সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • অরফ্যানগঞ্জ
    পায়ের নিচে মাটি তোলপাড় হচ্ছিল প্রফুল্লর— ভূমিকম্পর মত। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেন কেউ আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে— সেই প্রচণ্ড কাঁপুনিতে ফাটল ধরছে পথঘাট, দোকানবাজার, বহুতলে। পাতাল থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছিল। ঝোড়ো বাতাস বইছিল রেলব্রিজের দিক থেকে। প্রফুল্ল দোকান থেকে ...
  • থিম পুজো
    অনেকদিন পরে পুরনো পাড়ায় গেছিলাম। মাঝে মাঝে যাই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়। বন্ধুদের মা-বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ভাল লাগে। বেশ রিজুভিনেটিং। এবার অনেকদিন পরে গেলাম। এবার গিয়ে শুনলাম তপেস নাকি ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একটু পরে তপেসও এল ...
  • কাঁসাইয়ের সুতি খেলা
    সেকালে কাঁসাই নদীতে 'সুতি' নামের একটা খেলা প্রচলিত ছিল। মাছ ধরার অভিনব এক পদ্ধতি, বহু কাল ধরে যা চলে আসছে। আমাদের পাড়ার একাধিক লোক সুতি খেলাতে অংশ নিত। এই মৎস্যশিকার সার্বজনীন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়। মনে আছে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ...
  • শুভ বিজয়া
    আমার যে ঠাকুর-দেবতায় খুব একটা বিশ্বাস আছে, এমন নয়। শাশ্বত অবিনশ্বর আত্মাতেও নয়। এদিকে, আমার এই জীবন, এই বেঁচে থাকা, সবকিছু নিছকই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া, এমনটা সবসময় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না - জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পরিণ...
  • আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই...
    দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। দেশের সবচেয়ে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে বুয়েট। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছু বরাহ নন্দন! কাওকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কি খুব সহজ কাজ? কতটুকু জোরে মারতে হয়? একজন মানুষ পারে ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭
    চন্দ্রপুলিধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন ...
  • গুমনামিজোচ্চরফেরেব্বাজ
    #গুমনামিজোচ্চরফেরেব্...
  • হাসিমারার হাটে
    অনেকদিন আগে একবার দিন সাতেকের জন্যে ভূটান বেড়াতে যাব ঠিক করেছিলাম। কলেজ থেকে বেরিয়ে তদ্দিনে বছরখানেক চাকরি করা হয়ে গেছে। পুজোর সপ্তমীর দিন আমি, অভিজিৎ আর শুভায়ু দার্জিলিং মেল ধরলাম। শিলিগুড়ি অব্দি ট্রেন, সেখান থেকে বাসে ফুন্টসলিং। ফুন্টসলিঙে এক রাত্তির ...
  • দ্বিষো জহি
    বোধন হয়ে গেছে গতকাল। আজ ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ, সন্ধ্যাবেলায় আমন্ত্রণ ও অধিবাস। তবে আমবাঙালির মতো, আমারও এসব স্পেশিয়ালাইজড শিডিউল নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই তেমন - ছেলেবেলা থেকে আমি বুঝি দুগ্গা এসে গেছে, খুব আনন্দ হবে - এটুকুই।তা এখানে সেই আকাশ আজ। গভীর নীল - ...
  • গান্ধিজির স্বরাজ
    আমার চোখে আধুনিক ভারতের যত সমস্যা তার সবকটির মূলেই দায়ী আছে ব্রিটিশ শাসন। উদাহরণ, হাতে গরম এন আর সি নিন, প্রাক ব্রিটিশ ভারতে এরকম কোনও ইস্যুই ভাবা যেতো না। কিম্বা হিন্দু-মুসলমান, জাতিভেদ, আর্থিক বৈষম্য, জনস্ফীতি, গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অভাব, শিক্ষার অভাব ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

মহিষাসুরমর্দিনী

অভিষেক ভট্টাচার্য্য

শব্দটা হঠাৎ কানে যেতেই বাবুসোনা বুঝে গেছিল ব্যাপারটা। আর তাই অন্য সবাই চমকে উঠলেও সে চমকায়নি। ছুঁচে সুতো পরাতে পরাতে কাজ না থামিয়েই জিভ দিয়ে চুকচুক করে একটা আওয়াজ করে কেবল বলেছিল, 'আবার গেল একটা!'
অবশ্য ঠিক করে বিশ্লেষণ করে দেখলে বোঝা যায় এই শব্দে বাবুসোনার আশ্চর্য হবার মত কিছুই ছিল না। শোক পাবার তো নয়ই। এর আগে জীবনে আরো তিন-তিনবার শব্দটা শুনেছে সে। ঠিক এই এক প্রাবল্য, এক কম্পাঙ্ক, একই স্থায়িত্ব। সেই একই উৎস থেকে সেই একইভাবে ভেসে এল ক্লান্তিহীন সেই একঘেয়ে শব্দ। কিছুটা যেন চাপা বিস্ফোরণের মত। বাংলা ভাষার বর্ণমালার কোনো অক্ষর দিয়ে সেটাকে প্রকাশ করতে গেলে হয়তো বলা যায় দুপ। বা ধুপ। আর অন্য কোনো শব্দের সাথে তুলনা টানতে গেলে বোধহয় বলা চলে সেটা কিছুটা লরির টায়ার ফাটার শব্দের সাথে কিছুটা চকোলেট বোমের শব্দের মিশেল। টায়ার ফাটার আওয়াজের শেষদিকের আনুনাসিক অনুস্বারজাতীয় ধ্বনিটাও তাতে ছিল কিছুটা আবার চকোলেটের পুরুষতান্ত্রিক হেঁড়ে 'গুম'-টাও ছিল। এই দুইয়ের মিশ্রণ বাবুসোনা ভালো করেই চেনে। তাই ছুঁচে সুতোটা ঠিকই গলে গেছিল তার। হাতেরা চমকে উঠে বিদ্রোহ করেনি এক মিলিসেকেন্ডের জন্যেও। তাছাড়া দোকানে ঘটর-ঘটর করে সেলাই মেশিন চলছে তখন। বাকি রয়েছে আরো সতেরোটা জামা, তেরোটা প্যান্ট, সাতটা ব্লাউজ। হাতে আর শুধু চতুর্থী আর পঞ্চমী। অতএব সাংবিধানিক দিক থেকে দেখলে এই শব্দে বাবুসোনার কাজ থামানোর বা দৌড়ে যাবার কথা নয়।
তবে সংবিধানের বাইরেও তো কিছু জিনিস মাঝেমধ্যে থেকে যায়। যেমন জিভ দিয়ে করা ঐ চুকচুকটা। কেন করল ওটা বাবুসোনা? রাস্তার ওভারহেড তারে ঠেকে গিয়ে কে মরছে না মরছে তাতে তো তার জিভের দুঃখিত হবার কথা নয়! না, একেবারেই নয়।
মরেছিল নিতাই। একেবারে বেগুনপোড়া হয়ে। ব্যাপারটা বুঝে চারিদিকে হৈচৈ যতক্ষণে পড়েছে ততক্ষণে ভুশভুশিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে শরীর থেকে তার। তারগুলোর ওপরেই এলিয়ে পড়েছিল কিনা সে। তার শরীরের ভারে একটু বেঁকে চকচকে চারখানা তার ফটাফট শব্দ করে তখনও ইলেকট্রিক ফুলঝুরির মত ফুলকি ছিটোচ্ছে আর নিতাই তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুড়ে কালো হয়েও ধোঁয়া বের করে চলেছে সমানে। প্রাথমিক বিস্ফোরণটা অবশ্য থেমে গেছে ততক্ষণে। চোখ-ধাঁধাঁনো ফ্ল্যাশটাও।
তেমন বিরাট কিছু গন্ডগোল অবশ্য করেনি নিতাই। অ-সাংবিধানিক বলতে দোষের মধ্যে প্যান্ডেলের প্রায় একেবারে মাথায় চড়ে বাঁশে পেরেকটা মারবার সময়ে হাতুড়িশুদ্ধু হাতটা মাথার একটু বেশিই ওপরে তুলে ফেলেছিল। ঠেকে গেল তারে। সঙ্গে সঙ্গেই ফ্ল্যাশ আর চাপা বিস্ফোরণ। তারপর ধোঁয়া। প্রথমে অল্প, তারপরে গলগল করে। চারখানা তার আর নিতাইয়ের বডিখানা দিয়ে হুহু করে কোটি কোটি ইলেকট্রন বয়ে চলেছে তখন।
বন্ধ হল মিনিটদুয়েক পরে। কেউ অফ করেছিল লাইনটা। হওয়ার পরেও অবশ্য তারের আসন থেকে নামতে চায়নি নিতাই। ঝুলছিল ঘাড় লটকে। আর বেআক্কেলে, বেয়াদব, বেরসিক তারেরা হঠাৎ নিরীহ হয়ে পড়ে যেন কিছুই জানে না এমনি ভাব করে হাওয়ায় দুলছিল অল্প-অল্প। নিতাইয়ের লাশটাকে নিয়েই। নিচে শ'খানেক লোক জমা হয়েছে ততক্ষণে।
তারপরে আর বিশেষ কিছু হয়নি। প্যান্ডেলের পনেরোআনা তৈরি হয়েই গিয়েছিল তাই পুজো আর আটকায়নি। পুলিশ এসেছিল মিনিট চল্লিশেক পরেই অবশ্য। বাঁশ দিয়ে বাড়ি মেরে লাশটাকে নিচে ফেলে গাড়ি করে নিয়ে চলে যাওয়া হল পোস্টমর্টেমের জন্য। নিতাইয়ের বৌ এল, যথারীতি বুক চাপড়ে কাঁদলও। ক্ষতিপূরণের কথাও ঘোষণা করলেন পুজো-কমিটি। ওভারহেড তারের এত কাছে প্যান্ডেল করা হয়েছে কেন - এই নিয়ে মুখে মুখে যে চাপা প্রশ্নটা উঠেছিল সেটা থেমে গেল কাউন্সিলরের হস্তক্ষেপে। বাবুসোনা ঠিক সময়ে কাজ শেষ করল, মাপে ভুল করল না। তার খদ্দেরেরা এসে ষষ্ঠীর আগেই নিজের নিজের মাল নিয়ে ষষ্ঠীর সকালে বেরিয়ে পড়ল কালচে চাউমিন আর সস্তা এগরোল খেতে। ষষ্ঠীতে যথারীতি বেজে উঠল ঢাক। শাস্ত্রবিধি মেনে মা এলেন, অসুরবধ করলেন, জয়ী হলেন। পরাজিত হল বিরোধীপক্ষ। যেমন চিরকাল হয়।
শুধু ছোট্ট একটা অ-সাংবিধানিক ব্যাপার ঘটেছিল। খুবই ছোট্ট। পুড়ে কালো হয়ে তারের সাথে সেঁটে থাকবার সময়ে আর তারপরে কালো গাড়িতে চড়ে মর্গে যাবার সময়েও নিতাইয়ের বুকে ছিল একটা বিরাট ক্ষত, ওখানে একটা তার ঠেকে ছিল বলে জামা পুড়ে গিয়ে দগদগে ঘা তৈরি হয়েছে বিরাট একটা। আর বাঁ-হাতটা তখনও মাথার ওপরে তোলা ছিল। হাতুড়িশুদ্ধু। কাকে মারবার জন্যে কে জানে! সব মিলিয়ে তার লাশটার পোজটা যেরকম হয়েছিল সেটার সাথে প্যান্ডেলের ভেতরের মাটির মূর্তিগুলোকে মিলিয়ে দেখলে কোনো একটার সাথে মিল পাওয়া যেত স্পষ্ট।

184 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন