অবন্তিকা RSS feed

দিবারাত্রির চব্য

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বার্সিলোনা - পর্ব ২
    বার্সিলোনা আসলে স্পেনের শহর হয়েও স্পেনের না। উত্তর পুর্ব স্পেনের যেখানে বার্সিলোনা, সেই অঞ্চল কে বলা হয় ক্যাটালোনিয়া। স্বাধীনদেশ না হয়েও স্বশাসিত প্রদেশ। যেমন কানাডায় কিউবেক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মনে হয় এরকম একটা জায়গা থাকে, দেশি হয়েও দেশি না। ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ১
    ঠিক করেছিলাম আট-নয়দিন স্পেন বেড়াতে গেলে, বার্সিলোনাতেই থাকব। বেড়ানোর সময়টুকুর মধ্যে খুব দৌড় ঝাঁপ, এক দিনে একটা শহর দেখে বা একটা গন্তব্যের দেখার জায়গা ফর্দ মিলিয়ে শেষ করে আবার মাল পত্তর নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ভোর রাতে রওনা হওয়া, আর এই করে ১০ দিনে ৮ ...
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    (টিপ্পনি : দক্ষিণের কথ্যভাষার অনেক শব্দ রয়েছে। না বুঝতে পারলে বলে দেব।)দক্ষিণের কড়চা▶️এখানে মেঘ ও ভূমি সঙ্গমরত ক্রীড়াময়। এখন ভূমি অনাবৃত মহিষের মতো সহস্রবাসনা, জলধারাস্নানে। সামাদভেড়ির এই ভাগে চিরহরিৎ বৃক্ষরাজি নুনের দিকে চুপিসারে এগিয়ে এসেছে যেন ...
  • জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-১৪
    তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায়...আসলে যে কোনও শিল্প উপভোগ করতে পারার একটা বিজ্ঞান আছে। কারণ যাবতীয় পারফর্মিং আর্টের প্রাসাদ পদার্থবিদ্যার সশক্ত স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। পদার্থবিদ্যার শর্তগুলি পূরণ হলেই তবে মনন ও অনুভূতির পর্যায় শুরু হয়। যেমন কণ্ঠ বা যন্ত্র ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বৃহন্নলার বিনোদনবৃত্তি: আলো ক্রমে আসিতেছে?

অবন্তিকা

“দিদি কিছু দিয়ে যা l” “না পারবো না l” “কেন পারবি না?” “কেন ভিক্ষা করছেন?” “ভিক্ষে করি না, নাচগান করে পয়সা কামাই l” কথোপকথন শেষ হওয়ার আগেই সবুজ সংকেতে শহরের অন্যতম ব্যস্ত রাজপথ দ্রুত গতিশীল হয়ে পড়ে l জমকালো হলদেটে শাড়ি পরিহিত রোগাসোগা চেহারার মানুষটি সামান্য গলা তুলে বলে যান, “চোখে গগল্স পরবি আর গরিবকে দুটো টাকা দিতে পারবি না?”

একাধিক কালো চশমা ছিল, বা, আছে l দীর্ঘ দীর্ঘ সময়কাল ধরে l কিছু সামাজিক কালো চশমা, যার মধ্যে দিয়ে রূঢ় বাস্তবতাকে কিছুটা ফিকে বলে প্রতীতি হতে পারে l মনে হতে পারে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের স্বীকৃতিতে খুব সহজেই বদলে যাবে ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ দৈনন্দিনতা l কিন্তু লিঙ্গসাম্যের রাস্তাটা আদতে দুর্গম ও সময়সাপেক্ষ l আমরা দ্রুতবেগে এগিয়ে চলা মানুষেরা বহুকাল যাবৎ, ওই ট্র্যাফিক সিগনাল আর যানজটের ভরসায় নিজেদের রুজিরোজগারের বন্দোবস্ত করে নেওয়া প্রান্তিক মানুষগুলোকে কালো চশমার মধ্যে দিয়ে দেখছি l রাষ্ট্রের কাচ ক্রমে স্বচ্ছতর হচ্ছে l কিন্তু সার্বিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো ঠিক কতখানি স্বচ্ছ হলে ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ সমানাধিকারের ভার্ডিক্ট-কে প্রয়োগ করা যেতে পারে যাপন চর্যায়, তা এখনও গবেষণা-প্রত্যাশী l


ভিন্ন লিঙ্গ বনাম তৃতীয় লিঙ্গ: ‘মেন অ্যান্ড উওমেন- নট টু লার্ন বাট টু আনলার্ন’:

সংস্কৃতির আদি থেকে প্রজননের নিরিখে যে সমাজ পুরুষ ও মহিলা এই দুই ভাগে বিভক্ত এবং অন্যথার অস্তিত্ব নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত, সেখানে ‘তৃতীয়’ অভিধা এই ট্রান্সজেন্ডার অথবা, হিজড়ে, ইউনাক, কোথি, যোগাপ্পা, আরোবানী বা শিবশক্তি গোষ্ঠীর মানুষদের মূলস্রোতে মিশিয়ে দিতে কতটা রাজনৈতিকভাবে সঠিক হয়, তা নিয়ে সংশয় থাকে l বরং ‘আদার জেন্ডার’ বা ভিন্ন লিঙ্গকে অনেক বেশি যথাযথ বলে মনে হয় l
জাস্টিস কে.এস রাধাকৃষ্ণন তাঁর ভারডিক্টে লিখছেন- শচীন নামের তেইশ বছর বয়সী একটি মানুষ বহিরঙ্গে পুরুষের বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মালেও, অন্তঃকরণে সে নিজেকে মেয়ে হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় l ছোটবেলা থেকে সে মায়ের গেরস্থালির কাজে হাত লাগায় l জল তোলে, কাপড় কাচে, কুটনো কোটে l পড়শীরা তার আচরণে হাসাহাসি করে, সে কেন বাবার সঙ্গে বাইরের কাজে বেরোয় না তাই নিয়ে প্রশ্ন তোলে l শচীনের বাবা-মা তার ইচ্ছার পরিপন্থীর না হলেও, সামাজিক চাপের মুখে পড়ে কোনও প্রতিবাদ জানানোর সাহস অর্জন করতে পারেনা l
খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, শচীনের মত একটি রূপান্তরকামী অল্পবয়সী মানুষ, যে পুরুষের আকৃতিতে নারীর প্রকৃতি বলে নিজেক উপস্থাপিত করে, সেও নারীত্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মায়ের ঘরকন্না ও বাইরের কাজকে বাবার কাজ বোঝে l বলা বাহুল্য, এও এক মিথ, যা ভিন্ন লিঙ্গের অস্তিত্বকে বেঁধে রাখছে পুরুষ ও মহিলার কিছু সমাজপ্রদত্ত সুনির্দিষ্ট ধারণার বেড়াজালে l আবার বৈপরীত্যের কথায় আসা যাক l ধরা যাক, ষোলো বছর বয়সী জেসমিন নামের একটি মানুষ আকৃতিগতভাবে মেয়ে, তার স্তন সুস্পষ্ট, রজঃদর্শন ঘটেছে, অথচ সে আচরণে ডাকাবুকো, গ্রামের আলাউদ্দিন, শামিম, মহসিনদের সাথে ব্যাট-বল খেলতে যায় শার্ট-প্যান্ট প’রে l বাহ্যিক এই প্রচলিত পুরুষোচিত আচরণ তাকে বান্ধবীদের থেকে আলাদা করে l সে ক্রমশ মনে করতে থাকে, সে আসলে ছেলেই, ভ্রান্তিবশত মেয়ে হয়ে জন্মেছে l সমান্তরাল এই অস্তিত্বের সংকটে যে দ্বন্দ্ব এদের জেরবার করে, তাও কিন্তু ‘সমাজ দুইভাগে বিভক্ত যথা মহিলা ও পুরুষ’- এই মিথ-জনিত l এর বাইরে বেরিয়ে এসে, ভিন্ন লিঙ্গকে যদি পৃথক, স্বতন্ত্র ও আত্মনির্ভর অস্তিত্ব হিসাবেই বিবেচনা করা যায়, তবে ওই প্রান্তিক মানুষগুলোর পক্ষেও সম্ভব হয় নিরন্তর মানসিক জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসা l কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, সমস্ত লিঙ্গের অস্তিত্বকে পৃথকভাবে দেগে দেওয়ার জন্য পোশাক-পরিচ্ছদ, যৌন আকাঙ্ক্ষা-অনাকাঙ্ক্ষা বা যৌনসঙ্গী নির্বাচন এই মাপকাঠিগুলোর ওপর নির্ভরশীল হতে হয় l আর এ মাপকাঠি যতটা না ব্যক্তির স্বতন্ত্র ইচ্ছানির্ভর, তার চেয়ে ঢের বেশি সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র দ্বারা পূর্ব-নির্ধারিত l


বৃহন্নলার বিনোদনবৃত্তি:

ঊর্বশীর অভিশাপে পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসের সময় মত্স্য-রাজ বিরাটের অন্দরমহলে অর্জুন ঢুকেছিলেন ক্লীবের ছদ্মবেশে l তাঁর নাম হয়েছিল বৃহন্নলা l এবং জীবিকা- এক বছরকালব্যাপী মহিলাদের নৃত্যগীতির শিক্ষাদান করা l অন্যদিকে রামচন্দ্র যখন বনবাসের জন্য রাজ্য ছাড়ছিলেন, তখন আপামর রাজ্যবাসী তাঁকে অনুসরণ করে এগোতে থাকে l রাম সমস্ত নারী-পুরুষকে ঘরে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন l কিন্তু হিজড়েরা ওই দুই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায়, আদেশ মানতে বাধ্য নয় l ফলত তাঁরা রামচন্দ্রের সঙ্গে অনেকটা পথ অতিক্রম করেন l এ হেন আচরণে মুগ্ধ রাম তাঁদের আশীর্বাদ-স্বরূপ, নাচ-গান ও মনোরঞ্জনের মাধ্যমে বিবাহ ও সন্তানজন্মের মতো তথাকথিত শুভ অনুষ্ঠান সূচনা করার অধিকার দেন l
অদ্যবধি এ রাজ্যে হিজড়ে সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষজন ছোট ছোট গোষ্ঠী গঠন করে একপ্রকার সেই উপায়েই অন্নসংস্থান করে চলেছেন l সন্তানজন্মের পর বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাচগান করে টাকাপয়সা, চালডাল, এমনকি জামাকাপড়ও সংগ্রহ করে থাকেন এঁরা l অপরপক্ষে, ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের অন্যতম পেশা বিনোদনের আরেক ধারা, অর্থাৎ যৌনবৃত্তি l পয়সা রোজগারের এসব পন্থা কতখানি স্ব-ইচ্ছাবশত এবং কতটা উপায়ান্তর না থাকায়, সে বিষয় বিতর্কের l তবে যদি প্রশ্ন আসে সরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসনের, তো একটা প্রাসঙ্গিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় l যে ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ যৌনকর্মী নিজের পেশার মাধ্যমে দৈনিক গড়ে রোজগার করেন এক হাজার টাকা, পুনর্বাসনের মাধ্যমে দিনে সাকুল্যে একশ টাকা আয়ের ছোটখাটো হাতের কাজকে তিনি কেন নিজের জীবিকা হিসাবে গ্রহণ করতে চাইবেন? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের একার নৈমিত্তিক রোজগারের ওপর ভিত্তি করে তাঁরা সংসার চালান, অনেকেই গ্রাম বা মফঃস্বল থেকে চলে এসে শহরে থেকে বাড়ি ভাড়া মেটান, বৃদ্ধ বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজনের দেখভাল করেন l ফলত বিচ্ছিন্নভাবে স্বল্প আয়ে জীবন চালানোর চেয়ে প্রচলিত পন্থাকে জীবিকা হিসাবে গ্রহণ করা এঁদের কাছে অনেকটা লাভজনক l উপরন্তু বৃহত্তর সমাজের চোখে এখনও এঁরা ব্রাত্যজন, তাই প্রান্তবাসী হয়ে, গোষ্ঠীর মধ্যে থেকে নির্দিষ্ট কিছু জীবিকায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখাকে হয়তো এঁরা কিছুটা নিরাপদ বলেও মনে করেন, যেখানে তাঁদের আইডেনটিটি সংক্রান্ত তামাম কৌতুহলের ও কৌতুকের সম্মুখীন হতে হয় না প্রতিনিয়ত l


শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকানির্বাহ ও সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার:

‘তৃতীয় লিঙ্গকে’ ‘আদার ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস’ হিসাবে স্বীকৃত করা লিঙ্গসাম্যের নিরিখে একটা দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত l আর দিনযাপনের ন্যূনতম অধিকারগুলোকে তাদের জীবনের অঙ্গীভূত করা তার পরবর্তী পদেক্ষপ l সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ রাজ্যে এখনও পর্যন্ত মোট যত সংখ্যক ট্রান্সজেন্ডার ও হিজড়ে শ্রেণীর মানুষ আছেন, তার সাপেক্ষে, মূলধারায় শিক্ষালাভের অধিকার যে গুটিকয় ট্রান্সজেন্ডার ও হিজড়ে মানুষজন পেয়েছেন, তার শতকরা হিসাব এতটাই নগণ্য যে চোখে পড়ে না l উপরন্তু ইতিমধ্যে যেসব ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ মানুষ প্রাথমিক বা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন, প্রতিষ্ঠানে তাঁদের প্রায় সকলের নামই নথিভুক্ত হয়েছিল নারী/পুরুষ হিসাবে l সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার পর ঠিক কতজন ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ ব্যক্তিকে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ পরিচয়ে পঠনপাঠনের বা চাকরির দরখাস্ত করার অধিকার দেওয়া গেছে, রাজ্যে তার খতিয়ান স্পষ্ট নয় l ২০১৪-র শেষের দিক থেকে একে একে তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র এবং তারও পরে ২০১৫-তে পশ্চিমবঙ্গে গঠিত হয় ট্রান্সজেন্ডার ওয়েলফেয়ার বোর্ড l এই বোর্ড নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত l তবে সরকারি পরিসরে এই সাম্প্রতিক উদ্যোগের আগে থেকেই বহু বেসরকারি সংস্থা, যেমন- অ্যাসোসিয়েশান ফর ট্রান্সজেন্ডার/হিজড়া ইন বেঙ্গল, দুর্বার আনন্দম, নতুন আলো, বীরভূম সম্পর্ক, সম্পূর্না (নারী থেকে পুরুষে রূপান্তরিত মানুষদের নিয়ে), বন্ধন, একতা, জলপাইগুড়ি উত্তরায়ন এবং আরও একাধিক ছোট-বড় সংগঠন কোলকাতায় ও জেলায় জেলায় ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ মানুষদের নৈতিক ও সামাজিক অধিকারের দাবিতে কাজ করে চলেছে l
‘তৃতীয় লিঙ্গের’ মানুষেরা, সাধারণত দেখা যায়, বয়ঃসন্ধির সময়কাল থেকে মানসিক দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন l মেয়েলি পুরুষ অথবা পুরুষালি মেয়েরা, এমনকি রিয়েলিটি শো-তেও আদ্যন্ত মস্করার বিষয়বস্তু l এমতাবস্থায়, একজন ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ মানুষকে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ছাড়পত্র দিলেই সমাজিক দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় এমনটা নয় l তাদেরকে শিক্ষার মূলস্রোতের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দুটো প্রাথমিক কথা মাথায় রাখা জরুরি, এক- আশেপাশের শিক্ষার্থীদের ট্রান্সফোবিয়া বা ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ প্রতি ভীতি কাটানো, দুই- ওই তৃতীয় লিঙ্গের পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে সাধারণ পাঠ্যক্রমের সাথে সাথে এমনকিছু বিষয়ের ওপরেও নজর দেওয়া যা তাদের অবসাদ, ভয়, বা আত্মহত্যা প্রবণতাকে কাটিয়ে তুলতে সাহায্য করবে l
আন্তর্জাতিক স্তরে, পৃথিবীর অন্তত ২০টা দেশে ১৯৯৯ সাল থেকে, ২০শে নভেম্বর দিনটা ‘ট্রান্সজেন্ডার ডে অফ রিমেমব্রেন্স’ হিসাবে পালিত হয় l এর ইতিহাস যদিও বেদনার l রিটা হেস্টার নামে ৩৪ বছর বয়সী এক আফ্রিকান রূপান্তরকামী মানুষ যৌন হিংসার শিকার হয়ে খুন হন ১৯৯৮ সালে l ‘ট্রান্সজেন্ডার ডে অফ রিমেমব্রেন্স’-এর মূল উদ্দেশ্য ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ প্রতি অহেতুক সামাজিক ভীতি ও তাদের প্রতি নিরন্তর হিংসার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা l
স্বাস্থ্যক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা দেখা দেয় লিঙ্গ নির্ধারণের সময় l কোনও দরখাস্ততে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসাবে নিজের পরিচয় দেওয়ার জন্য ডাক্তারি সার্টিফিকেট থাকা জরুরি l বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই পরীক্ষা বেশ মোটা টাকার বিনিময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে করাতে হয় l রাজ্যের সরকারি চিকিৎসা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সুযোগ সুবিধা নিয়মিতভাবে পাওয়া গেলে নিচু স্তরের মানুষদের পক্ষে নিজেদের জেন্ডার-আইডেনটিটি প্রকাশ করা যে অনেকটা সহজতর হবে, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না l মেল-ফিমেল ওয়ার্ডের সাথে সাথে ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ জন্যও স্বতন্ত্র ঘর রাখার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন l এ রাজ্যে কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘সেক্স (জেন্ডার) রিঅ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি’-র প্রস্তাব গৃহীত হলেও, অত্যন্ত খরচসাপেক্ষ এই শল্যচিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত পরিকাঠামো তৈরি করা যায়নি সর্বত্র l

একদিকে যেমন ট্রান্সজেন্ডার বা হিজড়েরা আটকে আছেন যৌনবৃত্তি বা ভিক্ষাবৃত্তির মতো চেনা ও চিরাচরিত জীবিকায়, অন্যদিকে মূল ধারায় নিয়ে আসার দ্রুত আকাঙ্ক্ষায় এঁদেরকে পুনর্বাসনের মতো কিছু সস্তায় পুষ্টিকর রাস্তাতে চালনা করার চেষ্টা করছে বৃহত্তর সমাজ l বিভিন্ন পরিসরে ক্রিয়াশীল সংগঠনগুলোর একাধিক সংরক্ষণের দাবি একটু বেশি জোরদার বলে মনে হতে পারে আপাতদৃষ্টিতে l সেসব মেটাতে গিয়ে রাষ্ট্রকে শৌচালয় থেকে হাসপাতাল, যানবাহনের সিট থেকে দফতর প্রভৃতি বিবিধ সামাজিক ক্ষেত্রে যে যে পরিকাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে, তাকেও সময় সময় মনে হতে পারে পক্ষপাতিত্ব l তবে বহু শতাব্দীর বঞ্চনায় প্রলেপ দিতে এ ন্যূনতম জীবনের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া আসলে সাম্যেরই ইঙ্গিতবাহী l কারণ, ‘জাস্টিস’ আর ‘ইকুয়ালিটি’ সমার্থক হলেও, সবসময় সমান্তরাল হয়না l

---

[প্রবন্ধটি 'চতুরঙ্গ' পত্রিকার কার্তিক-চৈত্র ১৪২২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে l সম্পাদক শ্রী গৌতম সেনগুপ্ত ও উপদেষ্টা শ্রী শঙ্খ ঘোষের অনুমতিক্রমে এই লেখা ব্লগেও তুলে দিলাম]

343 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: অবন্তিকা

Re: বৃহন্নলার বিনোদনবৃত্তি: আলো ক্রমে আসিতেছে?

Avatar: Prativa Sarker

Re: বৃহন্নলার বিনোদনবৃত্তি: আলো ক্রমে আসিতেছে?

সচেতনতা বাড়ছে। কলকাতার বেশির ভাগ কলেজে ভর্তি হবার ফর্মে এখন সেক্স ক্যাটেগরিতে মেল, ফিমেল ছাড়াও আদার্স কথাটি লেখা হচ্ছে। এটা একধরণের সামাজিক স্বীকৃতি। যে এঁরাও আছেন। আর সেটা তৈরি করে এই লেখাগুলো । তবে যারা নিজেদের মেয়ে মনে করেন বা পুরুষের দেহে বন্দী নারীহৃদয়, তারা এতে খুশি হবেন কিনা জানি না। আরো অনেক ভাবতে হবে আমাদের।
অনেক জানলাম ।
Avatar: d

Re: বৃহন্নলার বিনোদনবৃত্তি: আলো ক্রমে আসিতেছে?

বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি এসেছে ভারতের চেয়ে আগে। কিন্তু সে নাকি শুধুই সরকারী স্বীকৃতি, সমাজে নাকি প্রয় কোনওরকম অ্যাকসেপ্টেন্স নেই। তা সেই প্রসঙ্গে এক আলোচনায় ওখানকার কিছু লোক জানালেন হিন্দুধর্মে নাকি তৃতীয় লিঙ্গের একটা স্থান আছে এবং সেইজন্য নাকি ভারতে এদের ওপরে অত্যাচার বা সামাজিক চাপ অপেক্ষাকৃত কম।
শুনে খুবই অবাক হয়েছিলাম, কারণ আমার চোখকানের অভিজ্ঞতা তো আশেপাশে কোনও স্থান আদৌ দেখায় না।

অবন্তিকা বা আর কেউ কিছু জানেন এই বিষয়ে?
Avatar: sosen

Re: বৃহন্নলার বিনোদনবৃত্তি: আলো ক্রমে আসিতেছে?

পাকিস্তানেও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার আইনত স্বীকৃত। তাতে করে যে সামাজিক হ্যারাসমেন্ট কমেনি, সেটাও নথিভুক্ত।
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সঙ্গে কাজ করার একটু অভিজ্ঞতা থেকে বলি,তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের চিন্তায় কিন্তু জেন্ডার আইডেন্টিটি সেক্সের সঙ্গে অভিন্ন ভাবে যুক্ত। ইনফ্যাকট, শরীরবোধের থেকে সোশ্যাল কনস্ট্রাকট অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, নারী নামক বাক্সের কিম্বা পুরুষ নামক বাক্সের প্রতি এঁদের টান অনেক বেশি, এঁরা কনজারভেটিভও। এলজিবিটি কথাটা যদিও আমরা একনিঃশ্বাসে বলে থাকি, টি একটি সম্পূর্ণ আলাদা অধ্যায়ের দাবি রাখে। এঁদের যৌনতাও ফ্লুইড নয়। সামাজিক অ্যাকসেপ্টেন্স প্রবলেম অনেক অনেক বেশি, সমকামী বা উভকামীদের তুলনায়। এছাড়াও রয়েছে হিজড়াবৃত্তির একটি ট্রাডিশনাল ছাতা যেটিকে এঁরা আপন মনে করেন। শুধু পয়সা রোজগারের জন্য নয়, যৌনতার স্বাদ নেওয়ার জন্যও অনেকেই প্রস্টিটিউশন করেন, কারণ সমাজের স্বাভাবিক পরিসরে যৌনসঙ্গী পাওয়াও মুশকিল। জীবনসঙ্গী তো ছেড়েই দিলাম। এই অবস্থায় মেইনস্ট্রিমে ফেরানোর জন্য, আর ভিক্ষাবৃত্তি রোধ করার জন্য অনেক অনেক বেশী সুবিধা এনাদের দেওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। চিকিৎসা, থেরাপি, শিক্ষা, আর্থিক সহায়তা।

এবং আমাদের জন্যও বাধ্যতামূলক থেরাপি, ট্রান্সফোবিয়া দূর করার জন্য। স্কুলে, কলেজে। আপিসে।




আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন