে শয়ান ছিল, কিন্তু এত ক্লান্ত লাগছে কোথাও বেরোনোর ইচ্ছেই হলো না | হিসেব করে দেখেছে, এই সপ্তাহে সে মোট অফিসে কাটিয়েছে একশ পাঁচ ঘন্টার একটু বেশি| গরম জলে লম্বা চান সেরে সামনের একটা হোটেল থেকে জমকালো একটা মিল অর্ডার করে , ব্লগে একটা লাইন লিখল ঈশানী ‘উড়ান এখন ক্লান্ত ’ | কিন্তু , এখনো এগার সপ্তাহ টিঁকতে হবে তাকে এখানে | আজ বাবা মার সাথে স্কাইপে কথা বলল কিছুক্ষণ , তার প্রবল ব্যক্তিত্বশালী মায়ের গলাও স্তিমিত লাগলো ফোনে |

৫)

এই ভাবে টুকির নতুন জীবন শুরু হল এক অজ মফস্বল থেকে ঝাঁ চকচকে শহরে । শহরের এদিক টাতে তাও একটু গাছ গাছালী টিঁকে আছে । কাঠবেড়ালী আর পাখীদের হুল্লোড়ে নিজের গ্রামের জন্য খুব খুব মন কেমন করলেও প্রথম প্রথম তার বেশ ভালো লাগত সকাল গুলো । এর পর যবে থেকে আস্তে আস্তে ঘরের মেয়ে আর কাজের মেয়ের মধ্যের তফাতটা বুঝতে শুরু করলো। এটাও বুঝতে পেরে গেল যে বাড়ীর আসল মালকিন মেডাম আর সেখানে , পান থেকে চুন খসলেই বিপদ | ফলে খুব সাবধানে থাকতে হয় | । সার বেশীর ভাগ দিন ই টুরে যান , যেদিন থাকেন বাড়ীতে সকালে বেরিয়ে যান আর ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা সাড়ে এগারোটা|

নিজের বাড়ীতেও অনেক কাজ ই করতে হত টুকি কে, তাই কাজ বুঝে নিতে খুব একটা সুবিধে হলো না | কিন্তু, অসুবিধে হয় মেডাম এর মন মেজাজ বুঝতে । এই হয়তো এসে নরম গলায় জিজ্ঞেস করছে , সব ভালো লাগছে কিনা আবার পরের মিনিটেই হয়ত এক গাদা জামাকাপড় এনে সামনে ফেলে দিল । একটা মেশিন আছে কাপড় কাচার , কিন্তু মেডাম বলে হাত দিয়ে না কচলে পরিষ্কার হয়না । আর তা না হলেই তুমুল বকাবকি । আর রেগে গেলে মেডামের সামনে বাবু ও মানে সার ও থাকতে সাহস করেনা । ঝুনু তো ওই টুকু বাচ্চা , স্কুলের পড়া তো টুকিও কতদিন করেনি । কিন্তু, একদিন স্কুলে কি নাকি চিঠি পাঠিয়েছিল , তাতে ওকেও মেডাম কি বকাই বকলো । শেষে একটা স্কেল দিয়ে দু ঘা দিয়েও দিল, বাঁচাতে গিয়ে টুকি ও খেল একটা জোর বাড়ি । এত রাগী ওর স্কুলে কোনো দিদিমনিকেও দেখেনি টুকি । কিন্তু, তার পরেই আবার সব ঠান্ডা , মেয়ে কে আদর করে একশা মেডাম । কি অদ্ভূত ।

এর দুদিন বাদেই প্রথম মার খেল টুকি ও | বসার ঘরে একটা বড় টিভি আছে মেডামের খুব শখের | তো সেটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করছিল ও | এত তার এদিক ওদিক জড়ানো ছিল, ওর মধ্যে দিয়ে এদিক ওদিক করে কাজ করা | হঠাৎ ওর পা জড়িয়ে গেল একটা তারে , সাথে আরেকটা অল্প ভারী বাক্স মত জিনিস প্রায় ফুট তিনেক উঁচু থেকে মাটিতে পড়ল আর ঢাকনা ভেঙ্গে ভিতর থেকে আরো কিসব বেরিয়ে পড়ল| আওয়াজ শুনেই ভিতর ঘর থেকে মেডাম বেরিয়ে নিজের মাথা চাপড়ালো প্রথমে তার পর ওকে নিয়ে পড়ল | ওটা নাকি হার ডিস্ না কি , খুব দামী আর দরকারী | বেশ কয়েক ঘা পিঠে মাথায় পড়ার পর সাবধান করে দিল, এর পরে ভুল হলে ভাগ্যে আরো দুঃখ আছে | খুব ভয় পেয়ে প্রথমে ব্যথা বুঝতেই পারেনি , তবে শরীর টাটিয়ে উঠলো রাতের বেলা | কিন্তু, যতই হোক গ্রামের খোলা মাঠে খেলা ধুলা করা শরীর, সকালে উঠে দেখল গায়ে ব্যথা নেই | কিন্তু মারের দুঃখ আর লজ্জা টা যেতে সময় লাগলো অনেক বেশী |

এই ভাবেই মাস তিনেক কেটে গেছে | বাবা দু একবার এখানে ফোন করেছিল , কিন্তু মেডাম বলেছে অত ফোন যেন না করে | তাই এখন মাসের শেষে জগাকাকা আসে , আর মাইনের টাকা নিয়ে যায় | কাকাকে অনেকবার ও বলার চেষ্টা করেছে, যে ওর ভালো লাগছেনা ..কিন্তু মেডাম সামনে থাকে বলে ভয়ে কিছু বলতে পারেনা ও | পুজো আসতে এখনো তিন মাস বাকি , তখন কি বাড়ী যেতে পারবে আর | তবে এখন বাড়ীতে কাজের ব্যপারটা ওর কাছে একটা রুটিন হয়ে গেছে বেশ | রোজ সকালে পাঁচ টায় ওঠা, উঠে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে , রাস্তা থেকে দু বালতি জল এনে জামা কাপড় কাচা , ঘর দোর ঝাঁট দেওয়া মোছা আর তার পর বাজারে যাওয়া , এসে সব্জী কোটা | তারপর ঝুনু কে স্কুল এ দিয়ে এসে ফেরা ম্যাডামের পা হাত টিপে দেওয়া | তার পর একটু ভাত তরকারী আর খুশি থাকলে মাছ বা চিকেন ও পাওয়া যায় | তবে মেডাম মাঝে মাঝেই ওকে বেশী খাওয়া নিয়ে মুখ করে | বাড়ীতে তো এর থেকে বেশিই ভাত খেত ও | কিন্তু কি আর করা | এর পর ঝুনু দিদি মনি চলে আসলে ওকে নিয়ে আঁকার ক্লাসে নিয়ে যাওয়া | ওখানে সবাই কত সুন্দর রং নিয়ে ছবি আঁকে | স্কুলে ও খুব ভালবাসত ছবি আঁকতে , মনে পড়ে যায় সে কথা | তার পর ক্লাস শেষ হলে বাড়ী নিয়ে আসা , সপ্তাহে তিন দিন আবার সাঁতার ক্লাসে নিয়ে যাওয়া | এসব শেষ করে সন্ধে বেলা তার এত খিদে আর ঘুম পায় যে নড়াচড়া করতেই ইচ্ছে করেনা | একদিন ঝিমোচ্ছিল বলে ম্যাডাম এসে খুব জোরে চুল টেনে দিয়েছিল | লেগেছিল খুব | তবে ওর আরো অসুবিধে হয়, সার থাকলে | সার এমনিতে মাটির মানুষ , বাড়ীতে থাকলে বোঝাও যায়না | কিন্তু সার বাড়ী ফিরে খেতে খেতে প্রায় বারো টা তার পর সব ধুয়ে মুছে তুলে রাখার পর সকালে ঘুম কিছুতেই ভাঙ্গতে চায়না | তার মধ্যে ওর সিঁড়ির নীচের ঘরটায় টিকটিকির উপদ্রব খুব | টিকটিকিকে খুব ভয় পায় ছোট বেলা থেকেই , তার মধ্যে ঘর টা স্যাঁত সেঁতে, হাওয়া ঢোকেনা | এর মধ্যেই ও ক্লান্তিতে প্রতিদিন ঘুমিয়ে পড়ে | ঠান্ডা লাগে বলে একদিন একটা চাদর চেয়েছিল , কিন্তু ম্যাডামের কাছে এখন কোনো ওকে দেবার মত চাদর নেই বলে , এমনি ই শুতে হয় ওকে গুড়ি শুরি মেরে | ব্যাগের মধ্যে তার পুতুল গুলো খালি খালি পড়ে থাকে খেলার সময় আর হয়না | শুধু ছেঁড়া ব্যাগ থেকে থেকে উলোঝুলো টুপি পড়া চাল্লি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকে | কতদিন বোন দুটোর সাথে দেখা হয়না , ওরাও কি দিদি কে ভুলে গেছে একদম | বাবা তো আসেনা , তাই আগের সপ্তাহে মাইনে নিতে আসা জগাকাকা কেই বলেছে যে ওর এখানে থাকতে একটুও ভালো লাগে না কিন্তু জগা কাকা আমতা আমতা করে চলে গেল কিছুই না বলে |

৬)

এভাবেই আরো মাস দুই কেটে গেলো | ঈশানীর ওজন কমেছে প্রায় সাত পাউন্ড , চোখের নীচে কালো ছোপ | অফিসে অবশ্য সেটা দেখে বোঝার উপায় নেই , তার কাজে যে সবাই খুশী সেটাও বোঝা যায় অল্প অল্প | শহরে ঠান্ডা বাড়ছে আরো | বরফ পরা শুরু হয়েছে রাতে | এত ঠান্ডায় মৃগী আরো বেড়ে না যায় , এই ভয় ও হচ্ছে মাঝেমাঝে | তবে আর এক সপ্তাহ মোটে | পি পি ও একবার পেয়ে গেলে, আর কিছু ভাবতে হবেনা |
আজ মঙ্গল বার , অফিস থেকে একটা মেল পেল, পিচবুকটা খুব ভালো হয়েছে জানিয়েছেন ভি পি | সামনের কাঁচে বরফের ধোঁয়া জমা হচ্ছে অল্প অল্প | নীচের সবুজ মাঠে বরফের চাদর | টিভিতে বরফ ঢাকা দেখতে খুব ভালো লাগত, কিন্তু এখানের এই ধূসর শহর কি হতাশাময়, প্রাণহীন | একটু রোদ উঠলে ভালো লাগতো | আজ অফিসে কাজের চাপ একটু কম, তাই অনেক রকম ভাবনা এসে জড়িয়ে যাচ্ছিল | একটা হেড কোয়ার্টার থেকে ডকুমেন্ট আসার কথা ছিল সেটার জন্য অপেক্ষা করতে হলো অনেকক্ষণ | দু একটা ফিনান্সিয়াল কাটা ছেঁড়া শেষ করে বেশ হালকা মনে আজ কোয়ারটারে ফিরল ঈশানী | মনে হচ্ছে পি পি ও টা পেয়ে যাবে পেলে একবার জার্মানি টাও ঘুরতে হবে | এরিক এর সাথে ঘরে ফিরে মাঝে মাঝেই কথা বলে | ওখানে শীতকাল আরো তীব্র কিন্তু আরো বিষাদ সুন্দর | বাভারিয়ান আল্প্স এ জমে থাকা সময় , সাথে হয়ত ও আর এরিক | নিজেই হেসে ফেলল ভাবতে ভাবতে …এত রোম্যান্টিক চিন্তা ভাবনা তার মগজে জমা হলো কি করে কে জানে, খরচ করবে কি ? নাকি জমিয়ে রেখে দেবে কোনো অদেখা অসময়ের পুঁজি হিসেবে |
ঘরে ফিরে ও অনেক দিন বাদে ল্যাপটপে ওর একটা খুব প্রিয় গান চালালো | ইগলস এর দা লাস্ট রিসর্ট | খুশী খুশী …চারিদিকে ঝরে পড়ছে যেন

‘’ She came from Providence,
the one in Rhode Island
where the old world shadows hang
heavy in the air
She packed her hopes and dreams like a refugee
Just as her father came across the sea’’

এবার শুধু একটা গরম জলে স্নান করে নেওয়া | নিজেকে খুব ঝরঝরে লাগছে |
বাথটাবে গরম জল চালিয়ে নিজের অনাবৃত শরীর দিয়ে গড়িয়ে নামা একেকটা ফোঁটা কে দেখছিল ঈশানী | শরীরটা যেন ছেড়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে | মনে হচ্ছে যেন শুয়ে পড়বে এবার | কিরম একটা ঝাপসা লাগছে সব কিছু, বমি পাচ্ছে | লক্ষণ টা চেনে ও | খিঁচুনি আসবে আবার ……কিন্তু ভ্যালিয়াম এর পিল টা বাইরের ব্যাগে | মাথা ঝাঁকিয়ে উঠতে গিয়ে দেখল , পায়ে জোর নেই যেন , ফাঁকা ফাঁকা লাগছে কেমন | কোনরকমে দেওয়াল ধরে আবার বসে পড়ল বাথটবের মেঝেতে | বাইরে জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছে তুলো তুলো বরফ ফুলের মত নেমে আসছে আলোকিত শহরের বুকে | গরম লাগছে …মাথা যেন পালকের মত হালকা হয়ে আসছে, উড়ে যাবে এবার | নিজের হাত পা আর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই ….দূর থেকে কি ঘন্টা বাজছে কোথাও| ভীষণ ভয় লাগছে ওর | বাপী , মম তোমরা এত দূরে কেন | ফোন টা পড়ে আছে বিছানার ওপরে, পৌছাতে পারবে কি আর ওই অবধি | ওকি মারা যাচ্ছে ..শরীর জুড়ে একটা শিরশিরে অনুভূতি উঠে আসতে চাইছে ..চোখের আকাশে ভীড় করে আসছে তীব্র অথচ শান্ত ঘুম মেঘ | পায়ের নীচ থেকে উঠে আসছে জলের উষ্ণ ঢেউ | আস্তে আস্তে পায়ের আঙ্গুল ডুবছে.. ওহ মম ….
শোবার ঘরে তখন ও গান চলছে রিপিট মোডে

“ They call it paradise
I don’t know why
You call someplace paradise
Kiss it goodbye..’’

৭)

এভাবেই টুকি র জীবনে রাত দৌড়িয়ে ভোর , ভোর হামাগুড়ি দিয়ে দিন দুপুর আর আবার সন্ধ্যে মাড়িয়ে রাতের আনাগোনা চলতে থাকে | আর এর ই মাঝে মাঝে একঘেয়ে কালি তে লেখা হতে থাকে তার রোজনামচা | ডায়রি লিখলে , টুকি লিখতই এই সব কাজের মধ্যে তার সবথেকে অপছন্দ ভোরে উঠে গরম আলু আর ডিম ছাড়াতে | কিন্তু উপায় নেই ,কেননা ঝুনু দিদিমনির ব্রেকফাস্টে বেশির ভাগ দিন ই ডিম পছন্দ সাথে আলু সেদ্ধ আর গোলমরিচ | তবে ডিম সিদ্ধর একটা কারিকুরি আছে আবার, ডিম হতে হবে হাপ বইল, মানে অল্প গলা সুজ্জি মামার মত কুসুম নইলে মোটেই পছন্দ হবে না | সেদিনও সকালে ডিম সিদ্ধ হচ্ছে এমন সময় তেড়ে বৃষ্টি | বাড়ীতে এরম বৃষ্টি হলে ও কখনই ঘরে থাকত না , হুল্লোড় করতে বেড়িয়ে যেত বন্ধুদের সাথে | বা দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে বৃষ্টির ঝাপসা চাদর নেমে আসা দেখত মন দিয়ে | ভিজে মাটির গন্ধে , তার মায়ের শরীরের গন্ধ এসে মিশত যেন | আর এখানে বৃষ্টি আসলেও ওকে দৌড়াতে হয়, তবে সেটা মেলে দেওয়া কাপড় যাতে আবার ভিজে না নেতিয়ে যায় সে জন্যে |

সেইদিন দৌড়ে ছাদে গিয়ে আগেরদিন রাতে মেলা জামা কাপড় আনতে গিয়ে ডিম টা একটু বেশী সিদ্ধ হয়ে গেছিল | তখন বোঝেনি ব্যাপারটা , কিন্তু দিদিমনি স্কুলে টিফিন খেতে পারেনি | সেটার রেশ যে এদ্দুর যাবে সেটা কি আর টুকি ভাবতে পেরেছিল ? বিকেলে স্কুল বাসে ফেরার পরই টিফিন বক্স না খুলেই মেডাম বুঝতে পারলো টিফিন বক্স ফাঁকা নয় | তারপর ঝুনু কে জিজ্ঞেস করেই আর কোনো কথা না বলে শুরু হলো মার | প্রথমে হাত দিয়ে, আর তার পরে হাত ব্যথা হয়ে গেলে চুল টেনে একটা সাড়াশি দিয়ে | এরম মার বাবা র হাতেও কোনদিন খায় নি টুকি , মাথা ঝনঝন করছিল । প্রথমে একটু খানি মাগো , আর করব না , আর মেরোনা মেডাম বলে চেঁচানোর চেষ্টা করলেও অল্প পরেই মাটি তে শুয়ে ছটফট করছিল টুকি আর পিঠ জুড়ে ফুটে উঠেছিল ডাগর ব্যথার মানচিত্র | এর মধ্যে ঝুনু ছুটে এসে মাকে ঠেকানোর চেষ্টা করছিল কিন্তু ওরও তো ঐটুকু শরীর | মাঝখান থেকে ও বেচারাও খেয়ে গেল ঘা কতক | মেডামের রাগ অবশ্য তখনো পড়ে নি , গজরাতে গজরাতে বলছিল এ মাস গেলেই ছাড়িয়ে দেব এটাকে , এত বড় মেয়ে তবু একটা কাজ ও যদি ঠিক করে করতে পারে | রোজ রোজ কিছু না কিছু ভুল করবেই , একটা অকম্মার ঢেঁকি জুটিয়েছি গ্রাম থেকে | টুকি ওই ব্যথার মধ্যেই মনে মনে বলছিল , মেডাম যেন সত্যিই ওকে আর না রাখে | ও এবার বাড়ী যাবেই | আর কারো কথা শুনবেই না। কান গরম হয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছিল যেন হু হু করে , ঠিক ঠাক বুঝতে পারছিল না তবু শুনতে পারছিল মেডামের গজরানি ” আজ রাতে খাবার পাবিনা , বাচ্চা মেয়েটা যেমন দুপুরে খেতে পায়নি তুইও রাতে খাবার পাবিনা | দেখি তবে যদি তোর শিক্ষা হয় | ”

সেই রাতেই ধূম জ্বর এলো তার | সোঁদা মাটিতে শুয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে প্রবল কান্নায় ফুলে উঠছিল তার ছোট্ট শরীর | দুপুরে ডিম খেতে পারেনি স্কুলে তাই আজ দিদিমনির জন্য স্পেশাল খাবার এসেছে, পিজা | তার পাকস্থলী ওলট পালট হয়ে যাচ্ছিল সেই গন্ধে | আধ স্বপ্নে সে তার মাকে দেখছিল | রাতে মা ওদের সবাই কে খেতে দিয়েছে , ভাত ডাল আলু পেয়াঁজ সিদ্ধ | সেই ধোঁয়া উঠছে লন্ঠন ঘিরে | আজ আবার বাবা মাছ এনেছে | মা নিজের হাতে ওকে খাইয়ে দিচ্ছে | বলছে, টুকু খুব খিদে পেয়েছে না , আয় এটুকু খেয়েনে দেখি শিগগিরই |
বাইরে কি ঘরের দরজা খুলে কেউ ওকে দেখতে চেষ্টা করছে , কে ঝুনু দিদিমনি ? মেডাম ও কি ওকে চেঁচিয়ে ডাকছে , আবার কি মারবে ? কিন্তু, যতই ডাকুক ও খুব ক্লান্ত , একটু ঘুমোতে হবেই এবার | এই তো মা বসে আছে পাশেই ও নিজের মাথা টা বাড়িয়ে দিল মায়ের কোলের দিকে | তারপর আরামে চোখ বুজলো , মা , মা গো |

৮)

অতসী আর সুভাষ যখন শহরে পৌছালো , তখন বৃষ্টি পড়ছে | তীক্ষ্ণ ছুরির মত হাওয়া যেন কেটে দিচ্ছিল চামড়া | কিন্তু, ওদের দুজনের পাথর দেহে কোন দাগ বসানোর ক্ষমতা ওই হিমাঙ্কের নীচের হাওয়ার ও ছিল না আজ| প্রথম বিশ্বের আলোকোজ্জ্বল ঝলমলে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তার সবটুকু প্রসাধন দিয়েও মুছে দিতে পারছিল না চরাচর ব্যাপী ধূসরতা | অবশ্যম্ভাবী সত্য টাকে মুখোমুখি দেখার ক্ষমতা ওদের দুজনেরই ছিল না | তবুও, হয়তো কোনো বিপরীত শক্তিই ওদের টেনে নিয়ে যাচ্ছিল নির্দিষ্ট ঠিকানায় |

বিমান বন্দরে ওদের অপেক্ষাতেই ছিলেন এক দীর্ঘাকৃতি বিষন্ন মানুষ | সুবিনয় এ দেশের নাগরিক প্রায় দেড় দশকের ওপর | ঈশানী তার জ্যেঠুর বাড়ীতে যাবার সময় পায়নি , কিন্তু স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে সাড়ে চারশ মাইল গাড়ী চালিয়ে এসে তাঁকেই দেহ সনাক্ত করতে হয় ইশানীর কর্মস্থলের ফোন আসার পর | গাড়ী নিয়ে উনি ই ওদের দুজন কে নিয়ে পৌছালেন হোটেলে | সেখানে কিছুটা জোর করেই কফি আর কেক খাওয়ালেন দম্পতিকে |

কোম্পানীর এক পদস্থ কর্তা, দক্ষিন ভারতীয় মানুষ ওদের হোটেলে এসেছিলেন সমস্ত কাগজ পত্র বুঝিয়ে, সমস্ত পাওনা টাকার হিসেব দিয়ে দিতে | দৃশ্যত অপ্রতিভ এবং মৃদুভাষী শ্রীনিভাসন বলে যাচ্ছিলেন কোম্পানীর একজন এত মূল্যবান কর্মচারীর মৃত্যুতে তাঁরা কত শোকার্ত , অল্প দিনেই ঈশানীর সবার আস্থাভাজন হয়ে ওঠা আর কিভাবে তার এই অকাল মৃত্যু তাঁদের সবাইকে হতভম্ব করে দিয়েছে এই সব ব্যাখান| ওদের কানে কিছুই ঢুকছিল না এসব | শুধু মনে পড়ছিল শেষ ফোন কল, মেয়ে বলছিল খুব ক্লান্ত লাগছে কবে যে শেষ হবে এই ঝামেলা আর কবে যে তোমাদের কাছে যাব কে জানে | দুজনেই নিজেকে দোষী ঠাওরাচ্ছিল হয়তো , আর অন্যের মুখে সেই অভিযোগের প্রতিফলন দেখতে পাবার ভয়ে অপরের দিকে মুখ তুলে তাকানোর সাহস পাচ্ছিল না কেউই |

অতসীর শুধু খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ছুটে গিয়ে কফিন টা খুলে ঈশানীর মুখটা দেখতে , মেয়েটার ঠান্ডা সহ্য হয়না একদম | ওই ঠান্ডা জমাট বাক্সে ও কি নীল হয়ে গেছে একদম |
দূতাবাসের সাহায্য পেয়েছিল প্রচুর , কফিনে শুয়ে থাকা ঈশানীর দেহ টা | এবার ওরা বডি নিতে যাবে , তারপর বিমানবন্দরে জরুরী ছাড়পত্রের জন্য দরকারী সমস্ত নথিও ঠিক করে রেখেছে কোম্পানি | পাকা কাজ | খুব কুন্ঠিত ভাবে সব কাগজ পত্র গুছিয়ে দিয়ে, হাতের ব্যাগ থেকে একটা চেক বার করলেন শ্রীনিভাসন আর বললেন স্যার একটু সাইন করে দিন এই কাগজ গুলোতে, এতে সমস্ত নমিনেশন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ আর যা যা পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে | একটু বুঝে নিন প্লিজ | সুভাষের ভাবলেশহীন মুখ দেখে উনি চোখ ধাঁধানো অঙ্কের চেক টা এবার বাড়িয়ে দিলেন বিস্ফারিত চোখ অতসীর দিকে |


৯)

প্রায় কুড়ি বছর পর আবার কলকাতার ট্রেন ধরল পরান | বড় মেয়েকে এখানে চিরকালের জন্য রেখে যাওয়ার পর প্রথমবার | এ শহরে দূষিত বাতাসে মিশে আছে সেই ছোট্ট শরীরের ছাই | আজ সেই শহরে পা পড়বে তার ছোট বোনের | দিদির পড়াশোনার স্বপ্ন পূরণ করার চেষ্টা করেছে পারু , মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিকে জেলার মধ্যে প্রথম তিরিশ জনের মধ্যে এসেছে নিজের সমস্ত প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে | অবশ্য এসবের পিছনে যে দুজনের হাত সবথেকে বেশি , তা হল জগা আর স্কুলের মিত্র দিদিমনি | নইলে , মেয়ের এতদূর পড়াশোনা টানার ক্ষমতা হতো না পরানের , যতই ইচ্ছে হোক | আজ এত আনন্দের দিন , কিন্তু জগা ওদের সাথে কলকাতায় আসতে চায়নি | যে অপরাধের রাসায়নিক পরানের ফুসফুস ঝাঁঝরা করে দিয়েছে এতদিন ধরে , তার অভিঘাত জগা কেও এফোঁড় ওফোঁড় করেছে, বুঝতে পারে পরান | এমনকি, যে স্কলারশিপ পেতে আজ পারু, কলকাতা যাচ্ছে তাও হয়ত জগার সহায়তা না থাকলে পেতনা | এবারেই এই স্কলারশিপ দেওয়া শুরু হয়েছে, আর প্রাপক পনের জনের মধ্যে তার মেয়েও একজন| সমস্ত প্রাপক দের ডাকা হয়েছে সম্বর্ধনা দেবার জন্য | ভাবতেও গর্বে তার হাড়সম্বল বুক গর্বে ফুলে ওঠে | বাবা আর মেয়ের মধ্যে কোনো কথা হয়না অবশ্য , ঝাপসা হতে থাকা দৃশ্যপটের মধ্যে দিয়ে ট্রেন শিয়ালদা এসে পৌছায় | জন মিছিলে হারিয়ে যায় দুটো গ্রাম্য শরীর , বাবার হাত টা দৃঢ় মুঠোয় ধরে রাখে পারু, বুড়ো মানুষ টা ভীড়ে হারিয়ে না যায় |

মিনিট পনেরো র সংক্ষিপ্ত ভাষণ শেষ করে , অভ্যেস বশত ঠোঁট টা একবার চেটে আসন গ্রহণ করলেন উপাচার্য | তাঁর ঘোষণার সারমর্ম , প্রতিবছর কিছু মেধাবী আর দুস্থ ছাত্রছাত্রী কে এককালীন ঈশানী স্মৃতি স্কলারশিপ ও শংসাপত্র তুলে দেবার লক্ষ্যে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ থেকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দান করলেন মহানুভব সুভাষ ও অতসী সেনগুপ্ত | এই প্রচার বিমুখ শিক্ষাব্রতী দম্পতি কে অকুন্ঠ ধন্যবাদ এবং তাঁদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আরো সবাইকে এরম মহতী উদ্দ্যেশের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে ঘোষক এবারে প্রাপক প্রাপিকাদের নাম ঘোষণা শুরু করলেন | অল্প অল্প বিরতিতে সামনের জমায়েত থেকে একটা মুগ্ধ হালকা হাততালির হররা মিলিয়ে যেতে থাকলো আকাশে | পারু সামনের দিকে এগোতে শুরু করলো আস্তে আস্তে |
পরানের দৃষ্টি সীমার বাইরে তখন সামনের সারি থেকে একে অপরের হাত ধরে শ্লথ পদক্ষেপে বেরোনোর গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন এক প্রায় প্রৌঢ় দম্পতি |

প্রকাশিত
অনুভব শারদ সংখ্যা ১৪২৩




555 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: mila

Re: মেয়ে

ঝুনু boro হয়ে ঈশানি হয়েছে? নাকি ঈশানির বোন ঝুনু?
এছাড়াও 20 বছর পর পারুল এর বয়েস ২২/23, উচ্চ মাধ্যমিক 18 তে
একটু কালানৌচিত্ব হয়ে গেছে
Avatar: সিকি

Re: মেয়ে

বাঃ।
Avatar: Abhyu

Re: মেয়ে

খুবই সুন্দর লেখা।
Avatar: Soumyadeep Bandyopadhyay

Re: মেয়ে

মিলি- ধন্যবাদ। প্রায়
কুরি বচর বোলেচি ( রাউন্দ ফিগর) আর উচ্চৈমধ্যোমিকের জোন্যেই স্কোলর্শিপ উচ্চ মধ্যমিকের জন্যেই তো না সব মিল্যিএও পেতে পারে । আর ঝুনু নিক নেম

Avatar: Soumyadeep Bandyopadhyay

Re: মেয়ে

এমন অসাধারণ বানান লিখলাম, তাই আরেকবার টাইপা লাম।
মিলি- ধন্যবাদ। প্রায় কুড়ি বছর বলেছি ( রাউন্ড ফিগার ) আর উচ্চমাধ্যমিকের জন্যেই স্কলারশিপ তা নয়, ওভারঅল রেসাল্টের জন্য ও পেতে পারে তো । আর ঝুনু নিক নেম :)
Avatar: mila

Re: মেয়ে

উচ্চ মাধ্যমিক এর রেজাল্ট 18 বছরে বেরোয় তো :)
টুকি যখন আট, ঝুনু তখন বোনের বয়েসী (২/3)
ঝুনু যখন মারা গেলো (MBA এর পর ইন্টারশিপ মানে 23+), তার মানে বোন ও তখন 23+ বা এক বছরের ছোট
মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কলারশিপ চালু হলেও পারুল এর বয়েস এখন ২২/23, গ্রাজুয়েশন শেষ হয়ে যাওয়া উচিত , উচ্চ মাধ্যমিক নয় :)
গল্প টা খুব ভালো লেগেছে :)

Avatar: সৌম্যদীপ

Re: মেয়ে

দু তিনটে জিনিস মিলা - ১ নম্বর, সবাই ১৮ তে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেনা , ভালো ছাত্রী হলেও ় দুই নম্বর, ঝুনু মারা যাবার সাথে সাথেই স্কলারশিপ চালু হয়েছে বলিনি তো ঃ) ় তিন নম্বর , পারু এখন মাস্টার্স করছে এমন ও হতে পারে , ও যে গ্র্যাজুএশোন করছে , সেটাও বলিনি কোথাও ( শুধু বলেছি মাধ্যমিক ও উচমাধ্যমিক এ জেলার প্রথম সারিতে )

তবে , মোদ্দা কথা , আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুব খুশী হলাম




আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন