সুকান্ত ঘোষ RSS feed

কম জেনে লেখা যায়, কম বুঝেও!

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • দক্ষিণের কড়চা
    গরু বাগদির মর্মরহস্য➡️মাঝে কেবল একটি একক বাঁশের সাঁকো। তার দোসর আরেকটি ধরার বাঁশ লম্বালম্বি। সাঁকোর নিচে অতিদূর জ্বরের মতো পাতলা একটি খাল নিজের গায়ে কচুরিপানার চাদর জড়িয়ে রুগ্ন বহুকাল। খালটি জলনিকাশির। ঘোর বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে পচা লাশের মতো। যেহেতু এই ...
  • বাংলায় এনআরসি ?
    বাংলায় শেষমেস এনআরসি হবে, না হবে না, জানি না। তবে গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আজ ব্লক অফিসে গেছিলাম। দেখে তাজ্জব! এত এত মানু্ষের রেশন কার্ডে ভুল! কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম প্রায় সবার ভোটারেও ভুল। সব আইকার্ড নির্ভুল আছে এমন ...
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...
  • খানাকুল - ২
    [এর আগে - https://www.guruchan...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ক্যেয়া ইয়ে ক্ষীর হ্যায়?

সুকান্ত ঘোষ

ঘুরে ফিরে আবার সেই সরস্বতী পূজো চলে এলো। ইস্কুল জীবন শেষ হবার পর বিশেষ একটা মাথা ঘামাই নি কবে বা কিভাবে সরস্বতী পূজা হবে সেই সব নিয়ে। পূজো বিষয়ে আমার জীবনের রেফারেন্স পয়েন্ট ছিল বলতে গিয়ে দূর্গা পূজা। দেশে কবে ফিরব এবং দেশ থেকে কবে আবার বিদেশে ফিরে যাব, কেনাকাটা কবে হবে, কার সাথে দেখা হবে – সেই সবই মাপা হত সপ্তমী বা দশমীর দিন থেকে। এর প্রধান কারণ ছিল আমার বাড়িতে দূর্গা পূজো হওয়া। ওই এক সময় গেলে সবার সাথে দেখা – বৃহত্তর পরিবারের আরো বিস্তৃত আত্মীয় পরিজনের সাথে দেখা করতে গেলে তার থেকে ভালো সুযোগ আর ছিল না। আর ছোটবেলার টান, নষ্টালজিয়া, মনকেমনের স্মৃতি, পরিবারেরর ঐতিহ্য – সেই সব ন্যাকা ন্যাকা ব্যাপার আর উল্লেখ করলাম না। এই তো সেদিন টুকুনদির বিয়ের বরযাত্রী গেলাম জীবনের দ্বিতীয় বানানো ফুলপ্যান্ট পরে - আর আগের বছর গিয়ে শুনলাম যে টুকুনদির মেয়ের নাকি বিয়ের সমন্ধ হচ্ছে! সময় কিভাবে যে কাব্যিক ভাষায় ‘ফল্গু নদীর’ মত বয়ে যায় কে জানে! এখন তো আবার বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতেও দূর্গা পূজা – সে এক ব্যালান্সের খেলা এরপর। তবে সে গল্প অন্য কোন সময়।

তা যা বলছিলাম – এই দেশে এসে আর দূর্গা পূজার ফ্লেভারটা পাচ্ছি না। কারণ এখানে দূর্গাপূজা হয় না, আগে বাঙালি বেশী ছিল না বলে হত না আর এখন নিয়মের কবলে পরে। আর তা ছাড়া বাইরে থাকলে এবং বাচ্ছা-কাচ্ছা ইস্কুল যেতে শুরু করলে জীবনের রেফারেন্স পয়েন্ট না থাকে দূর্গা পূজা - না থাকে সরস্বতী পূজা। জীবন আবর্তিত হয় ছেলে-মেয়েদের ইস্কুল শেসন-কে কেন্দ্র করে। দূর্গা-পূজার সময় শেসন থাকে পিক-এ, মানে চরম ব্যাপার স্যাপার চলে। বাবা-মা চূড়ান্ত ব্যস্ত – ফলে দূর্গা পূজা তে কেউ আর দেশে ফিরতে পারে না। নিজেদের মধ্যে মেলা-মেশা হয়, কিন্তু চূড়ান্ত কিছু নয় – ওই হালকা কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি। অন্যদিকে সরস্বতী পূজার সময় শেসন নাকি একটু ওরই মধ্যে হালকা থাকে – ফলে প্রচুর এফর্ট দিতে পারে পাবলিক। একটা ছোট্ট মূর্তি একবার এক বাঙালি ব্যাগে করে নিয়ে এসেছিল, সেই মূর্তি পূজা হয় আর হয় খাওয়া-দাওয়া – এবং নিজেরা রেঁধে! সে এক জমকালো ব্যাপার – প্রায় গোটা তিরিশ বাঙালি ফ্যামিলি সকাল সন্ধ্যে শুধু নয়, আগে পরের দিনও রেঁধে খাচ্ছে সে এক দেখার ব্যাপার। আমরা নিজেরাই রাঁধুনি, নিজেরাই যোগাড়ে! ফলতঃ বেশীর ভাগ বাঙ্গালির এখন রেফারেন্স পয়েন্ট হয়ে এসেছে সরস্বতী পূজা।

এ দেশে আসার পর বেশ কয়েক মাস পরে এসে গ্যালো সেই সরস্বতী পূজা। ততদিনে এখানকার বাঙালি সমাজে বেশ জানাজানি হয়ে গ্যাছে মিষ্টির প্রতি আমার সেই অমোঘ, প্রায় অনৈতিক, শালীনতার সীমারেখায় দাঁড়ানো এবং ডাক্তারি মতে অবৈধ ভালোবাসা। ফলে বাকি আরো অনেক কাজের সাথে আমার উপর ইউন্যানিমাস মতে ভার পরে ছিল মিষ্টির দায়িত্ব নেওয়া। এই পোড়া দেশে ভারতীয় মিষ্টি বলতে গেলে সবাই একটাই নাম মুখে আনে – ‘রামধনী’। মানে হল গিয়ে রামধনীর দোকান। রামধনী নাকি আদপে উত্তরপ্রদেশের লোক। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আছে ব্রুনাই-তে এসে গোর্খা ক্যাম্পের ভিতর এসে এক দোকান খোলে। প্রথমে মুদিখানা দিয়ে শুরু করলেও এখন তার নানা ব্রাঞ্চ - রামধনী স্টেশনারী, রামধনী ক্যান্টিন, ল্যন্ড্রী, কাপড়ের দোকান, চুল কাটা, পোল্ট্রী, গাড়ি ভাড়া দেওয়া, ডেকরেটর, এমনকি ভিসা সার্ভিস পর্যন্ত। মানে এক কথায় বলতে গেলে বিদেশে আকুল পাথারে পড়া ভারতীয়দের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস। দুর্জনেরা বলে থাকে রামধনী নাকি দেশে ফ্যামিলি রেখে আসা অগুনতি ভারতীয়দের জন্য রুটি-কাপড়া-মকানের পর অন্যতম নেসিসিটির ব্যবস্থাও করতে পারে – ফিলিপিনো এবং থাই দুই ধরনেরই। এদেশে যদিও সবার চাকুরী স্থলে বিল সাবমিট করতে হয় না কিছু ক্লেম করার জন্য – তবে অনেকেই করতে হয়, এবং সেই ক্ষেত্রে রামধনী নাকি প্রিন্ট-অন-ডিম্যান্ড পদ্ধতিতে বিল সাল্পাই করতে পারে, যেমনটা চাই ঠিক তেমনই।

এই রামধনির দোকানেই আমার প্রথম আলাপ হয় এদেশে এসে পার্থদার সাথে – আলাপ হওয়া প্রথম বাঙালি। সেই দিন পার্থদাও রামধনী গ্যাছে মিষ্টি কিনতে। পার্থদার কথা অন্য সময় – কিন্তু ব্রুনাইতে পার্থদাই ছিল আমার মিষ্টি প্রীতির প্রথম সহমর্মী। কারণ পার্থদা কলকাতা গেলে রুবির কাছে নিজের ফ্ল্যাট থেকে ড্রাইভ করে শক্তিগড় যায় শুধু মাত্র ল্যাঙচা খেতে। তো যাই হোক মূল গল্পে ফিরে আসা যাক। সেই বার আমাকে বলা হল রামধনী থেকে আমাকে নিজের মত জাজ করে মিষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে। রামধনীর মিষ্টি বলতে ছিল, লাড্ডু, গোলাব জামুন এবং সন্দেশ টাইপের ত্রিকোন জাতীয় কিছু একটা। সেবার সরস্বতী পূজার মিটিং-য়ে আমাকে শুভঙ্কর রিকোয়েষ্ট করল, সুকান্তদা লুচি তো আমরা বানাচ্ছিই, তুমি যদি বলে কয়ে রামধনী থেকে ক্ষীর বানিয়ে আনতে পার স্পেশাল অর্ডার দিয়ে, তাহলে পুরো জমে যাবে একেবারে। সবাই লুচি-ক্ষীরের লোভে একেবারে হই-হই করে উঠল এবং আমি পিয়ার-প্রেশারে পরে প্রপোজাল অ্যাকসেপ্ট করলাম। শুধু তাই নয়, বেশী ফালতু কথা না বলা লোক চন্দনদা পর্যন্ত বলে উঠল, ক্ষীর যদি পারিস বানাতে রামধনীকে দিয়ে সুকান্ত, তাহলে তুই কি আর বলে কয়ে বোঁদে বানাতে পারবি না! তবে দেখিস ঝুরে ঝুরে যেন না হয়, রসালো হলে তবেই না জমবে! দ্যাখ না একবার – আবার সেই সবার হেই-হেই ইত্যাদি ইত্যাদি।

অন্য সময় ফোনে অর্ডার দিলেও, ক্ষীর আর বোঁদে বোঝানোর জন্য আমি সশরীরে হাজির হলাম রামধনীতে। পরের কথা হিন্দীতে –

- ভাইসাব, আপ লোগ ক্ষীর বানা সাকতে হো?
- ক্ষীর – কিঁউ নেহী? কিতনা প্যাকেট চাহিয়ে?

আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম, প্যাকেটে করে আবার ক্ষীর কি ভাবে হবে? বললাম –

- হামকো থোড়া ড্রাই ড্রাই ক্ষীর চাইয়ে। মানে পুরোপুরি শক্ত হোনেসে বা নরম হোনেসে নাহি চলেগা। মাঝামাঝি চলেগা –
-
এবার যে অর্ডার নিচ্ছিল সে গেল ঘাবড়ে। আমাকে বলল, ভাই আপ ডাইরেক্ট আমারা কিচেন সে বাত করলো, বলে ফোন তুলে ডায়াল করে রাঁধুনিকে ধরিয়ে দিল। আমি ক্ষীর চাই রাঁধুনীকে বলে তারপর জানালাম ড্রাই-টাইপের ব্যাপারটা। আমার কাছে জানতে চাইল ক্ষীর আবার ড্রাই কিভাবে হবে?

- আরে কিঁউ নেহী হোগা? থোড়া ট্রাই কিজিয়ে না। থোডা যাদা উনুন-মে উসকো ফুটাও, ব্যাস খেল খতম!

কি বুঝল কে জানে! বলল কত প্যাকেট চাই – আমি আর প্যাকেট নিয়ে বেশী ঘাঁটালাম না, বললাম দশ প্যাকেট হলেই হবে। ফোন আবার কাউন্টারে ট্রান্সফার হয়ে গেল। জানতে চাইল আর কিছু চাই কিনা। আমি পড়লাম মহা ভাবনায়। বোঁদে-কে হিন্দীতে কি বলে বুঝতে পারছি না। হঠ করে মনে পড়ল, এদের কাছে যে লাড্ডু দেখেছি, সেই গুলোতো পাকানো হয় বোঁদে দিয়েই।

- ভাইসাব, আপকা যো ও লাড্ডু হ্যায়, ও কিসে বানতা?
- কিঁউ, ও তো বুঁদিয়া সে বানাতে হাম!

ব্যাস, আমার যা জানার হয়ে গেল জানা – বললাম,

- হামকো বুঁদিয়া চাইয়ে
- কিতনা পিস?
- আরে ভাই পিস নেই, হামকো বুঁদিয়ে চাইয়ে

সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল – আমি প্রাজ্ঞল করে বোঝালাম,

- ভাই তুম জ্যায়সে বুঁদিয়া বানাতে হো, অ্যায়েসি বানাও। স্রেফ লাষ্ট স্টেপ পে যা কে, গোল গোল মত বানাও। হামকো সব বুঁদিয়া সেপারেট সেপারেট চাইয়ে এক ট্রে পে। ওউর, থোডা উসমে রস্‌ জাদা রাখো।

কি বুঝল কে জানে, পিছনে লোক কিনতে এসে ওয়েট করছে দেখে, আমাকে বলল হয়ে যাবে – আমি বললাম তিন কিলো।

ফাষ্ট ফরোয়ার্ড পুজোর দিন – আমি গেছি দোকানে অর্ডার দেওয়া মিষ্টী আনতে। বোঁদে নিয়ে আমার টেনশন ছিল একটু। অ্যালুমিনিয়ামের ট্রে একটু তুলে দেখে নিলাম – মন ভরে গেল। রসালো টইটুম্বুর বোঁদে বিছানো আছে ট্রেতে। মনের আনন্দে আর ক্ষীরের ট্রে খুললাম। গাড়ির পিছনে এসে রেখে ভাবলাম, একবার তুলেই দেখা যাক – যেমন ভাবে আমি বোঁদেতে সাকসেস পেয়েছি, তেমন ক্ষীরে পেয়েছি কিনা। সেই দেখতে গিয়ে যেই না ট্রে-র এক কোন তুলে দেখেছি, আমার হয়ে গ্যাছে। দেখি সেই বিশাল ট্রে-র এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত ভরে আছে পায়েস! আবার সেই পায়েসও কেমন যেন জমাট বাঁধা! ড্রাই-ড্রাই যাকে বলে! আমি দুর-দার করে ছুটে গেলাম রামধনীতে। গিয়ে বললামঃ

- কেয়া ইয়ে ক্ষীর হ্যায়?
- এহি তো ক্ষীর হ্যায়! আপ য্যায়সা বোলা, ড্রাই-ড্রাই বানা দিয়ে। ফার্ষ্ট টাইম বানায়া ড্রাই টাইপ, লেকিন আচ্ছা টেষ্ট আয়া।

আমার ইয়ে ইয়েতে চড়ে গ্যাছে তখন। হিন্দীতে পায়েসকে যে ক্ষীর বলে - সেই হেতূ যে একটা পোটেনশিয়াল ভুল বোঝাবুঝি এবং তৎপর যে এক ক্যাটাস্ট্রোফির জন্ম নিতে পারে আমার বুদ্ধি ততটা সুদূরপ্রসারী কাজ করে নি অর্ডার দেবার দিন। একরাশ উপোসী বাঙালীর মুখ দেখতে পারছি যারা লুচি নিয়ে ক্ষীরের আসায় বসে আছে। আমার প্রথম ইমপ্রেশ করার চান্স এই ভাবে জলে যাবে? কোন ক্রমে পূজা স্থলে গেলাম। সেখানে কি হল আর বলা মানে আশুতোষ গায়কোয়াড়ের সিনেমা – তবে ড্রাই ড্রাই ক্ষীর আরো ঠান্ডা হয়ে গিয়ে সুপার-ড্রাই হয়ে গেছিল ততক্ষণে। এক বৌদি চামচ দিয়ে ক্ষীর নিতে গিয়ে চামচ বাঁকিয়ে ফেলল – কিন্তু ক্ষীরে থাবা বসাতে পারল না! আমার দিকে ফিরে বৌদি দেওর সুলভ চপলতা মিশিয়ে বলল – এটা কি ক্ষীর? আমার লাজুক হেসে জবাব, এটাই তো ক্ষীর! কিন্তু ইনিংস পরাজয়ের হাত থেকে আমাকে রক্ষ করে ওই রসালো বোঁদে। সবাই খেয়ে বলল, তার সব কিছু অপটিমাম – মিষ্টির লেভেল থেকে গায়ে গায়ে লেগে থাকাও! ক্ষীরের বুকে চামচ গাঁথা ট্রে পড়ে রইল, ওদিকে বোঁদে ফাঁকা।

রামধনী আরো এক মিষ্টি মানাতো যা দুইবার খেয়ে আর খাবার সাহস করতে পারি নি, সেটা হল জিলাবী। দেখতে কিন্তু বেশ ভালো করত, রসালো নয় – অনেকটা আমাদের ‘অমৃতি’-র মত দেখতে। তার গায়ে লেগে আছে কেলাসাকৃত চিনির দানা। সাদা ডিসে সাজিয়ে দিলে কমলা রঙের জিলাবী বেশ আর্টিস্টিক একটা ব্যাপার হত। প্রথম দিন খেয়ে সেই জিলাবী আমাকে একটানে পনেরো বছর পিছনে ফিরিয়ে দিয়েছিল। সে কি মিষ্টী রে ভাই – জাগতিক রসায়নের সূত্রের বাইরে বেরিয়ে সুপার-স্যাচুরেটেড চিনি কোন ভাবে সেই প্যাঁচানো ডালের মন্ডতে ঢুকে গেছিল। এক কামড় দিয়েই ইন্সুলিন শকে্‌র মত ঝটকা – বি ই কলেজের সেকেন্ড গেট দিয়ে বেরিয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনের গেটে ঢোকার পাশের দোকানে বিক্রী হওয়া চন্দ্রপুলির স্মৃতির ফ্ল্যাশব্যাক। জিলাবী গলা দিয়ে নামচে – মনে হচ্ছে গলার ভিতরের দিকের খাদ্যনালীর চামড়া পুড়ে যাচ্ছে – এককামড় খেয়েই প্রবল জল পিপাসার উদ্রেক। আর সেই ফাঁদে পড়ে জল খেয়ে নিলেই ব্যাস! সারা রাত আপনাকে আর ঘুমাতে হবে না – চোঁয়া ঢেঁকুরে জর্জরিত আপনি প্রবলেমটা ঠিক কি ঠাউর করতে পারবেন না। জোয়ানের আরক থেকে শুরু করে জেলিসুল, ইনো, পাতিলেবু জল বা ইদানিং কালের পতজ্ঞলির আয়ুর্বেদিক কোন কিছু খেয়েই আপনার জ্বালা প্রশমিত হবে না। এবার প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রথম বারেই যদি এই হয়, তাহলে দ্বিতীয় বার আবার খাওয়া কেন? লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু জাতীয় প্রবাদ বাক্য আপনারা ভাবলেও, আমার ডিফেন্স এই যে – কোন কিছু একবার খেয়ে তার সম্পর্কে ফাইন্যাল রায় দেওয়া অপরিণামদর্শিতার লক্ষণ! বহু আফসোস লিপিবদ্ধ আছে দ্বিতীয় বার ট্রাই না করার ঐতিহাসিক ভুল স্বরূপ।

তবে রামধনীর সমোসা নাকি ফেমাস ছিল। প্রথমে বিশ্বাস করি নি, কিন্তু ক্রমশঃ নিজের চোখে দেখলাম যে অফিস ফেরত বহু বিদেশী দোকানে আসে শুধু মাত্র সমোসা কিনে নিয়ে যাবার জন্য। নিজে খেলো, বাড়ির জন্য আবার টেক-অ্যাওয়ে। মাঝে ঝাল লেগে সু-শা করতে করতে – “ক্যান আই হ্যাভ সাম মোর চাটনী প্লীজ জাতীয়” কাকুতি। প্রচলিত অর্থে বাঙালি যাহাকে সিঙ্গারা বলে, তাহাকেই অবাঙালীরা বলে সমোসা – এমনটা আপনার মনে হতে পারে। কিন্তু সেটা তো নয়! সমোসা আর সিঙ্গারা পার্থক্যটা কি? নিজে ঠিক জানি না, মশালার গুণ নাকি ময়দার খোলসের পুরুত্বের পার্থক্য – নানা মুনির নানা মত। তবে এক দিন আমার এক উড়িয়া কলিগ বলল যে আসল পার্থক্য হচ্ছে আলুর খোসায়! সিঙ্গারায় নাকি যে আলুর ব্যবহার করা হয় পুর করার জন্য তার খোসা ছাড়ানো হয় না, আর সমোসায় আলু চটকানো হয় খোলা বিহীন! আমার তো ব্যাখ্যাটা বেশ লাগলো, ফলে আমি সেটা আরো ছড়িয়ে দিলাম। এখন ব্রুনাইয়ের সব বাঙালিই প্রায় সমোসা আর সিঙ্গারার টেকনিক্যাল পার্থক্যটা জানে।

বলাই বাহুল্য যে রামধনীর সিঙ্গারার সাইজ বিশাল। এখানে মাঝে মাঝে বাঙালীদের মধ্যে সান্ধ্য-সভার আয়োজন করা হয়। মানে ওই যে সভাতে ঠিক করা হয় পরের অনুষ্ঠানের ডিটেলস – কি হবে, কোথায় হবে, কে করবে - এই সব নিয়ে আর কি। তা সেই সব সভাতে জলযোগ হিসাবে মাষ্ট হচ্ছে সমোসা – আগে সেই সমোসা সাল্পাইয়ে রামধনীর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল,ইদানিং সেই আধিপত্যে ভাগ বসিয়েছে ‘রামলাল’। সমোসা সাপ্লাইয়ের সাথে রাম – নামের কোন সম্পর্ক আছে কিনা জানা নেই, কিন্তু সমোসা খাবার আগে রামের নাম একবার করে নিলে ব্যাপারটা একটু বেশী সিকিওর বোধ হয়। সান্ধ্য সভাতে সাতটার সময় সেই সমোসা খেয়ে আর রাতের বেলা ডিনার করার ক্ষমতা কোলেষ্টেরল জর্জরিত, আগামীতে আগত কোলেষ্টেরল জুজুতে ভিত এবং পেটের রোগে ভোগা বাঙালীর থাকত না। ফলে লিটারেলি অনেক বাঙালী রাম-রাম করতে করতে সমোসা খেত এবং খেয়ে ফেলে খুব বেশী ভয় পেয়ে জল না খেয়ে কোল্ড ড্রিংক্স গিলে নিত দুই ঢোঁক।

রামধনী উত্তর প্রদেশের লোক, রামলালও উত্তর প্রদেশের। ইন ফ্যক্ট এখানে বেশীর ভাগ ভারতীয় কাজ করার লোকেরাই উত্তর প্রদেশের – কোন এক অজ্ঞাত কারণে। কিন্তু ভারতীয় রেষ্টুরান্ট গুলির বেশীর ভাগ রাঁধুনীই আবার আসত পশ্চিম বাংলা থেকে । বেশীর ভাগই মেদিনীপুর থেকে, আরো প্রিসাইজলি বলতে গেলে বাংলা-উড়িষ্যা বর্ডার থেকে। উড়িয়া কানেকশন জানার পর রাঁধুনি কেন পশ্চিম বাংলা থেকে আসছে সেই নিয়ে আর কোন “অজ্ঞাত কারণ” ছিল না! আফটার অল কলকাতা সহ তাবৎ মফস্বলের মেস বাড়ি দশকের পর দশক চালিয়ে আসছে উড়ে-রা। কেবল মাত্র রামধনী তার নিজের ট্রাডিশন বজায় রেখে উত্তর প্রদেশ থেকে রাঁধুনী এনেছিল। ফলে তার পরিবেশীত খাবার যে ওই সমোসা, গোলাপ জামুন, বুঁদিয়া এই সবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে সেটা বলাই বাহুল্য!

কিছুদিন আগে হয়ে গেল প্রাক পুজো মিটিং – সমোসা এল রামলালের কাছ থেকে। সাথে এল লাল চা এবং লাড্ডু। সমোসা খেলাম – ঠিক আছে। চা খেলাম, প্রচুর মিষ্টি – মনে হল গরম সরবত খাচ্ছি। তারপর খেলাম লাড্ডু – সে ভাই কি মিষ্টী! আগে উল্লিখিত জিলাবী খাবার অভিজ্ঞতাকে আপনি ১০ দিয়ে গুণ করুন! আমার মত মিষ্টি খোরও খেতে পারল না একটার বেশী লাড্ডু। যাই হোক প্রচুর লাড্ডু বেঁচে রইল – কেউই বাড়ি ছাঁদা বেঁধে নিয়ে যেতে রাজী হল না। আমি কিছু আনলাম বাড়ির ফিলিপিনো কাজের মেয়েটাকে দেব বলে। সাধারনত ওরা বেশী মিষ্টি খায় না – কিন্তু ফ্রী বলে মনে হয় আর না করল না। যাই হোক, যে কেটলী করে লাল চা এসেছিল, সেই কেটলী যে রামলাল নিয়ে যাবে সময় মত এমনটাই কথা থাকে বা ছিল। কিন্তু এক সপ্তাহ হয়ে গেলেও কেউ এল না দেখে আমি দিতে গেলাম কেটলি – জিজ্ঞেস করলাম, “কি গো, কেটলী নিয়ে গেলে না যে?”। তার উত্তরে আমাকে হিন্দীতে রামলাল যা বলল তার বাংলা অর্থ হল, আপনাদের মত তো আমাদের আর অফিসে বসে কাজ নয় যে সেখানে বসে বসে ইয়ে করব – আমাদের খেটে খেতে হয়। বুঝলাম যে উনুনের ধারে রুটি সেঁকে সেঁকে রামলালের মেজাজ গরম হয়ে আছে। আর ঘাঁটালাম না – তার বদলে জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু চা টা সেদিন অমন মিষ্টী করলে কেন? ব্যাস, আবার খচে লাল – এই ইন্ডিয়ান কমিউনিটি বলছে যে চায়ে মিষ্টি হয় নি সেদিন – আপনি এসে বলছেন যে বেশী মিষ্টি হয়ে গ্যাছে! খেতে হলে খান – না হলে আসুন। বাপরে সেই আচরণ দেখে আমষ্টারডামের কাষ্টমার সার্ভিসের অভিজ্ঞতা মনে পড়ে গেল। মনযোগী পাঠক হয়ত লক্ষ্য করে ভাবতে পারেন যে রামলাল রুটি সেঁকছিল কেন। কারণ আর কিছুই নয়, প্রতি রবিবার সকালে রামলাল স্পেশাল হয় – হাতে সেঁকা রুটি এবং তার সাথে টাটকা কড়াইতে নামানো সব্জী, সে এক স্বর্গীয় স্বাদ। তবে কেবলমাত্র সকালে হবার জন্য ফ্যামিলি ম্যানেরা এটা সব সময় অ্যাভেল করতে পারে না – ওয়েট করতে হয় কবে বঊ ইন্ডিয়া ফিরে যাবে এবং সকালে গিয়ে টুক করে ব্রেকফাষ্ট সেরে আসব।

এখানে বেশ কিছু দোকান রবিবার সকালে ব্রেকফাষ্ট স্পেশাল করে। নর্থ এবং সাউথ দুই স্টাইল দুই পাওয়া যায়। তবে ভারতীয় দের মধ্যে দেখি সাউথ ব্রেকফাষ্টই বেশী জনপ্রিয় নর্থ ব্রেকফাষ্টের তুলনায়। সাউথের ব্রেকফাষ্ট বলতে একটা প্লেটে (বা প্যাকেটে) দিয়ে দেওয়া হবে – ইডলি, বড়া, একটু উথাপম, একটা সেট দোসা (এ আবার কনভেনশনাল দোসার থেকে আলাদা) এবং কমলা রঙের মিষ্টি দেওয়া সুজি। সাথে পরিমাণ মত চাটনী এবং দুই প্রকার সম্বর টাইপের কিছু একটা। সত্যি আমার মত সাউথের খাদ্যকে সন্দেহের চোখে দেখে তারপর খাওয়া শুরু করা লোকের কাছেও সেই ব্রেকফাষ্ট বেশ আকর্ষণীয় ছিল। অন্যদিকে নর্থ ইন্ডিয়ান ছিল চানা-বাটোরা বা লুচি-কচুরী জাতীয় কিছু সাথে তরকারী। ব্রেকফাষ্ট খাওয়া ছাড়া আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঘটত সকাল সাড়ে ৯ টা নাগাদ সেটার খবর সবাই জানত না – বা জানলেও বাঙালী ছাড়া কারো ইন্টারেষ্ট থাকার কথা ছিল না। এক পুরানো শপিং কমপ্লেক্সের সিঁড়ির ঠিক মুখে ছিল এক মিক্সড রেষ্টুরান্ট – মানে ভারতীয় এবং মালয় দু ধরণের খাবারই পাওয়া যেত। অত্যন্ত আন-রিমার্কেবল টাইপের দোকান – সেই খানেই আমার ব্রুনাইয়ে এসে খাদ্য বিষয়ক কিছু এক্টার প্রথম আবিষ্কার। সেদিন রবিবার সকালে যাচ্ছি চুল কাটতে শপিং কমপ্লেক্সের তিন তলায় – সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় দেখি এক বাঙালি ভাই (যদি ভাবেন কি করে চিনলাম – যদি বিদেশে থাকেন এবং বাংলাদেশীদের সাথে মেশামেশী করেন, তা হলে তাদের সনাক্তকরণের সাকসেস রেট শতকরা ১০০ ভাগের খুব কাছাকাছি থাকা কথা – আর তার উপর যদি রাধুঁনি হয়, তাহলে তো কথাই নেই – আপনার মুখে না জেনেই বাঙলা কথা এসে যাবে) সামনের কাঁচের শোকেসে ছোট ছোট আমাদের বাঙালী সিঙ্গারার মত কি একটা ঢালছে। চুল কাটা মাথায় উঠল – মন্টু ওয়েট করুক কাঁচি নিয়ে – আমি প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম এটা কি এটা কি বলে। উত্তরে একগাল হাসি – আমি একটা চেখে দেখলাম, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল আহা। একেবারে আমাদের গাঁয়ের গঙ্গা ময়রার এবং মেমারীর নীরেন ময়রার সিঙ্গারা। সেই শুরু – প্রতি রবিবার সকাল ৯টা তিরিশ মিনিটে সিঁড়ির সামনের দোকান। সপ্তাহে ওই একদিন স্পেশাল এবং গোটা ব্রুনাইতে আমার জানা মতে স্বদেশীয় স্বাদের সিঙ্গারা সেই এক জায়গাতেই।

আমার বাড়ির আশেপাশে দুই ছোটা টাউনে যে ভারতীয় রেষ্টুরান্ট গুলি আছে সেগুলি হল – তন্দুর হাট (দুই টাউনে দুই ব্রাঞ্চ), বিবিয়ানা, জাইকা, মালাবার, তাজ কিচেন, রিজওয়ানা, সেরিখন্ডি – এছাড়া আরো গোটা কতক আছে, কিন্তু তারা তেমন ফেমাস নয়। আমি আসার পর যোগ হল আরো দুটি – একটি গোর্খা প্যালেস এবং অন্যটি বোম্ব্বে প্যালেস। এই পর্বে শুধু ভারতীয় রেষ্টুরান্ট নিয়ে নাড়াঘাঁটা – পরের পর্বে অন্য দেশীয় নিয়ে হবে ক্ষণ। তা আমি তখন একে একে সব রেষ্টুরান্ট ট্রাই করে একই খাবার খেয়ে ক্লান্ত হয়ে নতুনত্ব খুঁজছি – এমন সময় জানতে পারলাম গোর্খা প্যালেস খুলেছে। চল চল বলে দোকান খোলার পরের দিনই হাজির – দেখলাম মেনুর নতুনত্ব – মানে তরপর বলব কি, দ্বিতীয় পাতায় পৌঁছে আমার বউ হয়ে গেল সেই জায়গার ফ্যান – কারণ মেনুকার্ডে ১৯ নম্বর এন্টি হচ্ছে ফুচকা, হ্যাঁ – আদি তেঁতুল গোলা জল দিয়ে ডুবিয়ে এবং আলু চটকানো দিয়ে খাওয়া যাবে এমন ফুচকা। ২০ নম্বর এন্ট্রি হল দহিবড়া, ২১ এ রয়েছে মুড়ি মশালা, ২২ এ আলু চটপটি – পাতা উল্টে শেষের দিকে আলু পরাঠা। এবং আমার জন্য রয়েছে নানা প্রকার মিষ্টির সমারহ – কিন্তু মিষ্টিতে গিয়ে একটু ঠেক খেলাম – যাই মিষ্টি অর্ডার করি, তাই বলে নেই। বিরক্ত হয়ে কিচেনের দিকে গেলাম – মনে রাখবেন দেশের নাম ব্রুনাই এবং সেই প্রথমবার রেষ্টুরান্ট গেলেও রাঁধুনি যে মেদিনীপুরের হবে মেনুতে ফুচকা দেখে সেই বিষয়ক কোনই সন্দেহ আমার মনে ছিল না। এবং ব্রুনাই বলেই কিচেনের দরজা থেকে হাঁক দিয়ে ভাই ভাই বলে কুক ভাইকে ডাক দিয়ে ডেকে এনে কথা বলা যায়। ভাইকে ডাইরেক্ট চার্জ করলাম, কেস কি – ঐ নেপালী মেয়ে সব মিষ্টিই আউট ওব অর্ডার বলছে কেন? এক গাল হাসি – দাদা, কেস কিছু না, মিষ্টির কারিগর এখনো ভিসা পায় নি। অ্যাপ্লিকেশন কবে জমা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনো অ্যাপ্রুভ না হওয়াতে সে এখনো এসে পৌঁছায় নি। জানতে চাইলাম আসবে কবে, বলল চলে আসবে। তারপর অনেক দিক কেটে গ্যাছে – যতবার গেছি তাতবার মিষ্টির অর্ডার দিয়ে গেছি আর ততবারই মাল নেই। শেষে একদিন মেনু কার্ডের শেষের পাতায় মিষ্টির মেনুর উপর সাদা কাগজ সাঁটা হয়ে গেল। মিষ্টির কারিগরের ভিসা আর অ্যাপ্রুভ হল না!

গোর্খা প্যালেস শুধু মেনু নয় – খাবারের পরিবেশনেও একটু নতুনত্ব এনেছিল এখানকার মার্কেটের রেসপেক্টে। ব্রুনাইয়ের বুকে প্রথম পরিবেশীত হয়েছিল কাঁসার থালায় খাবার – বাটি, চামচ সবই কাঁসার। দুপুরের দিকে আবার এই সব ভারতীয় রেষ্টুরান্টে থালি পরিবেশীত হত, মূলত চাকুরীজীবি জনতার দুপুরের লাঞ্চকে টার্গেট করে। একদিন তেমনি অফিস থেকে গেলাম লাঞ্চ খেতে – গিয়ে দিলাম নন-ভেজ থালির অর্ডার, নেপালী মুরগীর ঝোলের সাথে ভাত দেওয়া হল, সঙ্গে ডাল, দুই রকমের সব্জী এবং শাক। বড় কাঁসার থালায় চারিদিকে ছোট ছোট কাঁসার বাটিতে সব খাবার দেওয়া, কেবল মাংসের বাটিতা একটু বড়। কতদিন জামাই ষষ্টি খাওয়া হয় না – ভেবে প্রায় চোখে জল এনে দিল সেই কাঁসার থালা। আর মাংসের ঝোলটাও একদম ইন্ড্রাষ্টিয়াল স্কেলের মতন মশালাদের নয়, পাতি মনে হল বাড়ির রান্না করা হালকা ঝোলের মত খেতে। দুই বার ভাত চেয়ে নিয়ে প্রচুর খেয়ে ফেললাম – কিন্তু অনেক ভারতীয়দের আবার এই অ্যারেঞ্জমেন্ট পছন্দ নয় দেখলাম – ওদের জন্য মনে মনে আমি বাঙালি সুলভ করুণা নিক্ষেপ করলাম। ওদের ক্ষমা করে দিও প্রভু – ওরা জানে না যে ওরা কি মিশ করছে।

মালাবার রেষ্টুরান্টে আবার ভারতীয়দের থেকে বেশী যায় লোকাল মালয় পাবলিক। ফলে মালয় স্বাদের সাথে মানিয়ে নিতে নিতে কাষ্টমাইজড করে করে ভারতীয় খাবারের গুষ্টির তুষ্টী পুজো করে দিয়েছে তাদের রাঁধুনী – যে শিওর মেদিনীপুর থেকে হতে পারে না। হতাশ আমি সেই নিয়ে আর বেশী ইনভেষ্টিগেশন করতে নামি নি – আমার খাতা থেকে মালাবার প্রায় মুছে দিয়েছিলাম দোসা এবং সাউথ ইন্ডিয়ান স্টাইলের বিরিয়ানী এই দুই ডিস ছাড়া। জাইকা ছিল মূলত তেল কোম্পানীতে কাজ করতে আসা বিদেশি-দের টার্গেট করে বানানো রেষূরান্ট। সবচেয়ে সাজানো গোছানো ভারতীয় রেষ্টুরান্ট এবং এদের খাবারের দামও ছিল অন্যদের থেকে বেশী – ফলে ছাপোষা ভারতীয়রা কোন অকেশন ছাড়া এমনি এমনি খেতে জাইকাতে যেত না। এমনি এমনি খেতে যাবার মার্কেটের কাষ্টমার ধরার লড়াইটা মূলত সীমাবদ্ধ ছিল তন্দুর হাট এবং বিবায়ানার মধ্যে। এরা আবার পাশাপাশি রেষূরান্ট – তন্দুর হাটের ম্যানেজার তামিন ভাই এবং বিবিয়ানার ম্যানেজার মূর্তি দুইজনে মোটামুটি ভাগাভাগি করে মার্কেট কব্জা করে ফেলেছে এমন সময় এন্ট্রি ঘটল বোম্বে প্যালেস রেষ্টুরান্টের এবং তাদের পেশোয়ারী ম্যানেজার সাকিব খানের।

[ক্রমশঃ]


418 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: dd

Re: ক্যেয়া ইয়ে ক্ষীর হ্যায়?

বাঃ,বাঃ। চলুক চলুক
Avatar: সিকি

Re: ক্যেয়া ইয়ে ক্ষীর হ্যায়?

ব্যাপক হচ্ছে।

ইয়ে, দুর্গা আর পুজো - দুটোতেই হ্রস্ব উ হয়। পূজা দীর্ঘ ঊ।
Avatar: sayantani

Re: ক্যেয়া ইয়ে ক্ষীর হ্যায়?

তুর্কিরা এক রকম জিলিপি গোছের খাবার বানায়, তার নাম জুলাবিয়া। সেও অত্যন্ত মিষ্টি। আপনার রামধনুর অভিজ্ঞতা শুনে মনে পড়লো, দুই বুভুক্ষু বাঙালির বার্লিনে দুই বার মেট্রো বদল করে সে বস্তু খেতে যাওয়ার কথা
!
Avatar: সুকি

Re: ক্যেয়া ইয়ে ক্ষীর হ্যায়?

সিকি, ধন্যবাদ ভুল ধরিয়ে দেবার জন্য। জানা বানান, কিন্তু তবু ভুল হচ্ছে - এম্ব্যারেসিং ব্যাপার
Avatar: সুকি

Re: ক্যেয়া ইয়ে ক্ষীর হ্যায়?

কিন্তু এই সব খোরাক টাইপের লিখে কিছু লাভ হচ্ছে না - গুরুতে এতদিন লিখে জাতেই উঠতে পারলাম না! এদিকে আমার রাজনীতি আর অর্থনীতি ছাড়া হেন কোন বিষয় নেই যা নিয়ে ফান্ডা নেই - কিন্তু কে আর সেই মর্যাদা বোঝে?

লাইন সিফট করব ভাবছি। পয়সাও পাচ্ছি না লিখে, এদিকে জাতেও উঠতে পারলাম না - খামোকা রাত জেগে টাইপ করে পাতা ভরানো! পুরো ক্লাসিক ডিপ্রেশন কেস -
Avatar: amit

Re: ক্যেয়া ইয়ে ক্ষীর হ্যায়?

নস্টালজিক হয়ে গেলাম সুকি লেখাটা পড়ে। রামধনির দোকানের সিঙ্গারা আর লাড্ডু খেয়ে যে কত সন্ধ্যা কেটেছে আড্ডা মেরে। আর তার সাথে মালয়েশিয়া থেকে চুরি করে আনা মদের স্বাদই আলাদা। পরের দিকে অবশ্য আর নিজে নিয়ে আসতে হতোনা, একটা মালয়েশিয়ান কলিগকে বললেই সে এনে দিতো।
Avatar: Titir

Re: ক্যেয়া ইয়ে ক্ষীর হ্যায়?

বেশ লাগল পড়তে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন