Ashoke Mukhopadhyay RSS feed

Ashoke Mukhopadhyayএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৬
    চিংড়ির হলুদ গালা ঝোলকোলাপোতা গ্রামটার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কপোতাক্ষ। এছাড়া চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে খাল বিল পুকুর। সবুজ জংলা ঝোপের পাশে সন্ধ্যামণি ফুল। হেলেঞ্চার লতা। উঠোনের কোন ঘেঁষে কাঠ চাঁপা। পঞ্চমুখী জবা। সদরের মুখটায় শিউলি। সাদা আঁচলের মতো পড়ে থাকে ...
  • যৌন শিক্ষা মহাপাপ...
    কিছুদিন ধরে হুট করেই যেন ধর্ষণের খবর খুব বেশি পাওয়া যাচ্ছে। যেন হুট করে কোন বিষাক্ত পোকার কামড়ে পাগলা কুকুরের মত হয়ে গেছে কিছু মানুষ। নিজের খিদে মিটাতে শিশু বৃদ্ধ বাছ বিচার করারও সময় নাই, হামলে পড়ছে শুধু। যদি বিষাক্ত পোকার কামড়ে হত তাহলে এই সমস্যার সমাধান ...
  • ইতিহাসবিদ সব্যসাচী ভট্টাচার্য
    আধুনিক ভারতের ইতিহাস চর্চায় সব্যসাচী ভট্টাচার্য এক উল্লেখযোগ্য নাম। গবেষক লেখক শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে তাঁর অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সবসাচীবাবুর বিদ্যালয় শিক্ষা বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট হাই স্কুলে। তারপর পড়তে আসেন প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগে। ...
  • পাগল
    বিয়ের আগে শুনেছিলাম আজহারের রাজপ্রাসাদের মতো বিশাল বড় বাড়ি! তার ফুপু বিয়ে ঠিকঠাক ‌হবার পর আমাকে গর্বের সাথে বলেছিলেন, "কয়েক একর জায়গা নিয়ে আমাদের বিশাল বড় জমিদার বাড়ি আছে। অমুক জমিদারের খাস বাড়ি ছিল সেইটা। আজহারের চাচা কিনে নিয়েছিলেন।"সেইসব ...
  • অশোক দাশগুপ্ত
    তোষক আশগুপ্ত নাম দিয়ে গুরুতেই বছর দশেক আগে একটা ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখেছিলাম। এটা তার দোষস্খালন বলে ধরা যেতে পারে, কিন্তু দোষ কিছু করিনি ধর্মাবতার।ব্যাপারটা এই ২০১৭ সালে বসে বোঝা খুব শক্ত, কিন্ত ১৯৯২ সালে সুমন এসে বাঙলা গানের যে ওলটপালট করেছিলেন, ঠিক সেইরকম ...
  • অধিকার এবং প্রতিহিংসা
    সল্ট লেকে পূর্ত ভবনের পাশের রাস্তাটায় এমনিতেই আলো খুব কম। রাস্তাটাও খুব ছোট। তার মধ্যেই ব্যানার হাতে একটা মিছিল ভরাট আওয়াজে এ মোড় থেকে ও মোড় যাচ্ছে - আমাদের ন্যায্য দাবী মানতে হবে, প্রতিহিংসার ট্রান্সফার মানছি না, মানব না। এই শহরের উপকন্ঠে অভিনীত হয়ে ...
  • লে. জে. হু. মু. এরশাদ
    বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা অধ্যায় শেষ হল। এমন একটা চরিত্রও যে দেশের রাজনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল ছিল, এ এক বিরল ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধ না করে কোন সামরিক অফিসার বাড়িতে ঘাপটি মেরে বসে ছিলেন ...
  • বেড়ানো দেশের গল্প
    তোমার নাম, আমার নামঃ ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম --------------------...
  • সুভাষ মুখোপাধ্যায় : সৌন্দর্যের নতুন নন্দন ও বামপন্থার দর্শন
    ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’। এর এক বিখ্যাত কবিতার প্রথম পংক্তিটি ছিল – “কমরেড আজ নবযুগ আনবে না ?” তার আগেই গোটা পৃথিবীতে কবিতার এক বাঁকবদল হয়েছে, বদলে গেছে বাংলা কবিতাও।মূলত বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে সভ্যতার ...
  • মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র ভুবন
    মৃণাল সেনের জন্ম ১৯২৩ সালের ১৪ মে, পূর্ববঙ্গে। কৈশোর কাটিয়ে চলে আসেন কোলকাতায়। স্কটিশ চার্চ কলেজ ও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশুনো করেন। বামপন্থী রাজনীতির সাথে বরাবর জড়িয়ে থেকেছেন, অবশ্য কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

রাজেন্দ্রলাল মিত্র: উনিশ শতকের ভারতবিদ্যা পথিক

Ashoke Mukhopadhyay

[এবছর ২৬ জুলাই ২০১৬ রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মৃত্যুর একশ পঁচিশ তম বছর সূচিত হচ্ছে। উনিশ শতকের ভারতের এই অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্রকে আমরা আজ ভুলে গেলেও তাঁর জীবনের কর্ম ও সাধনাকে যতটুকু স্মরণ করব সেই অনুপাতে সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্য করতে ইচ্ছে হবে। সেই তাগিদ থেকেই এই রচনার জন্ম। ধাপে ধাপে কয়েকটি ক্রমে আমরা চেষ্টা করব স্মরণ করার ফাঁকে ফাঁকে এই মহৎ মানুষটিকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানের কিছু ভাগ অন্তত ফিরিয়ে দিতে। এবারে তৃতীয় পর্ব। সূত্রোল্লেখ শেষ পর্বে থাকবে।]

তৃতীয় পর্ব
।। ৫।।
ইউরোপীয় রেনেশাঁস একদল জ্ঞানতাপসের জন্ম দিয়েছিল। ফ্রান্সে দিদরো, লা মত্রি, হেলবেতিয়াস, হোলবাক, বোলতেয়ার প্রমুখ দার্শনিকদের পরিচয় হয়েছিল বিশ্বজ্ঞানী (encyclopaedist) হিসাবে। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও এরকম বেশ কয়েকজন বহুব্যাপ্ত জ্ঞানী (polymath)-র জন্ম হয়েছিল, যথা, রজার বেকন, দ্য ভিঞ্চি, ইরাসমাস, সার্ভেতো, গ্যালিলেও এবং আরও অনেকে। নবজাগৃতির এ-ও এক নিশ্চিত লক্ষণই বলা চলে। তাঁরা সকলেই অনেকগুলো করে ভাষা জানতেন, জ্ঞান জগতের নানা শাখায় স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতেন। ফ্রেডরিক এঙ্গেল্‌সের ভাষায় তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন এক একজন “বিশাল-ব্যক্তিত্ব” (giants)। দেরিতে এলেও, যখন এল, ভারতীয় রেনেশাঁসের মধ্যে অনেক দুর্বলতা ছিল, এ হয়ত ছিল ইউরোপীয় ধ্রুপদী রেনেশাঁসের তৃতীয় কার্বন কপি। এর বিভিন্ন চরিত্র সমাজের রক্ষণশীল বা স্থবির শক্তিগুলির সাথে নানা মাত্রায় জড়িয়ে থাকার দরুন বহু বিষয়েই সামন্তবাদী সংস্কৃতি ও ঔপনিবেশিক স্বার্থের সঙ্গে আপস করে গড়ে উঠেছিল। নিরাপস চরিত্রের দেখা প্রায় মেলেই না। তা সত্ত্বেও এখানেও এমন দু-চারজন মানুষের সাক্ষাত মেলে যাঁরা জ্ঞানচর্চার ব্যাপ্তিতে ও গভীরতায় বিস্ময়কর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার দত্ত, রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রমুখ তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নাম। এবং এও উল্লেখনীয় যে অক্ষয় দত্ত এবং বিদ্যাসাগরের সমকালে অবস্থান করেও এই বহুমুখী প্রতিভার জোরেই রাজেন্দ্রলাল মিত্র নিজের জন্য একটি বিশিষ্ট স্থান অর্জন করে ফেলেছিলেন।
প্রসঙ্গত, বলে রাখা ভালো, বিদ্যাসাগরের পাণ্ডিত্য তাঁর রচনায় খুব সামান্যই উদ্ঘাটিত হয়েছে। যাঁরা তাঁকে ঠিকমতো বুঝেছেন—খুব অল্প লোকই বুঝেছেন—তাঁদের কাছে বিদ্যাসাগরের জ্ঞানবত্তা তাঁর অসংখ্য আন্দোলন কর্মের মধ্যে এবং তাঁর চরিত্রের নানা খুঁটিনাটি মহত্তর বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। জ্ঞানবুদ্ধির এমন ক্রিয়াশীল রূপ সচরাচর দেখতেই পাওয়া যায় না। আর যা কিছু তিনি লিখেছেন তা হয় স্কুল পড়ুয়াদের জন্য পাঠ্যপুস্তক, নয়ত, তাঁর সামাজিক আন্দোলনের সপক্ষে প্রচার পুস্তিকা। সেই সবের মধ্যে তাঁর প্রতিভার জাত চেনা গেলেও সেই প্রতিভা-জাত ফসলের ফুল ও ফলগুলিকে প্রায় দেখাই যায় না। সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে তাঁর কিছু চিঠিপত্রে বা স্মারকলিপিতে খুব সংক্ষেপে কোথাও কোথাও তাঁর বিদ্যাবুদ্ধির দীপ্তি ঝলসে উঠেছে। তবে সেই আলোর স্পর্শ আপামর মানুষ পেয়েছে কম, বরং কাগুজে-দলিল হিসাবে তাদের অনেক বেশি আস্বাদন করেছে সরকারি পুঁথিঘরের ষষ্ঠপদী পোকামাকড়েরা।
পক্ষান্তরে, অক্ষয় কুমার দত্ত এবং রাজেন্দ্রলাল মিত্র—এই দুজনের কেউই সামাজিক আন্দোলনের কর্মী বা সংগঠক ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন জ্ঞান কর্মী। বুদ্ধিবৃত্তির চাষি। অক্ষয় দত্ত বেছে নিয়েছিলেন দর্শনের ক্ষেত্র। বিজ্ঞান মনস্কতা প্রচারের কর্মযজ্ঞ। আর রাজেন্দ্রলাল কাজ করেছেন ইতিহাসের বিভিন্ন বিচিত্র কক্ষে। প্রাচীন ভারতের ইতিহাস সংক্রান্ত বিদ্যাচর্চাই তাঁর কর্মক্ষেত্র। তাঁদের বহুমুখী জ্ঞান তাই তাঁদের জ্ঞান-কর্মের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়েছে। আর প্রথাগত উচ্চ শিক্ষা বা ডিগ্রি না পেয়েও দুজনেই তাঁর তাঁর বিশেষ বিশেষ কর্মক্ষেত্রে তাঁরা আপন প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ের জোরে এমন এক উচ্চতায় উঠেছিলেন, যেটা আজও আমাদের কাছে প্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্তস্বরূপ। খুবই গর্বের কথা, ম্যাক্সম্যুলারের মতো একজন পাশ্চাত্য পণ্ডিতকে এক সময় বলতে শোনা গিয়েছিল, ইউরোপের সংস্কৃত পণ্ডিত ও ভারতবিদদের আরও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে নিজেদের শ্রেয়ত্ব ধরে রাখার জন্য, কেন না, ভারতের মাটিতে রাজেন্দ্রলাল মিত্রের আগমন হয়েছে। [Maxmüller 1868, 300]
দুটো বিশেষ গ্রন্থ রাজেন্দ্রলালকে এই দুর্লভ সম্মান এনে দিয়েছিল। প্রথমটি The Antiquities of Orissa (Vol. I, 1875; Vol. II, 1880), এবং দ্বিতীয়টি হল The Indo-Aryans (Vols I-II, 1881)। এই দুটিই তাঁর নিজের গবেষণামূলক সৃজন কর্ম। এর আগে তিনি এশিয়াটিক সোসাইটিতে যুক্ত থাকার সুবাদে নানা রকম পুঁথি পাঠ এবং সম্পাদনা করেছেন, তার উপর রিপোর্ট লিখেছেন; বিভিন্ন মুদ্রা, স্তম্ভ, মূর্তি, অনুশাসন ইত্যাদি নিয়ে কাজ করেছেন, বিবরণ দিয়েছেন বা বিশ্লেষণ করেছেন; বিভিন্ন জায়গার ভাস্কর্য স্থাপত্য ইত্যাদি নিয়ে প্রবন্ধ রচনা করেছেন, হিন্দু ও বৌদ্ধ প্রাচীন সাহিত্যের অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজ করেছেন। ইউরোপের পণ্ডিতদের কাছ থেকে সদ্য উদ্ভাবিত প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস রচনার পদ্ধতিগত কলাকৌশলগুলি আয়ত্ত করে ভারতের ইতিহাসের নানা টুকরো টুকরো অংশ পুনরুদ্ধারের কাজে লাগাচ্ছিলেন। এই সময়ে একদিন তিনি লক্ষ করলেন, অধিকাংশ বিদেশি পণ্ডিত ভারতের ইতিহাস, ভারতীয় সংস্কৃতিকে একটু যেন অবজ্ঞার চোখে দেখতে এবং খাটো করে দেখাতে চান। জাত্যাভিমান আহত হল তাঁর, পাণ্ডিত্যাভিমান পরীক্ষা করে দেখতে চাইল, এই অবজ্ঞার পেছনে সত্য কতখানি। তারই ফসল, ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের এই দুটি আকর গ্রন্থ।
ওড়িশা নিয়ে বইটার একটা পৃষ্ঠভূমি আছে। জোসেফ ফার্গুসন [Fergusson 1876] বা শ্রীমতী শার্লো ম্যানিং [Manning 1856] প্রাচীন ভারতের শিল্পকর্ম নিয়ে অনেক মূল্যবান কাজ করলেও, এবং সারা বিশ্বের সামনে তা সর্বপ্রথম তুলে ধরলেও, তাঁরা জোর দিয়ে বলেছিলেন, ভারতের প্রস্তর স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়, বড় জোর অশোকের আমল (খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দ) থেকে এর শুরু। এমনকি, তাঁদের মনে হয়েছিল, পাশ্চাত্য দেশগুলি থেকেই, গ্রিক স্থাপত্যবিদ্যা থেকেই ভারতীয়রা এই স্থাপত্যশিল্প আয়ত্ত করেছিল।* রাজেন্দ্রলালের এই থিসিসে সন্দেহ হয়েছিল। তিনি ঠিক করলেন, এই সিদ্ধান্তকে পরখ করে দেখতে হবে। কয়েকজন শিল্পী এবং স্থপতিকে সঙ্গে নিয়ে ১৮৬৮-৬৯ সালে বছর দুয়েক ওড়িশার প্রান্তে প্রান্তে ঘুরে বেড়ালেন। বিভিন্ন মন্দির, গুহা, ও অন্যান্য স্থাপত্য ভাস্কর্যের নিদর্শনগুলিকে নানা দিক থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিচার করলেন। বহু ছবি নকশা চার্ট তৈরি করালেন। তারপর ধীরে ধীরে জবাব দেবার জন্য কলম ধরলেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বইটি কিন্তু কেবলমাত্র জবাব দানে বা ভারতীয় ভাস্কর্যবিদ্যার স্বকীয়তা ও প্রাচীনত্ব প্রমাণে সীমিত রইল না। বিচিত্র উপকরণের বিস্তারিত বিবরণের সাথে যুক্ত হল ওড়িশার মানুষের সামাজিক সাংস্কৃতিক ক্রমবিকাশের একটা ছবি, স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের নানা পর্যায় ও বৈশিষ্ট্যের ইতিহাস, শৈব ধর্ম এবং বৈষ্ণব ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক প্রত্নচিহ্নের উদ্ঘাটন, নানা রকম লোককথার বাস্তব রহস্য উন্মোচন, ইত্যাদি। প্রসঙ্গত, এও আমরা জানতে পারি, কীভাবে ভারতীয় ঐতিহ্যে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বস্তু বা শক্তিই ধীরে ধীরে দেবদেবীর মর্যাদা লাভ করেছিল। “প্রকৃতপক্ষে পরিকল্পনানৈপুন্যে, তথ্য সংগ্রহের নিষ্ঠায় এবং তার বিন্যাসে, বিভিন্ন মতামত পর্যালোচনা ও স্বকীয় মত প্রতিষ্ঠায় এই গ্রন্থটি ভারতবিদ্যাচর্চায় একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিকর্মের নিদর্শন।” [রায় ১৯৬৯, ১৩৩]
এ কথা সত্য, আনুপুঙ্খিক তথ্যগত বিচারে বইটার গুরুত্ব আজ কিছুটা কমে যেতে বাধ্য। সেই অর্থে মিত্রের বহু সিদ্ধান্তই হয়ত আজ আর আধুনিক ইতিহাসবিদের কাছে গ্রাহ্য নয়। পুরাকীর্তির নিরিখে বিচার করলে হরপ্পা নগর সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর অন্তত দেড় হাজার বছর ধরে আর কোনো অনুরূপ সভ্যতার দেখা মেলে না। মোটামুটি সম্রাট অশোকের কাছাকাছি সময় থেকেই মগধ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে ভারতে আবার নতুন করে নগর নির্মাণের নজির পাওয়া যায়। সেই অর্থে ফার্গুসন বা ম্যানিং-এর সময়োল্লেখ সবটাই ভুল ছিল না। নকল নবিশির প্রশ্নটা অবশ্যই ভুল। কিন্তু ইতিহাস রচনায় পৌরাণিক কাহিনির প্রভাব বর্জন করে ক্ষেত্র সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানকে আশ্রয় করে একজন ভারতীয়র তরফে বাস্তবমুখী গবেষণার প্রথম প্রয়াস হিসাবে এবং তার পদ্ধতি প্রদর্শনের দিক থেকে এই গ্রন্থের মূল্য আজকের ছাত্রদের কাছে এতটুকুও কমেনি।
রাজেন্দ্রলাল তাঁর সময়ের তুলনায় কতটা এগিয়ে ছিলেন এখানে আপাতত একটাই উদাহরণ দেব। ভারতের অনেক মন্দিরের গায়ে নরনারীর নগ্ন চিত্র বা ভাস্কর্য তো দেখা যায়ই, তার মধ্যে অনেকগুলি আবার সরাসরি মৈথুন ক্রিয়ার দৃশ্য। ইউরোপীয় পণ্ডিতরা এগুলো দেখে অশ্লীল বলে শুধু নাক সিঁটকেছেন তাই নয়, তাঁরা এই গুলিকেই ভারতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার নিম্ন দশার চাক্ষুষ প্রমাণ হিসাবে ধরে নিয়েছেন। অথচ, মিত্র অত্যন্ত সঠিকভাবেই সমাজতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক অর্থে এই কারুকার্যগুলিকে এমন এক সমাজের শিল্প সৃষ্টি হিসাবে গণ্য করেছেন, যেখানে পশু পালন ও কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত উর্বরতা অনুষ্ঠান এবং লিঙ্গ ও যোনি সংশ্লিষ্ট যাদু প্রচলিত ছিল। নরনারীর মৈথুনক্রিয়ার প্রদর্শনও সেখানে উর্বরতা কেন্দ্রিক যাদু অনুষ্ঠানের সঙ্গেই মিলেমিশে ছিল। বাস্তব জীবনযাত্রা প্রসূত এই সব চিত্র ও ভাস্কর্যের সঙ্গে শ্লীলতা অশ্লীলতার কোনো সম্পর্কই ছিল না, “. . . most of the temples on which the offensive figures are shown being dedicated to the mystical adoration of the phallic emblem. From a very early period in the history of religion, the phallic element has held a prominent place in the mind of man.” [উদ্ধৃত, রায় ১৯৬৯, ১৫০] আজ থেকে প্রায় একশ পঞ্চাশ বছর আগে এরকম মন্তব্য লেখার দুঃসাহস তিনি কোত্থেকে পেলেন ভাবতেই আমরা অবাক হয়ে যাই। কেন না, ইউরোপে তখন সবে মাত্র টাইলরের Primitive Culture, Vols. I-II (১৮৭২) বইটা প্রকাশিত হয়েছে। জেমস ফ্রেজারের বারো খণ্ডের Golden Bough শীর্ষক বিশাল রচনার মুদ্রণ শুরু হবে রাজেন্দ্রলালের মৃত্যুর ঠিক পরের বছর (১৮৯২) থেকে।
হয়ত এইসব কিছু বিবেচনা করেই দক্ষিণ ভারতের আয়েঙ্গার এক সময় বলেছিলেন, “Mitra’s Antiquities of Orissa (2 vols.), in spite of adverse criticisms from interested sources, even today serve as an important source book and throw a flood of light on one of the most sequestered corners of Indian history.” [Iyenger 1922, 102; উদ্ধৃত, রায় ১৯৬৯, ১৩৫]
দ্বিতীয় গ্রন্থটিও প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক জনজাতির সদস্যদের সম্পর্কে প্রথম একটি তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস রচনার প্রয়াস। এতদিন পর্যন্ত তথাকথিত আর্য সংস্কৃতি ও সংস্কৃত সাহিত্য কোনো বিচার্য বিষয় ছিল না, বরং যে কোনো বিষয় বিচারের যাচকাঠি ছিল। বিদ্যাসাগর, যদিও ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে এবং ভিন্ন উদ্দেশ্যে, ইতিমধ্যেই সংস্কৃত শাস্ত্রগুলিকেও বিচার্য পর্যায়ভুক্ত করে ফেলেছিলেন, যখন তিনি শিক্ষা বিভাগের সচিবকে এক পত্রে জানান যে, তাঁর মতে সাংখ্য ও বেদান্ত দর্শন “ভ্রান্ত বিচার” এবং হিন্দু ষড় দর্শনের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মূলগ্রন্থ এবং তাদের টীকা বার্তিক করণ ও ভাষ্য ইত্যাদিতে “সারবস্তু কিছুই নেই” বলে মন্তব্য করেছিলেন। রাজেন্দ্রলাল, হয়ত নিজের অগোচরেই, এই চিন্তাধারাতে আরও দু চার পদক্ষেপ ফেলে এগিয়ে গেলেন এবং সুবিশাল সংস্কৃত সাহিত্য ভাণ্ডার থেকে প্রাচীন বিভিন্ন বৈদিক যুগীয় জনগোষ্ঠীগুলির জীবন ও সংস্কৃতির কী কী ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সেই রহস্য অনুধাবনে আত্মনিয়োগ করলেন। এই হল সংক্ষেপে তাঁর The Indo-Aryans বইটা রচনার পৃষ্ঠভূমি।
কী আছে সেই বইতে?
তিনি দেখালেন, বৈদিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা প্রথম থেকেই খুব সুসংস্কৃত, সভ্য, উন্নত জাতি ছিল বা তাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক ধর্মীয় আচার-বিচার উৎসব অনুষ্ঠান সব প্রাচীন কাল থেকে আজ অবধি একই রকম আছে—ভারতীয় ইতিহাস সম্পর্কে এগুলো কতগুলো বহুল প্রচলিত দীর্ঘলালিত ভুল ধারণা মাত্র। জীবন সংগ্রামের নিয়মে অপরাপর মানব গোষ্ঠীর মতোই বৈদিক জনগোষ্ঠীরও এই যাবতীয় প্রকরণ ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলেছে। যুগে যুগে নতুন নতুন রূপ ধারণ করেছে। আজ তারা যে ধরনের জীবন যাপন করছে, যে রকম ধর্ম চর্চা করছে, সমাজ জীবনে যে সমস্ত উৎসব অনুষ্ঠান আচার আচরণ প্রথা প্রকরণ পালন করছে, এগুলো তাদের চিরাচরিত অপরিবর্তিত রীতি রেওয়াজ নয়।
আমরা এই ব্যাপারে দুটো খুব আকর্ষণীয় উদাহরণ দেব।
প্রথমত, তিনি দেখালেন, পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মতোই, ভারতীয় বৈদিক জনজাতির মানুষেরাও একেবারে প্রাচীন কালে শুরু থেকেই মৃতদেহকে দাহ করত না; একেবারে প্রথমে বনে জঙ্গলে মৃতদেহ ফেলে আসত; তারপর হয়ত নদীর জলে ভাসিয়ে দিত (এখনও সর্পদষ্ট মৃতদেহ জলেই ফেলা দেওয়া হয়ে থাকে); আরও পরে তারা লাশ মাটিতে গর্ত খুঁড়ে কবর দিত (একালেও শিশুদের মৃতদেহ এভাবেই কবরস্থ করা হয়); অথবা, কোনো নির্দিষ্ট খোলামেলা স্থানে ফেলে আসত। প্রাচীন ইরানীয় জরথুস্ট্রীয়দের এরকমই ছিল শব সৎকারের পদ্ধতি; এবং আধুনিক পার্শিদের মধ্যে এখনও সেই পদ্ধতি চালু রয়েছে। এর পরে কোনো এক সময় থেকে শব দেহকে পোড়ানোর রীতি প্রচলিত হয়। এমনকি, প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় ‘শ্মশান’ শব্দটার ব্যাকরণগত আদি ব্যুৎপত্তির মধ্যেও দাহ করার বা দহন সংক্রান্ত কোনো ইঙ্গিত নেই; আছে শায়িত করার ডানচ্‌ প্রত্যয় যোগে নিষ্পন্ন স্থান বাচক নির্দেশ। খ্রিঃ পূঃ চতুর্দশ বা ত্রয়োদশ শতাব্দ থেকে ভারতে আগত বৈদিক গোষ্ঠীসমূহ ছিল যাযাবর পশুপালক ও যুদ্ধবাজ সম্প্রদায়ের সমাজভুক্ত। আদ্যিকালে তাদের যেহেতু তখন স্থায়ী বসতি স্থাপনের কোনো উদ্যোগ ছিল না, তাই তাদের পক্ষে কোথাও স্থায়ী শ্মশান নির্মাণ করে রেখে গোষ্ঠীভুক্ত কেউ মারা গেলে ঘুরতে ঘুরতে অন্য দূরস্থান থেকে ফিরে এসে সেখানে মৃতের সৎকার করা স্বাভাবিক পদ্ধতি কিছুতেই হতে পারত না। কৃষিতে অভ্যস্ত হয়ে যখন থেকে তারা স্থায়ী বসতি গঠনের কাজ শুরু করে তারপরেই একমাত্র ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট স্থানে, অর্থাৎ, শ্মশানে শবদাহ প্রথায়ও তারা হয়ত অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।**
প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়ে বলি, রাজেন্দ্রলালও এই সব বিষয় আলোচনা করতে করতে খানিকটা যেন অপ্রাসঙ্গিকভাবেই বৈদিক যুগে হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহের প্রথার কিছু কিছু উদাহরণ তুলে ধরেন। অর্থাৎ, তাঁর এই রচনা যদি নিতান্তই বিদ্যায়তনিক পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের জন্য লেখা হত, তাহলে হয়ত এই সব বিষয় উত্থাপন করাই হত না। স্বাভাবিক। কিন্তু রাজেন্দ্রলালের কাছে এই সমস্ত বিষয়ে আলোচনার গুরুত্ব তাঁর দেশের মানুষকে সত্যের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যই। তাই তিনি সংস্কারমুক্ত মন গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান পেলে তাকে কাজে লাগিয়েছেন। আবার এইভাবেই তিনি বিদ্যাসাগরের আন্দোলনকে একটা বিরাট ঐতিহাসিক সমর্থন যুগিয়েছিলেন।
দ্বিতীয়ত, একটি মোক্ষম জায়গায় হাত দিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন, বর্তমান কালে যে সমস্ত হিন্দু মৌলবাদী শক্তি গরুকে দেবতা ও মাতা জ্ঞানে পূজা করা এবং গোরক্ষার নামে গোমাংস ভোজনের বিরুদ্ধে হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধুয়ো তুলছে এবং তার দ্বারা মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হিন্দুদের উত্তেজিত করছে, তারা আসলে বেদ বিরোধী ও পবিত্র হিন্দুশাস্ত্র বিরোধী কথা বলছে। তাঁর এই গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ষষ্ঠ অধ্যায়ের শিরোনাম Beef in Ancient India; এবং এতে ঋগ-বেদ, অন্যান্য সংহিতা, রামায়ণ মহাভারত ও অন্যান্য পুরাণ, কিছু কিছু উপনিষদ, চরক সংহিতা, সুশ্রুত সংহিতা, মনুস্মৃতি ও অন্যান্য স্মৃতি শাস্ত্র এবং সংস্কৃত নাটক গুচ্ছ (উত্তর রামচরিত, মহাবীর চরিত, ইত্যাদি) থেকে উদাহরণের পর উদাহরণ তুলে তুলে তিনি সন্দেহাতীতভাবে দেখালেন, প্রাচীন ভারতীয় জনসাধারণের কাছে গোমাংস ভোজন কতটা জনপ্রিয়, উপাদেয় এবং, কোনো কোনো ক্ষেত্রে, এমনকি বাধ্যতামূলক ছিল। অতীত ইতিহাসকে এইভাবে সাম্প্রতিক অন্ধ বিশ্বাসের বেড়াজাল থেকে উদ্ধার করে আনার প্রথম দৃষ্টান্ত হিসাবে রাজেন্দ্রলালের এই বইটিও আজকের ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের ছাত্রদের কাছে এক গভীর তাৎপর্য বহন করে। অলোক রায় লিখেছেন, “এই প্রবন্ধটি শুধু সে-যুগে নয়, এ-যুগেও চিত্তের ঔদার্যে, যুক্তি নির্ভরতায়, তথ্য উদ্ঘাটনে এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। . . . সমগ্র প্রবন্ধের মধ্যে কোথাও কৌতুক বা শ্লেষ, ব্যক্তিগত পক্ষপাত বা উত্তেজনা প্রকাশ পায়নি। নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকের মতোই তিনি শুধু তথ্য সংগ্রহ করেছেন, কিন্তু ঔচিত্য-অনৌচিত্যের প্রশ্ন তোলেননি।” [রায় ১৯৬৯, ১৭১] তাঁরই প্রদর্শিত পথ ধরে ধীরে ধীরে আরও অনেক মনীষী ভারত ইতিহাস সম্পর্কে আর্য-মিথ এবং তথাকথিত আর্যশ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যা ধারণাগুলিকে দূর করার কাজে এগিয়ে এসেছিলেন। তাই বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যপৃক্ত ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে রাজেন্দ্রলাল মিত্র আমাদের দেশে নিঃসন্দেহে পথিকৃৎ।
তাঁর এই ভূমিকা আমাদের দেশের চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীল শক্তি হিসাবে সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপি নেতাদের পছন্দ হয়নি। ১৯৯৯ সালে স্থায়ীভাবে কেন্দ্রীয় সরকারি ক্ষমতায় বসার সুযোগ পেতেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই সব স্কুলপাঠ্য ইতিহাস বইয়ের উপর, যেখানে যেখানে রাজেন্দ্রলাল মিত্রের নামের উল্লেখ এবং কাজের বিবরণ ছিল। সি বি এস সি বা কেন্দ্রীয় মধ্য শিক্ষা পর্ষদের অন্তর্ভুক্ত এই জাতীয় পাঠ্যবইগুলিকে তারা সিলেবাস থেকে উঠিয়ে দেয় এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রদের ক্ষেত্রে, যারা ইতিপূর্বেই বইগুলি কিনে ফেলেছিল এবং তার উপর ক্লাশ শুরু হয়ে গিয়েছিল, শিক্ষা সম্বন্ধীয় গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জাতীয় পরিষদ (NCERT) এবং কেন্দ্রীয় স্কুল শিক্ষা দপ্তর (CBSE) ২০০২ সালে সমস্ত অনুমোদিত বিদ্যালয়ে সার্কুলার দিয়ে নির্দেশ পাঠায়, শিক্ষকরা যেন ছাত্রদের কাছ থেকে বইগুলো চেয়ে নিয়ে রাজেন্দ্রলাল মিত্রের নাম ও বক্তব্যের মুদ্রিত অংশগুলো গাঢ় কালো কালি বুলিয়ে ঢেকে দেন। [Official notices; cited, Mukherjee and Mukherjee 2001]
আক্রোশের গভীরতাটা লক্ষণীয় এবং শিক্ষণীয়। আমাদের যাদের তাঁকে মনে রাখার কথা ছিল, তারা তাঁকে ভুলে গেলেও, ওরা কিন্তু রাজেন্দ্রলালকে ভোলেনি। ভোলাতেও ভোলেনি। প্রথম সুযোগ আসতেই হামলে পড়েছিল।
রাজেন্দ্রলাল সেদিন এই সব পুরাতাত্ত্বিক গবেষণার জগতে কী উচ্চ সম্মানের অধিকারী ছিলেন, আর একটি ঘটনা ও গ্রন্থ প্রসঙ্গের উত্থাপন তা পরিষ্কার করে দেবে। ১৮৭৭ সালে বর্মা থেকে একদল বৌদ্ধ স্থপতি এসে বিহারের গয়ায় বৌদ্ধ মন্দিরটি সংস্কার ও পরিষ্কার করার কাজে হাত দেন। এই কাজ করতে করতে তাঁরা একদিকে অনেক নতুন নতুন প্রত্ন উপাদান যেমন খুঁজে পেয়েছিলেন, অন্যদিকে তেমনি না বুঝে অনেক জিনিস নষ্টও করে ফেলতে থাকেন। বাংলার সরকারের তরফ থেকে তখন রাজেন্দ্রলালকে ডেকে দায়িত্ব দেওয়া হল, তাঁদের কাজ রক্ষণাবেক্ষণ করতে এবং পুরো বিষয়টির উপর একটি পুরাতাত্ত্বিক রিপোর্ট তৈরি করতে।
মনের মতো কাজ। মিত্র ঝাঁপিয়েও পড়লেন। এক বছর সংস্কার কর্মের তত্ত্বাবধান করার সময় তিনি নিজের উদ্যোগেও অনেক ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহ করলেন। তারই ভিত্তিতে রচিত হল আর একটি অসাধারণ গ্রন্থ, Buddha Gaya, the Hermitage of Sakyamuni (১৮৭৮)। ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত এই বিশাল বইটিতেও রাজেন্দ্রলাল বুদ্ধগয়ার অবস্থান, ভৌগোলিক বিবরণ, অতীত ও বর্তমানের বিবর্তনের ইতিহাস, বুদ্ধদেবের সঙ্গে সম্পর্ক, স্থাপত্য ভাস্কর্য ও শিল্পকর্মের বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা, শিলালিপির নিদর্শন, ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। পুর্বসুরীর মত যেমন অনেক ক্ষেত্রে গ্রহণ করেছেন, আবার বহু ক্ষেত্রে যুক্তি সহ বর্জন করে নিজস্ব চিন্তার ভিত্তিতেই বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়েছেন।
গোটা উনিশ শতক জুড়ে ভারত ইতিহাসের এই বিজ্ঞানসম্মত নির্মাণ কাণ্ডে ভারতবাসীর তরফে রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রায় একা, একেবারে নিঃসঙ্গ। হয়ত এই কারণেই ভারত ইতিহাসও আজ পর্যন্ত তাঁকে নিঃসঙ্গ করেই রেখেছে!
অথচ দুঃখের কথা হল, তাঁর সাধনার ফসলে শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই নন, আরও অনেকেই ভাগ নিয়েছেন। কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকৃতিও দিয়েছেন। শিবনাথ শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রমেশ চন্দ্র দত্ত, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, এমনই আরও কেউ কেউ। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তো তাঁর সহকারী হিসাবে এশিয়াটিক সোসাইটির সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং সেখানে তাঁরই পদচিহ্নিত পথরেখায় দীর্ঘকাল ধরে ভারতের প্রাচীন সম্পদ উদ্ধারে হাত লাগিয়েছিলেন। অনেকেই আজ শুনলে হয়ত অবাক হবেন, প্রফুল্লচন্দ্র তাঁর দুই খণ্ডে প্রকাশিত A History of Hindu Chemistry শীর্ষক বিখ্যাত বনেদি গ্রন্থটি রচনার সময় মিত্রের কাজের দ্বারা নানাভাবে উপকৃত হয়েছেন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি তাঁরা যদি সকলে মিলে তাঁর স্মৃতিরক্ষার চেষ্টা করতেন, তাহলে আজ হয়ত রাজেন্দ্রলাল ভারতীয় জনমানসের স্মৃতিসৌধের একেবারে নীচের তলায় অন্তত স্থায়ীভাবে একটা ছোট কক্ষ পেতে পারতেন।
তা-ও বা হল কই?
-----------------------------
*এখানে মনে রাখতে হবে, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে সৃষ্ট হরপ্পা মহেন-জো-দারোর প্রাচীন নগর সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ তখনও পর্যন্ত মাটির নীচে বা গভীর জঙ্গলে চাপা পড়েছিল। সেই সব প্রত্নক্ষেত্রে খনন কার্য শুরু হতে হতে রাজেন্দ্রলালের মৃত্যুর পর অন্তত দুই দশক কেটে যায়।

**এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে শ্মশান শব্দটির মধ্যেই আর একটি নিকটাত্মীয় শব্দ লুকনো রয়েছে, ‘মশান’, যার অর্থ বধ্যস্থান বা অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার স্থান। ‘শ্মশান-মশান’ প্রাচীন ও মধ্য যুগের বাংলা ভাষায়, বিশেষ করে শাক্ত আচার সম্বন্ধীয় ক্রিয়া (অর্থাৎ, পশুবলি) বোঝাতে প্রায়শই এক যুগ্ম-শব্দ হিসাবে ব্যবহৃত হত। এই দিক থেকে বিচার বিবেচনা করলেও শ্মশান কথাটার সাথে দহন ক্রিয়ার স্পষ্ট সম্বন্ধের অনুপস্থিতি অনুমান করা সহজ হয়।

451 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: Debabrata Chakrabarty

Re: রাজেন্দ্রলাল মিত্র: উনিশ শতকের ভারতবিদ্যা পথিক

অশোক বাবু ,খুব ভালো প্রবন্ধ পড়ছি বহুদিন পরে , বাকিরাও নিশ্চয়ই পড়বেন -একটি ছোট জিজ্ঞাসা Beef in Ancient India; প্রবন্ধটি কি রাজেন্দ্রলাল বাবু এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে প্রথম প্রকাশ করেন ?
আপনার " শ্মশান শব্দটির মধ্যেই আর একটি নিকটাত্মীয় শব্দ লুকনো রয়েছে, ‘মশান’" শব্দটি শুনে মনে পড়ল নেপালে মূলত কাঠমান্ডু তে শ্মশান কে ওনারা এখনো পর্যন্ত " মশান "ই বলেন । কেন বলেন তা নিয়ে তখন অবশ্য ভাবিনি ।

তৃতীয় পর্বের আশায় থাকলাম । আপনি কি লেখায় আনন্দচন্দ্র মিত্র ( (1854-1903)'র কথা আনবেন ?
Avatar: ashoke mukhopadhyay

Re: রাজেন্দ্রলাল মিত্র: উনিশ শতকের ভারতবিদ্যা পথিক

লেখাটির প্রতি মনোযোগ দেবার জন্য ধন্যবাদ! এক এক করে বলি। নেপালের ব্যাপারটা আমি ঠিক জানি না। শ্মশানের কথ্য রূপ হিসাবে অপভ্রংশ হয়ে মশান হতে পারে (হিন্দিভাষীরা যেমন এস্‌মশান বলেন), আবার আলাদা শব্দ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। যাই হয়ে থাকুক, আমার প্রধান অভিপাদ্যকে খণ্ডন করছে না। দুই, আনন্দচন্দ্র মিত্রকে নিয়ে কিছু লিখিনি। আপনার কি প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে? তিন, "বীফ" প্রবন্ধটি প্রথম সম্ভবত আলাদাভাবে ছাপা হয়েছিল। পরে বইটির ৬ষ্ঠ অধ্যায় হিসাবে যুক্ত হয়। কোথায় আমার জানা নেই। খুঁজে দেখব।
Avatar: ashoke mukhopadhyay

Re: রাজেন্দ্রলাল মিত্র: উনিশ শতকের ভারতবিদ্যা পথিক

আর একটা কথা। তৃতীয় পর্ব কিন্তু এসে গেছে। এখন চতুর্থ পর্বের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
Avatar: রৌহিন

Re: রাজেন্দ্রলাল মিত্র: উনিশ শতকের ভারতবিদ্যা পথিক

এই লেখাটা ক্রমশঃ আরো ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠছে। ২০০২ সালের ওই সার্কুলার তাহলে সত্যিই বেরিয়েছিল এবং এক্সিকিউটেড হয়েছিল? হুম্মম -
Avatar: ranjan roy

Re: রাজেন্দ্রলাল মিত্র: উনিশ শতকের ভারতবিদ্যা পথিক

"জামাই শ্মশানে মশানে ঘোরে ঘরের ভাবনা ভাবে না"--আগমনী গান।
" ভাল ভাল, তুমি দেখবো পালাও কোথা,
মশানে তোমার শূল রয়েছে পোঁতা"। (শ্যামা)।
Avatar: pi

Re: রাজেন্দ্রলাল মিত্র: উনিশ শতকের ভারতবিদ্যা পথিক

ইণ্টারেস্টিং। অনেক কিছু জানতে পারছি। আগে নাম আর সামান্য কিছু বাদে সেভাবে জানতাম না, স্বীকার করতে লজ্জা নেই।
কিন্তু সেটার থেকেই মনে হচ্ছে, আমারা ইতিহাসে রাজেন্দ্রলাল মিত্রকে কীভাবে পড়েছি ? আমাদের মধ্যশিক্ষা পর্ষদের বইতে রাজেন্দ্রলাম মিত্র কীভাবে আসতেন বা এখন আসেন ? বিজেপি তাই নিয়ে কোন সমস্যা করেনি ?
আর কেন্দ্রীয় মধ্যশিক্ষা পর্ষদের বইতে রাজেন্দ্রলাল মিত্রের কোন কোন বক্তব্য কীভাবে থাকতো, যেগুলো কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল ? এখনকার বইতেও কি নেই নাকি আবার ফেরানো হয়েছিল মাঝের কং আমলে ?
Avatar: ashoke mukhopadhyay

Re: রাজেন্দ্রলাল মিত্র: উনিশ শতকের ভারতবিদ্যা পথিক

@রৌহিন ব্যানার্জি: হ্যাঁ, সার্কুলারটা বেরিয়েছিল। আমি মূল পাঠে ভুল করে ২০০২ লিখেছি। ওটা বেরিয়েছিল ২৩ অক্টোবর ২০০১। দুই কর্তৃপক্ষ থেকেই একই দিনে। সতীশ চন্দ্র এবং দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ ঝা—এই দুজনের লেখা ইতিহাস বই পাঠ্য ছিল সিবিএসই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে। বইদুটোতেই রাজেন্দ্রলাল মিত্রের নাম দিয়ে হিন্দুত্ব বিরোধী কিছু কথা ছিল। ২০০২ থেকে বইগুলো বাদ হয়ে যায় (না, কংগ্রেস আমলে আর সেগুলো ফিরিয়ে আনা হয়নি)। ২০০১ সালে যেহেতু ছাত্রদের হাতে বইগুলো ছিল, তাই শিক্ষকদের ওরকম অদ্ভুত একটা নির্দেশ দেওয়া হয়। আমি তখন খড়্গপুরে ছিলাম এবং কিছু ছাত্রকে প্রাইভেটে পড়াতাম (অবশ্যই ইতিহাস নয়)। ফলে কালির খেলা দেখার সৌভাগ্যও হয়েছিল। ও হ্যাঁ, সেই সময় দ্বিজেনবাবুর উপর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকবার হামলা হয়। তিনি তখন পুলিশ সঙ্গে নিয়ে ক্লাশ নিতে যেতেন। এই ব্যাপারে দেখুন আরো তথ্য এখানে:
https://blog.mukto-mona.com/2016/03/23/48652/
পশ্চিম বঙ্গের মধ্যশিক্ষা পর্ষদের বইতে এসব কোনোকালেই থাকেনি+না। বামপন্থার আলোকে এসব আমরা কবেই জেনে গেছি কিনা!
Avatar: অর্জুন অভিষেক

Re: রাজেন্দ্রলাল মিত্র: উনিশ শতকের ভারতবিদ্যা পথিক


এটা তুললাম।
Avatar: রঞ্জন

Re: রাজেন্দ্রলাল মিত্র: উনিশ শতকের ভারতবিদ্যা পথিক

অনেক ধন্যবাদ অর্জুন।
এই লেখাটা খুঁজছিলাম। এই সময়ে খুব দরকারি লেখা।
Avatar: রঞ্জন

Re: রাজেন্দ্রলাল মিত্র: উনিশ শতকের ভারতবিদ্যা পথিক

অশোকবাবু,
রাজেন্দ্রলাল মিত্রের 'ইন্দো-এরিয়ান' বইটি কোথায় পাওয়া যাবে? বা অলোক রায়ের বইটি? আমার খুব দরকার।
Avatar: অর্জুন অভিষেক

Re: রাজেন্দ্রলাল মিত্র: উনিশ শতকের ভারতবিদ্যা পথিক


Asiatic Societyতে খোঁজ করে দেখতে পারেন। ওদের publication পুরনো সব বই নূতন করে ছাপছে, ছবির প্রিন্ট-ও। বইমেলায় দেখলাম।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন